Sunday, 11 June 2017

নিশ্চিহ্নাস্ত্র রহস্য by Ambuz Basak (incomplete)

 

রবিবারের সকাল। ফেলুদা কলেজ-স্ট্রিটের বই পাড়ায়। সম্ভবত, সুমিত্রা দেবীর সাথে ডেটিং-টেটিং এর প্ল্যান! তোপসে আর অয়ন্তিকা বৈঠকখানায় বসে জাঁকিয়ে গল্প করছে। বিষয়বস্তুঃ ফেলুদার ফিরে পাওয়া ভালোবাসা। দু'মাস হয়েছে তোপসে-অয়ন্তিকা নতুন ইনিং শুরু করেছে। ওদের শুভ-পরিণয়ে আমন্ত্রিত ছিলেন যেসমস্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ, তাঁদের মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত বৈজ্ঞানিক প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু ছিলেন মূল আকর্ষণ! কে না উপস্থিত ছিলেন সেদিন - বিখ্যাত সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সি, রাজা ভূদেব সিং-এর পরিবার-বর্গ থেকে শুরু করে 'কাকাবাবু', অর্থাৎ, রাজা রায়চৌধুরী মহাশয়-ও। তবে, এখনও অব্দি মধুচন্দ্রিমা-র অবকাশ পায়নি নব-দম্পতি। অয়ন্তিকা এসময়ে অত্যন্ত ব্যস্ত- সামনেই 'সারা বাংলা নৃত্য প্রতিযোগিতা', তাই সারাদিনের একটা মেজর সময় সে নৃত্য প্রশিক্ষণ দিতেই ব্রতী। রবিবারেও সে ছুটি নেয়নি!
- এই, সাড়ে নটা বাজে বাবু। চা টা শেষ করে কাপ-প্লেটটা সিঙ্কে নাবিয়ে দিও - আমি রেডি হচ্ছি, ফিরবো কখন তা ঠিক নেই।
- জো হুকুম, ম্যাডাম। আজ আমি একটা স্পেশ্যাল ডিশ বানাবো। দেখবে, পেট ভর্তি থাকলেও, শুধু খাবারটার সু-ঘ্রাণের দৌলতেই পেট খালি হয়ে গেছে!
- বেশ তো। তোমার স্কুলের সামার ভ্যাকেশন যতদিন আছে, ততদিন তবে আমি রান্না ঘরে ঢুকবো না! (ফিক্ করে হাসি অয়ন্তিকার, কোনোরকমের লুকিয়ে সিরিয়াসনেস আনার চেষ্টা)
- (মাথা চুলকে) এই, এই.. ওমনটা করবে? চাপ হয়ে যাবে আমার!
- (অট্টহাস্যে) মজা করছি। আমি উঠছি। হরিপদ বাবু (এখন আর লালমোহন বাবুর অ্যাম্বাসেডর নয়, বছর দু'য়েক হলো, ফেলুদা নতুন গাড়ি নিয়েছে - মার্সিডিজ) এসে গেছেন।
তোপসের কপালে একটা আলতো চুম্বন রেখে অয়ন্তিকা বেড়িয়ে গেল। তোপসে আনমনা ভাবে টিভি সুইচ করল। ২৪ ঘন্টা। একটা লাইভ টেলিকাস্ট। এ কি! এ যে ভয়ানক খবর! আওরঙ্গাবাদ-গামী এক যাত্রিবোঝাই বাস চোখের পলকে নিশ্চিহ্ন হতে দেখা গেছে! এ তো অকল্পনীয়! তোপসে সঙ্গে-সঙ্গেই তার ফোনে স্পিড-ডায়াল ১ প্রেস করল -
- ফেলুদা! তুমি -
- সারা দেশ এখন এই নিউজ নিয়েই সরগরম রে তোপসে। মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছে।
- কিন্তু, এ ও কি সম্ভব?
- সম্ভব হয়তো। নিশ্চই এর পিছনে কোনো জটিল বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে। এ ব্যাখ্যা দেওয়ার মতো 'আই.কিউ.' দেশের একজন বৈজ্ঞানিকেরই আছে।
- অর্থাৎ, তুমি প্রোফেসর শঙ্কু-র কথা বলছ?
- ইয়েস, মাই বয়। আমি জানিনা এই অঘটনের সমাধান কিভাবে হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটা একরকমের অলীক ব্যাপার, বিশ্বজনীন ও বটে।
- তুমি এখন একা?
- না। সৌমিত্র-দা (পাঠকগণ ঠিকই ধরেছেন, আমি স্বনামধন্য চলচ্চিত্রাভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়-এর কথাই বলছি) এর সাথে আড্ডা দিচ্ছি। আমি ফিরছি এক ঘন্টায়। জলখাবার খেলি?
- হ্যাঁ। অয়ন্তিকা বেড়িয়ে গেছে।
- ও ও তবে এতক্ষণে খবরটা পেয়েছে নিশ্চই। আমি আসছি।
একঘন্টার মধ্যে ফেলুদা ফিরেছে। দু' ভাই মিলে এখন ব্রেকিং-নিউজে মগ্ন। যাত্রিবোঝাই বাসটা ছিল একটি ট্যুরিজম কোম্পানির আন্ডারে - 'দ্য বিউটিজ অব হিন্দুস্তান'। মুম্বাই থেকে আওরঙ্গাবাদ-গামী বাসটি গতকাল রাত একটা পঁয়ত্রিশ নাগাদ মুম্বাই এয়ারপোর্ট থেকে রওনা দেয়, ড্রাইভার সমেত ৭৭ জন - আজ সকাল সাড়ে নটা নাগাদ আওরঙ্গাবাদের জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দিরের তিন মাইল আগেই তা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। স্থানীয় বেশ ক'য়েক জন ব্যাপারটা নিজে প্রত্যক্ষ করেন। স্বাভাবিক ভাবেই এই ঘটনা সেখানকার মানুষদের মধ্যে এক ভয়াবহ, আতঙ্কদায়ক, চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সূচনা করে। আঞ্চলিক পুলিশ-ফোর্স ব্যাপারটিকে খতিয়ে দেখছেন।
"ক্রিং.. ক্রিং ক্রিং.. ক্রিং ক্রিং.."
