Thursday, 4 March 2021

Rameshbabur Rakshyasa by Abhishek Mitra

 ২১ নং রজনী সেন রোড খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। মোড়টা ঘুরে একজন বয়স্ক ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করতেই উনি হেসে বললেন, “ফেলু মিত্তিরের বাড়ি তোওই যে সোজা গিয়ে দেখবেন একটা চায়ের দোকান পড়বেতার তিনটে বাড়ি পরে।

এখানে আমার পরিচয়টা বলে রাখা ভালো। আমার নাম সমীর দাস। পেশায় সাংবাদিক। কলকাতার এক নামী পত্রিকার জন্য সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি আমাদের সকলের প্রিয় শখের গোয়েন্দা শ্রী প্রদোষ চন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদার। গতকাল রাতেই ফোন করে একটা এপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিয়েছি। সাক্ষাৎকারের নাম শুনে বললেন, “ঠিক আছে সাক্ষাৎকার চলতেই পারেতবে ছবি কিন্তু তোলা যাবে না। জানেনই তো আমাদের পেশায় ছবি টবি কাগজে বেরিয়ে গেলেই ...”

আমি বললাম, “নানা ছবির প্রশ্নই আসছে না। শুধুই সাক্ষাৎকার।

যদিও আজকাল প্রাইভেট গোয়েন্দকে কেউ আর ডাকে না। তবুও... “ তারপর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললেন, “ঠিক আছে। কাল চলে আসুন সকাল দশটা নাগাদ। ঠিকানাটা জানেন তো?”

বললাম, “২১ রজনী সেন রোড। এটা জানবো নাসেই ছেলেবেলা থেকে তপেশদার লেখায় পড়ে আসছি। আমি কেন পৃথিবীতে যত বাঙালি আছেতাদের সবার মনে প্রায় ট্যাটু করা আছে এই এড্রেসটা।

গত ত্রিশ বছরে ফেলুদা আমাদের মনেই শুধু বেঁচে আছে। প্রথম প্রথম ওনার কিছু ছোট খাটো সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলেও গত ত্রিশ বছরে হয়নি। তাছাড়া তোপসের লেখাও সেই ইন্দ্রজাল রহস্যের পর আর প্রকাশ হয়নি। তাই আমাদের পত্রিকার সম্পাদককে বলতে উনি একটু নাক শিটকলেন ঠিকইকিন্তু ফেলুদা নামের সেই বিশাল পর্বতকে অগ্রাজ্য করতে পারলেন না

বাড়িটার সামনে এসে বুকের ভিতরটা কেমন যেন করে উঠল। চারিদিকের ঝাঁ চকচকে ফ্ল্যাটের মাঝখানে একটা আদ্যিকালের বাড়ি যেন খুব কষ্ট করেই দাঁড়িয়ে আছে। রঙ চটা দেওয়ালগুলো দেখলে মনে হয় চারিদিকের নতুনত্বে মাঝে এই বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। মনটা যেন একটু খারাপ হয়ে গেল। তিনটে সিঁড়ি পেরিয়ে সবুজ রঙের দরজার সামনে এসে বেল বাজালাম। বুকের মধ্যে দামামা বাজছে। এই বুঝি দরজা খুলে আমার সামনে এসে দাঁড়াবেন আমাদের সকলের প্রিয় ফেলুদা!

আরও মিনিট দুয়েকের অপেক্ষাতারপর একটা ক্যাঁচ শব্দ করে দরজাটা খুলে গেল। একটা বছর পনেরোর ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। আমায় দেখে বলল, “জ্যেঠুর সাথে দেখে করতে এসেছেন?”

