Thursday, 13 July 2023

দেবীপক্ষ

পর্ব ১ঃ বীরাঙ্গনা

“চলুন লালমোহনবাবু, চট করে পাহাড় থেকে ঘুরে আসি। কলকাতার এই প্যাচপ্যাচানি আমার সয় না মোটেই।” মণিদি বলছিল আমাদের বসার ঘরে বসে।

যদিও অক্টোবর মাস, পুজো সামনে, কিন্তু গরমের কমতি নেই।
“এটা আপনি একেবারে আমার মনের কথা বলেছেন মণিকঙ্কণা। আমার মনটাও ক’দিন থেকে পালাই পালাই করছে। কলকাতায় বসে আইডিয়া আসে না, আমার, জানেন তো! কিন্তু ভাবছিলুম পাহাড় তো অনেক হল, এবার ডুয়ার্সটা একবার এক্সপ্লোর করলে কেমন হয়?“ জটায়ু বলে ওঠেন।
“খারাপ হয় না! কলকাতার মত গরম তো আর নেই ওখানে…আর জঙ্গল, চা বাগান…”
মণিদির মনে ধরেছে প্রস্তাবটা।
“ডুয়ার্স নিয়ে আমাদের এথেনিয়াম ইন্সটিউটের বৈকুন্ঠ মল্লিকের একটা কবিতা আছে, জানেন তো! পোড়ার দেশে কল্কে পেল না লোকটা…শুনুন আপনি, মণিকঙ্কণা, শুনলেই বুঝবেন…”
বলে গলা টলা খাঁকড়ে শুরু করলেন জটায়ুঃ
“এ কি রূপ বুকে ধরে থাক বারো মাস
প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ তুমি হে বঙ্গের ডুয়ার্স ।
চায়ের বাগিচা কোথা, কোথা নদী খরস্রোতা।
বন্য হাতি, গন্ডারের একি চঞ্চলতা!
শাল সেগুনের বন যেন পটে আঁকা
তারি মাঝে নৃত্য করে তিস্তা জলঢাকা
উত্তরেতে সদা খাড়া, নির্ভীক, নির্ভয়
ভারতের গৌরব সে যে উচ্চ হিমালয়!”
“বলুন, কেমন ? ট্যালেন্ট ছিল কিনা, লোকটার?”
“হুম। বেশ ইউনিক জিনিস।” মণিদি ঘাড় চুলকে জবাব দিল।
“তা নদী, পাহাড়, হাতি সবই তো হল, ডুয়ার্সের ম্যালেরিয়া আর পেটের ব্যামোর কথাটা তো এল না একবারও? মুঘল সেনাপতি শায়েস্তা খাঁ যে ওখানে গিয়ে নানান ব্যারামে ভুগে শায়েস্তা হয়ে পলায়ন করেছিলেন সেটা জানা আছে আশা করি?” ফেলুদার প্রশ্ন।
“উনি আপনাদের এইসব আধুনিক কবিদের মত ছিলেন না ফেলুবাবু, যে কেবল নর্দমা আর ধাপার মাঠ নিয়ে লিখবেন।” জটায়ু গম্ভীর।
“রবীন্দ্রনাথও কিন্তু লিখেছিলেন…কাঁঠালের ভূতি আর মরা বেড়ালছানা”! মণিদি মনে করিয়ে দেয়!
“কি আশ্চর্য, এটা একটা প্রাকৃতিক বর্ণনা, তার মধ্যে ওসব আবার…”
“লালমোহনবাবু, আপনি কি প্রকৃতি দেখবেন বলে ডুয়ার্স যেতে চাইছেন নাকি ঐ বাবা শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রম দেখতে?”
হাতের রীডার্স ডাইজেস্টের পাতা উল্টোতে উল্টোতে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা!
বাবা শঙ্করীপ্রসাদ এখন যাকে বলে লেটেস্ট ফ্যাড। শহর জোড়া পোস্টারে ওঁর আর সেকেন্ড ইন কম্যান্ড পার্বতীমাঈ এর মুখ। তাঁদের লাইফস্টাইল এবং স্পিরিচ্যুয়ালিটি সংক্রান্ত উপদেশ হটকেকের মত বিকোচ্ছে।ভক্তদের মধ্যে মন্ত্রী, শিল্পপতি, আমলা, ফিল্মস্টার সব্বাই আছেন। বিরাট আশ্রম জলপাইগুড়ির কাছে। এখন এখানে বিবেকানন্দ পার্ক জুড়ে তাঁবু পড়েছে…এক পক্ষকাল ধরে বাবাজী এবং মাতাজী জ্ঞান বিতরণ করবেন। আমি জানি, কারণ ভিড়ের ঠ্যালায় পুলিশ অনেক রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে।
“মোক্ষম ধরেছেন মশাই! আসলে কি জানেন, আমি তো আবার আপনাদের মত অতটা ঠিক নাস্তিক ভাবাপন্ন নই! চারিদিকে সবাই এত বলছেন যখন, তখন ভাবলুম একবার দেখে এলে ক্ষতি কি? পাপ টাপ যা জমেছে আর কি এত দিনে , তার যদি একটা ইয়ে হয়…”
“আপনার পাপ তো মুলতঃ পাঠকের ঘাড়ে রাজ্যের গাঁজাখুড়ি মাল চাপিয়ে। তার তো কোন কমতি দেখি না…আরো একটা উপন্যাস তো অলরেডি ছাপাখানায়।”
“কি করে বুঝলেন ফেলুবাবু? বলিনি তো আপনাদের?”
“এমনিতে তো হপ্তায় দুবার আসেন, অথচ গত দুহপ্তায় দেখা মেলেনি আপনার একবারও। আবার আজ দেখছি একেবারে ফুরফুরে মেজাজ…কানের লতিতে শেভিং ক্রীম লেগে আছে, ভুরভুর করছে আফটার শেভের গন্ধ…পুজোর লেখা জমা দিয়ে দিয়েছেন নিশ্চয়ই?”
“আর বলেন কেন মশাই …যা গেল গত দু সপ্তাহ…তাগাদার ওপর তাগাদা…নাওয়া-খাওয়া বন্ধ, গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি…পাগলের মত লিখে চলেছি। অমন করলে ভাল লেখা হয়, বলুন দেখি? মাঝে মাঝে মনে হয় ওই প্রকাশককেই ভিলেন করে একটা লেখা লিখি!
শেষে কালকে ফাইনাল ড্রাফট জমা দিয়ে তবে আজ এখানে।”
“হুম! আজ যে আপনার মেজাজ ফুরফুরে সে আপনার ঢুকতে ঢুকতে ‘অমল ধবল পালে’ গুনগুন করা শুনেই বুঝেছি। যদিও ভয়ানক ভুল সুরে!”
“হেঃ, রবীন্দ্রসংগীত যে ঠিক সুরেই গাইতে হবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছে মশাই? ভাবটাই আসল বুঝলেন, ওসব সুর টুর সেকেন্ডারি!”
“বিশ্বভারতীর কানে যদি যায় এই কথা…”
“দূর মশাই, ওরা দেবব্রত বিশ্বাসকেই ব্রাত্য করে তার সঙ্গীত রুদ্ধ করে দিল, তা আর লালমোহন গাঙ্গুলী!
তা চলুন না ঘুরে আসি,সবাই মিলে? যাই তো আমরা প্রতিবারই। এবার আবার ম্যাডামও থাকবেন। আর গেলেই তো রহস্য কি বলেন, হে হে! অবিশ্যি আপনি সময় করতে পারবেন কিনা …”
গত দুমাসে ফেলুদা এত ব্যস্ত ছিল যে তিনটে কেস ফিরিয়ে দিতে হয়েছে।
“ও গেলে চলুক, না গেলে না। আমরা ঘুরে আসি। তপেশের তো পরীক্ষাটা শেষ হলেই কলেজে পুজোর ছুটি। আমার এখন একটু চাপ যাচ্ছে বটে, তবে আর কদিন পরে হলে দিন চারেক পেয়ে যাব।”
মণিদি ঝটপট বলে দেয়।
“তা আমাকে ছাড়া গেলে রহস্য জুটবে কি? তাহলে বেড়ানোটা পানসে হয়ে যাবে না?”
ফেলুদা রীডার্স ডাইজেস্টে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করে।
“আহা, আপনি না গেলে কি হয় নাকি…ওটা তো ম্যাডামের খালি কথার কথা।”
শ্রীনাথ ঢুকেছে ডালমুট আর চা নিয়ে। নিজের কাপে আয়েস করে চুমুক দিয়ে জটায়ু আবার বললেন,
“সত্যিই আপনি নাকি মক্কেল ঠেলতে পারছেন না? ভাল, ভাল! মক্কেলই তো লক্ষ্মী, কি বলেন মশাই?”
“সে তো বটেই!”
“আসলে আ্যদ্দিন তো আপনি লক্ষ্মীছাড়া ছিলেন, কিন্তু আপনার এখন গৃহলক্ষ্মী এসেছেন। তাই বোধহয় ভাগ্যলক্ষ্মীও সুপ্রসন্না…হে হে হে!”
“হুম! তবে আমার গৃহলক্ষ্মীটি যেরকম সতত চঞ্চলা ভাগ্যলক্ষ্মীটি তেমন হলেই বিপ—“
কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ আর্ত চিৎকার ভেসে আসে রান্না ঘরের দিক থেকে। মায়ের গলা না?
মণিদি বসেছিল ভেতরের দরজার সবচেয়ে কাছে। ফেলুদার উক্তি সপ্রমাণ করে ওই সবার আগে তিড়িং করে উঠে দৌড়ল। পেছনে আমরা।
রান্নাঘরের কাছে আসতেই দেখি ভেতর থেকে বিজয়িনীর মত বেরিয়ে আসছে মণিদি…
….এগিয়ে দেওয়া হাতে শুঁড় থেকে দোদুল্যমান একটি আরশোলা, তখনো নড়ছে।
পেছন পেছন বেরিয়ে এল মা । মুখটা লাল। একটু বেকুব বনে গেছে মনে হল।
“হি, হি, কাকীমা, তুমি তো দেখি আমার মায়ের চেয়েও ভীতু। আরশোলা দেখে এত ভয় পাও।”
“আরশোলা দেখে সব মেয়েরা ভয় পায় মণি। একমাত্র তুমি ছাড়া। সব কিছুই কি তোমার সৃষ্টিছাড়া বাপু?”
“শুধুমুধু মেয়েদের দোষ দিও না তো! ঐ দেখ লালমোহনবাবুর মুখটা…কি লালমোহনবাবু, ভয় পান এটাকে?”
নাকের সামনে পোকাটাকে ঝুলিয়ে বলে মণিদি।
লাফিয়ে তিন হাত পিছিয়ে গিয়ে জটায়ু বলেন
“হ্যাঁ, হ্যাঁ ভীষণ ভয় পাই। আপনি শীগ্গীর ফেলে আসুন ওটাকে।”
“কি হচ্ছে মণি, ভদ্রলোককে ওরকম করে…ওটাকে মেরে ফেলে দিয়ে এস।” মা গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে।
“বালাই ষাট। কেষ্টর জীব, মারব কেন? এটাকে রিহ্যাবিলিটেট করতে হবে।” মণিদি দৃঢপ্রতিজ্ঞ।
“কোথায় করা যায় বল তো কাকু?”
বাবাকে ধরেছে এবার।
“আরশোলাকে কোথায় রিহ্যাবিলেটেট করে তা তো আমি জানি না মা মণি, তবে ছাতে গিয়ে দেখতে পার.. পাশে আমগাছ আছে একটা…”
“বাঃ দারুণ বুদ্ধি কিন্তু তোমার কাকু।”
মণিদি সার্টিফিকেট দিয়ে দেয়।
“চল শ্রীনাথদা, ছাতের দরজাটা খুলে দেবে।”
“আর প্রদোষ তোমার চটিদুটো ছেড়ে দাও দেখি…”
বলে টলে ফেলুদার তিন সাইজ বড় চপ্পল দুটো পরে আরশোলা ঝোলাতে ঝোলাতে ছাতের সিঁড়ির দিকে রওনা দেয় মণিদি।
“এই হল সত্যিকারের সাহসী মেয়ে। এমনকি আরশোলাকে অব্দি ভয় পায় না। নাহলে অনেকেই তো আছেন, এমনিতে ডাকাবুকো এদিকে…”
মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বাবার ভাষণ থেমে যায়।

***
পর্ব ২ঃ ফোবিয়া

আজ আমাদের ভাস্বরবাবুদের ওখানে যাবার কথা। ওদের ছেলে যখন জন্মাল তখন মণিদি সুইডেনে ছিল বলে ওকে দেখেনি। তারপরও বিভিন্ন ডামাডোলে ভাস্বরবাবু আর চন্দ্রিমার সঙ্গে ওর মোলাকাত হলেও বাচ্চাটার সঙ্গে হয়নি। আমরা তিনজন গেছিলাম জন্মের পরে পরেই, তখন অবিশ্যি নতুন বাবা মা কে কনগ্র্যাচুলেট করা ছাড়া আর বিশেষ কিছু করার ছিল না।
এবার গিয়ে দেখি বেশ গাবলু গুবলু মতন হয়েছে। নামও গুবলু।ভারী মিশুকে। আমি আর ফেলুদা গাল টাল টিপে দিলাম। লালমোহনবাবু তো দেখলাম দারুণ দক্ষ এ ব্যাপারে। দিব্যি হাঁটুতে বসিয়ে বিভিন্ন ‘দাদ্দা-মাম্মা ‘ ইত্যাদি বলে টলে ভাব জমিয়ে নিলেন। গুবলুও ওনার নাক কামড়ে বন্ধুত্বের সীলমোহর দিয়ে দিল।
একমাত্র মণিদি দেখলাম গুবলুর ধারে কাছে ঘেঁসলোই না। দূর থেকে একটা ফ্যাকাসে হাসি দিয়ে বাকী সময়টা ওর বাবা মায়ের সঙ্গেই গপ্প করে কাটিয়ে দিল।
“কি যে একটা বিয়ে করলি মণি, না ঘটাপটা, না কিছু”, চন্দ্রিমা পাল্টে পাল্টে ড্রেস পরতে না পারার দুঃখ এখনো ভুলতে পারেননি মনে হচ্ছে।
“আপনি কেন কিছু বললেন না প্রদোষবাবু?”
“আমায় কিছু বলবেন না। কর্ত্রীর ইচ্ছেয় কর্ম। আমাকে যা করতে বলা হয়েছে আমি করেছি।”
“ঐ ছিটিয়াল মেয়ের ইচ্ছেয় আবার কেউ চলে নাকি? নমো নমো করে আধবেলায় বিয়েটা সেরে হানিমুন চলছে তো চলছেই সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে…”
আমরা চারজনেই একটা চকিত চাউনি বিনিময় করে নিলাম। ওদের হানিমুনে ঐ ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা প্রায় কাউকে বলা হয়নি…বিভিন্ন মন্তব্য, হা হুতাশ এবং মণিদির জীবনের আশঙ্কার ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে বাঁচার জন্য। ইন্সপেক্টর সহায়ের সহায়তায় কাগজ টাগজেও বিশেষ চাউর হয়নি খবরটা। আর রিসর্ট তো নিজেদের ব্যবসার স্বার্থেই ব্যাপারটা নিয়ে খুব একটা জল ঘোলা করতে চায়নি। অফিসিয়াল ভার্সনটা হল ওরা হানিমুনটা আরো কিছুটা এক্সটেন্ড করে তারপর ফিরেছে।
“তা ঠিকই তো আছে বাবা”, ভাস্বরবাবু বলে ওঠেন।
“যত্ত সব সার্কাসের পেছনে টাইম আ্যন্ড এনার্জি খরচা না করে এটাই ভাল। এসব ব্যাপারে মণির আ্যটিটিউড বেশ রিজনেবল। একমাত্র ওর ঐ ফোবিয়াটাই যে কেন এত আনরিজনেবল…”
“কিসের ফোবিয়া?” জটায়ু কৌতুহলী।
“ছোট বাচ্চার ফোবিয়া। দেখছেন না, একবারও গুবলুর কাছে গেল না।” প্রাঞ্জল করেন ভাস্বরবাবু।
“ফোবিয়া নেই মোটেই আমার, আমি জাস্ট অতটা ঠিক কমফর্টেবল না।” মণিদির প্রতিবাদ।
“ওটা তোর ফোবিয়াই”। ভাস্বর সেন বলে ওঠেন।
“জানেন প্রদোষবাবু, আমাদের মেডিক্যালে বেশীরভাগ মেয়েরা পিডিয়াট্রিকস নয়তো গাইনোকোলজি নিল…মানে যাদের মার্কস ছিল আর কি…আর ও ক্লাস টপার, কিন্তু ঘেঁসলই না ওদিকে।”
“ভুলভাল বলবি না ভাস্বর।আমি সার্জারী করতে চাইতাম বলেই..”
“হ্যাঁ হ্যাঁ। ছুরি ধরে ঘ্যাঁচঘ্যাঁচ করে চালানো তো তোর পার্সোনালিটির সঙ্গে বেশ যায়।”
“বাজে বকিস না। এর থেকে মোটেই প্রমাণ হয় না যে…”
“প্রমাণ চাই তো তোর? দাঁড়া এক্ষুণি… এস তো গুবলু সোনা..বলে ভাস্বরবাবু হাত বাড়ান..”
“তুমি দিও না কিন্তু ওকে মণির কোলে। ফেলে দেবে আমার গুবলুটাকে।”চন্দ্রিমা ভীত!
“আরে দেখোই না , আমি আছি তো রে বাবা …এস গুবলু বাবা, তোমার মণি পিসির কোলে বস তো একটু..”
মণিদির হাঁটুতে গুবলুকে বসিয়ে দিয়ে এক্সট্রা ফরওয়ার্ড শর্ট লেগের ফিল্ডারের মত ক্যাচ ধরার পজিশন নিয়ে দাঁড়ালেন ভাস্বরবাবু। এদিকে চন্দ্রিমার মুখে উদ্বেগ— লাস্ট বলে ৫ চাই এর দলের কোচের মত। আমি আর ফেলুদা রুদ্ধশ্বাস দর্শক। লালমোহনবাবু বিচক্ষণ আম্পায়ারের মত সব দেখছেন। মণিদির মুখ একাদশ ব্যক্তির মত যার ঘাড়ে ম্যাচ জেতানোর দায়িত্ব দিয়ে রথী মহারথীরা মাঠ ছেড়েছে অনেকক্ষণ আগে।
“মণিকঙ্কণা, আপনি গুবলুকে দুটো সাইড থেকে একটু হাল্কা করে ধরুন। পড়ে যাবে তো নৈলে…” লালমোহনবাবু বলেন।
“এত ওবলি কেন ও..”, গুবলুর কাঁধে হাত দিতে দিতে বলে মণিদি। মুখটা করুণ।
“ছ মাসের বাচ্চা ওবলিই হয়, রক সলিড নয়।”ভাস্বরবাবু বলেন।
গুবলু এতক্ষণ বেশ এনজয় করছিল ব্যাপারটা।কিন্তু মণিদি ওর দুটো কাঁধ চেপে ধরতেই একবার ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখেই তারস্বরে কাঁদতে লেগে গেল।মণিদিও সঙ্গে সঙ্গে
“ওরে বাবারে… ধর, ধর, ধর ওকে কেউ “ বলে প্রায় লাফাতে থাকল।
গুবলুকে ওর কোল থেকে উঠিয়ে নিয়ে ভাস্বর সেন বললেন, “হয়েছে প্রমাণ এবার?”
———-
“যাক মণিকঙ্কণা, নিশ্চিন্ত হলুম। আপনিও ভয় পান তাহলে। কঠিন সার্জারীতে না, গুন্ডা বদমাইশে না, পাহাড়ে চড়তে না, ইরাক-ইরান যুদ্ধে না, এমনকি আরশোলাতেও না…কিন্তু একটা নিরীহ বাচ্চাকে….”
ফেরার পথে গাড়িতে বললেন লালমোহনবাবু।
“হ্যাঁ পাই আমি ভয়। তবে মোটেই ভাববেন না ওরা নিরীহ! আমার তখন দশ বছর বয়েস …আমার মামাতো বোন পুকাই, ছ মাস হবে তখন তার…আদর করতে গেছি আর এমন করে চুল টেনে ধরেছে না..! কেটে ফেলতে হল কাঁচি দিয়ে শেষে। তাও চুলের গোড়াগুলো ফুলে রইল কতদিন! তারপর ঐ বেখাপ্পা কাটা চুলকে ঠিক করতে পুরো… “মণিদির গলা ধরে আসে…”ন্যাড়া করে দিল মা। হরিবল ব্যাপার। তারপর স্কুলে, পাড়ায় সর্বত্র সে যা হ্যানস্থা…সবচেয়ে জ্বালিয়েছে ঐ ভাস্বরটা।বিকেলে পাড়ার মাঠে খেলতে গেলেই দলবল জুটিয়ে ছড়া কাটত, ‘ন্যাড়া ন্যাড়া ন্যাড়া/ বেঞ্চির ওপর দাঁড়া’, এইসব বলে।ও কি আজকের পাপী?!”
“হোয়াট এ চাইল্ডহুড ট্রমা”, ফেলুদা গম্ভীর গলায় বলে।
“সে তুমি যত ইচ্ছে মক কর আমাকে! তার ওপরে এই সব সুংসুঙে বাচ্চা… মনে হয় ধরলেই ঘাড়ে লাগবে না কি হবে… “
“সে তো বটেই। ওরা তো আর ঝুলন্ত আরশোলার মত স্টেবল নয় যে রিহ্যাবিলিটেট করা যাবে…”
ফেলুদা এখনো গম্ভীর ভাব বজায় রেখেছে।
“যাকগে ভয়-টয় একটু আধটু থাকা ভাল। কাকীমাকে শিখিয়ে দেব তুমি বেশী ঝামেলা করলে কি ভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে।”
“হ্যাঁঃ! কাকীমার কাছে যেন ছোট বাচ্চা মজুত, চাইলেই অম্নি ঝুলি থেকে বের করতে পারবে…”
“না এখন মজুত নেই ঠিকই, তবে ভবিষ্যতে…” লালমোহন বাবু বলে ওঠেন।
“ভবিষ্যতেই বা কোত্থেকে…ও হরি আপনি ভাবছেন বুঝি আমার কথা?” মণিদির মাথায় খেলেছে এতক্ষণে।
“কি দেখলেন আর শুনলেন লালমোহনবাবু এতক্ষণ? আই ডোন্ট ডু কিডস…নট আন্ডার ফাইভ, নো ওয়ে।”
“তা একেবারেই পাঁচ বছরের বড় বাচ্চা তো আর পাওয়া যায় না…”
“সেই তো! আমি তো ঠিকই করে ফেলেছি…আমি কয়েকটা স্ট্রীট ডগকে বাড়িতে রাখব। আমাদের পাড়ায় একটা আছে, বেচারার একটা ঠ্যাং নেই। তাছাড়া হাজরার মোড়ে একটা আছে, একটা চোখ একটু কানা মত, কিন্তু কি মিশুকে। আমি গেলেই পাঁউরুটি দিই। নাকি একটা শেল্টারই খুলে ফেলা ভাল…তুমি কি বল, প্রদোষ?”
“ও, আমার মতামতের দাম আছে তাহলে এ ব্যাপারে? যে ভাবে চলছিল আমি তো ভাবলাম….”
“কি যে বল! তুমি তো ওদের বাবা হবে!”
“কি ? তোমার ঐ তিন ঠেঙে কুকুরের বাবা হতে হবে?”
“আর একটা এক চোখোও আছে কিন্তু ফেলুদা”,
আমি মনে করিয়ে দিই।
“যদি মনে কর আমার আগের পক্ষের ছেলে মেয়ে থাকত তাহলে কি তুমি…” মণিদিটা অসম্ভব কুতার্কিক!
“ইনকরিজিবল! তা সেগুলো তো মানুষের ছানা হত, নাকি? অবিশ্যি তোমার যা ব্যাপার স্যাপার তাতে পান্ত ভূতের জ্যান্ত ছানা হলেও কিছু আশ্চর্য নেই।”
ফেলুদা বলে ওঠে।
“মানুষের ছানা, কুকুরের ছানা, ভূতের ছানা এত তফাৎ করার কি আছে? তোমাদের কি মনে হয় এসব আহত পথপশুদের…”
“অবশ্যই দেখভাল করা উচিত, ভালবাসা উচিত। কিন্তু তাই বলে ওটা মানুষের নিজের ছেলেমেয়ে হয় নাকি?”
মণিদির কথা শেষ করার আগেই বলে ওঠে ফেলুদা।
“কেন হবে না, মনের প্রসারতা থাকলেই হয়”!
গম্ভীর ভাবে জানিয়ে দেয় মণিদি।

***
পর্ব ৩ঃ লক্ষ্মী মেয়ের উপাখ্যান
পরদিন কলেজ থেকে বাড়ি ফিরে দেখলাম চোখে চশমা, ঝুঁটি বাঁধা, জিনস আর ঢোলা শার্ট পরা একটা মেয়ে আমার পড়ার টেবলে বেশ আয়েস করে ঠ্যাং দুটো তুলে দিয়ে একটা বই নিয়ে পাতা উল্টাচ্ছে। মনে হচ্ছে গ্রিফিথের ইলেক্ট্রোডাইনামিকসটা। সামনে সমারফিল্ডের মেকানিকস আর স্মিথের অপটিকসের বইগুলো নামানো। আমি তো অবাক। হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে এটা ওরই বাড়ি, আমিই ভুল করে এসেছি।
আমি দরজার কাছে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। মেয়েটি ঘুরে এদিকে তাকাতে দেখলাম পুকাই। মণিদির মামাতো বোন। কি করছে ও আমার পড়ার টেবলে?
“ও তুমি এসে গেছ, তোপসে? তোমার বইগুলো দেখছিলুম একটু।”
“আমার নাম তপেশ। শুধু ফেলুদা আমাকে তোপসে বলে।” গম্ভীর ভাবে বললাম আমি।
“ফেলুদা বলেছে আমি চাইলে তোমাকে তোপসে বলতে পারি।”
“তুমি আমার বইগুলো ঘাঁটছ কেন?”
“আরে আমার তো ফার্স্ট ইয়ার ইলেকট্রিক্যাল। তো এখন তো ঐ মেইনলি ফান্ডামেন্টাল ফিজিক্স! তাই একটু দেখছিলাম তোমার বইগুলো? গ্রিফিথটা ভাল, না?”
“ডিপেন্ড করছে কি চাও!…ইলেকট্রিক্যাল বললে না? ও তো ওহমস ল আর লেঞ্জেস ল জানলেই চলবে তোমাদের। যে কোন বই থেকে পড়ে নিতে পার!”
“তোমাদের প্রেসির সবাই কি এরকম নাক উঁচু?”
“তোমাদের যাদবপুরের কথা আর বোলো না। আমার বন্ধু আছে কমলিকা, কম্পারেটিভে…”
“তোমার গার্লফ্রেন্ড? কম্পার মেয়েদের কিন্তু হেব্বি কেত!” চশমার আড়ালে চোখদুটো চকচক করে উঠল।
“না। ও আমার পাঠভবনের বন্ধু।”
“অ। তাহলে তোমার গার্লফ্রেন্ডের নাম কি?”
“কি জ্বালা! নেই তো রে বাবা। আর থাকলেও বলতাম না তোমাকে।”
“কেন? বলতে না কেন? আমার তিনটে ক্রাশ। একটা সিনিয়ার, একটা এইচ এসের কোচিংএ ছিল, এখন আইআইটিতে, আর একটা, মানে ঠিক ক্রাশ বলা যায় কিনা জানি না, মানে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট টীমে…এই তো বলে দিলাম। তোমাদের কি ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন কাউকে কিছু না বলা নাকি?”
“তার মানে?”
“মানে মিনিদি যে ফেলুদাকে ডেট করছে আমি জানতেই তো পারিনি! শোনার পর আমি তো পড়েই যাচ্ছিলাম চেয়ার থেকে। মিনিদিকে চেপে ধরতে তখন বলল বলতে নাকি মানা ছিল! “
“হতেই পারে। ফেলুদার গার্লফ্রেন্ডকে তো সাবধান হতে হবে। শুধু আমি আর লালমোহনবাবু জানতাম ।”
“আ্যই ওদের ফার্স্ট মিটিং তো তোমার সামনে তাই না? বল না, বল না, কি করে কি হল”?
পা দুটো টেবল থেকে নামিয়ে চেয়ারে বাবু হয়ে বসল।
“আমি গসিপ করি না। তাছাড়া শুনলে ফেলুদা…”
“…কি রাম গাঁট্টা দেবে? খুব ভয় পাও নাকি?”
“তুমি না ইলেক্ট্রিসিটি আর ম্যাগনেটিজম পড়তে এসেছিলে? এগুলো কি হচ্ছে?”
“হি হি এটাও তো একরকম ম্যাগনেটিজম! অবশ্য তুমি বুঝবে কচু। গার্লফ্রেন্ড নেই তোমার । ক্রাশ আছে?”
“না। তুমি কি গ্রিফিথটা নেবে?”
“নেব। তবে এখন না। পরীক্ষার আগে। দু সপ্তাহ গাঁতালেই হবে, বুঝেছ।”
“বুঝেছি। যাদবপুরে তো তোমরা ঐ কর। কোন জিনিস ডীপে গিয়ে বোঝার কোন গল্পই নেই!”
“বাজে বোকো না।তোমাদের শ্রডিঙ্গারের বেড়াল মরা হোক বা বাঁচা কারো কিছু যায় আসে না। আমাদের জেনারেটর বসে গেলে গরমের দুপুরে যা তা চাপ হয়ে যাবে।”
“পুকাই, তপেশ, খাবার রেডি”, মণিদির গলা।
ফলে পুকাইকে একটা উপযুক্ত জবাব দেওয়া গেল না।
অকালপক্ক, ডেঁপো মেয়ে একটি।খাবার টেবিলে দেখা গেল মেয়েটা অসম্ভব বাচালও বটে।
“কাকীমা, এই লুচিগুলো চ্যাপ্টা চ্যাপ্টা। তুমি আমাকে ফুলকো দেখে দাও তো!” বলে উঠল।
“কি হচ্ছে পুকাই, যা পাচ্ছিস তাই খা না…একই তো জিনিস।” মণিদি ধমকে ওঠে।
“অদ্ভুত কথা তো মিনিদি! সে তো সব কিছুই আলটিমেটলি কার্বন। তো কামড়ে কামড়ে কয়লা খাবে কি মানুষ? শাশুড়ির সামনে ভালমানুষি করতে হয় তুমি কর গিয়ে। চ্যাপ্টা লুচি খাও বসে বসে।আমার তো শাশুড়ি না। আমি কেন করতে যাব? বল কাকীমা!”
“সে তো বটেই । তুমি ইচ্ছা মত ফুলকো বেছে নাও। তবে তোমার দিদি কিন্তু খুব একটা ভালমানুষি করে না…”, মা বলে।
“কেন? খারাপ মানুষির কি দেখলে তুমি আমার?” মণিদি মাকে জিজ্ঞেস করে।
“নাকের সামনে জ্যান্ত আরশোলা ঝোলালে যে সেদিন!”
“ঝুলিয়েছিল না? ঈশ, কি দুঃখ তোমার কাকীমা ! ঐ মিনিদির মত ছিটেল বৌমা নিয়ে কেউ ঘর করতে পারে? আরশোলা, ব্যাঙ, কেঁচো…কোন কিছুতে ঘেন্না পিত্তি কিচ্ছু নেই। বর্ষাকালে ওগুলোকে ঘরে আশ্রয় দেয়…জলে ওদের বাসা ডুবে গেলে।”
“আর তুই কি? তোর মত নুন জলে ইলেকট্রোলিসিস করতে গিয়ে নিজের মাকে শক তো দিইনি। তার থেকে ঘরে দুটো হোমলেস কেঁচো রাখা ঢের ভাল।”
“সেটা আমার পাওয়ার সাপ্লাইটা ভাল কাজ করছিল না বলে। আই ওয়াজ ওনলি থার্টিন, দ্যাট ওয়াজ মাই ফার্স্ট পাওয়ার সাপ্লাই সার্কিট বিল্ট অন এ ব্রেডবোর্ড।”
“হোমলেস কেঁচো ব্যাপারটা কি? ঘরে ঢোকাবে নাকি ওগুলো?” ফেলুদা চিন্তিত মনে হল।
“ও তুমি জান না ? মিনিদি না একদিন বাড়ির সামনে জলের তোড়ে ভেসে যাওয়া দুটো কেঁচোকে হাতে করে ধরে ঘরে এনেছিল! ব্যাঙও ঢোকায় অনেক সময়। তুমি সাবধানে থেকো ফেলুদা…মিনিদির সঙ্গে ঘর শেয়ার করা একটুও সোজা নয়। আমি জানি তো!”
“বকবক বন্ধ করে খাওয়া শেষ করে ওঠ। বাড়ি যাবি না? এরপর দেরী হলে মামা চেঁচাবে কিন্তু।”
মণিদি দাবড়ানি দেয়।
“চেঁচাক। তুমি কি ঐ রসগোল্লাটা আর খাবে না মিনিদি? তাহলে আমাকে দিয়ে দাও।আলুর দমটা বীভৎস ভাল হয়েছে কাকীমা। তুমি করেছ?”
“না রান্নার লোক। নেবে তুমি আর একটু ?”
“দাও, বলছ যখন। তাহলে অবশ্য আর দুটো লুচিও লাগবে আমার।”
“এত কার্ব খাস না পুকাই। মুটিয়ে যাবি।” মণিদি সতর্ক করে।
“যাই যাব। তোমার মত পাখির আহার নাকি আমার? তখন থেকে আড়াইখানা লুচি নিয়ে বসে আছ…ফেলুদা তুমি কটা লুচি খেতে পার?”
“গুনে দেখিনি। তবে কার্ব আমিও বেশী খাই না। ভুঁড়ি হলে গোয়েন্দার চলে না।”
“আচ্ছা ফেলুদা, তোমার গল্পে তো এতদিন কোন মেয়ে ছিল না—“
“কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। অনেক কেসে ছিল। তবে সেগুলো তোপসে সব লেখেনি। ওর কিশোর পাঠকদের কথা ভেবে।”
“আ্যই! জানতাম আমি। ফেলুদার দোষ নয়। এটা তোপসের কীর্তি।”
“সে দোষ কি আর কাটবে না? এখন তো মণি বেশ কটা আ্যডভেঞ্চারে ছিল, তাতে হবে না?” ফেলুদা বলে ওঠে।
“সে থাকে থাক, কিন্তু আমি বলছিলাম, মানে তোপসের জায়গায় যদি…”
“তুই আসতে চাস তো?”
“হ্যাঁ। মানে চান্স তো দিতে পার! মেয়ে বলে পারব না বলবে না নিশ্চয়ই”!
“পাগল, আমার ঘাড়ে কটা মাথা! বললেই তো তুই, মণি , কাকীমা সবাই মিলে নিজেদের ঝগড়া ভুলে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বি। কিন্তু তোপসের পোস্টটা তো ঠিক অডিশন দিয়ে নেওয়া নয়। ছিল আমার সঙ্গে শুরু থেকে, তাই…”
“আই সী। প্রিভিলেজ অফ বার্থ। লাইক দ্য রয়্যালটি!”
“তুমি চাইলে ওকে নিতে পার একটা কেসে ফেলুদা। আমার কোন আপত্তি নেই। অবিশ্যি তোমার কেস ঝুলে যাবে কিনা সে আমি জানি না…”
“কাউকে কিছু করতে হবে না। তোদের লেখাপড়া নেই?”
“তাহলে এখন তোমার সঙ্গে কে যাবে কেসে? মিনিদি আর জটায়ু?”
“না। তোদের কলেজ আছে, মণি ডাক্তার, জটায়ু লেখক। সব সময় আমাকে সঙ্গ দেওয়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমি ফুল টাইম গোয়েন্দা। আমাকেই করতে হবে। তোপসের লেখা কাহিনী আমার কেসের টেন পার্সেন্টও নয়। বাকীগুলোর কথা সবাই জানে না, জানার দরকারও নেই।”
“বুঝলাম! চল মিনিদি, তুমি বাড়ি যাবে তো আজ? চারদিন ধরে এসে এখানে বসে আছ, ফেরার নামটি নেই। পিসিমণি দুঃখ করছিল।”
“বিয়ের পরে মেয়েরা শ্বশুরবাড়িতে থাকে এই নিয়মই তো জানতাম”, মা বলে উঠল।
“ধুর ঢপের নিয়ম। তুমি বলছ কারণ তোমার দুটোই ছেলে, সো দিস স্টুপিড নিয়ম স্যুটস ইউ। তবে মিনিদিকে তুমি বাগে আনতে পারবে না। ও হচ্ছে দারুণ গেছোদাদা। এই কেদার, নয়তো দার্জিলিং নয়তো ইরাক! তুমি বরং তোপসের বিয়েটা লক্ষ্মী মেয়ে দেখে দিও।”
“লক্ষ্মী মেয়ের যা অভাব দেখছি তাতে খুব একটা ভরসা হয় না।” মা বলে উঠল।
“সেটা তুমি ভুল বলনি।এই আমি এক যা আছি…”
আমি গলায় রসগোল্লা আটকে বিষম খেলাম। জল টল খেয়ে ঠান্ডা হয়ে শুনলাম অমৃতভাষণ এখনো শেষ হয়নি।
“তবে কাকীমা, এরপর যেদিন লুচি করবে না, একটু পায়েস কোর বুঝেছ। জমে যাবে। আমাকে খবর দিয়ে দিও, আমি এসে খেয়ে যাব।”
বলে টলে পেটুক, বাচাল, অকালপক্ক পুকাই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল।
খানিক পরে মণিদি আর পুকাই বেরিয়ে গেল আর তার একটু পরেই ফোনটা বেজে উঠল।
ফেলুদা ফোনটা ধরে দুটো হুঁ হাঁ দিয়ে রিসিভারটা রাখতেই ওর মুখ দেখে বুঝলাম সাংঘাতিক কিছু ঘটে গেছে।

