পর্ব ১ —হাইলি সাসপিশাস—
“সামনে পুজো, ফেলুদা ঠিকই করেছিল সামনের কয়েক মাস আর কোনো কাজ হাতে নেবে না।কাজেই দার্জিলিং যাওয়ায় তার আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না। দার্জিলিং এমনিতেই এর খুব প্রিয় জায়গা। তার ওপর…”( দার্জিলিং জমজমাট পৃঃ ২ )
“ডাঃ ব্যানার্জিও আজকাল ওখানেই পোস্টেড তাই না?”শ্রীনাথের আনা ডালমুট মুখে দিয়ে নিরীহ মুখে বললেন লালমোহনবাবু।
“তাই তো শুনেছি, না ফেলুদা”? হাসি চেপে বলি আমি।
“হুম্।”একটা পা অন্য পা-এর ওপর চাপিয়ে গম্ভীরভাবে বলে ফেলুদা।
ডাঃ মণিকঙ্কণা বন্দ্যোপাধ্যায় এর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কেদারনাথে, যখন ফেলুদা অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে কাঁধে বাড়ি খেয়ে ওনার কাছে গেছিল সুশ্রুষার জন্য। উনি তখন কি একটা এনজিওর সঙ্গে ছিলেন স্থানীয় লোক আর তীর্থযাত্রীদের চিকিৎসার জন্য। সেই সময় কাছাকাছির মধ্যে ডাক্তার বলতে উনিই ছিলেন। ফেলুদা চটপট সুস্থ হয়ে ওঠে, রহস্যও সমাধান হয়ে যায়। কিন্তু মণিকঙ্কণাদির সঙ্গে বন্ধুত্বটা জমে ওঠে আমাদের সবার।
যথেষ্ট কারণ আছে তার। ভদ্রমহিলা আ্যমেচার মাউন্টেনিয়ার। পাহাড়ের টানেই অনেকটা কেদারে কাজ নিয়ে গেছিলেন। প্রচুর পড়েন। গোয়েন্দা গল্পের পোকা। এমনকি লালমোহনবাবুর বইও পড়েছেন।
“কিন্তু ঐ উটের পাকস্থলীতে জল স্টোর করার ব্যাপারটা ঠিক নয়, লালমোহনবাবু।”
শুনে লালমোহনবাবু চুপসে গেলেও ফেলুদার মুখে একপেশে হাসিটা ফুটে উঠেছিল।
উনিই একমাত্র লোক যিনি ফেলুদাকে পরপর তিনবার স্ক্র্যাবলে হারিয়েছেন। দাবায় সমানে সমানে টক্কর দিয়েছেন আর ওনার প্রিয় বইও আরণ্যক, ফেলুদার মত!
আমার সঙ্গেও দিব্যি ভাব হয়ে গেল। একে তো উনি আমার হায়ার সেকেন্ডারীর কেমিস্ট্রি আর বায়োলজির জন্য দুর্দান্ত টিপস দিলেন। তারপর ওনার পিঙ্ক ফ্লয়েড কালেকশন অসাধারণ। দিন দুয়েকের মধ্যেই উনি আমার মণিদি হয়ে গেলেন।
লালমোহনবাবুর সঙ্গেও বেশ সমঝোতা হয়ে গেল উনি ওনার সাহারায় শিহরণের কপিতে লেখকের অটোগ্রাফ চাইবার পরেই। তারপর একদিন নিজের বানানো ক্যারামেল পুডিং খাওয়াতেই জটায়ু একেবারে ওনার ফ্যান হয়ে গেলেন।
“ভদ্রমহিলার এলেম আছে বলতে হবে মশাই। যাতেই হাত দেন সোনা ফলে।” একটু চুপ করে, “অনেকটা আপনার মত।”
ফেলুদা কিছু না বলে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়তে লাগল।
কলকাতায় এসেও যোগাযোগ মোটেই কমেনি। উনি আমাদের বাড়িতে ফোন করেছেন, আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। লালমোহন বাবুর সঙ্গেও কথা হয়। একবার ওনার গড়পারের বাড়িতেও গেছিলেন নকুড়ের সন্দেশ নিয়ে।
“অতি উপাদেয় মশাই। ভদ্রমহিলার পছন্দ আছে বলতেই হবে।”।
“মণিদি এক্সেলেন্ট”, বলে আমি আড়চোখে তাকিয়ে দেখি ফেলুদা মনোযোগ দিয়ে হাতের রুবিকস কিউবটা ঘোরাচ্ছে যেন শুনতেই পায়নি।
মণিদির ব্যাপারে ফেলুদার ব্যবহার যাকে বলে হাইলি সাসপিশাস।প্রায়ই দেখি নিজের ঘরের ফোন থেকে কার সঙ্গে নীচু গলায় কথা বলে। মক্কেল তো নয় কারণ তাহলে আমি জানতে পারতাম। আবার মণিদি যখন কলকাতায় এল, জটায়ুর বাড়ি গেল তখন দেখলাম ফেলুদা রোজ দুপুরে বেরোচ্ছে, বেশ মাঞ্জা দিয়ে। ফিরছে রাত করে। কোনো কেস টেস ছিল বলেও তো শুনিনি।
জটায়ু একদিন বললেন, “ভাই তপেশ, তোমাকে একটা কথা ক’দিন থেকে বলব বলে ভাবছি…মানে তুমি তো এখন যাকে বলে আ্যডাল্ট…মানে তোমার দাদার ব্যাপারে আর কি….ওনার কিছু ইয়ে-টিয়ে হয়েছে বলে শুনেছ নাকি…?
“ইয়ে-টিয়ে মানে”?
“মানে ঐ আর কি…গার্লফ্রেন্ড-টার্লফ্রেন্ড…মানে হতেই তো পারে, উনি ইয়াং, সুপুরুষ…না থাকাটাই বরং…”
“আমায় কিছু বলেনি। কিন্তু আপনি কি মণিদির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছেন?” আমি সোজাসুজি বলি।
“হে হে, এই দেখ, তোমারও তবে মনে হয়েছে।”
মনে যে হয়েছে তা আর অস্বীকার করি কি করে!
“ওদের কিন্তু মানায় বেশ ভাল , কি বল তপেশ ভাই”?
এটাও আমার মনের কথা।
“ফেলুদা যদি জানে ওকে নিয়ে আমরা এরকম পিএনপিসি করছি তাহলে ভাগ্যে দুঃখ আছে।” না বলে পারি না।
“আরে ছি ছি, তা কেন! যাকগে বাদ দাও তো, সময় হলে উনি নিজেই বলবেন।”
সেদিন ব্যাপারটা এখানেই মিটে যায়। কিন্তু তারপর থেকে ফেলুদার সামনে মণিদির কথা উঠলেই আমার আর জটায়ুর চোখাচুখি হয়ে যায়। সেটা ফেলু মিত্তিরের চোখ এড়াবার কোনো কারণ নেই অথচ ভান করে যেন দেখেনি। হাইলি সাসপিশাস!
--
পর্ব ২ —শৈলশহর জমজমাট—
ফেলুদা কি করবে জানিনা, কিন্তু আমি আর লালমোহনবাবু দুজনেই মণিদিকে বলে দিয়েছি আমরা দার্জিলিং যাচ্ছি।
প্রথমদিন পৌঁছে, পুলকবাবুদের সঙ্গে দেখা করে ম্যালে হাঁটতে বেরোলাম। রেলিংএ ভর দিয়ে দৃশ্য দেখছি, এমন সময় দেখি ব্লু জিন্সের ওপর লাল হাইনেক পুলোভার, রামধনু স্কার্ফ আর লাল বিনি হ্যাট পরা মণিদি আমাদের দিকে হাত নাড়তে নাড়তে আসছেন। আসপাশের কুয়াশা মোড়া পরিবেশ একনিমেষে ঝলমলে রঙিন হয়ে উঠল। যত না ওনার পোশাকের রঙে তার চেয়ে বেশী ওনার ঝকঝকে হাসিতে।
“এই নাও তপেশ, তোমার হায়ার সেকেন্ডারী রেজাল্টের জন্য”, একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন মণিদি। “জোন বায়াজের রেকর্ড আছে”।
“দারুণ! থ্যাঙ্ক ইউ মণিদি”!
“কেমন আছেন লালমোহনবাবু? আপনার বই আবার সিনেমা হচ্ছে তাহলে?”
“হেঁ, হেঁ, ওই আর কি! আপনি কি এখানেও এনজিওতে?”
“আরে না না, সরকারী হাসপাতালে। করে কম্মে খেতে হবে তো। কেবল ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ালে হবে!”
“কেমন আছেন প্রদোষবাবু”?
"ভাল, আপনি?”
“আমিও ভাল”।
ক্যাভেন্টার্সের ছাতে বসে নানা বিষয়ে আড্ডা চলতে থাকল। মণিদির সঙ্গ সবসময় উপভোগ্য ।ওঠার সময় বললেন ভদ্রমহিলা,
“এদের পাকোড়াটা ভাল না, আমার কোয়ার্টারে আসুন একদিন ভাল প্রন পকোড়া খাওয়াব আপনাকে, লালমোহনবাবু।”
“আর আমাদের কি নিমন্ত্রণ নেই”?একপেশে হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
“আপনারা তো থ্রী মাস্কেটিয়ার্স। একজনকে বলা মানেই তিন জনকে বলা”। হেসে বললেন মণিদি।
“তাহলে শুভস্য শীঘ্রম। কাল হতে পারে কি ফেলুবাবু”?
“না, কাল তো বিরূপাক্ষবাবুকে মীট করব ভুলে গেলেন”?
“ও হ্যাঁ , তাও তো বটে, পরশু?”
“ওকে পরশুই বেস্ট। পরশু আমার অফ, কাল নাইট আছে বলে।”মণিদি বলেন।
“আপনার কাল নাইট মানে কি দুপুরে ফ্রি আছেন? প্রশ্ন করে ফেলুদা। একবার বোটানিক্যাল গার্ডেনটা যাব ভাবছিলাম”
“অতি উত্তম প্রস্তাব। চলে আসুন আপনারা । আমার চেয়ে ভাল গাইড বেশী পাবেন না”।
“না না, আমার তো শ্যুটিং আছে দুপুরে, পুলক ছোকরা ঐ গেস্ট অ্যাপিয়ারেন্স রোলটা দিয়ে ফাঁসিয়ে দিল না! তপেশ, তুমি থাকলে তাও একটু ভরসা পাই। আপনি যান না, ফেলুবাবু, ঘুরে আসুন। এমনিতেও আপনি ফিল্মের লোকজন বেশী পছন্দ করেন না…”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, কোনো চিন্তা নেই লালমোহনবাবু, আমি আপনার সঙ্গে থাকব। বোটানিক্যালে গেলেই আমার পোলেন আ্যলার্জি হয়। তুমি যাও ফেলুদা মণিদির সঙ্গে।”
ডুবন্ত সূর্যের আলোতেই কিনা জানিনা, মণিদির মুখ হঠাৎ লালচে দেখায়।
“ঠিক আছে দেখা হবে পরে,” বলে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন।
--
পর্ব ৩ —পাহাড়ঢালে আতঙ্ক—
প্রন পকোড়ার প্ল্যানটা অবিশ্যি বানচাল হয়ে গেল। ঐদিনই বিরূপাক্ষবাবু খুন হলেন কিনা! আগেরদিন ফেলুদা বোটানিক্যালে গিয়েছিল কিন্তু ফিরে কিছু বলেনি। আমরাও আর কিছু জিজ্ঞেস করিনি। আমার পোলেন আ্যলার্জির গুলটা অব্দি বেমালুম হজম করে নিল, এদিকে স্পীকটি নট।
তারপর দিন চিড়িয়াখানায় মণিদি এলেন আমাদের সঙ্গে। সেদিনই ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনা যা ভাবলে আজও আমার গায়ে কাঁটা দেয়। আমি, লালমোহনবাবু আর মণিদি এগিয়ে ছিলাম কিছুটা। একটু পেছনে আসছিল ফেলুদা , হরিনারায়ণবাবুর সঙ্গে কথা বলে একটু অন্যমনস্ক ছিল।
হঠাৎ কুয়াশা থেকে এক ছায়ামুর্তি বেড়িয়ে ফেলুদাকে ধাক্কা দিয়ে ছুটে আবার কুয়াশায় মিলিয়ে গেল। লালমোহনবাবুর আর্তনাদের সঙ্গেই বুঝলাম কি অঘটন ঘটে গেছে। ফেলুদা খাদে গড়িয়ে গেছে!
