ব্যোমকেশ ও ফেলুদা , প্রথম আলাপ
১৯৬৭ সাল । ফেলুদার গোয়েন্দাগিরির একেবারে প্রথম যুগ । শ্যামপুকুরের কৈলাস চৌধুরীর কেসটার সমাধান করেছে ফেলুদা মাত্র কদিন আগেই ।তখন আমরা তারা রোডের বাড়িতে থাকি ।সকালের দিকে মাঝে মাঝে লেকে হাঁটতে যাই । তারপর একটা বেঞ্চিতে গিয়ে বসি । সিধু জ্যাঠা এসে পড়েন ইতিমধ্যে । ঘণ্টা খানেক আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরে আসি । মাত্র মাস তিনেক আগেই এই লেকের ধারটা ছিল জনশূন্য । পর পর বেশ কয়েকটা খুনের ঘটনা ঘটেছিল তখন । তারমধ্যে একটা তো একেবারে এই বেঞ্চিগুলোরই একটার ওপরে । একজন দিনমজুর ঘুমচ্ছিল । তার পিঠের বাঁ দিকে শজারুর কাঁটা ফুটিয়ে দিয়ে তাকে খুন করা হয় । খবরটা কাগজে পড়ে ফেলুদা আমাকে সঙ্গে নিয়ে খুনের যায়গাটা দেখতে গিয়েছিল । ওই বেঞ্চির কাছাকাছি ঘাসের মধ্যে একটা পোড়া সিগারেট খুঁজে পেয়েছিল ফেলুদা । সেটা দেখে ও বলেছিল , যদি সিগারেটটা খুনি খেয়ে থাকে তাহলে দেখবি লোকটা বেজায় কৃপণ ।
কি করে বুঝলে ?
দ্যাখ যারা নিয়মত সিগারেট খায় , কতটা খাওয়ার পর সেটা ফেলে দেবে তার একটা নিজস্ব হিসেব থাকে । যদি অ্যাশট্রেতে পোড়া সিগারেটগুলো লক্ষ করিস দেখবি সেগুলোর মাপও মোটামুটি এক । কিন্তু যারা মাঝেমাঝে খায় বা খুব কম খায় এবং একটু হিসেবি তারা দেখবি চট করে ফেলে দেয় না , পারলে প্রায় ফিল্টার পর্যন্ত টেনে শেষ করে, তারপর ফেলে । এখানেও তাই। যায়গাটা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হলে অন্যরকম ভাবতাম , কিন্তু ফিল্টারে পানের পিক লেগে রয়েছে । কাজেই যে খেয়েছে সে হয় কৃপণ অথবা তার অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা ভাল নয় ।
এর পরেও আর একটা খুনের ঘটনা ঘটেছিল একই ভাবে । তারপর কাগজ পড়েই জানতে পারি খুনি ধরা পড়েছে । খুনি একজন গায়ক , নাম প্রবাল । আমরাও রেডিওতে তার গান মাঝে মাঝে শুনেছি । তার সম্পর্কে যে বর্ণনা বেরিয়েছিল সেটা ফেলুদার অনুমানের সঙ্গে হুবহু মিলে গিয়েছিল । ও কিছু বলে নি , শুধু একপেশে হাসিটা হেসেছিল । আমি জানি এই কেসটা ওর হাতে এলে ও এটার সমাধান অনায়াসেই করতে পারত । কিন্তু এই কেসটার সঙ্গে একজন নামকরা ব্যাবসায়ির পারিবারিক ঘটনা জড়িত ছিল । তারা বিখ্যাত ব্যোমকেশ বক্সিকে কাজের ভার দিয়েছিল এবং উনিও ওঁর স্বাভাবিক দক্ষতায় খুনিকে ধরে দেন । খবরটা বেশ বড় করে বেরিয়েছিল কাগজে ।
এর কিছুদিন পরে আমরা লেকের ধারে হাঁটছি , এখন যায়গাটা আবার আগের মতই জনপ্রিয় , কারন শজারুর কাঁটার খুনি ধরা পড়েছে , ফেলুদা একজনকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল । বছর পাঞ্চান্ন বয়েসের সাদা ধুতিপাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক । উন্নত নাক , চোখে একটা মোটা চশমা , শার্প চেহারা , কানের পাশের দিকের চুলে অল্প পাক ধরেছে , কিন্তু চামড়া টানটান । লেকের দিকে মুখকরে একটা বেঞ্চিতে বসে আছেন । ফেলুদা ওঁর দিকে এগিয়ে গেল ।
নমস্কার , আপনি কি ব্যোমকেশ বাবু ?
