Tuesday, 18 April 2023

বিশ সাল বাদ

 পর্ব ১

দরজার বেলটা বেজে উঠতেই মণিদি বলে উঠল,

“মক্কেল হলে পত্রপাঠ বিদেয় দেবে, বলে দিলাম কিন্তু। ক্রিমিনালদের পেছনে দৌড়তে পারবে না তুমি এখন….”

“বুড়ো হয়ে গেছি বলছ, মণি”? ফেলুদার ঠোঁটের কোণে হাসি, চোখ যদিও হাতের বইতে।

“তা তিপান্ন হল, বুড়ো না হলেও আধবুড়ো তো বলাই যায়”।

আমি জানি অবিশ্যি মণিদি কেন বলেছে। ক’দিন আগেই ক্রীক রো-র কেসে প্রোমোটারদের ভাড়াটে গুন্ডারা অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়ে ওকে ভালই জখম করেছে। পাঞ্জাবীর হাতাটা সরালে দেখা যাবে আপার আর্মে এখনো ব্যান্ডেজ। কেসটা অবশ্য সফল। সত্যিকথা বলতে কি এখনো পর্যন্ত ফেলুদার অসফল কেস হাতে গোণা।

আর ঐ বুড়ো টুরো সব বাজে কথা। এখনো অসম্ভব ফিট। যোগব্যায়াম তো আছেই। তার সঙ্গে আজকাল জিমে গিয়ে ওয়েট ট্রেনিং করে। 

“বয়েসের সঙ্গে সঙ্গে মাসল ডিকে করে, বুঝলি তোপসে, তাই ওয়েট ট্রেনিংটা মাস্ট”।

মোটকথা এখনো আমার বয়সী লোকেদের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে।মজবুত শরীরে মেদের চিহ্ন মাত্র নেই। শুধু চুলটা সাদায় কালোয় যাকে বলে সল্ট আ্যন্ড পেপার আর চওড়া কপালে চিন্তার চিহ্ন একটু বেশী প্রকট।

“তুমি ভেবো না মণি, মক্কেল হবার চান্স কম। আজকাল মোবাইলে কল না করে কেউ আসে না।” বলতে বলতে গিয়ে দরজা খুলে দেয় ফেলুদা।

কিন্তু দরজা খুলতেই দেখা গেল সে ধারণা ভুল।

“আমি কি প্রদোষ মিত্রের সঙ্গে দেখা করতে পারি একবার? ফোন করে আসতে পারিনি, নম্বর তো জানি না। কিন্তু আমার না খুব দরকার, জানেন।” এক নিঃশ্বাসে বলে চলেন ওপাশে দাঁড়ানো বছর পঁয়ত্রিশের ভদ্রমহিলা। 

“আপনি এসে বসুন আগে। তারপর কথা বলবেন”, মণিদি বলে ওঠে। পত্রপাঠ বিদেয় করাটা তাহলে শুধু কথার কথা ছিল!

ভদ্রমহিলা সোফায় বসার পর ফেলুদা উল্টোদিকের চেয়ারে বসে বলে,

“আমিই প্রদোষ মিত্র, ইনি আমার ভাই তপেশ আর উনি আমার স্ত্রী…”

“মণিকঙ্কণা !” বলে ওঠেন ভদ্রমহিলা । 

“পড়েছি তো ওঁর কথা। তপেশবাবুর লেখায়। নিউরোলোজিস্ট আপনি, না? আর কি ভাল যে গাড়ি চালান দিদি, মানে ম্যাডাম ..” উচ্ছ্বসিত ভদ্রমহিলা ।

“নিউরোসার্জন। আর আমাকে দিদিই বলুন বরং। আপনারা কথা বলুন, আমি আসছি। চা খাবেন তো?” মণিদি উঠে পড়ে।

“বলুন কি বলতে চান আমাকে।” একটা পা অন্যটার ওপর চাপিয়ে বলে ফেলুদা।

“আমি..আমার নাম সুতপা সামন্ত। হিস্ট্রির টীচার, কসবায় হেমনলিনী উচ্চ বিদ্যায়তনে। আসলে সেদিন ক্লাস নাইনের মেয়েদের পালবংশের ইতিহাস পড়াচ্ছিলাম। তো একটি মেয়ে…সুকৃতি সমাদ্দার…সে বলল যে পাল বংশের একটা আর্টিফ্যাক্ট ওদের বাড়িতে নাকি আছে। আমি চাইলে ও নিয়ে আসতে পারে। তো আমি ন্যাচেরালি বললাম হ্যাঁ ।”

মণিদি ইতি মধ্যে যশোদাদিকে দিয়ে চা আর ডালমুট পাঠিয়ে দিয়েছে।

“কি আর্টিফ্যাক্ট সেটা যদি একবার বলেন..”, নিজের কাপে চুমুক দিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলুদা।

“আ্যঁ..সুতপা অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন। ও হ্যাঁ। নিশ্চয়ই। ওটা আসলে একটা তালপাতায় করা পেন্টিং। এই তিন ইঞ্চি বাই তিন ইঞ্চি হবে।”

“মিনিয়েচার পেন্টিং? ভেজিটেবল কলারে করা? বৌদ্ধ স্টাইলে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে। ওর এসব ব্যাপারে বেশ পড়াশোনা আছে।

“হ্যাঁ প্রদোষবাবু”।

“ সে তো পালযুগের বেশ ওয়েলনোন আর্ট। ওরকম একটা জিনিস ওদের বাড়িতে এল কি করে কিছু জানেন”?

“ওর দাদুর এসব কালেকশন ছিল। পুরোনো বড়লোক ফ্যামিলি। জমিদারী ছিল আগে বাঁকুড়ার কোথায়।আমাদের মত স্কুলে ওদের পরিবারের সচরাচর কেউ পড়ে না। সুকৃতিও আগে লোরেটো বউবাজারে পড়ত। তারপর সেখান থেকে টিসি নিয়ে এখানে। বাড়ির কাছে হবে বলে”

“তারপর কি হল বলুন।”

“ও সেদিন ওটা তো ক্লাসে নিয়ে এল। দেখানো হল। মেয়েরা সবাই খুশী। ওদিকে পরশু দোলের ছুটি শুরুর আগে আমাদের স্কুলে একটা ফাংশন আর এক্সিবিশন আছে। থীম হল বাংলার কৃষ্টি। আমরা ভাবলাম তার জন্য ওটা যদি দুদিন রেখে দেওয়া যায়। সুকৃতির বাড়ির লোকও আপত্তি করেনি। আমি তখন আমাদের বড়দির সঙ্গে কথা বলে ওটা বাড়ি নিয়ে গেলাম। কাছেই বাড়ি আমার। সুকৃতিও চেনে। তো বাড়িতে আমার দেরাজে রেখেছিলাম পরশু। আজ সকালে দেখি নেই…”

“খুঁজেছেন ভাল করে? অন্য কোথাও রাখেননি তো? ভুল করে? “

“তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি প্রদোষবাবু। একা থাকি আমি। বাবা মা থাকেন বোলপুরে। এখানে দুকামরার বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকি। সামান্য আসবাব। হারানোর অত জায়গাই বা কোথায়?”

“বাড়িতে কে কে এসেছিল এর মধ্যে ?”

“কাজের মেয়েটি আসে রোজ সকালে। ও যখন ঝাঁট দেয়, আমি ঘরেই থাকি। আর ও তো জানেও না ওটা আমি এনে রেখেছি..”

“অন্য কেউ? আত্মীয়, বন্ধু? কোলীগ? ছাত্রী?”

“বাড়িতে আসার মত সেরকম বন্ধু আমার এখানে কেউ নেই মিঃ মিত্র। ছাত্রীদের মধ্যে সুকৃতি এসেছিল। আমার থেকে শরদিন্দুর গৌড়মল্লার ধার নিতে। ও জানে ওটা আমার কাছে। কিন্তু ও নিজের জিনিস এভাবে নিজে চুরি করবে কেন? এক্সিবিশনের পর তো ওটা ও এমনিই ফেরত পাবে…”

“হারানোর কথাটা বলেছেন কাউকে এখনো?”

“কাউকে না মিঃ মিত্র। কাকে বলব? সুকৃতিকে বলা যাবে না। আর বড়দি আমায় এমনিই বিশেষ পছন্দ করেন না। জানতে পারলে আমার চাকরী নিয়ে টানাটানি পরে যাবে। বাড়িতে অসুস্থ বাবা, মা, আধবেকার ভাই…

আপনিই পারেন একমাত্র আমাকে বাঁচাতে প্রদোষবাবু! 