আর কিছু ভেবে ওঠার আগেই শুনলাম চাপা চিৎকার “প্রদোষ..!”তারপর দেখলাম মণিদি ঢাল বেয়ে তরতরিয়ে নেমে গেল প্রায় একশ ফুট নীচে একটা গাছের কাছে। ওপর থেকে দেখলাম ফেলুদাকে ধরে তোলার চেষ্টা করছে মণিদি, কিন্তু ওর পাঁচ ফুট তিনের পাতলা চেহারায় সেটা কার্যতঃ অসম্ভব।
“আমাদের হেল্প লাগবে তপেশ”, নীচ থেকে চেঁচিয়ে বললেন মণিদি। লালমোহনবাবু ততক্ষণে নেপালী ঘোড়াওয়ালাকে ডেকে এনেছেন। তার কাছে একটা দড়ির ল্যাসো মত ছিল। সেটা ছুঁড়ে দিলাম মণিদিকে আর আমরা ধরে থাকলাম অন্যদিকটা। ঘোড়াওয়ালা খানিকটা দূর নেমে দড়ি ধরে ফেলুদার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। হাঁচোড় পাঁচোড় করে তোলা হল ফেলুদাকে।হাতে চোট, কপালে কাটা, রক্ত ঝরছে।
ঘোড়াওয়ালাকে ধন্যবাদ দিয়ে বিদায় দেওয়া হল।
মণিদি ইতিমধ্যে পালস আর হাতের চোট দেখে নিয়েছেন।
“ভাঙেনি তবে হয়তো ক্রেপ ব্যান্ডেজ লাগবে আর পেইন কিলার। সবার আগে কপালটা দেখানো দরকার, স্টিচ করতে হতে পারে।”
“সামনেই ডঃ বর্ধনের চেম্বার। আসুন আমার সঙ্গে।”
“থ্যাঙ্ক্যু মণি—-ডঃ ব্যানার্জি”।ফেলুদা বলল।
“আপনার ওপরে এই ধরণের আক্রমণ কি প্রায়ই হয়? সেবার কেদারেও তো..”, ডাঃ বর্ধনের চেম্বার থেকে বেরিয়ে মণিদি জিজ্ঞেস করলেন।
“কি আর করব বলুন। আমার পেশাটা তো জানেন। ক্রিমিনালদের খোঁচাখুঁচি করলে তারা তো মাঝে মাঝে পথের কাঁটা দূর করতে চাইবেই”, ফেলুদা ক্লান্ত গলায় বলে।
“হুম! সেই জন্য শার্লক হোমসের সঙ্গে ডাক্তার ওয়াটসন থাকেন। কখন দরকার হয়ে পড়ে বলা তো যায় না! আপনাদের থ্রী মাস্কেটীয়ার্সের মধ্যে কেউ ডাক্তার নন এই যা মুসকিল!”
“এইটা আপনি মোক্ষম বলেছেন ডাঃ ব্যানার্জি! গোয়েন্দা আর ডাক্তারের জুটি দারুন কার্যকরী! দেখলেন না, আজ আপনি থাকায় কেমন সুবিধে হল।” লালমোহন বাবু এই সুযোগ ছাড়তে রাজী নন।
“সে তো জাস্ট বাই আ্যকসিডেন্ট! যাকগে আমি তাহলে চলি আজ। সাবধানে থাকবেন আর শরীর পুরোপুরি সুস্থ হবার আগে ধকল কম নেবেন। আসি”। বলে বিদায় নিলেন মণিদি।
ফেরার পথে লালমোহনবাবু যখন জিজ্ঞেস করলেন ও কেমন বোধ করছে তার উত্তরে ফেলুদা বলল ওর মাথাটা নাকি এই ধাক্কায় খুলে গেছে। যেমন আগেও হয়েছে অনেকবার। কিন্তু তারপর যেটা বলল সেটাই রহস্য।
ও এই কেসের ব্যাপারে একটা জোরালো ক্লু তো পেয়ে গেছেই, আর তাছাড়াও আরো একটা ব্যাপার নাকি জলের মত পরিস্কার হয়ে গেছে।
লালমোহনবাবু আমার দিকে তাকালেন। আমি মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিলাম আমি কিছু বুঝিনি।
--
পর্ব ৪ —সুভদ্রার্জুন—
পরের দুদিন তো ফেলুদা কেস নিয়েই ব্যস্ত রইল। আমি আর লালমোহনবাবু এরকম ক্ষেত্রে যা করি তাই করলাম।ওকে ভাববার এবং নিজের কাজ করার সুযোগ দিয়ে আমরা নিজেদের মত ঘুরতে বেরোলাম। সেই করতে গিয়েই তো ঝাউবন থেকে লোকনাথ বেয়ারার মৃতদেহ আবিষ্কার করলাম আমরা, যা ফেলুদার তদন্তের মোড় একেবারে ঘুরিয়ে দিল।
“ও মশাই, কাল যে ডঃ ব্যানার্জির আমাদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করার কথা ছিল”, লালমোহনবাবু মনে করিয়ে দিলেন।
“সেটা আবার কখন ঠিক হল”? ফেলুদা প্রশ্ন করল।
“আরে, আপনি তো মশাই কেস নিয়ে ব্যস্ত। আমি আর তপেশ ভাবলুম ওনার সঙ্গে একটু আড্ডা দিই। তা উনি ব্যস্ত মানুষ, সারাদিন তো সময় পাবেন না, তাই এই ব্রেকফাস্ট আড্ডার প্ল্যান..”
“হ্যাঁ ফেলুদা, তখন তো জানতাম না যে কাল তোমার এই মীটিং হবে।মণিদি আসবেন, আমাদের সঙ্গে ব্রেকফাস্ট করে হাসপাতাল চলে যাবেন সোজা—এই প্ল্যান করেছিলাম আমরা”
“সে এমন কিছু ব্যাপার না, ওনাকে ফোন করে বরং ক্যান্সেল করে দিচ্ছি…”লালমোহনবাবু উঠতে যান।
“দাঁড়ান, তার দরকার নেই।” ফেলুদার মাথায় কি একটা আইডিয়া এসেছে মনে হল।
“ডাঃ ব্যানর্জি নিশ্চয়ই গাড়ি নিয়ে আসবেন”?
“হ্যাঁ , তাই তো সম্ভব”।
“তাহলে বরং উনি যেমন আসছিলেন আসুন, তারপর আপনাদের ব্রেকফাস্ট হয়ে গেলে উনি আমাদের তিনজনকে দশটার মধ্যে নয়নপুর ভিলায় নামিয়ে দিয়ে হাসপাতাল চলে যেতে পারবেন”।
“তবে আমি কিন্তু আপনাদের আড্ডায় থাকতে পারব না, আমার কাজ এখনো শেষ হয়নি”।
“সে আমরা জানি ফেলুবাবু। আপনি আপনার কাজ করুন। আমরা আপনাকে বিরক্ত করব না”।
কিন্তু পরদিন আর আড্ডা বিশেষ হল না। মণিদি, আমি আর লালমোহনবাবু সবে আমাদের টোস্ট আর ওমলেট শেষ করেছি, ফেলুদা হন্ত দন্ত হয়ে নেমে এল হোটেলের ব্রেকফাস্ট রুমে।
“ লালমোহনবাবু, তোপসে, ক্যুইক, ইন্সপেক্টর সাহা ফোন করেছিলেন। সমীরণবাবু নাকি শিলিগুড়ি রওনা হয়ে গেছেন, মিনিট পনের আগে। ওকে ধরতে হবে।”
“ডাঃ, ব্যানার্জি, আপনি কি আমাদের পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যেতে পারবেন?”
“তারচেয়ে চলুন আমি আপনাদের শিলিগুড়ির রাস্তায় নিয়ে যাই। আপনার আসামী তো অলরেডি এগিয়ে গেছে। আরো দেরী করে লাভ কি”? মণিদি উঠে পড়েছেন চেয়ার ছেড়ে।
“আসামী ধাওয়া করা কিন্তু বেশ রিস্কি কাজ। গাড়িও চালাতে হবে যথেষ্ট জোরে..” ফেলুদা মনে করিয়ে দেয় গাড়ির দিকে যেতে যেতে।
“মিঃ মিত্র, আপনি গোয়েন্দা ঠিকই। কিন্তু আমার পেশাটা ভুলে যাবেন না। একটা পেশেন্ট এর হার্ট সার্জারি করা কিন্তু নেহাৎ কম ঝুঁকির কাজ নয়। লোকে বলে থাকে তাতেও নার্ভ অফ স্টীল লাগে।” মণিদির গলা ভীষণ ঠান্ডা।
“সরি, আমি সেভাবে কিছু মীন করিনি। শুধু মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে এতে বিপদের সম্ভাবনা আছে”।
গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সীটে উঠতে উঠতে বলে ফেলুদা।
দু মিনিট যেতেই বুঝলাম মণিদি তুখোড় ড্রাইভার। পাহাড়ী রাস্তা দিয়ে এত জোরে গাড়িতে আগে কখনো গেছি বলে মনে পড়ে না। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের রাস্তা আধঘন্টায় পেরিয়ে এলাম।
কিন্তু কার্সিয়ং অব্দি এসেও সমীরণবাবুর ট্যাক্সি পাওয়া গেল না।
“তাহলে এবার পাংখাবাড়ি ধরি, প্রদোষবাবু?”, মণিদি জিজ্ঞেস করলেন।
“হ্যাঁ , তাছাড়া আর উপায় কি! আপনি চাইলে আমায় দিতে পারেন চালাতে”।
“এতক্ষণ তো দেখলেন, মনে হল কি আমি কাঁচা ড্রাইভার? পাংখাবাড়ি ম্যানেজ করতে পারব না?” মণিদির কপালে ভ্রূকুটি।
“কি মুসকিল! এতটা চালালেন তাই ভাবলাম যদি একটু রেস্ট নিতে চান! যাকগে, ধরুন পাংখাবাড়ি”।
সাপের মত প্যাঁচানো পাহাড়ী রাস্তায় লালমোহনবাবু তো চোখ বন্ধ করে রাখলেন। একটা হেয়ারপিন বেন্ড ঘুরে অবশেষে দেখা গেল সামনে একটা ট্যাক্সি।
“আপনি ওটাকে টেইল করুন ডাঃ ব্যানার্জি। আর একটু কাছে গিয়ে হর্ন দিন..” ফেলুদা বলে।
মণিদি আরো স্পীড বাড়িয়ে দিলেন হর্ন দিতে দিতে।
“আপনি সিওর ওটাতেই আছে আপনার আসামী”?মণিদি রাস্তায় চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলেন।
“মোটামুটি! না থাকলে ও এমনিই দাঁড়াবে।”। ফেলুদা কোটের ভেতর থেকে রিভলবারটা বের করেছে।
“ও কিন্তু দাঁড়াবে বলে মনে হচ্ছে না, আরো স্পীড তুলছে”, মণিদি আড়চোখে রিভলবারটা দেখে বলে।
“দেখেছি”, ফেলুদা ওর দিকের জানলার কাচটা নামাতে নামাতে বলে।
হঠাৎ দেখা যায় সামনের গাড়িটা থেকে কেউ মুখ বের করেছে। হাতে কোনো একটা আগ্নেয়াস্ত্র। হঠাৎ একটা গুলি কানফাটা শব্দ করে বেরিয়ে গেল এবং আমাদের গাড়িটি খাদের বিপজ্জনক রকম কাছে চলে গিয়ে আবার ফিরে গেল।
মণিদি সময় মত গাড়িটা খাদের দিকে সরিয়ে না নিলে এতক্ষণে গুলি চাকায় এসে লাগত।
আমাদের গাড়ি এখন ট্যাক্সির আরো কাছে। জানলা দিয়ে মুন্ডু বাড়ানো লোকটি আবার তাক করছে আমাদের চাকা… জটায়ু আমার পাশে বসে সামনের সীটটা চেপে ধরে আছেন..ওঁর আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে গেছে…
“আমি স্টেডি ডিসট্যান্স মেইনটেইন করছি প্রদোষবাবু, আপনি এইম করুন”, মণিদি বললেন এবং একই সাথে ফেলুদা জানলা দিয়ে প্রায় অর্দ্ধেকটা শরীর বের করে দিয়ে ট্রিগারটা টিপস।
আবার আওয়াজ, কিন্তু এবার সামনের গাড়ির আরোহীর অস্ত্রটা ছিটকে পড়ল খাদে এবং অস্ত্রের মালিক হাতটা চেপে ধরে গাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
গাড়িটাও ধীরে ধীরে একপাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মণিদি আমাদের গাড়িটা নিয়ে গিয়ে ঠিক তার সামনে দাঁড় করালেন।
ফেলুদা রিভলভার হাতে ধরেই নেমে গিয়ে একটানে দরজা খুলে ট্যাক্সির পিছনের সীট থেকে সমীরণবাবুকে বের করল।উনি তখনো বাঁ হাত দিয়ে ডান হাতটা চেপে ধরে আছেন।
“সমীরণ বাবু, এবার আপনি সোজা আপনার সুটকেস নিয়ে আমাদের গাড়িতে আসুন, বেশী পাঁয়তাড়া করবেন না, পুলিশ এক্ষুনি আসবে”।
মিনিট পনের পরে সমীরণবাবুকে ইন্সপেক্টর সাহা এসে জিপে তুলে রওনা হলেন নয়নপুর ভিলার দিকে।
মণিদির গাড়িতে আমরাও ফিরতি পথ ধরলাম।
“ওঃ, মশাই, আপনি যা দেখালেন না, এভাবে চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি ছুঁড়ে সমীরণবাবুর হাতের রিভলভার উড়িয়ে দেওয়া ….এ তো প্রায় অর্জুনের লক্ষ্যভেদ মশাই”! জটায়ু বলে উঠলেন।
“তা উনি অর্জুন হলে এযাত্রা আমি কিন্তু কৃষ্ণ! সারথির কাজটা তো আমি মন্দ করিনি, কি বলেন?”মণিদির মুখে হাসি।
“অবশ্যই ডাঃ ব্যানার্জি ! আপনার সারথ্য ছাড়া এই অভিযান সফল হত না। আমার স্বীকার করতে কোনো দ্বিধা নেই যে আপনি আমার দেখা শ্রেষ্ঠ ড্রাইভার”ফেলুদা এখন রিল্যাক্সড।
“কিন্তু কৃষ্ণ হলে তো জেন্ডারে মিলছে না”, লালমোহনবাবু কিন্তু-কিন্তু করছেন॥
“ওটা সুভদ্রা হবে, না ফেলুবাবু? সুভদ্রাও তো দারুণ রথ চালাতেন…সেই যে, সুভদ্রাহরণের সময় উনি রথ চালাচ্ছিলেন আর অর্জুন যুদ্ধ করছিলেন! ওঃ জম্পেশ ব্যাপার মশাই এই মহাভারত, কি বলেন”? লালমোহনবাবু দারুণ এক্সাইটেড ।
মণিদির চোখ রাস্তায়। ফেলুদা জানলা দিয়ে পাহাড় দেখছে, কেউ কোনো জবাব দিল না!
