কালিম্পং রহস্য
অভীক দত্ত
-বুঝলে ভাই তপেশ, এই গরমটা না, সহ্য হচ্ছে না। আমার মনে হয়, আমরা পাহাড়ে ঘুরে এলে ভালো হত। কী বলেন ফেলুবাবু?
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে শুনেছিলাম দারুণ ম্যাঙ্গো লস্যি বানায়। সে দোকান থেকে লস্যি এনে দিয়েছেন হরিপদবাবু। লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে ফেলুদা বলল, "আপনি সাহারায় শিহরণ আনতে চেয়েছিলেন লালমোহনবাবু। এখন এই গরমের ঠ্যালায় কি নতুন কোন কাহিনি মাথায় চলে এলো নাকি?"
লালমোহনবাবু প্রথমেই এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে দিয়েছেন। ফেলুদার কথায় উৎসাহিত হয়ে বললেন, "আরে মশাই, আপনাকে তো সেই থেকে বলে যাচ্ছি। এত বছরের রয়্যালটি জমে আছে। কালিম্পং এর সেই বাড়িটা, মিস্টার আগরওয়াল বলেই দিয়েছেন ফেলুবাবুকে নিয়ে আসুন, ডিসকাউন্ট দিয়ে টাকা আরো কমিয়ে দেবো। আপনি তো শুনছেনই না মশাই। এই গরমে আমি আর কলকাতায় থাকতেই চাইছি না। মার্চের শেষের দিকে পাহাড়ে চলে যাবো, পুজোর মুখে নেমে আসবো”।
ফেলুদা লস্যি শেষ করে বলল, “আর আমার পসারটির ততদিনে গঙ্গাপ্রাপ্তি হোক। আপনি তেমনটাই চাইছেন তো?”
লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “আরে না মশাই। পাহাড়ে কি রহস্যের কমতি আছে নাকি? এই আগরওয়ালের মুখেই তো শোনা। বেশ কয়েকদিন হল একটার পর একটা বাড়িতে চুরি হয়ে যাচ্ছে...”
ফেলুদা বলল, “ছিচকে চোরের জন্য পুলিশ আছে। তার জন্য প্রদোষ মিত্তিরকে দরকার হয় না”।
লালমোহনবাবু মুষড়ে পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখেছো তোপসে, কোন প্রলোভনেই আমি ফেলুবাবুকে রাজি করাতে পারছি না। এই গরমে এখানে থাকার কোন মানে হয়? তুমিই বল?”
আমি ফেলুদার দিকে তাকালাম। কয়েকদিন ধরেই ফেলুদা আমাদের কারো সঙ্গেই বেশি কথা বলছে না। ওয়েস্টার্ন আর্ট নিয়ে একটা মস্ত বড় ব্লগ পেয়েছে। রাতদিন ওটাই পড়ে যাচ্ছে। আমাকে বলে দিয়েছে ক্লায়েন্ট এলে মেরিট বুঝে তবেই যেন ওর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করি। এর মধ্যে লালমোহনবাবুর বায়নায় যে ও খানিকটা বিরক্ত হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি।
তবে লালমোহনবাবুকে ফেলুদা পছন্দ করে বলে এই প্রস্তাবটা হয়তো ওকেও ভাবাচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। জোর করে লাভ নেই। যদি যেতে চায়, তবেই যাওয়া হবে, নয়তো নয়।
পর পর দু তিন বার কলিং বেল বেজে উঠলো। ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভদ্রলোকের বেশ তাড়া আছে মনে হচ্ছে। দেখ তো”।
আমি দরজা খুললাম।
প্রায় ফেলুদার সমান লম্বা এক ভদ্রলোক, ধবধবে ফরসা, বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে, কাঁচা পাকা চুল, আমাকে দেখে হেসে বললেন, “আপনিই শ্রী তপেশ রঞ্জন মিত্র, তাই তো?”
আমি ঘাড় নাড়লাম, “হ্যাঁ, বলুন”।
ভদ্রলোক উঁকি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে বললেন, “প্রদোষবাবু আছেন?”
আমি বললাম, “আছেন, তবে এখন হয়তো দেখা করতে পারবেন না”।
ভদ্রলোক মুষড়ে পড়ে বললেন, “আমার খুব দরকার ছিল”...
ভদ্রলোকের কথা শেষ হবার আগেই ফেলুদা বেরিয়ে এলো, “রাজশেখর পালিত, আপনার আর্টিকেলটা আজকেই কাগজে পড়েছি, তোপসে ওনাকে ভেতরে নিয়ে আয়”।
বুঝলাম ডোর ক্যামে ফেলুদা ভদ্রলোককে দেখে নিয়েছেন। আমি দরজা ছেড়ে দিলাম। ভদ্রলোক বিগলিত হাসি হেসে বললেন, “আমি বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি প্রদোষবাবু”।
ফেলুদা বললেন, “সেটা আমি বুঝেছি। আমার মনে হচ্ছিল বটে আপনি আসবেন। আসুন”।
লালমোহনবাবু রাজশেখর বাবুকে দেখেই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “আরে, আপনিই সেই ওয়ার্ল্ড ফেমাস এক্সপ্লোরার রাজশেখরবাবু নন?”
আমি জিভ কাটলাম। আমিই তারমানে একা ধরতে পারি নি। অবিশ্যি আমারও দোষ নেই। সকাল থেকে একগাদা ক্রসওয়ার্ড করিয়েছে ফেলুদা। বলেছে ক্রসওয়ার্ডের ধাঁধায় নাকি মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। মস্তিষ্ক ঠিক ঠাক সচল রাখা জরুরি। মোবাইল ঘাঁটারও একটা সময় বেঁধে দিয়েছে। এই ক্রসওয়ার্ডের জন্যই নিউজ ফিড দেখা হয় নি।
রাজশেখর বললেন, “ফেমাস হয়ে গিয়েই তো বিপদে পড়ে গেলাম মশাই। লাস্ট মান্থে পেরু থেকে ফিরলাম, টাইমসে আর্টিকেল লিখলাম। তারপর থেকে তিন বার আমার বাড়িতে চুরির অ্যাটেম্পট হল। কলকাতায় যাও বা সিকিউরিটি বাড়িয়ে নজরদারি বাড়ানো গেলো, মূল সমস্যা তো সেই একই থেকে গেলো”।
ফেলুদা বলল, “কলকাতার বাড়িতে তার মানে মূল্যবান তেমন কিছু নেই, তাই তো?”
