Showing posts with label incomplete. Show all posts
Showing posts with label incomplete. Show all posts

Thursday, 20 April 2023

Kalimpong Rahasya by Abhik Dutta (incomplete)

কালিম্পং রহস্য 

অভীক দত্ত 

-বুঝলে ভাই তপেশ, এই গরমটা না, সহ্য হচ্ছে না। আমার মনে হয়, আমরা পাহাড়ে ঘুরে এলে ভালো হত। কী বলেন ফেলুবাবু? 

শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে শুনেছিলাম দারুণ ম্যাঙ্গো লস্যি বানায়। সে দোকান থেকে লস্যি এনে দিয়েছেন হরিপদবাবু।  লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে ফেলুদা বলল, "আপনি সাহারায় শিহরণ আনতে চেয়েছিলেন লালমোহনবাবু। এখন এই গরমের ঠ্যালায় কি নতুন কোন কাহিনি মাথায় চলে এলো নাকি?" 

লালমোহনবাবু প্রথমেই এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে দিয়েছেন। ফেলুদার কথায় উৎসাহিত হয়ে বললেন, "আরে মশাই, আপনাকে তো সেই থেকে বলে যাচ্ছি। এত বছরের রয়্যালটি জমে আছে। কালিম্পং এর সেই বাড়িটা, মিস্টার আগরওয়াল বলেই দিয়েছেন ফেলুবাবুকে নিয়ে আসুন, ডিসকাউন্ট দিয়ে টাকা আরো কমিয়ে দেবো। আপনি তো শুনছেনই না মশাই। এই গরমে আমি আর কলকাতায় থাকতেই চাইছি না। মার্চের শেষের দিকে পাহাড়ে চলে যাবো, পুজোর মুখে নেমে আসবো”। 

ফেলুদা লস্যি শেষ করে বলল, “আর আমার পসারটির ততদিনে গঙ্গাপ্রাপ্তি হোক। আপনি তেমনটাই চাইছেন তো?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “আরে না মশাই। পাহাড়ে কি রহস্যের কমতি আছে নাকি? এই আগরওয়ালের মুখেই তো শোনা। বেশ কয়েকদিন হল একটার পর একটা বাড়িতে চুরি হয়ে যাচ্ছে...” 

ফেলুদা বলল, “ছিচকে চোরের জন্য পুলিশ আছে। তার জন্য প্রদোষ মিত্তিরকে দরকার হয় না”। 

লালমোহনবাবু মুষড়ে পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখেছো তোপসে, কোন প্রলোভনেই আমি ফেলুবাবুকে রাজি করাতে পারছি না। এই গরমে এখানে থাকার কোন মানে হয়? তুমিই বল?” 

আমি ফেলুদার দিকে তাকালাম। কয়েকদিন ধরেই ফেলুদা আমাদের কারো সঙ্গেই বেশি কথা বলছে না। ওয়েস্টার্ন আর্ট নিয়ে একটা মস্ত বড় ব্লগ পেয়েছে। রাতদিন ওটাই পড়ে যাচ্ছে। আমাকে বলে দিয়েছে ক্লায়েন্ট এলে মেরিট বুঝে তবেই যেন ওর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করি। এর মধ্যে লালমোহনবাবুর বায়নায় যে ও খানিকটা বিরক্ত হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি। 

তবে লালমোহনবাবুকে ফেলুদা পছন্দ করে বলে এই প্রস্তাবটা হয়তো ওকেও ভাবাচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। জোর করে লাভ নেই। যদি যেতে চায়, তবেই যাওয়া হবে, নয়তো নয়। 

পর পর দু তিন বার কলিং বেল বেজে উঠলো। ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভদ্রলোকের বেশ তাড়া আছে মনে হচ্ছে। দেখ তো”। 

আমি দরজা খুললাম। 

প্রায় ফেলুদার সমান লম্বা এক ভদ্রলোক, ধবধবে ফরসা, বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে, কাঁচা পাকা চুল, আমাকে দেখে হেসে বললেন, “আপনিই শ্রী তপেশ রঞ্জন মিত্র, তাই তো?” 

আমি ঘাড় নাড়লাম, “হ্যাঁ, বলুন”। 

ভদ্রলোক উঁকি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে বললেন, “প্রদোষবাবু আছেন?” 

আমি বললাম, “আছেন, তবে এখন হয়তো দেখা করতে পারবেন না”। 

ভদ্রলোক মুষড়ে পড়ে বললেন, “আমার খুব দরকার ছিল”... 

ভদ্রলোকের কথা শেষ হবার আগেই ফেলুদা বেরিয়ে এলো, “রাজশেখর পালিত, আপনার আর্টিকেলটা আজকেই কাগজে পড়েছি, তোপসে ওনাকে ভেতরে নিয়ে আয়”। 

বুঝলাম ডোর ক্যামে ফেলুদা ভদ্রলোককে দেখে নিয়েছেন। আমি দরজা ছেড়ে দিলাম। ভদ্রলোক বিগলিত হাসি হেসে বললেন, “আমি বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি প্রদোষবাবু”। 

ফেলুদা বললেন, “সেটা আমি বুঝেছি। আমার মনে হচ্ছিল বটে আপনি আসবেন। আসুন”। 

লালমোহনবাবু রাজশেখর বাবুকে দেখেই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “আরে, আপনিই সেই ওয়ার্ল্ড ফেমাস এক্সপ্লোরার রাজশেখরবাবু নন?” 

আমি জিভ কাটলাম। আমিই তারমানে একা ধরতে পারি নি। অবিশ্যি আমারও দোষ নেই। সকাল থেকে একগাদা ক্রসওয়ার্ড করিয়েছে ফেলুদা। বলেছে ক্রসওয়ার্ডের ধাঁধায় নাকি মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। মস্তিষ্ক ঠিক ঠাক সচল রাখা জরুরি। মোবাইল ঘাঁটারও একটা সময় বেঁধে দিয়েছে।  এই ক্রসওয়ার্ডের জন্যই নিউজ ফিড দেখা হয় নি। 

রাজশেখর বললেন, “ফেমাস হয়ে গিয়েই তো বিপদে পড়ে গেলাম মশাই। লাস্ট মান্থে পেরু থেকে ফিরলাম, টাইমসে আর্টিকেল লিখলাম। তারপর থেকে তিন বার আমার বাড়িতে চুরির অ্যাটেম্পট হল। কলকাতায় যাও বা সিকিউরিটি বাড়িয়ে নজরদারি বাড়ানো গেলো, মূল সমস্যা তো সেই একই থেকে গেলো”। 

ফেলুদা বলল, “কলকাতার বাড়িতে তার মানে মূল্যবান তেমন কিছু নেই, তাই তো?” 

রাজশেখর বললেন, “একবারে নেই তা নয়। ছোটখাটো কয়েকটা মূর্তি বাদে আমি এখানে কিছু রাখি নি। কালিম্পং এ আমার ঠাকুরদা একটা বাড়ি করে রেখেছিলেন। আমি সে বাড়িতে একটা জিনিস রেখেছিলাম। অবশ্যই সকলের অগোচরে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে সে জিনিসের মূল্য একবারেই নেই, কিন্তু কালেক্টরদের কাছে ও জিনিস অমূল্য। মিশর থেকে আনা প্যাপিরাস কাগজের উপরে আঁকা একটা ম্যাপ। আমার প্রথম কলামে আমি এই সংগ্রহের কথা বর্ণনা করি। তারপরই কলকাতায় অ্যাটেম্পট হওয়া শুরু করে। আমি অতোটা চিন্তিত ছিলাম না... কিন্তু গতকাল রাতে কালিম্পং এর বাড়িতেও...” 

আমি লালমোহনবাবুর দিকে তাকালাম। কালিম্পং শুনেই লালমোহনবাবুর মুখটা যেভাবে পাল্টে গেলো, সেটা ফেলুদারও নজর এড়ালো না। 

রাজশেখর বলে চললেন, “ও বাড়িতে একবার অ্যাটেম্পট হয়েছে, সামলে নেওয়া গেছে প্রদোষবাবু। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় সুযোগটা দেওয়া উচিত হবে না। আপনি যদি একবার ও বাড়ির নিরাপত্তার ব্যাপারটা সরেজমিনে দেখে আসতেন...  আমার বাবা আর্মিতে ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পরে কালিম্পং এই আছেন। এবার বাবার বয়স হচ্ছে। বাবা আছে বলেই আমার চিন্তাটা বেশি। আবার আমি পুলিশকেও ঠিক ভরসা করতে পারছি না”। 

ফেলুদা বলল, “আপনার উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ আছে মিস্টার পালিত, কিন্তু আমি তো নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নই। এ বিষয়ে আমি ঠিক কী অ্যাডভাইস দিতে পারি, সেটাই তো বুঝতে পারছি না”। লালমোহনবাবু হঠাৎ করে কাশতে শুরু করে দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক বলতে চাইছেন হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছেন কেন মশাই? হাসি চেপে বসে রইলাম। 

রাজশেখর একটু ইতস্তত করে বললেন, “অ্যাকচুয়ালি আরেকটা ব্যাপারেও আপনার সাহায্যটা দরকার মিস্টার মিটার”। 

ফেলুদা বলল, “নির্দ্বিধায় বলুন”। 

রাজশেখর বললেন, “ইন্দোনেশিয়া থেকে চার পাঁচ বছর আগে আমি একটি লক্ষ্মীর মূর্তি নিয়ে আসি। প্রায় এক হাজার বছর পুরনো মূর্তি। পিওর গোল্ডের। আমি বাবাকে সে মূর্তিটা দিয়েছিলাম রাখার জন্য। আজ যখন সকালে বাবা আমাকে ফোন করেন চুরির অ্যাটেম্পটের ব্যাপারে, আমি বাবাকে মূর্তিটার কথা জিজ্ঞেস করি। বাবা বলছেন তিনি মনে করতে পারছেন না মূর্তিটা কোথায় রেখেছেন। এটা শোনার পর থেকেই আমার মাথা কাজ করছে না”। 

ফেলুদা চারমিনার ধরালো। দুটো ধোঁয়ার রিং ছেড়ে রাজশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতের লক্ষ্মীর ক্রয়মূল্যটা আপনার চিন্তার কারণ, না প্যাপিরাসের ম্যাপ?” 

রাজশেখর বললেন, “দুটোই প্রদোষবাবু। আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি। বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো। আপনি যদি রাজি থাকেন তবে কাল ভোরের ফ্লাইটেই... আপনি বললে আমি আপনার অ্যাডভান্সটাও ইউ পি আই করে...” 

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “আপনার আগরওয়ালকে তাহলে তৈরি হতে বলুন লালমোহনবাবু, ডিসকাউন্ট তবে আপনি পাচ্ছেনই”। 

লালমোহনবাবু ঘাড় নেড়ে হাসি মুখে বললেন, “বিলক্ষণ”। 

***

২ 

“তপেশ, পিছনের লোকটাকে দেখেছো? সিট নাম্বার ১০ ই। হাইলি সাসপিশাস!” 

লালমোহনবাবু যার কথা বললেন, মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখে নিলাম। 

কাঁচা পাকা গোঁফ, রিমলেশ চশমা, প্রফেসরদের মতন দেখতে। এই ভদ্রলোকের মধ্যে লালমোহনবাবু সন্দেহজনক কী পেলেন, তা বুঝতে পারলাম না। 

প্লেন টেক অফ করার পর থেকেই ফেলুদা বই নিয়ে বসে আছে। মধ্যযুগের আর্ট চ্যাপ্টারটা ধরেছে। রাজশেখর বাবু আমার সামনের সিটে বসেছেন। প্লেনের মহার্ঘ্য চা খাওয়াতে চেয়েছিলেন। ফেলুদা বলে দিয়েছে একবারে বাগডোগড়া নেমেই খাবে। 

আধঘণ্টা থেকে বড় জোড় চল্লিশ মিনিট লাগে। লালমোহনবাবু বর্ণিত “সাসপিশাস” লোকটিকে দেখে চোখ বুজে এসেছিল।

লালমোহনবাবুই ডেকে দিলেন। লাগেজ নেবার সময় দেখলাম সেই “হাইলি সাসপিশাস” লোকটিই লালমোহনবাবুকে দেখে চোখ কপালে তুলে বলছেন, “আরে আপনি জটায়ু না? আপনি জানেন আপনার কত বড় ফ্যান আমি? সাহারায় শিহরণ পড়ে দু রাত্তির ঘুমোতে পারি নি মশাই। কী রেঞ্জ আপনার! অসাধারণ। জাপান থেকে পেরু, ইউক্রেন থেকে ব্রেজিল... নাহ... একটা সেলফি কিন্তু মাস্ট স্যার”। 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করতে করতে সেলফি তুলে ভদ্রলোকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আমার কাছে এসে বললেন, “ভারি মাই ডিয়ার লোক বুঝলে তপেশ। আমার সব ক’টি বই প্রকাশের প্রথম দিনই সংগ্রহ করেন”। 

ফেলুদা মাস্ক পরে আছে। বেল্ট থেকে ওর ব্লু বেরি কালারের ব্যাগটা নিয়ে বলল, “আপনি কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই ঠাণ্ডা গরম বাঁধিয়ে বসবেন লালমোহনবাবু। বাইরে এই মুহূর্তে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি। কালিম্পং এও কেমন গরম পড়েছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সোয়েটারটা হাতে রাখুন”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলেন কী মশাই? হিমালয়ের এত কাছে এসেও গরম থেকে মুক্তি নেই?” 

ফেলুদা বলল, “যথেচ্ছ গাছ কাটলে শুধু গরম কেন, আরো অনেক কিছু থেকেই মুক্তি পাবার কোন আশা দেখতে পাচ্ছি না”। 

রাজশেখরবাবু তার ব্যাগটা সংগ্রহ করে আমাদের কাছে এসে বললেন, “ড্রাইভার ফোন করেছিল। এসে গেছে। পারকিং অবধি হাঁটতে হবে”। 

ফেলুদা বললেন, “সেটা বলতে সংকোচ বোধ করছেন কেন? এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। চলুন”। 

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম। ফেলুদা পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি বলেছিল বটে, আমার আরো বেশি গরম লাগছিল। 

রাজশেখরবাবুর গাড়িতে উঠে লালমোহনবাবু বললেন, “এহ, ভারি ভুল হয়ে গেছে তপেশ। আগে বুঝলে এতো সোয়েটার নিয়ে আসতাম না”। 

এবার বুঝলাম লালমোহনবাবুর ব্যাগটা এতো ভারি লাগছিলো কেন। ফেলুদা বলল, “আপনি কি দিন পনেরোর হিসেবে রোজ একটা করে সোয়েটার নিয়ে এসেছেন নাকি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “ওরকমই বলতে পারেন। বেশ কয়েকদিন ধরে রাইটার্স ব্লক চলছে মশাই। ঘুরলে যদি মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়।  ইন্সপিরেশন পাওয়ার জন্য তাজা হাওয়া, আর আগরওয়ালের বাংলো তো আছেই। কী বলেন?” জোরে হেসে উঠলেন লালমোহনবাবু। 

গাড়ি চলতে শুরু করতেই রাজশেখরবাবুর ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে খানিকটা কথা এগোতেই রাজশেখরবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি কী বেচবো, কোনটা বেচবো না, সেটা কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে ঠিক করতে হবে? ... না... না আমি বেচবো না... আর ফারদার আমাকে এই ব্যাপারে কোন ফোন করবেন না... ডিসগাস্টিং”! 

ফোন কেটে দিলেন রাজশেখরবাবু। 

ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “কোন কালেক্টর ফোন করলেন আপনাকে?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “আর বলবেন না মশাই। বেশ কয়েকদিন ধরে ফোন করে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর জন্য এক কোটি টাকা অবধি দিতে রাজি আছে”। 

ফেলুদা বলল, “কে সে? এদেশেরই? নাকি মিডল ম্যান?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “এদেশেরই। বিষাক্ত মানব যাকে বলে। মগনলাল মেঘরাজ”। 

লালমোহনবাবু মনে হয় বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কোন কবিতা মনে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মগনলালের নাম শোনা মাত্র হেঁচকি তুলতে শুরু করলেন। তড়িঘড়ি জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম। একসঙ্গে অনেকটা জল খেয়ে নিয়ে বললেন, “উনি কি কালিম্পংএ দেখা দেবেন নাকি?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আজ বিকেলেই আমাদের বাড়ি আসবেন। কী বলবো বলুন? আসতে চাইলে কি আর বারণ করা যায়?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “না না, বারণ কি আর করা যায়? করা যায় না। আসুন আসুন। বারণ করা একবারেই ঠিক নয়!” 

