[1]
লালমোহন বাবুর ফোনটা সকাল নটা নাগাদ এল।
ইদানিং লকডাউনের অত্যাচারে আমাদের রোববারের আড্ডা শিকেয় উঠেছে। সত্যি বলতে কি, কোনটা যে কি বার সেটাই চট করে মনে পড়ছে না। এর মধ্যে একদিন বন্ধুকে ফোনে ভুল বার বলে ফেলে ফেলুদার ধমকও খেয়েছি। আজকাল অবিশ্যি এমনিতেও আমাদের বাড়িতে প্রতিদিনই রোববার। বাবা রিটায়ার করার পর থেকে সকালে আপিসের ভাত দেয়ার হইচই নেই মায়েরও। তাও অন্যদিন গুলোয় রাস্তায় গাড়ির আওয়াজ, লোকজনের চেঁচামেচি, দোকানপাটের ভিড়ভাট্টা, সব মিলিয়ে বোঝা যায়, এটা কাজের দিন। আমাদের রজনী সেন রোডে, এক জটায়ুর সবুজ অ্যামবাসাডর ছাড়া, আগে ততটা গাড়ি ঢুকত না। এখন আমাদেরও ধুলো ধোঁয়ার থেকে বাঁচতে একতলার জানলা বন্ধই রাখতে হয়।
“এ তো মশাই আর পারা যায় না! কানপুর ইষ্টিশনে আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে অবধি এত বছরে একটানা দু মাস আপনার আর তপেশের মুখ দেখিনি এরকম তো কখনও হয়নি! বসে না থেকে কয়েকটা উপন্যাসে হাত দেব ভেবেছিলুম, প্লটও ছিল, কিন্তু আপনাকে যে মাঝে মাঝে দেখিয়ে একটা ভ্যালুয়েবল অ্যাডভাইস নেব, সে রাস্তা না থাকায় বারবার আটকে যেতে হচ্ছে। বাজার দোকানে দুয়েকবার বেরতুম, তাও পাড়ার চ্যাংড়া ছেলেপিলেগুলো “দাদু বয়েস হয়েছে, বাড়ি যান, ইনফেকশন হবে” বলে খালি ভয় দেখায়! আরে বাপু, আর্লি লাইফে মুগুর ভেঁজেছি, হেদোতে বাটারফ্লাই স্ট্রোক দেখে লোকে ক্ল্যাপ পর্যন্ত দিয়েছে, গাছে উঠতে পারি, প্রয়োজন হলে এখনও উটে উঠতে পারব, আমার সাথে বাকতাল্লা? লাইফ হেল হয়ে গেল মশাই!”
ইদানিং আমাদের ল্যান্ডলাইন প্রায়ই খারাপ হওয়ায় বিরক্ত হয়ে, মাসছয়েক হল, ফেলুদা স্মার্টফোন নিয়েছে। প্রথমে বাক্স খুলে ম্যানুয়াল নিয়ে বসে একা ঠিক ম্যানেজ করতে না পেরে একবার আমায় হেল্প করতে ডেকেছিল। তারপর থেকে যখনই একলা, দেখি ফোনে খুটখাট করছে। একবার তো জটায়ু আমায় ফিসফিস করে বলেও ফেললেন, “তোমার দাদারও কি শেষটায় ফোনে অ্যাডিকশন হল নাকি ভাই তপেশ? অ্যাদ্দিন দেখছি, হাত খালি থাকলে বইপত্র না পড়ে, দাবাবোড়ে না খেলে, তাসের ম্যাজিক প্র্যাকটিস না করে, স্রেফ ফোন ঘাঁটছেন, এ তো কল্পনাও করা যায় না!” সত্যি বলতে কি, আমিও একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। একদিন শুনলাম, সিধু জ্যাঠাকে ফোনে বলছে, “উইকিপিডিয়াতে বলছে ১৭৭২, সত্যিই কি তাই?” ওপার থেকে কি উত্তর এল, সেটা অবিশ্যি শোনা গেল না। কারন ল্যান্ডলাইন গিয়ে অবধি, এক্সটেনশনে কথা শোনার সুযোগটাও চলে গেছে। এখন অবিশ্যি অন্য কথা। লক ডাউনে শহরের শব্দ কমে গিয়ে মোবাইলে অন্য দিকের কথাও পষ্ট শোনা যায়। বিশেষ করে রোববার হলে।
সেই ভাবেই জটায়ুর কথা হয়ত শুনতে পেয়েছিল ফেলুদা, বেরিয়ে এসে আমার হাত থেকে ফোনটা চাইল। “পাণ্ডূলিপি দেখাতে আর অসুবিধে কি? ক্যামস্ক্যানার বা ওই ধরণের কোন অ্যাপ ইন্সটল করে নিন, তারপর ছবি তুলে পাঠিয়ে দিন।“
“সেও একবার ভেবেছিলুম জানেন, তারপর একদিন পুরনো আনন্দবাজার গোছাতে গিয়ে চোখে পড়ল, গত বছর একটা খবর বেরিয়েছিল যে, ওসব ছবি নাকি পাচার হয়ে যাচ্ছে অন্য লোকের হাতে! এই বাজারে আমার অনেক রাইভ্যাল আছে জানেন তো? ভাবলুম, শেষটায় কার হাতে গিয়ে পড়বে, তাই আর ভরসা পেলুম না।“
“আরে, অন্য লোক বলতে কি আর আপনার নিশিকান্ত চাকলাদারের হাতে গিয়ে পড়বে ভাবছেন? তার এত ক্ষমতা নেই। ওসব অ্যাপের মাধ্যমে অনেকে ফিশিং ইউ আর এল ফোনে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। তাতে ফোনে ব্যাঙ্কিং করতে গেলে অনেক সময় টাকা চুরির ভয় থাকে। সেরকম চান্স আপনার ক্ষেত্রে আছে বলে তো মনে হয় না। আপনি কি ফোনে টাকাপয়সা আদান প্রদানে অভ্যস্ত?”
“পাগল হয়েছেন মশাই ? আমার বাড়ির দুটো বাড়ি পরে ব্যাংক, তার ওপর কাউনটারের ছোড়া আমার ফ্যান, গেলেই আমায় খাতির করে বসিয়ে টাকাপয়সা তুলে দেয়, খামকা ওসব হ্যাপাতে গিয়ে কি হবে?”
“তাহলে স্ক্যানারে আপনার ভয় নেই। আপনার তথ্য হাতিয়ে কারও কোনও লাভ হবে না।“
“বলছেন? জয় মা বলে শুরু করে দেব তাহলে?”
“স্বচ্ছন্দে! শুভস্য শীঘ্রম!”
ফেলুদা ফোনে ব্যাঙ্কিং করে কি না, ওর তথ্য হাতিয়ে কারও কোন লাভ হবে কি না, জটায়ুর ব্যাক্তিগত তথ্য সম্পর্কেও এতটা নিশ্চিন্ত থাকা চলে কি না, এসব নিয়ে একবার জিগ্যেস করব ভেবেছিলাম। পরে মনে হল, ইদানীং গাঁট্টা মারা ছেড়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু জ্ঞান দিতে গেলে এক এক সময়ে এমন কটমটিয়ে তাকায় যে রক্ত জল হয়ে আসে। তাই আর কিছু বললাম না।
পরে অবিশ্যি দেখা গেল যে বললেই ভাল ছিল।
[2]
“এই লকডাউনে সবচেয়ে বেশি মার খাচ্ছে কারা জানিস?”
ছাদের দিকে মাথা চিতিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়তে ছাড়তে বলল ফেলুদা। ইদানিং বাড়িতে বেশির ভাগ সময় বাবা থাকায়, সিগারেট খাবার একটু অসুবিধে হচ্ছিল। একদিন দুপুর রোদ্দুরে ছাতে দেখে বাবাই বললেন, “বয়স তো কম হল না, পাশের ঘরে খাবার টেবিলে আমি বসে, তাও ড্রয়িং রুমে বসে মক্কেলের সামনে কেতা করে সিগারেট টানলে যদি আমার অসম্মান না হয়, সামনে খেলেও হবে না। তবে ও জিনিস কমানোই ভাল।“ তারপর থেকে ঘরেই খায়।
ফেলুদার প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও, দিলাম না। এ হচ্ছে ফেলুদার বিখ্যাত জ্ঞান দেবার মুড। নিজেই প্রশ্ন করবে, নিজেই তার উত্তর দেবে। “ছোট ব্যবসায়ী আর শ্রমিক, বিশেষ করে যাদের এখন কায়দা করে বলছে পরিযায়ী শ্রমিক। টাকা হাতে থাকলে, এদের জন্যে কিছু করাই এখন আশু কর্তব্য।“
ফেলুদার হাতে খুব একটা টাকা যে নেই, সেটা আন্দাজ করা শক্ত না। ডিসেম্বরের গোড়ায়, রহিমপুরে একটা দলিল জালের মামলার পর থেকে আর মক্কেলের পা পড়েনি একুশ নম্বর রজনী সেন রোডে। এখন তো আর প্রশ্নই ওঠে না। ফেলুদার অবিশ্যি তাই নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয়না। লকডাউনে সবাই জেরবার। বাবা রোজ দুবেলা চায়ের দোকানের আড্ডা মিস করছেন বলে, মেজাজ গুম। ঘন ঘন চায়ের ফরমাশ যাচ্ছে বলে, আর শ্রীনাথ দেশে গেছে বলে, মা ও একটু চাপে। আমি একদিন ইউ টিউব দেখে রান্নার চেষ্টা করব কি না ভাবছিলুম। তার আগেই ফেলুদা একদিন আগ বাড়িয়ে রান্না করতে গিয়ে যেটা বানিয়েছিল, বাবা খেয়ে বললেন, সেটা নাকি চিকেনের ঘণ্ট। আমি অবিশ্যি ফেলুদার দেখাদেখি যে কোন খাবার সহ্য করে নেয়া অভ্যেস করেছি, তাই অত মুশকিল হয় নি। তারপর কদিন জটায়ুর থেকে চেয়ে আনা কাঠমান্ডুর সেই তিব্বতি কুক বুকটা আলমারি থেকে নামিয়ে নাড়াচাড়া করছে দেখেই, মা আবার চটপট ফর্মে ফিরে গেছেন। আপাতত ফেলুদা নির্বিকার। বই পড়ে, হাতের ফোনে নানা রকম ইনডোর গেমস খেলে, হাতসাফাই প্র্যাকটিস করে, দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে। নিয়মিত যোগ ব্যায়াম তো আছেই। মামলা না থাকলে স্রেফ কুঁড়েমি করে কাটিয়ে দিতে ওকে আগেও দেখেছি।
টিভি জিনিসটা আমাদের বাড়িতে একটু কমই চলে। মাঝে মধ্যে চললেও খবরের চ্যানেল একেবারেই নয়। ফেলুদা ও বাবা দুজনেই খবরের কাগজটা গুছিয়ে পড়াতেই বেশি বিশ্বাসী। রেডিওর খবর মিস করে গিয়ে, সেবার তো যক্ষীর মাথাটা বেহাতই হয়ে যাচ্ছিল আমাদের। নেহাত সিধু জ্যাঠা এসে খবর দেয়ায় রক্ষে। এখন অবিশ্যি মনে হয়, সেদিন সিদিকপুরে একটু দেরি করে না পৌঁছলে মূর্তির মাথাটা হয়ত হাতে এসে যেত, আর তাহলে গোটা কৈলাস মন্দির দেখাটাই মিস হয়ে যেত আমাদের।
কদিন ধরেই অভ্যেস পালটিয়ে ফেলুদা বারবার নিউজ চ্যানেল খুলছে, আর উশখুশ করছে দেখেই মনে হচ্ছিল, বিপাকে পড়া মানুষদের জন্য কিছু একটা করার কথা মাথায় ঘুরছে। দুপুর বেলা কী সব শব্দ শুনে ঘরে গিয়ে দেখি ফেলুদা ইউ টিউব দেখছে।!ব্যাপারটা আমার কাছে খুব আশ্চর্যজনক মনে হওয়াতে, কাছে গিয়ে দেখি, সিনেমা টিনেমা নয়, ফেলুদা ইউ টিউব দেখে দেখে অনলাইন টাকা পাঠানোর কায়দা গুলো শেখার চেষ্টা করছে। এটা আমি ভালই জানি, তাই নিজেই বুঝিয়ে দুয়েকটা অ্যাপ নামিয়ে রাস্তাগুলো দেখিয়ে দিলাম। ড্রয়ার খোলার আওয়াজ পেয়ে একটু বাদে বুঝলাম, প্রায় অব্যাবহৃত এটিএম কার্ড গুলো বার করা হচ্ছে। সন্ধ্যেবেলায় বেশ হালকা মেজাজে টিভির একটা জিংগলের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে ফেলুদা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে যা বলল, সেটা এই লকডাউনের ব্যাপার না হলে কখনও শোনা যেত কী না সন্দেহ। “সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যাট্রাকশন গুলো কাটিয়ে থাকতে পারলে, স্মার্ট ফোনের মত কাজের জিনিস খুব কমই আছে রে!”
“কিন্তু তুমি তো মোবাইল ফোনই নিতে চাইতে না! বলতে যখন তখন যেখানে সেখানে লোকে আমায় ফোন করে বিরক্ত করবে, সেটা আমার বরদাস্ত হবে না?”
“সেটা এখনও বলছি। বিশেষ করে তোকে আর জটায়ুকে। মামলার একটা মোক্ষম জায়গায় অনেক সময় আত্মগোপন করার প্রয়োজন হয়। তখন যদি খামকা ফোন করে ‘কোথায় আছ’ জিগ্যেস করে গোলমাল পাকাস, তাহলে বয়স যাই হোক না কেন, ফের রামগাঁট্টা খাবি, বলে রাখলাম। তবে যদি পকেট ক্যালকুলেটর বা সেবার হংকং থেকে কেনা পকেট রেকর্ডারটার কথা ভাবি, তাহলে প্রায় সব যন্ত্র একসঙ্গে পকেটে পুরে ফেলাটা মোটেই মন্দ নয়।“
“তোমার অ্যাপ এর কাজটা হল?”
“পি এম কেয়ারসে কয়েক হাজার টাকা পাঠিয়ে এখন একটু হালকা লাগছে। যদিও এদের কাজকম্ম আমার পছন্দ নয়, তবে বর্তমান অবস্থায় এক সরকারের পক্ষেই কিছু করা সম্ভব। সেক্ষেত্রে, যাতে টাকাপয়সাটা বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেটা দেখাটা আমাদের আশু কর্তব্য ।“
“আরও একটি লোককে কিছু টাকাপয়সা ডোনেট করতে ইন্সপায়ার করব ভাবছি। সেটা তিনি কেমন ভাবে নেবেন, সেটাই প্রশ্ন।“
এটাও একটু অবাক হবার মতই। এসব ডিসিশন নিতে ফেলুদার বড় একটা সময় লাগতে দেখিনি। আর আমার সাথে আলোচনার তো প্রশ্নই আসে না।
বলতে বলতেই এক ঝটকায় উঠে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে ডায়াল করল ফেলুদা। ওপাশ থেকে চেনা গলায় “ বলুন মশাই” শুনে বুঝলাম আমার আন্দাজ ঠিক। লোকটি জটায়ু। ভদ্রলোকের ট্যাঁকের জোর ফেলুদার চেয়ে অনেক বেশী। তবে ডোনেট করতে রাজী হবেন কী না, জানি না। এমনিতে বেশ কনযুশ। তবে ফেলুদার কথা হয়ত ফেলতে পারবেন না। ভাবতে ভাবতে আমি বই এর তাকের দিকে এগোলাম। ফেলুদা পরশুই আমায় হুমকি দিয়ে বলেছে এই লকডাউনের ফাঁকে ফেলুদার পুরনো নীল ডাইরি গুলোর সব কটা খুঁজে বার করে সাল তারিখ অনুযায়ী পরপর সাজিয়ে রাখতে। “সাত দিনের মধ্যে না হলে কিন্তু ফল ভাল হবে না, মনে রাখিস।“ এমনিতেও এই কাজে আমার আপত্তি নেই। এই সুযোগে সেই পুরনো বিখ্যাত মামলার নোটগুলোতে চোখ বোলাতে ভালই লাগবে।
লালমোহন বাবু কোভিড-১৯ এর মোকাবিলায় সামিল হলেন কী না, সেটা আর জানা হল না। পরে জিজ্ঞেস করে নিলেই হবে ভেবে হাতের কাজে মন দিলাম।
[3]
বাবাও যে এরই মধ্যে সরকারী খাতে ডোনেট করার কথা ভেবেছিলেন এবং এক বন্ধু কে বলে তার ব্যবস্থাও করেছেন, সেটা জানতাম না।আমাকে বললেই হত, কিন্তু সেদিকে আবার আপত্তি আছে। ব্যাপারটা জানতে পারলাম যখন পরের দিন সকালে খবরের কাগজ পড়ে চোখ কপালে তুলে বললেন, “দেশের এই অবস্থাতেও ভুয়ো সাইট খুলে লোকে টাকা চুরি করছে? এসব শয়তানদের শায়েস্তা করবে কে? সরকারের তো সেরকম ইচ্ছে আছে বলে মনে হয় না। আর ফেলুর মত গোয়েন্দাই বা কজন আছে ওদের দফতরে? আমিও তো না ভেবেচিন্তে ভাল কাজে দিচ্ছি ভেবে ফস করে কিছু টাকা পাঠিয়ে ফেললাম।”
“ভালই তো করেছ। তবে ছেলেকে একবার বলে করতে পারতে। ওরা ওসব বোঝে ভাল। বিপদ আপদের ভয় থাকে না“, বললেন মা।
“ফেলুর কথা শুনেই তো করলাম। ওর তো সেরকম কোন কেস হাতে নেই শুনছি। তাতে ও যদি ডোনেট করতে পারে তো আমি পেনশনার হয়ে পারব না?”
“ফেলু বলেছে? তাহলে জেনেশুনেই বলেছে। ভয়ের কিছু নেই। কাগজে তো কত হাবিজাবিই লেখে।”
সত্যি বলতে কী, খবরটা আমার চোখে পড়েনি।খুবই ছোট্ট করে বেরিয়েছে। বাবা বিরক্ত হয়ে কাগজটা ভাঁজ না করেই উঠে গেছেন বলেই সেটা চট করে নজরে এল। নইলে নয়ের পাতার বাঁয়ের কোণের এই পুঁচকে খবরটা খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। “পি এম কেয়ার এর নকল সাইট খুলে জালিয়াতি, ধৃত এক” দেখে সত্যি মাথায় রক্ত চড়ে যায়। ফেলুদাকে বলব ঘরে ঢুকতে গিয়েই শুনি সিধু জ্যাঠার গলা। ফোনের ওপার থেকে যেটুকু কানে এল, তাতে মনে হল এই ব্যাপারেই কথা হচ্ছে। “প্লেগের সময়ও কিন্তু ভুয়ো ক্লাব গড়ে, চাঁদা তুলে, টাকা মেরে দেয়া হয়েছে, আর সে খবর কাগজেও বেরিয়েছে। চুরির কায়দাটা পালটালেও, মনোভাব আর ধাঁচটা কিন্তু একই আছে ফেলু! এ নিয়ে, এই অবস্থায় তুমি বেশিদূর এগোতে পারবে বলে তো মনে হয় না। আর আমি তো তোমার বিশেষ কাজেও লাগবনা এসব বিষয়ে। এসব হ্যাকিং এর কায়দা কানুন জানা- বোঝা আমার সাধ্যির বাইরে”।
“ঠিকই। ব্যাপারটা বরদাস্ত করা মুশকিল। কিন্তু এসব ব্যাপারে পুলিসই বেস্ট। আমার পক্ষে এগোনোটা মুশকিল।”
এগোতে অবশ্য পরে হল। কেন হল, সেটা বলার আগে একথাটা জানিয়ে রাখি যে ফেলুদার কথায় জীবনে সম্ভবত প্রথমবার লালমোহন গাঙ্গুলি এক কথায় ৫,০০০ টাকা দিয়েছিলেন ত্রাণে। আর গোলমালটা সেখান থেকেই শুরু হল।
লালমোহন বাবুর এবারের ফোনটা এল রাত একটায়। হলটা কী ভদ্রলোকের ? ফেলুদা চিরকালের মতই তড়াক করে উঠে ফোন ধরল। লালমোহন বাবু কী বললেন জানি না। ফেলুদার মুখ এই ভাবে লাল হয়ে উঠতে আমি শেষ দেখেছি বোধহয় কাঠমান্ডুতে, যখন মগনলালের এল এস ডির প্রভাবে জটায়ু সারারাত আবোল তাবোল বকছিলেন। কী হয়েছে জিগ্যেস করাতে মুখে কিছু না বলে ইঙ্গিতে আমায় শুয়ে পড়তে বলে টেবিলে গিয়ে বসল। আওয়াজ শুনে বুঝলাম কম্পিউটার অন হল।
পরের দিন সকালে একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙল একটা চেঁচামেচির শব্দে। বাবা সকালে উঠেই ফোন অন করে একটা এস এম এস পেয়েছেন যে ওঁর অ্যাকাউন্ট থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ডেবিট হয়েছে। তাড়াতাড়ি করে উঠতে উঠতেই দেখি ফেলুদাও দরজা খুলে বেরোচ্ছে। মনে হল, ওর কাল সারারাত জাগার প্রয়োজন হয়েছে, যদিও যথারীতি এখন দাড়ি কামানো, স্নান সারা, শুধু এমনিতে এত বেলা অবধি ওর দরজা বন্ধ থাকে না। ফেলুদার প্রশ্নের জবাবে বাবা মাথায় হাত দিয়ে বসে জানালেন গতকালই উনি একটা এন জি ও তে কিছু টাকা দিয়েছিলেন, আর রাতেই এই কাণ্ড।
ফেলুদার বিখ্যাত ভ্রুকুটি দেখে প্রথমবার মনে হল একটু অসহায় বোধ করছে। খুবই রাগ হল যারা এরকম ক’রে লোকের ভালোমানুষির সুযোগ নিয়ে তার টাকা হাতাতে পারে সে সব শয়তানদের কথা ভেবে। আবার মায়াও হল ফেলুদার কথা ভেবে, যে এরকম পরিস্থিতে ওকে কক্ষনও পড়তে হয়নি। এ ব্যাপারে, এই লক ডাউনের মধ্যে কীই বা করা সম্ভব ওর পক্ষে! চোর যদি দূরে কোথাও বা বিদেশে বসে টাকা হাতানোর কৌশল জানে, সেখানে প্রাইভেট ইনভেসটিগেটরের পক্ষে আর কতটুকুই বা এগোনো সম্ভব? তদন্ত করে যদি চোর কে চেনাও যায়, তাকে শাস্তি দেবে কী করে ফেলুদা? এই লকডাউনে চোরের পিছুপিছু হিল্লি দিল্লী করাও তো অসম্ভব! শেষ পর্যন্ত কী কাছের লোকের টাকা চুরি করে ফেলুদাকে টেক্কা দিয়ে বেরিয়ে যাবে চোর? আর দেশের এই অবস্থায় ত্রাণের নামে টাকা চুরির মত শয়তানী মতলব ফেঁদেছে যারা, তারা বেঁচে যাবে? ফেলুদা এর একটা হিল্লে করতে পারবে না?
হঠাৎ মনে পড়ল কাল অত রাতে লালমোহন বাবু ফোন করে কী বললেন, জানা হয়নি। ফেলুদার থমথমে মুখ দেখে সাহস হচ্ছিল না, তাও থাকতে না পেরে শেষমেশ জিগ্যেস করেই ফেললাম।
[4]
“কালকের রাতে জটায়ুর ফোনের কথা জানতে চাইছিস তো ? - ব্যাপারটা একই। জটায়ুর অ্যাকাউনট থেকেও টাকা চুরি হয়েছে কাল রাতে। অংকটাও বড়।”
থমথমে মুখে বলল ফেলুদা। চোয়াল আর চিবুকের ভাব দেখে আর জিগ্যেস করতে সাহস হল না যে, কত টাকা।
“বুঝতেই পারছিস, এখন দায়টা সম্পূর্ণ ফেলু মিত্তিরের। যদিও আজ সকালে আবার ফোন করে বলেছেন যে উনি টাকার শোকটা অনেকটা সামলে উঠেছেন, এমনকি এই চুরির ধাঁচ থেকে একটা দুর্দান্ত প্লটও পেয়েছেন, ঠিকঠাক নামাতে পারলে টাকার ক্ষতিও হয়তো অনেকটা পূরণ হয়ে যাবে- তবু দায়টা আছে, দায়টা থেকেই যাচ্ছে।”
কথা বলতে বলতেই আবার কম্পিউটারটা অন করল ফেলুদা। মুখের ভাবে বুঝলাম, এবার আমার অন্য ঘরে গিয়ে বসবার সময় হয়েছে। ও একটু একা ভাবতে চায়। আর ডিস্টার্ব করা চলবে না। উঠে এগোতে যাচ্ছি। ফেলুদা এসে দরজাটা বন্ধ করতে করতে বলল।
“বলা হয় নি। লালমোহন বাবুর লোকসানের অঙ্কটা তিন লাখ!”
