————————————-
পর্ব ১ঃ টেলিপ্যাথি
————————————-
লালমোহনবাবুর ‘কারাকোরামে রক্ত কার’ সুপার হিট।
রাজেন রায়না পুলিশের হাতে ধরা পড়ায় শ্যুটিং কিছুটা বিঘ্নিত হলেও পুলকবাবু দারুণ তৎপরতা দেখিয়ে অর্জুন মেরহোত্রাকে হিরো করে ৩ মাসে ছবি নামিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে হিরোইন সুচন্দ্রা আর ভিলেন মহেন্দ্র ভার্মা।
সেদিন রোববার লালমোহনবাবু আমাদের বাড়ি এলেন ডায়মন্ডার প্যাকেট নিয়ে।
“এটা কি আপনার ছবির সিলভার জুবিলির জন্যে।?
“মোক্ষম ধরেছেন মশাই।”, একগাল হাসলেন জটায়ু।
“আমি তো ভেবেছিলুম এ ছবি আর দিনের আলো দেখবে না….হিরো গেল জেলে। তারপর ঐ পুলক ছোকরা হিরোইন টিরোইন ঢুকিয়ে আমার গল্পের এক্কেরে সাড়ে সর্বনাশ যাকে বলে..,” লালমোহনবাবু বলে চলেন।
“দেখাই যাচ্ছে দর্শক সাধারণ এই ব্যাপারটা অপছন্দ করেননি।” ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি।
“হ্যাঁ মশাই। তারপর আপনাকে আর মণিকঙ্কণা ম্যাডামকে দেখে আমি ভাবছি আমার প্রখর রুদ্রকে একটা গার্লফ্রেন্ড দিলে কেমন হয়।”
“বাবা! আপনি আমাকে দেখে প্রখর রুদ্রের ক্যারেক্টার চেঞ্জ করছেন! ভাবা যায়”! ফেলুদার মুখে ছদ্ম বিস্ময়।
“অবিশ্যি ঐ সাড়ে ছ ফুট প্রখর রুদ্রের সঙ্গে মানানসই বাঙালী মেয়ে আপনি কোথায় পাবেন সেটা একটা চিন্তার বিষয়।”ফেলুদা বলে।
“তাহলে বাঙালী মেয়ে দেব না।” জটায়ুকে বেশ প্রত্যয়ী শোনায়।
“প্রখর রুদ্রকে সুইডিশ গার্লফ্রেন্ড দিয়ে দেব, দরকার হলে।”
“সর্বনাশ! আপনার পরের গল্পের পটভূমিকা কি সুইডেন?”
“সেটা করলে মন্দ হয় না, কি বল ভাই তপেশ”?
“কিন্তু তাহলে তো আপনাকে সুইডেন যেতে হবে, লালমোহন বাবু! আজকাল তো আপনি জায়গাটা ভাল করে না দেখে গপ্প লেখেন না।” আমি মনে করিয়ে দিই।
“নাহ্ ! তা হলে আর হল না।” লালমোহনবাবু মাথা নাড়েন।
“ভাল কথা, ম্যাডামের কি খবর মশাই, দেখা সাক্ষাৎ নেই অনেকদিন”?
“আমার সঙ্গেও নেই”।ফেলুদা অকপট।
“এটা আবার কেমন কথা মশাই? ওঁর বাবা আবার..”
“না না, বাবা ঠিকই আছেন,এখন মেয়েই ব্যস্ত।কি একটা রিসার্চ প্রপোজাল বানানোর ডেডলাইন আছে।সেই নিয়ে জোরদার প্রস্তুতি চলছে।”
“ওরে বাবা, এ তো মহা মুশকিল। আপনারা দুজনেই এত ব্যস্ত হলে তো দিন স্থির করাই সম্ভব নয়।”
কথাটা লালমোহনবাবু ঠিকই বলেছেন। বম্বে থেকে ফেরার পরেই যখন দু বাড়ি থেকে বিয়ের দিন ঠিক করতে যাচ্ছে তখনই ফেলুদাকে চলে যেতে হল দিল্লী।
সিক্রেট মিশন, ইনটেলিজেন্স ডিপার্মেন্ট থেকে বিশেষ অনুরোধ।এর ব্যাপারে বিশদ জিজ্ঞেস করাও যায় না, জানাও যায় না। মোটের ওপর একমাস দিল্লীতে কাটিয়ে ফেলুদা ফিরেছে এই হপ্তা দুই হল।
এখন মণিদি দার্জিলিংএর পাট চুকিয়ে এখানে পিজিতে ঢুকেছে।তারপর কি যে মাথার পোকা নড়ে গেল, এখন একটা নিউরোসার্জারিতে স্পেশাল কোর্স করার কথা ভাবছে। সেই নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় আ্যপ্লিকেশন, প্রপোজাল জমা দেওয়া ইত্যাদিতে খুব ব্যস্ত।ফেলুদার সঙ্গে রোজ ফোনে কথা হয়, কিন্তু দেখা সাক্ষাৎ প্রায় নেই বললেই চলে। ওর তাতে বিশেষ হেলদোল নেই। ও নিজে যেমন কাজ পাগলা, অন্যদের কাজকেও তেমনি সম্মান করে।
“বুঝি না বাপু তোমাদের আজকালকার ছেলে মেয়েদের ব্যাপার স্যাপার”। মা বললেন আমাকে সেদিন ।
“যখন মণির বাবা যখন বেঁকে বসেছিলেন তখন তো ফেলু আহার নিদ্রা ত্যাগ করল। আর মণি ইরাক না ইরানের হয়ে শহীদ হতে ছুটছিল। আর এখন যখন সব ঠিক ঠাক, কারুর কোনো গা গোছই নেই। একজন গোয়েন্দাগিরিতে মত্ত তো অন্যজন ডাক্তারীতে।”
সত্যি, আমার মাউন্টেন বাইক আর সিন্থেসাইজার যে কবে হবে কে জানে!
——————————
“এ তো টেলিপ্যাথিক ব্যাপার মশাই।” শ্রীনাথের আনা একমুঠো ডালমুট মুখে দিয়ে বললেন জটায়ু।
“আগের দিনই আমরা আমার পরের গল্প সুইডেনে ফেলব কিনা ভাবছিলাম, আর এখন ম্যাডাম চললেন ওখানে।”
“এটাকে টেলিপ্যাথি বলা যায় কিনা আমার সন্দেহ আছে লালমোহনবাবু। তবে একটু আনক্যানি তো বটেই।” ফেলুদা বলে।
“তা হঠাৎ ওখানে যে”?
“হঠাৎ না মশাই।স্টকহোমের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট মেডিক্যাল রিসার্চের ক্ষেত্রে অন্যতম। ওখানে ও একটা কোর্স করবে, বিখ্যাত নিউরোসার্জন ডঃ ম্যাথিয়াস রুডস্ট্রমের কাছে। এটা সত্যিই খুব ভাল সুযোগ ।”
“বটে! জানতুম না তো! তা উনি যাচ্ছেন কবে?”
“এই ভিসা টিসা পেয়ে গেলেই। মাসখানেক ধরুন”।
“তা আপনি..?”
“আমি কি, লালমোহনবাবু ? আমি মূলতঃ কলকাতার গোয়েন্দা। খুব বেশী হলে ভারতের অন্যান্য জায়গায়। আমাকে তো এখানেই থাকতে হবে।”
“সে তো বুঝলুম…কিন্তু তাহলে…”, জটায়ুর ব্যাপারটা খুব একটা পছন্দ হয়নি মনে হল।
“তাহলে টাহলে কিছু নেই। আপনি রবিবার বিকেলে ফাঁকা আছেন কি?”
“হ্যাঁ ..তা আছি, কেন?”
“ভাস্বর আর চন্দ্রিমা আমাদের সবাইকে ডাকতে চান। আপনাকে ফোন করে নেবেন বলেছেন।”
রবিবার বিকেলে ভাস্বর সেনদের লেক রোডের বাড়িতেও সেইএকই কথা আলোচনা চলছিল।
“তোর সবেতেই বাড়াবাড়ি মণি! কোথায় এখন চুটিয়ে বিয়ের বাজার করবি আমাকে সঙ্গে নিয়ে, তা না…”চন্দ্রিমা বলে ওঠেন।
“তুই নিজে এখন না পারছিস কিছু খেতে, না পারছিস দৌড়াদৌড়ি করতে, তুই কি করে করতিস বাজার?” মণিদি উত্তর দেয়।
“আর তাছাড়া ঐ অর্থহীন শাড়ি-গয়না যা আমি পরিও না তাতে খরচা না করে—-“
“—-চ্যারিটিতে দেওয়া ভাল, তাই তো?”ভাস্বরবাবু বলে ওঠেন।
“তুই মা পেন্টুলুন আর ঘেমো শার্ট পরে বিয়ে করিস।তোর তাই ভাল।”
“রামচাঁটি খাবি তুই ভাস্বর। কি করে সহ্য করিস এটাকে তুই বলতো চন্দ্রিমা?”মণিদি রেগে মেগে জিজ্ঞেস করে।
“তুমি আর মুখ নেড়ো না মা জননী। তোমার মত ছিটেল পিসকে কি করে সহ্য করেন তাই বরং জিজ্ঞেস কর প্রদোষবাবুকে।” ভাস্বরবাবুও কম যান না।
“আরে বাবা , সে আপনি যা খুশি পরুন না কেন…শাড়ি, কিমোনো, পেন্টুলুন! বিয়েটা তো হওয়া চাই। ওটা করে গেলেই তো পারতেন, মণিকঙ্কণা ! সময় না থাকলে একটা ছোটখাট সেরিমনি…”লালমোহনবাবু ছাড়তে রাজী নন।
“না না। ছোটখাট হবে না, একদম হবে না!” হাঁ হাঁ করে ওঠেন চন্দ্রিমা।। আমার প্ল্যান আছে কোনদিন কি শাড়ি, কি ম্যাচিং জুয়েলারী! মণি যদি ন্যাতানো খাদি পরে বিয়েতে বসে তো বসুক, আমি বাবা বেনারসি পড়ব এই বলে রাখলুম।”চন্দ্রিমা ঘোষনা করে দেন।
“শখের প্রাণ গড়ের মাঠ !! তোমার এখনকার এই চেহারায় …”ভাস্বর বাবু মনে করিয়ে দেন।
“ধুর, তাও তো বটে ! তাহলে তুই ক’মাস পরেই বিয়ে কর মণি”।চন্দ্রিমা হতাশ!
“অমনি একেবারে! স্বার্থপর কোথাকার! প্রদোষবাবুর দিকটা একবার ভাবছ না তো?,”ভাস্বরবাবু বলে ওঠেন।
“ভাবাভাবির কিছু নেই ভাস্বরবাবু! ও যদি নাই থাকে এখানে তাহলে বিয়েটা সেরে রাখলে সুবিধা কি হবে তাই তো বুঝলুম না।”ফেলুদার সোজা কথা।
“তোমার না হোক আমার তো হবে! মণিদি ভুলো না কিন্তু, মাউন্টেন বাইক…”আমি মনে করিয়ে দিই।
“সত্যি তো বেচারাকে না ঝুলিয়ে ওটা এখনি কিনে দিলেই তো হয়!“মণিদির মত লোক হয় না!
“একদম না। বলেছি না, স্নেহশীলা বৌদি হয়ে ওর মাথা খাবে না তুমি।” ব্যাগড়া দেয় ফেলুদা।
“তা আপনি যাচ্ছেন কবে যেন?”, লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করেন।
“আর ঠিক পাঁচ সপ্তাহ পরে।”
…
————————————
পর্ব ২ঃ অক্সিপিটালে তালগোল
————————————
**********************
মণিকঙ্কণার জবানী
আজ প্রায় তিনমাস হয়ে গেল এই নতুন দেশে। মার্চের শেষে যখন এলাম তখনো দস্তুরমত ঠান্ডা। আমি দার্জিলিং আর কেদারে ছিলাম, ঠান্ডা অভ্যেস আছে। কিন্তু এটা অন্য লেভেলের ঠান্ডা। বেশ কয়েকপ্রস্থ জামা কাপড় না পরে বেরোনোই যায় না।যদিও ঘরের মধ্যে দিব্যি গরম, হীটিং এর কল্যাণে।
ক্যারোলিনস্কার কাছেই একটা স্টুডিয়ো আপার্টমেন্ট নিয়ে আছি। স্টকহোম খুব সুন্দর শহর।এই ক’দিনেই ভালবেসে ফেলেছি। যখন এসছিলাম গাছপালা সব ন্যাড়া ছিল। তারপর আস্তে আস্তে সব কিছুতে সবুজের ছোঁয়া লাগল।সঙ্গে রকমারী ফুল। এখন এই জুনের মাঝামাঝি দিনটা বেজায় লম্বা। সেই রাত্তির দুটো থেকে ভোর, আবার রাত সাড়ে এগারোটা অব্দি আলো।মাঝে ঘন্টা দুয়েক একটু সন্ধে গোছের হয়। ভারী পর্দা না টেনে ঘুমোনোই শক্ত।
কোলীগরাও বেশ ভাল। সুইডিশ ছাড়াও অনেক দেশের লোকজন আছে। আমার কাছাকাছি কাজের জন্য স্পেনের আ্যলবার্টো, ফিনল্যান্ডের মিকা, টার্কির সাব্রিনা আর সুইডেনের আনিকা আর লার্সের সঙ্গে ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। একসঙ্গে লাঞ্চ খেতে যাওয়া থেকে সপ্তাহান্তে আড্ডা।
খুব শীগ্গীর আসছে মিডসামার ডে।এটা পুরো স্ক্যান্ডিনেভিয়াতেই খুব বড় উৎসব, অনেকে তো বলে ক্রিসমাসের চেয়েও বড়! এই সব দারুণ শীতের দেশে এটা মোটেই আশ্চর্য নয় যে সবাই বছরেরে সবচেয়ে বড় দিনটা হৈচৈ করে পালন করবে।
ঐদিন এরা গাছের গুঁড়ি দিয়ে এক বিশাল ‘মে পোল’ (May Pole) বানিয়ে সেটাকে ফুল লতা পাতা দিয়ে সাজায় আর তার চারধারে সবাই মিলে হাতধরাধরি করে নাচে। খাওয়া হয় ঘরে তৈরী স্ট্রবেরী কেক, সেদ্ধ আলু আর জারানো হেরিং মাছ। জনশ্রুতি হল ঐদিন অবিবাহিতা মেয়েরা সাতরকম ফুল তুলে টায়রা বানিয়ে, সেটা পরে ‘মে পোলের’ চারপাশে নাচার পর যদি সেটাকে বালিশের তলায় রেখে ঘুমোয় তাহলে নাকি তারা তাদের ‘ট্রু লাভের’ মুখ স্বপ্নে দেখতে পায়।
আমার বন্ধুরা সবাই বলেছে আমার নাকি সেটা চেষ্টা করা উচিত এবার। আমি যদিও বলে দিয়েছি যে আমি এনগেজড, তাও আ্যলবার্টো খুব সিরিয়াস মুখ করে বলেছে, “কিন্তু তোমার ফিয়াঁসেই তোমার ট্রু লাভ কিনা সেটা তো বুঝতে পারবে! হয়তো তুমি স্বপ্নে আমার মুখ দেখলে, তখন?”এদের এই দক্ষিণ ইউরোপীয় ফ্লার্টিং এ আমি অভ্যস্ত নই এখনো। তার চেয়ে সুইডিশ শীতলতা ভাল!
আর আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী, আমি জানি এভাবে ট্রু লাভ খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে আমার ধারণা আমার ভাগ্য এ বিষয়ে সুপ্রসন্ন। এই যে আমি ঝপাৎ করে এখানে চলে এলাম একবছরের জন্য, প্রদোষ কিন্তু একবারও বাধা দেয়নি। কারণ ও জানে এটা আমার কাছে কতটা জরুরী। চাকরীর জন্য না, কিন্তু আমার নিজের ইন্টেলেকচুয়াল স্যাটিশফেকশনের জন্য।
জানতাম ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে, কিন্তু এতটা হবে বুঝিনি তো! মাঝে মাঝে মনে হয় পালাই সব ছেড়ে ছুড়ে। একবার বলেও ছিলাম ওকে ফোন করে, কিন্তু ও বলল পাগলামী না করতে। অথচ জানি ওর কত খারাপ লাগছে। বলে না মুখে যদিও, কিন্তু আমি বুঝতে তো পারি।
সপ্তাহে একদিন আধঘন্টা ফোন, তার চেয়ে বেশী করতে গেলে দেউলে হতে হবে। এমন যদি হত যে সবার কাছে একটা ওয়াকিটকির মত জিনিস থাকত যেটা দিয়ে যখন ইচ্ছে কথা বলা যেত, ছবি আর ভিডিয়ো শুদ্ধ! সায়েন্স ফিকশনে যেমন দেখায়! হবে হয়তো কখনো ভবিষ্যতে, কিন্তু ততদিনে আমরা বোধহয় বুড়ো হয়ে যাব।
হাঁটছি এখন হগাপার্কেনের ভেতর দিয়ে, লেকের পাশ দিয়ে।চারদিক অদ্ভুত সুন্দর। সবুজ ঘাস, নীল জল, রংবরঙের ফুল, প্রজাপতি। বাচ্চারা খেলছে। সামনে এক জোড়া প্রেমিক প্রেমিকা বেশ ঘনিষ্ঠ ভাবে বসে আছে…এখানকার সমাজের রক্তচক্ষু তো আমাদের মত নয়, ফলে মানুষ হাঁপ ছেড়ে নিজের মত বাঁচে।
মনটা হঠাৎই আরো খারাপ হয়ে গেল। সবাই বারণ করল আসতে, তাও এলাম মরতে। ভাস্বর ঠিকই বলে, আমার মাথায় দেদার ছিট। তখন জেদ করে এলাম আর এখন বিরহিনী রাধা হয়ে সব লোকের মধ্যে প্রদোষকে দেখছি। ঐ যে দূর থেকে হেঁটে আসছে লোকটা, চেহারার মিল আছে অনেকটা, কিন্তু তাই বলে….
….কিন্তু মিলটা যে বড়ই বেশী লাগছে…আর পেছনে ঐ তপেশর মত দেখতে ছেলেটা…আর লালমোহন বাবু…নাঃ ওরকম তো আর একজন পাওয়া অসম্ভব…
আমি সাংঘাতিক হ্যালুশিনেট করছি…ক্রিস্টাল মেথ ছাড়া আবার এ জিনিস হয় নাকি? বিরহের ঠ্যালায় আমার ব্রেনের অক্সিপিটাল লোবটাতে সব তালগোল পাকিয়ে গেল বোধহয়…
——————
“কি ম্যাডাম, ভূত দেখলেন নাকি”? লালমোহনবাবুই প্রথম বললেন।
“কি কান্ড ! আপনারা, এখানে? স্বপ্ন দেখছি না তো?”
“নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখে নিন না… হে হে..”
“হ্যাঁ মণিদি , আমরা। তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চলে এলাম…”
“কিন্তু কেন? মানে কখন…মানে কিভাবে…”?
“কলকাতায় বড্ড পচা গরম বুঝলেন তো! তারপর তপেশ বাবুর কলেজ ছুটি, ফেলুবাবুর ও হাত খালি।ভাবলুম গরমের ছুটিটা এবার সুইডেনে কাটালে কেমন হয়! আইডিয়াটা কিন্তু আমার, মণিকঙ্কণা, বুঝলেন!”
“কিন্তু …তা বলে…কোনো খবর না দিয়ে…”
“ওটা আমার আইডিয়া মণিদি,” তপেশের মুখে হাসি। “কেমন, দারুণ সারপ্রাইজ না”?
একমাত্র আসল লোকের মুখেই কোনো কথা নেই।
আমি কেন জানি ওর দিকে তাকাতে পারছি না। যদিও বেশ বুঝতে পারছি ওর মর্মভেদী দৃষ্টি আমার দিকে। কান, মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে আমার….গালে আগুনের হল্কা টের পাচ্ছি যদিও ও আমার চেয়ে অন্ততঃ পাঁচফুট দূরে দাঁড়িয়ে আছে।
“আপনারা জানলেন কি করে আমি এখানে হাঁটতে এসেছি?” কোনোরকমে কথা খুঁজে পাই আমি।
“আরে আমরা তো আপনার বিল্ডিং-এই একটা আপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছি। ঐ যে, আপনার নীচের তলায়.., কি নাম, ম্যাগ.. না মার্ক না ..”
“ম্যাগনাস হেডিন”, আমি বলি।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ । ওই। সে তো একমাস থাকবে না, সামার কটেজে যাবে। তাই আ্যপার্টমেন্ট একমাসের জন্য ভাড়া দেবে বলে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল। আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট মন্টুবাবু জোগাড় করে দিলেন তো!”বলে চলেন জটায়ু।
“আমরা তো তোমার ফ্ল্যাটে গিয়ে বেল দিলাম মণিদি।কেউ খুলল না। তারপর পাশের ফ্ল্যাটের বুড়ি ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এসে বললেন তুমি নাকি এসময় প্রায়ই হাঁটতে বেরোও। উনিই দেখিয়ে দিলেন এই পার্কের রাস্তা…”
“চল তপেশ আমরা একটু এই লেক ধরে হেঁটে আসি। আপনাদের আবার এখানেই মীট করব তাহলে, কেমন?“ বলে রওনা দিল দুজনে।
ওরা পথের বাঁকে মিলিয়ে যাওয়া মাত্র আমি নিজেকে আবিষ্কার করলাম দুটো সবল বাহুর মধ্যে। তাদের মধ্যে পুরোপুরি হারিয়ে যাবার ঠিক আগে মাথায় এল…
….আমরা দুজন দুজনকে এখনো অব্দি একটা কথাও বলিনি!”