***

৩ 

“আপনি এবার সোয়েটার পরে নিন লালমোহনবাবু”। 

তিস্তা বাজার পেরিয়ে গাড়ি পাহাড়ে উঠতে শুরু করতেই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া একটা দমকা হাওয়া জানান দিয়েছে এবার ঠাণ্ডা পড়বে। ফেলুদার কথা শুনে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, এই পাহাড়ে তিস্তা যেমন পাশে পাশে চলে, মগনলালও তেমনি সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকে কেন বলুন তো?” 

রাজশেখর বললেন, “পাহাড়ের সব নদীই কিন্তু তিস্তা না। রঙ্গিত আছে, রেলি আছে। এখন তো হোম স্টের যুগ। এক একটা নদীর ধারে দারুণ সব হোম স্টে তৈরি হয়েছে। জানেন প্রদোষবাবু, আমার মাঝে মাঝে কবিগুরুর ওই কবিতাটার কথা মনে হয়। নিজের ঘরের পাশের শিশিরবিন্দুটুকু দেখতে পারলাম না এদিকে গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালাম। এই পাহাড়ে কত অসংখ্য জায়গা আছে যেগুলো এখনও অনাবিষ্কৃত হয়ে পড়ে আছে”। 

ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “অনাবিষ্কৃত থাকাই ভালো। ট্যুরিস্টরা যেগুলো আবিষ্কার করছে, সেখানে প্লাস্টিক আর নোংরা ফেলে জায়গাগুলো শেষ করে দিচ্ছে। এবার সরকার বাহাদুর যদি রাস্তা চওড়া করার কথা ভেবে আবার পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানাতে শুরু করেন, তবেই চিত্তির”। 

রাজশেখর বললেন, “যা বলেছেন। তিস্তা বাজারের জ্যামটা দেখলেন এখন? বাগডোগরা বা এন জে পি যেতে আজকাল হাতে সময় না নিয়ে বেরোলে দুর্গতির একশেষ হয়”। 

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “কী ভাবছেন বলুন তো? নতুন উপন্যাসের নাম? কালিম্পঙে কেলেঙ্কারি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “আমার বেনারসের সরবতটার কথা মনে পড়ছে মশাই। এ লোকটা বার বার জেল থেকে ছাড়া পায় কী করে?” 

ফেলুদা বলল, “আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? ফেলু মিত্তির তো এখনও বেঁচে আছে”। 

লালমোহনবাবু জোরে হেসে উঠলেন, “ভয়? ভয় পাচ্ছি কে বললে? ভয় পাচ্ছি না”। 

লালমোহনবাবু বললেন বটে, কিন্তু তার গলার জোরে সেটা বোঝা গেলো না। 

ফেলুদা বলল, “আপনার কালিম্পং এর বাড়িতে চোর আসার ফুটেজটা পাওয়া গেছে রাজশেখরবাবু?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। পেয়েছি। দেখে কিছু বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের বাড়ি পৌঁছলে আপনাকে দেখাচ্ছি”। 

ফেলুদা বলল, “মোবাইলে আছে?” 

রাজশেখর তার ফোন বের করে বললেন, “তা আছে। দেখবেন?” 

ফেলুদা বলল, “দিন”। 

রাজশেখর ক্লিপ বের করে দিলেন। ভ্রূ কুঁচকে ফেলুদা ক্লিপটা দেখে নিয়ে রাজশেখবাবুকে তার ফোন ফেরত দিয়ে বলল, “মুখোশ পরে এসেছে। রাজেনবাবুর ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। তোর মনে পড়ল রে, তোপসে?” 

মনে পড়বে না আবার? ফেলুদার কেরামতি তো সেই প্রথম দেখেছিলাম। এসব জায়গায় বিভিন্ন বাহারি রকমের মুখোশ পাওয়া যায়। রাজশেখরবাবুর কালিম্পঙের বাড়িতে এরকম কোন মুখোশ পরেই চোর এসেছিলো। 

কালিম্পং পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো। রাজশেখরবাবুর বাড়িটা বেশ বড়। মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে। সাবেকি আমলের গাড়ি বারান্দা আছে। বাগানে সবুজ লন, বিভিন্ন ধরণের ফুল ফুটে রয়েছে। বাড়ি থেকে কালিম্পং শহরটা দিব্যি সুন্দর দেখা যাচ্ছে। 

লালমোহনবাবু মগনলালের কথা ভুলে মুগ্ধ হয়ে বললেন, “বাঃ। অসাধারণ! অনবদ্য! বুঝলেন ফেলুবাবু, আমাদের হুগলীর বিশিষ্ট কবি বৈকুণ্ঠ মল্লিক এই কালিম্পংকে নিয়ে লিখেছিলেন 

অহো অপূর্ব অতি সুন্দর তুমি 

কালিম্পং নগরী। 

কলিকাতা হতে 

হেরিনু তোমারে 

হাতে ফুল ঝুড়ি ঝুড়ি। 

কী অনবদ্য কবিতা বল তো তোপসে?”

অন্য সময় হলে হয়তো ফেলুদা এই কবিতা শুনে কিছু বলতো, এখন বলল না। বৈকুণ্ঠ মল্লিক যদি লালমোহনবাবুর মন থেকে মগনলাল মেঘরাজের মেঘ দূর করতে পারেন, তাতে ফেলুদা বাধা দিতে যাবেই বা কেন?  

রাজশেখরবাবুর বাবা রুদ্রশেখরবাবু গাড়ি বারান্দায় আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। রুদ্রশেখরবাবুর উচ্চতা ছেলের থেকেও বেশি, পেটানো চেহারা, চুলে সামান্য পাক ধরেছে। ভদ্রলোক যে বেশ ফিট, তা দেখেই বোঝা যায়।  ফেলুদাকে দেখে চওড়া হাসি হেসে বললেন, “আসুন আসুন প্রদোষবাবু। আমাদের সৌভাগ্য আপনি এ বাড়িতে পদার্পণ করেছেন”।  

ফেলুদা ড্রইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “সৌভাগ্যটা আমাদের হওয়া উচিত। আপনি কার্গিল যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ছিলেন, সেটা কিন্তু গুগল থেকে জানতে পেরেছি”। 

রুদ্রশেখর বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি আমার নাম গুগলেও সার্চ করে ফেলেছেন? অভাবনীয়”! 

ফেলুদা বলল, “ইদানীং এ অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক তথ্যে মাঝে মাঝেই ভুল পাওয়া যায়। তবু প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখানো সম্ভব নয়”। 

ড্রইং রুমটা ছিমছাম সুন্দর। রাজশেখর ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়েছেন। ফেলুদাকে বললেন, “চা দিতে বলি? নাকি কফি? ফ্রেশ হয়ে নেবেন না হয় তার পরে?” 

ফেলুদা বলল, “চা অবশ্যই। লালমোহনবাবু অবশ্য গ্রিন টি ধরেছেন আজকাল”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “ধ্যার মশাই, পাহাড়ে এসে আবার কেউ গ্রিন টি খায় নাকি? ফার্স্ট ফ্লাশ আছে নাকি রাজশেখরবাবু?” 

রাজশেখর হাসলেন, “আলবাত”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স হচ্ছে তো। বাইরেটা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। রাজা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে এ বাড়িতে দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র এনে রাখে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এলেও চোর বাবাজি পালানোর পথ পেতো না। খারাপ লাগছে, ব্যাটা এলো, আর আমি বুঝতেই পারলাম না?” 

ফেলুদা বলল, “আপনি ঘুমোচ্ছিলেন তখন?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। কিছু বুঝতেই পারি নি। ভাগ্যে পূব দিকের বারান্দার টবটা পড়ে গেলো। ওর শব্দে উঠে বেরিয়ে দেখি ব্যাটা পাঁচিল টপকাচ্ছে”। 

ফেলুদা রাজশেখরের দিকে তাকালেন, “আর দারোয়ান?” 

রাজশেখর বললেন, “এ জায়গা তো নিরুপদ্রব ছিল এদ্দিন। বাবা বাহাদুরকে ছুটি দিয়েছিলেন। ওর গ্রামে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন ছিল”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “আমি কী করে বুঝবো বলুন? আমার কাছে ছুটির জন্য বলল, আমি তো ভাবতেও পারি নি এরকম কিছু হতে পারে”। 

লালমোহনবাবু বসেন নি। ঘুরে ঘুরে দেওয়ালে টাঙানো ফটোগুলো দেখছিলেন। একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “ইনি ওবাবা না?” 

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “ওবামা। বারাক ওবামা”। 

রাজশেখর বললেন, “ওয়াশিংটন ডিসিতে আমাদের একটা প্রোগ্রামে এসেছিলেন। ভারি ভাল বক্তব্য রাখেন ভদ্রলোক”। 

লালমোহনবাবু খুশি হয়ে বললেন, “মারভেলাস মশাই, মারভেলাস। আপনি তো যে সে লোক নন”। 

রাজশেখর হাসলেন, “সেটা কি চোরেরা বুঝবে, বলুন?” 

ফেলুদা বলল, “আপনার সংগ্রহগুলো কোথায় রাখেন?” 

রাজশেখরবাবু উঠলেন, “আসুন”। 

***

৪ 

“এমনিতে সাদামাটা জিনিস, কিন্তু কিউরিও মূল্য বহু হতে পারে, এমন অনেক কিছুই আমার কাছে আছে। এটা দেখুন, মোঙ্গোলিয়া থেকে এনেছিলাম”। 

রাজশেখর বললেন। 

ছোট একটা ঘড়ি। বিভিন্ন নকশা আঁকা তাতে। ফেলুদার হাতে দিলেন। ফেলুদা ভাল করে দেখে বললেন, “আপনি মঙ্গোলিয়া গেছিলেন?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। বহুদিন ধরেই ও দেশটির প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। মুঘলদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ বরাবরের। তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ দেখবো না?” 

লালমোহনবাবু আগ্রহী গলায় বললেন, “তা কেমন দেখলেন চেঙ্গিস খানের দেশ?”

রাজশেখর হাসলেন, “ও দেশের ক্লাইমেট স্যুট করবে না এটুকু বলতে পারি। খুব বেশিদিন থাকতে পারি নি। ওখান থেকেই মস্কো চলে গেছিলাম”। 

ফেলুদা ঘড়িটা রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীর মূর্তিটা এখানেই রেখেছিলেন?” 

রাজশেখর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, “ওটা আমি বাবাকে দিয়েছিলাম। বাবা বলছেন মনে করতে পারছেন না। এদিকে ওটার জন্যই আজ এ বাড়িতে মগনলালের আসার কথা। আমি তো বুঝতেই পারছি না কী বলবো”। 

ফেলুদা বলল, “হতে পারে রুদ্রশেখরবাবু এসব ঝামেলা হবে জেনেই আগে থেকে কোন গোপন জায়গায় রেখে দিয়েছেন”। 

রাজশেখর বললেন, “তাহলে তো বেঁচেই যেতাম। তবে এরকম হলে বাবা তো আমায় অ্যাটলিস্ট একবার বলতেন। বলেন নি বলেই বুঝতে পারছি না, কী করবো”। 

ফেলুদা শো কেসের একটা ছোট মূর্তির দিকে আঙুল তুলে বলল, “এটা বোধহয় দক্ষিণভারতের নটরাজ মূর্তি, তাই না?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাদুরাই মন্দিরের এক পূজারী দিয়েছিলেন”। 

ফেলুদা বলল, “মগনলাল মেঘরাজ এ ঘরে না এলেই মঙ্গল রাজশেখরবাবু। ও লোক সুবিধের নয়। আপনার সংগ্রহ অমূল্য। কোনটির কিউরিও মূল্য কত হতে পারে, তা নির্ধারণ না হলেও মগনলালের মত ক্রিমিনালের চোখে এসব না পড়াই ভাল। আপনি বরং এ ঘরটা তালা দিয়ে রেখে দিন”। 

রাজশেখর ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “কলাম লেখাটাই ভুল হয়ে গেছে মশাই। এদ্দিন তো দিব্যি ছিলাম। এসব ঝামেলার সামনে তো কোনদিন পড়তে হয় নি”! 

ফেলুদা ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরাটা দেখে বলল, “এ ঘরে একটা ক্যামেরা আছে দেখছি। এটা ঠিকঠাক কাজ করে তো?” 

রাজশেখর তার মোবাইল থেকে সিসিটিভির অ্যাপটা বের করে ফেলুদাকে দেখালেন, “এই যে। ঠিকঠাকই আছে”। 

ফেলুদা বলল, “আর আপনার ওই প্যাপিরাসের ওপর আঁকা ম্যাপটা? ওটা তো এ বাড়িতেই...” 

রাজশেখর তর্জনী তুলে বললেন, “এক মিনিট”। 

দেওয়ালের কাছে দাঁড়ালেন রাজশেখর। দেওয়ালে একটা ছোট ক্যালেন্ডার ছিল। সেটা সরাতে একটা ছোট লকার বেরলো। লকারে কোড দেওয়ার পর লকারটা খুলে সেখান থেকে ছোট একটা বাক্স বের করলেন রাজশেখর। ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই যে সেইটি”। 

ফেলুদা বাক্সটা খুলে কাগজটা টেবিলের ওপর রাখল। বিভিন্ন রঙের একটা ম্যাপ আঁকা আছে। ফেলুদা বলল, “এটার একটা ফটো তোলা যাবে?” 

রাজশেখর বললেন, “নিশ্চয়ই?” 

আমি ম্যাপটার ফটো তুলে নিলাম। ফেলুদা কাগজটা আগের মত বাক্সে রেখে রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীমূর্তিটা এই লকারে রাখলেন না কেন?” 

রাজশেখর বললেন, “সেটাই প্ল্যান ছিল। সেদিন আমার লন্ডনের ফ্লাইট ধরার তাড়া ছিল। ড্রাইভার জানালো গোরুবাথান হয়ে নামতে হবে। রাস্তায় ধ্বস নেমেছিল। অগত্যা তাড়াহুড়ো করে বাবাকে দিয়ে...” ভ্রূ কুচকালেন রাজশেখর, “আমারই ভুল ছিল। বাবার বয়স হচ্ছে। হয়তো এ ঘরেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন... দেখা যাক”। 

বৈঠকখানায় গিয়ে দেখা গেল রুদ্রশেখরের বয়সী একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। আমাদের দেখে রুদ্রশেখর বললেন, “পরিচয় করিয়ে দি, আমাদের চারটে বাড়ি পরের প্রতিবেশী অবিনাশ ভটচাজ। অবিনাশ দীর্ঘদিন ধরে কালিম্পং সদর হাসপাতালের সুপার ছিলেন। সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন”। 

অবিনাশবাবু হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন, “রুদ্রর কাছে আমি আগেই শুনিচি। ফেলুবাবুর সঙ্গে আমার দেখা করার ইচ্ছে বহুদিনের। আর আমার নাতনি তো এখনও শোনেই নি যে জটায়ু কালিম্পঙে এসেছেন। শিভারিং ইন সাহারা পড়ে আমার নাতনি তো আপনার বিরাট ফ্যান হয়ে গেছে মশাই”। 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করে আমায় ফিসফিস করে বললেন, “বোঝো কাণ্ড, জটায়ুকে আজকাল ট্রান্সলেট করে পড়তে হচ্ছে”। 

ফেলুদা অবিনাশবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ বাড়িতে যে একটা চুরির অ্যাটেম্পট হয়েছিল, সেটা শুনেছেন নিশ্চয়ই”? 

অবিনাশবাবু বললেন, “কী বলবো বলুন তো? আমি এতদিন ধরে এ অঞ্চলে আছি, গর্ব করে বলতাম যে বাড়ির দরজা হাট করে খুলে চলে গেলেও কেউ কিচ্ছু নিতে আসবে না। কালে কালে যে আর কত কিছু দেখতে হবে”। 

অবিনাশবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়লেন। 

***

৫

চা এলো। লালমোহনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন, “আহা। এতো স্বর্গ। কোন বাগান?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “লোকাল এক বাগানের। আমি নামটা জেনে নিয়ে বলবো। আমার এমন অভ্যেস হয়ে গেছে, এই চা খাওয়ার পর আমি আর অন্য কোন বাগানের চা খেতেই পারছি না, বাহাদুর দু মাস আগে এই চা নিয়ে এসেছিল। তার পর থেকে অন্য কিছু মুখে রুচছে না”। 

আমি আমার ফোন বের করে প্যাপিরাসে আঁকা ম্যাপের ছবিটা একবার দেখে নিলাম। ভাষাটা কিছুই বোঝা গেলো না। কতগুলো লাল নীল দাগ এদিক সেদিক গেছে। 

ফেলুদা বলল, “লালমোহনবাবু, আপনি সেদিন বলছিলেন না কালিম্পং এ কীসব ছিচকে চুরির ঘটনা ঘটেছে? মিস্টার আগরওয়াল চুরির ব্যাপারে কোন ইনফরমেশন দিয়েছিলেন আপনাকে?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলছিলেন বটে। ফোন করব একটা?” 