এর পরের তিন দিন ফেলুদা কাটাল কম্পিউটারে, ফোনে কি জানি কি পড়ে, আর খাটে শুয়ে মাথা চিতিয়ে সিগারেট খেয়ে, ঘরের মধ্যে আর ছাদে পায়চারি করে, আর, ও হ্যাঁ, অনেকগুলো ফোন করে। তিনদিনের দিন রাতের দিকে দেখলাম ডাইরিতে কি সব লিখছে। আরও রাতের দিকে আবার জটায়ুর সেই তিব্বতী কুক বুকটা নাড়াচাড়া করছে দেখে একটু অবাক লাগল, দুঃখও হল, ফেলুদা তাহলে এবার সত্যি হাল ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
“এই অনলাইন হ্যাকিং ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। যে লোকটি জটায়ু বা কাকার টাকা হাতিয়ে নিল, সে এই দুজনের একজনকেও না চিনতে পারে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চেনে না, কোন ব্যক্তিগত শত্রুতাও নেই। সে হয়তো কলকাতায় বা এমন কী ভারতবর্ষে কোনোদিন আসেনি বা আসবে না। হয়ত কাজাকস্তান কী ইথিওপিয়ায়, বা জটায়ুর হন্ডুরাসে বসে স্রেফ টাকাটা হাতিয়ে নিয়েছে। চোর টার্গেট কে চেনে না, বা কোন শত্রুতা নেই, এটা অবিশ্যি সাধারণ চুরি ছিনতাই এর ব্যাপারেও ঘটে, সেদিক থেকে দেখলে এর মধ্যে টেকনোলজি ছাড়া নতুনত্ব নেই। তবে, সে ক্ষেত্রে আবার চেনাশোনা দুজন ব্যক্তি, যারা আবার সরাসরি রিলেটেডও নয়, কিন্তু পরিচিত, তাদের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পরপর টারগেট করাটা কী সম্পূর্ণ কাকতালীয় ? অবিশ্যি এমনও হতে পারে যে প্রায় পরপর একইরকম বা এমনকি একই ভুয়ো সাইটে তারা টাকা জমা দেয়ায় পরপর চোরেরা দুটো চুরির সুযোগ পেয়েছে। এ ছাড়া এদের মধ্যে আর কোনও যোগসূত্র নেই। দুজন ভিকটিমই এসব ব্যাপারে নভিস, জীবনে প্রথমবার এরকম লেনদেন করছে এটাও আবার একটা মিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এসব সাইটে কয়েক মিনিটের হেরফেরে নিশ্চয় অনেক লোকের ফুটপ্রিন্ট পড়ে, তাহলে ... নাঃ, এসব ব্যাপারে আরও অনেকটা নলেজ না থাকলে এগোনো সম্ভব নয়।“
এর মধ্যে জটায়ু প্রায় দিনই ফোন করে বলেছেন ওসব নিয়ে মাথা না ঘামাতে। একদিন আমায়ও বললেন, “জীবনে টাকা অনেক করিচি ভাই, আর তার পিছনে তোমার দাদারও কনট্রিবিউশনও কিছু কম নয়। আর এ চুরির জন্য দায় তো চোরের, ওনার তো নয়। উনি তো ভাল ভেবেই বলেছিলেন! ইদানীং দেখছি একটু কেমন যেন আনরিজনেবল হয়ে যাচ্ছেন। আর আমিও তো গিয়ে পড়তে পারছি না ওদিকে। হরিপদও আন-অ্যাভেইলেবল, আর তোমাদের প্রতিবেশিরাও যে কি ভাবে নেবেন আমার যাওয়াটা জানি না। এত বছর যাচ্ছি তোমাদের ওখানে, আজ এটাও মাথায় রাখতে হচ্ছে। ভাবতে পার? তুমি একটু নজর রেখ দাদাটির ওপর। বোলো ব্যাপারটা মন থেকে মুছে ফেলতে।”
সত্যিই ভাবা যায় না। লালমোহনবাবু রজনী সেন রোডে আসতে ভয় পাচ্ছেন, ফেলুদার ওপর নজর রাখতে বলছেন আমাকে, এ দু মাস আগেও কল্পনা করা যেত না। আমার অবিশ্যি এত কথা ওকে বলার সাহস আজও নেই। এমনিতেও যা ফেরোশাস মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, বাবা মাও চট করে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছেন না। আমি তো নয়ই।
যে কনফিউশনটা ফেলুদাকে ভাবাচ্ছিল, তা এর পরের দিন যে ভাবে কাটল, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, মনে হয় ফেলুদাও না। এমনিতেই এখন শহরে লোকের চলাচল কম, আমাদের পাড়ায় তো আরওই কম, সন্ধ্যে সাতটার সময়ে মনে হয় রাত দুপুর। তাড়াতাড়ি মা-ও খাবার পাট মিটিয়ে দিচ্ছেন, আমরা তিন জনে পালা করে বাসন মাজছি আর মা খুঁতখুঁত করে আবার সেগুলো ধুতে গিয়ে বাবার বকুনি খাচ্ছেন। শুতেও যাচ্ছি তাড়াতাড়ি। যদিও ঘুম আসছে না।
এরই মধ্যে রাত এগারোটায় বাইরের ঘরে এসে একটা বই এর পাতা উলটোচ্ছি, ফেলুদা পাশের সোফায় ওর বিখ্যাত পজিশনে বসে সবে একটা সিগারেট ধরিয়ে হাতের খাতায় কি যেন টুকটাক নোট করছে, হঠাৎ একটা অচেনা নম্বর থেকে আমার ফোন আসায় বেজায় চমকে গিয়ে ধরলাম। ‘হ্যালো’ বলে ওপার থেকে যে গলার আওয়াজ শুনলাম, তাতে আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে যাচ্ছিল। ফেলুদা সোফায় বসে থাকা অবস্থায় যে ভাবে ঝুঁকে পড়ে ক্যাচটা ধরল, তাতে বোঝা যায়, এক কালের ক্রিকেটের চর্চাটা এত বছর বাদেও কাজ দিচ্ছে। ওর হাতে ধরা ফোন থেকেই শুনতে পেলাম,
“ আঙ্কলের টাকাটা শেষমেষ আমার হাতেই এসে গেল মিস্টার মিটার! সেটাই বলতে যাচ্ছিলাম কাজিনকে। আপনি পুরনো ফ্রেন্ড, তাই আমার আঙ্কলের সঙ্গে সঙ্গে আপনার আঙ্কলেরও কিছু টাকা সরিয়ে নিলাম। ফেয়ার এক্সচেঞ্জ, কী বোলেন? তিন তিন বার আমার হাতের শিকার আপনি কেড়ে নিয়ে গেলেন, ফোরথ টাইম আমি ওভার ট্রামপ করে দিলাম আপনাকে। আপনি ব্রিজ খেলা জানেন তো মিস্টার প্রাইভেট ইনভেসটিগেটর?”
একটা হাসির শব্দ ছড়িয়ে ফোনটা কেটে গেল। সঙ্গে সঙ্গে রিং ব্যাক করে দেখা গেল “ফোন আউট অফ রীচ”।
[5]
ফেলুদা বলেছিল, এবারকার মামলার বিষয়ে কিছু লেখার সময় পাঠককে আগেভাগেই জানিয়ে রাখবি যে আসল ঘটনাগুলোর সময় তুই উপস্থিত ছিলি না। সবই আমার মুখ থেকে শোনা। জটায়ু অনেক কেসেই নেই, সেটা পাঠক জানে। কিন্তু যে সব কেসে তোকে বালক জ্ঞান করে সঙ্গে নিয়ে যাইনি, যেমন চন্দননগরের সেই জোড়া খুনের মামলা, তা নিয়ে তুই স্বাভাবিক ভাবেই লিখিস নি। এবারে কিন্তু লিখছিস, শুধু শুনে। সেটা একটা বড় গোলমাল। সেটা যেন পাঠক শেষে গিয়ে হটাৎ না জানে।
অবিশ্যি একদম গোড়াতেই সেটা লিখলে গপ্পো জমত না, আবার শেষের জন্য ফেলে রাখলেও ফেলুদার ধমক বাঁধা, তাই মাঝেই বললাম। আমার আর লালমোহনবাবুর ভুমিকা এখানে শোনার। সত্যি বলতে কি, ফেলুদাকে নিয়ে এতটা চিন্তায়, আর এতদিন ধরে, আগে কখনও পড়তে হয়নি।
এই কাহিনীর দ্বিতীয় পার্ট শুরু হল পরের দিন সকালে। একটু বেলা করেই উঠে যোগ ব্যায়াম করছি, মা ঘরে ঢুকে তুলে দিয়ে বলল, এখনও ব্যায়াম করছিস? ওদিকে ফেলুকে পাওয়া যাচ্ছে না। বলে কি? তড়াক করে উঠে গিয়ে দেখি বাইরের ঘরে চায়ের টেবিলে একটা ছোট্ট চিরকুট। “ফোন করে ডিস্টার্ব করবি না। আমি যোগাযোগ করব সময় বুঝে।”
ফেলুদার বহু বিখ্যাত মামলার আসল নাটকটা শুরু হয়েছে কোন একটা খুন বা নিখোঁজের খবর দিয়ে। চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে অনেক সময় ফেলুদাও আত্মগোপন করেছে, কিন্তু শুরুতেই গায়েব হবার দরকার পড়েনি কখনও। এই অবস্থায় গা ঢাকা দিয়ে ও কতদূর কী করতে পারবে কে জানে ! ভাবতে গিয়ে মনে হল, ভিলেন কে, সেটাও আমরা জানি, এমনকি সে নিজেই সেটা জানিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে, প্রশ্ন হল তাকে ধরা যাবে কী যাবে না, এরকমও এর আগে কখনও হয়েছে কী? এরকম বেয়াদবি বরদাস্ত করার লোকই ফেলুদা নয়। সেরকম হলে ও গোয়েন্দাগিরিই ছেড়ে দেবে।
ফেলুদার মত করেই মন শক্ত করে ভাবার চেষ্টা করলাম এ অবস্থায় কী রাস্তা নিতে পারে ও। সারাদিন ধরে পায়চারি করে, আঙুল মটকে, খাটে শুয়ে মাথা চিতিয়ে ছাদের দিকে চেয়েও কিচ্ছু মাথায় এল না। করব না করব না করেও শেষ পর্যন্ত জটায়ুকে ফোন করেই ফেললাম। “বল কী ভাই তপেশ ? নাহ, তোমার দাদা ভুল করলেন। বড্ড ভুল করলেন।”
পরপর তিনদিন সারাদিন অপেক্ষা করেও ফোন এল না দেখে, আর না পেরে ‘যা থাকে কপালে’ বলে ফেলুদার নাম্বারে ফোন করেই ফেললাম। এমনিও আশা করিনি ধরবে বলে। যান্ত্রিক কণ্ঠস্বরে প্রথমে শুনলাম বলছে নেটওয়ার্ক সীমার বাইরে। আবার করে শুনলাম ” নম্বর ব্লক করা হয়েছে। এখন আর কিছুই বলছে না। এটা শুনে বাবাও মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লেন। “দাদার মতো ডাকাবুকো হয়েছে বলে আগে গর্ব করতাম। এখন দেখছি সাহসটা হঠকারিতার জায়গায় পৌঁছে গেছে। এই সময় এরকম বেপরোয়া হওয়াটা স্রেফ নির্বুদ্ধিতা।”
খবর শুনে একমাত্র সিধু জ্যাঠাই দেখলাম নিশ্চিন্ত। “অন্ধকারে জানলা বন্ধ করে বসে থাকা ওকে মানায় না তপেশ, ওকে মানায় না । ও আলোর সন্ধানেই গেছে। চিন্তা কর না। অপেক্ষা কর। এই কদিন তোমার হোম টাস্ক হল খবরে চোখ রাখা।”
তাই করছিলাম, মানে করার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু মনের চাপটা ক্রমেই বাড়ছিল। লালমোহনবাবুও রোজই নিয়ম করে ফোন করেন আর এই অন্তর্ধানের ঘটনার নতুন নতুন বিশেষণ দেন।
একদিন বললেন “গাড়িটা নিয়ে একবার বেনারসের দিকটায় যেতে পারলে ভাল হত ভাই। আমার পাবলিশারকে বললে ওপর মহলের পারমিশন হয়ত হয়ে যেত, কিন্তু ওদিকে হরিপদর বাড়ির পাশেই কনটেনমেনট জোন শুনে সাহস পেলুম না। খবর পেলে সঙ্গে সঙ্গে একটা রিং কোর । বড় চিন্তায় আছি।”
লালমোহনবাবু বেনারস গিয়ে পড়লে ফেলুদার কতটা হেল্প হত সন্দেহের ব্যাপার । হয়ত সমস্যাই বাড়ত । কিন্তু সে কথা তো আর ওঁকে মুখের ওপর বলা যায় না ! তাও বাধ্য হয়ে বলতে হল, মগনলাল যে সেই বেনারসের গলিতেই আটকে বসে আছে সে সম্পর্কে অত শিওর হওয়া মুশকিল। জটায়ু অবিশ্যি জোরালো ভাবে অপোজ করে বললেন “সে যতই তুমি কাঠমান্ডুর কথা বল না কেন, ওই বেনারসের গলির ঘাঁটির বাইরে ও লোক বাঁচবে না।”
হতেও পারে। তবে আমি অতটা নিশ্চিত হতে পারছি না। যে লোক এভাবে অন লাইনে টাকা চুরির প্যাঁচ পয়জার শিখে নিতে পারে, সে এখনও লোক দিয়ে গলিতে নিরীহ লোককে ছুরি মারার স্ট্যান্ডার্ডে পড়ে থাকবে এটা মেনে নেয়া মুশকিল । এখন সে হংকং এ পঞ্চাশ তলা কাচ ঘেরা অফিসে বসবে এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ফেলুদা গেল কোথায়?
[6]
এর পরের দশ দিনের গল্প আর ডিটেলে লেখার মানে হয় না, কারণ সবই থোড়- বড়ি- খাড়া আর খাড়া- বড়ি- থোড় । খালি প্রত্যেকটা দিন যাবার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ বাড়তে বাড়তে শেষমেশ একটা হতাশার ভাব এসে যাচ্ছিল। ফেলুদা বাড়ি থেকে নিজের ইচ্ছেয় বেরিয়েছে ঠিকই, কিন্তু, এখনও অক্ষত আছে কী না, থাকলেও নিজের ইচ্ছেয় চলতে পারছে নাকি মগণলালের গুণ্ডাদের হাতে ধরা পড়েছে, সে ব্যাপারেও সাত – পাঁচ ভেবে কোন কূল কিনারা করতে পারছিলাম না। যতবারই ভাবছি এরকম বেয়াড়া পরিবেশে পুরনো শত্রুর হাতে ধরা পড়বার পরিণতি কী হতে পারে, ততবারই পেটের ভেতরটা কেমন নড়েচড়ে উঠছে। ফেলুদা উপস্থিত থাকলে মনের জোরের এরকম অবস্থা দেখে কষে ধমক দিত জানি, কিন্তু সেটা ভেবেও দুর্ভাবনাটা কমাতে পারছি না। বাবা একদম ভেঙে পড়েছেন, মা-ও ভীষণ উৎকণ্ঠায়। রোজ ফোনে জটায়ুর সঙ্গে কথা বলা ছাড়া আর তো করবার কিছু নেই- আর দু – তিন দিন অন্তর সিধু জ্যাঠাকে একটা ফোন। সিধু জ্যাঠা তো বরাবরই দেখছি খুব আশাবাদী। এমনকি জটায়ুও আমার মত অতটা ঘাবড়ে যান নি দেখে তাও মনটা একটু শান্ত হচ্ছে।
এর মধ্যে বলবার মত ঘটনা বলতে বাবার আর সহ্য করতে না পেরে ওঁর এক বাল্য বন্ধুর চেনাজানায় কলকাতার পুলিশ কমিশনার কে জানানো আর পরদিন মুখোশ-পরা এক পুলিশ থানা থেকে এসে কেস লিখে নিয়ে যাওয়া। মিসিং ডায়েরি। ভাবতে কষ্ট হচ্ছিল যে, যে ফেলুদা পুলিশকে কতবার টেক্কা দিয়েছে, এবারে তারই নামে ডায়েরি হল। পুলিশ তাকেই খুঁজে বের করার দায়িত্ব নেবে। লোকাল থানার মেজবাবু, নাম বললেন অচিন্ত্য মণ্ডল, তো দস্তুরমত ঠেস দিয়েই বললেন, প্রাইভেট ডিটেকটিভ ব্যাপারটা এখন আর চলে না মশাই। ও বড়োজোর বউ এর পিছনে নজরদারি, কিম্বা বরের পরকীয়ার জোগাড়ের কাজে লাগে। এখন অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার, যন্ত্রপাতি, অনেক সায়েন্টিফিক ট্রেনিং এর ব্যাপার এসে গেছে। মিত্তির মশাই ওসব কোথায় পাবেন! উল্টে, খোঁজ পাওয়া গেলে ওঁর নামেই আমাদের হয়ত লক ডাউন ভেঙে বেরোনোর চার্জ দিতে হবে। মানে, মহামারী অ্যাকট্ বুঝলেন না ? কি মুশকিল বলুন তো, হে হে হে। ওঁর অবিশ্যি ওপর মহলে সব চেনা শুনো, হয়ত পার পেয়ে যাবেন।”
মাঝে, সত্যি বলতে কি, একটু রাগই হচ্ছিল। প্রত্যেকবার নিখোঁজ হবার পর, কোন না কোন ভাবে ঠিক যোগাযোগ রেখেছে। আমাদের খুব বেশীক্ষণ টেনশনে থাকতে হয়নি। এবারে হটাত এত বেনিয়ম কেন? এতদিনে একবারও একটা ফোনও কী করতে পারত না ? এরপরে স্বাভাবিকভাবেই যে ভাবনাটা আসে সেটাকে সরাতে নেটফ্লিক্সে আরেকবার বিবিসির নতুন শারলক হোমস দেখার চেষ্টা করলাম। আগে কয়েকটা দেখেছি, তখনও মনে হয়েছে, এবারও মনে হল, কাম্বারব্যাচ জেরেমি ব্রেটের প্রভাব সম্পূর্ণ কাটাতে পারেনি। মন্দ হয়ত নয়, কিন্তু কয়েকবার আগুপিছু করে বুঝলাম, চেনা গল্পগুলোও গুলিয়ে ফেলছি। মাথা কাজ করছে না।
দিনগুলো একই রকম মনখারাপে কাটছিল, এর মধ্যে লক ডাউন একটু শিথিল হতেই একদিন জটায়ু এসে হাজির। নাকের তলায় আর কানের পাশে কালো ছোপ দেখে বুঝলাম উপায়ান্তর না দেখে নিজের হাতেই কলপ করেছেন। ফেলুদা হলে হয়ত আরও সাত রকম বদল নজর করত। আমিও এমনিতে হলে এর চেয়ে বেশি পারতাম, কিন্তু এখনকার কথা আলাদা। জটায়ু এসে খানিকক্ষণ নানা প্রসঙ্গ তুলে আমার ঠিকঠাক জবাব না পেয়ে হটাত বললেন, চল তপেশ, এখন তো আর গাড়িঘোড়া চলায় অত বিধিনিধেধ নেই, একবার গঙ্গার হাওয়া খেয়ে এলে মনটা তরতাজা হবে। আমার মনে হয়, তোমার দাদা কিছু একটা ফন্দী এঁটে গা ঢাকা দিয়েছেন। সময় মত ঠিক উদয় হবেন। মিথ্যে দুশ্চিন্তা করে লাভ নেই।”
আমার অবিশ্যি বেরোনোর বিশেষ ইচ্ছে ছিল না। এমনিতেও এখন বেরতে গেলে মুখোশ পরো, স্যানিটাইজারের বোতল পকেটে পোরো, সব মিলিয়ে নানান হ্যাপা। তাও, হাতে কোন কাজ নেই, বাড়িতে বসে থাকলে টেনশন আরও বেড়ে যাবে বোলে রাজী হলাম। গাড়িতে উঠে জটায়ু বেশ সায়েবী মেজাজে ‘প্রিন্সেপ ঘাট’ বলে হাঁক দিতে মনে হল, ওঁর মনে অম্বর সেন অন্তর্ধান রহস্যের ক্লাইম্যাক্সটা ঘোরাঘুরি করছে। সামনে তাকিয়ে হরিপদ বাবুকে না দেখে জটায়ুকে জিগ্যেস করলাম ভদ্রলোকের খবর কী। “বোলো না ভাই, জ্বরজারি নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিল, টেস্ট না করেই সিধে কোয়ারানটাইন সেন্টারে পাঠিয়ে দিয়েছে। রোগ তো নয়, এদের এই চিকিচ্ছে ব্যাবস্থাকেই ভয় হয়, হূঃ। এখন বাধ্য হয়ে পাড়ার ড্রাইভার সেন্টারেই বলছি, যে দু এক দিন গাড়ি লাগছে ।”
নতুন লোকটাকে একবার দেখে নিতে গিয়ে দেখি চোখ দুটো কীরকম যেন খুনির মত। আয়নার মধ্যে দিয়ে আমার দিকেই তাকাচ্ছিল বলে একবার চোখাচোখি হয়ে গেল। ব্যাপারটা ঠিক সুবিধের লাগল না । অগত্যা গাড়িতে আর কিছু কাজের কথা বললাম না। লালমোহন বাবুও, মনে হল, আসলে মনমরা হলেও, জোর করেই আমার সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছেন।
প্রিন্সেপ ঘাটের দরজা স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ। বাবু ঘাটের দিকটায় গঙ্গার ধারে গাড়ি লাগিয়ে নেমে দেখি জায়গাটা একদম থমথম করছে। একমাত্র বৈকুন্ঠপুর ফরেস্টে ছাড়া এরকম নিস্তব্ধতা আর দেখেছি বলে মনে করতে পারছি না। শহরে তো নয়ই। এমনকি মাঝরাতের গোরস্থানেও এর চেয়ে বেশী শব্দ ছিল।
বলব কি বলবনা করে শেষ পর্যন্ত দ্বিধা কাটিয়ে লালমোহন বাবুকে যে চিন্তাটা মাথায় ঘুরছিল সেটা বলেই ফেললাম।
[7]
গাড়ির চালকটিকে অত্যন্ত সন্দেহজনক মনে হওয়াতে, একটু দূরে গিয়েই দাঁড়িয়ে নীচু গলায় জটায়ুকে যে কথাটা বললাম সেটা একটু আগেই মাথায় এসেছে। এই অচেনা লোকটি মগনলালের স্পাই হতে পারে না কি? হয়ত আরও কেউ কেউ আমাদের ওপর নজর রাখছে। মগনলালের হুমকির ব্যাপারটা জটায়ুকে জানালেও এর আগে বাড়িতে বসে ফোনে সমস্ত ডিটেলটা ইচ্ছে করেই বলিনি, বাবা মা শুনতে পেলে আরও বেশী ঘাবড়ে যাবেন ভেবেই। সমস্তটা শুনে জটায়ুর মুখের চেহারা একমুহূর্তে পাল্টে গেল। উদ্বেগে না গঙ্গার হাওয়ায় কে জানে, চুলের ঘাড়ের কাছের অংশটা উস্কোখুস্কো হয়ে গিয়ে ওঁকে অদ্ভুত খ্যাপাটে লাগছিল। পিঠটাও একটু ঝুঁকে পড়ল যেন। স্বাভাবিক। ওঁর পক্ষে মগনলালের হাতে বারবার নাজেহাল হওয়ার স্মৃতিটা ভোলা মুশকিল।
"তাহলে তো এবার আমরা ঘো-হো-র বিপদে তপেশ! অপোনেন্ট গমন - থুড়ি - মগনলাল, এদিকে তোমার দাদাটিও নি-হ্-খোঁজ, এখন তো কাউকেই বি-হি-শ্বাস করা যায় না।" মাথার চুলগুলো আঙ্গুল দিয়ে পাট করার সময় খেয়াল করলাম ওনার হাত কাঁপছে।
এরপর আর বেশী কথা এগোল না। বাড়ি ফিরে লিখব না, লিখব না করেও হোয়্যাটসঅ্যাপে জটায়ুকে লিখলাম, আপাততঃ বাড়ির বাইরে আর না বেরোতে। অন্ততঃ হরিপদবাবু সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত। এই মুহূর্তে কাউকেই বিশ্বাস করা চলে না।
আমার পরামর্শ যে জটায়ু সিরিয়াসলি নেন নি, সেটা বুঝলাম দিন চারেক পরেই যখন ফোন করে আসার কথা বললেন। মুখের ওপর আসবেন না বলতে পারলাম না ঠিকই, কিন্তু এদিকে অচেনা ড্রাইভার নিয়ে বেরোনর ঝুঁকি, ওদিকে উনিও বয়স্ক, এদিকে বাড়িতে বাবা মা-ও আছেন, কোভিডের সময় মেলামেশাটা বেশী করাটা ঠিক কী না ভাবছি, এরই মধ্যে কলিংবেল। এখন বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা এতটাই কম যে দিনদুপুরেও কলিংবেল বাজলে চমকে উঠতে হয়। মুখোশ টুখোশ এঁটে দরজা খুলে দেখি লালমোহনবাবু। বেশ একটু উত্তেজিত। হাত না ধুয়েই সোফায় বসতে যাচ্ছিলেন। বাধ্য হয়েই মনে করাতে হল। একটু লজ্জা পেয়ে হাত ধুতে গেলেন ঠিকই, কিন্তু আনমনে প্রায় না ধুয়েই বেরিয়ে এসে বললেন, "এই লকডাউনে তো সবার বাজার ডাউন যাচ্ছে শুনেছিলাম। সিরিয়াল-টিরিয়ালের শুটিং-টুটিংও না কি বন্ধ। ওটি মানে অপারেশন থিয়েটার জানতাম, ওটি প্ল্যাটফর্ম কাকে বলে জানো?"
