Audio story:
একাই একশো
সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক মাস ব্যাপী আনন্দোৎসবে তাঁরই সৃষ্ট পাঁচটি অবিস্মরণীয় চরিত্রকে নিয়ে পাঁচটি নতুন গল্পের ডালি।
গল্প ৪ - শেয়াল দেবতার অভিশাপ
১.
"শোন তোপসে, আমি মিউসিয়াম থেকে বলছি। লালমোহনবাবুকে খবর দে। তোকে তুলে নিয়ে উনি যেন তাড়াতাড়ি মিউসিয়ামে চলে আসেন। আনুবিস গায়েব।"
এই কথাগুলো কোনদিন আমাকে শুনতে হবে ভাবিনি। বছর তিনেক আগে নীলমণি সান্যালের সেই কেসটার সমাধান করে ফেলুদা, যেটায় উনি প্রতুল দত্ত আর অন্যান্য প্রাচীন জিনিসের সংগ্রহকারীদের থেকে চুরি করে ব্যক্তিগত সংগ্রহ বাড়াতেন। একটা বাচ্চা ভিখিরি আর একজন বেঁটে বামনকে এই অসাধু কাজে লাগাতেন নীলমণি সান্যাল, প্রাচীন মিশরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন বা archaeological artefacts'য়ের প্রতি এতোই নেশা জন্মেছিলো তাঁর।
উনিই ফেলুদার কাছে আসেন নকল হুমকির চিঠি নিয়ে, যাতে চুরির সন্দেহ ওঁর উপর না পড়ে। কিন্তু তারপর ফেলুদা তাঁর চালাকি ধরে ফেলে আর বামাল সমেত গ্রেফতার হন নীলমণি সান্যাল আর সেই বামন সাকরেদ। পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার আগে তাঁর থেকে শেয়াল দেবতা আনুবিসের মূর্তিটাই পারিশ্রমিক রূপে চেয়ে নেয় ফেলুদা।
তারপর থেকে মিশরের দেবতার সেই মূর্তি আমাদের ন-নম্বর রজনী সেন রোডের বসার ঘরের শোভা বর্ধন করেছে, ঘোষাল বাড়ির সেই গণেশ মূর্তির পাশেই। তারপর গত পরশুই আনুবিস'কে দিন তিনেকের জন্য চেয়ে নিয়ে যায় শহরের একটা নতুন প্রাইভেট মিউজিয়াম।
সেই মিউসিয়ামের উদ্বোধন উপলক্ষে শহরের নামকরা ধনি ব্যক্তিরা তাঁদের ব্যক্তিগত সংগ্রহের কিছু কিছু ধার দেন। ফেলুদা নামকরা হলেও ধনি নয়, কিন্তু শেয়াল দেবতা কেসের পর আনুবিসের মূর্তির ছবি আর ফেলুদার ইন্টারভিউ খবরের কাগজে ছেপে বেরোয়, আর তারই সূত্র ধরে মিউসিয়ামের বড়কর্তার ফোন আসে ফেলুদার কাছে।
সেই বড়কর্তা বাঙালি নন, তাঁর নাম বিষ্ণু ঝুনঝুলওয়ালা। কিন্তু তাঁর জন্ম কলকাতায়, তাই তিনি বাংলাটা ভালোই জানে। আজ কাক ভোরে তাঁরই ফোন আসে, আর সেই ফোনে দু-মিনিট কথা বলেই ফেলুদা হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে যায়।
আমি বলেছিলাম একটু অপেক্ষা করতে। তাহলে লালমোহনবাবুকে খবর দিলে তিনিও এসে পড়তেন, আর আমরা তিনজনে একসঙ্গেই যেতে পারতাম। কিন্তু বুঝলাম ওর খুব তাড়া, আমাকে কথা শেষ না করতে দিয়েই দড়াম করে দরজা বন্ধ করে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলো। আর তার ঘন্টাখানেকের মধ্যেই এই ফোন।
২.
আরও আশ্চর্য্য, দু দিন আগেই শো-কেসে আনুবিসের খালি জায়গার দিকে তাকিয়ে ফেলুদা এই দেবতার কথাই আমাকে বলছিলো। "জানিস তোপসে, যে প্রাণীর মুখের আদলে আনুবিসের মুখ, তাকে এতোদিন বলা হতো African Golden Jackal. কিন্তু ইদানিং প্রমাণিত হয়েছে যে আসলে এই প্রাণী হলো নেকড়ে জাতীয়, তাই এর নতুন নাম এখন African Golden Wolf. সুতরাং তুই আনুবিস'কে যদি এখন থেকে নেকড়ে দেবতা বলিস তাহলে ভুল হবে না।"
"না, আমি শেয়াল দেবতাই বলবো।", বললাম আমি। "যে নামে প্রথম জেনেছি, সেটাই থাক। এই যেমন তোমার ভালো নাম প্রদোষ, কিন্তু যখন তোমাকে প্রথম চিনি, আমার তখন তিন বছর বয়স, তখন থেকেই জানি তুমি ফেলুদা। এখন তোমার পোশাকি নামটা জেনে গেছি বলেই কি তোমাকে প্রদোষদা বলে ডাকবো?"
ফেলুদা হেসে ফেললো। লালমোহনবাবুও। সেদিন রবিবার, তাই চা আর ডালমুটের আসরে তিনি যথারীতি এসেছিলেন। "ঠিক বলেছো, ভাই তপেশ", তিনি বললেন। " আমারও তো একটা ভালো নাম আছে, সর্বজ্ঞ। কিন্তু ভাগ্যিস সেই নামে কেউ আমাকে ডাকে না। সর্বজ্ঞ থেকে সবজান্তা হতে কতক্ষণ? তাই লালমোহনই গুড, আর জটায়ু'টা বেটার।"
লালমোহনবাবু আজকাল খুব ইংরেজি বলছেন। গত সপ্তাহে একদিন বিকেলে উনি এসেছিলেন, তখন খুব গরম। আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করলাম উনি শরবত খাবেন কিনা, তাতে উনি বললেন, "নাঃ, জল'ই গুড।" তাতে ফেলুদাও খুব খুশি হয়ে বললো কথাটা বাংলিশ শুধু না, শুদ্ধ ইংরেজিও বটে। একেবারে খাস ইংরেজ সাহেবরাও নাকি অহরহ এটাই বলে। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি, তারপর বুঝলাম ও jolly good'য়ের কথা বলছে।
এই সব ঘটনা এখন ইতিহাস। বরং ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা সেই মিশরীয় দেবতার অনুপস্থিতিই এখন ঘোর সত্য। সবুজ রঙের সেই মূর্তিটা আমাদের রোজকার সঙ্গী হয়ে গিয়েছিলো। আমরা কি তবে সঙ্গীহারা হলাম? মূর্তিটার দাম কতো আমি জানি না, তবে এটা জানি যে দাম নিয়ে ফেলুদা কোনদিনই মাথা ঘামায় না। কিন্তু ব্যাপারটা দামের চেয়ে অনেক গুরুতর - স্মৃতি আর শিল্পের এই মিশ্রণ তো বিরাট অর্থ দিয়েও কেনা যাবে না।
৩.
লালমোহনবাবু'কে ফোন করে দেখলাম এনগেজেড আসছে। তিন মিনিট পরে আবার করলাম, তখনও তিনি অন্য কারো সাথে ফোনে কথা বলছেন। তিন বারের বার পেলাম।
"আপনি ফোনটা ফ্রি রাখবেন তো!", রাগত স্বরে বললাম আমি। "একে তো সাংঘাতিক ব্যাপার, তার উপর আপনি সারাক্ষণ ফোনে আড্ডা দিয়ে যাচ্ছেন।"
"আড্ডা নয়, তপেশ। আমার প্রকাশকের সঙ্গে একটা বচসা চলছিলো।", বললেন জটায়ু। "আমার ইচ্ছা ছিলো নতুন উপন্যাসের নাম রাখবো মহেঞ্জোদারোর মৃত্যুবাণ, কিন্তু উনি আপত্তি করছিলেন। ওঁর মতে মহেঞ্জোদারো আর মান্ধাতার মধ্যে নাকি কোনও পার্থক্য নেই। হট কচুরিস কেন, এই নামের বই নাকি বাসি মুড়ির থেকেও কম বিকোবে। নতুন নাম নিয়েই কথা হচ্ছিলো। এখন কি নাম প্রপোজ করেছি বলো তো?"
"যেতে দিন আপনার মান্ধাতা।", অধৈর্য্য হয়ে বললাম আমি। " এদিকে যে আনুবিস চুরি গেছে, সে খবর রাখেন? এক্ষুণি এসে আমাকে তুলে নিয়ে মিউসিয়ামে যেতে বলেছে ফেলুদা।"
লালমোহনবাবু রীতিমতো অবাক হলেন। "বলো কি?", তিনি বললেন। "কি ভয়ঙ্কর। এদিকে আমিও গতকাল স্বপ্ন দেখেছি আনুবিস আর আমি একসাথে বসে চা খাচ্ছি। হঠাৎ পিছনে একটা বিকট আওয়াজ হলো, আর আমি চমকে উঠে বললাম, 'কেয়া হুয়া?'। তখন আনুবিস জবাব দিলো 'হুক্কা হুয়া', আর আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো। কে জানে, এটা আনুবিস চুরির একটা ইনশিউটন কিনা।"
আমি এতোই বিরক্ত হলাম যে আসল কথাটা যে ইনট্যুইশন, সেটা আর বললাম না। "সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে পরুন", আমি বললাম। "আমি তৈরি হয়েই থাকছি। ফেলুদা মিউসিয়ামেই আছে।"
"কামিং সুন" বলে জটায়ু ফোন রেখে দিলেন, আর আমি হুড়মুড় করে স্নান করতে গেলাম। তারপর গোগ্রাসে পাঁউরুটি আর ডিমসেদ্ধ খাচ্ছি, এমন সময়ে সামনের রাস্তা থেকে সবুজ এম্ব্যাসাডরের মার্কামারা হর্ন শুনতে পেলাম। অর্থাৎ জটায়ুর বাহনচালক হরিপদবাবু গড়পার ট্যু রজনী সেন রোডের দূরত্ব আজকে ফরমুলা ওয়ানের গতিতেই পার করেছেন। আমি মনে মনে লালমোহনবাবুকে ক্ষমা করে দিলাম।
৪.