আমি মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলতে ছেলেটা বলল, “আসুন।

তারপর আমার ছোট্ট বৈঠকখানাটায় বসতে বলে ভিতরে চলে গেল। আমি অ্যাকুয়ারিয়ামের পাশ রাখা বেতের সোফাটায় বসলাম। বাড়িটার বাইরেটার মত ভিতরের দেওয়ালেরও রঙ চটে গেছে। ছাদের কোনাগুলোয় ঝুলের আধিক্য। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয় খুবই অযত্নে রাখা হয়েছে বাড়িটাকে। শুধুই টিকিয়ে রাখা। আর আমার পাশে রাখা অ্যাকুয়ারিয়ামটায় দুটো গোল্ড ফিস ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখেই বোঝা যায় যে বেশ কিছুদিন হল জল পাল্টানো হয়নি। সেই দিকে তাকিয়ে দেখিছি এমন সময় আমার পিছন থেকে একটা গুরুগম্ভীর স্বরে কথা শুনে প্রায় চমকে উঠলাম

গত সপ্তাহ থেকে বলছি এখনও পাল্টায়নি জলটা

দেখি আমার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন ফুট লম্বারোগা ভদ্রলোক পরনে সাদা পাজামা আর হলুদ রঙের পাঞ্জাবী চোখে হাই পাওয়ারের কালচে ফ্রেমের চশমা। সারা মাথা জুড়ে ধবধবে সাদা চুল। ভদ্রলোক আমার উল্টদিকের সোফাটায় বসে বললেন, “নমস্কারচিনতে পারলেন না তো?”

প্রাথমিক ধাক্কাটা সামলে উঠে বললাল, “নামানে সেরকম না। আসলে গল্পে আপনার সম্বন্ধে যেটা পড়েছি সেটা...”

আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই ভদ্রলোক বলে উঠলেন, “আমার গল্পগুলো যখন লেখা হয়েছিল তখন আমার বয়স ছিল বত্রিশ তেত্রিশ। আর এখন আমার বয়স তেষট্টি। তাই সোনার কেল্লার ফেলুদার সাথে এই তেষট্টি বছরের ফেলুদার চেহারাটা মেলাতে যাওয়াটাই ধৃষ্টতা নয় কি?”

আমি একটু লজ্জিত হয়ে বললাম, “নানা ফেলুদাসেরকম না। আসলে আমাদের কাছে আপনার চেহারাটা চিরকালই সেই ‘সোনার কেল্লার ফেলুদা’ তোতাই একটু...”

ফেলুদা তার একপেশে হাসিটা হেসে বললেন, “চা না কফি?”

চা- ভালো।

ফেলুদা হাঁক পাড়ল, “টুটুলনন্দুকে বল তো দুকাপ চা দিয়ে যাবে।

তারপর একটু থেমে বললেন, “আসলে গত বছর মে মাসে শ্রীনাথ মারা গেছে। ক্যান্সার হয়েছিল। তাই নতুন কাজের লোক রেখেছি। এই ছেলেটিও বেশ ভালোই।

আমি চুপ করে থাকলাম। আমার সামনে যেন বিরাট একটা স্বপ্নের প্রাসাদ আস্তে আস্তে ভেঙে পড়ছে।

বললাম, “ফেলুদাএই টুটুল ছেলেটি কে?”

টুটুল তোপসের ছেলে। তোপসের সাথেই ব্যাঙ্গালরে থাকে। গরমের ছুটিতে এসেছে। তোপসেও আর ওর স্ত্রীও এসেছে। তবে এখন বেড়িয়েছে একটু। আপনি জানেন বোধহয়তোপসে ব্যাঙ্গালরে একটা এড এগেন্সিতে চাকরি করে।

সব কিছু কিরকম যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। ফেলুদা কোলকাতায় আর তোপসে ব্যাঙ্গালরএটা তো ভাবতেই কেমন একটা লাগছে। জিজ্ঞেস করলাম, “আর আমাদের থার্ড মাস্কেটিয়ারলালমোহনবাবু?”

প্রশ্নটা করেই একটা অজানা ভয় যেন আমাকে চেপে বসল

ফেলুদা বলল, “বেশ আছেন। এই গত রবিবারই তো এসেছিলেন। ওনার সেই রবিবার সকাল নটায় রজনী সেন রোডে না এলে কি চলে। তবে লেখেন না আজ কাল। মানে লিখতে পারেন না। ওনার নার্ভের অসুখ ধরা পড়েছিল বছর বিশেক আগে। সবসময় হাত কাঁপে। কলম ধরে লিখতে পারেন না।

তারপর টেবিলে রাখা চারমিনারের প্যাকেটটা থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটো ধোঁয়ার রঙ ছেড়ে বললেন, “শুরু করুন আপনার ইন্টারভিউ। আপনারটা শেষ করে একটু বেরতে হবে। ডাক্তারের কাছে এপয়েন্টমেন্ট আছে।

আমি একটু চিন্তিত হয়ে বললাম, “সিরিয়াস কিছুআমি কি তাহলে অন্য দিন আসব?”