***

পর্ব ৪ঃ ছেলেধরা

ফেলুদা গায়ে শার্টটা চাপাতে চাপাতে বলল “ক্যুইক তোপসে, ভাস্বরদের বাড়ি”। ওর মুখ অসম্ভব গম্ভীর।
গাড়িতে স্টার্ট দিতে দিতে বলল,
“গুবলুকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“তার মানে?”
“মানে ওকে কাজের মেয়েটি লেকে বেড়াতে নিয়ে গেছিল। রোজই যায়। প্র্যামে বসিয়ে। তারপর নাকি অন্য কয়েকজনের সঙ্গে গল্প করছিল… চেনা লোক সব ওর। তারপর পেছন ফিরে দেখে প্র্যাম খালি, গুবলু হাওয়া।”
“কি সর্বনাশ!”
“কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি এসেছে তারপর।
ওরা তক্ষুণি পাড়ার ছেলেদের নিয়ে বেরিয়েছে আশে পাশে খুঁজতে…”
ফেলুদা একটা মিনিকে রং সাইড দিয়ে ওভারটেক করল… “কিন্তু কিছু পায়নি। এখন পুলিশ এসেছে, আর আমরা…”
একটা প্রায় লাল হয়ে যাওয়া সিগনাল পেরোতে পেরোতে বলে ফেলুদা। এমনিতে ও খুব নিয়ম মেনে চালায়। কিন্তু এখন বোঝাই যাচ্ছে তাড়া খুব।
গাড়িটা পার্ক করতে করতেই দেখলাম সামনে আরো কয়েকটা গাড়ি। পুলিশের ভ্যান একটা। গেট হাঁ করে খোলা। লোকজন আসা যাওয়া করছে।
ভেতরে ঢুকে দেখি ভাস্বরবাবু উস্কো খুস্কো ভাবে বসে আছেন। কালই কত আড্ডা হল ভাস্বরবাবুর সঙ্গে এই ঘরেই বসে। এখন মনে হচ্ছে অন্য মানুষ। পাশে বেশ কয়েকজন লোক। পাড়া প্রতিবেশী হবে।উল্টোদিকের সোফায় বসে ইনস্পেক্টর হরেন মুৎসুদ্দি।
“কি ব্যাপার মিঃ মিত্তির, চেনেন নাকি আপনি এঁদের?”
“হ্যাঁ ফ্যামিলি ফ্রেন্ড। কি হল ব্যাপারটা বলুন তো?”
“আরে বাচ্চাকে দ্যাখে ঐ মেয়েটি, আরতি, ও গুবলুকে প্র্যামে বসিয়ে নিয়ে গেছিল লেকের দিকে। রোজই যায়। তারপর ওর গ্রামের একজন কে, বলছে বাসন্তী মাসির ছেলে, তার সঙ্গে গপ্প করছিল। বাচ্চা ঘুমিয়ে পড়েছিল। ওরা দাঁড়িয়ে কথা বলছিল…এই হাত বিশেক দূরে হবে।কথা টথা শেষ করে তারপর এসে দেখে বাচ্চা ভ্যানিশ।”
“খোঁজ করেনি? কেউ দেখেনি কে গুবলুকে তুলে নিয়ে গেল।”
“আরো অনেকে তাদের বাচ্চা নিয়ে বেড়াতে গেছিল ওখানে।তাদের মধ্যে দুজন বলছে একজন মহিলা এসে প্র্যাম থেকে কোলে তুলে নিয়ে গেছেন। তারা ভেবেছিল বাড়ির লোক। মহিলার চেহারার বর্ণনা যা দিচ্ছে সে যে কেউ হতে পারে…মাঝবয়সী, সিন্থেটিক শাড়ি, শ্যামলা রং, পাঁচফুট দুই মত হাইট, দোহারা গড়ন…এর থেকে কাউকে খুঁজে পাব কি করে বলুন তো?”
“ঐ আরতির সঙ্গে একবার আলাদা করে কথা বলা যায়?”
“হ্যাঁ, বলুন না…ঐ তো, ঐ পাশের ঘরে বসিয়ে রেখেছি।”
পাশের ঘরে গেলাম আমি, ফেলুদা আর হরেন মুৎসুদ্দী। সতের আঠারো বছরের একটি গ্রাম্য মেয়ে। কেঁদে কেঁদে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে।
“তুমি কতদিন এখানে কাজ করছ, আরতি”?
ফেলুদা জেরা শুরু করল।
“তিনমাস হবে।”
“বাড়ি কোথায় তোমার?”
“গোসাবা।”
“এদের খোঁজ পেলে কি করে?”
“আমাদের গ্রামের একজন বাবুর দিদির বাড়ি কাজ করে, সেই বলেছিল।”
“কি কাজ কর এখানে, শুধু বাচ্চা দেখা?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে বেড়াতে নিয়ে গিয়ে বাচ্চাকে সারক্ষণ চোখে চোখে না রেখে দূরে দাঁড়িয়ে গল্প কর, রোজ?”
“না দাদাবাবু! চোখে চোখেই তো রাখি। ওখানে লেকের ভেতরেই একটা পার্ক মত আছে। অনেকে বাচ্চা নিয়ে যায়। দোলনা আছে, স্লিপ আছে…গাড়ি ঘোড়া তো নেই। ভাবতে পারিনি এমন বিপদ হবে!” আরতি আবার চোখ মোছে।
“প্র্যামটা রেখে তুমি ঠিক কি করছিলে?”
“একজনের সঙ্গে কথা বলছিলাম। আমার চেনা। আগেও বলেছি অনেকদিন।”
“আরতি, ঠিক করে বল। কোথায় কি ভাবে রেখে কথা বলছিলে? প্র্যামটা সামনে রেখেই তো কথা বলা যায়। ওটা দূরে রাখতে গেলে কেন?”
“আমি, মানে…আসলে…” আরতি ঢোক গিলছে।
“ঠিক করে বল কি করছিলে”। এবার হরেনবাবু তাড়া দেন।
“আমি দোলনা চাপতে গেছিলাম। একটুক্ষণের জন্য শুধু। দোলনার বেশী কাছে রাখলে তো প্র্যামে লাথি লাগবে, তাই একটু শুধু দূরে, দোলনার পেছনে রেখেছিলাম।“
“তুমি একা দোলনা চাপছিলে না সঙ্গে কেউ ছিল?”
আরতির মাথাটা এবার নীচু হয়ে আসে।
“তপনদা, আমাদের গ্রামের…বাসন্তী মাসির ছেলে…ও আমাকে পেছনে দাঁড়িয়ে ঠেলে দিচ্ছিল…”
“ঐ তপনদাই কি তোমাকে দোলনা চড়ার কথা বলে?”
“হ্যাঁ”। মাটির দিকে চোখ নামিয়ে বলে আরতি, আঙুলটা গলার চেনে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে।
“তোমাকে এই লকেটটা কে দিয়েছে”?
ফেলুদার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। আমি বুঝলাম না কেন! ওটা নেহাতই সস্তা ইমিটেশনের একটা সরু চেন আর সঙ্গে একটা ছোট লকেট, নীচের ছবিটার মত।
আরতিও একটু পাজলড মনে হল।
“এ-এই হারটা? তপনদা দিয়েছে, কিছুদিন আগে।”
“কোত্থেকে কিনেছিল জান? তোমরা কি একসঙ্গে কোন দোকানে কিনতে গেছিলে এটা?”
মিঃ মুৎসুদ্দিও ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছেন ফেলুদার দিকে।
“ন-না। এটা তপনদার গলাতে ছিল। আমি ভাল বলেছিলাম বলে দিয়েছিল।” আরতি চোখ নামিয়ে নেয়।
“কলকাতায় কি করে এই তপনদা? পুরো নাম কি?”
“তপন বড়াল।কেয়ারটেকার।গুলমোহর আ্যপার্টমেন্টে, সাদার্ন আ্যভিনিউতে।”
মুৎসুদ্দি মশাই নোট করে নিলেন দেখলাম।
“তপন কি তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্য লেকে এসেছিল? রোজ আসে?”
“ না না, ও তো ওখানে ক্রিকেট ক্লাবেও কাজ করে । পার্ট টাইম। ঘাস ছাঁটা, ঘাসে জল দেওয়া…। আমার সঙ্গে প্রায় দেখা হয়, গুবলুকে নিয়ে গেলে।” আবার চোখ নামিয়ে ফেলে আরতি।
“তা হারানোর পর তোমরা খুঁজলে না?”
“অনেক খুঁজলাম দাদাবাবু! পার্কে, লেকের ক্যাম্পাসের মধ্যে। তারপর আরো লোকজন, লেকের সিকিউরিটি গার্ড, বেলুনওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা…সবাই মিলে কত খুঁজলাম। আমি ওখান থেকে বেড়িয়ে সাদার্ন আ্যভিনিউ ধরে মুদিয়ালী মোড় অব্দি গেলাম। তপনদা খুঁজল.. বিবেকান্দ পার্ক, কেয়াতলা ছাড়িয়ে একদম গোলপার্ক …কোথাও পেলাম না।”
“ঠিক আছে। আপাততঃ আমার আর কিছু জানার নেই। তবে পুলিশ তোমাকে আরো জেরা করতে পারে।”
“কি বুঝছেন মিঃ মুৎসুদ্দি?”
ঘর থেকে বেরিয়ে জিজ্ঞাসা করল ফেলুদা।
“ঐ ছেলেটি, তপন, তো মনে হচ্ছে এই আরতির বয়ফ্রেন্ড টাইপের কিছু। তার সঙ্গে ঢলাঢলি করতে গিয়ে কান্ডজ্ঞান ছিল না আর কি! তার ওপর প্র্যামটা ছিল ওদের পিছনের দিকে।”
“সবই বুঝলাম। কিন্তু ওরকম হঠাৎ করে কেউ এসে বাচ্চা তুলে নেবে? এগুলো তো একটু প্রিমেডিয়েটেড হয় সাধারণতঃ।”
“হুম সেটা ঠিক! হতে পারে ওরা রোজই ওরকম বাচ্চাকে দূরে রেখে কথাবার্তা বলে। কেউ নজরে রেখেছিল দিনকয়েক। তারপর একদিন সুযোগ বুঝে…”
“হতে পারে! তবে ঐ তপন ছেলেটিকে একবার থানায় ডেকে জেরা করতে পারেন।”
“সে করব। তবে জানিনা কতটা লাভ হবে। এসব কিডন্যাপিং তো বেশ অর্গানাইজড ক্রাইম। আর তপন পালানোর চেষ্টাও করেনি। তবু দেখব কথা বলে।”
“আর আরতিদের গোসাবার গ্রামের বাড়িতে…”
“সে আমি গোসাবা থানাকে অলরেডি বলে দিয়েছি। ওরা আরতি আর তপন দুজনের ব্যাপারেই খোঁজ নেবে।
“কিন্তু ঐ হারটার ব্যাপারে আপনি কেন জিজ্ঞেস করছিলেন মিঃ মিত্তির? তেমন কিছু দামী জিনিস তো বলে ওটা মনে হল না….এই কেসের সঙ্গে কি সম্পর্ক?”
“না, তেমন কিছু না। জাস্ট একটা খটকা। ওটা একেবারেই দামী না। কিন্তু ঐ লকেটটা একটা মিশরীয় সিম্বল, হায়রোগ্লিফিকে পাওয়া যায়।ওটাকে বলে ‘আই অফ রা’। ওটা এল কি করে ওর কাছে সেটাই….জানি না ওটার সঙ্গে এই কেসের সঙ্গে যোগ আছে কিনা, তবু যদি পারেন তো জেরার সময় একবার জিজ্ঞেস করবেন ওটার কথা।”
“হতেই পারে ওটা জাস্ট কাকতালীয় ভাবে কোন ফুটের দোকানে বিক্রি হচ্ছিল। তবু বলছেন যখন জিজ্ঞেস করব!”
“আচ্ছা ঐ মহিলা, যিনি গুবলুকে তুলে নিয়ে যান, তাঁকে পার্কের বাইরে কেউ দেখেছে?” ফেলুদা প্রশ্ন করল।
“বাইরে বলতে কি মীন করছেন? গেটে? না একদম বাইরে?”
“একদম বাইরে। ফুটপাতে, রাস্তায়, বাসস্টপে…। গেটের গার্ডরা নিশ্চয়ই অনেককে এরকম বাচ্চা কোলে যেতে আসতে দেখেছে। আলাদা করে চোখে পড়বে কি?”
“এক্স্যাক্টলি। ওরা সেই কথাই বলল। কিন্তু বাইরে খোঁজ নিতে বলছেন কেন?”
“কেউ যদি দেখে না থাকে তাহলে এত তাড়াতাড়ি ভ্যানিশ করলেন কি করে মহিলা? তার মানে হয় গাড়ি করে চলে গেছে নয়তো কাছাকাছি কোন বাড়িতে গা ঢাকা দিয়েছে।গাড়ি তো সব দাঁড়ায় গেটের সামনে।অন্য সব জায়গায় তো বিশাল উঁচু রেলিং, সেখান দিয়ে বেরোন সম্ভব না।গেটের গার্ডদের একবার জিজ্ঞেস করবেন তো ওরা কাউকে ঐ সময় বাচ্চা কোলে গাড়িতে উঠতে দেখেছিল কিনা। নাহলে ঐ অঞ্চলেরই কোন বাড়িতে হয়তো..”
“ভাল বলেছেন। আমি এক্ষুণি দেখছি।”
এবার ভাস্বরবাবুদের সঙ্গে দেখা করার পালা এবং সেটা বেশ কঠিন কাজ। এ তো আর অন্য অচেনা মক্কেল নয়, আমাদের এত কাছের মানুষ। আর কেসটাও এত সেনসিটিভ।
ফেলুদা ভাস্বরবাবুকে ঈশারায় ডেকে নিয়ে এল ভেতরের বারান্দার এক কোণে। এর আগে যতবার দেখেছি ভাস্বরবাবুকে অসম্ভব হাসি খুশী আর আমুদে মানুষ লেগেছে। এখন এরকম উদভ্রান্তের মত দেখে বেশ খারাপ লাগছিল।
“প্রদোষবাবু, আপনি এদেশের সম্ভবতঃ সবচেয়ে নামকরা গোয়েন্দা। তবু আমি জানি আপনি সফল নাও হতে পারেন…” ভাস্বরবাবুর শেষের কথাগুলো একটু কেঁপে গেল।
“ঠিকই ভাস্বরবাবু। গ্যারান্টি তো কেউ দিতে পারে না। অনেকে ভাবে বটে আমি সুপারম্যান, কিন্তু তা তো নয়। বুদ্ধি আর অভিজ্ঞতা খাটিয়ে যতটুকু পারি করি। তবে এটুকু বলতে পারি এটা এখন আমার টপ প্রায়োরিটি। সেটা শুধু আপনি মণির বেস্ট ফ্রেন্ড বলে নয়। এই ধরণের শিশু অপহরণের চেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ জগতে খুব কম আছে এবং এই অপরাধীদের শাস্তি দিতে না পারলে আমার গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেওয়া উচিত।”
“কিন্তু আমার যতটুকু মনে হয় ঐ আরতি মেয়েটি এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত নয়। ও যে ছেলেটির সঙ্গে সেদিন কথা বলছিল পুলিশ তাকে জেরা করবে, তবে সেটাও কদ্দুর গড়াবে জানি না। এর মধ্যে মুক্তিপণ চেয়ে ফোন টোন এলে জানাবেন…”
“আমি সরকারী হাসপাতালের ডাক্তার প্রদোষবাবু”, ভাস্বরবাবু ম্লান হেসে বলেন।
“প্রাইভেট প্র্যাকটিস অব্দি করি না। মুক্তিপণ কে চাইবে বলুন তো আমার থেকে? আমি তো আর আশিষ আগরওয়ালের মত ফিল্মি দুনিয়ার কসমেটিক সার্জন নই!”
“জানি। তবুও! এখন তাহলে চলি। তদন্ত কেমন এগোয় আমি আপনাকে জানাব আর পুলিশকে যতটা ইনফ্লুয়েন্স করা সম্ভব আমার পক্ষে তা আমি করব।
আর ইয়ে…চন্দ্রিমা এখন কেমন…”
আমি জানি ফেলুদা এসব ইমোশনাল ব্যাপার, কান্না কাটি মোটেই হ্যান্ডেল করতে পারে না। অথচ এখন কিছু করারও নেই।
“ও খুব শকড প্রদোষবাবু, কিন্তু হিস্টিরিয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এসব কিছু করেনি। পুলিশের সঙ্গে কথাও বলেছে …ও শক্ত মেয়ে।”
শুনে আমি আর ফেলুদা দুজনেই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
“মণি তখন রাস্তায় ছিল বলে ওকে খবর দিতে পারিনি। তবে এখন ও নিশ্চয়ই ওবাড়ি পৌঁছে গেছে। আমি ফোন করব। ও রাতে এখানে চলে আসবে।”
“শুধু শুধু আর ওকে ভোগাবেন না মিঃ মিত্র…”
“আমাকে কিছুই বলতে হবে না। কি মনে হয় আপনার, খবর শুনলে ও আসবে না? আপনি তো আমার চেয়ে বেশী চেনেন ওকে!”
“এনি ওয়ে, আমরা এখন আসি। সাবধানে থাকবেন।”

***
পর্ব ৫ঃ গডম্যান

প্রদোষ মিত্রের কথা
——————————
নাঃ, একটা সাকরেদ ছাড়া গোয়েন্দাগিরি করা বেশ শক্ত ! লালমোহনবাবু প্রকাশকের কাছে গেছেন। তোপসের টেস্ট চলছে। মণির হাসপাতাল। আমি এখন একদম একা।
আজ দুপুরেই মিঃ মুৎসুদ্দি ফোন করে বললেন যে তপনকে জেরা করে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। নাম, ঠিকানা, কাজের জায়গা সবই ঠিক বলেছিল। এই অপহরণের সঙ্গে ওর কোন আপাত যোগ কিছুই নেই।তাই ওকে শহর না ছাড়ার নির্দেশ দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন।
ও হ্যাঁ, লকেটটা নাকি ও গড়িয়াহাটের ফুটের দোকান থেকে কিনেছিল। জানে না এটা আসলে কিসের চিহ্ন , জাস্ট ভাল লেগেছে বলে কিনেছিল।এ ধরণের কথা ভেরিফাই করা অসম্ভব।
আপাত দৃষ্টিতে কোথাও কোন গোলমাল নেই।কিন্তু আমার মনটা খচখচ করছে।তাই আরো খবর জোগাড়ের আশায় এখন এখানে। কলকাতা পুলিশের এস আই সাত্যকি দাসের নামে একটা ফেক আইডেন্টিফিকেশন আমার পুলিশকে জানিয়ে করিয়ে রাখাই আছে। মাঝে সাঝে কাজে লাগে। এখন এই গুলমোহরের উল্টোদিকের ফুটপাথে পুলিশ বুথের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।প্লেন ড্রেসে অবিশ্যি…পুলিশের ইউনিফর্ম বড্ড দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ডিউটিরত আসল এস আই তড়িৎ মান্নাও আমার চেনা।
ঘন্টা দুয়েক হয়ে গেল, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। এখন দেখছি তপন আস্তে আস্তে গেটের বাইরে বেরিয়ে লেকের দিকে যাচ্ছে। অল্প দূরত্ব রেখে ফলো করতে থাকি। ক্রিকেট ক্লাবের কাছে এসে ও ভেতরে ঢুকে গেল। আমি বাইরে একটা বেঞ্চে বসে কাগজ পড়তে লাগলাম।একটু পরেই ও বেরিয়ে এল, সঙ্গে একটা ছেলে। মনে হচ্ছে ওখানেই ক্রিকেট খেলে। চেহারা দেখে মনে হচ্ছে বড়লোকের ছেলে। এর সঙ্গে ক্লাবের অস্থায়ী মালী তপনের এত কিসের বন্ধুত্ব?
দুজনে লেকের ধার দিয়ে পায়ে চলা পথ ধরে আর একটু এগিয়ে গেল। এদিকে লোকজন বিশেষ নেই। একটু দূরে একটা শিরিষ গাছের তলায় দাঁড়িয়ে একটা চারমিনার ধরালাম।দৃষ্টি অন্যদিকে, কিন্তু কান খাড়া আছে ওদের কথোপকথনে।
“আপনি একটু দাঁড়ান, আমি এই পনের-বিশ মিনিটে আসছি জিনিস নিয়ে। পেমেন্ট ক্যাশে করবেন তো?”
তপন জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ । কিন্তু দ্য বেবী বেটার বী গুড!”
“একদম। কোন দুনম্বরি ডেলিভারী আমার থেকে পেয়েছেন কখনো?”
বলে তপন হাঁটা দিল বিবেকানন্দ পার্কের দিকের গেটের দিকে। পার্কে শঙ্করীপ্রসাদের বিশাল তাঁবু। সেখানে লোকজন যাওয়া আসা করছে। তপন দেখলাম রাস্তা ক্রস করে ঈশারায় ডাকল কমলা গার্লসের গেটের সামনে মোটরসাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনকে।মেরুন টি-শার্ট একজনের, অন্যজনের সবুজ শার্ট। ওদের মধ্যে নীচু স্বরে কিছু কথা হয়ে গেল। এবার মেরুন টিশার্ট শঙ্করীপ্রসাদের তাঁবুতে চলে গেল আর তপন সবুজ শার্টের মোটরবাইকের পেছনে চড়ে রওনা দিল।
নাঃ, এবার তো মুসকিল! আমার সাসপেক্টরা তো দুভাগে ভাগ হয়ে গেল। দু জায়গায় একসঙ্গে যাই কি করে! ঐ শঙ্করীপ্রসাদের তাঁবুতে ঢুকতে পারলে ভাল হত , কিন্তু আমাকে তো এখন এখানে দাঁড়িয়ে ক্রিকেটার ছোকরার ওপর নজর রাখতে হবে। তপন ফিরবে শীগ্গীর। এই জন্যই বলেছিলাম একটা সাগরেদ লাগে…কিন্তু এখন পাই কাকে…
উল্টোদিকের ফুটপাথে ঐ কলেজের ছেলেমেয়েদের দলটা ফুচকা খাচ্ছে, তার মধ্যে ওটা পুকাই না? হা হা হি হি করতে ব্যস্ত। ডাকব নাকি? হবে কি ওকে দিয়ে? খুব বাচাল আর ছটফটে, কিন্তু বুদ্ধি আছে মাথায়…কার বোন দেখতে হবে তো! একটু গাইড করলে ওকে দিয়ে হতেও পারে।
দেখা যাক ডাকলে কায়দা করে আসতে পারে কিনা!
“আমি এস আই সাত্যকি দাস। প্লেন ক্লোদসে আছি।আপনি রূপমঞ্জরী ভট্টাচার্য তো? আপনার সঙ্গে একটু দরকার ছিল। একটু কথা বলা যাবে?”
আমি সোজা গিয়ে জিজ্ঞেস করি।
“আরে, আপনি ওকে চিনলেন কি করে? আর কথাটাই বা কি”? দাড়িওয়ালা ছেলেটা বলে উঠল।
“আই কার্ড দেখান তো আগে”। চশমা চোখে ঝোলা কাঁধে ছেলেটা এবার বলল।
বাঃ আজকালকার ছেলে মেয়েরা দেখছি বেশ সচেতন। পুলিশের নাম শুনলেই হড়বড় করে সব বলে দেয় না। দেখে ভাল লাগল।
“অবশ্যই।”
আমি আমার ফেক আইডিটা বাড়িয়ে দিলাম।
“তবে কথাটা তো সবার সামনে বলা যাবে না।”
দাড়িওয়ালা আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু পুকাই তার আগেই বলে উঠল,
“দ্যাটস ওকে সৈকত। আমি সাত্যকি বাবুকে চিনি। ফেলুদার মাধ্যমে আলাপ হয়েছিল। তোরা বরং এগিয়ে যা, আমি ওঁর সঙ্গে কথাটা বলে নিই। কাল দেখা হবে।”
গুড। মেয়েটার উপস্থিত বুদ্ধি আছে। হতে পারে কাজ ওকে দিয়ে।
“চল তবে, আমরা কেটে পড়ি, আদিল।রূপু মামনি এখন তো আর যে সে লোক নয়, খোদ ফেলুদার শালী। কলকাতা পুলিশের আদ্ধেক লোককে ও চেনে।”
সৈকত আওয়াজ দেয়।
“ঔক্কে রূপু। কাটলুম আমরা। তোর আর তাহলে পার্থদাকে আজ ঝাড়ি করা হল না—“
ঝোলা কাঁধে আদিল মাঝপথে থেমে গেল পুকাই এর কড়া চাউনিতে। কটমট করে তাকাতে দুই বোনেই ওস্তাদ। ফ্যামিলি ট্র্যাডিশন বোধহয়!
পুকাইকে নিয়ে একটু দূরে যেতেই ও বলে উঠল,
“কি ব্যাপার ফেলুদা? ছদ্মনাম! তদন্ত করছ তুমি?”
“হ্যাঁ । আর তাতে তোর একটু হেল্প চাই। পারবি?”
“আরিব্বাস! কেন পারব না? বল কি করতে হবে?”
“আমি লেকের গেটের কাছে বাইরে দাঁড়িয়ে একজনের ওপর নজর রাখছি। কিন্তু এখানে এক্ষুণি ভেতরে গেছে অন্য একজন। সে কার সঙ্গে দেখা করছে, কি করছে, কি বলছে সেগুলো জেনে এসে বলতে পারবি আমাকে?”
“কি রকম দেখতে? চিনব কি করে?”
“মেরুন টিশার্ট আর জিনস। পাঁচ ফুট আট মত। দোহারা চেহারা।ক্লীন শেভন। লেফট আর্মে স্নেক ট্যাটু। পানমশলা খায়।বুকপকেটে সানগ্লাস গোঁজা।”
“ঠিক হ্যায়। তুমি যাও তোমার কাজে, আমি ভেতরে যাচ্ছি।”
“তোর হয়ে গেলে বেরিয়ে এখানেই থাকবি। আমি আধঘন্টার আগেই ফিরব।”
পুকাই চলে গেল ভেতরে। আমি ফিরলাম লেকের গেটের দিকে, ক্রিকেটার ছোকরা এখনো ওখানে দাঁড়িয়ে। একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সবে একটা চারমিনার ধরিয়েছি, এমন সময় ফিরে এল তপন…ঠিক সতের মিনিট পরে।
“এই নিন।” তপন একটা প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়েছে।
“দেখে নিন, সব ঠিক আছে কিনা।”
ক্রিকেটার ছোকরা প্যাকেটটা চোখের কাছে নিয়ে দেখে মনে হল খুশী হয়েছে।
“ইয়েস। দিস বেবী ইজ পারফেক্ট।এবার দেখি টীম সিলেকশনে কি করে আমাকে বাদ দেয়!”
কি মুশকিল! এতো দেখি রেড হেরিং! বেবী তাহলে ঐ প্যাকেট? সম্ভবতঃ বেআইনী ড্রাগ। সিলেকশন বলছে যখন, তখন কোন ডোপিং স্টেরয়েড হবে।
“ভেরি স্যরি…কিছু মনে করবেন না!” আমি অন্যমনষ্কতার ভান করে ছেলেটিকে একটা ধাক্কা দিলাম। প্যাকেটটা ওর হাত থেকে পড়েই যাচ্ছিল। আমি হাত বাড়িয়ে লুফে নিয়ে ওটা ওকে ফেরত দিয়ে দিলাম। ভেতরে কাচের কিছু আছে মনে হল। ইঞ্জেকশনের আ্যম্পুল হবে। নিশ্চিত স্টেরয়েড।
কিন্তু আই আ্যম নট ইনটারেস্টেড ইন দ্যাট রাইট নাও! মুৎসুদ্দিকে খবর দিয়ে দেব কাল, ওরা যা পারে করবে।এর মধ্যে পড়ার সময় নেই আমার এখন। গুবলুকে খুঁজতে হবে। দেখি পুকাই কিছু খবর করতে পারল কিনা!
পার্কের সামনে যেতেই দেখি বেরিয়ে আসছে পুকাই । চশমার আড়ালে চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে। নিশ্চয়ই কিছু পাত্তা করতে পেরেছে।
“কি ব্যাপার? কিছু খবর পেলি?”
“হ্যাঁ , বলছি চল। ঐ দোকানে বসে রোল খেতে খেতে । তোমার কাজ করে দিলাম। খাওয়াও আমাকে এখন।”
“কাজ কতটা করেছিস সে তো জানি না এখনো। তবে খাওয়াতে পারি রোল। চল।”
কপাল ভাল ব্যস্ত দোকানে একটা টেবিল জুটে গেল। পুকাইএর জন্য রোল আর লস্যি অর্ডার দিলাম। আমি নিলাম ব্ল্যাক কফি।
“তুমি খাবে না কিছু”? রোলে কামড় দিয়ে বলল পুকাই।
“না। বললাম তো সেদিন কার্ব বেশী খাই না আমি। কি হল ভেতরে বল।”
“শোন, ভেতরে গিয়ে দেখি ঐ মেরুন টিশার্ট একেবারে স্টেজে মাতাজীর কাছে…”
“দাঁড়া, দাঁড়া । ওভাবে বললে হবে না। স্টেজ মানে এক্স্যাক্টলি কি? মাতাজীই বা কে? ভেতরের সেট আপ, লোকজনের পরিচয় সব সিস্টেমেটিক্যালি দে।”
“ও আচ্ছা, দাঁড়াও তাহলে। ভেতরে ঢুকলে তো বিশাল জায়গা, পুজোর প্যান্ডেলের মত। তা প্যান্ডেলে মনে কর যেখানে ঠাকুর থাকে সেরকম জায়গায় একটা স্টেজ মত। সেখানে মধ্যমণি এক মহিলা, তাকেই সবাই মাতাজী বলছিল। পার্বতীমাঈ মাতাজী।”
“শঙ্করীপ্রসাদ ছিল না স্টেজে?”
“না। ও নাকি খুব হাই প্রোফাইল, রোজ আসে না। ভি আই পি রা এলে শুধু আসে। সেদিন সবাই ঢুকতেও পায় না। অনেকে বলাবলি করছিল, আমি শুনলাম।”
“সব লোক কি ঐ স্টেজ অব্দি যাচ্ছিল?”
“না। কিছু দূর অব্দি অবারিত দ্বার। তারপর একটা দড়ির ব্যারিকেড। তারপরে শুধু সিলেক্টেড লোকেরাই ঢুকতে পারছে। তোমার মেরুন টিশার্ট কিন্তু ঐ সিলেক্টেড দলে। সোজা ভেতরে চলে গেল।”
“হুম। তো তারপর কি হল?”
“গিয়ে তো স্টেজের কাছে রাখা প্রথম সারির চেয়ারে বসে গেল। কিছুক্ষণ তো আর কিছু হল না, খালি ভজন কীর্তন। বোর হয়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় দেখলাম ধুতি আর শেরওয়ানি পরা মোটা মত এক মারওয়ারি এল। খুব ভি আই পি মনে হল। সোজা স্টেজে উঠে গেল।”
“তারপর?”
“দূর থেকে যা দেখলাম , ভেট চড়াল, মাতাজীকে প্রণাম করে খুব হেসে হেসে কথা বলল। তারপর স্টেজের পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নেমে, মাতাজীর সঙ্গে ভেতরের ঘরে চলে গেল। যাবার আগে মেরুন টিশার্টকে ঈশারায় ডেকে নিল। ও-ও তখন ভেতরে চলে গেল।”
“তারপর আর নিশ্চয়ই কিছু জানতে পারিস নি?”
“পেরেছি ফেলুদা! আমি তো আন্দাজ করলাম ঐ ভেতরের ঘরের একটা দেওয়াল পাশের টয়লেটের লাগোয়া।আর সব দেওয়ালই তো ত্রিপলের, কান পাতলে নিশ্চয়ই ভেতরের কথা সব শোনা যাবে, তাই সেদিকে চলে গেলাম।”
“সাবাশ তোপ…আই মীন পুকাই!”
“শোন না, আসল কথা তো এখনো বলিনি। ওদিকে গিয়ে পেছনের দিকে একটা গলি মত জায়গায় দাঁড়িয়ে কান পাততে শুনি ঐ মাতাজী বলছে ‘উস বাচ্চে কো ভেজ দিয়া হ্যায় না? চৌধুরাইনকে পাস?”
তাতে অন্য জন, মনে হয় মেরুন টিশার্ট বলল ‘হাঁ আপ বেফিকর রহিয়ে।’
তারপর ঐ মহিলা কন্ঠ বলল, ‘ঠিক হ্যায়। ম্যায় ভী যাউঙ্গি উধার।শায়দ ইয়ে ডিল মেরে রহতে হুয়ে হি বন যায়ে…’
তখন ঐ মারোয়ারী বোধহয় বলল, “ আচ্ছি বাত হ্যায়। ম্যায় ভি যাউঙ্গা, মেরা সামান আকে পড়া হুয়া হ্যায়।”
তারপর আবার মহিলা কন্ঠ বলল, “তো ফির হোলি ট্রিনিটি ভি দর্শন হো যায়েগা।”
“ব্র্যাভো! আরো কিছু শুনেছিস নাকি?”
“না গো। এইটুকু শুনেছি আর হঠাৎ কোত্থেকে এক জমাদারনী না কে এসে ‘আপ কিঁউ ইধার খাড়ি হ্যায়, কৌন হ্যায় আপ’ এই সব বলে চেঁচাতে লাগল। সেই শুনে মেরুন টিশার্ট আর মাতাজী বেরিয়ে এল। কেলেঙ্কারি ব্যাপার!”
“তুই কি বললি ওদের?”
“ক্যুইক থিংকিং! কাঁদকাঁদ গলায় বললাম আমাকে কেউ ব্যারিকেডের ওদিকে যেতে দিচ্ছে না…এদিকে আমার খুব দরকার, বয়ফ্রেন্ড ব্রেকআপ করে দিয়েছে, মাতাজীর হেল্প চাই ট্যু গেট হিম ব্যাক!”
“বিশ্বাস করল?”
“মাতাজী বোধ হয় একটু সন্দেহ করেছিল…শার্প চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল কোন কলেজ আর বয়ফ্রেন্ডের নাম কি । কলেজ আসলটাই বলে ফেলেছি। যাদবপুর।”
“আর বয়ফ্রেন্ডের নাম?”
“ইয়ে, মানে তুমি আবার রাগ করবে না তো?”
“আমি রাগ করব কেন?”
“আসলে, মানে, কেন জানি না তোপসের নামটা মাথায় এসে গেল ফস করে…”
“হুম!”
“কি আশ্চর্য ভেবে দেখ একবার…আমার তিনটে ক্রাশ, ক্লাস ভর্তি ছেলেরা বন্ধু, অথচ কারো নাম মাথায় এল না! বোধহয় তুমি আমাকে তোপসের কাজটা আমাকে দিয়েছ বলে ওটাই মাথায় ঘুরছিল, তাই না?”
“তাই হবে। তা তোর নকল সমস্যার সমাধান কিছু বাতলে দিল না?”
“ও দেখেছ, বলতেই ভুলে যাচ্ছিলাম। এই দেখ, একটা শুকনো হত্তুকী কাগজে মুড়িয়ে দিয়ে বলল এটা মুঠোয় নিয়ে দেবী মার ব্রত করলে বয়ফ্রেন্ড ফেরত আসবে। দেবী মা মানে কি ফেলুদা? দুর্গা? নাকি কালী?”
“জানি না…দেখি, দেখি! কাগজটা দেখা তো ভাল করে…কোথায় পেলি কাগজটা?”
“এটা তো টিস্যু, মাতাজীর ঝুলিতে ছিল…।”
“দেখেছিস এই ওয়াটার মার্কটা? টিস্যুর মাঝখানে?”
“ওয়াটার মার্ক…? না তো! কই দেখি…! আরিব্বাস! এটা তো আ্যন্খ (Ankh) না ফেলুদা? ইজিপ্সিয়ান সিম্বল অফ ফার্টিলিটি আ্যন্ড লাইফ?”
নাঃ, মেয়েটার পড়াশোনা আছে। কিন্তু আবার মিশরীয় চিহ্ন !
“ঠিক বলেছিস! এটা আমি নিলাম। তুই হত্তুকিটা ফেলে দিতে পারিস!”
“ধুর! ফেলে দিলে আমার বয়ফ্রেন্ড পালাবে না?”
রোলে শেষ কামড় দিয়ে বলে উঠল পুকাই।
“পুকাই, যদি ভেবে থাকিস যে তুই মণির বোন বলে ডেঁপোমি করলেও গাঁট্টা খাবি না, তাহলে সেটা ভুল!”
“আচ্ছা, আচ্ছা ! হুমকি দিও না তো ভিলেনদের মত। কাজ করে দিলাম তোমার এত…”।
“তা অবিশ্যি ঠিক। খুব ভাল কাজ করেছিস। ফুল মার্কস। তোপসেকে বলে দেব মন দিয়ে কাজ না করলে ওর চাকরী বেহাত হয়ে যেতে পারে। চল, তোকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে আমি ফিরব।”