ফেলুদা বলল, “থাক এখন। ওর বাড়িতে তো যাবোই। তখন না হয় কথা বলে নেবো”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “কোথায় যাবেন? আপনারা কি বেরোবেন?” 

ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়ালের বাংলোটা কি কাছাকাছিই পড়বে?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাইল খানেক। লাঞ্চ করে বেরোবেন কিন্তু”। 

ফেলুদা মাথা নাড়ল, “নিশ্চয়ই”। 

অবিনাশ বললেন, “ছিচকে চুরির ব্যাপারটা কে বলেছেন বললেন?” 

ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়াল বলছিলেন। কেন বলুন তো?” 

“আমিও সেরকম কিছু কথা সেদিন বাগানে গিয়ে শুনিচি। অতোটা কানে নিই নি। তবে ওই দিকের কয়েকটা বাড়িতে নাকি ইদানীং চোরের আনাগোনা বেড়েছে। যদি এই ছিচকে চোরই এদিকে আসে, তাহলে বাহাদুরকে আর ছাড়া যাবে না রুদ্রশেখর”। 

চায়ে চুমুক দিয়ে অবিনাশ কথাগুলো বললেন। 

রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স বাড়ছে। ঘর দোর, সোনাদানা নিয়ে অতোটা কষ্ট হয় না মশাই, ফুলের গাছগুলো নষ্ট করলে বড্ড গায়ে লাগে। এখন তো ওইটেই আমার ধ্যান জ্ঞান হয়ে গেছে। এখানে যে সব অর্কিড আমি জোগাড় করে এনে রেখেছি, তা কালিম্পঙের বড় বড় নার্সারিতেও পাবেন না। তুমি জানো তো ইয়ং ম্যান, কালিম্পঙের নার্সারিগুলো কত বিখ্যাত?” 

রুদ্রশেখর আমাকে প্রশ্নটা করলেন। 

আমি মাথা নাড়লাম। 

রুদ্রশেখর বললেন, “সাহেবদের সৌন্দর্যবোধ প্রখর ছিল, এ কথা স্বীকার না করে পারা যায় না। মারডক সাহেবের হন্টেড হাউজে আমি এক ধরণের অর্কিড পেয়েছিলাম, কী করে সে জিনিস এখানে এলো, তা এখনও বুঝে উঠতে পারি নি”। 

লালমোহনবাবু চোখ বড় বড় করলেন, “বলেন কী মশাই, হন্টেড হাউজ? ঘোউস্ট? দেখেছেন?” 

রুদ্রশেখর হতাশার সঙ্গে মাথা নাড়লেন, “না মশাই। সে সৌভাগ্য হয় নি। সবাই শুধু শুনেছে। কেউই মনে হয় না দেখেছে”। 

অবিনাশবাবু বললেন, “আমার ড্রাইভার বলে ও নাকি দেখেছে। তবে ওকে আমার বিশ্বাস হয় না। সন্ধ্যে হলেই ও আর এ জগতে থাকে না। কাজেই বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না”। 

ফেলুদা চা শেষ করে বলল, “মারডক সাহেবের বাংলোটি কাছাকাছি?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। এ পাড়াতেই”। 

ফেলুদা বলল, “হন্টেড হাউজটি ঘুরে দেখবার ইচ্ছে রইলো। ভূত বাবাজির সঙ্গে দেখা হলে মন্দ হবে না”। 

রুদ্রশেখর হাসলেন, “যাবেন, আমিও যাবো। প্রত্যক্ষদর্শী হবার সৌভাগ্য থেকে এ জন্মে বঞ্চিত হয়ে রইলাম বোধ হয়”। 

লালমোহনবাবুর গলায় ফোন ঝোলানো থাকে। বেশ কয়েকবার ফোন হারিয়েছেন উনি। শেষমেশ ফেলুদার পরামর্শে ফোনে দড়ি বেঁধে রেখেছেন। ফোন বেজে ওঠায় খানিকটা চমকে উঠে সেটা রিসিভ করলেন, “হ্যালো... হ্যাঁ ... হ্যাঁ আমরা এসে গেছি তো... দুপুরে?... ঠিক আছে”। 

ফোন রেখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগরওয়াল ফোন করেছিলেন। দুপুর তিনটে নাগাদ ওদিকটা একবার ঢু মেরে আসবো তবে?” 

আমি বুঝলাম না লালমোহনবাবু মগনলালকে এড়াতে চাইছেন নাকি। ফেলুদা ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে, আমরা ঘণ্টা খানেক থেকে ফিরে আসবো না হয়”। 

রাজশেখর এতক্ষণ বাইরে ছিলেন। ড্রইং রুমে এসে বললেন, “আপনাদের কোথাও যাবার হলে আমাদের গাড়িতেই যাবেন। ড্রাইভারের নাম্বার আমি টেক্সট করে দিচ্ছি। ও লোকালটা ভালোই চেনে”। 

অবিনাশবাবু উঠে দাঁড়ালেন, “আমি এখন চলি। বিকেলে না হয় একবার এদিকে ঢু মেরে যাবো। নাতনিকে নিয়েও আসতে পারি। জটায়ু আছেন শুনলে খুব বায়না করবে”। 

লালমোহনবাবু একগাল হাসলেন, “অবশ্যই আনবেন। লেখক মানে কী? পাঠক না থাকলে কি লেখকের কোন দাম আছে মশাই?” 

অবিনাশবাবু খুঁড়িয়ে হাঁটেন সেটা এখন দেখলাম। ফেলুদাও সেটাই লক্ষ্য করল বোধ হয়। অবিনাশবাবু বেরিয়ে যেতে রুদ্রশেখরবাবুকে সে কথাই জিজ্ঞেস করলে রুদ্রশেখর বললেন, “পড়ে গেছে বলল দু দিন আগে। বয়স হচ্ছে, বুঝতেই পারেন”। 

ফেলুদা “ও” বলে চুপ করে গেলো। 

***

৬ 

লাঞ্চ সেরে রাজশেখরবাবুর গাড়িতে আমরা আগরওয়ালের বাংলোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। 

গাড়িতে উঠে আমার প্রশ্নটাই ফেলুদা করল লালমোহনবাবুকে, “আপনি কি মগনলালকে অ্যাভয়েড করতে চাইছেন নাকি?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “কভি নেহি। খামোখা ভয় পেতে যাবো কেন বলুন তো? এখানে তো আমরা কোন কিছু রক্ষা করতে আসি নি। রাজশেখরবাবু কী করবেন, সেটা তার ব্যাপার”। 

ফেলুদা বলল, “আমিও আপনাকে সেটাই বোঝাতে চাইছিলাম। এ ব্যাপারে অন্তত আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আপনি বরং বাংলোটা দেখুন। মগনলালকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই”। 

আগরওয়ালের বাংলো কাছেই। আমাদের পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না। 

গাড়ি থেকে নেমে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, আপনার কি মনে হয়, ওই গোল্ড মূর্তিটা রুদ্রশেখরবাবু হারিয়ে ফেলেছেন? অত দামী মূর্তি হারানোটা তো চাট্টিখানি কথা না মশাই! আমার তো ভদ্রলোককে দেখে মনে হল না উনি স্মৃতিভ্রম জাতীয় কোন রোগে ভুগছেন”! 

ফেলুদা বলল, “আপনি বলতে চাইছেন রাজশেখর বাপের কাছে আদৌ ওই মূর্তি দেনই নি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “সেটা আমি কী করে বলবো ফেলু মিত্তির থাকতে?” 

ফেলুদা বলল, “বলে ফেলুন। পরে না হয় মিলিয়ে দেখা যাবে আপনার অনুমান ঠিক না ভুল”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “ধরুন ওই মূর্তিটা ইনসিওর করা আছে, আর তার জন্য রাজশেখরবাবুকে কোন গল্প সাজাতে হচ্ছে, এরকম কিছু হবার সম্ভাবনা আছে তো?” 

ফেলুদা বলল, “বিলক্ষণ। তার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।  জটায়ুর মাথা আজকাল ভালোই খেলছে দেখছি”। 

লালমোহনবাবু খুব খুশি হয়ে আগরওয়ালের বাংলোর কলিংবেলে চাপ দিলেন। “আসুন আসুন মিস্টার জটায়ু, আমি আপনারই ইন্তেজার করছিলাম”। 

দরজা যে খুলল, তাকে দেখে লালমোহনবাবু কেন, সম্ভবত ফেলুদাও চমকে গেছে। 

আদি এবং অকৃত্রিম মগনলাল মেঘরাজ। বয়স হয়েছে, প্রায় সব চুলেই পাক ধরেছে, কিন্তু চোখ মুখের সেই ধূর্ততা এখনও একইরকম আছে। 

ফেলুদা আমার কানে কানে বলল, “যেখানে বাঘের ভয় ইত্যাদি প্রভৃতি”। 

লালমোহনবাবু ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “আপনি এখানে?” 

মগনলাল দরজা ছেড়ে দিয়ে বলল, “আপনি ভেতরে আসেন আঙ্কেলজী। আগে বোসেন, তার পর বাকি কথা বলা যাবে”। 

ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল আপনার বন্ধু?” 

মগনলাল বলল, “চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড। ওর কাছে আঙ্কেলজীর কথা শুনে আমিই তো হয়রান হয়ে গেলাম। আর্থ ইজ রাউন্ড, কী বোলেন ফেলুবাবু?” 

মিস্টার আগরওয়াল ড্রইং রুমেই ছিলেন। লালমোহনবাবুকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, “মগনলাল বলল আপনাকে চেনে। বহুদিনের আলাপ নাকি!” 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করলেও আমি বুঝলাম তিনি আগরওয়ালের উপর বেশ খাপ্পা হয়ে গেছেন। মগনলালের বন্ধু কি খুব ভাল লোক হতে পারে? 

ফেলুদা সোফায় বসে পড়ে মগনলালকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনি তাহলে রাজশেখরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?” 

মগনলাল ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে উনি অ্যাডভাইসার রেখেছেন শুনলাম। আপনি এবারে আর আটকাবেন না মিস্টার মিটার, রাজশেখর ও মূর্তি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বেচুক, আমি চাই না”। 

ফেলুদা বলল, “বেচতে নাও তো চাইতে পারে। হতে পারে ও মূর্তি ওর কাছে  নেই”। 

মগনলাল হাসিমুখে বলল, “ওর কাছেই আছে। শুধু ভ্যালুটা ঠিক দিতে হবে”।

ফেলুদা বলল, “আপনি এত কনফিডেন্ট হচ্ছেন কী করে?” 

মগনলাল ফেলুদার প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে বলল, “আগরওয়ালের বলছে এখানে অনেক চুরি হচ্ছে। শুনেছেন তো মিস্টার মিটার?” 

ফেলুদা বলল, “শুনেছি। পালিতদের বাড়িতে তার নমুনাও দেখেছি। আপনার কী মনে হয়? এ চোর বাইরের না লোকাল?” 

মগনলাল বলল, “চোর সবখানে আছে মিস্টার মিটার। পলিটিকাল লিডারদের কাছে মগনলাল বাচ্চা। লিটল চাইল্ড। বঙ্গাল ভাষায় কাহাবত আছে, ঠগ বাছতে গা উজাড় হোয়ে যায়। এখন সবাই চোর। আপনি ও মূর্তি নিয়ে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে দিন। আঙ্কেলজীর জন্য বাংলো দেখুন, আমি আগরওয়ালকে বলে হেভি ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করিয়ে দিবো”। 

ফেলুদা হাসল, “আপনাকে আমি বহুবার বলেছি মগনলালবাবু। আমি ঘুষ নিই না। বার বার এক কথা বলাতে বাধ্য করাবেন না”। 

মগনলাল ফেলুদার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইল। আমি দিব্যি বুঝতে পারলাম, লালমোহনবাবুর প্রেশার চড় চড় করে বাড়ছে। ভদ্রলোক বেশ আগ্রহ নিয়ে বাংলো দেখতে এসেছিলেন। তার এই অবস্থা দেখে খারাপই লাগলো। 

***

৭

“হামি আপনাকে বলছে মিস্টার মিটার, ওই রাজশেখর পালিত উ সব এক্সপ্লোরার টোরার কুছু না। ও সব দিখাওয়া”। 

মগনলাল মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল। 

ফেলুদা বলল, “এ কথা বলছেন কেন?” 

মগনলাল বলল, “কম দিন তো হলো না মিস্টার মিটার। এ সব চক্করে অনেক দেশ ঘুমে নিয়েছি। আমার কথা ইয়াকিন না হয় তো আপ আগরওয়াল জি কো পুছ লিজিয়ে”।  

ফেলুদা আগরওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি কি ঠিক বলছেন?” 

আগরওয়াল বলল, “সবটা ঠিক বলছেন নাকি আমি জানি না, তবে রাজশেখরকে আমি দুবাইতে দেখেছি ইসমাইলের সঙ্গে। সুপারনোভা বলে একটা গ্রুপ আছে। ডার্ক ওয়েবে কাজ করে। স্মাগলিং আর দুষ্প্রাপ্য জিনিস কেনা বেচা করা ওদের কাজ। তখন অবাক হয়েছিলাম”। 

ফেলুদা বলল, “আপনি ইসমাইলকে চিনলেন কী করে?” 

আগরওয়াল বলল, “আমার দাদাজির কাছে শাহজাহানের আমলের কয়েকটা আশরফি ছিল। কয়েক বছর আগে আমি ফতুর হয়ে গেছিলাম। আশরফি বিক্রি করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। তখন ইসমাইল এখানে এসেছিল”। 

ফেলুদা বলল, “সেকি! মগনলাল মেঘরাজ থাকতে আপনাকে কি না ডার্ক ওয়েবের শরণাপন্ন হতে হল”! 

আগরওয়াল বলল, “আমরা বহুদিন ডিটাচড ছিলাম। মগন কাল ফোন করল। ইসমাইলের কথা আমিই ওকে বললাম”। 

মগনলাল বলল, “এই এক্সপ্লোরারের ধুলো দিয়ে এসব লোক স্মাগলড গুডস ইমপোর্ট এক্সপোর্ট করে”। 

ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল তো তার দেখার কথা বললেন। আপনি রাজশেখরকে কোথায় দেখেছেন?” 

মগনলাল হাসিমুখে বলল, “সব বাত বলে দিলে কী করে হবে মিস্টার মিটার? আমি শুধু আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। ওই মূর্তি আর আমার মধ্যে আপনি থাকবেন না। তাহলেই হবে”। 

ফেলুদা বলল, “আমি পরের মুখে ঝাল খাই না মগনলালবাবু। লোকের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার ধাতে নেই। আপনাকে যদি উনি বিক্রি করতে চান, তবে আমি বাধা দেবো না, সে কথা দিতে পারি। কিন্তু উনি যদি সেটা দিতে না চান এবং আপনি জোর করেন, সেক্ষেত্রে আমি কী করব, সেটা এখন কী করে বলি?” 

মগনলাল মাথা নাড়ল, “খুব ভালো মিস্টার মিটার, খুব ভালো। আপনি দেখে নিন, আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করবো না। আগরওয়াল, তুমি আঙ্কেলজীকো চা দেবে না?” 

আগরওয়াল কিছু বলার আগেই লালমোহনবাবু বললেন, “না না। আমি এখন কিচ্ছু খাবো না। আমার উপবাস চলছে”। 

মগনলাল ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কীস চিজ কা উপওয়াস?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলা যাবে না”। 

মগনলাল বলল, “ই তো আচ্ছি বাত নেহি আঙ্কেল। একটাই তো জীবন। না খেলে কী করে হবে?” 

ফেলুদা বলল, “আমরা তবে এখন উঠি। আপনি তো ও বাড়িতে যাবেনই। দেখুন রাজশেখর রাজি হন নাকি”। 

মগনলাল ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে। কথা হোবে। আঙ্কেল বাংলো কিনবেন না?” 