ফেলুদা সামান্য হেসে বললেন, “বয়স হয়েছে ভাইএখন হাজার সমস্যা। সিরিয়াস ভাবলে সিরিয়াসনা ভাবলে নয়। আসলে বেশ কিছু বছর ধরে হার্টের অসুখে ভুগছি। পেসমেকার লাগানো তো।

আমার মাথাটা ঝিমঝিম করছে। আমাদের মনে ফেলুদার যে ছবিটা আঁকা আছেসেটা কেমন জানি আসতে আসতে দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। মনটা খারাপ হয়ে গেল।

ইন্টারভিউ নেওয়ার মানসিকতাটাই চলে গেছে আমার। বললাম, “আপনাকে আজ একটাই প্রশ্ন করব?”

শুধু একটা?” ফেলুদা যেন একটু অবাক হলেন। তারপর তার একপেশে হাসিটা হেসে বললেন, “কেনবুড়ো ফেলুদাকে পছন্দ হল না?”

কি বলব বুঝতে পারলাম না। বললাম, “নানা সে কি বলছেন। আপনি ওই বলছিলেন না যে ডাক্তার দেখাতে যাবেনতাই আর কই।

আঙুলের ফাঁকে রাখা সিগারেটটায় শেষ টান দিয়ে ফেলুদা একটা টোকা মেরে সেটা জানলার বাইরে ফেলে দিলেন। তারপর বললেন, “ঠিক হ্যায়করে ফেলুন।

আমি নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বললাম, “আমরা আপনার প্রায় বিয়াল্লিশটা কেস নিয়ে তোপসেদার লেখা পড়েছি। সবগুলোই সাকসেসফুল। আপনার কিছু আন-সাকসেসফুল কেসও যে আছে সেটাও আমরা জানি।

আমার কথা মাঝ পথে থাময়ে দিয়ে ফেলুদা প্রশ্ন করলেন, “যেমন?”

আমি বললাম, “যেমন ধরুন বোসপুকুরের সেই জোড়া খুনের মামলাটা।

ফেলুদার ঠোঁটের কোণায় একটা হাল্কা হাসি দেখা দিল। বললেন, “হোম-ওয়ার্ক করে এসেছেন দেখছি। আচ্ছাকি যেন বলছিলেন?”

বলছিলামআপনার জীবনের তো প্রচুর কেস আছে। কিন্তু আজ যদি আপনাকে জিজ্ঞেস করিযে আপনার জীবনের সব থেকে ইন্টারেটিং কেস কোনটা তাহলে আপনি কি বলবেনগোরস্থানে সাবধান না যত কান্ড কাটমান্ডুনাকি অন্য কিছু?”

ফেলুদা মিনিট তিনেক চুপ করে বসে থাকলেন। ইতিমধ্যে চা এসে গেছে। ফেলুদা চায়ের কাপটা হাতে তুলে সোফায় গা-টা এলিয়ে দিয়ে বললেন, “আমার সক্রিয় গোয়েন্দা জীবনের দৈর্ঘ ছিল প্রায় তিরিশ বছর। এই তিরিশ বছরে অত কেস যে আমার হাতে এসেছে তার ইয়ত্তা নেই। সাধারণ চুরি থেকে খুন থেকে জাল ওষুধ পর্যন্ত। কিন্তু এখন হয়তো বয়সের কারনেই কোনটাই বিস্তারিত ভাবে আর মনে নেই। মাঝে মাঝে তোপসের লেখা গল্পগুলো পড়লে ঘটনাগুলো মনে পড়ে যায়। বহুদিন আগে ডাঃ কয়েং লি- বইতে পড়ে ছিলাম যে বয়সের সাথে মানুষের মস্তিস্কের কোষগুলো ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকেযার ফলে অনেক কিছুই মনে থাকে না। যদিও এই ব্যাপারের বিজ্ঞানসম্মত কিছু ধারনা আমারও আছে। যাই হোকআসল কথায় আসি। আমায় অনেকেই বিভিন্ন সময় জিজ্ঞেস করেছেন যে আমার জীবনে সব থেকে রোমহর্ষক কেস কোনটাআমি কিন্তু বিভিন্ন সময় বিভিন্ন লোককে বিভিন্ন কেসের কথা বলেছি। কারন অনেক কেসই আছে যেটাকে রোমহর্ষক বলা যায়তাই কোনটা বেশি 'রোমহর্ষকসেটা আমি এখনও নিজেই ঠিক করে উঠতে পারিনি। কখনও বলেছি সোনার কেল্লার কথা তো কখনও বলেছি গোরস্থানে সাবধান। কাটমান্ডু বা গোলাপি মুক্ত রহস্যের মগনলাল মেঘ্রাজের কথা এখনও বলেন লালমোহনবাবু।