- হ্যালো।
- হ্যাঁ, প্রদোষ বাবু?
- আহাঃ! আপনাকেই চাইছিলাম। কি বিশ্রী একটা ব্যাপার ঘটে গেল - ভেবে কিছু কুল-কিনারা পাচ্ছি না মশাই!
- আপনার সাথেও আমার দেখা করা খুব প্রয়োজন। তা আমি আগামি -
- আপনাকে কলকাতায় আসতে হবে না; আমরাই গিরিডি যাচ্ছি। কালই ভাবছি বেড়িয়ে পড়বো। অনেক দিন হয়েগেল, মাথার ব্যায়ামের সরঞ্জাম নেই (সহাস্যে)! তা, কিছু বলতে পারেন এ বিষয়ে?
- হ্যাঁ। কিছুমাত্র বলছি। আজকের দুর্ঘটনার জন্য যে ওয়েপনটি ব্যবহার করা হয়েছে -
- তা আপনারই বিশ্ববিখ্যাত ইনভেনশন, 'দ্য অ্যানাইহিলার'!
- ঠিক ধরেছেন। আমি আমার সারা জীবনে দু'বার ব্যাবহার করেছি সে অস্ত্র। কিন্তু তাতে মানবসমাজ, পরিবেশ, কিংবা মানবসম্পদের ক্ষতি হয়নি। দিনকেদিন মানুষ হিংস্র থেকে হিংস্রতর, তথা হিংস্রতম জীব হয়ে চলেছে। প্রদোষ বাবু, do you know, where does the biggest irony lie? The more we get upgraded, improve ourselves, the more we ruin our humanity. In fact, I believe, there is a reciprocal relationship between humanity & human-civilization.
- আমি আপনার সাথে একমত। আপনি চিন্তা করবেন না, আমরা গিরিডি অ্যাপ্রোচ করবার আগেই জানিয়ে দেব, কেমন?
- অসংখ্য ধন্যবাদ। ঐ কথাই রইল। রাখি তবে?
- রাখুন। নমস্কার।
রিসিভার রেখে দিল ফেলুদা। সত্যি কথা বলতে কি, ফেলুদা এই কলটার জন্যই অপেক্ষা করছিল।
- তোপসে -
- ফেলুদা, আমি তোমাদের ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছি, তুমি তোমারটা একবার চেক করে নাও। অয়ন্তিকাকে এখনও কিছু বলিনি যদিও, but, I can convince her to come with us!
- বাবাহ্! তুই তো আমারও এক-কদম আগে! এক্সটেনশনে শুনলি?
- পুরোটা! জাস্ট ভাবতে পারছিনা!
- ভাবতে আমিও পারছি না রে, তোপসে। কি এমন মেকানিজম থাকতে পারে, যার দৌলতে একটা আস্ত বাস ওতগুলো যাত্রি সমেত হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে? আর আমি এটুকু নিশ্চিত যে, 'দ্য অ্যানাইহিলার' চুরি যায়নি। যদি যেত, তবে সেটাও খবর হতো। আরেকটা ব্রেকিং নিউজ-ও বটে!
- তবে?
- যতদূর আন্দাজ করতে পারছি - সম্ভবত, ইনভেনশন-ফর্মুলা কেউ বা কারা কোনরকম ভাবে হস্তগত করেছে। আসল নথি যেমন থাকার তেমনই রইলো, কিন্তু বিষয়বস্তুর স্বাদ তখন অন্য কেউ চাখছে! আজকালকার ইলেকট্রনিক-যুগে প্রাইম-হ্যাকারদের ক্ষেত্রে প্রায় সবরকমের সিকিউরিটি ভেস্তে দেওয়া সহজ। অবাক হচ্ছি এই ভেবে, যে, কে এমন আছে, যে কিনা 'ত্রিলোকেশ্বর'-কেও ধোঁকা দিতে পারে!

সোমবার ফার্স্ট আওয়ারেই হরিপদ বাবু, ফেলুদার মার্সিডিজ নিয়ে হাজির। লালমোহন বাবু তার ক্লাসমেট বৈকুণ্ঠ মল্লিকের সাথে গ্যাংটক গেছেন। ফেলুদাকে বলে গেছেন, "তপেশের লেখা পড়ে জানতে পারি, '৭১ সালে আপনারা দু' ভাই মিলে গ্যাংটকে একেবারে - ওই কি যেন সিনেমাটার নাম? ও হ্যাঁ.. তা, যা ধুম-মাচিয়ে এসেছেন, আমি ভাবলে, মশাই, আজও গায়ে কাঁটা দেয়! তাই বৈকুণ্ঠকে আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট বানিয়ে বগলদাবা করে ঐখানে আমিও ধুম-টু করে আসবো!"
লালমোহন বাবু ফেলুদার মার্সিডিজকে জায়গা দেওয়ার জন্য তার গ্যারাজটিকেই দ্বিগুণ ক'রে ফেলেছেন। অবশ্য, ফেলুদা একরকমের জোর করেই গ্যারাজ মেরামতির খরচাপাতি দিতে গিয়ে যে রকমের ধমক খেয়েছিল লালমোহন বাবুর কাছে, তা অবিশ্যি ভুলবার নয়!