লালমোহনবাবু দুদিকে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন, “না। কোন প্ল্যান নেই”। 

মগনলাল একইভাবে ঘাড় নেড়ে বলল, “বড়ি দুঃখ কি বাত, বড়ি দুঃখ কি বাত”।  

আমরা আগরওয়ালের বাড়ি থেকে বেরোলাম। বাইরে বেরিয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে লালমোহনবাবু বললেন, “বাব্বা! বাঁচলুম মশাই। কাঠমান্ডুর মত আবার চায়ে এল এস ডি দিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল নাকি কে জানে”! 

ফেলুদা গম্ভীর হয়ে গাড়িতে উঠল। কোন কথা বলল না। ড্রাইভারকে বলল আমাদের কালিম্পং থানার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে। থানার সামনে বড় বাজার। মিষ্টির দোকানে সিঙ্গারা দেখে জটায়ু লোভ সামলাতে না পেরে দুটো সিঙ্গারা নিয়ে নিলেন। ফেলুদা বলল, “মগনলাল আপনাকে দেখলে নির্ঘাত জিজ্ঞেস করতো এ আপনার কেমন উপওয়াস আঙ্কেল?” 

চাটনিতে সিঙ্গারা মাখাতে মাখাতে লালমোহনবাবু বললেন, “দেখেছেন মশাই, ব্যাটা আগরওয়ালকে পর্যন্ত কব্জা করে নিলো। শৈলশহরে আমার বাংলো কেনার আশা মাঠে মারা পড়লো”। 

ফেলুদা বলল, “তোরা বাজারটা ঘুরে দেখ, আমি একটু থানা থেকে আসছি”। 

লালমোহনবাবু দ্বিতীয় সিঙ্গারাটা সামলাতে সামলাতে বললেন, “কী বুঝছো তপেশ, মগনলাল কি সত্যি কথা বলছে? রাজশেখর কি সত্যিই ঘুঘু?” 

আমি বললাম, “আগরওয়াল মিথ্যে বললেন বলে তো মনে হল না”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “এই ডার্ক ওয়েব না কী যেন বলল, সেটা কী বস্তু বল তো? এখানে কালিম্পং এ বাংলো কেনা যায়?” 

***






Thursday, 15 July 2021

Unlockdown-ey Feluda by Saraswati Nath (Incomplete)

Episode 1

সকালে যোগব্যায়াম সেরে বৈঠকখানায় এসে বসতেই ফেলুদা বলল ,"QUARANTINE বানান জানিস?"

সকাল সকাল এরকম একটা বেমক্কা প্রশ্ন শুনে ভ্যাবাচাকা খেলেও সেই ভাবটা কাটিয়ে আমি বললাম, " হ্যাঁ ফেলুদা।ওই তো Q,U,A,R,A,N,T,I,N,E=QUARANTINE।"

ফেলুদা:"good"

"কিন্তু কেন বলছো ফেলুদা? নতুন case পেয়েছো?"

ফেলুদা:"নারে, লালমোহনবাবুর নতুন উপন্যাস ' কলকাতায় করোনা' publish করার আগে পড়তে দিয়েছেন। বানানটা প্রত্যেকবার ভুল হয়েছে।"

আমি কিছু বলতে যাব এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠলো। ঘড়িতে দেখলাম প্রায় নটা বাজে। বুঝলাম লালমোহন বাবু।

দরজা খুলতেই হাসি মুখে ঢুকলেন ভদ্রলোক। বললেন,"কি মশাই কেমন হয়েছে উপন্যাসটা?"
ফেলুদা বলল," বেশ কতগুলো spelling mistake ছাড়া বাকি মোটামুটি ঠিক আছে।"

" আসছে পুজোয় বইটা বেরোবে। আচ্ছা মশাই , আপনার কি এখন অবসর? "-------"হ্যাঁ লালমোহনবাবু, এখন আর কে crime করবে?"

এমন সময় দরজার সামনে একটা গাড়ি এসে থামল। আমি উঠে দরজা খুলতে যাচ্ছিলাম ফেলুদা বলল" অত হ্যাংলামো কিসের? বেলটা বাজতে দে। " বলতে বলতেই ক্রিং ক্রিং শব্দে বেজে উঠলো বেল। দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকলেন এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক। চুল কাঁচায়- পাকায় মেশানো, পরনে fullsleeve shirt, jeans, মুখে double mask, হাতে gloves,চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। হাত sanitise করে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে প্রায় ছয় ফুট দূরে সরে বসে আমাদের প্রত্যেককে নমস্কার করে বললেন," আপনাদের মধ্যে প্রদোষ চন্দ্র মিত্র কোন জন?"

ফেলুদা ইতিমধ্যেই মাস্ক পরে এসে প্রতিনমস্কার করে বলল " আমিই প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।"

ভদ্রলোক বললেন" আমি আপনার খোঁজ পাই আপনার পুরোনো এক মক্কেলের কাছ থেকে। আমি একজন ডাক্তার।নাম শ্যামাপ্রসাদ সেন।আপনার কাছে এসেছি একটি বিশেষ ব্যাপারে।"

ইতিমধ্যে আমি মাস্ক পরে , শ্রীনাথকে চায়ের কথা বলে এসেছি। "বলুন" , ফেলুদা মিনি টেপ রেকর্ডারটা চালু করে দিল। শ্রীনাথ - এর এনে দেওয়া চা খেয়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন।

***

Episode 2

"আমি basically বর্ধমানের বাসিন্দা। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমি কলকাতায় থাকছি। কাজের জায়গা অর্থাৎ hospital টা কলকাতাতেই।আপনি জানেন নিশ্চয়ই যে এখন vaccination চলছে। গতকাল এক মাড়োয়ারী অথবা পশ্চিমা ভদ্রলোক এসেছিলেন আমাদের হসপিটালে। যেহেতু আমি সিনিওর most ডাক্তার তাই আমার সাথে দেখা করে পরিচয় দিলেন ব্যবসায়ী হিসেবে। তিনি করলেন এক অন্যায় আবদার। তিনি রেমডেসিভির ,oxygen cylinder এবং দুটি oxygen concentrator কিনতে চান। জনসেবার জন্য।আমাদের হাসপাতালেরই এখন বেসামাল অবস্থা। সুতরাং এই পরিস্থিতিতে আমরা তা করতে পারি না এই বলে ওনাকে অনেক বোঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তিনি এক জেদ ধরে রইলেন।২৫ হাজার পর্যন্ত দিতে রাজী তিনি।"

এই পর্যন্ত শুনেই ফেলুদা বলল, "ভদ্রলোকের নাম কি?"

----- "মেঘরাজ । মগনলাল মেঘরাজ।"

শুনেই আমি চমকে উঠলাম। আবার ওই লোকটা। ওর সাথে আর কতবার মোকাবিলা করতে হবে? ফেলুদা চমকেছে কিনা বোঝা গেলনা। মুখ তো ঢাকা। লালমোহনবাবু জল খেতে গিয়ে মেঘরাজের নাম শুনে বিষম খেয়েছেন।

শ্যামাপ্রসাদবাবু আবার বলতে শুরু করলেন, "আমি রাজী না হওয়ায় ভদ্রলোক বললেন তিনি নিয়েই ছাড়বেন । দুদিন সময় দিয়েছেন। আগামী পরশু ২০ কার্টুন ভ্যাকসিন, ৫ টি concentrator ,১০ হাজার মাস্ক,২৫ হাজার ppe kits,৩০০ oxygen cylinder, ২৫ কার্টুন রেমডেসেভির আসছে। সে কথা তিনি জানেন ।কি করে জানলেন সেটাও আমাদের ভাবনার বিষয়। আমি বাধ্য হয়েই security ডেকে ওনাকে বের করতে পারি।

ফেলুদা: " খুব কড়া মেজাজে কি তিনি কথা বলেছেন? "

-----"তা তো বলেছেন। "

-----" আপনি না করেই ভালো করেছেন। জনসেবার জন্য কিনছেন না। কিনছেন বিদেশে পাচারের জন্য। উনি একজন দালাল। কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করাই ওঁর কাজ। যাওয়ার সময় আপনার whatsapp number আর ফোন নম্বরটা দিয়ে যাবেন।"বলেই ফেলুদা পা'টা এমনভাবে নামালো যাতে ভদ্রলোক আসতে পারেন সেটা বোঝা যায়।

ভদ্রলোক একটা কাগজে নম্বর লিখে চলে গেলেন। লালমোহনবাবু বিরস মুখে শুধু বললেন," আবার মেঘরাজ?"

***
Episode 3

মাঝে মাঝেই আমি আর ফেলুদা আমাদের পুরোনো adventure গুলো নিয়ে আলোচনা করি। পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে মগনলাল মেঘরাজই ওর মতে যাকে বলে জবরদস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি যে এতদিন পরে আবার নতুন খেলা দেখাবেন সেটা ভাবিনি। সেটা যথাসময়ে না হয় বলা যাবে। পরেরদিন কেটে গেল শ্যামাপ্রসাদবাবু সম্বন্ধে কিছু তথ্য জোগাড় করে । ফেলুদা নিজের পুরোনো কিছু ডাক্তার বন্ধুদের কাছে WhatsApp করে রেখেছিল। আজ উত্তর পাওয়া গেল। ভদ্রলোক সত্যিই মস্ত বড় ডাক্তার। দু:স্থ লোকেদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা করেন। কোনো অহঙ্কার নেই। কলকাতায় লেক টেম্পল রোডে এক ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। লালমোহনবাবু এসে বললেন," ঘরে মন থাকতে চাইলো না। তাই চলেই এলুম। Case কতদূর এগুলো?" ফেলুদা বলল, " সবে তো শুরু। এখন তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।" এরপর আমার দিকে তাকাতেই আমি সকালে আসা সমস্ত তথ্য তাঁকে দিয়ে দিলাম। শুনে ভদ্রলোক তাঁর খুব প্রশংসা করতে লাগলেন। এত অবধি সব ঠিক ছিল। কিন্তু বোমাটা ফাটল পরদিন সকালে। ঘুম ভাঙতেই দেখি ফেলুদা কার সাথে ফোনে কথা বলছে -" hello, বলুন।" ------------- -" সেকী !কি হলো?" ------------- - " বাকিরা জানে?" ------------ -" আচ্ছা আমি কুড়ি মিনিটের মধ্যে আসছি।"বলেই ফোনে কেটে দিল। " তাড়াতাড়ি ready হয়ে নে। বেরোতে হবে। পারলে লালমোহনবাবুকেও ফোন করে ডেকে নে। " লালমোহনবাবু এসে " কি হয়েছে? " জিজ্ঞেস করাতে তাঁকে প্রায় জোর করে ঠেলে নিয়ে গাড়িতে উঠে হরিপদবাবুকে বলল " চলুন লেক টেম্পল রোডে।" এবার আমাদের দিকে ফিরে বলল " মিস্টার সেন। বললেন বিশাল বড় কেলেঙ্কারি হয়েছে। ফোনে সবটা বলা যাবে না বলে বাড়িতে যেতে বললেন।"
***
Episode 4

লেক টেম্পল রোড থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম ভদ্রলোকের ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটের নাম আলেয়া দেখে লালমোহনবাবু বললেন" মশাই, আলেয়ার পিছনে ছোটা কিন্তু অর্থহীন।"

ফেলুদা মেকী ধমকের সুরে বলল" আপনি অর্থহীন কথাবার্তাগুলো বন্ধ করুন তো এখন।"
 
ফ্ল্যাটে ঢুকতেই ভদ্রলোক অত্যন্ত সম্ভ্রমের সাথে আমাদের আপ্যায়ন করলেন। জানিনা কি হয়েছে তবু আগের দিন দেখা ভদ্রলোকের চেহারার সাথে আজকের চেহারা মেলে না। এরপর ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন" আপনাকে সেদিন যা যা বলে এসেছিলাম, ঠিক তাই তাই আজ ঘটে গেছে। ordered জিনিসের মধ্যে ওই আইটেমগুলো কম। ড্রাইভার দুজনকে রাস্তার ধারে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেছে। গাড়িটা রাস্তার ওপর ছিল। সামনের কাঁচ ভাঙা। পুলিশ উদ্ধার করেছে ড্রাইভারদের এবং গাড়িটাকে। " এই পর্যন্ত শুনেই লালমোহনবাবু বলে উঠলেন"highly suspesious. " " উল্টোদিক থেকে একটা ম্যাটাডোর এসে গাড়িটাকে ধাক্কা দেয়। সেই সময়ই চারজন লোক ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং chloroform (ড্রাইভারদের কথা অনুযায়ী মিষ্টি গন্ধ মাখা রুমাল) দিয়ে অজ্ঞান করে দেয়। তারপর প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে গেছে।" ফেলুদা বলল" hospital এর সবাই জানে?" -" না , শুধু seniour ডাক্তাররা জানেন।panic সৃষ্টি হবে বলে জুনিয়র ডাক্তাররা জানে না। " ----- " ঘটনা স্থল কোথায়?" -" জি .টি রোডের কাছে।" -----:" থানায় diary করেছেন?" -" হ্যাঁ। please আমাদের এ বিপদ থেকে উদ্ধার করুন। শুধু আমরা নয়, সমগ্র মানবজাতি আজ বিপদে।" ------" ok, i will try my best."বলেই উঠে পড়ল। দেখাদেখি আমরাও উঠে পড়লাম। apartment থেকে বাইরে এসে লালমোহনবাবু বললেন " মশাই ,এই case কি করে solve করবেন আমার মাথায় আসছে না।" -" ফেলু মিত্তিরের মাথায় এলেই হবে। "একথার পর ফেলুদা সমস্ত রাস্তা একেবারে নির্বাক। এরপর সমস্ত দিন ফেলুদা কাটাল medicine সংক্রান্ত বই পড়ে, সিধু জ্যাঠার কাছ থেকে কিছু তথ্য জোগাড় করে, ডাক্তার বন্ধুদের কিছু email,text করে। পরদিন সকালে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এল ফেলুদা। বুঝলাম যা জানার তা জেনে নিয়েছে। সাহস করে জিজ্ঞেস করলাম" কিছু জানতে পারলে?" " জেনেছি অনেক কিছু। কিন্তু সবই একটা জায়গাতে গিয়ে জট পাকিয়ে যাচ্ছে। তাই এক জায়গায় যেতে হবে।" বলেই dress change করতে উঠে গেল। যাওয়ার আগে অবশ্য বলল তৈরী হয়ে নিতে। --- " লালমোহনবাবুকে খবর দেব?" ----" না। যেখানে যাবো ওনাকে না নিয়ে যাওয়াটাই safe।" বাড়ী থেকে বের হয়ে একটা taxi করে এলাম একটা বাড়ীর সামনে। দেখেই চিনলাম । ফেলুদার সবথেকে প্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী মগনলাল মেঘরাজের বাড়ী। একইসঙ্গে বুঝলাম কেন লালমোহনবাবুকে আনেনি ফেলুদা। কারণ তাঁকে নিয়ে রগড় করাটা এই লোকটার মজ্জাগত। ক্রমশ


Note: this is my personal blog. The copyright of the story lies solely and entirely with the author.

Wednesday, 7 July 2021

Ratangarher Rahasya (incomplete) by Dilip Gangopadhyay

রত্নগড়ের রহস্য

দিলীপ গঙ্গোপাধ্যায়

(পর্ব -১)

অলস দুপুর, ফেলুদার বসার ঘরে লালমোহন বাবু সোফার উপরে হাত পা ছড়িয়ে দিবানিদ্রা যাপন করেচলেছেন। মাঝে মাঝে তার নাসিকার গর্জন শোনোযাচ্ছে। তোপসে একপাশে বসে আপনমনে ফেসবুক ঘেটেচলেছে। ফেলুদা ঠোঁটে জ্বলন্ত চারমিনার গুঁজেনিয়ে আজকের খবরের কাগজটা পড়ছেন, আর অল্প অল্প করে ধোঁয়া ছাড়ছেন । এই লক ডাউনের বাজারে ফেলুদার হাতে তেমন কাজনেই, যদিও প্রসার তাঁর আগের থেকে অনেক বেড়েছে। এখন ফেলুদার পকেটের সভাবর্ধন করে অত্যাধুনিক 9MM এর মতো পিস্তল, হাতে দামি সেলফোন, মস্তিষ্ক আগের থেকেও আরো বেশি প্রখর দিন দিন যেন ধার বেড়েই চলেছে। লালমোহন বাবুর দিবানিদ্রায় বেঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ ফেলুদার মোবাইলের  রিংটোন বেজেউঠলো।

ফেলুদা - হ্যালো

ওপ্রান্ত থেকে - আমিকি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের সাথে কথাবলছি?