—
পর্ব ৫ —জট ছাড়ানো, জট পাকানো—
গাড়ি কার্সিয়াং ঢোকার একটু আগে জটায়ু বললেন,
“আপনি তো কখনো ফেলুবাবুর রহস্য উন্মোচন মিটিং দেখেননি, তাই না ডাঃ ব্যানার্জি ?”
“না, সে সৌভাগ্য হয়নি কখনো”, হেসে বললেন মণিদি।
“তাহলে আজ চলুন না কেন আমাদের সঙ্গে? আপনি আমাদের নিয়ে নয়নপুর ভিলাতে যাচ্ছেনই। আর একটু সময় নিয়ে ফেলু মিত্তিরের তারাবাজিটা একবার দেখে যান না কেন? কি ফেলুবাবু, আপত্তি আছে নাকি আপনার”?
“বিন্দুমাত্র না। উনি তো অলরেডি আমাদের তদন্তে দস্তুরমত সহায়তা করেছেন ওনার ড্রাইভিং-এর তারাবাজি দেখিয়ে! কোথায় শিখলেন বলুন তো এ জিনিস?” ফেলুদা একপেশে হাসি হেসে জিজ্ঞেস করে।
“নর্মাল ড্রাইভিং তো আমি আঠারোতে সবাই যেমন শেখে তেমন শিখেছিলাম। তারপর তো একসময় রিমোট নর্থ ঈস্টে একটা এনজিও তে কাজ নিলাম। সেখানে আবার কিছু যানবাহন পাওয়া যায় না, জানেন তো! মিলিটারির সঙ্গে তো আমাদের যোগাযোগ রাখতে হতেই। ওরাই বলল ওদের রাফ টেরেন ড্রাইভিং এর ট্রেনিংটা নিয়ে নিতে। সেই শুরু আর কি! তারপর কেদার, এখানে… দিব্যি কাজে লেগে গেল স্কিলটা!”
“এবার বোঝা গেল!”, ফেলুদার ঠোঁটের কোনে হাসি।
“তাহলে কি স্থির হল, আপনি যাচ্ছেন তো আমাদের সঙ্গে, ডাঃ ব্যানার্জি ?” লালমোহনবাবু ফয়সালা করতে চান।
“চলুন তাহলে! কৌতুহল যে হচ্ছে না আমার তা তো নয়! তবে কার্সিয়াং-এ দু মিনিট দাঁড়াতে হবে। আমি বুথ থেকে একটা ফোন করব হাসপাতালে। আমার সকালের ডিউটিটা কাউকে ট্রান্সফার করতে হবে। “
“কি মিঃ মিত্র আপনার দেরী হয়ে যাবে না তো?”, মণিদি জিজ্ঞেস করেন ।
“বিন্দুমাত্র না। যতক্ষণ আপনার হাতে স্টিয়ারিং আমার কোনো টেনশন নেই”, মৃদু হেসে বলে ফেলুদা।
কার্সিয়াং-এ নেমে মণিদি গেলেন ফোন করতে। জটায়ু গেলেন কাছের দোকানে একটা “এক্সকুইজিট আ্যন্টিক হেড অফ বুদ্ধা”র দর করতে।
আমি আর ফেলুদা ভাঁড়ের চা খাচ্ছিলাম এমন সময় মণিদি উপস্থিত। “যাক, মিটে গেছে। এখন আমি দুপুর অব্দি ফ্রী! হেসে বললেন উনি।
“আপনাদের হাসপাতালে তাহলে স্টাফিং সিচুয়েশন ভাল, বেশ চটপট বদলি পেয়ে গেলেন।” ফেলুদা ক্যাজুয়ালি বলল।
“অতটাও ভাল না, তবে ভাস্বর আমার দারুণ বন্ধু তো, ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলাম। আমি বললে ভাস্বর সেন যে কখনো না করবে না আমি জানতাম”।মণিদি হেসে বলে।
“আপনার বন্ধুভাগ্য ঈর্ষনীয়! চলুন, জটায়ু এসে গেছে, এবার যাওয়া যাক”। ফেলুদা ভাঁড়টা ফেলে সোজা গাড়ির দিকে রওনা দিল।
সারা রাস্তা ফেলুদা ভুরু কুঁচকে সামনে তাকিয়ে থাকল। আমরা অবশ্য তিনজনে বেশ গপ্প করতে করতে এলাম। মণিদি একবার বললেন, “মিঃ মিত্র কি কেস নিয়ে খুব ভাবছেন নাকি!”
উত্তরে ফেলুদা একটা শুকনো হেসে বলল “ওই আর কি!”
নয়নপুর ভিলায় ফেলুদার তারাবাজি তো সকলে দেখল। এক নয়, দুজন খুনী, তার মধ্যে একজন আবার সিনেমার নায়ক! তারওপরে আবার মূর্তি চুরির কিনারা।
একেবারে টান টান উত্তেজনা।
শেষ হবার পরে অপরাধীরা ছাড়া সবাই ফেলুদার ওপর ইমপ্রেসড। মণিদির চোখমুখ জ্বলজ্বল করছে।ইন্সপেক্টর সাহা তো হ্যান্ডশেক করে, ধন্যবাদ দিয়ে গেলেন। এমনকি বম্বের ভিলেন মহেন্দ্র ভার্মা অব্দি ফেলুদার অটোগ্রাফ নিয়ে গেল।
একমাত্র পুলক বাবুই মনমরা। নায়ক জেলে গেলে পরিচালকের মাথায় তো হাত হবেই।লালমোহন বাবু গেলেন বাগানে তাঁকে নিয়ে সান্ত্বনা দিতে।
মণিদি বললেন, “যাক সব যখন ভালয় ভালয় মিটল তখন আমাদের প্রন পকোড়ার প্ল্যানটা আবার করতে হবে। আবার ভাস্বরকে ও খাওয়াতে হবে একদিন!ও যা পেটুক না, ভাবতে পারবেন না..”
“ও নিয়ে ভাববেন না ডাঃ ব্যানার্জি, না হলে না হবে। আপনার বিশেষ বন্ধুকে খাওয়ানোর প্ল্যানটা আগে করুন।” ফেলুদা বলে ওঠে।
মণিদি জবাব দেবার আগেই এদিকে এগিয়ে এলেন হিরোইন সুচন্দ্রা। মনে হল উনি কিন্তু সবচেয়ে বেশী ইমপ্রেসড!
“মিঃ মিত্রা, আপ তো কামাল কি ডিটেকটিভ হ্যায়! সচ মে, ম্যয় তো আপকি ফ্যান বন গয়ি। আপকো মেরে সাথ ডিনার পে জানা হোগা এক দিন। চলেঙ্গে না?”
“সুক্রিয়া। মগর ডিনার মে তো সায়দ নেহি যা পাউঙ্গা। আপ তো ফেমাস হ্যায়, আগে পিছে ফোটোগ্রাফার লেকে ঘুমতে হ্যায়। অউর ইতনা পাবলিসিটি হাম জাসুসোঁ কে লিয়ে আচ্ছা নেহি !” ফেলুদা বলে দেয়।
“কেয়া বাত করতে হ্যায় মিঃ মিত্রা, আপ কেয়া কম ফেমাস হ্যায়! আপ কো জানা পরেগা মেরে সাথ কাল ডিনার পে। কোই বাহানা নেহি শুনুঙ্গি ম্যায়”।সুচন্দ্রার ম্যানিকিওর করা আঙুল ফেলুদার কোটের বাহু স্পর্শ করে।
“তপেশ, আমি চললাম ভাই।” মণিদি উঠে দাঁড়ান। একটু আগের সেই হাসি খুশী ভাবটা একেবারে উধাও।
“একটু দাঁড়াও। ফেলুদাকে বলে যাবে না”?
“না ভাই, উনি বিখ্যাত মানুষ, এখন অন্য বিখ্যাত লোকদের নিয়ে ব্যস্ত। ওনাকে ডাকতে হবে না। আমি বেরোই। ভাস্বরকে রিলিভ করতে হবে। বেচারার বৌ প্রেগন্যান্ট, ওকে বেশীক্ষণ আটকানো ঠিক হবে না।”
বলে মণিদি ঝড়ের মত বেরিয়ে গেলেন। একটু পরে ফেলুদা এসে গম্ভীর মুখে বলল আমি বাইরে ট্যাক্সিতে অপেক্ষা করছি। জটায়ুর হলে তোরা চলে আসিস।
একটু পরেই লালমোহনবাবু ফিরে ভোম্বল মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন ,”এটুকু সময়ের মধ্যে কি হল বলতো ভাই?”
—
পর্ব ৬ — কনফেশন টাইম—
কেস তো সলভ হয়ে গেছে। খুনীর হাতে হাতকড়া।
“সব যখন ভালয় ভালয় মিটেই গেল, বুঝলেন ফেলুবাবু, তাহলে ডাঃ ব্যানার্জির সঙ্গে ঐ প্রন পকোড়ার ব্যাপারটা …”
“উনি হয়তো সময় করতে পারছেন না লালমোহনবাবু! ভাস্বর সেনকে খাওয়াতে হবে বলছিলেন”, ফেলুদা উত্তর দেয়।
“সে আবার কে?”
“ডাঃ ব্যানার্জির ঘনিষ্ট বন্ধু”!
“হ্যাঁ লালমোহনবাবু, ভাস্বর সেন আর ওঁর স্ত্রী দুজনেই মণিদির খুব ভাল বন্ধু। ওরা তিনজনেই একসঙ্গে স্কুলে পড়তেন। সত্যিই খুব পুরোনো আর ঘনিষ্ট বন্ধু”।আমি আর চুপ থাকতে পারি না।
“তুই এত কথা কি করে জানলি?” ফেলুদার কপালে ভ্রূকুটি।
“উনি তো নিজেই বললেন সেদিন। তুমি শোনোনি কারণ তুমি তখন সুচন্দ্রার সঙ্গে ডিনারের প্ল্যান করছিলে!”
“রদ্দা পড়বে তোর ঘাড়ে এবার!আমি সুচন্দ্রাকে কাটিয়ে দিলাম শেষে, শুনিসনি?”
“আমি শুনেছি। তবে মণিদি শোনেননি, তার আগেই তো চলে গেলেন।”
তিনজনেই চুপ! অখন্ড নীরবতা।
একটু পরে লালমোহনবাবুই প্রথম কথা বললেন,
“তাহলে ফেলুবাবু, আপনি তো আজ স্টিচ কাটাতে যাবেন, তখন না হয় নেমন্তন্নর কথাটা বলে নিতেন”।
“স্টিচ তো করেছেন ডঃ বর্ধন।”, ভুরু কুঁচকে বলে ফেলুদা।
“আহা, সে তো এমার্জেন্সিতে। এখন একজন কাছের লোক..মানে চেনা ডাক্তার থাকতে…কি বল তপেশ ভাই?”
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, মণিদি বেস্ট ডাক্তার। চলে যাও সন্ধেবেলা, স্টিচ কেটে, নেমন্তন্ন নিয়ে চলে এস”।
“তাছাড়া কাল অত ভাল গাড়ি চালিয়ে আমাদের কত সাহায্য করলেন, তোমার উচিত ওঁকে একবার নিজে গিয়ে ধন্যবাদ জানানো।”আমি জুড়ে দিই।
“সেই ভাল, তবে সাবধানে যাবেন। স্নো ফল হতে পারে, বলছিল ওরা হোটেলের লবিতে”।জটায়ু মনে করিয়ে দেন।
************************
মণিকঙ্কণার জবানী
বসে আছি সন্ধেবেলা, হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। এই অসময়ে কে? আজ বিস্তর স্নো ফল হবে। সেই শুনেই তো কাঞ্চা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গেল।
দরজা খুলতেই দেখি প্রদোষ বাবু।
“ওহ! মিঃ মিত্র আপনি! আসুন ভেতরে”।
“আমি তো জানতাম আপনার আজ সুচন্দ্রার সঙ্গে ডিনার ডেট”! মিঃ মিত্র সোফায় বসলে বলি।
“ভুল জানতেন। উনি আমাকে রিকোয়েস্ট করেছিলেন ঠিকই, তবে আমি তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করেছি।”
“সেকি! দেশের বেশীরভাগ লোক তো এই সুযোগ পেলে বর্তে যাবে!”