জামাকাপড় নেওয়া আছে দিন দশেকের মতো। অয়ন্তিকা প্রথম প্রথম গাঁই-গুঁই করেছিল, আর একমাস পরেই 'সারা বাংলা নৃত্য প্রতিযোগিতা' বলে কথা - কিন্তু, একটা উগ্র অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেয়েই সে আমতা-আমতা করেছে।
কোলকাতা থেকে গিরিডি প্রায় ৩২৩ কিমি। ড্রাইভিং বাই রোডের ডিউরেশন প্রায় ঘন্টা সাতেক। এমতাবস্থায়, লংড্রাইভের জন্য বাড়তি যা যা জিনিস প্রয়োজন, তা নেওয়া হয়ে গেলে, হরিপদ বাবু গাড়ি স্টার্ট দেন বেলা সাড়ে দশটায়।
পথের বর্ণনা দিয়ে আপনাদের অপেক্ষায় রাখবোনাই ভেবেছি। ফেলুদার মার্সিডিজের 'স্মার্ট-ম্যাপ' -এর দৌলতে, প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু মহাশয়ের বাড়ি পৌঁছানো গেল মাত্র ছ' ঘন্টার মধ্যেই। মূল ফটকে দুজন দ্বার-রক্ষী মোতায়েন - তারা ফটক খুলে দিল। মাঝখানের বাঁধানো পথটার বাঁদিকে একটা লন। আর, ডানদিকে একটা বাগান - বেশ বড়ই। ফেলুদা বাগানের গোলঞ্চগাছটার দিকে অন্যমনস্ক ভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল, তারপর হরিপদ বাবু ছাড়া বাকি সবাই গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। হরিপদ বাবু গাড়ি নিয়ে পার্কিং-জোনে ঢুকে গেলেন।
- আরে! আসুন, আসুন। আমি একটু আগেই আপনাদের কথা ভাবছিলাম - তা, পথে ঘাটে
- কোনো অসুবিধাই হয়নি প্রোফেসর! (অয়ন্তিকা, প্রোফেসরকে শেষ করতে না দিয়েই)
- বেশ, বেশ। লালমোহন বাবুকে দেখছি না -
- উনি ওনার ক্লাসমেটের সাথে গ্যাংটকে ঘুরতে গেছেন।
- বাহ্! ওইত্তো, হরিপদ। চলুন, ভিতরে যাওয়া যাক।
*****
প্রহ্লাদের হাতের চা টা লা-জবাব। আদা আর এক অচেনা সুমিষ্ট ফলের সুগন্ধে ভরপুর লিকার। ফেলুদা ফলের নাম জানতে চাইলে, প্রোফেসর বললেন যে ওটা 'মডিফায়েড ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুট'। বেশ ক'য়েক বছর আগে খবরের কাগজ এই 'ম্যাকেঞ্জি ফ্রুট' নিয়ে খুব সরগরম ছিল। প্রায় এক শতাব্দীরও বেশী সময় আগে করিমগঞ্জে এই ম্যাকেঞ্জি সাহেবের পূর্বপুরুষদের রেশমের কুঠি ছিল। কিন্তু, কুঠি উঠে গেলেও তারা করিমগঞ্জ ছাড়তে পারেননি। সেই ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাংলোর বাগানে এই আশ্চর্য ফলের গাছ। একাধিক ভিটামিনস-এ ভরপুর অতীব সুস্বাদু এই ফল যখন প্রকাশ্যে এলো (যতদূর মনে পড়ছে, ফাউন্ডারের নাম মানসুখানি। কিন্তু, ফেলুদার মতে সে নাকি ব্যাবসাদার মানুষ; আসল আবিষ্কারকের নাম কাগজে ছাপায়নি।), তার দাম হলো আকাশছোঁয়া - যা কিনা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষদের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
- 'মডিফায়েড' কেন? (ফেলুদা জিজ্ঞেস করলো)
- এই খবরটা জানেন তো যে, ওই ফল একমাত্র সেই বাংলোর বাগানেই ফলতো? এই রহস্যের উত্তর খুঁজতে, আমি করিমগঞ্জের সেই বাংলোতে একবার গেছিলাম, তাও বছর দশেক আগে। আমি ম্যাকেঞ্জি সাহেবের বাগান থেকে কিছু মাটি সংগ্রহ করেছিলাম। তো, গবেষনাগারে পরীক্ষা করে সে মাটির বেশ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্য আবিষ্কার করি। The soil was practically containing three transition metals: Yttrium, Niobium & Technetium, having a particular percentage-proportion of 32:14:23. এতোটা মাত্রায় যে কোনো জমিতে ওই তিনটি মৌল থাকতে পারে, তা জেনে অবাক হয়েছিলুম বৈ কি! আমি আমার বাগানের বেশ কিছু জমি নিয়ে, উপযুক্ত পদ্ধতিতে কৃত্রিম ভাবে ম্যাকেঞ্জি-ট্রি বানাই। অবশ্যই ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুটের বীজ পুঁতে। তবে, আমার বানানো গাছের ফলের স্বাদ, ম্যাকেঞ্জি সাহেবের গাছের ফলের স্বাদের থেকে বেশ কিছুটা আলাদা। কারণটা আমার কাছে অজ্ঞাত। আর তাই, 'মডিফায়েড ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুট'।
- চমৎকার! (অয়ন্তিকা এক্সাইটেড) আচ্ছা প্রোফেসর, এবার আপনার নিশ্চিহ্নাস্ত্রটি সম্পর্কে কিছু বলবেন? আমার কৌতুহলের শেষ নেই!
ফেলুদা অয়ন্তিকার দিকে তাকিয়ে মিটি-মিটি হাসছে! তোপসে একটু নার্ভাস! প্রোফেসর সহাস্যে বললেন, "তা তো অবশ্যই। আচ্ছা, শুনুন তবে। পর্যায়-সারণির ১১৪ ও ১১৫ নং মৌল দু'টি হচ্ছে যথাক্রমে Flerovium ও Moscovium. দু'টি মৌলই তেজস্ক্রিয়। Flerovium-এর ক্ষেত্রে, ভ্যালেন্স-শেল-ইলেকট্রনিক-কনফিগারেশনে দেখা যায় যে, the 'p-subshell' has only two electrons. Which is why, the element becomes highly unstable. আবার, in case of Moscovium, the valence 'p-subshell' contains three electrons, for this reason, it gains a 'half-filled' stability. কিন্তু যখন এই দুটি মৌলকে রশ্মি আকারে একে অপরের সাথে 'head-on' কলিশন করানো যায়, তবে মৌল দু'টির মধ্যে দ্রুত ইলেকট্রন-ট্রান্সফার ঘটে। সচারচর এই মৌলদ্বয় 'আলফা'-কণা নিঃসরণ করে থাকে। কিন্তু আমি এই মেকানিজমটাকে অ্যারেস্ট করেছি। যেহেতু আমি মৌল গুলিকে রশ্মির রূপ দিয়েছি, তাই প্রতিটি রশ্মি-স্রোত সেকেন্ডে প্রায় ২৫ কোটি Flerovium-পার্টিকেল নির্গত করে। মলিকিউলার-ওয়েট সামান্য বেশী হওয়ায়, Moscovium-এর ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটা একটু কম। এই 'head-on' কলিশনটিই এক দ্বিতীয় শক্তির উৎস। একে আমি বলি 'the speed-force'. এই স্পিড-ফোর্সের ওয়েভলেন্থ খুবই কম। ০.৫ ন্যানোমিটার। অর্থাৎ, ভেদন-ক্ষমতা মারাত্মক। একটিমাত্র পদার্থ ছাড়া সমস্ত কিছুকেই ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।"
- Adamantium কি? (ফেলুদার চোখে বুদ্ধিদীপ্ত ইঙ্গিত)
- ইয়েস, ডিটেকটিভ। Adamantium, non-destructive towards almost every weaponized energies.
