Saturday, 17 July 2021

Bakshikaran By Saptarshi Mukerjee (incomplete)

বশিকরণ (Subjugation)

পর্ব ১

রবিবারের সকাল, ১০ টা।দরজায় ডোরবেল।গিয়ে দরজাটা খুলে দিলাম।একই!দাড়িয়ে স্বয়ং রহস্যরোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক শ্রীযুক্ত লালমোহন গাঙ্গুলি অরফে জটায়ু।কিন্তু ভদ্রলোক কালই না বলে গেলেন সাতদিনের জন্য অসুস্থ দিদিকে দেখতে বর্ধমান যাচ্ছেন।যাইহোক ভাবনা আর কৌতুহল চেপে রেখে বললাম,'আসতে আঞগা হোক'।হাসি হাসি মুখ নিয়ে ঢুকে এসে সোফায় বসলেন লালমোহনবাবু।ঝোলা থেকে বেড়ল একটা  ঠোঙা।গন্ধেই টের পেলুম চপ বা সিঙারা জাতীয় কিছু।ঠোঙাটা টেবিলে রেখে বললেন;' ভাই তপেশ তোমার দাদাটি কোথায়?' আমি বললাম 'একটু বেড়িয়েছে,একটা ফোন এসেছিল'। 'ও তা যাও তো ভাই একটা বড় প্লেট নিয়ে এস' বললেন জটায়ু।নিয়ে এলাম।তাতে পটাপট চারটে ফিস চপ সাজিয়ে জটায়ু বললেন;' ভাবছ দিদির বাড়ি যাব বলেও হঠাৎ চলে এলুম তাও হাতে সুগন্ধি খাদ্যদ্রব্য নিয়ে, কী ব্যাপার এই তো'? বললাম ' তা বটে'। জটায়ু শুরু করলেন,' তবে শোন বলি।  কাল রাতে জামাইবাবু ফোনে জানালেন তিনি ডাক্তারের নির্দেশ মতো হাওয়া বদলের জন্য দিদিকে নিয়ে দীঘা যাচ্ছেন।আর তারপরই এল সুখবরটা'। আমি খানিক অবাক হয়েই বললাম ' এর মধ্যে সুখবরের কি হল'? জটায়ু বেশ বিরক্ত হয়েই বলে উঠলেন,' উফ এত তড়বড় কোর না তো বলছি তো।জামাইবাবু ফোন রাখতেই আর একটা ফোন।পুলকের। পুলক ঘোষাল।তার নাকি ইচ্ছে হয়েছিল আমার কাম্পুচিয়ায় কম্পমান বইটা নিয়ে একটা বেড়ে থ্রিলার ছবি করার।

***

পর্ব ২

“পুলক নাকি এক প্রোডিউসারকে বইটা পাঠিয়েছিল। সেই প্রোডিউসার নাকি শুধু রাজিই হয়নি। এডভ্যান্স হিসেবে ৫০ হাজার টাকা পাঠিয়ে পুলককে বলেছেন যে করে হোক আমাকে রাজি করাতেই হবে”। “আপনি কি বললেন?” “বললুম মানে এ সুযোগ ছাড়াটা বোকামি কি বল? তবে বলিচি শুটিং দেখতে যাব এবং থ্রি মাস্কেটিইয়ারস ই যাব। পুলক সায় দিলে। তাই তোমার দাদাকে সুখবর দিতে আসা এই যতসামান্য বস্তু নিয়ে।আফটারঅল আমার এইযে স্পেক্টেকুলার পপুলারিটি তার পিছনে প্রদোষ মিত্তিরের অবদান তী কম নয়”।

“ কিন্তু তিনি গেলেন কোথায়”? 

জটায়ুর কথা শেষ না হতেই ফেলুদার প্রবেশ। লালমোহন বাবুকে দেখেও যেন দেখল না। বসে পড়েছে সোফায়। কপালে ভীষণ চিন্তার ভাজ। অন্যমনস্ক ভাবেই একটা চপ তুলল। জটায়ু আমার দিকে ফিরে বললেন “ ব্যাপার কী বলতো”? আমি বললাম “ কিছুই তো বুঝতে পারছিনা”। উনি বললেন,” তা ভাই এ আবার কোন ঝঞ্ঝাবাতের পূর্বাভাস নয়তো”? 

এতক্ষনে ফেলুদার জবাব ফুটল;”লালমোহন বাবু”; জটায়ু বললেন “ইয়েস স্যার”।

“ আপনি গাড়ি এনেছেন সঙ্গে”?

“সার্টেনলি’

“বেশ তবে যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে আপনার গাড়ির উপর একটু অত্যাচার করব”।

“ উফ মশাই বলেইতোছি ও গাড়ি বিলংস্কটু আমাদের সবাই”।

“ তালে চলুন বেড়িয়ে পড়ি”।

জটায়ু সম্মতি জানিয়ে বললেন, “যথা আজ্ঞা তবে ঘটনাটা একটূ ভাঙলে হোত না”।

“ চলুন না বলছি” ফেলুদা জবাব দেয়।

গাড়িতে উঠেই হরিপদবাবুকে ফেলুদা বলল ,” গাদিয়াড়া যাব ,চেনেন তো”?

হরিপদবাবু ঘাড় নেড়ে স্টার্ট দিলেন। 

ফেলুদা এবার আমাদের দিকে ফিরে বলল,” লালমোহন বাবু আপনি বশিকরণে বিশ্বাস করেন”?

চোখ কপালে তুলে সভাবসিদ্ধ অবাক হওয়ার ভঙ্গিতে জটায়ু বললেন,”বশিকরন সেটা কি বস্তু”।

“বস্তু নয় বলা হয় তন্ত্র শাস্ত্রে  একটি প্রক্রীয়া যার প্রয়োগে কোন মানুষ অন্য কোন একজন মানুষকে হাতের পুতুল বানিয়ে ফেলতে পারে” জবাব্ দেয় ফেলুদা।

প্রবল বিস্ময়ে লাল্মোহনবাবু বলে উঠলেন,” বলেন কী মশাই, এও কী সম্ভব!”