দুদ্দাড় করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে আমার সময় লাগলো আঠাশ সেকেন্ড। আরেকটু বেশিই লাগতো, কিন্তু শেষের তিনটে সিঁড়ি স্লাইড করাতে আমি একটু জোরেই ভূমিষ্ঠ হলাম। শুদ্ধু বাংলায় লিখলাম যদিও, আসল মানে কিন্তু পপাত চ। তারপর উঠে একটু খুঁড়িয়েই গাড়িতে গিয়ে উঠলাম।
"লিম্পিং হোয়াই, ভাই তপেশ?", তাঁর অননুকরণীয় ভঙ্গিতে প্রশ্ন করলেন লালমোহনবাবু। আমি ওঁর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে হরিপদবাবুকে বললাম, "ল্যান্ডসডাউন রোডে চলুন, জলদি।" ক্যালকাটা এনশেন্ট হিস্টরি মিউসিয়াম'টা ওখানেই কিনা।
মিউসিয়ামে পৌঁছাতে চল্লিশ মিনিট লাগলো। আমরা যখন ভিতরে ঢুকলাম তখন ফেলুদার টেলিফোনের পর প্রায় দু ঘন্টা কেটে গেছে। দোতলায় উঠে দেখলাম আবহাওয়া থমথমে। যে ঘরে আনুবিস আর আরও অন্যান্য পুরনো জিনিস সাজানো ছিলো, তার সামনে পুলিশের পাহারা।
পুলিশ দেখলেই লালমোহনবাবু আবার হিন্দি বলতে থাকেন, কে জানে কেন? "হামলোগ প্রদোষ মিত্তির'কা আদমি হ্যায়", গম্ভীর গলায় বললেন তিনি।
পুলিশ কন্সটেবলের নাম বিনয় দাস, তাঁর উর্দিতেই নেমপ্লেটে লেখা ছিলো। তিনি একগাল হেসে বললেন " বাংলায় বললেও বুঝতাম স্যার। তাছাড়া আপনাকে কে না চেনে। আমার ছেলে আপনার লেখার খুব ভক্ত - হন্ডুরাসে হাহাকার আর বোর্নিও'র বিভীষিকা যে কতবার পড়েছে তার ইয়ত্তা নেই।"
লালমোহনবাবু খুব খুশি হলেন, কিন্তু তাঁর হাসি হাসি মুখটা ঘরে ঢুকেই মিলিয়ে গেলো। সেখানে ফেলুদা আর একজন পুলিশ ইন্সপেক্টর ছাড়াও আরেকজন লোক খুব গম্ভীর মুখে কি সব আলোচনা করছে।
ইন্সপেক্টরের রীতিমতো পেটানো শরীর, আর বেশ বয়স্ক - পঁয়তাল্লিশ পঞ্চাশ হবে। বাঙালিদের মধ্যে এমন চেহারা বড়ো একটা দেখা যায় না। চোখে একটু ঘোলাটে কাচের চশমা।
অন্য ভদ্রলোকের স্যুটের কাটিং আর ফিটিং, হাতে সোনার আংটি, পায়ে দামী জুতো আর কথা বলার আদবকায়দা দেখে আন্দাজ করলাম ইনিই বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালা। লম্বায় প্রায় ফেলুদারই সমান, যদিও একটু ভারী চেহারা, আর মাথার চুলটা পাতলা হতে শুরু করেছে। বয়স বছর চল্লিশেক হবে হয়তো। আমাদের দেখে একটা কাষ্ঠ হাসি হাসলেন, কিন্তু বুঝলাম একটুও হাসির মেজাজ নেই ওঁর।
৫.
"আয় তোপসে। আসুন লালমোহনবাবু। আলাপ করিয়ে দিই।", বললো ফেলুদা। "লালবাজার থেকে ইন্সপেক্টর প্রমথেশ লাহিড়ী আর মিউসিয়ামের মালিক এবং চীফ ক্যুরেটর মিস্টার বিষ্ণু ঝুনঝুলওয়ালা। আর এরা আমার ভাইপো তপেশরঞ্জন আর বন্ধু শ্রী লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু।"
জটায়ু নামটা শুনে বিনয় দাসের মতো কিন্তু প্রমথেশ লাহিড়ী বা বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালার মধ্যে কোনও উচ্ছাস দেখা গেলো না। হয় ওঁরা বাংলা রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাস পড়েন না বা উপস্থিত সমস্যার কারণে অন্যমনস্ক হয়ে আছেন। জটায়ু একটু মুষড়ে পড়লেন।
আলোচনা থেকে বুঝলাম, গভীর রাতে মিউসিয়ামে চোর ঢোকে। যে সে চোর নয়। সে বা তারা নাকি সব ক্লোসড সার্কিট ক্যামেরা বিকল করে দিয়ে, ঘুম পাড়ানি গ্যাসের প্রভাবে রাতের পাহারাদার'দেরও অচেতন করে। মানে চোর রীতিমতো তুখোড়।
এই ভাবনা যে নিছক কল্পনা নয়, তার প্রমাণস্বরূপ যে কাচের শো-কেসে আনুবিসের মূর্তি রাখা ছিলো, চোর সেখানে একটা কাগজ রেখে গেছে। সাধারণ কাগজ না, আসলে প্যাপাইরাস, মিশরের নীল নদের reeds দিয়ে তৈরি কাগজ যা হাজার হাজার বছর আগেও ব্যবহৃত হতো।
লেখাটাও পুরনো মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফস, মানে ছবি দিয়ে লেখা। প্যাপাইরাসটা ইন্সপেক্টর লাহিড়ী তাঁর গ্লাভস পরা হাতে ধরে আছেন, যাতে চোরের আঙুলের ছাপ যদি থেকে থাকে তাহলে সেটা নষ্ট হবে না। আমার কিন্তু মনে হলো এই সাবধানতা অনর্থক। যে চোর এতো চৌখষ, সে কি আর বোকামি করে হাতের ছাপ রেখে যাবে?
"হিয়েরোগ্লিফসগুলোই চিন্তার কারণ, জানিস তোপসে?" বললো ফেলুদা। "মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা ব্যবসায়ী হলেও প্রাচীন ইতিহাস নিয়ে ওঁর অগাধ জ্ঞান। সেইজন্যই তো মিউসিয়াম'টা বানিয়েছেন। উনিই অনুবাদ করে দিলেন। কথাগুলোর অর্থ কি, আপনি নিজের মুখেই আরেকবার বলে দিন, মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা।"
"ওবোশ্যোই, ওবোশ্যোই", বললেন ঝুনঝুনওয়ালা। "এর মানে হলো আনুবিস কারো মকানে থাকে না। তার অসলি জায়গা হলো মিশরের মন্দির। সেখানেই সে যাচ্ছে। আর যারা আনুবিস'কে চোরি করেছিলো, আনুবিসের অভিশাপে তাদের সোর্বনাশ হবে।"
৬.
লালমোহনবাবু আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। কই, এই অভিশাপের কথা তো ফোনে বলেনি ফেলুদা। অবশ্য এটা অভিশাপ না সোজাসুজি হুমকি বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া আনুবিস'কে তো ফেলুদা চুরি করেনি, পারিশ্রমিক হিসাবেই নিয়েছিলো। যাই হোক না কেন, আমাকে ফোন করে মিউসিয়ামে আসতে বলার সময়ে ফেলুদা এতবড়ো খবরটা স্রেফ চেপে গেছিলো কেন? আমি চিন্তা করবো বলে?
লালমোহনবাবু যেটাকে ইনশিউয়ন বলেছিলেন, সেই 'ইনট্যুইশন বা কোন অজানা ব্যাপার আন্দাজ করার বোধশক্তি ফেলুদা’র মধ্যে ভীষণভাবে বর্তমান। আমরা যখন জয়লসলমীর গেছিলাম, তখন আমিও আন্দাজে ঢিল ছুড়ে বলেছিলাম যে ফেলুদা কেসটা নেবেই। সেটা ছিলো টেলিপ্যাথি, এও প্রায় তাই। তবে টেলিপ্যাথি থাকে মনোবিজ্ঞানের গভীরে, আর ইনট্যুইশন হলো বুদ্ধি, বিবেচনা আর পর্যবেক্ষণ শক্তির সংমিশ্রণ।
সেই ইনট্যুইশনে ভর করে ফেলুদা বললো, "তুই নিশ্চই ভাবছিস আমি এ কথা তোকে ফোনে বলিনি কেন। আসলে মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা চুরির খবর পান ভোর রাতে, পাহাদারদের মধ্যে একজন জ্ঞান ফিরে পেয়ে তাঁকে ফোন করলে। তিনি তখন এয়ারপোর্টে ছিলেন, তাঁর এক আত্মীয়া বিদেশে যাচ্ছিলেন, তাঁকে সী অফ করতে। ভদ্রমহিলা এই প্রথম একা যাত্রা করছিলেন, তাই তিনি প্লেনে ওঠা অবধি মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা এয়ারপোর্টের বাইরেই অপেক্ষা করছিলেন। সেখান থেকেই আমাকে ফোন করেন, তাই আমি তাঁর আগেই মিউসিয়ামে পৌঁছে যাই। মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা এসেছেন মাত্র মিনিট কুড়ি হবে। তারপরেই উনি হিয়েরোগ্লিফস'টার অর্থ উদ্ধার করে আমাদের বলেন।"
আমার মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। ঝুনঝুনওয়ালাই ফেলুদা’র থেকে আনুবিসের মূর্তি চেয়ে নিলো, তার মিউসিয়াম থেকেই চুরি হলো, কেউ সেই মিউসিয়ামের ক্লোসড সার্কিট ক্যামেরাও বিকল করে দিলো, আবার ঠিক চুরির পরেই ঝুনঝুনওয়ালা এয়ারপোর্টে গেলো। এগুলোকে এক সুতোয় গাঁথলে তো মনে হতেই পারে যে মিউসিয়ামের বড়কর্তা ঝুনঝুনওয়ালাই চোর, আর হয়তো সে ইতিমধ্যেই আনুবিস'কে বিদেশে পাচার করে দিয়েছে।
লালমোহনবাবুর'ও বোধকরি একই মনোভাব। প্রায় আমার কানের মধ্যে ঢুকে গিয়ে তিনি ফিসফিস করে বললেন, "হাইলি সাসপিচিয়াস"। আমি খুব বিরক্ত হলাম। একে তো আনুবিস কোথায় কেউ জানে না, তার উপর মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা তো আর রাজস্থানের ট্রেনে বসা দেহাতী পোশাক পরা লোক নন, যে ইংরেজি বুঝবেন না। (যদিও তখন উনি জানতেন না সেই দেহাতী পোশাক পরা লোকটাই ডাক্তার হাজরা।) আমি হাল্লার মন্ত্রীমশাইয়ের মতো রেগে গেলেও খুব নীচু গলাতেই বললাম, "ফিসফিস করছেন কেন? কানে বাতাস লাগে জানেন না?" উনি চুপসে গিয়ে "সরি, সরি" বলে একটু সরে গেলেন।
৭.
মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালাকে খুব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগলাম আমি। সন্দেহজনক কিছুই চোখে পড়লো না। চুরি আর ওঁর মিউসিয়ামের গাফিলতির অপরাধে ওঁকে যথেষ্ট লজ্জিত আর বিব্রত মনে হলো। বার বার উনি বলছেন, " ডোন্ট ওয়ারি মিস্টার মিত্তির, হামি আপনার নুকসাম পুরা করে দিবো। কতো দাম হবে আনুবিসের মূর্তির? পচাস হাজারের বেশি কি? আমি আখুনি আপনাকে চেক লিখে দিচ্ছি।"
এবার আমি অবাক হলাম। আনুবিসের মূর্তির দাম বড়জোর দশ হাজার হবে। উনি যদি তার পাঁচগুন দিতে চান তাহলে তো ওঁকে চোর ভাবা যায় না। তাছাড়া স্পষ্টতই মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা অত্যন্ত ধনি। না হলে কেউ নিজের মিউসিয়াম খুলতে পারে? জটায়ুও কিছু বুঝতে পারছেন না। আমার হাতে একটা জম্পেশ চিমটি কেটে তিনি বললেন "কি হচ্ছে আন্ডারস্ট্যান্ডিং কি, তপেশ?" আমি ঘাড় নেড়ে "না" বোঝালাম।
ফেলুদা কিন্তু বেশ শক্ত আছে। মূর্তি চুরি আর হুমকি বা অভিশাপের চিঠিও ওকে টলাতে পারেনি। "না না, আপনি দেবেন কেন, মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা?", ও বললো। "আমার মূর্তি ইনসিওর করানোই ছিলো। ইন্সপেক্টর লাহিড়ী যদি চুরির রিপোর্ট দেন তাহলে টাকা আমি এমনিতেই পেয়ে যাব। কিন্তু প্রশ্ন সেখানে নয়। মানছি যে মূর্তিটা দুর্লভ, কিন্তু তেমন দুষ্প্রাপ্যও নয় যে কোনও বড় মাপের চোর এর পিছনে ধাওয়া করবে। আর অভিশাপের চিঠিটারই বা কি প্রয়োজন? চোর তো বিনা বাক্যব্যয়েই চুরিটা সারতে পারতো। এসবের মানে কি? আপনার কি মনে হয়, ইন্সপেক্টর?"
এতোক্ষণ ইন্সপেক্টর কলের পুতুলের মতোই দাঁড়িয়ে ছিলেন, এবার কথা বলার সুযোগ পেয়ে বেশ খুশি হলেন। "আমার মনে হয় চিঠিটা ভাঁওতা, মিস্টার মিত্তির।", উনি বললেন। "আনুবিসের কি খেয়েদেয়ে কাজ নেই, যে অভিশাপ দিতে যাবে? চোরের আসল উদ্দেশ্য হয়তো আপনাকে ভয় দেখানো। এতোবছর গোয়েন্দাগিরি করছেন - আপনার শত্রু তো কম নেই।"
শত্রু বলতেই আমার মনে পড়ে গেলো মগনলাল মেঘরাজের কথা। এ তার কাজ নয় তো? কিন্তু তাই বা কি করে হবে? সে তো এখন বিদেশের জেলে। হয়তো মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে। তাহলে?
"যেতে দিন, এমন উড়ো চিঠিকে গুরুত্ব দিতে নেই", ফেলুদা বললো। ওকে বেশ নিরুদ্বিগ্নই মনে হলো। লালমোহনবাবু আগেও বলেছেন, এবারেও (আবার) ফিসফিস করেই বললেন, "নাঃ, তোমার দাদা'র নার্ভ টনিকের নামটা জানতেই হচ্ছে।"
৮.
সেদিন বিকেলে আমরা রজনী সেন রোডের বাড়িতে বসে আছি। লালমোহনবাবু আর নিজের বাড়ি জাননি। আমাদের মিউসিয়াম থেকে ফিরতে প্রায় দুপুর দেড়টা হলো বলে ফেলুদাই ওঁকে বললো খেয়ে যেতে। দুপুরের ম্যেনু ছিলো আলুভাজা, লাল শাক, মুগের ডাল আর আড় মাছের ঝোল। লালমোহনবাবু বাকি সব খেলেও, মাছ দেখে মুখ বেঁকিয়ে শিবরাম চক্রবর্তীর ঢঙে "ওটা আড় খাবো না" বলে ফেলুদার বাহবা পেলেন।
খাওয়ার পরে ওঁর একটু গড়িয়ে নেওয়ার অভ্যাস, এদিকে হরিপদবাবুও সেদিন হাফ ডে'র ছুটির আর্জি দিয়ে রেখেছিলেন আগের থেকেই। তাই ফেলুদা বললো ওই সন্ধ্যাবেলায় গাড়ি চালিয়ে লালমোহনবাবুকে বাড়ি পৌঁছে দেবে, তাই আমাদের বসার ঘরের মেঝেতেই একটা চাদর বিছিয়ে উনি সটান শুয়ে পড়লেন। আমি বলেছিলাম আমার খাটে শুতে, কারণ দুপুরে আমি শুই না, কিন্তু উনি মানলেন না। এখন নাকি ওঁর কষ্ট করার বয়স, তাই সেটাই নাকি উনি প্র্যাক্টিস করছেন। কিন্তু শোয়ায় কষ্ট করলেও তিনজনের আলুভাজা উনি একাই সাবাড় করেছেন, অর্থাৎ খাওয়াতে কষ্ট করার বয়স হয়তো ওঁর এখনও আসেনি।
আমি আমার ঘরে পুরনো টিনটিন গুলো পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু আনুবিসের কথা ভেবে পড়ায় মন বসলো না। প্রাচীন মিশর নিয়ে Cigars of the Pharaoh পড়ার চেষ্টা করছি, ফেলুদার হঠাৎ ঘরে উঁকি দিয়ে "একটু বেরোচ্ছি" বলে কোথায় যেন একটা চলে গেলো। আমি "কোথায় যাচ্ছ?" জিজ্ঞেস করেও কোনও উত্তর পেলাম না।
লালমোহনবাবু ঘন্টাখানেক নাক ডাকার পর ঘুম থেকে উঠে আমাদের বাড়ির ফোন থেকেই তাঁর প্রকাশকের সঙ্গে ধুন্ধুমার ঝগড়া করলেন। বুঝলাম উনি নতুন উপন্যাসের নাম এবারে রাখতে চান 'গিবরল্টারের গানপাউডার'। আমি গিয়ে হাঁ হাঁ করে তাঁকে থামালাম। জায়গাটার নাম ইংরেজিতে G দিয়ে শুরু হলেও নামের উচ্চারণ যে জিবরল্টার, সেটা উনি জানতেনই না। খুব মুশকিল হলো। বর্গীয় জ দিয়ে জুতসই কিছুই তিনি খুঁজে পেলেন না। 'জিবরল্টারের জিলিপি' বা 'জিবরল্টারে জুতোসেলাই' তো আর রহস্য রোমাঞ্চ উপন্যাসের নাম হতে পারে না, তাই মনমরা হয়ে তিনি আবার নতুন নামের কথা ভাবতে লাগলেন।
সাড়ে চারটে বেজে যেতে আমরা ঠিক করলাম ফেলুদা’র জন্য অপেক্ষা না করে চা'টা খেয়ে নেবো। চা এলো, আর সবে পাড়ার মিষ্টির দোকান থেকে কেনা কড়াপাক সন্দেশে কামড় বসিয়েছি, এমন সময়ে বড় রাস্তার দিকের জানলার কাচ ঝনঝন করে ভেঙে পড়লো। দেখলাম মেঝেতে একটা বড়সড় ঢিল পড়ে আছে। মানে সেই ঢিলটাই রাস্তা থেকে কেউ ছুঁড়েছে।
ঢিলটার সাথে একটা কাগজ বাঁধা। অবিকল সেই প্যাপাইরাসের মতোই, যা আমরা মিউসিয়ামে দেখেছিলাম। আমি উঠে গিয়ে সুতো ছিঁড়ে কাগজটা খুলে দেখলাম সেটাতেও সেই হিয়েরোগ্লিফস। তবে এবার শুধু একটাই ছবি। সেটা একটা scarab beetle, এক ধরনের বড়সড় গুবরে পোকা, হাজার হাজার বছর ধরে মিশরীয় সভ্যতায় যা মৃত্যুর প্রতীক। এটা আমি জানি কারণ আনুবিস মৃত্যুর দেবতা, আর তার সম্মন্ধে গবেষণা করে ফেলুদাই আমাকে বলেছে।
লালমোহনবাবু স্ক্যারাব বীটলের ব্যাপারে জানতেন না, কিন্তু কাচ ভাঙা, প্যাপাইরাস আর হিয়েরোগ্লিফস মিলিয়ে আন্দাজ করেছেন এও সেই অভিশাপের ব্যাপারেই কিছু হবে। গুবরে পোকার ছবিটা দেখে প্রথমে তিনি খুব হাসলেন। "তোমার দাদা বন্দুকের গুলিকে ভয় পায় না, তাকে পোকার ভয় দেখাচ্ছে? হাঃ হাঃ হাঃ!" বললেন তিনি। তারপর আমি ছবিটার আসল মানেটা বুঝিয়ে দিতেই ওঁর মুখ শুকিয়ে গেলো।
৯.
ফেলুদার ফিরতে সন্ধ্যা ছটা বেজে গেলো। ওকে স্ক্যারাব বীটলের লেখাটা দেখালাম। ভাঙা কাচটাও। তখন আর কাচ বদলানোর সময় নেই, তাই আমার বই মলাট দেওয়ার ব্রাউন পেপার আর সেলোটেপ দিয়েই ভাঙা জায়গাগুলো ঢাকা, সেটাও দেখলো ফেলুদা। "হুম, গুবরে পোকাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ব্রেজিলের বিচ্ছু হলে তাও চিন্তার কিছু থাকতো।" এতোদিন পরে হঠাৎ সেই লোকটার কথা ফেলুদার মনে পড়লো কেন কে জানে?
রাতের খাবারও আমাদের বাড়িতেই। আজকে পাড়ার মোড়ের নতুন ঢাবা 'খাই খাই' থেকে তড়কা আর রুটি এসেছে। তাই খেতে খেতে ফেলুদা বললো, "চুরিটাকে বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালা আর ইন্সপেক্টর লাহিড়ী যতো সহজে নিচ্ছে ততোটা কিন্তু নয়।"
"কেন, ফেলুদা? আমাদের আনুবিস তো আর আসল antique নয়। ওর দামই বা আর কতো হবে?", আমি বললাম।
"তুই জানিস না বটে, কিন্তু এই মূর্তিটা একটা চার হাজার বছরের আসল মিশরীয় মূর্তির replica, যাকে বলে identical copy. আর সেই সত্যিকারের antique মূর্তিটা মাস চারেক আগে কায়রোর মিউসিয়াম থেকে চুরি গেছে।"
"বলেন কি? হাইলি সাসপিশাস", খুব নাটুকে ঢঙে বললেন লালমোহনবাবু। "আপনি কি বলতে চান সেই মূর্তি চোরাবাজারে অনেক দামে বিক্রি হতে পারে? কিন্তু তার সঙ্গে আমাদের, থুড়ি আপনাদের আনুবিসের কি সম্পর্ক?"