রাজশেখর বললেন, “একবারে নেই তা নয়। ছোটখাটো কয়েকটা মূর্তি বাদে আমি এখানে কিছু রাখি নি। কালিম্পং এ আমার ঠাকুরদা একটা বাড়ি করে রেখেছিলেন। আমি সে বাড়িতে একটা জিনিস রেখেছিলাম। অবশ্যই সকলের অগোচরে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে সে জিনিসের মূল্য একবারেই নেই, কিন্তু কালেক্টরদের কাছে ও জিনিস অমূল্য। মিশর থেকে আনা প্যাপিরাস কাগজের উপরে আঁকা একটা ম্যাপ। আমার প্রথম কলামে আমি এই সংগ্রহের কথা বর্ণনা করি। তারপরই কলকাতায় অ্যাটেম্পট হওয়া শুরু করে। আমি অতোটা চিন্তিত ছিলাম না... কিন্তু গতকাল রাতে কালিম্পং এর বাড়িতেও...”
আমি লালমোহনবাবুর দিকে তাকালাম। কালিম্পং শুনেই লালমোহনবাবুর মুখটা যেভাবে পাল্টে গেলো, সেটা ফেলুদারও নজর এড়ালো না।
রাজশেখর বলে চললেন, “ও বাড়িতে একবার অ্যাটেম্পট হয়েছে, সামলে নেওয়া গেছে প্রদোষবাবু। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় সুযোগটা দেওয়া উচিত হবে না। আপনি যদি একবার ও বাড়ির নিরাপত্তার ব্যাপারটা সরেজমিনে দেখে আসতেন... আমার বাবা আর্মিতে ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পরে কালিম্পং এই আছেন। এবার বাবার বয়স হচ্ছে। বাবা আছে বলেই আমার চিন্তাটা বেশি। আবার আমি পুলিশকেও ঠিক ভরসা করতে পারছি না”।
ফেলুদা বলল, “আপনার উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ আছে মিস্টার পালিত, কিন্তু আমি তো নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নই। এ বিষয়ে আমি ঠিক কী অ্যাডভাইস দিতে পারি, সেটাই তো বুঝতে পারছি না”। লালমোহনবাবু হঠাৎ করে কাশতে শুরু করে দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক বলতে চাইছেন হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছেন কেন মশাই? হাসি চেপে বসে রইলাম।
রাজশেখর একটু ইতস্তত করে বললেন, “অ্যাকচুয়ালি আরেকটা ব্যাপারেও আপনার সাহায্যটা দরকার মিস্টার মিটার”।
ফেলুদা বলল, “নির্দ্বিধায় বলুন”।
রাজশেখর বললেন, “ইন্দোনেশিয়া থেকে চার পাঁচ বছর আগে আমি একটি লক্ষ্মীর মূর্তি নিয়ে আসি। প্রায় এক হাজার বছর পুরনো মূর্তি। পিওর গোল্ডের। আমি বাবাকে সে মূর্তিটা দিয়েছিলাম রাখার জন্য। আজ যখন সকালে বাবা আমাকে ফোন করেন চুরির অ্যাটেম্পটের ব্যাপারে, আমি বাবাকে মূর্তিটার কথা জিজ্ঞেস করি। বাবা বলছেন তিনি মনে করতে পারছেন না মূর্তিটা কোথায় রেখেছেন। এটা শোনার পর থেকেই আমার মাথা কাজ করছে না”।
ফেলুদা চারমিনার ধরালো। দুটো ধোঁয়ার রিং ছেড়ে রাজশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতের লক্ষ্মীর ক্রয়মূল্যটা আপনার চিন্তার কারণ, না প্যাপিরাসের ম্যাপ?”
রাজশেখর বললেন, “দুটোই প্রদোষবাবু। আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি। বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো। আপনি যদি রাজি থাকেন তবে কাল ভোরের ফ্লাইটেই... আপনি বললে আমি আপনার অ্যাডভান্সটাও ইউ পি আই করে...”
ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “আপনার আগরওয়ালকে তাহলে তৈরি হতে বলুন লালমোহনবাবু, ডিসকাউন্ট তবে আপনি পাচ্ছেনই”।
লালমোহনবাবু ঘাড় নেড়ে হাসি মুখে বললেন, “বিলক্ষণ”।
***
২
“তপেশ, পিছনের লোকটাকে দেখেছো? সিট নাম্বার ১০ ই। হাইলি সাসপিশাস!”
লালমোহনবাবু যার কথা বললেন, মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখে নিলাম।
কাঁচা পাকা গোঁফ, রিমলেশ চশমা, প্রফেসরদের মতন দেখতে। এই ভদ্রলোকের মধ্যে লালমোহনবাবু সন্দেহজনক কী পেলেন, তা বুঝতে পারলাম না।
প্লেন টেক অফ করার পর থেকেই ফেলুদা বই নিয়ে বসে আছে। মধ্যযুগের আর্ট চ্যাপ্টারটা ধরেছে। রাজশেখর বাবু আমার সামনের সিটে বসেছেন। প্লেনের মহার্ঘ্য চা খাওয়াতে চেয়েছিলেন। ফেলুদা বলে দিয়েছে একবারে বাগডোগড়া নেমেই খাবে।
আধঘণ্টা থেকে বড় জোড় চল্লিশ মিনিট লাগে। লালমোহনবাবু বর্ণিত “সাসপিশাস” লোকটিকে দেখে চোখ বুজে এসেছিল।
লালমোহনবাবুই ডেকে দিলেন। লাগেজ নেবার সময় দেখলাম সেই “হাইলি সাসপিশাস” লোকটিই লালমোহনবাবুকে দেখে চোখ কপালে তুলে বলছেন, “আরে আপনি জটায়ু না? আপনি জানেন আপনার কত বড় ফ্যান আমি? সাহারায় শিহরণ পড়ে দু রাত্তির ঘুমোতে পারি নি মশাই। কী রেঞ্জ আপনার! অসাধারণ। জাপান থেকে পেরু, ইউক্রেন থেকে ব্রেজিল... নাহ... একটা সেলফি কিন্তু মাস্ট স্যার”।
লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করতে করতে সেলফি তুলে ভদ্রলোকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আমার কাছে এসে বললেন, “ভারি মাই ডিয়ার লোক বুঝলে তপেশ। আমার সব ক’টি বই প্রকাশের প্রথম দিনই সংগ্রহ করেন”।
ফেলুদা মাস্ক পরে আছে। বেল্ট থেকে ওর ব্লু বেরি কালারের ব্যাগটা নিয়ে বলল, “আপনি কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই ঠাণ্ডা গরম বাঁধিয়ে বসবেন লালমোহনবাবু। বাইরে এই মুহূর্তে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি। কালিম্পং এও কেমন গরম পড়েছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সোয়েটারটা হাতে রাখুন”।
লালমোহনবাবু বললেন, “বলেন কী মশাই? হিমালয়ের এত কাছে এসেও গরম থেকে মুক্তি নেই?”