আজ্ঞে হ্যাঁ , প্রতি নমস্কার করে বললেন ভদ্রলোক ।
আমার নাম প্রদোষ চন্দ্র মিত্র , আমি কাছেই তারা রোডে থাকি ।
ব্যোমকেশ বাবুর ভ্রু কুঁচকে গেল । প্রদোষ মিত্তির । মানে আপনার নামই তো ফেলু ? আপনার আর আমার পেশা তো একই তাইনা ? আপনি তো সম্প্রতি কৈলাস বাবুর কেসটা সলভ করেছেন ?
আজ্ঞে হ্যাঁ , আমাকে আপনি বলবেন না । আমি বয়েসে আপনার থেকে অনেকটাই ছোট ।
বেশ বেশ ,তা তুমি তো বেশ বুদ্ধিমান ছেলে ।
কিন্তু কৈলাসবাবুর কেসটা তো কাগজে বেরোয় নি । আপনি কি করে জানলেন ব্যাপারটা ?
ব্যোমকেশ বাবু আমাদের ওঁর পাশে বসার ইশারা করে একটু মুচকি হেসে বললেন সেই ব্লু বেরিলের কেস তো ? আচ্ছা তুমি তো আমাকে চেন , খবর রাখো , আন্দাজ কর দেখি কিভাবে আমি খবরটা পেলাম ।
ফেলুদা একটু ভেবে বলল , আচ্ছা আপনাদের একটা বইয়ের ব্যাবসা আছে না , কলেজ স্ট্রীটে । অজিতবাবু সেটার দেখাশোনা করেন । কৈলাস বাবুর লেখা শিকারের বইও বইপাড়া থেকেই ছেপে বেরোয় । মানে ওঁর ওই পাড়ায় যাতায়াত আছে নিয়মিত । তাহলে কি অজিতবাবুর সুত্রে আপনাদের আলাপ আছে ?
শাবাশ । তোমার অনুমান নির্ভুল । আসলে অজিত কৈলাস বাবুর লেখা একটা বই ছাপার জন্য ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে । সেই সুত্রে আমার সঙ্গেও আলাপ হয় । উনি আমার কাছেই এসেছিলেন প্রথমে । কিন্তু তখন আমি শজারুর কাঁটার কেসটা নিয়ে খুব ব্যাস্ত । অমৃতবাজারে তোমার দেওয়া বিজ্ঞাপন আমি পড়েছিলাম । আমিই ওকে সাজেস্ট করি তোমার কাছে যাওয়ার জন্য । আর আমার নামটা উহ্য রাখতে বলি যাতে তোমার ওপর কোন অতিরিক্ত চাপ না আসে । আমি কেসটা নিলে কেদার সুবিধে করতে পারতো না কারন আসল কৈলাসবাবুর সঙ্গে আমার আগেথেকেই আলাপ ছিল । গোয়েন্দা পাল্টে যাওয়ার সুযোগটাই ও নিয়েছিল । কিন্তু তুমি তো দক্ষতার সঙ্গেই কেসটা সমাধান করেছো , এবং তোমার অজান্তেই আমার মুখরক্ষা করেছো । কৈলাসবাবু পরে ফোন করে সব বর্ণনা দিয়ে তোমার দারুন প্রশংসা করেছেন । তুমি কি খুব ব্যাস্ত , তা না হলে চল , কাছেই আমার বাড়ি , চা খাবে ।
ফেলুদা বলল আমি জানি আপনার বাড়ি কেয়াতলায় । কিন্তু আজ নয় আগামী কাল যাব আপনার বাড়ি যদি অসুবিধে না থাকে । আসলে আমার এক জ্যাঠামশাই রোজ এখানে আসেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে , তাঁকে বলা নেই , না দেখতে পেলে হয়তো চিন্তা করবেন ।
ব্যোমকেশ বললেন তথাস্তু , তাহলে কাল সকালে এইখানেই চলে এস , তারপর একসঙ্গে যাওয়া যাবে ।
এই ছিল ফেলুদা আর ব্যোমকেশ বক্সীর প্রথম আলাপ । ১৯৬৭ সালে ব্যোমকেশ যখন শজারুর কাঁটার কেসটা সলভ করেন তখনই ফেলুদা কৈলাস চৌধুরীর পাথরের কেসটা পায় । পরদিন যখন আমরা ব্যোমকেশ বাবুর বাড়ি যাই সেটাও ছিল এক দারুন অভিজ্ঞতা । অন্য একদিন সে গল্প বলবো ।

No comments:
Post a Comment