***

পর্ব ৬ঃ কলহের ক্ল্যু

আমার পরীক্ষা শেষ। এবার পুজোর ছুটি পড়ে যাবে। দুপুরে যেতে পারলাম না ফেলুদার সঙ্গে সেটাই খারাপ লাগছে। ও উঠে পড়ে লেগেছে এটার ব্যাপারে। হাতে যে দুটো কেস ছিল তার একটাকে কলকাতার আর এক উদীয়মান ডিটেক্টিভ রাজেশ রাস্তোগীকে দিয়ে দিয়েছে। অন্য মক্কেল সেলিম খানকে বলে দিয়েছে ওর দেরী হবে, চাইলে উনি অন্য গোয়েন্দার কাছে যেতে পারেন। খান সাহেব অবশ্য বলেছেন ওঁর ফেলুদাকেই চাই, উনি অপেক্ষা করবেন। মণিদি কাল খবর পেয়েই ভাস্বরবাবুদের বাড়ি চলে গেছিল। ওখানেই ছিল রাতে।
সন্ধেবেলা আমরা কথা বলছিলাম বাইরের ঘরে বসে।পুকাইকে নিয়ে ও যে খবরগুলো সংগ্রহ করেছে সেগুলো একটু আগে বলেছে আমাকে। ডেঁপো মেয়েটা তাহলে একেবারে অকম্মার ঢেঁকি নয়। যদিও আমার মনে হয় শী ওয়াজ জাস্ট লাকি। আর ঐ বয়ফ্রেন্ডের নাম করে আ্যকটিং করা তো ওর ভালই আসে। সব সময় তো আর এ জিনিস খাটবে না। অবিশ্যি আমি আর ফেলুদাকে একা ছাড়ছিও না। আজ নেহাৎ পরীক্ষা ছিল তাই!
“কিছু এগোতে পারলে ফেলুদা?”
“বিশেষ না রে তোপসে। একমাত্র ঐ শঙ্করীপ্রসাদের লিঙ্কটা ছাড়া।”
“পুকাই এর শোনা ঐ ক’টা কথা থেকেই কি শঙ্করীপ্রসাদের লিঙ্কটা প্রমাণ হয়?”
“না, তা অবিশ্যি হয় না। কোন কিছু প্রমাণের জায়গাতেই এখনো পৌঁছইনি। কিন্তু যোগটা এসে পড়ছে তাও ঠিক। তপন হয়তো ইললীগাল ডোপিং ড্রাগের ব্যাপারে যুক্ত। কিন্তু ও তো ঐ মেরুন টিশার্টকেও চেনে, যে আবার মাতাজীর কাছের লোক। ওরা কোন বাচ্চাকে চৌধুরাইনের কাছে নিয়ে যাবার কথা বলছিল। কাজেই কিছু ঘাপলা তো আছেই।”
“কোন মুক্তিপণের ফোন টোন এসেছিল?”
“না। সেটার জন্য হলে আরো বড়লোকের বাচ্চা টার্গেট করত।”
“ডোপিং ড্রাগের কথা কি বলছিলে?”
মণিদি এসে বসেছে। ফেলুদা ওকে তপনের ব্যাপারটা বলল।
“ইন্টারেস্টিং! ভাস্বরের হাসপাতালে গত দু মাসে তিনটে কেস এসেছিল। কলকাতার বিভিন্ন ছোট ছোট ক্রিকেট ক্লাবের থেকে তিনজন ছেলে আসে যারা কোন হোম গ্রোন ডোপিং সাবস্ট্যান্স ব্যবহার করে অসুস্থ হয়ে পড়ে।”
“হোম গ্রোন মানে?”
“মানে বাড়িতে বা ছোট খাট কোন ল্যাবে তৈরী ডোপিং স্টেরয়েড। কোন বড় ওষুধ কোম্পানীর বানানো নয়।”
“বড় ওষুধ কোম্পানীরা আদৌ বানায় এ জিনিস?“
“দেখ, স্টেরয়েড মাত্রেই তো আর ব্যানড জিনিস নয়। এগুলো তো ভ্যালিড ওষুধ। যেমন ধর টেস্টোস্টেরন এনানথেট একটা পাউডার ওষুধ। হাইপো টেস্টোস্টেরনের অসুখে কাজে লাগে, আ্যজ পার ডক্টরস আ্যডভাইস। কিন্তু অনেকে এটা চোরাই পথে পাচার করে দেয় আন্ডারগ্রাউন্ড ডীলারদের কাছে, যেটা থেকে লোকে নিজেদের ল্যাব এ লিক্যুইড স্টেরয়েড ইন্জেকশন বানায়।”
“সেটা বানানো সম্ভব বাড়িতে বা ছোট কোন ল্যাবে?”
“হ্যাঁ ।অনেকেই করে। টেস্টোস্টেরন এনানথেট ছাড়া একটু বেঞ্জাইল বেঞ্জয়েট আর বেঞ্জোয়িক আ্যলকোহল শুধু লাগে। সহজেই যে কোন কেমিস্টের দোকানে পাওয়া যায় ওগুলো। এছাড়া লাগে কয়েকটা বীকার, ডিসটিল ওয়াটার, আ্যমপুল আর যে কোন একটা তেল, যেমন তিল তেল। উৎপাদনের পরিমাণ খুব বেশী হবে না এই যা।”
“আর তারপর সেই ইন্জেকশনগুলো চোরাইপথে চলে যায় বিভিন্ন খেলোয়াড়দের কাছে, যারা ডোপিং করতে চায়। তাই তো?”
“যারা বাড়িতে বানায় তারা মূলতঃ এটা শুধু নিজেরা ব্যবহার করে। কিন্তু যদি একটু বড় সেট আপ থাকে তো বাইরে বেচতেও পারে। এটা বেআইনী তো বটেই, বিপজ্জনকও। কোন ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া এভাবে ইন্জেকশনে ওভারডোজ বা ফেটাল সাইড এফেক্টও হতে পারে।”
“এই ওভারডোজের কেসই কি ভাস্বরের কাছে এসেছিল?”
“হ্যাঁ। ও তো টক্সিকোলজিতে আছে। আমি জানি ও কেসগুলো এরকম পরপর হচ্ছে বলে নারকোটিকস ব্যুরোকে জানিয়েছিল।”
“তাতে তো যারা এগুলো বানায় তাদের ওপর পুলিশের নজর পড়বে।তারা শোধ নিতে চাইতে পারে তো?”
“পারে। যদিও ভাস্বরকে ব্ল্যাকমেইল করে লাভ হবে না। কারণ ও সব এভিডেন্স দিয়েই দিয়েছে। তবে প্রতিশোধ চাইতেই পারে।”
“তাহলে কি তপনকে আবার জেরা করলে…” আমি বলে উঠি।
“না রে তোপসে। তপন এই খেলায় শুধুই একটা বোড়ে।পেছনে আরো রাজা-মন্ত্রীরা আছে। তাদের কাছে পৌঁছতে হবে…” ওর কপালে বিষম ভ্রূকুটি।
“সেদিন লেকের যেখান থেকে গুবলু গায়েব হয়েছে সেখান থেকে শঙ্করীপ্রসাদের ঐ তাঁবু কিন্তু খুব কাছে। কেউ ঘুমন্ত বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গেলে খুব চট করেই ওখানে পৌঁছে যাবে বেশী লোকের চোখে না পড়েই…”
“এক্সসেলেন্ট তোপসে! আমিও এটাই ভাবছিলাম!”
“সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়ে গিয়ে ওখানে খুঁজলে হয় না?”
“উঁহু! ২৪ ঘন্টার বেশী হয়ে গেছে। ওখানে রাখবে না, অন্য কোথাও চালান হয়ে গেছে আগেই। হয়তো ঐ চৌধুরাইনের কাছে। তাছাড়া ওরকম হাই প্রোফাইল বাবাজীর ডেরায় সার্চ করতে হলে শক্ত প্রমাণ চাই। নাহলে পার্লামেন্ট অব্দি কেঁপে যাবে।”
“তাহলে এখন কি করবে?”
“ভাবতে হবে রে তোপসে, অনেক কিছু জট পেকে আছে! এখন হাতে শুধু কয়েকটা সুতো আর ফ্যাঁকড়া…বাবা শঙ্করীপ্রসাদ, মাতাজী, তপন, মারোয়ারি,মেরুন টিসার্ট, ডোপিং স্টেরয়েড , কিডন্যাপার…এরা কি একসঙ্গে যুক্ত নাকি আলাদা আলাদা….ঐ মিশরীয় চিহ্নগুলোই বা বারবার এসে পড়ছে কেন? কিসের ইঙ্গিত ওগুলো?…আর ঐ চৌধুরাইনটা কে সেটা জানাটা বিশেষ দরকার…”
ফেলুদার কপালে ভাঁজ, বিড়বিড় করছে।
এর পরের স্টেজ আমি জানি। ঘরে বসে সিগারেট ধরিয়ে ভাববে, খাতায় লিখবে, পায়চারি করবে আর কারো সঙ্গে অন্য কোন ব্যাপারে কথা বলবে না। আমি জানি এই সময় ওকে বিরক্ত করা একদম বারণ।
তবে ভাবছিলাম এবার কি হবে, কারণ মণিদি তো আজ এবাড়িতে। ওকে তো আর আমার মত “এখন একদম বিরক্ত করবি না তোপসে, করলেই রামগাঁট্টা খাবি”, বলে ভাগিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিতে পারবে না। বাকী যে কেসগুলো গত মাসখানেকে দেখছিল সেগুলো এত জটিল ছিল না, ফলে এই পরিস্থিতিও আসেনি। দেখি, এবার কি করে!
বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। রাতের খাওয়ার পরে মণিদি দেখলাম হঠাৎ ওদের ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা বাবার স্টাডিতে গিয়ে বাবার সঙ্গে ইন্দো এরিয়ান সিভিলাইজেশন নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল! বাবাকে আর পায় কে…এ ব্যাপারে এত উৎসাহী শ্রোতা পেয়ে চালিয়ে গেল রাত্রি বারোটা অব্দি। তারপর মা এসে না থামালে হয়তো রাত্রি কাবার হয়ে যেত।
ততক্ষণে আমার পড়া শেষ হয়েছে, ঘুমোতে যাব ভাবছিলাম কিন্তু মণিদি এসে আমাকে ধরল।
“ক্যারাম খেলবে তপেশ?”
“এত রাতে? তোমার হাসপাতাল নেই সকালে?”
আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম ওদের ঘরের দরজা খোলাই আছে। পর্দার আড়ালে ফেলুদা মনে হচ্ছে ঘরেই। সুতরাং মণিদি কেন যে ওদিকে না গিয়ে মাঝরাতে ক্যারাম খেলতে চাইছে আমার মাথায় ঢুকল না।
“না, কাল আমার দুপুরে ডিউটি।তোমার ঘুম না পেয়ে থাকে তো চল খেলি।”
দেড়টা অব্দি খেলে তারপর বললাম, “মণিদি, এবার না ঘুমোলে আমার কাল কলেজ মায়া হয়ে যাবে।”
“ঠিক। তুমি গিয়ে শুয়ে পড়। গুডনাইট।” বলে দেখি ঘরের দিকে না গিয়ে বঙ্কিম রচনাবলী নিয়ে বসে গেল সোফায়।
“তুমি ঘুমোবে না?” জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
“এখনো না। দেখি পড়তে পড়তে যদি ঘুম পায় তখন…”
ব্যাপার সুবিধের বুঝছি না। ঘুম না এলেও তো ঘরে বসেই পড়া যায়। বিশেষ করে ঘরে অন্যজনও যখন এখনো জেগে আছে আলো জ্বালিয়ে!
আমি আর না ঘাঁটিয়ে শুতে চলে গেলাম।
প্রদোষ মিত্রের কথা
————————-
নাঃ, মণিকে নিয়ে আর পারা যায় না। সিগারেট খাওয়া যে ওর না পসন্দ সেটা তো জলের মত পরিস্কার। প্রথমে ভেবেছিলাম ও হয়তো স্মোকিং এর অপকারিতা নিয়ে ডাক্তারী জ্ঞান দেবে। কিন্তু সেদিকে গেল না, ওর টেকনিক আরো উঁচুদরের। রাতে খাবার পরে ঘরে ঢুকে সবে সিগারেটটা ধরিয়েছি, গটগট করে বেরিয়ে কাকার স্টাডিতে গিয়ে মহেঞ্জোদড়োয় ঘোড়া ছিল কিনা সেই নিয়ে তর্ক জুড়ে দিল। মাঝরাত অব্দি এই চালিয়ে তারপর তোপসের সঙ্গে ক্যারাম পিটল দেড়টা পর্যন্ত।তারপর এখন প্রায় আড়াইটা বাজে, এখনো দেখি বই নিয়ে সোফায় বসে আছে। আমি অবিশ্যি একটু একা, শান্তিতে ভাবতেই চাইছিলাম কিন্তু ঘরে কেউ না থাকলেও এটাকে শান্তি বলা যায় কিনা আমার সন্দেহ আছে। এর একটা হেস্ত নেস্ত করতে হবে!
“কি ব্যাপার বল তো তোমার মণি? সিগারেটের ধোঁয়ায় কি ঘরটা তোমার বসবাসের অযোগ্য হয়ে গেছে নাকি?”
“বাঃ, কি বুদ্ধি গো তোমার! ঠিক যেন গোয়েন্দা।” চোখটা বই থেকে না তুলেই জবাব দিল।
“তুমি জান আমি আজকাল ঘরে প্রায় খাই না, তোমার জন্য। কিন্তু আজ আমি একটু বিশেষ চিন্তায় ছিলাম, গুবলুর ব্যাপারটায়, আর তাই…”
“…আর তাই বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিতে হচ্ছিল তাই তো? লাভ হল কিছু, ধোঁয়া দিয়ে?”
“এখনো না, কিন্তু…”
“এক্স্যাক্টলি!”
বইটা বন্ধ করে তাকাল এবার আমার দিকে।
“ওভাবে বুদ্ধি খোলে না। ইউ নো দ্যাট। ইটস জাস্ট আ্যন আ্যডিকশন। তুমি এক্সট্রীমলি ট্যালেন্টেড। তোমার মত ক্যালিবারের একজন গোয়েন্দার কেস সলভ করতে এরকম অ্যাডিকশনের সাহায্য নেবার দরকার হয় না।”
“ছেড়ে দিতে বলবে তো? সব বৌরা যেমন বলে?”
“ছাড়া উচিত কিনা তুমি ঠিক করবে নিজে, আ্যজ এ রেসপন্সিবল আ্যডাল্ট।বরের চারিত্রিক উন্নতি সাধন তো আমার প্রাইমারী অকুপেশন না! আই হ্যাভ বেটার থিঙ্গস ট্যু ডু। আই ডোন্ট ওয়ান্ট ট্যু বী দ্য ন্যাগিং ওয়াইফ!”
“আ্যন্ড ইয়েট ইউ আর ডুয়িং জাস্ট দ্যাট। মাঝখান থেকে কাকাকে, তোপসেকে মাঝরাত্রি অব্দি জ্বালিয়ে বই পড়ার ভান করার কোন দরকার ছিল না!”
“বই পড়ার ভান মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি কখনো করে না”,
মুখটা লাল হয়ে গেছে রাগে।নাকের পাটা ফুলছে, জ্বলজ্বলে চোখদুটো আরো বড় হয়ে গেছে। ফ্যানের হাওয়ায় গালে উড়ে এসে পড়া দুটো চুলের গুছিকে ঝটকা মেরে সরিয়ে দিল।
“দেবী চৌধুরানীটা আবার পড়ছিলাম, অসম্ভব এনগেজিং…”
“কি..? কি পড়ছিলে…”?
“দেবী চৌধুরানী! বিশ্বাস না হয় পড়া ধর, ত্রিস্রোতা নদীতে বজরায় ব্রজেশ্বর আসা অব্দি পড়া হয়েছে। মন দিয়েই পড়েছি, ভান করিনি…”
“আঃ, মণি, ঝগড়াটা পরে কোর। মনে হয় অন্ধকারে একটু আলো দেখতে পেয়েছি….ত্রিস্রোতা, মানে তিস্তা..ইয়েস, অফ কোর্স। চৌধুরাইন ওয়াজ এ কোড ওয়ার্ড।ইটস নট এ পার্সন। ওটা একটা জায়গা, চৌধরাইন মানে দেবী চৌধুরানীর জায়গা…”
“তিস্তা…জলপাইগুড়ি! ঐ শঙ্করীপ্রসাদের একটা বিশাল আশ্রম আছে না ওখানে কোথায়?” মণিও এক্সাইটেড ।
“রাইট। জলপাইগুড়ি। প্রাচীন রংপুর জেলা এবং দেবীর চারণভূমি। বর্তমানে কাছেই নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশের বর্ডার। স্মাগলিং, ড্রাগস, মানুষ পাচার…এ সবের মধ্যে যদি শঙ্করীপ্রসাদ থাকে তো তার পক্ষে আদর্শ লোকেশন।”
“বাঃ , তাহলে তো তোমার ব্রেক থ্রু মিলে গেল।”
“হুম! বললাম তো বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দিলে কাজ হয়…”
“কি রকম?”
“মানে ধোঁয়া দিলাম বলেই তো তুমি রাগ দেখিয়ে বঙ্কিম রচনাবলী পড়তে বসলে আর সেই থেকে ক্ল্যু পেলাম…তিনটে প্রায় বাজে মণি, প্লীজ আর ভুগিও না, গিয়ে শুয়ে পড়।”
“তুমি?”
“আমি একটু আ্যাটলাসটা আর উত্তরবঙ্গ ভ্রমণটা নিয়ে বসব। ঐ অঞ্চলের ভূগোলটা একটু জানা দরকার। আর ইতিহাসটার জন্য সকালেই সিধু জ্যাঠার বাড়ি। আমার মন বলছে, হয়তো আমাদের কালই বেরিয়ে পড়তে হবে ডুয়ার্স।”
“আমাদের…?”
“হ্যাঁ। সবাই। লালমোহনবাবুর পুজোর লেখা প্রেসে চলে গেছে। তোপসের টেস্ট শেষ…তুমি…ছুটি নিতে পারবে না?”
“ডিফিকাল্ট। কিন্তু এটা ভাস্বর চন্দ্রিমার ব্যাপার। দরকার লাগলে নিশ্চয়ই যাব। যে করেই হোক।”
“তাহলে চল।হয়তো বুনো হাঁস ধাওয়া। কিন্তু না করলেও তো নয়। এতটুকু চান্স থাকলেও গুবলুর জন্য আমাদের সেটা নিতে হবে। তুমি গেলে সুবিধে হবে বলে আমার ধারণা।একটা বাচ্চা যখন জড়িত এটার মধ্যে, তখন একজন মহিলা সঙ্গে থাকলে কাজে দেবে”
“শোন, যেতে বল যাব, যদিও আমাদের ডিরেক্টর আমাকে কাঁচা খাবে এখন আবার ছুটি চাইলে, তাও! কিন্তু দয়া করে আমার ঘাড়ে ওসব বাচ্চা-টাচ্চা চাপাতে এস না তুমি…”
“আমি ছাড়া তোমার ঘাড়ে আর কে সেটা চাপাতে আসবে মণি? আর এলেও, আমারও তো একটা ছোটখাট দাবী আছে, সে আমি ফস করে ছাড়ছি না!”
“ডায়লগটা নষ্টনীড় থেকে ঝাড়লে না?”
“মাঝ রাতে প্রেয়সীর কাছে রবি ঠাকুর ঝাড়া সব বাঙালীর জন্মগত ক্ষাত্র অধিকার।”
“যা পার কর। আমার ঘুম পেয়েছে, চললাম।”
“যাও। বঙ্কিম রচনাবলীটাও রেখে যাও। আর হ্যাঁ, ঘরে বসে আর সিগারেট খাব না, প্রমিস!”
“বাব্বা! এত সদয় যে? ক্ল্যু পেলে বলে?”
“না। কারণ ওটা শুধু আমার ঘর নয়, আমাদের ঘর। তোমার যেটা এত অপছন্দ সেটা ওখানে করার রাইট কারো নেই, আমারও না!”
“তুমি বেশ ভালই জান হোয়াট ওয়ার্কস অন মি, ডোন্ট ইউ?”
“ওয়ান্স এগেইন, আমি ছাড়া আর সেটা কে জানবে?”

***

পর্ব ৭ঃ দেবী চৌধুরানী

পরদিন সকালে মনে হল ফেলুদা সারা রাত ঘুমোয়নি।
আমাকে দেখেই বলল, “আধ ঘন্টায় রেডি হয়ে নে তোপসে। আমি ততক্ষণ যোগব্যায়ামটা সেরে নি।”
“কোথায় যাবে তারপর ফেলুদা?”
“সিধুজ্যাঠার বাড়ি।”
“কেন?”
“শঙ্করীপ্রসাদের ব্যাপারে তথ্য চাই কিছু।”
আধঘন্টার মধ্যে আমরা তিন জনে বেরিয়ে পড়লাম। যেতে যেতে ফেলুদা কাল রাতের ডিসকভারীটা বলে দিল। কাল রাতে ঝগড়া করে মণিদির দেবী চৌধুরানী পড়া এরকম কাজে লেগে যাবে কে জানত! (ঝগড়া তো হয়েছিল নিশ্চিত, যদিও কারণটা জানি না। তবে এখন তো দেখছি আবার সব ঠিকঠাক!)
সিধুজ্যাঠার বাড়ি যেতে আমার বেশ লাগে। ফেলুদাকে উনি খুব ভালবাসেন, আমাকেও। আর জানেন না হেন জিনিস তো নেই। সব সময় ওখানে গেলে আমাদের যা জানার চটপট জানা হয়ে যায় দিব্যি মজার সঙ্গে।
কিন্তু আজ আমার একটু চিন্তা হচ্ছে, মণিদি সঙ্গে আছে বলে। আসলে সিধুজ্যাঠা এত ভাল, এত জ্ঞানী একজন লোক, অথচ দু একটা ব্যাপারে কেমন যেন একটু প্রাচীনপন্থী। নিজে অবিবাহিত, একাই থাকেন। বাড়িতে ঠাকুর, চাকর সবাই পুরুষ। মহিলা, বিশেষ করে আধুনিক মহিলাদের ব্যাপারে ওঁর কিছু রিজার্ভেশন আছে বলে আমার ধারণা। আমার এও মনে হয় যে ফেলুদা বিয়ে করায় উনি কিঞ্চিৎ ক্ষুণ্ণ, ওঁর কাছে হয়তো এটা কাজের প্রতি একনিষ্ঠতার অভাব বোঝায়। আমার মনে হয় না ফেলুদা এসব ঘুণাক্ষরেও কিছু আঁচ করেছে। কারণ সিধুজ্যাঠাকে ও অসম্ভব শ্রদ্ধা করে এবং ভালবাসে।ওর ক্ষুরধার বুদ্ধির কোন তুলনা নেই, কিন্তু সব মানুষেরই কিছু ব্লাইন্ড স্পট থাকে, যেটা তারা দেখতে পায় না। আর মণিদি তো বিয়ের সময় কেবল একবার দেখেছিল সিধুজ্যাঠাকে, ফলে ভাল মন্দ কিছুই জানে না।
ভাবতে ভাবতেই আমরা এসে গেলাম জ্যাঠার বাড়িতে।
“এস এস, ফেলু, তোমাদের কথাই ভাবছিলাম…ও বৌমাকেও নিয়ে এসেছ বুঝি! তা বেশ, তা বেশ।”
“হ্যাঁ, সিধুজ্যাঠা, এবারের কেস বেশ সিরিয়াস , …ফোনে বলিনি পুরোটা তখন…আসলে বাচ্চাটি মণির বন্ধুর ছেলে, ছ মাস বয়স, পাওয়া যাচ্ছে না পরশু থেকে…”
“কি সব্বনেশে ব্যাপার, আ্যঁ! তা তোমার বান্ধবীটিও তো ডাক্তার তোমার মত, তাই না বৌমা?”
“বান্ধবী, মানে চন্দ্রিমা? না, ও ডাক্তার না তো! স্কুলে পড়ায় ও।”
“কিন্তু ফেলু যে ফোনে বললে…”
“ও নিশ্চয়ই মীন করেছে ভাস্বর, মানে বাচ্চার বাবা! ভাস্বর আমার বেস্ট ফ্রেন্ড!”
“হুঁ। তা আমার কাছে কি জানতে চাও ফেলু?”
“ঐ যে বাবা শঙ্করীপ্রসাদ, ওর আশ্রম আছে না একটা ডুয়ার্সে? এক্স্যাক্টলি কোথায় সেটা?”
“ওটা হল শিকারপুরে। জলপাইগুড়ি থেকে একটু দূরে। এখন ওখানে চা বাগান। তবে আগে ওটাই ছিল বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গল। নামটা চেনা চেনা লাগছে ফেলু?”
“বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলেই তো ভবানী পাঠকের গড় ছিল বলে মনে করা হয়, তাই না?”
“একদম ঠিক। শিকারপুরে এখনো দেবী চৌধুরানীর মন্দির আছে।”
“ঐ মন্দিরের ব্যাপারে কিছু জানেন কি আপনি?”
“বল কি হে ফেলু, জানব না? দেবী চৌধুরানী হলেন সত্যিকারের বীরাঙ্গনা।তৎকালীন ইংরেজ সরকারকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরিয়েছিলেন ভবানী পাঠক আর তাঁর শিষ্যা দেবী চৌধুরানী। তাদেরই মন্দির জলাপাইগুড়ির শিকারপুরে।”
“কিন্তু এটা কি মিথ না সত্যি “?
“সব মিথের পেছনেই কিছু সত্যি থাকে। এটাও সেরকমই। যতদূর জানা যায় ভবানী পাঠক বলে একজন রবিনহুড টাইপের ডাকাত তখন ঐ অঞ্চলে ছিল। দেবী রানী বলে এক মহিলা দস্যুও ঐ সময় ছিল।তবে বঙ্কিমবাবু যেমনভাবে দেখিয়েছেন সে তো আর পুরো সত্যি হতে পারে না। উনি একসময় ঐ রংপুর অঞ্চলের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। তখনি তিনি সম্ভবতঃ দেবীর কাহিনী শোনেন। তারপর তিনি সেটা স্বকীয় মুন্সীয়ানায় দাঁড় করান। খাঁটি ভারতীয় তেজস্বিনী, যাকে বীরাঙ্গনা হতে গিয়ে আজকের আধুনিকাদের মত বিদেশী শিক্ষা, সহবৎ বা পোশাক পরিচ্ছদ কিছুই ধার করতে হয়নি।
“শুধু তাই না, গল্পের শেষে উনি যেভাবে নিজের অর্জিত সব শিক্ষা আর বলবীর্য বিসর্জন দিয়ে পুকুরঘাটে বাসন মাজায় আর স্বামীসেবায় লেগে পড়েছিলেন সেটাও আজকের আধুনিকারা ঠিক পেরে উঠতেন না!”
মণিদি বলে উঠল।ঠোঁটে বাঁকা হাসি।
ফেলুদার মনের মধ্যে যে কি চলছে মুখের ভাব দেখে তা বোঝার কিছু উপায় নেই।
“তুমি দেবী চৌধুরানী পড়েছ তাহলে, বৌমা। ভাল, ভাল! আমি ভেবেছিলুম বোধহয় বাংলা পড়ার বদভ্যাস তোমার নেই!”
“কেন জ্যেঠু? নামটা তো আমার মণিকঙ্কণা বাঁড়ুয্যে। বাড়ি কলকাতায়। বাংলা পড়ব না তো কি সোয়াহিলি পড়ব?”
“নামটি তোমার ভারী সুললিত বৌমা। তবে বিয়ের সময় শুনলুম মনে হল তোমার বাপের বাড়ির কেউ তোমাকে মিনি বলছে। ভাবলুম হয়তো শরদিন্দুর চেয়ে ডিজনির ওপরেই টানটা বেশী!”
“মিনি মাউস মনে হল জ্যেঠু, আর কাবুলিওয়ালা ভুলে গেলেন? শুনেছি আমিও ছোটবেলায় ওরকম বকবক করতুম!”
“তা বেশ! আসলে চাটুয্যে, বাঁড়ুয্যে, ঘোষ, বোস এসব তো আর কম দেখলুম না যাঁদের আবার বাংলাটা ঠিক আসে না, তাই…”
“তাই বঙ্কিমের ‘বাংলা সাহিত্যের আদরের’ নব্যবাবু ঠাউরেছিলেন বুঝি আমাকে? নাকি ‘একেই কি বলে সভ্যতা’র নবকুমার ভেবেছিলেন ?”
“হুম, বঙ্কিম, মধসূদন, রবীন্দ্রনাথ সবই যখন গুলে খেয়েছ তখন আমার ভুলই হয়েছিল মানতে হচ্ছে। আমাদের ফেলু যখন নিজে পছন্দ করেছে তোমাকে তখন এইটুকু আমার বোঝা উচিত ছিল। “
“আমার পড়াশোনার ক্রেডিটটাও ওকে দিয়ে দিলেন জ্যেঠু? ন্যায়তঃ এবং ধর্মতঃ ওটা আমার বা নিদেন পক্ষে আমার বাবা মায়ের পাওয়ার কথা ছিল না?”
বাপরে, এ তো দেখছি সম্মুখ সমর। যে কাজে এসেছি সেটা এখন হলে হয়!
“জ্যাঠা, ঐ শঙ্করীপ্রসাদ বাবাজীকে নিয়ে কবছর আগে একটা ডোপিং স্ক্যান্ডাল হয়েছিল, যতদূর মনে পড়ে…”
ফেলুদাও বোধহয় একই ভয় পেয়েছে আর তাই চটপট কাজের কথায় এসেছে।
“হুম, আমারও তাই মনে হচ্ছে। তবে শিওর হতে গেলে পেপার কাটিংগুলো দেখতে হবে। মনে হয় ছ সাত বছর আগেকার ঘটনা…”
“….তা বৌমা, আমার এখানে তো কোন সেরকম কেউ নেই যার সঙ্গে বসে তুমি ঐ তোমাদের ঘরকন্নার গপ্প টপ্প সব করতে পারবে…তবে তুমি বই-টই যখন পড় তখন এঘরের বইগুলোই একটু ঘেঁটে দেখ। আমরা বরং একটু ওদিকে আমার স্টাডিতে গিয়ে কাগজের কাটিংগুলো দেখে আসি।”
“আপনার স্টাডি কি খুব ছোট্ট জ্যেঠু?”
“না, তা তো নয়…কেন বলতো?”
“তাহলে আমিও যাই না?”
“চাইলে অবশ্যই আসতে পার। তবে আমি কেবল খুন, জখম, ডাকাতি, রাহাজানি এসব খবরের কাটিং জমাই তো, হয়তো তোমার ভাল লাগবে না, সেই ভেবে বলা আর কি!”
“ও আপনি ভাববেন না জ্যেঠু। ওসব ভাল না লাগলে কি আর আমি নিজে গোয়েন্দাকে পছন্দ করতাম? পছন্দটা তো কেবল ওর একতরফা নয়!”
ফেলুদা আর কখনো মণিদিকে এখানে আনবে না শিওর। মণিদিও ফিরে গিয়ে তুড়ি লাফ খাবে নির্ঘাত!
“হ্যাঁ , ছ সাত বছর আগে, মানে এইট্টি ওয়ান কিম্বা টু, তাইতো…” সিধুজ্যাঠা বিড়বিড় করতে করতে স্টাডির শেলফের দিকে হাত বাড়ান।
“এইট্টি টু দেখুন জ্যেঠু।” মণিদি বলে উঠল।
“কেন?”
“আমার মনে আছে তখন এশিয়ান গেমস চলছিল। শঙ্করীপ্রসাদের এক চ্যালা কুস্তিগীরদের সঙ্গে গেমস ভিলেজে থাকছিল।”
“ব্র্যাভো বৌমা! ঠিক বলেছ। ঐ চ্যালার নাম…”
“মনু রাউত ওরফে অঘোরানন্দ। খেলোয়াড়দের ডোপিং ড্রাগ সরবরাহ করতে গিয়ে ধরা পড়ে। মনে পড়েছে এখন আমার।”ফেলুদা বলে ওঠে।
“দাঁড়াও, খেলার ফাইলগুলো বড় একটা লাগে না বলে একদম উঁচুতে আছে…এদিকে ঘরাঞ্চিটা কাল সারাতে নিয়ে গেছে। দেখি অন্য কোন মই পাওয়া যায় কিনা…জনার্দন”…
“মই লাগবে না জ্যেঠু,” বলতে বলতে মণিদি ছোট টুলটায় পা দিয়ে বড় সেক্রেটারিয়েট টেবলে উঠে পড়েছে…
“আহা কর কি…ফেলুকে দাও না, ও লম্বা তো তোমার চেয়ে…”
“হ্যাঁ। আর ভারী। চান কি আপনার টেবল, শেলফ সব হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ুক?” বলতে বলতে জানলার গ্রিলে একটা পা দিয়ে মণিদি নামিয়ে আনল ৮২র খেলার ফাইল।
“হ্যাঁ,এই তো, মনু রাউত এশিয়াড ভিলেজে কি একটা ডি-বোল সাপ্লাই করতে গিয়ে ধরা পড়ে। “
সিধুজ্যাঠা বলে ওঠেন।
“ডায়ানাবোল, সংক্ষেপে ডি-বোল।মেটানডিয়েনোনের একটা ব্র্যান্ডনেম। ওটা একটা অ্যানড্রোজেন আ্যন্ড আ্যনাবলিক স্টেরয়েড”। মণিদি বলে ওঠে।
“স্টেরয়েড, মানে তো ব্যানড ড্রাগ, তাই না?” সিধু জ্যেঠার প্রশ্ন।
“সব স্টেরয়েড তো আর ব্যানড না! কিন্তু এটা বা সিমিলার অ্যানড্রোজেন আ্যন্ড আ্যনাবলিক স্টেরয়েড যেগুলো পারফরম্যান্স বাড়ায় বাই মিমিকিং টেস্টোস্টেরন সেগুলো বেশীরভাগ খেলাতেই ব্যানড।”
“ঐ রাউত গেমস ভিলেজে ঢুকল কিভাবে? বলেছে কিছু সেটা ঐ রিপোর্টে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
“হ্যাঁ, এই তো! ঢুকেছিল স্পিরিচ্যুয়াল গুরু হিসেবে। আ্যথলীটদের মেডিটেশন ইত্যাদিতে সাহায্য করার নামে। শঙ্করীপ্রসাদের চেলা কিনা! যোগাযোগ উঁচুতলা অব্দি।” জ্যাঠা উত্তর দিলেন।
“কিন্তু এই ঘটনার পরে শঙ্করীপ্রসাদ ধরা পড়েনি?”
“না ফেলু, সেটাই তো মজা! রাউত কনফেস করে যে হি আ্যক্টেড আ্যলোন, আ্যজ এ লোন উলফ…শঙ্করীপ্রসাদ নাকি এ ব্যাপারে কিছুই জানত না!”
“লোন উলফ, মাই ফুট! হয় কোনদিন? কোত্থেকে পেল ঐ ব্যানড সাবস্ট্যানস? সব ভেতরে ভেতরে যোগসাজস।” মণিদি বলে উঠল।
“সে তো সবসময় বৌমা! শঙ্করীপ্রসাদের কুকীর্তি তো শুধু এটা নয়…সব কথা তোমার সামনে বলা যায় না, কিন্তু ‘৭৯ -এ ওর বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ এসেছিল…”
“জানি। ঐ ওর আলিবাগের আশ্রমে কয়েকজন বিদেশী মহিলা ভক্তকে সিস্টেমেটিকালি রেপ আ্যন্ড আ্যবিউজ করা হত তো? সেটা বলা আবার যাবে না কেন আমাকে?”
“তুমি বেশ খোঁজ খবর রাখ দেখছি।”
“হ্যাঁ । একেই আমার দেব দ্বিজে ভক্তি কম। তার ওপর এসব ভন্ডামী দেখলে হাড়টা জ্বলে যায়।”
“ঐ কেসটা শেষ পর্যন্ত কি হল জানেন?” ফেলুদার প্রশ্ন।
“মেয়েগুলি…তিন জন বোধ হয় আমেরিকান, একজন জার্মান, একজন সুইস…তাদের ফেরৎ পাঠানো হয়। কিছুদিন খবরের কাগজে হৈ হৈ হল, তারপর আবার ঐ দু জন মালী না কেয়ারটেকারের ঘাড়ে দোষ দিয়ে ব্যাপারটা ধামাচাপা দেওয়া হয়।”
“এই ছবিটা কিসের জ্যাঠা?” ফেলুদার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, আঙুল কাটিং এর ফাইলের একটা খোলা পাতায়।
আমি ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম নীচের স্কেচের মত একটা ছবি।
“এটা তো ইলুমিনাতি সিম্বল মনে হচ্ছে, অথচ ঐ সঙ্গের চিহ্নগুলো…?” ও আবার বলে ওঠে।
“এটা তো শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রমের সীল। দেখনি তুমি আগে? আজকাল অবশ্য দেখি কম, ওর নিজেরই মুখ সর্বত্র। ঠিকই বলেছ এটা একটা নানা জিনিস মেশানো একটা হচপচ চিহ্ন। ঐ ত্রিভূজটা ইলুমিনাতি, তিন কোনে তিনটে গ্রীক-মিশরীয় চিহ্ন। আবার লোকে বলে ওটা হোলি ট্রিনিটি ।”
“ইন্টারেস্টিং!” ফেলুদার ভুরু কোঁচকানো।
“মিশরীয় চিহ্ন দুটো তো আই অফ রা আর আ্যন্খ। এ দুটো আগেও দেখলাম এই কেসে…আর তিন নম্বরটা তো…”
“ক্যাডুসিয়াস (caduceus ) । গ্রীক। মেডিসিনের সিম্বল হিসেবে আজও ব্যবহার হয় সর্বত্র।” মণিদি বলে উঠল।
“হুম! এই তিনটে একসঙ্গে কেন কে জানে! এমনও হতে পারে জাস্ট লোককে ইমপ্রেস করতে যা খুশী তিনটে সিম্বল এনে জুড়েছে।” সিধুজ্যাঠা বললেন।
“এই শঙ্করীপ্রসাদের ব্যাকগ্রাউন্ড কিছু জানেন ?”
“ও এই ডুয়ার্স অঞ্চলেরই ছেলে। লেখাপড়ায় মেধাবী ছিল। ইতিহাসে অনার্স নিয়ে কলেজে ভর্তিও হয়েছিল। তারপর মাঝপথে সব ছেড়েছুড়ে মন্দিরে সেবাইত হয়ে যায়। নাকি ডিভাইন কলিং!”
“কোন মন্দিরে সেটা জানেন?”
“আদি ভামরী মন্দির। তিস্তার কূলেই। তারপর সেটা ছেড়ে ক্রমে নিজেরই আশ্রম তৈরী করে।”
“হুম। তা ওর আশ্রমটা তো বেশ বড় সড়, তাই না ?”
“যতদূর জানি ওটা শিকারপুরের কাছে অনেকটা জায়গা নিয়ে বিশাল ক্যাম্পাস। উদ্বোধনের সময় মন্ত্রী শান্ত্রীরা গেছিল, কাগজে বেরিয়েছিল।”
“কি হয় ওখানে ? স্পিরিচ্যুয়াল হিলিং?”
“হ্যাঁ, যোগা, মেডিটেশন। ব্রিটিশ রয়্যাল ফ্যামিলি, আমেরিকান মিলিওনেয়ার— এরা সব ক্লায়েন্ট। দিশী বড়লোকও আছে। সঙ্গে বোধহয় একটা অনাথ আশ্রমও আছে।”
শুনেই ফেলুদা আর মণিদি চোখ চাওয়া চাওয়ি করে নিল।
“কি ভাবছ ফেলু? ঐ অনাথ আশ্রমের মাধ্যমে ছেলেধরার ব্যবসা হয় কিনা? খোঁজ নিতে পার, তবে আমি যতদূর জানি ওখানে কিন্তু নিয়ম মেনেই কাজ হয়। দেশ বিদেশের নিঃসন্তান দম্পতিরা ওখান থেকে আইনসম্মতভাবে দত্তক নেয়। অন্ততঃ বেনিয়মের খবর আমি কিছু পাইনি এখনো!”
“হতে পারে। তবে এই শঙ্করীপ্রসাদ যখন সর্বত্র এসে পড়ছে তখন একবার বাজিয়ে দেখতে হয়। অন্য কোন লীড তো নেই, পুলিশের কাছেও না, আমার কাছেও না।”
“দেখ তুমি, সে যা ভাল বোঝ! তবে ওখানে গেলে ওদের ক্লায়েন্ট হিসেবে যেও, তাতে সন্দেহ কম হবে আর খবরও বেশী পাবে। বরং ওকেও সঙ্গে নিয়ে যাও।” মণিদিকে দেখিয়ে বললেন জ্যাঠা।
“আমাদের বৌমাটি বেশ চৌখস এবং বুদ্ধিমতী মনে হচ্ছে। কাজে লাগবে।”
“সেরকমই ভাবছিলাম। আর একটা কথা বলুন তো জ্যাঠা, ঐ আদি ভামরী মন্দিরও তো ওখান থেকে কাছে। তার সঙ্গেও দেবী চৌধুরাণীর কোন যোগ ছিল কি?”
“সেরকম সরাসরি যোগাযোগ ছিল বলে তো শুনিনি। তবে ওটা তিস্তার ধারে। আর দেবীর বজরা ঘোরাফেরা করত ত্রিস্রোতা বা আজকের তিস্তা এবং করলা নদী ধরে। করলার ধারে আরো একটা কালী মন্দির আছে, জলপাইগুড়ি শহরের মধ্যে, সেটাকে পুজো দিয়ে নাকি দেবী ডাকাতিতে বেরোতেন। পুরোহিত ছিলেন ভবানী পাঠক স্বয়ং।”
“হুম, ইন্টারেস্টিং! এই গুবলু হারানোর ব্যাপারটা না থাকলে এগুলো ঘুরে আসা যেত।তবে এখন তো আর সেটা সম্ভব নয়! থ্যাঙ্ক ইউ সিধুজ্যাঠা, আজ তাহলে আমরা উঠি।”
“আরে দাঁড়াও, এখুনি উঠবে কি? এত সকালে এসেছ ব্রেকফাস্ট না করেই নিশ্চয়ই। জনার্দন…”
হাঁক শুনেই সিধু জ্যাঠার কাজের লোক জনার্দন জলখাবার নিয়ে এসেছে। সেগুলো খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।
মণিদি আর বিশেষ গন্ডগোল করেনি।শুধু বেরোনোর আগে মেঝেতে থেবড়ে বসে জুতোর ফিতে বাঁধতে লেগে গেল। অমনি জনার্দনদা “আহা, করেন কি বৌদিমণি, আমি চেয়ার আনছি”, বলে ছুটছিল।
তাতে আবার মণিদি, “চেয়ার কিসের? আমার কি হাঁটুতে বাত? নাকি তুমি ঘর ভাল করে মোছ না?” বলে টলে বেচারাকে থামিয়ে দিল।
ফেলুদা একটা হাল ছাড়া মুখ করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল, না হলে দেখতে পেত সিধু জ্যাঠার মুখে হাল্কা হাসির রেখা।
“ঠিক আছে জ্যেঠু, যাচ্ছি তাহলে।” মণিদি ওর স্নিকারের ফিতেটা বেঁধে নিয়ে অবশেষে বলল।
“যাচ্ছি বলতে নেই, বৌমা। আবার এস শীগ্গীর, তোমার ঐ বেস্ট ফ্রেন্ডের ছেলেকে খুঁজে আনার পরে একদিন। তুমি একটু দজ্জাল এবং ঠোঁটকাটা ঠিকই, তবে লোক হিসেবে দেখছি বেশ ইন্টারেস্টিং। কতগুলো পুরোন খবরের ডাক্তারী ব্যাখ্যাগুলো তোমার থেকে বুঝে নেব’খন। ফেলু মাষ্টার মনে হচ্ছে পছন্দটা মন্দ করেনি। সে অবিশ্যি তুমিও করনি!