এই সময়, এরকম একটা প্রশ্ন খুবই রহস্যজনক লাগলেও জটায়ুকে বুঝিয়ে বলে দিলাম যে ওটি নয়, ওটা হবে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে পয়সা দিয়ে গ্রাহক হলে দেশী-বিদেশী অনেক সিনেমা ও টেলিভিশন শো ইত্যাদি দেখা যায়। ভদ্রলোক ভাল করে না শুনেই বললেন, আমার পাঁচটা গল্প নিয়ে ওয়েসিরিজ না কী যেন করতে চায় এক প্রোডিউসর। ফোন নম্বর জোগাড় করে ফোন করেছিল তার সেক্রেটারি। নাকি কয়েক লাখ লোক দেখে? একবার লেগে গেলে নাকি হিউজ টাকাপয়সার ব্যাপার ? "ওভার দ্য টপ ইন মান এন্ড মানি, বোথ - অ্যাঁ!"
ভাল করে শুনে বুঝলাম ভদ্রলোক কোন এক বাংলাদেশী ওটিটির একটা ওয়েবসিরিজের প্রোডাকশন থেকে ফোন পেয়েছেন। ওঁর গল্প নিয়ে এক সিজন বানাতে চায় তারা। ভাষা বাংলা। তবে একবার লেগে গেলে হিন্দী, ভোজপুরী, তামিল, তেলুগু ও কন্নড়ে ডাবিং হবে। বেশ মোটাসোটা অ্যামাউন্টের ব্যাপার। ভদ্রলোক বেশ এক্সাইটেড।
প্রথমে একটু খটকাই লাগল। এই যে কাগজে দেখছি দেশে ব্যবসা বাণিজ্যের হাল খারাপ, লোকের হাতে টাকা নেই, তাহলে এ সময়ে এরকম অফার আসে কী করে? অবিশ্যি, লকডাউনে মানুষের মোবাইল দেখার হার নিশ্চয় বেড়েছে, লকডাউন ওঠার পরও যেহেতু পারলে বেশীর ভাগ বাড়িতে থাকতেই বলছে, হলে গিয়ে সিনেমা থিয়েটার দেখার সুযোগ নেই, তাই মোবাইলই ভরসা। এই অবস্থায় ওটিটির পৌষমাস ঠিকই। কিন্তু তাই বলে জটায়ুর গল্প? ওসব আজগুবি অ্যাকশন আজকের দিনে লোকে দেখবে? অবিশ্যি আজকাল কম্পিউটার গ্রাফিকসের সুবিধে হওয়াতে শুটিং এর ঝামেলা নিশ্চয়ই অনেকটা কমে গেছে।
"তোমার দাদা থাকলে একটু অ্যাডভাইস নিতুম হে। এসব কন্ট্র্যাক্ট অনেক জটিল আইনী ব্যাপার, আমাকে তো না বুঝে অন্ধের মতই সই করতে হবে।"
তা করুন। কিছুদিন আগেই টাকা লোপাট হবার শোক যে একরকম ভুলেই গেছেন হাবেভাবেই তা প্রকাশ পাচ্ছে। দুশ্চিন্তার মাঝে এটা অবশ্যই একটা ভাল খবর।
"এদিকে কোন মেসেজ টেসেজ পেলে তোমার দাদার? কোন সাংকেতিক খবর টবর?"
কিছু নেই, জানাতে খুব গম্ভীর হয়ে বললেন, "ঘরের কোথাও কিছু ফেলে যান নি তো?" জানলা দরজার ফাঁকে টাঁকে গুঁজে? ভাল করে নজর করেছ?
আমার সত্যিই ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছিল। এতদিন হয়ে গেল, কোথাও এতটুকু খোঁজখবর নেই, তাহলে কী খুব সাংঘাতিক কিছু হয়ে গেল? হামলা ওর ওপরে তো নতুন না, কপাল ও বুদ্ধির জোরে প্রত্যেকবারই বাজি ও জিতেছে, কিন্তুু একটু হলেও তো এবার বয়স হচ্ছে। কোথাও কি চালে ভুল করে বসল?
লালমোহন বাবু কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে, খানিক উশখুশ, উঠব উঠব করে, শ্রীনাথের দেয়া আরেক রাউন্ড চা খেয়ে সবে বেরিয়েছেন, এমন সময়, ঝনঝনিয়ে আমার ফোন বেজে উঠল। অচেনা নম্বর দেখেও খুব আগ্রহের সঙ্গেই ফোনটা ধরলাম।
[8]
যে গলাটা পাব আশা করে ফোন ধরলাম, সেটা নয়। এক মহিলা খুব সাহেবী মেজাজে বললেন ধরতে, কারণ স্যার কথা বলবেন। "কে স্যার?" প্রশ্নটা করার আগেই খুট। করে একটা শব্দে বুঝলাম কানেকশন হয়ে গেল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা চেঁচামেচির শব্দ, অনেকটা ক্যারাটে-কুংফু মার্কা, সঙ্গে ঝমঝমে সাসপেন্স মিউজিক, আবার সেটা ফেড আউট হয়ে চলে এল একটা চেনা গলা। "কী খোবোর কাজিন? মিস্টার মিটার শুনলাম নাকি মিসিং?" একটা বিশ্রী চুক চুক শব্দে বুঝলাম, এটা আক্ষেপ জানান হচ্ছে। "লালবাজারে নাকি ডাইরি হোলো উনার নামে? সেস পর্যন্ত গায়েব হয়ে গেলেন উনি এক্সট্রা-আর্ডিনারি বুদ্ধি নিয়ে, হাঁ? ইটা কি রোকোম হল? ইটা কি ভাল হল?" এরপর একটা শয়তানী হাড়জ্বালানি হাসি। কিছু বলার আগেই আরও চমক। "বাই দ্য ওয়ে, আংকল কি খোবোর দিয়ে গেলেন কুছ টাইম পেহলে? ভেরি ওয়াইজ অ্যান্ড নাইস ম্যান"।
আশ্চর্য, এই মিনিট পাঁচেকও হয়নি জটায়ু বেরোলেন, আর এরই মধ্যে শয়তান লোকটা তার খবর পেয়ে গেছে? বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের বাড়ির ওপর কড়া নজর রেখেছে। এমনকি, ফেলুদার মিসিং ডায়েরির খবরও জানে! এই দ্বিতীয় ব্যাপারটায় অবিশ্যি আজকের দিনে অবাক হবার কিছুই নেই। এ ধরণের ক্রিমিন্যালদেরই পুলিশে সোর্স থাকে এখন। আগে উল্টোটা হত। ফোনটা আবার হাতে নিয়ে জটায়ুকে ফোন করে খবরটা দিতে গিয়েও কি জানি ভেবে মাইন্ড চেঞ্জ করলাম। ভদ্রলোক একটু খুশিতে আছেন, এখনও নিশ্চয় রাস্তাতেই, এর মধ্যে আর ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। ভাবতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হল, লালমোহনবাবুর গাড়ি আজ কে চালিয়ে আনল, জানা হয়নি। রাতে ভাবনায় একটুও ঘুম হল না। সকালে যোগব্যায়াম করতেও ইচ্ছে হল না। অনেকদিন বাদে আজ ব্যায়ামটা ফাঁকি পড়ল। আর বকুনি দেবার লোকটাও যে নেই, সেটা মনে পড়ে আরও মনখারাপ হয়ে গেল। সকাল সকাল বেল বাজতে মনে হল, আবার জটায়ু এসে পড়লেন নাকি? উঁকি দিয়ে গাড়ি দেখতে না পেয়ে ভাবলাম বিগবাস্কেট থেকে জিনিসপত্র দিতে এসেছে। এমনিতে আমাদের বাড়িতে পাড়ার মোড়ের ভজুয়ার দোকান থেকেই সব মাসকাবারি আসে। এই লকডাউনের হ্যাপায় বিহারী ভজুয়া দেহাতে গিয়ে আটকে যাওয়ায় বাবা দূরের বাজারের মুদীর দোকানে লাইন দিতে যাচ্ছিলেন। বাবার বয়সে সেটা উচিত নয়, এদিকে আবার আমার বা ফেলুদার ওপর ভরসা নেই, তাই বাধ্য হয়েই অনলাইনে কেনাকাটার রাস্তা ধরতে হল। তাও প্রতিদিনই জিনিসের মাণ খারাপ, দাম বেশী, এসব অভিযোগ সহ্য করতে হয়। ঘন ঘন বেল বাজছে দেখে একবার মনে হল, ফেলুদা কি ফিরে এল? একছুটে গিয়ে দরজা খুলে দেখি মুখোশ-পরা, গলা-পর্যন্ত-দাড়িওলা এক বৃদ্ধ। একটু থতমত খেতে খেতেই হাতের ইয়া মোটা ডান্ডাওলা সেকেলে কালো ছাতাটা দেখে চিনতে পারলাম সিধুজ্যাঠাকে। হইহই করে ঢুকে একটানে মুখোশ খুলে বললেন, "চিনতে না পারলে অবজার্ভেশনে অ্যাদ্দিন যা নম্বর দিয়েছি সব কেটে শূন্য বসিয়ে দিতাম। চুলদাড়ি বেড়েছে - আমার নাপিতব্যাটা, বহুকাল ধরে রোববার করে বাড়ি এসে দাড়ি কামিয়ে দিয়ে যায়, মাসে একবার করে চুল, সে লকডাউনে নিখোঁজ হওয়ায়। নিজের হাতে কামানো ছেড়েছি নাইন্টিটুতে, একটু একটু হাত-কাঁপা শুরু হওয়ায়, অবিশ্যি বয়সের সাথে সাথে হাতের জোর কমলেও, দাড়ির গ্রোথ যে কমে না, এইটে নিজেকে দেখে বেশ বুঝতে পারছি। এটা কোন বইয়ে লেখে না, যদিও পরে মনে হল, আমাদের রবীন্দ্রনাথকে দেখে সেটা বোঝা উচিত ছিল। এখন অবিশ্যি দাড়িটা বেশ এনজয়ই করছি। সেকালের মুনি-ঋষিরাও তো লম্বা লম্বা দাড়ি-গোঁফ রাখতেন বলে শোনা যায়, তাই না?" দাড়ি নিয়ে এত ব্যাখান, তাও আবার এরকম বিপদের মধ্যে, সত্যি বলতে কী, আমার খুব একটা ভাল লাগছিল না। যদিও সেকথা ওঁকে বলার প্রশ্নই আসে না। তবু মুখে বোধহয় ভাবনার কিছুটা ছায়া পড়েছিল, সেটা লক্ষ্য করেই বোধহয় সিধুজ্যাঠা জিগ্যেস করলেন, "ফেলুর কোন খবর যে পাওনি, সেটা মুখ দেখেই বুঝতে পারছি। তোমার বয়সে, এতেই এতটা ভেঙে পড়া ঠিক নয়, ডাকো তোমার বাবাকে, একটু ধমকে দিয়ে যাই।"
বাবা অবিশ্যি গলা শুনে ততক্ষণে ঘরে ঢুকছেন। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চা-ও এসে গেল। গরম চায়ে একটা রামচুমুক দিয়ে সিধুজ্যাঠা বললেন, " এই একটা সমস্যা হয়েছে বুঝেছ লকডাউনে। আমায় ভাল দার্জিলিং চা এনে দেবার লোকটি হাপিস। পাড়ার দোকানের সিটিসি আমার মুখে রোচে না হে!"
আরও খানিকক্ষণ বসে, ফেলু যে নির্ঘাত কোথাও গা ঢাকা দিয়ে আছে, বড় মাছ ধরতে গেলে যে ধৈর্য্য রাখতে হয়, খেলাতে হয় অনেক বেশী এসব মনে করিয়ে দিয়ে, সেই কাশীর গলির মগনলাল এই যুগে যে আরও শক্তিধর হয়ে উঠেছে সেটা বুঝিয়ে, ভিলেন স্ট্রেট অপমান করে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে খোদ গোয়েন্দার বাড়ি থেকেই টাকা গায়েব করে ভাগলবা, এই অবস্থায় লকডাউনের নিয়ম মেনে হাত-পা গুটিয়ে বাড়ি বসে থাকলেই যে সেটা ফেলুর পক্ষে মৃত্যুর বাড়া হত সেটা জানিয়ে, থামলেন সিধুজ্যাঠা। "আমি হলে তো এই লজ্জার হাত থেকে বাঁচতে কান ধরে ওকে দরজার বাইরে বার করে দিতুম হে!"
একথা-সেকথার পর উঠি-উঠি মোমেন্টে হঠাৎ আমায় বললেন, "ক'দিন ধরেই ভাবছি তোমায় বলব, এই অনলাইন টাকাপয়সা কি ভাবে আদানপ্রদান হয়, হ্যাকিং বস্তূটা কি, বিটকয়েনই বা কাকে বলে, কদিন ধরে এসব বিষয়ে বেশ কৌতুহল অনুভব করছি। খবরের কাগজে এসব শব্দ তো প্রায়ই দেখি আজকাল- কিন্তু তাৎপর্যগুলো পরিস্কার ধরতে পারি না। এর মধ্যে আবার তোমাদের বাড়িতেই এরকম ক্রাইম হয়ে গেল। আছে না কি, তোমার সংগ্রহে কিছু বইটই, যা থেকে এ ব্যাপারে কিছুটা অবহিত হতে পারি?"এ প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে, নেই। ফেলুদার তো আরওই নেই বলে মনে হয়, নইলে কি আর আমার কাছে শিখতে আসত? সিধুজ্যাঠাকে সেকথা বলতেই একেবারে খ্যাঁক করে উঠলেন। "যে বিষয় নিয়ে তদন্ত করতে যাওয়া, সেটা নিয়ে পড়াশুনো করার অভ্যেসটা তো ফেলুর ছিল বলে জানতুম! মনের দরজা তাহলে আর খোলা রাখছ না তোমরা, অ্যাঁ? "
কি আর বলি, এসব যেটুকু জানি সে তো শুনে আর ঘেঁটে - এ নিয়ে বইপত্র পড়ে তো কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্ররা। সেরকম বন্ধুবান্ধব অবিশ্যি আছে কিছু। তাদের কাছ থেকে আনিয়ে দিতে পারি বলায়, হঠাৎ একটা পেটেন্ট ফিচেল হাসি দিয়ে বললেন, "ওসব আর লাগবে না, তোমার ঘরে যে ধন আছে, আমার ঘরেও সে ফোন আছে"। বলেই কাঁধের ঝোলা হাতড়ে বার করে আনলেন নতুন ঝকঝকে আইফোন। জটায়ু থাকলে "আইবাপ্" বলাটা সামলাতে পারতেন না। আমারও আরেকটু হলে বেরিয়ে যাচ্ছিল, কোনমতে চেপে নিলাম।
“পুরনো একসেট বিলিতি থ্রিলার, এমনিতেই উই ধরে যাচ্ছিল, এক কালেকটরের কাছে বিক্রি করে কিছু কাঁচা টাকা হাতে আসায় এইটে কেনবার সুবিধে হল। ওসব এখন আর পড়াও হয় না, ইচ্ছে হলেও কিন্ডল ভারসনে তো পড়ে নেয়া যাবেই, এই ভেবে আর দোনোমোনো করলুম না।"
যেমন ঝড়ের মত এসেছিলেন, তেমনি ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন সিধুজ্যাঠা। "বিপদের মুখে ঝাঁপিয়ে পড়াই ফেলুর ক্যারেকটার, বুঝলে? ওরকম ম্যাদামারা মুখ করে বসে থেকো না।" শেষ কথাটা বাবাকে উদ্দেশ করে বলা, তবে আমাকে বললেও ভুল হত না। রাস্তায় মগনলালের লোক নজর রাখছে, সিধুজ্যাঠা এই বয়সে আবার কিছু বিপদে না পড়েন, ভেবে বাড়ি পৌঁছে ফোন করে জানাতে বলেছিলাম, আধ ঘন্টা পরও খবর না পেয়ে একটু উদ্বিগ্ন হয়ে ফোন করাতে বললেন " রাস্তা দশ মিনিটের, কিন্তু বাড়িতে এসে এই যে সব শুদ্ধিকরণের হ্যাপা, এতেই সময় নষ্ট হয় বড়। আচ্ছা তপেশ, এই যে সত্তর পার্সেন্ট অ্যালকোহল ঢাললে যে ভাইরাস মরবে, এটা প্রথম আবিষ্কার করেছিল কে, এ জানে তোমাদের গু-গোল?"
