Saturday, 29 April 2023

Syzygy

পর্ব ১ঃ প্রথম দেখা

কেদারে সিংঘনিয়ার সঙ্গে দেখা করে ধর্মশালায় ফেরার পথে ফেলুদাকে কোন অজ্ঞাত আততায়ী কাঁধে বাড়ি মেরে পালাল।ওকে আমি আর লালমেহনবাবু মিলে ধরে তুলতেই দেখলাম কাঁধে বেশ জখম। একজন ডাক্তার লাগবে শীগ্গীর। ধর্মশালায় ফিরতে মাখনবাবু বললেন পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে ডঃ ব্যানার্জির বাড়ি। শুনেই আমরা ফেলুদাকে নিয়ে রওনা দিলাম। ও অবশ্য গাঁইগুঁই করছিল কিন্তু জটায়ু যখন বললেন “যাবেন, নাকি কাঁধের ব্যথায় ভুগে কালকের ক্লাইম্যাক্সটা মিস করবেন ফেলুবাবু?” তখন রাজী হল।

ছোট্ট পাহাড়ী জায়গায় রাত নটা মানে অনেক। দুটো গলি পেরিয়ে নির্দেশমত একটা দোতলা বাড়ির একতলার দরজায় নক করতেই কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন বছর ছাব্বিশের এক ভদ্রমহিলা, মনে হল ঘুমোতে যাচ্ছিলেন, পাজামার ওপর চাদর জড়ানো।

“কিছু মনে করবেন না, বাধ্য হয়ে এত রাতে বিরক্ত করতে এলাম। আপনার বাবাকে একটু ডেকে দেবেন?” 

“আমার বাবা! তিনি তো কলকাতায়!” 

ভদ্রমহিলা অবাক।

“তবে কি আপনার স্বামী? মানে ডাঃ ব্যানার্জিকে খুঁজছি…আসলে এই ভদ্রলোকের একটু চোট লেগেছে… দেখাতে হবে।” লালমোহনবাবু বলেন।

“ আসুন ভেতরে।” ভদ্রমহিলা দরজা ছেড়ে দাঁড়ান।

ভেতরে গিয়ে দেখি বেশ বড় একটা ঘর। বেশ গোছানো। জানলার পাশে একটা ডেস্ক আর চেয়ার। তারপাশে একটা বড় বুকশেল্ফ। দূরের দেওয়ালে একটা খাট।আর কোন লোক দেখা গেল না। ভেতরের দিকের একটা দরজা দিয়ে ডাইনিং টেবলের অংশ বিশেষ আর চেয়ার দেখা যাচ্ছে।

“বসুন আপনি এই চেয়ারে..কোটটা খুলে রাখুন ঐ হ্যাঙ্গারে।”ফেলুদাকে বলেন উনি। 

“আর আপনারা ঐ মোড়াদুটো টেনে নিন” আমি আসছি। বলে ভেতরের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। বোধহয় ওঁর স্বামী ডাঃ ব্যানার্জিকে ডাকতে।

মিনিট খানেক পরে ফিরে এলেন একাই।চাদরটা খুলে এসেছেন। হাতদুটো সদ্য ধোওয়া।জামার হাতাদুটো কনুই অব্দি গোটানো।

“আপনি শার্টটা খুলুন। ইনজুরিটা দেখতে হবে..” ভদ্রমহিলা গম্ভীরভাবে নির্দেশ দেন ফেলুদাকে।

আমি ততক্ষণে আন্দাজ করেছি ব্যাপারটা..

“কিন্তু আপনার স্বামী মানে ডাঃ ব্যানার্জি…” জটায়ু এখনো বোঝেননি মনে হচ্ছে।

“স্বামী টামী নেই। আমিই ডাঃ মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি। চলবে তো তাতে?” 

জটায়ু বেকুবের মত ঘাড় নাড়েন।

ভদ্রমহিলা এত গম্ভীর কেন!

আমি ফেলুদাকে সাহায্য করতে গেলাম…ও ডান হাত প্রায় ব্যবহার করতে পারছে না। মুখের চেহারাও দেখার মত। উঠে আসতেও পারছে না কিন্তু থাকার যে বিশেষ ইচ্ছে আছে তাও মনে হচ্ছে না।

শার্ট খোলা হয়ে গেছে। ডাঃ ব্যানার্জি দেখে নিলেন একবার আঘাতটা। মুখটা আর গম্ভীর করা সম্ভব নয় ওঁর। তাও একটা চেষ্টা হল মনে হল। কানে স্টেথোটা গুঁজে বললেন

“গেঞ্জিটা খুলুন এবার।” 

কাঁধের যে জায়গায় চোট তার মধ্যিখান দিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জির হাতাটা গেছে। না খুললে যে চিকিৎসা সম্ভব নয় সেটা বুঝতে ডাক্তার হতে হয় না।

ফেলুদার ভ্রূকুটিও ম্যাক্সিমাম হয়ে গেছে। কিন্তু ওর ক্ষুরধার বুদ্ধিতে ওখান থেকে উঠে আসার কোন উপায় বের করার আগেই আমি আর লালমোহনবাবু মিলে ওর গেঞ্জিটা মাথার ওপর দিয়ে সাবধানে তুলে নিলাম।

ভদ্রমহিলা মনে হল ডাক্তার হিসেবে ভালই। চোটের জায়গাটা আর পিঠে, কাঁধে তার আশপাশটা ভাল করে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। ফেলুদা পুরো সময়টা দেওয়ালে একটা গ্ল্যাক্সোর ক্যালেন্ডার আর তার ওপর বসা টিকটিকির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।

“দেখুন, ফ্র্যাকচার কিনা বুঝতে তো এক্স রে করতে হবে। সে তো এখন হবে না। ইন দ্যাট কেস, দ্য বেস্ট আই ক্যান ডু ইজ…আপনি আসুন মিঃ..

“মিত্র। প্রদোষ মিত্র। কোথায় যাব”?

“ঐ খাটে গিয়ে শুয়ে পডুন। অন ইওর টামি। আমি দেখব শোল্ডার ব্লেডে কোনো অবভিয়াস ফ্র্যাকচার আছে কিনা…”

“কিন্তু ওটা তো পেশেন্ট বেড নয়…” ফেলুদার গলায় ভীষণ অনিচ্ছা।

“না নয়। দ্যাটস মাই ওন বেড। আ্যন্ড এই যে চেয়ারটায় আপনি বসে আছেন সেটাও পেশেন্টদের নয়। আমার পড়ার চেয়ার। এই ঘরটাও ডিসপেন্সারী নয়, আমি এখানে থাকি। এমার্জেন্সী সিচুয়েশনে বোধহয় আগে কখনো পড়েননি না? খুব সিকিওরড, প্ল্যানড জীবনে অভ্যস্ত নাকি? কি করেন আপনি, সরকারী চাকরী?”

বাপরে। ডাঃ ব্যানার্জি তো ভালই বকুনি দিতে পারেন!

ফেলুদা আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। জিনসের ওপর ব্যায়ামপুষ্ট খোলা গা আর উস্কোখুস্কো চুলে বেশ একটা র্যাম্বো সুলভ ভাব এসেছে। কাঁধের কাটাটা একটা এক্সট্রা রাফনেস যোগ করেছে। 

গটগট করে গিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ল খাটটায়। ডাঃ ব্যানার্জি কাঁধ, পিঠ টিপেটুপে, স্টেথো লাগিয়ে, হাত কতটা উঠছে এসব দেখে মনে হল সন্তুষ্ট হয়েছেন। 

“আমি শিওর ভাঙেনি। তবে চাইলে পরে এক্স রে করে নিতে পারেন। আমি প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি আ্যন্টি ইনফ্লামেশন আর পেইনকিলারের । আজকের রাতের মত আমার থেকে নিয়ে নিন। কাল কিনে নেবেন।”

চেয়ারে বসে লিখতে লিখতে বলেন ডাঃ ব্যানার্জি। 

ফেলুদা খাটেই বসে। কারণ ঘরে আর কোনো বসার জায়গা নেই।

“আপনি এখানে এসে বসুন মিঃ মিত্র। উঠে দাঁড়িয়ে বলেন উনি। একটা ব্যান্ডেজ করে দিই আর একটা মেকশিফট স্লিং..”

“না, ব্যান্ডেজ করুন। তবে নো স্লিং”।

“কেন বলুন তো?”

“কারণ স্লিং সমেত রিভলভার চালানো সম্ভব নয়, যেটা আমার কয়েকঘন্টা পরেই হয়তো লাগবে।”

এবার ডাঃ ব্যানার্জি সত্যি গম্ভীর। 

“বিকজ অফ দ্যাট হিপোক্র্যাটিক ওথ আমি সব ধরণের লোকের চিকিৎসা করতে বাধ্য। কিন্তু ইউ আর পুশিং ইট ট্যু ফার। স্মাগলিং বা গ্যাং ওয়ার যাই আপনার প্রফেশন হোক না কেন, আ্যজ এ ডক্টর আই উড রেকমেন্ড…”

“এই যে বললেন আমি সিকিওর সরকারী চাকরী করি..” র্যাম্বো এবার চান্স পেয়েছে।

“আমি কি করে জানব বলুন! রিভলবার টিভলবার..”

“আপনার শেলফে তো ভর্তি ক্রাইম থ্রিলার। গুন্ডা বদমাইশ ছাড়া সেগুলোতে কারো রিভলভার থাকে না?”

“পুলিশ নাকি আপনি? তাহলে কিন্তু রিভলভার আর সরকারী চাকরী দুটোই হল”, 

ব্যান্ডেজের জোগাড় করতে করতে এতক্ষণে ফিক করে হাসলেন উনি। বেশ দেখায় কিন্তু হাসলে। কেন যে গম্ভীর থাকেন এত জানিনা।

“আপনি কেমন পুলিশ?  লেস্ট্রেডের মত না বচ্চনের ইনস্পেক্টর বিজয়ের মত?” ব্যান্ডেজটা বাঁধতে বাঁধতে বলেন ডাঃ ব্যানার্জি।

“আরে ম্যাডাম, লেস্ট্রেড অব্দি গেলেন আর আসল লোককে ভুলে গেলেন?” জটায়ু এখন কথা খুঁজে পেয়েছেন।

“দোহাই আপনার, ম্যাডাম বলবেন না। নাম ধরে ডাকুন, ডাক্তারবাবু বলুন, বহেনজী বলুন…যা খুশী। কেবল ঐ ট্যাঁশ ফিরিঙ্গি সম্বোধনটা করবেন না।”

ফেলুদার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।ও ও পারতপক্ষে স্যর শুনতে চায় না।

“তা আসল লোক মানে…শার্লক হোমস? ডিটেক্টিভ?” ব্যান্ডেজ শেষ করতে করতে বলেন ডঃ ব্যানার্জি।

“আমার ধারণা ছিল ওটা শুধু গল্পে হয়…আপনি শার্টটা পরে ফেলতে পারেন মিঃ মিত্র।”

“গল্পেই বেশী হয়। যেমন এঁর গল্প। তবে আমি বাস্তবের..” চেয়ার ছেড়ে উঠে বলে ফেলুদা।

“উনি কি গোয়েন্দা গল্প লেখেন?”

“হ্যাঁ। ওঁর বই দেখলাম তো আপনার শেলফে। সাহারায় শিহরণ!” শার্টটা পরতে পরতে বলে ফেলুদা।

“মাই গড! আপনি লালমোহন গাঙ্গুলী? দারুণ টানটান লেখেন আপনি, ধরলে ছাড়া যায় না…”

লালমোহনবাবুর মুখে একগাল হাসি।

“তবে…কয়েকটা ফ্যাকচুয়াল এরর আছে। যেমন ধরুন উটের পাকস্থলীতে জল জমিয়ে রাখার ব্যাপারটা। ওটা ঠিক নয়। হয় কি জানেন, ওদের ঐ কুঁজের ফ্যাটটা অক্সিডাইজ হয়ে..”

লালমোহনবাবু চুপসে গেছেন, কিন্তু ওঁর হাসি ফেলুদার ঠোঁটের একপাশে সংক্রামিত হয়েছে।

***

পর্ব ২ঃ শব্দ-জব্দ

পরদিন ভোরের মধ্যেই কেদারের ক্লাইম্যাক্স ভালয় ভালয় মিটে গেছে। দেবীশংকর পুরী ওরফে মিঃ ভার্গব ধরা পড়েছেন। লালমোহনবাবু ছোটকাকাকে খুঁজে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে বহুমূল্য বালগোপাল লাভ হয়েছে। কিন্তু এত ভাল ভাল ঘটনার মধ্যে একটা বাজে ব্যাপার হল যে ফেলুদার কাঁধের চোট থেকে আবার রক্ত পড়ছে। ওরই দোষ। কয়েকঘন্টার মধ্যে একটুও বিশ্রাম না নিয়ে এইরকম ছোটাছুটি করলে আর কি হবে!

“তাহলে চল আবার ডাঃ ব্যানার্জির ওখানে, এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো।” আমি বললাম।

“আর কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না?” 

ফেলুদা বলে ওঠে।

“এই ছোট পাহাড়ী জায়গায় আবার কটা ডাক্তার পাব ফেলুবাবু? উনি দেখছিলেন এটা। ডাক্তার তো উনি খারাপ বলে মনে হল না…”

“খারাপ ডাক্তার তা আমি বলি নি। তবে…”

 ও কি নিজেও জানে প্রবলেমটা কি!

“তবে ওটা ওঁর থাকার বাড়ি, ডাক্তারখানা নয়। সেখানে এরকম বারবার গিয়ে হানা দিলে…” 

এতক্ষণে একটা অজুহাত পেয়েছে।

“আরে কতক্ষণ আর লাগবে, সেরকম হলে আমরা বাইরে দাঁড়াই, আপনি দেখিয়ে আসুন..”জটায়ু বলেন।

“না না, তার দরকার নেই। আপনারা আসুন সঙ্গে”.. চটপট বলে দেয় ফেলুদা।

“কি হল, কিছু প্রবলেম?” আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন ডাঃ ব্যানার্জি। 

“হ্যাঁ, মানে ব্যান্ডেজটা থেকে ব্লীডিং হচ্ছে..”

“সেকি? কথা নয় তো। আসুন ভেতরে।”

আজ এই সকালবেলা বিছানা টিছানা সব পরিপাটি করে তোলা। টেবলে একটা স্ক্র্যাবলের বোর্ড পাতা…অর্ধেক খেলা হয়েছে।

ফেলুদা বসল চেয়ারে।

“আসলে আপনার দোষ না, আমিই একটু বেশী স্ট্রেন করে ফেলেছি” শার্ট খুলতে খুলতে বলে ও।

“সে তো দেখতেই পাচ্ছি…সাতসকালে মারামারি করতে গেছিলেন? ডাক্তারের কথা টথা শোনার দরকার নেই…ওঃ স্যরি, মাই হ্যান্ডস আর কোল্ড।”

শেষ কথাটার কারণ হল ওঁর হাত ফেলুদার গায়ে পড়তেই ও শিউড়ে উঠেছে। 

“আসলে এইমাত্র চান করে এলাম তো!”

“দ্যাটস ওকে!” গম্ভীর গলায় বলল ফেলুদা।

আবার সেই ক্ষতস্থান পরীক্ষা, ড্রেসিং, ব্যান্ডেজ..! তবে আজ আর টিকটিকি না দেখে ফেলুদা স্ক্র্যাবলের বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল।

একবার নিজের মুখটা যখন ফেলুদার প্রায় কানের কাছে এনে উনি ক্ষতটা পরীক্ষা করছিলেন, মনে হল ওর মুখের রংটা একটু বদলে গেল…তবে সেটা আমার চোখের ভুলও হতে পারে।

“ওকে। ইটস ডান নাও। জল না লাগানোর চেষ্টা করবেন দুদিন।আপনার স্ত্রীকে বলবেন যেন স্পঞ্জ বাথ দিয়ে দেন”।

“স্ত্রী-টী নেই ।তবে আমি জল লাগাব না। থ্যাঙ্ক ইউ।” শার্ট পরতে পরতে বলে ফেলুদা।

“বেশ পোক্ত করেই ড্রেসিং করে দিয়েছি। তবে ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ ধরতে যাবেন না ক’দিন, তাহলেই হল।” বলে দেন ডাঃ ব্যানার্জি ।

“আর সিলি মিড অফে?” ফেলুদার ঠোঁটে মৃদু হাসি। ও কলেজে ক্রিকেট খেলত, তাই মেটাফোরগুলো বেশ উপভোগ করছে বুঝতে পারলাম।

“ডোন্ট বী সিলি! আই ক্যান ওনলি আ্যলাউ দ্য ডীপ মিড উইকেট!” 

ভদ্রমহিলা বেশ উইটি।

“কিছু যদি মনে না করেন , আপনি কি একা একা স্ক্র্যাবল খেলছিলেন?” ফেলুদার গলাটা এখন রিল্যাক্সড।

“হ্যাঁ । এখানে আর দোকা কোথায় পাব বলুন! তাই একাই খেলি।”

“আরে আমাদের ফেলুবাবুও তো তাই, কেউ না থাকলে একা একা স্ক্র্যাবল বা দাবা…” লালমোহনবাবু বলে ওঠেন।

“ফেলুবাবু!”

“আরে ওঁর ডাক নাম তো ঐ। ভাল নাম..”

“মিত্র! ফেলু মিত্তির! ইয়েস আই হ্যাভ হার্ড আ্যবাউট ইউ। সেই বোম্বাই এর ঘটনাটা কাগজে বেরিয়েছিল তো! 

গুড ওয়ার্ক। তারপর আপনার গার্লফ্রেন্ড ফিল্ম আ্যকট্রেস রূপার ইন্টারভিউ।”

“আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। ওটা নেহাতই ফিল্মি গসিপ। দুদিন বেরিয়েছিল এখন খবরের অভাবে চাপা পড়েছে বহুদিন। আপনি এই পান্ডববর্জিত জায়গায় না থাকলে জানতে পারতেন। আমাদের জীবন ভীষণরকম নারীবিবর্জিত।”

“ইউ সীম ট্যু বী প্রাউড অফ দ্যাট! হোয়াটস রং উইথ আস?”

“আমি বলিনি আমি প্রাউড। আই মেয়ারলি স্টেটেড দ্য ফ্যাক্ট।দেয়ার ইজ নাথিং রং উইথ এনি জেন্ডার। আপনি যেভাবে আমাকে চিকিৎসা করেছেন তারপরে তো ওকথা মুখে আনাও পাপ।”

“খালি একটা প্রশ্ন, এই যে এই ওয়ার্ডটা…syzyg-ওটা কি…?” ফেলুদা স্ক্র্যাবল বোর্ড দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে।

“ঐ ব্ল্যাঙ্কটা y. শব্দটা Syzygy”

“আ্যকচুয়েল ডিকশনারীতে আছে নাকি..?”

“তার মানে? নিজেই নিজেকে চীট করে খেলছি নাকি? সর্বভূতে ক্রিমিনাল দেখেন কি আপনি?”

“আহা, ভুল হতে পারে তো!”

“স্ক্র্যাবলে ভুল হয় না আমার মিঃ মিত্তির। মেডিক্যালে আমি অবিসংবাদী চ্যাম্পিয়ান ছিলাম।”

“ডাক্তারদের কলেজ তো! তারা আর শব্দের মাস্টার কবে থেকে? ওষুধের নাম হলে নয় হত…”

“আর আপনার আ্যলমা ম্যাটারটা..”?

“ঐ আপনার পাশেই!”

“ঠিক জানি! প্রেসি ছাড়া এরকম বিশ্ব স্নব আর কে হবে! এক হাত খেলে দেখুন না ডাক্তাররা ওয়ার্ড গেম পারে কিনা।”

“আমার ক্রিমিনাল ধরা পড়ে গেছে। এখানে ছুটি কাটাতেই এসেছিলাম। এক হাত খেলতেই পারি। কিন্তু আপনার কি কাজ নেই? আজ তো সোমবার।”

“আমি শনি রবি কাজ করি কেদারে।এনজিওর হয়ে।সোম মঙ্গল আমার ছুটি। আজ বিকেলে চলে যাব রুদ্রপ্রয়াগ। সপ্তাহের বাকী ক’দিন ওখানে থেকে কাজ করি।

“ঠিক আছে। আমরাও বিকেলে নেমে যাব রুদ্রপ্রয়াগে।ওখানে আর দুটো দিন কাটিয়ে কলকাতায়। সুতরাং আমরা একসঙ্গেও যেতে পারি।তবে আপনাকে বলা আমার কর্তব্য যে আমি কিন্তু কখনো স্ক্র্যাবলে হারিনি। কলেজে না, বাড়িতে না, বন্ধুদের সঙ্গে না। কাজেই.. “

“চ্যালেঞ্জ আ্যকসেপ্টেড মিঃ মিত্র। ওদিকে চলুন, এখানে তো জায়গা নেই। ডাইনিং টেবলে বসতে হবে। 

কিন্তু লালমোহনবাবু আর…তোমার নাম কি ভাই?”

“তপেশ। তপেশ রঞ্জন মিত্র।”

“তা ওরা কি করবেন?”

“যদি কিছু মনে না করেন তো আমি একটু ঐ চৌমাথার দিকে যাব। দারুণ আলুর পরটা করছিল কাল দেখেছি।” জটায়ু বললেন।

“আর আমি আশপাশটা ঘুরে দেখে ছবি তুলব আমার নতুন ক্যামেরায়। চলুন লালমোহনবাবু।”

আলু পরটা খেয়ে, ছবি তুলে, বাজারে ঘুরে, আমি একটা হিমাচলী টুপি কিনলাম আর লালমোহনবাবু একটা পাথরের শিব কিনলেন।

“এটাও তো আপনার আর একটা ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট হয়ে গেল লালমোহনবাবু।” পাথরের তৈরী ওজনদার জিনিসটা দেখে আমি না বলে পারলাম না।

“এটা একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট তপেশ, আর রিলিজিয়াস ইমপর্টেন্সটাতো জানই।”

আমার অবিশ্যি ওটা দারুণ কিছু ওয়ার্ক অফ আর্ট মনে হচ্ছিল না, তবে আর ঘাঁটালাম না। বললাম,

 “এগারটা বেজে গেছে , চলুন লালমোহনবাবু, ফেলুদাকে নিয়ে আসি।”

“চল। কে জিতবে বলে মনে হয় তোমার তপেশ ভাই?”

“কি করে জানব বলুন। ফেলুদা ভাল, তবে…”

“তবে টবে কিছু নেই। ভারী জাঁহাবাজ মেয়ে ঐ ডাঃ ব্যানার্জি। না জিতলেই ভাল।”

“তা বলছেন কেন? চিকিৎসা করলেন ফেলুদার। আপনার বই পড়েন..”

“হ্যাঁ আর রাজ্যের ভুল ধরেন! ফেলুবাবুকে শুদ্ধ বকুনি! জিতবে না, দেখ তুমি!”

গিয়ে দেখলাম ফেলুদার সামনে একটা শেষ হওয়া প্লেট।

“ক্যারামেল পুডিং খাওয়ালেন ডাঃ ব্যানার্জি।” ফেলুদা সাফাই দেয়।

“তা কে জিতল?” জটায়ুর প্রশ্ন।

“আমি। একবার না দু দুবার।” ডাঃ ব্যানার্জির মুখে এখন ঝকঝকে হাসি। বলেছিলাম তো পাঙ্গা না নিতে।”

“কি না নিতে?”জটায়ুর জিজ্ঞাসা।

“পাঙ্গা, পাঙ্গা! হিন্দি কি কিছুই বোঝেন না নাকি আপনি?”

“এই নিন। ক্যারামেল পুডিং। আপনাদের জন্য।আপনারা তো হেরোর দলে। তাই অন্ততঃ এটুকু করা আমার কর্তব্য।”

 জটায়ু গম্ভীর মুখে প্লেটটা টেনে নিলেন।কিন্তু মুখে প্রথম চামচটা দিয়েই ওঁর মুখের চেহারা বদলে গেল। অসম্ভব ভাল খেতে।

“বাই দ্য ওয়ে, এটাতে কিন্তু আপনার সই চাই।”সাহারায় শিহরণ বাড়িয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা।জটায়ুর মুখে এবার অনাবিল হাসি।

***

পর্ব ৩ঃ ভানু গোয়েন্দা জহর আ্যসিসট্যান্ট

রুদ্রপ্রয়াগে আমরা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খাচ্ছিলাম। ডাঃ ব্যানার্জিও আমাদের সঙ্গে আছেন। আমার সঙ্গে এখন দারুণ ভাব হয়ে গেছে…মণিদি আর তুমিতে নেমে এসেছি। কারণ ওঁর কাছে ‘ডার্কসাইড অফ দ্য মুন’ ক্যাসেটটা দেখেই আমি ধার চাইলাম আমার ওয়াকম্যানের জন্য। দেখা গেল উনিও পিঙ্ক ফ্লয়েডের ভক্ত। লেখাপড়া নিয়েও অনেক কথা হল।

“কোন সাব্জেক্ট ফেভারিট তোমার, তপেশ?”

“ফিজিক্স। ম্যাথও ভাল”।

“তাহলে কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি খারাপ লাগে, তাই  তো?” হেসে জিজ্ঞেস করে মণিদি।

“হ্যাঁ। ঐ মানে…তুমি জানলে কি করে ?”