ফেলুদা - হ্যা আমিই প্রদোষ মিত্র।

ওপ্রান্ত - নমস্কার, আমি রত্নগড় রাজ পরিবার থেকে আদিত্য নারায়ণ সিংহদেও বলছি।

ফেলুদা - হ্যা বলুন

ওপ্রান্ত - আপনিকি একবারের জন্য এখানে আসতে পারবেন?

ফেলুদা - আগে দরকারটা কি সেটা বলুন, তারপর ভেবে দেখবো।

ওপ্রান্ত - তেমন কিছু না, তবে কয়েকটা জটিল ধাঁধার উত্তর খোঁজার জন্য আপনার সাহায্য চাইছি।

ফেলুদা - ও আচ্ছা। পরে ফোনকরে আপনাকে জানাচ্ছি। নমস্কার। এই বলে ফোনটা কেটেদিল ফেলুদা।


বলি ওমোশায় অত ভাবা ভাবির কিআছে? চলুননা আমরা থ্রি মাস্কেটিয়র্স মিলে বেরিয়েপড়ি ।


আপনার দিবানিদ্রা সাঙ্গ হলো লালমোহন বাবু ?


হবে না? আপনার ফোনটাই তো আমার দিবানিদ্রার বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো, আমার কানটা তো সবসময় ওটার দিকেই থাকে ফেলুবাবু 

ফোনটা বেজে উঠলেই কেমন যেন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ পাই। 


ফোনটা কে করেছিল ফেলুদা ? কি বললো লোকটা?


তেমন কিছু না, কয়েকটা ধাঁধার উত্তর খুঁজতে রত্ন গড়ের জমিদার ফোনকরেছিল ।


ভেরি ইন্টারেস্টিং, তাহলেতো বেপারটা কালটিভেট করতেই হচ্ছে মোশায়।

তুমিকি কেসটা নিচ্ছ ফেলুদা?

এখন সেভাবে কিছু ভাবিনি, তুই কিবলিস?

নিতে পারো, অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি

এই সুযোগে নতুন একটা জায়গাও ঘুরেআসা হবে।

তাহলে আজ আজ বিকেলে একবার সিধু জেঠার বাড়ি যেতে হয়।

তাহলে তুমি কেসটা নিচ্ছ বলো?

নানিয়ে উপায় আছে, লালমোহন বাবুর মুখের অবস্থাটা একবার ভাব।


(সিধু জেঠার বাড়ি বৈঠকখানা) 

কি ব্যাপার ফেলুজে, নিশ্চয়ই কোনো দরকারে?

নাহলে তো তুমি আবর এই পথে পা মাড়াও না।

কি যে বলেন , আপনি নাথাকলে এই ফেলু মিত্তিরো অচল। বিপদে আপদে আপনিই তো আমাদের একমাত্র ভরসার স্থল।

তা বিপদটা কি? নতুন কনো কেস হাতে নিয়েছ বুঝি? 

সেরকমই। রত্নগড়ের রাজ পরিবারথেকে ফোনকরেছিল, কিছু ধাঁধার উত্তর খুঁজেদিতে হবে।

তাই আপনার কাছে আসা।

দাড়াও, দাড়াও, রত্নগড়? ওটাতো ছোটনাগপুর অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। মাঝে এক দুবার বশ্যতা স্বীকার করলেও ওরা চিরকালই স্বাধীন থেকেছে। সেই হিসেবে রাজন্যবর্গও বলতে পারো । ওরা ছিল সামন্ত রাজা। নবম শতকে মধ্যপ্রদেশ আগত সিংহদেও বংশিয়রা, অনার্য রাজাকে পরাজিত করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে।চারিদিকে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরাছিল ওদের রাজধানী, মনোরম পরিবেশ। আরেকটা কথা, হ্যা মনে পড়েছে, একমাস আগে খবরের কাগজে খবরটা বেরিয়েছিল ছোট্ট করে তোমার নজরে পড়েছে কিনা জানি না, দাড়াও বেরকরে দেখাচ্ছি।

পেয়েছি পেয়েছি। আসে পাশের চার পাঁচটি গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জৈন ভাস্কর্য দেখে আরর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কিছু লোক  ওখানে  খনন কার্জ চালালে কিছু পুরোনো জৈন ধর্মের মুর্তি ও কয়েকটি সোনা ও রুপার মুদ্রা পাওয়া যায়। লেগে পড়, পেলেও পেতেপারো অমুল্য রতন।

আজ তাহলে উঠি সিধু জেঠা। লালমোহন বাবু আপনার রথ ঠিক থাক আছে তো?

আছে মানে? একদম ঝকাস আছে, এই তো পরশুদিন গ্যারাজ থেকে চকাচক করে গাড়িটা বাড়িতে নিয়ে এসেছি।

এখনো তো ট্রেন বন্ধ, তাই আপনার রথই আমাদের এখন একমাত্র ভরসা। আজই ওখানে যাওয়ার জন্য লালবাজার থেকে স্পেশাল পারমিশটা করিয়ে নিতেহবে। তাহলে কালকে খুব সকালে আমরা বেরিয়ে পড়ছি রত্নগড়ের উদ্দেশ্য।

পরদিন সকালে শহর ছাড়িয়ে দূরে কালো পিচঢালা

রাস্তার উপরে লালমোহন বাবু সবুজ অ্যাম্বাসেডার পক্ষীরাজের ঘোড়ার মতো ডানামেলে ছুটেচলেছে

ফেলুদার হাতে স্টিয়ারিং, তপসে তার নতুন কেনা ফোন ঘাটতে ব্যাস্ত, নীরবতা ভেঙে লালমোহন বাবু বললেন যাই বলুন মোশায় সকালের মুক্ত বাতাসের একটা আলাদা মাদকতা আছে।

তা আর বলতে লালমোহন বাবু, এই বাতাসের কাছে আপনার গঙ্গার বাতাস কোথায় লাগে।

ভাই তপেস সেই কখন থেকে দেখছি তুমি একমনে ফোন ঘেটে চলেছ, কি এতো আছে ওতে?

ও আপনি বুঝবেন না। ফেসবুক ঘাটছি।

ফেসবুক? নোটবুক জানতাম, ফেসবুক তো বাপের জন্মে শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না।

ফেলুদা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল ওর বাংলা নামটা হচ্ছে মুখবই।

মুখ আবার বই? পাসবাই হয় জানি। এখন দেখছি মুখও বই হয়।

তোপসে একবার গুগুল ঘেটে রোডম্যাপটা দেখতো

রত্নগড় যাবার রাস্তাটা যাতে খুঁজেপেতে অসুবিধা নাহয়।

গু গুল?এটা আবার কি?

ছেড়েদিন ওটা আপনার মাথায় ঢুকবেনা লালমোহন বাবু ।

ভাই তপেস তোমারো কি তাই মত?

গুগল হচ্ছে এমন একটা এপ্স যেখানে আপনি সারা বিশ্বের সমস্ত কিছু তথ্য পাবেন।

সন্ধ্যা পারকরে যখন লালমোহন বাবুর অ্যাম্বাসেডার রত্নগড়ে প্রবেশ করলো তখন দেওয়াল ঘড়িতে সময় ঘোষণা করলো রাত্রি আটটা।

অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়েগেল আদিত্য নারায়ণের ছেলে সৌম্য নারায়ণ।

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে সবাই মিলে চা খেতে পরিচয় পর্বটা শুরু করলেন জমিদার আদিত্য নারায়ণের সাথে ।আমিই প্রদোষ মিত্র, আপনি যাকে ফোন করেছিলেন, এহলো আমার খুড়তেতো ভাই তপেস, সহকারীও বলতে পারেন। আর ইনি হলেন আমার বন্ধু ও রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের লেখক

লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ূ। এরপর এক এক করে সকালের পরিচয় দিলেন আশি বছরের বৃদ্ধ বাড়ির কর্তা পুরোন জমিদার আদিত্য নারায়ণ। এই হলো আমার একমাত্র ছেলে সৌম্য নারায়ণ। ছোট খাট একটা ব্যাবসা করেন হাজারিবাগে এখন তাও বন্ধ।কিছুদিন হল পাঁচ বছরের শিশুপুত্র সহ স্ত্রীকে নিয়ে এখানেই চলে এসেছে আমার কাছে । আর আছে বলতে তিরিশ বছরের পুরোনো চাকর বিশু, ওকে তো দেখলেন এইমাত্র চা দিয়েগেল। ওর ভরসাতেই আমার এখানে  থাকা।তাছাড়া কিই বা আছে এখানে, একটা ভগ্নপ্রায় বিরাট বাড়ি, যার দক্ষিণ দিকের মহল ভেঙেপড়েছে। সম্পদ বলতে আছে কিছু জমি জমা ও পুকুর। এককালে বিরাট অবস্থা ছিল। এখন সেসব কিছুই নেই। এই ভগ্নস্তুপ বাড়িটা দেখে আপনি নিশ্চয়ই তা অনুমান করতে পারছেন। গোয়েন্দার চোখ আপনার, কিছু তো আর লুকোনোর নেই।ইনি হলেন "প্রকাশ পতুতুন্ডু।" ইতিহাস গবেষক। দিনসাতেক হলো এসেছেন।

এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও রাজ পরিবার নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। মুলত ইনিই রাজ পরিবারের কাগজ পত্র ঘাটা ঘাটি করতে গিয়ে একটা খেরোর খাতা আবিষ্কার করেন, যাতে কিছু ধাঁধা পাওয়া গেছে যেগুলো আমার মনেহয়েছে যেন গুপ্ত ধরনের ইঙ্গিত করছে। তার জন্যই আপনাকে এখানে ডাকা খুঁজে দিতে পারলে উপযুক্ত পুরস্কার দেবো । তুলট কাগজের উপর কালি কলমে লেখা খেরোর খাতাটার লেখক আমার দাদু গঙ্গা নারায়ণ সিংহদেও।এই বলে খাতাটা ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিলেন আদিত্য নারায়ণ।

তিনজোড়া চোখ তখন সেই খাতাটার উপরে

ধাঁধা নম্বর

1) দিক খুঁজো আগে

    দিশা পাবে কাজে।

2)শতাব্দী স্নানের ঘাটে

    বৃক্ষ বটের নিচে

     ক্ষেত্র বিশেষ আছে

      চাবি তাহার কাছে।

3)নং স্থান এখানে ফাঁকা রাখা আছে, নম্বর দিয়ে     কিছুই লেখেননি দেখছি ।

4)ভাগ্য ফেরাতে চাও? মৃগয়াতে যাও।

(ক্রমশ)

***

Thursday, 11 June 2020

Topshe Nirrudesh (incomplete) by Sayantani Mandal

 তোপসে নিরুদ্দেশ 

যখন আমার জ্ঞান হলো, তখন প্রথম চোখটা খুলে কিছুই দেখতে পেলাম না, চারদিকে কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোথায় আমি? কি করে এলাম এখানে? মাথার পেছনে একটা চিনচিনে ব্যাথা। আসতে আসতে ধাতস্ত হলাম, মাথাটাও আসতে আসতে পরিষ্কার হল। মনে পড়েছে, আমি লালমোহন বাবুর সাথে হোটেলে ছিলাম, ফেলুদা বেরিয়েছিল, ও অনেক্ষন না ফেরার পর ওকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। বিচের ধার দিয়ে খানিকটা হাঠার পর, হঠাৎ মাথার বাঁ দিক দিয়ে একটা আঘাত, তারপর সব অন্ধকার। চোখটা এতক্ষনে অন্ধকার সয়ে গেছে, আমি একটা টাটা সুমোর পেছনের সিটে হাত পা বাঁধা ব্যবস্থায় পড়ে আছি। মাথায় এখনো অসম্ভব ব্যাথা। গাড়িটা চলছে, যে রাস্তাটার ওপর দিয়ে চলছে সেই রাস্তাটা বেশ ভালো, কারণ গাড়িটা লাফাচ্ছে কম, বোধহয় হাইওয়ে। কিন্তু কোন হাইওয়? আর গাড়িটা যাচ্ছেই কোন দিকে? ফেলুদা কোথায? ও ঠিক আছে তো? ও কি জানে এরা আমায় ধরে নিয়ে এসেছে?এই সব সাত পাঁচ চিন্তা একসাথে মাথায় ভিড় করে এলো। মাথাটা একবার তোলার চেষ্টা করলাম আর সেটা করতেই, পাটা গাড়ির দরজায় ঠোকা খেয়ে "খট" করে একটা আওয়াজ হলো। সঙ্গে সঙ্গে মাঝের সিটে বসা একটা লোক পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বিশ্রী হেড়ে গলায় বলল, "উঠেছিস দেখছি। ও শাহবজি, তাড়াতাড়ি ওষুধটা মারুন সালাকে, এ বহুত চালু চিজ আছে।" বলার সাথে সাথেই গাড়িটা থেমে গেলো, এবং হেড়ে গলা ওয়ালা লোকটার পাশে বসে থাকা একটা ছিম ছাম চেহারার লোক, গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজা খুললো, কয়েক সেকেন্ড পরে কোনুয়ের কাছে একটা ছুঁচ ফোটানোর মত ব্যথা অনুভব করলাম। মাথা ভারী হতে আসছে, আমি আবার তলিয়ে যাচ্ছি।

আজ বিকেলের দিকে ওরা পুরী ঢুকেছে, আসার কারণ, মনমোহন দে নামে এক ব্যক্তি ফেলুদা কে চিঠি লিখে ডেকে পাঠিয়েছে কোনো এক বিশেষ দরকারে। এসে তোপসে আর লালমোহন বাবুকে হোটেলে রেখে ফেলুদা গেছিল ওনার সাথে দেখা করতে কারণ উনি একা দেখা করতে চেয়েছিলেন। ওনার ঠিকানায় পৌঁছে দেখে বাড়িতে কেউ নেই, শুধু গ্রিল গেটে একটা নোট গোঁজা, তাতে লেখা "এখানে দেখা করা নিরাপদ নই, সন্ধ্যে ৬:৬০ টা নাগাদ নুলীয়া বস্তির ৭ নম্বর খুলিতে আসুন" চিঠিটা অত্যন্ত সন্দেহজনক, কিন্তু না গেলেও যে নই। মুহুর্তের মধ্যে ডিসিশন নিয়ে ফেললো ফেলুদা। হোটেল এ ফিরে দেখে তোপসে অঘোরে ঘুমোচ্ছে, ওকে আর তুললো না, ওর কাধের ঝোলা ব্যাগটাতে কয়েকটা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে আর কোল্টটা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এদিক সেদিক ঘুরে, ওকে কেউ ফলো করছে না নিশ্চিত হোয়ে, একটা পাবলিক টয়লেটে ঢুকলো ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই, কাপড় পাল্টে মেক আপ নিয়ে, বেরিয়ে এলো ফেলুদা। পরনে খাকি হাফ প্যান্ট আর ঢিলে শার্ট, চোখে স্কোয়ারে ফ্রেমের চশমা, মুখে চাপ দাড়ি, মাথার চুলে পিছনে ঝুঁটি বাঁধা, অবশ্যই পরচুলা। এরকম বেশে, পকেট পিস্তল নিয়ে, ৭ নম্বর খুলির সামনে এসে এদিক ওদিক নুলিয়া বস্তির ছবি তুলতে লাগলো, এবং সাবধানে ৭ নম্বরের দিকে নজর রাখলো। প্রায় তিন ঘন্টা এভাবে কাটানোর পর যখন বুঝলো যে ৭ নম্বরে কোনো রকম মানুষ থাকার চিনহ নেই। তখন কেমন একটা খটকা লাগলো, এসবের মানে কি? তবে কি তাকে কেউ ইচ্ছে করে এখানে ডেকে এনেছে, কলকাতার বাইরে, কিন্তু কেন? কোনো এমন কাজ কে পরিণতি দিতে যা সে থাকলে অসুবিধে হতো, কিন্তু তার জন্য নুলিয় বসতি তে ডেকে অন কেন? আর এখানে থাকা ঠিক হবে না ভেবে, তাড়াতাড়ি হোটেল ফিরে এলো। রাস্তায় অবশ্য আবার পোশাক পাল্টে নিয়ে স্বাভাবিক পোশাক পরে নিয়েছিল ফেলুদা। হোটেলে ঢুকতেই ম্যানেজার ছুটে এসে বললেন "আপনার বন্ধুকে অজ্ঞান অবস্থায় বিচের ধারে পাওয়া গেছে। চারজন ছেলে তাকে খুঁজে পায়, মুখে চোখে জল দিয়ে খানিক সুস্থ্য করে, হোটেল এর নাম জেনে ওনাকে এখানে ছেড়ে দিয়ে গেছে। উনি আর আপনার ভাই ৭:৩০ তার দিকে বেরিয়েছিলেন, আপনার ভাই যদিও এখনও ফেরেনি।" কথাটা শোনা মাত্রই ফেলুদা প্রাই হাওয়ার গতিতে ছুটলো জটায়ুর ঘরের দিকে। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে জটায়ু, মাথায় আইস প্যাক বাঁধা।

"আপনি ঠিক আছেন?" ফেলুদা প্রশ্ন করলো

"হ্যাঁ, এখন ঠিকই আছি" জটায়ু উত্তর দেয়

"এসব হলো কি করে? তোপসে কোথায়?"