ফেলুদা বলল,” সম্ভব অসম্ভব জানা নেই কিন্তু এবারের কেসের নজিরটা কতকটা এমনি”।

***

পর্ব ৩

জটায়ু  বললেন,” ওয়েট আপনি নতুন কেস নিয়েছেন , কই বললেন না তো একবারো”।

ফেলুদা জবাব দিল ,” তা বলবার সুযোগটা পেলুম কোথায় বলুন? আজ সকালে ব্যঙ্ক থেকে একটা ফোন পাই। আমার একটা ডরম্যন্ট অ্যকাউন্ট চালু করবার জন্য কিছু সই দরকার ছিল সেই কারণেই ব্যাঙ্কে ডেকে পাঠায়। ব্যাঙ্কে যখন কাজ সারছি তখনই লক্ষ্য করছিলাম এক ভদ্রলোক আমার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে আছেন আর কিছু যেন বলি বলি করেও বলার সাহস পাচ্ছেন না। শেষে যখন বেড়িয়ে আসব ঠিক সেই সময় পেছন থেকে হাত চেপে ধরলেন ভদ্রলোক। আমি একটু অবাকই হই। বললাম, কিছু বলবেন? উনি যেন সামান্য ইতস্তত করে বললেন,’ আজ্ঞে আপনি কী গোয়েন্দা প্রদোষ মিত্র’? 

শুনতে শুনতে জটায়ুর মুখ হা হয়ে গিয়েছিল ফেলুদা থামতে ভদ্রলোক প্রবল বিস্ময়ে বলে উঠলেন ,”ও মশাই তারপর কী হল বলবেন তো”।

ফেলুদা আবার শুরু করল। “ আমি ওনার কথা শুনে নিজের পরিচয় দিতেই ভদ্রলোক হাউমাউ করে বলে উঠলেন ,’আমি কদিন ধরেই আপনার কথা ভাবছি। বড্ড বিপদে পড়েছি আমি। আপনি ছাড়া আমার সমস্যার সমাধান আর কেউ করতে পারবে বলে মনে হয় না। আপনি দয়া করে আমায় বাঁচান।‘

“ ভদ্রলোকের চোখে ভয় আর দুশ্চিন্তা আর করুণ মুখ দেখে আমি বলি বেশ আপনি শান্ত হয়ে সমস্যার কথা বলুন যদি সত্যি আমার দ্বারা সম্ভব হয় আমি যথা সাধ্য চেষ্টা করব। আমার কথা শুনে ভদ্রলোক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,’ সবটা জানতে হলে আপনাকে একবার আমার দেশের বাড়ি যেতে হবে কষ্ট করে’। 

***

পর্ব ৪

“ভদ্রলোকের অসহায়তা কেমন যেন আমায় স্পর্শ করে তাই আমি রাজি হয়ে যাই। কোথায় যেতে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন,’ গাদিয়াড়া ‘;এবং বারবার অনুরোধ করতে থাকেন যে আজই যদি যাই তবে তার বিশেষ উপকার হয় কারণ সময় যত গড়াবে ততই নাকি বিপদের সম্ভাবনা বাড়বে।“

এবার লালমোহনবাবু বলে উঠলেন,”তা মশাই আমরা গেলেই তো হবে না আপনার মক্কেলকেও তো পৌঁছতে হবে সেখানে।“

“অবশ্যই। আমি আজ যেতে রাজি শুনেই তিনিও ইতিমধ্যে রওনা হয়ে গিয়েছেন।“ ফেলুদা জবাব দেয়।

আমি বললাম ,” আচ্ছা ফেলুদা গাদিয়াড়া তো বেশ বড় জায়গা ,তা সেখানে ঠিক কোথায় যাব আমরা?”

“ভদ্রলোক তো বললেন বাস স্ট্যান্ড এ পৌঁছে যে কাউকে জিজ্ঞেস করলেই হবে বসু রায়চৌধুরিদের বাড়িটা কোথায় তাহলেই নাকি কেউ না কেউ দেখিয়ে দেবে।“ বলল ফেলুদা।

ঘটলও ঠিক তাই গাদিয়াড়া সরকারি বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে একটা চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতেই সে দেখিয়ে দিল বাড়ির রাস্তাটা। কাছাকাছি আসতেই টের পেলাম বেশ উচ্চবিত্ত পরিবার। পেল্লায় ফটক পেরিয়ে আমাদের গাড়ি কম্পাউন্ডে ঢুকতেই নজরে এল তিন তলা বিরাট বাড়িটা। কমপক্ষে আড়াই বিঘে জমির উপর পুরনো ধাঁচের পেল্লায় বাড়ি।বাড়িটার বয়স যাই হোক বেশ মেন্টেন্ড। বাড়ির এককোনে একটি কালী মন্দির যার গায়ে লেখা “কৃপাময়ী কালীমাতা”। হঠাৎ করেই কানে এল জটায়ু আপন মনেই সাসপিসিয়াস কথাটা উচ্চারণ করলেন। কারণ জানতে চাইলে বললেন,” বাড়ির নামটা দেখেছো তপেশ ?” আমি বললুম “না তো কি নাম?” উনি বললেন “চন্দ্রায়ণ”। আমি বললাম “তাতে কি?”

“আরে ভাই চন্দ্রায়ণ মানে জান না নিজের শ্রাদ্ধ নিজে করা। এইরকম নাম কেউ রাখে বাড়ির?” বলেন জটায়ু।

ওনার কথার কি উত্তর দেব ভাবছি এমন সময় ফেলুদা হাঁক পাড়ল “আয়।“ 

ফেলুদার ডাকে আমরা সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলাম। গাড়ি বারান্দা পেড়িয়ে দুপা সিড়ি উঠে ফেলুদা কড়া নাড়ল আর তার প্রায় সাথে সাথেই একটি যুবক দরজা খুলে দাঁড়াল।দরজা খুলে যেতেই নাকে এসে লাগল অদ্ভুত একটা গন্ধ।