“আমি তো দেশের বেশীরভাগ লোকের মতে চলি না ডাঃ ব্যানার্জি! আমি চলি আমার পছন্দে”!
“আমি তো বরং ভাবছিলাম খবর না দিয়ে এলাম, আপনি হয়তো আপনার ঐ বন্ধুকে নিমন্ত্রণ করে বসে আছেন..”মিঃ মিত্র বলে চলেন।
“কে? ভাস্বর? ওকে অত ঘটা করে নেমন্তন্নের কি আছে? ডাকলেই আসবে। যা পেটুক! কিন্তু ওর বৌ, চন্দ্রিমা বেচারা এখন প্রেগন্যান্ট, ভীষণ নশিয়া, কিছু খেতে পারছে না। ওদের পরে ডাকব”।
“আপনারা তিনজনেই অনেক পুরোনো বন্ধু বুঝি?”
“হ্যাঁ , তা তো বটেই। আমি আর চন্দ্রিমা ক্যালকাটা গার্লসে পড়তাম, আর ভাস্বর বয়েজে। ক্লাস নাইন থেকে দুটোতে প্রেম করছে আর আমার কাজ ছিল ওদের চিঠি বয়ে দেওয়া…একবার তো আমার হিস্ট্রি বই এর ভেতর থেকে ভাস্বরের চিঠি বেরোলো, চন্দ্রিমাকে লেখা..কিন্তু নাম টাম তো নেই, বাবা ভাবল বুঝি আমার প্রেমপত্র!
বুঝুন কান্ড! ভাস্বর আর আমাকে নিয়ে নেহাৎ পাগল না হলে কারো পক্ষে কিছু ভাবা সম্ভব!”
“কিন্তু আপনি একা যে? তপেশ আর জটায়ু কই”?
“ওরা এল না, তবে ওরাই আমাকে ওরা আপনার কাছে পাঠাল স্টিচ কাটতে।”
“কিন্তু আপনার স্টিচ তো আমি করি নি”!
“তাতে কি! কাটতে তো পারেন, নাকি!”
“হ্যাঁ তা পারি।দাঁড়ান, দেখি ব্যাগটা নিয়ে আসি।”
“ ব্যাগ পরে হবে, একটু বসুন, কথা আছে”।
একটু অবাক হয়েই চুপ করে এসে বসি উল্টোদিকের চেয়ারে।
“বলুন তো, সেদিন কেন ঝাঁপিয়ে পড়লেন খাদে, আমাকে বাঁচাতে? “
“কি আশ্চর্য, একটা লোক পড়ে গেছে বাঁচাতে হবে না?”
“তোপসে ঝাঁপায়নি, লালমোহনবাবুও না”।
“ওরা মাউন্টেনিয়ার নয়। ঝাঁপালে লাভের চেয়ে ক্ষতি বেশী হত। লোক ডেকে এনে বুদ্ধিমানের কাজ করেছে”।
“আর আপনি তাই আ্যমেচার মাউন্টেনিয়ারিং ভরসা করে এই ছ ফুট দেহ টেনে তুলবেন বলে লাফিয়ে পড়লেন….”
“দেখুন, ওটা রিফ্লেক্স। আমি ভেবে করিনি”।
“সে তো বটেই। যেমন সেদিন প্রদোষ বলে ডাকাটা রিফ্লেক্স। আজকের মিঃ মিত্রটা ভেবে বলা”।
সাংঘাতিক লোক তো! খাদে পড়েও শুনেছে আমি কি বলে ডেকেছি!
“কি হল, এখনো স্বীকার করবে না, মণি!”
আমার পা থেকে মাথা অব্দি বিদ্যুৎ খেলে গেল।
“সে তো আপনিও কত কিছু করেছেন। কলকাতায় রোজ দেখা করতেন। এখানে বোটনিক্যালে…। এদিকে বলেন গোয়ন্দাদের রিলেশনশিপে না যাওয়াই ভাল। তাতে নাকি ঝুঁকি বাড়ে সবার”।
“সে তো একশবার। কিন্তু লোকে তো ঝুঁকি নেয়। যেমন তুমি নিলে সেদিন! তাতেই তো চোখটা খুলে গেল আমার”।
কি চায় কি লোকটা!
“কখন নেয় বলতো লোকে ঝুঁকি”?
“জানিনা”।
“লোভে নেয়, ভয়ে নেয়…. তবে সবচেয়ে বেশী নেয় ভালবাসায়”।
আমি মাটির দিকে চেয়ে থাকি । চোখ তুললেই ধরা পড়ে যাব।
“বেশ তাহলে আমিই বলি! আমি তোমাকে ভালবাসি মণিকঙ্কণা! আর তুমি?”
“আপনি তো গোয়েন্দা। আন্দাজ করুন না”!ফিসফিস করি আমি।
“তোমার এখনকার চেহারা দেখলে খুব বাজে গোয়েন্দাও বলে দেবে উত্তরটা। তার জন্য ফেলু মিত্তিরকে লাগে না”।
আবার সেই একপেশে হাসি।গা জ্বলে যায়!
“কিন্তু আজ তো আমি গোয়েন্দা হয়ে আসিনি মণি! আমার সোজা উত্তর চাই , সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্সের দিন শেষ।”
একদম কাছে এসে দাঁড়িয়েছে ও। ওর নিঃশ্বাসে আমার কপালের চূর্ণ অলক কাঁপছে…
”জানিনা, যাও !”
বলে পালাবার আগেই ওর বাহুবন্ধনে আটকা পড়ে যাই।
আমার কানের একদম কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে “এতেই হবে। ‘যাঃ মানেই হ্যাঁঃ।’কোথায় আছে বলতো?”
“বিরিঞ্চিবা—“
কথা শেষ করার আগেই ঠোঁটদুটো বেদখল হয়ে যায়।
—
পর্ব ৭ —মণিকঙ্কণার জবানী—
— মিথ্যুক গোয়েন্দা ও মারকুটে ডাক্তার —
**************************************
সোফায় আধশোয়া আমার মাথা প্রদোষের কাঁধে, ওর ডান হাতের আঙুলগুলো আমার চুলে বিলি কাটছে..দুজনেই বসার ঘরের বে উইন্ডো দিয়ে অবিশ্রান্ত বরফ পড়া দেখছি। ওপাশের দেওয়ালে ফায়ার প্লেসের আগুন আস্তে আস্তে লালচে হয়ে আসছে।
ওর বাঁ হাতের আঙুলগুলো আমার ডান হাতে জড়িয়ে নিয়ে বলি, “কিন্তু কাল তুমি সুচন্দ্রাকে কাটালে কি করে বলতো? ও তো যেভাবে তোমার হাত ধরে টানাটানি লাগিয়েছিল, আমি তো ভাবলাম তখনি তোমায় ধরে নিয়ে যাবে!”
“আর তাই তুমি ময়দান ছেড়ে ছুটে পালালে? একহাত লড়ে নিতে পারলে না? এমনিতে তো খুব বীরত্ব; এই খাদ থেকে মানুষকে তুলছ, এই গোলাগুলির মধ্যে দিয়ে বাঁই বাঁই করে গাড়ি চালাচ্ছ… আর ঐ একটা রোগা মত আ্যকট্রেসের ভয়ে…”
“আচ্ছা! সুচন্দ্রা রোগা? স্লিম! আর আমি ওর কাছে ধুমসী, তাই তো?”আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার একটা ব্যর্থ চেষ্টা করি!
“যা ব্বাবা! সেটা আবার কখন বললাম?” আমাকে আবারো কাছে টেনে নিয়ে খুব অবাক গলায় জিজ্ঞেস করে ও।
“উঃ বাবা, হাতগুলো কি তোমার লোহা দিয়ে তৈরী নাকি? এমন করে ধরেছ যেন আমি তোমার আসামী।”
“আসামী না তো পালাচ্ছ কেন?”
“বললে না তো কাল কি করে কাটালে তোমার ঐ রোগা সুচন্দ্রাকে?”আমি পায়ের ওপর সুজনিটা টেনে নিয়ে বলি।
“এ আর কি শক্ত কাজ! বিনয়ের সঙ্গে বললাম ভেরী সরি, লেকিন কাল মেরা গার্লফ্রেন্ডকে সাথ ডিনার কা প্ল্যান হ্যায়।”
“সত্যি! শুনে কি বলল?”
“ কি আর বলবে, বলল ‘কৌন হ্যায় আপকি গার্লফ্রেন্ড, উয়ো যো মোটি সি লড়কী ইধার বৈঠিথি উয়ো..”!
“ মিথ্যুক কোথাকারের, ও কখনো এরকম বলেনি। সব তোমার বানানো”, দুম দুম করে কিল মারতে মারতে বলি আমি।
“আঃ, বাবারে, মেরো না অত জোরে…আচ্ছা, আচ্ছা, মোটি বলেনি…বলেছিল উয়ো যো সুন্দর সি লড়কী…হল তো এবার”?
“সত্যি, নাকি এটাও গুল”? আমি সন্দিগ্ধ!
“না না, এটা ঠিক”, কিল মারা জায়গাগুলোতে হাত বুলোতে বুলোতে বলে ও।
“ হুঁ। তাহলে সুচন্দ্রা মেয়েটা নেহাৎ খারাপ নয়”!
“বলছ? কাল যাব তাহলে ওর সঙ্গে ডেটে? ….আরে, আরে…থামো থামো….এমন মারকুটে ডাক্তার জীবনে দেখিনি তো!”
“আর এমন মিথ্যুক গোয়েন্দা আমিও জীবনে দেখিনি।তুমি না সত্যাণ্বেষী”?
“না তো ! সে তো শুধু ব্যোমকেশ”!
“তফাৎ কি?”
“অনেক! ব্যোমকেশের সত্যবতী আছে, খোকা আছে…আমার তো দুঘন্টা আগেও সিকিখানা গার্লফ্রেন্ড অব্দি ছিল না”!
“বেচারা! এখন খেদ মিটেছে তো?”
“একটু একটু! ব্যোমকেশকে ধরতে অবিশ্যি এখনো অনেক দেরী, তবুও..!!
“…সে যাই হোক, কিছু খেতে টেতে পাওয়া যাবে ডাক্তার সাহেবা? নাকি ঐ অধরসুধা টুধা দিয়েই আজ কাটিয়ে দেবার প্ল্যান আপনার? আমার অবিশ্যি তাতে দারুণ কিছু আপত্তি নেই..”
“বাড়ি ফিরবে না তুমি?” আমি তো অবাক!
“বাড়ি নয় হোটেল। আর সেখানে ফেরা এখন একটু শক্ত। তাকিয়ে দেখ বাইরে, কি রকম স্নো ফল হচ্ছে।”
“তাহলে কি তপেশকে ফোন করে দেবে? আমার এখানে গেস্টরুম পড়েই আছে।”
“ফোন করে দিচ্ছি যে থেকে যাব। কিন্তু গেস্টরুমে নয়!”
অসম্ভব সাহস বেড়েছে লোকটার।
শাসন করার জন্য হাত তুলতেই—-
“খুব মারতে শিখেছ দেখছি! এইবার দেখ”.. পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় দুবৃত্ত গোয়েন্দা।
“ওরে বাবা নামিয়ে দাও বলছি। নির্ঘাত ফেলবে আমাকে”।
“তা ফেলতেও পারি।সুচন্দ্রার মত রোগা হলে নয় ফেলতুম না..”
“আ্যই আমি ডায়েট করছি, যা তা বলবে না। তোমার নিজের ওজন কত?”
“খুব বেশী নয়, তোমার চিন্তার কারণ নেই… কোথায় যাব তাড়াতাড়ি বল, নয়তো ফেলে দেব সত্যি করে”।
“আমি পুলিশ ডাকব”!
“ইনস্পেক্টর সাহাকে কানেক্ট করে দেব? কিন্তু কি বলবে?”
দুত্তেরি!
————————
আমার ডান পাশের লোকটাকে ঠেলা দিয়ে বলি “কি হল, উঠবে না নাকি? ক’টা বাজে বলতো”!
“উঁ…বিরক্ত কোরো না, কাল একটুও ঘুম হয়নি”।
“তা সে জন্য কে দায়ী”?
“তুমি”।
“ফের মিথ্যে?”আমি চোখ পাকাই।
“মিথ্যে কোথায়! পাশে এমন তণ্বী, শ্যামা, শিখরদশনা, পক্কবিম্বোধরোষ্ঠী, পীন—-“
“চুপ, চুপ, একদম চুপ”….মুখ চেপে ধরি আমি।
“এবার ওঠ। তপেশরা কিন্তু ভাববে।”
“ধুর ওরা সব জানে। কেমন পোলেন আ্যলার্জির গুল দিল দেখলে না”!
