ঘড়ির কাঁটা ছ'টার ঘরে প্রবেশ করতেই ফেলুদা আর একবার তাড়া দিয়ে বলল 'তোপসে রেডি হয়ে নে শিগগির, লালমোহনবাবু এলেন বলে!' ফেলুদা জানিনা কিভাবে কোথাও বেরোনোর তাড়াহুড়ো থাকলে দু মিনিটেই রেডি হয়ে যায়। আমার কিন্তু খানিক সময় লেগেই যায়।
বললাম 'আজ একটা বিশেষ দিন, এতসব বিখ্যাত লোকজন আসবে, একটু ভাল করে না ড্রেস করলে হয়!' আমার কথা শেষ হতে না হতেই বাইরের খোলা দরজাটা দিয়ে বৈঠকখানায় ঢুকেই লালমোহনবাবু বলে উঠলেন 'ঠিক বলেছ ভায়া। আজ যে আমার পরম সৌভাগ্যের দিন। এতজন বিশিষ্ট মানুষের সান্নিধ্য পাব, আমার তো ভেবেই থ্রিলিং লাগছে! তাইতো আলমারি খুলে আজ আমার পিতৃদেবের বিবাহের পাঞ্জাবিটা নামিয়ে পড়লুম। কেমন লাগছে ভাইইই?'
ফেলুদাই বলে উঠল 'বেড়ে লাগছে। মাঞ্জাটা ভালই দিয়েছেন। তা পারফিউমটা কি বিদেশি?' লালমোহন বাবু বললেন 'ইয়েস স্যার! আমার পাড়ায় থাকে ন্যাপলা, সেই জার্মানি থেকে এনে দিয়েচে। আমার হাতে দিয়ে বললে স্বয়ং হিটলার এটি মাখতেন। তোমার জন্য নিয়ে এয়েচি কাকা। আজ সিল ভাঙলুম প্যাকেটটার। আসলে ঐসব মানুষজনের সামনে একটু পার্সোনালিটি ডেভলপমেন্ট দরকার কিনা!, হেঁ হেঁ হেঁ।' ফেলুদা বলল 'পার্সোনালিটি ডেভলপ্ড হয় না লালমোহনবাবু , ওটা নিজে থেকেই আসে। আর আপনি আজ অন্ততঃ ঐ ভুলভাল ইংরেজী বলে পার্সোনালিটি আনার চেষ্টা করবেন না।'
"যথা আজ্ঞা স্যার' বলেই লালমোহনবাবু পাঞ্জাবির হাতাটা তুলে জাপানি হাতঘড়িটা দেখলেন। বললেন 'উই হ্যাভ ফর্টি ফাইভ মিনিটস্ ইন আওয়ার হ্যান্ড। পার্টি তো সন্ধে সাতটায়। যাওয়ার পথে একটা ফুলের তোড়া নেব ভাবছিলুম মশাই। আর সাথে নকুড়ের সন্দেশ।'
জটায়ুর মাদ্রাজী সবুজ এম্বাসডারটা চৌরঙ্গী রোডে পড়তেই হরিপদবাবু বললেন 'প্রায় পৌঁছে গেছি স্যার'। 1/1, বিশপ লেফ্রয় রোড, বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়েই লালমোহনবাবু বললেন 'গায়ে কাঁটা দিচ্চে মশাই। ওরকম একটা মানুষের সাক্ষাৎ কিছুক্ষণের মধ্যেই পাব। উফ্! সত্যজিৎ রায় বলে কথা!।'
আমারও বেশ উত্তেজনা হচ্ছিল এত বড় একজন মানুষের বাড়িতে এসে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের "লিজিয়ঁ দা অনর" সম্মান পাওয়ার সুবাদেই আজ এই পার্টির আয়োজন করেছেন স্বয়ং মানিকবাবু। আর তার উদ্যোক্তা তাঁর পত্নী বিজয়া রায়। ফেলুদার সাথে আলাপ থাকলেও আমি বা লালমোহনবাবু কেউই মানিকবাবুর সাথে পরিচিত নই। তাই বোধহয় আমরা একটু নার্ভাস ছিলাম।
আমন্ত্রিতদের তালিকায় সিনেমাজগতের কিছু বিশিষ্ট মানুষের পাশাপাশি আমাদের সিধু জ্যাঠা ও তারিণীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে তারিণীখুড়োও ছিলেন। গিরিডি থেকে প্রফেসর শঙ্কুও এসছেন দেখলাম। আর সৌমিত্রবাবু তো প্রধান অতিথি হিসেবে রয়েছেনই।
কিছুক্ষণ পর মানিকবাবু এসে ফেলুদার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন 'বেশ কাজ করছ হে তুমি আজকাল। খবরটবর আমি পাই তোমার ঐ সিধুজ্যাঠার থেকে। এগিয়ে যাও। বাঙালীর মুখ উজ্জ্বল কর।' ফেলুদা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বলল 'সবই আপনার থেকেই শেখা। আপনি না থাকলে আমরা আর কোথায়!'