ফেলুদা বলল, “যথেচ্ছ গাছ কাটলে শুধু গরম কেন, আরো অনেক কিছু থেকেই মুক্তি পাবার কোন আশা দেখতে পাচ্ছি না”।
রাজশেখরবাবু তার ব্যাগটা সংগ্রহ করে আমাদের কাছে এসে বললেন, “ড্রাইভার ফোন করেছিল। এসে গেছে। পারকিং অবধি হাঁটতে হবে”।
ফেলুদা বললেন, “সেটা বলতে সংকোচ বোধ করছেন কেন? এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। চলুন”।
এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম। ফেলুদা পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি বলেছিল বটে, আমার আরো বেশি গরম লাগছিল।
রাজশেখরবাবুর গাড়িতে উঠে লালমোহনবাবু বললেন, “এহ, ভারি ভুল হয়ে গেছে তপেশ। আগে বুঝলে এতো সোয়েটার নিয়ে আসতাম না”।
এবার বুঝলাম লালমোহনবাবুর ব্যাগটা এতো ভারি লাগছিলো কেন। ফেলুদা বলল, “আপনি কি দিন পনেরোর হিসেবে রোজ একটা করে সোয়েটার নিয়ে এসেছেন নাকি?”
লালমোহনবাবু বললেন, “ওরকমই বলতে পারেন। বেশ কয়েকদিন ধরে রাইটার্স ব্লক চলছে মশাই। ঘুরলে যদি মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়। ইন্সপিরেশন পাওয়ার জন্য তাজা হাওয়া, আর আগরওয়ালের বাংলো তো আছেই। কী বলেন?” জোরে হেসে উঠলেন লালমোহনবাবু।
গাড়ি চলতে শুরু করতেই রাজশেখরবাবুর ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে খানিকটা কথা এগোতেই রাজশেখরবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি কী বেচবো, কোনটা বেচবো না, সেটা কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে ঠিক করতে হবে? ... না... না আমি বেচবো না... আর ফারদার আমাকে এই ব্যাপারে কোন ফোন করবেন না... ডিসগাস্টিং”!
ফোন কেটে দিলেন রাজশেখরবাবু।
ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “কোন কালেক্টর ফোন করলেন আপনাকে?”
রাজশেখরবাবু বললেন, “আর বলবেন না মশাই। বেশ কয়েকদিন ধরে ফোন করে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর জন্য এক কোটি টাকা অবধি দিতে রাজি আছে”।
ফেলুদা বলল, “কে সে? এদেশেরই? নাকি মিডল ম্যান?”
রাজশেখরবাবু বললেন, “এদেশেরই। বিষাক্ত মানব যাকে বলে। মগনলাল মেঘরাজ”।
লালমোহনবাবু মনে হয় বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কোন কবিতা মনে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মগনলালের নাম শোনা মাত্র হেঁচকি তুলতে শুরু করলেন। তড়িঘড়ি জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম। একসঙ্গে অনেকটা জল খেয়ে নিয়ে বললেন, “উনি কি কালিম্পংএ দেখা দেবেন নাকি?”
রাজশেখরবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আজ বিকেলেই আমাদের বাড়ি আসবেন। কী বলবো বলুন? আসতে চাইলে কি আর বারণ করা যায়?”
লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “না না, বারণ কি আর করা যায়? করা যায় না। আসুন আসুন। বারণ করা একবারেই ঠিক নয়!”
***
৩
“আপনি এবার সোয়েটার পরে নিন লালমোহনবাবু”।
তিস্তা বাজার পেরিয়ে গাড়ি পাহাড়ে উঠতে শুরু করতেই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া একটা দমকা হাওয়া জানান দিয়েছে এবার ঠাণ্ডা পড়বে। ফেলুদার কথা শুনে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, এই পাহাড়ে তিস্তা যেমন পাশে পাশে চলে, মগনলালও তেমনি সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকে কেন বলুন তো?”
রাজশেখর বললেন, “পাহাড়ের সব নদীই কিন্তু তিস্তা না। রঙ্গিত আছে, রেলি আছে। এখন তো হোম স্টের যুগ। এক একটা নদীর ধারে দারুণ সব হোম স্টে তৈরি হয়েছে। জানেন প্রদোষবাবু, আমার মাঝে মাঝে কবিগুরুর ওই কবিতাটার কথা মনে হয়। নিজের ঘরের পাশের শিশিরবিন্দুটুকু দেখতে পারলাম না এদিকে গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালাম। এই পাহাড়ে কত অসংখ্য জায়গা আছে যেগুলো এখনও অনাবিষ্কৃত হয়ে পড়ে আছে”।
ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “অনাবিষ্কৃত থাকাই ভালো। ট্যুরিস্টরা যেগুলো আবিষ্কার করছে, সেখানে প্লাস্টিক আর নোংরা ফেলে জায়গাগুলো শেষ করে দিচ্ছে। এবার সরকার বাহাদুর যদি রাস্তা চওড়া করার কথা ভেবে আবার পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানাতে শুরু করেন, তবেই চিত্তির”।
রাজশেখর বললেন, “যা বলেছেন। তিস্তা বাজারের জ্যামটা দেখলেন এখন? বাগডোগরা বা এন জে পি যেতে আজকাল হাতে সময় না নিয়ে বেরোলে দুর্গতির একশেষ হয়”।
ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “কী ভাবছেন বলুন তো? নতুন উপন্যাসের নাম? কালিম্পঙে কেলেঙ্কারি?”
লালমোহনবাবু বললেন, “আমার বেনারসের সরবতটার কথা মনে পড়ছে মশাই। এ লোকটা বার বার জেল থেকে ছাড়া পায় কী করে?”
ফেলুদা বলল, “আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? ফেলু মিত্তির তো এখনও বেঁচে আছে”।
লালমোহনবাবু জোরে হেসে উঠলেন, “ভয়? ভয় পাচ্ছি কে বললে? ভয় পাচ্ছি না”।
লালমোহনবাবু বললেন বটে, কিন্তু তার গলার জোরে সেটা বোঝা গেলো না।
ফেলুদা বলল, “আপনার কালিম্পং এর বাড়িতে চোর আসার ফুটেজটা পাওয়া গেছে রাজশেখরবাবু?”
রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। পেয়েছি। দেখে কিছু বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের বাড়ি পৌঁছলে আপনাকে দেখাচ্ছি”।
ফেলুদা বলল, “মোবাইলে আছে?”
রাজশেখর তার ফোন বের করে বললেন, “তা আছে। দেখবেন?”
ফেলুদা বলল, “দিন”।
রাজশেখর ক্লিপ বের করে দিলেন। ভ্রূ কুঁচকে ফেলুদা ক্লিপটা দেখে নিয়ে রাজশেখবাবুকে তার ফোন ফেরত দিয়ে বলল, “মুখোশ পরে এসেছে। রাজেনবাবুর ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। তোর মনে পড়ল রে, তোপসে?”
মনে পড়বে না আবার? ফেলুদার কেরামতি তো সেই প্রথম দেখেছিলাম। এসব জায়গায় বিভিন্ন বাহারি রকমের মুখোশ পাওয়া যায়। রাজশেখরবাবুর কালিম্পঙের বাড়িতে এরকম কোন মুখোশ পরেই চোর এসেছিলো।
কালিম্পং পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো। রাজশেখরবাবুর বাড়িটা বেশ বড়। মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে। সাবেকি আমলের গাড়ি বারান্দা আছে। বাগানে সবুজ লন, বিভিন্ন ধরণের ফুল ফুটে রয়েছে। বাড়ি থেকে কালিম্পং শহরটা দিব্যি সুন্দর দেখা যাচ্ছে।
লালমোহনবাবু মগনলালের কথা ভুলে মুগ্ধ হয়ে বললেন, “বাঃ। অসাধারণ! অনবদ্য! বুঝলেন ফেলুবাবু, আমাদের হুগলীর বিশিষ্ট কবি বৈকুণ্ঠ মল্লিক এই কালিম্পংকে নিয়ে লিখেছিলেন
অহো অপূর্ব অতি সুন্দর তুমি
কালিম্পং নগরী।
কলিকাতা হতে
হেরিনু তোমারে
হাতে ফুল ঝুড়ি ঝুড়ি।
কী অনবদ্য কবিতা বল তো তোপসে?”
অন্য সময় হলে হয়তো ফেলুদা এই কবিতা শুনে কিছু বলতো, এখন বলল না। বৈকুণ্ঠ মল্লিক যদি লালমোহনবাবুর মন থেকে মগনলাল মেঘরাজের মেঘ দূর করতে পারেন, তাতে ফেলুদা বাধা দিতে যাবেই বা কেন?
রাজশেখরবাবুর বাবা রুদ্রশেখরবাবু গাড়ি বারান্দায় আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। রুদ্রশেখরবাবুর উচ্চতা ছেলের থেকেও বেশি, পেটানো চেহারা, চুলে সামান্য পাক ধরেছে। ভদ্রলোক যে বেশ ফিট, তা দেখেই বোঝা যায়। ফেলুদাকে দেখে চওড়া হাসি হেসে বললেন, “আসুন আসুন প্রদোষবাবু। আমাদের সৌভাগ্য আপনি এ বাড়িতে পদার্পণ করেছেন”।
ফেলুদা ড্রইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “সৌভাগ্যটা আমাদের হওয়া উচিত। আপনি কার্গিল যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ছিলেন, সেটা কিন্তু গুগল থেকে জানতে পেরেছি”।
রুদ্রশেখর বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি আমার নাম গুগলেও সার্চ করে ফেলেছেন? অভাবনীয়”!
ফেলুদা বলল, “ইদানীং এ অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক তথ্যে মাঝে মাঝেই ভুল পাওয়া যায়। তবু প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখানো সম্ভব নয়”।
ড্রইং রুমটা ছিমছাম সুন্দর। রাজশেখর ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়েছেন। ফেলুদাকে বললেন, “চা দিতে বলি? নাকি কফি? ফ্রেশ হয়ে নেবেন না হয় তার পরে?”
ফেলুদা বলল, “চা অবশ্যই। লালমোহনবাবু অবশ্য গ্রিন টি ধরেছেন আজকাল”।
লালমোহনবাবু বললেন, “ধ্যার মশাই, পাহাড়ে এসে আবার কেউ গ্রিন টি খায় নাকি? ফার্স্ট ফ্লাশ আছে নাকি রাজশেখরবাবু?”
রাজশেখর হাসলেন, “আলবাত”।
রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স হচ্ছে তো। বাইরেটা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। রাজা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে এ বাড়িতে দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র এনে রাখে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এলেও চোর বাবাজি পালানোর পথ পেতো না। খারাপ লাগছে, ব্যাটা এলো, আর আমি বুঝতেই পারলাম না?”
ফেলুদা বলল, “আপনি ঘুমোচ্ছিলেন তখন?”
রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। কিছু বুঝতেই পারি নি। ভাগ্যে পূব দিকের বারান্দার টবটা পড়ে গেলো। ওর শব্দে উঠে বেরিয়ে দেখি ব্যাটা পাঁচিল টপকাচ্ছে”।
ফেলুদা রাজশেখরের দিকে তাকালেন, “আর দারোয়ান?”
রাজশেখর বললেন, “এ জায়গা তো নিরুপদ্রব ছিল এদ্দিন। বাবা বাহাদুরকে ছুটি দিয়েছিলেন। ওর গ্রামে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন ছিল”।
রুদ্রশেখর বললেন, “আমি কী করে বুঝবো বলুন? আমার কাছে ছুটির জন্য বলল, আমি তো ভাবতেও পারি নি এরকম কিছু হতে পারে”।
লালমোহনবাবু বসেন নি। ঘুরে ঘুরে দেওয়ালে টাঙানো ফটোগুলো দেখছিলেন। একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “ইনি ওবাবা না?”
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “ওবামা। বারাক ওবামা”।
রাজশেখর বললেন, “ওয়াশিংটন ডিসিতে আমাদের একটা প্রোগ্রামে এসেছিলেন। ভারি ভাল বক্তব্য রাখেন ভদ্রলোক”।
লালমোহনবাবু খুশি হয়ে বললেন, “মারভেলাস মশাই, মারভেলাস। আপনি তো যে সে লোক নন”।
রাজশেখর হাসলেন, “সেটা কি চোরেরা বুঝবে, বলুন?”
ফেলুদা বলল, “আপনার সংগ্রহগুলো কোথায় রাখেন?”