“এরকমই হয়।ইলেভেনে পড়ে আমার মামাতো বোন পুকাই, তারও তাই… হাসলে যে?”

“না, আসলে ঐ…পুকাই নামটা…”

“আর তোমার দাদা যে তোমাকে তোপসে বলেন সে বেলা? পুকাই-এরও ভাল নাম আছে, রূপমঞ্জরী ।”

“বাবা! আপনাদের বাড়ির মেয়েদের নামের তো খুব ঘটা! আপনারা কি জুতোর নাম দেন অবিমৃষ্যকারিতা, ছাতার নাম প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আর বাড়ির নাম কিংকর্তব্যবিমূঢ”? জটায়ু বলে উঠলেন।

“আর আপনার কি মেসোর নাম তকাই, শ্বশুরের নাম বিস্কুট”? মণিদিরও সুকুমার রায় ঠোঁটস্থ।

“শ্বশুর তো নেই, ডাঃ ব্যানার্জি। আমি, ফেলুবাবু সবাই ব্যাচেলর। তপেশের বয়স কম, এখনো সময় আছে তাই ওকে ওদলে ফেললুম না।”

“তা আপনাদের দুজনের কি সময় গেছে নাকি?”

“আমার সময় কোনদিনই ছিল না। ফেলুবাবুর কথা উনিই জানেন। কি মশাই?”

ফেলুদা অবশ্য জটায়ুর প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। তার বদলে একটা চারমিনার ধরিয়ে বলল,

“আমার শরীরটা ঠিক জ্যুৎ নেই বলে হারলাম।” 

বেচারা! উপুর্যপরি দুবার স্ক্র্যাবলে হারের কথাটা ভুলতে পারছে না।

“জীবনে শুনিনি লোকে কাঁধে ব্যথা বলে স্ক্র্যাবলে হারে। তাও দু বার।” মণিদি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল।

“ওষুধগুলোর এফেক্ট আছে তো!”

“কি নেপ্রক্সেন আর প্যারাসিটামল? এতে আপনার ব্রেন ফাংশন গুলিয়ে গেল! মেডিসিনে নবদিগন্ত খুলে যাবে এই আবিষ্কারে।”

“ভোরে উঠে ছুটতেও হয়েছিল ক্রিমিনালের পেছনে। যদি কাল একবার চান্স পেতাম তো…”

ঠিক শুনছি কি! ফেলুদা আবার একবার ওঁর ওখানে যেতে চায়। তাও কোনো ডাক্তারী কারণে না, স্ক্র্যাবল খেলতে! আঁতে লেগেছে মনে হয়।

“বেশ বারবার তিনবার হয়ে যাক। আপনার বুদ্ধির তো খুব প্রশংসা চারিদিকে। তৃতীয়বার হারলে মুচলেকা লিখে দেবেন। আমি বাঁধিয়ে রাখব।”

“আগে তো হারি!”

“ওহো! কিন্তু কাল যে…মণিদির কিছু মনে পড়েছে।

“কি ভয় পেয়ে গেলেন? পরাজয় স্বীকার করে নিতে

পারেন। ওয়াক ওভার দিয়ে ।”

“হ্যাঁঃ। মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি ভয় পায় এমন শর্মা এখনো জম্মায়নি, বুঝলেন মিত্তির মশাই! কাল দুপুরে আমি একবার পাহাড়ে চড়তে যাব ভাবছিলাম তাই…”

“ও, তাই ঘরের কোনে ঐ মাউন্টেনিয়ারিং বুটগুলো দেখছিলাম। আমারি তো লোভ হচ্ছে মশাই আপনার সঙ্গে ঝুলে পড়ার।”

“একেবারেই না। কাঁধের এই অবস্থায় পাহাড়ে চড়তে আমি আপনাকে আ্যলাউ করতে পারি না ডাক্তার হিসেবে। শেষে যদি আমার ওপর পড়েন তো আমিই ছবি হয়ে যাব।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক। পাহাড়ে আর চড়তে হবে না। যথেষ্ট চড়েছি গত ক’দিনে।” জটায়ু বলে দেন।

“ক’টায় বেরোবেন কাল?” ফেলুদার প্রশ্ন

“এই দশটা নাগাদ। “

“যদি আমি আটটায় যাই তাহলে একদান খেলা যাবে তো?” 

ওরে বাবা। এতো উৎসাহ! হেরে গিয়ে খুব মানে লেগেছে বোধহয়।

পরদিন দশটা নাগাদ ডাঃ ব্যানার্জির বাড়ি গিয়ে দেখলাম উনি হাসিমুখে বেরোচ্ছেন পাহাড়ে চড়ার জন্য রেডি হয়ে। মুখ দেখলেই বোঝা যায় উনি জিতেছেন।

যেটুকু সন্দেহ ছিল সেটুকুও উনি মাথার ওপর দুহাত তুলে নাচের ভঙ্গিমা করায় ঘুচে গেল।

“সে কি আবার হেরে গেলেন ফেলুবাবু?” 

জটায়ুও বুঝেছেন।

“হি হি! আমি তো আগেই বলেছিলাম! আজ তো আর ক্যারামেল পুডিং নেই, তবে দুঃখ করবেন না, এই নিন ম্যাঙ্গো ড্রপস লজেন্স।”

একগাল হেসে লজেন্স সমেত হাতটা বাড়িয়ে দেন ডাঃ ব্যানার্জি।

যাকে দেওয়া হল সে যে হেরে বিশেষ দুঃখিত তা মনে হল না অবিশ্যি। কিন্তু একটা লজেন্স মুখে দিয়েই ফেলুদার মুখটা অদ্ভুত হয়ে গেল।

“কি, পছন্দ নয় ফ্লেভারটা?” মণিদি জিজ্ঞেস করল।

“কি রকম একটা…ঠিক আপনার শ্যাম্পুর মত গন্ধ।”

ডাঃ ব্যানার্জি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন। 

আমি আর লালমোহনবাবু চুপ।

“না মানে আপনার বিছা-আ-নায়…আই মীন বা-বালিশে ..মা-মানে সেদিন কেদারে চেকআপের সময়…আমার ঘ্রাণশক্তি আসলে বেশ …”

কোনোদিন ফেলুদাকে এত তোতলাতে দেখিনি তো!

“হ্যাঁ, আমি ক্লোরানে ম্যাঙ্গো শ্যাম্পু ব্যবহার করি। আপনার নাক তো দারুণ…আমার বাচ্চাটার মত প্রায়।” মণিদি আবার সহজ।

“আপনি যে বললেন আপনি ব্যাচেলর। তাহলে বাচ্চা?” লালমোহনবাবু বলে উঠলেন।

“কে বলেছে মশাই বিয়ে করতেই হবে বাচ্চা পেতে গেলে? একটা মেয়ে যদি চায় তাহলে সে মা হতেই পারে। দ্যাটস হার প্রেরোগেটিভ। থিংকিং আদারওয়াইজ ইজ রিগ্রেসিভ। আপনি নীনা গুপ্তা আর ভিভ রিচার্ডসের কথা শোনেননি?” এক নিঃশ্বাসে বলে যান উনি।

“আপনার তো মশাই ভিভ রিচার্ডসও নেই, বাচ্চাও নেই…শুধু শুধু কেন তর্কগুলো করছেন”?

ফেলুদা বলে উঠল।

“কি করে জানলেন নেই”?

“দেখলেই বোঝা যায় কার কতদূর দৌড়। ভিভ রিচার্ডস! বাচ্চা বলতে কি পালিত কুকুর নাকি বেড়াল? কুকুরই হবে। নাক ভাল যখন।”

“হ্যাঁ কুকুর। হল তো! কি মহান ডিটেক্টিভ! সরুন এখন আমার ট্রেকিং এর দেরী হয়ে যাবে।”

“ফিরছেন কখন?”

“এই চারটে নাগাদ..”

“তো আজ রাতে ডিনারটা আমাদের সাথে করলে অসুবিধে আছে?”

“না, অসুবিধা আবার কিসের! সন্ধেবেলা এসে হোটেল থেকে ডেকে নেব আপনাদের।” বলে রওনা দিল মণিদি।

ফেলুদা তো দেখছি ওঁর সঙ্গে সময় কাটানোর কোন সুযোগই ছাড়তে রাজী নয়!            

“তা ফেলুবাবু, ডাঃ ব্যানার্জির সঙ্গে আপনার বেশ ভাব হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।”

 জটায়ু বলে উঠলেন মণিদি বিদায় নেবার পর। ওঁরও নিশ্চয় একই কথা মনে হয়েছে।

“ভাব বলতে যদি মীন করেন বন্ধুত্ব তবে নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু যদি অন্যকিছু দ্ব্যর্থবোধক ইঙ্গিত করেন তো ডেফিনিটলি না। শী ইজ গুড কম্পানি, দ্যাটস অল।”

                   ——————

সারাদিন আশপাশের জায়গাগুলো বেড়িয়ে এসে বিকেলে আমরা হোটেলের লবিতে বসে গল্প করছিলাম। মণিদির একক্ষণ এসে পড়ার কথা। 

“ভুলে যাননি তো আবার উনি”, সবে বলেছেন জটায়ু এমন সময় ঝড়ের মত এসে হাজির হল মণিদি…

“মিঃ মিত্র আমার বাচ্চাটাকে না কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না!”

“তা ওরা স্বাধীন জীব তো, গেছে কোথাও…”

“কি করে যাবে বেশীদূর? ওর একটা ঠ্যাং ভাঙা তো! কাছাকাছিই থাকে। আমি খেতে না দিলে মরেই যেত ! রোজ বিকেলে ব্রীজের কাছেই বসে থাকে, আমি পাঁউরুটি দিই তো! যখন কেদারে থাকি পাশের চায়ের দোকানদার ওকে খেতে দেয়। পয়সা দিয়ে বলা আছে ওকে।কাল রাত অব্দি ছিল। এখন গায়েব।”

“তা আপনি কি আমাকে আ্যপয়েন্ট করতে চাইছেন? কুকুর খুঁজতে?” 

ফেলুদার মুখ গম্ভীর কিন্তু চোখ হাসছে!

“না না সে কি! আপনি এত বিখ্যাত গোয়েন্দা…আপনি কেন করবেন এসব…কিন্তু কি যে করি …খুঁজলাম চতুর্দিক!” ডাঃ ব্যানার্জির মুখটা করুণ।

“সে তো বুঝলাম, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আপনি চান যে আমি তদন্তটা করি কিন্তু সোজাসুজি বলতে লজ্জা পাচ্ছেন!”

“ওসব লজ্জা টজ্জা আমার আসে না মিঃ মিত্তির। কিন্তু ভয় হয় আপনার ভক্তবৃন্দ তেড়ে আসবেন ফেলু মিত্তিরকে দিয়ে কুকুর খোঁজালে।”

“হুম! তবে লজ্জা নয়, ভয়! কিন্তু শোনেননি, ঘৃণা, লজ্জা, ভয়…তিন থাকতে নয়?”

“হ্যাঁ কিন্তু আপনার ভক্তরা…”

“তা ভক্তরা আমায় ভালবাসে কিনা, ওরা তো ওরকম ভাবতেই পারে। না বললেই তো হল ওদের। হোয়াট হ্যাপেনস ইন রুদ্রপ্রয়াগ, স্টেস ইন রুদ্রপ্রয়াগ!

চলুন তবে, একটু তদন্ত করে আসি।”

“না না, আপনি কেন এ রকম তুচ্ছ ব্যাপারে…”

“আপনার কাছে তুচ্ছ কি ব্যাপারটা?”

“তা নয় তবে..”

“তবে টবে আর কিছু নেই। তাছাড়া সেদিন চিকিৎসার পরে ফিজটাও নেননি। তারওপর ক্যারামেল পুডিং। ফলে কৃতজ্ঞতার ভারটাও একটু নামানো দরকার। আপনি একটু বসুন এখানে,আমরা ঘরে গিয়ে গরম জামা পরে আসি তারপর চলুন দেখাবেন কোথায় বাসস্থান ছিল আপনার সারমেয়টির।”

***

পর্ব ৪ঃ হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়

“কি মশাই? শেষে কুকুর হারানোর কেস? তা আবার তিন ঠেঙে রাস্তার কুকুর! আপনার একটা ইজ্জৎ নেই? ভানু গোয়েন্দা জহর আ্যসিসট্যান্টেও তো ওরা গরু চুরির কেস নিল না। আর আপনি এই দুদিন আগে এখানেই এতবড় একটা কেস সমাধা করে কিনা…”

ঘরে যেতেই বললেন জটায়ু। ভীষণ অফেন্ডেড হয়েছেন।

আমারও মনে হচ্ছিল একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। কি যে হয়েছে ফেলুদার কে জানে!

“কেন লালমোহনবাবু? পাখি চুরির কেস নিই নি আমি? সাধু সাবধান!” ফেলুদার যুক্তি অকাট্য।

“আহা সে তো পরে অন্য রকম দাঁড়াল…”

“এখানে তেমন হবে না আপনি জানেন?”

“না তা নয়, তবে ভাবলুম…মানে আপনি ঐ ডাঃ ব্যানার্জির জন্য একেবারে…মানে স্ক্র্যাবলে হারলেন ইচ্ছে করে, তারপর আবার এই কুকুরের কেস…”

“কে বলল আমি ইচ্ছে করে হেরেছি? খেলেছেন কখনো স্ক্র্যাবল বা দাবার মত মাইন্ড গেম? খেললে বুঝতেন ওতে হারার চেয়ে হাজারগুণ বেশী খারাপ হল অযোগ্য প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে খেলা! শিশু তো নন উনি যে জিতিয়ে দিতে হবে! 

        তাছাড়া এটা কি লুডো যে দুটো খাবার ঘুঁটি না খেলেই জিতে যাবেন উনি! ক্যাট ম্যাট ধরণের বালখিল্য শব্দ গড়লে বুঝবেন না উনি? ওঁর মাথায় যে নেহাৎ গোবর পোরা তেমন ভাবার কোন কারণ আছে কি? আ্যদ্দিনে আপনার সঙ্গে খেলেছি কি একবারও? উপযুক্ত প্রতিপক্ষ ছাড়া ফেলু মিত্তিরের মস্তিষ্ক পুষ্টি হয় না, বুঝলেন?”

“বুঝলুম ফেলুবাবু। এখন চলুন দেখি এই তিন ঠেঙে কুকুরের কেস কোন রোমহর্ষক দিকে মোড় নেয়।”

“কি ব্রীড ছিল আপনার কুকুরের?” 

মেইন রোডের দিকে যেতে যেতে প্রশ্ন করল ফেলুদা।

“কুকুর কুকুর করবেন না মিঃ মিত্র। ও আমার…”

“তা নাম দিয়েছিলেন কিছু ওর?”

“হ্যাঁ । ভাল নাম হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়—ওকি, আপনি হাসলেন নাকি মিঃ গাংগুলী?”? 

পেছনে “খিঁক” শুনে বললেন ডাঃ ব্যানার্জি ।

“না না। হাসব কেন? হাসার কথা  নাকি! আমার হেঁচকি উঠল বলেই তো..”

“আর ডাকনাম!”? 

ফেলুদা যে কি করে না হেসে আছে কে জানে। আমার তো পেট ফেটে যাচ্ছে।

“ডাকনাম হালুম।”

“তা এই হালুমের বংশ পরিচয় কিছু জানেন? না মানে এখন উনি ব্যানার্জি পরিবারভুক্ত ঠিকই, তবে জন্মসূত্রে ঠিক কি?”

“জার্মান শেপার্ড। ইফ দ্যাটস হোয়াট ইউ আর আস্কিং!”

বলতে বলতে আমরা ব্রীজের পাশে এসে গেছি। ব্রীজের নীচের একটা খোঁদল মত দেখিয়ে মণিদি বলল,

“ওখানেই থাকত হালুম! আমি ভেবেছিলাম বাড়িতে নিয়ে আসব। কিন্তু বাড়িওয়ালা রাজী না। তার ওপর আমি সারাদিন থাকি না, কে দেখবে ওকে। তারপর আবার দুদিন পরে দার্জিলিং চলে যাব..”

“আপনি দার্জিলিং চলে যাবেন? চাকরী নিয়ে?” জটায়ু শুধোন।

“হ্যাঁ । ওখানে আ্যপ্লাই করেছিলাম,হয়ে যাবে মনে হয়। আসলে আমার পাহাড় ভাল লাগে বলে খালি এসব জায়গাতেই খুঁজি।”

ব্রীজের পাশে একটা ছোট্ট গুমটি চায়ের দোকান। সেটার দোকানদার দেখলাম মণিদিকে চেনে। 

“আরে বহেনজী, ও কুত্তা আভি মিলা নেহি ক্যায়া আপকো?”

“নেহি ভাইসাব। আজ শুভেসে উসকো নেহি দেখা আপনে, হ্যায় না?”

“নেহি বহেনজী। পাতা নেহি কাঁহা গয়া, আ্যয়সে তো রোজ আ যাতা হ্যায় খানে কে লিয়ে। শান্তি সে বৈঠা রহতা হ্যায়। মগর কাল রাতকো, জব ম্যয় দুকানকে অন্দর শো রাহা থা তো বহৎ ভোঁক রাহা থা। ম্যয় শোচ ভি রাহা থা কি যাকে দেখুঁ ক্যায়া হ্যায়…লেকিন সর্দি ইতনি থী…অউর থোড়ি দের বাদ তো চুপ ভি হো গয়া।”

ফেলুদা ইতিমধ্যে ঢালু দিয়ে নেমে ঐ খোঁদলের পাশে চলে গেছে। আমরাও ওর কাছে গেলাম।

“ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নেই আপনার?” মণিদির প্রশ্ন।

“ কেন তাছাড়া ঠিক গোয়েন্দা গোয়েন্দা লাগছে না?” ফেলুদা চারপাশটা দেখতে দেখতে বলে।

“ভাববেন না, দরকার লাগলে সব পাওয়া যাবে, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, রিভলভার…তবে আপাততঃ…”বলে আশপাশের মাটিতে মন দিয়ে কি যেন দেখতে দেখতে হঠাৎ উবু হয়ে বসে একটা মাঝারি গোছের পাথরের ওপর তর্জনী বুলিয়ে কি যেন তুলে আনল।

মণিদি এতক্ষণ চোখ গোল গোল করে সব কিছু দেখছিল। ওর দিকে আঙুলটা বাড়িয়ে দিয়ে ফেলুদা বলে

 “কি, কিছু বুঝতে পারছেন?”

খপাৎ করে ওর আঙুলটা ধরে মণিদি নিজের চোখের কাছে এনে ভুরু টুরু কুঁচকে দেখল খানিক্ষণ।

“টেস্ট না করলে তো বুঝতে পারব না, তবে টেক্সচার আর কালার যা দেখছি তাতে মনে হয়…”

“হুম। যা ভাবছেন তাই।টেস্ট না করলেও বুঝতে পারছি আমি”। 

আঙুলটা মণিদির কবল থেকে ছাড়িয়ে নিজের নাকের কাছে নিয়ে বলল ফেলুদা।

“খুব হাল্কা কোকোর গন্ধ।ভেরী ফেইন্ট।বললাম না, আমার ঘ্রাণশক্তি খুব প্রখর!”

“ওহ্, তার মানে কি…”

“ইয়েস ডাঃ ব্যানার্জি। আপনার হালুম মনে হচ্ছে স্নিফার ডগ ছিল। জার্মান শেপার্ড বললেন তো, তাই না! এল কি করে এখানে! কতদিন ধরে এখানে ছিল জানেন?”

“মাস তিনেক হবে। একটা পা খুব ইনজিওরড ছিল। এখানে তো সেরকম ভেট টেট নেই। আমিই একটু দেখাশোনা করে অনেকটা সারিয়েছিলাম।”

“ইন্টারেস্টিং! স্নিফার ডগ, জার্মান শেপার্ড এভাবে রাস্তার ধারে…”

“ঐ সাদা গুঁড়োটা কি ফেলুবাবু?” জটায়ু বলে ওঠেন।

“কোকেন। মনে হয় কাল রাতে এখানে কিছু ডেলিভারি হচ্ছিল যেটি হালুমবাবু টের পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে ধরতে যায়।”

“ধরতে যায় বুঝলেন কি করে?”

“কারণ এই পড়ে থাকা গুঁড়ো। আরো কয়েক জায়গায় আছে আশপাশে।হয়ত প্যাকেট কামড়েছিল হালুম। আর ঐ দেখুন ঐ ঘাসে…দু ড্রপ রক্ত.”

“সেকি? হালুমের রক্ত নাকি!”

“ঐ রক্তের ফোঁটা সম্ভবতঃ ড্রাগ পেডলারদের। হালুমচন্দ্র বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়েননি। হাজার হোক সম্রাট হর্ষবর্ধনের নামে নাম তো!”

“কিন্তু ও গেল কোথায় বলতে পারেন?”

“সে তো বলা মুশকিল ডাঃ ব্যানার্জি । হয়তো ওকে কাবু করে ধরে নিয়ে গেছে। শুনলেন না, চায়ের দোকানী বলল চিৎকারটা হঠাৎ থেমে গেল!”

“ঈশ! মেরেই ফেলেছে বোধহয় হালুমটাকে”।

কেঁদে ফেলবেন নাকি ভদ্রমহিলা ! 

“আমি বাড়ি যাই মিঃ মিত্তির। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।” হঠাৎ উল্টো দিকে হাঁটা লাগালেন উনি।

“আরে, আরে! দাঁড়ান, দাঁড়ান! কোথায় চললেন? ডিনার খাবেন না?”

“আপনারা যান। আমার খিদে নেই।”

“এভাবে আহার নিদ্রা ত্যাগ করলে তো কোনো লাভ হবে না। তারচেয়ে চলুন কিছু খেয়ে নিই সবাই মিলে। পেটটা ভরা থাকলে দেখবেন আইডিয়া আসবে মাথায়।”

“হ্যাঁ মণিদি চল। তোমার থেকে আমার বেঞ্জিন রিং এর স্ট্রাকচারটা বোঝার আছে।”

“চলুন ডাঃ ব্যানার্জি, আমার পরের গল্পের প্লটটা একটু বলি আপনাকে। এটা ভাবছি একদম মাসাইমারায় ফেলব…সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, ভিক্টোরিয়া ফলস…”জটায়ু উৎসাহ দেন।

“ওটা মাটেরুনি ফলস হবে লালমোহন বাবু “, মণিদি ফোঁৎ করে নাকটা টেনে ধরা গলায় শুধরে দেয়। 

ফেলুদার মুখটা দেখতে পেলাম না, কারণ তক্ষুণি ও হাত মুঠো করে একটা ছোট্ট কাশি আড়াল করল।

রেসট্যুরেন্টে গিয়ে মণিদি শুধু একটু স্যুপ খেল। কথাবার্তাও হুঁ হাঁ দিয়ে চালিয়ে দিল।

“আপনি তো এনজিওর হয়ে ডাক্তারী করেন। পেশেন্টদের মধ্যে ড্রাগ প্রবলেম দেখেন?” ফেলুদা অবশেষে একটা চারমিনার ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“বিনি পয়সায় চিকিৎসা করাতে আসে যারা তারা সব গরীব লোক। কোকেনের পয়সা কোথায় পাবে? নেশার সমস্যা আছে, কিন্তু সেগুলো ঐ বাংলা চোলাই জাতীয়। 

তবে একবার আমার ডাক পড়েছিল সরকারী হাসপাতালে, একটা সার্জারীর জন্য…এখানে তো সার্জন অত আ্যভেলেবল নয়, তাই ওরা অনেক সময় আমাদের হেল্প নেয়। তো সেটা ছিল একটা ড্রাগ মিউলের কেস।”

“ড্রাগ মিউল আবার কি ফেলুবাবু? খচ্চড় ড্রাগ বয়ে আনে নাকি?”

“না লালমোহনবাবু, পশুতে নয়। মানুষে বয়। গরীব মানুষকে সামান্য পয়সার লোভ বা ভয় দেখিয়ে এই কাজ করানো হয়। তাদের ছোট ছোট ড্রাগ ভর্তি প্লাস্টিকের পোঁটলা গিলিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া যায়। ঐ লোকগুলোই তখন চলমান ড্রাগবাহক বা মিউল। এভাবে এক এক জন মিউল কোটি টাকার কোকেন ক্যারি করতে পারে।”

“কি সাংঘাতিক! কিন্তু পেটে তো আ্যসিড থাকে মশাই।ঐ প্লাস্টিকের পোঁটলাগুলো ফেটে টেটে যায় না?”

“এমন জিনিস ব্যবহার হয় যাতে তা না হয়। কারণ ফেটে গেলে মিউল মরবে তো বটেই, কিন্তু কোটি টাকার কোকেনও বরবাদ হবে। তাই ঠিকঠাক মেটিরিয়ালের পাউচ বানানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। গুড কোয়ালিটি ল্যাটেক্স, প্রেফারেবলি মাল্টি লেয়ার্ড, লো পারমিয়াবিলিটি…” 

“এত স্বত্ত্বেও সে রকম দুর্ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে বই কি! ঐ মিউলের তখন প্রাণ সংশয়…হেভি ড্রাগ ওভারডোজে। সেকরমই হয়েছিল এখানে ক’দিন আগে। সরকারী হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল একজনকে। তারই এমার্জেন্সী গ্যাস্ট্রিক সার্জারীতে সাহায্য করতে আমার ডাক পরে।” মণিদি বুঝিয়ে বলে।

“যে লোকটির অপারেশন হয়েছিল তার নামধাম পাওয়া যাবে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।

“তা আমি গিয়ে হাসপাতালে চাইলে ওরা দেবে মনে হয় আমাকে।”

“তাহলে চলুন হাসপাতাল” ফেলুদা উঠে বলল।

“কিন্তু এত রাতে?”