ছোটবেলা থেকে ফেলুদার কত গল্প পড়েছি…খুঁজে দিতে পারবেন না ওটা পরশুর মধ্যে”?  সুতপা দেবীর চোখ ছলছল, গলা কাঁপছে।

এধরণের কথাবার্তায় ফেলুদার প্রবল অসোয়াস্তি হয় আমি জানি। ভদ্রমহিলা না হয়ে ভদ্রলোক হলে হয়তো এতক্ষণে কিছু বলে ফেলত। ভিতরের দিকে তাকাচ্ছে, যদি মণিদি এসে এই পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে এই আশায়। কিন্তু তার কোনো লক্ষণ নেই।

“দেখুন এভাবে তো গ্যারান্টী দিয়ে কিছু বলা যায় না, তবে আমি চেষ্টা করব কথা দিচ্ছি। কিন্তু সেটা করতে গেলে আমার কিছু লোকজনের সঙ্গে কথা বলা দরকার। এদিকে আপনি তো কাউকে কিছু বলেননি…ধরুন যদি সুকৃতি বা আপনাদের স্কুলের কারো সঙ্গে কথা বলতে হয়…আসল কারণটা তাদের বলা যাবে না তো, তাই না?” ফেলুদা অবশেষে বলল।

“না,”রুমালে চোখ মুছে বলেন সুতপা দেবী।

“ঠিক আছে।আপনি এক কাজ করুন, আপনার ঠিকানা, ফোন নাম্বার, স্কুলের ঠিকানা আর সুকৃতির বাড়ির ঠিকানাটা আপাততঃএখানে লিখে দিন”। আইপ্যাডটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে ফেলুদা।

“আমি বেরোচ্ছি প্রদোষ। ঠিক টাইমে খেয়ে নিয়ে যশোদাদিকে ছেড়ে দিও। আর ঐ চোটের জন্য পেইনকিলার গুলো মনে করে খাবে।”মণিদি হাসপাতালের জন্য রেডি।

“তুমি কসবায় ওঁকে নামিয়ে দিয়ে যেতে পারবে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে ।

“হ্যাঁ। আমার তো প্রায় রাস্তাতেই পড়বে। আসুন”।

“আপনার গাড়িতে, ঈশ ভাবতে পারছিনা ম্যাডা…মানে দিদি!“ 

মনে হল সুতপার জীবনে সমস্যা টমস্যা নেই আর কিছু!

উনিও হয়তো বুঝলেন ব্যাপারটা। তাই তাড়াতাড়ি বললেন, 

“আসলে না…আমি, মানে আমরা সবাই সেই ছোটবেলা থেকে এত ফেলুদা ভক্ত! আজকাল তো শুনি ইংলিশ মিডিয়ামের ছেলেমেয়েরা অত পড়ে না। কিন্তু আমাদের সময়…আপনার আগের দিকের গল্পে তো মেয়েদের কোনো রোলই ছিল না, খুব খারাপ লাগত জানেন…নিজেকে কোথাও দেখতে পেতাম না তো! তাও পড়তাম, এত টানটান কাহিনী। তারপর যখন থেকে দিদি এলেন গল্পে…আমরা সবাই কেমন যেন মণিকঙ্কণা হয়ে গেলাম…”

ভদ্রমহিলা না থামলে এবার নির্ঘাত ফেলুদা কেসটা ছেড়ে দেবে। 

“আসুন। বাকীটা গাড়িতে যেতে যেতে শুনব”।

মণিদি উদ্ধার করে।

                     —————-

“কি অবস্থা তোর তোপসে? পুকাই তো এখনো সান দিয়েগোতে। বিচ্ছু দুটোকে সামলাচ্ছিস কি করে?”

“আর বোলোনা ফেলুদা। আমার এখন দুটো সেট অফ টীচিং। একটা ব্যাচেলর আর একটা মাস্টার্স কোর্স। নাজেহাল করে দিচ্ছে একেবারে। আর এমন পাজি মেয়েদুটো, কিছু বললেই বলে মাম্মা থাকলে এরকম করত না। অথচ আমি বেশ জানি পুকাই থাকলে আগেই দুঘা কষিয়ে দিত। তবু তো মা আছে বলে রক্ষা।”

“কাকীমাকে অত ধকল নিতে দিস না। বয়েস হয়েছে তো! ওদের এখানে পাঠিয়ে দে।আমাদের তো এখন এম্পটি নেস্ট। সেই একই তো রজনী সেন রোড…দুশ মিটার এদিক ওদিক।”

“আরে তুমি আর মণিদি দুজনেই এত ব্যস্ত…”

“তা বলে এটুকু যদি না করা যায় তো এত কাছে বাড়ি করে লাভটা কি হল?”

“যাকগে, সুতপার কেসটা কি বুঝলি বল।” 

ফেলুদা একটা চুয়িংগাম মুখে দিয়ে বলে। সিগারেটটা ও ফাইনালি ছেড়েছে। মণিদি পারেনি। কিন্তু আমার যমজ ভাইপো-ভাইঝি ঋক আর ঋতু সেই অসাধ্য সাধন করেছে।

ঋক গত বছর হাভার্ডে ডাক্তারী পড়তে ঢুকেছে।ও মণিদির মতই হবে, হয়তো আরো ব্রিলিয়ান্ট।ঋতুও গেল একই সঙ্গে কেমব্রিজে বায়োকেমিস্ট্রি পড়তে।ফরেনসিক সায়েন্সে স্পেশালাইজেশন করার ইচ্ছে।

ফেলুদা কখনো বলেনি কিছু; কিন্তু আমি, জটায়ু, মণিদি সবাই দেখেছি বাপ বেটিতে অসম্ভব মিল! সেই পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সেই একাগ্রতা, সেই ক্ষুরধার বুদ্ধি! আর সাহস তো আছেই, বাপ-মা দুদিক থেকেই।ফেলুদার লেগাসী যদি কেউ বহন করতে পারে তো সে….

“কি রে, বললি না তো! কলেজে পড়াতে পড়াতে কি ডিটেকশন একদম ভুলে মেরেছিস?” ফেলুদার ঠোঁটের কোনে হাসি।

“না ভুলব কেন? ভদ্রমহিলাকে একটু অন্যমনস্ক লাগছিল…সালোয়ারের ওড়নাটা তো মনে হল একেবারে বেমানান। তারপর কথা বলতে বলতেও…দুবার তোমাকে প্রশ্ন রিপীট করতে হল।”

“সেটা কি অস্বাভাবিক এরকম ক্ষেত্রে”?

“হয়তো না…কিম্বা এমনও হতে পারে উনি তোমাকে সবটা বলছেন না। মানে সাহায্যটা দরকার অথচ পুরো জিনিসটা বলতে পারছেন না……”

“ভেরি গুড”!

“আর তাছাড়া…”

“তাছাড়া কি?”

“সবচেয়ে আশ্চর্য হল ঐ মেয়েটির লোরেটো ছেড়ে ঐ স্কুলে আসা। শুধু বাড়ির কাছে বলেই কি কেউ এরকম করে?”

“এক্সসেলেন্ট!কেন যে তুই ফুল টাইম ডিটেকটিভ হলি না..”

“রক্ষে কর ফেলুদা। বাড়িতে একজনই যথেষ্ট। আর আমি ইনডিপেন্ডেন্টলি একাজ করতেও পারতাম না। আমাদের ফ্যামিলিতে যদি আর কেউ এদিকে যায় তো সে হবে ঋতু…তুমি কখনো ওর সঙ্গে সিরিয়াসলি কথা বলেছ, ফেলুদা?”

“ও কি করবে সেটা ওকেই ঠিক করতে হবে ! আমি বা মণি তো ওদের কিছুতে জোর করিনি, বাধাও দিইনি। ঋক যেমন জানে ও ডাক্তারী করবে। ঋতুর ডিটেকশনের ক্ষমতা আছে আমি জানি। কিন্তু সেটাই তো যথেষ্ট নয়। ইচ্ছেটাও দরকার। আর ও তো ছোট থেকে দেখেছে এই কাজের অসুবিধেগুলো। এই যে বুড়ো বয়েসে হাতে ব্যান্ডেজ করে বসে আছি… খুব প্যাশন না থাকলে এইসব রিস্ক নেওয়ার চেয়ে অনেক কেরিয়ার আছে যাতে …

…কি হল হাসছিস যে?”

“তুমি কিন্তু মণিদির বাবার মত কথা বলছ প্রায়…মনে আছে কি বলেছিলেন উনি? তুমি বাবা হলে বুঝতে পারবে প্রদোষ…”

“তোপসে,মাঝে মাঝে মনে হয় সেই ছোটবেলাকার রামগাঁট্টা তোর এখনো দরকার…”

“…যাকগে, তোর সময় থাকে তো চল বউবাজার”।

“লোরেটো?”

“হুম। ছাত্র ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে একেবারে গেঁজে যাসনি তাহলে।”

“ওখানে কি সিস্টার আ্যগনেসের সঙ্গে কথা বলবে ?”

“বলতে পারি। তবে তার আগে ক্লাস নাইনের মেয়েদের সঙ্গে কথা বললে সুবিধে হবে।”

“কি করে হবে সেটা ?”

“দেখি খ্যাতির বিড়ম্বনাটাকে কাজে লাগানো যায় কিনা..”

“জটায়ুকে বলে দিই? গড়পার থেকে চলে আসুন”?

“তথাস্তু”।

খবরের কাগজ, টেলিভিশন এবং সোস্যাল মিডিয়ার কল্যাণে ফেলুদার মুখ এখন বেশ পরিচিত। কাজের সুবিধার জন্য ও অনেক সময় তাই আজকাল একটা ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর তারসঙ্গে দিনের বেলা হলে একটা সানগ্লাস নেয়।

কিন্তু আজ কোনোটাই না নিয়ে লোরেটো হাউসের ঠিক সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে রইল ।

ফলে মিনিট কয়েকের মধ্যেই একে একে দুয়ে দুয়ে চারপাশে বেশ ভিড় হয়ে গেল। বেশীরভাগই স্কুল ছাত্রী। অটোগ্রাফ চায়। খাতায়, ডাইরীতে।ফেলুদা কল্পতরু হয়ে সবাইকে চাহিদা মেটাতে লাগল। 

“কোন ক্লাসে পড় তুমি”? সই করতে করতে একজনকে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।

“ক্লাস টেন।”

“আমি একজনকে চিনতাম, সে বোধহয় নাইনে পড়ে..”

