Tuesday, 27 June 2017

Belgiumer Aguntuk by Snehajit Lahiri

বেলজিয়ামের আগন্তুক

স্নেহজিৎ লাহিড়ী



...................................................................................................

।১।

-হ্যালো!আমরা এয়ারপোর্ট থেকে রওনা দেব কিছুক্ষণের মধ্যেই,আশা করি ঘন্টা দেড়েক এর মধ্যে আপনার বাড়ি পোঁছে যাব।

-(প্রতীক্ষা)

-হ্যাঁ ওনারা তিনজনেই ঠিকমতো এসেছেন,পৌঁছে কথা হচ্ছে তাহলে?

-(প্রতীক্ষা)

-ওকে বাই !

এই বলে নিজের বানানো সুপারস্মার্ট ফোনটা প্যান্টের পকেটে চালান করলেন প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু।জিনিসটার নাম রেখেছেন শ্যঙ্কোবেল।নিজের আর টেলিফোনের আবিষ্কর্তা গ্রাহাম বেলের নাম দিয়ে এই মোবাইলটির নাম রেখেছেন।গত বছর বার্লিনে এই অদ্ভুত ফিচার সমেত ফোনটি সায়েন্স কনফারেন্সে দেখানোর পর,অ্যাপেল ও অনান্য স্মার্টফোন বিক্রয়কারী সংস্থা গুলির পেটেন্ট নিতে একেবারে লঙ্কাকাণ্ড বাধিয়ে দিয়েছিল।অনান্য যন্ত্র গুলোর মত এটির ক্ষেত্রেও না বলে দিয়েছেন তিনি।তিনি যে প্রফেসর শঙ্কু,আবিষ্কারেই তার সুখ,অতিরিক্ত পয়সার লোভ কোনকালেই তার নেই।আর এ জিনিস বাইরে গেলে সাধারণ মানুষের আলসেমিটা আরও বাড়বে বই কমবে না।কাজেই সবাইকে প্রস্তাব নস্যাৎ করে দিয়েছেন প্রোফেসর।

এতক্ষন নিজের অত্যাধুনিক গাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন শঙ্কু।ভয়েস রেকগনিশন টেকনোলজির গাড়ি,একমাত্র তাঁর গলার ওপেন,ক্লোস,স্টার্ট ইত্যাদি কিছু কি-ওয়ার্ড দিয়েই গাড়িটিকে অ্যাক্টিভেট করা যায়।ওপেন বলে দরজা খুলে ড্রাইভিং সিটে বসলেন তিনি। পেছনে ঘুরে দেখলেন তিন অতিথি ততক্ষনে বেশ মানিয়ে গুছিয়ে নিয়েছেন।ভেতরে অনেকটা বড় জায়গা,যেটা বাইরে থেকে দেখে আঁচ করার উপায় নেই মোটেই।ইচ্ছে মত সিট গুলো ছোট বড় করা যায়,ইচ্ছে হলে একটা ক্যাম্প খাটের মত করে চার পাঁচ জন অনায়াসে ঘুমিয়ে নিতে পারে।

“Well gentlemen we need one and half hour to reach, you may sleep or you may enjoy the beauty of Kolkata”- বললেন শঙ্কু ।

“প্লিস শঙ্কুবাবু,বেঙ্গলিতে বলুন ।আমি ওদের দুজনকেই বাংলা শিখিয়েছি।আর আমি নাবিক,আমি অনেকদিন ধরে এ ভাষা জানি। টেগোর পড়েছি আর শুনেছি আমি ।” এই বলে ভদ্রলোক হেঁড়ে গলায় গাইতে লাগলেন “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি...”