“তাতে কি? হাসপাতাল তো! ২৪ ঘন্টা খোলা।”

হাসপাতালে গিয়ে কিন্তু কোন লাভ হল না। লোকটিকে কেউ হাসপাতালের সামনে ফেলে গেছিল। সেরে যাবার পর পুলিশ এসেছিল। কথা ছিল পরদিন এসে জেরা করবে। কিন্তু তার আগেই লোকটি পালায়। এই সরকারী হাসপাতালে সিকিউরিটি এমন কিছু কড়া না, কোন ওয়ার্ডবয়কে কিছু টাকা দিয়ে পালানো কিছুই নয়। লোকটি নিজের নাম বলেছিল মোহন, এর চেয়ে বেশি কিছু জানা গেল না।

“আপনি বাড়ি যান ডাঃ ব্যানার্জি। আমি ভেবে দেখছি কি করা যায়।” ফেলুদা অবশেষে বলল।

“হ্যাঁ সে তো যেতেই হবে। আপনিও হোটেলে ফিরে যান। অনেক করেছেন আপনি, আর ঝামেলায় জড়াবেন না। আপনার সোল্ডার ইনজুরি এখনো পুরো সারে নি।”

বলে মণিদি বিদায় নিল।

***

পর্ব ৫ঃ শিবতীর্থ

ফেলুদা কিন্তু হোটেলে না ফিরে ঘুরল বাজারের দিকে।

“আপনি কি মশাই আবার তদন্ত করার তালে আছেন? এবার ক্ষ্যামা দিন তো। এখনো পুরো সারেননি আগের জখম থেকে, একটা কুকুরের জন্য…ডাঃ ব্যানার্জিও তো বললেন ছেড়ে দিতে।”

“এটা কিন্তু আর কুকুরের নেই লালমোহনবাবু, কোকেনের মামলা হয়ে গেছে। যাকগে, আপনারা হোটেলে যান, আমি ঐ ওষুধের দোকান থেকে  আরো ক’টা পেইনকিলার কিনে নিয়ে আসছি। মিনিট পনেরর বেশী লাগবে না।”

হোটেলে ফিরে আমাদের ঘরে বসে গপ্প করতে করতে আমি আর জটায়ু যখন এক ঘন্টা কাটিয়ে ফেলার পরেও ফেলুদা ফিরল না, তখন চিন্তা হতে লাগল।

“তোমার দাদার এই ব্যাপারটা না ফ্র্যাঙ্কলি ভেরি ইরিটেটিং তপেশ।” জটায়ু ভুরু টুরু কুঁচকে বললেন।

“দেখি আর আধঘন্টা মত, নাহলে…”

“না হলে কি করবে বলতো তপেশভাই?”

“জানিনা। মাথায় আসছে না কিছু। একবার মণিদিকে..”

“না না, এই রাত বিরেতে, এটা তো কোন ডাক্তারী কেসও নয়। তারচেয়ে বরং পুলিশের কাছে..”

“পুলিশের কাছে কি হবে লালমোহনবাবু?”

 ফেলুদা ফিরেছে।

“এই তোমার পনের মিনিট? ওষুধ কিনতে ক ঘন্টা লাগে ফেলুদা?”

“আরে ওষুধ কিনতে গিয়েই তো অযাচিত ভাবে একটা ক্ল্যু পেয়ে গেলাম। ফলে সেটার একটু তদন্ত না করে তো আর আসা যাচ্ছিল না।”

“কিসের ক্ল্যু মশাই”?

“দেখলাম আমার আগের লোকটা ষোল বাক্স কন্ডোম কিনল।”

“ক্কি, কি বলছেন মশাই…তপেশের সামনে…ছি ছি ছি…”

“আপনি ধিক্কারটা থামান মশাই। এগুলো ইউরোপে ১০/১২ বছরের বাচ্চাদের স্কুলে শেখায়।তোপসে আর তিন মাস পরে আ্যডাল্ট হবে। ওর বায়োলজি টেক্সট বইতে আছে, ও যদি কিছু না জানে তো আমি ওর আসন্ন হায়ার সেকেন্ডারী নিয়ে সবিশেষ চিন্তায় পড়ব।”

“কিন্তু ফেলুদা তার থেকে তুমি ক্ল্যুটা কি পেলে? একটা লোক ফার্মেসীতে কিনতে এসেছে তো এর মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যাপারটা কোথায়?”

“অস্বাভাবিকত্বটা পরিমাণে। ঐ পরিমাণ একসঙ্গে কেনা…হাউ শ্যুড আই সে ইট…মোস্ট লাইকলি ইজ নট ফর দ্য ইনটেন্ডেড পারপাস!”

“তার মানে?” লালমোহনবাবুর প্রশ্ন।

“জানেন আর কিসে কিসে এর ব্যবহার হতে পারে?”

“হ্যাঁ …মা-মানে, সে তো আর না জানার কি আছে…” লালমোহনবাবু বেগুনী হয়ে গিয়ে তোতলাচ্ছেন।

“না, আমি এর প্রাইমারী ফাংশন আ্যজ এ বার্থ কন্ট্রোল টুলের কথা বলছি না…” ফেলুদাকে অসহিষ্ণু শোনায়।

“দেয়ার আর মেনি আদার লেসার নোন ইউজেজ, যেমন আন্ডার ওয়াটার সাউন্ড রেকর্ডিঙে লাগে আ্যজ এ ওয়াটার টাইট স্যাক ট্যু পুট দ্য মাইক্রোরেকর্ডার ইন। তেমনি…”

“আ্যজ ড্রাগ পাউচ…ফর দ্য মিউলস!” আমি বলে উঠি কারণ আমার মাথায় চট করে খেলে গেছে টাইমস ম্যাগাজিনের একটা আর্টিকেল।

“সাবাশ তোপসে। হ্যাঁ , আমি শিওর এগুলো কেনা হচ্ছে ওগুলোকে ড্রাগ পাউচ হিসেবে ব্যবহার করতে। আর তারপর সেগুলো মিউলের মাধ্যমে পাচার করতে।এটা অত্যন্ত ওয়েল নোন টেকনিক।পৃথিবীর সর্বত্র…মেক্সিকো, কলম্বিয়া থেকে ফার ইস্টের বিভিন্ন দেশেই বহুল প্রচলিত।”

“বলেন কি মশাই? ঐ জিনিস ড্রাগ পাচারের কাজে লাগে? জানতুম না তো!” বলে ওঠেন জটায়ু।

“ গুড কোয়ালিটি ল্যাটেক্স, ভেরি লো পারমিয়াবিলিটি, —মিউলদের পেটে ইনট্যাক্ট অবস্থায় থাকার সব গুণ আছে।তা ছাড়াও সস্তা, সহজলভ্য এবং সন্দেহউদ্রেককরী নয়। সুতরাং ড্রাগের কারবারীদের কাছে বেশ পছন্দের অপশন।”

“আমি একবার টাইমসে একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম।দু তিন পিস একসঙ্গে ইউজ করে মাল্টিলেয়ার্ড পাউচ বানায়, মিউলদের পেটের আ্যসিডে অক্ষত রাখার জন্য। তাই বোধহয় এই বাল্ক পারচেস, না ফেলুদা?”

“এক্সাক্টলি! তাই আমি দোকানদারের সঙ্গে ভাব জমিয়ে জানার চেষ্টা করলাম ক্রেতাটি কে! “

“জানতে পারলেন কে?”

“হ্যাঁ । সাম তিওয়ারী। মাঝে মাঝেই এভাবে এসে লার্জ কোয়ান্টিটিতে কিনে নিয়ে যায়। অদ্ভুতভাবে কেউ সন্দেহও করে না…দে ওয়্যার জাস্ট মেকিং সাম টেস্টলেস পুয়োর জোকস আ্যবাউট হিজ প্রাওয়েস। এনিওয়ে ওরা বলতে পারল না তিওয়ারী কোথায় থাকে, তবে বলল যে ও একটা বাইকে চেপে আসে যেটা সারাই করায় মাঝে মাঝে বাজারের নাথ্থু গ্যারেজে।”

“তা তখন আপনি নাথ্থু গ্যারেজ গেলেন নাকি?”

“ন্যাচেরালি!  ওখানে ওদের মেকানিক ইসমাইলের থেকে পাওয়া গেল আসল খবর। ওদের ওখানে কাজ করত মোহন নামে এক হেল্পার যে গত একমাস ধরে আসছে না পেটে আ্যপেন্ডিক্স অপারেশন হয়েছে বলে।”

“এই মোহনই কি ঐ পেটে প্যাকেট ফাটা মিউল নাকি মশাই?যাকে ডাঃ ব্যানার্জি সার্জারি করেছিলেন?”

“তাতে আর কোন সন্দেহ আছে কি? বিশেষ করে ঐ অ্যাপেনডিক্স অপারেশনের অজুহাত! তিওয়ারীর কাজ মূলতঃ মোহনই দেখত। গ্যারেজে ওদের কাজের চাপ খুব বেড়ে গেছে মোহন না থাকায়…”

“…আর শেষ খবরটা হল…তিওয়ারী ওয়ার্কস আ্যট দ্য মেঘরাজ হাউস!”

এরপর খট করে যে আওয়াজটা হল সেটা জটায়ুর দাঁতে দাঁতে লাগার।

              ———-

“আমাদের আগেই বোঝা উচিৎ ছিল মশাই। পাহাড়ী জায়গা, ড্রাগ…এ আমাদের মগনলাল ছাড়া কেউ না।”

পরদিন সকালে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলেন জটায়ু।

“শুধু তাই না। সবই শিবের তীর্থ। কাশী, পশুপতিনাথ কিম্বা এই কেদার-বদ্রী।” ফেলুদা মনে করিয়ে দেয়।

“হ্যাঁ মশাই, সেই জন্য তো কেদারে কেনা ঐ পাথরের শিবও কাছেই রেখেছি।”

কাঁধের ঝোলা থাবড়ে বুঝিয়ে দেন জটায়ু।

“বেশ একটা কনফিডেন্স পাওয়া যায়, বুঝলেন তো!”

“ভেবে দেখুন আপনি যাবেন কিনা। আপনাকে যেতেই হবে এমন কিন্তু কোন মানে নেই। মগনলাল পার্টিকুলারলি আপনাকে যেমন নাজেহাল করে তাতে করে আপনি না গেলে আমি কিচ্ছু মনে করব না…”

“ফেলুবাবু, আপনি কিন্তু আমায় দারুণ আন্ডার এস্টিমেট করছেন। আমরা যে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স তাও কি ভুলে গেলেন?” জটায়ু গম্ভীর হয়ে বললেন।

“এবারে তাহলে থ্রি নয়, ফোর মাস্কেটিয়ার্স।” দূরে মণিদিকে দেখিয়ে বলল ফেলুদা।

“কি মশাই! ওঁর মত একজন মহিলাকে নিয়ে মগনলালের বাড়িতে… না না। মানা করুন ওঁকে।”

“পারলে করুন আপনি। সকালে উনি ফোন করেছিলেন। বললাম এই ব্যাপার তো উনি জেদ ধরলেন যাবেনই। বারণ করতে গেলাম তো দুকথা শুনিয়ে দিলেন কিসব নারীবিদ্বেষী টেসী বলে। আপনার সাহসে কুলোয় তো মানা করুনগে যান।”

মেঘরাজ হাউস শহর থেকে একটু দূরে একটা সুন্দর ছবির মত সাদা বাড়ি, বিরাট কম্পাউন্ডের মাঝখানে। চারপাশে পাইন ফারের জঙ্গল। গেট থেকে নুড়ি বিছানো পথ তার মধ্যে দিয়ে অনেকটা গিয়ে শেষ হয়েছে গাড়িবারান্দার নীচে। গোল গাড়িবারন্দার নীচে বড় ফোয়ারা, চারপাশে ফুলের কেয়ারি।আমরা গেটের সামনে গিয়ে আমাদের ভাড়ার গাড়ি ছেড়ে দিয়ে দারোয়ানকে বললাম মেঘরাজ মশাইকে জানাতে যে কলকাতা থেকে তাঁর চেনা মিঃ মিত্র এসেছেন দেখা করতে। সে ইন্টারকমে কথা বলে নিয়ে আমাদের প্রবেশের অনুমতি দিল।

ভেতরের সুসজ্জিত বসার ঘরে কিছুক্ষণ বসার পরেই শুনলাম পরিচিত কণ্ঠস্বরঃ

“আরে মিঃ মিত্তর নাকি! কি সৌভাগ্য হামার…সাথমে কাজিন ঔর আঙ্কল কো তো ম্যয় পহচানতা হুঁ, লেকিন ইয়ে মোহতরমা কৌন হ্যায়? ভাবীজী?”

“ না মিঃ মেঘরাজ। ওঁর একটা জিনিস হয়তো আপনার কাছে আছে। সেই জন্যেই আসা আর কি!”

“আচ্ছা। উনকি কোঈ চীজকে লিয়ে আপ সিধা মেরে ঘর আ পঁহচে। বিনা কোঈ ডর! তব তো ইয়ে সায়দ হোনেবালি ভাবীজী হ্যায়। শরমাইয়ে মত। বোল দিজিয়ে, হাম তো ঠেহরে পুরানে জান পহচান বালে..”

ফেলুদা মগনলালের খোঁচা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলল,

“মগনলালজি, পরশু রাতে আপনার লোকেরা যখন কোকেন ডেলিভারী নিচ্ছিল ব্রীজের পাশে, তখন কোনো কুকুর আপনাদের বড্ড বিরক্ত করে। যার ফলে আপনারা তাকে চুপ করান জোরপূর্বক।সেই কুকুরটি কোথায় এখন বলতে পারেন?”

“কুকুর ? আরে উয়ো স্নিফার ডগ! ক্যায়া ভাবীজী, উয়ো স্নিফার ডগ লেকে আপ ক্যায়া করেঙ্গে? মিঃ মিত্রা সে কহিয়ে উয়ো আপকো এক ছোটাসা, প্যারা সা পুডল দিলা দেঙ্গে। খুব যাচেগা আপকো!”

মণিদিও দেখলাম বেশ বুদ্ধিমতী। কোনো রিআ্যক্ট করল না।

“তাহলে আপনার ড্রাগ মিউলের কারবারটা…মানে পাউচ বানানো , মিউলদের দিয়ে সেটা ক্যারি করানো সব কি আপনার এই বাড়ি থেকেই হয় নাকি?” 

ফেলুদা নিজের লাইন অফ কোয়েশ্চনসে অটল।

“আপ ইয়ে ক্যায়া অনাব শনাব বকে যা রহে হ্যায় মিঃ মিত্তর? হাঁ কোকেন কা কাম হাম থোড়া বহুৎ করতে হ্যায়  আ্যজ এ রিক্রিয়েশনাল ড্রাগ। লেকিন ইয়ে ড্রাগ মিউল ব্যাগেড়া…”

“তাহলে আপনার কর্মচারী তিওয়ারী কাল ওরকম বাল্ক পারচেজ অব কন্ডোমস করল কেন? দোকানে যা ছিল সব?”

“ আররে মিঃ মিত্র … আব সমঝা!” হেসে উঠল মগনলাল ।

“আপকো জরুরত থী  উয়ো চীজ, পর মিলি নেহি…ইসি লিয়ে ইতনা নারাজ হ্যায়….মুঝ পর, তিওয়ারী পর, সারি দুনিয়া পর! বহুৎ গলত কিয়া উস তিওয়ারী নে…”

মগনলালের উস্কানি অব্যাহত।

“ঔর আঙ্কলজি, আপ ক্যায়সে হ্যায়? ঠিক ঠাক”?

“আ্যঁ হ্যাঁ …সব ঠিক ঠাক, ঠিক ঠাক”। জটায়ু চমকে উঠে বলেন।

“মিঃ মিত্তর নে তো ঢুঁঢ লিয়া আপনি মাশুকা, ঔর আপকো কোঈ মিলি নেহি ক্যায়া আভি, আঙ্কলজি?”

“না না…মেরা তো মানে কুছ নেহি…মানে ম্যায় করতা নেহি এই সমস্ত।”

“কিঁউ? নামর্দ হ্যায় আপ…?”

মগনলালের সাহস বেড়ে চলেছে। ফেলুদা কি ভাবছে জানিনা। এই বাক্যবাণ আর কতক্ষণ সহ্য করবে ও…!

“ইউ কান্ট টক ট্যু হিম লাইক দ্যাট”, ফেলুদা কিছু বলার আগেই মণিদি বলে উঠেছে।

“ক্যায়া”? মগনলাল হকচকিয়ে গেছে।

“উনি একজন নামকরা সাহিত্যিক এবং ভদ্রলোক । এভাবে আপনি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন না”। মণিদি গনগনে গলায় বলে ওঠে।

“আরে মিঃ মিত্তর, আপকো তো শেরনি মিলি হ্যায়। বাধাই হো। ঔর মেরে নসিব দেখিয়ে… কালি ভৈঁস!

খ্যার ছোড়িয়ে, আপ আয়ে হ্যায় ইধার শিউজিকা দর্শন কিজিয়ে আঙ্কলকে সাথ, কাজিন কে সাথ পাহাড় মে চঢিয়ে, ভাবীজীকে সাথ রোমান্স কিজিয়ে…কেঁও ঝুটমুট আপনা অউর মেরা টাইম এক কুত্তে কে পিছে বরবাদ কর রহে হ্যায়? 

তিওয়ারীকে বারেঁ মে পুছ রহে থে না? বুলাতা হুঁ ম্যয় …তিওয়ারী,আরে ও তিওয়ারী ইধার আ জারা…” 

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল খোলা পিস্তল হাতে ন্যাড়া মাথা তিওয়ারী। হাতের কব্জির কাছে একটা ব্যান্ডেজ। বোধহয় হালুম বাবুর দাঁতের কাজ।

“যা তিওয়ারী ইন লোগোকো বাহার ছোড় আ। অউর গনেশ , তু ভী ইধার আ…”

আর একজন দশাসই লোক এসে হাজির হল। এর হাতে পিস্তল নেই বটে তবে রীতিমত পালোয়ান।

“গনেশ, তু মিঃ মিত্তরকে বিলকুল বগল মে রহনা, কোঈ উল্টি সিধি হরকত করনে না পায়ে ইয়ে।”

আমরা পর পর লাইন করে বেরিয়ে এলাম। আগে আমি, তারপর জটায়ু , তারপর ফেলুদা সবার শেষে মণিদি। নুড়িবিছানো পথ দিয়ে একটু এগোতেই শুনলাম “আঃ”, মণিদি বেচারা হোঁচট খেয়ে পড়ছে। তুলবার জন্য এগোনো যাবে কিনা ভাবার আগেই দেখলাম তিওয়ারী একটু নীচু হয়ে বাঁ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মণিদির দিকে । ডান হাতে রিভলভার ধরা।

বেচারী ভূপতিত মহিলার প্রতি গুন্ডাদেরও দয়া হয়!

কিন্তু মণিদি বাড়ানো হাত ধরে ওঠার বদলে এক হ্যাঁচকা টান এমন ভাবে দিল যে তিওয়ারী কুমড়ো গড়াগড়ি আর একই সঙ্গে ও নিজে উঠে দাঁড়াল। তিওয়ারীর হাতের রিভলভার ছিটকে গেল যেটা সঙ্গে সঙ্গে আমি তুলে নিয়ে তাক করলাম।ফেলুদা ওর পাশের গনেশ লোকটাকে ততক্ষণে কাবু করে মাটিতে ফেলেছে, ধ্বস্তাধস্তি চলছে…এমন সময় ঠকাং। গনেশের মাথায় জটায়ুর ঝোলায় থাকা পাথরের শিবের বাড়ি। এবার লোকটা চোখ এলিয়ে চিৎপাত।

ফেলুদা রিভলভারটা আমার থেকে নিয়ে তিওয়ারীর দিকে চোখ রেখেই মণিদিকে জিজ্ঞেস করল “জুজুৎসু শিখতেন বুঝি?’ উচি মাতা ‘প্যাঁচে কাত করলেন না তিওয়ারীকে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ । ব্লু বেল্টের বেশী এগোইনি, তবে কাজে লেগে গেল আজ! তা এবার কি? কতক্ষণ এভাবে পিস্তল তাক করে থাকবেন।”? মণিদির প্রশ্ন।

“আমার হিসেব মত বেশীক্ষণ না। ইনপেক্টর সিং এলেন বলে। সব সিনেমার মত শেষ দৃশ্যে।”

“বাতাইয়ে তিওয়ারী জী সারা সামান অউর উয়ো কুত্তা কিধার হ্যায়।”?

ফেলুদা পরে বলেছিল যে এটা নাকি সাইকোলজ্যিকাল। মানুষের পিউপিল মুভমেন্ট থেকে খুব সহজেই তার আসল মনের ভাব বোঝা যায়।

                তিওয়ারীও মুখে কিছু না বললেও একবার নিজের কব্জির আঘাতের দিকে আর পরক্ষণেই গাড়িবারান্দার নীচে ফোয়ারাটার দিকে তাকাল। আমরা সবাই ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি ফোয়ারার সামনে বাঁধানো জায়াগাটায় একটা ম্যানহোলের ঢাকনার মত। ওপরে আংটা লাগানো। 

“ছুটবেন না ডাঃ ব্যানার্জি “,

বলাটা দরকার ছিল কারণ মণিদি ছুটতে যাচ্ছিল।

“আমি বাইরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ পেলাম। পুলিশ ঢুকছে মনে হয়। এদুটোকে তাদের হাতে দিয়ে তারপর আপনার হালুম উদ্ধার।”

পাঁচমিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে তিওয়ারী আর গনেশকে হাতকড়া পড়িয়ে জীপে তুলল। দুজন বাড়ির ভেতরে গেল বোধহয় মগনলালের সঙ্গে কথা বলতে।তারপর ম্যানহোলের ঢাকনা তুলতেই দেখা গেল ভেতর দিয়ে লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে। পুলিশের পেছন পেছন আমরা চারজনও নেমে এলাম সেটা দিয়ে। নীচে একটা হলের মত। সামনের দরজাটার তালা খুলতেই দেখা গেল ভেতরে বিশাল কারখানার মত ঘর। সেখানে কোকেনের প্যাকেট, পাউচ সবই পাওয়া গেল। আসলে পুরো মেঘরাজ হাউসের বেসমেন্ট জুড়েই এই কারবার। আমরা যেখান দিয়ে এলাম সেটা ছাড়াও বাড়ির মধ্যে থেকে এখানে আসারও নিশ্চয় রাস্তা আছে। তবে সেসব এখন পুলিশ দেখবে। আমরা উঠে এলাম ওপরে।

“ও মিঃ মিত্তির, সবই তো হল, কিন্তু আমার বাচ্চাটা…” মণিদি এখনো দুঃখী।

“চলুন ঐ আউট হাউসে দেখি, নয়তো মগনলালকে আবার দাবড়ানি দিয়ে খোঁজ বের করতে হবে।”

“ওকে দাবড়ানি এমনিই দিতে হবে! ভাবীজি বলা আমি বের করছি ওর”।

“দেখুন মগনলালের হাজার দোষ, কিন্তু ভাবীজি বলা ইজ হার্ডলি এ ক্রাইম। বহেনজীতে তো চটেন না। ভাবীজি বললে চটেন কেন?”

“ইজি ফর ইউ ট্যু সে! আপনাকে তো আর বলেনি!”

“বলতে তো কিছু বাকীও রাখেনি। ছিলেন তো ওখানেই বসে, শোনেননি?”

এর মধ্যে এসে গেছি আউটহাউসের সামনে।

ভেতরের ঘর থেকে চাপা ভৌ ভৌ আওয়াজ আসছিল। একজন কনস্টেবল দরজা টা খুলতেই তীরের মত ছিটকে বেরিয়ে এলেন হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়।

তারপর কুড়ি সেকেন্ডে যে ঠিক কি কি জিনিস কি অর্ডারে ঘটল তা বোঝানোই শক্ত, তবু চেষ্টা করছি।

বাইরে দাঁড়িয়েছিল ফেলুদা। তার একটু পেছনে মণিদি। হালুম মারল ঝাঁপ মণিদির দিকে। ফেলুদা গেল লাফিয়ে পিছনে সরতে, মণিদি গেল এগিয়ে হালুমকে ধরতে…এই ত্রিবিধ ঝটাপটিতে দেখলাম ফেলুদা, মণিদি আর হালুম তিনজনেই ঢালু মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

***





Thursday, 20 April 2023

Kalimpong Rahasya by Abhik Dutta (incomplete)

কালিম্পং রহস্য 

অভীক দত্ত 

-বুঝলে ভাই তপেশ, এই গরমটা না, সহ্য হচ্ছে না। আমার মনে হয়, আমরা পাহাড়ে ঘুরে এলে ভালো হত। কী বলেন ফেলুবাবু? 

শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে শুনেছিলাম দারুণ ম্যাঙ্গো লস্যি বানায়। সে দোকান থেকে লস্যি এনে দিয়েছেন হরিপদবাবু।  লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে ফেলুদা বলল, "আপনি সাহারায় শিহরণ আনতে চেয়েছিলেন লালমোহনবাবু। এখন এই গরমের ঠ্যালায় কি নতুন কোন কাহিনি মাথায় চলে এলো নাকি?" 