…
—————————————
পর্ব ৩ঃ এলেম নতুন দেশে
—————————————
“দারুণ জায়গা কিন্তু মশাই, এই স্টকহোম! রাস্তায় ঘাটে একটু ধুলো-নোংরা কিচ্ছু নেই লক্ষ্য করেছেন কি? আর শহরের মধ্যেও কত সবুজ। লেকও আছে কতগুলো…ছোট বড় বিভিন্ন মাপের। কোথাও চিৎকার, চেঁচামেচি কিচ্ছু নেই।”
সকালবেলা একটা ক্যাফের বাইরে বসে কফি আর দারচিনি দেওয়া মিষ্টি রুটি—-এখানে বলে ক্যানেলবুল্লার—খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। ক্যাফের ও পাশে একটা বিশাল পার্ক, তার মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একদল গুটগুটে বাচ্চা, পেছনে তাদের ন্যানিরা। সুইডেনের বিখ্যাত সরকারী চাইল্ড কেয়ার সিস্টেমের চলন্ত বিজ্ঞাপন হয়ে। রাস্তার ধারে ধারে বিশাল বিশাল টবে নানরঙের ফুল। সত্যিই সুন্দর। আর তাই আসার পর থেকেই লালমোহনবাবু যা দেখছেন তাতেই ইমপ্রেসড হয়ে যাচ্ছেন।
“এটা একটা ধনী দেশ, ছোট দেশ, খুব বেশী আভ্যন্তরীণ সমস্যাও নেই। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, ফলে বিশাল ডিফেন্স বাজেটও নেই। জনগণের করের টাকা তাই আবার জনকল্যাণে ব্যয় করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আমাদের দেশের সঙ্গে তো তুলনা করা যায় না..” ফেলুদা বলে।
“আর আমাদের দেশের মত করাপশানও নেই কি বলেন ফেলুবাবু…হে হে…।এরকম জায়াগায় তো আপনার পশার মাটি। ক্রাইম না থাকলে গোয়েন্দা কি করবে?”
“ক্রাইম কম হলেও একেবারে নেই তা কিন্তু নয় লালমোহনবাবু। গত বছরই এদের প্রধানমন্ত্রী ওলফ পাম খুন হন অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে যার কোনো কিনারা হয়নি এখনো…”একপেশে হাসি হেসে কফিতে চুমুক দেয় ফেলুদা।
“ওটার উচ্চারণ হবে উলফ পালমে..”, মণিদি বলে।।
“তা উনি খুন হলেন কেন? টেররিস্ট-টিস্ট কিছু? আমাদের মিসেস গান্ধীর মত?” লালমোহনবাবু কৌতুহলী।
“না। উনি আর ওঁর স্ত্রী সিনেমা দেখে ফিরছিলেন, এই তো কাছেই, স্বেয়াভ্যাগেন বলে বড় রাস্তাটার কাছে। কোনো বডিগার্ড ছিল না কিন্তু। কেউ একজন গুলি করে পালিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু”।মণিদি বলে।
“বলেন কি ম্যাডাম! প্রধানমন্ত্রী বডিগার্ড ছাড়া? আর আমাদের তো পঞ্চায়েত প্রধানের আগে পিছে দুজন দেহরক্ষী! তা পুলিশ তদন্ত করল না”?
“করেছিল.. দু একজন সন্দেহভাজন ধরাও পরে। কিন্তু কিছু ঠিকমত প্রমাণ বা শাস্তি কোনোটাই হয়নি। এখনো অব্দি ওটা আনসলভড মিস্ট্রি।” মণিদি বলে।
“আসলে ওদের ফেলু মিত্তির নেই কিনা, তাই আনসলভড! কি মশাই লেগে পড়বেন নাকি? তদন্তে?”
“আজ্ঞে না, আমার অমন আপনার মত বেড়াতে এলেই রহস্য খোঁজার বাতিক নেই।” ফেলুদা বলে।
“তা বললে কি হয় মিঃ মিত্তির! আজ পর্যন্ত আমরা কতবার বেড়াতে গিয়ে তদন্তে জড়িয়ে গেছি ভেবে দেখুন তো…”, জটায়ুর চোখ জ্বলজ্বল করছে।
“সে যা হয়েছে, হয়েছে। এখন অন্ততঃ আমি উলফ পালমের হত্যা রহস্যে জড়াচ্ছি না। এটা একটা অত্যন্ত হাই প্রোফাইল আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যাপার…এভাবে রাস্তার ধারের কাফেতে বসে স্থির করার জিনিস না”। ফেলুদা এই আলোচনাটা শেষ করতে চায়।
“মণি তো এক্ষুনি ক্যারোলিনস্কা যাবে। আমরা তাহলে আজ গামলাস্থান টা ঘুরে আসি!” ফেলুদা ওর স্বভাব মত নতুন জায়গায় আসার আগে পড়াশোনা করে এসেছে।
“কি..কি বললেন মশাই? গামলাস্থান মানে? গামলা বিক্রির জায়গা নাকি?” জটায়ু আবার বিভ্রান্ত।
“গ্যামলাস্টান লালমোহনবাবু”, মণিদি হেসে বলেন ।
“গ্যামলা মানে পুরোনো। স্টান টা ঐ স্থানের মতই। শহর। অর্থাৎ ওল্ড টাউন। যান ঘুরে আসুন আপনারা”।
“কি আছে ওখানে?”
“প্রায় সবই! রাজবাড়ি, সুইডিশ পার্লামেন্ট, রাজবাড়ির চার্চ! সরু, সরু পায়ে চলা কবল স্ট্রীট আর তার দুপাশের পুরোনো বাড়িতে রকমারী দোকান, রেসট্যুরেন্ট। একটা আর্টিস্ট কর্নারও আছে…শিল্পীরা ছবি এঁকে প্রদর্শন আর বিক্রী দুটোই করেন।” মণিদি জানিয়ে দেয়।
“ওখানে কিন্তু নোবেল মিউজিয়াম ও আছে।” ফেলুদা বলে।
“বলেন কি মশাই! তবে তো যেতেই হচ্ছে! যত অধমই হই না কেন, আমিও তো সাহিত্যিক। এ তো আমার কাছে তীর্থস্থানের মত। আমাদের রবিঠাকুরের ব্যাপারে ওখানে কি আছে দেখতে হবে একবার।”
“আমি গেছিলাম, এখানে আসার পর পরই। রবীন্দ্রনাথকে ওরা বেশ ভালই কভার করেছে। আমাদের মেডিসিনের ফ্লেমিং, রস এদেরও। যান ভাল লাগবে।” উঠে পড়ে মণিদি।
“আজকের দিনটা হলেই আমার হয়েছে। পরপর তিনদিন ছুটি মিডসামারের।”
“আচ্ছা এই মিডসামার মানেটা কি বলুন তো মণিকঙ্কণা ? আমাদের তো ধরুন চোত মাস থেকেই গরম…চলবে সেই ভাদ্র অব্দি। তার মাঝামাঝি মানে ধরুণ গিয়ে জৈষ্ঠ মাস…সে তো মনে হয় এখনই! এখানেও কি সেরকম নাকি?”
“এখানে ছ মাস নয়, ছ সপ্তাহ সামার লালমোহনবাবু,” মণিদি হাসে।
“কিন্তু এটা সেই সামারের মাঝখানে মোটেই নয়। বরং সামারের শুরু বলা যেতে পারে।”
“আসলে এটা একটা ফেস্টিভ্যাল ট্যু সেলিব্রেট দ্য সামার সোলিস্টিস।” চেয়ারের পেছন থেকে স্কার্ফটা টেনে নেয় মণিদি।
“কাল কিন্তু আমরা একটা আইল্যান্ডে যাব।”স্কার্ফটা গলায় পড়তে পড়তে বলে মণিদি।
“আইল্যান্ড মানে?” জটায়ুর ভুরু কুঁচকে ওঠে।
“আইল্যান্ড মানে আইল্যান্ড। দ্বীপ। স্টকহোমটা তো আসলে একটা আর্কিপেলাগো লালমোহনবাবু।” ফেলুদা বলে।
“ কি পেলাগো?”
“আর্কিপেলাগো। ছোট ছোট দ্বীপের সমষ্টি। স্টকহোম একদিকে যেমন বাল্টিক সী। অন্যপাশে আবার আছে লেক ম্যালারেন। নামেই লেক, আসলে ছোটখাট সমুদ্র। বাল্টিক সীর সঙ্গেও যুক্ত। আর এই দুই জলের মধ্যেই ছোট বড় মাঝারি মিলে প্রায় হাজার তিনেক দ্বীপ ।”
“তারই একটায় আমার বন্ধু আনিকার বাড়ি। ওর পরিবারের লোকদের সঙ্গে মিডসামার ডে পালন করতে যাব আমরা,একদম পাক্কা সুইডিশ স্টাইলে।” মনে করিয়ে দেয় মণিদি।
…
—————————————
পর্ব৪ঃ মার্ডার ইন মিডসামার
—————————————
মণিদির বন্ধু আনিকার বাবা মা থাকেন লেক ম্যালারেনের মধ্যে একটা ছোট্ট দ্বীপে। সব মিলিয়ে হয়তো পঞ্চাশ ঘর লোক। সবারই নিজস্ব নৌকো আছে। আবার শীতে লেক জমে গেলে মেইন ল্যান্ডের সঙ্গে রাস্তা তৈরী হয়ে যায়। ছবির মত সুন্দর জায়গা। বড় বড় পাইন গাছে ঘেরা আনিকাদের বাড়িটা লাল রঙের কাঠের তৈরী, সাদা বর্ডার দেওয়া। বিশাল বাগানে অনেক ফুল..পপি, প্রিমরোজ, পিওনি বাগান আলো করে আছে। দুটো চেরী আর তিনটে আপেল গাছে ফল সবে ধরেছে। এছাড়াও র্যাস্পবেরী আর রুবার্ব এর ঝোপ ভরে আছে।
আনিকার বাবা ফ্রেডরিক ভাঙা ভাঙা ইংরেজী বলেন। উনি আগে বড় ট্রাক চালাতেন। ওর মা আ্যগনেতা হাসপাতালের নার্স ছিলেন। ইংরেজী প্রায় বলেন না, কিন্তু প্রচুর হাসি দিয়ে ভাষার অভাব পূরণ করে দেন। ওর ভাই এরিক প্রায় আমার বয়সী।ইন্জিনিয়ারিং পড়ে, ছুটিতে বাড়ি এসেছে। দিব্যি ভাব হয়ে গেল আমার সঙ্গে।
কয়েকজন প্রতিবেশীও এল দেখা করতে। হান্স আ্যন্ডারসনের সোনালী দাড়ি, সোনালী চুল। খুব হাসি খুশী। আজ দশ বছরেরে বেশী ধরে এই দ্বীপে থাকে।
জোনাস বুদিনের চুল অবশ্য ডার্ক ব্রাউন, চোখ কালো। বোতাম খোলা শার্টের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে বুকের ট্যাটু আর তার ওপর ঝুলন্ত অক্সিডাইজড মেটালের লকেট। হিপি হিপি চেহারা।
“আপনার ইংরেজী তো বেশ! একটুও সুইডিশ টান নেই!” ফেলুদা প্রশংসার সুরে বলে।
“ধন্যবাদ। আসলে আমি ইংল্যান্ডের স্কুলে পড়েছি প্রায় সাত বছর!” জোনাস হেসে বলে।
“দ্যাট এক্সপ্লেইনস ইট! আপনারও কি আসল বাড়ি এই দ্বীপে?”
“না না, আমি মাস দুয়েক হল এসেছি। ভাড়া নিয়ে ঐ বাড়িটা।” জোনাস আঙুল দিয়ে দেখায় একটা হলুদ বাড়ি।
“এটা আমার বেশ পছন্দের জায়গা। গতবছরও এসেছিলাম। এবার পুরো সামারটা কাটাবার প্ল্যান। সেই সেপ্টেম্বর অব্দি! জাস্ট মাছ ধরে, সাঁতার কেটে আর কায়াকিং করে।”
“ভেরী সুইডিশ!” মৃদু হাসে ফেলুদা।
“আমি কিন্তু আগে থেকে বলে রাখলাম, কাল মিডসামারের নাচে আমি আপনার পাশে থাকব, অন্ততঃ একটা গানে।” হান্স মণিদিকে বলে দেয়।
“আপনার সঙ্গে নাচার জন্য নিশ্চয়ই কাল লাইন পড়ে যাবে। আমারই কপাল মন্দ। কাল আমি ঐ পশ্চিমের দ্বীপে গিয়ে আমার বন্ধুদের সঙ্গে মিডসামার কাটাব কথা দিয়ে ফেলেছি। কাল সকালেই কায়াক নিয়ে বেরিয়ে যাব।” জোনাসকে হতাশ শোনায়।
পরের দিন মিডসামার ইভ। দ্বীপের সব বাসিন্দারা মিলে জলের ধারে সবুজ মাঠে মে পোল তুলবে। সেটা সাজানোর প্রস্তুতি আজ সকালেই দেখে এসেছি। একটু পরে নাকি এর চারধারে বাচ্চা বুড়ো সবাই হাত ধরাধরি করে নাচবে। সব মেয়েদের মাথায় থাকবে ফুল পাতা দিয়ে বানানো টায়রার মত ক্রাউন।আনিকাকে দেখলাম হেসে হেসে মণিদিকে ক্রাউন বানানো শেখাচ্ছে।
বেলা বারোটা নাগাদ তোলা হল মে পোল। বাচ্চারা ছুটোছুটি করছে, বুড়োরা গান গাইছে সব মিলে এক উৎসবের মেজাজ। মণিদি আনিকার সঙ্গে এল। গোড়ালি অব্দি লম্বা, ঘেরওয়ালা ফুলছাপ ফ্রক আর মাথায় গোলাপী পিওনির ক্রাউনে মণিদিকে ফাটাফাটি দেখাচ্ছে। অনেকেই ওকে ঘুরে ঘুরে দেখছে।
জোনাসকে দেখলাম ছিপ আর একটা পিকনিক বাস্কেট নিয়ে বীচে রাখা ওর কায়াকের দিকে যাচ্ছে। মণিদির দিকে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “শেম! ইউ লুক আ্যমেজিং”!
শুধু জোনাসই নয়, বীচে আরো অন্ততঃ পনেরটা কায়াক এবং ক্যানো। কেউ যাচ্ছে, কেউ আসছে।
“প্রদোষ, ইউ আর ডান্সিং উইথ আস, আর্নট ইউ?” আনিকা জিজ্ঞেস করল ফেলুদাকে।
“নো, আ্যবসলিউটলি নট। নট ইন এ মিলিয়ন ইয়ার।”ফেলুদা পরিস্কার বলে দেয়।
“কাম অন প্রদোষ, ফর মাই সেক… আ্যট লীস্ট ফর ইওর ফিয়াঁসেস সেক..” আনিকা নাছোড়বান্দা ।
“ট্রাস্ট মী আনিকা, ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট মী টু ডান্স। দ্যাট উইল বী আ্যন আনমিটিগেটেড ডিসাস্টার”। ফেলুদার মুখে মৃদু হাসি।
লালমোহনবাবুর মুখ এদিকে ফ্যাকাশে।
“ও মশাই এবার কি আমাকে ধরবে নাকি… এত মহা জ্বালা হল..”
বলতে না বলতেই আনিকা সটান গিয়ে লালমোহনবাবুর হাত ধরে টান দেয়,
“হোয়াট আ্যবাউট ইউ লালমোহন? শিওরলি ইউ আর নট আ্যজ স্পয়েল স্পোর্ট আ্যজ ইওর ফ্রেন্ড?” ফেলুদার দিকে দেখিয়ে বলে আনিকা।
“ইয়েস, ইয়েস ম্যাডাম…আই আ্যম …কি বলে ..বিগ, ভেরী বিগ..ঐ..মানে …স্পয়েলস্পোর্ট..আর কি!”
ভদ্রলোক কিন্তু আগে ভালই বলছিলেন ইংরেজীটা। এখন নার্ভাস হয়ে সব গুলিয়ে ফেলেছেন।
“ডোন্ট কল মি ম্যাডাম, কল মী আনিকা, লালমোহন! কাম, ইট ইজ রিয়েলি ইজি, আই উইল শো ইউ। ইউ পুট ইওর হ্যান্ড আ্যরাউন্ড মাই ওয়েইস্ট, লাইক দিস..”
“নো নো..ম্যাডাম..মানে আনিকা ম্যাডাম…আই ক্যান নট..মানে কি গেরো…”
“আনিকা, লীভ দিজ গাইজ আ্যলোন, লেট আস এনজয় আওয়ারসেল্ভস”, মণিদি উদ্ধার করে লালমোহন বাবুকে।
“তুমি যাবে না তো! আমি কিন্তু চললাম,”যাবার আগে মণিদি বলে ফেলুদাকে।
“যাও না। আমি কি বারণ করেছি? শুধু আমাকে টেনো না।”ফেলুদা বলে দেয়।
“লার্স, হান্স , আ্যন্ডার্স ওরা সবাই কিন্তু আমাকে ডাকাডাকি করছে। নাচব তো ওদের সঙ্গে?” মণিদির মুখে দুষ্টু হাসি।
“এসব বলে কোনো লাভ নেই, বুঝলেন ডাঃ ব্যানার্জি! গত কয়েক মাসে আপনার জন্য এমন অনেক কিছু করেছি, যা ফেলু মিত্তির করবে বলে কেউ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি। কিন্তু নাচতে আমি পারব না। তাতে আপনি সুপারম্যান বা মিঃ ইন্ডিয়া যার সঙ্গেই নাচের জুটি বাঁধুন না কেন।” ফেলুদার মুখেও একপেশে হাসি।
“হোপলেস! চল তপেশ আমরা যাই”, বলে আমার হাত ধরে টান দেয় মণিদি।
“আরে আরে মণিদি, আমি কি করে …আমি নাচতে জানি নাকি..”। এতো বিষম বিপদ।
“সে তো আমিও জানি না। শিখে নেব, চলতো। তাহলে ভবিষ্যতে তোমার বউকে এরকম একা একা নাচতে যেতে হবে না! চল, চল।” মণিদি নাছোড়বান্দা ।
“ও ফেলুদা..”
“যা তোপসে, সঙ্গে যা। নাহলে দেখবি তোর মাউন্টেন বাইক ফস্কে গেছে!” ফেলুদা হেসে বলে।
মণিদি আমার হাত ধরে টানতে টানতে একেবারে নাচের দলে নিয়ে এল।
নাচটা সত্যিই বেশ সোজা। ঐ যে বাচ্চারা রিঙ্গা রিঙ্গা রোজেস খেলে, অনেকটা সেইরকম। গানের কথাগুলোও বেশ মজার।এরিক আর আনিকা মিলে বুঝিয়ে দিচ্ছিল। ছোট্ট ব্যাঙের গান, কাপড় ধোয়ার গান, বৃষ্টি পড়ার গান…একেবারে ফোক সং। বাজনার তালে তালে পা মিলিয়ে গেলেই মোটামুটি একটা কিছু দাঁড়িয়ে যায়।
একটু পরে পরেই লোকে জায়গা বদল করছিল। মণিদির পাশে জায়গা নিতে সত্যিই ভিড় লেগে গেল।
ফেলুদা আর লালমোহনবাবু একটা উঁচু ঢিপির কিছুটা অব্দি উঠে সব দেখছে।
দিব্যি জমে উঠেছে ব্যাপারটা, এমন সময় হঠাৎ মনে হল দলের ছন্দবদ্ধ চলাটা থমকে গেছে। মণিদির কাছের জায়গাটায় আর লোকেরা হাত ধরাধরি করে নেই…কেমন একটা জট পাকিয়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি এক বিশালদেহী আধবুড়ো লোক মাটিতে চিৎ হয়ে পরে। মণিদি হাঁটু গেড়ে তার পাশে বসে পালস দেখছে মুখ গম্ভীর ।
“ডিড এনিওয়ান কল আ্যন আ্যমবুল্যান্স”? ফেলুদার গলা।
“ইয়েস, আনিকা ওয়েন্ট টু দ্য কাফে টু কল..” এরিক নার্ভাস গলায় বলে।
“আ্যন্ড দ্য পোলিস, টু..”
“পোলিস? ইসন্ট ইট এ হার্ট আ্যটাক…?”ভিড়ের মধ্যে কে বলে ওঠে।
“নো, ইট ডেফিনিটলি ইসন্ট”।বলে ফেলুদা আঙুল দেখায় …
পড়ে থাকা লোকটার ঘাড়ের তলা থেকে সরু রক্তের ধারা বেরিয়ে মণিদির ফুল ছাপ ড্রেস রাঙিয়ে দিচ্ছে…
…
————————————
পর্ব ৫ঃ টমসন আ্যন্ড থমসন
————————————
কার্ল গুন্নার গুস্তাভসনের ঘাড়ে গুলি লেগেছিল। কোনো গুলির শব্দ কেউ শোনেনি। হয়তো সাইলেন্সার ব্যবহার হয়েছিল। ভদ্রলোক কিন্তু মারা যাননি। তবে গুরুতর আহত।এটা উন্নত দেশ। সাত মিনিটের মধ্যে এয়ার আ্যম্বুলেন্স এসে হেলিকপ্টারে ওকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। সম্ভবতঃ ক্যারোলিনস্কাতেই যাবে।
দ্বীপের সব লোক ভীষণ শকড। এত দিন ধরে প্রতিবার এখানে মিডসামার পালিত হয়, কখনো এরকম ঘটেনি। এই তো মেরে কেটে একশ-দেরশ লোক। সবাই সবাইকে চেনে, আর আছে কিছু অতিথি, আমাদের মত। তার মধ্যে এই দ্বীপের বহুদিনের বাসিন্দা কার্লকে কে, কেন, কিভাবে গুলি করল সেটাই আশ্চর্য। অত লোকের মধ্যে, দিনের বেলা, অথচ কেউ কিছু দেখতে পেল না!