“সেকি, ওর পোলেন আ্যলার্জি নেই”?
“কস্মিনকালে না। আর জটায়ুটিও কি তলেতলে কম! ‘কাছের লোকের’ কাছে স্টিচ কাটতে পাঠিয়ে দিল।”
“হুম! ইন্টারেস্টিং”! আমি ভাবতে থাকি।
“কি ইন্টারেস্টিং ?”
“না, মানে ওরা কবে থেকে…মানে কি করে বুঝল বল তো? আমরাই তো শিওর ছিলাম না…”
“আমরা আবার কি! আমি ঠিকই শিওর ছিলাম”।
“তাই বুঝি? কবে থেকে?”
“কেন? সেই কেদার থেকে!”
“আবার সেই বাজে কথা, কেদারে কিছুই ছিল না..”
“স্পীক ফর ইওরসেল্ফ ম্যাম! আমি তো তখনই ভেবে রেখেছি এই মেয়েটাকেই…”
“আরিব্বাস ! কখন?”
“ঐ যে, স্ক্র্যাবল খেলার সময়! না হলে কি তুমি আমাকে হারাতে পারতে নাকি! আমি তো ইচ্ছে করে—“
“ঈশ! দাঁড়াও আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি স্ক্র্যাবল। পর পর চারবার যদি তোমায় না হারিয়েছি তো আমার নাম—“ উঠতে গিয়ে বাধা পাই আবার…
“এখন কি স্ক্র্যাবল খেলার সময়! মাথাটা কি তোমার একেবারে খারাপ, মণি”?টেনে আনে আমাকে আবার।
“তা কেদারেই যদি ভেবে থাক এতদিন ঝোলালে কেন?”
“তোমার মনোভাবটাও তো বুঝতে হবে, নাকি!”
“সে কি গো? দ্য ফেমাস ফেলু মিত্তির… লোকের নখের ডগা দেখে বলে দিতে পারে তিন মাস আগে তার বাঁ কান কটকট করেছিল কিনা… সে কিনা একটা মেয়ের মন বুঝতে বছর ঘুরিয়ে ফেলল!”
“আরে ফেলু মিত্তির বলেই তো একবছর নৈলে , ‘রমণীর মন, সহস্র বর্ষেরই সখা সাধনারই ধন’..হাজার বছর লেগে যেত যে!”
“বাব্বা, কাঠখোট্টা গোয়েন্দার মধ্যে এত কবিত্ব! বোঝা যায়নি তো”!
“সব জিনিস সবসময় সবাইকে বুঝতে হবে এমন কোনো কথা আছে কি!”
“তবে হাবে ভাবে অবিশ্যি সবাই টের পেত”, বলতে থাকেন গোয়েন্দাপ্রবর।
“কার হাবে ভাবে? তোমার না আমার?”
“তোমার! আমার থেকে তো বিন্দুমাত্র না”!
“তাই? ‘ডাঃ ব্যানার্জি , ভাবছিলাম বটানিক্যালটা ঘুরে আসি…’কে বলেছিল গো”?
“তাতে কি হল? একটা লোক ওখানে যেতে চাইতে পারে না? একটা ট্যুরিস্ট স্পট! তুমিই তো একদম লজ্জায় লাল টাল হয়ে সব গুবলেট করে দিলে!”
“যত বাজে কথা ! আমি ওরকম লজ্জাবতী লতা না যে কথায় কথায় লাল হয়ে যাব..”!
“আচ্ছা! এস দেখি হাতে নাতে পরীক্ষা হয়ে যাক একবার!”
….”উঃ, ঘুষি মেরো না তো অত জোরে! বাপরে বাপ,বাইরে অজ্ঞাত আততায়ী আর ঘরে মারকুটে ডাক্তার …বাঁচাই শক্ত ফেলু মিত্তিরের!”
******************************
ফেলুদা ফিরল বিকেলে। কাল রাতে ফোন করে দিয়েছিল যে মণিদির ওখানেই থেকে যাচ্ছে রাতে।
ফেরার পর থেকে কোনো উচ্চবাচ্যই নেই। আমি আর লালমোহন বাবু অনেকবার চোখ চাওয়া চাওয়ি করলাম। কিন্তু ফেলুদা নির্বিকার।
এসেই রেসট্যুরান্টে গিয়ে বিশাল পরিমাণ অর্ডার করল।
“মণিকঙ্কণা ম্যাডাম আপনাকে কিছু খাওয়াননি নাকি মশাই”?লালমোহনবাবু বলে উঠলেন।
ফেলুদা একপেশে হাসিতে কাটিয়ে দিল।
“তোমার স্টিচ তো কাটা হয়নি”, আমি বললাম।
“না । সময় পেলাম না রে। ওটা ডঃ বর্ধনকে দিয়ে আজ কাটিয়ে নেব”।
প্রায় ২৪ ঘন্টায় স্টিচ কাটার সময় হল না!
প্লেটের শেষ কাটলেটের টুকরোটা কাঁটায় গেঁথে মুখে ভরে ফেলুদা বলল ,”মণি বলেছে আপনাদের প্রন কাটলেট খাওয়াবে পরশু সন্ধেয়।”
“কে … কে বলেছে”, জটায়ু বিভ্রান্ত !
“মণি। মণিকঙ্কণা । আর কটা লোক আপনাকে প্রন কাটলেট খেতে ডাকতে পারে এখানে, লালমোহন বাবু”!
“ওটা পকোড়া ছিল না”?
“কাটলেটে আপত্তি আছে আপনার?”
“না না, তা কেন…”
“তাহলে আর কি, আপনি আর তোপসে চলে যাবেন সন্ধেবেলা”।
“তুমি যাবে না”? আমি জিজ্ঞেস করি।
“আমি আরো আগে, লাঞ্চের পরেই যাব। মণির হেল্প লাগবে”।
“তোরা বোস। আমি একটু ধোঁয়া ছেড়ে আসি”। ফেলুদা বাইরে বাগানে গেল।
“কি বুঝছ তপেশ ভাই”? চোখ গোল গোল করে কনুইদুটো টেবিলে রেখে প্রশ্ন করেন জটায়ু।
“গন্ডোগোল, বিস্তর গন্ডোগোল”! আমিও চোখ গোলগোল করে উত্তর দিই!
—
পর্ব ৮ — অবশেষে প্রন কাটলেট —
মণিদির বাড়ি সেদিন সন্ধেয় গিয়ে দেখি দারুণ ব্যস্ততা । মণিদি চিংড়ি, ম্যারিনেশনের সরঞ্জাম এসব নিয়ে রান্না ঘরে। ফেলুদা স্যালাড বানাচ্ছে ডাইনিং টেবিলে ।
জটায়ু একটু হতাশ মনে হল।
“কি মশাই, সেই লাঞ্চের পরেই এলেন হেল্প করতে, এতক্ষণে কি করলেন? সবে তো শুরু মনে হচ্ছে”।
মণিদির মুখ অস্বাভাবিক লাল, রান্নাঘরের তাতে সম্ভবতঃ।
“প্রদোষ তুমি একটু তাড়াতাড়ি হাত চালাও না। বাড়িতে কি কিছু কর নাকি কাকীমার আদরে কুটোটি নাড়ো না?”
“তুমি টেনশন কোরো না মণি। লালমোহনবাবু ওরকম খাই খাই করেন সব সময়”। ফেলুদা দিব্যি কুল।
“তোপসে, তুই মণিদির সঙ্গে গিয়ে কাটলেটগুলো বানা দেখি”।
“হয়ে গেল। ডেলিগেট করেই খালাস, বিগ ব্রাদার”! মণিদি ছদ্ম ভ্রুকুটি করে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ান।
খাওয়া দাওয়া ভালই হল। প্রন কাটলেট ছাড়াও ছিল কেনা বিরিয়ানি, মণিদির রাঁধুনির বানানো চিকেন চাঁপ আর মণিদির করা চীজকেক।
খাবার পর ফেলুদা আর মণিদি যখন ডিশগুলো তুলছে তখন ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে লালমোহনবাবু ফিসফিসিয়ে বললেন
“কি বুঝছ তপেশ ভাই? মণি! প্রদোষ”!
“হুঁ, সানাই বাজল বলে”, আমি ছুরপি চুসতে চুসতে বলি।
“ঠিক বলেছ ভায়া। আমি তো রাধাবল্লভীর গন্ধ পাচ্ছি।”
“এইমাত্র এত কিছু খেয়ে আবার রাধাবল্লভীর কথা কি বলছিলেন লালমোহনবাবু”? ফেলুদা ঘরে ঢুকেছে।
“কিছু না, এই তপেশকে বলছিলুম অনেকদিন বিয়েবাড়ি খাই না। তা একটা নেমন্তন্ন বোধহয় শীগ্গীরই পাব।”
“ভুল লালমোহনবাবু, ওটা নেমন্তন্ন নয়, বাড়ির কাজ”। আমিই বা ছাড়ি কেন!
“ডেঁপোমি ছেড়ে সরে বোস, আমি টিভিটা চালাব।”
“তুমি আবার ওর ওপর দাদাগিরি চালাচ্ছ!” মণিদি এলেন হাতে মৌরী আর লজেন্সের শিশি নিয়ে।
“হুঁ চালাচ্ছি। তুমি আর দয়া করে বৌদিগিরি ফলিয়ে ওর মাথাটি খেও না”। মণিদি এতটা সরাসরি আক্রমণ প্রত্যাশা করেননি। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন।
“তোমাকে কি তাহলে এবার থেকে মণিবৌদি বলব?” আমিও মওকা বুঝে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিই।
“কিন্তু আমি কি বলব বলুন তো। বৌদি তো হয় না, ফেলুবাবু আমার ছোট। এদিকে বৌমা ডাকলে বড় সেকেলে শোনায়। ডঃ ব্যানার্জি তো ভীষণ ফর্ম্যাল, মিসেস মিত্রও তাই। তবে কি মণিকঙ্কণা দেবী বলব?” জটায়ু খুব চিন্তিত!
“দেবীত্ব আরোপ করার দরকারটা কি? ওর নাম আছে তো একটা। মণিকঙ্কণা , নয়তো শর্টে মণি”। ফেলুদা বলে ওঠে।
“না ফেলুবাবু, ঐ মণি টনি আপনারই থাক। আমি মণিকঙ্কণা ম্যানেজ করতে পারব”। জটায়ু বলে দেন।
“আর, আরে, তোমরা কি এখানেই সব ঠিক করবে নাকি!” মণিদি এতক্ষণে ধাতস্থ।
“আমার মা বাবা আছেন তো রে বাবা। আর তোমার কাকা কাকীমাকে কি বলতে টলতে হবে না? তোমরা থ্রী মাস্কেটীয়ার্সই সব সিদ্ধান্ত নেবে?”
“আরে ওসব কিছু ব্যাপার নাকি! ওনারা কেউ অমত করবেন না”, জটায়ু আত্মবিশ্বাসী।
“হ্যাঁ , কিন্তু আমার বাবা”… মণিদিকে এবার দ্বিধাণ্বিত শোনায়।
“কেন, কেন ? আমাদের ফেলুবাবু পাত্র হিসেবে খারাপ কিসে? জানেন বম্বেতে সেবার বলিউডের নায়িকা রূপা অব্দি ওনার সঙ্গে ডিনারে যাবেন বলে আমাদের পুলক ছোকরাকে তো ফোনের ওপর ফোন, হে, হে…”
“তাই নাকি! বম্বের সব নায়িকাদের এত গোয়েন্দা প্রীতি জানা ছিল না তো!” ধারাল গলায় বলেন মণিদি, ফেলুদার দিকে একটা জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে।
“থ্যাঙ্কস”! ফেলুদা চাপা হিসহিসে গলায় বলে জটায়ুকে।
“কিন্তু সেটা না”। মণিদি আবার চিন্তিত।
“সমস্যা ওর প্রফেশন”।
“তার মানে? তোমার বাবার গোয়েন্দায় আ্যলার্জি? বলনি তো আগে”! ফেলুদা বলে ওঠে।
“শুধু গোয়েন্দায় নয়। পুলিশ, মিলিটারি…যে কোনো রিস্কি জব”।
“আসলে আমার পিসি…ওনার হাসব্যান্ড পুলিশে ছিলেন। তাঁর অন ডিউটি ডেথ হয়। তারপর পিসি সারাজীবন খুব ভুগেছেন, ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে..সেই থেকে বাবা বাড়ির মেয়েদের ঐসব প্রফেসনের লোকেদের বিয়ে করার ঘোরতর বিরোধী..। “ মণিদি বলে চলেন..
“আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল এক আইপিএস..”
“এক্স বয়ফ্রেন্ড”? ফেলুদা কুল হাবভাব ধরে রাখলেও গলার আওয়াজে একটা চোরা রুক্ষতা টের পাওয়া যায়।
“ধ্যাত্তেরি , বয়ফ্রেন্ড কেন হবে? ঝাঁটার মত গোঁফ, সারাক্ষণ পান মসলা খায়… ওরকম বয়ফ্রেন্ড রাখতে আমার দায় পড়েছে!”