“ঐ তো শ্রীপর্ণা নাইনে পড়ে। এদিকে আয়…কাকে চেনেন আপনি?”

“সুকৃতি। সুকৃতি সমাদ্দার। চেন? ওর বাবাকে চিনতাম আমি একসময়”। অম্লান বদনে বলে ফেলুদা।

“না ঐ নামে তো…শ্রীপর্ণা একটু বিভ্রান্ত”।

“সুকৃতি তো আর এখন এখানে পড়ে না। আগে পড়ত। ছেড়ে দিল তো এইটে।আপনি কি করে চিনলেন ওকে? ধরা পড়েছিল নাকি আপনার কাছে?” চশমা পরা একটি মেয়ে বলে ওঠে।

“ধরা পড়বে মানে? কিসের জন্য”?

“চুরির জন্য। আবার কেন? এখানে তো ও মৌপিয়ার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছিল। তাই তো টিসি পেল।”

“না। আমি ওকে কোনো চুরির ব্যাপারে কিছু বলিনি। 

যাকগে। এবার যেতে হবে আমাকে। ঐ যে রাস্তার ঐ পারে আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন…” 

লালমোহনবাবুকে হাত নাড়ে ফেলুদা।

“কে জটায়ু? উনি খুব হাসান, না?”

“না, উনি ইচ্ছে করে হাসান না, কিন্তু উনি একজন সরস মানুষ।”

“তোপসে কি এখনো আপনার আ্যসিসট্যান্ট”?

“ও কলেজে ফিজিক্স পড়ায়। তবে সময় পেলে আমায় সাহায্য করে বই কি!”

“আর মণিকঙ্কণা ? উনি কি এখনো সবার হার্টথ্রব?”চশমা পড়া ঐ মেয়েটাই সবচেয়ে পাকা!

“সবার খবর জানিনা, তবে আমার তো বটেই।”

বলে হাঁটা লাগায় ফেলুদা।

                 ——————-

“কি মশাই, এই ইয়ার এন্ডিং এর আগে আবার কেস পেয়ে গেলেন?” 

জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন গাড়িতে উঠে। গত বিশ-বাইশ বছরে উনি প্রায় একই রকম আছেন। টাকের পেছনে চুলগুলো শুধু এখন বেশীরভাগ পাকা আর হাসলে ঠোঁটের পাশে লাফ লাইনগুলো আরো বেশী প্রকট হয়ে ওঠে এই যা। একজন ষাটোর্ধ ব্যক্তির পক্ষে উনিও বেশ ফিট।

“অপরাধীদের কি আর ইয়ার এন্ডিং আছে মশাই, যে আমার থাকবে?”

“তা আপনার হাতের চোটের কি অবস্থা? মণিকঙ্কণা আপনাকে ছাড়লেন যে বড়?”

“হুম। মণি গন্ডোগোলের তালে ছিল, কিন্তু নিপীড়িত মহিলা দেখলে আবার ওর প্রাণ কাঁদে তো, তাই…”

“তা আপনার মক্কেল কি মহিলা নাকি মশাই?”

“মক্কেল, সাক্ষী সবাই। এক মেয়ে স্কুল ভর্তি। শুধু অপরাধী পুরুষ না মহিলা এখনো সেটা জানি না।”

“এ তো তাহলে আমাদের সেই আগের গপ্পগুলোর উল্টো হয়ে গেল মশাই…সেই যে তপেশ লিখত আর যত্ন করে মেয়েদের ছেঁটে বাদ দিত…”

“না লালমোহনবাবু, ইচ্ছে করে কেন হবে…”আমি প্রতিবাদ করে উঠি…”

“তা খানিকটা তো ইচ্ছে করেই ভাই! সত্যি কি ওরকম হয়? সবাই হয় বিপত্নীক নয় ব্যাচেলর।একটা কাজের মাসি অব্দি নেই, সব পুরুষ চাকর। আসলে তখন তো আর রূপমঞ্জরী আসেননি তোমার জীবনে, দুই কন্যার পিতাও হওনি। তোমার ধ্যানধারণা অন্যরকম ছিল তখন। সত্যি কথা বলতে কি, মণিকঙ্কণার সঙ্গে সেবার কেদারে আলাপ না হলে তোমরা দুজনেই ব্যাচেলর হয়েই থেকে যেতে।”

“অদ্ভুত কথা তো! জগতে কি আর মেয়ে ছিল না নাকি…”

“তা থাকবে না কেন? কিন্তু তোমাদের এই দুই ভাইকে ঐ দুই বোন মণিকঙ্কণা আর রূপমঞ্জরী—“

“যাঁদের পুরো নাম ধরে আপনি ছাড়া কেউ ডাকে না…”

ফেলুদা বলে ওঠে। 

“বেশ করি! কোথায় রূপমঞ্জরী আর কোথায় পুকাই। রামঃ”

“হরিপদবাবু, এবার কসবা চলুন”, ফেলুদা নির্দেশ দেয়।

“এবার কি হেমনলিনী বিদ্যায়তন”?

“ইয়েস স্যর”!

***

পর্ব ২

হেমনলিনীর সামনে যখন এলাম তখন চারটে বেজে গেছে। দু-চারজন ছাত্রী ঘোরাফেরা করছে, তবে বেশীরভাগই বাড়ি চলে গেছে মনে হল। স্কুলবাড়ি আর ছাত্রীদের চেহারা দুটোই লোরেটোর চেয়ে অনেক আলাদা।

আমি ভাবলাম ফেলুদা বোধহয় আবার ওর স্টার পাওয়ার ব্যবহার করবে। কিন্তু তা না করে ও সোজা চলে গেল স্কুলের ভেতর। দারোয়ানকে জিজ্ঞেস করে একদম হেডমিস্ট্রেস বিশাখা দত্তর ঘরে।

“মিঃ মিত্র আপনি…কি সৌভাগ্য ….কিন্তু কি ব্যাপারে…মানে আমি তো কিছু…” 

নমস্কার বিনিময়ের পরেই বলে ওঠেন বিশাখা দেবী।

“ না না, ঘাবড়াবেন না আপনি…একটা তদন্তের ব্যাপারে আসতে হল আরকি! আপনি যদি কয়েকটা ইনফরমেশন দিতে পারেন…”

“তদন্ত? কিসের ব্যাপারে বলুন তো”?

“একটু কনফিডেন্সিয়াল ব্যাপার …তবে বৌবাজার লোরেটোর সিস্টার আ্যগনেস একটু চিন্তিত ওঁর স্কুলে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দু একটা চুরির ঘটনা নিয়ে। ওখানকার মেয়েরা তো প্রায় সকলেই ওয়েল অফ ফ্যামিলির…তাই অন্য কোনো কারণের আগে ড্রাগ প্রবলেমের কথাটাই মাথায় আসে..।” 

ফেলুদা একটা বিরতি নেয়।

“গতবছর আপনার স্কুলে ওখান থেকে একটি মেয়ে ভর্তি হয়, ঠিক না? সুকৃতি সমাদ্দার ? ওকেও তো টিসি দেওয়া হয়েছিল ঐ চুরির অভিযোগে, তাই না?”

ফেলুদা এবার সোজা আ্যটাকিং মোডে।

“হ্যাঁ , সুকৃতি লোরেটো থেকে টিসি নিয়ে এসেছিল। টিসিতে কোনো অভিযোগ কিন্তু লেখা ছিল না। ওঁরা হয়তো চাননি ওর অন্য কোথাও ভর্তির পথটা বন্ধ করতে…”

“আপনি খোঁজ নেননি আর বিশদে?”

“না মিঃ মিত্র। ওদের পরিবার এখানকার নামকরা পরিবার। ওর বাবা, দাদু নিজেরা এসেছিলেন। আমাদের স্কুল তো দেখছেন। বেশীরভাগ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আমরা অত চুজি নই। আর সুকৃতি ওখানে মাঝারি ছাত্রী ছিল, আমাদের এখানে তার মানে বেশ উঁচুর দিকে। গত একবছরে কোনো অভিযোগ তো ওঠেনি…চুরির কিম্বা ড্রাগের…।”

“সুকৃতির সঙ্গে কথা বলা যায় একবার? মানে ওর বাড়িতে না গিয়ে? সম্ভব হলে স্কুলে। ওর বাড়ির লোককে এখনই জড়াতে চাইছিনা আর কি…”

“সে হয়তো ব্যবস্থা করা যায়, কিন্তু কি জানতে চান আপনি ওর কাছে? ও তো লোরেটো ছেড়েছে একবছরের ওপর হল। ওখানে এখন যাই ঘটুক না কেন…”

ফেলুদা হাত তুলে বিশাখা দেবীকে থামিয়ে দেয়।

“আমি শুধু জানতে চাই ও ওখানে থাকাকালীন কোনো ড্রাগডিলারকে চিনত কিনা।”

“ঠিক আছে। কাল তাহলে দুপুরে আসুন একবার। আমি সুকৃতিকে বলে রাখব। আমার অফিসের পাশের ঘরে বসে আপনি কথা বলে নিতে পারবেন। তবে…”

“হ্যাঁ বলুন…”

“স্কুলের মধ্যে ছাত্রীদের প্রতি আমার কিছু দায়িত্ব আছে। আপনার জিজ্ঞাসাবাদের সময় সঙ্গে কোনো মহিলা থাকলে ভাল হয়…”

“আমার বয়স তিপান্ন বিশাখা দেবী। আমার মেয়ের বয়স সুকৃতির চেয়ে বেশী! তবু বলছেন যখন, আমি সঙ্গে করে আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসব। তাতে হবে তো?”