লালমোহনবাবু প্রথমেই এক চুমুকে গ্লাস শেষ করে দিয়েছেন। ফেলুদার কথায় উৎসাহিত হয়ে বললেন, "আরে মশাই, আপনাকে তো সেই থেকে বলে যাচ্ছি। এত বছরের রয়্যালটি জমে আছে। কালিম্পং এর সেই বাড়িটা, মিস্টার আগরওয়াল বলেই দিয়েছেন ফেলুবাবুকে নিয়ে আসুন, ডিসকাউন্ট দিয়ে টাকা আরো কমিয়ে দেবো। আপনি তো শুনছেনই না মশাই। এই গরমে আমি আর কলকাতায় থাকতেই চাইছি না। মার্চের শেষের দিকে পাহাড়ে চলে যাবো, পুজোর মুখে নেমে আসবো”। 

ফেলুদা লস্যি শেষ করে বলল, “আর আমার পসারটির ততদিনে গঙ্গাপ্রাপ্তি হোক। আপনি তেমনটাই চাইছেন তো?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “আরে না মশাই। পাহাড়ে কি রহস্যের কমতি আছে নাকি? এই আগরওয়ালের মুখেই তো শোনা। বেশ কয়েকদিন হল একটার পর একটা বাড়িতে চুরি হয়ে যাচ্ছে...” 

ফেলুদা বলল, “ছিচকে চোরের জন্য পুলিশ আছে। তার জন্য প্রদোষ মিত্তিরকে দরকার হয় না”। 

লালমোহনবাবু মুষড়ে পড়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখেছো তোপসে, কোন প্রলোভনেই আমি ফেলুবাবুকে রাজি করাতে পারছি না। এই গরমে এখানে থাকার কোন মানে হয়? তুমিই বল?” 

আমি ফেলুদার দিকে তাকালাম। কয়েকদিন ধরেই ফেলুদা আমাদের কারো সঙ্গেই বেশি কথা বলছে না। ওয়েস্টার্ন আর্ট নিয়ে একটা মস্ত বড় ব্লগ পেয়েছে। রাতদিন ওটাই পড়ে যাচ্ছে। আমাকে বলে দিয়েছে ক্লায়েন্ট এলে মেরিট বুঝে তবেই যেন ওর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করি। এর মধ্যে লালমোহনবাবুর বায়নায় যে ও খানিকটা বিরক্ত হচ্ছে, তা বুঝতে পারছি। 

তবে লালমোহনবাবুকে ফেলুদা পছন্দ করে বলে এই প্রস্তাবটা হয়তো ওকেও ভাবাচ্ছে। আমি কিছু বললাম না। জোর করে লাভ নেই। যদি যেতে চায়, তবেই যাওয়া হবে, নয়তো নয়। 

পর পর দু তিন বার কলিং বেল বেজে উঠলো। ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভদ্রলোকের বেশ তাড়া আছে মনে হচ্ছে। দেখ তো”। 

আমি দরজা খুললাম। 

প্রায় ফেলুদার সমান লম্বা এক ভদ্রলোক, ধবধবে ফরসা, বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে, কাঁচা পাকা চুল, আমাকে দেখে হেসে বললেন, “আপনিই শ্রী তপেশ রঞ্জন মিত্র, তাই তো?” 

আমি ঘাড় নাড়লাম, “হ্যাঁ, বলুন”। 

ভদ্রলোক উঁকি মেরে ঘরের ভেতরটা দেখার চেষ্টা করে বললেন, “প্রদোষবাবু আছেন?” 

আমি বললাম, “আছেন, তবে এখন হয়তো দেখা করতে পারবেন না”। 

ভদ্রলোক মুষড়ে পড়ে বললেন, “আমার খুব দরকার ছিল”... 

ভদ্রলোকের কথা শেষ হবার আগেই ফেলুদা বেরিয়ে এলো, “রাজশেখর পালিত, আপনার আর্টিকেলটা আজকেই কাগজে পড়েছি, তোপসে ওনাকে ভেতরে নিয়ে আয়”। 

বুঝলাম ডোর ক্যামে ফেলুদা ভদ্রলোককে দেখে নিয়েছেন। আমি দরজা ছেড়ে দিলাম। ভদ্রলোক বিগলিত হাসি হেসে বললেন, “আমি বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছি প্রদোষবাবু”। 

ফেলুদা বললেন, “সেটা আমি বুঝেছি। আমার মনে হচ্ছিল বটে আপনি আসবেন। আসুন”। 

লালমোহনবাবু রাজশেখর বাবুকে দেখেই প্রায় চিৎকার করে উঠলেন, “আরে, আপনিই সেই ওয়ার্ল্ড ফেমাস এক্সপ্লোরার রাজশেখরবাবু নন?” 

আমি জিভ কাটলাম। আমিই তারমানে একা ধরতে পারি নি। অবিশ্যি আমারও দোষ নেই। সকাল থেকে একগাদা ক্রসওয়ার্ড করিয়েছে ফেলুদা। বলেছে ক্রসওয়ার্ডের ধাঁধায় নাকি মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন বেড়ে যায়। মস্তিষ্ক ঠিক ঠাক সচল রাখা জরুরি। মোবাইল ঘাঁটারও একটা সময় বেঁধে দিয়েছে।  এই ক্রসওয়ার্ডের জন্যই নিউজ ফিড দেখা হয় নি। 

রাজশেখর বললেন, “ফেমাস হয়ে গিয়েই তো বিপদে পড়ে গেলাম মশাই। লাস্ট মান্থে পেরু থেকে ফিরলাম, টাইমসে আর্টিকেল লিখলাম। তারপর থেকে তিন বার আমার বাড়িতে চুরির অ্যাটেম্পট হল। কলকাতায় যাও বা সিকিউরিটি বাড়িয়ে নজরদারি বাড়ানো গেলো, মূল সমস্যা তো সেই একই থেকে গেলো”। 

ফেলুদা বলল, “কলকাতার বাড়িতে তার মানে মূল্যবান তেমন কিছু নেই, তাই তো?” 

রাজশেখর বললেন, “একবারে নেই তা নয়। ছোটখাটো কয়েকটা মূর্তি বাদে আমি এখানে কিছু রাখি নি। কালিম্পং এ আমার ঠাকুরদা একটা বাড়ি করে রেখেছিলেন। আমি সে বাড়িতে একটা জিনিস রেখেছিলাম। অবশ্যই সকলের অগোচরে। আপাতদৃষ্টিতে দেখলে সে জিনিসের মূল্য একবারেই নেই, কিন্তু কালেক্টরদের কাছে ও জিনিস অমূল্য। মিশর থেকে আনা প্যাপিরাস কাগজের উপরে আঁকা একটা ম্যাপ। আমার প্রথম কলামে আমি এই সংগ্রহের কথা বর্ণনা করি। তারপরই কলকাতায় অ্যাটেম্পট হওয়া শুরু করে। আমি অতোটা চিন্তিত ছিলাম না... কিন্তু গতকাল রাতে কালিম্পং এর বাড়িতেও...” 

আমি লালমোহনবাবুর দিকে তাকালাম। কালিম্পং শুনেই লালমোহনবাবুর মুখটা যেভাবে পাল্টে গেলো, সেটা ফেলুদারও নজর এড়ালো না। 

রাজশেখর বলে চললেন, “ও বাড়িতে একবার অ্যাটেম্পট হয়েছে, সামলে নেওয়া গেছে প্রদোষবাবু। কিন্তু আমার মনে হয়, আমাদের দ্বিতীয় সুযোগটা দেওয়া উচিত হবে না। আপনি যদি একবার ও বাড়ির নিরাপত্তার ব্যাপারটা সরেজমিনে দেখে আসতেন...  আমার বাবা আর্মিতে ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পরে কালিম্পং এই আছেন। এবার বাবার বয়স হচ্ছে। বাবা আছে বলেই আমার চিন্তাটা বেশি। আবার আমি পুলিশকেও ঠিক ভরসা করতে পারছি না”। 

ফেলুদা বলল, “আপনার উৎকণ্ঠার যথেষ্ট কারণ আছে মিস্টার পালিত, কিন্তু আমি তো নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ নই। এ বিষয়ে আমি ঠিক কী অ্যাডভাইস দিতে পারি, সেটাই তো বুঝতে পারছি না”। লালমোহনবাবু হঠাৎ করে কাশতে শুরু করে দিলেন। আমি বুঝতে পারলাম ভদ্রলোক বলতে চাইছেন হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলছেন কেন মশাই? হাসি চেপে বসে রইলাম। 

রাজশেখর একটু ইতস্তত করে বললেন, “অ্যাকচুয়ালি আরেকটা ব্যাপারেও আপনার সাহায্যটা দরকার মিস্টার মিটার”। 

ফেলুদা বলল, “নির্দ্বিধায় বলুন”। 

রাজশেখর বললেন, “ইন্দোনেশিয়া থেকে চার পাঁচ বছর আগে আমি একটি লক্ষ্মীর মূর্তি নিয়ে আসি। প্রায় এক হাজার বছর পুরনো মূর্তি। পিওর গোল্ডের। আমি বাবাকে সে মূর্তিটা দিয়েছিলাম রাখার জন্য। আজ যখন সকালে বাবা আমাকে ফোন করেন চুরির অ্যাটেম্পটের ব্যাপারে, আমি বাবাকে মূর্তিটার কথা জিজ্ঞেস করি। বাবা বলছেন তিনি মনে করতে পারছেন না মূর্তিটা কোথায় রেখেছেন। এটা শোনার পর থেকেই আমার মাথা কাজ করছে না”। 

ফেলুদা চারমিনার ধরালো। দুটো ধোঁয়ার রিং ছেড়ে রাজশেখরের দিকে তাকিয়ে বলল, “হাতের লক্ষ্মীর ক্রয়মূল্যটা আপনার চিন্তার কারণ, না প্যাপিরাসের ম্যাপ?” 

রাজশেখর বললেন, “দুটোই প্রদোষবাবু। আমি বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েছি। বুঝে উঠতে পারছি না কী করবো। আপনি যদি রাজি থাকেন তবে কাল ভোরের ফ্লাইটেই... আপনি বললে আমি আপনার অ্যাডভান্সটাও ইউ পি আই করে...” 

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “আপনার আগরওয়ালকে তাহলে তৈরি হতে বলুন লালমোহনবাবু, ডিসকাউন্ট তবে আপনি পাচ্ছেনই”। 

লালমোহনবাবু ঘাড় নেড়ে হাসি মুখে বললেন, “বিলক্ষণ”। 

***

২ 

“তপেশ, পিছনের লোকটাকে দেখেছো? সিট নাম্বার ১০ ই। হাইলি সাসপিশাস!” 

লালমোহনবাবু যার কথা বললেন, মাথা ঘুরিয়ে তাকে দেখে নিলাম। 

কাঁচা পাকা গোঁফ, রিমলেশ চশমা, প্রফেসরদের মতন দেখতে। এই ভদ্রলোকের মধ্যে লালমোহনবাবু সন্দেহজনক কী পেলেন, তা বুঝতে পারলাম না। 

প্লেন টেক অফ করার পর থেকেই ফেলুদা বই নিয়ে বসে আছে। মধ্যযুগের আর্ট চ্যাপ্টারটা ধরেছে। রাজশেখর বাবু আমার সামনের সিটে বসেছেন। প্লেনের মহার্ঘ্য চা খাওয়াতে চেয়েছিলেন। ফেলুদা বলে দিয়েছে একবারে বাগডোগড়া নেমেই খাবে। 

আধঘণ্টা থেকে বড় জোড় চল্লিশ মিনিট লাগে। লালমোহনবাবু বর্ণিত “সাসপিশাস” লোকটিকে দেখে চোখ বুজে এসেছিল।

লালমোহনবাবুই ডেকে দিলেন। লাগেজ নেবার সময় দেখলাম সেই “হাইলি সাসপিশাস” লোকটিই লালমোহনবাবুকে দেখে চোখ কপালে তুলে বলছেন, “আরে আপনি জটায়ু না? আপনি জানেন আপনার কত বড় ফ্যান আমি? সাহারায় শিহরণ পড়ে দু রাত্তির ঘুমোতে পারি নি মশাই। কী রেঞ্জ আপনার! অসাধারণ। জাপান থেকে পেরু, ইউক্রেন থেকে ব্রেজিল... নাহ... একটা সেলফি কিন্তু মাস্ট স্যার”। 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করতে করতে সেলফি তুলে ভদ্রলোকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলে আমার কাছে এসে বললেন, “ভারি মাই ডিয়ার লোক বুঝলে তপেশ। আমার সব ক’টি বই প্রকাশের প্রথম দিনই সংগ্রহ করেন”। 

ফেলুদা মাস্ক পরে আছে। বেল্ট থেকে ওর ব্লু বেরি কালারের ব্যাগটা নিয়ে বলল, “আপনি কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই ঠাণ্ডা গরম বাঁধিয়ে বসবেন লালমোহনবাবু। বাইরে এই মুহূর্তে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি। কালিম্পং এও কেমন গরম পড়েছে, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। সোয়েটারটা হাতে রাখুন”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলেন কী মশাই? হিমালয়ের এত কাছে এসেও গরম থেকে মুক্তি নেই?” 

ফেলুদা বলল, “যথেচ্ছ গাছ কাটলে শুধু গরম কেন, আরো অনেক কিছু থেকেই মুক্তি পাবার কোন আশা দেখতে পাচ্ছি না”। 

রাজশেখরবাবু তার ব্যাগটা সংগ্রহ করে আমাদের কাছে এসে বললেন, “ড্রাইভার ফোন করেছিল। এসে গেছে। পারকিং অবধি হাঁটতে হবে”। 

ফেলুদা বললেন, “সেটা বলতে সংকোচ বোধ করছেন কেন? এটা তো স্বাভাবিক ব্যাপার। চলুন”। 

এয়ারপোর্ট থেকে বেরোলাম। ফেলুদা পঁয়ত্রিশ ডিগ্রি বলেছিল বটে, আমার আরো বেশি গরম লাগছিল। 

রাজশেখরবাবুর গাড়িতে উঠে লালমোহনবাবু বললেন, “এহ, ভারি ভুল হয়ে গেছে তপেশ। আগে বুঝলে এতো সোয়েটার নিয়ে আসতাম না”। 

এবার বুঝলাম লালমোহনবাবুর ব্যাগটা এতো ভারি লাগছিলো কেন। ফেলুদা বলল, “আপনি কি দিন পনেরোর হিসেবে রোজ একটা করে সোয়েটার নিয়ে এসেছেন নাকি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “ওরকমই বলতে পারেন। বেশ কয়েকদিন ধরে রাইটার্স ব্লক চলছে মশাই। ঘুরলে যদি মাথাটা একটু পরিষ্কার হয়।  ইন্সপিরেশন পাওয়ার জন্য তাজা হাওয়া, আর আগরওয়ালের বাংলো তো আছেই। কী বলেন?” জোরে হেসে উঠলেন লালমোহনবাবু। 

গাড়ি চলতে শুরু করতেই রাজশেখরবাবুর ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরে খানিকটা কথা এগোতেই রাজশেখরবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি কী বেচবো, কোনটা বেচবো না, সেটা কি আপনাকে জিজ্ঞেস করে ঠিক করতে হবে? ... না... না আমি বেচবো না... আর ফারদার আমাকে এই ব্যাপারে কোন ফোন করবেন না... ডিসগাস্টিং”! 

ফোন কেটে দিলেন রাজশেখরবাবু। 

ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “কোন কালেক্টর ফোন করলেন আপনাকে?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “আর বলবেন না মশাই। বেশ কয়েকদিন ধরে ফোন করে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর জন্য এক কোটি টাকা অবধি দিতে রাজি আছে”। 

ফেলুদা বলল, “কে সে? এদেশেরই? নাকি মিডল ম্যান?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “এদেশেরই। বিষাক্ত মানব যাকে বলে। মগনলাল মেঘরাজ”। 

লালমোহনবাবু মনে হয় বৈকুণ্ঠ মল্লিকের কোন কবিতা মনে করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। মগনলালের নাম শোনা মাত্র হেঁচকি তুলতে শুরু করলেন। তড়িঘড়ি জলের বোতলটা এগিয়ে দিলাম। একসঙ্গে অনেকটা জল খেয়ে নিয়ে বললেন, “উনি কি কালিম্পংএ দেখা দেবেন নাকি?” 

রাজশেখরবাবু বললেন, “হ্যাঁ। আজ বিকেলেই আমাদের বাড়ি আসবেন। কী বলবো বলুন? আসতে চাইলে কি আর বারণ করা যায়?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “না না, বারণ কি আর করা যায়? করা যায় না। আসুন আসুন। বারণ করা একবারেই ঠিক নয়!” 

***

৩ 

“আপনি এবার সোয়েটার পরে নিন লালমোহনবাবু”। 

তিস্তা বাজার পেরিয়ে গাড়ি পাহাড়ে উঠতে শুরু করতেই জানলা দিয়ে ঢুকে পড়া একটা দমকা হাওয়া জানান দিয়েছে এবার ঠাণ্ডা পড়বে। ফেলুদার কথা শুনে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, এই পাহাড়ে তিস্তা যেমন পাশে পাশে চলে, মগনলালও তেমনি সব সময় আমাদের সঙ্গেই থাকে কেন বলুন তো?” 

রাজশেখর বললেন, “পাহাড়ের সব নদীই কিন্তু তিস্তা না। রঙ্গিত আছে, রেলি আছে। এখন তো হোম স্টের যুগ। এক একটা নদীর ধারে দারুণ সব হোম স্টে তৈরি হয়েছে। জানেন প্রদোষবাবু, আমার মাঝে মাঝে কবিগুরুর ওই কবিতাটার কথা মনে হয়। নিজের ঘরের পাশের শিশিরবিন্দুটুকু দেখতে পারলাম না এদিকে গোটা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালাম। এই পাহাড়ে কত অসংখ্য জায়গা আছে যেগুলো এখনও অনাবিষ্কৃত হয়ে পড়ে আছে”। 

ফেলুদা জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “অনাবিষ্কৃত থাকাই ভালো। ট্যুরিস্টরা যেগুলো আবিষ্কার করছে, সেখানে প্লাস্টিক আর নোংরা ফেলে জায়গাগুলো শেষ করে দিচ্ছে। এবার সরকার বাহাদুর যদি রাস্তা চওড়া করার কথা ভেবে আবার পাহাড় ফাটিয়ে রাস্তা বানাতে শুরু করেন, তবেই চিত্তির”। 

রাজশেখর বললেন, “যা বলেছেন। তিস্তা বাজারের জ্যামটা দেখলেন এখন? বাগডোগরা বা এন জে পি যেতে আজকাল হাতে সময় না নিয়ে বেরোলে দুর্গতির একশেষ হয়”। 

ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকালো, “কী ভাবছেন বলুন তো? নতুন উপন্যাসের নাম? কালিম্পঙে কেলেঙ্কারি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “আমার বেনারসের সরবতটার কথা মনে পড়ছে মশাই। এ লোকটা বার বার জেল থেকে ছাড়া পায় কী করে?” 

ফেলুদা বলল, “আপনি ভয় পাচ্ছেন কেন? ফেলু মিত্তির তো এখনও বেঁচে আছে”। 

লালমোহনবাবু জোরে হেসে উঠলেন, “ভয়? ভয় পাচ্ছি কে বললে? ভয় পাচ্ছি না”। 

লালমোহনবাবু বললেন বটে, কিন্তু তার গলার জোরে সেটা বোঝা গেলো না। 

ফেলুদা বলল, “আপনার কালিম্পং এর বাড়িতে চোর আসার ফুটেজটা পাওয়া গেছে রাজশেখরবাবু?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। পেয়েছি। দেখে কিছু বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের বাড়ি পৌঁছলে আপনাকে দেখাচ্ছি”। 

ফেলুদা বলল, “মোবাইলে আছে?” 

রাজশেখর তার ফোন বের করে বললেন, “তা আছে। দেখবেন?” 

ফেলুদা বলল, “দিন”। 

রাজশেখর ক্লিপ বের করে দিলেন। ভ্রূ কুঁচকে ফেলুদা ক্লিপটা দেখে নিয়ে রাজশেখবাবুকে তার ফোন ফেরত দিয়ে বলল, “মুখোশ পরে এসেছে। রাজেনবাবুর ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। তোর মনে পড়ল রে, তোপসে?” 

মনে পড়বে না আবার? ফেলুদার কেরামতি তো সেই প্রথম দেখেছিলাম। এসব জায়গায় বিভিন্ন বাহারি রকমের মুখোশ পাওয়া যায়। রাজশেখরবাবুর কালিম্পঙের বাড়িতে এরকম কোন মুখোশ পরেই চোর এসেছিলো। 

কালিম্পং পৌঁছতে দুপুর হয়ে গেলো। রাজশেখরবাবুর বাড়িটা বেশ বড়। মূল শহর থেকে খানিকটা দূরে। সাবেকি আমলের গাড়ি বারান্দা আছে। বাগানে সবুজ লন, বিভিন্ন ধরণের ফুল ফুটে রয়েছে। বাড়ি থেকে কালিম্পং শহরটা দিব্যি সুন্দর দেখা যাচ্ছে। 

লালমোহনবাবু মগনলালের কথা ভুলে মুগ্ধ হয়ে বললেন, “বাঃ। অসাধারণ! অনবদ্য! বুঝলেন ফেলুবাবু, আমাদের হুগলীর বিশিষ্ট কবি বৈকুণ্ঠ মল্লিক এই কালিম্পংকে নিয়ে লিখেছিলেন 

অহো অপূর্ব অতি সুন্দর তুমি 

কালিম্পং নগরী। 

কলিকাতা হতে 

হেরিনু তোমারে 

হাতে ফুল ঝুড়ি ঝুড়ি। 

কী অনবদ্য কবিতা বল তো তোপসে?”

অন্য সময় হলে হয়তো ফেলুদা এই কবিতা শুনে কিছু বলতো, এখন বলল না। বৈকুণ্ঠ মল্লিক যদি লালমোহনবাবুর মন থেকে মগনলাল মেঘরাজের মেঘ দূর করতে পারেন, তাতে ফেলুদা বাধা দিতে যাবেই বা কেন?  

রাজশেখরবাবুর বাবা রুদ্রশেখরবাবু গাড়ি বারান্দায় আমাদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন। রুদ্রশেখরবাবুর উচ্চতা ছেলের থেকেও বেশি, পেটানো চেহারা, চুলে সামান্য পাক ধরেছে। ভদ্রলোক যে বেশ ফিট, তা দেখেই বোঝা যায়।  ফেলুদাকে দেখে চওড়া হাসি হেসে বললেন, “আসুন আসুন প্রদোষবাবু। আমাদের সৌভাগ্য আপনি এ বাড়িতে পদার্পণ করেছেন”।  

ফেলুদা ড্রইংরুমে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “সৌভাগ্যটা আমাদের হওয়া উচিত। আপনি কার্গিল যুদ্ধে লেফটেন্যান্ট ছিলেন, সেটা কিন্তু গুগল থেকে জানতে পেরেছি”। 

রুদ্রশেখর বিস্মিত হয়ে বললেন, “আপনি আমার নাম গুগলেও সার্চ করে ফেলেছেন? অভাবনীয়”! 

ফেলুদা বলল, “ইদানীং এ অভ্যাসটা তৈরি হয়েছে। যদিও অনেক তথ্যে মাঝে মাঝেই ভুল পাওয়া যায়। তবু প্রযুক্তিকে অস্বীকার করার ধৃষ্টতা দেখানো সম্ভব নয়”। 

ড্রইং রুমটা ছিমছাম সুন্দর। রাজশেখর ব্যস্তসমস্ত হয়ে পড়েছেন। ফেলুদাকে বললেন, “চা দিতে বলি? নাকি কফি? ফ্রেশ হয়ে নেবেন না হয় তার পরে?” 

ফেলুদা বলল, “চা অবশ্যই। লালমোহনবাবু অবশ্য গ্রিন টি ধরেছেন আজকাল”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “ধ্যার মশাই, পাহাড়ে এসে আবার কেউ গ্রিন টি খায় নাকি? ফার্স্ট ফ্লাশ আছে নাকি রাজশেখরবাবু?” 

রাজশেখর হাসলেন, “আলবাত”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স হচ্ছে তো। বাইরেটা দেখে বোঝা সম্ভব নয়। রাজা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়ে এ বাড়িতে দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র এনে রাখে। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে এলেও চোর বাবাজি পালানোর পথ পেতো না। খারাপ লাগছে, ব্যাটা এলো, আর আমি বুঝতেই পারলাম না?” 

ফেলুদা বলল, “আপনি ঘুমোচ্ছিলেন তখন?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। কিছু বুঝতেই পারি নি। ভাগ্যে পূব দিকের বারান্দার টবটা পড়ে গেলো। ওর শব্দে উঠে বেরিয়ে দেখি ব্যাটা পাঁচিল টপকাচ্ছে”। 

ফেলুদা রাজশেখরের দিকে তাকালেন, “আর দারোয়ান?” 

