১
জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপুর। ডাবের জলে চুমুক দিয়ে তোপসে আড়চোখে একবার ফেলুদাকে দেখে নিল। ঘুমোচ্ছে! মুখের ওপর স্টেটসম্যান। পড়তে পড়তে কখন যে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে, তা তোপসেও ভালো করে জানেনা। ওয়েল, ওয়েল! এই সুযোগ। ঢক করে তোপসে বাকি ডাবজল টুকু মেরে দিয়ে, যেই না ফেলুদার ফতুয়ার বুকপকেটে হাত গুঁজতে যাবে- অমনি!
- আমার জানাশোনা ৪৭ জন নামজাদা পকেটমার আছে। তোকে তালিম দেওয়ার জন্য পাঁচুই যথেষ্ট।
- ইয়ে, না! কাল থেকে কতবার জানতে চাইলাম ওই ভদ্রমহিলা সম্পর্কে.. তা তুমি তো কিছুই -
- আমার নতুন ক্লায়েন্ট। এক বিচিত্র কেস নিয়ে এসেছেন।
- কিরকম, শুনি?
- উঁহুহ্। সময় মতো বলব। আমি একটু বেরোচ্ছি। ফিরতে রাত হবে। রবি কাকার দোকানে মাংস-রুটি বলে যাচ্ছি, আর- কেউ যদি ফোনে চায়, তো বলে দিবি কাল ফার্স্ট আওয়ারে আমি থাকবো।
এই বলেই চোখের নিমেষে ফেলুদা স্টাডিরুমে ঢুকলো। প্রায় দশ মিনিট পর এক্কেবারে মাঞ্জা দেওয়া বাবুটি হয়ে, কাঁধে ঝোলা ঝুলিয়ে বেরিয়ে গেল! তোপসে তো হাঁ। এ কি রে বাবা! আজকাল ফেলুদা যেন কেমন কেমন করে! ৫০-এর গোড়াতেই কি আর ভিমরতি ধরবে এ শর্মার? মনে তো হয় না।
বেশ কয়েকদিন ধরেই ফেলুদা একটা ছোট্ট নোটবুক (বেশ পুরনো) নিয়ে মেতেছে। সারাক্ষণ ওতেই বুঁদ হয়ে থাকাই যেন আজকালকার শিডিউল। সেই নোটবুক ফেলুদা সর্বক্ষণ নিজের গোচরে রাখে- সেটা যেন তার কাছে 'সাত রাজার ধন-মানিক'! প্রথম প্রথম তোপসে গা করেনি, কিন্তু এখন যেন বিষয়টাকে অগ্রাহ্য করলে চলছে না।
সোফাতে গা এলিয়ে ফেলুদার কথাই ভাবতে ভাবতে ঘুমটা আসছিল- আচমকাই তোপসের মোবাইল ভাইব্রেট করে উঠল। অয়ন্তিকা।
- হুম।
- সরি বাবু, নাচের ক্লাস থেকে বেরিয়েছিই একটায়! এই একটু আগে ফিরলাম।
- হুম। ওবেলা বেরোবে? হাপুস-হুপুস মেলাটা -
- আমার মনের কথাটা কেড়ে নিলে তো দেখছি। রোদটা পড়ুক। চারটে নাগাদ যদি বেড়োই?
- উঁহু। সাড়েতিনটে।
- ওকে। আই উইল কল ইউ।
তোপসে প্রেম করছে। তিন মাসের রিলেশন। লালমোহন বাবুর এক ভাইপোর বিয়েতে আলাপ অয়ন্তিকার সাথে, তার এক সপ্তাহের মধ্যেই দু'জন দু'জনের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! প্রথম প্রথম ফেলুদা কিছুই জানতো না। কিন্তু বেশিদিন ধামাচাপা দেওয়া যায়নি ব্যাপার খানা - তোপসের জামার কলারে ক্রিমসন লিপস্টিক-এর দাগটাই সব ভন্ডুল করে দিলে! তা, ফেলুদা রাগ করেনি, তবে অভিমান করেছিল বটে। সেই অভিমানের পর্বই কি চলছে? ফেলুদা আজকাল কেমন যেন চাপা-চাপা।
২
মিলন মেলা প্রাঙ্গণে বসেছে 'হাপুস-হুপুস' মেলা। বাপস্! কি না নেই? ইলিশ মাছের 'হর-গৌরী' থেকে শুরু করে চকোলেট-ফুচকা! অভিনব সব জিভে জল আনা খাবার। এখন তোপসে আর অয়ন্তিকার ঢেঁকুর-পর্ব চলছে। সন্ধে নেমেগেছে। বাড়ছে ফ্ল্যাশলাইট ঝিলিক। এরই মধ্যে তোপসের চোখ গিয়ে আটকেছে এক দম্পতির দিকে। ভদ্রমহিলাটি ডাকসাইটে সুন্দরী। আর ভদ্রলোকটিকে কোথায় যেন দেখা! প্রায় ছ' ফুটের কাছাকাছি হাইট। পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, গাল বেয়ে নেমে এসেছে মসৃণ একহাত লম্বা দাড়ি।
- বলি, অমন ফ্যালফ্যাল করে কি দেখছ? ওই ভদ্রমহিলা কিন্তু তোমার দিদির বয়সি!