"আমাদের আনুবিসই বলুন, ওটাই ঠিক। আপনার আর আমাদের মধ্যে বিভেদ কোথায়?", ফেলুদা বললো। "আর সম্পর্ক এই যে কোনও দুর্মূল্য শিল্পের নিদর্শন, যেমন নামকরা আর্টিস্টের পেইন্টিং বা প্রাচীন ভাস্কর্য চুরি গেলেই তাদের কপির চাহিদাও খুব বেড়ে যায়। এই কারণে যে তখন নকল'কেও আসল বলে অনেক দামে বিক্রি করা যায়।"
"কিন্তু যে কিনবে সে কি অতোই বোকা? আসল নকলের পার্থক্য না বুঝুক, কোনও বিশেষজ্ঞকে দিয়ে পরখ করাবে না?", আমি প্রশ্ন করলাম।
"আরে, এই তথাকথিত বিশেষজ্ঞদের অনেকেই তো এই চোরাকারবারে জড়িত। এরা নকল'কে আসল বলে দাবী করে, যার বিনিময়ে প্রচুর টাকাও পায়। অনেক সময়ে দেখা গেছে এরাই পালের গোদা।", ফেলুদা বুঝিয়ে দিলো।
"তাহলে আপনি আনুবিস'কে ধার দিলেন কেন? বরং ব্যাঙ্কের লকারে রেখে আসা উচিৎ ছিলো না কি?", জটায়ুর যথার্থ প্রশ্ন।
ফেলুদা একটা রহস্যময় চাহনি দিয়ে "কারণ আছে" বলে চুপ করে গেলো। আমি কিছুই বুঝলাম না। "কিন্তু অভিশাপের চিঠিটা?" বললাম আমি।
"ওটাই বুঝতে পারছি না রে। ওটা কেই বা লিখেছে, আর কেনো? তাছাড়া হিয়েরোগ্লিফস দিয়ে লেখা। তার মানে কি লেখক প্রাচীন মিশরীয় ভাষা শিখেছে, না কি কাউকে দিয়ে লিখিয়েছে? ধোঁয়ার কুন্ডলী।" এই বলে ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে নিজেই একটা বিরাট ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়লো।
১০.
ডিনারের পরেও বেশ কিছুক্ষণ মিশর আর অভিশাপ নিয়ে আলোচনা চললো। প্রাচীন মিশরে নাকি শত্রুদের অভিশাপ দেওয়াটা রীতিমতো দস্তুর ছিলো, ঠিক আমাদের দুর্বাসা মুনির মতো। বিশেষ করে মিশরের রাজা, অর্থাৎ Pharaoh'দের কবরে যারা হানা দিতো, তাদের উপর থাকতো ভয়ঙ্কর সব অভিশাপ। এগুলো কতোটা ফলতো কেউ জানে না, কিন্তু ১৯২২ সালে টুটেনখামেনের কবর আবিষ্কার করা দলের অনেক সদস্যরাই মারা যায় রহস্যময় ভাবে, আর সেই থেকে মানুষের মনে এই অভিশাপের গল্প আরও জাঁকিয়ে বসে।
ফেলুদা যদিও বললো সবই গাঁজাখুরি, কিন্তু আমার মনে হলো হতেও তো পারে। লালমোহনবাবুও বললেন যদি আনুবিস'কে ফিরে পাওয়া যায় তাহলে তিনি 'অভিশপ্ত আনুবিস' নামে একটা উপন্যাস লিখবেন। ফেলুদার চোখ রাঙানিতে পরের মুহূর্তেই সেটা হয়ে গেলো 'মিশরের মরদেহ'।
সাড়ে নটার সময়ে ফেলুদা বললো "অনেক দেরী হয়ে গেলো। আপনি যাওয়ার জন্য রেডি তো? চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসি।" তারপর আমাকে বললো "তুই শুয়ে পড়িস। আমার আসতে দেরী হবে, কিন্তু আমার কাছে বাড়ির চাবি আছে, তাই চিন্তা নেই।"
ফেলুদা’র কথামতো আমি শুতে গেলাম। টেলিভিশনে The Mummy বলে একটা সিনেমা দেখাচ্ছিলো, সেটা কিছুটা দেখলাম। তাতে আবার স্ক্যারাব বীটল'ও ছিলো, তাই মনটা আরও অস্থির হয়ে গেলো। ভাগ্যিস সারাদিন তেমন বিশ্রাম হয়নি, তাই কিছুক্ষণে ঘুম এসে গেলো। ঘুম ভাঙলো সদর দরজা ধাক্কানোতে আর কলিং বেলের আওয়াজে।
১১.
চোখ কচলে ফেলুদার ঘরে গেলাম। সাধারণত ও খুব ভোরে ওঠে। তাহলে ও কেন দরজা খোলেনি? দেখলাম ঘর খালি, বিছানাও পাট পাট করা। তাহলে কি ফেলুদা রাতে বাড়ি ফেরেনি?
তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুললাম। দরজার বাইরে ইন্সপেক্টর লাহিড়ী আর লালমোহনবাবু। দুজনেই হাঁপাচ্ছেন।
"সর্বনাশ হয়েছে, ভাই তপেশ। তোমার দাদাকে পাওয়া যাচ্ছে না।", কাঁদো কাঁদো গলায় বললেন লালমোহনবাবু।
আমি চমকে উঠলাম। উনি বলেন কি? ফেলুদা নিরুদ্দেশ?
লালমোহনবাবু বলে চললেন - "আমার বাড়ির থেকে ফেরার সময়ে ট্যাক্সি পাচ্ছিলেন না বলে ফেলুবাবু আবার আমার গাড়িটা নিয়েই বেরোন। রাত তখন প্রায় এগারোটা। তারপর আজ ভোরে ইন্সপেক্টর লাহিড়ী আমাকে ফোন করে বলেন যে খিদিরপুর ডকের সামনে আমার সবুজ এম্ব্যাসাডর পড়ে আছে। শুনে আমি তো হতবাক। তারপর উনি প্রশ্ন করেন আমি গাড়ি চালাচ্ছিলাম কিনা। আমি বললাম আমি গাড়ি চালাতেই পারি না, তোমার দাদাই গাড়ি নিয়ে গেছিলেন। কিন্তু এখন কোথায় ইন্সপেক্টর লাহিড়ী জানেন না, আমিও না। দুজনেই বিপদের গন্ধ পেয়ে তাই তোমাদের বাড়িতে ছুটে এসেছি।"
"উনি কি বাড়ি ফিরেছেন?" এবার জিজ্ঞেস করলেন ইন্সপেক্টর লাহিড়ী। "তোমাদের বাড়িতে ফোন করেছিলাম, কিন্তু ফোন খারাপ। তাই আমিও থানা থেকে রওনা দিলাম, আর লালমোহনবাবু বললেন উনিও আসবেন। কাকতালীয় ভাবে দুজনেই প্রায় একইসঙ্গে পৌঁছেছি।"
আমি আরও অবাক। আমাদের ফোন খারাপ? কিন্তু গতকালই তো ফেলুদার সাথে ফোনে কথা হলো। তাহলে?
১২.
ফেলুদার কোনও খবর পেলেই যেন তখুনি তাঁকে জানাই, এই বলে বিদায় নিলেন ইন্সপেক্টর লাহিড়ী। লালমোহনবাবু আমার আর ফেলুদার জন্য বিশেষ চিন্তিত, তিনি থেকে গেলেন।
"কি ব্যাপার বলো তো তপেশ? তোমার দাদা গেলেন কোথায়? অভিশাপটা ফলে যায়নি তো?", তিনি বললেন।
আমি কি বলবো ভাবছি, এর মধ্যে ফোন বেজে উঠলো। আমি চমকে উঠলাম। লালমোহনবাবুও। "তবে যে বললেন ফোন খারাপ?" আমি বললাম।
"আমি যখন ফোন করেছিলাম তখন তো তাই ছিলো। এই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ'ও যা করে না, কি বলবো?", বিরক্ত স্বরে বলে নিজেই গিয়ে ফোন তুললেন লালমোহনবাবু।
কিছুক্ষণ চুপ করে শুনে তারপরে মুখ চূণ করে ফোন রাখলেন। বোঝাই যাচ্ছে খুব ভয় পেয়েছেন। "কে ফোন করেছিলো বলো তো? ভূ ভূ ভূ...", ভয়ে তিনি তোতলাতে শুরু করলেন।
"ভূত ফোন করেছিলো? কি যে বলেন না আপনি!", আমি বিরক্ত হয়ে বললাম।
"ভুত নয়, ভূপর্যটক। ম-মন্দার বোস।", কোনমতে বললেন জটায়ু।
মন্দার বোস! ইনি বলেন কি? সে তো সেই কোনকালেই ট্রেন থেকে পড়ে গেছিলো। আমি তো ভেবেছিলাম সেই দুর্ধর্ষ দুশমনের ভবলীলা সেদিনই সাঙ্গ হয়েছিলো। কিন্তু সে কি সত্যি বেঁচে আছে? তাহলে বলতে হয় লক্ষণের শক্তিশেলে রাওচন্দ্রের দেখা স্বপ্ন সত্ত্বেও রাবণব্যাটা যেমন মরেনি, রাবণের মতো এর জান'ও তাহলে খুব কড়া।
"যাঃ, কি যে বলেন।", আমি বললাম। "নির্ঘাৎ কেউ ভাঁওতা দিচ্ছে।"
"ভাঁওতা নয়, তপেশ ভাই", বললেন জটায়ু। "আনসেফটি রেজর, রাজস্থানে রক্তপাত, সাহারায় সীতাহরণ, জাতিস্মর, নাহারগড় কেল্লা, সব মনে করিয়ে দিলো লোকটা। মন্দার বোস ছাড়া কেই বা এসব জানবে? ওই নাকি তোমার দাদাকে কাল রাতে অপহরণ করেছে। আমাকে বললো খবরদার যেন পুলিশে খবর না দিই। তাহলেই নাকি খেল খতম।"
"বলেন কি?" আমি বললাম। "তাহলে আমাদের এখন কি করণীয়?" লালমোহনবাবু থম হয়ে বসে থাকলেন। কোনও কথাই ওঁর মুখ দিয়ে বেরলো না।
এমন অবস্থায় কখনও পড়িনি। এর আগে আমি আর লালমোহনবাবু অপহৃত হয়েছি, কিন্তু আমাদের আশা মতো ফেলুদাই আমাদের উদ্ধার করেছে। আর এবার ফেলুদার জীবন বিপন্ন, তাও আবার খাস কলকাতায়, কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারছি না। ইন্সপেক্টর লাহিড়ীকে খবর দেবো কি? কিন্তু তাতে হিতে বিপরীত হয় যদি?