"জানিনা তপেশ ভাই কোথায়। আপনার আসতে দেরও হচ্ছে দেখে প্রায় জোর করেই তপেশ ভাই আমাকে নিয়ে আপনাকে খুঁজতে বেরোয়। বিচের উপর দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ মাথায় বাড়ি, তারপর সব অন্ধকার। যখন জ্ঞান হলো তখন চারটে ছেলে আমার মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে, তপেশ ভাই আশপাশে কোথাও নেই। ছেলেগুলোও হোটেল পৌঁছে দিলো। এখানে এসে দেখি আমার জামার পকেটে একটা চিরকুট। এই যে...." লালমোহন বাবু কাপাকাপা হাতে কাগজটা ফেলুদা কে দিল। তাতে লেখা,

"মিঃ মিত্তর, আঙ্কলকে লিয়ে অনেক মজা এলো। এবার কাজিন কে নিয়ে একটু খেলা হোক। এবার কিন্তু গেম টা একটু সিরিয়াস।"

ফেলুদা ধপ করে খাটে এর উপর বসে পড়ল। প্রথম বার কোনো কেস এর মাঝখানে তার মাথা যেনো কাজ করা বন্ধ করে দিল। তার মাথা ঝিম ঝিম করছে, শরীরের প্রত্যেকটা স্নায়ু যেনো উত্তেজিত হতে আছে। এ ভাষা তার চেনা, তোপসের খুব বিপদ, ভীষণ বড়ো বিপদ....
~চলবে~

Source: FaceBook
Note: this is my personal blog. The copyright of the story lies solely and entirely with the author.

Sunday, 11 June 2017

নিশ্চিহ্নাস্ত্র রহস্য by Ambuz Basak (incomplete)

 ১

রবিবারের সকাল। ফেলুদা কলেজ-স্ট্রিটের বই পাড়ায়। সম্ভবত, সুমিত্রা দেবীর সাথে ডেটিং-টেটিং এর প্ল্যান! তোপসে আর অয়ন্তিকা বৈঠকখানায় বসে জাঁকিয়ে গল্প করছে। বিষয়বস্তুঃ ফেলুদার ফিরে পাওয়া ভালোবাসা। দু'মাস হয়েছে তোপসে-অয়ন্তিকা নতুন ইনিং শুরু করেছে। ওদের শুভ-পরিণয়ে আমন্ত্রিত ছিলেন যেসমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু ছিলেন মূল আকর্ষণ! কে না উপস্থিত ছিলেন সেদিন - বিখ্যাত সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সি, রাজা ভূদেব সিং-এর পরিবার-বর্গ থেকে শুরু করে 'কাকাবাবু', অর্থাৎ, রাজা রায়চৌধুরী মহাশয়-ও। তবে, এখনও অব্দি মধুচন্দ্রিমা-র অবকাশ পায়নি নব-দম্পতি। অয়ন্তিকা এসময়ে অত্যন্ত ব্যস্ত- সামনেই 'সারা বাংলা নৃত্য প্রতিযোগিতা', তাই সারাদিনের একটা মেজর সময় সে নৃত্য প্রশিক্ষণ দিতেই ব্রতী। রবিবারেও সে ছুটি নেয়নি!
- এই, সাড়ে নটা বাজে বাবু। চা টা শেষ করে কাপ-প্লেটটা সিঙ্কে নাবিয়ে দিও - আমি রেডি হচ্ছি, ফিরবো কখন তা ঠিক নেই।
- জো হুকুম, ম্যাডাম। আজ আমি একটা স্পেশ্যাল ডিশ বানাবো। দেখবে, পেট ভর্তি থাকলেও, শুধু খাবারটার সু-ঘ্রাণের দৌলতেই পেট খালি হয়ে গেছে!
- বেশ তো। তোমার স্কুলের সামার ভ্যাকেশন যতদিন আছে, ততদিন তবে আমি রান্না ঘরে ঢুকবো না! (ফিক্ করে হাসি অয়ন্তিকার, কোনোরকমের লুকিয়ে সিরিয়াসনেস আনার চেষ্টা)
- (মাথা চুলকে) এই, এই.. ওমনটা করবে? চাপ হয়ে যাবে আমার!
- (অট্টহাস্যে) মজা করছি। আমি উঠছি। হরিপদ বাবু (এখন আর লালমোহন বাবুর অ্যাম্বাসেডর নয়, বছর দু'য়েক হলো, ফেলুদা নতুন গাড়ি নিয়েছে - মার্সিডিজ) এসে গেছেন।
তোপসের কপালে একটা আলতো চুম্বন রেখে অয়ন্তিকা বেড়িয়ে গেল। তোপসে আনমনা ভাবে টিভি সুইচ করল। ২৪ ঘন্টা। একটা লাইভ টেলিকাস্ট। এ কি! এ যে ভয়ানক খবর! আওরঙ্গাবাদ-গামী এক যাত্রিবোঝাই বাস চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হতে দেখা গেছে! এ তো অকল্পনীয়! তোপসে সঙ্গে-সঙ্গেই তার ফোনে স্পিড-ডায়াল ১ প্রেস করল -
- ফেলুদা! তুমি -
- সারা দেশ এখন এই নিউজ নিয়েই সরগরম রে তোপসে। মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছে।
- কিন্তু, এ ও কি সম্ভব?
- সম্ভব হয়তো। নিশ্চই এর পিছনে কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। এ ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো 'আই.কিউ.' দেশের একজন বৈজ্ঞানিকেরই আছে।
- অর্থাৎ, তুমি প্রোফেসর শঙ্কু-র কথা বলছ?
- ইয়েস, মাই বয়। আমি জানিনা এই অঘটনের সমাধান কিভাবে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটা একরকমের অলীক ব্যাপার, বিশ্বজনীন ও বটে।
- তুমি এখন একা?
- না। সৌমিত্র-দা (পাঠকগণ ঠিকই ধরেছেন, আমি স্বনামধন্য চলচ্চিত্রাভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর কথাই বলছি) এর সাথে আড্ডা দিচ্ছি। আমি ফিরছি এক ঘন্টায়। জলখাবার খেলি?
- হ্যাঁ। অয়ন্তিকা বেড়িয়ে গেছে।
- ও ও তবে এতক্ষণে খবরটা পেয়েছে নিশ্চই। আমি আসছি।
একঘন্টার মধ্যে ফেলুদা ফিরেছে। দু' ভাই মিলে এখন ব্রেকিং-নিউজে মগ্ন। যাত্রিবোঝাই বাসটা ছিল একটি ট্যুরিজম কোম্পানির আন্ডারে - 'দ্য বিউটিজ অব হিন্দুস্তান'। মুম্বাই থেকে আওরঙ্গাবাদ-গামী বাসটি গতকাল রাত একটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে রওনা দেয়, ড্রাইভার সমেত ৭৭ জন - আজ সকাল সাড়ে নটা নাগাদ আওরঙ্গাবাদের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের তিন মাইল আগেই তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। স্থানীয় বেশ ক'য়েক জন ব্যাপারটা নিজে প্রত্যক্ষ করেন। স্বাভাবিক ভাবেই এই ঘটনা সেখানকার মানুষদের মধ্যে এক ভয়াবহ, আতঙ্কদায়ক, চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সূচনা করে। আঞ্চলিক পুলিশ-ফোর্স ব্যাপারটিকে খতিয়ে দেখছেন।
"ক্রিং.. ক্রিং ক্রিং.. ক্রিং ক্রিং.."
- হ্যালো।
- হ্যাঁ, প্রদোষ বাবু?
- আহাঃ! আপনাকেই চাইছিলাম। কি বিশ্রী একটা ব্যাপার ঘটে গেল - ভেবে কিছু কুল-কিনারা পাচ্ছি না মশাই!
- আপনার সাথেও আমার দেখা করা খুব প্রয়োজন। তা আমি আগামি -
- আপনাকে কলকাতায় আসতে হবে না; আমরাই গিরিডি যাচ্ছি। কালই ভাবছি বেড়িয়ে পড়বো। অনেক দিন হয়েগেল, মাথার ব্যায়ামের সরঞ্জাম নেই (সহাস্যে)! তা, কিছু বলতে পারেন এ বিষয়ে?
- হ্যাঁ। কিছুমাত্র বলছি। আজকের দুর্ঘটনার জন্য যে ওয়েপনটি ব্যবহার করা হয়েছে -
- তা আপনারই বিশ্ববিখ্যাত ইনভেনশন, 'দ্য অ্যানাইহিলার'!
- ঠিক ধরেছেন। আমি আমার সারা জীবনে দু'বার ব্যাবহার করেছি সে অস্ত্র। কিন্তু তাতে মানবসমাজ, পরিবেশ, কিংবা মানবসম্পদের ক্ষতি হয়নি। দিনকেদিন মানুষ হিংস্র থেকে হিংস্রতর, তথা হিংস্রতম জীব হয়ে চলেছে। প্রদোষ বাবু, do you know, where does the biggest irony lie? The more we get upgraded, improve ourselves, the more we ruin our humanity. In fact, I believe, there is a reciprocal relationship between humanity & human-civilization.
- আমি আপনার সাথে একমত। আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা গিরিডি অ্যাপ্রোচ করবার আগেই জানিয়ে দেব, কেমন?
- অসংখ্য ধন্যবাদ। ঐ কথাই রইল। রাখি তবে?
- রাখুন। নমস্কার।
রিসিভার রেখে দিল ফেলুদা। সত্যি কথা বলতে কি, ফেলুদা এই কলটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
- তোপসে -
- ফেলুদা, আমি তোমাদের ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি, তুমি তোমারটা একবার চেক করে নাও। অয়ন্তিকাকে এখনও কিছু বলিনি যদিও, but, I can convince her to come with us!
- বাবাহ্! তুই তো আমারও এক-কদম আগে! এক্সটেনশনে শুনলি?
- পুরোটা! জাস্ট ভাবতে পারছিনা!
- ভাবতে আমিও পারছি না রে, তোপসে। কি এমন মেকানিজম থাকতে পারে, যার দৌলতে একটা আস্ত বাস ওতগুলো যাত্রি সমেত হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে? আর আমি এটুকু নিশ্চিত যে, 'দ্য অ্যানাইহিলার' চুরি যায়নি। যদি যেত, তবে সেটাও খবর হতো। আরেকটা ব্রেকিং নিউজ-ও বটে!
- তবে?
- যতদূর আন্দাজ করতে পারছি - সম্ভবত, ইনভেনশন-ফর্মুলা কেউ বা কারা কোনরকম ভাবে হস্তগত করেছে। আসল নথি যেমন থাকার তেমনই রইলো, কিন্তু বিষয়বস্তুর স্বাদ তখন অন্য কেউ চাখছে! আজকালকার ইলেকট্রনিক-যুগে প্রাইম-হ্যাকারদের ক্ষেত্রে প্রায় সবরকমের সিকিউরিটি ভেস্তে দেওয়া সহজ। অবাক হচ্ছি এই ভেবে, যে, কে এমন আছে, যে কিনা 'ত্রিলোকেশ্বর'-কেও ধোঁকা দিতে পারে!

