উটের পাকস্থলী
এক মাস হলো আনলকডাউন শুরু হয়েছে৷ কিন্তু আমরা তাও একুশ নম্বর রজনী সেন রোড ছেড়ে বিশেষ বেরোচ্ছি না। কি হবে বেরিয়ে? আমার স্কুলের অনলাইন ক্লাস চলছে, তাতেই আমি আর শিক্ষকেরা গলদঘর্ম।
ফেলুদা প্রায় মাস চারেক কোনও কেস হাতে পায়নি, তাই ওর রোজগারও বন্ধ। কিন্তু তা বলে ও যে মুখ গোমড়া করে বসে আছে তা নয়। ফেলুদা কখনোই হাল ছাড়ার পাত্র নয়, তাই ব্যায়াম আর মহাভারত নিয়ে মেতে আছে আর আমাকে মহাভারতের trivia প্রশ্নে একই সাথে উত্ত্যক্ত আর পুলকিত করছে।
আজ সকালের কথাই ধরা যাক। শ্রীকৃষ্ণ আর অর্জুনের শঙ্খগুলোর নাম জিজ্ঞাসা করে বসলো। আমিও আমার জ্ঞানের ভান্ডার খুলে 'পাঞ্চজন্য' আর 'দেবদত্ত' বলে দিয়ে "উফ, কি দিলাম!" ভেবে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াচ্ছি, কিন্তু ফেলুদা চাপড়াতে দিলে তো? অমনি ও আবার "নামগুলোর কারণ কি, বল তো?" প্রশ্ন করে বসলো।
কোনও মানে হয়? অতো জানলে তো কালীপ্রসন্ন সিংহের মতো আমিও মহাভারতের উপর একটা বই লিখতে পারতাম। ফেলুদা উত্তরটাও দিলো না। ও বললো যে বিকেলে লালমোহনবাবু আসবেন, তখন ওঁকেও প্রশ্ন করে দেখবে উনি জবাব দিতে পারেন কিনা।
প্রায় চার মাস আমাদের সাথে দেখা না হওয়ায় আজ ভোরে নাকি লালমোহনবাবুর মনে হয়েছে তিনি অনেকদিন ফেলুদা'কে গুরুদক্ষিণা দেননি।
এদিকে তাঁর পাড়ায় নতুন multicuisine restaurant খুলেছে, যেখানে বাঙালি, গোয়ান, উত্তরভারতীয় আর দক্ষিণভারতীয় খাবার পাওয়া যায়। রেস্টুরেন্টের নাম ভাজা-ইডলি-রাজমা-সরপোতেল, সংক্ষেপে 'ভাইরাস'। এখনও সেখানে বসে খাওয়া যাচ্ছে না, কিন্তু তিনি নাকি পার্সেল করে সেখানকার খাবার নিয়ে আমাদের বাড়ি এসে রাতের খাওয়া আমাদের সাথেই সারবেন।
হরিপদবাবুও দু-সপ্তাহ আগে তাঁর মধ্যমগ্রামের বাড়ি থেকে এসে আপাতত লালমোহনবাবুর বাড়িতেই থাকছেন। গাড়ি চালানোর কাজ তেমন নেই বলে কিন্তু জটায়ু ওঁকে ছাড়িয়ে দেননি। মাইনেও দিয়েছেন নিয়মিত। তবে ফেলুদার মতো হরিপদবাবুও বিনা পরিশ্রমে পারিশ্রমিক নিতে চান না, তাই তিনি জটায়ুর Man Friday হয়ে সাময়িকভাবে বাজার আর রান্না করার ভার নিয়েছেন।
আজ সকালে নাকি গাড়ি স্টার্ট দিয়েও দেখে নিয়েছেন গাড়ি ঠিকঠাক চলছে, সুতরাং সবুজ এম্ব্যাসাডরের দেখা পাওয়ার আশায় আমি অন্যমনস্ক হয়ে অনলাইন অঙ্কের ক্লাসে অনেকগুলো silly mistake করে class test'য়ে কুড়িতে এগারো পেয়ে ফেলুদা'র কাছে গাঁট্টা খেলাম।
সন্ধ্যা ছটা নাগাদ জটায়ু এসে পৌঁছালেন। মুখে মাস্ক শুধু নয়, তার উপর মোটরসাইকেল হেলমেটে যে স্বচ্ছ প্লাস্টিকের ঢাকনা থাকে, সেরকম একটা মুখের সামনে লাগিয়ে এসেছেন। এগুলোকে face shield বলে, আজকাল নাকি খুব বিক্রি হচ্ছে। উনি হাতে দস্তানা আর গায়ে একটা রেনকোটও পরে এসেছেন। সাজগোজের বহর দেখে আমাদের বাড়িতে আসছেন না চাঁদে যাচ্ছেন বোঝা মুশকিল।