কিন্তু যদি জিজ্ঞেস করেন যে আমার জীবনে সব থেকে মজার কেস কোনটাতাহলে আমি একটা কেসের কথাই সবাইকে বলতাম। যদিও এটাকে কতটা ‘আমার’ কেস বলা যায় জানি না। কেসটা এতটাই সোজা আর হাস্যকর ছিল যে সেটার কথা প্রায় পুরটাই মনে আছে। তার একটা কারন অবিশ্যি আছে। এই গল্পটা আমি এতবার এত জনকে বলেছি যে প্রায় সবটাই ভালো করে মনে থেকে গেছে। আর যে ব্যাপারটা কাউকে বলিনিসেটার কোন ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই।

আমি রেকর্ডারটা অন করে টেবিলের উপর রেখে মন দিয়ে শুনছি ফেলুদার গল্পটা। ফেলুদা আর একটা চারমিনার ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন

তখন আমার বয়স বছর বাহান্ন হবে। ডাক্তারের পরামর্শ মেনে একটু হাওয়া বদল করতে গিয়েছিলাম কলকাতার খুব কাছে বাটানগর নামক একটা মফঃস্বলে। আমার এক পুরনো বন্ধুর পোস্টিং ছিল ওইখানের থানায়। নাম সুবিমল বসাক। আমার সাথেই পড়ত স্কটিশে। আমরা একসাথে ক্রিকেটও খেলেছি অনেক। যাই হোক বলল, “হাওয়া বদলের জন্য এমন জায়গা আর পাবি না ফেলু। আমি একটা বাড়ি ঠিক করে দিচ্ছি। এসে হপ্তা দুয়েক কাটিয়ে যা। আর তোর সাথে দেখাও হয়নি অনেকদিন।

তাই শ্রীনাথকে নিয়ে চলে গেলাম বাটানগরে যে বাড়িটায় উঠলামসেটা বেশ ভালো আর বাজার দোকানও কাছেই। বাড়ির সামনে দিয়ে লম্বা রাস্তা আর তার দুধার দিয়ে একতলা দোতলা বাড়ি। বেশ ভালোই কাটছিল দিনগুলো। বাটানগর জায়গাটাও বেড়ে। ছোট জায়গা। গাছ পালা আর পুকুরে ভর্তি। কলকাতার মডার্নাইজেশন তখনও ছুঁতে পারেনি তাকে।

এক রবিবার সকালে সুবিমলের সাথে দেখা করার জন্য থানায় গিয়েছি। থানার অবস্থা দেখে হাসিই পেল। আমার বন্ধু আর খান তিনের কন্সটেবেল। কারাগার ফাঁকা। আর দেখেও মনে হয়না সেখানে গত কিছুদিন কেউ ছিল বলে। আমারা দুজন বসে কথা বলছিএমন সময় দরজা দিয়ে মাথাটা বাড়িয়ে একজন লোক জিজ্ঞেস করল, ‘আসতে পারিস্যার?’