-“আহ ক্যাপ্টেন বিরক্ত করো না তো।চুপ করে শুয়ে থাকো,আর এই যে প্রোফেসর,আপনিও বিশ্রাম করুন।কি যে পেন্ডুলাম দোলাচ্ছেন প্লেন থেকে,ভগবানই জানেন।শঙ্কুবাবু আপনি চলুন।”বছর আঠারোর এই ছেলেটির কথা অনেক শুনেছেন শঙ্কু।কিন্তু চাক্ষুষ এই প্রথম।এবং প্রথম দর্শনেই বুঝতে পারছেন এইটুকু বয়সের ছেলেটার সাহস ,মনের জোর,কথা বলার ভঙ্গী ক্যাপ্টেনকেও কেন দমিয়ে রাখে।

গাড়িটিকে অটোড্রাইভ মোডে দিয়ে ,অ্যাড্রেস স্পিকারে বললেন,-“21 রজনী সেন রোড ।”

।২।

“মশাই একটু আগে কে ফোন করেছিল?আপনি কাদের জন্য অপেক্ষা করছেন বলুন তো?”-আর থাকতে না পেরে বললেন স্বনামধন্য রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী।

-“সময় হলে দেখতে পাবেন।আপাতত বলুন তো সায়েন্স ফিকশন শুনলে কার কথা মনে হয় আপনার?”

-“ইয়ে,জুলে ভের্ন”-বেশ তাড়াতাড়ি উত্তর দিলেন জটায়ু।

-“ওটা জুলস ভার্ন লালমোহন বাবু।যাই হোক,আর সায়েন্টিস্ট শুনলে?”

-“জগদীশ বোস।”

“তাহলে ধরে নিন ওনারাই আসছেন গাছের স্পিকিং এবিলিটি নিয়ে চর্চা করতে!”

ফেলুদার খোঁচায় ব্যাজার মুখ করে চুপ করে গেলেন লালমোহনবাবু।

“কি তোপসে?কিছু আন্দাজ করলি?”

আমি উত্তর দিতে যাব ঠিক সেই সময় কলিং বেল টা বেজে উঠল।আমিই দরজাটা খুললাম,আর তার পরক্ষণেই যাদের দেখলাম,তাঁরা সবাই আমার স্বপ্নের হিরো।ওই নীল শার্ট একটা প্লাস ফোর নিকারবকারস প্যান্ট,সামনের চুলটা স্পাইক করা,অনেকটা তোলা।টিনটিন!! টিনটিন এসছে আমাদের বাড়ি,এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার।তারপরেই চোখ গেল পাইপ মুখে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মজার কিন্তু রাগী ভদ্রলোকের দিকে।ক্যাপ্টেন হ্যাডক!সেই কালো জ্যাকেট,নেভি ব্লু শার্ট,মাথায় নেভির টুপি,আমার দিকে তাকিয়ে পাইপ মুখেই একগাল হাসলেন ভদ্রলোক।আর তারপরেই দেখলাম সেই বেঁটে-খাটো চেহারার প্রফেসর ক্যালকুলাস কে।সবুজ ওভারকোট,মাথায় টুপি ,হাতে পেন্ডুলাম। এ যেন কমিকস বই এর পাতা থেকে আশ্চর্য মন্ত্র বলে চরিত্র গুলো প্রান পেয়ে আমাদের বাড়ি ঘুরতে এসছে।আর তার ঠিক পেছনেই,মাথার সামনে টাক পরা,অবিন্যস্ত লম্বা দাড়ি,চোখে গোল চশমা পরিহিত মানুষটি আর কেউ নন-প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু!

।৩।

আমার ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যাওয়ার মুহূর্তে ফেলুদা দরজায় চলে এসে হাত দুটো নমস্কারের ভঙ্গীতে বলল-“welcome to Kolkata gentlemen! I hope you have enjoyed the journey. Please come inside and make yourselves comfortable.”

নমস্কার,প্রতি নমস্কার আর পরিচয় পর্বের পালা শেষ করে সবাই বসলেন আমাদের ড্রয়িং রুমের সোফা আর চেয়ারে।

“ওনারা খুব ভালো বাংলা বলেন মিঃ মিত্তির।–বললেন প্রোফেসর শঙ্কু।

“হাইলি সাসপিশিয়াস!”-এত বিখ্যাত ব্যাক্তিকে একসাথে দেখে ব্যোমকে গ্যাছেন লালমোহনবাবু।

ক্যপ্টেন হ্যাডক কে আড় চোখে ভুরু কুচকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন-“আপনি কি বলে,ইয়ে ,মানে,সেইলার?”