ঘরে ঢোকার আগে রেনকোটের পকেট থেকে ওঁকে একটা পিস্তল বার করতে দেখে আমি অবাক হয়ে গেলাম। কোল্ট নাকি? তারপর ভালো করে লক্ষ্য করে দেখলাম ওটা পিস্তলের মতো দেখতে হলেও আসলে একটা thermometer gun, যেটা দিয়ে দূর থেকেই অন্যদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা যায়। উনি ফেলুদা আর আমার তাপমাত্রা মেপে তারপর নিজেরটাও মাপলেন আর আমাদের আশ্বস্ত করার জন্য একগাল হেসে বললেন, "নর্মাল। তাহলে চিন্তা নেই।"
তারপর ঘরে ঢুকে মাস্ক, দস্তানা আর রেনকোট খুললেও face sheild'টা পরেই থাকলেন৷ আর খুব সাবধানে আমার হাতে একটা বিশাল থলি ধরিয়ে দিয়ে বললেন "প্রন ভিন্ডালু, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি, শাহী পনীর আর ছানা'র জিলিপি এনেছি, তাড়াতাড়ি ফ্রিজে তুলে রাখো।" এছাড়া চায়ের সঙ্গে খাওয়ার জন্য মুড়ুক্কু আর বিকানেরি ভুজিয়াও এনেছেন, সেগুলোও নাকি ভাইরাসেই পাওয়া যায়।
হাত পা ধুয়ে এসে লালমোহনবাবু আরাম করে সোফায় বসলেন আর চা এসে গেলো। আমি আর ফেলুদা নিয়ম মেনে ওঁর থেকে ছ-ফুটের'ও বেশি দূরে দুটো মোড়া নিয়ে বসেছি, তাই একটা বাটিতে অনেকখানি ভুজিয়া আর অল্প কয়েকটা মুড়ুক্কু নিয়ে নিলাম, যাতে বারবার আমাকে উঠতে না হয়।
"তারপর লালু-দা", চা খেতে খেতে বললো ফেলুদা, "কেমন চলছে আপনার আনলকডাউন? নতুন গল্পের কোনও আইডিয়া পেলেন? নাকি এবার রহস্য রোমাঞ্চ ছেড়ে 'গড়পারের গৃহস্থ' বলে একটা ঘরোয়া ধারাবাহিক লিখে টেলিভিশন চ্যানেল'কে বেচবেন?"
"ক্ষেপেছেন?", একগাল হেসে বললেন জটায়ু। "আমি লিখবো ঘরোয়া কান্নাকাটি আর কুচুটেপানায় ভরা ধারাবাহিক? ওসব লিখতে গেলে আমার কলমের নিব ভেঙে যাবে না? তা নয়, এবার ভ্রমণ কাহিনী লিখবো ভাবছি। আপনার সঙ্গে তো কম ঘোরা হলো না। কিন্তু জটায়ু নামে তো আর ভ্রমণকাহিনী লেখা যায় না, তাই নিজের একটা নতুন ছদ্মনামও রাখতে চাই, ঠিক যেমন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নীললোহিত নামে ভ্রমণকাহিনী লিখতেন।"
"তা কিছু নাম ঠিক করলেন কি?", ফেলুদা প্রশ্ন করলো। "লাললোহিত নয় আশাকরি।"
লালমোহনবাবু একটু অবাক'ই হলেন। "প্রথমে তাই ভেবেছিলাম, তারপর মনে হলো লোকে ভাববে টুকে পাস করেছি। কিন্তু লাল রঙটা ছাড়তে পারছিলাম না। আবার আমার প্রথম ছদ্মনামটা ওতো powerful, তাই ভাবছিলাম যদি কোনও পাখির নামে নাম রাখা যেতো।", বললেন তিনি।
"লালঝুঁটি রাখলেই পারেন", বললাম আমি। "লালও থাকলো, আবার কাকাতুয়াও।"
নাম'টা লালমোহনবাবু'র মনে ধরলো না। "কাকাতুয়া তো আর জটায়ুর মতো শক্তিশালী নয়। আমার চাই অসীম শক্তি। কি যে করি?"