পুলিশ এল ঘন্টা দুয়েক পরে, বোটে চড়ে। একজনের নাম অকেসন আর অন্যজন স্বেনসন। আমার কেন জানিনা টিনটিনের টমসন আ্যন্ড থমসনের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। অবশ্য এরা যমজ নয়। স্বেনসনের বয়স কিছুটা বেশী, অকেসনের চেয়ে।
ওরা মন দিয়ে নিজের কাজ করছিল। ঘাসে পড়ে থাকা ব্লাড স্যাম্পল নিল। আশপাশটা ঘুরে দেখল। কিছু লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তা বলল। তারপর এল মণিদির কাছে।
কথাবার্তা ইংরেজীতেই হল, কিন্তু আমি বাংলা করে লিখছি।
“আপনিই তো প্রথম লক্ষ্য করেন ওকে পড়ে যেতে, তাই না ডাঃ ব্যানার্জি ?”
“আমি..কার্ল তখন আমার ডান পাশে ছিল, আমার ডান হাত ধরে নাচছিল..হঠাৎ দেখলাম ও কি রকম থেমে গেল…হাতটা আলগা হয়ে গেল…আর তারপর ধপাস করে…”
“অন্যরা..?”
“হ্যাঁ, সবাই তো প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছুটে এল। আসলে কার্ল তো একটু পরে পরেই গিয়ে আ্যলকোহল শট খেয়ে আসছিল… তাই অনেকে ভাবছিল ও ড্রাঙ্ক হয়ে পড়ে গেছে বোধহয়। ওর অন্য হাত ধরেছিল ইলভা, সেও তো তাই ভাবছিল..”
“তাহলে আপনি কি করে বুঝলেন ওর গুলি লেগেছে?”
“বুঝি নি তো! ভেবেছিলাম কোল্যাপস করে গেছে। হয়তো হার্ট আ্যটাক বা এপিলেপ্সি।সেটাই বোঝার চেষ্টা করছিলাম, পালস দেখছিলাম…ডক্টর’স রিফ্লেক্স!” ম্লান হেসে বলে মণিদি।”
“সে তো বটেই”, সহানুভূতির সঙ্গে ঘাড় নাড়ে অকেসন।
“তারপর কখন বুঝলেন গুলি লেগেছে?”
“সেটা ওঁর আগে সম্ভবতঃ আমি দেখি”, ফেলুদা এগিয়ে আসে।
“আপনি…আনিকা উলসনের অন্য ভারতীয় অতিথি?”
“হ্যাঁ। আমরা চারজন আনিকার আতিথ্যে এসেছি। গতকাল। স্টকহোম থেকে।” আমাদেরকে দেখিয়ে বলে ফেলুদা।
“আপনিও কি ক্যারোলিনস্কায় ডাক্তার ?”
“আজ্ঞে না। আমি ডাক্তার নই। আমি এখানে ট্যুরিস্ট। এসেছি বেড়াতে আমার কাজিন আর বন্ধুকে নিয়ে।”
“আর আমার ফিয়াঁসের সঙ্গে দেখা করতে”, মণিদিকে দেখিয়ে বলে ফেলুদা।
“ফিয়াঁসে? তাহলে ওঁর আঙুলে আংটি নেই কেন? এনগেজমেন্ট রিং?”
“আংটি ছাড়া ফিঁয়াসে হয় না বুঝি? তাহলে গার্লফ্রেন্ড।”
“ও আচ্ছা। তা আপনিও নিশ্চয় তাহলে নাচছিলেন? আপনার গার্লফ্রেন্ডের অন্য হাত ধরে ছিলেন কি?”
“আজ্ঞে না। আমি এবং আমার এই বন্ধুটি নাচে একেবারেই পারদর্শী নই। তাই আমরা ঐ ঢিপিতে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম।”
“এই নাচে আবার পারদর্শী হবার কি আছে? এটা কি ওয়ালটজ নাকি ফক্সট্রট?” স্বেনসনের ভুরু কুঁচকে গেছে।
“আপনি আপনার সুন্দরী গার্লফ্রেন্ডের সঙ্গে দেখা করবেন বলে সেই ইন্ডিয়া থেকে এলেন, আর তারপর এই মিডসামার ডান্সের সময় তাকে ছেড়ে ঐ ঢিপির ওপর বন্ধুর সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকলেন!”
এরকম করে বললে অদ্ভুত শুনতে লাগে ঠিকই। এই জেরার ধরণটা মোটেই ভাল লাগছে না আমার…
“মিঃ গুস্তাভসনের ঘাড়ে বুলেট টা লেগেছিল। উনি তখন এইদিকে মুখ করেছিলেন। তার মানে ওটা তো ঐ ঢিপির দিক থেকেই এসেছিল, তাই না”? অকেসনের নীল চোখদুটো সরু হয়ে এসেছে, মুখের হাসিটা আর নেই।
“আপনার বন্ধু, উনি কি করেন”?
“আ -আ-আমি—-মানে- আমার —কাজ হল—কা-কা-ক্রাইম…”
“আপনি ক্রাইম করেন..?” অকেসনকে একই সঙ্গে অবাক আর সন্দিগ্ধ শোনায়।
“অফিসার অকেসন, উনি একজন বিখ্যাত ক্রাইম থ্রিলার রাইটার। যেমন ইনিড ব্লাইটন। আপনি চাইলে ইন্ডিয়ান এম্ব্যাসীতে খোঁজ নিতে পারেন ওঁর নাম করে।”
ফেলুদা কেটে কেটে বলে।
“আর হ্যাঁ, চাইলে আমার নামেও খোঁজ নিতে পারেন। ইন্ডিয়ান পুলিশকে অল্প বিস্তর সাহায্য করার অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমি একজন প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।”
“ও! ইন্ডিয়ান শার্লক হোমস! ইন্টারেস্টিং! ওকে, সো মিঃ ইন্ডিয়ান হোমস, টেল আস..এখানে এতদূর থেকে আপনি সবার আগে কি করে গুলি লাগাটা বুঝলেন?”
“সার্টেনলি মিঃ সুইডিশ লেস্ট্রেড, লেট মি এক্সপ্লেইন”
ফেলুদা ছেড়ে কথা বলার লোক নয়!
“কিছু একটা গোলমাল হয়েছে বুঝেই আমি ছুটে যাই ওখানে। ডিটেক্টিভ’স রিফ্লেক্স, ইউ সী”। ফেলুদা শুকনো হেসে বলে।
“গিয়ে দেখি মণি, মানে আমার গার্লফ্রেন্ড ওকে পরীক্ষা করছে আর ওর ফ্রক ভিজে উঠছে ভিক্টিমের রক্তে…
যেহেতু ও চিত হয়ে পড়েছিল, আমি বুঝে যাই গুলি লেগেছে ঘাড়ে কিম্বা ওপর পিঠে…”
“মাথায় নয় কেন?” স্বেনসন জিজ্ঞেস করে।
“মাথায় লাগলে ঘিলু, খুলির টুকরো সব ছিটকে যেত। অনেক মেসী একটা ব্যাপার হত।”
“হুম। তো তারপর কি হল?”
“তারপর আমি সঙ্গে সঙ্গে চেক করলাম…” মণিদি বলে
“ঘাড়ে লেগেছিল। বুলেট টা ওখানেই আটকে ছিল। আনিকাও এসে দেখল।তার একটু পরেই তো এয়ার আ্যম্বুলেন্স এসে গেল..।”
“ঠিক আছে। এখন এতেই হবে। আপনাদের পাসপোর্ট ডিটেইলগুলো আমরা নেব। আর আপনাদের স্টকহোমের ঠিকানাটা। এখন ক’দিন আপনারা সুইডেন ছাড়তে পারবেন না। ফেরার টিকিট কবে আপনাদের?”
“দেরী আছে কয়েক সপ্তাহ।আশাকরি তার মধ্যে আপনারা আসল অপরাধীকে ধরতে পারবেন।”
“দেখা যাক! সমস্যা হল কেউ কিছু দেখেওনি, শোনেওনি। অথচ পরিস্কার দিনের আলো, এত লোক…আপনারাও কিছু দেখেননি, তাই না?”
আমরা সবাই মাথা নাড়ি।
“আসলে সবাই নাচে ব্যস্ত ছিল..” মণিদি আস্তে আস্তে বলে।
“একমাত্র আপনার বয়ফ্রেন্ড আর তাঁর বন্ধু ছাড়া।” অকেসনের মুখে যদিও হাসি, চোখ হাসছে না।
“বন্ধু তো তাও বুঝি, একলা মানুষ।মেয়েদের ব্যাপারে মনে হয় একটু রক্ষণশীল। কিন্তু আপনার বয়ফ্রেন্ড যে কেন…”
“অফিসার অকেসন আপনি হয়তো জানেন না কিন্তু ..” ফেলুদা শুরু করে—
—”আমদের ঝগড়া হয়েছিল। নাচ শুরুর একটু আগেই..” মণিদি বলে ওঠে।
“তাই নাকি? কি নিয়ে?”
“ও আনিকার সঙ্গে খুব হেসে হেসে…আনিকা ওকে প্রায় টেনে নিয়ে যাচ্ছিল নাচতে…তাই…আমার রাগ হয়ে গেছিল..”
“ইউ আর জাস্ট লাইক মাই ওয়াইফ। ভেরী জেলাস। মে বী অল বিউটিফুল লেডিজ আর লাইক দ্যাট”।স্বেনসনের মুখে হাসি। অকেসনও চুপ করে যায়।
———-
“এটা কি হল? গুলটা মারলে কেন পুলিশকে? জান, এটা একধরণের অপরাধ? পুলিশকে মিসলিড করা..”, ফেলুদা বলল পুলিশের নৌকো ছেড়ে যাবার পরেই।
“আমি কিচ্ছু মিসলিড করি নি প্রদোষ। ওরাই একটা অদ্ভুত ফিক্সড আইডিয়া ধরে তোমাকে ক্রমাগত ফ্রেম করার চেষ্টা করে যাচ্ছিল।”
“তাতে কি? যা ঘটেনি তা ওরা কখনই প্রমাণ করতে পারত না।” ফেলুদা এখনো গম্ভীর।
“না। তা পারত না। তবে হ্যারাস করে তোমাদের পুরো ছুটিটা বরবাদ করে দিতে পারত। তুমি তো ওকে ভারতীয় শহুরে কালচারে নাচের অভাবের ব্যাপারে লেকচার দিতে যাচ্ছিলে, তাই তো? তোমার কি ধারণা ও বুঝতো সেটা? নিজেদের আচার,ব্যবহার, প্রথায় ওরা এতটাই র্যাপড যে ওদের মাথায় এগুলো ঢুকবেই না। বিশেষ করে ঐ অকেসনটার মোটা মাথায়।”
“যাকগে, চল এখন বাড়ি যাই। এই জামাটা ছেড়ে ভাল করে চান করব আমি”…ড্রেসের নীচের দিকে শুকিয়ে খয়রী হয়ে যাওয়া রক্তের দাগটা দেখিয়ে বলে মণিদি।
“চল, তোমায় বিদ্ধস্ত দেখাচ্ছে”।ফেলুদা অবশেষে নরম গলায় বলল।
“চলুন লালমোহন বাবু”। বলি আমি।
ভদ্রলোক থম মেরে বসেছিলেন এতক্ষণ।
“ওরা যদি আসল অপরাধী খুঁজে না পায়, তাহলে আমাদের ফেরার কি হবে ফেলুবাবু”?
“চিন্তা করবেন না লালমোহনবাবু। অপরাধের কিনারা হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আমাদের সাসপেক্ট লিস্ট থেকে বাদ দিলেই হল”।
“আর না দিলে… এখানেই থাকব নাকি সারা জীবন “?
“তাতে আপনার আপত্তিটা কি লালমোহনবাবু? এই তো বলছিলেন কি ভাল দেশ, কি পরিস্কার, কি সুন্দর , কি উন্নত..” বলে উঠি আমি।
“বাজে কথা বোলো না তো তপেশ! বেড়াতে আসা এক আর থাকা আর এক। আর থাকবই বা কোথায়, খাব কি? ওরে বাবা। নাচতে না জেনে একি ভোগান্তি!
তখন গেলেই হত আনিকা ম্যাডামের সঙ্গে। অত করে বললেন উনি। কি আর হত! হয় পা মাড়িয়ে দিতুম নয়তো আছাড় খেতুম….খুনের মামলায় তো আর জড়াতুম না…”
হাহাকার করতে থাকেন জটায়ু।
…
———————————
পর্বঃ ৬ স্নাইপার
———————————
সন্ধে সাতটার মধ্যে ডিনার হয়ে গেল। নামেই অবশ্য সন্ধে। আকাশে গনগন করছে বছরের দীর্ঘতম দিনের সূর্য।
আনিকাদের বাড়িতে সবাই খুব শকড। শুধু ওদের বাড়িতেই বা কেন, পুরো দ্বীপেই তাই। অন্যান্য বছর এখনো অব্দি মিড সামারের পার্টি আর খাওয়া দাওয়া চলতে থাকে। তার সঙ্গে দফায় দফায় নাচ গান। এবার অবিশ্যি সব গড়বড়।
আ্যগনেতা চটপট কিছু পাস্তা আর মীটবলস বানিয়েছেন ডিনারের জন্য। খাবার টেবলেও বিশেষ কথা বার্তা হচ্ছিল না।
“এই কার্ল গুন্নার কি এখানকার বহুদিনের বাসিন্দা?” ফেলুদা একটা মিটবল কাঁটায় গেঁথে জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ । ওরা তো অন্ততঃ তিন প্রজন্ম ধরে এখানেই আছে। আমি ওকে ছোটবেলা থেকে চিনি…” আস্তে আস্তে বলেন ফ্রেডরিক।
“মাঝখানে অবশ্য কিছুদিন ছিল না এখানে। ব্রেজিল না আর্জেন্টিনা কোথায় ছিল প্রায় বছর আষ্টেক। কতই বা বয়স হবে তখন… এই তোমাদের মত… এই তো দুনিয়া দেখার সময়।” অন্যমনষ্ক ভাবে বলে চলেন ফ্রেডরিক ।
“কি করতেন উনি ওখানে?”ফেলুদা প্রশ্ন করে।
“সেটা ভাল বলতে পারব না।”
“কেন যে কেউ ওকে মারবে আমি তো বুঝতে পারছি না।” এরিক বলে ভুরু কুঁচকে।
“দারুণ কিছু বড়লোক না, দারুণ কিছু প্রভাবশালী না। রাজনীতি করে না, ব্যবসা করে না…এখানে কোনো শত্রু আছে বলেও তো শুনিনি।”
“এখানে আমরা দরজা খুলে রেখে দোকানবাজার যাই। একটা ছিঁচকে চুরি অব্দি হয় না…অথচ…”আনিকা গম্ভীর হয়ে বলে।
———-
“চল তোপসে, একটু ঘুরে আসি। এখনো দিব্যি সূর্যের আলো রয়েছে।” রাত ন’টার সময় বলল ফেলুদা।
“মণিদি আর লালমোহনবাবু?”
“না রে, মণির ওপর খুব ধকল গেছে আর লালমোহনবাবুরও মন একেবারেই ভাল নেই। ওরা বিশ্রাম নিক, আমরা ঘুরে আসি।”
বাইরে বেরিয়ে দেখলাম মনে হচ্ছে কলকাতার গরমকালের বিকেল পাঁচটা। সূর্য এখনো দিগন্তের বেশ ওপরে। চারিদিক শুনশান কিন্তু অদ্ভুত সুন্দর!
ফেলুদা দেখলাম ঐ মে পোলের মাঠের দিকে এগোচ্ছে।
সেখানে পৌঁছে ও সোজা চলে গেল ছোট টিলাটার দিকে যেটার নীচের দিকে ও আর লালমোহনবাবু দাঁড়িয়ে ছিল। এবার কিন্তু ও সোজা টিলাটার টঙের দিকে উঠতে লাগল।
“কোথায় যাচ্ছি আমরা, ফেলুদা?”
“ঐ টমসন আ্যন্ড থমসন কিন্তু একটা কথা ঠিকই বলেছিল। কার্লের ঘাড়ে গুলি লাগলে সেটা নিশ্চয়ই এই টিলার দিক থেকেই এসেছিল। অথচ আমি আর জটায়ু তো কিছু দেখিনি। তাহলে হয়তো আরো ওপরে, আমাদের পেছনে কেউ ছিল…”
কথা বলতে বলতে আমরা প্রায় টঙে উঠে এসেছি।এখান থেকে মে পোলটা বেশ ছোট দেখাচ্ছে। অনেকটা দূরত্ব। টিলার অন্য পাশটায় প্রায় খাড়া পাথুরে দেওয়াল নেমে গেছে সোজা লেক ম্যালারেন এর জলে।
“ফেলুদা, এখানে কেউ বুকে ভর দিয়ে শুয়ে থাকলে নাচের মাঠ থেকে দেখা যাবে না ঠিকই। কিন্তু এখান থেকে কি গুলি করে অতদূরে নাচের দলে একজনকে মারা সম্ভব?”
“এমনিতে সাধারণ পিস্তল বা রিভলভার দিয়ে তো না…কিন্ত…”
“কিন্তু কি, ফেলুদা?”
“একটা খটকা রে তোপসে…চল, দেখ তো কোনো রাইফেলের বুলেটের ব্যবহৃত শেল আসেপাশে পাস কিনা?”
“রাইফেল?!”
“ইয়েস স্যার, রাইফেল ছাড়া এই দূরত্ব থেকে কিছু করা অসম্ভব।”
কিন্তু অনেক খুঁজেও সেরকম কিছু পেলাম না আমরা। টিলার ওপরটা মোটামুটি ফাঁকাই। কয়েকটা খরগোশের গর্ত আর এখানে ওখানে ছড়ানো পাথর ছাড়া।
“এখানে যদি কেউ থেকেও থাকে তবে সে পালাল কি করে ফেলুদা। নামার সময় তাকে সবাই দেখবে না? তাও আবার রাইফেল ঘাড়ে? “
“সেই তো ভাবছি রে তোপসে…যদি না সে ঐ দিক দিয়ে লেকে নেমে পড়ে…”
“ঐ দিকটা তো ভীষণ খাড়া ফেলুদা..”
“হুম। কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। বিশেষ করে যদি সে লোকের কাছে দড়ি টরি থাকে, প্ল্যান করে আসে।”
“আর নেমে? সাঁতরে পালাবে?”
“না রে তোপসে। রাইফেল ঘাড়ে, জুতো পরে… আর সাঁতরে যাবেই বা কতদূর? এই লেক ম্যালারেন তো বিশাল!
“তবে?”
“আমি হলে তো একটা ছোট ক্যানো বা কায়াক নৌকো নিতাম…ঐ দেখ ঐ যে দুজন যাচ্ছে, ওরকম”।
“টিলার ঠিক নীচ দিয়ে কায়াক চেপে যেতে যেতে হাত নাড়ে জোনাস আর হান্স।
“চল। কাল আরেকবার আসব মণিকে নিয়ে। ও যদি এই পাহাড় দিয়ে কিছুটা নেমে দেখে আসতে পারে…এখন চল নীচে যাই।”
মাঠে এদিক ওদিক ছড়ানো ছেটানো দু একটা চেয়ার পড়ে আছে। ইতি উতি পড়ে আছে মেয়েদের মাথার ক্রাউন দু একটা, কিছু ফুলের তোড়া।কার্ল যেখানে পড়ে ছিল সে জায়গাটা পুলিশ টেপ দিয়ে ঘিরে দিয়েছে।
ফেলুদা সোজা চলে গেল মে পোলটার দিকে। নীচে দুএকটা বার্চের ডাল আর ফুল টুল পড়ে আছে। ফেলুদার দৃষ্টি কিন্তু তীক্ষ্ণ, তাকিয়ে আছে মে পোলের দিকে, প্রায় মাথার সমান হাইটে। হঠাৎ গিয়ে একটা পড়ে থাকা চেয়ার নিয়ে এসে তার ওপর দাঁড়িয়ে পোলটার গা থেকে কি একটা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে থাকে। ততক্ষণে আমিও দেখেছি, ঐ জায়গাটায় বার্চ পাতা নেই, একটু ন্যাড়া মত…। হাত দিয়ে সুবিধে হল না দেখে ফেলুদা পকেট থেকে ওর সুইস নাইফটা বের করে কি একটা কেটে বের করে রুমালে ধরে নিয়ে নেমে এল।
“এই দ্যাখ তোপসে। এই জিনিস চট করে দেখা যায় না”। ফেলুদার প্রসারিত হাতের তালুতে রুমালের ওপর একটা লম্বা বুলেট।
“রাইফেলের বুলেট, ফেলুদা? আর একটা শট মারা হয়েছিল তাহলে, যেটা মিস হয়ে এই মে পোলে লাগে?”
“খুব সম্ভব। তবে এটা যে কোনো রাইফেলের বুলেট নয় রে তোপসে….ইফ আই আ্যম নট মিসটেকেন… দিস ইজ এ স্নাইপার বুলেট।”
“স্নাইপার! সে তো স্পাই থ্রিলারে থাকে…!! এখানে এই গেঁয়ো, আধবুড়ো কার্ল গুন্নারকে মারতে স্নাইপার?”
“হুম! রহস্যটা ক্রমেই পাকিয়ে উঠছে রে!”