***

পর্ব ৮ঃডুয়ার্সের পথে

“বাপরে বাপ! কিছুক্ষণ চুপ করে থাকা তোমার কুষ্ঠিতে লেখেনি, না?”
সিধুজ্যাঠার বাড়ির বাইরে এসে একটা চারমিনার ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
“না লেখেনি।ঐ জন্য তো বিয়ের আগে কুষ্ঠি মিলিয়ে দেখে। তুমি দেখালেই পারতে! তা এবার প্ল্যানটা কি?”
“তুমি হাসপাতাল গিয়ে ছুটির ব্যবস্থাটা করে এস। আমি আর তোপসে জলপাইগুড়ি যাবার ব্যাপারটা পাকা করে ফেলি। জটায়ুও এসে যাবেন শীগ্গীর।”
“চাকরীটা যাবে এবার আমার। বিয়ে, হানিমুন তারপর এখন আবার এই। তার চেয়ে তোমার ফুলটাইম সাকরেদ হয়ে যাই। মাইনে দিতে হবে কিন্তু!”
মণিদি গাড়িতে স্টার্ট দিতে দিতে বলল।
“আমি গরীব গোয়েন্দা, তোমার মত এক্সপেনসিভ নিউরোসার্জন আ্যসিসট্যান্ট রাখতে পারব না। তার চেয়ে আমার বিনি মাইনের তোপসেই ভাল। এখন অবিশ্যি আর একটা জুটেছে, টেম্পোরারী!”
“সে আবার কে?”
“পুকাই! ভাল হেল্প করেছে কাল আমাকে।”
“ঐ বখতিয়ার খিলজি? কিছু মনে কোর না মণিদি, তোমার বোন কিন্তু অসম্ভব ডেঁপো। বলে নাকি তিনটে ক্রাশ ওর! ভাব একবার!”
“তাতে তুই এত চটছিস কেন? মাতাজী যখন ওকে বয়ফ্রেন্ডের নাম জিজ্ঞেস করেছিল তখন কিন্তু ও তোর নাম বলেছিল!” ফেলুদার চোখ সামনে রাস্তায়।
“ক্কি, কি বলেছিল? অসম্ভব বাঁদর তো! আসুক বই ধার নিতে, মজা দেখাব আমি। বলে দিচ্ছি কিন্তু তোমাকে আগে থাকতে, মণিদি!”
“আমাকে বলে কি হবে ভাই? পারলে দেখিও মজা!”
মণিদিও রাস্তায় চোখ রেখে চালাচ্ছে।
রাগে আর সারা রাস্তা কোন কথাই বললাম না আমি।
মণিদি আমাদের বাড়িতে নামিয়ে হাসপাতাল চলে গেল। ঢুকে দেখলাম জটায়ু এসে গেছেন।
অন্যদিন আমাদের দেখলেই যে অমলিন হাসি দেন সেটা আজ আর দেখলাম না। ভদ্রলোক উদ্বিগ্ন।
“কি মশাই, কিছু বের করতে পারলেন? গুবলুর কথা ভেবে কাল রাতে ঘুমোতেই পারলাম না। অত ফুটফুটে বাচ্চা….আমারই যদি এমন হয় তো ওর বাবা মার কেমন হাল হয় বলুন তো!”
“একদমই ভাল না। ফোন করেছিলাম সকালে। চন্দ্রিমা শক্ত মেয়ে, কিন্তু আর নিতে পারছে না। ভাস্বরও ভেঙে পড়েছে ভীষণ।”
“পুলিশ কিছু পাত্তা করতে পারছে না?”
“ওরা ঐ কাজের মেয়েটিকে কাস্টডিতে নিয়েছে। লোকাল ক্রিমিনালদের ডেরায় খুঁজছে। তবে আমার মনে হয় না তাতে কিছু লাভ হবে।”
“তাহলে আপনার সন্দেহ কাকে?”
“ঐ শঙ্করীপ্রসাদের মাতাজী এবং তার দলবল। ওরা গুবলুকে ওদের শিকারপুরের আশ্রমের কাছে কোথাও পাঠিয়েছে কিনা সেটাই দেখতে হবে।”
“বলেন কি মশাই? শঙ্করীপ্রসাদের মত হাই প্রোফাইল লোক এর মধ্যে আছে? তা সেই লোকগুলোকে জেরা করা যায় না?”
“কমপ্লিকেটেড লালমোহনবাবু! শঙ্করীপ্রসাদের ল্যাজে চট করে কেউ পা দিতে চায় না। প্রমাণ ছাড়া তো একেবারেই না। বললেন না হাই প্রোফাইল! ওর ইনফ্লুয়েন্স পর্বতপ্রমাণ। সেইজন্যই আগে বহু রকম বজ্জাতি করে ছাড়া পেয়েছে।”
“তাহলে কি হবে ফেলুবাবু?”
“প্রমাণ জোগাড় করতে হবে। হাতে নাতে। যে প্রমাণ কেউ অগ্রাহ্য করতে পারবে না। তখন হয়তো ইন্সপেক্টর মুৎসুদ্দী বা লালবাজার আমার চেনা লোকেরা সাহায্য করতে পারবে।”
“সেই প্রমাণ যোগাড়ের জন্যই কি জলপাইগুড়ি ?”
“হ্যাঁ , তাই। আপাততঃ এছাড়া আর কোন উপায় নেই।”
“আচ্ছা মশাই, এই ছোট বাচ্চা যারা চুরি করে, কেন করে বলুন তো? মানে লাভটা কি?”
“প্রধান লাভটা বোধহয় মোটা টাকার বিনিময়ে নিঃসন্তান দম্পতিদের কাছে বেচে দেওয়া।”
“কি সর্বনাশ! তা আইনি পথেও তো লোকে দত্তক নিতে পারে?”
“সে তো পারেই এবং সেটাই বাঞ্ছনীয় । তবে কি জানেন, সেগুলো খুব লম্বা প্রসেস। অনেককে বছরের পর বছর বসে থাকতে হয়। তারপর যেমন পাবেন মোটামুটি তেমন নিতে হবে। মানে পছন্দ মত বাছাবাছি চলে না।”
“বাছাবাছির আবার কি আছে মশাই? একি বাজারের আলু না পটল ?”
“আমাকে বলে কি হবে লালমোহনবাবু! আমি তো আর বাছতে যাচ্ছি না। তবে লোক যে বহু বিচিত্র রকম হয় তা নিশ্চয়ই বুঝেছেন আমার সঙ্গে থেকে আ্যদ্দিনে?”
“সে তো বটেই।তা এই শিকারপুরের আশ্রমে কি এই বেচাকেনা হয়?”
“ওটা তো এমনিতে বিখ্যাত আশ্রম। দেশ বিদেশের লোক যায় ওখানে স্পিরিচ্যুয়াল হিলিং এর জন্য। তাদের মধ্যে অনেক হোমরা চোমড়া ব্যক্তিত্ব আছেন। ওদের একটা অনাথ আশ্রম আছে যেখান থেকে লোকে সব প্রোটোকল মেনে দত্তক নিতে পারে…খোঁজ নিয়ে দেখেছি। কিন্তু এসবের আড়ালে কিছু চলে কিনা সেটা তো খুঁজে না দেখলে বলা সম্ভব নয়। কি জানেন, ওটার লোকেশনটা খুব ট্রিকি। নেপাল, ভুটান আর বাংলাদেশ..তিনটে বর্ডারই খুব কাছে। ফলে বিভিন্ন স্মাগলার আর মাফিয়ার স্বর্গরাজ্য ঐ অঞ্চল।”
“তাহলে গুবলুকে কিডন্যাপ করাটা কি নেহাতই কাকতালীয়?ওর জায়গায় অন্য কোন বাচ্চাও হতে পারত?”
“হয়তো ওরা লক্ষ্য রেখেছিল গুবলুকে নিয়ে আরতি যায় ওখানে রোজ আর তাই প্ল্যান করছিল। তবে ভাস্বরবাবু ঐ ডোপিং এর ব্যাপারে কিছু তথ্য প্রমাণ পুলিশকে জানান। সেই জন্য ওরা হয়তো আরো বেশী করে ওকেই টার্গেট করেছিল!”
“প্রতিশোধ! কি ভয়ানক!”
“শুধু প্রতিশোধ নয় লালমোহনবাবু! বেচে দিতে পারলে ওদের ডোপিং ড্রাগের লোকসানওটাও খানিক পুষিয়ে যাবে।”
“শ্রীহরি, মাধবঃ! ভয়ঙ্কর ব্যাপার মশাই! আর ঐ মিশরীয় চিহ্নগুলো?”
“ওটা এখনও বিশেষ বুঝতে পারছি না। তবে শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রমের সীলটায় ঐ দুটো ইজিপ্সিয়ান চিহ্ন প্লাস একটা ক্যাডুসিউসের চিহ্ন আছে। কেন, এখনো আমি জানি না।”
“আচ্ছা, ঐ ইলুমিনাতি নাকি বলছিলেন , সেটা আবার কি?”
“ওটা একটা প্রাচীন চিহ্ন। একটা ত্রিভুজের মাঝখানে একটা চোখ। ইলুমিনাতি বা এনলাইটেন্ড নামটা আসে ষোড়শ শতকের ব্যাভেরিয়ান সিক্রেট সোসাইটি থেকে। তবে তারপর একে কেন্দ্র করে অনেক গুজব এবং ষড়যন্ত্রের থিয়োরী তৈরী হয়।একসময় কাল্ট সিম্বল হিসেবেও এর বহুল প্রচলন ছিল। অনেকে বলতো এটা ফ্রী ম্যাসনারি সিম্বল। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে এরকম ভন্ড বাবাজীদের পক্ষে এটা আদর্শ। তবে একটা জিনিসই একটু খটকা লাগছে!”
“আপনার শুধু একটা? আমার তো মশাই পুরোটাই, মানে যাকে বলে আরকি….তা আপনার খটকাটা কি শুনি?”
“ঐ ইলুমিনাতির মাঝখানে চোখটার বাঁপাশে একটা সাপের মত কি? ওটা তো সাধারণতঃ থাকে না…?”
“বাবা গো, আবার সাপও! তা ঐ চিহ্নগুলোর কি মানে থাকতেই হবে নাকি এই ব্যাপারে?”
“মানে তো কিছু আছেই! তপনের লকেটটা যদি গড়িয়াহাটের ফুটে কেনা বলে ধরেও নিই,ঐ ওয়াটারমার্ক ওয়ালা ট্যিসুটা তো মাতাজীরই…”
“ঐ মাতাজী মানে তো পার্বতীমাঈ? ওঁর কিন্তু খুব নাম ডাক, জানেন তো? আমার প্রতিবেশী হরিশ জোয়ারদার ওঁর বিষম ভক্ত! ওঁর রাঙাপিসিমার গেঁটেবাত নাকি মাতাজীর হত্তুকী খেয়ে এখন বেশ কম আছে…”
“হবে হয়তো। জানেনই তো এইসব গডম্যানদের ওপর আমার বিশেষ শ্রদ্ধা নেই…সেই কাশীর মছলিবাবা হোক বা সোনার কেল্লার ভবানন্দ, ভন্ড গডম্যান তো আর কম দেখলুম না।”
“তা ইনি তো গডম্যান না ফেলুবাবু! গডউম্যান! এবার কি তবে মহিলা ভিলেন নাকি! ওঃ ভাবা যায় না। আমাদের জীবন তো সত্যি কথা বলতে কি প্রায় নারী বিবর্জিতই ছিল, তারপর মণিকঙ্কণা আসার পর থেকে তো দেখছি…”
“মণি যদি শোনে আপনি ওর সঙ্গে মাতাজীর তুলনা করছেন আপনার ভাগ্যে কিন্তু দুঃখ আছে লালমোহনবাবু।”
“আহা, তুলনা কোথায় করলুম আবার… আপনি আবার ফস করে বলে বসবেন না যেন একথা ম্যাডামকে…”জটায়ু তাড়াতাড়ি বলে ওঠেন।
“ভয় পান নাকি আপনি মণিদিকে, লালমোহনবাবু?”
“ওরে বাবা উনি খেপে গেলে কে না ভয় পায়! আপনি পান না ফেলুবাবু?”
“আলবাৎ পাই! আজ সিধুজ্যাঠাও পেয়েছেন বলে আমার ধারণা।”
“বলেন কি! আপনার সেই মাইক্রোসফট?”
“উঃ, ইনকরিজিবল ! ওটা মাইক্রফট লালমোহনবাবু…শার্লক হোমসের দাদা। মাইক্রোসফট বিল গেটসের কোম্পানী, কম্পিউটার সফটওয়ার বানায়!”
“এ হে, ভুল হয়ে গেছে। কিন্তু তাঁকেও বকেছেন বুঝি মণিকঙ্কণা ? কি করেছিলেন উনি?”
“বিশেষ কিছু না। একটু ইঙ্গিত করেছিলেন যে মণির তদন্তে মাথা না ঘামিয়ে ঘর সংসারের গপ্প করা উচিত আর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন ওর বাংলা জ্ঞান নিয়ে…”
“উরিবাবা! এসব বলেও উনি এখনো বেঁচে আছেন? শুনেই তো আমার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে!
ম্যাডাম নিশ্চয়ই রণচন্ডী মূর্তি ধরেছিলেন?”
“মোর লাইক দেবী চৌধুরানী মূর্তি!”
“তার মানে?”
“মানে আমাদের এই অভিযানের সঙ্গে দেবী চৌধুরানীর একটা যোগ এসেই পড়ছে। শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রম যেখানে, মানে জলপাইগুড়ির শিকারপুরে, তার কাছেই আছে দেবী চৌধুরানীর মন্দির। সেখানেই যেতে হবে আমাদের।”
“বলেন কি! এরকম মন্দির আছে নাকি? দেবী চৌধুরানীর বিগ্রহ আছে সেখানে?”
“হ্যাঁ। দেবীর আর ভবানী পাঠকের বিগ্রহ।”
“এ তো দারুণ ব্যাপার মশাই, কাল্টিভেট করতে হচ্ছে ব্যাপারটাকে। সত্যিকথা বলতে কি, ঐ জল্পেশের মন্দির ছাড়া আর কিছুর নাম তো ঐ অঞ্চলে কখনো শুনিনি।”
“জল্পেশের মন্দির ওখান থেকে তিরিশ কিলোমিটার মত দূরে হবে, তিস্তার তীরে, যেখানে দেবীর বজরা ঘুরত বলে বঙ্কিমবাবু লিখে গেছেন।”
“তা ঐ শিকারপুর না কি, সেটা কি জঙ্গল নাকি? যেখানে ভবানী পাঠকের ডেরা ছিল?”
“এখন ওখানে চা বাগান। তবে আগে ওটার নাম ছিল বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গল, যেখানে সম্ভবতঃ ভবানী পাঠকের মূল ঘাঁটি ছিল।”
কাল রাতে ফেলুদা ঐ অঞ্চল নিয়ে বেশ লেখাপড়া করে নিয়েছে মনে হচ্ছে। আর তার সঙ্গে আজ সিধু জ্যেঠুর সঙ্গে আলোচনার ফলে ঐ অঞ্চলের ইতিহাস, ভূগোল দুটোই এখন ওর বেশ জানা হয়ে গেছে।
“রোমাঞ্চকর ব্যাপার মশাই। এমনি হলে বলতাম দারুণ আ্যডভেঞ্চারের জন্য মুখিয়ে আছি।তবে এখন গুবলুটার জন্য আর কিছু ভাল লাগছে না মশাই।”
“সে তো বটেই। আজ দুদিন হয়ে গেল, ঐটুকু বাচ্চা। ওরা আশাকরি ওকে ঠিকঠাক রাখবে নিজেদের স্বার্থেই।
আমরা আর একটু পরেই বেরিয়ে পড়ব। মণি হাসপাতাল থেকে সোজা এয়ারপোর্টে এসে আমাদের মীট করবে।”

***

পর্ব ৯ঃ ছদ্মবেশ

“তাহলে শিকারপুরে গিয়ে আপনি কি করবেন ঠিক করেছেন ফেলুবাবু?”
বাগডোগরা থেকে গাড়িতে শিকারপুরের দিকে যেতে জিজ্ঞেস করলেন জটায়ু।ভাড়ার গাড়ি, কিন্তু চালাচ্ছে মণিদি। ফলে বাইরের লোক কেউ নেই। নিশ্চিন্তে কথা বলা যায়।
“মনে হচ্ছে ওদের ঐ অনাথ আশ্রমটার ভেতরে যেতে হবে আমাদের। না হলে সব বোঝা যাবে না।”
“কিন্তু যাবে কি করে ফেলুদা? এ ভাবে আমরা গেলে মনে হয় ঢুকতেই দেবে না।”
“দিলেও লাভ হবে না। কিছু খবর পাওয়া যাবে না।ধ্যান ট্যান করে আর উপদেশ বাণী শুনে ফেরত আসতে হবে। ওভাবে হবে না।ঢুকতে হবে ওদের প্রসপেক্টিভ ক্লায়েন্ট হিসেবে।”
“ছদ্মবেশ”? জটায়ুর চোখ চকচক করে ওঠে।
“হ্যাঁ। মণি, তুমি আর আমি নিঃসন্তান দম্পতি, লুকিং ফর আ্যডপশন। লালমোহনবাবু তোমার ছোটকাকা, তোপসে যেমন আছে তেমন, আমার ছোট ভাই।”
“আমাকে বাদ দিলে হয় না? ওখানে তো ঐ রাজ্যের ছোট ছোট বাচ্চা…” মণিদি নিমপাতা খাওয়া মুখ করে বলে।
“না হয় না। একজন মহিলাকে অবশ্যই দরকার। কেবল ছোটকাকা আর ভাইকে নিয়ে কেউ আ্যডপশন এজেন্সীতে যায় শুনেছ?”
“তা খালি সঙ্গে গেলেই হবে নাকি এটা স্পীকিং পার্ট”?
“বিশেষ কথা না বললেও চলবে। কিন্তু বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ইমপর্টেন্ট। বেশ একটা স্নেহাতুর মা মা ভাব দরকার..”
“আপনি ঘাবড়াবেন না মণিকঙ্কণা। আপনি আপনার ঐ স্ট্রীট ডগদের কথা ভাববেন। দেখবেন স্নেহ টেহ আপনি ফুটে বেরোবে।” জটায়ু বলে ওঠেন।
“তাহলে আমরা হলাম মিঃ আ্যন্ড মিসেস—“
“ব্যানার্জি “! মণিদি বলে ওঠে।
“বেশ। তাই সই।” ফেলুদা রাজী ।
“তাহলে আমি গাঙ্গুলী থেকে যাই। নামটা বরং লালমোহনের জায়গায় জগমোহন হোক।”
“আমি তপব্রত ব্যানার্জি , ঠিক আছে মণিদি?”
মণিদি ঘাড় নাড়ে।
“গুড, তাহলে এবার ছদ্মবেশের ব্যবস্থা …”
“আমরা আমাদের নর্মাল জামাকাপড়ে গেলে হয় না?”
মণিদি বলে ওঠে।
“সত্যি কথা বলতে কি আমরা তিনজন তা পারি। তবে তোমাকে..”
“কি, লালপেড়ে শাড়ি? কপালে আধুলি সাইজ সিঁদুরের টিপ? শাঁখা ফাঁখা আর যত কিছু উৎপাত আছে জগতে?” মণিদির গলা গনগনে।
“অতটা দরকার নেই! তবে একটু প্লসিবল কিছু…ভেব না, আমিও একটা দাড়ি লাগাব, কেউ ফস করে চিনে ফিনে গেলে বিপদ তো!”
“তা এই ছদ্মবেশের সরঞ্জাম কোথায় যোগাড় হবে?”
“আমি আমার সব ছদ্মবেশের সরঞ্জাম সঙ্গে নিয়েছি…কখন কোনটা লাগে বলা তো যায় না! শুধু তোমার জিনিসগুলো যাবার পথে শিলিগুড়ির বাজারে কিনে নেব।”
“সবই তো বুঝলাম ফেলুবাবু, কিন্তু, মানে মণিকঙ্কণাকে ঠিক আমার মেয়ের বয়সী…মানে টাক আছে আমার মানছি, তবু…” লালমোহনবাবু কিন্তু কিন্তু করেন।
“কেন? দশ বার বছরের বড় ছোটকাকা থাকে না লোকের? আপনাকে অল্প মেকআপ দিয়ে দেব, চোখের নীচে ডার্ক সার্কেল, জুলফি পাকা…ওতেই হবে।”
সেই মত কেনাকাটা সেরে একটা সিনেমা হলের বাথরুমে মণিদি পোশাক বদলে নিল। ফেলুদা আর লালমোহনবাবুও মেকআপ নিয়ে নিল।
“এবার গাড়িটা আমি চালাব। কারণ মিসেস ব্যানার্জি গাড়ি চালাতে জানেন না।” ফেলুদা ড্রাইভারের সীটে বসে বলল।
“কেন বল তো? গাড়ি চালাতে জানলে সন্তান ক্ষুধাতুরা মহিলা হওয়া যায় না? কলকাতায় ট্যাক্সিতে আমার মোশন সিকনেস হচ্ছিল, এখানে যখন নিজে চালালাম তখন ঠিক ছিল।” মণিদি পাশের সীটে বসে বলল। এত বাজে যুক্তি দিতে পারে!
“মণি, ছদ্মবেশটা শুধু একটা পোশাক বা ফলস দাড়িতে হয় না।” ফেলুদা গম্ভীর।
“এটা একটা আ্যটিটিউড, একটা ক্যারেক্টার যেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে পেশ করতে হয়। আমি আমার চাউনি, ডায়ালেক্ট, ভয়েস সব বদলে ফেলি। এই সাটল জিনিসগুলো ছদ্মবেশটাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়।ঔরঙ্গাবাদে আমি যখন ছিটেল বুড়োর ছদ্মবেশ নিয়েছিলাম তখন হোটেলের বন্ধ ঘরেও বিড়বিড় করে গেছিলাম যাতে কারোর মনে ঘূণাক্ষরেও কিছু সন্দেহ না হয়।”
ফেলুদা গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বলল।
“তোমাকে আমি অতটা করতে বলছি না। কিন্তু তাঁতের শাড়ি আর শাঁখা-সিঁদুর পরেও যদি তুমি মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি হয়েই থেকে যাও আর তুড়িলাফ খেয়ে বেড়াও তাহলে কিন্তু বিপদ ঘটতে পারে। মনে রেখ আমরা কিন্তু পাড়ার স্টেজে নাটক করতে নামিনি। অত্যন্ত ধূর্ত কিছু লোকের চোখে ধুলো দিতে এসেছি। অসফল হলে একটা ছ মাসের বাচ্চার—-ভাস্বর আর চন্দ্রিমার বাচ্চার বিপদ বাড়বে। সেই বুঝে কাজ কোর।”
গাড়ি একটু পরেই শহর ছাড়িয়ে জঙ্গল আর চা বাগানের মধ্যে দিয়ে যেতে লাগল। লালমেহনবাবু হুঁ হুঁ করে একটা বেসুরো হিন্দি গানের সুর অনেকক্ষণ থেকে ভাঁজছেন। মণিদি জানলার কাচে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসে আছে। জিজ্ঞেস করতে বলল ওর মাথাটা একটু ধরেছে। কাল রাত তিনটে অব্দি জেগে বসে থাকার ফল আর কি!
“আচ্ছা এই বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলেই তো দেবী চৌধুরানী সেই সাত ঘড়া মোহর পেয়েছিলেন, তাই না?”
“গল্প তো তাই বলে!” ফেলুদা বলল।
“তা এখন আর তেমন পাওয়া যায় না? দিব্যি জঙ্গল জঙ্গল ভাব এখনো তো আছে, একটা ভাঙা বাড়ি,যকের ধন …পাওয়া যায় না?”
“এই কেসটা অলরেডি ছেলে চুরি, ডোপিং আর মিশরীয় চিহ্ন টিহ্ন মিলে বেশ প্যাঁচালো হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি আর তার মধ্যে গুপ্তধন ঢোকাবেন না লালমোহনবাবু, তাল রাখা যাবে না। আপনি চাইলে ওটা আপনার গল্পে ঢুকিয়ে দিতে পারেন।”
“যাই বলুন গুপ্তধনের গল্প কিন্তু শিওর সাকসেস। কি কি সব আছে আমাদের বাংলা সাহিত্যে…’হীরা মানিক জ্বলে ‘, ‘চাঁদের পাহাড়’…ওঃ! গায়ে কাঁটা দেয় মশাই!”
“আর একটা মিস করলেন যে! রবীন্দ্রনাথেরটা…” আমি বলে উঠলাম।
“ওঃ সে তো জব্বর তপেশ! পায়ে ধরে সাধা/ রা নাহি দেয় রাধা/ শেষে দিল রা…হিঁক!”
ফেলুদা গাড়িতে একটা হ্যাঁচকা ব্রেক মেরেছে। সামনে রাস্তা যদিও ফাঁকা।
“কি কর না তুমি, প্রদোষ! এই জন্য বলি আমাকে চালাতে দিতে।” মণিদি ঝিমুনি ভেঙে উঠে পড়েছে। গলায় একরাশ বিরক্তি।
“স্যরি!” ফেলুদা বলল। তারপর জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বলল “থ্যাঙ্কিউ লালমোহন বাবু।”
আমরা চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম, কিন্তু ফেলুদা আর কিছু বলল না। বাকী পথ অবিশ্যি বেশ মসৃণ ভাবেই এলাম।
হোটেল শিকারপুর ডিল্যাক্স লজে মিঃ অ্যান্ড মিসেস ব্যানার্জি যখন তাঁদের ভাই আর ছোটকাকাকে নিয়ে চেক ইন করলেন তখন সন্ধে হয়ে গেছে।
“এবার কালকের প্ল্যানটা ফাইনাল করা দরকার।” ওদের ঘরের খাটে বসে বলল ফেলুদা।
“ মণি, তুমি এখন থেকেই বেশ পেনসিভ মুখ করে ঘুরবে। হোটেলে কারো সঙ্গে কথাবার্তা হলেই দুকথার পর বুঝিয়ে দেবে অনেক আশা নিয়ে আ্যডপ্ট করতে এসেছ এখানে। এর আগে বহু জায়গায় নিরাশ হয়ে।”
মণিদি গোঁজ হয়ে শুনছে, কিছু বলছে না।
“আমাদের বিয়ে হয়েছে আট বছর আগে…”
“চাইল্ড ম্যারেজ হয়েছিল বুঝি আমাদের?”
এতক্ষণে কথা ফুটেছে।
“আমাদের বয়সটা বছর পাঁচেক করে বাড়িয়ে দিলেই সেই ফ্যালাসিটা কাটানো যায়। আমার ফলস দাড়িতে আর জুলফিতে দু চারটে করে পাকা চুল আছে। আর তোমার…”
“কিছু ভেবোনা। যা একখান সুপার মাসিমা মেকআপ দিয়েছ আমাকে, পাঁচ কেন, দশ বছরও বেশী বলতে পার।” নিজের পরনের তাঁতের শাড়িটার আঁচল আঙুলে পাকাতে পাকাতে বলে মণিদি।
“তাহলে তো হয়েই গেল।আমি বম্বে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে ইকনমিক্স পড়াই, তুমি চাকরী টাকরী কর না…”
“গেটিং বেটার আ্যন্ড বেটার…” মণিদি বিড়বিড় করে।
“হঠাৎ বম্বে কেন ফেলুবাবু?”
“কারণ গুবলুকে ওরা কলকাতার কারো কাছে চট করে দিতে চাইবে না, ধরা পড়ার চান্স বেশী।”
“হুম ! বুঝলুম!”
“আর ভেরি ইমপর্টেন্ট…আমরা কিন্তু একটা ছেলে খুঁজছি, ছয় সাত মাস বয়স হলে ভাল হয়।”
“ যারা সন্তানের জন্য এত ডেসপারেট তারা কি অত ছেলে মেয়ে ভাগ করে?”
মণিদি কিন্তু এটা ঠিক বলেছে বলে মনে হল আমার।
“করে মণি, করে! আমাদের এই দুর্ভাগা দেশে করে..” ফেলুদার ঠোঁটে তেতো হাসি।
“যাকগে, আমরা গুবলুর ওপর জিরো ইন করতে চাই। যথা সম্ভব ওর মত কেউ আমাদের প্রেফারেন্স।”
“আর লালমোহন বাবু, আপনি মণির ছোটকাকা। ব্যাচেলর, অনেক টাকার মালিক। আদরের ভাইঝির জন্য দরকার হলে দুহাতে খরচ করতে রাজী।”
“আর তোপসে, তুই সঙ্গে থেকে নজর রাখবি, বেগতিক দেখলে ইমপ্রোভাইজ করবি….ওকি, মণি ওগুলো খুলছ কেন?”
মণিদি হাত থেকে চুড়ি টুরি গুলো খুলে রাখছিল।
“এগুলো খালি ঠুনঠুন আওয়াজ করে, আমার দাঁত শিরশির করে…”
“সেকি মণিকঙ্কণা , এ তো অলঙ্কারের শিঞ্জিনী, কি কাব্যিক ব্যাপার। দাঁত শিরশির করে আবার কি!”
“আপনি পরবেন, কাব্যিক ভাবে?” মণিদি বাড়িয়ে ধরে ওগুলোকে।
“মণি , এই ঘরের বাইরে গেলে কিন্তু এগুলো পরতে হবে। আমার দাড়ি আর লালমোহনবাবুর মেক আপের মত। এই হোটেলে ওদের লোক সারাক্ষণ আসা যাওয়া করছে।তাদের মনে সন্দেহ জাগা ঠিক নয়।” ফেলুদা গম্ভীর।
“আচ্ছা ঠিক আছে। সে কাল দেখা যাবে খন। এখন আমরা উঠি। রাত হল অনেক। চল তপেশ।”
———————-
সকাল ঘুম ভাঙলো ফোনের আওয়াজে।
“তপেশ, লালমোহনবাবুকে নিয়ে শীগ্গীর এস আমাদের ঘরে। মেজর ব্রেক থ্রু।” মণিদির গলা।
দশমিনিটে রেডি হয়ে ওদের ঘরে গিয়ে দেখি ফেলুদা মনে হয় সবে যোগব্যায়াম শেষ করে উঠেছে। মণিদি বড় চেয়ারে বসে। চেহারা দেখে আঁতকে উঠলাম। মাথায় দোল খেলার মত সিঁদুর।তার ওপর কি সব ফুল টুল। কিন্তু তার এসবে ভ্রূক্ষেপ নেই। খোশমেজাজে চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে।
“কি ব্যাপার মশাই”?
“ব্যাপার গুরুচরণ লালমোহনবাবু। সকালবেলা ও তো যোগব্যায়াম নিয়ে পড়ল। আমার মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছিল তাই ভাবলাম খোলা হাওয়ায় ঘুরে আসি চা-বাগানের দিক থেকে একটু। তা এইসব পোশাকে মনে হয় খুব দুঃখী লাগছিল। হঠাৎ শুনি পেছনে “বেটি তু ইতনি উদাস কিঁউ হ্যায়।” মাতাজীর গলা। উনিও মর্নিং ওয়াকে এসেছিলেন।”
“বলেন কি! তারপর?”
“তারপর আর কি…আমি আমার দুখভরি কাহানী শোনালাম। কালকের স্ক্রিপ্ট মত। যা আ্যক্টিং করেছি না…কেউ দেখল না তাই, নয়তো ন্যাশনাল আ্যওয়ার্ড বাঁধা ছিল। বললাম ‘মেরি সুনি গোধ ভর দে মাঈ’, বলে আঁচল টাচল পেতে, একদম নিরূপা রায়!”
“তারপর? তোমাকে কি বলল, বাচ্চা বেচবে?”
“অত সোজা নয়। প্রথমে তো মৃদু হেসে ‘ইয়ে লে মাতাজীকা সিন্দুর, আগলে এক সাল কি অন্দর তেরি গোধ জরুর ভর জায়েগা’, বলে আমার মাথায় এসব চাপিয়ে টাপিয়ে দিয়ে দিব্যি কেটে পড়ছিল।”
“তারপর?”
“আমি দেখলাম একে তো ছাড়া যাবে না। একদম গালি থেকে পয়েন্টে ডাইভ দিয়ে গিয়ে পায়ে পড়লাম।”
“…গালি? কিসের গালি”? লালমোহনবাবু একটু বিভ্রান্ত।
“আপনি না, লালমোহনবাবু…প্রদোষ, তুমি তো কলেজে ক্রিকেট খেলেছ, বেসিকসগুলো একটু শেখাতে পারনি ওঁকে এতদিনে?”
“ফোকাস মণি, ফোকাস!”
“আচ্ছা, আচ্ছা! তো বললাম ‘নেহি মাতাজী, ডক্টর লোগো নে কহা হ্যায় ইয়ে নেহি হো শকতা। মেরা হাজব্যান্ড কা ওলিগোস্পার্মিয়া হ্যায়।”
“তোমার কাছে ডাক্তারী রিপোর্ট জানতে চেয়েছিল কি মাতাজী?”ফেলুদার গলা গম্ভীর।
“বাঃ, তুমিই তো কাল বললে সব রিয়ালিস্টিক করতে, ক্যারেক্টারে ঢুকে যেতে! দিন রাত্তির আমাকে সেই জন্য সং সাজিয়ে রেখেছ, গাড়ি চালাতে দিচ্ছ না…”
“হুম। তাই এটা তার রিভেঞ্জ! ঠিক আছে, বলে যাও…”
“তারপর আমি বললাম ‘আপ আশ্রম সে মুঝে এক নানহা সা প্যায়রা সা মুন্না দিলা দিজিয়ে।’
তাতে ব্যাটা বলে কিনা, ‘উসকে লিয়ে তো লম্বি লাইন হ্যায় রে, ম্যায় কেয়া কর শকতি হুঁ?’
আমি দেখলাম আমার মাথায় এসব চাপিয়েছে, পা ধরিয়েছে। আমি তো খবর আদায় করব তবে যাব।”
“বললাম কুছ তো কিজিয়ে। পয়সোঁ কা চিন্তা মৎ কিজিয়ে… তাতে একটু থমকালো। তারপর জিজ্ঞেস করল ‘বেটি তেরা হ্যাসব্যন্ড ক্যায়া করতা হ্যায়?’ আমি বুঝলাম ওষুধ ধরেছে।”
“বললাম ও কলেজ প্রফেসর । তাতে মনে হল না, খুব একটা ইমপ্রেসড। তখন বললাম লেকিন মেরি চাচাজী হ্যায়, উনকি ইমপোর্ট এক্সপোর্ট কা বিজনেস হ্যায়, উয়ো মেরি খুশী কে লিয়ে কুছ ভী করেঙ্গে!”
“তারপর, তারপর?” জটায়ু খুব এক্সাইটেড।
“তখন বলে কিনা যে ওদের আশ্রমে দুপুর দুটোর সময় যেতে। দুটো বাচ্চা মেয়ে আছে, ন মাসের আর চৌদ্দ মাসের। কিন্তু আশ্রমকে দশ লাখ টাকা ডোনেশন দিতে হবে।”
“কতগুলো বাচ্চাকে এভাবে ধরেছে এরা মশাই? ভয়ঙ্কর বদমাইশ তো!”
“শুনুন না, আমার আ্যক্টিং শেষ হয়নি এখনো!
বললাম, মুঝে বেটি নেহি, বেটা চাহিয়ে, নেহিতো মেরি শাস মুঝে মার ডালেগি।”
“বাঃ দারুণ ইমপ্রোভাইজ করেছ তো মণিদি। তারপর?”
“ তখন কিছুক্ষণ ভাবল, তারপর বলল ম্যয় তুঝে কুছ প্রমিস নেহি কর সকতি…লেকিন চান্সেস হ্যায়। মগর উস্কে লিয়ে কমসে কম পচ্চিশ লাখ। দেঙ্গে তেরে চাচাজী?”
“বললাম দেঙ্গে, জরুর দেঙ্গে। উনকি কোঈ ফ্যামিলি নেহি হ্যায়, উয়ো মুঝে আপনি বেটি মানতে হ্যায়।
তখন বলল ঠিক হ্যায়, তো ফির দোপহর দো নেহি, চার বাজে আ জানা…দেখতে হ্যায় দেবী মা কি কিরপা তুঝ পর হ্যায় কি নেহি। বলে আবার মাথায় দুটো ফুল ছিটিয়ে দিয়ে চলে গেল।”
“বাহ। চমৎকার কাজ করেছ মণি। তুমি সঙ্গে না থাকলে আমরা কিছুতেই এভাবে এগোতে পারতাম না। এখন গিয়ে মাথা থেকে ওগুলো যথা সম্ভব ধুয়ে এস…কেমন মা শেতলার থানের মত দেখাচ্ছে। আর শাড়িটা একটু চেঞ্জ করে….”
“আর আমার শাড়ি ফাড়ি নেই। ক’টা কিনবে মানুষ? এতেই চালিয়ে দেব…”
“অগত্যা। চল গিয়ে ব্রেকফাস্ট খেয়ে নিই ।”
“তোমরা যাও। আমার কেমন একটা লাগছে, কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না।” মণিদি মুখটা ভিরকুট্টি করে বলে উঠল।
“মাতাজীর থেকে কিছু প্রসাদ টসাদ খাওনি তো? যা সব ডোপিং ড্রাগের হিড়িক এদের…নাকি টেনশন খেয়ে গেলে? এখন কিন্তু সামনে তোমার অনেক কাজ।” ফেলুদা বলল।
“জানি। ভেবো না। আমার পার্ট ঠিকঠাক প্লে করে দেব।ও হ্যাঁ, এই দেখ, বাচ্চা কিনব বলে মাতাজী আমাকে আদর করে গলায় এই লকেটটা পরিয়ে দিল।”
মণিদির বাড়িয়ে দেওয়া হাতে একটা ইমিটিশনের আ্যন্খ লকেট!
“বাঁচা গেল। মাতাজীর সঙ্গে এটার যোগ তাহলে সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণ হল!” ফেলুদা বলে উঠল।
“কিন্তু এই চিহ্ন কেন ফেলুবাবু?”
“সব প্রশ্নের উত্তর দেবার সময় এখনো আসেনি লালমোহনবাবু! যথাসময়ে সব জানা যাবে আশা করছি।”
“হুঁঃ। যথাসময়ে! সবসময়ই আপনার ঐ এক রা!”
“ঠিক বলেছেন। ঐটেই তো আসল!”
“আপনার হেঁয়ালী বোঝা আমার কম্ম নয় মশাই, কিন্তু এটা অন্ততঃ বলুন ওই বাচ্চাটা আমাদের গুবলু বাবুই কিনা?”
“সে তো নিশ্চিত জানার উপায় নেই। তবে হওয়ার জোর চান্স আছে। সেটা ওখানে গেলে বোঝা যাবে। দেখা যাক…”
“সো আর উই অল সেট ফর দ্য অপারেশন”?
“আই-আই স্যর”,আমি, জটায়ু আর মণিদি সমস্বরে বলে উঠলাম!