ফেলুদা'র মুখে হাসি ফুটে উঠলো। "কাকাতুয়া আর শক্তি মিশিয়ে একটা নাম মাথায় এসে গেলো। আপনি আপনার নতুন ছদ্মনাম রাখুন 'ক্র্যাকাটোয়া'। কাকাতুয়ার মতো শোনালেও আসলে ওটা একটা অতি বিধ্বংসী আগ্নেয়গিরি। আর নামে একটা বেশ exotic ভ্রমণের গন্ধও আছে, তাই না?"
লালমোহনবাবু উচ্ছসিত হয়ে উঠলেন। "বেড়ে হয়েছে। শুনলেই মনে হয় দক্ষিণ আমেরিকায় পৌঁছে গেছি। কোথায় যেন আগ্নেয়গিরিটা - চিলি'তে কি?"
"উফ, লালুদা। আপনার কথায় উটের পাকস্থলী কেন বারে বারে ফিরে আসে বলুন তো? তুই বল তোপসে।", ফেলুদা বললো।
"ক্র্যাকাটোয়া তো ইন্দোনেশিয়ায়। জাভা আর সুমাত্রা'র মাঝখানে একটা দ্বীপ। আগে বেশ বড়ো ছিলো, তারপরে ১৮৮৩ সালে অগ্নুৎপাত হয়ে অনেক ছোট হয়ে গেছে।", আমি বললাম। লালমোহনবাবু জীভ কাটলেন।
ভুজিয়া শেষ, তাই বাকি মুড়ুক্কুগুলোও অনিচ্ছাসত্ত্বেও খেতে হলো। এর চেয়ে জটায়ু ডালমুট আনলেই পারতেন, আমার মনে হলো।
"তা হঠাৎ ভ্রমণ কাহিনী'র কথা ভাবলেন কেন বলুন তো?", মুড়ুক্কু'র সাথে চিবিয়ে চিবিয়েই কথাগুলো বললাম।
"কি জানো, ভায়া তপেশ? এই ভাইরাসের ঠেলায় তো ঘোরাঘুরি মাথায় উঠেছে, আবার কবে লোকে ট্রেনে-প্লেনে করে বেড়াতে যাবে কে জানে? তাই ভাবলাম আমাদেরই তো কতো বেড়ানোর অভিজ্ঞতা আছে। সেগুলোই বেশ ভালো করে লিখলে মানুষ সেই লেখা পড়ে কতো আনন্দ পেতে পারে, তাই না?"
"এটা মোক্ষম বলেছেন", ফেলুদা বললো। "কিন্তু এই ভ্রমণে কি প্রখর রুদ্রও থাকছে, নাকি আপনি ওর স্থান অধিকার করেছেন?"
"ছি ছি, তা কি পারি? প্রখরের জায়গা নিতে পারে একমাত্র প্রদোষ। আমি আপনার ছায়াসঙ্গী হয়েই ঘুরেছি, সেভাবেই লিখবো। তপেশরঞ্জনও অবশ্যই থাকবে লেখায়।", জটায়ু খুব ডগমগ হয়ে উত্তর দিলেন।
"তা বেশ", ফেলুদা বললো। "প্রথমে কোন জায়গা নিয়ে লিখবেন ঠিক করেছেন? জয়সলমীর, কাটমান্ডু, বেনারাস, ইলোরা না শিমলা? বা সোজা চলে যাবেন প্রাচ্যের লন্ডন, মানে হংকং'য়ে? নাকি বাড়ির কাছে ঘুরঘুটিয়া দিয়েই বউনি হবে?"