রাজশেখর বললেন, “এ জায়গা তো নিরুপদ্রব ছিল এদ্দিন। বাবা বাহাদুরকে ছুটি দিয়েছিলেন। ওর গ্রামে বিয়েবাড়ির নেমন্তন্ন ছিল”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “আমি কী করে বুঝবো বলুন? আমার কাছে ছুটির জন্য বলল, আমি তো ভাবতেও পারি নি এরকম কিছু হতে পারে”। 

লালমোহনবাবু বসেন নি। ঘুরে ঘুরে দেওয়ালে টাঙানো ফটোগুলো দেখছিলেন। একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে বললেন, “ইনি ওবাবা না?” 

আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, “ওবামা। বারাক ওবামা”। 

রাজশেখর বললেন, “ওয়াশিংটন ডিসিতে আমাদের একটা প্রোগ্রামে এসেছিলেন। ভারি ভাল বক্তব্য রাখেন ভদ্রলোক”। 

লালমোহনবাবু খুশি হয়ে বললেন, “মারভেলাস মশাই, মারভেলাস। আপনি তো যে সে লোক নন”। 

রাজশেখর হাসলেন, “সেটা কি চোরেরা বুঝবে, বলুন?” 

ফেলুদা বলল, “আপনার সংগ্রহগুলো কোথায় রাখেন?” 

রাজশেখরবাবু উঠলেন, “আসুন”। 

***

৪ 

“এমনিতে সাদামাটা জিনিস, কিন্তু কিউরিও মূল্য বহু হতে পারে, এমন অনেক কিছুই আমার কাছে আছে। এটা দেখুন, মোঙ্গোলিয়া থেকে এনেছিলাম”। 

রাজশেখর বললেন। 

ছোট একটা ঘড়ি। বিভিন্ন নকশা আঁকা তাতে। ফেলুদার হাতে দিলেন। ফেলুদা ভাল করে দেখে বললেন, “আপনি মঙ্গোলিয়া গেছিলেন?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ। বহুদিন ধরেই ও দেশটির প্রতি আমার আলাদা আকর্ষণ ছিল। মুঘলদের সম্পর্কে আমার আগ্রহ বরাবরের। তাদের পূর্বপুরুষদের দেশ দেখবো না?” 

লালমোহনবাবু আগ্রহী গলায় বললেন, “তা কেমন দেখলেন চেঙ্গিস খানের দেশ?”

রাজশেখর হাসলেন, “ও দেশের ক্লাইমেট স্যুট করবে না এটুকু বলতে পারি। খুব বেশিদিন থাকতে পারি নি। ওখান থেকেই মস্কো চলে গেছিলাম”। 

ফেলুদা ঘড়িটা রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীর মূর্তিটা এখানেই রেখেছিলেন?” 

রাজশেখর একবার দরজার দিকে তাকিয়ে কেউ নেই দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে বললেন, “ওটা আমি বাবাকে দিয়েছিলাম। বাবা বলছেন মনে করতে পারছেন না। এদিকে ওটার জন্যই আজ এ বাড়িতে মগনলালের আসার কথা। আমি তো বুঝতেই পারছি না কী বলবো”। 

ফেলুদা বলল, “হতে পারে রুদ্রশেখরবাবু এসব ঝামেলা হবে জেনেই আগে থেকে কোন গোপন জায়গায় রেখে দিয়েছেন”। 

রাজশেখর বললেন, “তাহলে তো বেঁচেই যেতাম। তবে এরকম হলে বাবা তো আমায় অ্যাটলিস্ট একবার বলতেন। বলেন নি বলেই বুঝতে পারছি না, কী করবো”। 

ফেলুদা শো কেসের একটা ছোট মূর্তির দিকে আঙুল তুলে বলল, “এটা বোধহয় দক্ষিণভারতের নটরাজ মূর্তি, তাই না?” 

রাজশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাদুরাই মন্দিরের এক পূজারী দিয়েছিলেন”। 

ফেলুদা বলল, “মগনলাল মেঘরাজ এ ঘরে না এলেই মঙ্গল রাজশেখরবাবু। ও লোক সুবিধের নয়। আপনার সংগ্রহ অমূল্য। কোনটির কিউরিও মূল্য কত হতে পারে, তা নির্ধারণ না হলেও মগনলালের মত ক্রিমিনালের চোখে এসব না পড়াই ভাল। আপনি বরং এ ঘরটা তালা দিয়ে রেখে দিন”। 

রাজশেখর ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “কলাম লেখাটাই ভুল হয়ে গেছে মশাই। এদ্দিন তো দিব্যি ছিলাম। এসব ঝামেলার সামনে তো কোনদিন পড়তে হয় নি”! 

ফেলুদা ঘরের সিসিটিভি ক্যামেরাটা দেখে বলল, “এ ঘরে একটা ক্যামেরা আছে দেখছি। এটা ঠিকঠাক কাজ করে তো?” 

রাজশেখর তার মোবাইল থেকে সিসিটিভির অ্যাপটা বের করে ফেলুদাকে দেখালেন, “এই যে। ঠিকঠাকই আছে”। 

ফেলুদা বলল, “আর আপনার ওই প্যাপিরাসের ওপর আঁকা ম্যাপটা? ওটা তো এ বাড়িতেই...” 

রাজশেখর তর্জনী তুলে বললেন, “এক মিনিট”। 

দেওয়ালের কাছে দাঁড়ালেন রাজশেখর। দেওয়ালে একটা ছোট ক্যালেন্ডার ছিল। সেটা সরাতে একটা ছোট লকার বেরলো। লকারে কোড দেওয়ার পর লকারটা খুলে সেখান থেকে ছোট একটা বাক্স বের করলেন রাজশেখর। ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “এই যে সেইটি”। 

ফেলুদা বাক্সটা খুলে কাগজটা টেবিলের ওপর রাখল। বিভিন্ন রঙের একটা ম্যাপ আঁকা আছে। ফেলুদা বলল, “এটার একটা ফটো তোলা যাবে?” 

রাজশেখর বললেন, “নিশ্চয়ই?” 

আমি ম্যাপটার ফটো তুলে নিলাম। ফেলুদা কাগজটা আগের মত বাক্সে রেখে রাজশেখরবাবুকে ফেরত দিয়ে বলল, “লক্ষ্মীমূর্তিটা এই লকারে রাখলেন না কেন?” 

রাজশেখর বললেন, “সেটাই প্ল্যান ছিল। সেদিন আমার লন্ডনের ফ্লাইট ধরার তাড়া ছিল। ড্রাইভার জানালো গোরুবাথান হয়ে নামতে হবে। রাস্তায় ধ্বস নেমেছিল। অগত্যা তাড়াহুড়ো করে বাবাকে দিয়ে...” ভ্রূ কুচকালেন রাজশেখর, “আমারই ভুল ছিল। বাবার বয়স হচ্ছে। হয়তো এ ঘরেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছেন... দেখা যাক”। 

বৈঠকখানায় গিয়ে দেখা গেল রুদ্রশেখরের বয়সী একজন ভদ্রলোক বসে আছেন। আমাদের দেখে রুদ্রশেখর বললেন, “পরিচয় করিয়ে দি, আমাদের চারটে বাড়ি পরের প্রতিবেশী অবিনাশ ভটচাজ। অবিনাশ দীর্ঘদিন ধরে কালিম্পং সদর হাসপাতালের সুপার ছিলেন। সম্প্রতি রিটায়ার করেছেন”। 

অবিনাশবাবু হাত জোড় করে নমস্কার করে বললেন, “রুদ্রর কাছে আমি আগেই শুনিচি। ফেলুবাবুর সঙ্গে আমার দেখা করার ইচ্ছে বহুদিনের। আর আমার নাতনি তো এখনও শোনেই নি যে জটায়ু কালিম্পঙে এসেছেন। শিভারিং ইন সাহারা পড়ে আমার নাতনি তো আপনার বিরাট ফ্যান হয়ে গেছে মশাই”। 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করে আমায় ফিসফিস করে বললেন, “বোঝো কাণ্ড, জটায়ুকে আজকাল ট্রান্সলেট করে পড়তে হচ্ছে”। 

ফেলুদা অবিনাশবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, “এ বাড়িতে যে একটা চুরির অ্যাটেম্পট হয়েছিল, সেটা শুনেছেন নিশ্চয়ই”? 

অবিনাশবাবু বললেন, “কী বলবো বলুন তো? আমি এতদিন ধরে এ অঞ্চলে আছি, গর্ব করে বলতাম যে বাড়ির দরজা হাট করে খুলে চলে গেলেও কেউ কিচ্ছু নিতে আসবে না। কালে কালে যে আর কত কিছু দেখতে হবে”। 

অবিনাশবাবু দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়লেন। 

***

৫

চা এলো। লালমোহনবাবু চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বন্ধ করে বললেন, “আহা। এতো স্বর্গ। কোন বাগান?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “লোকাল এক বাগানের। আমি নামটা জেনে নিয়ে বলবো। আমার এমন অভ্যেস হয়ে গেছে, এই চা খাওয়ার পর আমি আর অন্য কোন বাগানের চা খেতেই পারছি না, বাহাদুর দু মাস আগে এই চা নিয়ে এসেছিল। তার পর থেকে অন্য কিছু মুখে রুচছে না”। 

আমি আমার ফোন বের করে প্যাপিরাসে আঁকা ম্যাপের ছবিটা একবার দেখে নিলাম। ভাষাটা কিছুই বোঝা গেলো না। কতগুলো লাল নীল দাগ এদিক সেদিক গেছে। 

ফেলুদা বলল, “লালমোহনবাবু, আপনি সেদিন বলছিলেন না কালিম্পং এ কীসব ছিচকে চুরির ঘটনা ঘটেছে? মিস্টার আগরওয়াল চুরির ব্যাপারে কোন ইনফরমেশন দিয়েছিলেন আপনাকে?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলছিলেন বটে। ফোন করব একটা?” 

ফেলুদা বলল, “থাক এখন। ওর বাড়িতে তো যাবোই। তখন না হয় কথা বলে নেবো”। 

রুদ্রশেখর বললেন, “কোথায় যাবেন? আপনারা কি বেরোবেন?” 

ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়ালের বাংলোটা কি কাছাকাছিই পড়বে?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ, মাইল খানেক। লাঞ্চ করে বেরোবেন কিন্তু”। 

ফেলুদা মাথা নাড়ল, “নিশ্চয়ই”। 

অবিনাশ বললেন, “ছিচকে চুরির ব্যাপারটা কে বলেছেন বললেন?” 

ফেলুদা বলল, “মিস্টার আগরওয়াল বলছিলেন। কেন বলুন তো?” 

“আমিও সেরকম কিছু কথা সেদিন বাগানে গিয়ে শুনিচি। অতোটা কানে নিই নি। তবে ওই দিকের কয়েকটা বাড়িতে নাকি ইদানীং চোরের আনাগোনা বেড়েছে। যদি এই ছিচকে চোরই এদিকে আসে, তাহলে বাহাদুরকে আর ছাড়া যাবে না রুদ্রশেখর”। 

চায়ে চুমুক দিয়ে অবিনাশ কথাগুলো বললেন। 

রুদ্রশেখর বললেন, “বয়স বাড়ছে। ঘর দোর, সোনাদানা নিয়ে অতোটা কষ্ট হয় না মশাই, ফুলের গাছগুলো নষ্ট করলে বড্ড গায়ে লাগে। এখন তো ওইটেই আমার ধ্যান জ্ঞান হয়ে গেছে। এখানে যে সব অর্কিড আমি জোগাড় করে এনে রেখেছি, তা কালিম্পঙের বড় বড় নার্সারিতেও পাবেন না। তুমি জানো তো ইয়ং ম্যান, কালিম্পঙের নার্সারিগুলো কত বিখ্যাত?” 

রুদ্রশেখর আমাকে প্রশ্নটা করলেন। 

আমি মাথা নাড়লাম। 

রুদ্রশেখর বললেন, “সাহেবদের সৌন্দর্যবোধ প্রখর ছিল, এ কথা স্বীকার না করে পারা যায় না। মারডক সাহেবের হন্টেড হাউজে আমি এক ধরণের অর্কিড পেয়েছিলাম, কী করে সে জিনিস এখানে এলো, তা এখনও বুঝে উঠতে পারি নি”। 

লালমোহনবাবু চোখ বড় বড় করলেন, “বলেন কী মশাই, হন্টেড হাউজ? ঘোউস্ট? দেখেছেন?” 

রুদ্রশেখর হতাশার সঙ্গে মাথা নাড়লেন, “না মশাই। সে সৌভাগ্য হয় নি। সবাই শুধু শুনেছে। কেউই মনে হয় না দেখেছে”। 

অবিনাশবাবু বললেন, “আমার ড্রাইভার বলে ও নাকি দেখেছে। তবে ওকে আমার বিশ্বাস হয় না। সন্ধ্যে হলেই ও আর এ জগতে থাকে না। কাজেই বিশ্বাস করার প্রশ্নই ওঠে না”। 

ফেলুদা চা শেষ করে বলল, “মারডক সাহেবের বাংলোটি কাছাকাছি?” 

রুদ্রশেখর বললেন, “হ্যাঁ। এ পাড়াতেই”। 

ফেলুদা বলল, “হন্টেড হাউজটি ঘুরে দেখবার ইচ্ছে রইলো। ভূত বাবাজির সঙ্গে দেখা হলে মন্দ হবে না”। 

রুদ্রশেখর হাসলেন, “যাবেন, আমিও যাবো। প্রত্যক্ষদর্শী হবার সৌভাগ্য থেকে এ জন্মে বঞ্চিত হয়ে রইলাম বোধ হয়”। 

লালমোহনবাবুর গলায় ফোন ঝোলানো থাকে। বেশ কয়েকবার ফোন হারিয়েছেন উনি। শেষমেশ ফেলুদার পরামর্শে ফোনে দড়ি বেঁধে রেখেছেন। ফোন বেজে ওঠায় খানিকটা চমকে উঠে সেটা রিসিভ করলেন, “হ্যালো... হ্যাঁ ... হ্যাঁ আমরা এসে গেছি তো... দুপুরে?... ঠিক আছে”। 

ফোন রেখে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আগরওয়াল ফোন করেছিলেন। দুপুর তিনটে নাগাদ ওদিকটা একবার ঢু মেরে আসবো তবে?” 

আমি বুঝলাম না লালমোহনবাবু মগনলালকে এড়াতে চাইছেন নাকি। ফেলুদা ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে, আমরা ঘণ্টা খানেক থেকে ফিরে আসবো না হয়”। 

রাজশেখর এতক্ষণ বাইরে ছিলেন। ড্রইং রুমে এসে বললেন, “আপনাদের কোথাও যাবার হলে আমাদের গাড়িতেই যাবেন। ড্রাইভারের নাম্বার আমি টেক্সট করে দিচ্ছি। ও লোকালটা ভালোই চেনে”। 

অবিনাশবাবু উঠে দাঁড়ালেন, “আমি এখন চলি। বিকেলে না হয় একবার এদিকে ঢু মেরে যাবো। নাতনিকে নিয়েও আসতে পারি। জটায়ু আছেন শুনলে খুব বায়না করবে”। 

লালমোহনবাবু একগাল হাসলেন, “অবশ্যই আনবেন। লেখক মানে কী? পাঠক না থাকলে কি লেখকের কোন দাম আছে মশাই?” 

অবিনাশবাবু খুঁড়িয়ে হাঁটেন সেটা এখন দেখলাম। ফেলুদাও সেটাই লক্ষ্য করল বোধ হয়। অবিনাশবাবু বেরিয়ে যেতে রুদ্রশেখরবাবুকে সে কথাই জিজ্ঞেস করলে রুদ্রশেখর বললেন, “পড়ে গেছে বলল দু দিন আগে। বয়স হচ্ছে, বুঝতেই পারেন”। 

ফেলুদা “ও” বলে চুপ করে গেলো। 

***

৬ 

লাঞ্চ সেরে রাজশেখরবাবুর গাড়িতে আমরা আগরওয়ালের বাংলোর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। 

গাড়িতে উঠে আমার প্রশ্নটাই ফেলুদা করল লালমোহনবাবুকে, “আপনি কি মগনলালকে অ্যাভয়েড করতে চাইছেন নাকি?” 

লালমোহনবাবু জোরে জোরে মাথা নাড়লেন, “কভি নেহি। খামোখা ভয় পেতে যাবো কেন বলুন তো? এখানে তো আমরা কোন কিছু রক্ষা করতে আসি নি। রাজশেখরবাবু কী করবেন, সেটা তার ব্যাপার”। 

ফেলুদা বলল, “আমিও আপনাকে সেটাই বোঝাতে চাইছিলাম। এ ব্যাপারে অন্তত আপনার ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই। আপনি বরং বাংলোটা দেখুন। মগনলালকে নিয়ে ভাবার দরকার নেই”। 

আগরওয়ালের বাংলো কাছেই। আমাদের পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না। 

গাড়ি থেকে নেমে লালমোহনবাবু বললেন, “আচ্ছা ফেলুবাবু, আপনার কি মনে হয়, ওই গোল্ড মূর্তিটা রুদ্রশেখরবাবু হারিয়ে ফেলেছেন? অত দামী মূর্তি হারানোটা তো চাট্টিখানি কথা না মশাই! আমার তো ভদ্রলোককে দেখে মনে হল না উনি স্মৃতিভ্রম জাতীয় কোন রোগে ভুগছেন”! 

ফেলুদা বলল, “আপনি বলতে চাইছেন রাজশেখর বাপের কাছে আদৌ ওই মূর্তি দেনই নি?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “সেটা আমি কী করে বলবো ফেলু মিত্তির থাকতে?” 

ফেলুদা বলল, “বলে ফেলুন। পরে না হয় মিলিয়ে দেখা যাবে আপনার অনুমান ঠিক না ভুল”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “ধরুন ওই মূর্তিটা ইনসিওর করা আছে, আর তার জন্য রাজশেখরবাবুকে কোন গল্প সাজাতে হচ্ছে, এরকম কিছু হবার সম্ভাবনা আছে তো?” 

ফেলুদা বলল, “বিলক্ষণ। তার সম্ভাবনা একবারে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।  জটায়ুর মাথা আজকাল ভালোই খেলছে দেখছি”। 

লালমোহনবাবু খুব খুশি হয়ে আগরওয়ালের বাংলোর কলিংবেলে চাপ দিলেন। “আসুন আসুন মিস্টার জটায়ু, আমি আপনারই ইন্তেজার করছিলাম”। 

দরজা যে খুলল, তাকে দেখে লালমোহনবাবু কেন, সম্ভবত ফেলুদাও চমকে গেছে। 

আদি এবং অকৃত্রিম মগনলাল মেঘরাজ। বয়স হয়েছে, প্রায় সব চুলেই পাক ধরেছে, কিন্তু চোখ মুখের সেই ধূর্ততা এখনও একইরকম আছে। 

ফেলুদা আমার কানে কানে বলল, “যেখানে বাঘের ভয় ইত্যাদি প্রভৃতি”। 

লালমোহনবাবু ফ্যাকাসে মুখে বললেন, “আপনি এখানে?” 

মগনলাল দরজা ছেড়ে দিয়ে বলল, “আপনি ভেতরে আসেন আঙ্কেলজী। আগে বোসেন, তার পর বাকি কথা বলা যাবে”। 

ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল আপনার বন্ধু?” 

মগনলাল বলল, “চাইল্ডহুড ফ্রেন্ড। ওর কাছে আঙ্কেলজীর কথা শুনে আমিই তো হয়রান হয়ে গেলাম। আর্থ ইজ রাউন্ড, কী বোলেন ফেলুবাবু?” 

মিস্টার আগরওয়াল ড্রইং রুমেই ছিলেন। লালমোহনবাবুকে দেখে খুশি হয়ে বললেন, “মগনলাল বলল আপনাকে চেনে। বহুদিনের আলাপ নাকি!” 

লালমোহনবাবু হেঁহেঁ করলেও আমি বুঝলাম তিনি আগরওয়ালের উপর বেশ খাপ্পা হয়ে গেছেন। মগনলালের বন্ধু কি খুব ভাল লোক হতে পারে? 

ফেলুদা সোফায় বসে পড়ে মগনলালকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আপনি তাহলে রাজশেখরবাবুর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন?” 

মগনলাল ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনাকে উনি অ্যাডভাইসার রেখেছেন শুনলাম। আপনি এবারে আর আটকাবেন না মিস্টার মিটার, রাজশেখর ও মূর্তি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে বেচুক, আমি চাই না”। 

ফেলুদা বলল, “বেচতে নাও তো চাইতে পারে। হতে পারে ও মূর্তি ওর কাছে  নেই”। 

মগনলাল হাসিমুখে বলল, “ওর কাছেই আছে। শুধু ভ্যালুটা ঠিক দিতে হবে”।

ফেলুদা বলল, “আপনি এত কনফিডেন্ট হচ্ছেন কী করে?” 

মগনলাল ফেলুদার প্রশ্নটার উত্তর না দিয়ে বলল, “আগরওয়ালের বলছে এখানে অনেক চুরি হচ্ছে। শুনেছেন তো মিস্টার মিটার?” 

ফেলুদা বলল, “শুনেছি। পালিতদের বাড়িতে তার নমুনাও দেখেছি। আপনার কী মনে হয়? এ চোর বাইরের না লোকাল?” 

মগনলাল বলল, “চোর সবখানে আছে মিস্টার মিটার। পলিটিকাল লিডারদের কাছে মগনলাল বাচ্চা। লিটল চাইল্ড। বঙ্গাল ভাষায় কাহাবত আছে, ঠগ বাছতে গা উজাড় হোয়ে যায়। এখন সবাই চোর। আপনি ও মূর্তি নিয়ে ভাবনা চিন্তা ছেড়ে দিন। আঙ্কেলজীর জন্য বাংলো দেখুন, আমি আগরওয়ালকে বলে হেভি ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করিয়ে দিবো”। 

ফেলুদা হাসল, “আপনাকে আমি বহুবার বলেছি মগনলালবাবু। আমি ঘুষ নিই না। বার বার এক কথা বলাতে বাধ্য করাবেন না”। 

মগনলাল ফেলুদার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে রইল। আমি দিব্যি বুঝতে পারলাম, লালমোহনবাবুর প্রেশার চড় চড় করে বাড়ছে। ভদ্রলোক বেশ আগ্রহ নিয়ে বাংলো দেখতে এসেছিলেন। তার এই অবস্থা দেখে খারাপই লাগলো। 

***

৭

“হামি আপনাকে বলছে মিস্টার মিটার, ওই রাজশেখর পালিত উ সব এক্সপ্লোরার টোরার কুছু না। ও সব দিখাওয়া”। 

মগনলাল মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলল। 

ফেলুদা বলল, “এ কথা বলছেন কেন?” 

মগনলাল বলল, “কম দিন তো হলো না মিস্টার মিটার। এ সব চক্করে অনেক দেশ ঘুমে নিয়েছি। আমার কথা ইয়াকিন না হয় তো আপ আগরওয়াল জি কো পুছ লিজিয়ে”।  

ফেলুদা আগরওয়ালের দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি কি ঠিক বলছেন?” 

আগরওয়াল বলল, “সবটা ঠিক বলছেন নাকি আমি জানি না, তবে রাজশেখরকে আমি দুবাইতে দেখেছি ইসমাইলের সঙ্গে। সুপারনোভা বলে একটা গ্রুপ আছে। ডার্ক ওয়েবে কাজ করে। স্মাগলিং আর দুষ্প্রাপ্য জিনিস কেনা বেচা করা ওদের কাজ। তখন অবাক হয়েছিলাম”। 

ফেলুদা বলল, “আপনি ইসমাইলকে চিনলেন কী করে?” 

আগরওয়াল বলল, “আমার দাদাজির কাছে শাহজাহানের আমলের কয়েকটা আশরফি ছিল। কয়েক বছর আগে আমি ফতুর হয়ে গেছিলাম। আশরফি বিক্রি করা ছাড়া আমার আর কোন উপায় ছিল না। তখন ইসমাইল এখানে এসেছিল”। 

ফেলুদা বলল, “সেকি! মগনলাল মেঘরাজ থাকতে আপনাকে কি না ডার্ক ওয়েবের শরণাপন্ন হতে হল”! 

আগরওয়াল বলল, “আমরা বহুদিন ডিটাচড ছিলাম। মগন কাল ফোন করল। ইসমাইলের কথা আমিই ওকে বললাম”। 

মগনলাল বলল, “এই এক্সপ্লোরারের ধুলো দিয়ে এসব লোক স্মাগলড গুডস ইমপোর্ট এক্সপোর্ট করে”। 

ফেলুদা বলল, “আগরওয়াল তো তার দেখার কথা বললেন। আপনি রাজশেখরকে কোথায় দেখেছেন?” 

মগনলাল হাসিমুখে বলল, “সব বাত বলে দিলে কী করে হবে মিস্টার মিটার? আমি শুধু আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। ওই মূর্তি আর আমার মধ্যে আপনি থাকবেন না। তাহলেই হবে”। 

ফেলুদা বলল, “আমি পরের মুখে ঝাল খাই না মগনলালবাবু। লোকের কথা শুনে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার ধাতে নেই। আপনাকে যদি উনি বিক্রি করতে চান, তবে আমি বাধা দেবো না, সে কথা দিতে পারি। কিন্তু উনি যদি সেটা দিতে না চান এবং আপনি জোর করেন, সেক্ষেত্রে আমি কী করব, সেটা এখন কী করে বলি?” 

মগনলাল মাথা নাড়ল, “খুব ভালো মিস্টার মিটার, খুব ভালো। আপনি দেখে নিন, আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করবো না। আগরওয়াল, তুমি আঙ্কেলজীকো চা দেবে না?” 