লালমোহনবাবুর উদ্দেশ্যে বললেন 'জটায়ুর ইদানীং লেখার কাজ কেমন চলছে? বোর্নিওর বিভীষিকার পর আর কিছু লিখলে নাকি হে?' ভদ্রলোক হাসিমুখে উত্তর দিলেন ' ইয়েস স্যার লিখেছি। আরও দু'টো। "কারাকোরামে হারাকিরি" আর "ম্যানহাটানে ম্যানইটার"। দুটোই বেস্ট সেলার স্যার।' মানিকবাবু হেসে বললেন 'চালিয়ে যাও'।
সৌমিত্রবাবুর সাথেও আমাদের আলাপ হল। অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রলোক। ফেলুদাকে দেখে বললেন 'অল্প বয়সে আমার ঠিক তোমার চেহারা ছিল। মুখেরও অদ্ভূত মিল।' তাঁর ফিল্মি কেরিয়ারের নানা গল্পও শোনালেন। নতুন এই ফরাসি পুরস্কার পেয়ে তাঁর অনুভূতির কথা তুলে ধরলেন সকলের সামনে।
একে একে তারিণীখুড়ো থেকে শুরু করে প্রফেসর শঙ্কু এবং উপস্থিত সকলের সাথেই আলাপ পরিচয় হল।
তাল কাটল অন্য একটি ঘটনায়। আটটা নাগাদ সাদা ধুতি, জওহর কোট পরা এক ভদ্রলোক ঘরে ঢুকতেই। তাকে দেখেই সর্বসমক্ষে ভিরমি খেলেন লালমোহনবাবু। ঐ ভদ্রলোক আর কেউ নন, আমাদের বহুপরিচিত মগনলাল মেঘরাজ। তাকে দেখে আমিও বেশ চমকে উঠেছিলাম। পরে শুনলাম আমন্ত্রিতদের তালিকায় ইনিও আছেন।
জটায়ুর জ্ঞান ফিরলে মগনলাল বললেন ' কি আঙ্কল্! হামাকে দেখেই আনকন্সাস হয়ে গেলেন? হামি এখন ট্রু বিজনেসম্যান, নো গলত্ ধান্দা। রিয়েল এস্টেট। প্রপার হোয়াইট কলার ব্যবসা। কোন ভয় নাই আপনার।'
লালমোহনবাবু বললেন ' ইয়ে মানে দুপুরে রোদে একটু ঘোরাঘুরি করেচি তো, তাই মাথাটা ঘুরে গেল আরকি!'
ফেলুদার সঙ্গে মগনলালের কথাবার্তায় দেখলাম উভয়পক্ষেরই কিছু তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত বাক্য বিনিময়।
রাতে ডিনার টাইমে অপুর সংসার আর সোনার কেল্লা এই দুটো ছবির কিছু অদেখা ক্লিপিংস দেখানোর আয়োজন করা হয়েছিল। তা বেশ ইন্টারেস্টিং আর মজাদার ছিল। রাত ন'টা নাগাদ সৌমিত্রবাবুরই একটা থ্যাঙ্কফুল স্পিচ দিয়ে পার্টি শেষ হল।
আমি আর ফেলুদা ট্যাক্সি ধরে ফিরেছিলাম। কারণ লালমোহনবাবু ওখান থেকেই তার গড়পারের বাড়ীতে ফিরেছিলেন। আর যাওয়ার সময় বলে গেলেন কাল বিকেলে আসবেন আমাদের বাড়ীতে আড্ডা দিতে। বললেন 'আজকের হ্যাংওভারটা কাটাতে একটু সময় লাগবে মশাই।'
সকালে ফেলুদার ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙল। দেখি সাড়ে সাতটা বাজে। কেন এত দেরি হল ঘুম ভাঙতে? তবে কি কাল রাতে কোল্ড ড্রিংকে মগনলাল কিছু মিশিয়ে টিশিয়ে দিয়েছিল নাকি! ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করতেই মাথায় গাট্টা মেরে বলল 'আজকাল গাঁজা টাজা টেনে ঘুমাচ্ছিস নাকি রে বোকচোন্দর?? ভোরবেলা থেকেই দেখছি ঘুমের মধ্যে কিসব বিড়বিড় করে চলেছিস।'
গাট্টাটা খেয়ে তন্দ্রাভাবটা কাটতে মনে পড়ল আমার তো দু'দিন আগে পা মচকেছে। আমি তো গত পরশু ও কাল বিছানাতেই শোয়া। তবে কি আমি......................অ্যাঁ!!!!
(তোপসের কলমে)
...শান্তপ্রিয়
No comments:
Post a Comment