সিধুজ্যাঠা মনের আবহাওয়া অনেকটা পাল্টে দিয়ে গেলেন ঠিকই, তবে সেটা বেশীদিন স্থায়ী হল না। পরের ঘটনার শুরু সেদিনই রাতের দিকে।
[9]
এবারকার কাহিনীটা লিখতে বসে দেখছি, অনেক গুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার কেন্দ্রেই জটায়ু। এরকমটা আমাদের আগের কোন মামলায় হয়েছে বলে তো মনে হয় না। ক্লাইম্যাক্সে গিয়ে জটায়ু কোন কোন সময় একটা মোক্ষম ভূমিকা নিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু গোটা ক্রাইম ও তদন্ত জুড়ে এতটা জড়িয়ে থাকেননি কোনদিনই।
ঘটনার নতুন পরিচ্ছেদটাও শুরু হল জটায়ুরই ফোনে। এবারও বেশ রাতের দিকেই টঙটঙিয়ে বাজল জটায়ুর ফোন। এই ফাঁকে বলে রাখি, আজকাল যে আলাদা আলাদা রিংটোন অ্যাসাইন করা যায়, সেটা ফেলুদার অজানা ছিল। একদিন ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ সেটা আবিষ্কার করে প্রথম জটায়ুর ওপরই সেটার প্রয়োগ হল। দেখাদেখি আমিও জটায়ুকে বেশ চড়া বাজনায় চিহ্ন দিয়ে রাখলাম। "লালমোহনবাবুর গাড়ির প্রথম দিনের সেই জাপানী হর্নের কথাটা মনে আছে তো? সেইটাকে কমেমোরেট করবে এই রিংটোন"- বলেছিল ফেলুদা।
আবার কী বলেন, ঝামেলা নাকি আয়, এসব ভাবতে ভাবতে ফোনটা ধরেই বুঝলাম, আয়ের কথাই। "কালই মিটিং করতে চায় ওই প্রোডিউসার, নাম বলল..., দাঁড়াও, নোটবই দেখে বলতে হবে, সুমন আহমেদ বিল্টু। পার্ক স্ট্রীটে বারবিকিউ বলে একটা দোকান আছে কি? মনে হল, এরকমই কিছু বলল, সন্ধে সাতটায়। তোমার দাদাটি ভাগলবা, এই অবস্থায় তোমাকে ছাড়া তো যেতে ভরসা পাই না, এদিকে অফারও লুক্রেটিভ, বেশী টাইম খেলে যদি ফসকে যায়? আমার খুব ফ্যান বলে মনে হল টেলিফোনে। ঝপ ঝপ করে আমার দশটা উপন্যাসের নাম বলে দিল, বিশ্বাস করবে?" একদমে এতগুলো কথা বলে থামলেন জটায়ু। পার্ক স্ট্রীটের বড় দোকানগুলো অবিশ্যি খুলেছে বলে দেখেছি কাগজে, আর ওই তল্লাটে বসতবাড়ি কম হওয়ায় সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংও মেইনটেন করা তুলনায় সহজ, জটায়ুকে এই পরিস্থিতিতে একা ছাড়াও সমীচীন নয়, এসব ভেবে রাজীই হয়ে গেলাম। "বাঁচালে ভাই, এখুনি একবার প্রোডিউসারকে কনফার্ম করতে বলেছে। আরও অনেকে, ডিরেক্টর, ক্যামেরাম্যান আরও সব কারা কারা নাকি আসবে।" জটায়ুর হঠাৎ এই বাজারদরটা একটু অস্বাভাবিক লাগছিল। এর সম্ভাব্য কারন কী হতে পারে ভাবতে ভাবতে ইন্টারনেটে খোঁজ নিয়ে দেখি গত বছর জটায়ুর তিরিশটার মত উপন্যাস ই-বুক হয়ে বেরিয়েছে। রিভিউ দেখে মনে হয়, কাটতিও মন্দ না। হয়ত এটাই নতুন করে প্রোডিউসারদের নজরে পড়ার কারণ। অবিশ্যি সেক্ষেত্রে এক নজরে জটায়ুর দশটা উপন্যাসের নাম দেওয়ার মধ্যে বাড়তি কৃতিত্ব কিছু নেই। ল্যাপটপটা চোখের সামনে খুলে রাখলেই হয়।
একথা সেকথা ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। সকালে উঠে দেখি জটায়ুর মেসেজ ভোর তিনটে পঁয়তিরিশে। "মিটিং কনফার্মড। কামিং টু ইয়োর প্লেস টু পিক ইউ আপ অ্যাট সিক্স থার্টি পি এম শার্প"। ফিল্মের মিটিংটিটিং সবই নাকি আজকাল গভীর রাত্রে হয় শুনেছি। জটায়ু চট করে বেশ খাপ খাইয়ে নিচ্ছেন। উত্তেজিতও আছেন, উৎফুল্লও, রাতে ঘুম হচ্ছে না। তাই এই খাস সায়েবী মেজাজের মেসেজ, ভেবে হাসিও পেল।
সন্ধেবেলায় যে কালো স্যুট, চকচকে কালো বুট, আর ঝকমকে কালো গোঁফ ও চুলের জটায়ু এসে পড়লেন, তিনি ইংরিজি ছাড়া প্রায় কথাই বলেন না। হাবভাব দেখে মনে হয়, কোম্পানীর আমলের সাবেক পার্কস্ট্রীটের ব্রাউন সাহেব। একবার ভাবলাম বলি, কথা তো বলতে আসছে বাংলাদেশের দল, যারা মাতৃভাষার জন্য অত বড় যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছে, শুনেছি বাংলাভাষার ব্যবহারও নাকি অনেক বেশী, তাদের সামনে এত বিলিতি বারফট্টাই দেখালে আবার দাঁও ফসকে না যায়। পরে মনে হল, ফিল্ম জগতের ব্যাপারস্যাপার তো ভাল জানি না, তাই গোলমাল না বাড়ানোই ভাল
লকডাউনের দিন না হলেও, এমনিতেই এখন শহরে সন্ধের পর লোকচলাচল কম, তাই মিনিট কুড়িতেই আমরা সোজা বারবিকিউয়ের সামনে। রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে যে কলকাতাকে দেখতে পেলাম, তাকে যেন চেনাই যায় না। মনে হচ্ছে, মন্ত্রবলে যেন হঠাৎ এই শহরের নব্বই শতাংশ বাসিন্দাকে অন্য কোথাও সরিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে রাস্তাগুলো হয়ে গেছে প্রশস্ত, মোড়গুলো ফাঁকা, দোকানপাটের আলো ও বিজ্ঞাপন বিনা বাধায় গাড়ির জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে, ইমারতগুলো যে কত সুন্দর তাও বেশ নতুন করে চোখে পড়ছে। হঠাৎ দেখলে মনে হবে কোন বিলিতি শহর, যেখানে কলকাতার সবকিছুই আছে শুধু জনসংখ্যা কম। রাস্তাঘাটে গাড়িঘোড়া কম চলায়, উদ্বেগ, রাগ, ঝগড়াঝাঁটিও কম। যদিও এই আপাত-নিরুদ্বেগ ছবির পেছনে, যে কতটা চাপা উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা রয়েছে, সে শহরের প্রতিটি লোক প্রতিমুহূর্তে জানে। উদ্বেগ আমাদেরও মনে,অন্তত আমার তো বটেই। তবে লালমোহন বাবুকে দেখে সে কথা বোঝার উপায় নেই। দিব্যি পা নাচিয়ে "টুইংকল টুইংকল লিটল স্টার" গাইবার চেষ্টা করছেন। একবার কী ভেবে আমায় বললেন, "এরা আবার শ্যাম্পেন ট্যাম্পেন খেয়ে বেশী মাতলামি করবে না তো?" আরও একবার গলা শুনে তাকিয়ে দেখি, নিজের মনেই বারবার "মাই প্লেজার, মাই প্লেজার” আউড়ে সড়গড় হয়ে নিচ্ছেন। যাতে কেউ ধন্যবাদ-টন্যবাদ দিলে, বা কংগ্র্যাচুলেট করলে উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ জিভ জড়িয়ে না যায়।
লালমোহন বাবু এরই মধ্যে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে "মিট মাই স্টপগ্যাপ শফার, চাঁদু" বলে বেমক্কা আমায় সেই সন্দেহজনক ড্রাইভারটির সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন। কি আর করি, অগত্যা একটা নমস্কারের মত করতে হল। গাড়ি চালাতে চালাতে ওদিকেও একটা হাত একটু উঠতেই চোখে পড়ল, মোটা লোহার বালার পাশ থেকে উঁকি মারছে একটা নোঙর টাইপের ছবিওয়ালা উল্কি। হাতের ভেতর দিকটায় হওয়ায় সম্ভবতঃ এর আগে চোখে পড়েনি। এমনিতেও লোকটার চোখের চাহনি আমার ভাল লাগে না। এরপর তো আরওই গোলমেলে লাগতে লাগল। জটায়ুকে এখন এসব বলাটা অর্থহীন। তাই চোখকান খোলা রাখতে হবে, মনে মনে ঠিক করে নিলাম।
[10]
পার্কস্ট্রীটের চেহারা দেখে ভালই লাগল। সত্যি বলতে কী, অনেকদিন ঘরে বসে থেকে থেকে বাড়ির বাইরের শহরটাকে যতটা মৃত বলে মনে হচ্ছিল, বেরিয়ে পড়ে দেখলাম, এখন আর ততোটা না। ধর্মতলার দিকে মানুষজনের ভীড় দেখে বেশ ভালই লাগল। যদিও অন্যসময়ের থেকে অনেক কম, হয়ত কম বলেই ভালও লাগছে। মানুষের মন কী অদ্ভুত, এই মাসচারেক আগেই ধর্মতলায় ভীড় দেখলে রীতিমত রাগ হয়ে যেত, ফেলুদা তো রেগুলার বলছিল অবিলম্বে দিল্লীর মত এখানেও অড-ইভন্ ফর্মূলায় গাড়ি বার করা উচিৎ - এমনকী মানুষদেরও অফিসে যাওয়ার দিন কমিয়ে দিয়ে খাামকা রাস্তায় বেরোনোটা কিঞ্চিৎ কমানো দরকার। নইলে এ শহর বাঁচবে না। অথচ, এখন লোক দেখলে মন ভাল হয়ে যাচ্ছে। মানুষের মানুষকে দরকার, এটা এসব সময়ে বোঝা যায়।
পার্কস্ট্রীটে ঠিক ততটুকু লোক আছে যতটুকু না থাকলে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। নির্দিষ্ট সময়ের মিনিট দশেক আগেই পৌঁছেছি, তাই একটু দূরেই গাড়ি রেখে খানিকটা হেঁটে এগোলাম। একটা ইচ্ছে ছিল লালমোহনবাবুর নতুন ড্রাইভারটির নজর এড়ানো, কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই খেয়াল করলাম, সে গাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা বিড়ি ধরিয়ে আমাদের দিকেই যেন তাকিয়ে আছে। বাধ্য হয়েই একটু উল্টোপাল্টা হাঁটতে হল। শেষ পর্যন্ত মিনিট পাঁচেক লেটে বারবিকিউয়ের গেটে পৌঁছে দেখি এক ভদ্রলোক ঘন ঘন ঘড়ি দেখে, ব্যস্ত হয়ে কাকে জানি ফোন করছেন। পরমুহূর্তেই জটায়ুর সাইডপকেটে তারস্বরে "আমি কলকাতার রসগোল্লা" বেজে উঠতেই বুঝলাম, ইনিই ছবির প্রোডিউসার সুনীল আহমেদ বিল্টু। প্রযোজকসুলভ চেকনাই না থাকলেও, কাঁচা টাকার একটা পালিশ যে আছে সেটা স্বীকার করতেই হয়। আর যেটা আছে সেটা হল একটা বিদঘুটে কালার সেন্স। গোলাপী-ঘেঁষা সাফারি স্যুট, বুকপকেটে অল্প বের করে রাখা ময়ূরকণ্ঠী রঙের সিল্কের রুমাল, হাতে লাল, সবুজ, হলুদ তিনটে বড় বড় পাথর বসানো আংটি, চুলটাও একটু বাদামী কালার করা, কেন জানি না দেখে পরচুলা বলে মনে হয়। ভদ্রলোক রিংটোন শুনে একটু হকচকিয়ে গেলেও সঙ্গে সঙ্গেই সামলিয়ে নিয়ে এগিয়ে এসে হাত মেলালেন জটায়ুর সঙ্গে। " আসেন আসেন সার। আপনের সেহারা দেখলেই সাহিত্যিক পরিসয়টা একদম প্রকট হইয়া যায়" বলে জড়িয়ে ধরলেন জটায়ুকে। ভদ্রলোক বাংলাদেশী, বাংলাতেই কথা বলছেন দেখেও জটায়ু কেন যে "দ্য ফ্রেন্ড অফ মাই ডিয়ারেস্ট কাজিন, ইয়ে" বলে থতমত খেয়ে একদম ব্রেক মেরে দিলেন জানি না। সুনীলবাবুর গোল গোল হয়ে যাওয়া চোখ দেখে বরং আমাকেই জটায়ুর বন্ধুর কাজিন বলে নিজের পরিচয়টা দিতে হল। উটকো ব্যক্তির আগমন দেখে ভদ্রলোক অবিশ্যি মোটেই চমকালেন না। বরং "ভাল করেছেন এসে, আপনাদের জেনারেশনের জন্যই তো এসব বানানো ভাই" বলে আমায় ইঙ্গিত করলেন দরজার দিকে যেতে। বাকীরা শুনলাম কেউ ইতিমধ্যেই এসে গিয়ে একটা টেবল নিয়ে বসেছে। আবার কেউ কেই আসবার পথে। দরজা দিয়ে ঢুকতে গিয়ে চোখে পড়ল, একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ড্রাইভার চাঁদু। বোধহয় দারোয়ানের সঙ্গে কোন কথা হচ্ছিল, আমাদের আসতে দেখে এই মাত্র একটুৃ দূরের দিকে সরে গেছে। গাড়ির মধ্যে বসে থাকা অবস্থায় ঠিক বোঝা যায় না, এখন লক্ষ্য করলাম, লোকটি বেশ লম্বা, মজবুত চেহারা। পেটের মধ্যে একটা অস্বস্তি গুড়গুড় করে উঠল। সেটা অবশ্য বেশিক্ষণ থাকল না। অনেকদিন বাদে পার্ক স্ট্রীটের চেনা রেস্তোরাঁয় ঢুকে লোকজন, আলোর জমক, ওয়েটারদের আনাগোনা ও খাবারের গন্ধে মনটা বেশ চনমনিয়ে উঠল।
ভিতরটা অন্য সময়ের তুলনায় বেশ ফাঁকা ফাঁকা হলেও, এমনিতে দিব্যি ঝলমলে, বাইরের পৃথিবীর টেনশনের কথা চট করে মনে পড়ে না। হালকা বিলিতি গান বাজছে, বাসন-ডিশ-চামচের টুং টাং শব্দ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হাসিখুশি মানুষ। লাল কার্পেট পাতা চওড়া কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠে, একটা ভারী কাচের সুইংডোর ঠেলে মাঝারি সাইজের হলঘরের এক পাশে প্রকান্ড দেয়ালজোড়া জানলার ধারে বড় গোল টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন সুমনবাবু। ওঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি একজন চোখা চেহারার, শিশির তলার মত গোল কাচের সেকেলে রিমলেস চশমা পরা ছু্ঁচলো দাড়ির একটি রোগা লম্বা লোকের সঙ্গে একটি পরিস্কার করে মাথা কামানো শেওলা সবুজ ব্লেজার পরা লোক বসে এদিকেই তাকিয়ে আছে। দুজনের হাতেই কাচের গ্লাসে পানীয় প্রায় শেষ, সামনে বাহারী কাট গ্লাসের বোতল, যাকে ইংরিজিতে ডিক্যান্টার বলে, তাতেও বিশেষ অবশিষ্ট নেই। চোখের দৃষ্টিতেও বোঝা যায়, এরা ইতিমধ্যেই যথেষ্ট নেশা করে ফেলেছেন। খুব বেশী সূক্ষ্ম আলোচনার অবস্থায় নেই। ব্যাপার দেখে জটায়ু প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও দুর্দান্ত মনের জোরে সামলে নিলেন বটে, তবে সুমনবাবু হুইস্কি বা ভডকা জিজ্ঞেস করায়, খামকা কাঁধ নাচিয়ে "এন্ নো, থ্যাংকস। নো ড্রিংকিং অন ডিউটি" বলাটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি। আমি দুজনের জন্যেই সুইট ফ্রেশ লাইম সোডাই বললাম, ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে বলছে কোথায় কী যেন একটা গোলমাল আছে, শুধু কেন যে সেটা মনে হচ্ছে বুঝতে পারছি না, আর এখানে আসা মূলতঃ জটায়ুকে গার্ড দেবার জন্য, সেক্ষেত্রে একটুও অ্যালকোহল টেস্ট করার কথা ভাবাই যায় না।
সুমনবাবুই ডিনার বললেন, এতক্ষণ পানীয়ের সঙ্গে সুইট ক্রিস্পি কর্ণ আর ফ্রায়েড চিকেন তো চলছিলই, এখন এল চিমনি স্যুপ, মাঞ্চুরিয়ন চিকেন আর মিক্সড ফ্রায়েড রাইস। আমার অবিশ্যি এদের নুডলস বেশী পছন্দ, কিন্তু এখানে সেটা বলা অভদ্রতা হবে ভেবে কিছু বললাম না। খানিকক্ষণ ধরেই খেয়াল করছি লালমোহনবাবু যেন আমায় প্রায় চিনতেই পারছেন না। প্রোডিউসারের সঙ্গেই যেন একটা গায়ে-পড়া ভাব। বলা হয়নি, অন্য দুজনের পরিচয় ইতিমধ্যে পেয়েছি। একজন, চোখা, সিরিজের ক্যামেরাম্যান, আজকাল যাকে কায়দা করে বলছে ডিওপি, অন্যজন ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যানট ডিরেক্টর। প্রথম জন মিলন ব্যানার্জী বাচ্চু, অন্যজন সিজার সিদ্দিকি।
এনার নামে ওই বাধ্যতামূলক ডাকনামটা লেজুড় হিসেবে নেই কেন, সেটা বুঝতে পারলাম না। আরেকটা প্রশ্নও উঁকি দিচ্ছিল, এই সিজার যাঁকে অ্যাসিস্ট করেন সেই ডিরেক্টরটি কিনি ?
[11]
ডিনার শেষ। টুকটাক এলোমেলো কথা চলছে। এর মধ্যে চট করে ঘড়ি দেখে আর একটু উঠে গিয়ে একটা ফোন সেরে সুমন হঠাৎ বললেন, "চলেন মিস্টার জটায়ু। আইজই দিন ভাল। আমাদের ডিরেক্টরসায়েবও আসতেয়াসেন, সইসাবুদ হয়ে যাক, আপনার অ্যাডভান্সও দিয়া দিই। তাইলে আমরাও আমাদের প্রি-প্রোডাকশনের কাজ শুরু করে দিতে পারি।" মনে পড়ল, ফেলুদা বলেছিল, বাংলাদেশের বাঙালিদের সঙ্গে এপার বাংলার মান্য বাংলার প্রচুর তফাৎ থাকলেও, ওপার বাংলার ভাষাও জেলায় জেলায় আলাদা হওয়া স্বত্ত্বেও দেখবি, কলকাতায় এসে বাংলাদেশীরা যতটা সম্ভব মান্য বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করেন। এটা ভদ্রতা, যেমন আমরা হিন্দী বেল্টে গিয়ে একটু আটকে আটকে গেলেও হিন্দীতেই কথা বলার চেষ্টা করি। সব মিলিয়ে দু দেশের ভাষার একটা মিলমিশ, একটা মাঝখানের রূপ তৈরী হয়। সেটা শুনতে বেশ মজার আর মিষ্টি। জটায়ু অবশ্য কোনও দেশের বাংলাতেই না গিয়ে, সজোরে অনেকক্ষণ ধরে সেধে রাখা "মাই প্লেজার"টা নিখুঁত নামিয়ে দিয়ে, বুকপকেট হাতড়ে বার তিনেকের চেষ্টায় ওঁর লাকি পার্কার পেনটা বার করে ফেললেন। "ইয়ে, মানে আমার রেমুনেশনটা যেরকম কথা হয়েছিল সেরকই থাকছে তো? বললেন জটায়ু। "একই থাকবে স্যার, উল্টে আমাদের চীফ প্রোডিউসার, মানে, মেন ফাইন্যান্সিয়ার বলতে পারেন, ওঁর নাম যদিও টাইটেলে থাকে না, স্পেশ্যালি আপনার জন্য আরও কিছুটা হনারেরিয়াম যোগ করবেন বলেছেন। আপনার খুব ফ্যান, 'ভেরি অনারেবল অ্যান্ড লার্নেড রাইটার' বলতেসিলেন বারবার।” সুমনের জবাব শুনে জটায়ুর আরও গোটা দুই দাঁত, মুখের দু পাশ দিয়ে বেরিয়ে এল।
ভেবেছিলাম সইসাবুদ আর অ্যাডভান্সের ব্যাপারটা এইখানেই মিটে যাবে, আর আমরাও বহুদিন বাদে গাঙ্গুরামের মিষ্টি কিনে নিয়ে বাড়ি যাব। খানিকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিলাম, জটায়ু আর সুমনবাবুর মধ্যে ঘন ঘন কথা ও মাথা নীচু করে চুপিচুপি ঘাড় নাড়ানাড়ি চলছিল। শেষ পর্যন্ত দাঁড়াল যে এই সীনের যবনিকা নাকি এখানে নয়। চীফ প্রোডিউসার আছেন রাজারহাটের একটা বিলাসবহুল রিসর্টের রয়্যাল এক্সক্লুসিভ স্যুটে। আমাদের এক্সপেক্ট করছেন। আজই কি জানি অক্ষয় না মাহেন্দ্রযোগে সইসাবুদটা সারতে চান।
এবার একটু বিরক্তিকরই লাগল। এই অতিমারীর সিচুয়েশনে পার্কস্ট্রীট অবধি আসাটা যাও বা মেনে নেয়া যায়, এই রাতবিরেতে রাজারহাট? এমনিতেই বেশ অপরাধ-করলেই-করা-যায় গোছের ফাঁকা উপনগরী, তার ওপরে কে না কে চীফ প্রোডিউসার, কী তার মতলব না জেনে ফস করে তার অফিসে যাওয়াটা কী একটু হঠকারিতা হয়ে যাচ্ছে না? জটায়ুকে সতর্ক করব বলে একবার প্রায় জোর করেই টয়লেটে নিয়ে যেতে চাইলাম। কিন্তু ভদ্রলোক বুঝতেই চান না। উল্টে "তপেশ, তুমি একটু আগেই একবার গেলে না? তুমি ব্যায়াম ট্যায়াম করো, তোমার তো এত অল্প বয়সে সুগারটুগার ধরার কথা নয়" বলে জনসমক্ষে আমার প্রেস্টিজ পাংচার করে দিয়েছিলেন প্রায়। আশা করি স্পীকারটা ঠিক মাথার উপরে থাকায়, আর টেবিলের বাকিরা বেশ টিপসি হওয়ায় কথাটা কেউ শুনতে পায়নি। শেষমেশ বাধ্য হয়ে, পাশের চেয়ারে বসা জটায়ুকে মেসেজ করার রাস্তা ধরতে হল। তাও ভদ্রলোক উত্তেজনার চোটে দেখেন না।
কী আর করি, শেষটায় সুমনবাবু একবার "এক্সকিউজ মি" বলে উঠে যাবার সুযোগে বাকিদের নজর বাঁচিয়ে বুকপকেটের দিকে ইঙ্গিত করতে হল।। জটায়ু বুঝতে পেরে, পড়ে, আমায় উল্টে লিখলেন, "ঘাবড়িও না তপেশ। তোমার দাদা এটা লাইক করতেন না।"
সত্যি বলতে কী, আজকের ব্যাপারে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফেলুদার ব্যাপারটা মন থেকে একটু হলেও সরে গিয়েছিল। হঠাৎ এই ফেলুদার প্রসঙ্গে পাস্ট টেন্স ব্যবহার দেখে মাথাটা বেশ গরম হয়ে গেল। তাহলে লালমোহন গাঙ্গুলিও ধরে নিয়েছেন যে প্রদোষ মিত্র অতীত? একটা রোখ চেপে গেল। যা থাকে কপালে, এর শেষ দেখে ছাড়তে হবে।
এদিকে ফিল্ম পার্টির ওঠার তাড়া মোটেই নেই। ভরপেট ডিনারের পর আবার একপ্রস্থ কী সব জানি পানীয় নিয়ে তারা বসে নিজেদের মধ্যে নানান গল্প করেই চলেছে। হাবেভাবে মন হয় বেশিরভাগই নানা রকমের ফিল্মী গসিপ, যদিও যাদের নিয়ে আলোচনা তাদের কাউকেই চিনি না। মাঝে মাঝে ঘড়ি দেখা চলছে, একসময় মনে হল ওরা কারও বা কোনকিছুর জন্য অপেক্ষা করছে। লালমোহন বাবু দেখছি ধৈর্যের পাহাড়। এমনিতে নানা সময় ঘুরতে গিয়ে দেখেছি, রাত এগারোটার পর থেকে জটায়ু একটু স্লো হয়ে যান। অবিশ্যি মামলার ক্লাইম্যাক্সের জন্য সারারাত জাগতে হলে আলাদা কথা। এরকম দরকার বারকয়েক হয়েওছে, যার সবচেয়ে মেমোরেবল উদাহরণ হচ্ছে 'গোরস্থানে সাবধান'। একবার ঠাট্টা করে তাঁর এই আর্লি তন্দ্রার ব্যাপারটা নিয়ে একটু খোঁচা দেওয়ায় বলেছিলেন, "এটা তোমাকে এক্সপ্লেন করা একটু শক্ত তপেশ। কল্পনাশক্তি যেটাকে তোমরা বল, সেটা তো একরকমের স্বপ্ন দেখাই বলতে পারা যায়? সেই কারণে ব্রেনকে বেশী সময়ের জন্য স্বপ্ন দেখার স্কোপ দিতে হয়। এটা একরকমের সাধনা বলতে পার। শুনিচি গ্রেট পোয়েট বৈকুণ্ঠ মল্লিকেরও তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার হ্যাবিট ছিল।" ফেলুদা অবিশ্যি এই কনসেপ্টটাকে 'জেগে ঘুৃমনো' বলে ঈষৎ হেয় করেছিল। কিন্তু লালমোহন বাবু সেটা পাত্তাই দেন নি।
আজ কিন্তু জটায়ু একেবারে তন্দ্রাহীন- যেন সত্যিই সীতাকে পাহারা দেবেন। শুধু টাকার আকর্ষণ হয়তো নয়। হয়তো এর মধ্যে খ্যাতির টানটাও একটা বড় ব্যাপার- কিন্তু সব মিলিয়ে ব্যাপারটা যে বেশ অদ্ভুত, তাতে সন্দেহ নেই। আমিও মনে মনে সারারাত জাগার জন্য প্রস্তুত হয়ে নিলাম।
হঠাৎ রাত বারোটার কাছাকাছি সুমনবাবু রাত বেড়ে যাওয়ার জন্য অ্যাপোলোজাইস করে বেয়ারাকে বিল দিতে ডাকলেন। লোকটাকে আমি শত্রুপক্ষ বলে ধরেই নিয়েছি, তাই একটু ভাল করে নজর করে দেখলাম। বিল মিটিয়ে বেয়ারাকে বেশ মোটা টিপস দিলেন ভদ্রলোক। এমনিতে কার্ডে পেমেন্ট হল।
তারপর নোট বার করে প্লেটে টিপ রাখার সময় হাতটা একটু বাড়ানোতে চোখে পড়ল, কব্জির অল্প ওপরে একটা নোঙর টাইপের উল্কি। এই একই ধরণের উল্কি আজই দেখেছি আরেকজনের হাতে। অবশ্য ড্রাইভার চাঁদুর হাতের সেই উল্কির রং ছিল নীল। এঁর ক্ষেত্রে সেটা বদলে হয়ে গেছে সবুজ।
[12]
যখন রাস্তায় বেরিয়ে এলাম তখন ঘড়িতে রাত বারোটার কাছাকাছি। হঠাৎ ঢং ঢং করে জোরালো একটা ঘড়িতে বারোটা বাজার শব্দ শুনে চমকে উঠে আরেকটু হলেই জটায়ুর পা মাড়িয়ে দিচ্ছিলাম। এক মুহূর্ত পরেই বুঝলাম, আওয়াজটা এসেছে, অদূরের রাসেল স্ট্রীটের গির্জা থেকে। এরপর প্রায় মিনিট খানেক জুড়ে নানারকম সরু, মোটা, মিহি, গম্ভীর, সুরেলা আর শুকনো আওয়াজে নানান ঘন্টা মিলেমিশে বাজল। রাস্তায় একটিও মানুষ নেই। কুকুর, গাড়ি, পুলিশ, পাগল কিচ্ছু না। হঠাৎ মনে হল, আমরা দাঁড়িয়ে আছি সায়েবী কলকাতার রাত্তিরে। অদূরেই সাউথ পার্ক স্ট্রীট গোরস্থান। কলকাতার বিলুপ্ত সায়েবদের তিনশো-চারশো বছরের হিম ঘুম কাটিয়ে উঠে এ সময়ে একটু হাওয়া খেয়ে বেড়ানোর ফুরসৎ। আমাদের গাড়িগুলো পার্কিং থেকে এসে মৃদু শব্দ করে দাঁড়াল। চটপট উঠে পড়ে জোরে একটা নিশ্বাস নিয়ে মন শক্ত করার চেষ্টা করলাম। সুমনবাবু এগিয়ে এসে চাঁদুকে কি সব বুঝিয়ে দিলেন। সেও মুখ বুজে মাথা নাড়ল।
হঠাৎ মনে হল, লোকটা অদ্ভুত রকম গোমড়া আর চুপচাপ। বেশ কয়েক বার ওর গাড়িতে চড়েও আজ অবধি ওকে একটা কথা বলতে শুনিনি, এমন কি লালমোহন বাবুর সঙ্গেও না। ছোট্ট একটা ঝাঁকুনি দিয়ে আমাদের বাহন চলতে শুরু করল। সামনে পেছনে আরও দুটো গাড়িতে ভাগ করে সুমন বাবু, তাঁর ক্যামেরাম্যান ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পার্কস্ট্রীটের মিয়োনো জৌলুষ পেছনে থেকে গেল। আমরা পূর্ব কলকাতার বিচ্ছিন্ন একটা প্রান্তের দিকে এগোলাম। যখন মা ফ্লাইওভারে উঠে গাড়ি স্পিড বাড়াল, তখন রাতের ঠান্ডা কলকাতাকে দেখে রূপকথার ঘুমন্ত রাজকন্যার কথা মনে হল। নিজের হৃদপিন্ডের আওয়াজ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি। হঠাৎ হাসি পেল একটা ভাবনা মাথায় এসে। প্রোফেসর শংকুর নার্ভিগারের প্রয়োজন যদি কারও হয়ে থাকে, সে আজকের আমার। ফাঁকা রাস্তা পেয়ে চাঁদু অ্যাকসিলেটরে আরও চাপ দিতেই মনে হল, আবার আমাদের একটা প্রাণ-হাতে নেয়া রোমহর্ষক অ্যাডভেঞ্চার শুরু হয়ে গেল। যদিও এবারে মূল নায়কই অনুপস্থিত।
একটু চটে থাকলেও, এই অভিযানে বেরোনোর অনুভূতির কথাটা জটায়ুকে ইচ্ছে করেই বললাম, আসলে চাঁদুকে শোনাব বলেই। একবার লড়াই যখন লেগেই গেছে, এনিমি ক্যাম্পের কোন এজেন্টকেই পাল্টা চাপে ফেলার সুযোগ পেলে যে হাতছাড়া করতে নেই, এটা ফেলুদাকে দেখে শিখেছি। ফেলুদাও এমনিতে খুব একটা গোপনীয়তা রাখে না। সন্দেহভাজনকেই মামলার নতুন ফাইন্ডিংস বলে দিতে দেখে অনেকবার অবাক হয়েছি। মনে আছে, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে সামান্য পরিচিত এবং গোলমেলে অনন্তলাল বাটরাকে অনীকেন্দ্র সোমের মার্ডারে তার যমজ ভাইটির জড়িয়ে পড়ার খবর সবিস্তারে বলতে দেখে বেশ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। তখন অবিশ্যি জিজ্ঞেস করতে সাহস পাইনি। পরে যখন দেখা গেল সেই বাটরা, ওরফে জগদীশই একজন কালপ্রিট, তখন ভয়ে ভয়ে ফেলুদাকে বললাম, "ওকে এভাবে সব কথা বলে দেয়াটা বোধহয় ভুল হয়ে গিয়েছিল, তাই না?" ফেলুদা বলেছিল, "ঠিক তা নয়, অনেক সময় কিছুটা ইনফরমেশন লীক করে দিলে অপরাধীকে কনফিডেন্ট করে দেয়া যায়, যে সে সন্দেহের তালিকায় নেই। তাতে সে একটু রিল্যাক্সড হয়ে গেলে সুবিধে। আবার অনেক সময় সন্দেহ যে করছি, সেটার একটা আভাস দিলে, ঘাবড়ে বা ডেসপারেট হয়ে বেচাল কিছু করে ফাঁদে পা দিয়ে বসে। তাতে তাকে হাতেনাতে ধরতে সুবিধে হয়। পুরোটাই মাইন্ড গেম, বুঝলি? এ তো আর জটায়ুর নভেল নয়!"