আগরওয়াল কিছু বলার আগেই লালমোহনবাবু বললেন, “না না। আমি এখন কিচ্ছু খাবো না। আমার উপবাস চলছে”। 

মগনলাল ভ্রূ কুঁচকে বলল, “কীস চিজ কা উপওয়াস?” 

লালমোহনবাবু বললেন, “বলা যাবে না”। 

মগনলাল বলল, “ই তো আচ্ছি বাত নেহি আঙ্কেল। একটাই তো জীবন। না খেলে কী করে হবে?” 

ফেলুদা বলল, “আমরা তবে এখন উঠি। আপনি তো ও বাড়িতে যাবেনই। দেখুন রাজশেখর রাজি হন নাকি”। 

মগনলাল ঘাড় নাড়লো, “ঠিক আছে। কথা হোবে। আঙ্কেল বাংলো কিনবেন না?” 

লালমোহনবাবু দুদিকে জোরে জোরে মাথা নেড়ে বললেন, “না। কোন প্ল্যান নেই”। 

মগনলাল একইভাবে ঘাড় নেড়ে বলল, “বড়ি দুঃখ কি বাত, বড়ি দুঃখ কি বাত”।  

আমরা আগরওয়ালের বাড়ি থেকে বেরোলাম। বাইরে বেরিয়ে বড় করে শ্বাস নিয়ে লালমোহনবাবু বললেন, “বাব্বা! বাঁচলুম মশাই। কাঠমান্ডুর মত আবার চায়ে এল এস ডি দিয়ে দেওয়ার প্ল্যান করেছিল নাকি কে জানে”! 

ফেলুদা গম্ভীর হয়ে গাড়িতে উঠল। কোন কথা বলল না। ড্রাইভারকে বলল আমাদের কালিম্পং থানার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে। থানার সামনে বড় বাজার। মিষ্টির দোকানে সিঙ্গারা দেখে জটায়ু লোভ সামলাতে না পেরে দুটো সিঙ্গারা নিয়ে নিলেন। ফেলুদা বলল, “মগনলাল আপনাকে দেখলে নির্ঘাত জিজ্ঞেস করতো এ আপনার কেমন উপওয়াস আঙ্কেল?” 

চাটনিতে সিঙ্গারা মাখাতে মাখাতে লালমোহনবাবু বললেন, “দেখেছেন মশাই, ব্যাটা আগরওয়ালকে পর্যন্ত কব্জা করে নিলো। শৈলশহরে আমার বাংলো কেনার আশা মাঠে মারা পড়লো”। 

ফেলুদা বলল, “তোরা বাজারটা ঘুরে দেখ, আমি একটু থানা থেকে আসছি”। 

লালমোহনবাবু দ্বিতীয় সিঙ্গারাটা সামলাতে সামলাতে বললেন, “কী বুঝছো তপেশ, মগনলাল কি সত্যি কথা বলছে? রাজশেখর কি সত্যিই ঘুঘু?” 

আমি বললাম, “আগরওয়াল মিথ্যে বললেন বলে তো মনে হল না”। 

লালমোহনবাবু বললেন, “এই ডার্ক ওয়েব না কী যেন বলল, সেটা কী বস্তু বল তো? এখানে কালিম্পং এ বাংলো কেনা যায়?” 

***






Tuesday, 18 April 2023

বিশ সাল বাদ

 পর্ব ১

দরজার বেলটা বেজে উঠতেই মণিদি বলে উঠল,

“মক্কেল হলে পত্রপাঠ বিদেয় দেবে, বলে দিলাম কিন্তু। ক্রিমিনালদের পেছনে দৌড়তে পারবে না তুমি এখন….”

“বুড়ো হয়ে গেছি বলছ, মণি”? ফেলুদার ঠোঁটের কোণে হাসি, চোখ যদিও হাতের বইতে।

“তা তিপান্ন হল, বুড়ো না হলেও আধবুড়ো তো বলাই যায়”।

আমি জানি অবিশ্যি মণিদি কেন বলেছে। ক’দিন আগেই ক্রীক রো-র কেসে প্রোমোটারদের ভাড়াটে গুন্ডারা অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে ওকে ভালই জখম করেছে। পাঞ্জাবীর হাতাটা সরালে দেখা যাবে আপার আর্মে এখনো ব্যান্ডেজ। কেসটা অবশ্য সফল। সত্যিকথা বলতে কি এখনো পর্যন্ত ফেলুদার অসফল কেস হাতে গোণা।

আর ঐ বুড়ো টুরো সব বাজে কথা। এখনো অসম্ভব ফিট। যোগব্যায়াম তো আছেই। তার সঙ্গে আজকাল জিমে গিয়ে ওয়েট ট্রেনিং করে। 

“বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে মাসল ডিকে করে, বুঝলি তোপসে, তাই ওয়েট ট্রেনিংটা মাস্ট”।

মোটকথা এখনো আমার বয়সী লোকেদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।মজবুত শরীরে মেদের চিহ্ন মাত্র নেই। শুধু চুলটা সাদায় কালোয় যাকে বলে সল্ট আ্যন্ড পেপার আর চওড়া কপালে চিন্তার চিহ্ন একটু বেশী প্রকট।

“তুমি ভেবো না মণি, মক্কেল হবার চান্স কম। আজকাল মোবাইলে কল না করে কেউ আসে না।” বলতে বলতে গিয়ে দরজা খুলে দেয় ফেলুদা।

কিন্তু দরজা খুলতেই দেখা গেল সে ধারণা ভুল।

“আমি কি প্রদোষ মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে পারি একবার? ফোন করে আসতে পারিনি, নম্বর তো জানি না। কিন্তু আমার না খুব দরকার, জানেন।” এক নিঃশ্বাসে বলে চলেন ওপাশে দাঁড়ানো বছর পঁয়ত্রিশের ভদ্রমহিলা। 

“আপনি এসে বসুন আগে। তারপর কথা বলবেন”, মণিদি বলে ওঠে। পত্রপাঠ বিদেয় করাটা তাহলে শুধু কথার কথা ছিল!

ভদ্রমহিলা সোফায় বসার পর ফেলুদা উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলে,

“আমিই প্রদোষ মিত্র, ইনি আমার ভাই তপেশ আর উনি আমার স্ত্রী…”

“মণিকঙ্কণা !” বলে ওঠেন ভদ্রমহিলা । 

“পড়েছি তো ওঁর কথা। তপেশবাবুর লেখায়। নিউরোলোজিস্ট আপনি, না? আর কি ভাল যে গাড়ি চালান দিদি, মানে ম্যাডাম ..” উচ্ছ্বসিত ভদ্রমহিলা ।

“নিউরোসার্জন। আর আমাকে দিদিই বলুন বরং। আপনারা কথা বলুন, আমি আসছি। চা খাবেন তো?” মণিদি উঠে পড়ে।

“বলুন কি বলতে চান আমাকে।” একটা পা অন্যটার ওপর চাপিয়ে বলে ফেলুদা।

“আমি..আমার নাম সুতপা সামন্ত। হিস্ট্রির টীচার, কসবায় হেমনলিনী উচ্চ বিদ্যায়তনে। আসলে সেদিন ক্লাস নাইনের মেয়েদের পালবংশের ইতিহাস পড়াচ্ছিলাম। তো একটি মেয়ে…সুকৃতি সমাদ্দার…সে বলল যে পাল বংশের একটা আর্টিফ্যাক্ট ওদের বাড়িতে নাকি আছে। আমি চাইলে ও নিয়ে আসতে পারে। তো আমি ন্যাচেরালি বললাম হ্যাঁ ।”

মণিদি ইতি মধ্যে যশোদাদিকে দিয়ে চা আর ডালমুট পাঠিয়ে দিয়েছে।

“কি আর্টিফ্যাক্ট সেটা যদি একবার বলেন..”, নিজের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলুদা।

“আ্যঁ..সুতপা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। ও হ্যাঁ। নিশ্চয়ই। ওটা আসলে একটা তালপাতায় করা পেন্টিং। এই তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি হবে।”

“মিনিয়েচার পেন্টিং? ভেজিটেবল কলারে করা? বৌদ্ধ স্টাইলে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে। ওর এসব ব্যাপারে বেশ পড়াশোনা আছে।

“হ্যাঁ প্রদোষবাবু”।

“ সে তো পালযুগের বেশ ওয়েলনোন আর্ট। ওরকম একটা জিনিস ওদের বাড়িতে এল কি করে কিছু জানেন”?

“ওর দাদুর এসব কালেকশন ছিল। পুরোনো বড়লোক ফ্যামিলি। জমিদারী ছিল আগে বাঁকুড়ার কোথায়।আমাদের মত স্কুলে ওদের পরিবারের সচরাচর কেউ পড়ে না। সুকৃতিও আগে লোরেটো বউবাজারে পড়ত। তারপর সেখান থেকে টিসি নিয়ে এখানে। বাড়ির কাছে হবে বলে”

“তারপর কি হল বলুন।”

“ও সেদিন ওটা তো ক্লাসে নিয়ে এল। দেখানো হল। মেয়েরা সবাই খুশী। ওদিকে পরশু দোলের ছুটি শুরুর আগে আমাদের স্কুলে একটা ফাংশন আর এক্সিবিশন আছে। থীম হল বাংলার কৃষ্টি। আমরা ভাবলাম তার জন্য ওটা যদি দুদিন রেখে দেওয়া যায়। সুকৃতির বাড়ির লোকও আপত্তি করেনি। আমি তখন আমাদের বড়দির সঙ্গে কথা বলে ওটা বাড়ি নিয়ে গেলাম। কাছেই বাড়ি আমার। সুকৃতিও চেনে। তো বাড়িতে আমার দেরাজে রেখেছিলাম পরশু। আজ সকালে দেখি নেই…”

“খুঁজেছেন ভাল করে? অন্য কোথাও রাখেননি তো? ভুল করে? “

“তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি প্রদোষবাবু। একা থাকি আমি। বাবা মা থাকেন বোলপুরে। এখানে দুকামরার বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকি। সামান্য আসবাব। হারানোর অত জায়গাই বা কোথায়?”

“বাড়িতে কে কে এসেছিল এর মধ্যে ?”

“কাজের মেয়েটি আসে রোজ সকালে। ও যখন ঝাঁট দেয়, আমি ঘরেই থাকি। আর ও তো জানেও না ওটা আমি এনে রেখেছি..”

“অন্য কেউ? আত্মীয়, বন্ধু? কোলীগ? ছাত্রী?”

“বাড়িতে আসার মত সেরকম বন্ধু আমার এখানে কেউ নেই মিঃ মিত্র। ছাত্রীদের মধ্যে সুকৃতি এসেছিল। আমার থেকে শরদিন্দুর গৌড়মল্লার ধার নিতে। ও জানে ওটা আমার কাছে। কিন্তু ও নিজের জিনিস এভাবে নিজে চুরি করবে কেন? এক্সিবিশনের পর তো ওটা ও এমনিই ফেরত পাবে…”

“হারানোর কথাটা বলেছেন কাউকে এখনো?”

“কাউকে না মিঃ মিত্র। কাকে বলব? সুকৃতিকে বলা যাবে না। আর বড়দি আমায় এমনিই বিশেষ পছন্দ করেন না। জানতে পারলে আমার চাকরী নিয়ে টানাটানি পরে যাবে। বাড়িতে অসুস্থ বাবা, মা, আধবেকার ভাই…

আপনিই পারেন একমাত্র আমাকে বাঁচাতে প্রদোষবাবু! 

ছোটবেলা থেকে ফেলুদার কত গল্প পড়েছি…খুঁজে দিতে পারবেন না ওটা পরশুর মধ্যে”?  সুতপা দেবীর চোখ ছলছল, গলা কাঁপছে।

এধরণের কথাবার্তায় ফেলুদার প্রবল অসোয়াস্তি হয় আমি জানি। ভদ্রমহিলা না হয়ে ভদ্রলোক হলে হয়তো এতক্ষণে কিছু বলে ফেলত। ভিতরের দিকে তাকাচ্ছে, যদি মণিদি এসে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে এই আশায়। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ নেই।

“দেখুন এভাবে তো গ্যারান্টী দিয়ে কিছু বলা যায় না, তবে আমি চেষ্টা করব কথা দিচ্ছি। কিন্তু সেটা করতে গেলে আমার কিছু লোকজনের সঙ্গে কথা বলা দরকার। এদিকে আপনি তো কাউকে কিছু বলেননি…ধরুন যদি সুকৃতি বা আপনাদের স্কুলের কারো সঙ্গে কথা বলতে হয়…আসল কারণটা তাদের বলা যাবে না তো, তাই না?” ফেলুদা অবশেষে বলল।

“না,”রুমালে চোখ মুছে বলেন সুতপা দেবী।

“ঠিক আছে।আপনি এক কাজ করুন, আপনার ঠিকানা, ফোন নাম্বার, স্কুলের ঠিকানা আর সুকৃতির বাড়ির ঠিকানাটা আপাততঃএখানে লিখে দিন”। আইপ্যাডটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে ফেলুদা।

“আমি বেরোচ্ছি প্রদোষ। ঠিক টাইমে খেয়ে নিয়ে যশোদাদিকে ছেড়ে দিও। আর ঐ চোটের জন্য পেইনকিলার গুলো মনে করে খাবে।”মণিদি হাসপাতালের জন্য রেডি।

“তুমি কসবায় ওঁকে নামিয়ে দিয়ে যেতে পারবে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে ।

“হ্যাঁ। আমার তো প্রায় রাস্তাতেই পড়বে। আসুন”।

“আপনার গাড়িতে, ঈশ ভাবতে পারছিনা ম্যাডা…মানে দিদি!“ 

মনে হল সুতপার জীবনে সমস্যা টমস্যা নেই আর কিছু!

উনিও হয়তো বুঝলেন ব্যাপারটা। তাই তাড়াতাড়ি বললেন, 

“আসলে না…আমি, মানে আমরা সবাই সেই ছোটবেলা থেকে এত ফেলুদা ভক্ত! আজকাল তো শুনি ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা অত পড়ে না। কিন্তু আমাদের সময়…আপনার আগের দিকের গল্পে তো মেয়েদের কোনো রোলই ছিল না, খুব খারাপ লাগত জানেন…নিজেকে কোথাও দেখতে পেতাম না তো! তাও পড়তাম, এত টানটান কাহিনী। তারপর যখন থেকে দিদি এলেন গল্পে…আমরা সবাই কেমন যেন মণিকঙ্কণা হয়ে গেলাম…”

ভদ্রমহিলা না থামলে এবার নির্ঘাত ফেলুদা কেসটা ছেড়ে দেবে। 

“আসুন। বাকীটা গাড়িতে যেতে যেতে শুনব”।

মণিদি উদ্ধার করে।

                     —————-

“কি অবস্থা তোর তোপসে? পুকাই তো এখনো সান দিয়েগোতে। বিচ্ছু দুটোকে সামলাচ্ছিস কি করে?”

“আর বোলোনা ফেলুদা। আমার এখন দুটো সেট অফ টীচিং। একটা ব্যাচেলর আর একটা মাস্টার্স কোর্স। নাজেহাল করে দিচ্ছে একেবারে। আর এমন পাজি মেয়েদুটো, কিছু বললেই বলে মাম্মা থাকলে এরকম করত না। অথচ আমি বেশ জানি পুকাই থাকলে আগেই দুঘা কষিয়ে দিত। তবু তো মা আছে বলে রক্ষা।”

“কাকীমাকে অত ধকল নিতে দিস না। বয়েস হয়েছে তো! ওদের এখানে পাঠিয়ে দে।আমাদের তো এখন এম্পটি নেস্ট। সেই একই তো রজনী সেন রোড…দুশ মিটার এদিক ওদিক।”

“আরে তুমি আর মণিদি দুজনেই এত ব্যস্ত…”

“তা বলে এটুকু যদি না করা যায় তো এত কাছে বাড়ি করে লাভটা কি হল?”

“যাকগে, সুতপার কেসটা কি বুঝলি বল।” 

ফেলুদা একটা চুয়িংগাম মুখে দিয়ে বলে। সিগারেটটা ও ফাইনালি ছেড়েছে। মণিদি পারেনি। কিন্তু আমার যমজ ভাইপো-ভাইঝি ঋক আর ঋতু সেই অসাধ্য সাধন করেছে।

ঋক গত বছর হাভার্ডে ডাক্তারী পড়তে ঢুকেছে।ও মণিদির মতই হবে, হয়তো আরো ব্রিলিয়ান্ট।ঋতুও গেল একই সঙ্গে কেমব্রিজে বায়োকেমিস্ট্রি পড়তে।ফরেনসিক সায়েন্সে স্পেশালাইজেশন করার ইচ্ছে।

ফেলুদা কখনো বলেনি কিছু; কিন্তু আমি, জটায়ু, মণিদি সবাই দেখেছি বাপ বেটিতে অসম্ভব মিল! সেই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সেই একাগ্রতা, সেই ক্ষুরধার বুদ্ধি! আর সাহস তো আছেই, বাপ-মা দুদিক থেকেই।ফেলুদার লেগাসী যদি কেউ বহন করতে পারে তো সে….

“কি রে, বললি না তো! কলেজে পড়াতে পড়াতে কি ডিটেকশন একদম ভুলে মেরেছিস?” ফেলুদার ঠোঁটের কোনে হাসি।

“না ভুলব কেন? ভদ্রমহিলাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল…সালোয়ারের ওড়নাটা তো মনে হল একেবারে বেমানান। তারপর কথা বলতে বলতেও…দুবার তোমাকে প্রশ্ন রিপীট করতে হল।”

“সেটা কি অস্বাভাবিক এরকম ক্ষেত্রে”?

“হয়তো না…কিম্বা এমনও হতে পারে উনি তোমাকে সবটা বলছেন না। মানে সাহায্যটা দরকার অথচ পুরো জিনিসটা বলতে পারছেন না……”

“ভেরি গুড”!

“আর তাছাড়া…”

“তাছাড়া কি?”

“সবচেয়ে আশ্চর্য হল ঐ মেয়েটির লোরেটো ছেড়ে ঐ স্কুলে আসা। শুধু বাড়ির কাছে বলেই কি কেউ এরকম করে?”

“এক্সসেলেন্ট!কেন যে তুই ফুল টাইম ডিটেকটিভ হলি না..”

“রক্ষে কর ফেলুদা। বাড়িতে একজনই যথেষ্ট। আর আমি ইনডিপেন্ডেন্টলি একাজ করতেও পারতাম না। আমাদের ফ্যামিলিতে যদি আর কেউ এদিকে যায় তো সে হবে ঋতু…তুমি কখনো ওর সঙ্গে সিরিয়াসলি কথা বলেছ, ফেলুদা?”

“ও কি করবে সেটা ওকেই ঠিক করতে হবে ! আমি বা মণি তো ওদের কিছুতে জোর করিনি, বাধাও দিইনি। ঋক যেমন জানে ও ডাক্তারী করবে। ঋতুর ডিটেকশনের ক্ষমতা আছে আমি জানি। কিন্তু সেটাই তো যথেষ্ট নয়। ইচ্ছেটাও দরকার। আর ও তো ছোট থেকে দেখেছে এই কাজের অসুবিধেগুলো। এই যে বুড়ো বয়েসে হাতে ব্যান্ডেজ করে বসে আছি… খুব প্যাশন না থাকলে এইসব রিস্ক নেওয়ার চেয়ে অনেক কেরিয়ার আছে যাতে …

…কি হল হাসছিস যে?”

“তুমি কিন্তু মণিদির বাবার মত কথা বলছ প্রায়…মনে আছে কি বলেছিলেন উনি? তুমি বাবা হলে বুঝতে পারবে প্রদোষ…”

“তোপসে,মাঝে মাঝে মনে হয় সেই ছোটবেলাকার রামগাঁট্টা তোর এখনো দরকার…”

“…যাকগে, তোর সময় থাকে তো চল বউবাজার”।

“লোরেটো?”

“হুম। ছাত্র ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে একেবারে গেঁজে যাসনি তাহলে।”

“ওখানে কি সিস্টার আ্যগনেসের সঙ্গে কথা বলবে ?”

“বলতে পারি। তবে তার আগে ক্লাস নাইনের মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে সুবিধে হবে।”

“কি করে হবে সেটা ?”

“দেখি খ্যাতির বিড়ম্বনাটাকে কাজে লাগানো যায় কিনা..”

“জটায়ুকে বলে দিই? গড়পার থেকে চলে আসুন”?

“তথাস্তু”।

খবরের কাগজ, টেলিভিশন এবং সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ফেলুদার মুখ এখন বেশ পরিচিত। কাজের সুবিধার জন্য ও অনেক সময় তাই আজকাল একটা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর তারসঙ্গে দিনের বেলা হলে একটা সানগ্লাস নেয়।

কিন্তু আজ কোনোটাই না নিয়ে লোরেটো হাউসের ঠিক সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইল ।

ফলে মিনিট কয়েকের মধ্যেই একে একে দুয়ে দুয়ে চারপাশে বেশ ভিড় হয়ে গেল। বেশীরভাগই স্কুল ছাত্রী। অটোগ্রাফ চায়। খাতায়, ডাইরীতে।ফেলুদা কল্পতরু হয়ে সবাইকে চাহিদা মেটাতে লাগল। 

“কোন ক্লাসে পড় তুমি”? সই করতে করতে একজনকে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।

“ক্লাস টেন।”

“আমি একজনকে চিনতাম, সে বোধহয় নাইনে পড়ে..”

“ঐ তো শ্রীপর্ণা নাইনে পড়ে। এদিকে আয়…কাকে চেনেন আপনি?”

“সুকৃতি। সুকৃতি সমাদ্দার। চেন? ওর বাবাকে চিনতাম আমি একসময়”। অম্লান বদনে বলে ফেলুদা।

“না ঐ নামে তো…শ্রীপর্ণা একটু বিভ্রান্ত”।

“সুকৃতি তো আর এখন এখানে পড়ে না। আগে পড়ত। ছেড়ে দিল তো এইটে।আপনি কি করে চিনলেন ওকে? ধরা পড়েছিল নাকি আপনার কাছে?” চশমা পরা একটি মেয়ে বলে ওঠে।

“ধরা পড়বে মানে? কিসের জন্য”?

“চুরির জন্য। আবার কেন? এখানে তো ও মৌপিয়ার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছিল। তাই তো টিসি পেল।”

“না। আমি ওকে কোনো চুরির ব্যাপারে কিছু বলিনি। 

যাকগে। এবার যেতে হবে আমাকে। ঐ যে রাস্তার ঐ পারে আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন…” 

লালমোহনবাবুকে হাত নাড়ে ফেলুদা।

“কে জটায়ু? উনি খুব হাসান, না?”

“না, উনি ইচ্ছে করে হাসান না, কিন্তু উনি একজন সরস মানুষ।”

“তোপসে কি এখনো আপনার আ্যসিসট্যান্ট”?

“ও কলেজে ফিজিক্স পড়ায়। তবে সময় পেলে আমায় সাহায্য করে বই কি!”

“আর মণিকঙ্কণা ? উনি কি এখনো সবার হার্টথ্রব?”চশমা পড়া ঐ মেয়েটাই সবচেয়ে পাকা!

“সবার খবর জানিনা, তবে আমার তো বটেই।”

বলে হাঁটা লাগায় ফেলুদা।

                 ——————-

“কি মশাই, এই ইয়ার এন্ডিং এর আগে আবার কেস পেয়ে গেলেন?” 

জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন গাড়িতে উঠে। গত বিশ-বাইশ বছরে উনি প্রায় একই রকম আছেন। টাকের পেছনে চুলগুলো শুধু এখন বেশীরভাগ পাকা আর হাসলে ঠোঁটের পাশে লাফ লাইনগুলো আরো বেশী প্রকট হয়ে ওঠে এই যা। একজন ষাটোর্ধ ব্যক্তির পক্ষে উনিও বেশ ফিট।

“অপরাধীদের কি আর ইয়ার এন্ডিং আছে মশাই, যে আমার থাকবে?”

“তা আপনার হাতের চোটের কি অবস্থা? মণিকঙ্কণা আপনাকে ছাড়লেন যে বড়?”

“হুম। মণি গন্ডোগোলের তালে ছিল, কিন্তু নিপীড়িত মহিলা দেখলে আবার ওর প্রাণ কাঁদে তো, তাই…”

“তা আপনার মক্কেল কি মহিলা নাকি মশাই?”