-“আলবাত!সেই জন্যেই তো ৮৭ টা দেশের ১৮৬ রকম ভাষা আমি জানি!”-বেশ বুক ফুলিয়ে বললেন ক্যাপ্টেন হ্যাডক।

-“বলেন কি মশাই! আপনাকে তো কাল্টিভেট করতে হচ্ছে।”

-“আপনি কটা ভাষা জানেন মিঃ গাঙ্গুলী?

-“টু অ্যান্ড হাফ! অনলি আড়াই খানা!বাংলা,ইংরেজি আর অর্ধেক হিন্দি।”

লালমোহন বাবুর কথায় হেসে উঠলাম সবাই।

-“আপনি চিন্তা করবেন না মিঃ গাঙ্গুলী,ক্যপ্টেনের একটু বাড়িয়ে বলা স্বভাব।অতগুলো ভাষা ও জানে না ।”-টিনটিনের কথায় একটু আশ্বস্ত হলেন জটায়ু।

শ্রীনাথদা এসে ততক্ষ্মনে সবার জন্য মকাইবাড়ির চা আর প্লেটে করে শিঙাড়া,চানাচুর সাজিয়ে দিয়ে গ্যাছে।

আমি অনেকক্ষণ ধরে উসখুস করছিলাম,এবার সুযোগ পেয়ে বললাম-“আচ্ছা টিনটিন কুট্টুস কে আননি?”

-“নাহ ফ্লাইটে আনার সমস্যা,আর আমি কালই ফিরে যাব।ওকে নেস্টরের কাছে রেখে এসছি” উত্তর দিল টিনটিন।

চায়ে চুমুক দিয়ে সবার মুখেই একটা স্বস্তির ছাপ লক্ষ্য করলাম।শিঙাড়ায় কামড় বসিয়ে প্রোফেসর শঙ্কু বললেন-“আসলে,প্রফেসর ক্যালকুলাস আর আমি একটা রিসার্চ করছি নিজেদের মত করে।উনি কিছুদূর এগিয়েছেন,আমিও খানিকটা। গতবার জার্মানিতে সায়েন্স কনফারন্সে এ বিষয়ে ক্যালকুলাস বক্তৃতা দেওয়ার পর আমি ওঁর সাথে দেখা করি।কারণ এ বিষয়ে আমিও কিছু গবেষণা করছিলাম।

“কি প্রোফেসর বাকিটা আপনিই বলুন না?”

আনমনা ক্যালকুলাস হঠাৎ যেন বাইরের জগত থেকে রজনী সেন রোডের বৈঠক খানায় ফিরে এসে বললেন-“অ্যাঁ?আমি তো কিছু জানি না,এই ক্যাপ্টেন নিশ্চয়ই আমার নামে কিছু বলেছে?”

-“উফফ এনাকে নিয়ে আর রক্ষে নেই। একেবারে মাথা খারাপ!”

“যখন শুনতে পান না ,কানের হিয়ারিং এইড টা পরেন না ক্যানও?”-ক্যাপ্টেনের চিৎকারে জটায়ু ও বিষম খেয়েছেন।

নির্লিপ্ত ভাবে ক্যালকুলাস বলে চললেন-“তবে হ্যাঁ তোমাদের যেটা বলতে পারি সেটা হল,আমার আর শঙ্কুর নতুন প্রোজেক্ট অটোট্রান্সপোর্টেশন মেশিন।” তোমাদের দেশের ফিল্মমেকার রে এর একটা সিনেমা থেকে আইডিয়াটা পেয়েছিলাম।হাততালি মেরে যেখান সেখান চলে যাচ্ছে কি যেন নাম লোক দুটোর?