হঠাৎ দরজার কলিং বেল বেজে উঠলো। দরজার ফুটো দিয়ে বাইরে দেখলাম একটা ছোট ছেলে দাঁড়িয়ে। কে জানে কি দরকার? আমি দরজা খুললাম আর অমনি পেটে বিরাশি সিক্কার একটা ঘুঁষিতে ধরাশায়ী হলাম। আমি মাটিতে পড়ামাত্র ছেলেটা আমার কাঁধে একটা রদ্দা মারলো, তারপর আর কিছু আমার মনে নেই।
১৩.
শেখ আসলাম -
আলিপুরের বনেদি পাড়ার পাঁচতারা হোটেলের সুদৃশ্য স্যুইটের দরজা খুলে দাঁড়ালেন আরব দেশ থেকে আসা ধনকুবের শেখ আসলাম। লবিতে দুজন দাঁড়িয়ে।
"আসুন, মিস্টার বোস", ইংরেজিতে বললেন শেখ। "আপনার সঙ্গে ইনি কে? জিনিসটা কি এঁর কাছেই আছে?"
"আজ্ঞে হ্যাঁ", উত্তর দিলেন বোস নামক ব্যক্তি। "ইনি মিস্টার সান্যাল। এঁর সঙ্গেই লেনদেন হবে।"
"ভিতরে আসুন", বললেন শেখ। "নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন দুজন।
"জিনিসটা দেখান, মিস্টার সান্যাল।", সোফায় বসে বললেন শেখ। "জেনুইন কিনা যাচাই করার লোক আছে আমার। তাকেও আসতে বলেছি। সে এসে পড়লো বলে।
পকেট থেকে জিনিসটা বার করে শেখের হাতে দিলেন সান্যাল।
" বেশ, বেশ", খুশি হয়ে বললেন শেখ আসলাম। "আমার জহুরি যতক্ষণ না আসছে ততক্ষণ কিছু খানাপিনা হোক না হয়। আপনার হুইস্কি চলে তো?"
"আমি ড্রিঙ্ক করি না, স্যার", বললেন স্যান্যাল। "আমিও না", সায় দিলেন বোস।
শেখ আসলামের ভুরু কুঁচকে গেলো। বোসের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "কিন্তু আমার যে ইন্ডিয়ান কন্ট্যাক্ট আপনার আর সান্যালের সাথে দেখা করে আমাকে জানিয়েছিলো, সে বলেছিলো আপনারা খুব ড্রিঙ্ক করেন। ঠিক আছে, আপনাদের জন্য মিনি-বার থেকে সফট ড্রিঙ্ক দিচ্ছি।"
বোস বা সান্যাল কিছু বলার আগেই দরজায় টোকা পড়লো। "নিশ্চই আপনার জহুরি এসেছে", বললো বোস। "আপনি বসুন, আমি দেখছি।"
দরজা খুলতেই শেখ আসলামের চেনা জহুরি ঘরে ঢুকে জিনিসটা পরখ করলো। সব দেখেঠেকে "একদম সাচ্চা মাল" বললো সে।
"আপনারা বসুন, আমি ক্যাশ নিয়ে আসছি।" বলে শোয়ার ঘরে গেলেন শেখ আসলাম। সান্যাল আর বোস একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
১৪.
তোপসের কথা -
জ্ঞান ফিরলো যখন, দেখি আমার হাত-পা বাঁধা, আর আমি মাটিতে শুয়ে আছি। বাঁ পাশে ফিরে দেখি লালমোহনবাবুর'ও একই অবস্থা, যদিও আমার মতো তখনও তাঁর জ্ঞান ফেরেনি। তিনি অজ্ঞান অবস্থাতেই "উঃ আঃ" করছেন - নির্ঘাৎ কোনও দুঃস্বপ্ন দেখছেন।
কিছুক্ষণে তাঁর জ্ঞান ফিরলো। ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, "এ কি হলো, তপেশ? কে এমন করেছে? কেনোই বা? আমরা কোথায়?"
"আমিই বলি না হয়।" একটা চেনা কণ্ঠস্বর কানে এলো।
আমাদের যেদিকে মুখ, ঘরের দরজা তার পিছন দিকে। যে এই কথাগুলো বললো এবারে সে আমাদের চোখের সামনে এসে দাঁড়ালো। প্রমথেশ লাহিড়ী। কিন্তু এখন আর সে পুলিশের বেশে নেই। তার গায়ে এখন কালো জামা, কালো জ্যাকেট, কালো প্যান্ট আর কালো জুতো। লাহিড়ী কি তাহলে পুলিশ নয়? কিন্তু মিউসিয়ামে তো পুলিশে ছয়লাপ ছিলো, সেও তো ছিলো তাদের মধ্যে? তাহলে?
এদের ছাড়া আরো দুজন ঘরে ঢুকলো। এদের একজন সেই ছোট ছেলেটা, যে আমাকে অজ্ঞান করেছিলো। আগে তার মুখটা ভালো করে দেখিনি, এখন দেখলাম। আট দশ বছরের ছেলের মতো জামা আর হাফ প্যান্ট পরলেও আসলে সে একজন রীতিমতো শক্তিশালী বামন, অর্থাৎ dwarf. আর তার সাথে, এই বামনকেই অন্যদের প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহ থেকে চুরি করাতেন যে ব্যক্তি, সেই নীলমণি সান্যাল।
নীলমণি সান্যাল এবার মুখ খুললেন। "তোমার দাদা কোথায়, বলো তো তপেশরঞ্জন। আর আনুবিসই বা কোথায়?"
"ফেলুদা কোথায় আমি জানি না। মন্দার বোস বলে একজন ক্রিমিনাল ওঁকে কিডন্যাপ করেছে। সেই ফোন করে জানিয়েছে আমাদের। আর আনুবিস কোথায় আমি জানি না। জানবো কি করে?", আমি বললাম।
"মিথ্য কথা!", চেঁচিয়ে উঠলো প্রমথেশ লাহিড়ী। "কে বললো আমি কিডন্যাপ করেছি? ব্যাটা নির্ঘাৎ নিজেই কোথাও লুকিয়ে আছে আর আমার নামে দোষ দিচ্ছে।"
অবাক কান্ড! আমি তো মন্দার বোসের নাম বলেছি। লাহিড়ী নিজেকে মন্দার বোস ভাবছে নাকি? আর ফেলুদাই বা তাহলে কোথায়? মন্দার বোসের কবলে যদি না পড়ে থাকে, তাহলে ফোনটা করলো কে? আর কেনই বা করলো?
কি জটায়ু-জি, চিনতে পারছেন?" এবার ক্রুর হাসি হেসে লাহিড়ী লালমোহনবাবুকে বললো। "আজ আমার হাতে আপনার কুকরি'টা নেই, কিন্তু এটা আছে। চালাবো নাকি?" লাহিড়ীর হাতে পিস্তল। পুলিশের পিস্তলই হবে হয়তো। তার গলার স্বরও এখন পাল্টে গেছে। এ সেই স্বর, যার পরিচয় আমরা যোধপুরের সার্কিট হাউসে প্রথম পাই। চোখের ধুসর কাচের চশমাটাও এবার খুলে ফেললো সে, আর এই প্রথম সরাসরি তার চোখ দেখলাম। এমন বাজপাখির মতো চোখ শুধু একজনেরই আছে। মন্দার বোস।
প্রমথেশ লাহিড়ী আর মন্দার বোস তাহলে একই লোক। কিন্তু দেখতে তো এক নয়।
তাহলে কি...
"ঠিক ধরেছো, প্লাস্টিক সার্জারি।", আমার মুখের ভাব লক্ষ্য করে হেসে উঠলো লাহিড়ী-রূপী মন্দার বোস। "ট্রেন থেকে পড়ে গিয়ে আমার মুখ ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিলো। সেই ভয়াবহ মুখ ভাঙিয়েই বছরকয়েক সার্কাসে খেল দেখাই। তারপর মাসকয়েক আগে মিস্টার সান্যাল আমাকে চিঠি লেখেন। সার্জারির খরচটা উনিই দেন। আমার মতো ওঁর'ও তো একটা পুরনো হিসাব আছে টিকটিকির সঙ্গে।", বললো সেই বছর পাঁচেক আগে যাকে শেষ দেখেছি, সেই ভবানন্দের চেলা মন্দার বোস।
মন্দার বোস এবার লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বললো - "এই যে রহস্য রোমাঞ্চ বাবু, সাহারায় সীতাহরণ তো হলো না, কিন্তু কলকাতায় জটায়ুবধ'টা হবে নাকি? আনুবিস কোথায় বলুন, নাহলে এই দেখছেন তো?" পিস্তলের নলটা প্রায় লালমোহনবাবুর নাকের সামতেই নাচতে লাগলো।
ফেলুদার থেকে শিখেছি বিপদের সময়ে মাথা ঠান্ডা রাখতে। "আনুবিস কোথায় আমরা জানবো কি করে? সে তো চুরি গেছে। আপনি তো জানেন, মিস্টার বোস। ইন্সপেক্টর সেজে আপনিও তো ছিলেন মিউসিয়ামে।" আমি বললাম।
"মিথ্যে কথা", গর্জে উঠলো নীলমণি সান্যাল। "আমি নিজেই সেই রাতে গেছিলাম মিউসিয়ামে। ক্যামেরা বন্ধ করি আমিই, পাহারাদারদের অজ্ঞানও করি ঘুমপাড়ানি গ্যাস দিয়ে। কিন্তু আনুবিস তো ছিলো না সেখানে। শুধু ছিলো সেই হিয়েরোগ্লিফস'য়ের চিঠি। তার মানে আনুবিস'কে আগেই গায়েব করা হয়েছে। আর পাহারাদারদের সামনে দিয়েই যখন আনুবিস চুরি হয়েছে, তার মানে ফেলু মিত্তির ছাড়া আর কেই বা সেটা নেবে?"
