জটায়ু - বলেন কি মশাই, ইন্দুবালা দেবী রান্না করার আগেও বাঙালি মানকচু খেতো?
একদিন তোপসেদের বাড়িতে খেতে বসেছে তিনমূর্তি৷ তোপসের মা পূর্ণিমা দেবী সহস্তে রান্না করেছেন খাবার৷ বাবা বিনয় বাবু তদারকি করছেন৷ একটি পদ ভাতে মেখে মুখে দিয়ে জটায়ু অভিভূত৷ এমন সুস্বাদু পদ খেলে নাকি বৈকুন্ঠ মল্লিক আনন্দে কবিতা লিখে ফেলতেন৷ তারপরে, কথোপকথন...
ফেলুদা - আলবাৎ খেতো৷ বহুকাল আগে থেকে খেতো৷ ছোলা দিয়ে মানকচুর ঘন্ট, মানকচু মাখা ভাজা, মানকচু পোড়া বাটা, মানকচুর ডালনা, মাছ দিয়ে, মাছের মাথা দিয়ে মানকচু, মানকচু দিয়ে মুগ ডাল, মানকচুর জালি ভাজা, এমনকি মানকচুর মালপোয়াও রান্না করা যায়৷ আরো অনেক পদ রয়েছে মানকচুর৷ আর অনেক বাঙালি বাড়িতে সেগুলো আজও নিয়মিত রান্না করা হয়৷
জটায়ু - উরেব্বাস! মানকচু বাটা ছাড়াও মানকচুর পদ করা যায়?
ফেলুদা - তবে আর বলছি কি?
জটায়ু - কিন্তু ইন্দুবালা দেবী তো এই রান্নাগুলোর কথা বলেন নি?
ফেলুদা - দেখুন, আর যাই হোক, আপনার কাছ থেকে নিব্বা নিব্বি মার্কা কথাবার্তা আশা করি না৷ ইন্দুবালা দেবীকে দেখে রান্না শিখবে যারা কুয়োয় বসে ঘ্যাঙরঘ্যাঙ করে আর ইউটিউব দেখে জল গরম করে৷ আপনার প্রখর রুদ্র তো মশাই সাহারায় নেকড়ে বাঘের সাথে রেস লাগায় আর হণ্ডুরাসে জলহস্তীর সাথে কুস্তি করে৷ এসব কথা আপনাকে মানায় না৷
জটায়ু - ভাই তোপসে, মায়ের কাছ থেকে জেনে আমাকে কয়েকটি পদের রেসিপি লিখে দিও কেমন? এসব রান্না খেলে পেশীতে যে অনুযায়ী শক্তি আর মনে যে পরিমাণ তৃপ্তি আসবে, তাতে বছরে চারটে করে উপন্যাস নামিয়ে ফেলা কোনো ব্যাপার নয়৷
🌶️
ছবিতে রইলো ছোলা দিয়ে মানকচুর ঘন্ট আর মান মাখা ভাজা৷ তোপসে ওর মায়ের কাছ থেকে জেনে লালমোহন বাবুকে রেসিপি দিয়েছিলো কি না জানি না, তবে আমি সুস্মিতার কাছ থেকে জেনে মানকচু মাখা ভাজার রেসিপিটি নিচে লিখে দিলাম। উপন্যাস তো আর আমরা সবাই নামাতে পারি না, তবে এই সাধারণ অথচ সুস্বাদু পদটি ঠিকঠাক রান্না হলে, এক থালা ভাত নামিয়ে দেওয়া কোনো ব্যাপার না 😊
মানকচুর মাখা ভাজা -
এটি একটি খাঁটি ওপার বাংলার প্রাচীন রান্না। খুব সাধারণ উপকরণে সহজে রান্না করা যায়৷
মানকচু দুরকম ভাবে ভাজা যায়, ঝুরো ঝুরো করে বা মাখা মাখা করে। এটি মাখা মাখা করে ভাজা।
উপকরণ : মানকচু, শুকনো লংকা, কাঁচা লংকা, হলুদ, কালোজিরে, নুন, মিষ্টি, ভিনিগার।
প্রণালী : প্রথমে মানকচুটাকে ঘষে (grate করে) নিয়েছি। এরপরে কচুতে নুন মাখিয়ে জল ঝরানোর জন্য রেখে দিয়েছি এক ঘন্টা। এরপরে জল ভালোভাবে নিংড়ে কচুটা তুলে নিয়েছি।
কড়াইতে সরষের তেল দিয়ে কালো জিরে আর শুকনো লংকা ফোড়ন দিয়েছি। ফোড়ন থেকে গন্ধ বেরলে নিংড়ে রাখা কচুগুলি ওর ভেতরে দিয়ে দিয়েছি। একটু নাড়াচাড়া করে এর ভেতর অল্প হলুদ, নুন আর মিষ্টি দিয়ে কচুর সাথে মশলাটা ভালোভাবে মিশিয়ে নিয়েছি। কচুর পরিমান বুঝে অল্প ভিনিগার দিয়েছি। এর ফলে গলা ধরার সম্ভাবনা থাকে না৷ এরপরে অল্প জলের ছিটে দিয়ে গোটা কাঁচা লংকা (একটু ভেঙে) দিয়ে দিয়েছি। এরপরে তিন চার মিনিট ঢাকা দিয়ে রেখেছি (5 মিনিট)। এরপরে ঢাকাটা তুলে কম আঁচে অনেকক্ষণ ধরে নাড়তে হবে।
সবচেয়ে দরকারি কথাটা হল পুরো রান্নাটাই হবে খুব কম আঁচে, ধৈর্য নিয়ে। তাড়াতাড়ির জন্য আঁচ বাড়িয়ে দিলে কিন্তু স্বাদ আসবে না, নীচে লেগে ধরবে।
ভাজা হয়ে গেলে রঙ পালটে যাবে, ওপরের স্তরটা একটু (খুব কম) ভাজা ভাজা হবে। নামিয়ে গরম গরম খেলে সবচেয়ে ভালো।
দিদাকে দেখেছি দিনের সব রান্নার শেষে যখন উনুনের আঁচ কমে এসেছে, তখন এই রান্নাটি করতে, অনেক সময় নিয়ে পান মুখে গল্প করতে করতে। রান্নাটি খাওয়ার ঠিক আগে নামালে খুব ভালো, গরম থাকলে এর ভেতরে থেকে শুকনো লংকা আর হাল্কা ভাজা কাঁচা লংকার যে গন্ধ আসে তা খুব সুন্দর আর গরম ভাতে মেখে খুব ভালো লাগে খেতে।
সমাপ্ত
রান্না আর রেসিপি - Susmita
লেখা আর ছবি - Joydeep
No comments:
Post a Comment