২
সোমবার ফার্স্ট আওয়ারেই হরিপদ বাবু, ফেলুদার মার্সিডিজ নিয়ে হাজির। লালমোহন বাবু তার ক্লাসমেট বৈকুণ্ঠ মল্লিকের সাথে গ্যাংটক গেছেন। ফেলুদাকে বলে গেছেন, "তপেশের লেখা পড়ে জানতে পারি, '৭১ সালে আপনারা দু' ভাই মিলে গ্যাংটকে একেবারে - ওই কি যেন সিনেমাটার নাম? ও হ্যাঁ.. তা, যা ধুম-মাচিয়ে এসেছেন, আমি ভাবলে, মশাই, আজও গায়ে কাঁটা দেয়! তাই বৈকুণ্ঠকে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে বগলদাবা করে ঐখানে আমিও ধুম-টু করে আসবো!"
লালমোহন বাবু ফেলুদার মার্সিডিজকে জায়গা দেওয়ার জন্য তার গ্যারাজটিকেই দ্বিগুণ ক'রে ফেলেছেন। অবশ্য, ফেলুদা একরকমের জোর করেই গ্যারাজ মেরামতির খরচাপাতি দিতে গিয়ে যে রকমের ধমক খেয়েছিল লালমোহন বাবুর কাছে, তা অবিশ্যি ভুলবার নয়!
জামাকাপড় নেওয়া আছে দিন দশেকের মতো। অয়ন্তিকা প্রথম প্রথম গাঁই-গুঁই করেছিল, আর একমাস পরেই 'সারা বাংলা নৃত্য প্রতিযোগিতা' বলে কথা - কিন্তু, একটা উগ্র অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়েই সে আমতা-আমতা করেছে।
কোলকাতা থেকে গিরিডি প্রায় ৩২৩ কিমি। ড্রাইভিং বাই রোডের ডিউরেশন প্রায় ঘন্টা সাতেক। এমতাবস্থায়, লংড্রাইভের জন্য বাড়তি যা যা জিনিস প্রয়োজন, তা নেওয়া হয়ে গেলে, হরিপদ বাবু গাড়ি স্টার্ট দেন বেলা সাড়ে দশটায়।
পথের বর্ণনা দিয়ে আপনাদের অপেক্ষায় রাখবোনাই ভেবেছি। ফেলুদার মার্সিডিজের 'স্মার্ট-ম্যাপ' -এর দৌলতে, প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু মহাশয়ের বাড়ি পৌঁছানো গেল মাত্র ছ' ঘন্টার মধ্যেই। মূল ফটকে দুজন দ্বার-রক্ষী মোতায়েন - তারা ফটক খুলে দিল। মাঝখানের বাঁধানো পথটার বাঁদিকে একটা লন। আর, ডানদিকে একটা বাগান - বেশ বড়ই। ফেলুদা বাগানের গোলঞ্চগাছটার দিকে অন্যমনস্ক ভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল, তারপর হরিপদ বাবু ছাড়া বাকি সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। হরিপদ বাবু গাড়ি নিয়ে পার্কিং-জোনে ঢুকে গেলেন।
- আরে! আসুন, আসুন। আমি একটু আগেই আপনাদের কথা ভাবছিলাম - তা, পথে ঘাটে
- কোনো অসুবিধাই হয়নি প্রোফেসর! (অয়ন্তিকা, প্রোফেসরকে শেষ করতে না দিয়েই)
- বেশ, বেশ। লালমোহন বাবুকে দেখছি না -
- উনি ওনার ক্লাসমেটের সাথে গ্যাংটকে ঘুরতে গেছেন।
- বাহ্! ওইত্তো, হরিপদ। চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।
*****
প্রহ্লাদের হাতের চা টা লা-জবাব। আদা আর এক অচেনা সুমিষ্ট ফলের সুগন্ধে ভরপুর লিকার। ফেলুদা ফলের নাম জানতে চাইলে, প্রোফেসর বললেন যে ওটা 'মডিফায়েড ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুট'। বেশ ক'য়েক বছর আগে খবরের কাগজ এই 'ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট' নিয়ে খুব সরগরম ছিল। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশী সময় আগে করিমগঞ্জে এই ম্যাকেঞ্জি সাহেবের পূর্বপুরুষদের রেশমের কুঠি ছিল। কিন্তু, কুঠি উঠে গেলেও তারা করিমগঞ্জ ছাড়তে পারেননি। সেই ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাংলোর বাগানে এই আশ্চর্য ফলের গাছ। একাধিক ভিটামিনস-এ ভরপুর অতীব সুস্বাদু এই ফল যখন প্রকাশ্যে এলো (যতদূর মনে পড়ছে, ফাউন্ডারের নাম মানসুখানি। কিন্তু, ফেলুদার মতে সে নাকি ব্যাবসাদার মানুষ; আসল আবিষ্কারকের নাম কাগজে ছাপায়নি।), তার দাম হলো আকাশছোঁয়া - যা কিনা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
- 'মডিফায়েড' কেন? (ফেলুদা জিজ্ঞেস করলো)
- এই খবরটা জানেন তো যে, ওই ফল একমাত্র সেই বাংলোর বাগানেই ফলতো? এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে, আমি করিমগঞ্জের সেই বাংলোতে একবার গেছিলাম, তাও বছর দশেক আগে। আমি ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগান থেকে কিছু মাটি সংগ্রহ করেছিলাম। তো, গবেষনাগারে পরীক্ষা করে সে মাটির বেশ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করি। The soil was practically containing three transition metals: Yttrium, Niobium & Technetium, having a particular percentage-proportion of 32:14:23. এতোটা মাত্রায় যে কোনো জমিতে ওই তিনটি মৌল থাকতে পারে, তা জেনে অবাক হয়েছিলুম বৈ কি! আমি আমার বাগানের বেশ কিছু জমি নিয়ে, উপযুক্ত পদ্ধতিতে কৃত্রিম ভাবে ম্যাকেঞ্জি-ট্রি বানাই। অবশ্যই ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুটের বীজ পুঁতে। তবে, আমার বানানো গাছের ফলের স্বাদ, ম্যাকেঞ্জি সাহেবের গাছের ফলের স্বাদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। কারণটা আমার কাছে অজ্ঞাত। আর তাই, 'মডিফায়েড ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুট'।
- চমৎকার! (অয়ন্তিকা এক্সাইটেড) আচ্ছা প্রোফেসর, এবার আপনার নিশ্চিহ্নাস্ত্রটি সম্পর্কে কিছু বলবেন? আমার কৌতুহলের শেষ নেই!
ফেলুদা অয়ন্তিকার দিকে তাকিয়ে মিটি-মিটি হাসছে! তোপসে একটু নার্ভাস! প্রোফেসর সহাস্যে বললেন, "তা তো অবশ্যই। আচ্ছা, শুনুন তবে। পর্যায়-সারণির ১১৪ ও ১১৫ নং মৌল দু'টি হচ্ছে যথাক্রমে Flerovium ও Moscovium. দু'টি মৌলই তেজস্ক্রিয়। Flerovium-এর ক্ষেত্রে, ভ্যালেন্স-শেল-ইলেকট্রনিক-কনফিগারেশনে দেখা যায় যে, the 'p-subshell' has only two electrons. Which is why, the element becomes highly unstable. আবার, in case of Moscovium, the valence 'p-subshell' contains three electrons, for this reason, it gains a 'half-filled' stability. কিন্তু যখন এই দুটি মৌলকে রশ্মি আকারে একে অপরের সাথে 'head-on' কলিশন করানো যায়, তবে মৌল দু'টির মধ্যে দ্রুত ইলেকট্রন-ট্রান্সফার ঘটে। সচারচর এই মৌলদ্বয় 'আলফা'-কণা নিঃসরণ করে থাকে। কিন্তু আমি এই মেকানিজমটাকে অ্যারেস্ট করেছি। যেহেতু আমি মৌল গুলিকে রশ্মির রূপ দিয়েছি, তাই প্রতিটি রশ্মি-স্রোত সেকেন্ডে প্রায় ২৫ কোটি Flerovium-পার্টিকেল নির্গত করে। মলিকিউলার-ওয়েট সামান্য বেশী হওয়ায়, Moscovium-এর ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা একটু কম। এই 'head-on' কলিশনটিই এক দ্বিতীয় শক্তির উৎস। একে আমি বলি 'the speed-force'. এই স্পিড-ফোর্সের ওয়েভলেন্থ খুবই কম। ০.৫ ন্যানোমিটার। অর্থাৎ, ভেদন-ক্ষমতা মারাত্মক। একটিমাত্র পদার্থ ছাড়া সমস্ত কিছুকেই ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।"
- Adamantium কি? (ফেলুদার চোখে বুদ্ধিদীপ্ত ইঙ্গিত)
- ইয়েস, ডিটেকটিভ। Adamantium, non-destructive towards almost every weaponized energies.
- কিন্তু, ওই ধাতুর এক্সট্রাকশান হয়েছে তো একটি উল্কাপিণ্ড থেকে? যেটা কিনা কালাহারি মরুভূমিতে পাওয়া গেছিল!
- একটি উল্কাপিণ্ড নয়, প্রদোষবাবু। (প্রোফেসরের ঠোঁটের কোনে হাসির আভাস) দু' টি। অপর উল্কাপিণ্ডটি পড়ে ঠিক প্রথমটা পড়ার চল্লিশ বছর পর - ১৯৭১ সালে। আর, কোথায় পড়েছিল জানেন?
- আন্দাজ করতে পারি। আপনার বাগানের ঐ গোলঞ্চ গাছটার পিছনে কি?
- অসাধারণ পর্যবেক্ষণ এবং অব্যর্থ অনুমান মশাই আপনার!
- অর্থাৎ, আপনার ওই পিস্তলটি Adamantium-এর?
- আপনার এই অনুমানও নির্ভুল। কিন্তু আমার মন বলছে, আপনি এখনও সন্তুষ্ট নন। আপনি হয়তো ভাবছেন, যে রশ্মির ওয়েভলেন্থ মাত্র ০.৫ ন্যানোমিটার, তা কিভাবে একটা আস্ত ট্যুরিস্ট-বাসকে ভ্যানিশ করতে পারে, তাই তো?
- একদম। (ফেলুদা আঙুল মটকাচ্ছে)
- আগে আপনার অনুমানটি শুনি। (প্রোফেসরের চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি)
- যতদূর আন্দাজ করতে পারছি, ওয়েভলেন্থ এক্সপ্যান্ড করার জন্য আপনি নিশ্চই কোনো হালকা মৌলের সহায়তা নিয়েছেন - তেজস্ক্রিয় তো বটেই। এবং, এটাই আপনার অক্সিলিয়ারি-মেকানিজম।
- I am impressed, detective! হ্যালোজেন-পরিবারের তেজস্ক্রিয় মৌল Astatine. যে পজিট্রন নিঃসরণ করে। এই পজিট্রনের উপস্থিতিই ওই ওয়েভলেন্থকে এক্সপ্যান্ড করার জন্য দায়ী।
- খুব ইন্টারেসটিং। এবার আপনার ল্যাবরেটরিটা দেখব। তারপর ইনভেনশনের কাগজপত্র যেখানে থাকে, সেই জায়গাটা।
- চলুন। একতলাতেই আমার ল্যাব। আসুন -
আরামকেদারা ছেড়ে ওঠা মাত্রই, কোথাথেকে যেন নিউটন তার মনিবের পায়ের কাছে এসে পাজামায় গলা ঘষতে লাগলো।
- ও-মা! কি কিউট! (অয়ন্তিকা টপ্ করে নিউটন কে কোলে তুলে নিয়েছে)
- হাঃ হাঃ! ও আমার সর্বক্ষনের সঙ্গী।
বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে একটা করিডোর পেরনোর পর, একটা বড়ো জানলাকে বাঁদিকে রেখে, ডানদিকের একটি ঘরের দরজার সামনে এগিয়ে গেলেন প্রোফেসর। কিছুটা সামনে ঝুঁকে - দরজার ঠিক যেখানে হাতলটা থাকে, সেই জায়গাটার দিকে প্রোফেসর তাঁর ডান-চোখটা রেখে দশ সেকেন্ড মতো তাকিয়ে থাকলেন। আর, তারপরই দরজাটা আপনা-আপনি খুলে গেল। ফেলুদা খুব বেশি অবাক না হলেও, তোপসে আর অয়ন্তিকা তো রীতিমতো হাঁ! প্রোফেসর ওদের দু'জনার বিস্ময় আন্দাজ করতে পেরেই বললেন, "এই যে আমার চশমাটি দেখছেন, এর এই ডানদিকের লেন্সটাতে একটা 'cybernetic-coating' আছে। আর, বাঁদিকের লেন্সে আছে সিলিকনাইজ্ড মাইক্রো-কম্প্যুটর। ডানদিকের লেন্সটা একটি স্ক্যানার হিসেবে কাজ করে। এই দরজার লকিং সিস্টেমটা আমারই আবিষ্কার কিছু কোডসের উপর বেসড। চশমাটার নাম রেখেছি 'দ্য স্মার্ট-আইজ'। দেখতে অন্য দু'টি সাধারণ চশমার মতোই। গুগলের যে স্মার্ট-গ্লাস আছে, তার মেকানিজমটার অনেকটাই আমার চশমাটার সাথে মেলে - কিন্তু, আমার চশমার মেকানিজম ততোটা জটিল নয়।"
ল্যাবরেটরিটা ছোটখাটো হলেও, সাধারণ কেমিকাল ইনস্ট্রুমেন্টস ছাড়াও বিচিত্র সব যন্ত্রপাতিতে ভরা। প্রোফেসর তাঁর কিছু বিশেষ-বিশেষ আবিষ্কার সম্পর্কে সংক্ষেপে বক্তৃতা দিলেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - ওমনিস্কোপ, বটিকা-ইন্ডিকা, এয়ারকন্ডিশনিং পিল, লিঙ্গুয়াগ্রাফ, লুমিনিম্যাক্স, রিমেম্ব্রেন, মিরাকিউরল বড়ি, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-শঙ্কু ফরমুলা, কম্পু, কার্বোথিনের গেঞ্জি.. আরও কত কি! এবং, সর্বোপরি, তাঁর 'নিশ্চিহ্নাস্ত্র'। প্রোফেসর বলে চললেন, "এই হচ্ছে সেই ব্রহ্মাস্ত্র। আপনারা যন্ত্রটিকে হাতে নিলেই বুঝতে পারবেন যে যন্ত্রটা অসম্ভব রকমের ঠান্ডা। Adamantium-এর সাধারণ তাপমাত্রা মাত্র ১১° সেন্টিগ্রেড। আর, এই 'speed-force' অ্যাক্টিভেট হওয়ার জন্য নূন্যতম তাপমাত্রা প্রয়োজন ২৩° সেন্টিগ্রেড। তাই, ট্রিগার দিলে কম করে হলেও এই রেডিয়েশন কার্যকরী হয় উৎক্ষেপন স্থান থেকে নিদেনপক্ষে দু' ফুট তফাতে; গরমকালে তাপমাত্রা বেশী থাকার কারণে, এই দূরত্ব তিন ফুটেরও বেশী হতে পারে! রেডিয়েশনটি প্রথমে কিছুটা সরলরৈখিক ভাবে চলার পরে, একসময় তা গোলাকৃতি তরঙ্গমুখের আকারে ছড়িয়ে যায়। যার রেডিয়াস কম করে এক ফুট। অর্থাৎ, আপনি যদি ট্রিগার করেন, তো আপনি সুরক্ষিত, যেহেতু আপনার থেকে কমপক্ষে দু' ফুট দূরে 'speed-force' টি অ্যাক্টিভেট হচ্ছে। এক্ষেত্রে অ্যাক্টিভেশন রেডিয়াসটা ইচ্ছে মতো কন্ট্রোল করা যায়।"
শুধু ফেলুদা কেন? সব্বাই স্পিচলেস। কি ভীষণ ইন্টারেস্টিং মেকানিজম!
এরপর প্রোফেসর, ফেলুদা, তোপসে ও অয়ন্তিকাকে দোতলায় নিয়ে এলেন। একটি করিডোর পেড়িয়ে এসে সামনের একটা ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন প্রোফেসর। আগের মতোই প্রোফেসর তাঁর 'স্মার্ট-আইজ' ব্যাবহার করে দরজা খুললেন।
প্রোফেসর ঘরে ঢোকার পর, প্রথমে অয়ন্তিকা প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু, 'welcome professor' শোনার পর ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়েই 'বাবাগো!' বলে নিউটনকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেড়িয়ে সে দশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়ালো! তোপসে অপ্রস্তুত।
- (প্রোফেসরের অট্টহাসিটা ছিল দ্যাখবার মতো) ভয় পাবার কিছু নেই। ও হচ্ছে রোবু। আমার তৈরী রোবট। কিন্তু, ধন্দে পড়ে গিয়েছি, প্রদোষবাবু। পৃথিবীর এমন কোনো প্রযুক্তি নেই - অন্তত, না থাকারই কথা - যার সাহায্যে কেউ রোবুর চোখে ধূলো দিতে পারে। পাঁচ বছর আগে আমি রোবুকে লাস্ট আপগ্রেড করেছি, অনেক নতুন ফাংশনাল ফিচারসও ইনকর্পোরেট করেছি। ওর বডিটাকে Adamantium-দিয়ে কভার করেছি। He is almost invulnerable.
- আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না যে, চোর আপনারই এক ভার্চুয়াল ইমেজ তৈরী করে তা নিজের ফেসের সাথে অ্যাডজাস্ট করে এসেছিলো? (এবার অয়ন্তিকা এগিয়ে এসে প্রশ্নটা করে প্রোফেসরকে)
- (প্রোফেসরের ঠোঁটের কোনে হাসির আভাস) আপনি বেশ বুদ্ধিমতী। (তোপসে আড়চোখে দেখলো, অয়ন্তিকা ব্লাশ করছে) আমি লাস্ট আপগ্রেডে এই অ্যানড্র‍য়েডের 'ব্রেন'-এ একটি 'heat-signature' মাপক যন্ত্র ফিট করি। সেন্সরটা ঠিক ওর বুকের মাঝখানে। এই 'heat-signature'-এর ব্যাপারটি অনেকটি ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো কাজ করে। আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা-আলাদা ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই আলাদা-আলাদা heat-signature বর্তমান। এমনকি, যেকোন জড়বস্তুর অবস্থান, আকার-আকৃতি চেঞ্জ হলে তাদেরও heat-signature কিছুমাত্রায় চেঞ্জ হয়! তাই, কেউ আমার ভার্চুয়াল ইমেজ ক্রিয়েট করলেও সে রোবুর কাছে ব্যর্থ হবে।"
এরপর একে একে সবাই ঘরে প্রবেশ করল। এবারে রোবুর 'হ্যালো এভরিবাডি' -সম্বোধনের উত্তরে অয়ন্তিকা একটা লম্বা 'হাইইইইই...ই' করেছে! ঘরটা খুব বেশি বড়ো নয়। একটিও জানালা নেই ঘরটাতে। ফেলুদা, তোপসের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো, "ব্যাপারটা বুঝলি? দরজা খোলার সাথে সাথেই আমরা দেখলাম কিন্তু ঘরে ফ্লুরোসেন্ট-LED জ্বলছে। মানে, দরজাটার সাথে লাইটটা লিংক্ড!"
এবার প্রোফেসর একটা লকারের দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুরু করেন, "এখানেই আমার যাবতীয় ইনভেনশনের কাগজ-পত্র, আমার ডেমনস্ট্রেশন্সের স্পীচ, ইলেকট্রনিকাল-ডেটাস.. ইত্যাদি থাকে। আমি গত শুক্রবার, অর্থাৎ, আওরঙ্গাবাদের দুর্ঘটনাটা ঘটার দু'দিন আগে, কিছুটা নস্টালজিক হয়েই আমার অ্যানাইহিলিন-পিস্তলের পেপারটা দেখতে আসি। পেপারটা হাতে নেওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই রোবু ছুটে আসে! কিছুক্ষন আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ও বলে, ''According to my sensor, the heat-signeture is changed''. আমি তো হতবাক! তারমানে কি কাগজগুলো জালি? জিজ্ঞেস করতেই ও আবার বলে, ''No. I can recognize most of the heat-signetures, that I am experiencing now. It is scanned by someone from outsides. The heat-signatures coming from the rest of your papers tell me that, they could be displaced from their actual positions, but am confident that, these papers are not scanned." সেই পাঁচ বছর আগে রোবুকে আপগ্রেড করার কিছুদিন পরে নিতান্তই খেয়াল বশত কাগজগুলি বের করে লকারটা ভালো করে পরিষ্কার করি। তখনই ও আমার সমস্ত কাগজপত্রের heat-signeture গুলো ওর 'ব্রেন'-এ স্টোর করে নেয়।"
- অর্থাৎ, এই কুকর্মটি রিসেন্টলিও হতে পারে, আবার পাঁচ বছর আগেও হতে পারে তো! (তোপসে বিস্মিত)
- এক্সাক্টলি। এটাও আমি ভেবে দেখেছি। এই পাঁচবছরের মধ্যে যে কোনো দিন চোর এসে, অত্যন্ত উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যাবহার করে, আমার রোবু কে কিছু সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। আর গত রবিবার সুযোগ আসাতে হয়তো -
প্রোফেসর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ। একমাত্র রোবু নিজের মনের সুখে ওর পায়ের ওপর তাল ঠুকে যাচ্ছে, একটা টুলের ওপর বসে। অয়ন্তিকা অন্যমনস্ক ভাবে নিউটনের গায়ে হাত বুলোচ্ছে। তোপসে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। এতক্ষণ ফেলুদা কোনো কথা বলেনি, এবার সে প্রোফেসরকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনার তো শত্রুর অভাব নেই। ইন ফ্যাক্ট, আমার মতে, মেকি বন্ধুরও অভাব নেই। এই পাঁচ বছরের মধ্যে আপনি কি গিরিডিতে আপনার এমন কোনো বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, যার সাথে আপনার মনোমালিন্য আছে?"
- (কিঞ্চিৎ ভেবে) আমার খুব কাছের বন্ধুরা প্রতিবছর অন্তত একটি বার আমার এখানে আসেন। আর, আমি গত বছর আমারই এক বন্ধুর আমন্ত্রণে ইনসব্রুকে যাই - দ্বিতীয় বার। একটা কনফারেন্স-এ অংশ নেওয়ার জন্য। প্রায় দু'সপ্তাহ আমি ইনসব্রুকে কাটিয়ে গিরিডি তে ফিরি। আমার অবর্তমানে বাড়ির সদস্য বলতে নিউটন, প্রহ্লাদ, রোবু, বিধুশেখর আর আমার অত্যন্ত বিশ্বাসী প্রতিবেশী বন্ধু অবিনাশবাবু।
- বিধুশেখর কে? (অয়ন্তিকা প্রশ্ন করল)
- আমার তৈরী আরেকটি অ্যানড্র‍য়েড। ও ও রোবুর মতো ইমোশনাল। তবে, একটু বেশিই ঘুমোয়। হাঃ হাঃ। এখন মনে হয় ছাদে উঠে সে 'বায়ু-সেবন' করছে!
একতলায় নামতে নামতে প্রোফেসর বললেন, "প্রদোষবাবু, দু' দশক আগে আপনি যেভাবে কৈলাস থেকে চুরি যাওয়া যক্ষীর মাথা উদ্ধার করেছিলেন, তা ভাবতেই আমার খুব গর্ব হয় - আপনি এই শতাব্দীর বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ; আমি আপনাকে এই ঘটনাটি ইনভেস্টিগেট করার অনুরোধ করবো।"
- আমার তরফ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবো না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা কালই আওরাঙ্গাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। You will be updated.
- অসংখ্য ধন্যবাদ। তেমন দরকার পড়লে, আমিও আপনাদের সঙ্গে আসতে পারি -
- বেশ। আমি আপনাকে হোয়াট্সঅ্যাপ মারফত অবশ্যই ইনফর্ম করে দেবো।
- তপেশ (অয়ন্তিকা, তোপসের দিকে তাকিয়ে), প্রোফেসরকে দেখে কিন্তু বোঝাই যায় না যে ওনার নব্বই বছর বয়স!
- হাঃ হাঃ। (প্রোফেসর তাঁর ভ্রু-জোড়া নাচালেন দু'বার!) এই রহস্যের উত্তর কিন্তু ফেলুবাবু বলতে পারবেন।
- পারি বৈ কি! আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আপনি তিব্বতে একশৃঙ্গ প্রাণীর খোঁজে অভিযান করেন। আপনি অভিযান সেরে দেশে ফেরেন পঁচিশ বছর কমিয়ে!
- এক্সাক্টলি-
- এও কি সম্ভব? (প্রোফেসরকে বাকি কথা বলতে না দিয়েই, অয়ন্তিকা)
- নিশ্চই। এরও পেছনে দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাখ্যা আছে। অন্যদিন না হয় সে গল্প করা যাবে!
- একটা প্রশ্ন না করে পারছি না। আপনি এটা কি করে কনফিডেন্সের সাথে বললেন যে, আপনার বয়সের রহস্যটা আমি জানি?
- (প্রোফেসর মুচকি হাসছেন) মানিকবাবু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার প্রতিটা অভিযানের ডায়েরি গুলি আমি ওঁনার কাছে রেখে আসতাম। কিন্তু আজ আর সেসবের অবসর নেই। (প্রোফেসর রুমাল বের ক'রে চোখ মুছলেন। পরক্ষণেই আবার হাসির ঝিলিক।) আর, মানিকবাবু তো আপনার গডফাদার।
এবার ফেলুদাও হতভম্ভ!