- কিন্তু, ওই ধাতুর এক্সট্রাকশান হয়েছে তো একটি উল্কাপিণ্ড থেকে? যেটা কিনা কালাহারি মরুভূমিতে পাওয়া গেছিল!
- একটি উল্কাপিণ্ড নয়, প্রদোষবাবু। (প্রোফেসরের ঠোঁটের কোনে হাসির আভাস) দু' টি। অপর উল্কাপিণ্ডটি পড়ে ঠিক প্রথমটা পড়ার চল্লিশ বছর পর - ১৯৭১ সালে। আর, কোথায় পড়েছিল জানেন?
- আন্দাজ করতে পারি। আপনার বাগানের ঐ গোলঞ্চ গাছটার পিছনে কি?
- অসাধারণ পর্যবেক্ষণ এবং অব্যর্থ অনুমান মশাই আপনার!
- অর্থাৎ, আপনার ওই পিস্তলটি Adamantium-এর?
- আপনার এই অনুমানও নির্ভুল। কিন্তু আমার মন বলছে, আপনি এখনও সন্তুষ্ট নন। আপনি হয়তো ভাবছেন, যে রশ্মির ওয়েভলেন্থ মাত্র ০.৫ ন্যানোমিটার, তা কিভাবে একটা আস্ত ট্যুরিস্ট-বাসকে ভ্যানিশ করতে পারে, তাই তো?
- একদম। (ফেলুদা আঙুল মটকাচ্ছে)
- আগে আপনার অনুমানটি শুনি। (প্রোফেসরের চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি)
- যতদূর আন্দাজ করতে পারছি, ওয়েভলেন্থ এক্সপ্যান্ড করার জন্য আপনি নিশ্চই কোনো হালকা মৌলের সহায়তা নিয়েছেন - তেজস্ক্রিয় তো বটেই। এবং, এটাই আপনার অক্সিলিয়ারি-মেকানিজম।
- I am impressed, detective! হ্যালোজেন-পরিবারের তেজস্ক্রিয় মৌল Astatine. যে পজিট্রন নিঃসরণ করে। এই পজিট্রনের উপস্থিতিই ওই ওয়েভলেন্থকে এক্সপ্যান্ড করার জন্য দায়ী।
- খুব ইন্টারেসটিং। এবার আপনার ল্যাবরেটরিটা দেখব। তারপর ইনভেনশনের কাগজপত্র যেখানে থাকে, সেই জায়গাটা।
- চলুন। একতলাতেই আমার ল্যাব। আসুন -
আরামকেদারা ছেড়ে ওঠা মাত্রই, কোথাথেকে যেন নিউটন তার মনিবের পায়ের কাছে এসে পাজামায় গলা ঘষতে লাগলো।
- ও-মা! কি কিউট! (অয়ন্তিকা টপ্ করে নিউটন কে কোলে তুলে নিয়েছে)
- হাঃ হাঃ! ও আমার সর্বক্ষনের সঙ্গী।
বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে একটা করিডোর পেরনোর পর, একটা বড়ো জানলাকে বাঁদিকে রেখে, ডানদিকের একটি ঘরের দরজার সামনে এগিয়ে গেলেন প্রোফেসর। কিছুটা সামনে ঝুঁকে - দরজার ঠিক যেখানে হাতলটা থাকে, সেই জায়গাটার দিকে প্রোফেসর তাঁর ডান-চোখটা রেখে দশ সেকেন্ড মতো তাকিয়ে থাকলেন। আর, তারপরই দরজাটা আপনা-আপনি খুলে গেল। ফেলুদা খুব বেশি অবাক না হলেও, তোপসে আর অয়ন্তিকা তো রীতিমতো হাঁ! প্রোফেসর ওদের দু'জনার বিস্ময় আন্দাজ করতে পেরেই বললেন, "এই যে আমার চশমাটি দেখছেন, এর এই ডানদিকের লেন্সটাতে একটা 'cybernetic-coating' আছে। আর, বাঁদিকের লেন্সে আছে সিলিকনাইজ্ড মাইক্রো-কম্প্যুটর। ডানদিকের লেন্সটা একটি স্ক্যানার হিসেবে কাজ করে। এই দরজার লকিং সিস্টেমটা আমারই আবিষ্কার কিছু কোডসের উপর বেসড। চশমাটার নাম রেখেছি 'দ্য স্মার্ট-আইজ'। দেখতে অন্য দু'টি সাধারণ চশমার মতোই। গুগলের যে স্মার্ট-গ্লাস আছে, তার মেকানিজমটার অনেকটাই আমার চশমাটার সাথে মেলে - কিন্তু, আমার চশমার মেকানিজম ততোটা জটিল নয়।"
ল্যাবরেটরিটা ছোটখাটো হলেও, সাধারণ কেমিকাল ইনস্ট্রুমেন্টস ছাড়াও বিচিত্র সব যন্ত্রপাতিতে ভরা। প্রোফেসর তাঁর কিছু বিশেষ-বিশেষ আবিষ্কার সম্পর্কে সংক্ষেপে বক্তৃতা দিলেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - ওমনিস্কোপ, বটিকা-ইন্ডিকা, এয়ারকন্ডিশনিং পিল, লিঙ্গুয়াগ্রাফ, লুমিনিম্যাক্স, রিমেম্ব্রেন, মিরাকিউরল বড়ি, ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন-শঙ্কু ফরমুলা, কম্পু, কার্বোথিনের গেঞ্জি.. আরও কত কি! এবং, সর্বোপরি, তাঁর 'নিশ্চিহ্নাস্ত্র'। প্রোফেসর বলে চললেন, "এই হচ্ছে সেই ব্রহ্মাস্ত্র। আপনারা যন্ত্রটিকে হাতে নিলেই বুঝতে পারবেন যে যন্ত্রটা অসম্ভব রকমের ঠান্ডা। Adamantium-এর সাধারণ তাপমাত্রা মাত্র ১১° সেন্টিগ্রেড। আর, এই 'speed-force' অ্যাক্টিভেট হওয়ার জন্য নূন্যতম তাপমাত্রা প্রয়োজন ২৩° সেন্টিগ্রেড। তাই, ট্রিগার দিলে কম করে হলেও এই রেডিয়েশন কার্যকরী হয় উৎক্ষেপন স্থান থেকে নিদেনপক্ষে দু' ফুট তফাতে; গরমকালে তাপমাত্রা বেশী থাকার কারণে, এই দূরত্ব তিন ফুটেরও বেশী হতে পারে! রেডিয়েশনটি প্রথমে কিছুটা সরলরৈখিক ভাবে চলার পরে, একসময় তা গোলাকৃতি তরঙ্গমুখের আকারে ছড়িয়ে যায়। যার রেডিয়াস কম করে এক ফুট। অর্থাৎ, আপনি যদি ট্রিগার করেন, তো আপনি সুরক্ষিত, যেহেতু আপনার থেকে কমপক্ষে দু' ফুট দূরে 'speed-force' টি অ্যাক্টিভেট হচ্ছে। এক্ষেত্রে অ্যাক্টিভেশন রেডিয়াসটা ইচ্ছে মতো কন্ট্রোল করা যায়।"
শুধু ফেলুদা কেন? সব্বাই স্পিচলেস। কি ভীষণ ইন্টারেস্টিং মেকানিজম!