ফেলুদার ঠোঁটে মৃদুহাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।
“কিন্তু সেটা কথা না। দেখেছিল আমাকে কোন বিয়েবাড়িতে, তখন আমি ইন্টার্ন করি, বিয়ের প্রশ্নই ওঠে না। হঠাৎ একদিন বাড়িতে এসে উপস্থিত মাকে নিয়ে। তাদের তো কোনোরকমে বিদেয় করা হল চা খাইয়ে। তারপর বাবা যা শুরু করল না! চেঁচামেচি… আমি নাকি জেনেশুনে ওকে আসতে বলেছি, মরে গেলেও ওর সঙ্গে বিয়ে দেবে না… একটা সময় রাগের চোটে মনে হচ্ছিল ওকেই বিয়ে করে ফেলি…কিন্তু আবার পরক্ষণেই ওর চায়ের কাপে সুরুৎ সুরুৎ করে চুমুক দেওয়া মনে পড়ে যাচ্ছিল তো… তাই আর…”
“শুনুন মণিকঙ্কণা, তারপর অনেকদিন কেটে গেছে। আপনি নিজে মাউন্টেনিয়ারিং করেন, একা থাকেন, নাইট ডিউটি করেন। এত সব যখন আপনার বাবা মেনে নিয়েছেন তখন গোয়েন্দা জামাই-ও নেবেন।” সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত কথাটি অবশেষে জটায়ুই বললেন!
“অনেক রাত হল, আমরা এবার উঠব। চল তপেশ ভাই। আপনি যাবেন না থাকবেন, ফেলুবাবু”?
“যাব, চলুন।” অন্যমনস্ক ফেলুদা লালমোহনবাবুর আলতো খোঁচাটা মনে হয় ধরতেই পারল না।
—
পর্ব ৯ —এবার কান্ড কলকাতায়—
কলকাতায় ফিরে ফেলুদা একদিন বলল,
“তোপসে, তুই কাকীমাকে বলতে পারবি কথাটা?”
“কোন কথা ফেলুদা”? আমি না বোঝার ভান করি।
“চ্যাংড়ামো হচ্ছে?”, ফেলুদার গলায় কপট রাগ।
“ও মণিদির কথাটা তো। সে আমি বলে দেব। কিন্তু সব ঠিকঠাক হলে কি পাব আমি?”
“লবডঙ্কা। তবে সব যদি গুবলেট করিস তো রামগাঁট্টা খাবি, ছোটবেলার মত”।
“ওসব চাল ছাড়! তুমি আমাকে একটা সিন্থেসাইজার কিনে দেবে।”
“ওঃ শখ তো কম নয়। বড়জোর একটা মাউথ অর্গান। তাও নেহাৎ কিছু না দিলে মণি গন্ডগোল করবে তাই।”
“সিন্থেসাইজার। ইয়ামাহার।আর মণিদি বলেছে মাউন্টেন বাইক। দার্জিলিং যখন যাব তখন চড়ব”।
“একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে না…?”
“মোটেই না, নয়ত দেব সব গুবলেট করে!”
“তুই আর কি গুবলেট করবি রে তোপসে। গুবলেট করার আসল লোক তো ওদিকে।”
“মণিদির বাবার কথা বলছ”? জিজ্ঞেস করি আমি।
“হ্যাঁ রে, ভদ্রলোকের ধারণাটা বেশ বদ্ধমূল”।
“সে রকম হলে নাই বা দিলেন উনি সম্মতি। তোমরা আ্যডাল্ট, রোজকার কর, তোমাদের কিসের ভাবনা”?
“হুম, খুব পেকেছিস দেখতেই পাচ্ছি! কলেজ চলছে কেমন”?
“ভাল, আবার কেমন! ফেলুদা , তুমি কিন্তু শেরওয়ানি পরতে পারো। খুব চলছে এখন। একদম—“
“—মগনলালের মত লাগবে।” বলে ওঠে ফেলুদা।
যাকগে ওসব পরে ভাবা যাবে!
পরদিন ফেলুদা জরুরী তলবে লালমোহনবাবুকে ডেকে এনে সোজা ছাতে নিয়ে গেল। সঙ্গে আমাকেও। আমরা দাঁড়িয়ে আছি আর ফেলুদা চারমিনারের ধোঁয়া ছেড়েই যাচ্ছে।
“কি ব্যাপার?” লালমোহন বাবু ঈশারায় জানতে চান।
“জানিনা”। আমিও সেভাবেই উত্তর দিই।
ফেলুদা শেষ টান দিয়ে সিগারেটটা ঘষে নিবিয়ে, ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে,
“যে জন্য আপনাদের ডাকা। লালমোহনবাবু, আপনার বিয়েবাড়ির ভোজ আপাততঃ হচ্ছে না। মণির বাবাকে রাজী করানো যায়নি। তোপসে তুই যদি কাকীমাকে কিছু এখনো না বলে থাকিস তো আর বলার দরকার নেই..”
“কেন মশাই? ওনার অনুমতি কি মাস্ট? উনি যদি এমন অন্যায় জেদ করেন তো আপনারা সেটা মানছেন কেন?
আমরা দুজন সাক্ষী আছি, রেজিস্ট্রি…”
ফেলুদা হাত তুলে থামায় লালমোহনবাবুকে।
“মণির বাবা হাসপাতালে লালমোহনবাবু। কাল অনেক চেঁচামেচির পরে উনি অসুস্থ হয়ে পরেন। “
আমরা চুপ।
“মণি বলেছে ও বাড়ি ছেড়ে আসতে তৈরী ছিল, কিন্তু ওর বাবার লাশের ওপর দিয়ে হেঁটে ও আমার কাছে আসতে পারবে না।” আর একটা চারমিনার ধরিয়ে বলে ফেলুদা।
“আ্যন্ড আই কাইন্ড অফ এগ্রি উইথ হার”! একটা রিং ছেড়ে বলে ও।
—••—
লালমোহনবাবুর সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার আওয়াজ শুনে আমি দৌড়ে গিয়ে ধরি ওনাকে।
“কি হল, কিছু না বলে চললেন যে? বুদ্ধি দিন কিছু একটা..”
“তুমি ভুল লোককে ধরেছ তপেশ ভাই। আমি হলুম কনফার্মড ব্যাচেলর। লিখি কিশোরপাঠ্য রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ। আমার মতামতের আর কি মূল্য আছে এ ব্যাপারে বল তো! “
একগাল হাসি ছাড়া জটায়ুকে কেমন যেন খাপছাড়া লাগে….
“আসি ভাই। দাদার খেয়াল রেখ”।
—
পর্ব ১০ —পলাতকা—
পরের কয়েকদিন যা গেল সে আর কহতব্য নয়।
ফেলুদা ঘর থেকে প্রায় বেরোয় না। খায় নামমাত্র।
ঘুমোয় কিনা কে জানে। ঘরের মেঝেতে শুধু সিগারেটের ছাই আর শেষ হওয়া টুকরো।যোগব্যায়াম বন্ধ, লেকের ধারে জগিং বন্ধ।
বাবা অব্দি ক’দিন পরে জিজ্ঞেস করলেন হ্যাঁ রে ফেলুর ব্যাপার কি? খুব জটিল কেস টেস কিছু কি?
আমি কোনোমতে মাথা নেড়ে পালিয়ে আসি।
কিন্তু মায়ের কাছে অত সহজে ছাড় পেলাম না।
“তুই আমাকে সব খুলে বল বাবা। এ কোনো কেস হতে পারে না। বহু জটিল কেস এর আগে ওকে আমি সমাধান করতে দেখেছি। এ সে জিনিস না।”
“আর তাছাড়া কেস হলে তদন্তে বেরোবে, ফোন করবে, সিধুজ্যাঠার কাছে যাবে। এভাবে দিনের পর দিন ঘরে বন্ধ হয়ে থাকার মানে কি?”
বাপরে! মা তো দেখি কিছু কম গোয়েন্দা না!
“তুই ঠিক করে বল কি হয়েছে?”
আমার কাছে মা সব শুনে বলল, “আমার সঙ্গে ঐ মণিকঙ্কণার দেখা করাতে পারিস একবার?”
“লাভ হবে না মা। আমি আর লালমোহনবাবু দেখা করেছিলাম একদিন। কফি হাউসে। মণিদিকে চেনা যায় না এই ক’দিনে। চোখের তলায় কালি। রোগা হয়ে গেছে অনেক। ওর বাবা সবে বাড়ি ফিরেছে। এখন ও কিছুতেই এমন কিছু করবে না যাতে ওর বাবার ক্ষতি হয়।”
“হ্যাঁ । আর আমার ছেলেটা বানের জলে ভেসে এসেছে কিনা, তাই তার যা হয় হোক”, মা-এর গলা গনগনে।
“যাকগে ও যদি দেখা না করে তাহলে ওর বাবা মার সঙ্গেই দেখা করতে হবে।” মা দৃঢ গলায় বলে।
“কি মুস্কিল , তুমি ওদের বাড়ি যাবে নাকি! শুনলে না ওর বাবা কেমন? যদি দুকথা শুনিয়ে দেয়?”
“তাহলে আমি চার কথা শুনিয়ে দেব! ছেলে আমার চোরও নয়, ডাকাতও নয়। বরং চোর ডাকাত ধরে লোকের উপকার করে। সবাই কত নাম করে। কোন এক খিটকেল বুড়ো তার বিটকেল ভাবনায় তাকে এত কষ্ট দেবে তা তো হতে পারে না..”
এতো আচ্ছা জ্বালা হল।
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি দেখি একটু। দুদিন সময় দাও”।
“বেশ দুদিন। মনে থাকে যেন। তারপর আমি যাবই। দরকার হলে টেলিফোন ডাইরেক্টরী থেকে ঠিকানা খুঁজে যাব। না হলে ইনস্পেক্টর হরেন মুৎসুদ্দির সাহায্য নেব। ফেলু মিত্তিরের কাকীমা আমি, একটা বাড়ি খুঁজে পাব না?” ঝনাৎ করে চাবির গোছা পিঠে ফেলে চলে যায় মা।
তবে এত কিছু করার দরকার পড়ল না।
দ্বিতীয়দিন সকালেই বাড়ির সামনে এক গাড়ি এসে থামল। আমি তো ভেবেছি মক্কেল। কি বলে কাটাব ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতেই দেখি এক বয়স্ক ভদ্রলোক। মনে হল বেশ অসুস্থ। সঙ্গে ইনহেলার।
“প্রদোষ মিত্র আছেন? “ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করেন তিনি।
দরজা থেকে এঁকে বিদায় করা যায় না।
“আপনি বসুন।” সোফা দেখিয়ে বলি। “আমি ওর ভাই তপেশ।”
“কিন্তু উনি এখন কোনো কেস নিচ্ছেন না। পার্সোনাল কারণে।” বসার পর বলি আমি।
“আমি সেই পার্সোনাল কারণেই এসেছি বাবা, আমি মণিকঙ্কণার বাবা । একবার ডাক তোমার দাদাকে”।
আমি একছুটে গিয়ে ফেলুদাকে ডেকে আনি।
ঘর থেকে বেরোনোর ঠিক আগে,
“একমিনিট ফেলুদা..”
“কি হল?”
“চুলটা একটু আঁচড়ে নাও । আর পাঞ্জাবীটা বদলে নাও। সাতদিন ধরে পরে আছ তো এটাই..এরকম করে হবু শ্বশুরের কাছে গেলে এমনিও বিয়ে দেবে না”।
অনেকদিন পর ফেলুদার মুখে একপেশে হাসি দেখলাম।
অবশেষে দেখা হল দুজনে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী একমাত্র আমি।
“মণি বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।”কোনো সম্ভাষণ-টম্ভাষণ ছাড়াই বলে ওঠেন ভদ্রলোক।
“মানে? কোথায় গেছে? দার্জিলিং ?” ফেলুদাও সোজা টু দি পয়েন্ট।
“না না। এখন সে বম্বেতে । ঠিকানা দেয়নি। শুধু বলেছে পরশু ইরাক যাবে। রেডক্রসের হয়ে ডাক্তারী করবে ইরাক-ইরান ফ্রন্টলাইনে। ওকে ফিরিয়ে এনে দাও বাবা, যে করে হোক।”
“বাপরে বাপ! সাংঘাতিক মেয়ে তো আপনার! দাঁড়ান , আমি ইন্সপেক্টর পট্টবর্ধনকে একটা ফোন করি। আপনি চিন্তা করবেন না। দরকার হলে বম্বের পুলিশ কমিশনারকে যোগাযোগ করব।” ফেলুদা ফোনটা টেনে নেয়।
“কি বেয়াইমশাই , গোয়েন্দাদের লাগে তো বিপদে আপদে? নিন এখনএকটু মিষ্টিমুখ করুন”। মা ঢোকে জলখাবারের বিরাট ট্রে নিয়ে।
“চিন্তা করবেন না, ফেলু যখন চেষ্টা করছে আপনার মেয়ে ফিরে আসবে ঠিক।”
“আমাকে আর লজ্জা দেবেন না মিসেস মিত্র। আসলে কি জানেন, নিজের বোনকে দেখেছি তো, অল্প বয়েসে বিধবা, তিনটে ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে, কি যে দুর্গতি!”