"আজ্ঞে, রাজস্থান নিয়েই প্রথমে লিখবো ভাবছি। ওখানেই আপনাদের সাথে আলাপ কিনা। তাছাড়া উটের পাকস্থলী'র ভুলটা সেই যাত্রাতেই আপনি শুধরে দিয়েছিলেন। আমি তো ভেবে রেখেছি কোনদিন যদি আপনার biography লিখি তাহলে ইংরেজিতেই সেটা লিখবো আর বইটার নাম দেবো Camel's Intestine. কেমন হবে বলুন তো?" জটায়ু যথারীতি তাঁর চিন্তাধারায় ফেলুদার সীলমোহর চান।
"এটাও একটা ছোটখাটো উটের পাকস্থলী হলো বৈকি", ফেলুদা বললো। জটায়ু'র মুখটা চুপসে যেতে দেখে ফেলুদা বললো "আপনি যে উটের কথা ভাবছেন, অর্থাৎ রামদেওরা যাওয়ার সময়ে যাতে চড়ে আপনার গলা শুকিয়ে গেছিলো, সেই এক কুঁজওয়ালা উট'কে বলে Dromedary. আর মূলত চীন আর মঙোলিয়ার দু-কুঁজওয়ালা উট হলো Camel বা Bactrian camel."
"ওই হলো আর কি!", বলে জটায়ু ব্যাপার'টাকে উড়িয়ে দিলেন। "দুটো ব্যাপার কিন্তু নিশ্চিত। আমার প্রথম ভ্রমণকাহিনী'র নাম হবে 'সোনার কেল্লা ফতে', আর সেই বইয়ের ভূমিকা লিখবেন আপনি। কি, লিখবেন তো, ফেলুবাবু?"
"লিখতে পারি, কিন্তু একটা শর্ত আছে। আপনি তো উটের পাকস্থলী ছড়িয়েই যাচ্ছেন, তাই আপনাকে মহাভারত থেকে দুটো প্রশ্ন করবো, সেগুলোর একটারও যদি উত্তর দিতে পারেন, তাহলে লিখবো, নচেৎ নয়।", বললো ফেলুদা।
"আর যদি দুটোই পারি?" জটায়ু'র গলায় তাঁর চরিত্রের সঙ্গে বেমানান আত্মবিশ্বাস।
"তাহলে আমি আপনার বইয়ের ভূমিকা'ই শুধু লিখবো না, বই বিক্রি'র জন্য প্রচারও করবো।", বললো ফেলুদা। কিন্তু ওর গলায় একটা খটকা'র সুর অনুভব করলাম যেন।
"সহজ সরল প্রশ্ন", ফেলুদা বলে চললো। "মহাভারতের যুদ্ধে শ্রীকৃষ্ণ আর অর্জুনের শঙ্খ হলো যথাক্রমে পাঞ্চজন্য আর দেবদত্ত। কেন এই নাম?"
আমি ভাবছি লালমোহনবাবুও আমার মতো হাবুডুবু খাবেন, কিন্তু আশ্চর্য্য, উনি হাততালি দিয়ে "জানি, জানি" বলে উঠলেন।
"বিষ্ণু একবার পাঞ্চজন্য বলে এক দানবকে চক্রবান পর্বতে বধ করেন। এই পাঞ্চজন্য দানবের বসবাস করার জায়গা ছিলো একটা শঙ্খ, যা তার exoskeleton'ও বলা চলে। সেই শঙ্খ'ই বিষ্ণু নিয়ে নেন। আর শ্রীকৃষ্ণ তো বিষ্ণুরই অবতার, তাই দুইয়ে দুইয়ে চার।", বললেন লালমোহনবাবু।
আমি হতবাক হয়ে উত্তর'টা ঠিক কিনা জানার জন্য ফেলুদার মুখের দিকে তাকালাম। ফেলুদা মাথা নেড়ে জানালো উনি ঠিক বলেছেন।
"দ্বিতীয়টা আরও সহজ", বললেন লালমোহনবাবু। "দেবদত্ত মানে দেবতার দান। ময়দানবকে বরুণ দেব এই শঙ্খ দিয়েছিলেন, তারপর খান্ডবদহনের সময়ে অর্জুন তার প্রাণ বাঁচানোয় ময়দানব তাঁকে প্রচুর উপহার দেয়। শোনা যায় এই শঙ্খও ছিলো তার মধ্যে। এই শঙ্খকে বরুণ শঙ্খ'ও বলা হয়।"
এবার ফেলুদাও অবাক। ও আর আমি দুজনেই হাততালি দিয়ে উঠলাম। উটের পাকস্থলীর গিঁট থেকে এভাবেও যে নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়া যায় তা আমি সত্যি ভাবতে পারিনি। ফেলুদাও পারেনি মনে হয়।
"ধন্য আপনি", বললো ফেলুদা৷ "কিন্তু এতো জানলেন কি করে বলুন তো?"