***

পর্ব ১০ঃ আশ্রমিক

ব্রেকফাস্ট খেয়ে এসে ফেলুদা বলল,
“চারটে বাজতে তো অনেক দেরী। আমি বরং এই ফাঁকে একটু ঘুরে আসি।”
“কোথায় ফেলুদা?”
“নর্থবেঙ্গল ইউনিভার্সিটি।”
“ইতিহাস ডিপার্টমেন্টে?”
“গুড! মগজের ঘিলুটা একদম শুকিয়ে ঘুঁটে করে ফেলিসনি দেখছি!”
“কেন যাচ্ছ সেটা বলা যাবে না বোধহয়?”
“কতগুলো প্রশ্ন আর খটকা আছে। সেগুলো ওখানকার হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট ডাঃ ত্রিপাঠীর কাছে বুঝে নিতে যাচ্ছি। এর বেশী এখন আর কিছু বলা যাবে না। “
বলে বেরিয়ে গেল আবার লাঞ্চের আগে ফিরেও এল। জিজ্ঞেস করায় বলল অনেক ধোঁয়াশা নাকি ওর কেটেছে।তবে ভাব দেখে মনে হল না এক্ষুণি ও আমাদের মনের ধোঁয়াশা দূর করতে আগ্রহী।
সাড়ে তিনটের মধ্যেই আমরা শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রমে পৌঁছে গেলাম।এলাহী ব্যাপার। গেটে অনেক সিকিউরিটি।বিশাল ক্যাম্পাস গিয়ে মিশেছে চা বাগানের সঙ্গে। সামনের রাজকীয় দোতলা মেইন বিল্ডিং ছাড়াও এদিক ওদিকে ছোট, বড় নানা মাপের বাড়ি ছড়ানো…কোনটা মেডিটেশন হাউস, কোনটা ভজন মহল এইসব। বেশীরভাগ লোকে সামনের হলে গিয়ে বসতে পারে, উপদেশ শুনতে পারে বা ধ্যান করতে পারে। তাছাড়া অন্যান্য জায়গায় যাওয়া সোজা নয়। পারমিশন করে টিকিট নিতে হয়।
তবে মণিদির কল্যাণে তো আমাদের আ্যপয়েনমেন্ট ছিল খোদ মাতাজী পার্বতীমাঈ এর সঙ্গে। তাই আমাদের সাধারণ ওয়েটিং রুমে বসতে হল না।
আমরা রিসেপশনে গিয়ে বলতেই একজন কর্মচারী আমাদের বাগানের মধ্যে দিয়ে অনেকটা হাঁটিয়ে নিয়ে এল পেছনের দিকের একটা ছোট সাদা একতলা বাড়িতে।
একটা ঘরে বসতে বলে খবর দিতে গেল মাতাজীকে।
মিনিট সাতেক অপেক্ষা করতেই ভেতরে এলেন মাতাজী। ছবিতে যেমন দেখেছি তার চেয়েও ভয়াল ভৈরবী চেহারা। লালচে গেরুয়া শাড়ি, রুক্ষ, খোলা চুল, কপালে সিঁদুরের তিলক, গলায়, হাতে রুদ্রাক্ষের মালা।
তাছাড়াও নাকে জ্বলজ্বলে হীরের নাকছাবি আর গলায় বেশ বড় সড় সোনার লকেট—আ্যঙ্খ।
“আ গয়ী তু বেটী? সাথমে ইয়ে কৌন কৌন হ্যায়?”
“মেরা পতি, দেবর অউর চাচাজী”, মণিদি আমাদের দেখিয়ে দেয়।
“শোচ লিয়া ঠিক সে? ওহি বাচ্চা চাহিয়ে ইয়া ফির বাচ্চী সে ভি কাম চল যায়গা? সস্তা পড়েগা তুম লোগোকো!”
আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এভাবে বাচ্চা নিয়ে দামাদামি হয়!
“নেহি মাতাজী, বাচ্চা তো হামে ওহি চাহিয়ে…লেকিন কোঈ কিউ ব্যাগেড়া তো নেহি হ্যায় না?”
ফেলুদা প্রশ্ন করল।
“নেহি, কোঈ কিউ নেহি হোগা। এক ফর্ম ব্যস ভর দেনা অউর ডোনেশন।”
“সব কুছ কানুনী তারিকে সে হোগা না? বাদমে হামে কোঈ দিককত নেহি চাহিয়ে…পুলিশ ইয়া অউর কিসিসে।” ফেলুদা কনভিনসিং শোনায়।
“কুছ নেহি হোগা। সারে পেপারস মিল জায়েঙ্গে হামারী তরফ সে। রেপুটেড আ্যডপশন এজেন্সী হ্যায় ইয়ে। দুনিয়াভর সে লোগ আতে হ্যায় ইঁহা বাচ্চা আ্যডপ্ট করনে। পোলিস কি হিম্মত নেহি হোগি উঙ্গলি উঠানেকি…”
“ক্যায়া একবার হাম দেখ সকতে উস বাচ্চে কো?” মণিদি প্রশ্ন করে।
আমরা সবাই যাকে বলে উৎকর্ণ !
“উয়ো বাচ্চা তো ইধার নেহি হ্যায় বেটি। আগর আপলোগ ডিসাইড করকে আ্যডভান্স কর দেতে হো ডেলিভারি মিল জায়েগী কাল তক!”
কি সাংঘাতিক, ডেলিভারী! যেন জিনিস বেচা কেনা চলছে , মানুষ না! কিন্তু এই সব পঁচিশ লাখ টাকা, তার আ্যডভান্স ..সেই বা কি করে হবে!
“টেনশন কি কোঈ বাত নেহি হ্যায় বেটি।ইয়ে বিলকুল হেলদি বেবী হ্যায়, আচ্ছে খানদান সে। পুরা মেডিক্যাল চেকআপ করকে দেঙ্গে হাম।”
আমাদের দ্বিধাগ্রস্ত দেখে বলেন মাতাজী। মনে হচ্ছে এদের পুরো মেশিনারি আছে এসব জিনিস ডীল করার জন্য। হয়তো খুঁজলে আরো অনেক আনসলভড শিশু অপহরণের হদিশ মিলবে এখানে।
“মগর জারা জলদি শোচনা পড়েগা বেটি…বহোৎ সারে লোগ আ্যয়সে বাচ্চে কে লিয়ে ইন্টারেস্টেড হ্যায়। আ্যয়সে তো তুঝে সুবহ দেখকে মুঝে তরস আয়া, নেহিতো আ্যয়সে কেসেস মে তো আকসর বিডিং হোতি হ্যায়”,
মাতাজী তাড়া লাগান।
“নেহি মাতাজী , আ্যয়সা মৎ কহিয়ে, বহৎ আশ লেকে আয়ে হ্যায় ইধার, নিরাশ মৎ কিজিয়ে। আজ আট সালসে তরস গ্যায়ে হাম…”
বলে চোখে আঁচল দিয়ে সত্যি সত্যি জল মুছে ফেলল, গ্লিসারিন ছাড়া! বিরাট ট্যালেন্ট তো মণিদিটার! একদম ক্যারেক্টারে ঢুকে গেছে।
“কেঁদো না মা রাণু! তোমার ছোটকাকা যখন আছে ব্যবস্থা একটা হবে ঠিকই।”
লালমোহনবাবুও তো দেখি কম যান না। কি টাইমিং!
“ভেবো না রাণু, ভগবান নিশ্চয়ই মুখ তুলে চেয়েছেন এত দিনে। সেই জন্যই তো মাতাজীর সঙ্গে তোমার দেখা হয়ে গেল এভাবে।”
ফেলুদা ওর গলার আওয়াজ আর কথা বলার ধরণ দুই বদলে নিয়েছে। আওয়াজে একটু ফ্যাঁসফেঁসে ভাব, কথায় হাল্কা প্রবাসী টান। এ জিনিস ও আগেও করেছে ছদ্মবেশ ধরার সময়।
“দেখুন আমি ভাল হিন্দি জানি না, বাংলা বললে হবে?” লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করেন।
“জরুর! মুঝে বাংলা সমঝমে আতা হ্যায়।”
“বলছিলাম এত টাকা তো এখন আমার সঙ্গে নেই। আজ বিকেল হয়ে গেছে। ব্যাঙ্কও বন্ধ। বলি কি কাল সকালে ব্যাঙ্কে ফোন করে টাকার ব্যবস্থা করে না হয় আসি? আপনারা বাচ্চটিকেও এনে রাখবেন’খন।”
লালামোহনবাবু দেখছি ফর্মে আছেন।
“ঠিক হ্যায়। ইতনি বিনতি কর রহে হ্যায় আপ তো হোল্ড কর সকতে হ্যায় কাল তক। লেকিন বাচ্চে কো ইঁহা নেহি লায়েঙ্গে। আপলোগ পয়সা লেকে আইয়ে ইধার, পেপারস ব্যাগেড়া লিজিয়ে। উসকে বাদ হাম আপকো সাথমে লেকে চলেঙ্গে বাচ্চেকে পাস।”
“বেশ তাহলে কাল দুপুর দুটো নাগাদ আসব, তাতে তোমার অসুবিধে নেই তো অরিন্দম বাবাজীবন?” লালমোহনবাবু শুধিয়ে নেন ফেলুদাকে।
“না কোন অসুবিধে নেই ছোটকাকা। কিন্তু মাতাজী, খুব বেশী সময় লাগবে না তো?”
“আরে নেহি। দেবী মা কি কিরপা সে সারে কাম এক ঘন্টে মে হো যায়গা।”
“খুব ভাল। তা আপনাদের এখানে দেবী মার মন্দির আছে নাকি? একবার প্রণাম করে যেতাম, এতবড় একটা সুখবর তো…” ফেলুদা বলে উঠল।
“হামারে ইঁহা তো কোঈ মন্দির আ্যয়সে নেহি হ্যায়। লেকিন কাল যব বাচ্চে কো লেনে যাওগে তো পাস মে হি দেবী মা কা মন্দির মিলেঙ্গে। টেক লেনা আপনি মাথা!”
“বাঃ তাহলে তো আর কোন কথাই নেই। অরিন্দম বাবাজীবন, তুমি তো এক দেবী মার সামনেই আছ এখন—মাতাজী নিজেই তো মানে যাকে বলে হেঁ হেঁ হেঁ…”
গুবলুর জন্য বলেই কিনা জানি না, লালমোহনবাবু আজ নিজেকে ছাপিয়ে গেছেন একদম!
“আরে ছোড়িয়ে উয়ো সব…লোগ তো কুছ ভি কহতে রহতে হ্যায়…কি ম্যয় দেবী চৌধুরাইন হুঁ ইস জমানে কি…ঔর শঙ্করীজী ভবানী পাঠক!” মাতাজীর কুতকুতে চোখে তৃপ্তির হাসি।
“ইয়ে সব তো ম্যয় নেহি জানতি, লেকিন হাম কৌশিস করতে হ্যায় লোগোকি সেবা করনে কি…”
“কাল এলে কি একবার শঙ্করীপ্রসাদ গুরুজীর সঙ্গে দেখা হবে?” ফেলুদা জিজ্ঞাসা করে।
“আরে উয়ো তো বহুৎ কম রহতে হ্যায় ইধার, মিলতে ভি বহুৎ কম লোগো সে….”
“আচ্ছা! তাহলে গুরুজী থাকেন কোথায়? অন্য কোন আশ্রমে?”
“ উয়ো তো বেটা সূরজ জ্যায়সে হ্যায়…দূর রহতে হ্যায় লেকিন উনহিকি বাদৌলত সব কুছ চলতা হ্যায়…”
বলল না কিন্তু গুরুজী কোথায় থাকে! অবশ্য এমনও হতে পারে বিদেশ ভ্রমণে গেছেন।
“ঠিক আছে মাতাজী, আমরা তাহলে আজ আসি…”বলে আমরা ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াই। তখনি মণিদি হঠাৎ বলে ওঠে,
“একটা ফোটো যদি অন্ততঃ পেতাম মাতাজী, মানে একটিবার চোখের দেখা আরকি…কাল সারা রাত আমি স্বপ্ন দেখেছি, যেন নন্দলালা গোপাল আমার কাছে এসে…”
আবার চোখে আঁচল। নাঃ, ডাক্তারী ছেড়ে অভিনয়ে নেমে পড়তে পারে!
“ঠিক হ্যায়…দেখতি হুঁ ম্যায়…অপর্ণা, যারা পুছনা শম্ভুকে পাস নয়া বালা বাচ্চেকা ফোটো হ্যায় কি নেহি।”
অপর্ণা নামের মেয়েটি একটু পরে একটা ফোটো এনে মাতাজীর হাতে দিল।
“ইয়ে লে বেটি, তসল্লি করলে আপনি”, বলে মাতাজী ফোটোটা মণিদিকে দিলেন।
মণিদি একঝলক দেখেই ফেলুদার কাছে নিয়ে গিয়ে বলল, “ওগো দ্যাখ না গো, কি মিষ্টি। ছোটকাকা, তপু, তোমরাও দেখ…”
আমরা সবাই মিলে দেখলাম ফোকলা হাসিতে উজ্জ্বল গুবলুর ছবি! দেখা হয়ে গেলে অবশ্য ওটা ফেরত দিতে হল, কোন প্রমাণ ওরা বাইরে যেতে দেবে না।
——————
“তুমি দূরত্বটা হিসেব করার জন্য কতক্ষণ লাগবে জিজ্ঞেস করলে, তাই না ফেলুদা”? ফেরার পথে জিজ্ঞেস করলাম আমি।
“ঠিক ধরেছিস! গুবলুকে কোথায় রেখেছে সেটা এখন জানতে হবে। মনে হচ্ছে এই আশ্রম থেকে কুড়ি তিরিশ কিলোমিটারের মধ্যেই।আর তার কাছেই একটা মন্দির আছে।”
“তাহলে কি ওটা ঐ দেবী চৌধুরানী মন্দিরটা? ওটা কিন্তু কাছেই আশ্রমের…!” আমি বলে উঠলাম।
“হুঁ! বড্ড বেশী কাছে! আর বেশ ছোট। সম্ভাবনা একেবারে নেই তা নয়, তবে চল গিয়ে দেখি… আর একটা খটকা…”
দেবী চৌধুরানীর মন্দিরে গিয়ে দেখলাম বেশ ফাঁকাই। ছোট মন্দির। দেবী আর ভবানী পাঠক ছাড়াও রঙ্গরাজের মূর্তি আছে। বাইরে একটা বটগাছ। তার নীচের বেদী মত জায়াগাটায় এসে দাঁড়াতেই জটায়ু বলে উঠলেন “ঐ দেখুন মশাই, সেই ক্লডিয়াসের চিহ্ন !”
ওঁর আঙুল বেদীর ওপরে ত্রিশূলের নীচে সিঁদূরে আঁকা গ্রীক চিহ্নটার দিকে।
“ক্লডিয়াস না, ওটা ক্যাডুসিয়াস। কিন্তু ঠিকই বলেছেন, ঐ চিহ্নটাই বটে। চলুন যাওয়া যাক।”
“সে কি? আর একটু খুঁজে দেখবেন না? গুবলুকে রেখেছে কিনা কোথাও লুকিয়ে? চিহ্ন আছে যে এখানে?”
“ঐ চিহ্ন আছে বলেই আমি মোটামুটি শিওর যে গুবলুকে ওরা এখানে রাখেনি। আসুন, জলপাইগুড়ি যেতে হবে এখন।”
“কি করতে?”
“কাজ আছে। পুলিশ স্টেশন, বাজার…”
আমি, মণিদি আর লালমোহনবাবু চোখ চাওয়া চাওয়ি করে নিলাম। কেউ কিছু বুঝিনি। ওকে অনুসরণ করা ছাড়া আর কিছু করার নেই আমাদের। গোয়েন্দা তো ওই, বাকীরা আমরা সহকারী বই তো না, তা যতই কেন না মাঝে মাঝে বাহবা পাবার মত কাজ করি! তদন্ত ওর, প্ল্যান ওর, ডিডাকশন ওর। আমরা শুধু সাধ্যমত সাহায্য করি।সময় হলে ফেলুদাই জানাবে আমাদের।
“ওরা গুবলুকে ওদের আশ্রমে আনছে না কেন মশাই?”
জলপাইগুড়ি যাবার পথে বললেন লালমোহনবাবু।
“আনবে না কারণ ওটা ওদের ফ্রন্ট ফেস। ওখানে নিয়ম মেনে কাজ হয়। বাইরের লোক সেটাই জানে। এই ধোঁকার টাঁটির আড়ালে কি হয় সেটা তো দেখছেন। এখন ঘটনা হল ওদের ঐ অন্য কাজকর্মের ঘাঁটিটা কোথায়…?”
“সেটা কাল ওদের সঙ্গে গেলে বোঝা যাবে না?”
“কি করে লালমোহনবাবু? টাকা দিতে হবে ওদের তার আগে। আর দিলেও সঙ্গে ওদের লোক থাকবে, বাবা মুস্তাফার মত নিয়ে যাবে ঘুর পথে….ওতে হবে না।”
“তাহলে উপায়?”
“কাল দুপুরের মধ্যে ওদের ঐ লুকোন ঘাঁটিতে পৌঁছতে হবে।”
“পুলিশ?”
“হাতে নাতে ধরতে পারলে সাহায্য পাওয়া যাবে। তার আগে নয়। এই মেইন আশ্রমে পুলিশ কিচ্ছু পাবে না। ওরা সে ব্যাপারে সতর্ক।”
“তাহলে এই একদিনে ঘাঁটির হদিস…পারবেন?”
“দেখি! চেষ্টা তো করতে হবে। এখন তো জানি ওটা গুবলু। ছেড়ে দিই কি করে!”
জলপাইগুড়িতে আমাদের বাজারে নামিয়ে দিয়ে ও চলে গেল পুলিশ স্টেশনে। আমরা দু একটা দরকারী জিনিস কেনা কাটা সেরে একটা দোকানে চা খাচ্ছিলাম তখন ও এসে উপস্থিত হল। হাতে রাধাগোবিন্দ শাড়ি এম্পোরিয়েমের একটা ব্যাগ।
“কি মশাই? আপনি শাড়ি কিনলেন নাকি?”
“কেন লালমোহনবাবু, পুজো আসছে, আমি বিবাহিত লোক, একটা শাড়ি কিনতে পারি না?”
ফেলুদা মুচকি হেসে বলল।
ওর এই হাসি আমরা হাড়ে হাড়ে চিনি তাই আমরা তিনজনের একজনও ওর কথা একবর্ণও বিশ্বাস করিনি।এই হাসির মানে হল ওর মাথায় কি একটা প্ল্যান ঘুরছে কিন্তু সেটার কথা এখন খুলে বলবে না।জিজ্ঞেস করেও লাভ নেই। একপেশে হেসে নয়তো উল্টোপাল্টা একটা প্রতিপ্রশ্ন করে কাটিয়ে দেবে।
“দেখি কেমন শাড়ি কিনলে..” মণিদি হাত বাড়াতে যাচ্ছিল ঝোলার দিকে, কিন্তু তার আগেই এক পরিচিত কন্ঠস্বরে আমরা সবাই সচকিত হয়ে গেলাম।

***

পর্ব ১১ঃ মেঘরাজ

“বাধাই হো মিঃ মিত্তর, সাদী মুবারক ভাবীজী !” এক বাক্স লাড্ডু নিয়ে আমাদের টেবলে রাখল মগনলাল ।
“কি ব্যাপার মগনলালজী, আপনি এখানে?”
“আমি বলছি আমি কেন এখানে। লেকিন আপকো ভি বতানা পড়েগা। ফেয়ার এক্সচেঞ্জ হোনা চাহিয়ে!”
“সেই কাঠমান্ডুর মত?” ফেলুদার ঠোঁটের কোনে হাসি।
“আরে মিঃ মিত্তর, আপনি তো জানেন কি আমার কার্য়োবার পুরা ইন্ডিয়াতে আছে।”
“সে তো বটেই। বিশেষ করে শিবধামে। এখানেও তো কাছেই জল্পেশ, কি বলেন?”
“শিউজীকে শরণমে হাম হর জাগা রহতে হ্যায়। লেকিন এখানে উসব লিয়ে হামার কুনো কাম নাই। হামি তো আসিয়েছিলাম হামার গোডাউন দেখতে। জেল থেকে ছুটলাম, এখুন তো সারা বিজনেস উজনেসের হাল দেখতে হোবে, কি বোলেন?”
“তাই তো দেখছি। ছাড়া পেয়ে গেলেন কেদারের কেসটা থেকে?”
“আরে আপ তো ঝুটমুট এতো পরিশ্রম কোরেন…হামাকে আটকাতে পারবেন না। দেখিয়ে আপনি আমাকে জেল ভেজলেন এতে আমার কুছু দুখ নাই। মগর সাদী মে হামাকে বুলালেন না, ইয়ে তো মুঝে সাচ মে বুরা লাগা! পর যো ভি হো, হামি কিন্তু আপনার ঔর ভাবীজীকে বাস্তে লাড্ডু আনলাম!”
একটা চেয়ার টেনে এবার বসলেন মেঘরাজজী।
“সুক্রিয়া মগনলালজী। কিন্তু আপনি কি শুধু লাড্ডু দিতেই এখানে এলেন?” ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি।
“আরে হামি তো বোলে দিলাম কি কেন এলাম, লেকিন আপনি বলুন তো আপনি কি করছেন এখানে? হানিমুন তো নেহি হো সাকতা, ইয়ে দোনো হাড্ডিয়াঁ যো হ্যায় কাবাব মে…”
জটায়ুর মুখ সাংঘাতিক গম্ভীর। কাবাব মে হাড্ডির উপমাটা মোটেই পছন্দ হয়নি!
“আভি আভি তো দেখা বাজারমে পুলিশ স্টেশনের পাশে ঘুমছিলেন। কুছ নয়া কেস?”
“না মগনলালজী। গেছিলাম তো এই দোকানে।” ফেলুদা হাতের প্যাকেটটা দেখিয়ে বলে।
“আররে মিঃ মিত্তর! ইয়ে ক্যায়া হাল বানায়া আপকা হামারি ফেমিনিস্ট ভাবীজী নে! আপনার এত এক্সট্রার্ডিনারি বুদ্ধি এখুন শাড়ি পসন্দ করতে বেওহার হচ্ছে! আমি তো আপনার বড়া ফ্যান আছি…খারাব লাগছে হামার।”
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন মেঘরাজজী। কেউ বজ্জাতি করলেই আমার বুদ্ধির আবার সঠিক প্রয়োগ হবে। আপনি তেমন কিছু করছেন না তো আবার?”
“আরে, আপনি বিসয়োস নাই করবেন তো পুছেন কেন হামাকে? বোলা না, বিজনেস হ্যায় মেরা ইধার, গোডাউন ভী…ফুললি লাইসেন্সড! তো সচ মে ইখানে কুনো কাম লিয়ে আসেন নাই?”
“আমরা এসেছিলাম এমনি বেড়াতে। পুজোর ছুটি তপেশের। লালমোহনবাবুর নতুন বই বেরিয়ে গেছে। আমরা তিনজন প্রতিবারই এরকম বেরোই। এবার শুধু চারজন এই যা!”
“হাঁ, হাঁ…সে তো আমি জানি। ছুট্টি মানানে নিকলতে হ্যাঁয় ঔর ইনভেস্টিগেশন শুরু করিয়ে দেন…কাশী মে ভি তো তাই হোল, কি বোলেন?”
“সে তো অনেক সময় ঘটে মগনলালজী, কি করব! তা এখানে আপনার গোডাউনটা কোথায়? শিকারপুরে নয়তো?”
“জী নেহি। আমার বেওসা আছে তিস্তা কি কিনারে, আদি ভামরী মন্দিরের একদম বগল মে। শিকারপুরের বেপারে পুছলেন কেন, মিঃ মিত্তর?”
“না, ওখানে তো ঐ বিখ্যাত শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রম।যাননি কখনো?”
“হাঁ আমি শুনেছি জরুর, কিন্তু যাই নি কখুনো। উনকি উয়ো মেডিটেশন, রিহ্যাব মে মেরা কোঈ ইন্টারেস্ট নেহি হ্যায়।”
“তবে কি অরফানেজে ইন্টারেস্ট? কলকাতায় গেছিলেন তো ওঁদের সভায়, বিবেকানন্দ পার্কে?”
“আরে অরফানেজে আমার কেনো ইন্টারেস্ট হোবে বোলেন তো? সুরজকে তো আপনি দেখিয়েছেন। উসকে ইলাবা ভি মেরা তিন ঔর বাচ্চে হ্যায়। আ্যডপশন তো আমার কুনো দরকার নাই। আমাকে যেতে হল কিঁউকি আমার বিবি দেখা করবে বলল মাতাজীকে সাথ। তো যেতে হল হামাকে। আমার বিবি তো ভাবীজীর মতন ওরকম ফেমিনিস্ট নয়…ঘরেলু কিসিম কি হ্যায়..ফিরভি, কভি কবহার তো একটু কথা শুনতে ভি হয়!”
“তাহলে আপনি মাতাজীকে চেনেন? দেখা করেছেন?”
“দেখিয়ে মিঃ মিত্তর, হামি তো কুছ পাঁচ মিনট কে লিয়ে দেখা করলাম।লেকিন ইতনা জানি কি এখানে ও অনেক বড় নাম আছে। উয়ো বহোৎ পূণ্য কা কাম কর রহি হ্যায়। যব কোঈ বড়ে আদমী আ্যডপ্ট করতে হ্যায় তো লাইফ বন যাতি হ্যায় উন বাচ্চোকি! লোগ পুজতে হ্যায় উনকো!”
“তাহলে আপনি ঐ অরফানেজ সম্পর্কে জানেন! ঠিক কি ভাবে আ্যডপশন হয় ওখানে”? ফেলুদার ঠোঁটের কোনে হাসি।
“মিঃ মিত্তর, আভি আভি তো সাদী হুয়ি আপকি! পহলে খুদ ট্রাই তো কিজিয়ে! আভি সে ইয়ে আ্যডপশন কি বাতেঁ কিঁউ!”
মণিদির মুখের চেহারাটা দেখার মত হয়েছে।
“ঠিক হ্যায়, আব তো মুঝে যানা হোগা।আশা করব কি ইসবার সাচমুচ কা হলিডে করবেন আপনি। ঔর ইয়ে লাড্ডু খাইয়েগা জরুর…আসলি ঘিউ কা হ্যায়। আঙ্কলজি, আপ ভি খানা!”
“না না। আমি খাই না”, জটায়ু নিশ্চয়ই কাঠমান্ডুর সুগার কিউবের কথা ভাবছেন।
“আরে মোহনবাবু, এ কেমন কথা হল? খাবেন না কেন? ঘাবড়াইয়ে মৎ, এতে ভিষ নাই! ড্রাগস ভি নাই…ড্রাগস বোহৎ কিমতি চীজ আছে। পুছিয়ে আপ মিঃ মিত্তর সে, পুছিয়ে।”
জটায়ু তাও চুপ!
“ফির ভি তসল্লি নেহি হুয়া না? লাইয়ে ম্যয় খা কে দিখাতা হুঁ।”
বলে প্যাকেট খুলে একটা লাড্ডু অল্প ভেঙে খেলেন উনি।
“শিউজী কা পরসাদ সমঝকে খা লেনা। ম্যয় আব চলতা হুঁ।
“আপনার হাতের আংটিটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং মগনলালজী? ইজিপ্ট গেছিলেন নাকি?”
মগনলাল উঠতে গিয়ে মাঝপথে থেমে গেলেন। ফেলুদার দৃষ্টি ওঁর লাড্ডু ধরা ডান হাতের মধ্যমায় সোনার আংটিটায়, যার ওপর মিনে করা আই অফ রা!
চোখ বটে ফেলুদার। দুহাতে ঐ আটটা আংটির মধ্যে ওটা দেখেছে!
“ইয়ে ইজিপ্সিয়ান হ্যায় ক্যায়া? পাতা নেহি। এটা তো আমাকে আমার ভাঞ্জা দিল…আশিষ। ও তো যায় অনেক জাগা…হামি জানি না।”
বলে রওনা দিলেন মগনলাল মেঘরাজ।
“ওর ফেমিনিস্টদের ওপর এত রাগ কেন বল তো?” মগনলাল বিদায় নিতেই মণিদি বলে উঠল।
“কি ভেবেছিলে? মগনলাল উইল বী এ টর্চ বেয়ারার অফ জেন্ডার ইকোয়ালিটি? মিসোজাইনিটাই ওর চরিত্রের সঙ্গে ভাল যায় না কি? আর তুমি কবে থেকে নিজের মতামতের ব্যাপারে লোকের আ্যপ্রুভাল চাইতে শুরু করলে?
মগনলাল চিরকালের বুলি। লালমোহনবাবুকে সম্পূর্ণ অকারণে ও বহুবার নাকাল করেছে। দুর্বলের ওপর ক্ষমতার দম্ভ দেখানোকেই ও পৌরুষ ভাবে।”
“সে নাহয় হল। কিন্তু তুমি কি করে জানলে ও কলকাতায় মাতাজীর সঙ্গে দেখা করেছিল?” মণিদি ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল।
“ধুতি আর শেরওয়ানি পরা মোটা মারোয়ারি, পুকাই বলেছিল!” বিদ্যুৎ ঝলকের মত মনে পড়ল আমার।
“সাবাশ তোপসে!চল এবার গোশালা মোড়ের কালীমন্দির।”
“হঠাৎ এত ভক্তি জেগে উঠল যে তোমার?”
“যা প্যাঁচে পড়েছি এখন দেবীমাই ভরসা।”
এই মন্দিরটা জলপাইগুড়ি ইঞ্জিনীয়ারিং কলেজের কাছেই। শহরের মধ্যেই, অথচ দিনে দুপুরে গা ছমছম করে। বিশাল একটা বটগাছের অজস্র ঝুড়ি নেমেছে। তার পাশেই মন্দির। তাতে কালীমূর্তি। বাইরে বিরাট হাড়িকাঠ, কালীপুজোয় বলি হয় এখনো। লোকজন বেশী নেই এখানে । মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে করলা নদী।
বটগাছের তলায় ধুনি জ্বেলে বসেছেন এক লাল আলখাল্লা পরা বাবাজী এবং পাশে লাল শাড়ি পরা ভৈরবী মা। পাশের মাটিতে পোঁতা ত্রিশূল।
“এই মন্দিরটা কিসের ফেলুবাবু?”
“এটাও দেবী চৌধুরানীর মন্দির। কথিত আছে এখানে পুজো দিয়ে ডাকাতিতে বেরোতেন দেবী। দেবীর বজরা ঘুরত করলা নদীতে। করলা নদীর এমন মজা দশা তখন ছিল না।গর্ভগৃহের থেকে নাকি সুড়ঙ্গপথে নেমে যাওয়া যেত করলা নদীতে।”
“বলেন কি? ঐ কালীমূর্তির কাছেই তাহলে সেই সুড়ঙ্গমুখ?”
“না লালমোহনবাবু। সেই আদিমন্দিরের গর্ভগৃহ আর এটা এক নয়। সে মন্দির অনেক আগেই ভেঙেচুরে গেছে। সেই সুড়ঙ্গের মুখ যে কোথায় এখন তা বলা মুশকিল। অবিশ্যি এমনও হতে পারে যে পুরোটাই গল্প!”
বলতে বলতে চলে এলাম মন্দিরের পিছনের দিকে। এদিকে বিশেষ কিছুই নেই, কেবল একটা অস্থায়ী ছাউনি, সেটায় বোধহয় ঐ বটতলার সাধু থাকেন। ছাউনির পেছনে একটা মজা কুয়ো আর একটু দূরে একটা পরিত্যক্ত হাড়িকাঠ।
“ক’টা হাড়িকাঠ মশাই? “ বলে উঠলেন জটায়ু!
“এটা মনে হয় না আর ব্যবহার হয়…দেখছেন না কেমন ভগ্নদশা।”
“কি-কিন্তু ফেলুদা, ঐ দেখ…” আমি আঙুল তুলে দেখাই হাড়িকাঠের নীচে পাথরে খোদাই করা আ্যঙ্খ।
“দেখেছি! রহস্যটা বোধহয় এবার পরিস্কার হয়ে আসছে রে তোপসে…সাইডগুলো সব মিলে যাচ্ছে এখন বাকী শুধু মধ্যিখানটা…”।
বলতে বলতে ও এগিয়ে গেল কুয়োর দিকে। আমরা ওর পেছনে। উঁকি মেরে দেখলাম কুয়োর মধ্যে আগাছা আর জংলী ডালপালায় ভর্তি। তার পরেই দেখলাম কুয়োর পার থেকে কি একটা কুড়িয়ে নিল ফেলুদা।
“আপনারা কি কলকাতা থেকে এসেছেন, বেড়াতে?”
ভৈরবী মা বটতলা থেকে উঠে এসেছেন।
“আজ্ঞে হ্যাঁ ।” জটায়ু জবাব দিলেন।
“সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, এখানে থাকবেন না…সাপ খোপের আড্ডা ঐ মজা কুয়ো। ঐ দেখুন, শঙ্খচূড়ের খোলস পড়ে আছে …” ভৈরবী আঙুল দিয়ে দেখালেন।
“ওরে বাবা, কি সব্বনাশ! ভাগ্যিস আপনি বললেন। চলুন মশাই, যাই এখান থেকে। শঙ্খচূড়ের এক ছোবলেই মৃত্যু!”
“এখানে দেখার কিছু নেইও। মন্দিরের ভেতরে যান, প্রতিমা দর্শন করুন, ভাল লাগবে।”
ভৈরবী বলে চলে গেলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
“আচ্ছা ফেলুদা, ওটা তখন তুমি কি কুড়িয়ে নিলে?”
“এই দ্যাখ”, ফেলুদার হাতের তালুতে একটা খয়রী গোল জিনিস।
“রুদ্রাক্ষ নাকি মশাই? এত স্মুথ যে? খাঁকড়া কাটা হয় না?”
“নর্মালি তাই হয়।”
“ঐ ভৈরবী কিম্বা সাধু বাবাজীর গলা থেকে খুলে পড়েছে , নাকি?”
“কারো না কারো গলা থেকে তো খুলে পড়েছে বটেই…!
“ফেলুদা, মগনলালের ঐ আংটি কি সত্যিই কাকতালীয়? ও জানে না?”
“কাকতালীয় কিছুই নয় রে তোপসে! শঙ্করীপ্রসাদের সঙ্গে ও যুক্ত। তাই লাড্ডু নিয়ে এসেছিল খবর যোগাড় করতে যে আমি কতটা কি জানি।”
“ও মশাই, তাহলে আমাদের ছদ্মবেশ”? জটায়ু বলে ওঠেন।
“ছদ্মবেশ আর নাম তো দেখেছে মাতাজী, মগনলাল তো নয়! দাড়ি তো আমি পুলিশের কাছে যাব বলে আগেই খুলে ফেলেছিলাম। চল, এবার যাওয়া যাক। এবার হোটেলে ফেরত। কাল তো ক্লাইম্যাক্স।”
অবশেষে বলল ফেলুদা।
“আচ্ছা কাল যদি ক্লাইম্যাক্স হয় তো মারামারির চান্স আছে? মণিদি হঠাৎ বলে উঠল।
“হতে পারে। কেন, ঘাবড়ে গেলে?”
“শাড়ি পরে কি করে মারামারি করব?”
“কেন দেবী দুর্গার মত!”