এরপর প্রোফেসর, ফেলুদা, তোপসে ও অয়ন্তিকাকে দোতলায় নিয়ে এলেন। একটি করিডোর পেড়িয়ে এসে সামনের একটা ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন প্রোফেসর। আগের মতোই প্রোফেসর তাঁর 'স্মার্ট-আইজ' ব্যাবহার করে দরজা খুললেন।
প্রোফেসর ঘরে ঢোকার পর, প্রথমে অয়ন্তিকা প্রবেশ করতে যাচ্ছিল। কিন্তু, 'welcome professor' শোনার পর ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়েই 'বাবাগো!' বলে নিউটনকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বেড়িয়ে সে দশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়ালো! তোপসে অপ্রস্তুত।
- (প্রোফেসরের অট্টহাসিটা ছিল দ্যাখবার মতো) ভয় পাবার কিছু নেই। ও হচ্ছে রোবু। আমার তৈরী রোবট। কিন্তু, ধন্দে পড়ে গিয়েছি, প্রদোষবাবু। পৃথিবীর এমন কোনো প্রযুক্তি নেই - অন্তত, না থাকারই কথা - যার সাহায্যে কেউ রোবুর চোখে ধূলো দিতে পারে। পাঁচ বছর আগে আমি রোবুকে লাস্ট আপগ্রেড করেছি, অনেক নতুন ফাংশনাল ফিচারসও ইনকর্পোরেট করেছি। ওর বডিটাকে Adamantium-দিয়ে কভার করেছি। He is almost invulnerable.
- আচ্ছা, এমন কি হতে পারে না যে, চোর আপনারই এক ভার্চুয়াল ইমেজ তৈরী করে তা নিজের ফেসের সাথে অ্যাডজাস্ট করে এসেছিলো? (এবার অয়ন্তিকা এগিয়ে এসে প্রশ্নটা করে প্রোফেসরকে)
- (প্রোফেসরের ঠোঁটের কোনে হাসির আভাস) আপনি বেশ বুদ্ধিমতী। (তোপসে আড়চোখে দেখলো, অয়ন্তিকা ব্লাশ করছে) আমি লাস্ট আপগ্রেডে এই অ্যানড্রয়েডের 'ব্রেন'-এ একটি 'heat-signature' মাপক যন্ত্র ফিট করি। সেন্সরটা ঠিক ওর বুকের মাঝখানে। এই 'heat-signature'-এর ব্যাপারটি অনেকটি ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতো কাজ করে। আমাদের প্রত্যেকেরই আলাদা-আলাদা ফিঙ্গারপ্রিন্টের মতোই আলাদা-আলাদা heat-signature বর্তমান। এমনকি, যেকোন জড়বস্তুর অবস্থান, আকার-আকৃতি চেঞ্জ হলে তাদেরও heat-signature কিছুমাত্রায় চেঞ্জ হয়! তাই, কেউ আমার ভার্চুয়াল ইমেজ ক্রিয়েট করলেও সে রোবুর কাছে ব্যর্থ হবে।"
এরপর একে একে সবাই ঘরে প্রবেশ করল। এবারে রোবুর 'হ্যালো এভরিবাডি' -সম্বোধনের উত্তরে অয়ন্তিকা একটা লম্বা 'হাইইইইই...ই' করেছে! ঘরটা খুব বেশি বড়ো নয়। একটিও জানালা নেই ঘরটাতে। ফেলুদা, তোপসের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো, "ব্যাপারটা বুঝলি? দরজা খোলার সাথে সাথেই আমরা দেখলাম কিন্তু ঘরে ফ্লুরোসেন্ট-LED জ্বলছে। মানে, দরজাটার সাথে লাইটটা লিংক্ড!"