সুবিমল বলল, ‘আসুন।

লোকটা ঘরে ঢুকলে তার চেহারটা ভালো করে লক্ষ্য করলাম। রোগাবেঁটেকটা কটা চোখমাথায় চুল প্রায় নেই বললেই চলে। বয়স মনে হল পঁয়তাল্লিশ ছেচল্লিশ হবে। পরনে একটা ময়লা পাঞ্জাবী আর পাজামা। সামনের দুটো দাঁত একটু অস্বাভাবিক রকম বড়। চোখে একটা ডাটি ভাঙা চশমা আর হাতে একটা বড় বাট-ওয়ালা তাপ্পি মারা ছাতা। সব মিলিয়ে একটা দেখার মত চেহারা।

ভদ্রলোক আমাদের টেবিলের সামনে এসে হাত দুটো জোড় করে কপালে ঠেকিয়ে বলল, ‘পেন্নাম স্যার আমার নাম সুদীপ মহাপাত্র’ লোকটার গলাটাও শোনার মত কারণ ওনার গলাটা ভীষণ রকমের মিহি কোন প্রাপ্ত বয়স্ক লোকের গলা যে এতটা মিহি হতে পারে সেটা আমার ধারনা ছিল না

নমস্কারবলুন কি দরকার?’ বলল সুবিমল।

এদিক ওদিকে একটু সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তারপর গলাটা যতটা সম্ভব নীচে নামানো যায়ততটা নামিয়ে সে বলল, ‘আমি আসলে আপনাকে একটু সাবধান করে দিতে এসেছিস্যার।

কি ব্যাপারে?’

মানেস্যার,’ আবার চারিদিকটা দেখে নিয়ে চেয়ারটা একটু এগিয়ে নিয়ে বলল, "আমি দেখেছিস্যার।

কি দেখেছেন আপনি?’

রাক্ষস। এখানে একটা রাক্ষস আছে স্যার। এটা কি আপনি জানেন?’

কথাটা শুনে সুবিমিল আর আমি হো হো করে হেঁসে উঠলাম। যদিও সুদীপ মহাপাত্র কথাটা খুব সিরিয়াসলিই বলেছিল। তারপর অনেক কষ্টে হাঁসি চেপে বলল, ‘রাক্ষস?’

ভদ্রলোক যেন আমাদের হাসিটাকে পাত্তাই দিল না। সে আবার বলল, ‘হাসবেন না স্যার। আমি দেখেছি।

গোয়েন্দা জীবনে অনেক ধরনের মানুষের সাথেই আমার আলাপ হয়েছে। অনেক রকম অদ্ভত কেসও এসেছে আমার কাছে তবে ভূত প্রেত রাক্ষস নিয়ে কেস এই প্রথম। হেসে বললাম, ‘তা কিরকম দেখতে আপনার রাক্ষসকে মূলোর মত দাঁত আর কুলোর মত কান?’

ভদ্রলোক দাঁত বের করে মুখ দিয়ে একটা খিক খিক শব্দ করে হেসে বলল, ‘কি যে বলেনস্যার। সে তো সেই ছেলেবেলার রাজা রানির গল্পের রাক্ষস।

তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বলল, ‘সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কি ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য!’

তা বলুনকিরকম সেই দৃশ্য?"

শুনুন তাহলে। আমি এখানে ওই গুমোরজলার ওখানে একটা বিড়ি কারখানায় কাজ করি। তাও ধরুন বছর দশেক হল। গত একমাস ধরে আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করছি। আমাদের কারখানায় কিছু একটা আছেবুঝলেন স্যার। আমি কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে না একটা আওয়াজ শুনতে পাই।

কি রকম আওয়াজ?’ বেশ মজাই লাগছিল গল্পটা শুনতে। বসে বসে বোর হওয়ার থেকে তো ভালো।

একটা গুনগুন...গুনগুন...শব্দ। ঠিক যেন মাছির আওয়াজ। আস্তে আস্তে সেটা বাড়তে থাকে। যেন হাজার হাজার মাছি একসাথে। প্রথম প্রথম আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না ব্যাপারটা কি। একবার ভাবলামআমার কানটাই হয়তো গণ্ডগোল করছে। গেলুম আমাদের বরুন ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারবাবু ভালো করে দেখে টেখে বললেননা কান তো ঠিকই আছে।

ভদ্রলোক দম নেওয়ার জন্য একটু থামলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এই রকমই চলছিল বুঝলেন। তারপর আমি সেটাকে দেখলাম,’ শেষ কথাটা বেশ থমথমে গলায় বলল সুদীপ মহাপাত্র।

আমি হাসি চেপে বললাম, ‘সেটাসেটা কিআপনার রাক্ষস?’

