Wednesday, 14 March 2018

Fan Fiction by Tapas Chattopadhyay

 ‘আরে ভাই তোপসে, এসব কি শুনছি চারিদিকে? গ্যালিলিও মারা গিয়ে নাকি আইনস্টাইন হয়ে এসেছিলেন, আবার আইনস্টাইন মারা গিয়ে নাকি হকিং হয়ে এসেছিলেন….আমার তো সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে ভায়া!’ বলতে বলতে জটায়ু ঘরের মধ্যে ঢুকেই ধপ করে সামনের সোফাতে বসে হাঁক পাড়লেন…’ওহে শ্রীনাথ, একগ্লাস চিলড্ ডাই হাইড্রোজেন অক্সাইড খাওয়াও দেখি…’

আমি প্রতিবাদ করে উঠলাম,‘সে কি করে সম্ভব? গ্যালিলিও মরে যদিও বা আইনস্টাইন হতে পারেন, আইনস্টাইন মরে কিছুতেই হকিং হতে পারেন না. আইনস্টাইন মারা গেছিলেন ১৯৫৫ সালে, আর হকিং এর জন্ম ১৯৪২ এ.’
‘তাহলে যে সবাই চারিদিকে বলাবলি করছে এনাদের জন্মদিন আর মৃত্যুদিন নাকি সব এক, একদম অঙ্ক কষে একজনের মৃত্যুর পরেই অপরজন এসেছেন! ফেসবুক তো ভরে গেছে ভায়া !’ জটায়ুর কথা শেষ হতে না হতেই শ্রীনাথ একটা খালি গ্লাস এনে টেবিলে রাখলো. জটায়ু অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘খালি কেন? জল কই?’ শ্রীনাথ একটুও না ঘাবড়ে বললো, ‘আপনি তো গেলাসে করে গ্যাস চাইলেন…ওইযে কিসব ‘জেন’ 'সাইড' গ্যাসের নাম বললেন. তাই তো আমি হাওয়া ভর্তি গেলাস এনে দিলাম, এর মধ্যেই সব গ্যাস পেয়ে যাবেন ’
আমি হো হো করে হেসে উঠতেই জটায়ু একটু অপ্রস্তুত হয়ে ফেলুদার দিকে তাকালেন. ফেলুদা এতক্ষন মন দিয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলো. এবার মাথা না তুলেই জটায়ুর পরিত্রাতা হয়ে বলে উঠলো, ‘ডাই হাইড্রোজেন অক্সাইড হলো H2O,অর্থাৎ জল, বুঝলে শ্রীনাথ. লালমোহনবাবু কে এক গ্লাস ঠান্ডা জল খাওয়াও. লালমোহনবাবু,জেনে রাখুন, হকিং সাহেব আত্মা বা জন্মাতরবাদকে অলীক গল্পকথা বলতেন. তা আপনার বাড়ির কম্পিউটারটা আজ সকাল থেকে হঠাৎ খারাপ হলো কি করে?
জটায়ু কিছুক্ষন হাঁ করে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকে যত দেখি তত অবাক হয়ে যাই মশাই! কথা হচ্ছিল আইনস্টাইন আর হকিংকে নিয়ে, আপনি কি করে বুঝলেন যে আমার বাড়ির কম্পিউটার খারাপ ?”
‘এসব একটু চোখ কান খোলা রাখলেই বোঝা যায়’, ফেলুদা খবরের কাগজটা রেখে জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বললো, ‘প্রথমত, আপনি ফেসবুকের পোস্টগুলো পুরোটা ভালো করে পড়েননি. তাই জন্মদিন আর মৃত্যুদিনের লিংকগুলো গুলিয়ে ফেলেছেন. আসলে, গ্যালিলিওর মৃত্যুদিন আর হকিং-এর জন্মদিন এক, আর আইনস্টাইন এর জন্মদিন আর হকিং এর মৃত্যুদিন এক, এগুলোকে মিলিয়ে একটা সমাপতনের আলোচনা চলছে. আলোচনার জন্য তথ্যগুলো আপনার দরকার অথচ আপনি পোস্টগুলো ভালো করে পড়তে পারেননি, আপনি মোবাইল ব্যবহার করেননা, তাই কম্পিউটারই ভরসা. দ্বিতীয়ত, আপনি এসে থেকে উশখুশ করছেন আর লাস্ট ৫ মিনিটে অন্তত ১০ বার আমার ডেস্কটপের দিকে তাকিয়েছেন, অর্থাৎ, আপনার বাড়ির কম্পিউটার কাজ করছেনা. ইন্টারনেট থেকে হকিং সাহেবকে নিয়ে কোনো জরুরি তথ্য সংগ্রহ করতে না পেরে আপনি বেশ টেনশনে আছে. তাই আমার কম্পিউটারটি ব্যবহার করার কথা পারবেন কিনা ভাবছেন'.
‘হে হে, আপনার মগজাস্ত্র মশাই ব্রহ্মাস্ত্রকেও হার মানায়, ইয়ে মানে আপনার জন্মদিনের সাথে বিখ্যাত কারুর জন্মদিন মিল টিল খায় নাকি,' জটায়ু বেশ গদগদ হয়ে বললেন, ‘আসলে সকালে হকিং সাহেবের খবরটা শুনে দুঃখ তো হলোই, সাথে সাথে মাথায় এলো একটা নতুন গল্পের প্লট . 'ব্ল্যাকহোলের বিভীষিকা’. মানে ব্ল্যাকহোলের ভিতরেই বসবাস করে এমন কিছু ভয়ঙ্কর প্রাণীদের নিয়ে সায়েন্টিফিক থ্রিলার, বুঝলেন কিনা! হে হে নামটা জব্বর দিয়েছি কি না বলুন, আজকাল তো দেখি ছেলে ছোকরারা 'কে কোথায় খেতে যায়নি' এই নিয়েই থ্রিলার লিখে ফেলছে’