“দুঃখের কথা ঠিকই। তবে কি জানেন বেয়াইমশাই, আপনার মেয়ের ব্যাপারটা এক নয়। সে নিজে একজন ডাক্তার। ভগবান না করুন আমার ফেলুর যদি ভাল মন্দ কিছু হয়েই যায়”, জোর হাত কপালে ঠেকায় মা, “তাহলে মণি তো নিজেই নিজের বা তার সন্তানদের দেখভাল করতে পারবে। চাইলে আর একটা বিয়েও”।
“সত্যি কাকীমা, পার বটে তুমি। মণির দ্বিতীয় বিয়ের প্ল্যান করতে লেগে গেলে…”ফেলুদা না বলে পারে না।
“না বাবা, আপাততঃ আমি ওর প্রথম বিয়েরই ব্যবস্থা করছি। কি বেয়াইমশাই তাই তো? নাকি মেয়ে ফিরে এলে আবার তাকে ব্যাঙ্কের চাকুরে দেখে বিয়ে দেবেন”? মা অপ্রতিরোধ্য!
“কি যে বলেন না আপনি মিসেস মিত্র! তুমি কিছু মনে কোরো না বাবা প্রদোষ। আসলে আমার ঐ একটিই মেয়ে, তুমি বাবা হলে বুঝতে পারবে।”
“সে পথ তো আর একটু হলেই আপনি বন্ধ করে দিচ্ছিলেন বেয়াইমশাই !” মা আজ ফর্মে আছে।
“ইনকরিজিবল”, বলে উঠতে যাচ্ছিল ফেলুদা।
“আর একটা কথা বাবা,” ফেলুদা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় “তুমি নিজে যদি যেতে পার একবার। নৈলে ও যা মেয়ে, পুলিশ কমিশনার কেন প্রাইম মিনিস্টারের কথাও শুনবে না”।
“সে তো ও যাবেই।” মা বলে ওঠে।
“কিন্তু মেয়ে তাহলে জেদটি আপনার থেকেই পেয়েছে, কি বলেন বেয়াইমশাই “?
এবার আমি আর ফেলুদা দুজনেই পালাই ঘর ছেড়ে। মণিদির বাবাকে মায়ের জিম্মায় রেখে।
—
পর্ব ১১ —The White Orchid—
“তোপসে, তুই জটায়ুকে বলে দে চলে আসতে আর ফোন করে আজ বিকেলে তিনটে টিকিট বুক করে ফেল বম্বের ।আমাকে কয়েকটা জিনিস একটু ভাবতে হবে আর কয়েকটা ফোন করব”। এই তো সেই চেনা ফেলুদা! চেহারাটা যদিও এখনো উস্কোখুস্কো…সমস্যা সামনে আসতেই সেই দৃষ্টি, সেই চটপট চিন্তার সুতো সব ফিরে এসেছে!
“রেডক্রসের কলকাতার অফিসে যাবে না?”
“না। সময় নেই। আর লাভ হবে না। ওদের মাধ্যমে এরকম ইন্টারন্যাশনাল নিয়োগ হয় বলে মনে হয় না। হলেও এভাবে একজন ক্যান্ডিডেটের সব তথ্য চাইলেই দিয়ে দেবে না।”
“পুলিশকে?”
“কেন? মণির ক্রাইমটা কি? একজন ডাক্তার নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছে ..নাঃ ওভাবে হবে না”।
“তাহলে?”
“তাহলে মণিকে যোগাযোগ করতে হবে যে করে হোক। ও নিজে থেকে যাতে যাওয়াটা ক্যান্সেল করে সেটাই দেখতে হবে!”
“বম্বে শহরে এক কোটি লোক ফেলুদা। তার মধ্যে থেকে একজনকে, একদিনের মধ্যে…”
“দেখা যাক্…..তুই বরং মণির বাবার থেকে ভাস্বর সেনের ফোন নম্বরটা চেয়ে নে।”
“তুমি বার বার খালি কেন ওকে সন্দেহ কর বলতো?”
“উফ্! না রে বাবা! ও মণির পুরোনো বন্ধু। হয়তো জানবে ওদের কোনো কমন বন্ধু বম্বেতে আছে কিনা। বা ওকে হয়তো মণি কিছু বলেছিল এই চাকরীর ব্যাপারে… কোনো রেফারেন্স চেয়েছিল…চেষ্টা করতে হবে তো!”
জটায়ু চলে এলেন ঘন্টা খানেক পরেই।
“কি মশাই , ম্যাডাম ভাগলবা?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ ! পরশুর মধ্যেই তিনি দেশান্তরী হবেন পণ করেছেন”।
“ এই তো সমস্যা এইসব ডাকাবুকো মহিলাদের নিয়ে। একে প্রাণে ভয়ডর তো নেই। তার ওপর আবার প্রবল জীবে দয়া। সারক্ষণ এনজিও-রেডক্রস…”
“হ্যাঁ, দয়া সর্বজীবে, কেবল কাছের লোক কয়টি ছাড়া…”
“তা উনি পালালেনই যখন, তখন এখানে এলেই তো হত”!
“তাহলে কি আর ওর বাবা এমন ‘বাবা বাছা’ করে এখানে আসতেন? ছাতের সমান লাফ দিয়ে আবার গিয়ে হাসপাতালে ঢুকতেন না?”
“যাকগে, চলুন লেক রোড। ভাস্বর সেনের বাড়ি। ওরা থ্যাঙ্কফুলি এখন কলকাতায়।”
ভাস্বর সেন আর চন্দ্রিমা আমাদের আপ্যায়ন করলেন ওঁদের বসার ঘরে।
“হ্যাঁ, ও তো আমাদের হাসপাতালের সুপার ডাঃ ছেত্রীর কাছে রেকমেন্ডেশন চেয়েছিল। কিন্তু সে তো বদলি নিয়ে কলকাতায় চলে আসার জন্য…মানে ভাবছিল আপনাদের বিয়ের পরে…সরি…!”
ভাস্বরবাবু মাঝপথে থেমে যান।
“ক’দিন আগে ও দার্জিলিং এল, কথা ছিল কিছু কাজ টাজ গুছিয়ে আবার কলকাতা ফিরবে।বিশ্বাস করুন আমি যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতাম ও এইসব প্ল্যান কষছে আমি ওকে কিছুতেই যেতে দিতাম না..”
“যাই বলুন, এই সব ঝামেলা কিন্তু ঐ কাকাবাবুর জন্য “, চন্দ্রিমা বলে ওঠেন।
“শুধু আজ বলে না তো…সেই একবার আমাকে লেখা ভাস্বরের চিঠি ওর বই থেকে পেয়ে…”
“ওরে বাবা, সে কি আমি ভুলেছি! কাকাবাবু সোজা চিঠি নিয়ে আমার বাবার কাছে…আড়ং ধোলাই তারপর…”ভাস্বর সেন একবার কাঁধে হাত বুলিয়ে নেন।
“এখনো এখানে দাগ আছে জানেন!”
“তখনি বলেছিলাম আমি, মণি, মা আমার, আমার গা ছুঁয়ে তুই কথা দে তুই কখনো প্রেম করবি না, অন্ততঃ যতদিন তোর ঐ হিটলার বাপ বেঁচে আছে ততদিন!”
জটায়ু চায়ের কাপে বিষম খেলেন।
“আপনাদের কোনো কমন বন্ধু বম্বেতে আছে? যার কাছে মণি গিয়ে উঠতে পারে? “, ফেলুদা কাজের কথায় ফেরে।
“স্কুলের তো সেরকম কেউ মনে পড়ছে না… তোমাদের মেডিক্যাল কলেজের বন্ধু কেউ , ভাস্বর..?”চন্দ্রিমা জিজ্ঞেস করেন।
“সঙ্গীতা ঘোষাল আছে সরকারী হাসপাতালে। চন্দ্রিমা, সঙ্গীতার নম্বরটা একটু এনে দেবে?” চন্দ্রিমা উঠে গেলেন ভেতরের ঘরে।
“আর আশিষ আগরওয়াল আছে ব্রীচ ক্যান্ডিতে… কিন্তু মণি ওর কাছে চট করে যাবে বলে তো মনে হয় না। দুজনে আদায় কাঁচকলায় ছিল কলেজে ..” ভাস্বর সেন বলতে থাকেন।
“তাও একবার ফোন নম্বরটা পেলে কথা বলে নিতাম “।
“দেখছি। আমার কাছে নেই। তবে প্রজ্ঞা গোয়েলের কাছে সম্ভবতঃ আছে। আমি ওর থেকে নিয়ে আপনাকে জানিয়ে দেব।”
“বেশ আপাততঃ এতেই হবে। অনেক ধন্যবাদ। দরকার লাগলে আবার যোগাযোগ করতে পারি তো?”
“কি বলছেন মিঃ মিত্র! মণি আর আমি নার্সারী থেকে মেডিক্যাল অব্দি একসাথে পড়েছি। একসঙ্গে কাজ করেছি … শী হ্যাজ এ হার্ট অফ গোল্ড…আপনি অসম্ভব লাকি, প্রদোষবাবু! হ্যাঁ, মাথায় ওর বিস্তর ছিট আছে ঠিকই… তবু ফিরিয়ে আনুন ওকে যেভাবে হোক!”
—————
“বম্বেতে নেমে আপনার প্ল্যানটা কি ফেলুবাবু?”, এয়ারপোর্টের দিকে যেতে যেতে জানতে চান জটায়ু।
“ইন্সপেক্টর পট্টবর্ধন সব বড় হোটেলে খবর পাঠিয়ে দিয়েছেন। সেখানে উঠলে জানা যাবে।
তবে বম্বেতে ছোট- মাঝারি আরো অসংখ্য হোটেল, গেস্টহাউস ইত্যাদি আছে। সব গুলো হয়তো কভার করা যাবে না।”
“আর ওঁর আত্মীয় বা বন্ধুরা”?
“মণির মাসতুতো দিদি থাকে ওখানে। সেখানে যায়নি, ন্যাচেরালি! বন্ধুদের মধ্যে সঙ্গীতা ঘোষালের কাছে যায়নি। চেক করেছি। আশিষকে পাইনি। উনি ওটিতে আছেন। আবার নেমে ফোন করতে হবে।”
“আচ্ছা ফেলুদা, মণিদি তো বম্বে এয়ারপোর্ট দিয়েই যাবে পরশু, তাহলে…”আমি বলি।
“সেটা শেষ চেষ্টা করতেই হবে। এয়ারপোর্ট পুলিশকে কমিশনার কুলকার্নি বলে দেবেন। কিন্তু কোন ফ্লাইট, ক’টার সময়… কিচ্ছু জানা নেই।তার ওপর পুলিশ ওকে শুধু অনুরোধ করতে পারে, আটকাতে তো পারে না, ফলে আটকাতে গেলে আমাদের ওখানে সারাদিন বসে থাকতে হবে…দেখা যাক! কিছু না হলে তখন…”
বম্বে পৌঁছতে বিকেল হয়ে গেল। তাজ আর শালিমার হোটেল থেকে দুটো লীড পাওয়া গেছিল। কিন্তু দুটোই দেখা গেল ফলস্ ট্রেইল। পট্টবর্ধনের লোক সঙ্গে নিয়ে এয়ারপোর্টের কাছাকাছি সব হোটেল চষে ফেলতে ফেলতে রাত ১০ টা হয়ে গেল।
“কাল একবার কমিশনার কুলকার্নি রেডক্রসের রিজিওনাল ডাইরেকটরের সঙ্গে কথা বলবেন। পার্সোনাল ফেভার হিসেবে। দেখা যাক অন্ততঃ ফ্লাইট ইনফরমেশনটা পাওয়া যায় কিনা…”
“আপনারা হোটেলে গিয়ে বিশ্রাম নিন লালমোহন বাবু। আমি আরো কয়েক জায়গা যাব।”
আমাদের ট্যাক্সিতে তুলে দিয়ে বলল ফেলুদা।
———
পরদিন সকালে সবে হোটেলে ব্রেকফাস্ট করছি, এমন সময় ওয়েটার জানাল ফেলুদার সঙ্গে কেউ দেখা করতে এসেছে।আমাদের খাওয়া হয়ে গেছিল প্রায়। তাই তিনজনেই গেলাম।
হোটেলের লবিতে বসেছিলেন এক সুদর্শন এবং স্মার্ট ভদ্রলোক। আমাদের দেখে, ঝকঝকে হেসে হাত বাড়িয়ে দিলেন ফেলুদার দিকেঃ
“মিঃ মিটার? আই আ্যম আশিষ আগরওয়াল। আপনি আমাকে কাল কয়েকবার ফোন করে পাননি। আই ওয়াজ বিজি ইন ওটি। কিন্তু আপনার মেসেজ আমার আনসারিং মেশিনে রাত্রে পেয়ে আই ওয়াজ কিউরিয়াস কি হোআট ডু ইউ ওয়ান্ট ফ্রম মী! আপনি আমাকে চিনেন না কিন্তু আমি আপনার নাম শুনেছি…ফ্রম মাই মামাজি।আমার হসপিটাল যাবার পথে এই হোটেল, সো আই থট কি লেটস ফাইন্ড আউট”!