হেসে উঠলেন জটায়ু। "আপনার সঙ্গে ঘুরে আর আপনার গোয়েন্দাগিরি দেখে আমার মগজে তো একটু ধার হতেই পারে, তাই না?", বললেন তিনি। "মাসখানেক আগে যখন আপনাদের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করছিলাম তখন লক্ষ্য করি টেবিলের উপর ডাঁই করা অনেকগুলো মহাভারতের বই। তখনই আমার মনে হয় এর পর আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলে আমাকে boy scout'দের মতো 'Be Prepared' হয়েই আসতে হবে। তাই আমাদের সেই বন্ধু, মহাপন্ডিত অম্বর সেন মহাশয়ের থেকে ক্যুরিয়ার করে ওঁর অনেকগুলো মহাভারতের বই ধার করে নিজের কাছে আনিয়ে নিই। অম্বর সেন'কে মনে আছে নিশ্চই? ওই যে, নিজেই নিজের অন্তর্ধান রহস্য সৃষ্টি করেছিলেন যে ভদ্রলোক।"
আমার মনে পড়ে গেলো। সিধু জ্যাঠা আর ফেলুদা ছাড়া উনিই আমার দেখা সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি। ফেলুদার বুদ্ধি'র মোকাবিলা করতে জটায়ু ভালো লোক'কেই বেছেছেন।
গল্পগুজব চলতে লাগলো। রাত বাড়লো, আর আমরা ভাইরাস রেস্টুরেন্টের খাবার খেয়ে প্রন ভিন্ডালু'কে দশে পাঁচ, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি'কে দশে সাত, শাহী পনীর'কে দশে দুই আর ছানা'র জিলিপি'কে দশে দশ দিয়ে হাত মুখ ধুতে গেলাম।
তারপর আরও কিছুক্ষণ আড্ডার পরে লালমোহনবাবু বললেন, "এবার তাহলে উঠি, ফেলুবাবু। আজকে এখানে এসে খুব ভালো লাগলো। নাহলে রোজ রোজ ভাইরাসে এতো লোকের আক্রান্ত হওয়ার খবর দেখে মনটা ভার হয়ে যাচ্ছিলো। মাঝে মাঝে মনে হয় আনলক না হলেই ভালো হতো। ওটা শুরু হওয়ার পর থেকেই তো হু-হু করে কেস বেড়েছে।"
ফেলুদা হেসে ফেললো। "WHO-WHO বলতে কি বোঝাচ্ছেন বলুন তো?", ও বললো। "আর যেতে যেতে আরেকটা উটের পাকস্থলী না পাকালেই কি চলছিলো না, লালুদা?"
লালমোহনবাবু World Health Organisation'য়ের ব্যাপার'টা ধরতে না পারলেও আবার সেই উটের পাকস্থলী শুনে চমকে উঠলেন। "আবার কি করলাম?", হতচকিত ভাবে বললেন তিনি।
"আসলে দোষটা আপনার একার নয়। পুরো দেশেই এখন এই ব্যাপার।", বললো ফেলুদা। "বিভিন্ন দলের নেতারা একে অপর'কে দোষারোপ করছে, সংবাদমাধ্যম ভয় দেখাচ্ছে, জনতা বুঝে উঠতে পারছে না ভাইরাসটা বাঘ, শেয়াল, ইঁদুর না ডাইনোসর। কেউ কেউ কোনও নিয়ম না মেনে নিজেদের আর অন্যদের বিপদ ডেকে আসছে, আবার কেউ কেউ অতিরিক্ত ভয়েই নিজেকে কাবু করে ফেলছে।"
লালমোহনবাবু মাথা চুলকে বললেন, "তা হয়তো ঠিক। কিন্তু আনলকডাউন যে আরও বিপদ ডেকে এনেছে সেটা তো মানবেন?"
"তাই কি?", ফেলুদা বললো। " যখন লকডাউন চলছিলো তখন কিন্তু আপনার গলায় অন্য সুর ছিলো। অন্য সবার মতো আপনিও চাইছিলেন লকডাউনটা তাড়াতাড়ি কাটুক। আর এখন সবাই সবাই'কে বলছে যে লকডাউনটা অসহ্য হলেও কিন্তু আনলকডাউন না হলেই ভালো হতো। তার মানে তারা অনর্থক দুশ্চিন্তা আর সমালোচনা নিয়েই থাকতে চায়, সমাধানে তাদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।"
"কেন এমন বলছো, ফেলুদা?", আমি বললাম। "আমরা সমাধান করবো কি করে?"