"ঠিক কিতা আমি বলতে পারব না। সেটা আলোয় লুকিয়ে থাকে আর অন্ধকার হলেই বেরোয়।"

সুবিমল বলল, ‘তা অন্ধকারে সেটাকে দেখেন কি করে?’

আর মনে মনে ভাবলাম, 'এর মাথাটা পুরো খারাপ। অন্ধকারে রাক্ষস দেখে। চমৎকার।'

সুদীপ মহাপাত্র একটু গলা খাঁকরিয়ে বলল, ‘না মানেঅন্ধকারে আর কি করে দেখব বলুন। কিন্তু ছায়া দেখতে পাই। ছায়া যখন পড়েতখন দেখি ওই রাক্ষসটাকে।

আমি মাটিতে আমার ছায়াটার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম, ‘কিএইখানে দেখতে পাচ্ছেন এই রক্ষসটাকে?’

ভদ্রলোক মাথা হেঁট করে আবার সেই খিক খিক করে হেসে বলল, ‘নানা...এখানে কেন দেখব তো আপনার ছায়া। আপনি কি আর রাক্ষস বলুনযে আপনার ছায়ায় আমি ওটাকে দেখবআমি তো ওটা দেখি শুধু রমেশবাবুর ছায়ায়।

রমেশবাবুসেটা আবার কে?’

এই যে বললাম না স্যাররাক্ষস।

আহাসে তো বুঝলাম। কিন্তু এই রমেশবাবুর পরিচয়টা কি?’

তাই বলুন। উনি আমাদের বিড়ি কারখানার মালিক।

তা আপনি ওখানে বছর দশেক চাকরি করছেন?’

আজ্ঞে হ্যাঁস্যার।

তা বছর দশেক চাকরি করছনে আর মাত্র এক মাস আগে জানলেন যে আপনার মালিক রাক্ষস?’

তা হবে কেনআগে তো উনি মালিক ছিলেন না। আগের মালিক শচিনবাবুর কাছ থেকে এই এক মাস হল উনি কারখানাটা কিনে নিয়েছেন। আর তারপর থেকেই আমি আওয়াজটা শুনতে পাই।

আপনার মতে এই রমেশবাবুই রাক্ষস?’

হ্যাঁস্যার।

তা উনি আপনার কোন ক্ষতি করেছেন?’

নাতা করেন নি।

তাহলেহোক না রাক্ষসআপনার কি?’

আমাই কি মানে?" বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল ভদ্রলোক। ‘ মানুষ খুন করছে আর আপনি বলছেন আমার কিএই নিয়ে পাঁচটা হল।

খুন করছেনকই আমার কাছে তো সে রকম কোন রিপোর্ট নেই। তবুও আমি দেখছি।’ এই খুনের কথা শুনে আমি আর সুবিমল দুজনেই একটু সিরিয়াস হয়ে গেলাম। একজন কন্সটেবেলকে ডাকল সুবিমল, ‘দাসবাবুএকটু শুনুন।

আহাআপনি কি করে খবর পাবেন এই খুনগুলোর?’

মানে?’

ওদের শরীর তো বেঁচে আছে।

কি যাতা বলছেন?" আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করেছে।

আপনি শুনুন নাস্যার। রমেশবাবু ওদের শরীর থেকে আত্মা বের করে নেয়। আমি বুঝতে পারি। কিন্তু কাউকে কিচ্ছু বলেন না। রমেশবাবু যাদের আত্মা নিয়েছেনতাদের ব্যবহারও পালটে গেছে। আমি নিজে সাক্ষী স্যার। আপনি আমাদের বাঁচান। ওকে এরেস্ট করুন।

আপনি যদি বলেন যে আপনার মনে হয় একজন রাক্ষসতাহলে আপনার মাথার ডাক্তার দেখানো উচিৎ। সেই লোকটাকে এরেস্ট করা নয়,’ একটু কড়া গলায় বলল সুবিমল।

সুদীপ মহাপাত্র যেন ওর কোথায় কানই দিল না। বলতে লাগল, ‘জানেন স্যারকালকে উনি আমার এক বন্ধুর আত্মা নিয়ে নিয়েছেন। মেরে ফেলল ওকে। রমেশবাবুর ঘর থেকে বেরতেই আমি বুঝেছিলামযে  আর নেই। শুধু শরীরটা আছেআত্মা নেই। আর...’