‘আপনি আইনস্টাইনকে উৎসর্গ করে একটা গল্প লিখেছিলেন না? আণবিক দানব? যাতে ম্যাক্সিমাম গাঁজা ছিল?’ ফেলুদা স্থির দৃষ্টিতে জটায়ুর দিকে তাকিয়ে বললো. জটায়ু বেশ ঘাবড়ে গিয়ে আমতা আমতা করে বললেন, ‘হ্যা মানে, সে লিখেছিলাম বৈকি. আর আপনি বলার পর বুঝতেও পেরেছিলাম যে ডিটেলে পড়াশোনা না করে লেখা উচিত হয়নি. তাই তো গল্পের প্লটটা মাথায় আসতেই কম্পিউটার খুলে ইন্টারনেটে তথ্য সংগ্রহ করতে বসলাম. কিন্তু কি আশ্চর্য মশাই, নেট খুলতে একটু পরেই কিসব উল্টোপাল্টা লিংক আসতে লাগলো, স্ক্রিন লাফাতে লাগলো, পেজ নিজে থেকেই পাল্টে যেতে লাগলো…ভয় পেয়ে বন্ধ করে এখানে চলে এলাম.’
ফেলুদা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ‘তোপসে, তোর কি মনে হয় ব্ল্যাকহোলে প্রাণ থাকা সম্ভব ?” আমি বললাম, ‘না. কারণ একটা বিশাল ভারী গহ্বর, যার এমন সাংঘাতিক মহাকর্ষীয় টান যে কোনো বস্তু তো ছাড়, আলো অবধি সেই টান এড়িয়ে যেতে পারেনা, তার মধ্যে প্রাণের বসবাস! অসম্ভব. ‘ধারণাটা অনেকদিন পর্যন্ত এরকমই ছিল, বুঝলি তোপসে’ বললো ফেলুদা, ‘যতদিন না পর্যন্ত রাশিয়ান ফিজিসিস্ট প্রফেসর ভিয়াচেস্লাভ দোকুচাইভ অঙ্ক কষে দেখালেন যে ব্ল্যাকহোলের মধ্যেও এমন কিছু স্তর থাকতে পারে যেখানে ফিজিক্সের সূত্র খাটেনা, আর সেখানে ব্ল্যাকহোলের টান এড়াতে গেলে আলোর চেয়ে জোরে ছুটতেও হয়না. সেইসব স্তরে আমাদের অজানা কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে ভেসে বেড়াতে পারে কোনো বস্তু, কোনো গ্রহ এমনকি সেই গ্রহে বসবাসকারী প্রাণীরাও. ব্ল্যাকহোলের বাইরে থেকে যাদের কোনো অস্তিত্ত্ব বোঝা সম্ভব নয়.’
‘বলেন কি মশাই!! আমার তো শুনেই কেমন যেন গুসবাম্পস হচ্ছে ! ব্ল্যাকহোলের ভেতরে সত্যি সত্যি প্রাণের অস্তিত্ত্ব থাকা সম্ভব ? তার মানে কোনো না কোনো ভাবে তাদের ব্ল্যাকহোলের বাইরে বেরিয়ে আসাও সম্ভব…আর বেরিয়ে এসে পৃথিবীতেও, মানে ধরুন কিনা এই কলকাতাতেও এসে পড়া সম্ভব !!’ জটায়ু প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, ’এতো আমার রহস্য গল্পের পুরো রসদ পেয়ে গেলাম মশাই’
‘রহস্যের এখনো অনেক কিছু বাকি আছে লালমোহনবাবু', ফেলুদা চেয়ার থেকে উঠে একটা চারমিনার ধরালো, ‘আপনার কম্পিউটার আজ সকাল থেকে কেন কাজ করছেনা জানেন?’
‘হয়তো ভাইরাস’ আমি বলে উঠলাম. ‘সাবাস তোপসে !’ ফেলুদা প্রশংসার দৃষ্টিতে আমার দিকে একবার তাকিয়ে জটায়ুর দিকে ফিরে বললো, ‘আপনার স্টিফেন হকিং সাহেব কম্পিউটার ভাইরাস নিয়ে কি বলে গেছেন জানেন? কম্পিউটার ভাইরাস একটা সফটওয়্যার প্রোগ্রাম হলেও সেগুলো আসল ভাইরাসের মতোই একটা হোস্ট থেকে অন্য হোস্টে যেতে পারে এবং হোস্টের মধ্যে বংশবিস্তারও করতে পারে. হকিং বলেছিলেন, যে কম্পিউটার ভাইরাসকে একটা জীবন্ত প্রাণী হিসাবে মর্যাদা দেওয়া উচিত, কারণ তার মধ্যে প্রাণের সব লক্ষণ রয়েছে. শুধু দুঃখের কথা যে মানুষের সৃষ্ট এই প্রাণী তার স্রষ্টার মতনই শুধু ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারে, হয়তো ব্ল্যাকহোলের ভেতরেও এমন বিদ্ধংসী কম্পিউটার ভাইরাসের মতোই বিভীষিকাময় প্রাণের অস্তিত্ত্বই পাওয়া যাবে, যাদের জাতভাইরা এখন আপনার কম্পিউটারে এসে আস্তানা গেড়েছে’.
কথা শেষ করে ফেলুদা চারমিনারে একটা লম্বা সুখটান দিলো। শ্রীনাথ এবার গ্লাসে জল নিয়ে এসেছিলো, জটায়ু কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাসটা ধরে আড়চোখে ঘরের কম্পিউটারটার দিকে তাকালেন।

No comments:

Post a Comment