রাজশেখরবাবু উঠলেন, “আসুন”।
***
৪
“এমনিতে সাদামাটা জিনিস, কিন্তু কিউরিও মূল্য বহু হতে পারে, এমন অনেক কিছুই আমার কাছে আছে। এটা দেখুন, মোঙ্গোলিয়া থেকে এনেছিলাম”।
রাজশেখর বললেন।
ছোট একটা ঘড়ি। বিভিন্ন নকশা আঁকা তাতে। ফেলুদার হাতে দিলেন। ফেলুদা ভাল করে দেখে বললেন, “আপনি মঙ্গোলিয়া গেছিলেন?”
রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। বহুদিন ধরেই ও দেশটির প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। মুঘলদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ বরাবরের। তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ দেখবো না?”
লালমোহনবাবু আগ্রহী গলায় বললেন, “তা কেমন দেখলেন চেঙ্গিস খানের দেশ?”
রাজশেখর হাসলেন, “ও দেশের ক্লাইমেট স্যুট করবে না এটুকু বলতে পারি। খুব বেশিদিন থাকতে পারি নি। ওখান থেকেই মস্কো চলে গেছিলাম”।
ফেলুদা ঘড়িটা রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীর মূর্তিটা এখানেই রেখেছিলেন?”
রাজশেখর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, “ওটা আমি বাবাকে দিয়েছিলাম। বাবা বলছেন মনে করতে পারছেন না। এদিকে ওটার জন্যই আজ এ বাড়িতে মগনলালের আসার কথা। আমি তো বুঝতেই পারছি না কী বলবো”।
ফেলুদা বলল, “হতে পারে রুদ্রশেখরবাবু এসব ঝামেলা হবে জেনেই আগে থেকে কোন গোপন জায়গায় রেখে দিয়েছেন”।
রাজশেখর বললেন, “তাহলে তো বেঁচেই যেতাম। তবে এরকম হলে বাবা তো আমায় অ্যাটলিস্ট একবার বলতেন। বলেন নি বলেই বুঝতে পারছি না, কী করবো”।
ফেলুদা শো কেসের একটা ছোট মূর্তির দিকে আঙুল তুলে বলল, “এটা বোধহয় দক্ষিণভারতের নটরাজ মূর্তি, তাই না?”
রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাদুরাই মন্দিরের এক পূজারী দিয়েছিলেন”।
ফেলুদা বলল, “মগনলাল মেঘরাজ এ ঘরে না এলেই মঙ্গল রাজশেখরবাবু। ও লোক সুবিধের নয়। আপনার সংগ্রহ অমূল্য। কোনটির কিউরিও মূল্য কত হতে পারে, তা নির্ধারণ না হলেও মগনলালের মত ক্রিমিনালের চোখে এসব না পড়াই ভাল। আপনি বরং এ ঘরটা তালা দিয়ে রেখে দিন”।
রাজশেখর ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “কলাম লেখাটাই ভুল হয়ে গেছে মশাই। এদ্দিন তো দিব্যি ছিলাম। এসব ঝামেলার সামনে তো কোনদিন পড়তে হয় নি”!
ফেলুদা ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরাটা দেখে বলল, “এ ঘরে একটা ক্যামেরা আছে দেখছি। এটা ঠিকঠাক কাজ করে তো?”
রাজশেখর তার মোবাইল থেকে সিসিটিভির অ্যাপটা বের করে ফেলুদাকে দেখালেন, “এই যে। ঠিকঠাকই আছে”।
ফেলুদা বলল, “আর আপনার ওই প্যাপিরাসের ওপর আঁকা ম্যাপটা? ওটা তো এ বাড়িতেই...”
রাজশেখর তর্জনী তুলে বললেন, “এক মিনিট”।
দেওয়ালের কাছে দাঁড়ালেন রাজশেখর। দেওয়ালে একটা ছোট ক্যালেন্ডার ছিল। সেটা সরাতে একটা ছোট লকার বেরলো। লকারে কোড দেওয়ার পর লকারটা খুলে সেখান থেকে ছোট একটা বাক্স বের করলেন রাজশেখর। ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই যে সেইটি”।
ফেলুদা বাক্সটা খুলে কাগজটা টেবিলের ওপর রাখল। বিভিন্ন রঙের একটা ম্যাপ আঁকা আছে। ফেলুদা বলল, “এটার একটা ফটো তোলা যাবে?”
রাজশেখর বললেন, “নিশ্চয়ই?”
আমি ম্যাপটার ফটো তুলে নিলাম। ফেলুদা কাগজটা আগের মত বাক্সে রেখে রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীমূর্তিটা এই লকারে রাখলেন না কেন?”
রাজশেখর বললেন, “সেটাই প্ল্যান ছিল। সেদিন আমার লন্ডনের ফ্লাইট ধরার তাড়া ছিল। ড্রাইভার জানালো গোরুবাথান হয়ে নামতে হবে। রাস্তায় ধ্বস নেমেছিল। অগত্যা তাড়াহুড়ো করে বাবাকে দিয়ে...” ভ্রূ কুচকালেন রাজশেখর, “আমারই ভুল ছিল। বাবার বয়স হচ্ছে। হয়তো এ ঘরেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন... দেখা যাক”।
বৈঠকখানায় গিয়ে দেখা গেল রুদ্রশেখরের বয়সী একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। আমাদের দেখে রুদ্রশেখর বললেন, “পরিচয় করিয়ে দি, আমাদের চারটে বাড়ি পরের প্রতিবেশী অবিনাশ ভটচাজ। অবিনাশ দীর্ঘদিন ধরে কালিম্পং সদর হাসপাতালের সুপার ছিলেন। সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন”।
অবিনাশবাবু হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন, “রুদ্রর কাছে আমি আগেই শুনিচি। ফেলুবাবুর সঙ্গে আমার দেখা করার ইচ্ছে বহুদিনের। আর আমার নাতনি তো এখনও শোনেই নি যে জটায়ু কালিম্পঙে এসেছেন। শিভারিং ইন সাহারা পড়ে আমার নাতনি তো আপনার বিরাট ফ্যান হয়ে গেছে মশাই”।
লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করে আমায় ফিসফিস করে বললেন, “বোঝো কাণ্ড, জটায়ুকে আজকাল ট্রান্সলেট করে পড়তে হচ্ছে”।
ফেলুদা অবিনাশবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ বাড়িতে যে একটা চুরির অ্যাটেম্পট হয়েছিল, সেটা শুনেছেন নিশ্চয়ই”?
অবিনাশবাবু বললেন, “কী বলবো বলুন তো? আমি এতদিন ধরে এ অঞ্চলে আছি, গর্ব করে বলতাম যে বাড়ির দরজা হাট করে খুলে চলে গেলেও কেউ কিচ্ছু নিতে আসবে না। কালে কালে যে আর কত কিছু দেখতে হবে”।
অবিনাশবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়লেন।
***
৫
চা এলো। লালমোহনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন, “আহা। এতো স্বর্গ। কোন বাগান?”