“দ্যাটস ভেরী কাইন্ড অফ ইউ, ডঃ আগরওয়াল। আসলে আমি একজনকে খুঁজছি, আপনার এক কলেজের ব্যাচমেট, যদি আপনি কিছু জানেন”।
“হু ইজ হি?”
“ইটস এ শী, আ্যকচুয়েলি….মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি”।
“ওহ্, মাই! মণি! কিয়া কেয়া উস শরফেরি- নাকচড়ি লড়কি নে? জিসকে লিয়ে আপ জ্যায়সে ফেমাস জাসুস কো ভেজা গয়া”?
“ না উনি কিছু ক্রাইম করেননি।দিন কয়েকের মধ্যে কি উনি আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন? উনি এখন সম্ভবতঃ বম্বেতে আছেন, তাই…”
“ভাস্বর নে আপকো মেরা নাম্বার দিয়া থা না…বাতায়া নেহি উসনে কি মণি অউর মেরা ছত্তিশ কা আঁকড়া থা কলেজ মে…উয়ো কিঁউ আয়েগি মুঝসে মিলনে..?”
“আমরা শুধু জানতে চাইছি আপনি কিছু জানেন কিনা। যদি না জানেন, দেন, ওয়েল থ্যাঙ্কস ফর ইওর টাইম…”
“শুনুন মিঃ মিত্রা, ম্যায় তো উসসে শায়দ পিছলে পাঁচ সাল মে একবার ভী নেহি মিলা। লেকিন ইন এ ওয়ে, আমার চেয়ে ভাল ওকে কেউ চিনে না। পুরা উয়ো সেবা করনেবালি টাইপ…সরকারী আসপাতাল ইয়া এনজিও.. ।বিলকুল মেরি অপোজিট। ম্যায় নে তো ডক্টরী শিখি হ্যায় প্যায়সা কামানে কে লিয়ে। আরে, মেহনত কিয়া ম্যায়নে ইস্কে লিয়ে। কসমেটিক সার্জন হুঁ ম্যায়। ইয়ে জো সারে হিরোইনস হ্যায় না, মেরা রেগুলার ক্লায়েন্টস হ্যায় সব!” আশিষকে গর্বিত শোনায়।
“ম্যায়নে বোলা থা উসসে, ও আমার সঙ্গে অনেক ঝগড়া করত কলেজে, ফিরভি। কি আ জা ইধার, জয়েন কর মুঝে…”
“কেন ?”
“কিঁউ কি উয়ো ঘমন্ডী লড়কী কী সার্জারী কা হাত কামাল কি হ্যায়। আতি তো হাম দোনো কো ফয়দা হোতা। মগর নেহি, উসে তো সেবা মে হি ইন্টরেস্ট হ্যায়।
আ্যকসিডেন্ট মে ঘায়েল লোগোকোঁ ঠিক করঙ্গে, লেকিন বিউটি ট্রীটমেন্ট নেহি! আভি দেখিয়ে, মেরা বান্দ্রা মে আলিশান ঘর হ্যায় যব কি উয়ো সর রহি থী কোঈ সরকারী কোয়ার্টার মে। এখন তো বলছেন কি শী ইজ মিসিং! আ্যয়সা হি হোনা থা। সরাসর বেওকুফ। ইমোশনাল ফুল”!
“স্যরি ডঃ আগরওয়াল , বাট দ্যাটস মাই ফিঁয়াসে ইউ আর টকিং আ্যবাউট”, ফেলুদার গলা ইস্পাত শীতল!
“রিয়েলী! ওয়েল, ওয়েল! মামাজি কো দেনা পড়েগা ইয়ে খুশখবরী! আপ শায়দ জানতে হ্যায় মেরে মামাজি কো… মগনলাল মেঘরাজ নাম হ্যায় উনকি!”
জটায়ুর গলা থেকে একটা “হিঁক” গোছের আওয়াজ বেরোয়।
“ঠিক হ্যায় তো ফির আব ম্যায় চলতা হুঁ। উমিদ হ্যায় কি আপকো আপকি খোয়ি হুয়ি মেহবুবা মিল জায়েগী…… শায়দ কিসি গাটার মে সে।”
শেষ কথাগুলো দাঁতের ফাঁক দিয়ে উচ্চারণ করে আশিষ আগরওয়াল পেছন ফিরতে যায়——কিন্তু তার আগেই ফেলুদার এক বিরাশি সিক্কার মুষ্ঠাঘাতে ধরাশায়ী হয়ে যায় লবির মার্বেলের মেঝেতে।
——-
“চল তোপসে, চলুন লালমোহনবাবু…ধারাভি!”
গোলমালটা থামার পরে বলে ফেলুদা।
“আপনি ঐ মগনলালের ভাগ্নের থেকে ক্লু পেলেন নাকি মশাই!”
“হ্যাঁ, লালমোহনবাবু। আশিষ যতবড় অর্থগৃধ্নু হামবাগ হোক না কেন, মণিকে চিনেছে ঠিক। আমরা ওকে ভুল জায়গায় খুঁজছি। ফাইভ স্টারে নয়, ওকে পাওয়া যাবে আন্ডার প্রিভিলেজড জায়গায়। অনেক সময় বন্ধুদের চেয়ে শত্রুরা চেনে আরো ভাল।”
ধারাভি বস্তির অলি গলি দিয়ে প্রায় দুঘন্টা হেঁটেও কিছু পাত্তা করা গেল না। অনেক সমাজসেবী সংস্থা কাজ করে এখানে। পট্টবর্ধন তাদের একটা লিস্ট দিয়ে দিয়েছেন। ওনার দুজন লোকও খুঁজছে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
রেললাইনের ধারঘেঁসে একটা চাতাল মত জায়গায় এসে দাঁড়ালাম তিনজনে। মিনিট কয়েক বসা দরকার।
পাশ দিয়ে ঘন ঘন বম্বের বিখ্যাত লোকাল ট্রেন যাচ্ছে।
লাইনের ধারে কয়েকটা বাচ্চা খেলছে।
“সত্যি মশাই, মানুষ যে কিভাবে থাকে এখানে না এলে বোঝা যায়না। মণিকঙ্কণা ম্যাডাম যে কেন এসব করেন একটু একটু বুঝতে পারছি। সবাই তো আর ঐ আশিষের মত স্বার্থপর নয়। বলে না নরানাং মাতুলক্রমঃ…”
—“এ বাবু কুছ পয়সা দো না,” তিনটে বাচ্চা এসে জটায়ুর ঝোলা ধরে টান দিতে লেগেছে।
জটায়ু কিছু বলার আগেই ফেলুদা ওর মানিব্যাগ বের করেছে… ওর চোখ কিন্তু পেছনের মেয়েটার দিকে…তীক্ষ্ন দৃষ্টি….এই দৃষ্টি আমি চিনি!
“ইয়ে লো..”
বড় অঙ্কের নোটটা দেখে চোখগুলো চকচক করে ওঠে বাচ্চাগুলোর।
“কেয়া নাম হ্যায় তুম লোগোকা?”
“আশা..সুবোধ…দিশা…”, বাচ্চাগুলো বলে।
“কিতনা প্যারা নাম হ্যায়। ওউর দিশা, তুমহারে বালোঁমে উয়ো ফুল তো সাচমে একদম ফার্স্টক্লাস হ্যায়”
ফেলুদাকে এভাবে কথা বলতে তো জীবনে শুনিনি!
“কাঁহা মিলা ইতনা খুবসুরৎ ফুল?”
হঠাৎ ফেলুদা এখন ফুলের পেছনে পড়ল কেন!
“ইঁহা নেহি মিলতি ইয়ে সাব”, দিশার ধুলোমাখা মুখে খুশীর হাসি।
“উয়ো যো ডক্টর দিদি হ্যায় না, উনহোনে দিয়া হ্যায় মুঝে.. রাখলো, সাব, রাখলো ইয়ে আপ।” দিশা রুক্ষ চুল থেকে ফুলটা খুলে বাড়িয়ে দেয়।
“ওউর উয়ো ডক্টর দিদি?”ফেলুদা ফুলটা নাকের কাছে নিয়ে জিজ্ঞেস করে
“উধার…রেল পটরী কে উস তরফ, তিসরি খোলি মে..”আশা, সুবোধ আর দিশা তিনজনেই হাত দিয়ে দেখায়।
ফেলুদা দৌড়েছে ওদিকে। আমি ছুটতে যাব ওর পেছনে, হঠাৎ আস্তিনে টান।
“দাঁড়াও তপেশ ভাই। এই ব্যাপারটা মনে হয় তোমার দাদার একার হ্যান্ডেল করাই ভাল। আমরা বরং এখানে অপেক্ষা করি।”
———-
বিকেলে চৌপট্টিতে ভেলপুরী খাচ্ছিলাম চার জনে।
“আপনি ঐ ফুলটা থেকে কি করে বুঝলেন বলুনতো ফেলুবাবু”?
“Coelogyne cristata, The White Orchid, লালমোহন বাবু। দার্জিলিং, কার্শিয়াং এ ভর্তি। আর মণির ফেভারিট। ধারাভির বস্তিতে এমনি এমনি পাওয়া একটু আশ্চর্যের!
“সঙ্গে করে নিয়ে যাচ্ছিলেন নাকি আপনি?” মণিদিকে প্রশ্ন করেন লালমোহন বাবু।
“হ্যাঁ । ওটা আমার দার্জিলিং এর শোবার ঘরে ডানদিকের বেডসাইড টেবিলটার ওপর ছিল। বাঁচত না হয়তো ইরাকে, তাও…”
সূর্যাস্তের আলোতে লাল হয়ে ওঠা সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে লালমোহনবাবু বলেন “ওঃ জম্পেশ মশাই! আমার তো একটা কবিতা মনে আসছে…”
“আবার সেই বৈকুন্ঠ মল্লিক?”
“না মশাই, এটা একদম রবি ঠাকুরের”…
“………
তখনি চলে যেতেম, কিন্তু বাকি আছে একটি কাজ।
আর দিন-কয়েকেই ক্যামেলিয়া ফুটবে,
পাঠিয়ে দিয়ে তবে ছুটি।
সমস্ত দিন বন্দুক ঘাড়ে শিকারে ফিরি বনে জঙ্গলে,
সন্ধ্যার আগে ফিরে এসে টবে দিই জল
আর দেখি কুঁড়ি এগোল কত দূর।
সময় হয়েছে আজ।
যে আনে আমার রান্নার কাঠ।
ডেকেছি সেই সাঁওতাল মেয়েটিকে।
তার হাত দিয়ে পাঠাব
শালপাতার পাত্রে।
তাঁবুর মধ্যে বসে তখন পড়ছি ডিটেকটিভ গল্প।
বাইরে থেকে মিষ্টিসুরে আওয়াজ এল, "বাবু, ডেকেছিস কেনে।'
বেরিয়ে এসে দেখি ক্যামেলিয়া
সাঁওতাল মেয়ের কানে,
কালো গালের উপর আলো করেছে।
সে আবার জিগেস করলে, "ডেকেছিস কেনে।'
আমি বললেম, "এইজন্যেই।'
তার পরে ফিরে এলেম কলকাতায়।”
Source:
সব পর্বের লিঙ্কঃ
পর্ব ১ঃ হাইলি সাসপিশাস https://www.facebook.com/100090322895563/posts/110490371971726/?app=fbl
পর্ব ২ঃ শৈল শহর জমজমাট https://www.facebook.com/100090322895563/posts/111540158533414/?app=fbl
পর্ব ৩ঃ পাহাড়ঢালে আতঙ্ক https://www.facebook.com/100090322895563/posts/112919271728836/?app=fbl
পর্ব ৪ঃ সুভদ্রার্জুন https://www.facebook.com/100090322895563/posts/113004095053687/?app=fbl
পর্ব ৫ঃ জট ছাড়ানো, জট পাকানো https://www.facebook.com/100090322895563/posts/113621301658633/?app=fbl
পর্ব ৬ঃ স্বীকারোক্তি https://www.facebook.com/100090322895563/posts/113923568295073/?app=fbl
পর্ব ৭ঃ মিথ্যুক গোয়েন্দা ও মারকুটে ডাক্তার https://www.facebook.com/100090322895563/posts/115379161482847/?app=fbl
পর্ব ৮ঃ অবশেষে প্রন কাটলেট https://www.facebook.com/100090322895563/posts/116156348071795/?app=fbl
পর্ব ৯ঃ এবার কান্ড কলকাতায় https://www.facebook.com/100090322895563/posts/116816561339107/?app=fbl
পর্ব ১০ঃ পলাতকা https://www.facebook.com/100090322895563/posts/117771631243600/?app=fbl
পর্ব ১১ঃ The White Orchid https://www.facebook.com/100090322895563/posts/118816597805770/?app=fbl
No comments:
Post a Comment