আমি অবাক। লালমোহনবাবুও। "কিন্তু ওটা তো মিস্টার মিত্তিরেরই জিনিস, উনিই বা চুরি করবেন কেন? কি আশ্চর্য্য।" এতোক্ষণে একটু গলার আওয়াজ ফিরে পেয়েছেন তিনি।
"কারণ উনি যেটা জোর করে আমার থেকে হাতিয়েছিলেন সেটা ছিলো নকল, আর মিউজিয়াম থেকে যেটা চুরি করেছেন সেটা আসল, মিশরের মিউসিয়াম থেকে চুরি যাওয়া antique. যার দাম দশ লক্ষ ডলার। যার বিদেশি খরিদ্দার আমার জন্য অপেক্ষা করছে। এর বেশি কিছু জানার প্রয়োজন নেই আপনার। এবার বলুন তো, আনুবিস কোথায়?"
আমার মাথা ঘুরছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। ফেলুদা চোর? আসল আনুবিসের মূর্তি? দশ লক্ষ ডলার? বলে কি?
"কে জানে?", সেই মাথা ঘোরা অবস্থাতেই আমি বললাম। "ফেলুদাই যদি নিয়ে থাকে, হয়তো আমাদের বাড়িতেই কোথাও লোকানো আছে।"
আমার কথায় তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো নীলমণি সান্যালের বামন সাকরেদ। সেই তেড়ে এলো আমার দিকে। "বল কোথায় আছে আনুবিস। তোদের বাড়ি লণ্ডভণ্ড করেও আমি খুঁজে পাইনি।"
"আর কতো সময় নষ্ট করবেন বলুন তো? এদিকে শেখ সাহেব তো এসে পড়লেন বলে। মাল না দিতে পারলে কি হবে জানেন?" এবার মুখ খুললো মন্দার বোস। "ব্যাটারা এখানেই আটকে থাকুক আপাতত। শেখের কাছে কিছুটা সময় চেয়ে নিয়ে আমরা বরং টিকটিকির খোঁজ করি। কথায় বলে কান টানলে মাথা নড়ে। একবার মিত্তিরকে যদি জানানো যায় ওর বন্ধু আর ভাইপো আমাদের কাছে তাহলেই বাপধন সুড়সুড় করে চলে আসবে।"
"তাই চলুন", বললো সান্যাল।
১৫.
আমাদের ঘরে হাত পা বাঁধা অবস্থাতেই বন্ধ রেখে বেরিয়ে গেলো সবাই। হাতে ঘড়ি নেই, ঘরে কোনও জানলাও নেই বলে দিন না রাত বোঝা মুশকিল। শুধু একটা ইলেক্ট্রিক আলো জ্বলছে।
চোখ বুজেই বসে আছি। সব চুপচাপ। মাঝে শুধু লালমোহনবাবু কাঁপা কাঁপা গলায় 'বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা' কবিতাটা আবৃত্তি করতে গিয়ে প্রায় কেঁদেই ফেলেছিলেন, আর তারপর প্রতিজ্ঞা করেন যে যদি ছাড়া পান তাহলে অভিশাপ কাটাতে অন্তত সাতটা মন্দিরে পুজো দেবেন। আমি ভেবেছিলাম বলবো যে মিশরীয় দেবতার দেওয়া অভিশাপ হয়তো ভারতীয় দেবতা'রা নাও কাটাতে পারেন, কিন্তু ওঁর মনের অবস্থার কথা ভেবে কিছু বললাম না।
কতো ঘন্টা পেরলো কে জানে? অনেকক্ষণ কিছু খাওয়াও হয়নি। প্রায় ঝিমুনি এসেছে, এমন সময়ে খুট করে আওয়াজ হলো। দরজা খোলা হচ্ছে। কে আবার এলো? সান্যাল না মন্দার বোস?
দরজা খুলে ঢুকে এলো এক আরব শেখ। তার চাপ দাড়ি, চোখে কালো চশমা, গায়ে আরবি পোশাক। সে এসে আমাদের হাত আর পায়ের বাঁধন কাটতে লাগলো। আমি কিছু বলতে যাওয়াতে সে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বোঝালো এখন নয়, পরে কথা হবে। বুঝলাম আমাদের তাড়াতাড়ি মুক্ত করতে চায় লোকটা।
লালমোহনবাবু মুক্তির আনন্দে আত্মহারা। "থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার। আসসেলাম আলেইকুম" বলে ফেললেন তিনি। "আলেইকুম আসসেলাম" বলে আরব শেখ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন, আর আমরা গেলাম পিছন পিছন।
ঘর থেকে বেরিয়ে বুঝলাম আমাদের যেখানে আটকে রেখেছিলো সেটা মাটির নীচে একটা চোরা কুঠুরি। সেইজন্যই কোনও জানলা নেই। একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে আমরা যেখানে উঠে এলাম সেটা একটা বাড়ি।
বাড়িটা চেনা চেনা মনে হলো। তারপর মনে পড়ে গেলো এটাই নীলমণি সান্যালের বাড়ি, যেখানে আমরা আগে এসেছি।
বসার ঘরে ঢুকলাম। দেখি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে মন্দার বোস আর নীলমণি সান্যাল। আর তাদের সামনে মন্দার বোসেরই পিস্তল তাগ করে রেখেছে নীলমণি সান্যালের সেই বামন সাকরেদ।
১৬.
নীলমণি সান্যালের বাড়িতে কিছুক্ষণে পুলিশ এলো, আর তাদের সঙ্গে ঢুকলেন বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালা। আরব শেখ ততক্ষণে নকল গোঁফদাড়ি আর চশমা খুলে ফেলেছে। ফেলুদাকে যে আরব বেশে এতো মানাতে পারে, তা আমি নিজে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না।
"আসুন, ইন্সপেক্টর সামন্ত", ফেলুদা বললো। "নীলমণি সান্যালের সাথে আপনার আলাপ নেই, কিন্তু পুরনো কেস ঘাঁটলেই ওঁর কথা জানতে পারবেন। আর এই ভদ্রলোক নিজেকে পুলিশ বলেন। দেখুন তো, চেনেন কিনা।"
ইন্সপেক্টর সামন্ত মন্দার বোসের দিকে তাকিয়ে বললেন "এঁকে জীবনেও দেখিনি। কে ইনি?"
"আমি বুঝিয়ে দিচ্ছি", বললো ফেলুদা। "তার আগে ঘরের চারিদিকে আপনার পুলিশদের সজাগ থাকতে বলুন, কেউ যাতে পালাতে না পারে। সবাই ঠিকঠাক বসেছেন তো? শুরু করি তবে।"
ফেলুদা বলে চললো -
"ঘটনার সূত্রপাত চারমাস আগে। খবরের কাগজে মিশরের আসল আনুবিসের মূর্তি চুরির কথা পড়ে আর ছবি দেখে আমি বুঝি যে আমার কাছে যে আনুবিস আছে তা এর হুবহু নকল। আমি ইন্টারপোলের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি যে মূর্তিটা উদ্ধার না হলেও কিন্তু চোর ধরা পরেছে।
কিন্তু শুধু চোর ধরলেই তো হবে না, মূর্তিটা ফিরে পেতে হবে, আর সেই চোরাই মাল কেনার জন্য যে খদ্দের জোগাড় হয়েছিলো, তাকেও ধরা যায়নি। সে যে কে, ইন্টারপোল তা জানলেও তাকে গ্রেফতার করার মতো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
সেই ব্যক্তির নাম শেখ আসলাম। ধনকুবের আরব। সে নাকি মাঝেমধ্যেই ভারতে বেড়াতে আসে, অন্যান্য অনেক আরবদের মতোই। তাকে ধরা গেলে তার মাধ্যমে আরও অনেক চোরাই মাল পাওয়া যেতে পারে, আবার সে যাদের থেকে এসব কেনে তাদেরও খোঁজ পাওয়া সম্ভব। তাই ইন্টারপোল একটা প্ল্যান করছিলো শেখ আসলাম'কে হাতে নাতে ধরার। আমিও তাতে সামিল হয়ে গেলাম। আপনি তো জানেনই, ইন্সপেক্টর সামন্ত, যে গত কয়েক বছরে একাধিক আন্তর্জাতিক কেস সমাধান করে ইন্টারপোলের সাথে আমার একটা বিশ্বাসের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।"
বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়লেন ইন্সপেক্টর সামন্ত। বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালায় নিঃশব্দে হাততালি দিয়ে ফেলুদাকে বাহবা জানালেন। আমার মনে হলো এই প্ল্যানে তিনিও হয়তো সামিল আছেন। দেখলাম আমার ভাবনাটা ঠিক। ফেলুদা বলতে লাগলো -
"আমিই ইন্টারপোলকে বললাম, শেখ আসলাম'কে যদি কলকাতায় টেনে এনে চোরাই মাল কেনার সময়ে গ্রেফতার করা হয় তাহলে কেমন হয়? আসল মূর্তি না থাকলেও আমার নকল মূর্তি তো কাজে লাগানো যেতেই পারে।
সেই কথাই রইলো। ইন্টারপোলের মাধ্যমে দিকে দিকে খবর ছড়িয়ে পড়লো যে আসল মূর্তিটা ভারতে পাচার হয়েছে। ক্রমশ তা শেখ আসলামের কানেও পৌঁছে দেওয়া হলো। এবং এই ভুয়ো খবরও তিনি পেলেন যে কলকাতায় এসে সেই মূর্তি তারপর জলপথে থাইল্যান্ড হয়ে জাপানে পাচার হতে পারে, কারণ জাপানিরা মিশরীয় জিনিসের কদর করে খুব। শেখ মরিয়া হয়ে খোঁজ করতে লাগলেন জাপানিদের হাত থেকে বাঁচিয়ে কিভাবে আনুবিস'কে নিজের সিন্দুকে ভরা যায়।"
"কিন্তু এর মধ্যে নীলমণি সান্যাল আর মন্দার বোস এলো কি করে? ওরা কি শেখের henchmen?" হালেই শেখা একটা ইংরেজি শব্দ ব্যবহার না করেই পারলেন না লালমোহনবাবু।
"সবই বলছি", হেসে বললো ফেলুদা। "আসলে আমার জীবনে যে অনেক কাকতালীয় ব্যাপার ঘটেছে, এটাও তাই। মাসকয়েক আগেই জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন নীলমণি সান্যাল। দুঃখের বিষয়, আবার সেই জেলেই তাঁকে যেতে হবে। এখানে মনে রাখতে হবে যে তিনি কখনও চাকরি বা ব্যবসা করেননি, একবার যে লটারি জিতেছিলেন সেই টাকাতেই তাঁর চলতো। কিন্তু উকিলের খরচে আর চুরির খেসারত দিতে তার অনেকটাই উবে গেছে। সেই 'ভ্যানিশ' হয়ে যাওয়া টাকা আবার কি করে ফিরে পাওয়া যায় তা ভেবে উনি হন্যে হয়ে যাচ্ছিলেন। এছাড়া চেপে বসে আমার উপর প্রতিহিংসা নেওয়ার বদবুদ্ধি, মানে জিঘাংসা।"
কথাটা শোনামাত্র লালমোহনবাবুর চোখ দুটো দপ করে জ্বলে উঠলো। প্রায় অচেতন মনেই উনি খুব জোরে "জিবরল্টারের জিঘাংসা" চেঁচিয়ে উঠলেন, তারপর সবাই অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকানোয় তিনি "ভেরি সরি" বলে চুপসে গেলেন।
"এ কথা আমি জানতেও পারতাম না, বাচ্চু এসে আমাকে না বললে। ধন্যবাদ, বাচ্চু" বলে ফেলুদা সেই পিস্তলধারী বামনকে স্যাল্যুট করলো। সেও একগাল হাসলো। নীলমণি সান্যাল অগ্নিচক্ষু দিয়ে বাচ্চুকে ভস্ম করতে চেয়ে তা না পেরে বলে উঠলেন "বিভীষণ"।
"বিভীষণ, মীরজাফর, সুগ্রীব, যাই বলুন না কেন, বাচ্চু তো আইআফিক কাজই করেছে।", ফেলুদা সান্যালের দিকে তাকিয়ে বললো। "আপনার সাথে অপরাধ করে ও'ও জেল খেটেছে, কিন্তু ও জাত অপরাধী নয়। নেহাৎ পেটের দায়েই চুরি করেছে।
অপরাধ কম বলে বাচ্চুর জেলের মেয়াদও আপনার থেকে কম। তাই আপনার ছ-মাস আগেই ও রেহাই পেয়ে পুলিশের কাজ শুরু করে। ওর মতো লোককে তো কেউ চাকরি দেয় না, কিন্তু ওর জেলের মেয়াদ ফুরানোর পরে আমার সুপারিশে ও পুলিশ ইনফর্মারের কাজ পায়। সেটা আপনি জানতেন না।
আপনি জেল থেকে বেরিয়ে ওকেই তলব করেন আপনার কুকর্মে সাহায্য করতে, সেটা ও আমাকে জানায়। তারপর আমার মত অনুযায়ীই বাচ্চু ফের আপনার সাকরেদ হয়। আর আপনি খুঁজে পেতে আমার পুরনো কেসের অপরাধীদের তালিকার থেকে যে মন্দার বোসকে আবিষ্কার করেন, তাও আমাকে ও জানায়।"
হঠাৎ আমার পেটে খুব ব্যথা করতে লাগলো। বাচ্চু যদি পুলিশের লোক হয় তাহলে আমাকে আর লালমোহনবাবুকে ঘুঁষি মেরে অজ্ঞান করলো কেন? "কিন্তু, ফেলুদা, বাচ্চু..."আমি বলতে শুরু করলাম।
আমার মনের কথা ফেলুদা বুঝলো। "ওর কোনও উপায় ছিলো না রে।", ও বললো। "ওর সঙ্গে লাহিড়ী রূপী মন্দার বোসও ছিলো, যখন ও আমাদের বাড়িতে যায়। এটুকু না করলে ওর উপর সন্দেহ পড়তো যে। কিন্তু তোদের ঘুঁষি মেরে ও খুবই অনুতপ্ত। তাই না রে বাচ্চু?"