“মক্কেল, সাক্ষী সবাই। এক মেয়ে স্কুল ভর্তি। শুধু অপরাধী পুরুষ না মহিলা এখনো সেটা জানি না।”

“এ তো তাহলে আমাদের সেই আগের গপ্পগুলোর উল্টো হয়ে গেল মশাই…সেই যে তপেশ লিখত আর যত্ন করে মেয়েদের ছেঁটে বাদ দিত…”

“না লালমোহনবাবু, ইচ্ছে করে কেন হবে…”আমি প্রতিবাদ করে উঠি…”

“তা খানিকটা তো ইচ্ছে করেই ভাই! সত্যি কি ওরকম হয়? সবাই হয় বিপত্নীক নয় ব্যাচেলর।একটা কাজের মাসি অব্দি নেই, সব পুরুষ চাকর। আসলে তখন তো আর রূপমঞ্জরী আসেননি তোমার জীবনে, দুই কন্যার পিতাও হওনি। তোমার ধ্যানধারণা অন্যরকম ছিল তখন। সত্যি কথা বলতে কি, মণিকঙ্কণার সঙ্গে সেবার কেদারে আলাপ না হলে তোমরা দুজনেই ব্যাচেলর হয়েই থেকে যেতে।”

“অদ্ভুত কথা তো! জগতে কি আর মেয়ে ছিল না নাকি…”

“তা থাকবে না কেন? কিন্তু তোমাদের এই দুই ভাইকে ঐ দুই বোন মণিকঙ্কণা আর রূপমঞ্জরী—“

“যাঁদের পুরো নাম ধরে আপনি ছাড়া কেউ ডাকে না…”

ফেলুদা বলে ওঠে। 

“বেশ করি! কোথায় রূপমঞ্জরী আর কোথায় পুকাই। রামঃ”

“হরিপদবাবু, এবার কসবা চলুন”, ফেলুদা নির্দেশ দেয়।

“এবার কি হেমনলিনী বিদ্যায়তন”?

“ইয়েস স্যর”!

***

পর্ব ২

হেমনলিনীর সামনে যখন এলাম তখন চারটে বেজে গেছে। দু-চারজন ছাত্রী ঘোরাফেরা করছে, তবে বেশীরভাগই বাড়ি চলে গেছে মনে হল। স্কুলবাড়ি আর ছাত্রীদের চেহারা দুটোই লোরেটোর চেয়ে অনেক আলাদা।

আমি ভাবলাম ফেলুদা বোধহয় আবার ওর স্টার পাওয়ার ব্যবহার করবে। কিন্তু তা না করে ও সোজা চলে গেল স্কুলের ভেতর। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে একদম হেডমিস্ট্রেস বিশাখা দত্তর ঘরে।

“মিঃ মিত্র আপনি…কি সৌভাগ্য ….কিন্তু কি ব্যাপারে…মানে আমি তো কিছু…” 

নমস্কার বিনিময়ের পরেই বলে ওঠেন বিশাখা দেবী।

“ না না, ঘাবড়াবেন না আপনি…একটা তদন্তের ব্যাপারে আসতে হল আরকি! আপনি যদি কয়েকটা ইনফরমেশন দিতে পারেন…”

“তদন্ত? কিসের ব্যাপারে বলুন তো”?

“একটু কনফিডেন্সিয়াল ব্যাপার …তবে বৌবাজার লোরেটোর সিস্টার আ্যগনেস একটু চিন্তিত ওঁর স্কুলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দু একটা চুরির ঘটনা নিয়ে। ওখানকার মেয়েরা তো প্রায় সকলেই ওয়েল অফ ফ্যামিলির…তাই অন্য কোনো কারণের আগে ড্রাগ প্রবলেমের কথাটাই মাথায় আসে..।” 

ফেলুদা একটা বিরতি নেয়।

“গতবছর আপনার স্কুলে ওখান থেকে একটি মেয়ে ভর্তি হয়, ঠিক না? সুকৃতি সমাদ্দার ? ওকেও তো টিসি দেওয়া হয়েছিল ঐ চুরির অভিযোগে, তাই না?”

ফেলুদা এবার সোজা আ্যটাকিং মোডে।

“হ্যাঁ , সুকৃতি লোরেটো থেকে টিসি নিয়ে এসেছিল। টিসিতে কোনো অভিযোগ কিন্তু লেখা ছিল না। ওঁরা হয়তো চাননি ওর অন্য কোথাও ভর্তির পথটা বন্ধ করতে…”

“আপনি খোঁজ নেননি আর বিশদে?”

“না মিঃ মিত্র। ওদের পরিবার এখানকার নামকরা পরিবার। ওর বাবা, দাদু নিজেরা এসেছিলেন। আমাদের স্কুল তো দেখছেন। বেশীরভাগ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আমরা অত চুজি নই। আর সুকৃতি ওখানে মাঝারি ছাত্রী ছিল, আমাদের এখানে তার মানে বেশ উঁচুর দিকে। গত একবছরে কোনো অভিযোগ তো ওঠেনি…চুরির কিম্বা ড্রাগের…।”

“সুকৃতির সঙ্গে কথা বলা যায় একবার? মানে ওর বাড়িতে না গিয়ে? সম্ভব হলে স্কুলে। ওর বাড়ির লোককে এখনই জড়াতে চাইছিনা আর কি…”

“সে হয়তো ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু কি জানতে চান আপনি ওর কাছে? ও তো লোরেটো ছেড়েছে একবছরের ওপর হল। ওখানে এখন যাই ঘটুক না কেন…”

ফেলুদা হাত তুলে বিশাখা দেবীকে থামিয়ে দেয়।

“আমি শুধু জানতে চাই ও ওখানে থাকাকালীন কোনো ড্রাগডিলারকে চিনত কিনা।”

“ঠিক আছে। কাল তাহলে দুপুরে আসুন একবার। আমি সুকৃতিকে বলে রাখব। আমার অফিসের পাশের ঘরে বসে আপনি কথা বলে নিতে পারবেন। তবে…”

“হ্যাঁ বলুন…”

“স্কুলের মধ্যে ছাত্রীদের প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব আছে। আপনার জিজ্ঞাসাবাদের সময় সঙ্গে কোনো মহিলা থাকলে ভাল হয়…”

“আমার বয়স তিপান্ন বিশাখা দেবী। আমার মেয়ের বয়স সুকৃতির চেয়ে বেশী! তবু বলছেন যখন, আমি সঙ্গে করে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসব। তাতে হবে তো?”

“মণিকঙ্কণা! অবশ্যই হবে। উনি যে সর্বকর্মে পটিয়সী, সে তো শরদিন্দুই বলে গেছেন।দাঁড়ান, আপনাদের জন্য একটু শরবত বলি…সুব্রতা..!”

“আপনি ব্যস্ত হবেন না বিশাখা দেবী, আমরা…”

“না। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আপনার কত বড় ফ্যান আমি জানেন? এখন শরবত খাবেন, আমাকে অটোগ্রাফ দেবেন তবে যাবেন। নাহলে কিন্তু সুকৃতির সঙ্গে আ্যপয়েনমেন্ট ক্যান্সেল কাল! 

আমাদের আবার একটা ফাংশন আছে পরশু। বসন্ত উৎসবের। সেই সঙ্গে এক্সিবিশন, বাংলার কৃষ্টির ওপরে।আসতে হবে কিন্তু আপনাদের বলে রাখলাম।”

“তা টেবলে এইসব রঙের গুঁড়ো কি ঐ বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি”?

চোখ বটে ফেলুদার! ও পাশের ডেস্কের ডানদিকের কোনে কিছু গুঁড়ো মেটে লাল আর নীল রং, সেদিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করল ও।

“দেখেছেন কান্ড! ঐ আবীর টাবীর গুলো কিনে এনে রিসিট সব সাবমিট করে তুলে রাখার সময় এইটি করেছে। দেখবে তো একটু…কোথায় যে গেল সুব্রতা…একটু ওয়েট করুন আমি ওকে বলে আসছি এখুনি।”

                    ————————-

রজনী সেন রোডে ফেলুদার বাড়িতে ঢুকেই দেখি আসর সরগরম। মা এসেছেন তাঁর দুই নাতনীকে নিয়ে। মণিদিও আছে।

আমরা ঢুকতেই দুবোনে গিয়ে লালমোহনবাবুর থেকে চকলেট আদায় করল—ওটা ওদের অলিখিত চুক্তি ।

“জ্যেঠু, স্পাইডারম্যান আর ক্যাট উইম্যানের মধ্যে যুদ্ধ হলে কে জিতবে বলতো? আমি স্পাইডারম্যান আর দিদি ক্যাট উওম্যান” বলে ওঠে কেকা।

“এটা তো লীডিং কোয়েশ্চন হয়ে গেল, কেকা বুড়ি।” ফেলুদা হেসে ওর চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল।

“লীডিং কোয়েশ্চেন মানে?”

“মানে যেটার আ্যনসার কি হতে পারে সেটা আগে থেকে ঠিক করা থাকে। না জ্যেঠু”? রাকার প্রশ্ন।

“একদম ঠিক। শিখলি কোথায়”? ফেলুদা জানতে চায়।

“ঋতু দিদি শিখিয়েছে। ও গোয়েন্দা হবে তোমার মত আর আমি ওর আ্যসিসট্যান্ট বাবার মত”। রাকার ঘোষণা।

“আর আমি?” কেকা কাঁদ কাঁদ।

“তোকে জটায়ু করে দেব”। দিদি আশ্বাস দেয়।

“না আমি জটায়ু না—-আমার কি টাক নাকি মাথায়”?

প্রমাণ স্বরূপ ঝাঁকড়া চুলগুলো দুলিয়ে বলে কেকা।

“আমি আর ঋকদাদা তাহলে আর একটা গোয়েন্দা হব”, কেকা জানিয়ে দেয়।

“ঋকদাদা তো ডাক্তার হবে, জেম্মার মত। হাঁদা কোথাকার।” দিদির গম্ভীর ভর্ৎসনা।

“তুমি কিচ্ছু ভেব না, কেকা বুড়ি। তোমাকে প্রখর রুদ্র বানিয়ে দেব। তোমার বাবা, জ্যেঠু এরা আর কি গোয়েন্দা…আসল গোয়েন্দা তো প্রখর রুদ্র” বলে ওঠেন জটায়ু।

“কণিষ্কের মুন্ডু উদ্ধার করেছেন উনি, রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরির কিনারা করেছেন, এমনকি জ্যাক দ্য রিপার কে খুঁজে শাস্তি দিয়েছেন…”

“করতে গিয়ে ক্রনোলজি, রিয়্যালিটি -এগুলো একটু ঘেঁটে গেছে যদিও, কিন্তু সে সব তো মাইনর ব্যাপার।”


বলতে বলতে উঠে গিয়ে ফ্যানের রেগুলেটরটা বাড়িয়ে দেয় ফেলুদা। ওর কি গরম লাগছে নাকি! আমার তো শীত শীত করছে বেশ!

“ওসব বললে আমি শুনছি না ফেলুবাবু! আপনার তাও দু একটা আংশিক ব্যর্থতা আছে।কিন্তু আসল কথা হল প্রখর রুদ্র হার মানেনি কখনো…”

“না। কেবল হার মেনেছেন আইনস্টাইন।স্পেস, টাইম আর কস্যালিটিকে যে ভাবে ঘেঁটে ঘন্ট করেছেন আপনার গপ্পের গোয়েন্দাকে জেতাতে গিয়ে…”

ডান হাতটা একবার ঘাড়ের ওপর দিয়ে বুলিয়ে আনল। ওর কি শরীর খারাপ লাগছে নাকি? অসুখ বিসুখ তো হয়ই না প্রায় কখনো ওর।

“কাকীমা, পুকাইএর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। তোমার নী রিপ্লেসমেন্টের ডেট নিতে বলে দিয়েছে।” মণিদি মাকে বলে।

“না না। আমার হাঁটু বেশ আছে। এই বয়সে অত কাটাছেঁড়ার কোনো দরকার নেই।” মা কিছুতেই রাজী নয়।

“সে তো ডাক্তার বুঝবে নাকি! পুকাই বলেছে কোনো বাহানা না শুনে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যেতে।”

“ঐ আমেরিকায় বসে শাশুড়ির ওপর হুকুম চালাতে বারণ করে দিও তোমার বোনকে মণি”।

“তা আমেরিকায় থাকা বৌমা অপছন্দ হলে আমি তো আছি এখানে, তোমার দেশি বৌমা! সোজা নিয়ে গিয়ে ফেলব ওটিতে” মণিদি  বলে দেয়।

“চোরে চোরে মাসতুতো ভাই শুনেছিলাম। আর গুন্ডায় গুন্ডায় মামাতো-পিসতুতো বোন এই তোমাদের দেখলাম। যখন আমাদের বাড়ি প্রথমদিন এসে আমার নাকের সামনে আরশোলা ঝুলিয়েছিলে তখনই বোঝা উচিত ছিল আমার।”

“বাজে কথা বোলো না কাকীমা। তুমিই আরশোলা দেখে ভয়ে চিল চিৎকার ছেড়েছিলে, আমি গিয়ে রেসকিউ করলাম।”

“হি হি, ঠাম্মি আরশোলা ভয় পায়, জ্যেঠু দেখ….

জ্যেঠু!! ….জ্যেঠু কি হল তোমার…” কেকা কেঁদে ওঠে।

ফেলুদার ঘাড়টা অদ্ভুতভাবে সোফায় হেলানো।চোখ বন্ধ।হাতদুটো দুপাশে ছড়ানো

***

পর্ব ৩

“প্রদোষ!”..

“ফেলুদা!!”

“ফেলুবাবু!!”

“ফেলু!!”

আমাদের কারো ডাকে সাড়া নেই।

“তপেশ, আমার ব্যাগটা, বেডরুমে আছে, ক্যুইক।”মণিদি পালস দেখতে দেখতে বলে।

“লালমোহনবাবু, আ্যম্বুলেন্স”।

আ্যম্বুলেন্স আসার আগেই অবশ্য ফেলুদার জ্ঞান ফিরে এল।কিন্তু ওকে বেশ কনফিউসড দেখাচ্ছে।কথাটাও অল্প জড়িয়ে যাচ্ছে।মণিদি দেখে নিয়েছে পালস রেট একটু হাই আর ব্লাড প্রেসারও। যদিও এসব কোনো সমস্যা ওর আজ অব্দি নেই।

“অ্যাম্বুলেন্স বারণ করে দাও মণি। হয়তো একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে…” ক্লান্ত গলায় বলে ফেলুদা।

“ওর কথা শুন না মণি, সোজা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চেক আপ করাও।” মা বলে ওঠে।

“সে তো করাবই…” বলতে বলতে মণিদির ফোন বেজে ওঠে।

ঋতু করেছে কেমব্রিজ থেকে। স্পীকারে দিয়ে দিলাম।

“কি ব্যাপার মা, বাবার ফোন বেজে যাচ্ছে কেন?” 

মণিদি দুকথায় বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা…

“…মনে তো হচ্ছে সিজ্যুর…কারণটা বুঝতে পারছি না…”

“আর কি কি সিম্পটমস আছে বলতো ঠিক করে?”

“বিপি আর পালস রেট একটু হাই। আর ঐ তো বলছে হেডেক…একটু কনফিউসড…ফানি ফিলিং ইন দ্য স্টম্যাক।স্পীচটাও একটু স্লারি লাগছিল…তোর বাবা না হয়ে অন্য কেউ হলে বলতাম আ্যলকোহল ইনএব্রিয়েশন…”

“বাবাকে দাও তো মা। শীগ্গীর…”

মাঝপথে বলে ওঠে ঋতু।

“হ্যাঁ ঋতু, চিন্তা করিস না রে, বয়েস হচ্ছে তো, এরকম একটু আধটু…”

ফেলুদার গলা এখনো ক্লান্ত।

“তোমার কাছে কি কোনো নতুন কেস এসেছে, বাবা?”

“হ্যাঁ , আজ সকালেই। কিন্তু তুই কি করে জানলি..”

“কারণ আমি ফেলু মিত্তিরের মেয়ে। তদন্তে বেরিয়েছিলে নিশ্চয়ই…কিছু খেয়েছিলে? মক্কেল, উইটনেস, সাসপেক্ট কারো থেকে…?”

“শরবত !” আমি আর জটায়ু বলে উঠি একসাথে।

“তবে তো হয়েই গেল। মা, মন দিয়ে শোন। এক্ষুণি ভাস্বরমামাকে কনট্যাক্ট কর।টক্সিকোলজিতে আছে তো। আস্ক হিম আ্যবাউট দ্য আন্টিডোটস অফ ইথিলীন গ্লাইকল। ব্লাড টেস্টের রেজাল্টের জন্য ওয়েট করবে না। সময় লাগবে। ততক্ষণে কিডনিতে অক্সালেট ফর্ম করে গেলেই চিত্তির।

               গিভ হিম সোডি বাই কার্বস আ্যন্ড গেট হিম টেস্টেড ফর আ্যসিডোসিস আ্যন্ড কিডনি ফাংশনস। হি উইল বি ওকে। সারক্ষণ বয়স বয়স করে বটে কিন্তু হি ইজ ইন এ মাচ বেটার শেপ দ্যান হাফ অফ মাই ক্লাসমেটস। দরকার হলে ঋকের সঙ্গেও ডিসকাস করে নাও আ্যন্টিডোটসের ব্যাপারে। আমি আবার একঘন্টা পর ফোন করব।”

“আমাদের যখন কিছু হয়নি তার মানে শুধু আপনার গ্লাসেই…” বলেন জটায়ু।

“আই অলওয়েজ হ্যাড এ ব্যাড ফীলিং আ্যবাউট হার..”ফেলুদা আস্তে আস্তে বলে।

“হার? তোমাকে শরবত খাইয়েছিল কি কোনো মহিলা নাকি?” ঋতু এখনো ছাড়েনি।

“কি ভাবছিস? Persuit of Algiers”? ফেলুদার চোখ এখনো বোজা, তবে মুখে মৃদু হাসি।

“ওয়েল, দ্যাট স্টেটমেন্ট ইজ স্ট্যাটিস্টিক্যালি ইনকারেক্ট। বাট ইউ আর রাইট বাবা, ওটাই ভাবছিলাম…তুমি কি করে বুঝলে?” ঋতুর গলা এখন কিছুটা রিল্যাক্সড শোনায়।

“কারণ আমি ঋতু ব্যানার্জি মিত্তিরের বাবা”, ফেলুদার মুখের মৃদু হাসি আর একটু বিস্তৃত।

“আপনাদের বাপ-বেটির এই ধাঁধায় কথাটা যদি একটু বুঝিয়ে দেন আমাদের মত অধমদের জন্য”। জটায়ু বলে ওঠেন।

“Poison is a woman’s weapon”… লাইনটা আছে শার্লক হোমসের ঐ সিনেমাটায়—Persuit of Algiers . ওদের দেখাতে নিয়ে গেছিলাম যখন ওদের এই রাকার মত বয়স।”

ফেলুদা আমার কাঁধে ভর দিয়ে উঠতে উঠতে বলে। নীচে আ্যম্বুলেন্স এসে গেছে।

“তাহলে অপরাধীও মহিলা এই কেসে, ফেলুবাবু?”

বলে উঠলেন জটায়ু। 

            ————————————

পরদিন দুপুর। ফেলুদা সব চেকআপের পর বাড়ি ফিরে এসেছে একটু আগে। ওটা ইথিলীন গ্লাইকল পয়সনিং-ই ছিল।মিস্টি স্বাদের তরল সহজেই পানীয়ে মেশানো যায়। সিম্পটমগুলো লোকে সাধারণ সিজ্যুর বা মাইল্ড কার্ডিয়াক প্রবলেমের সঙ্গে গুলোয়। ফলে সময় মত না হয় টেস্ট না পরে আ্যন্টিডোটস। ১২ থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিটেকটেড না হলে ফেটাল হয়ে যায়। কিডনি ফেলিওর সবচেয়ে কমন।

                তবে এক্ষেত্রে স্টেজ ওয়ানে ধরা পড়ায় এবং মণিদি ও ভাস্বরবাবুর তৎপরতায় সামলে উঠেছে। ঋতু যদি অত তাড়াতাড়ি না ধরত তাহলে জল বহুদূর গড়াতে পারত। 

“কিন্তু ফেলুদা, ঐ মিনিয়েচার পেন্টিং এর কি হবে? আর বিশাখা দেবীই বা এত কান্ড করলেন কেন?”

“কারণ তো স্পষ্ট, যাতে আমি সুকৃতির সঙ্গে কথা বলতে না পারি। প্রথমে চাইছিলেন জেরার সময় সঙ্গে থাকতে। তাই অত মহিলা সঙ্গে রেখে জেরা করার ভুজুং ভাজুং..এইটুকু একফোঁটা মেয়ের জন্য! তারপর সেটা বানচাল হয়ে গেল দেখে এইভাবে আমাকে সরানোর প্ল্যান, অন্ততঃ সাময়িক ভাবে। তবে এত ঝুঁকি নিলেন যখন তখন তার কারণ তো একটা আছেই।সেটা বুঝতেই আমি সুকৃতির সঙ্গে কথা বলব আজই। স্কুলে নয়, কিন্তু সুতপা সামন্তর বাড়িতে।”

“তুমি কি একদিনও রেস্ট নেবে না, প্রদোষ?” মণিদিকে হতাশ শোনায়।

“রাগ কোরো না মণি। কালকের পরে বিশ্রাম। প্রমিস।”

           ———————————-

সুতপা দেবীর দরজায় বেল দিতেই উনি দরজা খুলে আমাদের ভেতরে ডাকলেন। বেতের কয়েকটা চেয়ারে আমরা চারজন বসলাম। উল্টোদিকের তক্তাপোশে জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে। অনুমান করলাম সেই সুকৃতি।

“সুকৃতি তুমি জানতে আমরা আসব?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে।

“হ্যাঁ । দিদিমণি বলেছেন তো! অটোগ্রাফ নেব আমি…আপনার আর জটায়ুর থেকে।”

“অবশ্যই। এই দিদিমণিকে খুব পছন্দ তোমার?”

“হ্যাঁ । উনি সুন্দর করে সব বুঝিয়ে দেন যে…মিউজিয়ামে নিয়ে গেছিলেন। গুপ্তযুগ পড়ানোর সময়। কর্ণসুবর্ণও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বাংলার ইতিহাস পড়ানোর সময়। কিন্তু বড়দি বললেন…”

“কি বললেন? হবে না?”

“হ্যাঁ । আসলে অনেক খরচ তো! আমাদের গরীব স্কুল…আমি তখন ওদের বললাম গৌড়মল্লার পড়তে।”সুতপা দেবী বললেন।

“গৌড়মল্লারও তো লাইব্রেরী থেকে নিতে দিলেন না বড়দি…বললেন বড়দের বই”। সুকৃতি বলে ওঠে।

“এটা কি তুমি সুতপা দিদিমণির থেকে ধার নিয়ে গেছিলে সেদিন?” পাশে রাখা শরদিন্দুর বইটা দেখিয়ে প্রশ্ন করে ফেলুদা।

“হ্যাঁ।”

“এই স্কুল ভাল লাগে তোমার? নাকি লোরেটো ভাল ছিল?” ফেলুদা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করে এবার।

“এই স্কুলে সবাই ভাল না…কিন্তু সে তো লোরেটোতেও..”

মাটির দিকে তাকিয়ে বলে সুকৃতি।

“মৌপিয়ার সঙ্গে কি হয়েছিল তোমার সুকৃতি?” ফেলুদা নরম গলায় জিজ্ঞেস করে।

সুকৃতি চমকে উঠে সুতপার দিকে তাকায়।

“তুমি ভেবো না সুকৃতি। তোমার দিদিমণি একথা আমাদের বলেননি….যদিও বললে ওঁর অনেক সুবিধে হত। তাও বলেননি কারণ উনি তোমাকে বিপদে ফেলতে চাননি।”

সুতপার মুখ নীচু।

“তবে আমি তো ফেলুদা। আমি চেষ্টা করলে অনেক কিছুই জানতে পারি, সেভাবেই জেনেছি।” একপেশে হেসে বলে ও।

“আমি আমি ওর টাকা নিইনি, ফেলুদা। মরিয়া গলায় বলে ওঠে সুকৃতি। কেউ বিশ্বাস করল না…সবাই বলল সুকৃতি না, কুকীর্তি…” 

মেয়েটার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। মণিদি উসখুস করছে জেরাটা থামানোর জন্য ।

“আমি বিশ্বাস করেছি সুকৃতি। কিন্তু ওর ব্যাগে আর কিছু ছিল কি যেটা তুমি নিতে গেছিলে?”

“একটা পেন…কাঠের তৈরী…বেশী দাম না…কিন্তু আমার কি রকম হয় মাঝে মাঝে। একটা সামান্য জিনিস,কিন্তু না পেলে মনে হয়….আমি বোঝাতে পারব না ফেলুদা..”

“আমি বুঝেছি সুকৃতি। ওটা একটা অসুখ। ওর নাম ক্লেপ্টোম্যানিয়া। চিকিৎসা করলে সেরে যায়। কেউ বলেনি তোমাকে আগে?”

“না।বাড়িতে খালি মা জানে। কাউকে বলতে বারণ করেছে। বাবা, দাদু খুব বকবে জানতে পারলে। লোরেটোর টিসির পরে তো…”

“তুমি আমাকে ফেলুদা বললে যখন, উনি তাহলে তোমার মণিবৌদি। উনি ডাক্তার, জান তো?” 

সুকৃতি ঘাড় নাড়ে।

“উনি তোমাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন। তোমার বাড়ির লোকের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলব, তাহলে হবে?”

সুকৃতি চোখ মোছে।

“এবার বল তো, সেদিন এই বাড়ির দেরাজ থেকে ঐ পেন্টিংটাও কি তুমি নিয়েছিলে ক্লেপ্টোম্যানিয়ার জন্য”?

“নিয়েছিলাম…কিন্তু ঐ জন্য না…আমাকে নিতে বলেছিল…”

“কে বলেছিল? তোমাদের বড়দি”?