রুদ্রশেখর বললেন, “লোকাল এক বাগানের। আমি নামটা জেনে নিয়ে বলবো। আমার এমন অভ্যেস হয়ে গেছে, এই চা খাওয়ার পর আমি আর অন্য কোন বাগানের চা খেতেই পারছি না, বাহাদুর দু মাস আগে এই চা নিয়ে এসেছিল। তার পর থেকে অন্য কিছু মুখে রুচছে না”।
আমি আমার ফোন বের করে প্যাপিরাসে আঁকা ম্যাপের ছবিটা একবার দেখে নিলাম। ভাষাটা কিছুই বোঝা গেলো না। কতগুলো লাল নীল দাগ এদিক সেদিক গেছে।
ফেলুদা বলল, “লালমোহনবাবু, আপনি সেদিন বলছিলেন না কালিম্পং এ কীসব ছিচকে চুরির ঘটনা ঘটেছে? মিস্টার আগরওয়াল চুরির ব্যাপারে কোন ইনফরমেশন দিয়েছিলেন আপনাকে?”
লালমোহনবাবু বললেন, “বলছিলেন বটে। ফোন করব একটা?”
ফেলুদা বলল, “থাক এখন। ওর বাড়িতে তো যাবোই। তখন না হয় কথা বলে নেবো”।
রুদ্রশেখর বললেন, “কোথায় যাবেন? আপনারা কি বেরোবেন?”
ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়ালের বাংলোটা কি কাছাকাছিই পড়বে?”
রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাইল খানেক। লাঞ্চ করে বেরোবেন কিন্তু”।
ফেলুদা মাথা নাড়ল, “নিশ্চয়ই”।
অবিনাশ বললেন, “ছিচকে চুরির ব্যাপারটা কে বলেছেন বললেন?”
ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়াল বলছিলেন। কেন বলুন তো?”
“আমিও সেরকম কিছু কথা সেদিন বাগানে গিয়ে শুনিচি। অতোটা কানে নিই নি। তবে ওই দিকের কয়েকটা বাড়িতে নাকি ইদানীং চোরের আনাগোনা বেড়েছে। যদি এই ছিচকে চোরই এদিকে আসে, তাহলে বাহাদুরকে আর ছাড়া যাবে না রুদ্রশেখর”।
চায়ে চুমুক দিয়ে অবিনাশ কথাগুলো বললেন।
রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স বাড়ছে। ঘর দোর, সোনাদানা নিয়ে অতোটা কষ্ট হয় না মশাই, ফুলের গাছগুলো নষ্ট করলে বড্ড গায়ে লাগে। এখন তো ওইটেই আমার ধ্যান জ্ঞান হয়ে গেছে। এখানে যে সব অর্কিড আমি জোগাড় করে এনে রেখেছি, তা কালিম্পঙের বড় বড় নার্সারিতেও পাবেন না। তুমি জানো তো ইয়ং ম্যান, কালিম্পঙের নার্সারিগুলো কত বিখ্যাত?”
রুদ্রশেখর আমাকে প্রশ্নটা করলেন।
আমি মাথা নাড়লাম।
রুদ্রশেখর বললেন, “সাহেবদের সৌন্দর্যবোধ প্রখর ছিল, এ কথা স্বীকার না করে পারা যায় না। মারডক সাহেবের হন্টেড হাউজে আমি এক ধরণের অর্কিড পেয়েছিলাম, কী করে সে জিনিস এখানে এলো, তা এখনও বুঝে উঠতে পারি নি”।
লালমোহনবাবু চোখ বড় বড় করলেন, “বলেন কী মশাই, হন্টেড হাউজ? ঘোউস্ট? দেখেছেন?”
রুদ্রশেখর হতাশার সঙ্গে মাথা নাড়লেন, “না মশাই। সে সৌভাগ্য হয় নি। সবাই শুধু শুনেছে। কেউই মনে হয় না দেখেছে”।
অবিনাশবাবু বললেন, “আমার ড্রাইভার বলে ও নাকি দেখেছে। তবে ওকে আমার বিশ্বাস হয় না। সন্ধ্যে হলেই ও আর এ জগতে থাকে না। কাজেই বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না”।
ফেলুদা চা শেষ করে বলল, “মারডক সাহেবের বাংলোটি কাছাকাছি?”
রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। এ পাড়াতেই”।
ফেলুদা বলল, “হন্টেড হাউজটি ঘুরে দেখবার ইচ্ছে রইলো। ভূত বাবাজির সঙ্গে দেখা হলে মন্দ হবে না”।
রুদ্রশেখর হাসলেন, “যাবেন, আমিও যাবো। প্রত্যক্ষদর্শী হবার সৌভাগ্য থেকে এ জন্মে বঞ্চিত হয়ে রইলাম বোধ হয়”।
লালমোহনবাবুর গলায় ফোন ঝোলানো থাকে। বেশ কয়েকবার ফোন হারিয়েছেন উনি। শেষমেশ ফেলুদার পরামর্শে ফোনে দড়ি বেঁধে রেখেছেন। ফোন বেজে ওঠায় খানিকটা চমকে উঠে সেটা রিসিভ করলেন, “হ্যালো... হ্যাঁ ... হ্যাঁ আমরা এসে গেছি তো... দুপুরে?... ঠিক আছে”।
ফোন রেখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগরওয়াল ফোন করেছিলেন। দুপুর তিনটে নাগাদ ওদিকটা একবার ঢু মেরে আসবো তবে?”
আমি বুঝলাম না লালমোহনবাবু মগনলালকে এড়াতে চাইছেন নাকি। ফেলুদা ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে, আমরা ঘণ্টা খানেক থেকে ফিরে আসবো না হয়”।
রাজশেখর এতক্ষণ বাইরে ছিলেন। ড্রইং রুমে এসে বললেন, “আপনাদের কোথাও যাবার হলে আমাদের গাড়িতেই যাবেন। ড্রাইভারের নাম্বার আমি টেক্সট করে দিচ্ছি। ও লোকালটা ভালোই চেনে”।
অবিনাশবাবু উঠে দাঁড়ালেন, “আমি এখন চলি। বিকেলে না হয় একবার এদিকে ঢু মেরে যাবো। নাতনিকে নিয়েও আসতে পারি। জটায়ু আছেন শুনলে খুব বায়না করবে”।
লালমোহনবাবু একগাল হাসলেন, “অবশ্যই আনবেন। লেখক মানে কী? পাঠক না থাকলে কি লেখকের কোন দাম আছে মশাই?”
