Wednesday, 7 July 2021

Ratangarher Rahasya (incomplete) by Dilip Gangopadhyay

রত্নগড়ের রহস্য

দিলীপ গঙ্গোপাধ্যায়

(পর্ব -১)

অলস দুপুর, ফেলুদার বসার ঘরে লালমোহন বাবু সোফার উপরে হাত পা ছড়িয়ে দিবানিদ্রা যাপন করেচলেছেন। মাঝে মাঝে তার নাসিকার গর্জন শোনোযাচ্ছে। তোপসে একপাশে বসে আপনমনে ফেসবুক ঘেটেচলেছে। ফেলুদা ঠোঁটে জ্বলন্ত চারমিনার গুঁজেনিয়ে আজকের খবরের কাগজটা পড়ছেন, আর অল্প অল্প করে ধোঁয়া ছাড়ছেন । এই লক ডাউনের বাজারে ফেলুদার হাতে তেমন কাজনেই, যদিও প্রসার তাঁর আগের থেকে অনেক বেড়েছে। এখন ফেলুদার পকেটের সভাবর্ধন করে অত্যাধুনিক 9MM এর মতো পিস্তল, হাতে দামি সেলফোন, মস্তিষ্ক আগের থেকেও আরো বেশি প্রখর দিন দিন যেন ধার বেড়েই চলেছে। লালমোহন বাবুর দিবানিদ্রায় বেঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ ফেলুদার মোবাইলের  রিংটোন বেজেউঠলো।

ফেলুদা - হ্যালো

ওপ্রান্ত থেকে - আমিকি প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিস্টার প্রদোষ চন্দ্র মিত্রের সাথে কথাবলছি?

ফেলুদা - হ্যা আমিই প্রদোষ মিত্র।

ওপ্রান্ত - নমস্কার, আমি রত্নগড় রাজ পরিবার থেকে আদিত্য নারায়ণ সিংহদেও বলছি।

ফেলুদা - হ্যা বলুন

ওপ্রান্ত - আপনিকি একবারের জন্য এখানে আসতে পারবেন?

ফেলুদা - আগে দরকারটা কি সেটা বলুন, তারপর ভেবে দেখবো।

ওপ্রান্ত - তেমন কিছু না, তবে কয়েকটা জটিল ধাঁধার উত্তর খোঁজার জন্য আপনার সাহায্য চাইছি।

ফেলুদা - ও আচ্ছা। পরে ফোনকরে আপনাকে জানাচ্ছি। নমস্কার। এই বলে ফোনটা কেটেদিল ফেলুদা।


বলি ওমোশায় অত ভাবা ভাবির কিআছে? চলুননা আমরা থ্রি মাস্কেটিয়র্স মিলে বেরিয়েপড়ি ।


আপনার দিবানিদ্রা সাঙ্গ হলো লালমোহন বাবু ?


হবে না? আপনার ফোনটাই তো আমার দিবানিদ্রার বারোটা বাজিয়ে ছাড়লো, আমার কানটা তো সবসময় ওটার দিকেই থাকে ফেলুবাবু 

ফোনটা বেজে উঠলেই কেমন যেন একটা রহস্য রহস্য গন্ধ পাই। 


ফোনটা কে করেছিল ফেলুদা ? কি বললো লোকটা?


তেমন কিছু না, কয়েকটা ধাঁধার উত্তর খুঁজতে রত্ন গড়ের জমিদার ফোনকরেছিল ।


ভেরি ইন্টারেস্টিং, তাহলেতো বেপারটা কালটিভেট করতেই হচ্ছে মোশায়।

তুমিকি কেসটা নিচ্ছ ফেলুদা?

এখন সেভাবে কিছু ভাবিনি, তুই কিবলিস?

নিতে পারো, অনেকদিন কোথাও যাওয়া হয়নি

এই সুযোগে নতুন একটা জায়গাও ঘুরেআসা হবে।

তাহলে আজ আজ বিকেলে একবার সিধু জেঠার বাড়ি যেতে হয়।

তাহলে তুমি কেসটা নিচ্ছ বলো?

নানিয়ে উপায় আছে, লালমোহন বাবুর মুখের অবস্থাটা একবার ভাব।


(সিধু জেঠার বাড়ি বৈঠকখানা) 

কি ব্যাপার ফেলুজে, নিশ্চয়ই কোনো দরকারে?