নভেলিস্টকে এতক্ষণে একটু এক্সাইটেড মনে হল। অনেকটা প্রথম বারের, মানে, সোনার কেল্লার অভিযানের স্টাইলে সিটে বসে প্রায় নাচতে নাচতে জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কি সিরিয়াসলি কোন ফাউল প্লে সাসপেক্ট করছ? আমার তো এঁদের বেশ লাগছে তপেশ! বরং একটু বেশী যেন ফ্রাইটেন্ড দেখছি তোমায় এবার!"
এরপর আর কথা বাড়ানো অর্থহীন, তাই চুপ করে জানলা দিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগলাম, যাচ্ছি ঠিক কোথায়। যদি গোলমাল কিছু ঘটে, কলকাতার কোন তল্লাটে আছি সেটা গুলিয়ে ফেললে নিষ্কৃতি পাওয়া ডবল কঠিন হবে।
[13]
গাড়ি নানা আলো-আঁধারি রাস্তা পেরিয়ে বাইপাস ধরে নিউটাউনের টানা লম্বা রাস্তা ধরল। ছিমছাম গর্তহীন রাস্তা, লাইন করে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ি, মূর্তি, ট্রাইডেন্ট লাইট ও সাজানো আইল্যান্ড পেরিয়ে, যেখানে দাঁড়াল সেটা আসলে রাজারহাট নিউটাউনের অংশ নয়। এটা তার খানিকটা আগে, ভালনাম সল্টলেক সেক্টর ফাইভ। নলবনের ফুডপার্ক ছাড়িয়ে, গোদরেজ ওয়াটারফ্রন্টের পেল্লায় জলের তৈরী ময়দানের পাশে একটা অ্যাপার্টমেন্টে হাউসের গেট দিয়ে শোঁ শোঁ করে ঢুকল তিনটে গাড়ি। দরজায় অবিশ্যি গার্ড ছিল, কিন্তু বোঝা গেল অন্যদুটো গাড়ি গার্ডদের চেনা, কারণ নামধাম, নাম্বার ইত্যাদি সব লিখতে হল শুধু জটায়ুকে। ভিতরে পাঁচটা টাওয়ারের তৃতীয়টার পোর্টিকোয় এসে গাড়ি দাঁড়াল। এইসব সারতে আমাদের কয়েক মিনিট লাগল। নেমে দেখি সুৃমনবাবুর দল সিগারেট ধরিয়ে ওয়েট করছেন। আমরা পৌঁছতেই বিনা বাক্যব্যায়ে এগিয়ে একটা লিফটের বোতাম টেপা হল। নিঃশব্দ লিফট থেকে সতেরো তলায় নেমে আধো অন্ধকারে বাঁদিকে খানিকটা হেঁটে একশ বাহাত্তর নম্বর ফ্ল্যাটের পালিশ করা কালো দরজার বেল টেপা হল। একটা খুট করে আওয়াজ হতে সুমনবাবু এক পা এগিয়ে দরজার ইয়েল লকের নব ঘোরালেন।
ভারি দরজার ওপারে একজন সাফারি সুট পরা লোক, মুখ দেখে মনে হয় জীবনে একবারও হাসেনি, আমায় এয়ারপোর্টের স্টাইলে হাত ছড়িয়ে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল। উপায় নেই দেখে তাই করলাম। পকেট সার্চ করে "শুক্রিয়া" বলে ফোনটা পকেটস্থ করল বুঝলাম। সুমন বাবু ইতিমধ্যে ব্যাপার দেখে ফিরে এসে হাঁ হাঁ করে " উনি আমাদের গেস্ট, মোস্ট ফেমাস রাইটার জটায়ুৃজী" বলে বারণ করায় লোকটি একটু থমকে গিয়ে "সাব কো পুছনা পড়েগা" বলে অন্ধকারে মিশে থাকা দরজাগুলোর একটা দিয়ে কোথায় কি জানি চলে গেল। আগে বলা হয়নি, ঘরের ভেতরটা এত অন্ধকার, আর আসবাবপত্রগুলোও এত ডার্ক রঙের যে মানুষের অবয়ব ছাড়া আর প্রায় কিছুই দেখা যায় না। আর তাতেই একটা অসহায় ভাব তৈরী হয়। লোকটা হুকুম নিয়ে ফিরে এল বটে, কিন্তু তাতেও সবটা চিঁড়ে গলল না। পকেটের ফোনটা গার্ডের জিম্মায় রেখে তবে জটায়ু ছাড়া পেলেন। তল্লাশির হেনস্তাটা হল না, এই যা।
এই লোকটিই এবার আমাদের আরেকটা দরজা ফাঁক করে দিয়ে ঢুকতে বলল। অনেকটা রেকর্ডিং স্টুডিওর মতো এর ওপর গোল কাচ। যদিও তার ওপাশে দৃষ্টি চলে না। প্রথমে মনে হয়েছিল সেটা দরজার ওপাশে পর্দা জাতীয় কিছু থাকার জন্য, পরে বুঝলাম, সেটা আলোর অদ্ভুত স্বল্পতার জন্য। অবিশ্যি আমরা ঢুকে দাঁড়াতে ক্রমে আলোটা বাড়ল। আর তারই মধ্যে একটা গলা শোনা গেল। গলাটা অনেকদিনের চেনা, তাও, বা তাই হয়তো, রক্ত জল হয়ে আসে এখনও।
"আসেন আংকল। সো উই মিট এগেন। বহোত বরস হয়ে গেলো, হল না?"
সত্যি বলতে কি প্রথমে একটু আনন্দই হল। এই রহস্যময় চীফ প্রোডিউসারের সঙ্গে দেখা করার প্রশ্ন উঠতেই যে সম্ভাবনাটার কথা মাথায় এসেছিল, সেটা ফলে যাওয়াতে মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে নিলাম। ফেলুদার অনুপস্থিতিতে একটু অসহায় লাগলেও বুদ্ধিটা যে একেবারে অকেজো হয়ে যায় নি, এটা ভেবে ভাল লাগল। আমি ঘাবড়ে যাচ্ছি বলে বারবার খোঁচা দেয়া লালমোহন গাঙ্গুলি এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, ঘুঘুটাই সব নয়, পিছনে ফাঁদও আছে। মগনলালের এই অন্ধকারে ঘাপটি মেরে বসে থাকার বিচিত্র স্বভাবটা বেনারসের গলি থেকে শুরু করে আজ অবধি রয়ে গেছে দেখছি। আর গোলমেলে কারবারে জড়িয়ে থাকার স্বভাবটাও আর পাল্টাবে বলে মনে হয় না। এসব ভাবনার ফাঁকেই চোখে পড়ল নিবাসের চেহারাটা পাল্টালেও মগনলালের বেশবাস বিশেষ পাল্টায় নি। সামনের দিকের চুলটা একটু কম, আর গোঁফ আর চুলের অনেকটাই রূপোলী হওয়া ছাড়া চেহারাটাও বিশেষ পাল্টায় নি। আর যেটা একদম পাল্টায় নি সেটা হল শয়তানী দৃষ্টি, যেটা আপাতত জটায়ুর দিকে ফিরে মজা দেখছে।
[14]
লালমোহনবাবু এবার অবিশ্যি খুবই হকচকিয়ে গেছেন, তবে এতক্ষণের সাহসের পতন হতেও তো খানিক সময় লাগে, তাই এখনও দাঁড়িয়ে আছেন বটে, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে যে কোন সময় দম ফুরিয়ে হাওয়া পুতুলের মত ফস করে বসে পড়বেন। পাশের সোফার ব্যাকরেস্টটা হাত বাড়িয়ে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন সাপোর্ট হিসেবে। আবছা আলোয় একবার যেন মনে হল আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে, তবে সেটা আমার চোখের ভুলও হতে পারে।
আমি অবিশ্যি বেশিক্ষণ জটায়ুর দিকে নজর দিতে পারলাম না কারণ মগনলালের দৃষ্টি ততক্ষণে
আমার দিকে ঘুরেছে। "মিস্টার মিত্তরের ডিজ্যাপিয়ারের বেপারটা নিয়ে আমি খুব ওরিড আছি জেনুইনলি। একটা ফ্রেন্ডলি জোক, আমায় রিকুয়েস্ট করলে আংকলদের টাকা আমি ওয়াপস করে দিতাম। উ টাকার এমাউন্ট আমার কাছে নাথিং। উনি ফালতু পাঙ্গা নিতে গিয়ে লাইফ রিস্ক করে ফেললেন দেখে খুব আফসোস হল। ব্রেভ ম্যান, খালি মাঝে মাঝে বেচাল করে ফেলেন। উনার সাথ কুনো সিক্রেট কন্টাক্ট থাকলে যেন খোবোর পাই"।
একটা ছোট্ট "হুঁঃ" আওয়াজে চোখ ঘুরিয়ে দেখি, লালমোহনবাবু বোধহয় প্রাণপণে একটা সায় দেবার চেষ্টা করতে গিয়ে মাঝপথে আটকে গিয়ে কেমন যেন কাঁদোকাঁদো হয়ে গেছেন। একটা ছোট্ট ভোঁতা শব্দে বুঝলাম, হাতে-ধরা ফোনটা পায়ের কাছে মোটা গদীতে পড়ল। বোধহয় একটু টলেও উঠলেন কারণ আমি নড়ার আগেই প্রায় অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসা একজন তাগড়া সাফারি সুট ওঁকে জাপটে ধরে নিল। লালমোহনবাবুর ফ্যালফেলিয়ে যাওয়া দৃষ্টি আর এলিয়ে পড়া ভাব দেখে হঠাৎ মনে হল, বেনারস কি কাঠমান্ডুর বয়স এখন আর নেই, এ বয়সে এতটা মানসিক চাপ ওঁর পক্ষে মারাত্মক হতে পারে। যদিও এখন আর আমার বিশেষ কিছু করার নেই, আমার কথায় একটুও পাত্তা না দিয়ে নিজেই উনি ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেছেন।
মগনলালের মুখে পান বা গুটখা জাতীয় কিছু আছে বোঝাই যাচ্ছে, এরকম ঝাঁ চকচকে চারতারা পরিবেশে বেমানান একটা থুকদানিও পাশেই বসানো, সঙ্গীসাথীদের কারও মুখেই মাস্কের বালাই নেই, হয় এদের ভাইরাসও ভয় পায়, নয় ট্যাঁকের জোর এতটাই যে কিছু হলেও চিকিৎসা করিয়ে চট করে সেরে উঠবে বলে আশা করছে।
মগললাল এবার ঘুরল সুমনবাবুর দিকে। ভদ্রলোক এতক্ষণ কি করছিলেন খেয়াল করিনি, তবে এখন মুখ দেখে মনে হল, ব্যাপারস্যাপার দেখে একটু থতমত খেয়ে গেছেন। "কী মিস্টার বাচ্চু, আমাদের দেসের ফেমাস রাইটারকে কোনো পড়েশানি দিচ্ছেন না তো? উনার জন্য কিন্তু মুহ্ মাঙ্গে কিম্মৎ। প্লাস বোনাস ভি আমি খুদ আপনি পাকেট থেকে দিব। বিল করে নিবেন মনোহরের পাস থিকে। জগদীশ, থোড়া গরম পানি পিলাও আংকলকো!" বাজখাঁই গলায় নির্দেশটা যাবার মিনিটখানেকের মধ্যেই বাহারি গ্লাসে একটা পানীয় এল যেটা শুধুই জল কখনই নয়। আন্দাজে মনে হল ব্র্যান্ডি, হুইস্কি বা রাম জাতীয় কিছু। যদিও এব্যাপারে আমার আমার ঘ্রাণশক্তি বিশেষ নির্ভরযোগ্য নয়। জটায়ু জিনিসটা চোঁ করে খেয়েও নিলেন। একটা হিক্কা মতও তুললেন প্রায় ধর্মেন্দ্র স্টাইলে। প্রায় একই সময়ে কোমরের কাছে একটা ঠান্ডা, শক্ত খোঁচায় বুঝলাম, আমার পিঠে একটা আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকানো হল।
"আজকেই ক্যাশ পাকিটে নিয়ে আপনি বাড়ি যাবেন মিঃ জটায়ু, ওনলি অন ওয়ান কন্ডিশন" হিসহিসে শয়তানী গলায় বলল মগনলাল, "মিঃ মিটারের হোয়ার অ্যাবাউটস এবারে বলে দিন আমাকে, আদারওয়াইজ আপনার আর কাজিনের বডি পাওয়া যাবে কাল নলবন ভেড়িতে, আগর সরকারি মছলিরা খাবার পর যদি কিছু বাকি থাকে।"
"আজকেই ক্যাশ পাকিটে নিয়ে আপনি বাড়ি যাবেন মিঃ জটায়ু, ওনলি অন ওয়ান কন্ডিশন" হিসহিসে শয়তানী গলায় বলল মগনলাল, "মিঃ মিটারের হোয়ার অ্যাবাউটস এবারে বলে দিন আমাকে, আদারওয়াইজ আপনার আর কাজিনের বডি পাওয়া যাবে কাল নলবন ভেড়িতে, আগর সরকারি মছলিরা খাবার পর কিছু বাকি থাকে।"
ঘরের আলোটা এখন যেন আরও নিবুনিবু। নিজের বুকের ধুকপুকুনির আওয়াজটা এখন ঘরে থেকে তো বটেই, মনে হচ্ছে আশপাশের ফ্ল্যাট থেকেও হয়ত শোনা যাবে, সুমনবাবুর চোখদুটো এত গোলগোল হয়েছে যে মনে হয় এবারে মণিদুটো ঠিকরে মেঝেতে পড়বে, এমন সময় বসে-যাওয়া-গলায় লালমোহনবাবু যেটা বললেন, সেটা একদম এক্সপেক্ট করিনি।
"অ! আর এদিকে আমরা তো ভাবছিলাম উনি আপনার খপ্পরেই পড়েছেন। তার মানে, মিঃ মিত্তির এখনও ফ্রি, মগনবাবু?"
মগনলাল নিশ্চয়ই লালমোহনবাবুর এতটা বেতোয়াক্কা ভাবটা এক্সপেক্ট করেনি, কিন্তু সেটাকে খুব একটা আমল দিল না। ওই অন্ধকারেও চোখদুটো ধক্ করে জ্বলে উঠল, সেই সাথে গলাটাও।
"সির্ফ দো অপশন হ্যায় আপ দোনোকে পাস। ইয়া মিত্তরের বডি ভাসবে ভেড়িতে, না তো আপনাদের দুজনের। আপনাদের ফিনিস করে দিলেও মিঃ মিত্তর এবার ইবারে আর আমার রীচ থেকে পালাতে পারবেন না। উই আর মাচ মোর অর অর্গানাইজড নাউ। দো দিন জাদা লাগবে বাস। ডিসক্লোস কোরে দিলে লাইফ পাবেন, রুপয়া ভি পাবেন, ফুল ব্ল্যাক মানি, ইক পইসা টেক্স লাগবে না, ফিল্ম হোবে, নাম আউর খাতির ভি হোবে। নাহলে, ফুল ট্রায়ো গায়ব।"
"নাউ চয়েস ইস ইওরস।"
[15]
"ঠান্ডাইটা ছেড়ে এখন হট ড্রিংকস ধরেছেন নাকি মগনবাবু? উঁহু, এ বয়সে এসব নেশা কিন্তু আপনার পক্ষে হাইলি ডেঞ্জারাস! " জটায়ু ইংগিতে নীল সাফারি সুটকে হাত ছাড়তে বলে নিজেই বেশ জমিয়ে বসলেন কালো সোফায়। মাথার ওপর হাত তুলে ক্যাজুয়ালি আড়মোড়াও ভেঙে নিলেন একবার।
মগনলাল চুপ। তাঁর হাঁটুদুটো অসহিষ্ণুভাবে ঢেঁকির মত উঠছে আর পড়ছে। এ জিনিস আগেও দেখা। এ হচ্ছে ক্রমশঃ রেগে যাওয়ার লক্ষণ। মেপে দেখছে জটায়ু কদ্দূর যেতে পারেন। আর আমি সব ভাবনাচিন্তার বাইরে উর্ধ্বে, একবার চিমটি কেটে নিলাম চুপিসারে, জেগে আছি কি না।
"তবে যাই বলুন, ভাং হোক কি মদ হোক, আপনার বাড়ির শরবৎ খেয়ে চিরকালই আমি শরীরে বেশ বল পাই, কি বল তপেশ?"
ঢেঁকির ওঠাপড়া ক্রমশঃ বাড়ছে। সাফারি সুটরা কান্ড দেখে বেশ অবাক। ওরা নিশ্চয় আর কোন লোককে তাদের মনিবের সাথে এই সুরে কথা বলতে দেখেনি। মগনলাল এবারে মুখ খুলল।
"আপনার কনফিডেন্স দেখে মালুম হচ্ছে আপনি মিঃ মিত্তরের হোয়্যারঅ্যাবাউটস জানেন। উনি এখোন কি ইখানে আছেন? ইস ঘরকে নজদিক? হয়্যার ইজ হি?"
জটায়ুকে এবার একটু বিমর্ষ দেখাল। "আমি জানলে কি আর আসতুম এখানে? স্যাডলি, আমি জানি না। তপেশও জানে না।"
"সে কাজিন কি জানে না জানে আমি খোবর রাখি। আমার ডাউট আপনাকে নিয়ে। আপনি জাদা স্মার্টনেস দিখাচ্ছেন ইসবার। ইসি লিয়ে। অওর ওই যে কী যেন আংকল মিঃ মিত্তরের- এ বুকওয়ার্ম লার্নেড ম্যান- উনার উপরেও লোক লাগানো আছে। মিঃ মিত্তর ট্রাস্টস বোথ অফ ইউ। আপনি কিন্তু বহোত রিস্ক নিচ্ছেন মিস্টার গাংগুলি। মাইন্ড ইউ। যদি কনফার্ম হই আপনি খোবর জেনে ভি আমাকে বোলছেন না, তো আপনার জান খতরে মে। এখোনো বলছি, ইনফারমেশন দিন, পেমেন্ট লিন, ফিল্লম করুন। ইস কি বাদ কুচ্ছু পাবেন না।"
জটায়ু চুপ। একদৃষ্টে তাকিয়ে মগনলালের দিকে। এমনকি হাঁটুও দুলছে একটু একটু, এটা কাঁপুনি না, দুলুনি। কাঁপুনিটা ভয়, এটা কনফিডেন্স ডিনোট করে। মগনলালও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আরেকটা চাল দিল। "আপকা জাগা ম্যায় হোতা তো ইয়ে গলতি কভি নহি করতা। মিস্টার মিত্তরকে আর আপনার জরুরত নাই রসগুল্লা বাবু। ইখন গুগোল আছে, ইকটা সেক্রেটারি রাখিয়ে দিবেন তো আপনাকে রিসার্চ ভি কোরতে হোবে না। আপনার ফেম অওর পাইসাও মিত্তরসে বহোৎ জাদা। লাস্ট মেনি ইয়ারস উনি কি কোরিয়েছেন আপনার জন্য? রেগুলার রিডিকিউল কোরেছেন আপনায় বহোতবার। আমার লোক আছে। আপনাদের এভরি অ্যাডভেঞ্চার পড়ে আমায় কিস্যা শুনায়। ইস কাজিন ভি আপনাকে কমেডিয়ান বানিয়ে স্টোরির সেল বঢ়িয়েছে।"
কী বলে কী শয়তান লোকটা? এটা শুনে এমন রাগ হল যে, যে হঠাৎ খেয়াল করলাম যে, পাহাড়ের দেশে কুয়াশা কাটার মত মন থেকে ভয়টা হঠাৎ ভ্যানিশ করে যাচ্ছে। মাথাটা এখন অনেক ঠান্ডা আর ক্লিয়ার। মাথা গরম হলে যে ক্ষেত্রবিশেষে ঠান্ডা হতে পারে, এই প্রথম দেখলাম। ধরেই নিয়েছিলাম এর পরে কপালে নানান নির্যাতন আছে, তবে এখন আর ভয় করছিল না। কিন্তু কেমন জানি হঠাৎ করেই মগনলালের তর্জনগর্জন থেমে গেল। হুকুম হল গেস্টদের খানাপিনা করানোর। সামনের সেন্টার টেবিলে ভাজাভুজি, উৎকৃষ্ট শরাবও চলে এল চটপট। এতক্ষণে বোধহয় একটু ধাতস্থ হয়ে সুমনবাবু আর তার দুই সংগী এমন মুখ চালাতে শুরু করলেন যে বিশ্বাস করাই কঠিন যে একটু আগেই একটু আগেই এঁরা পুরোদস্তুর ডিনার করে এসেছেন। এমনকি জটায়ুও আয়েস করে বসে নির্ভয়ে চিকেন বল আর ওয়াইনের দিকে হাত বাড়ালেন দেখে অবাক হতে গিয়েও নিজেকে চেক করলাম। এই মামলায় গোড়া থেকে এখনও পর্যন্ত হীরো যদি কাউকে বলতে হয় সে লালমোহন গাঙ্গুলি। কাজেই নতুন করে অবাক হওয়ার মানে হয় না। বলা হয়নি, মগনলালের মুড চেঞ্জ হওয়া মাত্রই খেয়াল করলাম আমার পিঠ থেকে বন্দুকের নল সরে গেছে।
রাস্তায়, মানে বাড়ির কোর্টইয়ার্ডে নেমে এসে নির্বিঘ্নে যে গাড়িতে উঠতে পারব সেটা মিনিট পনের আগেও ভাবতে পারিনি। দরজার লক খুলতে খুলতেও মনে হচ্ছিল যে নিশ্চয় লাস্ট মোমেন্টে রক্ত জল করা কিছু একটা ঘটবে। হয়ত মাছ খেলিয়ে তুলতেই মগনলালের আনন্দ। হয় গাড়ি চলবে না কিংবা চললেও চাঁদু রিভলভার দেখিয়ে আমাদের নিরুদ্দেশে নিয়ে যাবে, বা পিছন থেকে গুলি চালিয়ে কেউ টায়ার ফাঁসিয়ে দেবে। সে সব কিছু হলে এক হাত লড়ে যাব সেটাও।মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি। চাঁদু লোকটা মজবুত, তবে আমিও ফেলুদার সংগে সংগে কমদিন ক্যারাটের প্যাঁচ প্র্যাকটিস করিনি। মোক্ষম মুহূর্তে লালমোহনবাবু যে অনেকবার জ্বলে ওঠেন সেটা আগেও দেখেছি। আর এবার তো ভদ্রলোকের এলেম দেখে রীতিমত চমক লেগে যাচ্ছে। কাজেই, আমাদের হাপিস করা অতোটা সহজ হবে না।
কিন্তু এসব কিছুই ঘটল না। নির্ঝঞ্ঝাটে গাড়িতে উঠে যখন ভেড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছি, তখন হঠাৎ লালমোহনবাবু দেখি গুণগুণ করে গান ধরেছেন। কনফিডেন্স আর নার্ভ দেখে সত্যি বলতে কি, এবার একটু সন্দেহই হল, ধাঁধাও লাগল। তাহলে কি মগনলালের কথাই ঠিক? আসলে ফেলুদা গা ঢাকা দিয়ে আশপাশেই কোথাও থেকে জটায়ুকে গাইডেন্স দিয়ে যাচ্ছে? যে গানটা গাইছেন সেটাও চেনা, তবে লালমোহনবাবুও যে এটা জানেন সেটা একদম হিসেবের বাইরে।
চন্দ্রবিন্দু ব্যান্ডের "ভেসে যায় আদরের নৌকো" একলাইন গেয়ে জটায়ু বেশ রোম্যান্টিক সুরে বললেন, "এতক্ষণে এই ভেড়িতেই আমাদের বডি ফ্লোট করার কথা না, তপেশ?"