***

পর্ব ৫

ছেলেটি আমাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,”কি চাই?” ফেলুদা বলল,” আমাদের রমণীমোহন বাবু আসতে বলেছেন।“ “কিন্তু বাবু তো এখানে নেই; কলকাতার বাড়িতে আছেন” জবাব দেয় ছেলেটি। ফেলুদা বলল ,”জানি , কিন্তু উনি আমাদের আসতে বলেছেন এবং নিজেও যে কোন মুহুর্তে এসে পড়বেন।“ ফেলুদার কথা শেষ হতেই পেছন থেকে একটা গাড়ির আওয়াজ এল ।আমরা ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলাম দুধসাদা রঙের একটি ফিয়াট গাড়ি এসে দাড়াল বাড়ির কম্পাউন্ডে। সেই গাড়ি থেকে যিনি নেমে এলেন তার বয়স আন্দাজ বছর ষাট কিংবা পয়ষট্টী। পরণে ধবধবে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী। দেখেই বোঝা যায় বেশ সৌখিন এবং ফিটফাট মানুষ এবং যথেষ্ট বিত্তবান। বাড়িটা দেখে সে আন্দাজ অবশ্য আগেই হয়েছিল। গাড়ি থেকে নেমেই ফেলুদার উদ্দেশ্যে হাত নাড়িয়ে বলে উঠলেন “ওয়েলকাম টু চন্দ্রায়ণ মিত্তির মশাই।“ ফেলুদাও হেসে এগিয়ে গেল তার দিকে সঙ্গে আমরাও। আমরা ওনার কাছাকাছি যেতেই উনি বললেন “ খুব দুঃখিত আপনাদের অপেক্ষা করতে হল ,আসলে একটু দেরি হয়ে গেল আমার।“ উত্তরে ফেলুদা বলল,” না না কোন ব্যাপারই নয়, আমরাও এইমাত্রই এসেছি।“এরপর সেই যুবক ছোকড়াটিকে উদ্দেশ্য করে ভদ্রলোক বলে উঠলেন ,”ওরে বিমল অতিথীদের ভেতরে নিয়ে বসার ব্যবস্থা কর। আমি মায়ের মন্দিরে প্রণাম সেরেই আসছি।”

ভদ্রলোকের কথায় বিমল এগিয়ে এসে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল।বাড়ির ভেতর পা দিয়েই আবার সেই অদ্ভুত গন্ধটা নাকে এসে লাগল।গন্ধটা অচেনা হলেও বেশ বুঝতে পারছিলাম চড়া কোন ধূপ জাতীয় গন্ধ। সদর দরজা পেরিয়েই একফালি গলি তারপরই বরাট বসার ঘর। সেখানে আমাদের বসিয়েই বিমল চলে গেল। বসার ঘরটি যে বেশ বড় শুধু তাই নয় নানাবিধ পুরনো দামী আসবাবে সাজানো। এসব দেখতে দেখতেই ফেলুদার চোখ আটকে গেল ঘরটার পশ্চিম দেওয়ালে ঝোলা একটা অয়েল পেন্টিং এর উপর। ও খুব গভীর ভাবে দেখতে থাকল ছবিটা। আমি ভাবছিলাম জিজ্ঞেস করি ব্যাপার কি কিন্তু তার আগেই ফেলুদা বলে উঠল “তপশে এই বাড়িটার সবকিছুই যে অদ্ভুত সেটা লক্ষ্য করেছিস?”

***

পর্ব ৬

আমি কিছু বলার আগেই জটায়ু উত্তেজিত ভাবে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,” যা বলেছেন মশাই! বাড়ির নামটাই তো কেমন বদখদ”। “সব ছেড়ে নামটাই চোখে পড়ল আপনার” বলল ফেলুদা। জটায়ু আবার বলল ,”অবশ্যই অমন নাম কেউ রাখে নাকি বাড়ির।“ “কারণ আছে নিশ্চয়ই” ছোট্ট করে জবাব দিল ফেলুদা। “অ্যাঁ , নামের  কারণ ? বলেন কি?” অবাক ভঙ্গিতে বলল জটায়ু।

“বলছি এটাই যে আপনার অবসারভেসান পাওয়ার ফেল। আমার সংসর্গ করেও উন্নতি হলনা লালুদা আপনার। বাড়ির নামটাই দেখলেন অথচ নিচের লেখাটা দেখলেন না।“ আমসীর মতো শুকনো মুখে জটায়ু বললেন,” সেটা কী”। “স্বর্গীয়া চন্দ্রাবতী দেবীর পুণ্য স্মৃতির উদ্দেশ্যে” বলল ফেলুদা। খানিক কি যেন ভেবে লালমোহন  বাবু বলে উঠলেন,” সে আপনি আমায় যাই বলুন মশাই স্মৃতির উদ্দেশ্যে আর নাম পেলনা ?” “হয়তো আপনার মতো শব্দকোষ কিংবা অভিধান নিয়ে বসার অভ্যাস ছিল না বাড়ির কর্তাদের।“ বলল ফেলুদা।

কথা এর বেশি এগোনোর আগেই ঘরে প্রবেশ করলেন রমণীমোহন বাবু। তাকে দেখেই ফেলুদা এগিয়ে গিয়ে বলল ,” আপনার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেই এ আমার খুড়তুতো ভাই তপেশ রঞ্জন মিত্র আর উনি স্বনামধন্য রহস্য রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী যাকে ছাড়া আমার কোন কেসই প্রায় সম্পূর্ণ হয়না।“ ফেলুদার কথায় একটু আগের বিরক্তির ভাব কেটে গিয়ে একগাল হাইক্লাস বিনয়ের হাসি হেসে জটায়ু প্রায় অর্ধেক ঝুঁকে পড়লেন। পরিচয় পর্ব মিটতেই রমণীবাবু আমার ও জটায়ু দিকে তাকিয়ে হেসে নমস্কার জানালেন। আমরাও তাই হাত জোড় করলাম।আমরা আবার বসতেই রমণীবাবু আমাদের উল্টো দিকের সোফায় বসলেন। 

ফেলুদা এবার বলে উঠল, “বলুন রমণীবাবু এবার আপনার সমস্যার কথা শোনা যাক তবে তার আগে আমি আপনাকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই।”

***

পর্ব ৭

ফেলুদার কথা শুনে ভদ্রলোক বেশ নড়চড়ে বসে বললেন,” অবশই। আর সত্যি বলতে কি আপনাকে সব কিছু বলার জন্য আমিও ছটফট করছি।কারণ পারলে আপনি পারবেন এই বিপদ থেকে উদ্ধার করতে আমায়।“