- আরে, দ্যুত্! আমি ওই দাড়িওয়ালা টাকে দেখছি। কেমন যেন চেনা চেনা..
- দেখে তো মনে হয় প্রফেসর-টফেসর গোছের। আশ্চর্য! ওকি! কই চললে?
নিমেষের মধ্যে তোপসে হনহনিয়ে দাড়িওয়ালার কাছে এগিয়ে গিয়ে স্মার্টলি একটা আলতোভাবে ধাক্কা মেরে যেইনা ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে 'সরি' বলেছে, ওমনি ভদ্রলোকটির পিলে চমকে যাওয়ার জোগাড়! মুহূর্তে ভদ্রলোকটি বিষম-টিষম খেয়ে খেই হারালেন। তপেশরঞ্জন তখন যা বোঝার বুঝে গেছে।
- কি, পাগোল হয়ে গেলে নাকি? অমন করে ধাক্কা দিলে কেন ভদ্রলোকটিকে?
- পরে খোলসা ক'রে বলবো ম্যাডাম। একেই নিঃসন্দেহে বলে, 'সেয়ানে-সেয়ানে কোলাকুলি'।
- বুঝলাম না যদিও.. তবে, তুমি কিন্তু ওনাকে প্র্যাক্টিক্যালি গুঁতোলে!
ন'টা নাগাদ রবি কাকার দোকান থেকে খাবার নিয়ে বাড়ির বৈঠকখানার সোফায় গা এলিয়ে বসে তোপসে। সাড়ে ন'টা নাগাদ ফেলুদার আগমন। এবার এক্কেবারে ক্লিন শেভড্ মুখমণ্ডল - ঠিক যেমনটি হয়ে বাবুমশাই বেড়িয়েছিলেন।
- কিরে, খাসনি কেন এখনো?
- খিদে নেই তেমন। হাপুস-হুপুসে যা খেয়েছি!
- রাগ করেছিস? বুঝতে পারছি.. ছদ্মবেশ তো শুধু পাবলিসিটি এড়ানোর জন্য! আমি ব্যাপার খানা বলতুম কিছুদিন পরেই। ও হচ্ছে সুমিত্রা। আমার কলেজ লাইফের বান্ধবী।
ফেলুদা বলে কি! কলেজ লাইফের বান্ধবী? এই তেইশ বছরকার গোয়েন্দাগিরির জীবনে ফেলুদা একবারও ওনার সম্পর্কে কিছুই বললে না? ফেলুদা বলে চলল-
"সালটা ১৯৬৩। লক্ষ্নৌ-এ গেসলাম কলেজের হয়ে ক্রিকেট খেলতে। তার সঙ্গে পুরো শহরটাকে চষে ফেললাম। ওখানেই এক বাঙালি ফ্যামিলির সাথে আলাপ হয় - লছমনঝুলার প্রবাসী অ্যাডভোকেট অনিন্দ্য রায়চৌধুরি। সুমিত্রা অনিন্দ্যবাবুর একমাত্র মেয়ে, আলাপচারিতাতেই প্রেমে পড়ে গেলাম আমরা। বেশ চলছিল, কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাত! অনিন্দ্যবাবুর বাল্যবন্ধুর ছেলে আমেরিকা থেকে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট পাশ করে ফিরেছে - তার সঙ্গেই সুমিত্রার বিয়ে দেবেন অনিন্দ্যবাবু! সুমিত্রা তার বাবাকে শত চেষ্টাতেও বোঝাতে পারল না যে সে এই বিয়েতে রাজি নয়, সে আমার জীবনসঙ্গিনী হতে চায়। মনটা ভেঙ্গে গেল। নির্ধারিত শেষ ম্যাচটা খেলে সুমিত্রাকে কিছু না জানিয়েই ফিরে এলাম কলকাতা। কোন যোগাযোগ রাখিনি এতগুলো বছর।
"দু' মাস আগেকার কথা। ব্যোমকেশ দা'র কেয়াতলার বাড়ি থেকে আড্ডা মেরে বেরিয়ে হরির দোকান থেকে একটা চারমিনার নিয়ে সবে ধরাতে যাব - একি! এ যে সুমিত্রা!