এবার প্রোফেসর একটা লকারের দিকে ইঙ্গিত করে বলতে শুরু করেন, "এখানেই আমার যাবতীয় ইনভেনশনের কাগজ-পত্র, আমার ডেমনস্ট্রেশন্সের স্পীচ, ইলেকট্রনিকাল-ডেটাস.. ইত্যাদি থাকে। আমি গত শুক্রবার, অর্থাৎ, আওরঙ্গাবাদের দুর্ঘটনাটা ঘটার দু'দিন আগে, কিছুটা নস্টালজিক হয়েই আমার অ্যানাইহিলিন-পিস্তলের পেপারটা দেখতে আসি। পেপারটা হাতে নেওয়ার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই রোবু ছুটে আসে! কিছুক্ষন আমার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে ও বলে, ''According to my sensor, the heat-signeture is changed''. আমি তো হতবাক! তারমানে কি কাগজগুলো জালি? জিজ্ঞেস করতেই ও আবার বলে, ''No. I can recognize most of the heat-signetures, that I am experiencing now. It is scanned by someone from outsides. The heat-signatures coming from the rest of your papers tell me that, they could be displaced from their actual positions, but am confident that, these papers are not scanned." সেই পাঁচ বছর আগে রোবুকে আপগ্রেড করার কিছুদিন পরে নিতান্তই খেয়াল বশত কাগজগুলি বের করে লকারটা ভালো করে পরিষ্কার করি। তখনই ও আমার সমস্ত কাগজপত্রের heat-signeture গুলো ওর 'ব্রেন'-এ স্টোর করে নেয়।"
- অর্থাৎ, এই কুকর্মটি রিসেন্টলিও হতে পারে, আবার পাঁচ বছর আগেও হতে পারে তো! (তোপসে বিস্মিত)
- এক্সাক্টলি। এটাও আমি ভেবে দেখেছি। এই পাঁচবছরের মধ্যে যে কোনো দিন চোর এসে, অত্যন্ত উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যাবহার করে, আমার রোবু কে কিছু সময়ের জন্য নিষ্ক্রিয় করতে সক্ষম হয়। আর গত রবিবার সুযোগ আসাতে হয়তো -
প্রোফেসর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বেশ কিছুক্ষণ সবাই চুপ। একমাত্র রোবু নিজের মনের সুখে ওর পায়ের ওপর তাল ঠুকে যাচ্ছে, একটা টুলের ওপর বসে। অয়ন্তিকা অন্যমনস্ক ভাবে নিউটনের গায়ে হাত বুলোচ্ছে। তোপসে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। এতক্ষণ ফেলুদা কোনো কথা বলেনি, এবার সে প্রোফেসরকে জিজ্ঞেস করলো, "আপনার তো শত্রুর অভাব নেই। ইন ফ্যাক্ট, আমার মতে, মেকি বন্ধুরও অভাব নেই। এই পাঁচ বছরের মধ্যে আপনি কি গিরিডিতে আপনার এমন কোনো বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, যার সাথে আপনার মনোমালিন্য আছে?"
- (কিঞ্চিৎ ভেবে) আমার খুব কাছের বন্ধুরা প্রতিবছর অন্তত একটি বার আমার এখানে আসেন। আর, আমি গত বছর আমারই এক বন্ধুর আমন্ত্রণে ইনসব্রুকে যাই - দ্বিতীয় বার। একটা কনফারেন্স-এ অংশ নেওয়ার জন্য। প্রায় দু'সপ্তাহ আমি ইনসব্রুকে কাটিয়ে গিরিডি তে ফিরি। আমার অবর্তমানে বাড়ির সদস্য বলতে নিউটন, প্রহ্লাদ, রোবু, বিধুশেখর আর আমার অত্যন্ত বিশ্বাসী প্রতিবেশী বন্ধু অবিনাশবাবু।
- বিধুশেখর কে? (অয়ন্তিকা প্রশ্ন করল)
- আমার তৈরী আরেকটি অ্যানড্রয়েড। ও ও রোবুর মতো ইমোশনাল। তবে, একটু বেশিই ঘুমোয়। হাঃ হাঃ। এখন মনে হয় ছাদে উঠে সে 'বায়ু-সেবন' করছে!
একতলায় নামতে নামতে প্রোফেসর বললেন, "প্রদোষবাবু, দু' দশক আগে আপনি যেভাবে কৈলাস থেকে চুরি যাওয়া যক্ষীর মাথা উদ্ধার করেছিলেন, তা ভাবতেই আমার খুব গর্ব হয় - আপনি এই শতাব্দীর বাংলা তথা সারা ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ; আমি আপনাকে এই ঘটনাটি ইনভেস্টিগেট করার অনুরোধ করবো।"
- আমার তরফ থেকে চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবো না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আমরা কালই আওরাঙ্গাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেব। You will be updated.
- অসংখ্য ধন্যবাদ। তেমন দরকার পড়লে, আমিও আপনাদের সঙ্গে আসতে পারি -
- বেশ। আমি আপনাকে হোয়াট্সঅ্যাপ মারফত অবশ্যই ইনফর্ম করে দেবো।
- তপেশ (অয়ন্তিকা, তোপসের দিকে তাকিয়ে), প্রোফেসরকে দেখে কিন্তু বোঝাই যায় না যে ওনার নব্বই বছর বয়স!
- হাঃ হাঃ। (প্রোফেসর তাঁর ভ্রু-জোড়া নাচালেন দু'বার!) এই রহস্যের উত্তর কিন্তু ফেলুবাবু বলতে পারবেন।
- পারি বৈ কি! আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে আপনি তিব্বতে একশৃঙ্গ প্রাণীর খোঁজে অভিযান করেন। আপনি অভিযান সেরে দেশে ফেরেন পঁচিশ বছর কমিয়ে!
- এক্সাক্টলি-
- এও কি সম্ভব? (প্রোফেসরকে বাকি কথা বলতে না দিয়েই, অয়ন্তিকা)
- নিশ্চই। এরও পেছনে দারুণ ইন্টারেস্টিং ব্যাখ্যা আছে। অন্যদিন না হয় সে গল্প করা যাবে!
- একটা প্রশ্ন না করে পারছি না। আপনি এটা কি করে কনফিডেন্সের সাথে বললেন যে, আপনার বয়সের রহস্যটা আমি জানি?
- (প্রোফেসর মুচকি হাসছেন) মানিকবাবু আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার প্রতিটা অভিযানের ডায়েরি গুলি আমি ওঁনার কাছে রেখে আসতাম। কিন্তু আজ আর সেসবের অবসর নেই। (প্রোফেসর রুমাল বের ক'রে চোখ মুছলেন। পরক্ষণেই আবার হাসির ঝিলিক।) আর, মানিকবাবু তো আপনার গডফাদার।
এবার ফেলুদাও হতভম্ভ!