“বেশ তবে আগে আমার কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন”, বলল ফেলুদা।

প্রশ্ন পর্বে অবশ্য ছেদ পড়ল কারন এরমধ্যেই বিমল একটা ট্রে করে তিনপ্লেট মিষ্টি আর চার গ্লাস শরবত নিয়ে ঘরে ঢুকল। তাকে দেখেই রমণীবাবু  আমাদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন,” নিন নিন গরমে তেঁতেপুড়ে এসেছেন আগে একটু গলা ভিজিয়ে নিন”।

আমরাও তাই একে একে শরবতের একটা একটা গ্লাস তুলে নিলাম সাথে রমণীবাবু নিজেও একটা গ্লাস তুলে নিলেন। হঠাৎ চোখে পড়ল গ্লাস তুলেও চুমুক না দিয়ে একদৃষ্টে গ্লাসের দিকে তাকিয়ে আছেন জটায়ু। আমি কারণ জিজ্ঞেস করাতে বললেন, “আসলে ভাই তপেশ আজকাল শরবত দেখলেই সেই বিভীষিকা ময় স্মৃতি মনে পড়ে যায় তাই কেমন যেন ইয়ে ইয়ে লাগে।“ বুঝলাম ভদ্রলোক মগনলাল মেঘরাজের ঘরের সেই ছুড়ি কান্ডের কথাই বলছেন। সেদিনও এমনি এক শরবত পানের পর ঘটেছিল ঘটনাটা। লালমোহন বাবু যে সেই ফোবিয়া এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি সেটা স্পষ্ট বুঝলাম তাই আশ্বাস দিয়ে বললাম,” ও আশঙ্কা এখানে নেই আপনি নিশ্চিন্তে পান করুন”।

এবার ফেলুদার গলা শোনা গেল। “আচ্ছা রমণীবাবু আপনার নামটুকু ছাড়া বাকি পরিচয় আমার এখনও অজানা তাই সেটা দিয়েই প্রশ্ন শুরু করি। আপনি কি করেন মানে আপনার পেশা কি?”

“আজ্ঞে ব্যবসা।”

“কিসের ব্যবসা?”

“এক্সপোর্ট  ইম্পোর্ট আর তাছাড়া কলকাতার হগ মের্কেটের কাছে আমার একটা কিউরিও দোকান আছে।”

“পৈতৃক বাড়ি ছেড়ে কলকাতায় থাকার কারণ কি ব্যবসা?”

“ কতকটা তাই তবে অন্য আরেকটা কারণও আছে।”

***

পর্ব ৮ 

ফেলুদা বলল ,” এই অন্য কারণটা কি?”

“বলতে পারেন সেটাই সমস্যার অন্যতম সূত্র যেটা বলতেই আপনাকে আজ ডাকা।“ বললেন রমণীবাবু।

ফেলুদা আবার বলল,” বেশ তালে সেটা শোনার আগে  বাকি কিছু জিনিস জেনে নেওয়া যাক।“

আবার শুরু হল ফেলুদার প্রশ্নপর্ব।

“আপনি বললেন ব্যবসা সূত্রে আপনি কলকাতা নিবাসী, এই বাড়িটা কি তবে ফাঁকাই থাকে এমনিতে।“

“ না না আমার একমাত্র বিধবা পিসি,তার ছেলে আর বউমা তারাই থাকে এখানে। আমি মাঝেমধ্যে আসি সব দেখাশুনা করে ফিরে যাই। এছাড়া বিমল আছে ওই সব সামলায়।“

“বিমল ছাড়া আর কাউকে আপাতত দেখিনি বাড়ির বাকিরা তবে কোথায়?”

“ আজ দিন ছয়েক হল সবাই গেছে বর্ধ্মানে পিসির শ্বশুরবাড়ি বিশেষ কি এক দরকারে।“

রমণীবাবুর কথা শেষ না হতেই বিমল ঘরে এসে বলল,” বাবু আপনার টেলিফোন এসেছে।“

“আপনারে একটু বসুন আমি আসছি “ এই বলেই রমণীবাবু ফোন ধরতে উঠে গেলেন।

রমণীবাবু বেড়িয়ে যেতেই জটায়ু বলে উঠল ,”মশাই আপনার কিন্তু ওই বাড়ির নামটা নিয়ে একটা প্রশ্ন করা উচিৎ ছিল। যতই স্মৃতির উদ্দেশ্যে হোক অমন নাম কেউ রাখে যার মানে দাড়ায় নিজের শ্রাদ্ধ করা।“ 

“এই তথ্য আবার আপনাকে কে দিল?” বলল ফেলুদা। 

“দেবে আবার কে ? এতো শাস্ত্র বাক্য।“

“হলনা লালুদা।“

“তার মানে” জটায়ুর চোখ গোল হয়ে ওঠে।

“মানেটা এটাই যে শাস্ত্র পড়ে আপনি এটা সেটা সেমি ফেল মানে জল মেশানো আছে নয়তো আবার আপনার অবসারভেশন পাওয়ার গোল্লা অর্থাৎ মন দিয়ে পড়েননি। শুনুন আপনি যে প্রক্রিয়ার কথা বলছেন তার নাম চন্দ্রায়ণ নয় চান্দ্রায়ণ এবং তার মানে  শুধুমাত্র নিজের শ্রাদ্ধ নিজে করা নয় বরং চান্দ্রায়ণ  হয় তাঁরই, যিনি প্রবল অসুস্থ - হয় সেরে উঠবেন, নয় দু-চোখ বুজবেন অথবা নিজের পারলৌকিক ক্রিয়া নিজে মিটিয়ে উত্তর পুরুষকে দায়মুক্ত করা। বলতে পারেন একপ্রকার প্রায়শ্চিত্ত।“  

জটায়ুর মুখটা মিইয়ে গেল অস্ফুটে বললেন ,” আবার ব্যাড মিস্টেক হয়ে গেল। নাঃ পড়ার সময় চোখ কান আরো খোলা রাখতে হবে দেখছি।

