Wednesday, 25 April 2018

Satyajit Ray Dharani by Ananyo Chakraborty

সাত সকালে ঘুম থেকে ওঠা ফেলুদার বহুদিনের অভ্যেস। যোগাভ্যাসটাও করে রোজ নিয়ম করে। আমি যখন উঠি তখন ফেলুদা হয় চা খেতে খেতে কাগজ পড়ে নাহয় কোন বইয়ে ডুবে থাকে। কিন্তু আজ সকালে বসার ঘরে এসে দেখি ফেলুদা গম্ভীর মুখে পায়চারি করছে, হাতে ধরা একটা কাগজের টুকরো। সাধারণত এইরকম অবস্থায় আমি ফেলুদাকে কোন প্রশ্ন করে বিরক্ত করিনা। আজও করলাম না। চোখের ইশারায় শ্রীনাথের থেকে জানলাম ফেলুদা আজ চা-ও খায়নি। নিঃশব্দে সোফায় এসে বসতেই ফেলুদা আমার দিকে সেই কাগজের টুকরোটা এগিয়ে দিয়ে গম্ভীর ভাবে বললো, 'এটা পড়।'

আমি কাগজটা নিয়ে খুলে দেখলাম তাতে একটা ছড়া লেখা। লেখাটা এরকম...
দাবার চালে কোণাকুণি
বাম ছাড়লো তার শেষ,
সঙ্গে জোড়ে কুল চূড়ামণি
চাঁদ বাইতে চাঁদের দেশ।
সেই দেশেতেই স্মরণ আজি
এসো সবাই ত্বরা
বাড়িও না পা সেই পথে
যেথায়, নামের পাশে ধরা।

'এটা কে দিলো ফেলুদা! এতো দেখছি হেঁয়ালি !'

'এটা হেঁয়ালি তা বোঝার জন্যে মাথায় কিছু না থাকলেও চলে। কিন্তু হেঁয়ালিটা কিসের সেটা বুঝতে হবে। সকালে খবরের কাগজের মধ্যে এই কাগজটা ঢোকানো ছিল এমনভাবে যাতে কাগজটা খুললেই চোখে পড়ে। এখন প্রশ্নটা হল, কে এবং কেন?'

'কিছু উদ্ধার করতে পারলে?" বোকার মতো প্রশ্নটা করতেই দরজায় কলিংবেলের আওয়াজ, আর তারপরেই শ্রীমান জটায়ুর হন্তদন্ত প্রবেশ।

'হাইলি সাস্পিসাস ব্যাপার মশাই! সকাল সকাল কে আমাকে নিয়ে মস্করা করছে দেখুন! খবরের কাগজের ভেতরে কি এক দুর্বোধ্য ছড়া লিখে পাঠিয়েছে মশাই। কিছুই বুঝতে না পেরে আপনার কাছে আসাই ঠিক মনে করলাম।' জটায়ু একটা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন ফেলুদার দিকে। দেখে মনে হল একই ধরনের কাগজ। ফেলুদা কাগজটা নিয়ে দেখে আরও গম্ভীর হয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে দিলো। অবাক হয়ে দেখি সেখানেও সেই এক ছড়া লেখা, দুটোই বাংলায় টাইপ করা, একই ধরনের পাতায় প্রিন্ট নেওয়া।

আমি জটায়ুকে ফেলুদার কাগজটা দেখাতেই ওনার চোয়াল যেন ঝুলে পড়লো। 'আপনাকেও !! একই লেখা! কি সাঙ্ঘাতিক! এসব কার কারসাজি মশাই?"

'আপনার গাড়িটা এনেছেন?' ফেলুদা জটায়ুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা করলো।

'হ্যাঁ, বাইরেই রয়েছে। বেরোবেন নাকি? ইয়ে, মানে গুপ্তধন-টন নাকি মশাই !! '

ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'পাঁচ মিনিটে রেডি হ তোপসে।

রজনী সেন রোড থেকে বেরিয়ে মুদিয়ালি আসতেই ফেলুদা ড্রাইভারকে বলল ভবানিপুরের দিকে যেতে। আমি আর জটায়ু উসখুস করছি। ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'দাবার চালে কোণাকুণি, মানে কি?'

'কোণাকুণি মানে...গজ।' বললাম আমি।

'সাবাস! বাম ছাড়ে তার শেষ, বাম অর্থাৎ লেফট, তার শেষ অক্ষর ছেড়ে দিলে লেফ।'

'কি সব বলছেন কিছুই বুঝছিনা মশাই। গজ, লেফ, চাঁদ... এসব কি? রহস্যময় ব্যাপার ! আপনার সাথে এরকম হেঁয়ালি করার সাহস রাখে কে এই খোদ কোলকাতায়?'

'কূল চূড়ামণির কোন সুযোগ্য শিষ্য...' ফেলুদা মুচকি হেসে জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বললো,' চাঁদ বাইতে চাঁদের দেশ... একে চন্দ্র, অর্থাৎ এক বাই এক। আর গজ অর্থাৎ বিশপ। লালমোহন বাবু, কোনো গুপ্তধন নয়, তবে এক মহারাজের প্রাসাদে যাচ্ছি আমরা।'

'এক বাই এক বিশপ !! মহারাজ ! আমি সত্যি কিছুই বুঝতে পারছিনা ফেলুদা।' আমি আত্মসমর্পণ করাই শ্রেয় মনে করলাম।

'মারবো মাথায় এক গাঁট্টা। ' ফেলুদা বললো, 'সকালে উঠে যোগাভ্যাস কর।'

ভবানিপুর পোস্ট অফিসটা পেরোতেই ফেলুদা ড্রাইভারকে বললো ডানদিকে ঘোরাতে। রাস্তার নাম দেখেই চমকে উঠলাম আমি। বিশপ লেফ্রয় রোড... গজ অর্থাৎ বিশপ, লেফট টি ছেড়ে লেফ, আর সঙ্গে জোড়ে কুলচূড়ামণি, তার মানে 'রয়'। এক বাই এক, বিশপ লেফরয় রোড, স্বয়ং সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি ! বিদ্যুৎচমকের মতো মনে পড়লো আজ ২৩শে এপ্রিল, ওনার মৃত্যুদিন...

স্মরণসভায় প্রোফেসর শঙ্কুও এসেছিলেন। ফেলুদা ওনাকে প্রণাম করতেই উনি হেসে জড়িয়ে ধরলেন ফেলুদাকে, একটু আড়ালে ডেকে কিছু আলোচনাও করলেন। খুব শিগগিরি আমাদের বাড়ি আসবেন কথা দিলেন। ফেরার পথে জটায়ু বললেন, 'এই বাড়িতে এসে যেন তীর্থস্থান ভ্রমণের অনুভূতি হলো। হেঁয়ালির সবই তো বুঝলাম মশাই, কিন্তু ওই শেষ দুটো লাইন... বাড়িও না পা সেই পথে / যেথায়, নামের পাশে ধরা...এটার অর্থ কি বুঝলাম না তো। '

ফেলুদা মুচকি হেসে বললো, 'পাশের রাস্তাটার নাম খেয়াল করেছেন? সত্যজিৎ রয় ধরণী...

No comments:

Post a Comment