নাহলে তো তুমি আবর এই পথে পা মাড়াও না।

কি যে বলেন , আপনি নাথাকলে এই ফেলু মিত্তিরো অচল। বিপদে আপদে আপনিই তো আমাদের একমাত্র ভরসার স্থল।

তা বিপদটা কি? নতুন কনো কেস হাতে নিয়েছ বুঝি? 

সেরকমই। রত্নগড়ের রাজ পরিবারথেকে ফোনকরেছিল, কিছু ধাঁধার উত্তর খুঁজেদিতে হবে।

তাই আপনার কাছে আসা।

দাড়াও, দাড়াও, রত্নগড়? ওটাতো ছোটনাগপুর অঞ্চলের মধ্যে পড়ে। মাঝে এক দুবার বশ্যতা স্বীকার করলেও ওরা চিরকালই স্বাধীন থেকেছে। সেই হিসেবে রাজন্যবর্গও বলতে পারো । ওরা ছিল সামন্ত রাজা। নবম শতকে মধ্যপ্রদেশ আগত সিংহদেও বংশিয়রা, অনার্য রাজাকে পরাজিত করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে।চারিদিকে ছোট ছোট পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরাছিল ওদের রাজধানী, মনোরম পরিবেশ। আরেকটা কথা, হ্যা মনে পড়েছে, একমাস আগে খবরের কাগজে খবরটা বেরিয়েছিল ছোট্ট করে তোমার নজরে পড়েছে কিনা জানি না, দাড়াও বেরকরে দেখাচ্ছি।

পেয়েছি পেয়েছি। আসে পাশের চার পাঁচটি গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জৈন ভাস্কর্য দেখে আরর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার কিছু লোক  ওখানে  খনন কার্জ চালালে কিছু পুরোনো জৈন ধর্মের মুর্তি ও কয়েকটি সোনা ও রুপার মুদ্রা পাওয়া যায়। লেগে পড়, পেলেও পেতেপারো অমুল্য রতন।

আজ তাহলে উঠি সিধু জেঠা। লালমোহন বাবু আপনার রথ ঠিক থাক আছে তো?

আছে মানে? একদম ঝকাস আছে, এই তো পরশুদিন গ্যারাজ থেকে চকাচক করে গাড়িটা বাড়িতে নিয়ে এসেছি।

এখনো তো ট্রেন বন্ধ, তাই আপনার রথই আমাদের এখন একমাত্র ভরসা। আজই ওখানে যাওয়ার জন্য লালবাজার থেকে স্পেশাল পারমিশটা করিয়ে নিতেহবে। তাহলে কালকে খুব সকালে আমরা বেরিয়ে পড়ছি রত্নগড়ের উদ্দেশ্য।

পরদিন সকালে শহর ছাড়িয়ে দূরে কালো পিচঢালা

রাস্তার উপরে লালমোহন বাবু সবুজ অ্যাম্বাসেডার পক্ষীরাজের ঘোড়ার মতো ডানামেলে ছুটেচলেছে

ফেলুদার হাতে স্টিয়ারিং, তপসে তার নতুন কেনা ফোন ঘাটতে ব্যাস্ত, নীরবতা ভেঙে লালমোহন বাবু বললেন যাই বলুন মোশায় সকালের মুক্ত বাতাসের একটা আলাদা মাদকতা আছে।

তা আর বলতে লালমোহন বাবু, এই বাতাসের কাছে আপনার গঙ্গার বাতাস কোথায় লাগে।

ভাই তপেস সেই কখন থেকে দেখছি তুমি একমনে ফোন ঘেটে চলেছ, কি এতো আছে ওতে?

ও আপনি বুঝবেন না। ফেসবুক ঘাটছি।

ফেসবুক? নোটবুক জানতাম, ফেসবুক তো বাপের জন্মে শুনেছি বলে মনে হচ্ছে না।

ফেলুদা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল ওর বাংলা নামটা হচ্ছে মুখবই।

মুখ আবার বই? পাসবাই হয় জানি। এখন দেখছি মুখও বই হয়।

তোপসে একবার গুগুল ঘেটে রোডম্যাপটা দেখতো

রত্নগড় যাবার রাস্তাটা যাতে খুঁজেপেতে অসুবিধা নাহয়।

গু গুল?এটা আবার কি?

ছেড়েদিন ওটা আপনার মাথায় ঢুকবেনা লালমোহন বাবু ।

ভাই তপেস তোমারো কি তাই মত?

গুগল হচ্ছে এমন একটা এপ্স যেখানে আপনি সারা বিশ্বের সমস্ত কিছু তথ্য পাবেন।

সন্ধ্যা পারকরে যখন লালমোহন বাবুর অ্যাম্বাসেডার রত্নগড়ে প্রবেশ করলো তখন দেওয়াল ঘড়িতে সময় ঘোষণা করলো রাত্রি আটটা।

অভ্যর্থনা জানিয়ে বাড়ির ভেতরে নিয়েগেল আদিত্য নারায়ণের ছেলে সৌম্য নারায়ণ।

হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেস হয়ে সবাই মিলে চা খেতে পরিচয় পর্বটা শুরু করলেন জমিদার আদিত্য নারায়ণের সাথে ।আমিই প্রদোষ মিত্র, আপনি যাকে ফোন করেছিলেন, এহলো আমার খুড়তেতো ভাই তপেস, সহকারীও বলতে পারেন। আর ইনি হলেন আমার বন্ধু ও রহস্য রোমাঞ্চ গল্পের লেখক

লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ূ। এরপর এক এক করে সকালের পরিচয় দিলেন আশি বছরের বৃদ্ধ বাড়ির কর্তা পুরোন জমিদার আদিত্য নারায়ণ। এই হলো আমার একমাত্র ছেলে সৌম্য নারায়ণ। ছোট খাট একটা ব্যাবসা করেন হাজারিবাগে এখন তাও বন্ধ।কিছুদিন হল পাঁচ বছরের শিশুপুত্র সহ স্ত্রীকে নিয়ে এখানেই চলে এসেছে আমার কাছে । আর আছে বলতে তিরিশ বছরের পুরোনো চাকর বিশু, ওকে তো দেখলেন এইমাত্র চা দিয়েগেল। ওর ভরসাতেই আমার এখানে  থাকা।তাছাড়া কিই বা আছে এখানে, একটা ভগ্নপ্রায় বিরাট বাড়ি, যার দক্ষিণ দিকের মহল ভেঙেপড়েছে। সম্পদ বলতে আছে কিছু জমি জমা ও পুকুর। এককালে বিরাট অবস্থা ছিল। এখন সেসব কিছুই নেই। এই ভগ্নস্তুপ বাড়িটা দেখে আপনি নিশ্চয়ই তা অনুমান করতে পারছেন। গোয়েন্দার চোখ আপনার, কিছু তো আর লুকোনোর নেই।ইনি হলেন "প্রকাশ পতুতুন্ডু।" ইতিহাস গবেষক। দিনসাতেক হলো এসেছেন।

এখানকার প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও রাজ পরিবার নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। মুলত ইনিই রাজ পরিবারের কাগজ পত্র ঘাটা ঘাটি করতে গিয়ে একটা খেরোর খাতা আবিষ্কার করেন, যাতে কিছু ধাঁধা পাওয়া গেছে যেগুলো আমার মনেহয়েছে যেন গুপ্ত ধরনের ইঙ্গিত করছে। তার জন্যই আপনাকে এখানে ডাকা খুঁজে দিতে পারলে উপযুক্ত পুরস্কার দেবো । তুলট কাগজের উপর কালি কলমে লেখা খেরোর খাতাটার লেখক আমার দাদু গঙ্গা নারায়ণ সিংহদেও।এই বলে খাতাটা ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিলেন আদিত্য নারায়ণ।

তিনজোড়া চোখ তখন সেই খাতাটার উপরে

ধাঁধা নম্বর

1) দিক খুঁজো আগে

    দিশা পাবে কাজে।

2)শতাব্দী স্নানের ঘাটে

    বৃক্ষ বটের নিচে

     ক্ষেত্র বিশেষ আছে

      চাবি তাহার কাছে।

3)নং স্থান এখানে ফাঁকা রাখা আছে, নম্বর দিয়ে     কিছুই লেখেননি দেখছি ।

4)ভাগ্য ফেরাতে চাও? মৃগয়াতে যাও।

(ক্রমশ)

***

No comments:

Post a Comment