অনুতপ্ত না ছাই! আমার পেটটা কনকন করতে লাগলো। লালমোহনবাবু নীচু গলায় একটা হিন্দি গান করতে লাগলেন। গানের কথাগুলো হলো 'দুষমন না করে দোস্ত নে যো কাম কিয়া হ্যায়'।
ফেলুদার কথা চলতে লাগলো।
"আমি যখন মন্দার বোস আর নীলমণি সান্যালের যোগাযোগের কথা জানলাম, তখনই বুঝি যে কিছু পরিকল্পনা করছে। বাচ্চুর থেকে জানতে পারি সান্যালও সেই আসল আনুবিসের কলকাতায় আসার ভুয়ো খবর পেয়েছে। আশ্চর্যের কিছু নয়, পুলিশের কাজই ছিলো খবরটা অপরাধ জগতে এমনই ছড়িয়ে দেওয়া যে সবাই ব্যাপারটা সত্যি মনে করে।
অতঃপর? তার হারানো অর্থ ফিরে পেতে সান্যাল এতোই মরিয়া হয়ে পড়ে যে সেই আসল আনুবিস'কে চুরি করতে সে বদ্ধপরিকর হয়। কিন্তু সে নিজে যথেষ্ট বেপরোয়া নয় বলে মন্দার বোসের মতো বদমাইশকে জুড়িদার করে। আমি নিশ্চিত নই, কিন্তু মন্দার বোস যখন সান্যালের আর আমার ঘটনা জানতে পারে, তখন অর্থ উপার্জন ছাড়াও সে সান্যালকে বুদ্ধি দেয় চুরিটা আমার ঘাড়েই চাপাতে, যাতে জেলে যাই আমি। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি। আর সেইজন্যই যখন ওদের মনে হলো চুরিটা সত্যিই আমি করেছি তখন ওদের মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।"
"কিন্তু আপনার জিনিস আপনি চুরি করবেন, এটা পুলিশের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে কেন?", প্রশ্ন করলেন ইন্সপেক্টর সামন্ত। আমার মাথাতেও একই প্রশ্ন ঘুরছিলো।
"সান্যাল আর মন্দার বোস তো আর জানতো না যে তারা যে মূর্তিটা চুরি করতে চায় সেটা নকল। ওরা ভেবেছিলো antique মূর্তি চুরির দায়ে আমি ঘানি টানবো আর ওরাই মূর্তিটা বিক্রি করে বড়লোক হয়ে যাবে। কি মন্দারবাবু, ঠিক বলিনি?", বললো ফেলুদা।
দাঁত কিড়মিড় করে উঠলো মন্দার বোসের। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, "বড়লোক হতে চাওয়া কি অপরাধ? সেবার দামী পাথরও পেলাম না, আর এবারেও লবডঙ্কা। এখনও সেই টপ ট্যু বটম পরের দ্রব্য পরেই দিন চালাচ্ছি। এখন না হয় প্যাঁচে পড়েছি, কিন্তু ভুলে যাবেন না, টিকটিকি বিছের খাদ্য।"
ফেলুদা মন্দার বোসের এই উক্তিকে পাত্তা না দিয়ে বলে চললো -
"যখন তাদের উদ্দেশ্য আর মনোভাব বুঝলাম, তখন ভাবলাম কাঁটা দিয়েই কাঁটা তুললে কেমন হয়? যদি মন্দার বোস আর নীলমণি সান্যালই শেখ আসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে মূর্তি বিক্রির ব্যাপারে? কলকাতা পুলিশের একজন'কে শেখের এজেন্ট সাজানো হলো। Underworld'য়ে চাউর হলো যে শেখ আসলাম খবর পেয়েছেন কলকাতায় আনুবিসের মূর্তি আসবে বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালার মিউসিয়াম উন্মোচনে, তারপর লুকিয়ে তা পাচার হয়ে যাবে ব্যাঙ্ককে। তার আগেই কাজ হাসিল করার সিদ্ধান্ত নেয় মন্দার বোস আর সান্যাল।
শেখকেও সেই কথাই জানানো হয় আর তিনিও সেইমতো কলকাতায় চলে আসেন। কিন্তু আমরা কখনোই শেখের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাইনি, সবসময়ে গোপন পুলিশের এজেন্টের মাধ্যমেই আলোচনা হয়, তাই শেখ সান্যাল বা মন্দার বোস'কে কেমন দেখতে, বা তাদের গলার আওয়াজ কেমন তা জানতেন না।
একটা জিনিস শুধু ইচ্ছা করেই মিথ্যা বলা হয় দু পক্ষকেই। শেখ'কে বলা হয় উনি যেন হোটেলের ঘরেই থাকেন, সেখানেই পৌঁছে যাবে মূর্তি। আর সান্যালকে বলা হয় শেখ কোনও হোটেলে দেখা করতে চান না, তিনি তার বাড়িতেই আসবেন।
সেইমতো আমি আর মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা সান্যাল আর মন্দার বোস সেজে আনুবিসের মূর্তি নিয়ে যাই। তারপর শেখের লোক এসে মূর্তি'টাকে আসল বলায় শেখ আশ্বস্ত হয়ে আমাদের দেওয়ার জন্য টাকা বের করে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশ ঘরে ঢুকে তাঁকে বামাল সমেত গ্রেফতার করে।
তারপর আমিই শেখ আসলাম সেজে সান্যালের বাড়িতে আসি, আর বাচ্চুর সাহায্যে সান্যাল আর মন্দার বোসকে পাকড়াও করি। বাকিটা তো তোরা জানিসই, তোপসে।"
"কিছুই জানি না", প্রায় চেঁচিয়ে বললাম আমি। "তুমি গায়েব হলে কেন, মূর্তিটা তুমি মিউসিয়াম থেকে কখন চুরি করলে, অভিশাপের চিঠিটা কে লিখলো, মন্দার বোস পুলিশ ইন্সপেক্টর সাজলো কি করে, নকল পুলিশ সেজেও ধরা পড়লো না কেন, শেখ আসলামের লোক নকল মূর্তিকে আসল বললো কেন, এগুলো বলবে কে?"
"সত্যি ফেলুবাবু, ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্কস গুলো ভরে দিন, নাহলে খুব অস্বস্তি হচ্ছে।", বললেন লালমোহনবাবু। আমার মতো উনিও খাবি খাচ্ছেন।
হেসে উঠলো ফেলুদা। "আরে, আমি গায়েব না হলে একবার সান্যাল আর একবার শেখ আসলাম কে সাজতো? তোদের বলে দিলে তো তোরা আগেই গুবলেট করতিস, তাই কিছু না বলেই কাজটা সারতে হয়েছে। আর কে বললো আমি মূর্তিটা চুরি করেছি? ওটা তো মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা শো-কেসে রাখেন'ই নি। শুরু থেকেই ওঁর কাছে ছিলো ওটা। আমি যে ওঁকে আমার প্ল্যানে সামিল করেছি এটা বুঝলি না? ওঁর মিউসিয়ামে আসল আনুবিস আসবে, এই মিথ্যেটা তো ওঁকেও বারকয়েক মুখ ফস্কে বলতে হয়েছে, যাতে কথাটা পাঁচকান হয়। মুখ ফস্কানোটা অবশ্য অভিনয়, বলাই বাহুল্য।"
মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা মুচকি হাসলেন। তার মানে প্রথম যখন মন্দার বোস পুলিশ সেজে এসেছিলো তখনও ঝুনঝুনওয়ালা অভিনয় করছিলেন। আর আমি কিনা তাঁকেই সন্দেহ করেছিলাম। ছি ছি ছি!