***
—————————————————
পর্ব ৭ঃ পদস্খলন—
—————————————————
পরদিন সকালে উঠে ব্রেকফাস্ট খাবার পরে এরিক আমাদের বেসমেন্টে ওর ওয়ার্কশপ দেখাল। ছেলেটার সত্যিকারের ইন্টারেস্ট আছে ইঞ্জিনিয়ারিং এ। সেই ছোটবেলা থেকে কত কি যে বানিয়েছে….বিভিন্ন মডেল ইঞ্জিন, খেলনা ট্রাক, হ্যাম রেডিও ! অনেক যন্ত্রপাতিও আছে। ড্রিল, স্ক্রুড্রাইভার, নাট বল্টু এসব ছাড়াও চেইন শ, নানরকমের করাত, টিউব, রেঞ্জ, ব্যাটারী ইত্যাদিতে ভর্তি।
মণিদিকে আজ অনেক ফ্রেশ লাগছে। লালমোহনবাবুর মুখ অবশ্য এখনো থমথমে। কালকের বুলেটের ব্যাপারটা ফেলুদা পুলিশকে ফোন করে বলেছে। ওরা একটু পরে এসে নিয়ে যাবে বলেছে।
সকাল ন’টা নাগাদ আমরা চারজন, আনিকা আর এরিক মিলে আবার ঐ টিলাটার ওপরে উঠলাম।
“এই গর্তগুলো কিসের মশাই”, লালমোহন বাবু জিজ্ঞেস করেন।
“খরগোশের। এই গর্তগুলো কিন্তু মাটির তলা দিয়ে বহুদূর যায়”, আনিকা বলে।
“বলেন কি! সেই আ্যলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ডের মত?” লালমোহনবাবুর মুড টা ঠিক হচ্ছে মনে হয়।
“দেখ তো, পারবে এদিকটা দিয়ে নামতে? ভাল করে দেখে নাও। অযথা রিস্ক নিও না”, ফেলুদা মণিদিকে বলে।
“প্রায় পুরোটাই পারব…শেষের ৫০ ফুট ছাড়া। ওটা ভয়ঙ্কর খাড়া আর শুধুই পাথর। তার ওপরে জলের ঢেউ লেগে লেগে পিছল।” মণিদি বলে।
“ঠিক আছে। তাহলে তার ওপর অব্দি গিয়ে দেখ”।
“কিন্তু কি খুঁজব?”
“জানি না…কোনো দড়ি জাতীয় কিছু… কারো ওদিক দিয়ে নেমে যাবার কোনো চিহ্ন…”
মণিদি খাঁজে খাঁজে পা রেখে প্রায় ফুট তিরিশেক নেমেই চেঁচিয়ে ওঠে “ইউরেকা!” তারপর চটপট উঠে এল, হাতে একটা মাঝারি সাইজের পাথর। তাতে নীল নাইলনের দড়ি বাঁধা যেটার তলার দিকটা পরিস্কার করে কাটা, সম্ভবতঃ কোনো ছুরি দিয়ে।
“ভেরী গুড। এটাতে ঝুলে হয়তো নেমে গেছিল। গিয়ে দড়িটা ছুরি দিয়ে কোমর থেকে কেটে পালিয়েছিল”। ফেলুদা বলে।
“নীচে নেমে ঐ জলের ধারে যাওয়া যায়?” ফেলুদা এরিককে জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ, ঐ বীচ থেকে বাঁ দিক ধরে ধারে ধারে তিন চারশ মিটার হাঁটলেই যাওয়া যাবে। এবড়ো খেবড়ো পাথর, শ্যাওলায় পেছল..কিন্তু সাবধানে হাঁটলে যাওয়া যায়।” এরিক বলে।
“কেন যেতে চান আপনি ওখানে?”
“দেখতে চাই কোনো কায়াক বেঁধে রাখার চিহ্ন পাওয়া যায় কিনা।”
এরিকের কথা মত বীচ থেকে টিলার তলা ঘেঁসে হাঁটু জলে কিছুদূর যেতেই দেখা গেল কায়াক মুরিং পয়েন্ট।
লোকে যাতে তাদের কায়াক বেঁধে রেখে টিলার পাথরে বিশ্রাম নিতে পারে সেই জন্য কাঠের তৈরী খান চারেক হ্যাঙ্গার আছে টিলার গা ঘেঁসে। এই জায়াগাটাও অপেক্ষাকৃত সমতল, একটু দাঁড়ানো যায়।
এখন অবশ্য এখানে কোনো কায়াক বাঁধা নেই। তবু ফেলুদা হ্যাঙ্গারগুলোর আশপাশে ঘুরে দেখতে লাগল।
কাছেই মাটিতে টুকরো টাকরা দড়ি বা ধাতব হুক পড়ে আছে দু একটা। কয়েকটা তো বেশ পুরোনো মনে হল।
“প্রদোষ, লুক”, এরিকের চোখ জ্বলজ্বলে, ওর হাতে একটা ছোট্ট হুকের সঙ্গে বাঁধা এক টুকরো নাইলনের নীল দড়ি…ঠিক যেমন মণিদি কুড়িয়ে আনল একটু আগে।
“ইটস দ্য সেম রোপ, ইসন্ট ইট?”
“সীমস সো”। ফেলুদা বলল
“আর এই হুকটা তো..,”
“হ্যাঁ, টিপিক্যাল কায়াক মুরিং রোপে লাগানো থাকে। ডকে বাঁধতে সুবিধে হয়। তবে একটুতেই খুলে যায় অনেক সময়…বিশেষ করে তাড়াহুড়ো থাকলে।”এরিক বলতে থাকে। এরা ছোটবেলা থেকেই সবাই নৌকো চালানোয় দক্ষ।
ফেলুদা বিড়বিড় করতে শুরু করেছেঃ
“আচ্ছা, তাহলে পুরো ব্যাপারটা খাপে খাপে মিলে যাচ্ছে, কায়াকে করে এসে, টিলায় উঠে, স্নাইপ করে আবার কায়াকে চেপে পলায়ন। একটা মিসড শট মে পোলের গায়ে, অন্যটায় লক্ষ্যভেদ…কিন্তু প্রশ্ন মোটিভটা কি…এত কিছু কান্ড….
….মণি!!!
ফেলুদা হঠাৎ মণিদিকে হ্যাঁচকা টান দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিল। টাল সামলাতে না পেরে মণিদি একটা পাথরে হোঁচট খেয়ে টিলার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। আর সঙ্গে সঙ্গেই মণিদি একটু আগে যেখানে ছিল সেখানে একটা বিরাট পাথর আছড়ে পড়ল। আর এক সেকেন্ড দেরী হলে কি হত ভাবতেও গায়ে কাঁটা দেয়।
“ল্যান্ডস্লাইড নাকি মশাই”? লালমোহনবাবু বলে ওঠেন।
“মনে হয় না, লালমোহনবাবু। আমি শিওর এটা ঐ টিলার ওপর থেকে গড়িয়ে ফেলা হয়েছে। সম্ভবতঃ আমাদের তদন্তে ব্যাগড়া দিতে।”
“মণি, তুমি ঠিক আছ?” কাঁধের তলায় হাত দিয়ে তোলার চেষ্টা করতে করতে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
“না….মানে পা টা মনে হয় বাজে ভাবে মচকেছে… হাঁটতে পারছি না..” মণিদির মুখ যন্ত্রনায় কুঁচকে আছে।
“আমরা সবাই মিলে ধরব”? এরিক আর আনিকা এগিয়ে আসে।
“না, ঠিক আছে। আমি দেখছি।” বলে মণিদিকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় ফেলুদা।
“আরে আরে, কি করছ কি…নামিয়ে দাও..আমি পারব”, মণিদি হাঁউমাঁউ করে ওঠে।
“না পারবে না। আর তোমার পদস্খলনের জন্য যখন আমিই দায়ী তখন আমাকেই তার ভারটা বইতে দাও”। বলে হাঁটা লাগায় ফেলুদা।
“চলে আসুন। আমাদের কাজ এখানে শেষ”।
“অ-অ-অ! হাউ রোমান্টিক! “ আনিকা বলে ওঠেন।
এরিক আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে চোখ টেপে।
“লালমোহন, আর ইউ আ্যজ রোমান্টিক আ্যজ ইওর ফ্রেন্ড”? আনিকার জিজ্ঞাসা।
“নো আনিকা ম্যাডাম…নো রোমান্স! আই আ্যম ওনলি …কি বলে ..ইনটু রহস্য রোমাঞ্চ”, বেগুনী হয়ে গিয়ে বলেন জটায়ু।
“রোহাস…হোয়াট?” আনিকা ঘেঁটে গেছেন।
“ক্রাইম থ্রিলার”, আমি উদ্ধারে নামি।
“ও-ও! দ্যাটস আ্যমেজিং”! আনিকার গলায় প্রশংসার সুর।
“আরো বেশী আ্যমেজিং কি জানেন আনিকা, ওনার পেন নেম জটায়ু, একজন বিরাট মাইথোলজিক্যাল ক্যারেক্টার যে কিনা একজন মহিলার সম্মান বাঁচাতে জীবনপণ করেছিল”। এগিয়ে যেতে যেতে বলে ফেলুদা।
“ওয়াও”! আনিকা বাকরুদ্ধ !
আমি ভাবছিলাম ফেলুদার ফিটনেসের কথা। আমরা যেখানে নিজেই হাঁটতে গিয়ে কেবল হড়কাচ্ছি, সেখানে ও মণিদিকে কোলে তুলে দিব্যি এগিয়ে যাচ্ছে।
আমরা সবাই বীচে ফিরে এসে দেখি পুলিশের বোটটাও এসে গেছে।ফেলুদা মণিদিকে একটা বেঞ্চে বসিয়ে দিল। এরিক গেল বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে আসতে যাতে মণিদিকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
“তাহলে আপনিই বুলেটটা পেলেন? “, ফেলুদার হাত থেকে ওটা নিয়ে বললেন অফিসার অকেসন।
“স্নাইপার বুলেট তো এটা!” ফেলুদা অকেসনের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ , তাই তো মনে হচ্ছে। আপনি পেলেন কি করে? জানতেন নাকি ওটা কোথায় থাকবে?” অকেসনের কথায় শ্লেষ স্পষ্ট।
“আজ্ঞে না। কয়েকটা ক্লু পরপর অনুসরণ করে এটা পেয়েছি। মে পোলটা দেখলেই বুঝতে পারবেন এটা কোথায় গেঁথেছিল। আর সেটা থেকে আপনাদের ব্যালিস্টিক এক্সপার্ট নিশ্চয়ই বলতে পারবেন যে এটা আমরা যেখানে দাঁড়িয়েছিলাম তার আরো অনেক পেছন আর উঁচু থেকে ছোঁড়া হয়েছিল।”
ফেলুদার গলা ঠান্ডা।
“তা ছাড়াও অন্ততঃ পঞ্চাশ জন লোক আমাকে আর আমার বন্ধুকে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন। তারপর আমি গুলি টুলি ছুঁড়ে অত লোকের সামনে স্নাইপার রাইফেল, সাইলেন্সার সব গুছিয়ে সরিয়ে ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ভিক্টিমের কাছে কি করে পৌঁছলাম সে প্রশ্ন তো থেকেই যায়।”
এবার গলা খাপ খোলা তলোয়ার।
“স্যরি মিঃ মিত্র, আমরা মীন করিনি যে আপনি মার্ডার আ্যটেমপ্ট করেছেন। আমরা কালই ইন্ডিয়ান এম্বাসীতে যোগাযোগ করেছিলাম। দ্য এম্বাসাডার পার্সোনালি ভাউচড ফর ইউ। আর আপনার বন্ধু, রাইটারের কথাও উনি বলেছেন। থ্যাঙ্কস ফর ইওর হেল্প ইন দিস ইনভেস্টিগেশন।” স্বেনসন ফেলুদার দিকে হাত বাড়িয়ে দেন।
***
————————————————
পর্ব ৮ঃ অন্ধকার অতীত
————————————————
মণিদির পা ভালই ফুলেছে। ভাঙেনি বলেই মনে হয় তবে মোটামুটি চলচ্ছক্তিরহিত। অন্ততঃ আজকের দিনটাও এখানে থাকতে হবে। আনিকাদের বাড়ির সবাই অবশ্য সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছে যত দিন না পা পুরো সারে ওখানে থেকে যেতে।
ফেলুদার স্নাইপার বুলেট খুঁজে পাওয়ায় সবাই বেশ ইমপ্রেসড ।
“ইউ আর ট্রুলি ইন্ডিয়ান শার্লক হোমস।” আনিকার বাবা ফ্রেডরিক বললেন।
“একদম ঠিক ফ্রেডরিক। উনি এটা না পেলে পুলিশ কোনোদিনও এটা স্নাইপার আ্যটাক হিসেবে ধরতই না। দুটো আনতাবড়ি জেরা টেরা করে কেস বন্ধ করে দিত, আরেকটা আনসলভড মিস্ট্রি!” বললেন প্রতিবেশী জোনাস বুদিন।
“আমাদের পুলিশ হয়েছে বেশীরভাগ যত অপদার্থ। এগুলো তো ওদের খোঁজার কথা। তা না… শুধু যত নিও নাজী সিম্পাথ্যাইজার..”!
“ফ্রেডরিক!” আ্যগনেতার গলায় ভর্ৎসনা।
ফ্রেডরিক চাপা গলায় সুইডিশে কিছু গজগজ করে বাগানে চলে গেলেন।
“আসলে আমার বাবা এক আদ্যন্ত স্যোসালিস্ট। ট্রেড ইউনিয়নের মেম্বার। গত কয়েক বছরে নিও নাজী মুভমেন্ট বিভিন্ন জায়গায় বেড়ে উঠেছে বাবা সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না।” আনিকা ব্যাখ্যা দেন।
“এটা কি সত্যিই একটা বড় সমস্যা এখানে”? জিজ্ঞেস করে ফেলুদা।
“আমার তো মনে হয় না! ফ্রেডরিকদের জেনারেশন আসলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আরো কাছে তো,তাই ওদের অনেক সময় রজ্জুতে সর্পভ্রম হয়।” জোনাস হাসে।
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তো সুইডেন নিরপেক্ষ ছিল তাই না”? ফেলুদা জিজ্ঞেস করে।
“হ্যাঁ , সেটা ঠিক। কিন্তু এই নিয়েও দ্বিমত আছে। সুইডেন প্রচুর লৌহ আকরিক জার্মানীকে ঐ সময় বেচেছিল। যেটা ওদের অস্ত্র তৈরীতে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।তারপরে জার্মানী সোভিয়েত আক্রমণ করলে পরে সুইডেন জার্মান সৈন্যদের ওখানে যেতে দেয় নিজের রেল ব্যবহার করতে দিয়ে।”
ডাক্তার হলেও আনিকার ইতিহাস জ্ঞান ভালই।
“কিন্তু সুইডেন তো আ্যলায়েড ফোর্সকেও সাহায্য করেছিল”, ফেলুদা বলে।
“অবশ্যই। সেই জন্য তো চার্চিল বলেছিলেন যে ‘সুইডেন ইগনোরড দ্য গ্রেটার মরাল ইস্যুস অফ দ্য ওয়ার আ্যন্ড প্লেইড বোথ সাইডস ফর দ্য প্রফিট।’”
“একজন ভারতীয় হিসেবে অবশ্য চার্চিলকে আমার দারুণ কিছু মহান মনে হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ওঁর যাই অবদান থাক তার জন্য আমার দেশে করা ওঁর জেনোসাইড এবং ম্যান মেড ফ্যামিনের মত অপরাধ তো ছোট হয়ে যায় না।” ফেলুদা বলে।
“জানি প্রদোষ! ইতিহাস তো এরকম সরল সাদা কালোয় বিভক্ত নয়, অনেক জটিল! তবে প্রশ্ন কিন্তু শুধু সুইডেনের অফিসিয়াল অবস্থানের নয়। অনেক লোক ব্যক্তিগত ভাবেও এখানে নাজী ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হয়ে তখন হিটলারের দলে যোগ দিয়েছিল।
হিটলারের পতনের পর তাদের একটা বড় অংশ ব্রাজিল এবং দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশে পালিয়ে যায়। জেল থেকে বাঁচার জন্য। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই তাদের গোপন যোগাযোগ থেকে গিয়েছিল এখানে। অনেকে বিশ ত্রিশ বছর পরে অন্য পরিচয়ে ফিরেও এসেছে। কেউ কেউ বলে তারাই এখনকার এই নিও নাজী মুভমেন্টের মূলে।” আনিকা বুঝিয়ে বলে।
“কার্ল গুন্নার অনেকদিন দক্ষিণ আমেরিকায় ছিল না?” জানতাম এবার ফেলুদা প্রশ্নটা করবে।
“হ্যাঁ । প্রথমে ব্রাজিলে। তারপর বোধহয় আর্জেন্টিনা .. না না চিলিতে ছিল।” আনিকা বলেন।
“ওর কি কোনো নাজী যোগাযোগ…”
“লুক প্রদোষ, এগুলো তো জানা খুব শক্ত। তার ওপর ও যখন ব্রাজিল চলে যায় তখন আমি নেহাৎই শিশু। তবে ও একজন চিলিয়ান মহিলাকে বিয়ে করেছিল। তার নাম আলমা। দারুণ কিছু নাজী হলে করত কি? আলমা মারা গেছেন এখানেই, বেশ কবছর হল। আর ফিরে আসার পরেও তো কখনো পুলিশ কার্লকে ধরতে আসেনি। ও নাম ভাঁড়িয়েও আসেনি। ওর মেয়ে আছে বিরগিত্তা , সেও এখানেই থাকে…”আনিকা বলেন।
“হুম ! তা ঐ কার্লের আর কোনো খবর? আছেন কেমন উনি?”
“ওকে তো ক্যারোলিনস্কাতেই ভর্তি করা হয়েছে। এখনো অপারেট করা যায় নি। আসলে ম্যাথিয়াস এখন স্টকহোমে নেই আর ও ছাড়া এই অপারেশন করতে কেউ সাহস পাচ্ছে না..যদি হিতে বিপরীত হয় সেই ভেবে। আপাতঃ ওষুধ দিয়ে স্টেবল করে রাখা হয়েছে। আর কার্ল তো কোমাতেই আছে। আমি আর মণি আলোচনা করছিলাম। এই বুলেট বের করা সহজ হবে না… অসম্ভব ট্রিকি অপারেশন।”
কথা বলতে বলতে আমরা বাগানে এলাম। দূরে র্যাস্পবেরী ঝোপের কাছে এরিক আর মণিদি দাঁড়িয়ে গল্প করছে। মণিদি আমাদের দিকে পেছন করে। আমি একটু অবাকই হলাম। ও হাঁটতে পারছে না, তারমধ্যে এভাবে বাগানে ঘুরে বেড়ালে তো সারতে আরো সময় লাগবে।
ফেলুদারও নিশ্চয়ই একই কথা মনে হয়েছে।
“মণি তুমি এখানে ..”ভুরু কুঁচকে গলা তুলে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল ও।
কথা শেষ করার আগেই পেছন ফিরল মণিদি….কিন্তু না তো, মণিদি কোথায়? এ তো অন্য কোনো মহিলা!
“আলাপ করিয়ে দিই। ইনি বিরগিত্তা গুস্তাভসন। কার্লের একমাত্র মেয়ে।”এরিক বলে উঠল।
বিরগিত্তা আমাদের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন উনি ফেলুদার সঙ্গে দেখা করতেই এসেছেন। ধন্যবাদ দিতে চান তদন্তে সাহায্য করার জন্য।
ওরা কথা বলছিল আর আমি ভাবছিলাম ভদ্রমহিলাকে এত ভারতীয় দেখতে কেন। কার্ল তো টিপিক্যাল ভাইকিং দেখতে। নীল চোখ, সোনালী চুল, লালচে দাড়ি গোঁফ, বড় সড় লালচে সাদা চেহারা। অথচ বিরগিত্তার গায়ের রং প্রায় আমাদের মতই ব্রাউন। চুল কালো, চোখের মণি কালো। আনিকার মত লম্বাও না।বরং মণিদির মত হাইট। তারপরেই মনে পড়ে গেল ওর মা চিলিয়ান ছিলেন। সেই জন্যই দূর থেকে আমরা ওকে মণিদি বলে ভুল করেছি।
বিরগিত্তার সঙ্গে কথা বলে বাগান থেকে বাড়ির দিকে ফেরার পথে দেখি ফেলুদার মুখে বিষম ভ্রূকুটি।
“কি ভাবছ বল তো”?
“আমরাই যদি বিরগিত্তাকে মণি বলে ভুল করি, তাহলে বাইরের লোক তো আরোই…..টিলার ওপর থেকে যে পাথরটা ফেলা হয়েছিল সেটার টার্গেট কি আমি ছিলাম নাকি মণির বকলমে বিরগিত্তা?”
“কার্ল গুন্নার গুস্তাভসন নেহাৎ একজন গেঁয়ো চাষা ছিল বলে তো আর মনে হচ্ছে না রে! ওর জীবনে নিশ্চয়ই আরো অধ্যায় ছিল যেগুলো এতটা সাদামাটা নয়।”
“বিরগিত্তার ওপরেই বা হামলা হল কেন? ও কি সেই অধ্যায়গুলো কিছু জানে?” আমি বলি।
“হয়তো! তারচেয়েও বড় ব্যাপার হল ওর ওপর আবার হামলা হতে পারে। প্রশ্ন হল সেটা ঠেকাব কি করে…এই টমসন আর থমসনকে দিয়ে তো…”
“নাঃ, লালমোহনবাবুই ঠিক। বেড়াতে গেলেই রহস্য ঠিক আমাদের পিছু নেবে… আর সেটা শুধু ভারতবর্ষে না”। চারমিনার ধরিয়ে বলে ফেলুদা।
***
————————————————
পর্ব ৯ঃ জেরা
————————————————
“মণি, এবার ঠিক করে বল তো সেদিন নাচের ওখানে ঐ গুলি চলার আগে ঠিক কি কি ঘটেছিল?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
আমরা চারজনে বসে আছি আনিকাদের বাগানে চেয়ার পেতে। দূরে লেক দেখা যাচ্ছে। আকাশটাতে বেগনী আর কমলা মেশানো অদ্ভুত একটা রং। সূর্য ডোবেনি তবে হাল্কা মেঘের আড়ালে ঢাকা।
“আরে বললাম তো সেদিন পুলিশকে। তুমি কি আমাকে জেরা করছ নাকি?” মণিদি চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে।
“চটে যেও না। তোমার সাক্ষ্য এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ। ওরকম আধা খাঁচড়া জেরা, যেমন পুলিশ সেদিন করল, সেটা ফেলু মিত্তির করে না। মাথা ঠান্ডা করে ভেবে বল।
ঠিক কখন কার্ল তোমার পাশে নাচতে এল? শুরু থেকে তো ছিল না, তাই না?”