৩ (পার্ট-ওয়ান)
সন্ধেবেলায় প্রোফেসরের বৈঠকখানায় বসে 'ম্যাঙ্গোরেঞ্জ' আর ডালমুট-চানাচুর সহযোগে টেলিভিশনে মগ্ন সবাই। দ্য টাইমস প্রাইম। বাস দুর্ঘটনার পর বত্রিশ ঘন্টা কেটে গেছে। আওরঙ্গাবাদের স্থানীয় police-কমিশনার মিস্টার ঘোটে ('কৈলাসে কেলেঙ্কারি'-র সময়ে যিনি এখানকার সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন)-র কথায়, "...and, we are investigating the situation. The actual reason behind this tragedy is completely unknown to us, for now. In fact, we are confused, we do not know from where to start. Hopefully, we'll get some clues, soon. We are trying hard to reveal the mystery behind the accident, as soon as possible. And, you know that, nothing is impossible!"
এই মুহূর্তে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবর, এবার সেটা নিয়ে বলা যাক। মুম্বই এয়ারপোর্ট থেকে আওরঙ্গাবাদ গামী 'দ্য বিউটিজ অব হিন্দুস্তান'-এর ট্যুরিস্ট-বাসে থাকা প্যাসেঞ্জারদের তালিকা প্রকাশ্যে এসেছে। সাতাত্তর জন ভারতীয়-অভারতীয় সমস্ত যাত্রীদের (ড্রাইভার সমেত) নাম জানা না গেলেও, ইতিমধ্যে ঊনসত্তর জনের সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
- মাই গুডনেস! (প্রোফেসর রীতিমতো উত্তেজিত) এনরিকো পেত্রি, ফ্রম মিলান? টমাস গ্রোপিয়াস, ফ্রম ইন্সব্রুক? এরাও যে ভিকটিমস দের মধ্যে পড়বে, তা তো আমার কল্পনাতীত, প্রদোষবাবু! আর এরা যদি ভারতে আসার পরিকল্পনা করেও থাকে, তো আমাকে ইনফর্ম করতো অবশ্যই। কিন্তু - আমি তো ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছি না মশাই!
- আপনার জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কী এমন ঘটনা আছে, যার সাথে এঁরা জড়িত?
- উম.. দু'টি। আপনাকে আগে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই।
- নিশ্চয়ই।
- প্রায় দু' দশক আগে, ন্যাশনাল-ইন্টারন্যাশনাল মিলিয়ে, প্রায় শতাধিক পত্রিকা একটি খবর নিয়ে তুমুল ঝড় তুলেছিল। ইন ফ্যাক্ট, খবরটি ঐ বছরের 'দ্য টাইমসঃ নিউজেস অব দ্য ডিকেড' -এর লিস্টে তিন নম্বরে ছিল। আপনি মনে করতে পারেন নিউজটা?
- (কিছু ভেবে, ফেলুদা) যতদূর মনে পড়ছে, আপনার 'ড্যামি'-র বক্তৃতা। আর.. সম্ভবত, ইনসব্রুকে। আর.. মূল অপরাধীর নামটা.. গ্রোপিয়াস? (ফেলুদা নিজেই চমকে উঠেছে!)
প্রোফেসর বলতে শুরু করলেন, "ইয়েস, ডিটেকটিভ! আপনার মেমারির যত প্রশংসাই করি না কেন, কম বলা হবে। কার্ল গ্রোপিয়াস। তারই বানানো আমার অবয়বের ড্যামি, বিশ বছর আগে ইন্সব্রুকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি সম্পর্কে যে ধরনের বক্তৃতা পেশ করেছিল, আজ ভাবলেই আমার গায়ে কাঁটা দেয়, ফেলুবাবু। তো, আমাকে ইন্সব্রুকে যেতেই হয় এবং, সেই মুহূর্তে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী, আমি গ্রোপিয়াসের বাড়িতেই উঠি। একদিন হঠাৎ আমার বন্ধু সামারভিলের কাছ থেকে গ্রোপিয়াসের ব্যর্থতার কথা জানতে পারি। আমার অধিকাংশ ইনভেনশনের আইডিয়া নাকি গ্রোপিয়াসের মাথাতেই সর্বপ্রথম উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু, গ্রোপিয়াসের এক প্রবন্ধানুযায়ী, ওঁর চিন্তাধারাগুলি ফলপ্রসূ করবার আগেই নাকি আমি সমস্ত কিছুর পেটেন্ট নিয়ে রেখেছি! তো, ফেলুবাবু, আপনি বুঝতেই পারছেন, এটা একটা রিভেঞ্জ স্টোরি। গ্রোপিয়াস তাই আমাকে বিশ্বের বিজ্ঞান-মহলের কাছে অপদস্থ, পাগল প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে এক তুখোড় মাস্টারপিস ছাড়ে - আমার দোসর। সামারভিল না থাকলে হয়তো আজ আমি মাটিতেই মিশে যেতাম।
"কার্ল গ্রোপিয়াস আজ থেকে সাত বছর আগে মারা যান। ব্রেন টিউমর হয়েছিল, শেষ রক্ষা করা যায়নি। এই টমাস গ্রোপিয়াস ছিলেন কার্লের নিজের ভাইপো। গতবছর অক্টোবরে দ্বিতীয়বারের জন্য ইন্সব্রুকে যাই, ওঁর সাথে আলাপ হয়। কেমব্রিজ থেকে পোস্ট-ডক করে, 'রয়্যাল সোসাইটি', 'নেচার' আর 'কসমস'-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। আজকে ওর বয়স হতো.. তাও পঞ্চান্ন। তবে, কাকার মতো উগ্র মানসিকতা ছিল না তাঁর।
"এনরিকোর সাথে আলাপ বছর পনেরো আগে। ইতালির মিলান শহরের পদার্থবিজ্ঞানী প্রোফেসর লুইজি রন্ডির অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল সে। তবে-"