***

পর্ব ১২ঃ বাবার প্রসাদ

হোটেলে ফিরে লালমোহনবাবু বললেন
“তাহলে লাড্ডুগুলো কি হবে ফেলুবাবু?”
“বিয়ের হট্টগোলে হাবিজাবি খেয়ে খেয়ে আমার দেড় কেজি ওজন বেড়ে গেছে লালমোহনবাবু। ওটা আবার আগের জায়াগায় না নামা অব্দি আমি মিষ্টি ছুঁচ্ছি না।”
“আমিও তাই। লো কার্ব, নো সুগার।” মণিদি সায় দেয়।
“সবেতেই বাড়াবাড়ি মশাই আপনাদের! বিয়ের পর অমন একটু আধটু ওজন সবার বাড়ে…”
“…এবং তারপর বাড়তেই থাকে আর অচিরেই একটি নেয়াপাতি ভুঁড়ি। ওসব হলে গোয়েন্দার চলে না মশাই।
যোগব্যায়ামের সময় বাড়িয়ে দিয়েছি এবং কার্ব কমিয়ে দিয়েছি।চান তো আপনি খেতে পারেন। অবিশ্যি যদি ভরসা হয়…”
“ভরসা তো করা যায় মনে হয়…খেয়ে দেখাল যে মগনলাল। বেশ বড় বড় ঘিয়ের লাড্ডু কিন্তু ! আমাদের ঘরেই নিয়ে যাই, কি বল তপেশ? তোমার আবার লো কার্ব, নো কার্ব এসব নেই তো?”
“না লালমোহনবাবু, তবে আমার এখন পেট ভরা। নিয়ে চলুন আমাদের সঙ্গে। খাব না হয় একটু পরে।”
কিন্তু আমার আর খাওয়া হল না। লালমোহন বাবু ঘরে ফিরে টপাটপ দুটো খেয়ে ফেললেন। আমি গেলাম বাথরুমে ভাল করে চান করতে, সারাদিন অনেক হুজ্জুতি হয়েছে।
আমি স্নান সেরে এসে দেখি লালমোহনবাবু নিজের বিছানার চাদরটা টেনে টেনে সোজা করছেন।জিজ্ঞেস করতে বললেন বিছানাটা নাকি ভীষণ নরম লাগছে। তখনও ভাল বুঝিনি কি হচ্ছে, তাই একটু অবাক হয়েই বললাম,
“বিছানা তো নরম হওয়াই ভাল লালমোহনবাবু!”
তাতে উনি ভয়ঙ্কর হাসতে শুরু করে দিলেন, হাসির দমকে কথা আটকে যেতে যেতে বললেন,
“বি-ই-ই-ছানা—-হো হো হো—ন-অ-অ-রম —হো হো হো—হওয়া ভা-আ-আ-ল—হো হো হো হো..!”
“কি মুশকিল! আপনি ওরকম মাতাল কুট্টুসের মত করছেন কেন?”
“কুট্টুস মাতাল নাকি ক্যাপটেন হ্যাডক মাতাল ভাই? ব্লিস্টারিং বার্নাকলস… খুকুর কুকুর / ঠাকুর পুকুর/ মেঘলা দুপুর/টাপুর টুপুর…হিক…হে হে!”
“কি জ্বালা! বসুন দেখি এসে এখানে! চুপ করে বসুন। কোন কথা নয়।”
“শ-শ-শ”, ঠোঁটের ওপর তর্জনী দিয়ে বললেন ভদ্রলোক।
“কোন প্রশ্ন নয়, কোন প্রশ্ন নয়! কেবল উট সম্পর্কে প্রশ্ন চলবে।”
বলে টলে আয়নার সামনে রাখা টুলটায় ঘোড়ায় চাপার মত দুদিকে পা দিয়ে বসলেন। বোধহয় উটে চাপা হচ্ছে। কারণ আপার বডিটা ওরকম আগুপিছু করতে লাগলেন।
“লালমোহনবাবু, এরকম করলে কিন্তু আপনাকে এবার বেঁধে রাখতে হবে।” আমি কড়া গলায় বলি।
“আমারে বাঁধবি তোরা, সে বাঁধন কি তোদের আছে-এ-এ-এ…”
“উঃ, এখন আবার বেসুরো গলায় গান ধরলেন?”
“বেসুরো কেন হবে ভাই? আমি একজন কোকিলছানা ডাকছি কু-উ-উ, কু-উ-উ!”
এতো পারা যায় না, আবার ক্যাপ্টেন হ্যাডক!
“এই গানটা দয়া করে থামান না!”
“তাহলে কোনটা গাইব? শিখিপাখা মিশিমাখা নাকি রামভজনের গিন্নীটা/বাপরে যেন সিংগীটা/বাসন নাড়ে ঝনারঝন/কাপড় কাচে দমাদ্দম…”
ভারী বিপদ! টিনটিন, রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায় সব একসঙ্গে ঘেঁটে ঘন্ট! ব্যাপার সুবিধের নয়। লাড্ডুতে নিশ্চয়ই কিছু ছিল। কি করি এখন! ভাবলাম ফেলুদাদের একটা ফোন করা যাক।
কিন্তু সবে ডায়াল করেছি আর উনি ছুটে এসে আমার হাত থেকে রিসিভারটা ছিনিয়ে নিয়ে ঠোঁটের ওপর তর্জনী রেখে মুখে অমায়িক হাসি টেনে বললেন,
“শ-শ-শ! ওদের ডিস্টার্ব কোর না তপেশ! কাবাব মে হাড্ডি—বুরা বাৎ—আমরা বুড়া না তপেশ—তুমিও না, আমিও না—আমার বয়স সবে সাড়ে তেরো…”।
এই সেরেছে, একি হ য ব র লর উধো হয়ে গেল নাকি! মহা মুশকিল! রিসিভারের ওদিকে ফেলুদার গলা শুনছি,
“হ্যালো, হ্যালো!”
জটায়ু দেখি এক পায়ে দাঁড়িয়ে কাত হয়ে বলছেন “হেলেছি, হেলেছি…আর কত হেলব?”
বলতে বলতে কাত হয়ে বিছানায় পড়ে গেলেন। আবার দম ফাটা হাসি।
এর মধ্যে দরজায় টোকা। ফেলুদা বোধ হয়। গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি ফেলুদা আর মণিদি দুজনেই।
“আপনার স্বামী ডাঃ ব্যানার্জিকে ডেকে দিন তো…ফেলুবাবুকে দেখাতে হবে, কাঁধে চোট লেগেছে।”
হাসি হাসি মুখে মণিদিকে বললেন জটায়ু।
মণিদি অবাক চোখে তাকাতেই আমি বাক্সটা দেখিয়ে বললাম “লাড্ডু!”
“দিল্লীকা লাড্ডু…ফেলুবাবু খাকে পস্তায়া, হাম নেহি খাকে পস্তায়া…” আবার শুরু করেছে!
মণিদি এর মধ্যে লাড্ডুর বাক্সটা খুলে বলে উঠল,
“কি কান্ড, চারটে খেয়ে ফেলেছেন নাকি?”
আমি তো দেখেছিলাম দুটো! তাহলে তারপর আরো দুটো খেয়েছেন যখন আমি বাথরুমে ছিলাম তখন।
“দারুণ খিদে পেয়েছে মশাই। আর একটা দিন তো!” জটায়ু হাত বাড়ান।
“সব্বনাশ! একদম না!” মণিদি চকিতে সরিয়ে নিল প্যাকেট।
“তাহলে আপনার ক্যারামেল পুডিং কিম্বা প্রন পকোড়া“?
“এখন ওসব কিচ্ছু হবে না। যান গিয়ে শুয়ে পড়ুন।” মণিদি কড়া গলায় বলে।
“ধুর, আপনি মশাই উপোস করিয়ে রাখেন বড় লোককে।” বাচ্চাদের মত ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন জটায়ু। “কাল ফেলুবাবু অমনি বরফের মধ্যে সারা রাত রইলেন আপনার কাছে, কিন্তু কিছু খাওয়ালেন না , ভারী অন্যায়!”
ভদ্রলোকের টাইম -স্পেস সব ঘেঁটে গেছে।
“ফেলুবাবু কিন্তু ভারী ভাল। আমাদের খাওয়ালেন অপেরাশালেনে, তারপর আংটি দিলেন… আনিকাকে দিলেও হত আংটিটা…”
“আনিকাকে কে আংটি দিত লালমোহনবাবু? ও?”
মণিদির দিকে কড়া চোখে তাকাল ফেলুদা।
“আ্যল, ছি ছি ছি…তাই কি হয়”, বিশাল জিভ কাটলেন ভদ্রলোক।
“আনিকাকে দেবেন প্রখর রুদ্র, আপনাকে দেবেন প্রদোষ মিত্র….আমাকে দেবে মগনলাল …”
“কি দেবে? আংটি?”
এবার ফেলুদার দৃষ্টি আরো কড়া কিন্তু মণিদি পাত্তা দিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
“আরে না না, আংটি কেন…সুগার কিউব, লাড্ডু…খাবেন নাকি?” জটায়ুর মুখে আবার অমায়িক হাসি।
“না ও খাবে না। আমরা কেউ খাব না। যান গিয়ে শুয়ে পড়ুন। কাল আবার ঐ আ্যডপশনের ব্যাপারে—“
ফেলুদার কথা শেষ হবার আগেই জটায়ু বলে ওঠেন
“আভি সে আ্যডপশন কিঁউ? যান মশাই, ঘরে গিয়ে ট্রাই করুন তো নিজেরা…”
“উফ! ইমপসিবল...যা খুশী বকে যাচ্ছে”, ফেলুদা চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল।
“কি বুঝছ মণি? ভাং লাড্ডু তো?”
“সে তো বটেই। শিউজীর প্রসাদ বলে কথা। সেই জন্যই এত খিদে।”
“কিছু কি করার আছে?”
“বিশেষ না। ইট উইল রান ইটস ওন কোর্স। তুমি বরং এদের বার থেকে একটু লেমনেড নিয়ে এস। আমি একটা মাইল্ড কাম্পোজ দিয়ে দিচ্ছি। ঘুমটাই সবচেয়ে দরকার।”
“ঠিকই। আমি বরং কিছু খাবার দাবারও নিয়ে আসি।না হলে আবার খিদের চোটে উঠে পড়বে। তোপসে, ঘুমিয়ে পড়লে তুই হ্যান্ডেল করতে পারবি তো?”
“হ্যাঁ, তা পারব। কিন্তু মগনলাল যে খেয়ে দেখাল?”
“খেল তো ঐ টুকু ভেঙে। ওতে ওর কি হবে?”
“কারণটা কি?”
“কিছুটা হয়তো নিছক জব্দ করা…জেলে পাঠানোর শোধ। তবে হয়তো ভেবেছিল হ্যাংওভারের ঠেলায় যা করতে এসেছি সেটা খানিকটা হলেও পন্ড হবে।”
“ও কি জানে আমরা কি করতে এসেছি?”
“মিঃ আ্যন্ড মিসেস ব্যানার্জি যে আমরা তা নিশ্চয়ই জানে না। তবে হয়তো আমাদের দেখে ভেবেছে ওর কোন কুকর্মের ব্যাপারে আমরা খোঁজ করছি কিনা। ওর সঙ্গে এই আশ্রমের লিঙ্কের ব্যাপারে এখন আমি নিশ্চিত।ওর আংটিটা দেখার পর থেকেই।”
“আমার সঙ্গে এস প্রদোষ। কাম্পোজ আছে আমার ব্যাগে। দিয়ে দিই তোমাকে। এনে খাইয়ে দাও।”
মণিদিরা বেরিয়ে গেল। একটু পরে ফেলুদা একা ফিরে এল ট্যাবলেট আর লেমনেড নিয়ে।
“এই নিন লালমেহনবাবু, খেয়ে ফেলুন এটা”, মণিদির দেওয়া ট্যাবলেটটা হাতে নিয়ে বলল ফেলুদা।
“দূর মশাই, কেন খাব? এখনো তো জলের গ্লাসে ভিবজিওর দেখছি না।” কাঠমান্ডুর রেফারেন্স বোধ হয়।
“তাও খেয়ে ফেলুন। মণি বলেছে এটা আপনার দরকার।”
“ধুর, আপনি বড় হেন পেকড হয়ে গেছেন। ম্যাডাম যা বলবেন তাই। উনি এখন আপনার জীবনের সেন্টার অব গ্র্যাভিটি!”
ফেলুদা হাতে ওষুধ নিয়ে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মিনিট খানেক। ও কি অফেন্ডেড হল নাকি জটায়ুর কথায়? ভদ্রলোক তো সেন্সে নেই এখন…
“আপনি জিনিয়াস লালমোহনবাবু! সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি! অফ কোর্স! ধাঁধার উত্তর মিলে গেল…শেষে দিল রা!”
মাথামুন্ডু কিছু বুঝলাম না।ফেলুদাও কি ভাঙের লাড্ডু খেল নাকি?
ফেলুদারা কাম্পোজ দিয়ে নিজেদের ঘরে চলে যাবার কিছুক্ষণ পর জটায়ুও নিদ্রা দিলেন। মাঝে আর বিশেষ গোলমাল করেননি। লেমনেডের পর ঐ দমকা হাসির প্রকোপটা কমে গেছিল।
শুধু ঘুমোনোর আগে একবার বললেন
“দেবী চৌধুরানীর সাত ঘড়া মোহর কোথায় পোঁতা আছে বলতো? সেই যে জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা বাড়ি?”
“সে কি আর এদ্দিনে আছে নাকি”?
“নেই বলছ?…পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা…ধারাগোল…গন্ডগোল, বিস্তর গন্ডগোল…”
বিড়বিড় করতে করতে ভদ্রলোক চোখ বুজলেন। ঘড়িতে তখন রাত্রি সাড়ে এগারোটা।

***

পর্ব ১৩ঃমাতৃতন্ত্র

পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ আমাদের ঘরের ফোনটা বেজে উঠল।
“তোপসে মন দিয়ে শোন। ঘন্টা খানেকের মধ্যে রেডি হয়ে তোরা দুজন গাড়ি নিয়ে বেরোবি। গাড়ি ঠিক করা আছে। তোদের রিসেপশন থেকে ডেকে নেবে। আড়াল থেকে শিকারপুরের মন্দিরের ওপর নজর রাখবি। মন্দিরের মধ্যে যাবি না। যদি বাই চান্স গুবলুকে ওরা ওখানে নিয়ে আসে…চান্স কম, তাও গুবলুর ব্যাপারে আমি কোন রিস্ক নিতে চাই না…তাহলে ড্রাইভারকে সঙ্গে সঙ্গে ডেকে নিবি। ও পুলিশের লোক, আর্মস থাকবে ওর সঙ্গে। যদি গুবলুকে ওরা ওখানে না আনে তো দশটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়বি। ড্রাইভারকে বলা আছে কোথায়।”
“আর তোমরা?”
“আমরা বেরিয়ে পড়েছি। অন্যদিকে।”
“কিন্তু তোমাদের সঙ্গে আবার কোথায় যোগাযোগ হবে?”
“সময় হলেই জানতে পারবি। এখন ছাড়ছি।”
কি যে হচ্ছে কিছু তো বুঝতে পারছি না।
“এ তো সেই কৈলাসের মত ব্যাপার মন হচ্ছে তপেশ ! তোমার দাদা আড়াল থেকে ইন্সট্রাকশন দিয়ে যাচ্ছেন!”
কথাটা জটায়ু ঠিকই বলেছেন। যাই হোক ও যেমন বলল সেইমত আমি আর লালমোহনবাবু বেরিয়ে পড়লাম।
মন্দিরের দর্শনার্থীরা যেখানে গাড়ি রাখে সেখানে রেখে জঙ্গলে ঢুকে গেলাম। এত সকালে বিশেষ কেউ নেই।
শরৎ কালের সকালে ডুয়ার্সের জঙ্গল দারুণ সুন্দর লাগছে। মন্দিরের থেকে একটু দূরে গিয়ে দাঁড়ালাম।
সামনে দুটো বড় শাল গাছ আছে, এছাড়া ছোটখাট ঝোপঝাড়।আড়াল ভালই হবে। একটা জায়গা বেছে দাঁড়ালাম যেখান থেকে মন্দিরের দরজা ভাল করে দেখা যায়।
বেলা বাড়তে থাকল। একজন এসে ঝাঁটপাট দিল, তার কিছুক্ষণ পরে একজন পুজারী এসে ভেতরে ঢুকে মিনিট পনের কুড়ি পর বেড়িয়ে গেলেন। বোধহয় পুজো হল। তারপর আবার শুনশান। কোন ট্যুরিস্ট এখনো আসে নি। খুব একটা জনবহুল ট্যুরিস্ট স্পট তো এটা নয়!
এখন প্রায় নটা। এমন সময় দেখলাম কালকের ঐ অপর্ণা, শম্ভু আর আরো একজন মন্দিরের দিকে আসছে। অন্য লোকটি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। অপর্ণা আর শম্ভু ভেতরে চলে গেল। তারপর মিনিট দশেক পরে অন্য লোকটা চলে গেল। উঁকি মেরে দেখলাম ও গাড়িতে উঠে স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল।
“কি হল বলুন তো লালমোহনবাবু? বাকী দুজনকে মন্দিরের মধ্যে রেখে গেল নাকি?”
“সেই তো ভাবছি তপেশ ভাই । একবার ভেতরে গিয়ে দেখব নাকি?”
“ওরা চিনে ফেললে? কাল তো দেখেছে আমাদের…”
“তাহলে?”
“আর একটু দেখি।”
কিন্তু আরো প্রায় আধঘন্টা হয়ে গেল কেউ বেরোল না।
“চল ভাই , একটু গিয়ে দেখি। নেহাৎ সামনে পড়ে গেলে বলে দেব যাহোক কিছু…মন্দিরে পুজো দিতে এসেছি…”
“চলুন তবে!”
ভেতরে গিয়ে দেখি কেউ কোথাও নেই। ভবানী পাঠক আর দেবীর দুটো মূর্তি পাশাপাশি বসানো। আর কোন দরজাও নেই।
“কি হল বলতো তপেশ? ওরা দুজন ভ্যানিশ করে গেল নাকি?”
“তা তো হতে পারে না…নিশ্চয়ই অন্য কোন রাস্তা আছে…”
“কিন্তু কোথায়?”
“বাবা, সাপ নাকি ওটা?” বলে লাফ মেরে মূর্তিগুলোর পেছনে সরে গেলেন লালমোহনবাবু।
আমি ততক্ষণে দেখে নিয়েছি সাপ টাপ নয়, ওটা নেহাতই শুকনো ফুলের মালা।ভদ্রলোকের হ্যাংওভার বোধহয় এখনো পুরো কাটেনি, তাই এটাকে সাপ ভেবেছেন!
কিন্তু তার মধ্যেই লালমোহনবাবু টাল সামলানোর জন্য পেছনের দেওয়ালে আটকানো মশালের হুকটা ধরেছেন।
হুকে টান পড়তেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটে গেল। দেবী আর ভবানী পাঠকের মূর্তি দুটো দুদিকে সরে গেল…মাঝখানে মেঝেতে একটা দরজা। ট্র্যাপডোর।
উঁকি মেরে দেখলাম সিঁড়ি নেমে গেছে। মশালের হুকটা মূর্তির পেছনে হওয়ায় এমনিতে লোকে ওটা ধরে টানবে তার চান্স কম। নেহাৎ লালমোহনবাবু সাপের ভয়ে অমন লাফ দিয়ে উঠলেন তাই।
“যাব, ভাই?”
“অবশ্যই। চলে আসুন।”
নামতে গিয়ে দেখলাম ভেতরের দেওয়ালে আর একটা মশালের হুক। টানতেই দরজাটা ওপরে বন্ধ হয়ে গেল। ওপরে দেবী নিশ্চয়ই আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেছেন।
সিঁড়িটা দিয়ে একতলা মত নামতেই একটা করিডোর।
দুপাশে তালা দেওয়া বন্ধ ঘর। মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে কয়েকটা।কয়েকটা ঘরের দরজায় আবার ঐ ক্যাডুসিয়াসের চিহ্ন। দরজাগুলোয় কান পেতে শুনলাম, কিন্তু কোন আওয়াজ পেলাম না।তারপর করিডোর ধরে আঁকাবাঁকা পথে বেশ কিছুটা গিয়ে দেখলাম আবার একটা সিঁড়ি উঠে গেছে। সেটা দিয়ে কিছুদূর উঠতেই একটা দরজা। দরজার বাইরে এসে দেখি জঙ্গল এখানে আরো ঘন আর সামনে একটা ছোট নালার মত। সেখানে ছোট একটা ঘাট এবং নৌকা বেঁধে রাখার জায়গা আছে।
“এখান দিয়ে নৌকা করে গেছে নাকি ওরা?”
“তাই তো মনে হচ্ছে। কিন্তু কেন?”
“সে তো বোঝা মুশকিল। তবে এত গোপনীয়তা যখন একটা কিছু ব্যাপার তো আছেই।”
“কি করবে এখন তাহলে ?”
“এখন তো আর কিছু করার নেই। চলুন ফেরা যাক। গাড়িতে পৌঁছতে হবে শীগ্গীরই। দশটা প্রায় বাজে।”
“যে পথে এলুম সেখান দিয়েই ফিরব?”
“না রিস্কি হয়ে যাবে। মন্দিরের মধ্যে যদি কেউ দেখে ফেলে?”
“তাহলে?”
“চলুন না, জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, ঐ মন্দিরের পেছনের দিকে।খুব বেশীদূর তো হবে না…চার পাঁচশ মিটার বড় জোর। পৌঁছে যাব।”
ফিরতে বিশেষ অসুবিধে হল না।একটু এগোতেই মন্দিরের চূড়ার ত্রিশূল দেখতে পেলাম। পার্কিং-এ এসে ড্রাইভারকে বললাম যেতে।
গাড়ি জলপাইগুড়ির রাস্তা ধরল। কালকের সেই কালীমন্দিরে এসে গাড়ি থামল। ফেলুদারা কি তাহলে এই মন্দিরে?
দেখলাম আজ এখানে কিছু ট্যুরিস্ট আছে। কয়েকজন দেশী-বিদেশী ট্যুরিস্ট বাইরে বটগাছের নীচে গোল হয়ে বসে সেই সাধুবাবা আর ভৈরবী মায়ের বাণী শুনছে। মনে হল বেশ মুগ্ধ। সাধুর সামনে ধুনি জ্বলছে, ভৈরবীর সামনে ত্রিশূল পোঁতা।মন্দিরের ভেতরে কেউ নেই।
এবার কি করতে হবে ফেলুদা তো বলে দেয়নি। হয়তো এসে পড়বে শীগ্গীর, অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। একটু দূরে দাঁড়ালাম যাতে মন্দিরের দরজাটা চোখে পড়ে। বটগাছের বিশাল গুঁড়ি আর ঝুড়িতে মোটামুটি আড়াল হচ্ছে।সাধুবাবার বাণী শোনার কোন ইচ্ছে আপাতত আমাদের নেই, তাই ওদিকে ঘেঁসলাম না।
একটু পরেই দেখি মন্দিরের পেছন থেকে বেরিয়ে এল শম্ভু আর অপর্ণা। দেখেই আমরা বটগাছের গুঁড়ির আড়ালে ভাল মত সরে গিয়ে উঁকি মেরে দেখতে লাগলাম। ওদের সাজ পোশাক এখন একদম আলাদা। আশ্রমের গেরুয়া-সাদা পোশাকের বদলে সাধারণ প্যান্ট শার্ট আর শাড়ি। শম্ভুর কাঁধে একটা বড় ব্যাগ। অপর্ণার কোলে একটি বাচ্চা—দূর থেকে মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আমি বাজি রাখতে পারি ওটা গুবলু।
কিন্তু ওরা গুবলুকে পেল কোথা থেকে? যখন শিকারপুরের সুড়ঙ্গে নেমে গেল তখন তো শুধু দুজন ছিল! এখন ঐ পেছনদিক থেকে এল, মানে নদীর দিক থেকে। তবে কি ঐদিকে কোন ঘাট আছে? আর নদী দিয়ে আসার পথে গুবলুকে কোথায় পেল?
“কি করবে তপেশ? সোজা গিয়ে চার্জ করবে?”
“না লালমোহনবাবু! ফেলুদা সেরকম কিছু করতে বলেনি। ওদের কাছে অস্ত্র থাকতে পারে, গুবলু আমাদের চেনা এমন কোন প্রমাণ নেই, ওরা উল্টো ওর আসল বাবা-মা বলে চেঁচিয়ে সীন ক্রিয়েট করতে পারে।”
“তবে?”
“দাঁড়ান, আর একটু দেখি।”
বলতে বলতেই দেখি উল্টোদিকের পার্কিং এর জায়গা থেকে আসছেন পার্বতীমাঈ আর সঙ্গে মগনলাল।
দুজনে এগিয়ে গেল ঐ বটতলার সন্ন্যাসী আর ভৈরবীর দিকে। এদিক থেকে শম্ভুরাও গুবলুকে নিয়ে এগিয়ে গেল ওদিকে। চারজনেই বেদীতে উঠেছে, তখনি হঠাৎ একটা ব্যাপার ঘটে গেল।
সন্ন্যাসীর কোঁচড় থেকে বেরিয়ে এল একটা রিভলবার। সেটা সোজা ওদের দিকে তাক করে সন্ন্যাসী ভৈরবীকে দেখিয়ে বললেন “বাচ্চাটাকে ওর হাতে দিন, ক্যুইক!”
ফেলুদা! আর পাশে ভৈরবী বেশে মণিদি!
রাধাগোবিন্দ এম্পোরিয়ামের প্যাকেটে তাহলে এই ছদ্মবেশের পোশাকই ছিল!
জমায়েত হওয়া ভক্তদের মধ্যেও দুজন রিভলবার বের করেছেন। নিশ্চয়ই পুলিশ।
অপর্ণা ভ্যাবাচাকা খেয়ে একটু এদিক ওদিক দেখে গুবলুকে মণিদির দিকে বাড়াচ্ছিল, হঠাৎ মাতাজী ওকে অপর্ণার কোল থেকে ছিনিয়ে নিলেন একহাতে। অন্য হাতে ঝকঝক করছে কোমরের গেঁজে থেকে বের করা ছুরি। ছুরিটা গুবলুর গলার কাছে ধরে উনি বললেন,
“আপলোগ সব আপনা হাতিয়াড় নীচে রাখখো ঔর হাত উপর। হাম সব কো জানে দো, নেহি তো ইস বাচ্চে কো জান সে মার দুঙ্গি। সচ কহতি হুঁ ম্যয়।”
ভয়ঙ্কর পৈশাচিক লাগছে এখন মাতাজীকে।
কিছু করার নেই, ঐটুকু বাচ্চাকে হোস্টেজ বানিয়েছে। মাতাজীর চেহারাই বলে দিচ্ছে উনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য যা খুশী করতে পারেন।আস্তে আস্তে সবাই রিভলবার মাটিতে রেখে দিল।শম্ভু মাটিতে রাখা অস্ত্রগুলো এক এক করে তুলে নিল।ওরা চারজনে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। মাতাজীর কোলে গুবলু, ডান হাতে ধরা ছোট, বাঁকা ছুরি ওর গলার খুব কাছে…দেখেই আমার পেটের ভেতর কেমন জানি করছে।
মগনলাল আর অপর্ণা প্রায় গাড়ির কাছে চলে গেছে। মাতাজী ঐ বেদী থেকে নেমে এগোচ্ছেন। শম্ভু ওঁকে গার্ড করে আছে।
ওরা এখন মাথার ওপর হাত তুলে থাকা দুজন পুলিশকে পেরিয়ে মণিদিকে ছাড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছে। এমন সময় মাটিতে পোঁতা ত্রিশূলটা এক ঝটকায় তুলে নিয়ে শম্ভুর মাথায় বেদীর ওপর থেকে মোক্ষম ঘা মারল ভৈরবী বেশী মণিদি।
শম্ভু হুমড়ি খেয়ে পড়ল মাতাজীর ঘাড়ে। মাথার পেছনে ফেটে রক্ত ঝরছে ওর। ফেলুদা লাফিয়ে বেদী থেকে নেমে শম্ভুর হাত থেকে পড়ে যাওয়া রিভলবারগুলো তুলে নিল।এদিকে শম্ভু ঘাড়ে পড়ায় মাতাজীর ব্যালেন্স হারিয়ে ছুরিটা হাত ফস্কে মাটিতে।এক হাতে গুবলুকে ধরে উনি ছুরিটার দিকে নীচু হয়ে আবার হাত বাড়ানোর আগেই মণিদি বেদী থেকে ত্রিশূল নিয়ে লাফিয়ে নেমে মাতাজীর গলায় ঠেকিয়ে বলে উঠল,
“বাচ্চাটাকে ছেড়ে না দিলে এই ত্রিশূল কিন্তু আপনার ক্যারোটিড আর্টারী ভেদ করবে মাতাজী!”
লাল শাড়ি, গলায় রুদ্রাক্ষ, খোলা চুল, হাতে ত্রিশূল আর অগ্নিবর্ষী দৃষ্টিতে মণিদি তখন সত্যিই রণচন্ডী!
পঞ্চমীর সকালে দূরে কোথাও ঢাক বাজছে।
মগনলাল আর অপর্ণা কিন্তু গাড়িতে উঠে এর মধ্যে রওনা দিয়েছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আর বাকী দুজনের জন্য দাঁড়ায়নি।
এদিকে পুলিশ যতক্ষণে মাতাজী আর শম্ভুকে হাতকড়া পরাচ্ছিল ততক্ষণে লালমোহনবাবু গুবলুকে কোলে তুলে নিয়েছেন।
“মণি ক্যুইক, ওদের পিছু নিতে হবে। লালমোহনবাবু, আপনি গুবলুকে নিয়ে এখানেই থাকুন, পুলিশের সঙ্গে। তোপসে তুই আমাদের সঙ্গে আয়।”
বলতে বলতেই আমরা ছুটলাম গাড়ির দিকে। এটাতে করেই এসেছিল মণিদিরা সকালে।
“কোন দিকে যাব?”
“রংধামালি বাজারের দিকে চল।”
“শিওর তুমি ? শিকারপুরের উল্টো দিকে তো?”
মণিদি থার্ড গিয়ারে শিফট করে বলল।
“হ্যাঁ।ওদিকেই ভামরী মন্দির!”
ড্রাইভিং সীটে ভৈরবীকে দেখে অনেকেই চমকে যাচ্ছিল। তবে শহর থেকে বেরিয়েই মণিদি স্পীড তুলে দিল। লোকালয় ছাড়িয়ে দুপাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে কালো পিচের রাস্তা ধরে মিনিট দশেক যেতেই দূরে দেখতে পেলাম মগনলালদের সাদা ফিয়াট।
“তুমি কি চাকায় গুলি করবে ভাবছ?” ফেলুদাকে রিভলবার বের করতে দেখে প্রশ্ন করল মণিদি।
“হ্যাঁ, দেখ যতটা কাছে যেতে পার।”
“একটু ওয়েট কর…ওরা আমাদের দেখে আ্যকসিলারেট করছে। আমাকেও করতে হবে। স্টেডি পেস না হলে তুমি মিস করে যাবে।” মণিদির ডান পা গ্যাস পেডালটাকে একেবারে গাড়ির মেঝেতে চেপে ধরেছে।
“এবার…” সামনের গাড়ির বিশ হাতের মধ্যে গিয়ে গ্যাস পেডালের ওপর থেকে প্রেসার কমিয়ে বলল মণিদি।
ফেলুদা জানলা দিয়ে মুন্ডু বের করে পেছনের বাঁ চাকাটা লক্ষ্য করল।কানফাটানো আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটা বিপজ্জনক ভাবে এঁকে বেঁকে গিয়ে রাস্তার পাশের নালার মুখে গিয়ে কাত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।
“আমরা কি বেরোব?” গাড়িটা থামিয়ে গিয়ারটা নিউট্রালে দিয়ে জিজ্ঞেস করল মণিদি।
“না। ওদের কাছে অস্ত্র থাকতে পারে। ওরা জখম হয়েছে বলে তো মনে হয় না। আমি নামছি।তোমরা এখানে বোস।”
কিন্তু ফেলুদা নামার আগেই হঠাৎ দেখলাম ওদের গাড়ির সামনের, পেছনের দুটো দরজাই খুলে গেল আর ড্রাইভার, মগনলাল, অপর্ণা তিনজনেই গাড়ি থেকে বেরিয়ে আমাদের দিকে না তাকিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগাল রাস্তার উল্টোদিকের জঙ্গলে।
কি হল ব্যাপারটা, ভাল করে বোঝার আগেই দেখলাম এপাশের জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এল একটা কালো পাহাড়। হাতি!
রাস্তার মাঝখানে এসে ওদের গাড়িটাকে শুঁড়ে করে একটা ঠেলা দিতেই ওটা খেলনার মত গড়িয়ে গেল পাশের সরু নালাটার মধ্যে । তারপর আমাদের গাড়ির দিকে একবার তাকাল আর শুঁড় তুলে চিৎকার করে উঠল। বৃংহণ! আমরা দম বন্ধ করে বসে আছি।
তারপর হাতি বাবাজি রাস্তার ওপারের জঙ্গলে চলে গেলেন যে পথে মগনলালরা গেছিল সেদিকে। আশাকরি মগনলাল ভুঁড়ি দুলিয়ে ভাল ছুটতে পারবে, না হলে ওর কপালে দুঃখ আছে।
ফেলুদা চাপা গলায় বলল “এপাশে দেখ।”
তাকাতে চোখে পড়ল সামনের গাড়ির হাত কয়েকের মধ্যে জঙ্গলের ভেতর একটা হাতির বাচ্চা! মা হাতি তার বাচ্চা নিয়ে জঙ্গলে যেখানে ছিল, টায়ার ফেঁসে মগনলালদের গাড়ি তার হাত পাঁচেকের মধ্যে গিয়ে কেতরে দাঁড়িয়েছে।সেই জন্যই মা হাতি খেপে ওদের তাড়া করেছে।
“বেশ হয়েছে। অনেক মানুষ মায়ের কোল খালি করেছে ওরা। হাতি মা এবার ওদের উচিত শিক্ষা দেবে। বজ্জাতের দল সব!” মণিদি বলে উঠল।
“হাতিদের মাতৃতন্ত্র, জান তো? তোমাকে ফেমিনিজিমের খোঁটা দেবার শোধটাও ঐ হস্তিনীই নেবে ‘খন।” ফেলুদা এখন রিল্যাক্সড।
“চল তাহলে ফেরা যাক। আরো অনেক কাজ বাকী।”
“ আর কি কাজ বাকী ফেলুদা? গুবলুকে তো পাওয়া গেছে। মাতাজীও ধরা পড়েছে। হাতির তাড়ায় নাকাল মগনলালকেও নিশ্চয়ই পুলিশ এসে ধরবে শীগ্গীর।”
“আর বাকী বাচ্চাগুলোর কি হবে? তাদের বাবা-মা ফেলু মিত্তিরের বৌ-এর বন্ধু নয় বলে কি তারা উদ্ধার হবে না? তাছাড়া পালের গোদাটাকেও তো ধরতে হবে।”
“কে, শঙ্করীপ্রসাদ? জান তুমি ও কোথায় আছে?”
“দেখা যাক! মিশরীয় চিহ্নগুলো তো সব ক্ল্যুই ঠিকঠাক দিল, এখন অব্দি! “
“একটু বুঝিয়ে বলবে কিসের থেকে কি ক্ল্যু পেলে? জানলে কি করে গুবলুকে ওখানে পাওয়া যাবে বা মগনলাল এই পথে আসবে? শিকারপুরের মন্দিরের তলাতেই বা কি আছে?”
“জলের মত সোজা। ভাবতে থাক, পেয়ে যাবি তোপসে। আর নেহাৎ না পারিস তো ওয়েট কর শেষ দৃশ্যের জন্য।”
“ফেলু মিত্তিরের তারাবাজি আবার?”
“সে তো আছেই। তবে গোদাটাকে ধরার পরে।মণি, তোমার নার্ভ স্টেডি আছে তো? চালাতে পারবে?”
“পারব। ” গাড়ি ঘোরাতে ঘোরাতে বলল মণিদি।