“মণিকঙ্কণা! অবশ্যই হবে। উনি যে সর্বকর্মে পটিয়সী, সে তো শরদিন্দুই বলে গেছেন।দাঁড়ান, আপনাদের জন্য একটু শরবত বলি…সুব্রতা..!”

“আপনি ব্যস্ত হবেন না বিশাখা দেবী, আমরা…”

“না। আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আপনার কত বড় ফ্যান আমি জানেন? এখন শরবত খাবেন, আমাকে অটোগ্রাফ দেবেন তবে যাবেন। নাহলে কিন্তু সুকৃতির সঙ্গে আ্যপয়েনমেন্ট ক্যান্সেল কাল! 

আমাদের আবার একটা ফাংশন আছে পরশু। বসন্ত উৎসবের। সেই সঙ্গে এক্সিবিশন, বাংলার কৃষ্টির ওপরে।আসতে হবে কিন্তু আপনাদের বলে রাখলাম।”

“তা টেবলে এইসব রঙের গুঁড়ো কি ঐ বসন্ত উৎসবের প্রস্তুতি”?

চোখ বটে ফেলুদার! ও পাশের ডেস্কের ডানদিকের কোনে কিছু গুঁড়ো মেটে লাল আর নীল রং, সেদিকে আঙুল তুলে জিজ্ঞেস করল ও।

“দেখেছেন কান্ড! ঐ আবীর টাবীর গুলো কিনে এনে রিসিট সব সাবমিট করে তুলে রাখার সময় এইটি করেছে। দেখবে তো একটু…কোথায় যে গেল সুব্রতা…একটু ওয়েট করুন আমি ওকে বলে আসছি এখুনি।”

                    ————————-

রজনী সেন রোডে ফেলুদার বাড়িতে ঢুকেই দেখি আসর সরগরম। মা এসেছেন তাঁর দুই নাতনীকে নিয়ে। মণিদিও আছে।

আমরা ঢুকতেই দুবোনে গিয়ে লালমোহনবাবুর থেকে চকলেট আদায় করল—ওটা ওদের অলিখিত চুক্তি ।

“জ্যেঠু, স্পাইডারম্যান আর ক্যাট উইম্যানের মধ্যে যুদ্ধ হলে কে জিতবে বলতো? আমি স্পাইডারম্যান আর দিদি ক্যাট উওম্যান” বলে ওঠে কেকা।

“এটা তো লীডিং কোয়েশ্চন হয়ে গেল, কেকা বুড়ি।” ফেলুদা হেসে ওর চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বলল।

“লীডিং কোয়েশ্চেন মানে?”

“মানে যেটার আ্যনসার কি হতে পারে সেটা আগে থেকে ঠিক করা থাকে। না জ্যেঠু”? রাকার প্রশ্ন।

“একদম ঠিক। শিখলি কোথায়”? ফেলুদা জানতে চায়।

“ঋতু দিদি শিখিয়েছে। ও গোয়েন্দা হবে তোমার মত আর আমি ওর আ্যসিসট্যান্ট বাবার মত”। রাকার ঘোষণা।

“আর আমি?” কেকা কাঁদ কাঁদ।

“তোকে জটায়ু করে দেব”। দিদি আশ্বাস দেয়।

“না আমি জটায়ু না—-আমার কি টাক নাকি মাথায়”?

প্রমাণ স্বরূপ ঝাঁকড়া চুলগুলো দুলিয়ে বলে কেকা।

“আমি আর ঋকদাদা তাহলে আর একটা গোয়েন্দা হব”, কেকা জানিয়ে দেয়।

“ঋকদাদা তো ডাক্তার হবে, জেম্মার মত। হাঁদা কোথাকার।” দিদির গম্ভীর ভর্ৎসনা।

“তুমি কিচ্ছু ভেব না, কেকা বুড়ি। তোমাকে প্রখর রুদ্র বানিয়ে দেব। তোমার বাবা, জ্যেঠু এরা আর কি গোয়েন্দা…আসল গোয়েন্দা তো প্রখর রুদ্র” বলে ওঠেন জটায়ু।

“কণিষ্কের মুন্ডু উদ্ধার করেছেন উনি, রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরির কিনারা করেছেন, এমনকি জ্যাক দ্য রিপার কে খুঁজে শাস্তি দিয়েছেন…”

“করতে গিয়ে ক্রনোলজি, রিয়্যালিটি -এগুলো একটু ঘেঁটে গেছে যদিও, কিন্তু সে সব তো মাইনর ব্যাপার।”


বলতে বলতে উঠে গিয়ে ফ্যানের রেগুলেটরটা বাড়িয়ে দেয় ফেলুদা। ওর কি গরম লাগছে নাকি! আমার তো শীত শীত করছে বেশ!

“ওসব বললে আমি শুনছি না ফেলুবাবু! আপনার তাও দু একটা আংশিক ব্যর্থতা আছে।কিন্তু আসল কথা হল প্রখর রুদ্র হার মানেনি কখনো…”

“না। কেবল হার মেনেছেন আইনস্টাইন।স্পেস, টাইম আর কস্যালিটিকে যে ভাবে ঘেঁটে ঘন্ট করেছেন আপনার গপ্পের গোয়েন্দাকে জেতাতে গিয়ে…”

ডান হাতটা একবার ঘাড়ের ওপর দিয়ে বুলিয়ে আনল। ওর কি শরীর খারাপ লাগছে নাকি? অসুখ বিসুখ তো হয়ই না প্রায় কখনো ওর।

“কাকীমা, পুকাইএর সঙ্গে আমার কথা হয়ে গেছে। তোমার নী রিপ্লেসমেন্টের ডেট নিতে বলে দিয়েছে।” মণিদি মাকে বলে।

“না না। আমার হাঁটু বেশ আছে। এই বয়সে অত কাটাছেঁড়ার কোনো দরকার নেই।” মা কিছুতেই রাজী নয়।

“সে তো ডাক্তার বুঝবে নাকি! পুকাই বলেছে কোনো বাহানা না শুনে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে যেতে।”

“ঐ আমেরিকায় বসে শাশুড়ির ওপর হুকুম চালাতে বারণ করে দিও তোমার বোনকে মণি”।

“তা আমেরিকায় থাকা বৌমা অপছন্দ হলে আমি তো আছি এখানে, তোমার দেশি বৌমা! সোজা নিয়ে গিয়ে ফেলব ওটিতে” মণিদি  বলে দেয়।

“চোরে চোরে মাসতুতো ভাই শুনেছিলাম। আর গুন্ডায় গুন্ডায় মামাতো-পিসতুতো বোন এই তোমাদের দেখলাম। যখন আমাদের বাড়ি প্রথমদিন এসে আমার নাকের সামনে আরশোলা ঝুলিয়েছিলে তখনই বোঝা উচিত ছিল আমার।”

“বাজে কথা বোলো না কাকীমা। তুমিই আরশোলা দেখে ভয়ে চিল চিৎকার ছেড়েছিলে, আমি গিয়ে রেসকিউ করলাম।”

“হি হি, ঠাম্মি আরশোলা ভয় পায়, জ্যেঠু দেখ….

জ্যেঠু!! ….জ্যেঠু কি হল তোমার…” কেকা কেঁদে ওঠে।

ফেলুদার ঘাড়টা অদ্ভুতভাবে সোফায় হেলানো।চোখ বন্ধ।হাতদুটো দুপাশে ছড়ানো

***

পর্ব ৩

“প্রদোষ!”..

“ফেলুদা!!”

“ফেলুবাবু!!”

“ফেলু!!”

আমাদের কারো ডাকে সাড়া নেই।

“তপেশ, আমার ব্যাগটা, বেডরুমে আছে, ক্যুইক।”মণিদি পালস দেখতে দেখতে বলে।

“লালমোহনবাবু, আ্যম্বুলেন্স”।

আ্যম্বুলেন্স আসার আগেই অবশ্য ফেলুদার জ্ঞান ফিরে এল।কিন্তু ওকে বেশ কনফিউসড দেখাচ্ছে।কথাটাও অল্প জড়িয়ে যাচ্ছে।মণিদি দেখে নিয়েছে পালস রেট একটু হাই আর ব্লাড প্রেসারও। যদিও এসব কোনো সমস্যা ওর আজ অব্দি নেই।

“অ্যাম্বুলেন্স বারণ করে দাও মণি। হয়তো একটু রেস্ট নিলেই ঠিক হয়ে যাবে…” ক্লান্ত গলায় বলে ফেলুদা।

“ওর কথা শুন না মণি, সোজা হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে চেক আপ করাও।” মা বলে ওঠে।

“সে তো করাবই…” বলতে বলতে মণিদির ফোন বেজে ওঠে।

ঋতু করেছে কেমব্রিজ থেকে। স্পীকারে দিয়ে দিলাম।

“কি ব্যাপার মা, বাবার ফোন বেজে যাচ্ছে কেন?” 

মণিদি দুকথায় বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা…

“…মনে তো হচ্ছে সিজ্যুর…কারণটা বুঝতে পারছি না…”

“আর কি কি সিম্পটমস আছে বলতো ঠিক করে?”