প্রোফেসর থামলেন। রুমাল বের করে চোখ মুছলেন প্রোফেসর। তারপর, টেবিলে রাখা গ্লাসের জলে চুমুক দিলেন।
- (ফেলুদা) আচ্ছা, এই প্রোফেসর লুইজি রন্ডিই কি সিরিয়াল-কিলারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন? সে সময়ে যে সমস্ত বৈজ্ঞানিকগণ টাইম-মেশিন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে.. নাম যতদূর মনে পড়ছে.. ক্লাইবার। তা -
- (জলের গ্লাস শেষ করে, প্রোফেসর) ঠিক। ক্লাইবারকে লুইজিই হত্যা করে। তবে, আমাকে লুইজির কবল থেকে বাঁচানোর বিশেষ ভূমিকা নেয় আমার এক জার্মান বন্ধু, ক্রোল এবং এই এনরিকো। তবে, এনরিকোর শেষ জীবন সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই।
- (অয়ন্তিকা রীতিমতো এক্সাইটেড হয়ে) প্রোফেসর! আমাকে একটি মিনিট দিন, আমি ওঁর সম্পর্কে পর্যাপ্ত পরিমাণের তথ্য গুগল থেকে বের করছি।
এক মিনিট কেন, ত্রিশ সেকেন্ডেরও কম সময় লাগলো অয়ন্তিকার। এনরিকো গত পাঁচ বছর ধরে 'কসমস' পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিল, নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতো। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় এই যে, Adamantium -ধাতুটি সম্পর্কে সে গত তিন-চার বছর ধরে গবেষণা করছিল। এই খবরটা প্রোফেসরের কাছেও অজ্ঞাত।
- (তোপসে এবার উদ্বিগ্ন হয়ে) আচ্ছা ফেলুদা, এনরিকোর এই Adamantium -নিয়ে রিসার্চ আর প্রোফেসরের ফর্মুলা চুরির ব্যপারটা কি লিংকড হতে পারে না? হয়তো পাঁচ বছর আগে এনরিকোই ফর্মুলা হস্তগত করে নতুন ভাবে প্রোফেসরের নিশ্চিহ্নাস্ত্রের দোসর তৈরী করতে সফল হয়।
- (তোপসে, প্রোফেসরের পাশেই বসে ছিল। প্রোফেসর তোপসের পিঠে চাপড় মারেন।) ব্রিলিয়ান্ট, তপেশরঞ্জন! ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু, যে কিনা একবার আমাকে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল, সে এমন বিশ্বাসঘাতকতা করবেই বা কেন?
- (এবার ফেলুদা মুখ খুললো) আর, সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট প্রশ্ন গুলো হল - টমাস গ্রোপিয়াস কি এনরিকোর সঙ্গে কোনও ভাবে যুক্ত ছিলেন? যুক্ত থাকলেও কি 'কসমস' পত্রিকায় লেখালিখি মারফত? আর তা না হলেও, কেন, কিভাবে? মোটিভটাই বা কি? চুরি তো যা হওয়ার এই পাঁচ বছরের মধ্যেই হয়ে গেছে। আর, এই ঘটনার সাথে এনরিকো, গ্রোপিয়াস - এদের হাত আছেই - তা হলপ করে বলা যাচ্ছে না। তৃতীয় কোনো ব্যক্তি যে নেই, তা সম্পর্কে শিওর হওয়া যাচ্ছে কি? ওয়েপনটাকি বাসের মধ্যেই ব্যবহার করেছিলেন কেউ? নাকি, বাসের বাইরে থেকে বাসটাকে নিশানা বানানো হয়? এতো সব প্রশ্ন নিয়েই কাল আমরা আওরঙ্গাবাদ রওনা দেব। পুলিশ-কমিশনার মি. ঘোটে আমার বন্ধুস্থানীয়।
'শ্যাঙ্কোপ্লেন'-টা মাত্র হাত পাঁচেক লম্বা। কিন্তু, তাতেই অনায়াসে পাঁচজনে (প্লেন-চালক সমেত) বসা যায়। কাল রাতেই, প্রোফেসর একটা ছোট-খাটো ডেস্ক্রিপশন দিয়েছিলেন। "প্লেনটা প্রথমে বানাই অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি'-র ওপর বেস করে। যে ধাতু দিয়ে তৈরী করেছি, তার নাম দিয়েছিলাম 'শ্যাঙ্কোভাইট'। কিছুদিন আগেই এটাকে লাস্ট আপগ্রেড করি। এর আগে প্লেনটায় বসার জায়গা ছিল মাত্র দু' জনার ('স্বপ্নদ্বীপ'-গল্পে সত্যজিৎ বাবুর ইলাশট্রেশনানুযায়ী)। এখন তা বেড়ে পাঁচ। আর, বর্তমানে প্লেনটা লাইসেন্সড।"
অয়ন্তিকা এমন মুগ্ধ হয়ে শুনছিল যে, সে কখন নিজের ডানহাতের তর্জনীর নখটা অর্ধেক গ্রাস করেছে অজান্তেই - তা আর খেয়ালে নেই! পরে অবিশ্যি ফেলুদা ধমক দেওয়ায় চমক ভাঙে।
আজ প্রোফেসর নিজেই আমাদের সঙ্গ নিয়েছেন। শ্যাঙ্কোপ্লেনের চালকের ভূমিকায় স্বয়ং ফেলুদা! পাশে প্রোফেসর। কাল রাতেই ফেলুদা শ্যাঙ্কোপ্লেন চালানো সম্পর্কে সমস্ত কিছু তথ্য প্রোফেসরের কাছ থেকে জেনে নিয়েছে। এমনকি, আজ ভোরে ফেলুদা, প্রোফেসর আর অবিনাশ বাবুকে নিয়ে আকাশ-ভ্রমণও নাকি করে এসেছে! তপেশ আর অয়ন্তিকা তখন ঘুমিয়ে। ফেলুদার মতে, "Shanko-plane is one of the easiest vehicles to drive."
হরিপদ বাবু আজ সকালেই ফেলুদার মার্সিডিজ নিয়ে ফিরে গেছেন - ওর ছেলেকে কলেজে ভর্তি করার জন্য এই কদিন ব্যস্ত থাকবে।
সকাল সাড়ে দশটার মধ্যে সবাই ম্যাকেঞ্জি-ফ্রুটের রসে ভরপুর লিকার আর বেশ কয়েকটা ম্যাঙ্গোরেঞ্জ খেয়ে শ্যাঙ্কোপ্লেনে বসল। সবার আগে মি. ঘোটের সাথে দেখা করার ইচ্ছে ফেলুদার - তারপর, ক্রাইম-সিনের স্পট।
- ক্রমশ।



No comments:

Post a Comment