সময়ের ইতিহাস
ঘরে ঢুকে দেখি ফেলুদা ওর সংখ্যাতত্বের বইটা তাক থেকে পেড়ে খুব মনোযোগ দিয়ে কি একটা দেখছে। ভুরু দুটোর কপালে ওঠা দেখে বুঝলাম বেশ অবাক হয়েছে, কিন্তু তার বেশি কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর পাবনা জানি, তাই খবরের কাগজটা তুলে নিলাম। আজ যেটা সবথেকে বড় খবর সেটা অবিশ্যি বাংলা ইংরেজি কোনও কাগজেই বেরোয়নি, আমি টিভির খবরে জানলাম। আর কাগজটা খোলা মাত্রই ফেলুদা বইটা নামিয়ে আমায় যে প্রশ্নটা করল তাতে বুঝলাম সেও ওই একই ব্যাপার নিয়ে ভাবছিল। বলল, 'আজ একজন বিখ্যাত ব্যক্তি মারা গেছেন জানিস বোধহয়?'
'স্টিফেন হকিং তো?'
'হ্যাঁ। আইনস্টাইনের পরে ফিজিক্সের জগতে এতো বড় মাথা আর আসেনি। অথচ আশ্চর্য্য ব্যাপার, ভদ্রলোকের মাথা ছাড়া শরীরের প্রায় সবটাই আস্তে আস্তে কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল গত পঞ্চাশ বছরে। এরকম মনের জোর, জাস্ট ভাবা যায়না।'
'কিন্তু তোমার ওই ডক্টর ম্যাট্রিক্সের বইতে কি স্টিফেন হকিংয়ের কথাও লিখেছে নাকি?'
'ঠিক নাম করে লেখেনি, কিন্তু মানুষের জীবনে সংখ্যার গুরুত্বটা আরেকবার মনে পড়ে গেল, তাই বইটা একটু নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।'
'কেন, মনে পড়ে গেল কেন?'
'আজকের তারিখটা লক্ষ্য করেছিস কি?'
'চোদ্দই মার্চ।'
'হ্যাঁ। আমরা বলবো ১৪-৩, কিন্তু আমেরিকার লোকেরা বলে ৩-১৪। এই তিনটে সংখ্যা পাই-এর প্রথম তিনটি সংখ্যা হওয়ার ফলে এই দিনটাকে আমেরিকায় পাই ডে বলা হয়। গণিত এবং গণিতজ্ঞদের দিন হিসেবে এটাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।'
'ও, তাই নাকি? স্টিফেন হকিং তো গণিতজ্ঞই বটে। কিন্তু এটা কি নিছকই একটা সমাপতন বা কোইন্সিডেন্স নয়? '
'উঁহু, শুধু তাই নয়। চোদ্দই মার্চ আরেকজন বিখ্যাত মানুষের জন্মদিন সেটা জানিস?'
'কার?'
'অ্যালবার্ট আইনস্টাইন।'
আমার চোখ কপালে উঠে গেল। আইনস্টাইনের জন্মদিন আর হকিংয়ের মৃত্যুদিন এক? এ তো সেই লিংকন-কেনেডির ব্যাপারটার মতন হয়ে গেল। আমার মনের ভাব আন্দাজ করেই বোধহয় ফেলুদা ওর একপেশে হাসিটা হেসে বলল, 'এখানেই শেষ নয়, আরও আছে।'
'কি?'
'হকিংয়ের জন্মদিন কবে?'
'আটই জানুয়ারী ১৯৪২। এক্ষুনি টিভিতে দেখলাম।'
'বেশ। তার ঠিক ৩০০ বছর আগে, অর্থাৎ আটই জানুয়ারী ১৬৪২ কি হয়েছিল জানিস?'
'জানতাম, ভুলে গেছি।'
'আবার বাজে কথা বললে গাঁট্টা খাবি। যে তারিখটা বললাম সেটা হল গ্যালিলিওর মৃত্যুর দিন। অর্থাৎ স্টিফেন হকিং জন্মেছেন গ্যালিলিওর মৃত্যুর তারিখে, আর মারা গেলেন আইনস্টাইনের জন্মের তারিখে।'
'কি আশ্চর্য্য, তাই না ফেলুদা?'
'আশ্চর্য্য তো বটেই। টাইম ব্যাপারটা যে কি অদ্ভুৎ নিয়মে চলে সেটা বুঝতে আমাদের এখনও ঢের দেরি। যেদিন বুঝব সেদিন হয়ত আর আশ্চর্য্য লাগবেনা। অবিশ্যি হকিং চলে যাওয়ায় সে বোঝার দিনটা যে বেশ খানিকটা পিছিয়ে গেল তাতে সন্দেহ নেই।'
'আচ্ছা এরকম আরেকটা শুনেছিলাম, গ্যালিলিও যে বছর মারা যান সে বছরই নিউটন জন্মান, তাই না?'
'হ্যাঁ এবং না, দুটোই।'
'তার মানে?'
'মানেটা পরে বুঝিয়ে দেবো। আপাতত দরজাটা খোল, জটায়ুর গাড়ির শব্দ পেলাম।'
---
Source: https://hellocheck123.blogspot.com/2018/03/blog-post.html
(বৈজ্ঞানিক স্টিফেন হকিং মারা যাওয়ার পর আমার বাবার পাঠানো একটি হোয়াটস্যাপ মেসেজের থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই লেখাটা ফেসবুকের "ফেলুদা ফলোয়ার্স" গ্রুপে পোস্ট করেছিলাম। এখানেও দিয়ে দিলাম।)
No comments:
Post a Comment