“না। একদম শুরুতে তো এরিক ছিল। তার একটু পরে হান্স এল, দ্বিতীয় গানটা শুরু হবার সময়।”
“হান্সের সঙ্গে কোনো কথা হয়েছিল? “
“মানে সেরকম তো কিছু না…আচ্ছা আচ্ছা দাঁড়াও ভেবে বলি…ওরকম ভুরু কুঁচকে ভড়কে দিও না তো”, মণিদি বলে ওঠে।
“প্রথমে ও এসে জিজ্ঞেস করল এরিককে এই ভারতীয় সুন্দরীর সঙ্গে নাচার সৌভাগ্য ওর হবে কিনা। এরিক সেটা শুনে, অবশ্যই, বলে ওদিকে চলে গেল, বোধহয় তপেশের পাশে..”
আমি ঘাড় নাড়ি।
“তারপর?” ফেলুদার মুখ ভাবলেশহীন ।
“তারপর জিজ্ঞেস করল আমার আপত্তি আছে কিনা। আমি হেসে বললাম না। তখন বলল আশাকরি তোমার বয়ফ্রেন্ড চটবে না আমার ওপর। আমি আবার হেসে বললাম মনে তো হয় না। “
“তারপর কি হল?” ফেলুদার গলা একই রকম।
“তখন বলল তোমার বয়ফ্রেন্ড বেশ হ্যান্ডসাম! তারওপর আবার ডাক্তার। আমি বললাম ও ডাক্তার কেন হতে যাবে। ও তো ডিটেক্টিভ!”
“বলে দিলে আমি ডিটেক্টিভ”?
“কেন, বলা উচিৎ হয়নি বুঝি?” মণিদি একটু বিভ্রান্ত ।
“যাকগে, বলে যাও, তারপর কি হল?”
“তারপর মনে হল ও খুব ইমপ্রেসড। জিজ্ঞেস করছিল তুমি কতটা ফেমাস। কি ধরণের কেস কর..তারপর তো ঐ ছোট্ট ব্যাঙের গানটা শুরু হয়ে গেল। আর সেটা শেষ হতেই কার্ল এল।”
“কার্ল কি নিজে থেকে এল”?
“না, হান্সই তো ওকে ডেকে বলল, এস তোমাকে আমাদের এক্সটিক অতিথির সঙ্গে নাচার সুযোগ করে দিচ্ছি। তোমার নিশ্চয়ই খুব পছন্দ হবে। তারপর..”
“দাঁড়াও দাঁড়াও , এটার মানে কি…কার্লের নিশ্চয়ই খুব পছন্দ হবে কথাটার মানে কি..”
“কেন আমাকে পছন্দ হবার কথা নয় নাকি!”
আমি বুঝেছি ফেলুদা কি বলতে চেয়েছে।
“কার্লের বউ তো চিলিয়ান ছিল। হান্স হয়তো তাই বলতে চাইছিল যে এক্সটিক এথনিসিটির লোকদের ও পছন্দ করে।”
“সাবাশ তোপসে। অর্থাৎ নিও নাজীর একদম উল্টো।
যাকগে বল তারপর কি হল।”
“তারপর তো কার্ল এগিয়ে এল, একগাল হেসে..”
“আর হান্স কোথায় গেল?”
“হান্স …আমি তো ঠিক…. তপেশ তুমি মনে করতে পার?”
“না মণিদি, তখন তো আমার একপাশে এরিক অন্যপাশে আনিকা সব গানের মানে টানে বোঝাচ্ছিল…আমিও খেয়াল করিনি।
“হান্স মানে ঐ লোকটা তো? খুব লম্বা, সোনালী চুল? সোনালী দাড়ি? সেদিন ঐ কায়াক নৌকো করে টিলার নীচ দিয়ে যাচ্ছিল?” লালমোহন বাবু বলে ওঠেন।
“হ্যাঁ হ্যাঁ ..”
ওকে সেদিন দেখলুম, ম্যাডামের পাশ থেকে বেরিয়ে ঐ ক্যাফের দিকে চলে গেল..”
“আচ্ছা! তাহলে ও আর নাচে ফেরে নি! ইন্টারেস্টিং”!
“ও কিন্তু গুলি করেনি ফেলুদা। ওকে আমি আনিকার সঙ্গে ছুটে আসতে দেখেছি ক্যাফের মধ্যে থেকে। আ্যম্বুল্ন্স ডাকার পর। ক্যাফেটা তো টিলার উল্টো দিকে..”
“আমি জানি ও গুলি করেনি। স্নাইপার গান চালানো যে সে লোকের কাজ না।” ফেলুদা শান্ত গলায় বলে।
“যাকগে বল, কার্ল আসার পর কি হল?”
“ও তো তখন অলরেডি বেশ কিছুটা ড্রাঙ্ক মনে হল.. হাতে একটা গ্লাস ছিল, তারমধ্যে বোধহয় ভদকা দেওয়া অরেঞ্জ জ্যুস ছিল। সেটা আমার জামায় ফেলল..খুব ক্লামসী…তারপর সরি টরি বলে সেটা রুমাল দিয়ে মুছতে চেষ্টা করল..”
“দাঁড়াও। জামার কোথায়?”
“গ্লাসের ধাক্কাটা তো লাগল…ইয়ে, মানে…”মণিদির মুখ লাল।
“তোমার বুকে তো? সেটাই টপোলজিক্যালি সবচেয়ে বেশী প্রোব্যাবল। তো তারপর কি হল?”
“তারপর জ্যুসটা চলকে পড়ল একটু নীচে, এই প্লিটগুলোর ওপরে..”মণিদি কোমরের কাছে হাত দিয়ে দেখায়।
“ও তো তোমার চেয়ে বেশ কিছুটা লম্বা। তার মানে ও যখন রুমাল দিয়ে ওটা মুছতে গেছিল, তখন ওকে হঠাৎ নীচু হতে হয়েছিল…”
“আর তাই প্রথম বুলেটটা মিস হয়েছিল..” আমি বলে উঠি।
“সাবাশ তোপসে”! আবার বলল ফেলুদা।
“তারপর কি হল বল।”
“ও বলল আমি কবে এসেছি, কতদিনের জন্য এইসব। তারপর তো আবার নাচ শুরু হয়ে গেল। ও খুব একটা ভাল নাচিয়ে বলে মনে হল না। বিশাল থাবায় আমার হাত শক্ত করে ধরে রীতিমত টেনে নিয়ে যাচ্ছিল… তারপর…হঠাৎ মনে হল হাতটা আলগা হয়ে গেল…আর তারপর তো দুম করে চক্ষু মুদে চিৎপাত।”
“ঠিক আছে । এতেই হবে।” ফেলুদা বলল অবশেষে।
“বাব্বা, গোয়েন্দার সঙ্গে রিলেশন যে এত ঝকমারী কে জানত। সারাক্ষণ বাড়িতেই কোর্ট। সাক্ষী আর জেরা। দিল মুডটাকে অফ করে। তপেশ, ঐ সাইকেলটায় করে একটু দিয়ে এস তো আমাকে বাড়ির ভেতর। লেকের শোভা দেখার শখ আমার মিটে গেছে।”।
মণিদি চটে গেছে। পা ঠিক থাকলে এতক্ষণ নিশ্চয়ই গটগটিয়ে উঠে পালাত। আমি উঠতে যাব, ফেলুদা ঈশারায় আমাকে বসতে বলে মণিদিকে বলল,
“কার্লের ইনজুরিটা কেমন বলে তোমার মনে হয় মণি? সেরে উঠবে কি?”
“বলা শক্ত! মেডুলা অবলাংগাটায়, ব্রেন আর স্পাইনাল কর্ডের জয়েন্টে লেগেছে। স্পাইনাল কর্ডে চোট মানে কিছু একটা রকম প্যরালিসিস তো বটেই। তবে ও যে এখনো বেঁচে আছে তার মানে নিশ্চয়ই সেন্ট্রাল ক্রেনিয়াল নার্ভাস সিস্টেমে ফেটাল চোট লাগেনি। যদিও আমার ধারণা ও গ্লাসগো কোমা স্কেলে ৫ এর নীচে আছে।আসলে বুলেটটাকে তো বের করতে হবে। এদিকে ওখানে সার্জারী করতে গেলে টেম্পোরাল লোবে চোট পেতে পারে। তাতে স্পীচ আর ভিশন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমনকি আংশিক আ্যমনেশিয়া….
…কি হল হোয়াটস সো ফানি?”
মণিদির গলায় বিরক্তি, কারণ ফেলুদা একপেশে হাসি হাসছে!
“না ফানি না। শুধু ভাবছিলাম ডাক্তারের সঙ্গে রিলেশনও কম ঝকমারী না… খালি খটমটে ল্যাটিন নাম আর কঠিন রোগের ফিরিস্তি! সারক্ষণ বাড়িতেই হাসপাতাল..!”
“যাকগে, চল তোমায় ঘরে দিয়ে আসি।”
মণিদিকে কোলে তুলে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয় ফেলুদা, আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে!
***
——————————————
পর্ব ১০ঃ চিলি মানে লঙ্কা নয়
——————————————
পরদিন আমরা স্টকহোম ফিরে এলাম। মণিদির পা এখনো পুরো ঠিক হয়নি, তবে ও একটা ফুট সাপোর্ট নিয়েছে, যেটা এখানে খুব কমন, স্কী ইনজুরির পরে। তার ফলে মোটামুটি নিজে চলাফেরা করতে পারছে। আনিকারা আরো দু একটা দিন থেকে যেতে বলেছিল। কিন্তু মণিদির কাজের চাপ আছে।
সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল কার্লের অপারেশন করার জন্য ক্যারোলিনস্কার নিউরোসার্জারীর হেড ম্যাথিয়াস রুডস্ট্রম মণিদির সাহায্য চেয়েছে। এটা সত্যিই ভীষণ জটিল অপারেশন এবং এই কাজে দক্ষতা খুব কম লোকের আছে। কাল অপারেশন।
“নার্ভাস লাগছে নাকি ম্যাডাম, আপনার”? জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন বিকেলের কফি খেতে খেতে।
“সেরকম কিছু না। আর ম্যাথিয়াসও সঙ্গে থাকছে, হি ইজ এ লেজেন্ড ইন নিউরোসার্জারী। তবে এটা তো একটা জটিল কেস বটেই।”
“শুধু দেখ আ্যমনেশিয়াতে না চলে যায়, তাহলেই হবে। ওর স্টেটমেন্ট লাগবে মনে হয় পরে।” ফেলুদা মৃদু হেসে বলে।
“যে আছে যার তালে!” বলে ওঠে মণিদি।
“অপারেশন সাকসেসফুল হলেও—যার চান্স বেশ কম— মনে ভেব না ও পরক্ষণেই বড় বড় শ্বাস ফেলে উঠে বসবে সিনেমার মত! রিকভার করতে, কোমাটোজ কাটিয়ে স্টেটমেন্ট দিতে সময় লাগবে।”
পরদিন মণিদি তো গেল হাসপাতালে। ফেলুদাও বলে গেল ওর নাকি কয়েকটা কাজ আছে। সারাদিন লেগে যাবে। আমরা যেন নিজের মত ঘুরে নিই।
আমরা এতে অভ্যস্ত। তাই আমি আর লালমোহনবাবু চলে গেলাম স্কানসেন আর ভসা মিউজিয়াম দেখতে।
স্কানসেনের ওপেন এয়ার মিউজিয়ামটা দারুণ। পুরোনো দিনের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান ঘরবাড়ি, গ্রাম সব কিছুর মডেল আছে। তারসঙ্গে একটা চিড়িয়াখানা আছে যাতে বল্গা হরিণ, সীল মাছ, লিংকস এইসব উপমেরু অঞ্চলের জন্তু আছে। দিব্যি সময় কেটে গেল।
দুপুরে কাছেই একটা রেসট্যুরান্টে বসে পিজ্জা খাচ্ছি, এমন সময় লালমোহনবাবু উত্তেজিত হয়ে হলে উঠলেন, “তপেশ, দেখ দেখ, এটা সেই আনিকাদের প্রতিবেশী সোনালী দাড়ি ছেলেটা না? ঐ যে, রাস্তার ওপারে।”
আমি তাকিয়ে দেখি ওক গাছের তলায় দাঁড়িয়ে আছে হান্স। ঘনঘন ঘড়ি দেখা আর পায়চারি থেকেই বোঝা যাচ্ছে ও কারো জন্য অপেক্ষা করছে।
একটু পরে একটা কালো রঙের গাড়ি এসে দাঁড়াল। সেটা থেকে একজন বেশ স্যুটেড বুটেড লোক—দেখে মনে হল স্প্যানিশ বা ইটালিয়ান—নেমে হান্সের সঙ্গে খুব হাত পা নেড়ে কথা বলতে লাগল।
“তপেশ, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে হান্স ঐ কালো গাড়িটায় করে যাবে… পিছু নেবে নাকি ভাই?”
জটায়ুর এটা একটা পুরোনো রোগ, কোনো ক্ল্যু পেলে ধাওয়া করা, ফেলুদাকে ছাড়াই। যেমন সেই কাঠমান্ডুর শুয়োর গলি।
“কিন্তু কেন, লালমোহনবাবু? হান্স একটা লোকের সঙ্গে গাড়িতে গেলে কি হয়েছে?”
“ক্ষতিও তো কিছু নেই তপেশ ভাই। আমাদের তো খাওয়া শেষ, কিছু করারও নেই। চলই না। হয়তো তোমার দাদার তদন্তে কোনো সাহায্য হল..”
“ফেলুদা তদন্তে আছে কিনা সেটাই তো পরিস্কার নয় লালমোহনবাবু। ঐ টমসন আর থমসনকে তো দেখলেন..” বলতে বলতে আমি উঠে বিলটা মিটিয়ে দিই।
“ঐ টিনটিনের পুলিশ দুটো তো! ওদের কথা বাদ দাও। নিশ্চয়ই এদেশের পুলিশে আরো কিছু ভদ্রলোক আছে।”
বলতে বলতে রাস্তায় নেমে আসি আমরা।
হান্স ততক্ষণে ঐ কালো গাড়িটায় উঠছে। আমরাও একটা হলুদ ট্যাক্সি নিয়ে ওটার পেছনে যেতে থাকলাম।
মিউজিয়াম আইল্যান্ডের থেকে বেরিয়ে ওটা সেন্ট্রাল স্টকহোমের দিকে মোড় নিল। তারপর স্ট্রান্ড রোডের বুলেভার্ড হয়ে কুংগস্ট্রাগর্ডেন পেরিয়ে কিছুদূর গিয়ে একটা সুন্দর সাদা, পুরোনো বিল্ডিংএর সামনে থামল।
গেটের সামনে দুজন প্রহরী আর বাড়িটার গায়ে নোটিশ ঝোলানো—দ্য এম্বাসী অফ চিলি!
হান্স আর ঐ স্যুট পরা লোকটা ভেতরে ঢুকে গেল। আমি আর লালমোহন বাবুও ট্যাক্সিকে বললাম সোলনায় আমাদের আ্যপার্টমেন্টে নিয়ে যেতে।
—————————
“আচ্ছা ফেলুবাবু, চিলি তো এই সুইডেন থেকে বহুদূরে। পৃথিবীর অন্য প্রান্তে। কিন্তু কেবল ঐ যোগাযোগটা এসে পড়ছে কেন বলুন তো?”
আমাদের আ্যপার্টমেন্টে ডিনার খেতে খেতে শুধোন জটায়ু । রাত ৮ঃ৩০ বাজে। যদিও দেখে বোঝার উপায় নেই কিচ্ছু। বাইরে রোদে ফেটে পড়ছে। মণিদি এখনো ফেরেনি।
“যোগাযোগ তো শুধু দূরত্ব দিয়ে হয় না লালমোহনবাবু!
১৯৭৩ এ যখন সি আইএ র মদতে চিলিতে ক্যু করে সালভাদর আলেন্দেকে সরানো হয় তখন বহু স্যোসালিস্ট আ্যক্টিভিস্ট ওখান থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। সুইডেন তাদের এক বড় অংশকে আ্যসাইলাম দেয়। বিশেষ করে উলফ পালমে এ ব্যাপারে অগ্রণী ছিলেন।” স্প্যাগেটি গুলো কাঁটায় জড়িয়ে মুখে দিয়ে বলে ফেলুদা।
“উলফ পালমে…মানে সেই প্রধানমন্ত্রী যিনি খুন হন গত বছর? যাঁর খুনীকে ধরা যায় নি?”
“ইয়েস স্যর।”
“বোঝো।”
“আলেন্দের পরেই তো চিলিতে ডিক্টেটর পিনোচের শাসন শুরু হয় তাই না, ফেলুদা?”
“হ্যাঁ । মিলিটারি জেনারেল, সি আই এ র মদতে ক্ষমতা দখল করেই শুরু করে রুথলেস পার্জিং…বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট আলান্দের সমর্থকদের। দেশ ছেড়ে পালানো ছাড়া তাদের আর গত্যন্তর ছিল না। এই পার্সিকিউটেড চিলিয়ান স্যোসালিস্টদের একটা বড় অংশ সুইডেনে আশ্রয় পায় উলফ পালমের কল্যাণে।”
“বাপরে! তো চিলির ঐ ..পিনোচিও নাকি…ও তো উলফ পালমেকে খুন করাতে পারে, নাকি?”
“বাঃ আপনার ডিডাকশনের ক্ষমতার বেশ উন্নতি হয়েছে সেটা বলতেই হচ্ছে লালমোহন বাবু। এই থিওরিটা অনেকেই ভেবেছিল পালমের খুনের পরে। কিন্তু ভাবলেই তো হবে না, প্রমাণ করতে হবে।”
“কিন্তু ফেলুদা, এরকম স্টেট স্পনসর্ড আ্যসাসিনদের পক্ষে তো স্নাইপার ব্যবহার করা কিছুই না..”
“অবশ্যই না। কিন্তু ওরা স্নাইপারটা তো পালমের ওপর ব্যবহার করেনি ।করেছে ঐ গেঁয়ো চাষা কার্লের ওপর। সেটাই তো কেন এখনো পুরো পরিস্কার নয়…”
“তবে,” ফেলুদা খাওয়া শেষ করে ছুরি-কাঁটা দুটো প্লেটে পাশাপাশি রেখে একপেশে হেসে বলল,
“সেটা না জানলেও স্নাইপারটি কে সে বিষয়ে মোটামুটি একটা আন্দাজ পেয়েছি।”
“বলেন কি মশাই? কে সে?”
“সব কথা বলার সময় এখনো আসেনি লালমোহন বাবু, তবে এটুকু বলতে পারি স্নাইপারের পরিচয়টা জানতে পেরেছি আজ আবার আনিকাদের বাড়ি গিয়ে।”
“আনিকাদের বাড়ি গেছিলেন আপনি আজ? কেন ?”
“এরিকের সঙ্গে একটু দরকার ছিল।”
“এরিকের সাথে!”
“হ্যাঁ প্রভূত লাভ হয়েছে তাতে।”
“তা স্নাইপারও কি এই চিলির লোক?”
“না স্নাইপারটি হয়তো ভাড়া খেটেছে চিলি তথা সুইডিশ নাজীদের হয়ে। তবে আসলে সে দক্ষিণ আফ্রিকার লোক।”
“ওরে বাবা। আমার তো সব গুলিয়ে যাচ্ছে মশাই! এর মধ্যে আবার দক্ষিণ আফ্রিকা কোত্থেকে এল?”
“কেন আসবে না লালমোহনবাবু? বিভিন্ন দেশের চরমপন্থী দলের মধ্যে যোগাযোগ তো নতুন নয়। হিটলারের সঙ্গে মুসোলিনির বন্ধুত্ব ছিল না? যতক্ষণ না স্বার্থের সংঘাত ঘটে ততক্ষণ এদের দিব্যি ভাব থাকে।”
“আর বর্তমান বিশ্বে দক্ষিণ আফ্রিকার চেয়ে চরমপন্থী সরকার আর কে আছে? খোলাখুলি বর্ণবিদ্বেষী, প্রায় সব দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন… নেলসন ম্যান্ডেলার মত লোককে আজ প্রায় বাইশ বছরের বেশী জেলে ভরে রেখেছে…”
ফেলুদা যদিও গলা তোলেনি, ঝাঁঝটা টের পাওয়া যায়।
“তা আপনি ঐ দক্ষিণ আফ্রিকার স্নাইপারের ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ। আমি নিশ্চিত । কিন্তু কোর্টে প্রমাণ করতে গেলে আমার একটা মর্সকোড জানা লোক লাগবে…”
আমি আর লালমোহনবাবু চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম, কিন্তু বোঝাই গেল ও আর কিছু বলবে না।
“কিন্তু ফেলুদা, এই দুটো খুন আর খুনের চেষ্টা কি পরস্পর যুক্ত? মানে ঐ পালমে আর কার্ল..?”
“এখনো শিওর না! এগুলো খুব জটিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ব্যাপার। তথ্য টথ্য সব স্টেট সিক্রেট। তবে সোজাসুজি যোগাযোগ না থাকলেও অপ্রত্যক্ষ যোগ থাকতে পারে…”
“বাবা, আমার তো রীতিমত রোমাঞ্চ হচ্ছে মশাই! একটা নয়, দুটো নয় তিন তিনটে দেশের দুষ্টু লোক। ডিক্টেটর, নিও নাজী, বিদেশী স্পাই, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র ….আপনি কি এবার জেমস বন্ড হয়ে যাবেন নাকি মশাই?” লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করেন।
——“কে জেমস বন্ড হচ্ছে?”
মণিদি ঢুকেছে । ওর কাছে একটা চাবি দেওয়া আছে আমাদের এই ফ্ল্যাটের।
“না না মানে জেমসবন্ডের ওসব ইয়ে-টিয়ের কথা বলিনি কিন্তু। শুধু ভাল ভাল জিনিসগুলো, মানে..”