-“ইয়ে গুপি বাঘার কথা বলছেন ?”লালমোহন বাবুর কথা শুনতে পেলেন না ভদ্রলোক,বলে চললেন-“তা জাকগে,আমি যেটা ভেবেছি সেটা হল,এটা দুটো স্টেশন মত থাকবে।ধরো তোমরা কলকাতায় আছো,সেখানকার স্টেশন থেকে বোতাম টিপবে যেখানে যেতে চাও পৌঁছে যাবে এক নিমেষে।”

এবার প্রোফেসর শঙ্কু বললেন –“ঠিক সেই কারণেই ওনার এখানে আগমন।আমরা গিরিডী তে ফিরে একসাথে কাজ করব কিছুদিন এবার ।”

“বাহ।চমৎকার আইডিয়া। এরকমটা হলে একটা বেশ যুগান্তকারী আবিষ্কার হবে।কিন্তু সবই তো বুঝলাম শুধু টিনটিন বাবু সুদূর বেলজিয়াম থেকে কি আমার সাথে প্রোফেসর দের এই প্রোজেক্ট নিয়ে আলোচনা করতে এসছেন?তা তো ঠিক মনে হচ্ছে না!” ফেলুদার গলায় চাপা কৌতূহল।

-“তাহলে কি মনে হচ্ছে মিঃ মিটার?”

-“তুমি ঢোকার সময়ই দেখলাম,তোমার প্যান্টের পকেটের কোনা থেকে আই কার্ডের একটা অংশ উঁকি দিচ্ছে,তাতে p t t m e ,গ্যাপ দিয়ে দিয়ে বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।আমার বিশ্বাস ওটা তুমি যে কাগজের সাংবাদিক,অর্থাৎ "Petit Vingtieme" এর আই কার্ড।তুমি এসছ সেই কাগজের হয়ে আমার ইন্টারভিউ নিতে। তাই তো?

-“oh brilliant mr. mitter . You are truly Indian Sherlock holmes!!” এই বলে নিজের ডান হাতটা ফেলুদার দিকে বাড়িয়ে দিল টিনটিন।

।৪।

আসলে বেশ কিছুদিন আগে ব্রাসেলে একটা বিস্ফোরণে বহু মানুষ মারা গিয়েছিল।ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পরা একটা c.c.t.v ফুটেজ দেখে ফেলুদা অপরাধীকে শনাক্ত করে ফেলে,আর সেটা নিয়ে বেলজিয়ামে স্বরাষ্ট্র দপ্তরে একটা মেল পাঠায়।পরে বেলজিয়াম পুলিসের তদন্তে,ফেলুদার সন্দেহ ঠিক বলে প্রমানিত হয়।সেই জন্যই টিনটিনকে ওরা পাঠায় ফেলুদার ইন্টারভিউ নিতে।

সমস্ত কিছু মিটে যাওয়ার পর ,লাঞ্চে ভাত ইলিশ মাছ আর মাটন কষা খেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছিল সবাই ।ওরা বেরিয়ে যাওয়ার পর কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম আমরা সবাই।এতক্ষন স্বপ্ন দেখছিলাম না তো?ফেলুদাও একটু চুপচাপ এখন।

-“ও মশাই কিছু বলুন।আপনার খ্যাতি তো দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে এবার!”

-“ছোঁড়ার এলেম আছে বলতে হবে।ওইটুকু বয়েসে আমারও এত সাহস ছিল না!থ্যাঙ্কস টু প্রোফেসর শঙ্কু।ভাগ্যিস ক্যালকুলাস আর উনি এক কাজ করছেন।নইলে হয়তো টিনটিন আসতো না এখানে।রজনী সেন রোডের যায়গায় আমায় স্কাইপে ইন্টারভিউ দিতে হত!

“জয় বাবা ত্রিলোকেশ্বর!”-জটায়ুর কথায় অন্য দিন হলে সবাই হাসতাম ঠিকই,কিন্তু আজ বাড়িটা হঠাৎ খুব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।লালমোহনবাবু বেড়িয়ে যেতে আমি বইয়ের তাক থেকে ‘তিব্বতে টিনটিন’ টা নিয়ে পড়তে শুরু করলাম,ফেলুদা দেখলাম একমনে বইয়ের কভারটার দিকে চেয়ে আছে। কি ভাবছে ওই জানে !!


No comments:

Post a Comment