***

পর্ব ১৪ঃ কালকেউটে

কালীমন্দিরে ফিরে এসে মাতাজী আর শম্ভু কাউকেই দেখলাম না। লালমোহনবাবু বললেন ওদের কাস্টডিতে নিয়ে পুলিশের একটা জীপ বেরিয়ে গেছে আগেই।
হাতির হাতে মগনলালের নাকাল হবার গল্প শুনে জটায়ু যারপরনাই খুশী।
“হুঁ হুঁ বাবা, ভাঙের লাড্ডু খাওয়ানো…এবার দেখুক মজা!”
তারপর মণিদির দিকে ঘুরে বললেন,
“তবে যে বললেন শাড়ি পরে মারামারি করা যায় না?”
“আপনাদের পাল্লায় পড়ে আরো কত কিছু যে কপালে আছে কে জানে! তবে আমি চান্স নিই নি, এই দেখুন”
মণিদি শাড়িটা পায়ের ওপর একটু তুলতেই দেখলাম তলায় কালো স্ল্যাক্স।”
“জাস্ট ইন কেস। তাই নির্ভয়ে লাফাতে পারলাম।”
“মেক আপটা কিন্তু জবরদস্ত হয়েছিল আপনাদের দুজনেরই। চিনতেই পারিনি।”
“সেটা এক্সপেক্ট করেননি বলে।” ফেলুদা বলে উঠল। “আর বেশ খানিকটা দূরেও ছিলেন।তবে আমার তো এসব অভ্যেসই আছে, সেই মছলীবাবার সময় থেকেই। মণিকে মেকআপ দিতেই যা সময় লাগল…নিউরোসার্জনকে ভৈরবী বানানো তো নেহাৎ সোজা কাজ নয়। তাও তো শেষ পর্যন্ত সেই ক্যারোটিড আর্টারী বেরিয়ে গেল…স্বভাব যায় না ম’লে।”
ফেলুদা এতক্ষণে আয়েস করে একটা চারমিনার ধরিয়েছে।
“বাজে বকো না, বুঝলে। যে পরিমাণ ছাই মাটি আমার চুলে চাপিয়েছ জটা বানাতে গিয়ে, এবার বোধহয় ন্যাড়া করতে হবে।”
“হুম। তাতে আবার সেই চাইল্ডহুড ট্রমার পুনরাবৃত্তি হবে না তো? সেবার থেকে তো বাচ্চা ফোবিয়া, তা এবার তাহলে কি হবে, বর ফোবিয়া? তাহলে কিন্তু…”
মণিদির ভৈরবী চাউনি দেখে ফেলুদা মাঝপথে থেমে গেল।আমি উল্টোদিকে তাকিয়ে হাসি চাপলাম।
“তা ফেলুবাবু, অতঃকিম?”
“এখনো অনেক কাজ বাকী আছে। আসুন সবাই।”
আমরা তিনজন গুবলু সমেত ইন্সপেক্টর দত্ত আর দুজন কনস্টেবলকে নিয়ে ফেলুদার পেছন পেছন গেলাম। ও দেখি মন্দিরের পেছনের দিকে ঐ মজা কুয়ো আর হাঁড়িকাঠের দিকে এগোচ্ছে।
“ও মশাই , আবার ঐ সাপের বাসার দিকে না গেলেই নয় নাকি আপনার? সঙ্গে গুবলু আছে…”জটায়ু নার্ভাস গলায় বলে ওঠেন।
“ঘাবড়াবেন না, মিশরীয় সভ্যতায় সাপ তো খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রাণী।”
“তার সঙ্গে আমাদের কি?”
“কেন? ভুলে গেলেন চিহ্নগুলোর কথা?”
“চিহ্ন ছাড়াই তো গুবলু উদ্ধার হয়ে গেল, আবার তবে কেন…”?
“তাই বুঝি? কে বলল আপনাকে?”
বলতে বলতে আমরা ঐ হাঁড়িকাঠের কাছে।
“তোপসে, তুই ঐ হাঁড়িকাঠের ‘ওয়াই’ অংশটাকে লিভারের মত টেনে নামিয়ে আন মাটিতে, যাতে ঐ আ্যঙ্খ খোদাই করা পাথরে এসে ঠেকে একটা দিক।”
“আর আপনারা আসুন আমার সঙ্গে।”
বলে বাকীদের নিয়ে ও এগিয়ে গেল কুয়োর দিকে।
“হে মা মনসা, হে বাবা বিষহরি…হুঁ হুঁ বাবা…মান রেখ বাবা…হে বাবা চাঁদ সদাগর…ও না না, স্যরি স্যরি, চাঁদ সদাগর তো সাপের শত্রু…হেই মা মনসা, দোষ নিও না মা…”
বিড়বিড় করতে করতে লালমোহনবাবু গুবলুকে কোলে নিয়ে সাপের খোলসটা ফ্যাকাসে মুখে ডিঙিয়ে গেলেন।
এদিকে ফেলুদার কথা মত আমি হাঁড়িকাঠের লিভারটা টানতেই ওদিকে কুয়োর মধ্যে ঘড়ঘড় শব্দ করে একটা ট্র্যাপডোর খুলে গেল। শিকারপুরের মতই এখানেও নীচে সিঁড়ি নেমে গেছে।
ট্র্যাপডোরের ওপরে নেহাৎ আলগাভাবেই কিছু আগাছা আর ডালপালা রাখা ছিল যাতে কারো সন্দেহ না হয়। এমনিতেও এটা মন্দির আর সাধুর ছাউনির পেছনে হওয়ায় চট করে কারো চোখে পড়ে না। অন্যদিকগুলো গাছপালা আর আগাছায় ভরা জঙ্গুলে। সাধুবাবা আর ভৈরবী ছিল এদের লোক। ঐ হাঁড়িকাঠ আর ট্র্যাপডোরে নজর রাখত। কেউ বাই চান্স এসে পড়লে ভাগিয়ে দিত,সেদিন যেমন আমাদের দিল, সাপের ভয় দেখিয়ে।
“চলুন মিঃ দত্ত। এই সিঁড়ি দিয়ে নীচে গেলে আরো অপহৃত বাচ্চাদের সন্ধান পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। কিন্তু একজন কেউ গুবলুকে নিয়ে বাইরে থাকুক, ওকে নিয়ে ওখানে আবার যাবার কোন দরকার দেখি না। মণি, তুমি রাখতে পারবে গুবলুকে?”
শুনে মণিদি জটায়ু সাপের খোলস দেখে যতটা লাফ দিয়েছিলেন তার চেয়েও বড় একটা লাফ দিল।
“বোঝা গেছে! লালমোহনবাবু আপনি?”
“হ্যাঁ মশাই, আমি গুবলুকে নিয়ে এখানে থাকি। ঐ কুয়োতে নামার বিশেষ শখ আমার এমনিও নেই…দু চারটে সাপখোপ কি আর নেই ওখানে!”
আমরা ওখানে নেমে দেখলাম শিকারপুরের মতই সুড়ঙ্গের করিডোর আর দুপাশে অনেক ঘর। শুধু পুরো জিনিসটাই আরো অনেক বড় স্কেলে। একটা ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ঢুকে দেখলাম একটা হলের মত বড় ঘর। সেখানে পাঁচ ছটা বেবী কট। তার তিনটেতে তিনটে বাচ্চা…বয়স সব দুই এর নীচে। সঙ্গে লাগোয়া রান্নাঘর, তাতে বেবীফুড ইত্যাদি আছে। বড় ঘরে কিছু খেলনা।
“যারা এদের দেখাশোনা করত তারা নিশ্চয়ই গোলমাল দেখে পালিয়েছে। কিন্তু কোনদিক দিয়ে বলুন তো?” ইন্সপেক্টর দত্ত বলে উঠলেন।
“সম্ভবতঃ পেছনের নদী দিয়ে। আসুন দেখা যাক। কিন্তু এই বাচ্চাগুলোর কি হবে?”
“আমি খবর দিচ্ছি। আরো ফোর্স আসবে। এদের নিয়ে যেতে হবে। তারপর ওদের ফ্যামিলিকে খোঁজার কাজ।”
বলতে বলতে আমরা সুড়ঙ্গের শেষে এসে দেখলাম দরজা খোলা। বাইরে করলা নদী।
“চলুন মিঃ দত্ত। এবার পালের গোদাটাকে ধরতে হবে। শঙ্করীপ্রসাদ ওরফে মন্টু গুহকে!”
“মন্টু গুহ কি ওর পূর্বাশ্রমের নাম নাকি মশাই?”
“হ্যাঁ। তবে পূর্বাশ্রমকে ও একেবারে ত্যাগ করতে পারেনি।”
বেরিয়ে এসে আমরা গুবলুকে ইন্সপেক্টরের কোয়ার্টারে কিছুক্ষণ রাখার ব্যবস্থা করে বেরিয়ে পড়লাম।
“মিঃ মিত্র, আপনি শিওর তো? গুরুজী কিন্তু ভীষণ ইনফ্লুয়েন্সিয়াল।” যেতে যেতে বললেন মিঃ দত্ত।
“হান্ড্রেড পারসেন্ট। অঙ্কের হিসেবে ভুল হবে না।” ফেলুদা কনফিডেন্ট।
পুলিশের জিপ চলল জঙ্গলের উদ্দেশ্যে। আমরা কেউ জানিনা কোথায় যাচ্ছি, ফেলুদা ছাড়া ।ম্যাপ দেখে ওই ডাইরেকশন দিচ্ছে। প্রায় ২০ কিলোমিটার গিয়ে ফেলুদা বলল জীপ থামাতে।
“দাঁড়ান, একটা জিনিস আগে নিয়ে নিই।” বলে ফেলুদা জিপের পেছনে রাখা একটা ব্যাগ থেকে একটা বেঁটে, স্টীলের লাঠি হাতে নিয়ে নিল। মনে হচ্ছে ওটা টেলিস্কোপিক, মানে গুটিয়ে রাখা আছে, টানলে আরো বেশ খানিকটা লম্বা হবে। কিন্তু লম্বা হোক বা বেঁটে, একটা স্টীলের লাঠি কি কাজে লাগবে বুঝলাম না। ও কি এবার দেবী চৌধুরানীর দলবলের মত লাঠি নিয়ে মারামারি করবে, রিভলবার ছেড়ে?
এবার পায়ে হেঁটে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকতে হবে। অন্যদের কথা জানি না, আমার কেবল মনে হচ্ছিল হাতির কথা। জটায়ুর মুখও ফ্যাকাশে।
“একদিনে মগনলাল, মাতাজী, সাপ আর আবার এখন হাতি…আ্যডভেঞ্চারের বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে তপেশ ভাই!”
“সাপ তো ছিল না লালমোহনবাবু, আপনি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছিলেন।” আমি না বলে পারলাম না।
“সাপ এখনো শেষ হয়নি লালমোহনবাবু!”
সবার আগে এগিয়ে যেতে যেতে বলল ফেলুদা। এত কনফিডেন্ট যেন জানে এক্স্যাক্টলি কোথায় যেতে হবে।
“আপনি কোথায় যাচ্ছেন বলুন তো মশাই?”
মুখের সামনে থেকে একটা মাকড়সার জাল সরিয়ে বললেন লালমোহনবাবু।
“তেঁতুল বটের কোলে/দক্ষিণে যাও চলে/ঈশান কোণে ঈশানী/কয়ে দিলাম নিশানী।” ফেলুদা খোশমেজাজে।
“তেঁতুল, বট কোনটাই তো দেখছি না”। মণিদি বলল।
“আর এটা দক্ষিণ দিকও না, পুব দিক”। ইন্সপেক্টর দত্ত বললেন।
“সে তো বটেই। সূর্যদেব তো পূর্বেই উদিত হন”।
ফেলুদার হেঁয়ালী অব্যাহত।
“রবীন্দ্রনাথের ছড়াটা তো মেটাফরিক্যাল। তবে একটা ভাঙা বাড়ি টাড়ি কিছু পাওয়া যাবে বলেই মনে হয়।”
“সে কি মশাই গুপ্তধন? বললেন যে নেই সেদিন?”
“গুপ্ত তো বটেই, তবে ধন কিনা সেটা তর্কসাপেক্ষ। …মাথা বাঁচিয়ে…, অশ্বত্থের ঝুড়ি নেমে জায়গাটা হাঁটার অযোগ্য হয়ে আছে।”
“ও মশাই, আপনার অস্ত্রটা সঙ্গে আছে তো?” কাঁপা কাঁপা গলায় বলেন জটায়ু।
“কোনটার কথা বলছেন লালমোহনবাবু? একটা তো খুলির ভেতর থাকে, তাই খোলা যায় না!”
এখনও দিব্যি ইয়ার্কি করে যাচ্ছে ও।
“আর কোল্টটাও পকেটে। তবে এটাও আছে…হয়তো সেটাই কাজে লাগবে সবার আগে!” বলে ওর হাতে ধরা বেঁটে স্টীলের লাঠিটা দেখাল ফেলুদা।ওতে কি উপকার হবে আমি বুঝলাম না যদিও।
আরো কিছুটা এগোতেই জঙ্গল হঠাৎ পাতলা হয়ে গেল। সামনে একটা গোল মত চত্তর। বোঝাই যাচ্ছে জঙ্গলের মধ্যে গাছ টাছ কেটে পরিস্কার করে জায়গাটা বানানো।সেই চত্তরের মাঝে একটা ভাঙা বড় বাড়ি। ছাত টাত বেশীরভাগ ভাঙাচোড়া। থামগুলো ইঁট বের করা , অশ্বত্থ গাছে জড়ানো। চারিদিক ভীষণ শুনশান।
সামনে ভাঙা দালান। আধভাঙা পাঁচিল গোল যায়গাটাকে প্রায় দুভাগে ভাগ করেছে। এককালে হয়তো এটা বার মহল ছিল। পাঁচিলের ওধারে অন্দরমহলের উঠোন।
ফেলুদা জানল কি করে এখানে এটা আছে? আর এলই বা কেন এখানে?
“আচ্ছা, এবার সাবধানে আসুন আমার পেছনে। তোপসে, লালমোহনবাবু, মণি…তোমরা চাইলে এখানে দাঁড়াতে পার।”
“আমি যাব তোমার সঙ্গে।” আমরা কেউ কিছু বলার আগেই মণিদি বলে উঠল।
“আমিও ফেলুদা।”
“আর আমি কি এই জঙ্গলের মধ্যে সাপের বাসায় একা দাঁড়িয়ে থাকব নাকি? চলুন সবাই মিলেই যাই।” বললেন জটায়ু।
ফেলুদা এগিয়ে গেল ভাঙা বাড়ির দিকে। দালানের একদিকের দেওয়াল মোটামুটি অক্ষত। সেটার মাঝখানে একটা দরজা। ঠেলা মারতে দেখা গেল বন্ধ। মিঃ দত্ত ছিটকিনিতে একটা গুলি করতেই ওটা খুলে গেল। ঠেলে ঢুকতেই দেখলাম আধো অন্ধকার একটা বড় ঘর। ছাতটা এখানে মাথায় আছে। কিন্তু ঘরে কোথাও কিছু নেই। উল্টোদিকে কেবল একটা বন্ধ জানলা। এবার যাব কোথায়?
ইন্সপেক্টর দত্তের টর্চের আলোয় দেখা গেল মেঝের মার্বেলের ওপর বিশাল এক বাজপাখির মাথার ডিজাইন। দেখে ফেলুদার মুখে হাল্কা হাসি খেলে গেল।
পাখির গলাটা বেড় দিয়ে একটা পাথরে কোঁদা সাপ, যার ফণাটা নীচের দিকে পাখির গলার কাছে।ফেলুদা ভাল করে দেখে সাপের মাথাটা ধরে টান দিতেই ওটা ঘড়ির কাঁটার মত ঘুরতে শুরু করল। ও ফণাটাকে টেনে নিয়ে এল উল্টোদিকে, মাথার ওপরে বাজপাখির দুই চোখের মাঝখানে, ঠোঁটের ওপরে। অমনি পাখির গলার নীচের অংশটা দুভাগে সরে গিয়ে নীচে নামার সিঁড়ি বেরিয়ে এল।
এই নিয়ে সকাল থেকে এটা তৃতীয় গুপ্ত দরজা আর সুড়ঙ্গ, ভাবলাম আমি। তবে এই সিঁড়ি বেশ চওড়া আর ঝকঝকে। নীচে নেমে দেখলাম এক বিশাল হলঘর। রাজকীয় ভাবে সাজানো। কিন্তু মিশরীয় ডিজাইনে। মনে হচ্ছিল যেন ক্লিওপেট্রা সিনেমার সেটে আছি।দেওয়ালে বিশাল সব ফ্যারাওদের ছবি, শো কেসে মিশরীয় আনুবিস, নেফারতিতির মাথা—এই সব জিনিস। মেঝেতে ইজিপ্সিয়ান কার্পেট। পালিশ করা কাঠের ফার্নিচার। কিন্তু কেউ কোত্থাও নেই।
একদিকের দরজা দিয়ে আবার একটা করিডোরে এসে পড়লাম। এটাও দামী কার্পেট, ঝাড়বাতি, পেইন্টিং ইত্যাদিতে বেশ সাজানো গোছানো। দুদিকে ঘর।
“ইন্সপেক্টর দত্ত, এই ঘরগুলো আপনার লোককে নিয়ে পরে ভাল করে খুঁজে দেখবেন। আমার ধারণা সোনা, ক্যাশ, বিদেশী মুদ্রা সবই পাবেন। তবে আমাদের আগে খুঁজতে হবে এর মালিককে। তিনি এবং তাঁর চেলারা গেলেন কোথায়?”
এমন সময় করিডোরের অপর প্রান্ত থেকে একটা ঘটঘট আওয়াজ ভেসে এল। আমরা ছুটলাম ওদিকে। আওয়াজ কমেই বাড়ছে। ছুটতে ছুটতে বুঝতে পারলাম করিডোরটা ওপরের দিকে উঠছে ঢালু হয়ে। হয়তো সিঁড়ির বদলে এদিকে করিডোরটাই ঢালু হয়ে উঠে গেছে মাটির লেভেল অব্দি।শেষপ্রান্তে এসে দেখি আর একটা বড় লবির মত ঘর। তার জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বাইরের উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে একটা হেলিকপ্টার। ওটারই পাখার আওয়াজ কানে আসছিল।
কিন্তু ঘরে পা দিয়েই ফেলুদা থমকে গেল। সুতরাং ওর পেছনে আমরাও। আমি ততক্ষণে দেখছি মেঝেতে দুটো লোক পড়ে গোঙাচ্ছে। ফেলুদার আঙুল ঠোঁটের ওপর।
ওর চোখ অনুসরণ করে মেঝেতে চোখ পড়তেই মাথাটা ঘুরে গেল। মার্বলের সাদা মেঝেতে খেলে বেড়াচ্ছে হলুদ কালো হিলহিলে লম্বা এক সরীসৃপ। কিং কোবরা।
পৃথিবীর অন্যতম বিষাক্ত সাপ। সাপটার লম্বা দেহের অংশবিশেষ মেঝেতে, কিন্তু বাকীটা পড়ে থাকা একটা লোকের বুক আর গলায় জড়িয়ে। চেরা জিভ বের হচ্ছে লোকটার গলার কাছে।লোকটা এখনো বেঁচে।
আমার পেটের ভেতর খালি খালি লাগছে। সেই বাদশাহী আংটির র্যাটল স্নেকের কথা মনে হচ্ছে। ফেলুদার রিভলবার আছে, মিঃ দত্তেরও। কিন্তু ঠিক মত টিপ করে লাগাতে হবে। লোকটার গায়ে না লাগিয়ে কি করে সেটা সম্ভব? কিং কোবরা আ্যটাক করে, বিশেষ করে কোনঠাসা হলে।
জটায়ু আমার হাত খিমচে ধরেছেন….হাতের তালু ঘামে ভেজা। মিঃ দত্ত থমকে দাঁড়িয়ে। মণিদির মুখও ফ্যাকাশে।কিন্তু ফেলুদা দেখলাম এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল।
কি করতে চাইছে ফেলুদা…ভাবতে ভাবতেই ফেলুদা ওর হাতের ছোট লাঠিটা ক্লিক শব্দ করে খুলে ফেলল। ঐ টেলিস্কোপিক লাঠটা এখন পুরো লম্বা। কিন্তু লাঠি কি ওটা? তাহলে ওটার ডগায় ঐ হাঁ করা ক্লিপের মত ওটা কি? চট করে মাথায় এল ওটা একটা স্নেক ক্যাচিং স্টিক!
ওটা ফেলুদা বিদ্যুতের মত চালিয়ে দিল কেউটের মাথা লক্ষ্য করে। বিশাল লম্বা সাপটা এখন গলা থেকে ঝুলছে ঐ লাঠির ডগা থেকে। লাঠির অন্যপ্রান্ত ফেলুদার হাতে ধরা।হাতটা ও লম্বা করে বাড়িয়ে ধরে আছে যাতে সাপটা যথা সম্ভব দূরে থাকে।বাইরে হেলিকপ্টারের পাখার শব্দে কান পাতা যাচ্ছে না।
সাপটাকে লাঠির ডগায় ধরে ফেলুদা ছুটে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল। দিতেই ওদিক থেকে ছুটে এল পরপর গুলির শব্দ। গেরুয়া পরা বাবাজী ছুটছেন হেলিকপ্টারের দিকে, ভেতরে বসা পাইলটের হাতে রিভলবার।
আমরা খোলা দরজা থেকে দেওয়ালের দিকে সরে এলাম। দরজার একদিকের পাল্লার আড়ালে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টর দত্ত গুলি চালালেন। দরজার পেছন থেকে ভাল লক্ষ্য করতে পারেননি।পাইলটের গায়ে লাগেনি, কিন্তু লেগেছে ওর পাশের কাচে। পরমুহূর্তে আর একটা, এটা এবার পাখাতে। ঝনঝনে ধাতব শব্দ।
গুরুজী হেলিকপ্টারে উঠে পড়েছেন। পাইলট এবার পিস্তল ছেড়ে কন্ট্রোলে মন দিয়েছে। গুরুজী নিজের হাতে রিভলবার নিয়ে তাক করতেই একটা গুলি ওঁর হাত থেকে অস্ত্রটা উড়িয়ে দিল। এটা করেছে ফেলুদা। সাপ সমেত লাঠি এখন ওর বাঁ হাতে ধরা, ডান হাতে রিভলবার।
গুরুজী হাত চেপে ধরে বসে পড়েছেন। ফলে দরজাটা বন্ধ করতে পারেননি এখনো। ফেলুদা আর দত্ত এখন ঐ উঠোনে। কনস্টেবল দুজনও ছুটেছে ওদিকে। কিন্তু পাইলট আবার গুলি চালিয়েছে। এবার ফেলুদার হাতের রিভলবার ছিটকে মাটিতে। ওর হাতেও লেগেছে নিশ্চয়ই, যেভাবে হাতটা ঝাড়ল মুখ কুঁচকে, তাতেই পরিস্কার। এদিকে দত্তের রিভলবারের একটা শুধু খচ শব্দ হল, গুলি শেষ।উনি পকেট থেকে বুলেট বের করছেন,কিন্তু এবার হলিকপ্টার উঠতে লেগেছে, গুরুজীর দিকের দরজা খোলা অবস্থাতেই।
হেলিকপ্টার মাটি থেকে প্রায় চার-পাঁচ ফুট উঠে গেছে। ফেলুদা ছুটেছে ওদিকে। কি করবে, এবার কি হেলিকপ্টার ধরে ঝুলবে হলিউডি সিনেমার মত?
কিন্তু না, হঠাৎ দেখলাম ফেলুদা সাপ ধরা লাঠিটা বাড়িয়ে ধরে, ক্লিপটা আলগা করে সাপটাকে ছুঁড়ে দিল কপ্টারের ভেতরে।
পাখার শব্দ ছাপিয়ে ভেসে এল আর্ত চিৎকার। তারপরেই বিকট শব্দ। পাইলট কন্ট্রোল হারিয়ে কপ্টার মাটিতে ক্র্যাশ করেছে। এত অল্প হাইট থেকে অবশ্য তাতে কিছু হয় নি। কিন্তু সাপের ভয়ে গুরুজী আর পাইলট দুজনেই মেরেছে ঝাঁপ। কিং কোবরার সঙ্গে ঐটুকু জায়গায় বন্ধ থাকার থেকে ঝাঁপ মারা ভাল।
এবার মিঃ দত্ত সাপটার মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালালেন । দুবার ছটফট করে স্থির হয়ে গেল ওটা। কনস্টেবল দুজন এরমধ্যে হাতকড়া পরিয়ে দিয়েছে ওদের দুজনকে।
মণিদি ছুটে গিয়ে ফেলুদার ডান হাতটা ধরে গম্ভীরভাবে দেখছে। রক্ত ঝরছে দেখাই যাচ্ছে।
“ভাঙেনি থ্যাঙ্কফুলি। ইমপ্যাক্টটা তোমার কোল্টের ওপর দিয়েই গেছে। হাতে জাস্ট ছুঁয়ে গেছে। কিন্তু হাতের চেটো ভর্তি ব্লাড ভেসেলস। ফলে রক্ত পড়বে বেশ….”
বাঁ হাতে পকেট থেকে রুমাল বের করে ফেলুদা বলল
“হিন্দি সিনেমার মত তোমার আঁচল ছিঁড়ে পট্টি বাঁধতে না চাইলে এটা নাও।”
মণিদি আর একটা অগ্নিদৃষ্টি ওর দিকে দিয়ে তাই করল।
“মিঃ দত্ত, আপনি ওর ঐ সুটকেস দুটো নিয়ে সবার আগে থানায় জমা করুন। ওটার মধ্যে ওর কুকর্মের যাবতীয় প্রমাণ, ডোপিং এবং কিডন্যাপিং র্যাকেটের ডিটেইলস, সুইস ব্যাঙ্কের নম্বর ইত্যাদি পাবেন বলেই আমার বিশ্বাস। সঙ্গে হয়তো বেশ কিছু ডলার, জাল পাসপোর্ট ইত্যাদি। “
“হ্যাঁ মিঃ মিত্র। আমি এখুনি ওয়াকি টকিতে জেলার সুপারকে ধরব। এত বড় রাঘব বোয়াল জালে পড়েছে। এর আগে প্রত্যেক বারই ওর চ্যালা চামুন্ডারা জেলে গেলেও ও পিছলে বেরিয়ে গেছে।”
“হুম। এবার যথেষ্ট প্রমাণ আছে। ঘরগুলো সার্চ করলে আরো প্রমাণ পাবেন। মিঃ দত্ত, আপনার প্রমোশন এবার বাঁধা।”
“জানি প্রদোষবাবু। যদি হয় তার জন্য মূল কৃতিত্ব হবে আপনার। কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব…”
“কিছুই বলতে হবে না। মণি, এবার আমার হাত ছাড়। বিশেষ কিছু হয়নি। বরং ভেতরের লোকদুটো বেঁচে আছে কিনা দেখ। আমার দুফোঁটা রক্ত দেখেই হিপোক্র্যাটিক ওথটা ভুলে মেরো না।”
“আমার সঙ্গে আ্যন্টি ভেনোম নেই”, গম্ভীর গলায় বলে মণিদি ঐ লোকদুটোকে দেখতে চলে গেল।
“ওরা কি এই গুরুজীর চ্যালা ফেলুদা?”
“খুব সম্ভব। বিপদের সম্ভাবনা দেখেই গুরুজী ওদের সাপে কাটিয়ে পালানোর তাল করছিলেন। হয়তো ওরা অনেক কিছু জানে আর তাই পুলিশের হাতে পড়া বিপজ্জনক। এদিকে ওদের সঙ্গে করে বেনামে দেশ ছাড়াও যায় না… বিগ লায়াবিলিটিজ। তাই শেষ করে দেওয়াই ভাল। আর ছাড়া সাপ আমাদেরও ঠেকিয়ে রাখবে কিছুক্ষণ।”
“তুমি কিভাবে কি বুঝলে বলতো? আমি তো টোটালি ব্ল্যাঙ্ক!”
মণিদি জিজ্ঞেস করল। আ্যন্টি ভেনোম না থাকায় ও অবশেষে আঁচল ছিঁড়েই লোকদুটোকে বাঁধন দিয়েছে। বাঁচবে কিনা হাসপাতাল বলতে পারবে।ওদের আর হাতকড়া পরানো আসামীদের নিয়ে জীপের দিকে এগিয়ে গেছেন মিঃ দত্ত আর কনস্টেবলরা। আমরা চারজন একটু পেছনে।
“যাক মণিকঙ্কণা, আপনিও! ভেবেছিলাম আমিই একা কিছু বুঝিনি।”
“না লালমোহনবাবু, ও আমাকেও কিছুই বলেনি। খালি বলে গেছে এখন এই ছদ্মবেশ, তখন ঐ ছদ্মবেশ! শুধু হুকুম তামিল করে গেছি!”
“সেটা পুরোটা ঠিক নয় মণি। দরকার মত ভালই ইম্প্রোভাইজ করেছ, বুদ্ধি আর সাহস দেখিয়েছ, নয়তো এতদূর আসতে হত না আমাকে। তবে বাকী ক্ল্যুগুলো প্রায় সবই তোমাদের সামনে ছিল, তাকিয়ে দেখনি। এখন চল, মিঃ দত্তের বাড়িতে গুবলুকে নিতে যাব যখন তখন সব বুঝিয়ে বলছি। উনিও কৌতুহলী!”
“আমারও একটা কৌতুহল আছে।এভাবে সাপ ধরতে শিখলে কোথায়?” মণিদি বলল।
“অনেকদিন আগে। আমার ইউনিভার্সিটির জুনিয়র ছিল নাতাশা। ইকোলজি ডিপার্টমেন্টে। ওদের একটা গ্রুপ ছিল। সাপ বেরোলে না মেরে ওরা ধরত। ওই শিখিয়েছিল আমাকে। সেগুলো অবশ্য ঢোঁড়া। কেউটে এই প্রথম।” ফেলুদা বলল।
“ইন্টারেস্টিং! এই নাতাশার কথা শুনিনি তো আগে? তুমি শুনেছিলে তপেশ?”
“না মণিদি!”
“অথচ তোমাকে সাপ ধরা শেখালো….অনেক সময় লেগেছিল নিশ্চয়ই?”
“বেশী না। দিন তিনেক! ও আমাকে আরো অনেক কিছু শিখিয়েছিল, খুব স্মার্ট মেয়ে। এখন ব্যাঙ্গালোরে আছে।এন সি বি এস ইন্সটিটিউটে।”
“তা তোমার তো ইকোলজি না, এক ইয়ারেও না…ভাব হল কি করে?”
“ও তো ব্যাডমিন্টনে আমার পার্টনার ছিল মিক্সড ডাবলসে। গুড হাইট। পাঁচ আট। ফলে সুবিধে হত আমার সঙ্গে খেলতে।বেশীরভাগ বাঙালী মেয়ে তো পাঁচ দুই কি তিন…পার্টনার হলে অসুবিধা !”
“হুম, আমিও পাঁচ তিন তো! তা দেখতে কেমন এই নাতাশা?”
“মিস ক্যালকাটা সেকেন্ড রানার আপ। ফ্যাবুলাস!”
“মশাই চুপ করুন না আপনি!” ফিসফিস করলেন জটায়ু।
“চুপ করতে বলছেন কেন লালমোহনবাবু? আরো কি কি শিখিয়েছিল ওকে শুনি একটু!”
“সে তো লম্বা লিস্ট। কাজ কম্ম সব মিটুক তারপর তোমাকে ভাল করে বুঝিয়ে বলব’খন!”
বলে ফেলুদা মণিদির চন্ডিকা মূর্তি অগ্রাহ্য করে একটা চারমিনার ধরিয়ে লম্বা টান দিল।

