Tuesday, 6 February 2018

Fan Fiction by Santapriya Chakraborty

 আচ্ছা মশাই! শাহজাহান, আরঙজেব হল গিয়ে মুঘল, আর এই খলজিরা তো তাদের বেশ কিছুটা আগে? তবে সুলতান কারা? দাস বংশের ব্যাপারটাই বা ঠিক কী? আর এই রাজপুত.....

লালমোহনবাবু আর‌ও একগুচ্ছ প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তাকে থামিয়ে ফেলুদা বলল 'আপনাকে মশাই আমি শুধু খলজি বংশের ইতিহাস আর সমকালীন রাজপুতদের শাসনকালটা একটু উল্টেপাল্টে দেখে আসতে বলেছিলাম। আর আপনি তো দেখছি সব ঘেঁটে ঘ বানিয়ে বসে আছেন!'
ব্যাপারটা হচ্ছে আমাদের আজ "পদ্মাবত" দেখতে যাওয়ার কথা থাকায় ফেলুদা লালমোহনবাবুকে দু'দিন আগে ইতিহাস ব‌ইটা একটু চোখ বুলিয়ে নিতে বলেছিল। ‌ও বলে, নতুন কিছু দেখার আগে বা নতুন জায়গায় যাওয়ার আগে সেটা সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করে নিলে ইন্টারেস্টটা একটু বেশী পাওয়া যায়। কিন্তু ভদ্রলোক সব তালগোল পাকিয়ে সিনেমাফেরত তার নিজের গাড়ীতে বসে একটার পর একটা প্রশ্ন করে চলেছেন।
তার জট ছাড়াতে ফেলুদা বলল ' মহম্মদ ঘুরীর মৃত্যুর পর ১২০৬ থেকে ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত যে পাঁচটি বংশের দখলে দিল্লীর তখ্ত ছিল তাদেরকেই ‌একত্রে সুলতান বংশ বলে। ‌এগুলি হল মামুক, খলজি, তুঘলক, সৈয়দ ও লোদী বংশ। এই মামুক বংশের প্রতিষ্ঠাতা কুতুবদ্দীন আইবক ছিলেন একজন ক্রীতদাস। ছেলেবেলাতেই ইরানের বাজারে বিক্রী হ‌ওয়ার পর অনেক হাত ঘুরে অবশেষে মহম্মদ ঘুরীর কাছে আসেন এবং তার দাস হিসেবে কাজ করতে থাকেন। পরবর্তীকালে ঘুরীর মৃত্যুর পর দিল্লীর সিংহাসন দখল করেন। ক্রীতদাস থেকে দাস, আর তা থেকেই দাসবংশ। অর্থাৎ সুলতান রাজ্যত্বের এই মামুক বংশ‌ই দাস বংশ রুপে খ্যাত। আর মোঘল শাসনকালের সূচনা লোদী বংশের শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদীকে পানিপথের যুদ্ধে বাবর পরাজিত করার পর। এরপরের ইতিহাস আশা করি আপনার জানা?' - প্রশ্ন করল ফেলুদা।
লালমোহনবাবু হেসে বললেন 'তা জানা, মুঘল পিরিয়ডটা বরাবর‌ই আমার ফেবারিট। স্কুলে থাকতে "আলমগীর" নাটক করে ফাস্ট প্রাইজের মেডেল পেয়েছিলুম।' তারপর আমার দিকে চেয়ে বললেন ' তবে যাই বল ভাই তপেশ, এই খলজি চরিত্রটির মধ্যে একটা ইয়ে ইয়ে ব্যাপার আছে‌। এরকম হিংস্র, ভয়ানক,নিষ্ঠুর আবার খানিক উন্মাদ চরিত্র খুব বেশী নেই বোধহয় ইতিহাসে! আছে নাকি ফেলুবাবু?', জিগ্গেস করলেন ভদ্রলোক।
ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে গাড়ীর কাঁচ নামিয়ে দুটো ধোয়ার রিং ছেড়ে বলল 'মুষ্কিলটা কোথায় জানেন? আপনারা কোন জিনিস একবার দেখেই সেটা যাচাই না করে একটা ধারণা নিজের মনে বানিয়ে নেন। এই ফিল্মের খলজী চরিত্রটির সাথে বাস্তব আলাউদ্দীন খলজীর বিস্তর ফারাক। পরিচালক মশাই ছবির স্বার্থে সুকৌশলে তাতে পরিবর্তন এনেছেন। সেটা খানিক গ্রহণযোগ্য হলেও শিক্ষিত মানুষজন সেটাকেই সর্বৈব সত্যি ধরে নেবে তা মানা যায় না। চরিত্রটিতে যে বেশকিছু ভাল দিক‌ও যে রয়েছে সেটা খলজি বংশের ইতিহাস পড়লে জানা যায়। তিনিই ভূ-ভারতে প্রথম রেশন ব্যবস্থা চালু করেন, বাজারদর নিয়ন্ত্রণ করার বন্দোবস্ত করেন। জমি জরিপ করে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করেন। তাছাড়া রাজ্যে সুশাসন গড়ে তুলতে মদ্যপান, জুয়া খেলা বন্ধ করেন তিনি। দিল্লীর সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম এক সুসংগঠিত সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। কাজেই এরকম এক শাসককে আপনি আড়াই ঘন্টার একটা সিনেমা দেখে চরিত্রায়ন করে ফেললেন লালমোহনবাবু! এটা কি আপনার মত একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের শোভা পায়?'
ভদ্রলোক জিভ কেটে বললেন 'কি করব মশাই! চোখের সামনে যা দেখব, বা যা দেখানো হবে সেটাকেই তো সত্যি বলে ভাবব। আমাদের আর দোষ কী বলুন! ইতিহাসের খোঁজ অত কে রাখে?'
ফেলুদা জবাবে বলল 'কিছু খোঁজ রাখা ভাল। যদি রাখতেন তবে বাগবাজারে মোহন ময়রার দোকান থেকে সিঙারা কিনে বেরানোর সময় তোপসেকে যে আপনি জিগ্গেস করলেন এ অঞ্চলে কবে বাঘ পাওয়া যেত, সেটা আর করতেন না। অর্থাৎ আপনার ধারণা ঐ অঞ্চলে বাঘ ছিল বলেই বাগবাজার নাম।'
কথার রেশ ধরে আমি বললাম ঐ অঞ্চলে ইংরেজ ব্যবসায়ী পেরিন সাহেবের এক বিশাল বাগান ছিল আঠারো শতকের গোড়ার দিকে। সেই বাগান কিংবা বাগিচা থেকেই বাগবাজার নাম, এর সাথে বাঘের কোন সম্পর্ক নেই।
কথা শুনে ভদ্রলোক খানিক লজ্জিত হয়ে বললেন 'যেই শহরে থাকি তা সম্বন্ধেই কত কম জানি মশাই। তাই তো ভাবি, কলিকাতা হচ্ছে ব্রিটীশদের সাধের শহর, ভারতের পুরানো রাজধানী। সেখানে কি আর বাঘ থাকে! হেঁ হেঁ হেঁ..'
ফেলুদা বলল 'আপনি আবার গোল্লা পেলেন লালমোহনবাবু। আপনার ‌জ্ঞানের ভান্ডার এক্ষেত্রেও কম পড়ল। বাঘ ছিল, এ শহরে সেদিন‌ও বাঘ ছিল। জোব চার্নক আসার বেশ কিছু বছর পরেও এ শহরে বাঘ ছিল। এখনকার চৌরঙ্গী তখন ঘন জঙ্গল, গোবিন্দপুর মানে আজকের ধর্মতলা কিংবা কালিঘাট, ভবানীপুর চত্বরেও বাঘের হানায় মানুষের প্রাণ যেত হামেশাই। আজকের কলকাতা তখন‌ কোথায়!'
লালমোহনবাবুর মুখ হাঁ দেখে ফেলুদাই বলে উঠল 'জানুন লালমোহনবাবু, জানুন। নতুন জিনিস জানুন। আজ থেকে নতুন জিনিস জানা প্র্যাকটিস করুন।'
(তোপসের কলমে)
...শান্তপ্রিয়

No comments:

Post a Comment