- ওমন ভেবলু হয়ে কি দেখছ? চিনতে পারছো না?
- সুমিত্রা। তুমি এখানে?
- চলে এলাম। তোমাকে তো আমি বেশ ক'দিন থেকেই ফলো করছি! চেহারাটা তো অনেক ঝরঝরে করে ফেলেছ। সুগার-টুগার বাঁধিয়েছ নাকি?
- ওই মানে.. সেসব কথা ছারো। অনিন্দ্যবাবু -
- পাঁচ বছর হলো বাবা গত হয়েছেন। জানো, আমি বিয়েটা করিনি। (ফিক্ করে হেসে ফেলেছে সুমিত্রা!)
- ক- ক- কি- ব- ব- বলছো কি?
- তবে আর বলছি কি! বাপিকে সাফ-সাফ বলে দিয়েছিলাম যে ঘর যদি বাঁধতেই হয় তো বাঁধবো ওয়ান এন্ড ওনলি, ফেলু মিত্তিরের সাথে! বাই দ্য ওয়ে, '৬৭ তে তুমি আবার যখন লক্ষ্ণৌ এলে, বড়া ইমামবাড়াতে তোমাকে দেখেছিলাম। ডাকিনি। খুব রাগ হয়েছিল। একবারও খবর নেওয়ার প্রয়োজন মনে করনি (সুমিত্রা চোখ মুছল)। এটা দেখ। চিনতে পারো?
একটা সবুজ রঙের ছোট্ট পুরনো নোটবুক এগিয়ে দিল সুমিত্রা, ফেলুদার দিকে। দেখামাত্রই চিনেছে! ফেলুদা যখন ছোট ছিল, তার বাবা তাকে এটা দেন। কত-শতই না স্মৃতি জড়িয়ে আছে! নোটবুকটা একমুহূর্তের জন্যও কাছ-ছাড়া করত না ফেলুদা। কিন্তু-
- মনে আছে, সেবার ('৬৩-তে) যখন তোমাকে ভুলভুলাইয়াতে গাইড করলাম? বেরিয়ে এসে কি হয়েছিল?
- হ্যাঁ! মুশলধারে বৃষ্টি! আমি-
- তুমি তখন তোমার নোটবুকটা আমায় দিয়ে বললে ভ্যানিটি ব্যাগটায় রাখতে। কিন্তু নেওয়ার আর সুযোগ পেলে না।
- তোমার বিয়ের খবরটা-
- তা সেসব কথা থাক। আমি এটা ফেরত দেওয়ার জন্যই এসেছি। একমাস হয়েছে, দিদির বাড়িতে উঠেছি। তোমাকে দেবো-দেবো করেও তোমার সামনে আসতে পারছিলাম না- কিন্তু, আজ আর না এসে পারলাম না। বলি, কিসব ছাইপাঁশ খাও? ফের যদি সিগারেট খেতে দেখেছি তো-
- ম্যাডাম! আর হবেনা! এবারের মতোন এ শর্মাকে মাপ করে দিন! তা তুমি-
- এইত্তো, আমের মরশুম শেষ হলেই আবার পাততাড়ি গুটিয়ে লক্ষ্ণৌ। তা, বেশ তো জাঁকিয়ে গোয়েন্দাগিরি করছ!
- ওই, মানে-
- বিয়ে-টিয়ে করোনি কেন শুনি?
- এখানেই সব শুনবে? চলো, প্রিন্সেপ-ঘাটে বসে গল্প করব..
- চলো।
"সুমিত্রাকে কনভিন্স করতে পেরেছিলাম শেষমেষ। ও ও'র দিদির বাড়িতেই আছে। আমি ওকে একটা সময়ে ভুলতে চেয়েছিলাম। তখন তো সবে কেরিয়ারের শুরু। শুরু গোয়েন্দাগিরির-ও। এই কুড়িটা বছর ধরে তো খুব ভেবেছিস যে আমার জীবনটা রস-কষ হীন! আসলে, মানিক কাকা ব্যাপারটা আদ্যপান্তই জানতেন। উনিই আমাকে বলেছিলেন সুমিত্রাকে নিয়ে যেন প্রসঙ্গ না ওঠে! আর, তুই তো জানিসই। মানিক কাকা আর সিধুজ্যাঠা - এঁরা দু'জনেই আমার মেন্টর। তাই, আর- "
ফেলুদা থামল। তোপসের রাগ কমেছে। ফেলুদার দিকে তাকিয়ে মুচকি-মুচকি হাঁসছে।
- বেশ গুরুতর কেস তো, ফেলুদা!
- হুম। কেসটা বেশ গুরুতর রে, তোপসে!
© অম্বুজ
No comments:
Post a Comment