***

পর্ব ১৬ঃ উপসংহার

“শোনো মণি, ভাস্বররা কাল সকালেই এসে পড়বে। দিব্যি সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা, এক রাত সামলানো কোনো ব্যাপারই না…”
গুবলুকে নিয়ে হোটেলে ফিরে বলল ফেলুদা।
“তা সামলাও না। তোমরা তিনজন তো রয়েইছ। আমি বরং দোকান থেকে ওর যা লাগবে নিয়ে আসছি…।”
“তুমি একটা ডাক্তার, তার ওপরে একজন মহিলা, তুমি সামলাতে পারবে না?”
“এইবার পথে এস। মানে আমরা নয়, আমি সামলাবো, তাই তো? সে গুড়ে বালি। আমি পিডিয়াট্রিশিয়ান না, গুবলুও অসুস্থ না…ডাক্তারের ওর কোনো দরকার নেই…”
“আরে বাবা, ডাক্তার না লাগুক, মা তো লাগবে ঐটুকু বাচ্চার! তুমি এক রাত একটু প্রক্সি দিতে পারবে না?”
“কি করে পারব? ব্রেস্টফীড তো আর করাতে পারব না…”
“উফ! সব সময় তুমি এমন এক্সট্রীমে চলে যাও কেন বলতো? একটু কোলে নিয়ে আদর টাদর তো করতে পার”
“নো ওয়ে। কোলে নিলে আমিও কাঁদব, ও-ও কাঁদবে”
“চুপ করুন তো মশাই আপনারা দুজন। নাহলে এবার আমি, তপেশ আর গুবলু তিনজনেই কাঁদব। বোঝা গেছে আপনাদের কেরামতি। দিন ওকে আমার কাছে…”
অবশেষে বললেন জটায়ু।
গুবলু দেখা গেল লালমোহন বাবুকে ভালই পছন্দ করেছে। উনিও নানারকম মুখভঙ্গী করে ওকে হাসাচ্ছেন।
মণিদি আর ফেলুদা গিয়ে ওর জিনিস পত্র নিয়ে এল দোকান থেকে। ইয়া বড় এক ব্যাগ। কত যে জিনিস লাগে ঐটুকু একটা বাচ্চার! যাইহোক, পরবর্তী কয়েক ঘন্টায় গুবলুকে ন্যাপি বদলে দিল ফেলুদা, বোতল থেকে খাইয়ে দিলেন লালমোহনবাবু, আমিও বেশ কবার ওকে বাইরে থেকে কোলে করে ঘুরিয়ে আনলাম, ওর সঙ্গে পিক-আ-বু খেললাম। শুধু মণিদি ঠায় গোঁজ হয়ে বসে চোখ সরু সরু করে দেখে গেল।
“তুমি কি কিছুই করবে না ঠিক করেছ মণিদি?”
“তোমাদের কেয়ার নেওয়ার ঠ্যালায় যদি পড়ে টরে চোট পায় তো আমি আছি। নৈলে তোমরাই সামলাও।”
চারজনে মিলে লবিতে বসে গল্প করতে করতে দেখলাম এবার গুবলুর চোখ ছোট হয়ে আসছে, হাই উঠছে।
“দিন মশাই ওকে ঘুম পাড়িয়ে দিই।”
লালমোহনবাবু কাঁধে ফেলে একটু থাবড়ে দিতেই ঘুমিয়ে কাদা।
“নিন ম্যাডাম, ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছি একবারে। এবার ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিন সাবধানে।”
“কোন ঘরে?”
“আপনাদের, আবার কোথায়? আমার আর তপেশের তো সিঙ্গেল বেড। সরু সরু। পড়ে যাবে তো গুবলু । আপনাদের ডবল বেড। মাঝখানে নিলে পড়ার ভয় নেই।”
“তা হলে আপনি আমাদের ঘরে এসে গুবলুকে নিয়ে প্রদোষের সঙ্গে থাকুন। আমি যাই আপনার ঘরে…”
“মণি, বাড়াবাড়ির একটা সীমা আছে। কেউ কোত্থাও যাবে না। লালমোহনবাবু, আপনি আর তোপসে যান গিয়ে শুয়ে পড়ুন আপনাদের ঘরে। আমি চললাম গুবলুকে নিয়ে আমাদের ঘরে। তোমার ইচ্ছে হলে এস নয়তো সারা রাত এই লবির সোফায় বসে মশা তাড়াও। নাইট ডিউটি অভ্যেস আছে তো, এক রাতে কিছু হবে না তোমার।”
গুবলুকে নিয়ে হাঁটা দেয় ফেলুদা।
—————————————-
মণিকঙ্কণার জবানী
—————————————-
কি সাংঘাতিক সেক্সিস্ট লোকজন সব! বাচ্চা মানেই তার দায়িত্ব মেয়েদের। জঘন্য। যেমন দোকানের লোকগুলো , কি খায় ম্যাম আপনার ছেলে? কি ব্র্যান্ডের ন্যাপি পরে। আরে আমাকে যদি মা ঠাউরায় তো প্রদোষকে বাবা ঠাউরেছে তো? তাকে তো কেউ কিছু জিজ্ঞেস করছে না!
ভাগ্যিস আমি ভেবে রেখেছি এসবের মধ্যে জড়াব না কোনোদিন। এর থেকে স্ট্রীট ডগ ঢের ভাল। তা সে প্রদোষ যাই বলুক। ও আর কি বুঝবে রাজ্যের যত সেক্সিস্ট লোকের ঝামেলা…উঃ মশাগুলো অব্দি সেক্সিস্ট। খালি আমায় কামড়াচ্ছে।
এর মধ্যে আমাকে বসিয়ে রেখে চলে গেল বাকী সাড়ে তিন জন…হু অল হ্যাপেনস টু বী মেন।
কি হত একদিন লালমোহনবাবুর সঙ্গে শুলে? মাঝে তো গুবলু থাকত নাকি! কেবল আমাকে প্যাঁচে ফেলার চক্রান্ত। জানে আমার ফোবিয়া আছে…।
কিন্তু আর কতক্ষণ এভাবে থাকব রে বাবা! একেই কাল রাতে ভাল ঘুম হয়নি জটায়ুর ঐ লাড্ডু পর্বের ঠ্যালায়। কোন সকালে উঠে ভৈরবীর মেকআপ করতে বসেছি। তারপর সারাদিন এত হুজ্জুতি…একটু তো রেস্ট প্রাপ্য আমার! তা না, বলে কিনা সোফায় বসে মশা তাড়াও।
কিন্তু বললেই বা আমাকে শুনতে হবে কেন? ঘর কি ওর একার? বসে বসে পিঠ ব্যথা, তার মধ্যে ঐ দুটো লোক কেমন অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে। একা একটা মেয়ে শান্তিতে বসবে এমন দেশ তো নয় এটা! হুইস্কির গ্লাস নিয়ে বসে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন গিলে ফেলবে। মারতে হয় এক ঘুঁসি ঐ থ্যাবড়া নাকে! বদের ধাড়ি সব।দেব নাকি একচোট ধাতানি দুটোকে? কিন্তু আর পারা যাচ্ছে না। একদিনের মত যথেষ্ট মারপিট হয়েছে। যাই ঘরে গিয়ে দেখি কি অবস্থা! গুবলু ঘুমিয়ে গেছে নির্ঘাত, আর চুল টুল ধরে নাও টানতে পারে।
ঘরে ঢুকে আলো জ্বালতে যাব প্রদোষের চাপা গলা, “আলো জ্বেলো না, গুবলু উঠে যাবে।”
“তুমি কোথায়?” আমি অন্ধকারে হাতড়াই।
“দরজার দিকের সাইডে। তুমি বাথরুমের সাইডে গিয়ে খাটে ওঠ। সাবধানে, গুবলুর ঘাড়ে পড়ো না।”
হাতড়ে হাতড়ে খাটে উঠতে যাব হাতে ঠেকল গুবলুর নরম চুলে ভরা মাথাটা।
“প্রদোষ, তুমি ওকে ভুল দিকে শুইয়েছ। আড়াআড়ি মাথা।”
“আমি ঠিক দিকেই শুইয়েছিলাম। ও ঘড়ির কাঁটার মত ঘুরছে।”
বলতে না বলতেই গুবলু আবার একটা ছোটো আওয়াজ করে আরো পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ঘুরে গেল।
“আমি তাহলে কোথায় শোব?”
“একটু ধারের দিকে সাইড করে শুয়ে পড়। আমিও তাই করেছি। খাটের সেভেন্টি পার্সেন্ট গুবলুর দখলে।”
নাঃ, এ অসম্ভব ব্যাপার । কোনোরকমে গুবলুর মাথাটা আস্তে আস্তে সরিয়ে একটু কাত হয়ে শুয়েছি হঠাৎ গুবলু বুকে ভর দিয়ে উঠে আমাকে অন্ধকারে একটু দেখেই ফুঁপিয়ে কেঁদে আমার কোলে মাথাটা গুঁজে দিল।
আমি শিউড়ে উঠলাম। কিন্তু ওকে সরিয়ে দেবার বদলে আস্তে আস্তে ওর মাথাটা আরো কাছে টেনে নিলাম। গুবলুর মাথা থেকে কি সুন্দর একটা গন্ধ আসছে…খাটে এখন আমার অনেক জায়গা, কারণ গুবলু আমার গায়ের সঙ্গে মিশে অঘোরে ঘুমোচ্ছে আর আমার আঙুলগুলো ওর চুলে বিলি কাটছে।
প্রদোষ হঠাৎ ওর দিকের বেড সুইচটা জ্বালল। গুবলু উঠল না। শুধু আমার গলাটা ডান হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল।
“বাবা! এ যে দেখি গনেশ জননী! যাক, তাও ভাল…তিন ঠেঙে কুকুরের বাবা হবার চেয়ে পদোন্নতির আশা দেখা যাচ্ছে।”
“আলোটা বন্ধ কর। দেখছ না, চোখে আলো লাগছে বলে কেমন মুন্ডুটা একেবারে বুকের মধ্যে গুঁজে দিয়েছে!”
“দেখছি তো…আমার ইজারামহলে এ হেন জবরদখল…নেহাৎ ছমাস বয়স বলে মাপ করলুম। তবে আমার হকটা একেবারে ছেড়ে দেওয়া কিছু কাজের কথা না!”
বলে আমাকে গুবলু সমেত নিজের দিকে টেনে নিল।
গুবলুও দুই মানুষ-পাঁচিলের মধ্যে পড়ে বনবন করে ঘোরাটা বন্ধ করে দিল। তার বদলে ওর গায়ে একটা ঠ্যাং আর আমার নাকের ওপরে একটা হাত চাপিয়ে নির্বিবাদে ঘুমোতে লাগল।
———————————————
তোপসের জবানী
———————————————
পরদিন সকালে উঠে তো ভাবলাম না জানি কি ঘটে গেছে মণিদি আর গুবলুকে নিয়ে। কিন্তু ভয়ে ভয়ে ব্রেকফাস্ট রুমে গিয়ে দেখি অবাক কান্ড, গুবলুকে কোলে নিয়ে মণিদি বিভিন্ন মুখভঙ্গী করছে আর গুবলুও বেজায় খুশী হয়ে ফোকলা মুখে হাসছে। এক রাতের মধ্যে গুবলুবাবু কি ম্যাজিক করলেন কে জানে! গুবলুকে খেলা দিতে এত ব্যস্ত যে মণিদি বিশেষ খেলও না, একটু জ্যুস আর এক পিস শুকনো টোস্ট খেয়ে বলল আর ইচ্ছে করছে না।
এদিকে সকাল থেকেই চারিদিকে রিপোর্টার আর ফটোগ্রাফারের ভিড়। রেডিও, টিভি দুটোতেই শঙ্করীপ্রসাদের গ্রেপ্তারী এবং ওর আশ্রমে চলা কুকীর্তির কথা ফলাও করে বলা হচ্ছে।
ফেলুদা আবার ছদ্মবেশের দাড়িটা পরে নিয়েছে। একজন এসে তাও জিজ্ঞেস করল ও মিঃ মিত্র কিনা, তাতে ও অম্লান বদনে বলে দিল ওর নাম অরিন্দম ব্যানার্জি, বম্বে থেকে এসেছে। ভদ্রলোক নিরাশ হয়ে চলে গেলেন।
“আমাকে জিজ্ঞেস করলে কিন্তু আমি সত্যি বলে দেব মশাই”। লালমোহনবাবু হুঁশিয়ারি দেন।
“আমিও।” মণিদি সায় দেয়।
“বল না। আমিও বলে দেব এই তদন্তে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছেন আমার স্ত্রী আর বন্ধু। বলে তোমাদের কাছে ভিড়িয়ে দেব।”
একটু পরেই ভাস্বরবাবুরা চলে এলেন। গুবলুকে সহি সালামত ফেরৎ পেয়ে যত খুশী হলেন প্রায় ততটাই অবাক হলেন মণিদির কোলে গুবলুকে দেখে।
“নাঃ, মণি , তোর তাহলে আশা আছে।”
গুবলুর সঙ্গে পুনর্মিলনের ইমোশনাল পর্ব-টর্ব সব মিটে গেলে ডাইনিং হলে বসে চন্দ্রিমা বলে উঠলেন।
“আমি তো আগেই বলেছিলাম, ওসব ফোবিয়া টোবিয়া নেই আমার। ওগুলো তোদের রটনা!”
মণিদি রং নিচ্ছে এখন।
“চালিয়াতি মারার আর জায়গা পাসনি? তোর আলবাৎ ফোবিয়া ছিল। আমরা সবাই সাক্ষী আছি। হ্যাঁ সেটা এখন বদলালো কি করে ঠিক বুঝতে পারছি না…কে জানে তোর ঐ ছিটেল ব্রেনে কি চলে। এত লোকের ব্রেন নিয়ে কাজ করিস, নিজেরটা একবার খুলে দেখতে পারতিস …মিনিমাম তিনটে স্ক্রু তো ল্যুজ আছেই আমি গ্যারান্টি দিতে পারি।”
“ভাস্বর, তোকে আজ কেউ বাঁচাতে পারবে না আমার হাত থেকে, দ্যাখ। ছেলের সামনে ধোলাই খাবি তুই…”
বলে মণিদি চেয়ার ছেড়ে উঠে ভাস্বরবাবুর দিকে ধাওয়া করতে যেতেই হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে নিজের রগটা চেপে ধরল আর তারপর দুম করে কার্পেটের ওপর চিৎপাৎ হবার আগেই ফেলুদা ওকে ধরে ফেলল।
ব্ল্যাক আউট!
——- সমাপ্ত——-

পর্ব ১৫ঃ তারাবাজি
—————————————
ইন্সপেক্টর দত্তের বাড়িতে বসে চা আর পকোড়া খেতে খেতে কথা হচ্ছিল। মিসেস দত্ত গুবলুকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছেন দুপুরে। ও এখনো ঘুমোচ্ছে।
“তা এবার বলুন তো পুরো ব্যাপারটা কি দাঁড়াল?”
একটা পকোড়া মুখে নিয়ে বললেন জটায়ু।
“প্রথম থেকে শুরু করা যাক তাহলে।” ফেলুদা ওর চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল।
“এই যে শিকারপুরে শঙ্করীপ্রসাদের আশ্রম আর সঙ্গের অনাথ আশ্রম, এটা এদের একটা ফ্রন্ট। এখানে দেশ বিদেশের লোক আসে, ডিটক্স করতে। অনেক হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্ট আছে। কাজকর্ম এখানে সব নিয়ম মেনে হয়। লীগাল আ্যডপশনও কিছু হয় ঐ অরফানেজ থেকে। এই ফ্রন্টটা রাখার মূল উদ্দেশ্য দুটি।
এক,মার্কেটিং বা পি আর বাড়ানো। শঙ্করীপ্রসাদ এবং তার সেবামূলক কাজের কথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া। দেশ বিদেশের হোমড়া চোমড়াদের সঙ্গে দহরম মহরম রাখা।দুই, এর আড়ালে বিভিন্ন দুনম্বরি কাজ চালিয়ে যাওয়া।
এই দুনম্বরি কাজের মধ্যে আছে অনেক কিছু। বেআইনি ডোপিং ড্রাগ সরবরাহ, যেটা করতে গিয়ে রাউত ধরা পড়েছিল। আমার ধারণা তারপরই মগনলাল এই ব্যাপারটা দেখাশোনার ভার নেয়। আফটার অল হি ইজ আ্যন এক্সপার্ট অন ড্রাগস স্মাগলিং!”
শুকনো হেসে বলে ফেলুদা।
“শঙ্করীপ্রসাদ এটার অপারেশন প্রায় বড় কোম্পানীর মত করে ফেলেছিল। নিজে সিইও। ওর আন্ডারে বিভিন্ন ডিভিশনাল হেড। মগনলাল ড্রাগসের হেড, মাতাজী শিশু পাচার এবং বিক্রির। হয়তো বিদেশী ভক্তদের মগজ ধোলাই করে টাকা রোজগারের জন্য অন্য কোন হেড আছে মহারাস্ট্রের আলিবাগে!”
“কিন্তু মন্দিরগুলোর ঐ আনডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্কটা…”
“বলছি। তবে তার আগে একটু ইতিহাস কাম এই অঞ্চলের মিথ বা লেজেন্ড দেবী চৌধুরানীর কথাটা ঝালিয়ে নেওয়া দরকার।”
ফেলুদা আর একটা চারমিনার ধরাতে যাচ্ছিল, কিন্তু মণিদির ভৈরবী চোখের দিকে তাকিয়ে আবার পকেটে ভরে ফেলল।
“কথিত আছে দেবীর বজরা করলা এবং ত্রিস্রোতা বা তিস্তা বেয়ে যাতায়াত করত। নদীগুলোর চেহারা তখন অন্য ছিল, এরকম মরে হেজে যায়নি। এই দুই নদীর ধারে ধারে গড়ে উঠেছিল অনেক মন্দির, যেমন ঐ কালী মন্দির বা জল্পেশের মন্দির। অনেক সময় এই সব মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে সুড়ঙ্গ পথে সরাসরি যোগ থাকত নদীর। সম্ভাব্য বিদেশী বা বিধর্মী আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য এগুলো তৈরী হত।
ভবানী পাঠক ছিলেন কালীর উপাসক। তিনি নিজে এবং পরবর্তী কালে দেবী ডাকাতিতে বেরোনোর আগে এই সব গুপ্ত পথে মন্দিরে আসতেন শোনা যায়।”
“তা সে সব লেজেন্ড সত্যি বা মিথ্যে যাই হোক, এইসব গোপন সুড়ঙ্গপথের হদিশ পরবর্তী কালে অনেক ক্ষেত্রেই হারিয়ে যায়। কখনো মন্দিরভবন পুনর্নিমিত হলে গর্ভগৃহ অন্য জায়গায় সরে যায়। কোন ক্ষেত্রে নদী গতিপথ পরিবর্তন করায় ঘাটের বদলে জঙ্গলে গিয়ে সুড়ঙ্গ শেষ হয় আবার কোথাও বা নদী মজে তিরতিরে নালায় পরিণত হয়।
এসবের হদিশ শঙ্করীপ্রসাদ ক্রমে ক্রমে বের করে। প্রথমে কিছুটা আচমকা, ভামরী মন্দিরের ছোট সেবাইত থাকার সময়। তারপর সিস্টেমেটিক ভাবে খোঁজ খবর নিয়ে। ওর আশ্রমে মাইনে করা ঐতিহাসিক এবং পুরাতত্ত্ববিদ আছে, আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি।
সুতরাং বর্তমান মন্দিরের ট্রাস্টি এবং সেবাইতদের অগোচরে ঐ সব আন্ডারগ্রাউন্ড নেটওয়ার্ক ব্যবহার হচ্ছিল শঙ্করীপ্রসাদের দু নম্বরি কাজকর্মে। সুড়ঙ্গপথে শুধু যে করিডোর ছিল তা তো নয়,একাধিক ঘর, সিঁড়ি সব মিলে টিলে ছোটখাট ভুলভুলাইয়া। তাদেরই কোনটায় ইললীগাল ড্রাগ স্টোর হত তো কোনটায় চুরি করা বাচ্চা। সবই তো ওদের কাছে কমোডিটি!”
ফেলুদার ঠোঁটে তেতো হাসি।
“এভাবেই জলপাইগুড়ি কালীমন্দিরের নীচের সুড়ঙ্গে ছিল ওদের চোরাই বাচ্চা জমা করার জায়গা। মন্দির তার গর্ভগৃহ নিয়ে অন্য জায়াগায় সরে গেছে। ঢোকার মুখ এখন মজা কুয়ো দিয়ে। কিন্তু ঐ পুরোন হাঁড়িকাঠের লিভার দিয়ে ঐ কুয়োর ট্র্যাপডোর খোলা যায়। সাধুবাবা আর ভৈরবী ছিল নজর রাখার জন্য এদের মাইনে করা লোক।”
“তাহলে ঐ শিকারপুরের মন্দিরের নীচের সুড়ঙ্গে কি
আছে?” আমি ওখানে দেখা বন্ধ দরজাগুলোর কথা ভেবে বললাম।
“ওখানে ওরা জমাত টেস্টোস্টেরন এনানথেট। এটা কিভাবে ডোপিং স্টেরয়েড তৈরীতে লাগে, তা তো কলকাতায় সেদিন মণি বুঝিয়ে বলেছে।”
“এরা ঐ টেস্টোস্টেরন এনানথেট নেপাল থেকে স্মাগল করে এনে জমা করত শিকারপুরের তলায়। মগনলালের কাঠমান্ডুর নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে। তারপর সেটা ব্যবহার করে লিক্যুইড স্টেরয়েড তৈরী হত আদি ভামরী মন্দিরের নীচে মগনলালের গুদামের ল্যাবে। তারপর তৈরী হওয়া আ্যমপুল সব পাচার হত এদেশে আর বাংলাদেশে।”
“মগনলাল তাহলে এখানে সেইজন্য সকালে কালী মন্দিরে এসেছিল?”
“হ্যাঁ। টেস্টোস্টেরন এনানথেটে ডেলিভারি নিতে। অপর্ণা আর শম্ভুর ব্যাগ—যেটা ওরা বাচ্চার জিনিসপত্রের ব্যাগ বলে ভান করছিল—সেটা থেকে টেস্টোস্টেরন এনানথেট পাওয়া গেছে। ওরা শিকারপুরের মন্দিরের নীচ থেকে ড্রাগ নিয়ে নৌকা করে এখানে এসে, এখানকার আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে গুবলুকে তুলে ওপরে এসেছিল। মগনলাল নিজের জিনিস নিয়ে চলে যেত আর ওরা গুবলুকে নিয়ে চলে যেত কাছাকাছি কোন হোটেল বা বাড়িতে। সেখানে মিঃ আ্যন্ড মিসেস ব্যানার্জি আসতেন গুবলুকে নিতে। অথবা হয়তো মগনলালও সেদিন যেত মাতাজীর সঙ্গে ব্যানার্জিদের মীট করতে—-কারণ আগেরদিন আমাদের জলপাইগুড়িতে দেখে ওর সন্দেহ হয়ে থাকতে পারে।”
“ওদের এই বেআইনী ডোপিং ড্রাগস আর বাচ্চা চুরির ব্যবসাদুটো তাহলে পাশাপাশিই চলত?” জিজ্ঞেস করলেন জটায়ু।
“হ্যাঁ।ঐ কলকাতার তপনও তো ক্রিকেট ক্লাবের ছেলেদের ড্রাগ সরবরাহ করত আবার দরকার মত বাচ্চা চুরিতে সাহায্য করত! সেদিন নিশ্চয় ও আরতিকে কথায় ভুলিয়ে রেখে গুবলুকে তুলে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল!”
“সে তো বটেই। তপনের মত অনেক লোককে নিশ্চয় এরা এমপ্লয় করে।”মিঃ দত্ত বললেন।
“তা আপনি এগুলো বুঝলেন কি করে মশাই?”
“বোঝার ক্ষেত্রে সবার আগে আসছে ঐ চিহ্নগুলো।
তিনটে চিহ্ন কেবল ঘুরে ফিরে আসছে। অথচ একদম র্যান্ডম নয়। একটু ভাবলেই দেখবেন ওদের মধ্যে একটা প্যাটার্ন আছে।
আই অফ রা—-পাওয়া গেল তপনের গলায়, মগনলালের আংটিতে, যারা ডোপিং ড্রাগের ডিভিশনে কাজ করে। এখন এটা হল—“
“দ্য সিম্বল অফ পাওয়ার! ডোপিং স্টেরয়েড পাওয়ার বাড়ায়।” আমি বলে উঠলাম।
“এক্স্যাক্টলি।”
“তেমনি আ্যঙ্খ আসছে মাতাজীর গলার লকেট বা টিস্যুতে কারণ—“
“আ্যঙ্খ ইজ এ সিম্বল অফ ফার্টিলিটি… মানে আ্যডপশন!” মণিদি বলে উঠল।
“আর তার মানে, ক্যাডুসিয়াস, সিম্বল অফ মেডিসিন। অর্থাৎ সেখানে ঐ চোরাই ওষুধগুলো জমানো হত।”
এবার মিঃ দত্ত বলে উঠলেন।
“একদম ঠিক মিঃ দত্ত। আমার ধারণা শিকারপুরের মন্দিরের তলার সুড়ঙ্গে রেইড করলে আপনি আরো অনেক ধরণের চোরাই ওষুধ পাবেন।”
“ওরা যে বাচ্চা বেচার ধান্দা চালাচ্ছে সে তো কালই আমাদের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল। কিন্তু বাচ্চাগুলোকে রাখছে কোথায় সেটাই ক্লিয়ার হচ্ছিল না। সেটা প্রথম স্ট্রাইক করল সেদিন মাতাজীর কথায়।”
“কিভাবে?”
“ও বলল না, ও হল নব দেবী চৌধুরানী !নামগুলোও লক্ষ্য করুন।মাতাজীর মেন্টর শঙ্করীপ্রসাদ, যেমন দেবীর ছিলেন ভবানী।
ভবানীর আর এক নাম শঙ্করী। তেমনি দেবী হলেন পার্বতী।মূল ঘাঁটিও সেই এক জায়গায়—বৈকুন্ঠপুর ওরফে শিকারপুরের জঙ্গল।দেবী যেমন ইংরেজ পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে কাজ করতেন এঁরা দেন এখনকার পুলিশের চোখে ধুলো।
সেই থেকেই মনে হল দেবীর গতিবিধি যেসব জায়গায় ছিল সেগুলো আর একবার ভাল করে দেখা দরকার।প্রথমে গেলাম শিকারপুরের মন্দিরে। কিন্তু ওখানে পেলাম ক্যাডুসিয়াস, মাতাজীর আ্যঙ্খ নয়। সুতরাং ওটা সম্ভবতঃ চোরাই বাচ্চা রাখার জায়গা নয়।তখনি মনে পড়ে গেল জলপাইগুড়ির কালীমন্দিরটার কথা। এটার কথাও সিধুজ্যাঠা বলেছিলেন। তাই ওটা কাল বিকেলে দেখতে এসেছিলাম। দেখলাম ওখানেও ঐ আ্যঙ্খ। মানে মাতাজীর ডিপার্টমেন্ট।
তারপর আবার কাল ওখানে কুড়িয়ে পেলাম ঐ রূদ্রাক্ষটা। ভাল করে দেখলে বুঝতেন ওটা একমুখী রুদ্রাক্ষ। একদম স্মুথ, বেশ রেয়ার এবং দামী। যে কোন সাধুর গলায় দেখা যায় এমনটা নয়। তবে কাল আশ্রমে পার্বতীমাঈ এর গলায় দেখেছিলাম । ফলে আজ ওখানে ছদ্মবেশে নজর রাখাটা বিশেষ জরুরী হয়ে পড়েছিল।”
“কিন্তু ঐ পালের গোদাটার হদিশ পেলেন কি করে?”
“সেইটা ছিল সবচেয়ে ট্রিকি”। ফেলুদা একটা পায়ের ওপর অন্য পা টা চাপিয়ে বলল।
“সেটা বুঝতে গেলে প্রথমে লোকটাকে আগে বুঝতে হবে। ও ইতিহাস নিয়ে পড়েছে। স্পেশালাইজেশন মিশরে। আমি সেদিন ইউনিভার্সিটিতে খোঁজ নিয়েছি। ওর ইন্টারেস্টটা প্রায় অবশেসনের জায়গায় চলে গেছিল। তার অবিশ্যি একটা কারণও ছিল।”
ফেলুদা একটু থামল। সবাই উৎকর্ণ।
“ওর পূর্বাশ্রমের নাম মন্টু গুহ। বাবা বাঙালী, বিপ্রদাস গুহ। কিন্তু মা মিশরীয়, নাম হেবা। বিপ্রদাস সুয়েজে কাজ করতে যান যুবা বয়সে। তখনি হেবার সংগে পরিচয় এবং বিয়ে।এখন মন্টু শুধু বাঙালী নাম না। এটা একটা প্রাচীন মিশরীয় দেবতার নাম যাকে দেখতে বাজপাখির মত!”
“ঐ সেই বাজপাখির মাথা যেটা আমরা সেদিন ঐ ভাঙা বাড়িতে পেলাম? মেঝেতে আঁকা? তার নাম মন্টু?”
“হ্যাঁ লালমোহনবাবু! শুধু তাই নয়,ঐ একই চেহারা প্রায় আবার সূর্যদেব রা এর। বাজপাখির মাথা, চোখ হল আই অফ রা, হাতে আ্যঙ্খ, অন্যহাতে আর একটা স্ট্যাফ বা লাঠি।মাথায় গোল সূর্য আর তাকে ঘিরে সাপ!”
“এই রা হল মিশরের অন্যতম প্রধান দেবতা। মন্টু ওরফে শঙ্করীপ্রসাদ নিজেকে সেভাবেই ভাবত। মাতাজী কি বলেছিল মনে আছে? উয়ো তো সূরজ য্যায়সে হ্যায়, দূর রহতে হ্যায় লেকিন সব কুছ উনহি কি বদৌলত হ্যায়। এটা মেটাফোরিক্যাল ছিল না। শঙ্করীপ্রসাদ ওরফে মন্টু ওরফে রা ঐ জঙ্গুলে ভাঙা বাড়িতে ঘাঁটি গেড়ে সব কিছু চালাত। এটার হদিশ খুব কম লোকে জানত। গুরুত্বপূর্ণ নথি সব এখানে থাকত। তাই দু একবার ওর চ্যালারা জেলে গেলেও ও যায়নি।”
“তা ওর ঐ ডেরার হদিশ আপনি পেলেন কি করে?”
“প্রথমে ওর ঐ সীল। ইলুমিনাতি ত্রিভূজের তিন কোনে তিন চিহ্ন। সেগুলো আসলে এখানে ওর তিন মন্দিরের ঘাঁটি।”
“জলপাইগুড়িতে আ্যঙ্খ মানে চোরাই বাচ্চা রাখার ঘাঁটি, শিকারপুরে ক্যাডুসিয়াস মানে চোরাই এষুধ রাখার ঘাঁটি এবং ভামরী মন্দিরে মগনলালের গুদাম আর ওর আংটিতে আই অফ রা, মানে ডোপিং ড্রাগ তৈরীর ঘাঁটি… তাই তো, ফেলুদা?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“গুড তোপসে। এই তিন মন্দিরে ওদের তিন কেন্দ্র, যেটাকে ওরা বলে হোলি ট্রিনিটি। আসলে ভয়ঙ্কর আনহোলি ব্যাপার!”
“বুঝলাম। ইলুমিনাতি ত্রিভূজের তিন শীর্ষবিন্দু তিন মন্দিরের গুপ্তগৃহ, যাদের থেকে তিন ধরণের স্মাগলিং চলত।কিন্তু মধ্যিখানের ঐ চোখটা কি? ওটারও কি কিছু মানে আছে না ওটা এমনি এমনি?” মণিদির প্রশ্ন।
“বল কি মণি! ওটাই তো আসল। ইলুমিনাতি ত্রিভূজের চোখের ওপর ঐ সাপ…মানে ওটা বাজপাখির মাথাওলা রা দেবের চোখ! ওটাই মন্টুদেবের আস্তানা। ঐ যে ভাঙাবাড়ির তলায় রাজকীয় ব্যবস্থা!”
“কি কান্ড! বুঝলেন কি করে মশাই?”
“আপনিই তো ধরিয়ে দিলেন লালমোহনবাবু! সেদিন এয়ারপোর্ট থেকে আসতে আসতে গুপ্তধনের ছড়া কাটলেন…পায়ে ধরে সাধা/রা নাহি দেয় রাধা/শেষে দিল রা…তখনই মাথায় ধাঁ করে রা এর ব্যাপারটা খেলে গেল…”
“আর তাই তুমি অমন উৎকট ব্রেক মারলে গাড়িতে!”
“হ্যাঁ মণি, তোমার মত না হলেও গাড়িটা আমি অত বাজেও কিছু চালাই না! তবে জটায়ু সবচেয়ে বড় ক্ল্যুটা কিন্তু দিলেন ভাঙের লাড্ডু খেয়ে!”
“কি রকম, কি রকম?”
“আমি মন্দিরগুলো, চিহ্নগুলো এবং শঙ্করীপ্রসাদই যে স্বঘোষিত রা এর অবতার সেটা বোঝার পরেও বুঝতে পারছিলাম না ওর ঘাঁটিটা ঠিক কোথায়। সেদিন ইতিহাসের অধ্যাপক ত্রিপাঠী বললেন যে এই বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গলে একটা ভাঙা বাড়ি আছে বলে জনশ্রুতি। কেউ জানে না কোথায়, তবে লোকে ভাবে ওখানেই দেবী মোহর পেয়েছিলেন। মন্টু গুহ ছাত্রাবস্থায় এই নিয়ে অনেক মাতামাতি করেছিল।
কোন এক সময় ও এরকম একটা বাড়ির সন্ধান সত্যি করে পায় এবং সেটাকে নিজের ঘাঁটি বানায়। আর পুরো জিনিসটা—ঐ তিন মন্দির এবং নিজের ঘাঁটির ম্যাপ নিজের সীলে বানিয়ে ফেলে।”
“কি বলছেন মিঃ মিত্তির? ঐ ইলুমিনাতি ত্রিভুজ আসলে ম্যাপ”? মিঃ দত্ত অবাক!
“আজ্ঞে হ্যাঁ। একটা কাগজ পেন্সিল দিন বুঝিয়ে দিচ্ছি। আমার আঁকার হাত অত ভাল না, তবু….”
বলে ফেলুদা নীচের ছবিটা আঁকল।
“দেখুন এটা একটা সমদ্বিবাহু বা আইসোসেলেস ত্রিভুজ। দুটো সমান বাহু হল শিকারপুর ট্যু ভামরী এবং জলপাইগুড়ি ট্যু ভামরী। শিকারপুর ট্যু জলপাইগুড়ি হল ত্রিভুজের ভূমি বা বেস। আসল ম্যাপেও জায়গাগুলো মোটামুটি সেভাবেই আছে।
এবার এই রা এর চোখটা ত্রিভুজের কোথায় আছে বল তো মণি?”
“কোথায় আবার? মাঝখানে?” মণিদি বলল।
“ধুর! তোমরা ডাক্তাররা বড় অঙ্কে কাঁচা! পুকাই হলে বলে দিত। তুই বল তোপসে!”
“সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি!” আমি চেঁচিয়ে উঠি!
“দ্যাটস রাইট! ওটা ত্রিভুজের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি বা ভরকেন্দ্র। আর ওখানেই শংকরীপ্রসাদ, যে কিনা এই পুরো সংগঠনের ভরকেন্দ্র, তার ঘাঁটি!
লালমোহনবাবু, সেদিন যখন আপনি নেশার ঘোরে অভিযোগ করলেন যে আজকাল মণি আমার জীবনের সেন্টার অফ গ্র্যাভিটি….তখন এটাই আমার মাথায় স্ট্রাইক করে।
আর সমদ্বিবাহু ত্রিভুজের ভরকেন্দ্র কিভাবে পাওয়া যায়, তোপসে?”
“বেসের মধ্যবিন্দু থেকে ভরকেন্দ্রের দূরত্ব হল
[√(4p² - q²)]/6
যেখানে q হল সমান সাইড দুটো আর p হল বেস।”
“একদম। আসল ম্যাপে এই ফর্মূলা ফেলেই ওর ঘাঁটিটা পেয়ে গেলাম। বললাম না তখন? অঙ্কের হিসেবে ভুল হবে না!”
বলে ফেলুদা আরো দুটো পকোড়া তুলে নিল।
“আপনাকে আর কি বলি বলুন তো মশাই! ধন্যি ছেলের অধ্যবসায়!”
ফেলুদার কথা শেষ হলে জটায়ুই প্রথম বললেন।
“সত্যি ফেলুদা! জ্যামিতিটা অসাধারণ!”
“মিঃ মিত্তির, আপনার অনেক নাম শুনেছিলাম, তবে যা দেখলাম তা সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। বুদ্ধি আর সাহসের এমন মেলবন্ধন সচরাচর দেখা যায় না।” মিঃ দত্ত বললেন।
একমাত্র মণিদিই কিছু বলল না।
ফেরার পথে গুবলুকে কোলে নিয়ে লালমোহনবাবু এগিয়ে গেলেন। তারপরেই আমি।একটু পেছনে ফেলুদা আর মণিদি। তখন মণিদির চাপা স্বর কানে এল।
“আমি যদি অলরেডি তোমার প্রেমে না পড়ে থাকতাম তো আজ ঠিক পড়তাম!”
“নাতাশার কথা শোনার পরেও?”
“মেরে ফেলব আমি তোমাকে, জান তো?”
“তুমি যত ডেথ থ্রেট দাও আমাকে, আমার ক্রিমিনালরা দেয় না! সেই দার্জিলিং থেকে!”
আমি পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম।


বই! syzygy আর দার্জিলিং




No comments:

Post a Comment