"এই যে আমার বারণ সত্ত্বেও তুই মাঝেসাঝেই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পাড়ার মোড়ে যাচ্ছিস, সেটা কি সমাধানের অঙ্গ বলে তোর মনে হয়?", ফেলুদা বললো। "একমাত্র সমাধান কিন্তু vaccine নয়, তা হলো break the chain (of infection). আর সেটা কোনও দেশের সরকার বা কোন ওষুধের কোম্পানি নয়, একমাত্র আমজনতাই করতে পারে। আনলকডাউন কিন্তু সংক্রমণ বাড়ায়নি, তা বাড়িয়েছে বিবেচনাহীন মানুষ।"
লালমোহনবাবু তাও হাল ছাড়লেন না। "আপনার কথা না হয় মেনেই নিলাম। কিন্তু গত এক মাসে যে অনেক বেশি কেস হয়েছে সেটা তো মানবেন?", তিনি বললেন।
"কি করে মানি, বলুন?", ফেলুদা এবার একটু বিরক্ত হয়েই বললো। "লকডাউনের সময়ে কতোজনের পরীক্ষা হয়েছে আর আনলকডাউনে কতোজনের, তার হিসাব কি আপনার কাছে আছে? সেই তথ্য তো সংবাদমাধ্যম'ও লুকিয়ে রাখছে। এমন কি হতে পারে না, যে অনেকেই আগে থেকে সংক্রমিত ছিলো, আর বেশি পরীক্ষার ফলে এখন রোগ ধরা পড়েছে মাত্র? কিন্তু সংবাদমাধ্যম চায় ভয় দেখাতে, তাই 'অশ্বত্থামা হত, ইতি গজ' করেই ছেড়ে দিচ্ছে। অথচ প্রতি একশোটা পরীক্ষায় কতোজন সংক্রমিত আর কাদের পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেটা জনতা জানেও না, জানার আগ্রহও নেই। আমি যদি কোনও gymnasium আর কোন মিষ্টির দোকানে গিয়ে লোকেদের blood test করাই, তাহলে তো মিষ্টির দোকানের খরিদ্দার'দেরই বেশি blood sugar ধরা পড়বে। কিন্তু তার মানেই কি পৃথিবীর সবার diabetes আছে?"
"তার মানে তুমি বলতে চাও যে ভাইরাস নয়, এই 'ইতি গজ' সংবাদমাধ্যমই হলো শত্রু?", আমি বললাম।
"কিছুটা হয়তো তাই৷ কিন্তু তার চেয়েও বড়ো শত্রু আছে। মগনলাল বা মন্দার বোসের চেয়েও যে দুর্ধর্ষ দুশমন।" ফেলুদা'র মুখটা বিষাদে ছেয়ে গেলো। "তা হলো এই মমতাহীন সমাজ। যারা রুগী'র মৃত্যু হলে তার ভিডিও তুলে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। আর এখন তো সবাই ভাইরাসের চেয়ে সমাজ'কেই ভয় পাচ্ছে বেশি। রুগীদের পরিবারদের শত্রুপক্ষ মনে করে তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে মানুষই তো মানুষের দুশমন হয়ে উঠছে। একে উটের পাকস্থলী বলবো না তো কি বলবো বল তো?"
আমি মাথে নেড়ে সায় জানালাম। লালমোহনবাবু কানে হাত দিয়ে বললেন, "আপনি ঠিকই বলেছেন। আমিও মনে মনে গত একমাস এই সব নিয়ে সমস্ত ভুল ভেবেছি আর অন্যদের ভাবিয়েছি। আর আমার ভুল হবে না। আমি আবারও বুঝলাম কেন আমার ভাগে মগজধোলাই আর আপনার ভাগে মগজাস্ত্র। ধন্যবাদ ফেলুবাবু।"
"একটা কথা বলবো, ফেলুদা?", শেষ কথা আমিই বললাম। "তোমার থেকে আজকে যে শিক্ষা পেলাম, আমার মনে হয় সেটার গল্প লিখে ছাপিয়ে দিলে মানুষের উপকার হবে। গল্পের নাম তো ঠিক করাই আছে - উটের পাকস্থলী। ভালো হবে না?"
ফেলুদা হেসে উঠলো। লালমোহনবাবু'ও।
সমাপ্ত


No comments:
Post a Comment