[16]
এক রাত্তিরে এর পরে যে আরও ঘটনা থাকতে পারে, সেটা ভাবতে পারিনি, যদিও সেরকম আমাদের অনেক মামলাতেই হয়েছে। মগনলালের গেটেড অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স থেকে বেরিয়ে গাড়ি স্ট্রেট সাউথের দিকে যাবে বলেই ভেবেছিলাম। জটায়ুর হঠাৎ করে চোখ নাচিয়ে চাঁদুকে বলা "একবার একটু ইলেক্টনিক কমপ্লেক্স থানাটা ঘুরে যেতে হবে ভাই, চেনো তো?" বলাটায় তাই বেশ হকচকিয়ে গেলাম। কি মতলব ভদ্রলোকের? জিজ্ঞেস করায় একটা প্রাইসলেস হাসি দিয়ে বললেন "চলোই না! তোমার দাদার অ্যাবসেন্সে তো এর আগেও আমি লিডিং পার্ট নিয়েছি ভাই। এবারে অনুপস্থিতিটা একটু লম্বা, এই যা। "
থানায় এমন সায়েবী চালে লালমোহনবাবু ঢুকলেন যে দরজার কনস্টেবলটি কারণ জিজ্ঞেস করব করব করেও করল না। উল্টে জটায়ুই তাকে ডেকে "হয়্যার ইজ দি অফিসার ইন চার্জ অব দিস পুলিস স্টেশন" বলে হাঁক দিয়ে প্রশ্ন করায় সে মুখে কিছু না বলে, আঙু্ল দিয়ে একটা ঘর দেখিয়ে দিল। ঢোকার আগে দরজার বাইরের ওপরের দিকে সাঁটা লেবেল দেখে জটায়ু কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ভাল করে পড়ে নিয়ে টেবলের ওপরে বসা এক টাকমাথা অফিসার, যিনি কি একটা ফাইল পড়তে পড়তে একপ্রকার ঘুমিয়েই পড়েছিলেন, তাঁকে আচমকা "হেললো, অফিসার চ্যাটার্জী” বলে সম্বোধন করতেই ভদ্রলোক চমকে উঠে চোখ কপালে তুলে " আজ্ঞে এখানে চ্যাটার্জী বলে তো কেউ.. আমার নাম এস মুখার্জি " বললেন। জটায়ু চটপট নিজের ভুলটা সামলে নিয়ে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে একটুও হোঁচট না খেয়ে বললেন " হোয়াটেভার- আমার একটা ডাইরি না এফ আই আর কি আপনারা বলেন, করতে হবে ইমিডিয়েটলি।" আমি আর কি করি পরিস্থিতি সামলাতে দু'একবার সরি-টরি বলে দেখলাম ভদ্রলোক বিশেষ কান না দিয়ে বরং জটায়ুকেই ইমপর্ট্যান্স দিয়ে চটপট একটা কম্পিউটারের মাউস নাড়াচাড়া করে সেটাকে জাগিয়ে তুললেন। ওঁকে ইঙ্গিতে সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে দিলেন। জটায়ু গ্যাঁট হয়ে বসলেন। আমি অবিশ্যি একদম ক্লুলেস কি নিয়ে এত গভীর রাতে জটায়ু হঠাৎ থানায় কমপ্লেন করছেন। মনে তো হয় লাইফে প্রথমবার। লালমোহন বাবুর ফোনটা মগনলালের ঘরে পড়ে গেছল দেখেছি, সেটার ব্যাপারেই কি? এর মধ্যেই এই মুখার্জি ভদ্রলোক যেন আমার মনের কথা জানতে পেরেই জিজ্ঞেস করলেন "কী কিছু চুরি ছিনতাই-টিনতাই? চোরকে চিনলে এফ আই আর করতে পারেন অবশ্য, তবে না চিনলে জি ডি করাই ভাল। কি গেল? ফোন বা পার্স জাতীয় কিছু?"
"ওসব কিস্যু নয়, আমাকে ইন্টিমিডিয়েট, না, মানে ইন্টিডিমেট, থুড়ি, ইন্টিমিডেট করা হয়েছে, মানে ইন্টেনশন্যালি থ্রেটন করা হয়েছে, বাই ওয়ান হাইলি সাসপিশাস, শুধু তাই নয়, পাওয়ারফুল কনফার্মড ক্রিমিন্যাল মগনলাল মেঘরাজ। অ্যান্ড" বলে একটা মোক্ষম নাটকীয় পজ নিয়ে পকেট টকেট হাতড়ে " অ্যান্ড, হিয়ার ইজ দ্য প্রুফ"। বলে ঠক্ করে টেবলে রাখলেন তাঁর মোবাইল ফোন। কখন কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে পুরেছেন, জানি না।
মুখার্জি এবার দৃশ্যতই চমকে তাকালেন লালমোহনবাবুর দিকে, চোখ সতর্ক। " মগনলাল... মানে বেনারস বর্ন? আপনি চেনেন ওনাকে? মানে রেকগনাইজ করতে পারবেন?"
রেকগনাইজ মাই লেগ, ইয়ে, ফুট। এই তো ওঁর বাড়িতে মদটদ খেলুৃম, আবার ব্রাইব করতে চাইলেন, থ্রেটও করলেন, জাস্ট ফিউ মিনিটস ব্যাক!"
মুখার্জির মুখের চেহারাটা এবার দেখার মত হল। এদিকে গাল ঝুলে পড়ছে, আবার ওদিকে পুলিশি একটা গাম্ভীর্যও কোত্থেকে এসে বসছে। গলাটাও হঠাৎ সিরিয়াস, "আপনি বলছেন, নোন ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিন্যাল মগনলাল মেঘরাজের প্রেসেন্স এই পয়েন্ট অফ টাইমে এই লোক্যালিটিতে আছে? আর, আপনি তার লেটেস্ট হোয়্যারঅ্যাবাউটস জানেন? "
এবার আমাকে খানিকটা জোর করেই জটায়ুর পাশের চেয়ারে বসে পড়ে মুখার্জিকে পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করতে হল। হঠাৎ-পাওয়া স্মার্টনেসের ঠেলায় লালমোহনবাবু যে ক্রমাগত নিজেকে প্যাঁচে জড়িয়ে ফেলে পুলিশের চোখে প্রায় মগনলালের স্যাঙাৎ প্রমাণ করে ফেলছেন, সেটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল না। ফেলুদার নাম না করে এক্ষেত্রে উপায় নেই, আর সেটাতে মন্ত্রের মত কাজ হল। মুখার্জি এবারে চেয়ার থেকে অল্প উঠে লালমোহনবাবুকে একটা নমস্কারের আভাস দিয়ে বললেন, "ওঃ, আপনিই সেই ফেমাস জটায়ু? আরে, দেখুন দেখি, প্রদোষবাবুর গপ্প পড়ে আপনার সম্পর্কে যেরকম মনে হয়, আপনি তো দেখছি তেমনটা একেবারেই নন? অবশ্য ওটা বোধহয় ক্রিয়েটিভ লাইসেন্স, তাই না?" শেষ কথাটা অবিশ্যি আমার দিকে তাকিয়ে বলা, আর সেটাতে আমার জটায়ুর ওপর একটু রাগই হল। এ মামলায় এভাবে উনি ক্যারেকটার চেঞ্জ করে ফেলে আমাকেই বেশ মুশকিলে ফেলে দিয়েছেন। এর ওপর আবারকানে কানে জটায়ুর টিপ্পনী, "তোমার গল্পগুলো ইদানীং কি তেমন কাটছে না ভাই তপেশ? এত করে পরিচয় দেয়া, তাও পুলিশের কাছে, এরকমটা তো আগে দেখি নি?"
মুখার্জি ইতিমধ্যে টকাটক কম্পিউটারে কি সব টিপে বোধহয় কেস রেকর্ড-টেকর্ড পড়ে আবার খানিক থতমত খেয়ে বললেন, "এ কি ! রেকর্ডে যে দেখছি প্রদোষ মিত্তির নিখোঁজ? ওনাকেই খুঁজতে ডায়রি হয়েছে? এ কি কান্ড মশাই?
"সেইটিই তো আরও জানতে এলুম। মিঃ মিত্তির মিসিং, আপনাদের দিক থেকে নো প্রগ্রেস, উল্টে আমাদেরই কাছ থেকেই তার হোয়ারঅ্যাবাউটস জানতে চেয়ে ডেথ থ্রেট দিচ্ছে ভিলেন, আইন কানুন কি একদম লাটে উঠে গেল না কি, অ্যাঁ?"
লালমোহন বাবুর মেজাজ দেখে এবার মুখার্জি সত্যিই ঘামতে শুরু।করেছেন। কাকে যেন ফোন করে খোঁজটোঁজ নিলেন, আর আমি লালমোহন বাবুকে রীতিমত অ্যাডমায়ার করতে শুরু করলাম। এই কেসে এখনও পর্যন্ত ওঁর যা পারফর্ম্যান্স, খুবই ইন্সপায়ারিং বলতে হবে।
মিঃ মুখার্জি খুবই খাতিরটাতির করে আমাদের বাইরে অবধি পৌঁছে দিলেন। তার আগে অবিশ্যি লালমোহন বাবুর ঠিকানা, ফোন নম্বর এসব টুকে নেয়া হয়েছে। গাড়িতে ওঠার সময় বললেন, " "কয়েকটা দিন একটু সাবধানে থাকবেন, কেউ কোথাও ডাকলে টাকলে ফস করে একা চলে যাবেন না। অন্ততঃ এই ভাইপোটিকে নিয়ে যাবেন। এখন আমাদের যা স্টাফ শর্টেজ, নইলে মগনলালের ব্যাপারটার পর আপনাকে একটা সিকিউরিটি দেয়া আমাদের ডিউটি ছিল।"
———————————————————————————————————-
"এমনিতেই লকডাউনের কারণে খুব একটা যে বেরোচ্ছি তা না তবে ফেলুবাবুর কোন খবরটবর পেলে ঘরে বসে থাকব না, বলে দিলুম", খুব রোয়াবের ওপর বলে চাঁদুকে গাড়ি চালাতে ইশারা করলেন জটায়ু। গাড়িও হ্যাঁচকা মেরে এগোল। যে কথাটা জিগ্যেস করব কি করব না ভাবছিলাম একবার তাকাতেই জটায়ু যেন সেটাই আন্দাজ করে নিয়ে দিয়ে দিলেন।
"লকডাউনে আটকে থাকার সময়টায় ফোন দেখে দেখে বিপাসনা মেডিটেশন করাটা খুব কাজ দিয়েছে ভাই।"
[17]
রাত প্রায় শেষ করে বাড়ি ফিরে একটু বকুনি যে খেতে হল না, তা নয়, তবে লালমোহনবাবু সঙ্গে করে পৌঁছে দিয়ে দেরীর জন্য রিগ্রেট করে যাওয়ায়, সেটা একটু কমের ওপর দিয়ে গেল। ফেলুদার অবিশ্যি এখনও কোন হদিশ নেই, তবে ফেলুদা যে অ্যাট লিস্ট মগনলালের হাতে ধরা পড়েনি সেটা ভেবে অনেকটাই রিলিভড লাগছিল। ফেলুদাকে হাতে পেলে, এমনকি মগনলালও আমাদের সামনাসামনি থ্রেট করার রাস্তায় যেত না। সত্যি কথা বলতে কি, লালমোহন বাবুর বিধ্বংসী ফর্মও ভরসা যোগানোর একটা বড় কারণ তাতে সন্দেহ নেই। উনি যে ফোনের রেকর্ডিং অন করে হাত থেকে আলগোছে ফেলে দিয়ে প্রমাণট্রমাণ সংগ্রহ করে করে আবার সবার নজর এড়িয়ে সেটা কুড়িয়ে নিয়ে এসে প্রমাণ হিসেবে পুলিশে দাখিল করবেন, এতটা আন্দাজ করা বোধহয় ফেলুদারও অসাধ্য হত। বিপাসনা না উপাসনা, কিসে এমনটা হয় জানা নেই। তবে ড্রাগ বা ডোপিংয়ে হয় বলে শুনেছিলাম। কিন্তু সেটা তো আর ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করা যায় না!
পরের দিন সকালে বেলা আটটায় যখন জটায়ুর ফোন পেলাম তখন আমি অনেকটাই কনফিডেন্ট। গতরাতের ঘটনাপ্রবাহ নার্ভ স্টেডি করে দিয়েছে। যদিও অত তাড়াতাড়ি কোন ডেভেলপমেন্ট আশা করিনি। বেশ উত্তেজিত হয়ে জটায়ু জানালেন, মিনিট দশেক হল সল্টলেক ইলেকট্রনিক কমপ্লেক্স থানা, মানে যেখানে গতকাল বেশী রাতে গিয়েছিলাম, সেখান থেকে ওঁকে ফোন করে ডেকে পাঠান হয়েছে। আমাকেও নিয়ে যেতে বলেছে। আমাদের কমপ্লেনের ব্যাপারে না কি কি সব ক্লু ওরা পেয়েছেন, অ্যারেস্টট্যারেস্টও হয়েছে, আমাদের আইডেন্টিফাই করা জরুরী। ফেলুূদার নামের ওজনের কারণে বেশীর ভাগ কেসে পুলিশ আমাদের হেল্পই করেছে, কিন্তু তাই বলে এত তাড়াতাড়ি মামলার এতটা প্রগ্রেস হলে ডিপার্টমেন্টের খুবই উন্নতি হয়েছে বলতে হবে।
বেরোবার সময় বাবা অবিশ্যি সংগে যেতে চেয়েছিলেন, ধমকটমক দিয়ে সেটা থামাতে হল। এই ইনফেকশনের বাজারে পুলিশ থানায় যাওয়াটা ওঁর পক্ষে একদমই উচিত নয় বলেই মনে হল। ফেলুদা থাকলে কিছুতেই অ্যালাউ করত না। তবে বাবার পরামর্শ অনুযায়ী পাসপোর্ট, আধার কার্ড, ভোটার কার্ড সবই সংগে নিয়ে নিলাম। এদিকে জটায়ু সকাল থেকে ফোন করে করে চাঁদুকে না পেয়ে নিরুপায় হয়ে ড্রাইভার সেন্টার থেকে বদলি ড্রাইভার নিয়েছেন। বললেন আধ ঘন্টার মধ্যেই তুলে নেবেন
পুলিশ স্টেশনের দরজায় আজ অন্য কনস্টেবল, সে আমাদের ঢোকার মুখেই আটকে আসার কারণ জিজ্ঞেস করল। আজ লালমোহন বাবু বেশ উস্কোখুস্কো, রাতের ঘুম কম হওয়ায় চোখের তলায় কালি, একটু বেশী চুপচাপও। হয়তো কাল অনভ্যস্ত পানভোজনের ফল। কাজেই আমাকেই কথা বলতে হল। জটায়ুর পরিচয় দিতেই অবিশ্যি সটাং আমাদের কালকের সেই মুখার্জির কাছে নিয়ে যাওয়া হল। মুখার্জির মুখটা কাল একটু অভিভূত গোছের ছিল, আজ বেশ কঠিন। হয়ত বেশী রাতে পুলিশি ভাবটা একটু কমে গিয়েছিল, এখন আবার কড়া মেজাজটা ফিরে পেয়েছেন। জটায়ুকে ইংগিতে বসতে বলে কি সব কাজ সেরে কাকে কাকে জানি ফোন করে ঘর একটু খালি করে আমাদের দিকে ফিরলেন। “একবার লক আপে যেতে হবে স্যার একটা মেজর ব্রেকথ্রু হয়েছে। মিঃ মিত্তিরের ডিস্যাপিয়ারেন্স কেসের সাথে এর লিংকও পাওয়া গেছে। অ্যারেস্টেড লোকটিকে আপনাকে আইডেন্টিফাই করতে হবে।"
পাশের দুটো ঘর পেরিয়ে থানার পিছন দিকের একটা অতি নোংরা ঘরে লক আপ। সত্যি বলতে কি, এরকম ঝাঁ চকচকে থানার ভিতরে যে এরকম জঘন্য ঘর আছে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। সবুজ সেকেলে শস্তার পেন্ট, তাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, টিমটিমে আলোয় তার মধ্যেই দেওয়াল জোড়া পানের পিক চোখে পড়ছে। এরই মধ্যে মেঝেতে শুয়ে থাকা কয়েকটি লোকের মধ্যে নাম ধরে পুলিশি হাঁকের ফলে যে লোকটি আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে উঠল, তার চোখ দুটো ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে। মুখার্জি ডাকলেন "বাচ্চু সরকার!"
যে লোকটি উঠে দাঁড়াল, আমরা তাকে চিনি চাঁদু নামে। বিগত মাসখানেক ধরে জটায়ুর অস্থায়ী ড্রাইভার!
[18]
পাশের দুটো ঘর পেরিয়ে থানার পিছন দিকের একটা অতি নোংরা ঘরে লক আপ। সত্যি বলতে কি, এরকম ঝাঁ চকচকে থানার ভিতরে যে এরকম জঘন্য ঘর আছে, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। সবুজ সেকেলে শস্তার পেন্ট, তাও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, টিমটিমে আলোয় তার মধ্যেই দেওয়াল জোড়া পানের পিক চোখে পড়ছে। এরই মধ্যে মেঝেতে শুয়ে থাকা কয়েকটি লোকের মধ্যে নাম ধরে পুলিশি হাঁকের ফলে যে লোকটি আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে উঠল, তার চোখ দুটো ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছে। মুখার্জি ডাকলেন "বাচ্চু সরকার!"
যে লোকটি উঠে দাঁড়াল, আমরা তাকে চিনি চাঁদু নামে। বিগত মাসখানেক ধরে জটায়ুর অস্থায়ী ড্রাইভার!
"আমার সব কটা সন্দেহ যে এভাবে মিলে যাবে সেটা ভাবতেই পারিনি" বলে জটায়ুর সামনে জটায়ুর স্টাইলেই লাফিয়ে উঠতে পারলে বেশ হত, কিন্তু থানার মধ্যে সেটা বাড়াবাড়ি হবে ভেবে সামলে নিলাম। এদিকে জটায়ু কিন্তু চাঁদুকে লক আপে দেখে একেবারেই ভেঙে পড়লেন। পা টা একটু টলে গেল, আমি সময় মত ধরে না নিলে হয়ত পড়েই যেতেন। ভদ্রলোকের মুখ এত হাঁ হয়ে গেছে যে মনে হচ্ছে আর কোনদিন বন্ধই হবে না। মুখার্জিও বোধহয় এতটা রিয়্যাকশন আশা করেন নি, তাই তাড়াতাড়ি নিজের ঘরে গিয়ে ভদ্রলোককে বসিয়ে চা অফার করলেন। ওঁর ঘরে আরেকজন চেনা লোকের সঙ্গে দেখা হল, যদিও ঘটনার ঘনঘটায় আর মুখোশের কারণে প্রথমে একদম চিনতেই পারিনি। নিজেই মাস্কটা খুলে হেঁ হেঁ হাসিটা শুরু করায় চিনতে পারলাম। আমাদের পাড়ার থানার মেজবাবু অচিন্ত্য মন্ডল। ফেলুদার মিসিং ডায়েরির ব্যাপারে উনিই আমাদের বাড়িতে তদন্ত করতে এসেছিলেন।
"একবার যখন লেজ ধরতে পেরেছি মশাই, টেনেটুনে ঠিক অজগর বার করে আনব। খবর ঠিক বার করব, তবে মিস্টার মিত্তিরকে অ্যালাইভ আর পাব কি না শিওর নই। আমরা মগনলালের অ্যাংগলে ভাবছিলাম, আর সেই রিলেশনেই আপনার কমপ্লেনের কানেকশনে এই বাচ্চু সরকারকে তোলা হল, কিন্তু সত্যি বলতে কি পুরনো নতুন মিলিয়ে ফেলুবাবুর শত্রুর সংখ্যা কি কম? লকডাউন সিচুয়েশনে অ্যানোনিমাস অবস্থায় বেকায়দায় পেলে তাদের অনেকেই ওঁকে নিকেশ করে দিতে কসুর করবে না। এটাই ভাবাচ্ছে।
খানিক আগেই সন্দেহ ফলে যাওয়ায় মনে যেটুকু ফুর্তি হয়েছিল, মন্ডলের কথা শুনে তার চেয়ে সাতগুণ মন খারাপ হয়ে গেল এটা বোধহয় বলাই বাহুল্য। ছবি তুললে বোধহয় জটায়ুর থেকে এখন আমাকে বিশেষ ভাল দেখাত না। এই অবস্থায় বাড়ি ফিরলে বাবা-মা মুখ দেখেই কিছু একটা আঁচ করে নিয়ে ভেঙে পড়বেন। সেটা এড়াতে, থানা থেকে বেরিয়ে এসে দুজনে পরামর্শ করে সোজা বাড়ি না ফিরে সিধুজ্যাঠার ওখানে একটা ঢুঁ মেরে যাব বলে স্থির করলাম। খবরগুলোও দেয়া দরকার, আর উনি ঠান্ডা মাথার মানুষ, হয়ত কথা বললে আমাদেরও মনের জোর খানিকটা ফিরে আসতে পারে।
কয়েকদিনের মধ্যে সিধুজ্যাঠার যে আরও আধহাত দাড়ি বেড়ে কেমন রুক্ষ রবীন্দ্রনাথ গোছের হয়ে গেছে দেখে বেশ অবাক লাগল। চিরকালের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন মানুষ, এই প্যানডেমিকে কি রকম মুশকিলে পড়েছেন দেখে খারাপ লাগে। ওঁর যদিও সে সব নিয়ে বিশেষ মাথাব্যথা আছে বলে মনে হল না। ঢুকতে ঢুকতেই পুরনো পুরনো বইপত্রে একশ বছর আগে ফ্লু-র প্যানডেমিকের ইনফরমেশন, অজস্র রেফারেন্স সহ বলতে শুরু করলেন। সে স্রোত খানিকটা কমলে পরপর ঘটনাগুলো জানালাম। লালমোহনবাবু গোটা সময়টাই মাথায় হাত দিয়ে বসে, কালকের লোকটার সাথে আজকের লোকটাকে যেন মেলানোই যায় না। সব শুনে সিধুজ্যাঠা যে প্রস্তাবটা করলেন, সেটা এত বছরে এই প্রথম। বললেন, বাড়িতে বলে দাও, চাও তো আমিও বলে দিতে পারি, আজ রাতটা দুটিতে আমার এখানেই থেকে যাও। এক কালে ভালই রান্নার হাত ছিল হে! আজ তোমাদের এক রকম স্প্যানিশ মুরগি খাওয়াব। দিল খুশ না হলে লড়া যাবে কি করে! সত্যি, আশ্চর্য লোক বটে এই সিদ্ধেশ্বর বোস! সাধে ফেলুূদা চিরকাল জ্যাঠা বলে এত মান্যিগণ্যি করে, যদিও ব্লাড রিলেশন নেই।
সত্যি বলতে কি, সেদিন রাতটা ওখানে না কাটালে যে কি হত, সেটা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।
[19]
সব শুনে সিধুজ্যাঠা যে প্রস্তাবটা করলেন, সেটা এত বছরে এই প্রথম। বললেন, বাড়িতে বলে দাও, চাও তো আমিও বলে দিতে পারি, আজ রাতটা দুটিতে আমার এখানেই থেকে যাও। এক কালে ভালই রান্নার হাত ছিল হে! আজ তোমাদের এক রকম স্প্যানিশ মুরগি খাওয়াব। দিল খুশ না হলে লড়া যাবে কি করে! সত্যি, আশ্চর্য লোক বটে এই সিদ্ধেশ্বর বোস! সাধে ফেলুূদা চিরকাল জ্যাঠা বলে এত মান্যিগণ্যি করে, যদিও ব্লাড রিলেশন নেই।সত্যি বলতে কি, সেদিন রাতটা ওখানে না কাটালে যে কি হত, সেটা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।
সিধুজ্যাঠা প্রায় ঘন্টা দুই ভারতীয় ও ইউরোপীয় রান্নার তফাৎ নিয়ে বোঝাতে বোঝাতে প্রচুর পাঁয়তাড়া করলেন বটে, খেতে বসে সত্যি বলতে কি, একটু নিরাশই হতে হল। স্পেনের লোকেরা এত আলুনি খায় কি না জানি না, তবে এতটা মিষ্টি খায় বলে মোটেই মনে হয় না। এ কথাটা অবিশ্যি সিধুজ্যাঠাকে বলার প্রশ্নই নেই। সাহসও নেই। ফেলুদা হলেও পারত কি না, জানি না।
লালমোহনবাবুর থতমত মুষড়ে পড়া ভাবটা রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েই চলল। সিধুজ্যাঠা দেখলাম বেশ রাত করেই খাওয়া সারেন। রান্না শুরুই হল প্রায় রাত নটায়, খেয়ে উঠতে উঠতে রাত বারোটার কাছাকাছি। তার ওপর আবার নিজের হাতে থালাবাসন ধোয়া চাই। আমি করে দিতে চাইলে জোর ধমক দিয়ে বললেন, "যে রেকাবিটায় তোমাদের সালাড দিলাম ওর বয়স, ব্যাকগ্রাউন্ড আর পেডিগ্রি জান? আমার এক বছরের খাইখরচ উঠে আসবে ওই একটি বেচলে। তুমি খোকা মানুষ, তার ওপর এখন যা মনের অবস্থা দেখছি, তোমার হাতে ও জিনিস ছাড়া চলে না।"
জটায়ু খেতে খেতেই অবসন্ন হয়ে প্রায় ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। দোষ দেয়া যায় না ওঁকে। একে তো গত চব্বিশ ঘন্টা প্রচন্ড ধকল গেছে, মনের অবস্থাও বুঝতেই পারছি। একটা অদ্ভুত জিনিস লক্ষ্য করলাম। নানান মামলার ব্যাপারে জটায়ু অনেকবারই আমাদের সঙ্গে রুম শেয়ার করেছেন। আমি আর ফেলুদা অনেকবার আড়ালে আলোচনা করেছি যে লালমোহনবাবু হচ্ছেন এমন ধরণের লোক যিনি এমনি নিরীহভাবে বসে থাকলেও দেখে হাসি পায়। এমন কী যে ওঁর সম্পর্কে কিছুই জানে না, আমার বিশ্বাস সে-ও ওঁকে ঘুমিয়ে থাকতে দেখলেও হেসে ফেলবে। আজ প্রথমবার দেখলাম মানুষটার মুখটা ঘুমের মধ্যেও করুণ দেখাচ্ছে। দেখলে বেশ মায়াই হয়।
আমার অবিশ্যি রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না। এইখানে বলে রাখি সিধুজ্যাঠা আমাদের শুতে দিয়েছিলেন ওঁর পড়ার ঘরেই, আরাম করে বসে পড়ার জন্য সেখানেও একটা চৌকি আর একটা বড় সোফা আছে। জটায়ুকে চৌকি ছেড়ে দিয়ে আমি সোফাতেই রাতটা কাটিয়ে দেব ঠিক করেছিলাম। জটায়ুর শোবার জন্য অবিশ্যি সিধুজ্যাঠার পড়বার ডেস্কটাকে খাট থেকে নামিয়ে ঘরের কোণায় চালান করা হল। বেশ ভারী জিনিসটা। জ্যাঠা বললেন, খাঁটি বার্মাটিক।
লালমোহনবাবু ফুরফুর করে নাক ডাকছেন, করিডরের ওপাশে শোবার ঘর থেকে জ্যাঠার গলা খাঁকারির আওয়াজ, মাঝে দু একবার চুরুটের গন্ধ, বইপত্র জলের গেলাস নাড়াচাড়ার খসখস ঠুংঠাং শব্দ পাচ্ছি, ঘুমচোখেই দেয়ালঘড়িতে যেন রাত দুটো বাজতে দেখলাম, এমন সময় কখন জানি ঘরটা ভ্যানিস হয়ে একটা সায়েবী হোটেলের ঘর হয়ে গেল। কালো সোফায় কালো সুট পরা লোক ছাল ছাড়িয়ে কি সব খাচ্ছে। প্লেটের দিক থেকে একটা আওয়াজ আসায় তাকিয়ে দেখি সেগুলো জ্যান্ত মুরগি। একটা লোক, ধুতি-পরা, জ্যান্ত মুরগির পা-ডানা অবলীলায় ছিঁড়ে মুখে পুরে দিচ্ছে, আর মাঝে মাঝেই ছিক করে পিকদানিতে রক্ত ফেলছে। " ওয়েল মিস্টার গাঙ্গুলি, আংকল মিত্তরসাবের পতা আভ্ভি দে দিজিয়ে অওর শখসে ফিল্লম বনাইয়ে!" মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি সেটা জটায়ুর ড্রাইভার চাঁদু, ওরফে বাচ্চু সরকার। এর পর বাচ্চু হঠাৎ দেখি গায়ে মুড়ি দিয়ে রাখা আলোয়ানের ভিতর থেকে হাতড়ে একটা মুভি ক্যামেরা বের করে উল্টোদিকে বসা জটায়ুর দিকে বাড়িয়ে দিল। জটায়ুর পরণে লাল পাঞ্জাবি, নীল জীনস, গায়ে হালকা সবুজ রঙের চাদর জড়ানো, চোয়াল শক্ত, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, ঠোঁটের একপাশে সিগারেট ঝুলছে, লাইটার দিয়ে ধরিয়ে নিতে চারমিনারের চেনা গন্ধও পেলাম স্পষ্ট। ভদ্রলোক পায়ের ওপর পা তুলে বসে বিখ্যাত একপেশে হাসিটা হেসে সবে বলেছেন, "লকডাউন গাঙ্গুলি নয় মিস্টার মিটার, আমার নাম মগজাস্ত্রলাল মেঘরাজ, অমনি চাঁদুর মুখটা পাল্টে কেমন পুলিশের মিস্টার মুখার্জির মত হয়ে গেল আর পাশে বসা ডিরেক্টর সুমন আহমেদ বিল্টুর হাত থেকে পড়ে সিধুজ্যাঠার দামী রেকাবি ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ল।
চমকে চটকাটা ভাঙল, সত্যিই কোথায় যেন কি একটা ভাঙার আওয়াজ হল না? অন্ধকারের মধ্যেই খানিকক্ষণ চুপচাপ কান খাড়া করে শুয়ে রইলাম। ঘরের মধ্যে ফ্যানের আওয়াজ, লালমোহন বাবুর নাক ডাকা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়ে একটা ফিকে নিশ্বাসের শব্দ, দূরে কোথাও একটা বেড়াল ডেকে উঠল, কারও বাড়িতে একটা মৃদু আওয়াজে একটা কম্পিউটার অন বা অফ হল, এরই মধ্যে ঝনঝন করে দ্বিতীয়বার কাচ ভাঙার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ঝুপ করে একটা শব্দ, তারপরেই একটা গোঙানির আওয়াজ, গলা শুনে মনে হল সিধুজ্যাঠা!
[20]
চমকে চটকাটা ভাঙল, সত্যিই কোথায় যেন কি একটা ভাঙার আওয়াজ হল না? অন্ধকারের মধ্যেই খানিকক্ষণ চুপচাপ কান খাড়া করে শুয়ে রইলাম। ঘরের মধ্যে ফ্যানের আওয়াজ, লালমোহন বাবুর নাক ডাকা প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়ে একটা ফিকে নিশ্বাসের শব্দ, দূরে কোথাও একটা বেড়াল ডেকে উঠল, কারও বাড়িতে একটা মৃদু আওয়াজে একটা কম্পিউটার অন বা অফ হল, এরই মধ্যে ঝনঝন করে দ্বিতীয়বার কাচ ভাঙার আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে ঝুপ করে একটা শব্দ, তারপরেই একটা গোঙানির আওয়াজ, গলা শুনে মনে হল সিধুজ্যাঠা!
"লালমোহন বাবু উঠুন, বাড়িতে বিপদ" বলে হাঁক দিয়েই লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজার দিকে দৌড়লাম। চোখ অভ্যস্ত হয় নি, ঘরটাও প্রায় অচেনা, সুইচটা কোন দিকে তাও মনে নেই, কাজেই কিসে যেন একবার হোঁচট খেলাম। হুমড়ি খেয়ে পড়তেই পড়তেই দরজা ঠেলে বেরিয়ে করিডর পেরিয়ে অন্য ঘরটায় ঢুকেই দেখি, খাটে শোয়া সিধুজ্যাঠার গলায় রিভলভারের নল ধরা। আরেকটা মুশকো লোক একটা বালিশ দিয়ে জ্যাঠার পা দুটোর নড়াচড়া বন্ধ করতে চাইছে। ঘরে আমি যে ঢুকব সেটা বোধহয় হিসেবের মধ্যেই ছিল, কারণ ঢোকা মাত্র আরেকটা লোক আমায় পাকড়ে পিছমোড়া করে চেপে ধরল। গোলমালের মধ্যেও হাতের বালা আর উলকিটা চিনতে পারলাম। বাচ্চু সরকার আর চাঁদু, এই দুটো নামে একে আমরা চিনি।
এতক্ষণে জ্যাঠার মুখ থেকে কথা আর টেবিলের ড্রয়ার হাতড়ে চাবি বার করে একজন বাড়ির সদর দরজার তালা খুলতে চলে গেছে। দরজা খোলার পর, খেয়াল করে শুনতে পেলাম একটা কোন দামী ভারী মডেলের গাড়ির এঞ্জিন চালু ছিল, বন্ধ হল। দরজার দিকে জুতো মচমচিয়ে আর খুক খুক করে কাশতে কাশতে ঘরে ঢুকল মগনলাল।
"বহোত শুভ অবসর আজ, এক সাথ দো দো লার্নেড রেসপেক্টেবল লোককে মিট করা, হমার মত গাঁওয়ার অনপড় আদমীর উপর বুজুর্গদের বহোত মেহেরবানী। আমার খুব সাধ ছিল আংকল বোস কি আপনাকে অওর আংকল রসগুল্লামোহন গাঙ্গোলিকে এক সাথ আমার কোঠিতে রাখি। আকবর বাদশার যেমন নওরতন ছিলেন, ছিলেন না? ওহি টাইপ। কামকাজে ইতনা ঝামেলা-উমেলা না হলে উসব সাধ পুরা ভি হয়ে যেত। লেকিন ইয়ে মিস্টার মিত্তরকা অ্যায়সা আওকাদ, বার বার হমার কারবার গবা করতে চান। বহোৎ না ইনসাফি।"
ইতিমধ্যে মগনলালের চোখের ইশারায় সিধুজ্যাঠাকে অনেকটা স্বাভাবিকভাবে খাটে বসতে দেয়া হয়েছে, যদিও দু-দুটি পিস্তল তার দিকে তাগ করা। আর আমারও কানের পাশে থেকে রিভলভারের নল একটুও সরেনি। জটায়ু অবিশ্যি এখনও ঘরে ঢোকেননি। হয় ঘুম ভাঙেনি, নয় পরিস্থিতি বুঝতে পেরে অন্য কোথাও ঘাপটি মেরে রয়েছেন। দ্বিতীয়টা হলে, ধরয় না দিয়ে খুব বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন, এটা বলতেই হবে। অন্ততঃ একজন আমাদের পক্ষে আছে, যে লোকটা এখনও ফ্রি, আর কঠিন পরিস্থিতিতে অনেকবারই সাহসের কাজ করে দেখিয়েছে, এটাই আশা।
"তারপর? কদ্দিন আর আপনি আপনার কোঠিতে মিত্তরকে হাপিস করে রাখবেন, বোস সাহিব? আপনি লার্নেড ম্যান, আর ইটা সমঝলেন না কি হম ভি বুড়বাক নহি? আপনার উপর পেহলা দিনসে হমার আদমী ফিট আছে, ফির ভি ইতনা দিন সে ক্লু কুছ মিলা নহি। আর ইখন তো পুলিসমে ভি হমার সোর্স আছে, পাক্কা খোবর আছে কি, ইউ ডেফিনিটলি নো কি হয়্যার ইজ মাই রাইভ্যাল।"
সিধুজ্যাঠার কপালের কোণের একটা দিক সামান্য কেটে রক্ত ঝরছে। একটু ছাড়া পেয়ে ফতুয়ার পকেট থেকে রুমাল বের করে সেটা মুছে মোটা চশমাটা পরে জ্যাঠা উঠে বসলেন। মুখেচোখে একটা দিব্যি নিশ্চিন্ত ভাব। "আজ রাত্তিরটা তো জেগেই কাটবে বলে মনে হচ্ছে, তোমার ওই গুন্ডোগুলোকে বলবে আমার টেবলের ড্রয়ার থেকে আমার সিগারের বাক্স আর দেশলাইটা এনে দিতে? বুদ্ধির গোড়ায় একটু ধোঁয়া দিতে হবে যে ভাই মগন? তুমিও টান দেবে না কি একটা?"
এত বেতোয়াক্কাভাব মগনলালের আর যে সহ্য হচ্ছে না সেটা বুঝতে একটুও অসুবিধে হয় না। প্রকান্ড একটা ভাল্লুকের মত ফুঁসতে ফুঁসতে সে উঠে এল, মুখের ভাষার পালিশটা ঝরে গিয়ে বেনারসের গলির আসল লোকটা বেরিয়ে পড়ল। " চোপ বুঢ্ঢা বঙ্গালি, কামকাজ কুছ নহি, কিতাবসে বচ্চোঁ কি তরাহ খেলতা হ্যায়,পাঙ্গা লে রহে হো মুঝসে? এক ঝাপড় মারেগা শালা পিসাব হো জায়গা"। বলেই মগনলাল এক পা এগিয়ে ঠাটিয়ে একটা চড় মারল সিধুজ্যাঠাকে। চশমাটা ছিটকে পড়ল খাটের ওধারে ঝনঝন শব্দে। সে শব্দের রেশ মিটতে না মিটতেই, আমার কানের পাশ দিয়ে হুশ করে ছুটে গেল একটা আগুনের লাইন, আওয়াজটা এল যেন একটু পরে। মগনলাল ততক্ষণে বোধহয় আরেকটা ঝাপড় মারার জন্য হাত তুলেছিল, একটা অস্ফুট আওয়াজে সেই হাতই নেমে গিয়ে চেপে ধরল তার নিজের হাঁটু। সেখান থেকে সরু একটা রক্তের স্রোত নেমে আসছে।
এরপর ঘরের মধ্যে একসঙ্গে এত কিছু ঘটল যে বর্ণনা করাই মুশকিল। প্রথমে বোধহয় আমার পিঠে বাচ্চু সরকার এমন একটা রামধাক্কা দিল যে আমি লাট খেয়ে গিয়ে পড়লাম খাটের আড়ালে। সিধুজ্যাঠার দিকে তাগ করে থাকা বন্দুকওলা গুলো বাচ্চুর দিকে পিস্তলের নল ঘোরানোর আগেই ঘরের জানলার বাইরে থেকে সার্চলাইটের মত কি একটা পড়ল, আর বাচ্চু সেই সুযোগে লোকদুটোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পুরো শরীরের ওজন দিয়ে। ওদের মধ্যে একটা লোক চটপটে, সে হাত ছাড়িয়ে বন্দুক ফেলে দরজার দিকে ছুট দিল। যদিও পৌঁছতে পারল না, ততক্ষণে দরজা কভার করে ঢুকছেন, অচিন্ত্য মন্ডল, আর মিস্টার মুখার্জি, দুজনের হাতেই সার্ভিস রিভলভার। সঙ্গে যে আরও অনেক লোক জানলা, দরজার বাইরে বাড়ি ঘিরে রেখেছে সেটা আন্দাজে বোঝা যায়। মগনলালের দুচারজন স্যাঙাৎ ও যে বাইরে দুদ্দাড় ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে সেটাও মনে হল।
"সরি মিস্টার মেঘরাজ, সেবার বেনারসের ঘাটে আমার গুলি আপনার রক্তপাত ঘটায় নি, সেখানে ওইটুকু শিক্ষাই যথেষ্ট মনে হয়েছিল। এবারে কিন্তু অতোটা অল্পে ছাড়া পাবেননা আপনি, সিদ্ধেশ্বর বোসের গালে থাপ্পড় মারার সাহস যদি কেউ দেখায় -" কথা অসমাপ্ত রেখে চেনা কোল্ট পয়েন্ট থ্রিটু তুলে অবহেলার সঙ্গে মগনলালের অন্য হাঁটুটায় একটা বুলেট পুরে দিল চাঁদু, ওরফে বাচ্চু সরকার, ওরফে প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।
ফেলুদা? তাহলে কি আমায় পিছমোড়া করে রগে নল ঠেকানো লোকটা আসলে ফেলুদা? ভাবনাটা পরিস্কার হওয়ার সময় পেল না। তার আগেই ঘরের দরজার পিছন থেকে আমার মাথায় একটা কিছু এসে পড়ল, আর ফেলুদা, মগনলাল, সিধুজ্যাঠা, পুলিশ, গুন্ডা সব মুহূর্তে ব্ল্যাক আউট।
[21]
এরপর ঘরের মধ্যে একসঙ্গে এত কিছু ঘটল যে বর্ণনা করাই মুশকিল। প্রথমে বোধহয় আমার পিঠে বাচ্চু সরকার এমন একটা রামধাক্কা দিল যে আমি লাট খেয়ে গিয়ে পড়লাম খাটের আড়ালে। সিধুজ্যাঠার দিকে তাগ করে থাকা বন্দুকওলা গুলো বাচ্চুর দিকে পিস্তলের নল ঘোরানোর আগেই ঘরের জানলার বাইরে থেকে সার্চলাইটের মত কি একটা পড়ল, আর বাচ্চু সেই সুযোগে লোকদুটোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল পুরো শরীরের ওজন দিয়ে। ওদের মধ্যে একটা লোক চটপটে, সে হাত ছাড়িয়ে বন্দুক ফেলে দরজার দিকে ছুট দিল। যদিও পৌঁছতে পারল না, ততক্ষণে দরজা কভার করে ঢুকছেন, অচিন্ত্য মন্ডল, আর মিস্টার মুখার্জি, দুজনের হাতেই সার্ভিস রিভলভার। সঙ্গে যে আরও অনেক লোক জানলা, দরজার বাইরে বাড়ি ঘিরে রেখেছে সেটা আন্দাজে বোঝা যায়। মগনলালের দুচারজন স্যাঙাৎ ও যে বাইরে দুদ্দাড় ছুটে পালানোর চেষ্টা করছে সেটাও মনে হল।
"সরি মিস্টার মেঘরাজ, সেবার বেনারসের ঘাটে আমার গুলি আপনার রক্তপাত ঘটায় নি, সেখানে ওইটুকু শিক্ষাই যথেষ্ট মনে হয়েছিল। এবারে কিন্তু অতোটা অল্পে ছাড়া পাবেননা আপনি, সিদ্ধেশ্বর বোসের গালে থাপ্পড় মারার সাহস যদি কেউ দেখায় -" কথা অসমাপ্ত রেখে চেনা কোল্ট পয়েন্ট থ্রিটু তুলে অবহেলার সঙ্গে মগনলালের অন্য হাঁটুটায় একটা বুলেট পুরে দিল চাঁদু, ওরফে বাচ্চু সরকার, ওরফে প্রদোষ চন্দ্র মিত্র।
ফেলুদা? তাহলে কি আমায় পিছমোড়া করে রগে নল ঠেকানো লোকটা আসলে ফেলুদা? ভাবনাটা পরিস্কার হওয়ার সময় পেল না। তার আগেই ঘরের দরজার পিছন থেকে আমার মাথায় একটা কিছু এসে পড়ল, আর ফেলুদা, মগনলাল, সিধুজ্যাঠা, পুলিশ, গুন্ডা সব মুহূর্তে ব্ল্যাক আউট।
অজ্ঞান হয়ে গিয়ে যে স্বপ্ন দেখা যায়, সেটা লালমোহনবাবু প্রমান করে দিয়েছিলেন রয়েল বেঙ্গল রহস্যে , তবে সেটা বোধহয় মাথায় বাড়ি খেয়ে অজ্ঞান হলে হয় না! সিধুজ্যাঠার ঘরে হুটোপুটির মধ্যেই চোখ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, তার পর প্রথমেই যেটা মনে পড়লো সেটা হল একটা তেজালো ডেটলের গন্ধ, আর ব্রহ্মতালুতে একটা চিনচিনে ব্যথা আর কড়া একটা আলো !
চোখ খুলতেই ঝলসে গেলো টর্চের আলোয়, সেটা নিবতে , একটু স্পষ্ট দেখতে পাওয়া মাত্র শরীর, মন আবার ধাঁধিয়ে উঠল দেখে যে, যে মুখটা এই মাত্র টর্চ নিবিয়ে আমার উপর ঝুঁকে পড়ল সেটা ফেলুদার ! চমকে গিয়ে আবার ভির্মি খাওয়া আশ্চর্য ছিল না, যদি না ফেলুদার পরের কথাটা শুনতে পেতাম!
"এবারের মগনলাল ম্যাচে ম্যান অফ দ্য ম্যাচটা আপনার বাঁধা ছিল লালমোহন বাবু!, লাস্ট মোমেন্টে মাথা গুলিয়ে গিয়ে সেমসাইড করে দিলেন?"
“ছ্যা ছ্যা ছ্যা মশাই ! তাড়াহুড়োয় চশমাটা খুঁজে পেলুম না, এদিকে সিধু বাবুর বাড়ির চাদ্দিকে অন্ধকার, অজস্র জিনিসপত্র , দরজার কাছে খানিক ক্ষণ ওঁৎ পেতে ওয়েট করে ঢুকবার সময় মন ঠিক করে নিয়েছিলাম, যা থাকে কপালে, সামনে এনিমি কেউ এলেই বাতিদানটা চালিয়ে দেব ! শেষটায় যে তপেশ ভাইয়েরই মাথায়।... ছ্যা ছ্যা !!"
"ছ্যা ছ্যা তা যে আমাকেও বলতে হচ্ছে লালমোহন, নেপালি রেয়ার বাতিদানটা হাত থেকে ফেলে যা দশা করলে ওটার ! পাটনের এক বুড়ো অভাবে পড়ে বেচে দিয়েছিল নাগরমলকে। ... অন্তত তিনশো বছরের পুরোনো !!" গজগজ করে উঠলেন সিধু জ্যাঠা।
"ওটা ভেঙে ফেলাটা অবিশ্যি আমার জন্যই হয়েছে, জটায়ু ওর জন্য ডিরেক্টলি দায়ী নন, কিন্তু ওই মোমেন্টে ওটাকে হাত লাগিয়ে পুশ না করতে পারলে, তোপসের মাথাটাই ফেটে চৌচির হয়ে যেত !" বলল ফেলুদা !
এবারে হাত ঘুরিয়ে দেখি একটা যুদ্ধক্ষেত্রের শেষ দৃশ্যের মতো ছড়ানো-ছিটোনো- থ্যাঁৎলানো- ওল্টানো বইপত্র আর জিনিস চারদিকে, তার মধ্যেই সিধু জ্যাঠার তক্তপোষে হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে "উঃ আঃ " চিৎকার করে ককিয়ে কাঁদতে লেগেছেন মগনলাল মেঘরাজ ! তার দু পাশে পুলিশের লোক, আর অচিন্ত্য মন্ডল তুলো লাগাচ্ছেনা ইজিচেয়ারে বসা সিধু জ্যাঠার কপালে ! ওদিকে মুখার্জি হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে চোখ কপালে তুলে ' " alleged ক্রিমিনালের ইনজুরি বেশি নয় তো? কোর্টে প্রডিউস করা যাবে তো ?" বললেন যাকে, তার হাতে স্টেথো দেখে বুঝলাম তিনি ডাক্তার !
এতক্ষণে ব্যথা- যন্ত্রণার থেকে কৌতুহলটা এতই বেশি হয়ে গেছে যে আর শুয়ে থাকা যায় না ! আর ফেলুদাও সেটা বুঝতে পেরেই একটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো, "সেন্স যখন এসেই গেছে আর চিন্তার কিছু নেই, গা ঝাড়া দিয়ে এবার উঠে পড় ! এই সীনে তোর শুয়ে থাকাটা আর বরদাস্ত করা যায় না বোকচন্দর !"
বিশেষণটা বহুকাল হল বলা ছেড়ে দিয়েছে ফেলুদা, আজ শুনে বুঝভুম্বুল অবস্থাটা একটু কাটলো ! তবে পুরোটা না, কারণ বাড়িয়ে থাকা হাতটা ধরতে গিয়ে চোখে পড়ল, ফেলুদার হাতে অপরিচিত লোহার বলা, আর তার পাশ দিয়ে উঁকি মারছে চাঁদুর হাতে দেখা সেই নোঙ্গর মার্কা উল্কি !!
"নাঃ , তোর মনের অন্ধকারটা এবার কাটানো দরকার রে তোপসে, মগনলালকে পুলিশ চালান করুক, তারপর বেরিয়ে প্রিন্সেপ ঘাটের দিকটায় গিয়ে আমরা সবাই যাব চা খেতে। এমনিও রাত ফুরিয়ে আসছে !"
সিগারেটটা ভোরের ফুলে ওঠা নদীর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল ফেলুদা , "কাকার আর লালমোহন বাবুর টাকা হাতিয়ে নিয়ে ফোন করে মগনলাল যখন চ্যালেঞ্জ দিল, তখন প্রথমে ব্রহ্মতালু জবর গরম হয়ে উঠেছিল ঠিকই, তবে ও ভাবে ডিটেকশন হয় না। সারারাতের চেষ্টায় মাথাটা ঠান্ডা করে ভাবলাম, এই কেসে পুলিশের আক্টিভ সাপোর্ট ছাড়া এগোনোর রাস্তা ফেলু মিত্তির এরও , জানা নেই, গভীর রাতে মাস্টার-কী দিয়ে নিজেরই বাড়ির দরজা খুলে থানায় গিয়ে অচিন্ত্য বাবুর সঙ্গে পরিচয় হল। ইয়ং অফিসার, একটা ভাল বড় ক্রাইম ক্র্যাক করার জন্য দেখলাম মুখিয়ে আছেন। ওঁদের রেকর্ড সব এখন ডিজিটাইজড। ক্রাইম ব্রাঞ্চে সেই রাতেই খবর নিয়ে জানা গেল, মগনলাল বেশ কয়েক মাস হল কলকাতায়, সেক্টর ফাইভের ফ্ল্যাটে ওর ওপর ওয়াচ আছে সারাক্ষণ , দরকারে ওর বডি গার্ডে সোর্সও ঢোকানো যাবে, ইলেক্ট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানা বলল ওদের ধারণা ওই বাড়িটাকে কেন্দ্র করে একটা ইন্টার ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম সেন্টার খোলার তাল করছে মগনলালের ছেলে সূরজ। যদিও এখনও ঠিক দানা বাধেনি, বলা যায় নেট প্র্যাক্টিস চলছে।
দুয়ে দুয়ে চার করে আমার খটকা লাগছিল, কাকা ও জটায়ুর টাকা হাপিস মগনলালের হুমকি আর সুরাজের নতুন ব্যবসার টাইমিংটা ম্যাচ করছে কেন? তাই সাইবার ক্রাইমকেও ইনভল্ভ করা হল। ওই ডিপার্টমেন্টে বেশ কয়েকজন ইয়ং সাইবার স্পেশ্যালিস্ট বেরিয়ে গেল যারা ছোটবেলা থেকে আমার কাহিনী পড়ছে, খুব ভক্তই বলা যায়। চাইলে যে কম্পিউটার দিয়ে কী করা যায় দেখে হাঁ হয়ে যেতে হয় - ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে ওরা মগনলালের কোন ভূয়ো account এ কী রাস্তায় কাকা আর জটায়ুর টাকা সাইফন করা হয়েছে তা বার করে ফেলল আর সেই টাকা একটা সাসপেন্স একাউন্ট এ ফেলে দিল। চাইলে নাকে জটায়ু বা কাকার একাউন্ট এ ফেলে দেয়াও সম্ভব , কিন্তু তাতে মগনলালকে ততটা জব্দ করা হবে না, শাস্তি দেয়াও মুশকিল হবে বোঝা গেল। ভবিষ্যতে আরো সতর্ক হয়ে যাবে উল্টে। তখনই প্ল্যান হল ওকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে, ওর গুহায় ঢুকে ওকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে, একটা সহজ ফৌজদারী ক্রাইমের রাস্তায় সশরীরে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করার চেষ্টা করতে হবে। এটা পুলিশের পক্ষে সম্ভব না - আর সেখানেই হল আমার খেল।
[22]
সিগারেটটা ভোরের ফুলে ওঠা নদীর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল ফেলুদা , " কাকার আর লালমোহন বাবুর টাকা হাতিয়ে নিয়ে ফোন করে মগনলাল যখন চ্যালেঞ্জ দিল, তখন প্রথমে ব্রহ্মতালু জবর গরম হয়ে উঠেছিল ঠিকই, তবে ও ভাবে ডিটেকশন হয় না। সারারাতের চেষ্টায় মাথাটা ঠান্ডা করে ভাবলাম, এই কেসে পুলিশের আক্টিভ সাপোর্ট ছাড়া এগোনোর রাস্তা ফেলু মিত্তিরেরও জানা নেই .গভীর রাতে মাস্টার কী দিয়ে নিজেরই বাড়ির দরজা খুলে থানায় গিয়ে হাজির হয়ে অচিন্ত্য বাবুর সঙ্গে পরিচয় হল। ইয়ং অফিসার, একটা ভাল বড় ক্রাইম ক্র্যাক করার জন্য দেখলাম মুখিয়ে আছেন। ওঁদের রেকর্ড সব এখন ডিজিটাইজড। ক্রাইম ব্রাঞ্চে সেই রাতেই খবর নিয়ে জানা গেল, মগনলাল বেশ কয়েক মাস হল কলকাতায়, সেক্টর ফাইভের ফ্ল্যাটে ওর ওপর ওয়াচ আছে সারাক্ষণ , দরকারে ওর বডি গার্ডে সোর্সও ঢোকানো যাবে, ইলেক্ট্রনিক্স কমপ্লেক্স থানা বলল ওদের ধারণা ওই বাড়িটাকে কেন্দ্র করে একটা ইন্টার ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম সেন্টার খোলার তাল করছে মগনলালের ছেলে সূরজ। যদিও এখনও ঠিক দানা বাধেনি, বলা যায় নেট প্র্যাক্টিস চলছে।
দুয়ে দুয়ে চার করে আমার খটকা লাগছিল, কাকা ও জটায়ুর টাকা হাপিস মগনলালের হুমকি আর সূরজের নতুন ব্যবসার টাইমিংটা এতটা ম্যাচ করছে কেন? তাই সাইবার ক্রাইমকেও ইনভল্ভ করা হল। ওই ডিপার্টমেন্টে বেশ কয়েকজন ইয়ং সাইবার স্পেশ্যালিস্ট বেরিয়ে গেল যারা ছোটবেলা থেকে আমার কাহিনী পড়ছে, খুব ভক্তই বলা যায়। চাইলে যে কম্পিউটার দিয়ে কী করা যায় দেখে হাঁ হয়ে যেতে হয় - ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে ওরা মগনলালের কোন ভূয়ো account এ কী রাস্তায় কাকা আর জটায়ুর টাকা সাইফন করা হয়েছে তা বার করে ফেলল আর সেই টাকা একটা সাসপেন্স একাউন্ট এ ফেলে দিল। চাইলে নাকি জটায়ু বা কাকার একাউন্ট এ ফেলে দেয়াও সম্ভব , কিন্তু তাতে মগনলালকে ততটা জব্দ করা হবে না, শাস্তি দেয়াও মুশকিল হবে বোঝা গেল। ভবিষ্যতে আরো সতর্ক হয়ে যাবে উল্টে। তখনই প্ল্যান হল ওকে ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে, ওর গুহায় ঢুকে ওকে ক্ষেপিয়ে দিয়ে, একটা সহজ ফৌজদারী ক্রাইমের রাস্তায় সশরীরে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করার চেষ্টা করতে হবে। এটা পুলিশের পক্ষে সম্ভব না - আর সেখানেই আমার কাজ।
"পলাতক অবস্থায় তো আর বাড়িতে থাকা যায় না ! বাড়ির ওপর মগনলালের নজর আছে। তাছাড়া তুই আর কাকা কাকীমা জেনুইনলি নার্ভাস হয়ে থাকলে ধোঁকাটা জমে ভাল। এদিকে থাকবোই বা কোথায়, বাড়ি থেকে বেশি দূরে থাকাটাও ঠিক নয়, মগনলাল টের পেয়েছে ওর হাতানো টাকা আবার বেরিয়ে গেছে, এর পেছনে আমার হাত আছে সেটুকু ওর বুঝতে বাকি নেই। তোদের ওপর কোন হামলা টামলা হলে আমাকে কাছাকাছি সাপোর্টে থাকতে হবে। এই সব সাত পাঁচ ভেবে কাছেই সর্দার শংকর রোডে সিধু জ্যাঠার বাড়িতে আমার আচমকা উদয় হতে হল। জ্যাঠা অবিশ্যি আমায় দেখে মোটেও চমকালেন না, পরিস্থিতি ক্যালকুলেট করে উনি নাকি প্রায় এক্সপেক্টই করছিলেন আমাকে, আর তাই, এমনকী ঘর বিছানাও রেডি করে রেখেছিলেন। কিন্তু একটা ছদ্মবেশ তো চাই, তাই উল্কি, বালা আর একটু মুখে হাতে মাখার রং কাজে লাগাতে হল। পুলিশ আমাকে একটা জাল পরিচয় পত্রও বানিয়ে দিল। কিন্তু ওই ভাবে সর্দার শংকর রোডে গা ঢাকা দিয়ে চুপচাপ বসে থেকে তো কার্যসিদ্ধি হবে না, তাই হরিপদ বাবুকে টিপে দিয়ে ওঁরই রেফারেন্সে বদলি ড্রাইভার হিসেবে চাঁদুর উদয় হল। লালমোহন বাবুও প্রথম দুদিন আমাকে একটুও চিনতে না পেরে আমায় ধমকের ওপর রাখলেন। কিন্তু দুজনের অন্ততঃ একজনকে হাতে না পেলে তদন্তের কাজ এগোবো কি করে। ভেবে দেখলাম তোকে দায়িত্ব দেব এটাই স্বাভাবিক, তাই উল্টোটা করতে হল। জটায়ুকে সন্দেহ করা মগনলালের বুদ্ধিতে কুলোবে না। তাই থার্ড দিনে আমি আসল গলাটা একবার বার করলাম। তাতে অবিশ্যি লালমোহন বাবুর যা চেহারা হয়েছিল, তাকে এক কথায় , ......."
" ফ্রিজিড বলা যায় মশাই, মানে ফ্রিজিফায়েড , মানে যাকে বলে প্রস্তরীভূত,: ফেলুদার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বললেন জটায়ু।
"এই সময় থেকে কাজের একটু সুবিধে হল, ঘোরাঘুরিটা সহজ হওয়ায়। জটায়ুর গাড়ির নম্বরটা পুলিশে দেয়া ছিল, তাই লক ডাউনে নির্ঝঞ্ঝাটে ঘোরাঘুরির অসুবিধে ছিল না, আর ড্রাইভিং তো আমার অনেকদিনের পছন্দ সেটা জানিসই। মোটামুটি অঞ্চলটা জানা থাকলেও, মগনলালের ডেরাটা যে ঠিক কোন এপার্টমেন্টের কোন ফ্ল্যাটে সেটা জানা ছিল না কারোই। এখানটায় একটু ঠেকে যাচ্ছিলাম, তারপর ওটিটি বানানোর তাল করে শয়তানটি জটায়ুকে আরেকবার নাকাল করে আরেক দফা নৃশংস রসিকতার তাল করছে জেনে একটা রাস্তা খুলে গেল। স্বয়ং জটায়ুকেই টোপ করে, ওর ঠিকানায় ঢোকার রাস্তা নিতে হল।"
"আরেক রাউন্ড চা বল ভাই পুলিশ, ফেলুর গল্পটা বেশ লম্বা, সবারই একটু গলা ভেজাতে হবে। যদিও এখানে যা জঘন্য চা, এরকম অকেশন ছাড়া গলা দিয়ে নামানোই মুশকিল।" বললেন সিধু জ্যাঠা।
অচিন্ত্যবাবুর ইঙ্গিতে এক কনস্টেবল চা ওলাকে হাঁক দিতে গেল, আর ফেলুদা একটু থেমে আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে তার বৃত্তান্ত শুরু করল।
"সেদিন যখন খাওয়া দাওয়া চলছে, আর লালমোহন বাবু আমার প্ল্যান অনুযায়ী সন্তর্পণে কথাবার্তা রেকর্ড করে প্রমান রাখছেন, সেই সময় মগনলালের একাউন্টের বেশ কিছু টাকা হ্যাক করে ওর একাউন্টটা লক করে দেয়া হয়, আর সোর্সের মাধ্যমে ওর কানে তুলে দেয়া হয় যে সেই টাকা গেছে প্রদোষ মিত্রের পকেটে আর তিনি লুকিয়ে আছেন সিদ্ধেশ্বর বোসের বাড়িতে। বাকিটা তো গোঁ গোঁ করে এসে সটাং ফাঁদে পা দেয়া - সেটা সবার দেখা।
এতক্ষণ স্রোতের মত কথা বলে একটু থামলো ফেলুদা। আমার মনে যে প্রশ্নটা অনেক্ষন ধরে ঘুরছিল, সেটা এই সুযোগে জিজ্ঞেস করে ফেললাম। ফেলু মিত্তির ওরফে চাঁদু যে যে পুলিশের সঙ্গে যোগসাজশেই মামলা চালাচ্ছে এটা যখন জানা, তখন খামকা হঠাৎ চাঁদুকে এরেস্ট করে ফেলল কেন পুলিশ ? এটাও কি সেমসাইড ?""
"সেম সাইড তো নয়ই, বরং এটাই এই কেসে প্রদোষ মিত্র মশায়ের বিখ্যাত মগজাস্ত্রের সেরা চাল " মুখ খুললেন ইলেক্ট্রনিক কমপ্লেক্স থানার মিস্টার মুখার্জি। সারা রাতের দৌড়াদৌড়িতে ভদ্রলোকের চোখ টকটকে লাল। "মগনলালের গ্যাঙের মধ্যে যেমন পুলিশের সোর্স আছে , পুলিশের মধ্যেও কিন্তু, বলতে লজ্জা হয়, বড় বড় ক্রিমিন্যালদের আড়কাঠি থাকে। সম্ভবত এরকম কোন সূত্রে মগনলাল স্যাঙ্গুইন হয়েছিল যে চাঁদুই প্রদোষ , থাকে সিদ্ধেশ্বর বাবুর বাড়িতে, আর চালায় লালমোহন বাবুর গাড়ি। ভেবে দেখুন গাড়ি চলে অনেক সময়ই ফাঁকা জনমানবশূন্য রাস্তায়, এমনকি বেশি রাতে। এর মধ্যে যেকোন পয়েন্টেই হামলা করা সম্ভব, আমাদের পক্ষেও আইডেন্টিটি ডিসক্লোজ না করে সিকিউরিটি এনশিওর করা সম্ভব নয়। যে কোন সুযোগে মগনলালের লোক চাঁদুকে লোপাট আর পারলে নিকেশ করে দিত। তাই একটা ডাবল ব্লাফের প্রয়োজন হল। লালমোহন বাবুর ডাইরিটা একটা দারুন সুযোগ এনে দিল। মিস্টার মিত্রের প্ল্যানেই চাঁদুকে তুলে নিয়ে একদম লক আপের সিকিউরিটিতে রাখা হল, আর পথের কাঁটা হাজতে জেনে মগনলাল সোজা সেই রাতেই মিস্টার বোসের বাড়িতে হামলা করবার মওকা পেল। মগনলাল তো পুলিশের সাথে যোগসাজশের ব্যাপারটা জানে না, ফলে ও ভাবল আমরা ভুল করেই মিস্টার মিত্তিরকে গ্রেপ্তার করেছি, আর কলকাতা শহরে এই ভুলটা ভাঙিয়ে দিয়ে ওঁর বেরিয়ে আসতে কয়েক ঘন্টার বেশি লাগবে না। কাজেই ওর হাতে একটাই রাত। একদিকে
সিধুবাবুর বাড়ির আর্টের ডিপোটা হাতানোর লোভ, অন্যদিকে আঙ্কেলকে শাস্তি, প্লাস ফেলুবাবুকে চূড়ান্ত অপমানের সুযোগ, এই তিনের হাতছানি এড়াতে না পেরে মগনলাল ফাঁদে পা দিল। আমরা অবিশ্যি বলেছিলুম যে যে মিস্টার বোসের শারীরিক রিস্কটা বেশি হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু ভদ্র্রলোক সেটা গা-ই করলেন না। "
এদিকে ঝলমলে একটা সকাল হচ্ছে, পুলিশরা একে একে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছেন, আমারও অনেক দিনের টেনশনের পর ঘুম ঘুম পাচ্ছে, অথচ ফেলুদার ওঠার বিশেষ তাড়া নেই। জটায়ু একবার উঠি উঠি করতে, চোখের ইশারায় বসতে আদেশ করল ফেলুদা। মনে হল বাইরের লোকের চলে গেলে পর বিশেষ কিছু বলার আছে।
"তোর অবজার্ভেশনের যা হাল দেখলাম, তাতে বুঝতে পারছি, আমার স্যাটেলাইটের পোস্টটা তোকে আর দেয়া যায় কি না ভেবে দেখতে হবে " আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল ফেলুদা। " বরং লাস্টের দিকে একটু তালগোল পাকিয়ে ফেলাটা বাদ দিলে, লালমোহন বাবু এই মামলায় যে সাহস, ধৈর্য, আর ঠান্ডা মাথার পরিচয় দিয়েছেন,তাতে এই মামলার হীরো প্রকৃত প্রস্তাবে তাকেই বলা উচিত। তোকে যখন সিধু জ্যাঠার ঘরে চেপে ধরলাম তখনও এমনকি টাচ-এও আমায় চিনতে পারলি না দেখে আমি হতাশ এবং আশ্চর্য। "
"বা রে !তুমি যে খামকা আমাকেই গলায় বন্দুক ঠেকিয়ে কোনঠাসা করবে সেটা কি করে মাথায় আসবে ?"
"খামকা কোনোটাই নয়। এর থেকে বরং প্রমান হয় এখনও তোর মাথায় লজিক গুলো ঢুকছে না। মনে রাখতে হবে , মগনলাল আমায় খুব ভালো করেই চেনে, সামনা সামনি দেখলেও চিনতে পারবে না , এতটা গাড়োলও নয়। তাহলে কি ভাবে কভার নিচ্ছি ? অন্ধকার ঘরে তোকে বন্দুক পয়েন্ট করে রাখা লোকটাকে ও আড়চোখে দেখেই ধরে নেবে ওরই কোনো বডিগার্ড। দ্বিতীয়বার তাকাবেই না। তাহলে তোকেও প্রোটেকশন দেয়া যাবে দরকারে , আর গোলমাল হলে মগনলালকেও বন্দুকের রেঞ্জে পাওয়া যাবে। অবিশ্যি ফায়ার করাটা এমনিতে আমার প্ল্যানে ছিল না। কিন্তু আমার সামনে সিধুজ্যাঠাকে থাপ্পড় মারাটা আমার পক্ষে বরদাস্ত করা সম্ভব হল না। "
"এবং সেটা খুবই বেআইনী কাজ হল। " অত্যন্ত বেজার মুখ করে বললেন সিধু জ্যাঠা।
"ওটাকে এক প্রকার আত্ম রক্ষার্থে গুলি চালনা বলেই দেখতে হবে আমাকে। কারণ আমার ওপর হামলা হলেও আমি অতটা বিচলিত হতাম কিনা জানি না " ফেলুদার হাজির জবাব।
কথাটা ঘোরানোর জন্য জটায়ুকে একটু খোঁচা দিয়েই জিজ্ঞেস করলাম, " কি ব্যাপার মশাই, এই হঠাৎ সাহসী হয়ে ওঠাটা কি আপনার বিপাসনার ফল ?"
" আমার ছোট কাকা দুর্গা মোহন, তাঁকে তো তুমি দেখেইচ কেদার নাথ ধামে, প্রাতঃ স্মরণীয় ব্যক্তি," আকাশের দিকে হাত তুলে প্রণাম করে বললেন জটায়ু, " কানে কানে বলেছিলেন আমায়, সর্বদা মনে রাখিস লালু, ঘাবরিতং যঃ , মমার্ সঃ . ওঁকেই স্মরণ করে চলি ভাই "
——————————————————
এর পরেও দুয়েকটা খবর দেয়া বাকি আছে।
এমনিতে সাইবার ক্রাইম, শারীরিক হামলা, বেআইনী ভাবে প্রবেশ, হুমকি, ইত্যাদি গুচ্ছের চার্জে মগনলাল এখন পুলিশ হাজতে। আদালতে হাজির করাও মুশকিল, কারণ তাকে হাসপাতালে পাঠাতে হয়েছে, কারণ সে করোনা পজিটিভ। এমনিতে জ্বর সর্দি কাশি, তবে গতকাল রাত থেকে নাকি, মাথাটাও একটু গন্ডগোল করছে। ডাক্তারকে দেখলেই নাকি "ফির মিস্টার মিত্তর আ রাহা হায় ", বলে কঁকিয়ে উঠছে বলে ভালো করে চিকিৎসা করে যাচ্ছে না। ডাক্তাররা, আর পুলিশ বেশ সমস্যায়।
ফেলুদাও, সত্যি বলতে কি, চির শত্রু মগনলালকে নিয়ে একটু ভাবনায়।
——————————————————







No comments:
Post a Comment