অবিনাশবাবু খুঁড়িয়ে হাঁটেন সেটা এখন দেখলাম। ফেলুদাও সেটাই লক্ষ্য করল বোধ হয়। অবিনাশবাবু বেরিয়ে যেতে রুদ্রশেখরবাবুকে সে কথাই জিজ্ঞেস করলে রুদ্রশেখর বললেন, “পড়ে গেছে বলল দু দিন আগে। বয়স হচ্ছে, বুঝতেই পারেন”।
ফেলুদা “ও” বলে চুপ করে গেলো।
***
৬
লাঞ্চ সেরে রাজশেখরবাবুর গাড়িতে আমরা আগরওয়ালের বাংলোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম।
গাড়িতে উঠে আমার প্রশ্নটাই ফেলুদা করল লালমোহনবাবুকে, “আপনি কি মগনলালকে অ্যাভয়েড করতে চাইছেন নাকি?”
লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “কভি নেহি। খামোখা ভয় পেতে যাবো কেন বলুন তো? এখানে তো আমরা কোন কিছু রক্ষা করতে আসি নি। রাজশেখরবাবু কী করবেন, সেটা তার ব্যাপার”।
ফেলুদা বলল, “আমিও আপনাকে সেটাই বোঝাতে চাইছিলাম। এ ব্যাপারে অন্তত আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আপনি বরং বাংলোটা দেখুন। মগনলালকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই”।
আগরওয়ালের বাংলো কাছেই। আমাদের পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না।
গাড়ি থেকে নেমে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, আপনার কি মনে হয়, ওই গোল্ড মূর্তিটা রুদ্রশেখরবাবু হারিয়ে ফেলেছেন? অত দামী মূর্তি হারানোটা তো চাট্টিখানি কথা না মশাই! আমার তো ভদ্রলোককে দেখে মনে হল না উনি স্মৃতিভ্রম জাতীয় কোন রোগে ভুগছেন”!
ফেলুদা বলল, “আপনি বলতে চাইছেন রাজশেখর বাপের কাছে আদৌ ওই মূর্তি দেনই নি?”
লালমোহনবাবু বললেন, “সেটা আমি কী করে বলবো ফেলু মিত্তির থাকতে?”
ফেলুদা বলল, “বলে ফেলুন। পরে না হয় মিলিয়ে দেখা যাবে আপনার অনুমান ঠিক না ভুল”।
লালমোহনবাবু বললেন, “ধরুন ওই মূর্তিটা ইনসিওর করা আছে, আর তার জন্য রাজশেখরবাবুকে কোন গল্প সাজাতে হচ্ছে, এরকম কিছু হবার সম্ভাবনা আছে তো?”
ফেলুদা বলল, “বিলক্ষণ। তার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। জটায়ুর মাথা আজকাল ভালোই খেলছে দেখছি”।
লালমোহনবাবু খুব খুশি হয়ে আগরওয়ালের বাংলোর কলিংবেলে চাপ দিলেন। “আসুন আসুন মিস্টার জটায়ু, আমি আপনারই ইন্তেজার করছিলাম”।
দরজা যে খুলল, তাকে দেখে লালমোহনবাবু কেন, সম্ভবত ফেলুদাও চমকে গেছে।
আদি এবং অকৃত্রিম মগনলাল মেঘরাজ। বয়স হয়েছে, প্রায় সব চুলেই পাক ধরেছে, কিন্তু চোখ মুখের সেই ধূর্ততা এখনও একইরকম আছে।
ফেলুদা আমার কানে কানে বলল, “যেখানে বাঘের ভয় ইত্যাদি প্রভৃতি”।
লালমোহনবাবু ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “আপনি এখানে?”
মগনলাল দরজা ছেড়ে দিয়ে বলল, “আপনি ভেতরে আসেন আঙ্কেলজী। আগে বোসেন, তার পর বাকি কথা বলা যাবে”।
ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল আপনার বন্ধু?”
মগনলাল বলল, “চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড। ওর কাছে আঙ্কেলজীর কথা শুনে আমিই তো হয়রান হয়ে গেলাম। আর্থ ইজ রাউন্ড, কী বোলেন ফেলুবাবু?”
মিস্টার আগরওয়াল ড্রইং রুমেই ছিলেন। লালমোহনবাবুকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, “মগনলাল বলল আপনাকে চেনে। বহুদিনের আলাপ নাকি!”
লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করলেও আমি বুঝলাম তিনি আগরওয়ালের উপর বেশ খাপ্পা হয়ে গেছেন। মগনলালের বন্ধু কি খুব ভাল লোক হতে পারে?
ফেলুদা সোফায় বসে পড়ে মগনলালকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনি তাহলে রাজশেখরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?”
মগনলাল ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে উনি অ্যাডভাইসার রেখেছেন শুনলাম। আপনি এবারে আর আটকাবেন না মিস্টার মিটার, রাজশেখর ও মূর্তি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বেচুক, আমি চাই না”।
ফেলুদা বলল, “বেচতে নাও তো চাইতে পারে। হতে পারে ও মূর্তি ওর কাছে নেই”।
মগনলাল হাসিমুখে বলল, “ওর কাছেই আছে। শুধু ভ্যালুটা ঠিক দিতে হবে”।
ফেলুদা বলল, “আপনি এত কনফিডেন্ট হচ্ছেন কী করে?”
মগনলাল ফেলুদার প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে বলল, “আগরওয়ালের বলছে এখানে অনেক চুরি হচ্ছে। শুনেছেন তো মিস্টার মিটার?”
ফেলুদা বলল, “শুনেছি। পালিতদের বাড়িতে তার নমুনাও দেখেছি। আপনার কী মনে হয়? এ চোর বাইরের না লোকাল?”
মগনলাল বলল, “চোর সবখানে আছে মিস্টার মিটার। পলিটিকাল লিডারদের কাছে মগনলাল বাচ্চা। লিটল চাইল্ড। বঙ্গাল ভাষায় কাহাবত আছে, ঠগ বাছতে গা উজাড় হোয়ে যায়। এখন সবাই চোর। আপনি ও মূর্তি নিয়ে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে দিন। আঙ্কেলজীর জন্য বাংলো দেখুন, আমি আগরওয়ালকে বলে হেভি ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করিয়ে দিবো”।
ফেলুদা হাসল, “আপনাকে আমি বহুবার বলেছি মগনলালবাবু। আমি ঘুষ নিই না। বার বার এক কথা বলাতে বাধ্য করাবেন না”।
মগনলাল ফেলুদার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইল। আমি দিব্যি বুঝতে পারলাম, লালমোহনবাবুর প্রেশার চড় চড় করে বাড়ছে। ভদ্রলোক বেশ আগ্রহ নিয়ে বাংলো দেখতে এসেছিলেন। তার এই অবস্থা দেখে খারাপই লাগলো।
***
৭
“হামি আপনাকে বলছে মিস্টার মিটার, ওই রাজশেখর পালিত উ সব এক্সপ্লোরার টোরার কুছু না। ও সব দিখাওয়া”।
মগনলাল মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল।
ফেলুদা বলল, “এ কথা বলছেন কেন?”