"কিন্তু বাকিগুলো? মন্দার বোস পুলিশ সাজলো, কেউ ধরলো না কেন?", বললাম আমি।
"অতি লোভে তাঁতি নষ্ট, জানিসই তো।", বললো ফেলুদা। "সান্যাল আর মন্দার বোসের প্ল্যানই ছিলো মন্দার পুলিশ সেজে শেখের সঙ্গে দেখা করতে যাবে, যাতে তাকে ভয় দেখিয়ে বেশি টাকা হাতানো যায়। রাতে যখন মিউসিয়ামে হানা দিয়ে ওরা মূর্তি পেলো না, তখন আন্দাজ করে আমিই চুরি করেছি। তাই মরিয়া হয়েই কাকভোর থাকতে আবার মিউসিয়ামে এসে পুলিশ দলের মধ্যে ভিড়ে যায় মন্দার বোস। ইন্সপেক্টর সামন্তরই আসার কথা ছিলো, কিন্তু আমি ইচ্ছে করেই ওঁকে আসতে মানা করি। আমার মনে হয় এলে ওঁর বিপদ হতো। যে লোক তার সাকরেদ'কে নকল ডাক্তার হাজরা সাজানোর জন্য আসল ডাক্তার হাজরাকে ভ্যানিশ করতে পারে, তার পক্ষে সবই সম্ভব। আসল ইন্সপেক্টর এলো না দেখে মন্দার বোসের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়, সে আরও বেপরোয়া হয়ে পড়ে। নাহলে সে হয়তো আনুবিস খুঁজতে বাচ্চুর সঙ্গে আমাদের বাড়িতে যেতো না।"
"সব মিথ্যে কথা। প্রমাণ কই?", চীৎকার করে উঠলো সান্যাল।
এবার মুখ খুললেন ইন্সপেক্টর সামন্ত। "আমাদের পুলিশ বিভাগের সাহায্য নিয়ে বাচ্চুর গায়ে মাইক্রোফোন লোকানো ছিলো, তাই আপনাদের সব কথাই রেকর্ড হয়ে আছে। আর আপনি মিউসিয়ামে সব ক্যামেরা বিকল করলেও মিউসিয়ামের বাইরের ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্টে লাগানো ক্যামেরায় আপনাদের ছবি ধরা পড়েছে। সুতরাং চিন্তা নেই, প্রমাণের অভাব হবে না।"
"নেমকহারাম, নেমকহারাম" বলে বাচ্চুর দিকে তেড়ে গেলো সান্যাল। ইন্সপেক্টর সামন্ত আর ফেলুদা দৌড়ে গেলো সান্যালকে থামাতে, কিন্তু তার দরকার ছিলো না। বাচ্চুর শক্তিশালী ঘুঁষির ঘায়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লো সান্যাল।
১৭.
পুলিশের লোক এসে সান্যাল আর মন্দার বোসকে ঘর থেকে নিয়ে গেলো। ইন্সপেক্টর সামন্তও বিদায় নিলেন। বাচ্চু'ও। বাকি রইলাম শুধু আমরা তিনজন আর মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা।
লালমোহনবাবুর ইংরেজির বাতিকটা কিছুতেই যাচ্ছে না। "Two bits এখনও বাকি। অভিশাপের চিঠি আর নকল মূর্তিকে আসল প্রমাণ করা।", তিনি বললেন।
"অভিশাপের চিঠিটা স্রেফ সান্যালকে ভাঁওতা দেওয়ার জন্য।", বললো ফেলুদা। "মূর্তিটা আদৌ আমি নিয়েছি না অন্য কেউ, সেটা নিয়ে তাকে ভাবানোর জন্য। সান্যাল নিজেই হিয়েরোগ্লিফস পড়তে আর লিখতে পারে, আপনাদের মনে আছে হয়তো। তাইতো আমার কাছে প্রথম এসেছিলো এইরকমই একটা ভুয়ো হুমকির চিঠি নিয়ে। একটু তো শোধ তুলবোই। তাই আগের রাতেই চিঠিটা আনুবিসের শো-কেসে রেখে দেন মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা।"
"কিন্তু হিয়েরোগ্লিফস? তুমি কবে ওই ভাষা শিখলে? আর পাপাইরাস'ই বা পেলে কোথায়?" আমার ঘোর এখনও কাটছে না।
"আমি লিখবো কেন?", ফেলুদা বললো। "চিঠিটা মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালাই লেখেন। পাপাইরাস'ও দিনকয়েক আগে ওঁকে দিয়েই আনাই, মিশর থেকেই। তোদের মধ্যেও অভিশাপের চিন্তাটা বদ্ধমূল হওয়ার প্রয়োজন ছিলো, না হলে আমার অদৃশ্য হওয়াটা তোরা অন্য চোখে দেখতিস। তাই আমিই পাথর ছুড়ে আমাদের বাড়ির জানলা ভেঙে স্ক্যারাব বীটলের ছবিটা তোদের হাতে পৌঁছে দিই। আর লালমোহনবাবু, আপনি two bits বললেন, আসলে কিন্তু three bits. আপনাকে ফোনে মন্দার বোস সেজে কে হুমকি দিয়েছিলো, সেটা জানতে চাইলেন না?"
লালমোহনবাবু ভাঙেন কিন্তু মচকান না। "ওটা তো নিশ্চই আপনিই করেছিলেন, যাতে আমরা শত্রুর কবলে পড়লে সেটাই বলি যা আমরা বিশ্বাস করি, আর যাতে ওরা আরও দিশেহারা হয়ে পড়ে। আর আমার ধারনা সেদিন ভোরে আপনিই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ'কে বলে কিছুক্ষণের জন্য ফোনটা খারাপ করতে বলেছিলেন যাতে মন্দার বোস আর আমি দুজনেই ভাবি কিছু গোলমাল হয়েছে। ঠিক বলেছি কি?"
"ব্রাভো", লালমোহনবাবুর পিঠ চাপড়ে বললো ফেলুদা।
"কিন্তু তুমি জানলে কি করে যে মন্দার বোস আমাদের বাড়িতে তল্লাশি চালাবে আর আমাদের ধরে নিয়ে যাবে?", আমি জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
"জানতাম না, আন্দাজ করেছিলাম। বাঘের স্বভাব বদলায় না। খুব অল্প সময়ে মূর্তি উদ্ধার করার জন্য মন্দার বোসের চরিত্রের লোক এগুলো করবে বলেই আমার বিশ্বাস ছিলো। হয়েছেও তাই।", হেসে বললো ফেলুদা।
"নটে গাছটি প্রায় মুড়িয়ে এসেছে।", বললেন লালমোহনবাবু। "শুধু নকল আনুবিস'কে বিশেষজ্ঞ'ও কেন আসল বললেন সেটা বুঝলাম না। উনি আসল বিশেষজ্ঞ ছিলেন না বুঝি?"
"একেবারে খাঁটি বিশেষজ্ঞ। নাহলে শেখের বিশ্বাস হবে কেন?" ফেলুদা বললো। "দুটো জিনিস আমি ইচ্ছে করে সত্যি বলিনি এতক্ষণ। এক, আসল মূর্তিটা চুরি যাওয়ার এক মাসের মধ্যেই উদ্ধার হয়, কিন্তু আমাদের এই 'অপারেশন শেখ আসলাম'কে জারি রাখতে সেই খবর গোপন রাখা হয়। আর দুই, নকল মালের সঙ্গে ধরা পড়লে শেখ সহজেই ছাড়া পেয়ে যেতেন, তাই প্রয়োজন ছিলো আসল আনুবিসের সঙ্গেই তাঁকে ধরা। এবার বুঝলি?"
আমি হতভম্ব। "তার মানে আসল মূর্তিটাও কলকাতায় এসেছে? কি করে এলো? এখন সেটা কোথায়?" উত্তেজনায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।
"এবার হামি বোলি, মিস্টার মিত্তির?", এতক্ষণে মুখ খুললেন ঝুনঝুনওয়ালা।
"অবশ্যই", একগাল হেসে বললো ফেলুদা।
"সেদিন ভোরে আমি কিন্তু এয়ারপোর্টে সচমুচ গেছিলাম। কাউকে সী অফ করতে না, আসলি আনুবিস'কো রিসীভ করতে। ইন্টারপোল থেকে আমার নামেই পাঠানো হয়েছিলো, কড়া সিকিউরিটির সঙ্গে।", উদ্ভাসিত মুখে বললেন বিষ্ণু ঝুনঝুনওয়ালা।
'Oh My God", বললেন জটায়ু। "তাহলে এখন কোথায় সেই আসল আর নকল আনুবিস?"
ফেলুদা তার আরব জোব্বার দুই পকেটে হাত ঢোকালো, আর বেরিয়ে এলো দুই আনুবিস। দুটোই বিঘতখানেক লম্বা, সবুজ পাথরে খোদাই করা। দুটোর গায়েই ঝলমলে পাথর বসানো। কোনটা আসল, কোনটা নকল, বোঝা মুশকিল।
"বাঁ হাতেরটা আসল", বললো ফেলুদা। "এটা এখনই মিস্টার ঝুনঝুনওয়ালা এয়ারপোর্টে নিয়ে যাবেন। সেখানেই এটা লকারে থাকবে আজ রাত অবধি, তারপর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরবে। এর পরের ছুটিতে আমরা না হয় ইজিপ্ট বেড়াতে যাবো, তখন শুধু আনুবিস নয়, আইসিস, ওসাইরিস, হোরাস, সেঠ, পিতাহ, রা, সেখমেট, সবাইকে দেখে আসবো। তাহলে কেমন হবে লালমোহনবাবু?
শিশুর মতো হাততালি দিয়ে উঠলেন জটায়ু। "একেবারে সোনায় সোহাগা। তাহলেই তো আমার 'মারাত্মক মিশর' উপন্যাসটা লিখতে পারবো।", তিনি বললেন।
"তাহলে সব ভালো যার শেষ ভালো।", আমি বললাম। "শুধু আনুবিসের অভিশাপ'টাই যা ফললো না। ভাগ্যিস!"
"কে বললো ফলেনি?", ফেলুদা বললো। "অভিশাপে লেখা ছিলো যে আনুবিস চুরি করেছিলো তার সর্বনাশ হবে। যার মনে চুরি, সেই তো চোর। তাই মন্দার বোস আর সান্যাল প্রকৃত অর্থেই চোর। আর তাদের সর্বনাশ হতে কি কিছু বাকি আছে, বল?"
লালমোহনবাবু আর আমি দুজনেই হেসে উঠলাম। "থ্রি চিয়ার্স ফর ফেলু মিত্তির", বললেন জটায়ু। "হিপ হিপ হুররে", বললাম আমি। গলা মেলালেন ঝুনঝুনওয়ালাও।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment