তোপসে নিরুদ্দেশ
যখন আমার জ্ঞান হলো, তখন প্রথম চোখটা খুলে কিছুই দেখতে পেলাম না, চারদিকে কেমন ঘুটঘুটে অন্ধকার, কোথায় আমি? কি করে এলাম এখানে? মাথার পেছনে একটা চিনচিনে ব্যাথা। আসতে আসতে ধাতস্ত হলাম, মাথাটাও আসতে আসতে পরিষ্কার হল। মনে পড়েছে, আমি লালমোহন বাবুর সাথে হোটেলে ছিলাম, ফেলুদা বেরিয়েছিল, ও অনেক্ষন না ফেরার পর ওকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। বিচের ধার দিয়ে খানিকটা হাঠার পর, হঠাৎ মাথার বাঁ দিক দিয়ে একটা আঘাত, তারপর সব অন্ধকার। চোখটা এতক্ষনে অন্ধকার সয়ে গেছে, আমি একটা টাটা সুমোর পেছনের সিটে হাত পা বাঁধা ব্যবস্থায় পড়ে আছি। মাথায় এখনো অসম্ভব ব্যাথা। গাড়িটা চলছে, যে রাস্তাটার ওপর দিয়ে চলছে সেই রাস্তাটা বেশ ভালো, কারণ গাড়িটা লাফাচ্ছে কম, বোধহয় হাইওয়ে। কিন্তু কোন হাইওয়? আর গাড়িটা যাচ্ছেই কোন দিকে? ফেলুদা কোথায? ও ঠিক আছে তো? ও কি জানে এরা আমায় ধরে নিয়ে এসেছে?এই সব সাত পাঁচ চিন্তা একসাথে মাথায় ভিড় করে এলো। মাথাটা একবার তোলার চেষ্টা করলাম আর সেটা করতেই, পাটা গাড়ির দরজায় ঠোকা খেয়ে "খট" করে একটা আওয়াজ হলো। সঙ্গে সঙ্গে মাঝের সিটে বসা একটা লোক পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বিশ্রী হেড়ে গলায় বলল, "উঠেছিস দেখছি। ও শাহবজি, তাড়াতাড়ি ওষুধটা মারুন সালাকে, এ বহুত চালু চিজ আছে।" বলার সাথে সাথেই গাড়িটা থেমে গেলো, এবং হেড়ে গলা ওয়ালা লোকটার পাশে বসে থাকা একটা ছিম ছাম চেহারার লোক, গাড়ি থেকে নেমে পেছনের দরজা খুললো, কয়েক সেকেন্ড পরে কোনুয়ের কাছে একটা ছুঁচ ফোটানোর মত ব্যথা অনুভব করলাম। মাথা ভারী হতে আসছে, আমি আবার তলিয়ে যাচ্ছি।
আজ বিকেলের দিকে ওরা পুরী ঢুকেছে, আসার কারণ, মনমোহন দে নামে এক ব্যক্তি ফেলুদা কে চিঠি লিখে ডেকে পাঠিয়েছে কোনো এক বিশেষ দরকারে। এসে তোপসে আর লালমোহন বাবুকে হোটেলে রেখে ফেলুদা গেছিল ওনার সাথে দেখা করতে কারণ উনি একা দেখা করতে চেয়েছিলেন। ওনার ঠিকানায় পৌঁছে দেখে বাড়িতে কেউ নেই, শুধু গ্রিল গেটে একটা নোট গোঁজা, তাতে লেখা "এখানে দেখা করা নিরাপদ নই, সন্ধ্যে ৬:৬০ টা নাগাদ নুলীয়া বস্তির ৭ নম্বর খুলিতে আসুন" চিঠিটা অত্যন্ত সন্দেহজনক, কিন্তু না গেলেও যে নই। মুহুর্তের মধ্যে ডিসিশন নিয়ে ফেললো ফেলুদা। হোটেল এ ফিরে দেখে তোপসে অঘোরে ঘুমোচ্ছে, ওকে আর তুললো না, ওর কাধের ঝোলা ব্যাগটাতে কয়েকটা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে আর কোল্টটা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এদিক সেদিক ঘুরে, ওকে কেউ ফলো করছে না নিশ্চিত হোয়ে, একটা পাবলিক টয়লেটে ঢুকলো ও। কিছুক্ষণের মধ্যেই, কাপড় পাল্টে মেক আপ নিয়ে, বেরিয়ে এলো ফেলুদা। পরনে খাকি হাফ প্যান্ট আর ঢিলে শার্ট, চোখে স্কোয়ারে ফ্রেমের চশমা, মুখে চাপ দাড়ি, মাথার চুলে পিছনে ঝুঁটি বাঁধা, অবশ্যই পরচুলা। এরকম বেশে, পকেট পিস্তল নিয়ে, ৭ নম্বর খুলির সামনে এসে এদিক ওদিক নুলিয়া বস্তির ছবি তুলতে লাগলো, এবং সাবধানে ৭ নম্বরের দিকে নজর রাখলো। প্রায় তিন ঘন্টা এভাবে কাটানোর পর যখন বুঝলো যে ৭ নম্বরে কোনো রকম মানুষ থাকার চিনহ নেই। তখন কেমন একটা খটকা লাগলো, এসবের মানে কি? তবে কি তাকে কেউ ইচ্ছে করে এখানে ডেকে এনেছে, কলকাতার বাইরে, কিন্তু কেন? কোনো এমন কাজ কে পরিণতি দিতে যা সে থাকলে অসুবিধে হতো, কিন্তু তার জন্য নুলিয় বসতি তে ডেকে অন কেন? আর এখানে থাকা ঠিক হবে না ভেবে, তাড়াতাড়ি হোটেল ফিরে এলো। রাস্তায় অবশ্য আবার পোশাক পাল্টে নিয়ে স্বাভাবিক পোশাক পরে নিয়েছিল ফেলুদা। হোটেলে ঢুকতেই ম্যানেজার ছুটে এসে বললেন "আপনার বন্ধুকে অজ্ঞান অবস্থায় বিচের ধারে পাওয়া গেছে। চারজন ছেলে তাকে খুঁজে পায়, মুখে চোখে জল দিয়ে খানিক সুস্থ্য করে, হোটেল এর নাম জেনে ওনাকে এখানে ছেড়ে দিয়ে গেছে। উনি আর আপনার ভাই ৭:৩০ তার দিকে বেরিয়েছিলেন, আপনার ভাই যদিও এখনও ফেরেনি।" কথাটা শোনা মাত্রই ফেলুদা প্রাই হাওয়ার গতিতে ছুটলো জটায়ুর ঘরের দিকে। বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় বসে আছে জটায়ু, মাথায় আইস প্যাক বাঁধা।
"আপনি ঠিক আছেন?" ফেলুদা প্রশ্ন করলো
"হ্যাঁ, এখন ঠিকই আছি" জটায়ু উত্তর দেয়
"এসব হলো কি করে? তোপসে কোথায়?"
"জানিনা তপেশ ভাই কোথায়। আপনার আসতে দেরও হচ্ছে দেখে প্রায় জোর করেই তপেশ ভাই আমাকে নিয়ে আপনাকে খুঁজতে বেরোয়। বিচের উপর দিয়ে হাঁটছি, হঠাৎ মাথায় বাড়ি, তারপর সব অন্ধকার। যখন জ্ঞান হলো তখন চারটে ছেলে আমার মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে, তপেশ ভাই আশপাশে কোথাও নেই। ছেলেগুলোও হোটেল পৌঁছে দিলো। এখানে এসে দেখি আমার জামার পকেটে একটা চিরকুট। এই যে...." লালমোহন বাবু কাপাকাপা হাতে কাগজটা ফেলুদা কে দিল। তাতে লেখা,
"মিঃ মিত্তর, আঙ্কলকে লিয়ে অনেক মজা এলো। এবার কাজিন কে নিয়ে একটু খেলা হোক। এবার কিন্তু গেম টা একটু সিরিয়াস।"
ফেলুদা ধপ করে খাটে এর উপর বসে পড়ল। প্রথম বার কোনো কেস এর মাঝখানে তার মাথা যেনো কাজ করা বন্ধ করে দিল। তার মাথা ঝিম ঝিম করছে, শরীরের প্রত্যেকটা স্নায়ু যেনো উত্তেজিত হতে আছে। এ ভাষা তার চেনা, তোপসের খুব বিপদ, ভীষণ বড়ো বিপদ....
~চলবে~
Source: FaceBook
Note: this is my personal blog. The copyright of the story lies solely and entirely with the author.
No comments:
Post a Comment