যদিও পড়ার সংগে কান খোলা রাখার কি সম্পর্ক সেটা আমি বুঝলাম না তবু মুখে কিছু বললাম না কারণ এমনি তেই আজ দুবার ফেলুদার কাছে বেচারা নাকানিচোবানি খেয়েছে।

***

পর্ব ৯

এসবের মাঝেই রমণীবাবু ফোন সেরে ঘরে ঢুকলেন। সোফায় বসে বললেন, “বর্ধ্মান থেকে আমার পিসতুতো ভাই ফোন করেছিল,বলল কালই ওরা ফিরে আসছে।“

ওনার কথা শেষ হতেই ফেলুদা বলল, “রমণীবাবু এবার আপনার সমস্যার কথা বলুন।”

ফেলুদার কথায় রমণীবাবু শুরু করলেন ,” বেশ গোড়া থেকেই তবে শুরু করা যাক। আমাদের এই বাড়িটা দেখেই হয়তো আপনারা বুঝতে পারছেন এই বাড়ি শুধু প্রাচীনত্বেই নয় আভিজাত্যেও অনন্য। সেই ঠাট বাঁট সেভাবে আজ বজায় নেই ঠিকই তবে মা কৃপাময়ীর ইচ্ছায় মোটামুটি সচ্ছলতার সাথেই আমাদের দিন কেটে যায়। তাছাড়া আমি অকৃতদার বেশিরভাগ সময়টা কলকাতা তে ব্যবসা নিয়েই কাটে আর যখন ইট কাঠ পাথরের ওই শহরে হাঁপিয়ে উঠি তখনই এখানে চলে আসি। আপনাকে তো বললাম এ বাড়িতে থাকে আমার পিসি ,পিসতুতো ভাই আর তার বউ। রঞ্জন ,মানে আমার পিসতুতো ভাই এখানেই একটা এজেন্সি তে চাকরি করে। ওর রোজগারও নেহাত মন্দ নয়। বেশ ভালোই চলছিল আমাদের দিনগুলো। কিন্তু একদিনের একটা ঘটনায় সব কেমন ওলট পালট হয়ে গেল।“ এতদুর বলেই রমণীবাবু চুপ করলেন।

ফেলুদা বলল ,” কি সেই ঘটনা?”

“সেটা জানতে হলে একবার মায়ের মন্দিরে যেতে হবে আপনাকে। একবার আসবেন?”বললেন রমণীবাবু।

***

পর্ব ১০

মনের মধ্যে আমি বেশ একটা চাপা উত্তেজনা অনুভব করছিলাম। রমণীবাবুর কথা শুনে আমরা সবাই ওনার পিছু পিছু এগিয়ে গেলাম মন্দিরের দিকে। ধাপ চারেক সিঁড়ি উঁচু শ্বেতপাথরের মন্দির।গর্ভগৃহে কষ্ঠিপাথরের কালীমূর্তি নানবিধ অলংকারে সজ্জিত। সবচেয়ে উলেক্ষ্য বিগ্রহের চোখদুটি অদ্ভুত উজ্জ্বল অথচ স্নিগ্ধ। লালমোহনবাবু ভক্তিভাব যেন দ্বিগুন বেড়ে গেল।সাষ্টাঙ্গ প্রণাম সারলেন। আমাদের নিয়ে রমণীবাবু ঢুকলেন গর্ভমন্দিরে। তারপর কালীমুর্তির সামনে চোখবুজে হাতজোড় করে দাঁড়ালেনএকটূ। তারপর ফেলুদার দিকে ফিরে বলতে শুরু করলেন, “আমাদের এই বাড়ি তৈরী  হয়েছিল আজ থেকে একশো সাতাশ বছর আগে , তৈরী করেছিলেন আমার ঠাকুরদা। এ বাড়ি যার নামে সেই চন্দ্রাবতী দেবী ছিলেন আমার ঠাকুমা।ঠাকুরদা যে শুধু এ বাড়ির নাম ঠাকুমার নামে রেখেছিলেন তাই নয় এই বাড়িটিও ঠাকুমাকেই দিয়ে যান। তার কারণ ঠাকুমা বিয়ে হয়ে এবাড়িতে আসার পরই আমাদের যাবতীয় প্রতিপত্তি।

এবার জটায়ু বলে উঠলেন,” আপনার ঠাকুরদা স্ত্রী জীবিত থাকতেই তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে বাড়ি তৈরী করেছিলেন কারণ ফলকে তো তাই লেখা।“

“আজ্ঞে না না। বাড়ির নামকরণ ঠাকুরদা করেছিলেন ঠিকই কিন্তু ঠাকুমার মৃত্যুর পর আমরাই “স্মৃতির উদ্দেশ্যে” কথাটা যোগ করি।“ বললেন রমণীবাবু।

“বেশ তারপরের ঘটনা ?” বলল ফেলুদা

“হ্যাঁ যা বলছিলাম।“রমণীবাবু আবার শুরু করলেন। “ চন্দ্রাবতী দেবীকেই আমি ঠকুমা বলে জানলেও তিনি কিন্তু আমার বাবার সৎ মা। আসলে আমার আপন ঠাকুমা মারা যান যখন আমার বাবার বয়স মাত্র দশ।বাবাকে মানুষ করার জন্য একপ্রকার বাধ্য হয়েই ঠাকুরদা আবার বিবাহ করেন। সৎ মা হলেও তিনি এসে বাবাকে আপন সন্তানের মতই আকড়ে ধরেন এবং জীবনের শেষদিন অবধি মায়ের অভাব বুঝতে দেননি। বলা ভাল বাবা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন ঠাকুমা ওনার সৎ মা। ঠাকুমা যেমন স্নেহপরায়না ছিলেন তেমনি ছিলেন উদার। তারই পরামর্শে ব্যাবসা শুরু করে ঠাকুরদাদার যাবতীয় প্রতিপত্তি। ঠকুমার এহেন মিষ্টি স্বভাব আমার উদারতার কারণেই ঠাকুরদা তার যাবতীয় কিছু ঠাকুমাকে দিয়ে যান কারণ তার বিশ্বাস ছিল নিজের সন্তান থাকলেও বাবাকে ঠাকুমা বঞ্চিত করবে না। হলও তাই বরং বলা ভাল একটূ বেশী।“

“তার মানে চন্দ্রাবতী দেবীরও সন্তান হয়? তারা এখন কোথায়?” বলে ফেলুদা

“হয় বই কি। চন্দ্রাবতী দেবীর এক ছেলে ও এক মেয়ে হয়েছিল। তার সেই ছেলে কোন এক কারণে মায়ের উপর রাগে ঘরছাড়া যার খোঁজ আমরা জানিনা। আর আমার যে পিসির কথা বললাম সেই তো ওনার মেয়ে। তবে আগেই বললাম ঠাকুমা তিন সন্তানে কোনদিন বিভেদ করেননি বরং আমার বাবাই ছিলেন তার সবচেয়ে বেশী প্রিয়। যাইহোক আমার ঠাকুমার ছিল বাগানের সখ তা একদিন এইখানে বাগান করবার জন্য মাটি খুঁড়তে গিয়ে তিনি পান এই কালীমূর্তি এবং একটি কাঠের বাক্স।শুনেছি তারপরই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়। কিন্তু সেই বাক্সটা ঠাকুমা আমৃত্যু হাতছাড়া করেননি। তার মৃত্যুর পর সে বাক্সের হদিস কেউ পায়নি। তবে মৃত্যুর আগে বাবাকে ঠাকুমা একটা চিঠি দিয়ে যান যেটা থকেই এই ঘটনার সূত্রপাত।

***

পর্ব ১১

“কি এমন ছিল সেই চিঠিতে ?” ফেলুদা প্রশ্ন করল।

ফেলুদার কথা শুনে রমণীবাবু একটু নিচু হয়ে কালীমূর্তির বেদির একপাশে একটু চাপ দিলেন আর চাপ দিতেই একটা ছোট্ট কুঠুরি খুলে গেল। হাত ঢুকিয়ে সেই কুঠুরি থেকে উনি বার করে আনলেন একটা খাম। খামটা ফেলুদার হাতে দিয়ে বললেন,” নিন আপনি নিজেই পড়ুন।“

খাম থেকে চিঠিটা বের করে চোখের সামনে মেলে ধরতেই আমি আর জটায়ু ও তার উপর ঝুঁকে পড়লাম। মুক্তোর মতো হাতের লেখা।

স্নেহাস্পদেষু সৌরিশ,

       জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়ে আজ তোমায় কিছু কথা জানিয়ে যেতে চাই। এতকাল ধরে যে কথা মনের গভীরে চেপে রেখেছিলাম আজ তা না জানিয়ে গেলে শান্তিতে পৃথিবী ত্যাগ করা আমার সম্ভব হবে না। আর আমার  সিদ্ধান্তে তুমিই সেই  একমাত্র যোগ্য ব্যক্তি যাকে একথা জানানো যায়। আমার বিশ্বাস এ ব্যাপারে আমি কোন ভুল করছি না। তোমায় আমি গর্ভে ধারণ করিনি ঠিকই কিন্তু তুমি আমার নিজের সন্তানদের থেকেও বেশী। কিন্তু শুধু সেই কারণেই নয় তোমায় এই গোপন কথা জানাবার অন্যতম কারণ তুমি নির্লোভ। তোমার সততা ,উদারতা, দয়া,ক্ষমাপরায়ণতা সবই তোমায় মানুষ করে তুলেছে। মা হয়েও বলছি আমার নিজের সন্তানদের চোখে আমি দেখছি লোভ ও হিংসার বীজ।তাই তাদের জানানো মানে অপাত্রে দান করা। 

তুমি জান তোমার বাবা এই বাড়ি এবং সম্পত্তি আমায় দিয়ে গিয়েছিলেন। ভবিষ্যতে তোমার ভাই এবং বোন যাতে কোন সমস্যার সৃষ্টি করতে না পারে তাই আমি এই বাড়ি ও সম্পত্তির স্বত্তাধিকার তিন সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছি। কিন্তু আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদটির খোঁজ আমি তোমাকেই দিয়ে যেতে চাই। তুমি নিশ্চয়ই অবগত আছ যে মায়ের মূর্তি খুঁজে পাওয়ার সাথে সাথে আমি একটি বাক্স উদ্ধার করি যা সারাজীবন আমি গোপন রেখেছিলাম। সবার মতো তোমারও হয়ত এই প্রশ্ন যে কি এমন ছিল সেই বাক্সে । আজ তোমায় সব জানানোর সময় এসেছে। 

বাক্সটা পাওয়ার পর সেই রাত্রে আমি বহু চেষ্টার পর বাক্সটা খুলতে সক্ষম হই। খোলার পর তার মধ্যে রূপোর চাদরে মোড়া আমি একটি প্রাচীন পুঁথি। দেবনাগরি অক্ষরে লেখা সেই পুঁথি আমার পক্ষে পড়া সম্ভব হয়নি তাই পরদিনই আমি আমার বাপের বাড়ির গ্রামে যাই। এবং সেখানে এক অতিবৃদ্ধ সংস্কৃত পন্ডিত থাকতেন তাকে গিয়েই সব জানিয়ে পুঁথিটি দেখাই। আসলে পুঁথির বিষয়বস্তু জানবার জন্য আমি বড়ই অস্থির হয়ে ছিলাম।  পন্ডিত মশাই আমার কাছে তিনদিন সময় চেয়ে নেন। তিনদিন পর যখন আবার তার কাছে যাই তিনি আমি বলেন সেই অত্যাশ্চর্য ঘটনা…

***

পর্ব ১২

আমি যখন পন্ডিত মশাইয়ের কাছে পৌঁছাই  তিনি আমায় বলেন “ মা চন্দ্রা তোমায় আজ আমি যে কথা বলব তা কারুর কাছে প্রকাশ কোরো না। তুমি নিশ্চয়ই এটুকু বুঝেছ যে এই পুঁথি বহু প্রাচীন তবে এটাও জেনে রাখ এ পুঁথি শুধু প্রাচীনই নয় বলা ভাল এক দুর্মুল্য বস্তু। কারণ এই পুঁথিতেই আছে সেই মহামুল্যবান সম্পদের হদিস অর্থাৎ রাজা বল্লাল সেনের পদ্মরাজ মণির সন্ধান। এই পুঁথিতেই সেই গুপ্ত স্থান এর বর্ণনা আছে যেখানে গেলে এ মণি পাওয়া যাবে। শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই সেই স্থানে এই মণি লুকিয়ে রাখা আছে।“ এরপর সেই স্থানের বর্ণনা তিনি আমায় বুঝিয়ে দেন কিন্তু বলেন যে আমি সেই মণি খুঁজে পেলেও যেন তা গোপন রাখি কারণ অসৎ ব্যক্তি এর সন্ধান পেলে তা আর রক্ষা করা সম্ভব হবে না। তুমি জান লোভ আমার মধ্যেও নেই কিন্তু শুধু মাত্র কৌতুহলের বশবর্তী হয়ে আমি সেই মণির সন্ধান করি এবং তা উদ্ধার করতে সক্ষম হই। সেই মণি আজও সেই গুপ্ত স্থানেই বিদ্যমান। জীবনের অন্তিম লগ্নে এসে পৌঁছে দায়মুক্ত হতেই আজ তোমায় এর সন্ধান দিয়ে গেলাম।কারণ আমার মতে তুমিই একমাত্র যোগ্য ব্যাক্তি।তবে এর সন্ধান আমি তোমায় সহজ ভাষায় দেবনা। তোমার জন্য এই বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সূত্র ছেড়ে গেলাম।আমার বিশ্বাস তোমার মেধা দিয়ে তুমি ঠিক পারবে সব উদ্ধার করতে। ধরে নাও এ তোমার মায়ের এক ছেলেমানুষি লুকোচুরি খেলা। ভাল থেকো। অনেক অনেক আশীর্বাদ নিও। জয়ী হও এবং তুমিও তোমার নির্বাচিত যোগ্য মানুষটিকে এর সন্ধান দিয়ে যেও।


                                                        ইতি তোমার নিত্য আশীর্বাদিকা 


                                                                              মা


                                                                শ্রীমত্যা চন্দ্রাবতী দেবী


চলবে…

***

পর্ব ১৩

আমাদের মতো জটায়ু ও বোধহয় একনিশ্বাসে শেষ করলেন চিঠিটা। আর করেই চেনা ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,” হাইলি সাসপিসিয়াস”। এবার ফেলুদা রমণীবাবুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল,” এতো গেল চিঠির  কথা কিন্তু সমস্যাটা হল ঠিক কোথায়?” 

এবার আবার রমণীবাবু শুরু করলেন,” এই চিঠি পাওয়ার পর বাবা অনেক সন্ধান চালিয়েছিলেন  এবং তার অসামান্য মেধার কারণেই ঠাকুমার রেখে যাওয়া অনেক সূত্র উদ্ধার করে একটু একটু করে সাফল্যের দরজায় পৌঁছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি হঠাৎ হার্ট এটাক হয় বাবার এবং সে ধাক্কা তিনি সামলে উঠতে পারেননি। আমার বয়স তখন কম হলেও মনে আছে শেষ যাদিন হাসপাতালে বাবাকে দেখতে যাই ক্ষীন কন্ঠে বাবা আমায় এই চিঠির সন্ধান্ দেন ও বলেন আমি যেন তার অসমাপ্ত কাজ শেষ করি। সেদিন বেশী কিছু না বুঝলেও পরে এই চিঠির মর্মার্থ আমি অনুধাবন করি।  

ওনার কথার মাঝেই আমি জিজ্ঞেস করলাম,” ফেলুদা তুই কি এইজন্যই বলেছিলে এ বাড়ির সবকিছুই অদ্ভুত?” ফেলুদা ঘাড় নেড়ে সায় দেয়। 

রমণীবাবু আবার শুরু করলেন,” আর একটা অদ্ভুত বিষয় কি জানেন মিত্তির মশাই ,আমার কেন জানি না মনে হয় বাবার মৃত্যুটাও স্বাভাবিক নয়। তার কারন হল ওই শেষদিন বাবার বলা একটা কথা। বাবা প্রায় অনুনয়ের সুরেই আমায় বলেছিলেন এ বাড়ির থেকে দূরে থাকতে যার কারণ বাবা বলে যাননি। কিন্তু আমার মন বলে এই কথার সঙ্গে বাবার মৃত্যুর যোগ আছেই।“

“তার মানে কলকাতায় থাকার দ্বিতীয় কারন এটাই “বলল ফেলুদা।

“ঠকই বলেছেন। এরপর বেশ কিছু বছর কেটে গেছে । সবই ঠিকই চলছিল কিন্তু একদিন হঠাৎ আমাদের ঠাকুরমশাই মায়ের বেদী পরিষ্কার করতে গিয়ে অজান্তেই এই কুঠুরি খুলে ফেলেন এবং চিঠিটা পান । তিনি চিঠিটা রেখেই দিচ্ছিলেন কিন্তু সেইসময় আমার পিসতুতো ভাই অমলেন্দু সেটা দেখতে পায় এবং চিঠিটা পড়ে ফেলে। পরদিনই পিসিমা আমায় তড়িঘড়ি ডেকে পাঠান এবং প্রায় হুমকির সুরে আমায় বলেন ওই মণির ভাগ তাদের চাই। আমি কিছুতেই তাদের বিশ্বাস করাতে পারিনি যে আমি নিজেই এর সন্ধান জানি না। তাদের বদ্ধমূল ধারনা হয় বাবা আমায় সবকিছুর খোঁজ দিয়ে গেছেন। অশান্তি চরমে পৌঁছলে অমল ক্ষীপ্র ভঙ্গীতে আমায় বলে যে ভাগ আদায় করার অন্য রাস্তা তার জানা আছে। কিন্তু এরপরই…

***

পর্ব ১৪

“কি হয়েছিল এরপর?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।

রমণীবাবু আবার শুরু করলেন,” অমলের এই আপাত হুমকি তে ভয় পাইনি ঠিকই কিন্তু মনটা বড্ড ভেঙ্গে গেল। আপনজন দের এই ব্যাবহার আমি মানতে পারিনি তাই এ বাড়ীতে আসা প্রায় বন্ধই করে দেব ভেবেছিলাম। যাই হোক সেইদিনের সেই বচসার পর দশদিন কাটতে না কাটতেই আমার কাছে অমলের টেলিফোন যায় যে পিসিমার শারীরিক অবস্থা খুব খারাপ এবং আমি যেন সেদিনের সব কিছু ভুলে তাড়াতাড়ি চলে আসি। এই খবরের পর আমি আর অভিমান করে থাকতে পারিনি।পরদিনই কার্ত্তিককে সাথে নিয়ে চলে আসি। কার্ত্তিক আমার কলকাতার বাড়িতেই থাকত আমার দেখাশোনার জন্য। এসে পিসিমা কে শয্যাশায়ী দেখি ঠিকই কিন্তু আমার মন যেন বলে তেমন গুরুতর কিছু নয়। যা হোক পিসির যাবতীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করলাম। এরই মাঝে হঠাৎ একদিন পিসির গুরুদেব এসে উপস্থিত হলেন। পিসি অসুস্থ তাই কার্তিকের  উপরেই দায়িত্ব পড়ল তার দেখভালের। যাই হোক আস্তে আস্তে পিসি সুস্থ হয়ে উঠল যথারীতি আমিও ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করতে লাগলাম। কিন্তু অদ্ভুত ভাবে বেঁকে বসল কার্তিক। যে ছেলে আমায় একা রেখে একদিনের জন্যও কোথায় যেতে চায় না সে নির্বিবাদে জানিয়ে দিল আমি যেন ফিরে যাই সে পিসি ঠাকুমার কাছেই থাকবে। কার্তিকের এই পরিবর্তনে কেমন যেন খটকা লাগল আমার। জোর করে লাভ হবে না বুঝে আমি ফিরে গেলাম। কিন্তু দুদিনও কাটল না এরপর।"

***

পর্ব ১৫

“কার্তিক ফিরে এল কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য মানুষ হয়ে । শান্ত শিষ্ট ছেলেটার মধ্যে অদ্ভুত একটা রাগ আর বিরক্তি যেন সুস্পষ্ট হয়ে উঠল। নিজের কাজটুকু ছাড়া সব সময়ই চুপ করে ভাবত কি যেন। অনেক জিজ্ঞেস করেছিলাম তবে সদুত্তর না পেয়ে একসময় আমিও আর ঘাটাই না। কিন্তু একটা ঘটনা আমার চিন্তা বাড়িয়ে দিল। কাজ থেকে ফিরে মাঝে মধ্যেই দেখতাম আমার ঘরের জিনিস পত্র ওলটপালট। সাধারণত কার্তিক খুব গোছানো কিন্তু অদ্ভুত ভাবে সব কেমন ওলট পালট। পরপর বেশ কিছু দিন এটাই লক্ষ্য করলাম। আর যেটা হোত কার্তিক ঘন ঘন এ বাড়িতে যাতায়াত শুরু করল। আমার মনে হতে লাগল যে এ বাড়ির লোকেরাই যেন কার্তিককে বশ করেছে শুধুমাত্র ভুল বিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে যে পদ্মরাজ মণি আমার কাছেই আছে। আর এর সঙ্গে আমার মনে শুরু হল মৃত্যু ভয়। যারা এভাবে একটা নিরিহ ছেলেকে ব্যবহার করতে পারে নিজেদের লোভ চরিতার্থ করতে তাদের পক্ষে সবই সম্ভব। প্রতিদিন এই ভয় নিয়ে বেঁচে থাকা আমার কাছে দুঃর্বিশহ হয়ে উঠছে। আমি চাই আপনি এই রহস্যের সমাধান করুন আর ওই মণি উদ্ধার করে সরকারের হাতে তুলে দিয়ে সবার ভুল ভাঙ্গিয়ে দিন।আমার মণির লোভ নেই কিন্তু আমি এও চাই না অযোগ্য ব্যক্তিরা এটা হাতে পাক। “

***

পর্ব ১৬

“আমায় দুটো দিন ভাববার সময় দিন রমণীবাব, এই কেসের নজিরটা আমার কাছেও বেশ নতুন আমি দুদিনের মধ্যেই আপনাকে জানাচ্ছি” জবাব দিল ফেলুদা।

“আমি কিন্তু  আপনার ভরসায় বসে থাকব মিত্তির মশাই ,আমার আশা আমায় আপনি নিরাশ করবেন না।“ করুণ মুখে বললেন রমণীবাবু।

কী বলবে বুঝতে না পেরে ফেলুদা শুধু হেসে বলল , “চিন্তা করবেন না সব ঠিক হয়ে যাবে।“

এরপর রমণীবাবুর থেকে বিদায় নিয়ে আমরা রওনা হলাম। এরপর কিছুটা আসার পর একটা হোটেলের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ফেলুদা নেমে পড়ল তারপর আমাদের নেমে আসতে বলে হরিপদবাবুকে বলল ,” গাড়িটা পার্ক করিয়ে আপনিও আসুন ।“

গাড়ি থেকে নেমেই লালমোহনবাবু ফেলুদা বললেন ,” ও মশাই এই হোটেলের কোন যোগসূত্র আছে নাকি এবারের কেসে ?”

আমার হাসি পেল কিন্তু চেপে গেলাম। এবার ফেলুদা বলল “ কটা বাজে লালমোহন বাবু? সারাদিন পেটে দানাপানি পড়েনি সে খেয়াল আছে?”

চওড়া করে হেসে জটায়ু বললেন ,” আসলে মশাই বশিকরণের কেসে এমন বস হয়ে গিয়েছিলাম যে খাওয়ার কথাই ভুলে গেছি।“

হরিপদবাবু আসতেই আমরা চারজন একটা টেবিলে গিয়ে বসলাম। লাঞ্চ অর্ডার করা শেষ হতেই আমি বললাম ,” আচ্ছা ফেলুদা তুমি কি সত্যি এই বশিকরণে বিশ্বাস করো?”

ফেলুদা কোন উত্তর না দেওয়ায় বুঝলাম ওর মাথায় ইতিমধ্যেই চিন্তা শুরু হয়ে গেছে।

চলবে…


No comments:

Post a Comment