৩ (পার্ট-ওয়ান)
সন্ধেবেলায় প্রোফেসরের বৈঠকখানায় বসে 'ম্যাঙ্গোরেঞ্জ' আর ডালমুট-চানাচুর সহযোগে টেলিভিশনে মগ্ন সবাই। দ্য টাইমস প্রাইম। বাস দুর্ঘটনার পর বত্রিশ ঘন্টা কেটে গেছে। আওরঙ্গাবাদের স্থানীয় police-কমিশনার মিস্টার ঘোটে ('কৈলাসে কেলেঙ্কারি'-র সময়ে যিনি এখানকার সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন)-র কথায়, "...and, we are investigating the situation. The actual reason behind this tragedy is completely unknown to us, for now. In fact, we are confused, we do not know from where to start. Hopefully, we'll get some clues, soon. We are trying hard to reveal the mystery behind the accident, as soon as possible. And, you know that, nothing is impossible!"
এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর, এবার সেটা নিয়ে বলা যাক। মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে আওরঙ্গাবাদ গামী 'দ্য বিউটিজ অব হিন্দুস্তান'-এর ট্যুরিস্ট-বাসে থাকা প্যাসেঞ্জারদের তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে। সাতাত্তর জন ভারতীয়-অভারতীয় সমস্ত যাত্রীদের (ড্রাইভার সমেত) নাম জানা না গেলেও, ইতিমধ্যে ঊনসত্তর জনের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
- মাই গুডনেস! (প্রোফেসর রীতিমতো উত্তেজিত) এনরিকো পেত্রি, ফ্রম মিলান? টমাস গ্রোপিয়াস, ফ্রম ইন্সব্রুক? এরাও যে ভিকটিমস দের মধ্যে পড়বে, তা তো আমার কল্পনাতীত, প্রদোষবাবু! আর এরা যদি ভারতে আসার পরিকল্পনা করেও থাকে, তো আমাকে ইনফর্ম করতো অবশ্যই। কিন্তু - আমি তো ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না মশাই!
- আপনার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কী এমন ঘটনা আছে, যার সাথে এঁরা জড়িত?
- উম.. দু'টি। আপনাকে আগে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই।
- নিশ্চয়ই।
- প্রায় দু' দশক আগে, ন্যাশনাল-ইন্টারন্যাশনাল মিলিয়ে, প্রায় শতাধিক পত্রিকা একটি খবর নিয়ে তুমুল ঝড় তুলেছিল। ইন ফ্যাক্ট, খবরটি ঐ বছরের 'দ্য টাইমসঃ নিউজেস অব দ্য ডিকেড' -এর লিস্টে তিন নম্বরে ছিল। আপনি মনে করতে পারেন নিউজটা?
- (কিছু ভেবে, ফেলুদা) যতদূর মনে পড়ছে, আপনার 'ড্যামি'-র বক্তৃতা। আর.. সম্ভবত, ইনসব্রুকে। আর.. মূল অপরাধীর নামটা.. গ্রোপিয়াস? (ফেলুদা নিজেই চমকে উঠেছে!)
প্রোফেসর বলতে শুরু করলেন, "ইয়েস, ডিটেকটিভ! আপনার মেমারির যত প্রশংসাই করি না কেন, কম বলা হবে। কার্ল গ্রোপিয়াস। তারই বানানো আমার অবয়বের ড্যামি, বিশ বছর আগে ইন্সব্রুকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে যে ধরনের বক্তৃতা পেশ করেছিল, আজ ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়, ফেলুবাবু। তো, আমাকে ইন্সব্রুকে যেতেই হয় এবং, সেই মুহূর্তে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী, আমি গ্রোপিয়াসের বাড়িতেই উঠি। একদিন হঠাৎ আমার বন্ধু সামারভিলের কাছ থেকে গ্রোপিয়াসের ব্যর্থতার কথা জানতে পারি। আমার অধিকাংশ ইনভেনশনের আইডিয়া নাকি গ্রোপিয়াসের মাথাতেই সর্বপ্রথম উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু, গ্রোপিয়াসের এক প্রবন্ধানুযায়ী, ওঁর চিন্তাধারাগুলি ফলপ্রসূ করবার আগেই নাকি আমি সমস্ত কিছুর পেটেন্ট নিয়ে রেখেছি! তো, ফেলুবাবু, আপনি বুঝতেই পারছেন, এটা একটা রিভেঞ্জ স্টোরি। গ্রোপিয়াস তাই আমাকে বিশ্বের বিজ্ঞান-মহলের কাছে অপদস্থ, পাগল প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এক তুখোড় মাস্টারপিস ছাড়ে - আমার দোসর। সামারভিল না থাকলে হয়তো আজ আমি মাটিতেই মিশে যেতাম।
"কার্ল গ্রোপিয়াস আজ থেকে সাত বছর আগে মারা যান। ব্রেন টিউমর হয়েছিল, শেষ রক্ষা করা যায়নি। এই টমাস গ্রোপিয়াস ছিলেন কার্লের নিজের ভাইপো। গতবছর অক্টোবরে দ্বিতীয়বারের জন্য ইন্সব্রুকে যাই, ওঁর সাথে আলাপ হয়। কেমব্রিজ থেকে পোস্ট-ডক করে, 'রয়্যাল সোসাইটি', 'নেচার' আর 'কসমস'-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। আজকে ওর বয়স হতো.. তাও পঞ্চান্ন। তবে, কাকার মতো উগ্র মানসিকতা ছিল না তাঁর।
"এনরিকোর সাথে আলাপ বছর পনেরো আগে। ইতালির মিলান শহরের পদার্থবিজ্ঞানী প্রোফেসর লুইজি রন্ডির অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল সে। তবে-"
প্রোফেসর থামলেন। রুমাল বের করে চোখ মুছলেন প্রোফেসর। তারপর, টেবিলে রাখা গ্লাসের জলে চুমুক দিলেন।
- (ফেলুদা) আচ্ছা, এই প্রোফেসর লুইজি রন্ডিই কি সিরিয়াল-কিলারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন? সে সময়ে যে সমস্ত বৈজ্ঞানিকগণ টাইম-মেশিন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে.. নাম যতদূর মনে পড়ছে.. ক্লাইবার। তা -
- (জলের গ্লাস শেষ করে, প্রোফেসর) ঠিক। ক্লাইবারকে লুইজিই হত্যা করে। তবে, আমাকে লুইজির কবল থেকে বাঁচানোর বিশেষ ভূমিকা নেয় আমার এক জার্মান বন্ধু, ক্রোল এবং এই এনরিকো। তবে, এনরিকোর শেষ জীবন সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই।
- (অয়ন্তিকা রীতিমতো এক্সাইটেড হয়ে) প্রোফেসর! আমাকে একটি মিনিট দিন, আমি ওঁর সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণের তথ্য গুগল থেকে বের করছি।
এক মিনিট কেন, ত্রিশ সেকেন্ডেরও কম সময় লাগলো অয়ন্তিকার। এনরিকো গত পাঁচ বছর ধরে 'কসমস' পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিল, নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতো। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এই যে, Adamantium -ধাতুটি সম্পর্কে সে গত তিন-চার বছর ধরে গবেষণা করছিল। এই খবরটা প্রোফেসরের কাছেও অজ্ঞাত।
- (তোপসে এবার উদ্বিগ্ন হয়ে) আচ্ছা ফেলুদা, এনরিকোর এই Adamantium -নিয়ে রিসার্চ আর প্রোফেসরের ফর্মুলা চুরির ব্যপারটা কি লিংকড হতে পারে না? হয়তো পাঁচ বছর আগে এনরিকোই ফর্মুলা হস্তগত করে নতুন ভাবে প্রোফেসরের নিশ্চিহ্নাস্ত্রের দোসর তৈরী করতে সফল হয়।
- (তোপসে, প্রোফেসরের পাশেই বসে ছিল। প্রোফেসর তোপসের পিঠে চাপড় মারেন।) ব্রিলিয়ান্ট, তপেশরঞ্জন! ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু, যে কিনা একবার আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, সে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবেই বা কেন?
- (এবার ফেলুদা মুখ খুললো) আর, সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্ন গুলো হল - টমাস গ্রোপিয়াস কি এনরিকোর সঙ্গে কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন? যুক্ত থাকলেও কি 'কসমস' পত্রিকায় লেখালিখি মারফত? আর তা না হলেও, কেন, কিভাবে? মোটিভটাই বা কি? চুরি তো যা হওয়ার এই পাঁচ বছরের মধ্যেই হয়ে গেছে। আর, এই ঘটনার সাথে এনরিকো, গ্রোপিয়াস - এদের হাত আছেই - তা হলপ করে বলা যাচ্ছে না। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যে নেই, তা সম্পর্কে শিওর হওয়া যাচ্ছে কি? ওয়েপনটাকি বাসের মধ্যেই ব্যবহার করেছিলেন কেউ? নাকি, বাসের বাইরে থেকে বাসটাকে নিশানা বানানো হয়? এতো সব প্রশ্ন নিয়েই কাল আমরা আওরঙ্গাবাদ রওনা দেব। পুলিশ-কমিশনার মি. ঘোটে আমার বন্ধুস্থানীয়।
'শ্যাঙ্কোপ্লেন'-টা মাত্র হাত পাঁচেক লম্বা। কিন্তু, তাতেই অনায়াসে পাঁচজনে (প্লেন-চালক সমেত) বসা যায়। কাল রাতেই, প্রোফেসর একটা ছোট-খাটো ডেস্ক্রিপশন দিয়েছিলেন। "প্লেনটা প্রথমে বানাই অ্যান্টি-গ্র‍্যাভিটি'-র ওপর বেস করে। যে ধাতু দিয়ে তৈরী করেছি, তার নাম দিয়েছিলাম 'শ্যাঙ্কোভাইট'। কিছুদিন আগেই এটাকে লাস্ট আপগ্রেড করি। এর আগে প্লেনটায় বসার জায়গা ছিল মাত্র দু' জনার ('স্বপ্নদ্বীপ'-গল্পে সত্যজিৎ বাবুর ইলাশট্রেশনানুযায়ী)। এখন তা বেড়ে পাঁচ। আর, বর্তমানে প্লেনটা লাইসেন্সড।"
অয়ন্তিকা এমন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল যে, সে কখন নিজের ডানহাতের তর্জনীর নখটা অর্ধেক গ্রাস করেছে অজান্তেই - তা আর খেয়ালে নেই! পরে অবিশ্যি ফেলুদা ধমক দেওয়ায় চমক ভাঙে।
আজ প্রোফেসর নিজেই আমাদের সঙ্গ নিয়েছেন। শ্যাঙ্কোপ্লেনের চালকের ভূমিকায় স্বয়ং ফেলুদা! পাশে প্রোফেসর। কাল রাতেই ফেলুদা শ্যাঙ্কোপ্লেন চালানো সম্পর্কে সমস্ত কিছু তথ্য প্রোফেসরের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে। এমনকি, আজ ভোরে ফেলুদা, প্রোফেসর আর অবিনাশ বাবুকে নিয়ে আকাশ-ভ্রমণও নাকি করে এসেছে! তপেশ আর অয়ন্তিকা তখন ঘুমিয়ে। ফেলুদার মতে, "Shanko-plane is one of the easiest vehicles to drive."
হরিপদ বাবু আজ সকালেই ফেলুদার মার্সিডিজ নিয়ে ফিরে গেছেন - ওর ছেলেকে কলেজে ভর্তি করার জন্য এই কদিন ব্যস্ত থাকবে।
সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে সবাই ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুটের রসে ভরপুর লিকার আর বেশ কয়েকটা ম্যাঙ্গোরেঞ্জ খেয়ে শ্যাঙ্কোপ্লেনে বসল। সবার আগে মি. ঘোটের সাথে দেখা করার ইচ্ছে ফেলুদার - তারপর, ক্রাইম-সিনের স্পট।
- ক্রমশ।