আমাদের আর সহ্য হল না এই পাগলের প্রলাপ। কন্সটেবেলকে ডেকে বললাম পাগলটাকে বাইরে নিয়ে যেতে।

দুদিন পর সুবিমলের সাথে দেখা করতে থানায় গিয়ে যে দৃশ্য দেখলামতাতে বেশ অবাকই হলাম। থানার লকআপে মাথা নিচু করে বসে আছে সুদীপ মহাপাত্র। একজন কন্সটেবেলকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই পাগলটা আবার কি করল?’

খুন করেছে স্যার। তপন দত্ত বলে ওদেরই বিড়ি কারখানার একটা মজদুরকে।

কি?’ আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

আমাকে দেখে হঠাৎ লকআপের ভিতর থেকে সুদীপ মহাপাত্র চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘আমি খুন করিনিস্যার।  তো তিন দিন আগেই মরে গিয়েছিল। আমি শুধু শরীরটাকে মুক্তি দিয়েছি।

সাট আপ,’ বলে চেঁচিয়ে উঠল পাশের টেবিলে বসা সুবিমল।

কন্সটেবেলের দিকে তাকিয়ে বললাম, ‘কনফেশানে সই করেছে?’

হ্যাঁস্যার। তবে সই না। টিপ সই।

ওকে।

এই কেসটার ব্যাপারে আমি কৌতূহল বসত রমেশবাবুর সঙ্গেও দেখা করেছিলাম। ওনাকে দেখে মনে হলযে উনি আর কিছু হন না হনরাক্ষস হতে পারেন না। অত্যন্ত সাদা সিধা মানুষ। আর বিড়ি কারখানার বাকি মজদুররা কেউই ওনার সম্বন্ধে খারাপ কিছু বলল না। বরং জনা চারেক মজদুর তো ওনাকে প্রায় ভগবানই বলে ফেলল।

দুয়েকটা এদিকের কথা বলে রমেশবাবুকে সুদীপ মহাপাত্রের কথা জিজ্ঞেস করতে উনি বললেন, ‘সুদীপ ছেলেটা বেশ ভালো। তবে ইদানীং দেখছি কেমন একটু ভয়ে ভয়ে থাকে। কিরকম একটা সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে এদিক ওদিক তাকায়। দু তিন দিন অফিসে ডেকে ছিলাম। আসে নি। কি জানি কি হয়েছেতা হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছেনকিছু হয়েছে নাকি?’

নানা। সেরকম কিছু না। এমনি,’ এই বলে বিদায় নিলাম।

এই কেসটা নিয়ে আমার এক মন বৈজ্ঞানিক বন্ধুর সাথেও কথা বলেছিলাম।  বলে ছিল যে পৃথিবীতে এমন অনেক অসুখ আছে যার ব্যাখ্যা করা খুব কঠিন ব্যাপার। ওর মতে সুদীপ মহাপাত্রের সাইকোকাইনেসিস ছিল। যার ফলে সে নিজে থেকেই এমন সব জিনিষ কল্পনা করতে লেগেছিল যে গুলোর আসলে কোন অস্তিত্বই নেই। কিন্তু ওর কাছে সেই সব জিনিষ সত্যি।  সেগুলোকে দেখবেসেগুলোর সাথে কথা বলবে। আসলে সবটাই ওর মনের ভুল। সুদীপ মহাপাত্র ভেবেছিল যে রমেশবাবুর মধ্যে একটা রাক্ষস আছেযে মানুষের আত্মা চুরি করে। অনেকটা ওই জম্বির (zombie) মত। আর এই ধারনা থেকেই সে তপন দত্তকে খুন করে।  আসলে মানসিক রোগী

এই ঘটনাটা আর বছর দশেক আগে হলে সিধু জ্যাঠার কাছেই যেতাম। কিন্তু ...’

কিন্তু কি ফেলুদা?’ বোকার মত প্রশ্ন করলাম আমি

ফেলুদা বললেন, ‘আপনার রবার্টসনের রুবি গল্পটা মনে আছে?’