সুতপা চমকে তাকান।

“হ্যাঁ ফেলুদা। উনি বলেছিলেন ওটা না এনে দিলে উনি লোরেটোর ঘটনাটা সবাইকে বলে দেবেন আর আমাকে এখান থেকেও তাড়িয়ে দেবেন।”

“তুমি নিশ্চিন্তে থাক সুকৃতি। তোমাকে কেউ তাড়াবে না। যাও গিয়ে গাড়িতে গিয়ে বস তুমি মণিবৌদির সঙ্গে। আমরা তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব।আমি  তোমার দিদিমণির সঙ্গে কথা বলে আসছি।”

                 ——————

“এবার পরিস্কার করে বলুন তো সুতপা, আপনার সঙ্গে বড়দির সমস্যাটা আসলে কি?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে মণিদিরা বেরিয়ে গেলে।

“কি বলি বলুন তো মিঃ মিত্র ! উনি আসলে এই স্কুলটা একদম পছন্দ করেন না। ওনার ধারণা এই মেয়েদের কিছু হবে না। কর্ণসুবর্ণ যেতে কত টাকাই বা লাগত…রেলের, হোটেলের সব ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। তবু দিলেন না উনি। শরদিন্দুর গল্প, তাও পড়তে দিলেন না মেয়েদের। মিউজিয়ামে যাওয়া নিয়েও ঝামেলা…আমি একরকম জোর করেই…”

“শুধু সেই জন্যই কি আপনাকে তাড়াতে চান উনি?”

“ না, আরো কারণ আছে।ওঁর নিজের ভাইঝিকে এখানে ঢোকাতে চান, আমার জায়গায়।”

“সেই জন্য উনি সুকৃতিকে একরকম ব্ল্যাকমেল করলেন যাতে ও ঐ পেন্টিংটা চুরি করে। তারপর চুরির দায়টা আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে আপনাকে সরানোর ফন্দি আঁটলেন এবং আমি তদন্ত করলে সব বেরিয়ে যাবে বলে আমাকেও সরাতে চেষ্টা করলেন, অন্ততঃ সাময়িক ভাবে।”

“সুকৃতি জানবে কি ওটা কোথায় এখন”? সুতপা প্রশ্ন করেন।

“মনে হয় না। তবে আমার একটা আন্দাজ আছে। দেখা যাক। আপনাদের কালকের এক্সিবিশন ক’টায় শুরু?”

“বিকেল তিনটেয়। তবে আমরা সব জড় হয়ে যাব একটার মধ্যে। মিঃ মিত্র, তার মধ্যে না পেলে কিন্তু ভীষণ ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে…”

“বিশ্বাস রাখুন আমার ওপর, সুতপা। আর একটা প্রশ্ন। সুব্রতা কে?”

“সুব্রতা…মানে আমাদের ল্যাব আ্যসিসটেন্টের কথা বলছেন? হায়ার সেকেন্ডারি সায়েন্স স্টুডেন্টদের জন্য..”? সুতপা একটু বিভ্রান্ত।

“ইনটারেস্টিং! উনিও কি বিশাখা দেবীর পরিচিতা? “

“হ্যাঁ । ওঁর আগের স্কুলেও ছিলেন তো উনি…আপনি জানলেন কি করে?” 

“জানতাম না, গেস করলাম। আচ্ছা, এই বইটা নিয়ে যেতে পারি আমি?”

সুকৃতির ফেরৎ দেওয়া শরদিন্দুর বইটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলুদা।

“হ্যাঁ…তা..কিন্তু কেন?” সুতপা একটু বিভ্রান্ত ।

“ও কিছু না, এমনি। তুঙ্গভদ্রার তীরেটা আর একবার পড়ব। হাজার হোক ওটা মণিকঙ্কণার গপ্প তো!” 

মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ায় ফেলুদা।

“আসি আজ, কাল দেখা হবে।”

***

পর্ব ৪ (শেষ পর্ব)

হেমনলিনী বিদ্যায়তনে সেদিন দুটো নাগাদ পৌঁছে দেখলাম হৈ হৈ ব্যপার। প্রচুর ব্যস্ততা। এক্সিবিশন শুরু না হলেও বিভিন্ন বয়সের সাজগোজ করা মহিলারা চুলে ফুল টুল লাগিয়ে বসন্তোৎসব পালন করতে চলে এসেছেন। আমরা তিনজন নিতান্তই সংখ্যালঘুর দলে এখানে। লালমোহনবাবুরও নিশ্চয় একই কথা মনে হয়েছে। কারণ উনি বললেন,

“এ যে একবারে রমণীসংবাদ ফেলুবাবু! মণিকঙ্কণাও যদি থাকতেন সঙ্গে তো বুকে একটু বল পেতুম। আজকেই কি ওঁর এত কাজ থাকতে হল!”

“তাতে কি হল লালমোহনবাবু। এরা তো আর আ্যমাজন ওয়ারিওর নয় যে আমাদের প্রাণ সংশয় হবে!” ফেলুদা লঘু গলায় বলল।

“আরে মশাই আ্যমাজন ওয়ারিয়র হলে ভয় পেতাম না। আজকাল আবার কাউকে অফেন্ড করে ফেললেই তো…বুঝলেন কিনা…”

“করবেন না কাউকে অফেন্ড। তাহলেই তো হল।”

“সে আমি না হয় করলুম না। কিন্তু আপনি তো অফেন্ড করতেই এসেছেন, তাই নয় কি ফেলুবাবু? ঐ মহিলার কিন্তু খুব কূটবুদ্ধি। দেখবেন আবার উল্টোপাল্টা ব্লেম দিয়ে…” বিড়বিড় করেন জটায়ু।

“হুঁ। আপনার সাংসারিক জ্ঞান বেশ বেড়েছে দেখছি”

অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখছে আমাদের। ফেলুদাকে চিনেছে হয়তো। উল্টোদিক থেকে আসা দুজন নীল আর বেগুনী শাড়ি পরা দুই মহিলা ফেলুদার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে চলে গেলেন।

আমরা পা চাললাম বড়দির ঘরের দিকে।

হলুদ শাড়ি পরা, খোঁপায় পলাশ গোঁজা এক সুশ্রী মহিলাকে পেরিয়ে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে যেতেই আমাদের দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন বিশাখা দেবী। 

“মিঃ মিত্র! আপনারা…?!”

“কেন আশা করেননি বুঝি? সেদিন যে অত সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন, অত ভাল শরবত খাওয়ালেন…?”

“হেঁ হেঁ…না না, এ তো আমাদের সৌভাগ্য। আপনার মত লোক যে আমাদের এই স্কুলে সময় করে আসতে পারবেন…” বিশাখা দেবীর চেহারাটা এখনো ফ্যাকাশে।

“…সুব্রতা, এস একটু এদিকে। একটু চা…”

“আপনি ব্যস্ত হবেন না, বিশাখা দেবী, আমার গিন্নীর একদম স্ট্রীক্ট অর্ডার, বাড়ির বাইরে কিছু মুখে দেওয়া যাবে না। একে ডাক্তার তায় গৃহিণী…বোঝেনই তো, অমান্যি করি এতবড় বুকের পাটা ফেলু মিত্তিরেরও নেই।”

“…তা বসন্ত উৎসবের তো সব রেডি মনে হচ্ছে। আর এক্সিবিশনও তাই আশা করি?”

ফেলুদা জিজ্ঞাসা করে।

“ আ্যকচুয়ালি না, মিঃ মিত্র। আপনি এসেছেন ভালই হয়েছে…” বিশাখা দেবী নিজেকে সামলে নিয়েছেন মনে হল।

“আমাদের একটা স্পেশাল আইটেম ছিল, একটা হিস্টোরিক্যাল আর্টিফ্যাক্ট…পাল যুগের। একজন ছাত্রীর দাদু দিয়েছিলেন। লোন হিসেবে। এখন সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। দেখুন না যদি বের করতে পারেন…”

“তাই নাকি? তা জিনিসটা কি আর কার কাছে ছিল?” ফেলুদার অভিনয় ভালই।

“ একটা মিনিয়েচার পেন্টিং। তালপাতায় করা। আর ছিল তো আমাদের ইতিহাসের দিদিমণি সুতপার কাছে। এখন বলছে খুঁজে পাচ্ছে না। দেখুন দেখি কি কান্ড। আমার এত খারাপ লাগছে বেচারার জন্য, দেখুন না যদি হেল্প করতে পারেন ওকে…” 

বিশাখা দেবীর অভিনয়ও খারাপ নয়!

“অবশ্যই। তা ওটার কথা সুতপা দেবী ছাড়া আর কে কে জানতেন?”

“আর তো কেউ না … মানে মেয়েটি তো ওটা ওকে দিল, আমার সামনে। আর কেউ ছিল না। সুতপা বলছে তো ওর শোবার ঘরের দেরাজে ছিল। তাই সার্চ করতে হলে তো সেখানে কিম্বা স্কুলে ওর ড্রয়ার…”

“বাঃ। আপনি তো বেশ মেথডিক্যাল। তাহলে বরং কাছের জায়গা থেকেই শুরু করা যাক। সুতপা আর আপনার অফিস ঘর…তারপর নয় ওঁর বাড়ি…”

“আমার অফিস!”

“তা তো বটেই। আপনারা দুজনেই তো জানতেন ওটার কথা। কাজেই সার্চ করতে হলে তো…এখান থেকেই শুরু করি তবে, কি বলেন বিশাখা দেবী?”

“আপনি এটা করতে পারেন না মিঃ মিত্র!”

 হিসিয়ে ওঠেন বিশাখা দেবী।

“কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া, কোনো মহিলা পুলিশ ছাড়া আমার অফিস আপনি সার্চ করতে পারেন না।”

“কিন্তু সুতপা দেবীর বাড়ি গিয়ে তাঁর বেডরুমে সার্চ করতে পারি? কেন বলুন তো? উনি কি কিছু কম মহিলা? নাকি সল্টলেকের বিশাখা দত্ত যে প্রিভিলেজ ডিসার্ভ করেন বোলপুরের সুতপা সামন্ত তা করেন না?”

“সে আপনি অন্য কোথায় কি করবেন আপনার ব্যাপার। কিন্তু এভাবে একটা গার্লস স্কুলে ঢুকে আপনারা তিনজন ভদ্রলোক, আমার অফিসে বসে আমাকে যদি এভাবে হ্যারাস করেন তো…”

আমার মনে হচ্ছিল লালমোহনবাবুর কথা। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ভদ্রলোক ফ্যাকাশে মেরে গেছেন। আমার নিজেরও ব্যাপারটা ভাল লাগছে না একটুও। ফেলুদা কি ভাবছে কে জানে। এবার কিন্তু আমরা বিশ্রী গন্ডগোলে ফেঁসে যাব।ভাবতে ভাবতেই ওর গলা শুনলাম…

“নাঃ, আপনি সত্যিই মেথডিক্যাল বিশাখাদেবী! তবে ফেলু মিত্তিরও তো কম মেথডিক্যাল নয়। মধুশ্রী, এস তো এদিকে…”ফেলুদা গলা তুলে ডাকে ঘরের দরজা থেকে।

হলুদ শাড়ি পরা, চুলে পলাশ গোঁজা সেই মহিলা এসে দাঁড়ান।

“ বিশাখা দেবী, ইনি আমার একপ্রকার সহকর্মী বলতে পারেন। কসবা থানার ইন্সপেক্টর মধুশ্রী সেনগুপ্ত। উই গো এ লং ওয়ে ব্যাক। অনেক কেসে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। এখন প্লেন ড্রেসে আছেন তবে, ‘মধুশ্রী তোমার ব্যাজটা দেখিয়ে দাও একবার। আর সার্চ ওয়ারেন্টটাও।”ফেলুদা বলে ইন্সপেক্টর সেনগুপ্তকে।

“শুধু মধুশ্রীই নয় কিন্তু। ওর সঙ্গে আরো দুজন কনস্টেবল আছেন। ঐ যে নীল আর বেগুনী শাড়িতে…”

“বেগুনী না প্রদোষদা, ওটা মভ।” 

বলতে বলতে এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর সেনগুপ্ত।

“আচ্ছা বেশ মভই নয় হল। ওকে বল সুব্রতার দিকে নজর রাখতে। আর তুমি এস এদিকে, সার্চ করতে হবে।

করার বিশেষ কিছু নেই অবশ্য…তুমি শুধু দেখ প্রটোকলগুলো ঠিকমত মানা হচ্ছে কিনা। আর ঐ ভদ্রমহিলাকে আমার চেয়ে যথা সম্ভব দূরে রাখ…পরে যেন কোনোরকম উদ্ভট অভিযোগে মামলাটা কেঁচিয়ে দিতে না পারেন।কূটবুদ্ধিতে এঁর মাথাটা ঠাসা কিনা!”

বলতে বলতে ফেলুদা গিয়ে জানলার পাশের বুককেস থেকে নিয়ে আসে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসের বইটা। তারপর সোজা একটা পাতা খুলতেই বুকমার্কের মত বেরিয়ে আসে তালপাতায় আঁকা অনবদ্য মিনিয়েচার পেন্টিং। 

খোলা পাতাটার দিকে চোখ পড়তেই দেখি ওখান থেকেই শুরু হচ্ছে উপন্যাস—গৌড়মল্লার।”

                                 —-———

“আপনি বুঝলেন কি করে মশাই?” ফেলুদাদের লিভিংরুমে চা খেতে খেতে প্রশ্ন করেন জটায়ু।

“উনি শরদিন্দুর বই নিতে দিচ্ছেন না দেখে প্রথম খটকাটা লাগে। অথচ ওটা ওঁর অফিসে দেখলাম সেদিন।এদিকে সেদিন মণিকে নিয়ে সুকৃতিকে জেরা করতে যাবার কথা উঠতেই বিশাখা দেবী ওর নাম থেকে তুঙ্গভদ্রার তীরের রেফারেন্সটা দিলেন। মানে উনি হয় শরদিন্দুর মারাত্মক ভক্ত নয়তো সদ্য পড়ছিলেন। ভক্ত হলে তো অন্যরকম হয়…সুতপার মত। ইতিহাসে ইনটারেস্ট, সাহিত্যে অনুরাগ। ছাত্রীদের ওঁর লেখা পড়তে উৎসাহিত করা। তা সেসব তো বালাই নেই।”

“তারপর সেদিন টেবিলে পরে থাকা রঙের গুঁড়োর ব্যাপারটা…।ওগুলো তো আজকালকার উজ্জ্বল কেমিক্যাল রং নয়। আগেকার অনুজ্জ্বল ভেজিটেবল কালার—মিনিয়েচার পেন্টিংএ যেমন ব্যবহার হত। এই ছবিটা বইয়ে ভরে রাখতে গিয়ে বা বের করতে গিয়ে ঐ রংগুলো অল্প-স্বল্প খসে পড়ে। 

                                  সুকৃতিও সেদিন সুতপার থেকেও ঐ ধার নেওয়া বইএর মধ্যে করেই পেইন্টিংটা নিয়ে আসে। সুতপার থেকে নিয়ে আসা বইটার পাতাতেও ঐ একই রঙের গুঁড়ো লেগে আছে দেখলাম। আর তাতেই ব্যাপারটা আরো পরিস্কার হয়ে গেল।

                আজ আবার দেখলাম ঐ শেলফে বইগুলোর সামনে ধুলোর স্তর—একমাত্র ঐ শরদিন্দুর বইটার সামনে তাকটা চকচক করছে। ফলে খোঁজাটা সহজ হয়ে গেল আর কি!”

“সহজ খালি আপনারই লাগে মশাই। আমরাও তো একই জিনিস দেখলুম, মাথায় এল না কেন বলুন তো!” নিঃশ্বাস ফেলেন জটায়ু।

“আর ঐ সুব্রতা না কি? যে তোমায় ইথিলীন গ্লাইকল পয়সন করেছিল?” মণিদির প্রশ্ন।

“ও তো কেমিস্ট্রি ল্যাব আ্যসিসট্যান্ট। ওর আ্যকসেস ছিল। যা করেছিল বিশাখার ইনস্ট্রাকশনে অবশ্যই। মধুশ্রী, তোমার ঐ বেগুনী-শাড়ি-কনস্টেবল কনফেশন আদায় করেছে তো?”

“ওর নাম দেবযানী, দাদা। হ্যাঁ তা তো ও করেছেই। তা ছাড়াও ল্যাবের ইনভেন্টরী হিসেব করে দেখা গেছে অনেকখানি ইথিলীন গ্লাইকল কিসে খরচা হল তার হিসেব নেই।”

             “কিন্তু প্রদোষদা, দেবযানীর শাড়িটা সেদিন মভ ছিল, বেগুনী নয়! বৌদি, আপনি কি করে পারেন বলুন তো! ঠিক কালারের শাড়ি কিনে দেয় আপনাকে, প্রদোষদা?” মধুশ্রী প্রশ্ন করেন।

“আমি শাড়ি টারি বিশেষ পরি না ভাই, সেটা একটা সুবিধে আছে। তবে হ্যাঁ , রঙের ব্যাপারে ও ঐ রকমই। পার্পল, লিলিয়াক, মভ…সব ঐ বেগুনী। এত জিনিস জানে, চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া একটা, অথচ পর্দা টার্কোইজ না সী গ্রীন জিজ্ঞেস করে দেখ একবার…” মণিদি বলে ওঠে।

“শোন, স্পেকট্রামে সাতটা রং আছে আর আছে সাদা কালো। সে ক’টা আমি চিনি। বাকী তোমাদের ঐ ২৭৭ রকম লাল আর ৬৩ রকমের তুঁতে…ও আমার ক্ষমতার বাইরে।”

“আমি কিন্তু মশাই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি ঐ বিশাখা দত্তর কথা ভেবে। আপনাকে প্রায় খুন করতে যাচ্ছিলেন…”

“হয়তো খুন নেসেসারিলি নয়। বেশ ভাল রকম অসুস্থ করে ফেলে রাখা যাতে তারমধ্যে নিজের কার্যোদ্ধার হয়ে যায়।”

“তুমি আর ঐ ক্রিমিনাল মহিলার হয়ে সাফাই গেয়ো না প্রদোষ।” মণিদির রাগত গলা।

“ইথিলীন গ্লাইকল ইজ সিরিয়াস পয়সন। ইজি ট্যু আ্যডমিনিস্টার, ডিফিকাল্ট টু ডিটেক্ট । ঋতু যদি অত তাড়াতাড়ি জিনিসটা পয়েন্ট আউট না করত, যদি সময় মত আ্যন্টিডোটগুলো না পড়ত, অনেক কিছুই হতে পারত…এমনকি তোমার এই ইনভিন্সিবল আয়রন বডিতেও!”

“তাহলে এই কেসটা কি দাঁড়াল ফেলুবাবু? মক্কেল, সাক্ষী, দুষ্টু লোক, পুলিশ সব্বাই মহিলা? একমাত্র গোয়েন্দা…”

“তা গোয়েন্দাও তো ভাগাভাগি হয়ে গেল লালমোহন বাবু…এটাতে তো দুজন গোয়েন্দা। প্রদোষ মিত্র আর ঋতু ব্যানার্জি মিত্র!

                      ঋতু ব্যাপারটা না ধরলে সেদিন তো এই গোয়েন্দাটির হয়ে এসেছিল। ও খুব ইমপর্টেন্ট হেল্প করেছে এবং সেটা আমি শুধু আ্যজ এ প্রাউড ড্যাড বলছিনা।”

“শুধু জটায়ু একমেবোদ্বিতীয়ম..” মণিদি বলে ওঠে।

“বাই দ্য ওয়ে সুতপা, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল..”

“বলুন না। কিন্তু প্লীজ আমাকে তুমি করে বলুন। অনেক ছোট আমি আপনার থেকে।”

“বেশ তাই হবে। তুমি যদি চাও লোরেটোতে ট্রাই করতে পার। সিস্টার আ্যগনেস বলছিলেন ওঁরা একজন ভাল হিস্ট্রি টীচার খুঁজছেন। তোমার মত ডেডিকেটেড টীচার যে কোনো স্কুলের আ্যসেট। তুমি চাইলে আমি কথা বলতে পারি।”

“আপনি যে বললেন সেই আমার কাছে অনেক দাদা। তবে আমি এখানেই থাকতে চাই। লোরেটো অনেক ভাল টীচার পাবে দাদা, হেমনলিনী তো পাবে না। এখানকার মেয়েগুলো কি তাহলে কিছুই শিখবে না? আসলে আমিও তো মফস্বলের মেয়ে। আমাদের স্কুল হেমনলিনীর চেয়েও অনেক খারাপ ছিল। তবু সেখান থেকে তো অনেকে…মানে দিদির মত নিউরোসার্জন না হলেও…”

“আমি কোত্থেকে পড়েছি বলতো সুতপা”, মণিদির ঠোঁটে হাসি।

“ক্যালকাটা গার্লস তো?” সুতপা বললেন।

“আরে সে তো শুধু নাইন টেন। তপেশের বই থেকে সবাই ওটাই জানে কিনা। আমি চারটে স্কুলে পড়েছি।জান বাকিগুলো কি?”

“লা মার্টস?মহাদেবী বিড়লা? কারমেল কনভেন্ট..?”

“হয়নি, হয়নি ফেল! আমার বাবার ছিল ট্রান্সফারেবল জব। অনেক সময়ই প্রত্যন্ত এলাকায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে আমি গেছি মেদিনীপুরের যোগেন্দ্রবালায়, পুরুলিয়ার ললিতাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ে আর মাথাভাঙার সীতারানি বিদ্যাপীঠে। শেষে নাইনে উঠলে বাবা জোর করে কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে আসেন।”

“বলেন কি দিদি! তাহলে আপনার এমন ইংরেজী..”?

“ও তো বই পড়ে, বিবিসি নিউজ শুনে আর পরে বিদেশে কাজের সূত্রে গিয়ে। ওগুলো কোনো ব্যাপার নাকি! পরে পিক আপ করে নেওয়া যায়…যদি শিক্ষার ভিতটা মজবুত থাকে। আর সেটার জন্য দরকার তোমার মত শিক্ষক।”

**********************

মণিকঙ্কণার জবানী

**********************

বাব্বা। মিটল এবার সব ঝামেলা। প্রদোষকে অবশেষে রাজী করিয়েছি দু সপ্তাহ ছুটি নিতে। ঋক-ঋতু এসে পড়বে কাল। আমিও ছুটি নিয়েছি। নির্ভেজাল ফ্যামিলি টাইম এখন ক’টা দিন। তারপর পুকাই ফিরলে সবাই মিলে দার্জিলিং…। ছেলে মেয়েরা সব নাক সিঁটকাচ্ছিল দার্জিলিং বলে। কত সব নাকি এক্সটিক জায়গা রয়েছে বেড়াবার জন্য আজকাল।ঐ পুঁচকে কেকাটা শুদ্ধ বলে কিনা দার্জিলিং পচা। লাডাখ চল জেম্মা!

ওই জায়গাটার তো আলাদা স্থান আমাদের জীবনে। সেটা আর অন্যরা কি বুঝবে! প্রদোষ অবশ্য ঠিকই বুঝেছিল আর তপেশ এবং জটায়ুও সময়মত তাল দিয়েছিল।না হলেই দার্জিলিং যাওয়া হয়েছিল আর কি! সাধে কি পুকাই বলে, তোমাদের ফোর মাস্কেটিয়ার্সের আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর লেভেলই আলাদা মণিদি! কথা তো বলতে হয়ই না, ঈশারাও করতে হয় না। টেলিপ্যাথিতে কাজ হয়। তা খুব ভুল বলেনি। এতবার একসঙ্গে দুষ্টু লোকেদের মোকাবিলা করতে গেলে তো এ জিনিস ডেভেলাপ করবেই…

“বুঝলে মণি, ঋতুটা মনে হচ্ছে এই লাইনেই আসবে।” প্রদোষ ওর হাতের বইটা আর রীডিং গ্লাসটা বেডসাইড টেবলে নামিয়ে রেখে বলল।

“সে তো আমি আগেই জানি। সবাই জানে। তুমিই কেবল গা করনি…”

“আমার ওপর তো নির্ভর করে না। ও কি চায় সেটা হল আসল কথা।”

“ও চিরকালই বাপকা বেটি”।

“হুম। ঋক যেমন তোমার ছেলে! তোমার পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন পালন করবে বলে অদ্দুর থেকে আসছে তো কাল…ঋতুকে শুদ্ধ কনভিন্স করে সঙ্গে নিয়ে…”

“রাখ তো! ৫০ বছরের আবার জন্মদিন। বুড়ি হয়ে গেলাম সে কথা আবার সবাইকে ঘটা করে জানানো বই তো নয়…”

“তাই নাকি? আমার তো এখনো সেই দার্জিলিং-এর মত লাগে…এমনকি উইন্ডোসীলে ঐ হোয়াইট অর্কিড…ঠিক সেদিনের মত…কিছু তো বদল বুঝতে পারছি না।”

“জ্বালিও না তো! তখন ছিলাম সাতাশ,এখন পঞ্চাশ…বদল নাকি হয়নি!”

“ইভেন বেটার।উইথ ইউ নাও আই হ্যাভ ট্যু টুয়েন্টিফাইভ ইয়ার্স ওল্ড!” আলো নিভিয়ে এ পাশ ফিরে বলে ও।

“সত্যি, কথায় তোমার সঙ্গে পারার যো নেই। শেষের কবিতার অমিত রায়ের ওপরওয়ালা তুমি…”

“শ-শ-শ! …এত কথা বলে না মণি…

For God’s sake hold your tongue, and let me love,

Or chide my palsy, or my gout,

My five gray hairs, or ruined fortune flout…”

***