ফেলুদার চোখের দিকে তাকিয়ে চুপ করে যান জটায়ু ।
“অপারেশন কেমন হল, মণিদি?”
“মনে তো হচ্ছে উতরে গেছে। তবে ৪৮ ঘন্টা না গেলে কিছু বলা যায় না। তারপরে রিকভারী কেমন হবে সে তো অন্য গল্প”!
ধপাস করে চেয়ারে বসে বলে মণিদি।
“আই আ্যম সো টায়ার্ড …বাট সো হ্যাপি…বিকজ আই হ্যাভ সীন দ্য গড টুডে”!
“গড আবার কোথায় দেখলেন মণিকঙ্কণা ?”
“ম্যাথিয়াস রুডস্ট্রম লালমোহনবাবু! দ্য গড অফ নিউরোসার্জারী! ওকে এত কাছ থেকে ব্রেন সার্জারী করতে দেখা ভাগ্যের ব্যাপার…। আজ আমার এখানে আসা সার্থক, এই কোর্স করা সার্থক, ডাক্তারী পড়া সার্থক!”
“তোমার ম্যাথিয়াস বন্দনা শেষ হলে এবার এসে খেয়ে নাও।” ফেলুদা বলল।
“আমি ওপরে যাচ্ছি চেঞ্জ করতে। স্প্যাগেটি কিছু বাকী আছে নাকি সব শেষ?”
“তুমি গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নাও। আমাদের খাওয়া শেষ। তোমার স্প্যাগেটি আর বোলোনিজ সস গরম করে নিয়ে আমি এখুনি যাচ্ছি।” ফেলুদা উঠে পড়ল।
মণিদি ওর নিজের আ্যপার্টমেন্টে চলে গেল আর একটু পরে ফেলুদা ওর খাবার নিয়ে ওপরে গেল। আমি আর লালমোহনবাবু কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম, গপ্প করলাম তারপর রাত এগারটা বাজে দেখে নিজেদের ঘরে শুতে চলে গেলাম।ফেলুদার কাছে এই ফ্ল্যাটের চাবি আছে, ও যখন চায় এসে ঢুকতে পারবে।
মাঝরাতে মনে হল পাশের ঘর থেকে একটা চাপা ধুপ শব্দ শুনলাম। হয়তো ফেলুদা ফিরেছে..আবার পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
***
———————————————-
পর্ব ১১ঃ অজ্ঞাত আততায়ী
———————————————
“তোপসে, শীগ্গীর আয়…” ফেলুদার চিৎকারে ঘুম ভেঙে দেখি ঘরে ঝাঁ ঝাঁ রোদ। ধরমরিয়ে ফেলুদার ঘরে গিয়ে দেখি ও দরজার কাছে দাঁড়িয়ে। এর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি খাটের হেডবোর্ডে বিঁধে আছে একটা বুলেট। বালিশের তুলো টুলো ছড়িয়ে ছত্রখান।
আমার গলাটা কেমন শুকনো শুকনো লাগছে।
“কি হল মশাই, কাল কি আপনি রাতে এঘরে শোননি নাকি?” লালমোহনবাবু উঠে এসেছেন।
“শুলে কি আর এখানে দাঁড়িয়ে আপনার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলতে পারতাম লালমোহনবাবু! দেখছেন না অবস্থা!”
লালমোহনবাবু একবার বিছানাটা দেখে পাশের খোলা জানলাটা দেখিয়ে ফ্যাকাশে মুখে বললেন
“ও-ওইটা দিয়েই মনে হয়…”
“সে তো বটেই।খোলাই ছিল জানলাটা বিকেল থেকে।”
“সাইলেন্সার…?” আমি কোনোরকমে বলি।
“সে তো বটেই। নাহলে তো সারা পাড়া জেগে উঠত”
আমার মনে পড়ে গেল কাল রাতের চাপা ‘ধুপ’ শব্দটা।
পেটের মধ্যে খালি খালি লাগছে।
“কিন্তু…তুমি কি আ্যকসিডেন্টালি….মানে তুমি তো প্ল্যান করে অন্য জায়গায় শোওনি!” আমার গলা এখনো ভীষণ শুকনো।”
“হ্যাঁ রে তোপসে….আমার একটা হাঞ্চ ছিল। জানতাম না এভাবেই হামলা হবে, বা কাল রাতেই হবে।তবে কিছু একটা হতে পারে সন্দেহ ছিল।” ফেলুদার গলা গম্ভীর।
“কিন্তু কেন? কেন তোমাকে কেউ মারতে চাইবে এখানে..”?
“কারণ স্নাইপারের ব্যাপারে আমার সন্দেহটা ঠিক আর তাই আরো পাকা প্রমাণ জোগাড়ের আগেই ওরা আমায় সরাতে চায়..”
“তোমাদের ব্রেকফাস্টের কি প্ল্যান বলতো..?” মণিদি ঢুকেছে খোলা দরজা দিয়ে।
আমাদের এভাবে ফেলুদার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে এগিয়ে আসে মণিদি। এক নিমেষেই অবস্থাটা বুঝে যায় অবশ্য।
“ত-তার মানে—তুমি কাল এখানে থাকলে-ও মাই গড”..মণিদি বলে ওঠে।
“এই বিরাট টেডিটা…আর ঐ অতগুলো বালিশ-কুশন…সব কম্বল চাপা দেওয়া…মনে হচ্ছে যেন লোক শুয়ে আছে…তুমি কি ট্র্যাপ সেট করেছিলে নাকি?”
মণিদির পর্বেক্ষণ শক্তি ভালই!
“হুম।দারুণ কিছু উঁচু দরের ক্যামোফ্লজ নয়। কিন্তু মাথামোটা বদমাইশদের পক্ষে যথেষ্ট।”
“মাথামোটা মানে? জানেন নাকি কে করেছে?” লালমোহনবাবু আমাদের সবার হয়ে বলে ওঠেন।
“মোটামুটি জানি বই কি! তবে শিওর হতে গেলে এই বুলেটটা নিয়ে আমাকে একবার পুলিশ স্টেশন থেকে ঘুরে আসতে হবে।”
“চল তো মণি তোমার ফ্ল্যাটে আমার সুইস নাইফটা পড়ে আছে। নিয়ে আসি।”
*********************************
মণিকঙ্কণার জবানী
—————————
“তাহলে এই জন্যে কাল রাতে এখানে থেকে যাবার জন্য জোরাজুরি করছিলে!” ফ্ল্যাটে ঢুকে বলি আমি।
“শুধু এই জন্য নয় কিন্তু!” একপেশে হাসি ওর মুখে।
“অথচ আমি তোমাকে বারবার নীচে ফিরে যেতে বলছিলাম…যদি যেতে…কি হত তাহলে…”
“দেখলে তো! এবার থেকে আর ওরকম কোরো না। যখনি বলব, একদম লক্ষ্মী মেয়ের মত…”
“ইটস নট ফানি প্রদোষ! দিজ পিপল আর ট্যু ডেঞ্জারাস আ্যন্ড রেকলেস। যদি তোমার কিছু হয়ে যেত…”
বলতে বলতেই বুঝতে পারি আমার টীয়ার গ্ল্যান্ডগুলো শত্রুতা করতে চলেছে…
“আরে, আরে….এ কি কান্ড…চোখে জল নাকি! নার্ভ অফ স্টীল ফিল সব কোথায় গেল? বীরাঙ্গনা থেকে বিনা নোটিশে একেবারে ছিঁচকাঁদুনে মেয়ে হয়ে গেলে যে…!”
“আই টোল্ড ইউ, ইটস নট ফানি”… এবার ভোকাল কর্ডগুলোও ডোবানোর ফন্দি এঁটেছে…
“আই নো মণি! এরকম কেস আমি আগে হ্যান্ডেল করি নি। এখানে শুধু একটা লোভী মূর্তি চোর বা ভাড়াটে খুনী নেই। দিজ আর স্টেট স্পনসর্ড টেররিজম। কিন্তু চিন্তা কোরো না আমি সতর্ক আছি…অযথা ঝুঁকি আমি কখনই নিই না। আর আজকাল তো আরোই না!”
আমার চোখের নোনতা জলগুলো শুষে নিতে নিতে বলে ও।
“এবার চল।ব্রেকফাস্ট করে নিই সবাই।তোমাকে তো হাসপাতাল যেতে হবে। আর আমি যাব পুলিশের কাছে।” সুইস নাইফটা পকেটে ভরে বলে ও।
“ঐ টমসন আর থমসন কি তোমাকে সাহায্য করবে? ওরা…বিশেষ করে ঐ অকেসনটা তো নির্ঘাত নিও নাজী সিম্প্যাথাইজার। আমার মনে হয় তোমার এবার স্যাপো, মানে সুইডিশ সিক্রেট সার্ভিসকে যোগাযোগ করা দরকার…” চোখ মুখ মুছে বলি আমি।
“এই তো ফেলু মিত্তিরের গিন্নীর মত কথা। চল, আমার আ্যপয়েনমেন্ট আছে স্যাপো চীফ মাইকেল ড্যানিয়েলসনের সঙ্গে সকাল দশটায়।”
“স্যাপো চীফ তোমায় আ্যপয়েনমেন্ট দিল যে…
দাঁড়াও, দাঁড়াও… !!
তার মানে তুমি তদন্ত করতেই এসেছ?
আমাদের ইন্ডিয়ান ইনটেলিজেন্স সার্ভিস পাঠিয়েছে তোমায়, তাই না?
সেই যে তখন দিল্লী গেলে…?”
আমি চোখ সরু করে বলি।
“বাপরে। এবার তো দেখছি তোপসেকে বরখাস্ত করে তোমাকেই আমার প্রাইমারী স্যাটেলাইট বানাতে হবে।”
“আর আমি কিনা ভাবছি তুমি এসেছ আমার জন্য।লাইক মাই প্রিন্স চার্মিং… টু স্যুইপ মী অফফ মাই ফিট, ডান্স থ্রু দ্য হোল নাইট, আ্যন্ড পুট এ রিং অন মাই ফিঙ্গার…”
“সব্বনাশ! সত্যি ভেবেছিলে নাকি তুমি এসব?”
ও চোখ কুঁচকে তাকায়।
“হলে ভালই হত, কিন্তু তোমাকে তো আমি চিনি। ইনভেস্টিগেশন যে তোমার ফার্স্ট লাভ এবং আমি মেয়ারলি এ ডিসট্যান্ট সেকেন্ড তা আমি জানি! আ্যন্ড আই আ্যম ফাইন উইথ দ্যাট”, হেসে বলি আমি
********************************
————————————
আমি আর জটায়ু থম মেরে কিচেন টেবিলে বসে আছি। ফেলুদা বেরিয়ে গেছে পুলিশের কাছে।
“কি ভাবছ তপেশ?”
“কি জানি লালমোহনবাবু, আমার কিন্তু মনে হয় দিস ইজ ট্যু ডেঞ্জারাস। ফেলুদা তো সত্যিই কিছু আর জেমস বন্ড নয়। এইসব স্নাইপার, স্পাই, আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র, রাজনৈতিক হত্যা… এসবের বিরুদ্ধে কি শুধু মগজাস্ত্র দিয়ে কাজ হয়! জেমস বন্ডেরও তো হাজারটা গ্যাজেট আছে…!!” বলে উঠি আমি।
“মগজাস্ত্র ছাড়া কিন্তু সব গ্যাজেটই অর্থহীন ভাই”!
ফেলুদা ফিরল বেলা ১১টা নাগাদ। ও ঐ বুলেটটা পুলিশে জমা দিয়ে কথা বলে এসেছে।
“এটাও কি স্নাইপার বুলেট”?
“না। শহেরের মধ্যে এভাবে স্নাইপার লাগানোও শক্ত আর দরকারই বা কি? একটা ঘুমন্ত লোককে জানলা দিয়ে গুলি করতে যে কোনো রিভলবার যথেষ্ট।”
“কাদের সঙ্গে কথা বললেন মশাই? সেই টমসন আর থমসন আবার?”
“না লালমোহনবাবু। কথা হল মাইকেল ড্যানিয়েলসনের সঙ্গ।”
“বাবা এ ও সন! এ কি এদের আর এক ভাই নাকি মশাই?”
“ফেলুদা, সত্যি একবার ভেবে দেখ। বিদেশে বসে এরকম আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করার রসদ তোমার আছে কিনা! বেশী ঝুঁকি হয়ে যাচ্ছে না?”
“তুই আবার এর মধ্যে শুরু করিস না …চল বেরোতে হবে। বিরগিত্তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“মানে ঐ কার্লের মেয়ে? সেও কি খুন হল?”
“এখনি সেটা ভাবার কারণ নেই। কিডন্যাপ হতে পারে, নিজে কোথাও লুকোতে পারে। মাইকেল বলল ওরা কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছে না।”
“মাইকেল মানে এই নতুন পুলিশ? এ লোকটা ভাল মনে হচ্ছে..”
“হ্যাঁ , ও এখানকার সিক্রেট পুলিশ স্যাপোর চীফ।ও আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ টিপ দিল, সেটা ফলো আপ করতে যেতে হবে। তাড়াতাড়ি কর।”
“কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
“দ্য লিটল চিলি।”
***
—————————————
পর্ব ১২ঃ দ্য লিটল চিলি
—————————————
দ্য লিটল চিলি একটা চিলিয়ান রেসট্যুরেন্ট। এই সকালের দিকে এখনো কোনো ক্রেতা নেই। তবে কর্মচারীরা আছে ভেতরে। ভেতরে গিয়ে ফেলুদা সোজা সালভাদর এদেলস্টামের খোঁজ করল।রিশেপসনের মহিলা একটু অবাক হয়ে ফোনে কার সঙ্গে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলে নিলেন। তারপর আমাদের একটু অপেক্ষা করতে বললেন।
খানিক পরেই একজন কর্মী এসে আমাদের করিডোর পেরিয়ে একটা ঘরের দরজা দেখিয়ে দিলেন।
“ভেতরে এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিলেন তিনি হেসে করমর্দন করে বললেন মিঃ মিত্রা, গ্ল্যাড টু ফাইনালি মীট ইউ। প্লিজ হ্যাভ এ সীট।”
জটায়ু আবার হেঁচকি তোলার মত শব্দ করলেন। অস্বাভাবিক নয়, কারণ এই লোকটাকেই সেদিন স্কানসেনের কাছে দেখেছিলাম হান্সের সঙ্গে দেখা করতে।
“গ্ল্যাড টু মীট ইউ ট্যু মিঃ এডেলস্টাম। আমি শুধু জানতে এসেছি বিরগিত্তা গুস্তাভসন ঠিক আছেন কিনা জানতে।”
“উনি সেফ আছেন সেটুকু আপনাকে বলতে পারি মিঃ মিত্রা। তবে কোথায় আছেন সেটা বলার সময় এখনো আসেনি। কার্লকে আমরা রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু বিরগিত্তাকে করব।”
“কিন্তু আমার একটা প্রশ্ন আছে আপনার কাছে, মিঃ মিত্র। আমার খোঁজ আপনি কি করে পেলেন জানতে পারি কি?” এডেলস্ট্যাম প্রশ্ন করেন।
“আপনার নাম তো পেলাম স্যাপো চীফ মাইকেলের থেকে। আপনি পিনোচের চরদের থেকে চিলির রিফিউজিদের রক্ষা করার দায়িত্ব যে পালন করে চলেছেন তা তো আর তাঁর অজানা নয়।” ফেলুদা মৃদু হেসে বলে।
“ আমি চিলি এম্ব্যাসীতে চাকরী করি মিঃ মিত্র, তাই সরাসরি সরকারের বিরুদ্ধে তো যেতে পারি না। মিঃ ড্যানিয়েলসনও জানেন আমার গতিবিধি এবং আমিও জানি যে তিনি জানেন, তবে অফিসিয়ালি এটা স্বীকার করায় আমাদের দুজনেরই বাধা আছে!”
“জানি, তাই তো উনি আমাকে নিজে এসে এখানে আপনার সঙ্গে দেখা করতে বললেন।”
“তাছাড়া আমার এই বন্ধু এবং কাজিনও আপনার সঙ্গে সেদিন হান্সকে দেখে ফেলে এই ধাঁধাটি বুঝতে আমার অশেষ উপকার করেছে। নাহলে ভেবেই তো পাচ্ছিলাম না আমার ব্যাপারে হান্সের এত ইনটারেস্ট কেন?”
“মাইকেলের কাছে আপনার নাম শুনে এবং তার সঙ্গে হান্সের চিলি এম্ব্যাসীতে যোগাযোগ দেখে অবশেষে বুঝি যে ওকে আপনারা লাগিয়েছিলেন কার্লের ওপর নজর রাখতে, তাই না?”
“হান্স গত দশ বছর ধরে কার্লকে শ্যাডো করেছে। যদিও ওর কোনো চিলিয়ান হেরিটেজ নেই। করেছে নিজের আইডিয়োলজি থেকে।ও বুঝতে পেরেছিল যে কার্লের বিপদ বেড়ে চলেছে। যখন ও জানতে পারে আপনি একজন বিদেশী গোয়েন্দা,তখন তো ও আপনাকেও সন্দেহ করেছিল…”
“আর সঙ্গে সঙ্গে ও সেই মিডসামারের নাচ ছেড়ে কাফেতে গিয়ে আপনাকে ফোন করে…” ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি।
“ন্যাচেরালি! কিন্তু ওর হিসেবে ভুল হয়েছিল। ফোনটা শেষ হবার আগেই কার্লকে গুলি করা হয়, যেটা ক্লিয়ারলি আপনি করেননি। আমরা জানতাম কার্লের বিপদ বাড়ছে, নিও নাজীদের শক্তি বৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু ওরা যে এত শক্তিশালী হয়ে স্নাইপার আ্যটাক করবে সেটা সবার হিসেবের বাইরে ছিল।”
“কার্ল গুন্নার তাহলে অনেক শক্তিশালী মানুষকে চটিয়েছিলেন বলুন!”
“ কার্লের জীবন ছিল বর্ণময়। সাদা কালোর সব রকম শেড ছিল তাতে। ব্রেজিলে যখন উনি যান তখন ওখানে আশ্রয় নেওয়া প্রাক্তন নাজীদের সঙ্গে ওঁর ঘনিষ্ঠতা হয়। উনি তাদের কথা মত সুইডেনে নিও নাজী সংগঠনগুলোকে সংহত করার চেষ্টাও করেন। তাদের অনেক গোপন তথ্যই তাই কার্লের কাছে ছিল।”
“আর সেই কার্ল গুন্নারই চিলিতে গিয়ে একদম ভোল বদলে ফেলেন। আলান্দের সমর্থক স্যোসালিস্টদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পিনোচের রোষে পড়েন। এই পরিবর্তনটা সম্ভব হল কি করে বলুন তো?”
“কারণ আলমা। আলমাদের পরিবার চিলির নামকরা আ্যন্টিফ্যাসিস্ট পরিবার। ওর বাবাকে, দাদাকে পিনোচের লোক ফায়ারিং স্কোয়াডে মারে। ওকেও মারত, যদি না ওরা পালিয়ে আসত সুইডেনে।”
“এই আলমার প্রেমে পড়ে কার্ল একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়। আলমা ছিলেন এক অসাধারণ মহিলা। সাহসী, বুদ্ধিমতী এবং লক্ষ্যে অবিচল। সেই সঙ্গে স্বার্থশূন্য ভাবে দেশের মানুষের উপকার। আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে কিনা জানি না মিঃ মিত্র তবে এই ধরণের মহিলারাই পারেন কঠিন পুরুষদের হৃদয় পরিবর্তন করতে।”
“এখানে এসে কি কার্ল নিও নাজীদের তথ্য পুলিশকে দিয়ে দেয়?”