হ্যাঁসেই যেখানে ইনপেক্টার নিজেই…’

ঠিকসেই ঘটনার মাস তিনেক পর সিধু জ্যাঠা চলে গেলেন। হার্ট এট্যাক।

আমার কেন জানিনা হঠাৎ মনে হতে লাগল যে আমি আজ না আসলেই পারতাম। চোখের সামনে খুব যত্নে সাজানো কল্পনাটা যেন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে।

ফেলুদা আবার বলতে শুরু করলেন, ‘এই ঘটনার প্রায় সাড়ে তিন মাস বাদে সুবিমলের থেকে জানতে পারি যে সুদীপ মহাপাত্র আজীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়। কোর্টেও সে একই কথা চেঁচিয়ে বলেছিল, "আমি ওকে খুন করিনি। আমি ওকে মুক্তি দিয়েছি।  তো আগেই মরে গেছিল।জেল হওয়ার আগে যদিও ওর মানসিক পরীক্ষা করা হয়েছিল আর তাতে কোন মানসিক রোগ ধরা পড়েনি।

এই কেসটার কথা ভাবলে আজও মাঝে মাঝে হাসি পেয়ে যায়। যদিও এটাকে কেস বলা যায় কিনা জানিনা। কিন্তু যে একটা কথা কাউকে বলিনিসেটা নিয়ে আমি অনেক ভেবেও কিছু বুঝতে পারিনি। কেসটা একদম সোজা সাপটা ছিল। কিন্তু খটকা লাগল এক জায়গায়।

তপন দত্ত যেদিন মারা যায়সেদিন সন্ধ্যায় পোস্টমরটাম করার সময় আমিও গিয়েছিলাম সুবিমলের সাথে। পুলিশের ডাক্তার সান্যালবাবু আমাদের ডেকে পাঠান। সুবিমলকে বেশ চিন্তিত ভাবে উনি বলেন, ‘আপনি সিওর যে  লোকটা আজই মারা গেছে?’

হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’ বেশ অবাক হয়েই বলল ও।

ডাঃ সান্যাল ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘নাআসলে বডিটা এগজামিন করে মনে হচ্ছে যে এটা দিন তিনেকের পুরানো বডি। টাইম অফ ডেথ মনে হচ্ছে মিনিমাম বাহাত্তর ঘন্টা আগে। কি জানি আপনি যখন বলছেন তাহলে হয়তো আমারই কিছু ভুল হচ্ছে...’

তারপর আমাদের ঘরের ভীতরে নিয়ে গিয়ে বললেন, ‘দেখুনবডিটার পায়ের কাছে পোকা ধরে গেছে। বাহাত্তর ঘণ্টার আগে এই সিমটম আসেই না।

আমি আর সুবিমল দুজনেই দেখলাম। কিন্তু কেউই কিছু বললাম না।

আমি যদিও এরপর ব্যক্তিগত ভাবে আরও খানিক তদন্ত করেছিকিন্তু তাতে কোন ফল হয়নি। কিছু করেই আমি সুদীপ মহাপাত্রের কথার কোন প্রমাণ পাইনি। তবু খটকাটা যেন এখনও লেগেই আছে।

গল্পটা শেষ করে ফেলুদা ওনার হাতে ধরা সিগারেটটা এশট্রেতে ফেলে দিয়ে উঠে পড়লেন। বললেন, “আজ এইটুকুই থাক তাহলে?”

আমার মাথা তখনও ঝিলঝিম করছে। এও কি সম্ভবরেকর্ডারটা ব্যাগে ঢুকিয়ে বললাম, “ঠিক আছে ফেলুদা। আমি আজ উঠি।

ফেলুদা তার একপেশে হাসিটা হেসে মাথা নাড়ালেন। বললেন, “এই রকম আরও খান তিনেক অদ্ভুত কেস আছে। সবগুলোই তোপসের ব্যাঙ্গালোর যাওয়ার পরের। তাই গল্প হিসেবে পাবেন না। পরে কোনদিন সময় করে আসবেনশোনাব।



Source: Facebook 

Note: this is my personal blog. The copyright of the story lies solely and entirely with the author.


No comments:

Post a Comment