“বিপি আর পালস রেট একটু হাই। আর ঐ তো বলছে হেডেক…একটু কনফিউসড…ফানি ফিলিং ইন দ্য স্টম্যাক।স্পীচটাও একটু স্লারি লাগছিল…তোর বাবা না হয়ে অন্য কেউ হলে বলতাম আ্যলকোহল ইনএব্রিয়েশন…”

“বাবাকে দাও তো মা। শীগ্গীর…”

মাঝপথে বলে ওঠে ঋতু।

“হ্যাঁ ঋতু, চিন্তা করিস না রে, বয়েস হচ্ছে তো, এরকম একটু আধটু…”

ফেলুদার গলা এখনো ক্লান্ত।

“তোমার কাছে কি কোনো নতুন কেস এসেছে, বাবা?”

“হ্যাঁ , আজ সকালেই। কিন্তু তুই কি করে জানলি..”

“কারণ আমি ফেলু মিত্তিরের মেয়ে। তদন্তে বেরিয়েছিলে নিশ্চয়ই…কিছু খেয়েছিলে? মক্কেল, উইটনেস, সাসপেক্ট কারো থেকে…?”

“শরবত !” আমি আর জটায়ু বলে উঠি একসাথে।

“তবে তো হয়েই গেল। মা, মন দিয়ে শোন। এক্ষুণি ভাস্বরমামাকে কনট্যাক্ট কর।টক্সিকোলজিতে আছে তো। আস্ক হিম আ্যবাউট দ্য আন্টিডোটস অফ ইথিলীন গ্লাইকল। ব্লাড টেস্টের রেজাল্টের জন্য ওয়েট করবে না। সময় লাগবে। ততক্ষণে কিডনিতে অক্সালেট ফর্ম করে গেলেই চিত্তির।

               গিভ হিম সোডি বাই কার্বস আ্যন্ড গেট হিম টেস্টেড ফর আ্যসিডোসিস আ্যন্ড কিডনি ফাংশনস। হি উইল বি ওকে। সারক্ষণ বয়স বয়স করে বটে কিন্তু হি ইজ ইন এ মাচ বেটার শেপ দ্যান হাফ অফ মাই ক্লাসমেটস। দরকার হলে ঋকের সঙ্গেও ডিসকাস করে নাও আ্যন্টিডোটসের ব্যাপারে। আমি আবার একঘন্টা পর ফোন করব।”

“আমাদের যখন কিছু হয়নি তার মানে শুধু আপনার গ্লাসেই…” বলেন জটায়ু।

“আই অলওয়েজ হ্যাড এ ব্যাড ফীলিং আ্যবাউট হার..”ফেলুদা আস্তে আস্তে বলে।

“হার? তোমাকে শরবত খাইয়েছিল কি কোনো মহিলা নাকি?” ঋতু এখনো ছাড়েনি।

“কি ভাবছিস? Persuit of Algiers”? ফেলুদার চোখ এখনো বোজা, তবে মুখে মৃদু হাসি।

“ওয়েল, দ্যাট স্টেটমেন্ট ইজ স্ট্যাটিস্টিক্যালি ইনকারেক্ট। বাট ইউ আর রাইট বাবা, ওটাই ভাবছিলাম…তুমি কি করে বুঝলে?” ঋতুর গলা এখন কিছুটা রিল্যাক্সড শোনায়।

“কারণ আমি ঋতু ব্যানার্জি মিত্তিরের বাবা”, ফেলুদার মুখের মৃদু হাসি আর একটু বিস্তৃত।

“আপনাদের বাপ-বেটির এই ধাঁধায় কথাটা যদি একটু বুঝিয়ে দেন আমাদের মত অধমদের জন্য”। জটায়ু বলে ওঠেন।

“Poison is a woman’s weapon”… লাইনটা আছে শার্লক হোমসের ঐ সিনেমাটায়—Persuit of Algiers . ওদের দেখাতে নিয়ে গেছিলাম যখন ওদের এই রাকার মত বয়স।”

ফেলুদা আমার কাঁধে ভর দিয়ে উঠতে উঠতে বলে। নীচে আ্যম্বুলেন্স এসে গেছে।

“তাহলে অপরাধীও মহিলা এই কেসে, ফেলুবাবু?”

বলে উঠলেন জটায়ু। 

            ————————————

পরদিন দুপুর। ফেলুদা সব চেকআপের পর বাড়ি ফিরে এসেছে একটু আগে। ওটা ইথিলীন গ্লাইকল পয়সনিং-ই ছিল।মিস্টি স্বাদের তরল সহজেই পানীয়ে মেশানো যায়। সিম্পটমগুলো লোকে সাধারণ সিজ্যুর বা মাইল্ড কার্ডিয়াক প্রবলেমের সঙ্গে গুলোয়। ফলে সময় মত না হয় টেস্ট না পরে আ্যন্টিডোটস। ১২ থেকে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ডিটেকটেড না হলে ফেটাল হয়ে যায়। কিডনি ফেলিওর সবচেয়ে কমন।

                তবে এক্ষেত্রে স্টেজ ওয়ানে ধরা পড়ায় এবং মণিদি ও ভাস্বরবাবুর তৎপরতায় সামলে উঠেছে। ঋতু যদি অত তাড়াতাড়ি না ধরত তাহলে জল বহুদূর গড়াতে পারত। 

“কিন্তু ফেলুদা, ঐ মিনিয়েচার পেন্টিং এর কি হবে? আর বিশাখা দেবীই বা এত কান্ড করলেন কেন?”

“কারণ তো স্পষ্ট, যাতে আমি সুকৃতির সঙ্গে কথা বলতে না পারি। প্রথমে চাইছিলেন জেরার সময় সঙ্গে থাকতে। তাই অত মহিলা সঙ্গে রেখে জেরা করার ভুজুং ভাজুং..এইটুকু একফোঁটা মেয়ের জন্য! তারপর সেটা বানচাল হয়ে গেল দেখে এইভাবে আমাকে সরানোর প্ল্যান, অন্ততঃ সাময়িক ভাবে। তবে এত ঝুঁকি নিলেন যখন তখন তার কারণ তো একটা আছেই।সেটা বুঝতেই আমি সুকৃতির সঙ্গে কথা বলব আজই। স্কুলে নয়, কিন্তু সুতপা সামন্তর বাড়িতে।”

“তুমি কি একদিনও রেস্ট নেবে না, প্রদোষ?” মণিদিকে হতাশ শোনায়।

“রাগ কোরো না মণি। কালকের পরে বিশ্রাম। প্রমিস।”

           ———————————-

সুতপা দেবীর দরজায় বেল দিতেই উনি দরজা খুলে আমাদের ভেতরে ডাকলেন। বেতের কয়েকটা চেয়ারে আমরা চারজন বসলাম। উল্টোদিকের তক্তাপোশে জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি কিশোরী মেয়ে। অনুমান করলাম সেই সুকৃতি।

“সুকৃতি তুমি জানতে আমরা আসব?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে।

“হ্যাঁ । দিদিমণি বলেছেন তো! অটোগ্রাফ নেব আমি…আপনার আর জটায়ুর থেকে।”

“অবশ্যই। এই দিদিমণিকে খুব পছন্দ তোমার?”

“হ্যাঁ । উনি সুন্দর করে সব বুঝিয়ে দেন যে…মিউজিয়ামে নিয়ে গেছিলেন। গুপ্তযুগ পড়ানোর সময়। কর্ণসুবর্ণও নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন বাংলার ইতিহাস পড়ানোর সময়। কিন্তু বড়দি বললেন…”

“কি বললেন? হবে না?”

“হ্যাঁ । আসলে অনেক খরচ তো! আমাদের গরীব স্কুল…আমি তখন ওদের বললাম গৌড়মল্লার পড়তে।”সুতপা দেবী বললেন।

“গৌড়মল্লারও তো লাইব্রেরী থেকে নিতে দিলেন না বড়দি…বললেন বড়দের বই”। সুকৃতি বলে ওঠে।

“এটা কি তুমি সুতপা দিদিমণির থেকে ধার নিয়ে গেছিলে সেদিন?” পাশে রাখা শরদিন্দুর বইটা দেখিয়ে প্রশ্ন করে ফেলুদা।

“হ্যাঁ।”

“এই স্কুল ভাল লাগে তোমার? নাকি লোরেটো ভাল ছিল?” ফেলুদা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করে এবার।

“এই স্কুলে সবাই ভাল না…কিন্তু সে তো লোরেটোতেও..”

মাটির দিকে তাকিয়ে বলে সুকৃতি।

“মৌপিয়ার সঙ্গে কি হয়েছিল তোমার সুকৃতি?” ফেলুদা নরম গলায় জিজ্ঞেস করে।

সুকৃতি চমকে উঠে সুতপার দিকে তাকায়।

“তুমি ভেবো না সুকৃতি। তোমার দিদিমণি একথা আমাদের বলেননি….যদিও বললে ওঁর অনেক সুবিধে হত। তাও বলেননি কারণ উনি তোমাকে বিপদে ফেলতে চাননি।”

সুতপার মুখ নীচু।

“তবে আমি তো ফেলুদা। আমি চেষ্টা করলে অনেক কিছুই জানতে পারি, সেভাবেই জেনেছি।” একপেশে হেসে বলে ও।

“আমি আমি ওর টাকা নিইনি, ফেলুদা। মরিয়া গলায় বলে ওঠে সুকৃতি। কেউ বিশ্বাস করল না…সবাই বলল সুকৃতি না, কুকীর্তি…” 

মেয়েটার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। মণিদি উসখুস করছে জেরাটা থামানোর জন্য ।

“আমি বিশ্বাস করেছি সুকৃতি। কিন্তু ওর ব্যাগে আর কিছু ছিল কি যেটা তুমি নিতে গেছিলে?”

“একটা পেন…কাঠের তৈরী…বেশী দাম না…কিন্তু আমার কি রকম হয় মাঝে মাঝে। একটা সামান্য জিনিস,কিন্তু না পেলে মনে হয়….আমি বোঝাতে পারব না ফেলুদা..”

“আমি বুঝেছি সুকৃতি। ওটা একটা অসুখ। ওর নাম ক্লেপ্টোম্যানিয়া। চিকিৎসা করলে সেরে যায়। কেউ বলেনি তোমাকে আগে?”

“না।বাড়িতে খালি মা জানে। কাউকে বলতে বারণ করেছে। বাবা, দাদু খুব বকবে জানতে পারলে। লোরেটোর টিসির পরে তো…”

“তুমি আমাকে ফেলুদা বললে যখন, উনি তাহলে তোমার মণিবৌদি। উনি ডাক্তার, জান তো?” 

সুকৃতি ঘাড় নাড়ে।

“উনি তোমাকে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করাবেন। তোমার বাড়ির লোকের সঙ্গে আমি নিজে কথা বলব, তাহলে হবে?”

সুকৃতি চোখ মোছে।

“এবার বল তো, সেদিন এই বাড়ির দেরাজ থেকে ঐ পেন্টিংটাও কি তুমি নিয়েছিলে ক্লেপ্টোম্যানিয়ার জন্য”?

“নিয়েছিলাম…কিন্তু ঐ জন্য না…আমাকে নিতে বলেছিল…”

“কে বলেছিল? তোমাদের বড়দি”?

সুতপা চমকে তাকান।

“হ্যাঁ ফেলুদা। উনি বলেছিলেন ওটা না এনে দিলে উনি লোরেটোর ঘটনাটা সবাইকে বলে দেবেন আর আমাকে এখান থেকেও তাড়িয়ে দেবেন।”

“তুমি নিশ্চিন্তে থাক সুকৃতি। তোমাকে কেউ তাড়াবে না। যাও গিয়ে গাড়িতে গিয়ে বস তুমি মণিবৌদির সঙ্গে। আমরা তোমাকে নামিয়ে দিয়ে যাব।আমি  তোমার দিদিমণির সঙ্গে কথা বলে আসছি।”

                 ——————

“এবার পরিস্কার করে বলুন তো সুতপা, আপনার সঙ্গে বড়দির সমস্যাটা আসলে কি?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করে মণিদিরা বেরিয়ে গেলে।

“কি বলি বলুন তো মিঃ মিত্র ! উনি আসলে এই স্কুলটা একদম পছন্দ করেন না। ওনার ধারণা এই মেয়েদের কিছু হবে না। কর্ণসুবর্ণ যেতে কত টাকাই বা লাগত…রেলের, হোটেলের সব ডিসকাউন্টের ব্যবস্থা করেছিলাম আমি। তবু দিলেন না উনি। শরদিন্দুর গল্প, তাও পড়তে দিলেন না মেয়েদের। মিউজিয়ামে যাওয়া নিয়েও ঝামেলা…আমি একরকম জোর করেই…”

“শুধু সেই জন্যই কি আপনাকে তাড়াতে চান উনি?”

“ না, আরো কারণ আছে।ওঁর নিজের ভাইঝিকে এখানে ঢোকাতে চান, আমার জায়গায়।”

“সেই জন্য উনি সুকৃতিকে একরকম ব্ল্যাকমেল করলেন যাতে ও ঐ পেন্টিংটা চুরি করে। তারপর চুরির দায়টা আপনার ঘাড়ে চাপিয়ে আপনাকে সরানোর ফন্দি আঁটলেন এবং আমি তদন্ত করলে সব বেরিয়ে যাবে বলে আমাকেও সরাতে চেষ্টা করলেন, অন্ততঃ সাময়িক ভাবে।”

“সুকৃতি জানবে কি ওটা কোথায় এখন”? সুতপা প্রশ্ন করেন।

“মনে হয় না। তবে আমার একটা আন্দাজ আছে। দেখা যাক। আপনাদের কালকের এক্সিবিশন ক’টায় শুরু?”

“বিকেল তিনটেয়। তবে আমরা সব জড় হয়ে যাব একটার মধ্যে। মিঃ মিত্র, তার মধ্যে না পেলে কিন্তু ভীষণ ঝামেলা শুরু হয়ে যাবে…”

“বিশ্বাস রাখুন আমার ওপর, সুতপা। আর একটা প্রশ্ন। সুব্রতা কে?”

“সুব্রতা…মানে আমাদের ল্যাব আ্যসিসটেন্টের কথা বলছেন? হায়ার সেকেন্ডারি সায়েন্স স্টুডেন্টদের জন্য..”? সুতপা একটু বিভ্রান্ত।

“ইনটারেস্টিং! উনিও কি বিশাখা দেবীর পরিচিতা? “

“হ্যাঁ । ওঁর আগের স্কুলেও ছিলেন তো উনি…আপনি জানলেন কি করে?” 

“জানতাম না, গেস করলাম। আচ্ছা, এই বইটা নিয়ে যেতে পারি আমি?”

সুকৃতির ফেরৎ দেওয়া শরদিন্দুর বইটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে ফেলুদা।

“হ্যাঁ…তা..কিন্তু কেন?” সুতপা একটু বিভ্রান্ত ।

“ও কিছু না, এমনি। তুঙ্গভদ্রার তীরেটা আর একবার পড়ব। হাজার হোক ওটা মণিকঙ্কণার গপ্প তো!” 

মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ায় ফেলুদা।

“আসি আজ, কাল দেখা হবে।”

***

পর্ব ৪ (শেষ পর্ব)

হেমনলিনী বিদ্যায়তনে সেদিন দুটো নাগাদ পৌঁছে দেখলাম হৈ হৈ ব্যপার। প্রচুর ব্যস্ততা। এক্সিবিশন শুরু না হলেও বিভিন্ন বয়সের সাজগোজ করা মহিলারা চুলে ফুল টুল লাগিয়ে বসন্তোৎসব পালন করতে চলে এসেছেন। আমরা তিনজন নিতান্তই সংখ্যালঘুর দলে এখানে। লালমোহনবাবুরও নিশ্চয় একই কথা মনে হয়েছে। কারণ উনি বললেন,

“এ যে একবারে রমণীসংবাদ ফেলুবাবু! মণিকঙ্কণাও যদি থাকতেন সঙ্গে তো বুকে একটু বল পেতুম। আজকেই কি ওঁর এত কাজ থাকতে হল!”

“তাতে কি হল লালমোহনবাবু। এরা তো আর আ্যমাজন ওয়ারিওর নয় যে আমাদের প্রাণ সংশয় হবে!” ফেলুদা লঘু গলায় বলল।

“আরে মশাই আ্যমাজন ওয়ারিয়র হলে ভয় পেতাম না। আজকাল আবার কাউকে অফেন্ড করে ফেললেই তো…বুঝলেন কিনা…”

“করবেন না কাউকে অফেন্ড। তাহলেই তো হল।”

“সে আমি না হয় করলুম না। কিন্তু আপনি তো অফেন্ড করতেই এসেছেন, তাই নয় কি ফেলুবাবু? ঐ মহিলার কিন্তু খুব কূটবুদ্ধি। দেখবেন আবার উল্টোপাল্টা ব্লেম দিয়ে…” বিড়বিড় করেন জটায়ু।

“হুঁ। আপনার সাংসারিক জ্ঞান বেশ বেড়েছে দেখছি”

অনেকেই ঘুরে ঘুরে দেখছে আমাদের। ফেলুদাকে চিনেছে হয়তো। উল্টোদিক থেকে আসা দুজন নীল আর বেগুনী শাড়ি পরা দুই মহিলা ফেলুদার দিকে মৃদু হাসি দিয়ে চলে গেলেন।

আমরা পা চাললাম বড়দির ঘরের দিকে।

হলুদ শাড়ি পরা, খোঁপায় পলাশ গোঁজা এক সুশ্রী মহিলাকে পেরিয়ে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে যেতেই আমাদের দেখে ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন বিশাখা দেবী। 

“মিঃ মিত্র! আপনারা…?!”

“কেন আশা করেননি বুঝি? সেদিন যে অত সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন, অত ভাল শরবত খাওয়ালেন…?”

“হেঁ হেঁ…না না, এ তো আমাদের সৌভাগ্য। আপনার মত লোক যে আমাদের এই স্কুলে সময় করে আসতে পারবেন…” বিশাখা দেবীর চেহারাটা এখনো ফ্যাকাশে।

“…সুব্রতা, এস একটু এদিকে। একটু চা…”

“আপনি ব্যস্ত হবেন না, বিশাখা দেবী, আমার গিন্নীর একদম স্ট্রীক্ট অর্ডার, বাড়ির বাইরে কিছু মুখে দেওয়া যাবে না। একে ডাক্তার তায় গৃহিণী…বোঝেনই তো, অমান্যি করি এতবড় বুকের পাটা ফেলু মিত্তিরেরও নেই।”

“…তা বসন্ত উৎসবের তো সব রেডি মনে হচ্ছে। আর এক্সিবিশনও তাই আশা করি?”

ফেলুদা জিজ্ঞাসা করে।

“ আ্যকচুয়ালি না, মিঃ মিত্র। আপনি এসেছেন ভালই হয়েছে…” বিশাখা দেবী নিজেকে সামলে নিয়েছেন মনে হল।

“আমাদের একটা স্পেশাল আইটেম ছিল, একটা হিস্টোরিক্যাল আর্টিফ্যাক্ট…পাল যুগের। একজন ছাত্রীর দাদু দিয়েছিলেন। লোন হিসেবে। এখন সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। দেখুন না যদি বের করতে পারেন…”

“তাই নাকি? তা জিনিসটা কি আর কার কাছে ছিল?” ফেলুদার অভিনয় ভালই।

“ একটা মিনিয়েচার পেন্টিং। তালপাতায় করা। আর ছিল তো আমাদের ইতিহাসের দিদিমণি সুতপার কাছে। এখন বলছে খুঁজে পাচ্ছে না। দেখুন দেখি কি কান্ড। আমার এত খারাপ লাগছে বেচারার জন্য, দেখুন না যদি হেল্প করতে পারেন ওকে…” 

বিশাখা দেবীর অভিনয়ও খারাপ নয়!

“অবশ্যই। তা ওটার কথা সুতপা দেবী ছাড়া আর কে কে জানতেন?”

“আর তো কেউ না … মানে মেয়েটি তো ওটা ওকে দিল, আমার সামনে। আর কেউ ছিল না। সুতপা বলছে তো ওর শোবার ঘরের দেরাজে ছিল। তাই সার্চ করতে হলে তো সেখানে কিম্বা স্কুলে ওর ড্রয়ার…”

“বাঃ। আপনি তো বেশ মেথডিক্যাল। তাহলে বরং কাছের জায়গা থেকেই শুরু করা যাক। সুতপা আর আপনার অফিস ঘর…তারপর নয় ওঁর বাড়ি…”

“আমার অফিস!”

“তা তো বটেই। আপনারা দুজনেই তো জানতেন ওটার কথা। কাজেই সার্চ করতে হলে তো…এখান থেকেই শুরু করি তবে, কি বলেন বিশাখা দেবী?”

“আপনি এটা করতে পারেন না মিঃ মিত্র!”

 হিসিয়ে ওঠেন বিশাখা দেবী।

“কোনো সার্চ ওয়ারেন্ট ছাড়া, কোনো মহিলা পুলিশ ছাড়া আমার অফিস আপনি সার্চ করতে পারেন না।”

“কিন্তু সুতপা দেবীর বাড়ি গিয়ে তাঁর বেডরুমে সার্চ করতে পারি? কেন বলুন তো? উনি কি কিছু কম মহিলা? নাকি সল্টলেকের বিশাখা দত্ত যে প্রিভিলেজ ডিসার্ভ করেন বোলপুরের সুতপা সামন্ত তা করেন না?”

“সে আপনি অন্য কোথায় কি করবেন আপনার ব্যাপার। কিন্তু এভাবে একটা গার্লস স্কুলে ঢুকে আপনারা তিনজন ভদ্রলোক, আমার অফিসে বসে আমাকে যদি এভাবে হ্যারাস করেন তো…”

আমার মনে হচ্ছিল লালমোহনবাবুর কথা। আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ভদ্রলোক ফ্যাকাশে মেরে গেছেন। আমার নিজেরও ব্যাপারটা ভাল লাগছে না একটুও। ফেলুদা কি ভাবছে কে জানে। এবার কিন্তু আমরা বিশ্রী গন্ডগোলে ফেঁসে যাব।ভাবতে ভাবতেই ওর গলা শুনলাম…

“নাঃ, আপনি সত্যিই মেথডিক্যাল বিশাখাদেবী! তবে ফেলু মিত্তিরও তো কম মেথডিক্যাল নয়। মধুশ্রী, এস তো এদিকে…”ফেলুদা গলা তুলে ডাকে ঘরের দরজা থেকে।

হলুদ শাড়ি পরা, চুলে পলাশ গোঁজা সেই মহিলা এসে দাঁড়ান।

“ বিশাখা দেবী, ইনি আমার একপ্রকার সহকর্মী বলতে পারেন। কসবা থানার ইন্সপেক্টর মধুশ্রী সেনগুপ্ত। উই গো এ লং ওয়ে ব্যাক। অনেক কেসে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। এখন প্লেন ড্রেসে আছেন তবে, ‘মধুশ্রী তোমার ব্যাজটা দেখিয়ে দাও একবার। আর সার্চ ওয়ারেন্টটাও।”ফেলুদা বলে ইন্সপেক্টর সেনগুপ্তকে।

“শুধু মধুশ্রীই নয় কিন্তু। ওর সঙ্গে আরো দুজন কনস্টেবল আছেন। ঐ যে নীল আর বেগুনী শাড়িতে…”

“বেগুনী না প্রদোষদা, ওটা মভ।” 

বলতে বলতে এগিয়ে এলেন ইন্সপেক্টর সেনগুপ্ত।

“আচ্ছা বেশ মভই নয় হল। ওকে বল সুব্রতার দিকে নজর রাখতে। আর তুমি এস এদিকে, সার্চ করতে হবে।

করার বিশেষ কিছু নেই অবশ্য…তুমি শুধু দেখ প্রটোকলগুলো ঠিকমত মানা হচ্ছে কিনা। আর ঐ ভদ্রমহিলাকে আমার চেয়ে যথা সম্ভব দূরে রাখ…পরে যেন কোনোরকম উদ্ভট অভিযোগে মামলাটা কেঁচিয়ে দিতে না পারেন।কূটবুদ্ধিতে এঁর মাথাটা ঠাসা কিনা!”

বলতে বলতে ফেলুদা গিয়ে জানলার পাশের বুককেস থেকে নিয়ে আসে শরদিন্দুর ঐতিহাসিক উপন্যাসের বইটা। তারপর সোজা একটা পাতা খুলতেই বুকমার্কের মত বেরিয়ে আসে তালপাতায় আঁকা অনবদ্য মিনিয়েচার পেন্টিং। 

খোলা পাতাটার দিকে চোখ পড়তেই দেখি ওখান থেকেই শুরু হচ্ছে উপন্যাস—গৌড়মল্লার।”

                                 —-———

“আপনি বুঝলেন কি করে মশাই?” ফেলুদাদের লিভিংরুমে চা খেতে খেতে প্রশ্ন করেন জটায়ু।

“উনি শরদিন্দুর বই নিতে দিচ্ছেন না দেখে প্রথম খটকাটা লাগে। অথচ ওটা ওঁর অফিসে দেখলাম সেদিন।এদিকে সেদিন মণিকে নিয়ে সুকৃতিকে জেরা করতে যাবার কথা উঠতেই বিশাখা দেবী ওর নাম থেকে তুঙ্গভদ্রার তীরের রেফারেন্সটা দিলেন। মানে উনি হয় শরদিন্দুর মারাত্মক ভক্ত নয়তো সদ্য পড়ছিলেন। ভক্ত হলে তো অন্যরকম হয়…সুতপার মত। ইতিহাসে ইনটারেস্ট, সাহিত্যে অনুরাগ। ছাত্রীদের ওঁর লেখা পড়তে উৎসাহিত করা। তা সেসব তো বালাই নেই।”

“তারপর সেদিন টেবিলে পরে থাকা রঙের গুঁড়োর ব্যাপারটা…।ওগুলো তো আজকালকার উজ্জ্বল কেমিক্যাল রং নয়। আগেকার অনুজ্জ্বল ভেজিটেবল কালার—মিনিয়েচার পেন্টিংএ যেমন ব্যবহার হত। এই ছবিটা বইয়ে ভরে রাখতে গিয়ে বা বের করতে গিয়ে ঐ রংগুলো অল্প-স্বল্প খসে পড়ে। 

                                  সুকৃতিও সেদিন সুতপার থেকেও ঐ ধার নেওয়া বইএর মধ্যে করেই পেইন্টিংটা নিয়ে আসে। সুতপার থেকে নিয়ে আসা বইটার পাতাতেও ঐ একই রঙের গুঁড়ো লেগে আছে দেখলাম। আর তাতেই ব্যাপারটা আরো পরিস্কার হয়ে গেল।

                আজ আবার দেখলাম ঐ শেলফে বইগুলোর সামনে ধুলোর স্তর—একমাত্র ঐ শরদিন্দুর বইটার সামনে তাকটা চকচক করছে। ফলে খোঁজাটা সহজ হয়ে গেল আর কি!”

“সহজ খালি আপনারই লাগে মশাই। আমরাও তো একই জিনিস দেখলুম, মাথায় এল না কেন বলুন তো!” নিঃশ্বাস ফেলেন জটায়ু।

“আর ঐ সুব্রতা না কি? যে তোমায় ইথিলীন গ্লাইকল পয়সন করেছিল?” মণিদির প্রশ্ন।

“ও তো কেমিস্ট্রি ল্যাব আ্যসিসট্যান্ট। ওর আ্যকসেস ছিল। যা করেছিল বিশাখার ইনস্ট্রাকশনে অবশ্যই। মধুশ্রী, তোমার ঐ বেগুনী-শাড়ি-কনস্টেবল কনফেশন আদায় করেছে তো?”

“ওর নাম দেবযানী, দাদা। হ্যাঁ তা তো ও করেছেই। তা ছাড়াও ল্যাবের ইনভেন্টরী হিসেব করে দেখা গেছে অনেকখানি ইথিলীন গ্লাইকল কিসে খরচা হল তার হিসেব নেই।”

             “কিন্তু প্রদোষদা, দেবযানীর শাড়িটা সেদিন মভ ছিল, বেগুনী নয়! বৌদি, আপনি কি করে পারেন বলুন তো! ঠিক কালারের শাড়ি কিনে দেয় আপনাকে, প্রদোষদা?” মধুশ্রী প্রশ্ন করেন।

“আমি শাড়ি টারি বিশেষ পরি না ভাই, সেটা একটা সুবিধে আছে। তবে হ্যাঁ , রঙের ব্যাপারে ও ঐ রকমই। পার্পল, লিলিয়াক, মভ…সব ঐ বেগুনী। এত জিনিস জানে, চলমান এনসাইক্লোপিডিয়া একটা, অথচ পর্দা টার্কোইজ না সী গ্রীন জিজ্ঞেস করে দেখ একবার…” মণিদি বলে ওঠে।

“শোন, স্পেকট্রামে সাতটা রং আছে আর আছে সাদা কালো। সে ক’টা আমি চিনি। বাকী তোমাদের ঐ ২৭৭ রকম লাল আর ৬৩ রকমের তুঁতে…ও আমার ক্ষমতার বাইরে।”

“আমি কিন্তু মশাই আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি ঐ বিশাখা দত্তর কথা ভেবে। আপনাকে প্রায় খুন করতে যাচ্ছিলেন…”

“হয়তো খুন নেসেসারিলি নয়। বেশ ভাল রকম অসুস্থ করে ফেলে রাখা যাতে তারমধ্যে নিজের কার্যোদ্ধার হয়ে যায়।”

“তুমি আর ঐ ক্রিমিনাল মহিলার হয়ে সাফাই গেয়ো না প্রদোষ।” মণিদির রাগত গলা।

“ইথিলীন গ্লাইকল ইজ সিরিয়াস পয়সন। ইজি ট্যু আ্যডমিনিস্টার, ডিফিকাল্ট টু ডিটেক্ট । ঋতু যদি অত তাড়াতাড়ি জিনিসটা পয়েন্ট আউট না করত, যদি সময় মত আ্যন্টিডোটগুলো না পড়ত, অনেক কিছুই হতে পারত…এমনকি তোমার এই ইনভিন্সিবল আয়রন বডিতেও!”

“তাহলে এই কেসটা কি দাঁড়াল ফেলুবাবু? মক্কেল, সাক্ষী, দুষ্টু লোক, পুলিশ সব্বাই মহিলা? একমাত্র গোয়েন্দা…”

“তা গোয়েন্দাও তো ভাগাভাগি হয়ে গেল লালমোহন বাবু…এটাতে তো দুজন গোয়েন্দা। প্রদোষ মিত্র আর ঋতু ব্যানার্জি মিত্র!

                      ঋতু ব্যাপারটা না ধরলে সেদিন তো এই গোয়েন্দাটির হয়ে এসেছিল। ও খুব ইমপর্টেন্ট হেল্প করেছে এবং সেটা আমি শুধু আ্যজ এ প্রাউড ড্যাড বলছিনা।”

“শুধু জটায়ু একমেবোদ্বিতীয়ম..” মণিদি বলে ওঠে।

“বাই দ্য ওয়ে সুতপা, আপনাকে একটা কথা বলার ছিল..”

“বলুন না। কিন্তু প্লীজ আমাকে তুমি করে বলুন। অনেক ছোট আমি আপনার থেকে।”

“বেশ তাই হবে। তুমি যদি চাও লোরেটোতে ট্রাই করতে পার। সিস্টার আ্যগনেস বলছিলেন ওঁরা একজন ভাল হিস্ট্রি টীচার খুঁজছেন। তোমার মত ডেডিকেটেড টীচার যে কোনো স্কুলের আ্যসেট। তুমি চাইলে আমি কথা বলতে পারি।”

“আপনি যে বললেন সেই আমার কাছে অনেক দাদা। তবে আমি এখানেই থাকতে চাই। লোরেটো অনেক ভাল টীচার পাবে দাদা, হেমনলিনী তো পাবে না। এখানকার মেয়েগুলো কি তাহলে কিছুই শিখবে না? আসলে আমিও তো মফস্বলের মেয়ে। আমাদের স্কুল হেমনলিনীর চেয়েও অনেক খারাপ ছিল। তবু সেখান থেকে তো অনেকে…মানে দিদির মত নিউরোসার্জন না হলেও…”

“আমি কোত্থেকে পড়েছি বলতো সুতপা”, মণিদির ঠোঁটে হাসি।

“ক্যালকাটা গার্লস তো?” সুতপা বললেন।

“আরে সে তো শুধু নাইন টেন। তপেশের বই থেকে সবাই ওটাই জানে কিনা। আমি চারটে স্কুলে পড়েছি।জান বাকিগুলো কি?”

“লা মার্টস?মহাদেবী বিড়লা? কারমেল কনভেন্ট..?”

“হয়নি, হয়নি ফেল! আমার বাবার ছিল ট্রান্সফারেবল জব। অনেক সময়ই প্রত্যন্ত এলাকায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে আমি গেছি মেদিনীপুরের যোগেন্দ্রবালায়, পুরুলিয়ার ললিতাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ে আর মাথাভাঙার সীতারানি বিদ্যাপীঠে। শেষে নাইনে উঠলে বাবা জোর করে কলকাতায় ট্রান্সফার নিয়ে আসেন।”

“বলেন কি দিদি! তাহলে আপনার এমন ইংরেজী..”?

“ও তো বই পড়ে, বিবিসি নিউজ শুনে আর পরে বিদেশে কাজের সূত্রে গিয়ে। ওগুলো কোনো ব্যাপার নাকি! পরে পিক আপ করে নেওয়া যায়…যদি শিক্ষার ভিতটা মজবুত থাকে। আর সেটার জন্য দরকার তোমার মত শিক্ষক।”

**********************

মণিকঙ্কণার জবানী

**********************

বাব্বা। মিটল এবার সব ঝামেলা। প্রদোষকে অবশেষে রাজী করিয়েছি দু সপ্তাহ ছুটি নিতে। ঋক-ঋতু এসে পড়বে কাল। আমিও ছুটি নিয়েছি। নির্ভেজাল ফ্যামিলি টাইম এখন ক’টা দিন। তারপর পুকাই ফিরলে সবাই মিলে দার্জিলিং…। ছেলে মেয়েরা সব নাক সিঁটকাচ্ছিল দার্জিলিং বলে। কত সব নাকি এক্সটিক জায়গা রয়েছে বেড়াবার জন্য আজকাল।ঐ পুঁচকে কেকাটা শুদ্ধ বলে কিনা দার্জিলিং পচা। লাডাখ চল জেম্মা!

ওই জায়গাটার তো আলাদা স্থান আমাদের জীবনে। সেটা আর অন্যরা কি বুঝবে! প্রদোষ অবশ্য ঠিকই বুঝেছিল আর তপেশ এবং জটায়ুও সময়মত তাল দিয়েছিল।না হলেই দার্জিলিং যাওয়া হয়েছিল আর কি! সাধে কি পুকাই বলে, তোমাদের ফোর মাস্কেটিয়ার্সের আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর লেভেলই আলাদা মণিদি! কথা তো বলতে হয়ই না, ঈশারাও করতে হয় না। টেলিপ্যাথিতে কাজ হয়। তা খুব ভুল বলেনি। এতবার একসঙ্গে দুষ্টু লোকেদের মোকাবিলা করতে গেলে তো এ জিনিস ডেভেলাপ করবেই…

“বুঝলে মণি, ঋতুটা মনে হচ্ছে এই লাইনেই আসবে।” প্রদোষ ওর হাতের বইটা আর রীডিং গ্লাসটা বেডসাইড টেবলে নামিয়ে রেখে বলল।

“সে তো আমি আগেই জানি। সবাই জানে। তুমিই কেবল গা করনি…”

“আমার ওপর তো নির্ভর করে না। ও কি চায় সেটা হল আসল কথা।”

“ও চিরকালই বাপকা বেটি”।

“হুম। ঋক যেমন তোমার ছেলে! তোমার পঞ্চাশ বছরের জন্মদিন পালন করবে বলে অদ্দুর থেকে আসছে তো কাল…ঋতুকে শুদ্ধ কনভিন্স করে সঙ্গে নিয়ে…”

“রাখ তো! ৫০ বছরের আবার জন্মদিন। বুড়ি হয়ে গেলাম সে কথা আবার সবাইকে ঘটা করে জানানো বই তো নয়…”

“তাই নাকি? আমার তো এখনো সেই দার্জিলিং-এর মত লাগে…এমনকি উইন্ডোসীলে ঐ হোয়াইট অর্কিড…ঠিক সেদিনের মত…কিছু তো বদল বুঝতে পারছি না।”

“জ্বালিও না তো! তখন ছিলাম সাতাশ,এখন পঞ্চাশ…বদল নাকি হয়নি!”

“ইভেন বেটার।উইথ ইউ নাও আই হ্যাভ ট্যু টুয়েন্টিফাইভ ইয়ার্স ওল্ড!” আলো নিভিয়ে এ পাশ ফিরে বলে ও।

“সত্যি, কথায় তোমার সঙ্গে পারার যো নেই। শেষের কবিতার অমিত রায়ের ওপরওয়ালা তুমি…”

“শ-শ-শ! …এত কথা বলে না মণি…

For God’s sake hold your tongue, and let me love,

Or chide my palsy, or my gout,

My five gray hairs, or ruined fortune flout…”

***





No comments:

Post a Comment