“অবশ্যই! ওটা ছিল ওর এক ধরণের প্রায়শ্চিত্ত।ওর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৎকালীন নিও নাজী নেটওয়ার্ক সুইডিশ গভর্নমেন্ট প্রায় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়। উলফ পালমে তো এ ব্যাপারে বেশ অগ্রণী ছিলেন।”
“কিন্তু হালে এই নিও নাজীরা আবার অক্সিজেন পেয়েছে। এবং চিলির চরমপন্থী সংস্থাগুলোর সঙ্গে মিলে কার্লের ওপর প্রতিশোধ নিয়েছে।”ফেলুদা বলে।
“ঠিক তাই। তবে শুধু চিলির চরমপন্থীদের দোষ দিলে ভুল হবে। ব্রেজিলের অথবা…”
“দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বষীরাও আছে এর মধ্যে তাই তো?” ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি।
“মিঃ মিত্র , আপনি সাহসী এবং বুদ্ধিমান। তারওপর আমাদের চিলিয়ান রিফিউজিদের ওপর আপনার সহানুভূতি আছে। তাই আপনাকে বন্ধু ভেবে একটা পরামর্শ দিচ্ছি। আপনি কিন্তু সাপের গর্তে হাত দিচ্ছেন। এক না একাধিক সাপ। আপনার ওপর তো কাল রাতে হামলা হয়ে গেছে। কপাল জোরে বেঁচে গেছেন…”
“শুধু কপাল না! ঐ যে বললেন না, অসাধারণ মহিলারা অনেক সময় জীবনের গতিপথ বদলে দেয়…, আমারও খানিকটা তাই বলতে পারেন।”
“যাক আজ আসি।আসা করি বিরগিত্তাকে ঠিকঠাক রাখতে পারবেন।”
“চিন্তা করবেন না মিঃ মিত্র। বিরগিত্তা আলমা রডরিগেজের মেয়ে। ওকে আমরা বাঁচাব।”
“আর সম্ভবতঃ চিলির ডুয়াল সিটিজেন..” হেসে বলে ফেলুদা। “আসি তাহলে, আলাপ হয়ে ভাল লাগল।”
“আমারও। হান্সের কাছে শুনেছিলাম আপনার কথা। সাবধানে থাকবেন..আপনি আর আপনার লেডি লাক, দুজনেই।”
***
—————————————
পর্ব ১৩ঃ অপরাধী
—————————————
সেদিন সন্ধেবেলা অব্দি ফেলুদা ঘর বন্ধ করে কি সব কাজ করল। বলল ওর নাকি একটু মাথা ঠান্ডা করে ভাবা দরকার। মাঝখানে বার দুয়েক ফোন করেছিল কাকে। চাপা গলার কথা বোঝা যায়নি।
ছটা নাগাদ আমি আর লালমোহনবাবু ঠিক করলাম মণিদির ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি একবার। বেল দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম, কেউ খুলল না। পাশের ফ্ল্যাটের ঐ বৃদ্ধা মহিলা আবার দরজা খুলে বললেন মণিদি নাকি সেই সকালে বেরিয়েছে, এখনো ফেরেনি।
“ওঁর কি আজও এত দেরী হবার কথা?” লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করেন।
“জানিনা। হয়তো কোনো বন্ধুর বাড়ি গেছে।” বললাম বটে, কিন্তু মনটা খচখচ করছিল।
নীচে আমাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি ফেলুদা বেরিয়েছে একটা নোট লিখে যে ও বেরোচ্ছে, ফিরতে দেরী হবে। আমরা যেন খেয়ে নিই।
আমরা আট’টায় খেয়ে নিয়ে আবার ওপরে গিয়ে দেখে এলাম। মণিদি তখনো ফেরে নি। এবার সত্যিই চিন্তা হচ্ছে।
ফেলুদা ফিরল একটু পরেই। ফেরা মাত্র আমরা বললাম মণিদির ব্যাপার।শুনেই মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল ওর।
“আনিকাকে একটা ফোন করে জিজ্ঞেস কর তো ও কিছু জানে কিনা।”
প্রথমে আনিকা, তারপর তার থেকে নম্বর নিয়ে একে একে লার্স, মিকা, সাব্রিনা , আ্যলবার্তো এমনকি ম্যাথিয়াসকে অব্দি ফোন করা হল। কেউ কিছু জানে না। সাব্রিনা ওকে শেষ দেখেছিল ৫ টা নাগাদ, যখন ও বাড়ি যাবার জন্য তৈরী হচ্ছিল।
“এবার কাকে ফোন করি?” লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করেন।
“কাউকে না। আমার ধারণা খুব শীগ্গীর একটা ফোন আসবে..” ফেলুদার কপালে বিষম ভ্রূকুটি।
ফোনটা এল মিনিট দশেক পরেই। ফেলুদাই ধরল।
“যা ভেবেছি তাই।ওরা মণিকে কিডন্যাপ করেছে। আমাদের যেতে হবে ওদের সঙ্গে।”
“কারা কিডন্যাপ করেছে? কোথায় যেতে হবে?”
“কোথায় যেতে হবে তা তো বলেনি। ওরা গাড়ি পাঠাবে এক্ষুনি। তারাই নিয়ে যাবে ।”
“কিন্তু কি চায় ওরা ? টাকা?”
“ওদের দেবার মত টাকা আমাদের নেই লালমোহন বাবু! ওরা চায় কিছু কাগজপত্র যা প্রমাণ করতে পারে ওরা উলাফ পালমের হত্যার সঙ্গে জড়িত।”
“কারা ওরা?”
“ চলুন , গেলেই দেখতে পাবেন। অবিশ্যি যদি আপনারা দুজন না যেতে চান..”
“আমরা ফোর মাস্কেটীয়ার্স ফেলুবাবু। যা হবার একসাথে হবে।”
———————-
একটা কালো কাচ তোলা গাড়িতে চলেছি তো চলেছি। ড্রাইভারের পাশে একজন। আরেকজন ভেতরের ৬ জনের সীটের একটায় একজন, আমাদের ওপর নজর রাখার জন্য। সঙ্গে অস্ত্র আছে কিনা সেটা ওঠার সময়ই চেক করে নিয়েছে।
প্রায় দুঘন্টার বেশী গাড়ি চলছে। কালো কাচ দিয়ে বাইরেটা ভাল বোঝা যাচ্ছে না। তবে শহর, লোকালয় ছাড়িয়ে এখন রাস্তার দুদিকে ঘন জঙ্গল । রাস্তায় গাড়ির সংখ্যাও হাতে গোনা।
বড় রাস্তা থেকে নেমে গাড়ি এখন আঁকাবাঁকা পাহাড়ী পথ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকেছে।
অবশেষে গাড়ি থামল । জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা জায়গা পরিস্কার করে সেখানে একটা লাল সাদা কাঠের দোতলা বাড়ি…সুইডেনে যেমন অনেক আছে। চারিপাশ শান্ত, সুন্দর,নির্ঝঞ্ঝাট।
সঙ্গের লোকদুটো ঈশারা করে ঢুকতে। আমরা বসার ঘরে গিয়ে পুরু সোফায় বসলাম। একজন দাঁড়িয়ে রইল ভাবলেশহীন মুখে আমাদের দিকে বন্দুক তাক করে। অন্যজন বোধহয় খবর দিতে গেল ভেতরে।
একটু পরে একজন এসে ঘরে ঢুকলো। লম্বা দোহারা চেহারা, মুখে চাপ দাড়ি , চোখে সানগ্লাস । শেষের দুটো সম্ভবতঃ পরিচয় গোপনের জন্য।
“আপনার কাছে কি প্রমাণ আছে সেটা দেখান।” লোকটা সোজাসুজি বলে।
“তার আগে আমি দেখতে চাই যে মণি এখানে আছে। আপনি ওকে নিয়ে আসুন এখানে।”
“লোকটা ঈশারায় নির্দেশ দিল আর এক সাকরেদ বেরিয়ে গেল।”
একটু পরেই মণিদিকে নিয়ে এল লোকটা, পিঠে পিস্তল ঠেকিয়ে। ওকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে ঠিকই, তবে ভীত লাগছে না। একঝলক ওর দিকে তাকিয়ে ফেলুদা শুরু করল,
“আপনি সানগ্লাস টাস পরে বৃথা এত কষ্ট করছেন জোনাস…নাকি বলব আ্যন্টনি হোয়াইট।”
“চোখ থেকে সানগ্লাস আর মুখ থেকে দাড়িটা সরিয়ে মৃদু হাসল জোনাস বুদিন ওরফে আ্যন্টনি হোয়াইট।”
“যাক, আপনার বুদ্ধি দেখা যাচ্ছে সুইডিশ পুলিশের চেয়ে বেশী।”
“আপনার ইংরেজী শুনেই আমার সন্দেহ হয়েছিল। সুইডিশ টান একেবারে নেই। অথচ খাঁটি সুইডিশ নাম। বললেন ইংল্যান্ডের স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু দেখলাম আপনি আনিকাকে এনিকা বলেন। সবচেয়ে বড় প্রমাণটা পেলাম ঐ মিডসামারের দিন, যেদিন আপনি মণিকে দেখে বললেন “শেম! ইউ লুক আ্যমেজিং।” শেমের এই ব্যবহার দক্ষিণ আফ্রিকার বাইরে আর কোথাও হয় বলে তো শুনিনি।”
“বুঝলাম, আপনার লিঙ্গুয়িস্টিক দক্ষতা দারুণ। আমি সাউথ আফ্রিকান হলে কি এল গেল?”
“ এই এল গেল যে আপনি নাম ভাঁড়িয়ে এক অখ্যাত দ্বীপে রয়েছেন। কিছু তো ব্যাপার আছে!”
“কিন্তু আরো বড় প্রমাণটা পেলাম তার পরদিন। টিলার মাথায় সেদিন পাথরটা গড়িয়ে বিরগিত্তা ভেবে মণির মাথায় ফেলতে গিয়ে আপনার লকেটটা খরগোশের গর্তে পড়ে যায় তাই না, মিঃ হোয়াইট? ঐ বড় অক্সিজাইজড মেটালের লকেটটা, যেটা আমি আগেও আপনার গলায় দেখেছিলাম। কিন্তু ওটা সেদিন খরগোশের গর্ত থেকে উদ্ধার করে দেখি উল্টোদিকে আপনাদের রোডেশিয়ান স্কাউট দলের চিহ্ন…ঐ সিলাওস স্কাউট ঈগল…এনগ্রেভ করা। তার পরই আমার কাছে স্নাইপারের পরিচয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। ঐ দলেই তো আপনার স্পেশাল স্নাইপার ট্রেনিং, তাই না?”
জোনাস বুদিন ওরফে আ্যান্টনি হোয়াইট চোখ সরু করে ফেলুদাকে দেখছে। মুখে কোনো কথা নেই। কিন্তু ফেলুদার কথা এখনো শেষ হয়নি।
“এই রোডেশিয়ান স্কাউট দল তো নৃশংশতার জন্য কুখ্যাত।স্নাইপিং, বায়োলজিক্যাল ওয়েপন সবই তো চলে , তাই না? রোডেশিয়া আর জিম্বাবোয়ের বুশ ওয়ারে তো আপনাদের অবদান প্রচুর! সুতরাং বর্তমান দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী বোথা সরকারের সঙ্গে আপনাদের দহরম মহরম দারুণ!”
“আপনার প্রমাণ বলতে কি শুধু ঐ লকেটটা? ঐ রোডেশিয়ান স্কাউট সীলের এনগ্রেভিং তো যথেষ্ট নয় আমাকে জেলে ভরার পক্ষে!” আ্যনটনির মুখে বাঁকা হাসি।
“না তা নয়। ওটা তো শুধু আমার নিজের শিওর হবার ব্যাপারে যে স্নাইপারটি কে!” ফেলুদা স্বীকার করে।
“আসল প্রমাণ তো পেলাম এরিকের ওয়ার্কশপে”।
জোনাস নড়েচড়ে বসে।
“গত বছর যখন মিঃ উইলিয়ামসনের নির্দেশ আছে আপনার কাছে উলাফ পালমেকে খুন করার ব্যাপারে, তখন এরিকের হ্যাম রেডিও যে সেটা ক্যাচ করে নেয় মিঃ হোয়াইট! মর্স কোডে লেখা সেই ট্রান্সক্রিপ্ট তো পেলাম আমি সেখানে। এরিক মর্স কোড জানে না, তাই পড়তেও পারেনি। তবে জমিয়ে রেখেছিল…যদি কোনো এলিয়েনের বার্তা হয় সেই ভেবে!”
“তা এক অর্থে ভিনগ্রহী তো বটেই….কোথায় সুইডেনের লিবারেল স্যোসালিস্ট এরিক আর কোথায় আপনাদের বর্ণবিদ্বেষী সরকারের সুপার-স্পাই ক্রেগ উইলিয়ামসন!”
“ভেবে দেখুন, এটা কিন্তু কার্ল গুন্নার গুস্তাভসনের হত্যার চেষ্টা না, এটা প্রধানমন্ত্রী পালমের আ্যকচুয়াল হত্যার প্রমাণ। জেলে ভরার পক্ষে এটা যথেষ্ট তো, মিঃ হোয়াইট?
পালমেকে মারতে আপনার স্নাইপার গান লাগেনি। দেহরক্ষী ছাড়া রাস্তায় পেয়ে আপনি সাধারণ অস্ত্রেই কাজ সারেন। কিন্তু কার্লের ব্যাপারে এখানকার নিও নাজীদের থেকে মোটা টাকার বরাত পেয়ে আপনি ওটা কাজে লাগান, তাই তো?
উলফ পালমে খুব চটিয়েছিলেন আপনাদের তাই না? একে তো পিপলস পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়ে। তার ওপরে আবার নেলসন ম্যান্ডেলার আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসকে বড় টাকা অনুদান …”
“উলফ পালমে বিশ্বাসঘাতক…”আ্যন্টনির মুখটা ঘৃণায় বেঁকে গেছে।
“ নিজে সাদা নর্ডিক হয়ে যত সিমপ্যাথি ঐ কালো কুত্তার বাচ্চা ম্যান্ডেলার ওপর। কি ভেবেছে ওকে আমরা কখনো ছাড়ব জেল থেকে? ও তো নিজেকে আবার তোদের ঐ কুলি ব্যারিস্টার গান্ধীর চেলা বলে দাবী করে..
এই সুইডেনের গভর্নমেন্টের আদিখ্যেতা দেখলে গা জ্বালা করে। নিজেরা সাদা। কোথায় আমাদের সাদাদের আধিপত্যে বিশ্বাস করবে তা না যত নোংরা থার্ড ওয়ার্ল্ড দেশের প্রতি দরদ। তবে টিকবে না এ জিনিস। ওদের পুলিশের মধ্যেই অনেক আমাদের লোক আছে।”
“সে তো বটেই। যেমন অকেসন। আমার ঘরে গুলিটা তো ওই চালিয়েছিল, তাই না?” ফেলুদা বলে।
“অবশ্যই। কারণ তোর ঐ বাদামী নাক সবজায়গায় গলানোর বাজে স্বভাব! তোর ঐ দ্বীপে গিয়ে ঘুরঘুর, এরিককে সঙ্গে নিয়ে খরগোশের গর্ত থেকে লকেট উদ্ধার এগুলো কি আমরা জানতে পারিনি ভেবেছিস? “
“কিন্তু অকেসনটা এমন বোকা! দেখবি তো রে বাবা ঘরে লোকটা আদৌ আছে কিনা! নাকি বালিশ বিছানা দেখেই অন্ধকারে আনতাবড়ি চালিয়ে দিবি! তবে বোকা হোক আর যাই হোক, এই লোকগুলোই আমাদের ভরসা। কালো লোকেদের ওরা ঘেন্না করে।
এই যে তোর এই গার্লফ্রেন্ড ..নাকি নিউরোসার্জন। ঐ ডাঃ রুডস্ট্রমের মত লোকেরা এদের মাথায় তোলে। শিখিয়ে, পড়িয়ে, কাজের সুযোগ দিয়ে।
আরে ঐ কালো মেয়েদের কাজ আমাদের এঁটো বাসন মাজা আর বাথরুম পরিস্কার করা। না হয় দরকারে আমাদের গরম তরুণদের বিছানায় সঙ্গ দেওয়া।”
আমি দেখতে পাচ্ছি ফেলুদার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“ তা না, ব্রেন সার্জন! কেন, দেশে কি সাদা পুরুষ মানুষের অভাব পড়েছে?” জোনাস বলে চলে…
“চলবে না এ জিনিস। আগামী বিশ বছরেই ঐ অকেসনের মত লোকেরাই পুরো ক্ষমতা দখল করবে আর তোদের মত কালো আর বাদামী কুত্তাদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠাবে।”
“তবে তোদের আর সে জিনিস দেখতে হবে না। আজই তো তোদের শেষ দিন…”, বিচ্ছিরি হেসে ওঠে লোকটা।
“আমাদের মেরে ফেললে কিন্তু ঐ মর্স কোডের ট্রান্সকিপ্টের কাগজ আপনি কখনই ফেরৎ পাবেন না। যতই না সার্চ করুন আমাদের।”
বলার আগেই আমাদের সার্চ করতে লেগেছে লোকগুলো। বলা বাহুল্য কিছু পাওয়া গেল না।
“তোদের জাতের স্বভাবই এই। সব ব্যপারে মাথা গলানো। সেই কুলি ব্যারিস্টারের সময় থেকে। কি চাস বল।”
“আমাদের একটা গাড়ির চাবি দিন। আমরা গাড়িতে উঠে স্টার্ট দেব। তারপর আমি আপনাকে ঐ কাগজটা দিয়ে দেব।”
“না দিলে?”
“আপনাদের কাছে তো অন্ততঃ তিনটে পিস্তল আছে। আমাদের কাছে কিছু নেই, দেখেই তো নিয়েছেন”, ফেলুদা শুকনো হেসে বলে।
“ঠিক আছে। তাই হোক। এই নে চাবি । এবার গাড়িতে যা। বাইরে আছে। কোনো রকম চালাকি নয়।”
তিনজনে তিনটে পিস্তল আমাদের দিকে পয়েন্ট করে আছে। আমরা মাথার ওপর হাত তুলে লাইন করে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম। আমি আর জটায়ু পেছনের সীটে, মণিদি ড্রাইভারের সীটে বসে স্টার্ট দিয়ে পাশের সীটের দরজাটা খুলে দিল। ফেলুদা এক পা এক পা করে এগিয়ে পাশের সীটে বসল।
“কাগজ না দিয়ে যদি এই দরজা বন্ধ করিস তো কেউ প্রাণে বাঁচবি না বলে দিলাম”। হিসিয়ে ওঠে আ্যন্টনি।
ফেলুদা সীটে বসে হঠাৎ একটানে মণিদির চুলের গোড়ায় বাঁধা বড় ক্লিপটা খুলে নেয়। তারপর অল্প চাপ দিতেই দেখা যায় ফাঁপা অংশটায় পাকিয়ে রাখা একটা কাগজ…কাগজ সমেত ক্লিপটা ছুঁড়ে দিয়েই ফেলুদা দরজা বন্ধ করে আর মণিদি গাড়িতে স্টার্ট দেয়।
ওদের হকচকানি কাটিয়ে ক্লিপটা কুড়িয়ে নিতে যে ক’ সেকেন্ড লাগল তার মধ্যেই তীরের মত বেরিয়ে এল গাড়ি। পেছনে দুটো গুলির শব্দ এল…সম্ভবতঃ চাকা লক্ষ্য করে। কিন্তু মণিদি সাপের মত এঁকে বেঁকে অথচ জোরে চালিয়ে সেগুলোকে কাটিয়ে দিল।
এই আঁকা বাঁকা, জঙ্গুলে, আলোহীন রাস্তায় মণিদি যেভাবে চালাচ্ছে না দেখলে বিশ্বাস হয় না।
“ও মশাই ওরা যদি অন্য গাড়ি নিয়ে ধাওয়া করে? “
“করলেও মণি যখন হেড স্টার্ট পেয়ে গেছে তখন আমাদের ধরা শক্ত। কততে চালাচ্ছে দেখছেন না? তবে আমার ধারণা ওরা আসবে না। ওদের যা দরকার ছিল ওরা পেয়ে গেছে। আমাদের মেরে ওদের বিশেষ কিছু লাভ নেই। ওদের আর শাস্তির ভয় নেই। প্রমাণাভাবে ছাড়া পেয়ে যাবে। সাউথ আফ্রিকান গভর্নমেন্টের বজ্জাতি, উইলিয়ামসনের স্পাইং কিছুই জনসমক্ষে আর আসবে না। এরা বরং এখন এই ডেরা ছেড়ে পালানোর তোড়জোর করবে এখন”।
ফেলুদার গলা ক্লান্ত শোনায়।
“কি বলছেন মশাই। এরা ছাড়া পেয়ে যাবে? এই রহস্য আপনি এত বু্দ্ধি করে, এত ঝুঁকি নিয়ে সমাধান করলেন, অথচ শেষ মূহুর্তে সব জলে গেল? দুনিয়া জোড়া নাম হত যে আপনার।”
“কিছু করার ছিল না আমার লালমোহনবাবু! না হলে মণিকে ফিরে পেতাম না।”
“স্যরি প্রদোষ। আমার জন্যই হল এটা! পাঁচটা নাগাদ কাজ শেষ করে বেরোচ্ছিলাম। ক্যাম্পাস থেকে বেরোবার আগেই অকেসন আর অন্য একটা পুলিশ —-জানি না সত্যি পুলিশ না মিথ্যে পুলিশ—এসে বলল, ‘ডঃ ব্যানার্জি, শীগ্গীর একবার আসুন, মিঃ মিত্রের ওপর আ্যটেম্প্ট হয়েছে। ওরা একটা পুলিশ ব্যাজও দেখাল। আমি তো ছুটে গিয়ে গাড়িতে উঠলাম আর উঠেই দেখি দুটো লোক বন্দুক তাক করে বসে আছে। বোকামিই হয়েছিল কাজটা হয়তো।“
“বোকামির কিছু নেই মণি। পুলিশের মধ্যে এভাবে ইনফিলট্রেশন ঘটলে সাধারণ লোক কি করবে! তোমার ওপরে না হলে হয়তো এটা তোপসে বা লালমোহনবাবুর ওপর দিয়ে হত। কাল রাতের ঐ অসফল আ্যটাকের পর আমারই উচিত ছিল তোমাদের ওপর পাহারার ব্যবস্থা করা।”
ফেলুদা সীটে মাথাটা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করে জবাব দিল।
***
—————————————————
পর্ব ১৪ঃ ডাউন দ্য র্যাবিট হোল
—————————————————
আমাদের আ্যপার্টমেন্টে আজ বারবিকিউ পার্টি হচ্ছে। বাইরের খোলা জায়াগটায় কয়লার উনুনে মাংসের টুকরো গ্রিল হচ্ছে।
মণিদির বন্ধুরা আছে, এরিক আর বিরগিত্তা আছে, সালভাদর এডেলস্ট্যাম আর হান্স আছে। আর আছেন ডঃ ম্যাথিয়াস রুডস্ট্রম এবং স্যাপোর কর্তা মাইকেল ড্যানিয়েলসন।মণিদি আর ওর বন্ধুরা বাইরে গ্রিল করছিল। বাকীরা ঘরের মধ্যে ।
“আপনার বাবার অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে বিরগিত্তা।” মৃদু হেসে ম্যাথিয়াস বলেন।
“আমার ধারণা অল্প দিনেই পুরো রিকভারী হবে। মণি আমাকে দারুণ আ্যসিস্ট করেছে। ওর মধ্যে অচিরেই শ্রেষ্ঠ নিউরোসার্জন হবার সব রকম সম্ভাবনা আছে।”
“ওঁরা দুজনেই যেভাবে এই কেসে সাহায্য করেছেন তা ভাবা যায় না।” মাইকেল বলেন।
“মিঃ মিত্র যে পালমের হত্যার সম্পর্কে কিছু তথ্য সংগ্রহ করবেন তা আমি মোটামুটি জানতাম। স্যাপোর চীফ হিসেবে আমার সঙ্গে ভারতীয় ইনটেলিজেন্সের এর প্রধান ভাটনগরের কথা হয়েছিল। কিন্তু আমার ধারণা ছিল উনি শুধু ভারতীয় যোগসূত্রের ব্যাপারটা, মানে বোফর্সের সঙ্গে কিছু যোগ আছে কিনা তাই দেখবেন।”
“প্রথমে তাই প্ল্যান ছিল। কয়েকমাস আগে যখন আমি দিল্লী যাই এ বিষয়ে ভাটনাগরকে সাহায্য করতে, তখন উনি বলেই দিয়েছিলেন হয়তো এখানে আসতে হতে পারে। তবে উনি এও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন পালমে হত্যার পুরো তদন্ত আমার বা আমাদের এক্তিয়ার নয়। দুই বা ততোধিক দেশের কূটনীতি এ ব্যাপারে জড়িয়ে আছে। আমার কাজ ছিল ভারতীয় যোগসূত্র আছে কিনা খুঁজে বের করা। নেই যে তাতে ভাটনগর অন্ততঃ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছেন।”
“কিন্তু আমি হাঁপ ছাড়তে পারছি না তো”। মাইকেল বলে ওঠেন। “যে ভাবে সুইডিশ পুলিশে নিও নাজী ইনফিলট্রেশন হয়েছে তাতে আমি লজ্জিত ও চিন্তিত।
আপনি ভাববেন না প্রদোষ, অকেসনকে আ্যরেস্ট করা হয়েছে। আপনার ঘরে পাওয়া বুলেট যে ওর সার্ভিস রিভলভার থেকে বেরিয়েছে তা প্রমাণ হয়ে যাবে সহজেই। ওর শাস্তি হবে। কিন্তু ওই তো একমাত্র পুলিশ না যে এই ভাবধারায় বিশ্বাসী..”
