~~~~~~~যোগাযোগ~~~~~~~~
শেষ যখন ঘড়ি দেখেছিলাম তখন রাত প্রায় দেড়টা। নেটফ্লিক্সে সিজনটা দেখতে দেখতে কখন যেন নাকের ওপর ফোন চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম রাতে। নিশ্চিন্তেই ঘুমোচ্ছিলাম ... একে তো লকডাউন তার মধ্যে রবিবার ওঠার কোন তাড়াই নেই। কিন্তু আচমকাই ঘুমটা ভেঙে গেলো। না না, কোন ভয়াবহ স্বপ্ন টপ্ন নয়। আচমকাই পিঠটা জ্বালা করে উঠলো। অনেক কষ্টে চোখ করে নাকের ওপর থেকে ফোনটা নামিয়ে, দুবার নাকের ওপর হাত বুলিয়ে ঘড়িতে দেখলাম পাঁচটা।মশা ভেবে চাদরটা জড়িয়ে আবার পাশ ফিরে শুতে যাচ্ছি।আবার খোঁচা।এবার কষ্ট করে ঘাড় ঘোরাতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হল।ফেলুদা খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কড়ে আঙুলের নখটা দিয়ে আমাকে খোঁচাচ্ছে। এক্সারসাইজ করার পোষাক পরে সাতসকালে একদম রেডি।
মনে পড়লো কাল রাতেই ফেলুদা বলছিলো আজ ২১শে জুন নাকি আন্তর্জাতিক যোগ দিবস।ফেলুদা বরাবরই সকালে আধঘন্টা ধরে নানারকম আসন করে ... এমনকি কনুইয়ের ওপর ভর দিয়ে মাথা নীচের দিকে আর পা উপর দিকে শূন্যে তুলে শীর্ষাসন পর্যন্ত। কিন্তু কাল রাতেই ফেলুদা বলেছিলো আমাকে আজ থেকে এক্সারসাইজ করানো শুরু করবে .. ওর মতে লকডাউনে বাড়িতে বসে আমি প্রচন্ড আনফিট হয়ে যাচ্ছি।
ফেলুদা কিছু ঠিক করলে করেই ছাড়ে। সুতরাং মনের দু:খ মনেই চেপে কোনরকমে বিছানা ছাড়তেই হলো।
ব্রাশ করতে করতে যখন ঘরে উঁকি দিলাম দেখি ফেলুদা শীর্ষাসন করছে।তার সঙ্গে ঘরের কোনায় রাখা রেডিওতে হালকা সুরে বাজছে ভায়োলিন। বিদেশী ইন্স্ট্রুমেন্টালের ভক্ত ফেলুদা এক্সারসাইজোর সময়টাতে হালকা করে মিউজিক চালিয়ে রাখে .. বলে মন:সংযোগে সুবিধে হয়। ফেলুদার সঙ্গে থেকে আমিও অল্প বিস্তর চিনেছি ইন্স্ট্রুমেন্টাল শিল্পীদের । কান পেতে শুনে বুঝলাম আজ বাজছে ফেলুদার প্রিয় নিকোলা আমাটির ভায়োলিন।
বাজনার আওয়াজের ওপর গলা তুলে আমি বললাম .." এই যোগব্যায়াম প্রথম ভারতে কে করেছিলেন...? মনোহর আইচ... যিনি বিশ্বশ্রী হয়েছিলেন জুনিয়র বিভাগে ?"
ঘড়ি ধরে দেড় মিনিট পরে ফেলুদা উত্তর দিলো....
" ছাত্রকে মনে রাখলি আর তার মাস্টারমশাইকে চিনিস না...!"
একে তো সাত সকালে ঘুম থেকে ওঠা .. তারপর আবার এতক্ষণ পরে এরকম একটা উত্তর। ভারী রাগ হলো।
একটু গম্ভীরভাবেই বললাম " মাস্টারমশাই ...?"
যোগাসনের ম্যাটটা ঝেড়েঝুড়ে স্যানিটাইজার দিতে দিতে ফেলুদা বললো..."হ্যাঁ। মাস্টারমশাই .... ব্যায়ামাচার্য বিষ্ণু চরন ঘোষ ওরফে ছাত্রদের প্রিয়
বিষ্টু দা।"
আমার রাগের জায়গা ততক্ষণে দখল করেছে কৌতুহল।ফেলুদাও বলে চলেছে ..."আমাদের বাড়িতে পুরোনো বাঁধানো যে শিশুসাথীগুলো আছে দেখবি ওখানে বাচ্ছাদের সহজে যোগব্যায়াম শেখাতেন মনোতোষ রায় ... উনিও তো বিষ্টু ঘোষেরই ছাত্র।"
"কোথায় ওনার আখড়া ছিলো ..." জানতে চাওয়ায় ফেলুদা বললো .. লালমোহন বাবুর বাড়ির কাছেই .. গড়পারে।আরও মজার ব্যাপার কি জানিস .. তুই যে মনোহর আইচের কথা বলছিলিস ওনাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েই তো নারায়ণ দেবনাথ বাবু বাঁটুল দ্য গ্রেট সৃষ্টি করেন। "
আমি ততক্ষণে মুগ্ধ... আর আমার মুখ দেখে সেটা ফেলুদা বুঝতেও পেরেছে ... হেসে বললো ..." অনেক তো গল্প হলো আর ছোট্ট ইনফরমেশন দেবো । তারপর প্র্যাকটিকাল এক্সারসাইজ শুরু করবি ঠিক আছে!! ১৯৪৬ এর দাঙ্গার গল্প তো পড়েই ছিস নিশ্চয়।বিষ্ণু ঘোষ ও তাঁর আখড়ার ছেলেরা তখন অসমসাহসিকতায় নিজেদের জীবন বিপন্ন করে এগিয়ে গেছিলেন ধর্ম নির্বিশেষে অসহায় মানুষজনকে গুন্ডার হাত থেকে রক্ষা করতে।তাদের উদ্ধার করে নিজেদের আখড়ায় নিয়ে গিয়ে রেখেছিলেন তিনি।"
গল্প বলতে বলতেই ম্যাট স্যানিটাইজ করে মাটিতে বিছিয়ে ফেলেছে ফেলুদা।
এবার আমার মানে কিনা তোপসের ফেলুদার থেকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসে এক্সারসাইজ শেখার পালা।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার
আম আঁটির ভেপু প্রচ্ছদ (সত্যজিৎ রায়)
আবহ সঙ্গীত - Sean Avram Carpenter
অরিজিনাল লিঙ্ক - https://youtu.be/_pnhewS40ns

No comments:
Post a Comment