মগনলাল বলল, “কম দিন তো হলো না মিস্টার মিটার। এ সব চক্করে অনেক দেশ ঘুমে নিয়েছি। আমার কথা ইয়াকিন না হয় তো আপ আগরওয়াল জি কো পুছ লিজিয়ে”।
ফেলুদা আগরওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি কি ঠিক বলছেন?”
আগরওয়াল বলল, “সবটা ঠিক বলছেন নাকি আমি জানি না, তবে রাজশেখরকে আমি দুবাইতে দেখেছি ইসমাইলের সঙ্গে। সুপারনোভা বলে একটা গ্রুপ আছে। ডার্ক ওয়েবে কাজ করে। স্মাগলিং আর দুষ্প্রাপ্য জিনিস কেনা বেচা করা ওদের কাজ। তখন অবাক হয়েছিলাম”।
ফেলুদা বলল, “আপনি ইসমাইলকে চিনলেন কী করে?”
আগরওয়াল বলল, “আমার দাদাজির কাছে শাহজাহানের আমলের কয়েকটা আশরফি ছিল। কয়েক বছর আগে আমি ফতুর হয়ে গেছিলাম। আশরফি বিক্রি করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। তখন ইসমাইল এখানে এসেছিল”।
ফেলুদা বলল, “সেকি! মগনলাল মেঘরাজ থাকতে আপনাকে কি না ডার্ক ওয়েবের শরণাপন্ন হতে হল”!
আগরওয়াল বলল, “আমরা বহুদিন ডিটাচড ছিলাম। মগন কাল ফোন করল। ইসমাইলের কথা আমিই ওকে বললাম”।
মগনলাল বলল, “এই এক্সপ্লোরারের ধুলো দিয়ে এসব লোক স্মাগলড গুডস ইমপোর্ট এক্সপোর্ট করে”।
ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল তো তার দেখার কথা বললেন। আপনি রাজশেখরকে কোথায় দেখেছেন?”
মগনলাল হাসিমুখে বলল, “সব বাত বলে দিলে কী করে হবে মিস্টার মিটার? আমি শুধু আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। ওই মূর্তি আর আমার মধ্যে আপনি থাকবেন না। তাহলেই হবে”।
ফেলুদা বলল, “আমি পরের মুখে ঝাল খাই না মগনলালবাবু। লোকের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার ধাতে নেই। আপনাকে যদি উনি বিক্রি করতে চান, তবে আমি বাধা দেবো না, সে কথা দিতে পারি। কিন্তু উনি যদি সেটা দিতে না চান এবং আপনি জোর করেন, সেক্ষেত্রে আমি কী করব, সেটা এখন কী করে বলি?”
মগনলাল মাথা নাড়ল, “খুব ভালো মিস্টার মিটার, খুব ভালো। আপনি দেখে নিন, আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করবো না। আগরওয়াল, তুমি আঙ্কেলজীকো চা দেবে না?”
আগরওয়াল কিছু বলার আগেই লালমোহনবাবু বললেন, “না না। আমি এখন কিচ্ছু খাবো না। আমার উপবাস চলছে”।
মগনলাল ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কীস চিজ কা উপওয়াস?”
লালমোহনবাবু বললেন, “বলা যাবে না”।
মগনলাল বলল, “ই তো আচ্ছি বাত নেহি আঙ্কেল। একটাই তো জীবন। না খেলে কী করে হবে?”
ফেলুদা বলল, “আমরা তবে এখন উঠি। আপনি তো ও বাড়িতে যাবেনই। দেখুন রাজশেখর রাজি হন নাকি”।
মগনলাল ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে। কথা হোবে। আঙ্কেল বাংলো কিনবেন না?”
লালমোহনবাবু দুদিকে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন, “না। কোন প্ল্যান নেই”।
মগনলাল একইভাবে ঘাড় নেড়ে বলল, “বড়ি দুঃখ কি বাত, বড়ি দুঃখ কি বাত”।
আমরা আগরওয়ালের বাড়ি থেকে বেরোলাম। বাইরে বেরিয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে লালমোহনবাবু বললেন, “বাব্বা! বাঁচলুম মশাই। কাঠমান্ডুর মত আবার চায়ে এল এস ডি দিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল নাকি কে জানে”!
ফেলুদা গম্ভীর হয়ে গাড়িতে উঠল। কোন কথা বলল না। ড্রাইভারকে বলল আমাদের কালিম্পং থানার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে। থানার সামনে বড় বাজার। মিষ্টির দোকানে সিঙ্গারা দেখে জটায়ু লোভ সামলাতে না পেরে দুটো সিঙ্গারা নিয়ে নিলেন। ফেলুদা বলল, “মগনলাল আপনাকে দেখলে নির্ঘাত জিজ্ঞেস করতো এ আপনার কেমন উপওয়াস আঙ্কেল?”
চাটনিতে সিঙ্গারা মাখাতে মাখাতে লালমোহনবাবু বললেন, “দেখেছেন মশাই, ব্যাটা আগরওয়ালকে পর্যন্ত কব্জা করে নিলো। শৈলশহরে আমার বাংলো কেনার আশা মাঠে মারা পড়লো”।
ফেলুদা বলল, “তোরা বাজারটা ঘুরে দেখ, আমি একটু থানা থেকে আসছি”।
লালমোহনবাবু দ্বিতীয় সিঙ্গারাটা সামলাতে সামলাতে বললেন, “কী বুঝছো তপেশ, মগনলাল কি সত্যি কথা বলছে? রাজশেখর কি সত্যিই ঘুঘু?”
আমি বললাম, “আগরওয়াল মিথ্যে বললেন বলে তো মনে হল না”।
লালমোহনবাবু বললেন, “এই ডার্ক ওয়েব না কী যেন বলল, সেটা কী বস্তু বল তো? এখানে কালিম্পং এ বাংলো কেনা যায়?”
***
No comments:
Post a Comment