“প্রদোষ, আমরা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ যে আপনার জন্যই আমরা আ্যন্টনিকেও ধরতে পেরেছি নরওয়ের সীমান্তে। সেদিন আপনারা পালিয়ে আসার সময় ফালুন থেকে ফোন করে খুব কাজের কাজ করেছেন। ওর গাড়িতে স্নাইপার গান পাওয়া গেছে যার থেকেই কার্লকে মারা বুলেটটা বেরিয়েছে। ফলে কার্লের খুনের চেষ্টার জন্য ওর জেল হবে। “ মাইকেল বলে চলেন।
“কিন্তু আ্যন্টনির পালমে খুনের যোগের প্রমাণ আমাদের কাছে আপাততঃ নেই। আর সেটা ছাড়া এভাবে ওদের সরকারকে জড়িয়ে অভিযোগ করা যাবে না। দ্যাট উইল বী এ ডিপ্লোম্যাটিক ডিসাস্টার। ফলে আমাদের অফিসিয়াল ভার্সন অনুযায়ী পালমে হত্যা অমীমাংসিতই থাকবে”।মাইকেল কথা শেষ করেন।
“পালমের হত্যার সঙ্গে যে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবিদ্বেষী বোথা সরকারের যোগ আছে এটা অনেকেই বলাবলি করত কিন্তু। যেভাবে এ এন সিকে মোটা টাকা দেবার পরেই পালমে খুন হন তাতে…” ম্যাথিয়াস বলে ওঠেন।
“এটা তো ওপেন সিক্রেট। খুনের পরে আমাদের পুলিশ একের পর এক মূল্যবান ক্ল্যু এবং প্রমাণ নষ্ট না করলে হয়তো এতদিনে…কে জানে, এর পেছনেও ঐ চরমপন্থী পুলিশদের কতটা ইচ্ছাকৃত অবদান আছে!” মাইকেল স্বীকার করেন।
“একটা বড় প্রমাণ তো হাতে এসেও চলে গেল..মণিকে কিডন্যাপ করার পর আর আমার কিছু করার ছিল না, মাইকেল..” ম্লান হেসে বলে ফেলুদা।
“আপনি অনেক করেছেন প্রদোষ। আমাদের দেশের পুলিশ যখন বারবার তদন্তে বাধা দিয়েছে তখন আপনি বিদেশী হয়ে এত ঝুঁকি নিয়ে…আপনার দেশও তো আপনাকে এ কাজ দিয়ে পাঠায়নি। যা করতে পাঠিয়েছিল, আপনি করেছেন। বাকী ডিসকভারীটাতো আ্যক্সিডেন্টাল”! মাইকেল বলেন।
“সে তো বটেই। আনিকাদের ঐ দ্বীপে আমি এমনিই গেছিলাম মিডসামার পালন করতে। তারপর ঘটে গেল ঐ কার্লের ওপর হামলা। আ্যন্টনি ওরফে জোনাস যে চিলির পিনোচের সমর্থকদের হয়েও কাজ করে সেটা আমাকে অবাক করেছে।” ফেলুদা অকপট।
“পিনোচের দিন ঘনিয়ে এসেছে।” এডেলস্ট্যাম বলে ওঠেন।”সেই জন্যই লিটল চিলিতে আমরা বিরগিত্তাকে লুকিয়ে রাখতে পেরেছিলাম। তবে ওর কিছু সমর্থক আজকাল মরিয়া। আর কার্লের ওপর ওদের বহুদিনের রাগ। ওর কনফেশনের জন্য সুইডেনের নিও নাজী নেটওয়ার্ক অন্ততঃ পঁচিশ বছর পিছিয়ে যায়।”
“আর ঐ আ্যন্টনি, হয়তো বেশ কিছু টাকার বিনিময়ে ওকে স্নাইপ করে। সেদিন জোনাস ওরফে আ্যন্টনি যখন বলল ও অন্য দ্বীপে যাচ্ছে তখন আসলে ও কাছাকাছি কোনো জনশূন্য জায়াগা থেকে ওর লুকোনো স্নাইপার গান ইত্যাদি নিয়ে টিলার পেছন দিয়ে উঠে আসে। প্রথম শটটা কপালদোষে মিস হয় কারণ কার্ল তক্ষুণি নীচু হয়েছিল। পরেরটা লক্ষ্যভেদ করে। ও আবার দড়ি ধরে নেমে কায়াকে চড়ে পালায়। হয়তো কেউ ওকে সাহায্য করেছিল। মে বি অকেসন। জেরা করলে বেরোবে।” ফেলুদা বলে।
“আর ওর ঐ লকেট টা”? আমি জিজ্ঞেস করি।
“আ্যন্টনি হয়তো বিরগিত্তাকেও মারার বরাত পেয়েছিল। এইসব সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের প্রতিহিংসা সাংঘাতিক হয়। বিরগিত্তা তো শুধু কার্লের মেয়ে নয়, ও আলমা রডরিগেজের মেয়ে, হেক্টর রডরিগেজের নাতনী। সেদিন ও যখন টিলার ওপর থেকে আমাদের দেখে, মণিকে বিরগিত্তা ভেবে ভুল করে। পাথরটা গড়িয়ে ফেলে পালায়, কিন্তু গলার লকেটটা ছিঁড়ে পড়ে যায় সোজা খরগোশের গর্তে।”
“আপনি সেটা পেলেন কি করে?”জটায়ুর প্রশ্ন।
“সেদিন যখন আমি আবার ঐ দ্বীপে গিয়ে এরিকের সঙ্গে দেখা করি, ওর ওয়ার্কশপ থেকে একটা মেটাল ডিটেক্টর নিয়ে টিলার ওপরে যাই। আমি ভেবেছিলাম হয়তো বুলেটের শেলটা ওখানে পড়ে গেছে। সেটা পেলে সুবিধে হত…কোন ধরণের সংগঠন কোন ধরনের স্নাইপার বুলেট ব্যবহার করে সেটা মোটামুটি জানা।
কিন্তু শেল পাইনি। ওটা হয়তো আ্যন্টনি সঙ্গে করে তুলে নিয়ে গেছিল…অভিজ্ঞ লোক তো! কিন্তু তার বদলে পেলাম এই লকেট। এরিক আর ফ্রেডরিক আমাকে সাহায্য করে ওটা খুঁড়ে তুলতে। তারপর এরিকের ওয়ার্কশপে ফিরে কাগজপত্রের মধ্যে দেখি ঐ মর্স কোডে লেখা ট্র্যান্সক্রিপ্ট। তখন ওটা কৌতুহল বশে বাড়ি নিয়ে আসি। তারপর একজন মর্স জানা লোককে দিয়ে পড়াতেই…আ্যন্টনির নাম, ক্রেগ উইলিয়ামসনের নাম, পালমেকে মারার প্ল্যান..একেবারে ড্যামনিং এভিডেন্স।”
“এ যে মশাই একেবারে ডাউন দ্য র্যাবিট হোল”! বলে ওঠেন জটায়ু।
“দেয়ার ইজ এ বিগার র্যাবিট হোল মিঃ গাংগুলী থ্রু হুইচ মাই কান্ট্রি ইজ ফলিং ডাউন”। ডাঃ ম্যাথিয়াস রুডস্ট্রমের মুখ গম্ভীর।
“নাজীজিমের এই ব্যাধি যদি নির্মূল করা না যায় আর এক প্রজন্মের মধ্যে ঐ অকেসনদের হাতেই ক্ষমতা আসবে। সেটা এই দেশের সর্বনাশ ডেকে আনবে। আমাদের ছোট দেশ। অভিবাসীদের ছাড়া এদেশ কখনো চলতে পারে? এই যে মণি, সাব্রিনা…কি দক্ষ ডাক্তার, যে কোনো দেশের পক্ষে ওরা আ্যসেট। তাদেরকে গায়ের রং বিচার করে তাড়িয়ে দেবার চেয়ে বড় মূর্খামি আর কি আছে বলুন তো! সুইডেন তো ভাগ্যবান, ফ্রীতে এরকম দক্ষ লোক পেয়ে।”
“সাব্রিনার কথা জানি না ম্যাথিয়াস, তবে মণি কিন্তু ভারতেই ডাক্তারী করবে। এই কোর্সটা শেষ হলেই।” ফেলুদা একপেশে হেসে বলে।
“তবে ভাবছেন কেন? অকেসন-ই তো একা নয়। আপনার আর মাইকেলের মত লোকেরাও তো আছেন যারা মানুষকে গায়ের রং বা ধর্ম দিয়ে বিচার করেননা। আপনারা চেষ্টা করুন যাতে দেশটা নির্বোধ পাষন্ডদের হাতে না চলে যায়। আর সত্যি কথা বলতে কি এ লড়াই তো আপনাদের একার নয়, সব দেশেই আছে। মিঃ এডেলস্ট্যামকে জিজ্ঞেস করুন না! কোনদিন হয়তো আমার দেশও এই ক্রসরোডে এসে দাঁড়াবে, কে বলতে পারে!”
***
——————————————
অন্তিম পর্ব ১৫ঃ উপসংহার
——————————————
পার্টি শেষে সবাই চলে যাবার পরে আমরা চারজন ব্যালকনিতে বসেছিলাম।
“আচ্ছা আমার ক্লিপের মধ্যে ঐ কাগজটা কখন ঢোকালে আর কেনই বা ঢোকালে?”মণিদি প্রশ্ন করে।
“সেদিন রাতে তুমি যখন ওটা খুলে রাখছিলে তখনই ওটার ঐ ফাঁপা ব্যারেলটা দেখে আইডিয়াটা মাথায় আসে। ট্রান্সকিপ্টের কাগজটা তো আগের দিনই নিয়ে এলাম এরিকের থেকে, কিন্তু ওটা লুকিয়ে রাখতে হত, অথচ মোটামুটি চোখের সামনে। তুমি তো ওটা রোজই চুলে লাগাও, তাই…”
“হুম। কিন্তু জান কি এরকম দুটো ক্লিপ আছে আমার? অবিকল একরকম? যদি সেদিন অন্যটা পরে যেতাম?”
“সর্বনাশ! এটা তো জানতাম না!” ফেলুদার চোখ গোল!
“তোমাদের এত গাদা গাদা একই রকম সাজের জিনিস থাকে কেন বলতো?”
“আমার গাদা গাদা সাজের জিনিস? তিনটে ক্লিপ আর দুজোড়া কানের দুল সম্বল আমার। তাও চ্যারিটিতে কেনা। একটা লিপস্টিক ক্লাস ইলেভেনে কিনেছিলাম এখনো শেষ হয়নি….তোমার না চন্দ্রিমার মত কেউ জোটা উচিত ছিল…বুঝতে সাজ কাকে বলে!”
“ওসব চন্দ্রিমা টন্দ্রিমা দেখালে তো হবে না।আমাদের তিনজনের সম্মিলিত ভাবে একটাও ক্লিপ, কানের দুল কিম্বা লিপস্টিক নেই, বুঝেছ! তুমি তো এখন আমাদের চতুর্থ মাস্কেটীয়ার, সুতরাং …”
“সুতরাং মাথাটা সবার আগে মুড়িয়ে আসি, নাকি? হেয়ার স্টাইলটা কার মত করব? লালমোহনবাবুর মত হলে ক্লিপের ল্যাঠাটা একেবারে চুকে যায়..”
“দেখুন মণিকঙ্কণা , আপনাদের এই দাম্পত্য কলহে আমার টাককে টানবেন না”।
জটায়ু টাকের ব্যাপারে খুব অনুভূতিপ্রবণ!
“আর আপনি বলুন তো ফেলু বাবু, কাল আমাদের সঙ্গে বিরকা বেড়াতে যাবেন না রোজকার মত ঐ দুপুর দুটো নাগাদ ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে যাবেন?”
“কি? আমার সঙ্গে আবার দুপুর দুটোয় রোজ কে দেখা করে? আমার কি কাজকর্ম সব ডকে উঠেছে নাকি?” মণিদি বলে ওঠে।
“তাহলে..”? আমি আর লালমোহনবাবু দুজনেই অবাক।
“কোথায় যাও তাহলে তুমি রোজ দুপুরে, ফেলুদা?”
“ক্রমশ প্রকাশ্য “, ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি।
“কি আবার হবে! আরো কিছু তদন্ত বাকী আছে মনে হয়। এসেছেই তো ঐ করতে..” মণিদির গলায় ঝাঁঝ।
“তা হলেই বা তোমার ক্ষতি কি মণি! ঐ সময় তো তুমিও কাজেই থাক”, বলে ওঠে ফেলুদা।
“আপনারা ঝগড়াটা থামান তো মশাই। বরং আমার কথা যদি শোনেন তো এবার ফিরে গিয়ে বিয়েটা চট করে সেরে নিন।”
“কেন? বিয়ের জন্য কি আটকাচ্ছে লালমেহনবাবু?”ফেলুদার প্রশ্ন।
“না , আপনার যে কিছু আটকাচ্ছে না সে তো দেখতেই পাচ্ছি। দিব্যি ওপর তলায় থিতু হয়েছেন।”
আমি রাস্তার দিকে তাকিয়ে হাসি চাপলাম। মণিদি অস্ফুটে ‘আসছি..’ বলে দুদ্দাড় ছুটে পালাল।
“কিন্তু কলকাতা সুইডেন নয় মনে রাখবেন। পুরোহিতকে ফাঁকি দিয়ে এরকম কপোত কপোতী যথা উচ্চ বৃক্ষচূড়ে থাকা বেরিয়ে যাবে।”
“তা আপনি কি আনিকার সাথে আর যোগাযোগ করেছেন? ভদ্রমহিলা আপনার কথা জিজ্ঞেস করেন খুব, মণি বলছিল। এমনকি কোত্থেকে একটা সুইডিশ রামায়ণ যোগাড় করে জটায়ুর ব্যাপারটা পড়ে নিয়েছেন…”
“শুনুন মশাই, আপনার নিজের ল্যাজটি কাটা গেছে বলে এখন আমার পিছনে লাগবেন না। আমি ব্যাচেলর ছিলুম, আছি, থাকব একেবারে কনফার্মড!” জটায়ু র গলা প্রত্যয়ী।
“আর ঐ ভদ্রমহিলা আমার চেয়ে আধ হাত খানেক বেশী লম্বা। তবে…ভাবছিলুম ওঁর আদলে প্রখর রুদ্রকে একটা গার্লফ্রেন্ড দিলে কেমন হয়!”
“সাধু, সাধু। কবি সাহিত্যকদের আসল মানসী তো তাঁদের সৃষ্টিতেই মিশে থাকে! সুতরাং লেগে পড়ুন।”
———
আমাদের যাবার দিন প্রায় এসে গেছে। গোছগাছ শেষ। কাল দুপুরে প্লেন। গতকাল রাতেই ফেলুদা বলেছে,
“তোমরা তিন জনেই আমাকে দারুণভাবে সাহায্য করেছ এই কেসে—
—লালমোহনবাবু, আপনি আর তোপসে হান্স আর এডেলস্ট্যামের খোঁজ দিয়ে।
—আর মণি তুমি গাড়ি চালিয়ে, পাহাড়ের ঢালে নেমে দড়ি খুঁজে এবং সর্বোপরি ঐ হামলার রাতে আমার অন্যত্র থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে—অত কটমট করে তাকিও না, এটা কারো অজানা কিছু নয়।
তো মোদ্দা কথা হল তোমাদের তিনজনেরই একটা থ্যাঙ্ক্যু ট্রীট প্রাপ্য। সুতরাং কাল সন্ধেবেলা স্পেশাল ডিনার অপেরাশালেন রেসট্যুরেন্টে, আমার তরফ থেকে।”
এখানকার বেশ কায়দার রেসট্যুরেন্ট ওটা। ড্রেস কোড আছে। মণিদি একটা এমারেল্ড গ্রীন লং ড্রেস পরেছে। চুলটা উঁচু করে ওর ঐ সবেধন তিনখানি ক্লিপের একটা দিয়ে আটকানো। আর ক্লাস ইলেভেনের সেই লিপস্টিকটার মনে হয় সদ্ব্যবহার হয়েছে। আমাদের তিনজনের পরনে ইস্ত্রী করা সাদা শার্ট, কালো ট্রাউজার্স, কালো জুতো।
ডিনারের পর আমরা জলের ধার দিয়ে দিয়ে হাঁটছিলাম । আশপাশের ছোট বড় ব্রীজ গুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। আশপাশের পুরোনো বাড়িগুলো, উঁচু চার্চ আর জলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আলোয় সাজানো জাহাজ…সব মিলে দিব্যি লাগছে। সমুদ্র এখানে অনেকটাই ভেতরে ঢুকে এসেছে খাঁড়ির মত। স্রোত তাই প্রায় নেই। ধারে ধারে পুরো জায়গাটাই বাঁধানো। দেশ বিদেশের ট্যুরিস্টরা স্থানীয় লোকেদের সঙ্গে মিলে হাঁটছে, বেঞ্চে বসে আইসক্রীম খাচ্ছে অথবা ছবি তুলছে।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা চারজনে একটা বড় চত্বর মত জায়গায় এসে পড়লাম। বেশ চওড়া জায়গার একপাশে একজন বড় বড় দুটো বক্স লাগিয়ে মিউজিক বাজাচ্ছে। কেউ বসে শুনছে, কেউ তালে তালে পা নাচাচ্ছে। ওদিকে সিঁড়ি উঠে গেছে রাস্তা অব্দি।
“বুঝলে মণি, ভেবে দেখলাম লোকে বড় কুকথা কইছে…”বলে ফেলুদা চট করে একবার লালমোহনবাবুর দিকে দেখে নিল।
“এমনকি সুইডেনের মত লিবারেল জায়গাতেও ফিয়াঁসে না গার্লফ্রেন্ড সেই নিয়ে কচকচি….তারপর ধর তোমার অস্থাবর সম্পত্তি বলতে ওই মোটে দুটো কানের দুল আর তিনটে ক্লিপ, ওটাকেও একটু না বাড়ালে আর চলছে না…সুতরাং…”
মণিদির ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা কাটার আগেই ফেলুদা এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছে…হাতে খোলা একটা ছোট্ট নীল ভেলভেটের বাক্স যার ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটা আংটি।
“ডাঃ মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি, উইল ইউ ম্যারি মি”?
“ইয়েস! আই মোস্ট সার্টেইনলি উইল”!
মণিদি আংটির হীরেটার চেয়ে দশ গুণ বেশী ঝকঝকে হাসি দিয়ে বাঁ হাতের অনামিকাটা বাড়িয়ে দিয়েছে।
এবং আমি আর লালমোহনবাবু ছাড়াও আশপাশের রাস্তা, পায়ার, ব্রিজ আর সিঁড়ি থেকে অন্ততঃ পঞ্চাশ জন সম্পূর্ণ অচেনা, বিভিন্ন দেশের লোক হাততালি দিয়ে বিভিন্ন ভাষায় শুভেচ্ছা জানাচ্ছে।
“ওয়েল, দ্যাট পার্ট ইজ সর্টেড”, আংটিটা মণিদির আঙুলে পড়িয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় ফেলুদা।
“নাও লেটস ওয়ালটজ”, বাঁ হাতে মণিদির কোমর জড়িয়ে ডান হাতে ওর বাঁ হাত ধরে বলে ফেলুদা।
“তু-তুমি…ওয়ালটজ…” মণিদি ধাঁধিয়ে গেছে।
“পুরো দু সপ্তাহ ক্লাস করেছি, রোজ দুপুরে, দু ঘন্টা করে। ফেলু মিত্তির চাইলে শিখতে পারে না এমন জিনিস খুব কম আছে মিস মণিকঙ্কণা,” লীড করতে করতে বলে ফেলুদা।
চত্বরের ঐ মিউজিক বাজানো লোকটা তখন চালিয়ে দিয়েছে ফ্রাঙ্ক সিনাত্রার মুন রিভার….
“Moon river wider than a mile
I'm crossing you in style someday
Old dream maker, you heartbreaker
Wherever you're going I'm going your way.”
***
No comments:
Post a Comment