গোদরেজের নতুন সোফাটার ওপর বসে বেশ একটা গদগদ ভাব নিয়ে লালমোহনবাবু বললেন 'আপনি মশাই অনেকদিন বাঁচবেন। একটু আগেই আপনার কথা বলছিলুম আমার চাকরটিকে। কতদিন যাওয়া হচ্চে না ঐ আপনাদের তল্লাটে। আর তার একটু পরেই আপনি এসে হাজির।'
সব শুনে ফেলুদা একটু রসিকতার ধাঁচে বলল ' হ্যাঁ, আপনাকে না দেখতে পেয়ে রজনী সেন রোডের প্রতিটা ল্যাম্পপোস্টগুলো পর্যন্ত জটায়ুর অভাব বোধ করছিল। আর আজ আপনি আমার কথা ভাবলেন, আমি এসে হাজির আমার ভাইটিকে নিয়ে আপনার বাড়িতে। একে টেলিপ্যাথি ছাড়া আর কি বলবেন??'
লালমোহনবাবু বেশ জোড়ে একটা হাঁচি দিয়ে বললেন 'শুধুই কি টেলিপ্যাথি মশাই! মনের টান টা অনুভব করলেন না?? এত বছরের সম্পর্ক, তার তো একটা জোড় থাকবেই। কি বল ভাই তপেস?'
আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম ' তা তো বটেই। তা আপনার শরীর এখন কেমন? জ্বর তো আপনাকে খুব একটা কাহিল করতে পারেনি বলেই মনে হচ্ছে।'
বেশ একটা হামবড়া ভাব দেখিয়ে বললেন 'হুর! এসব ছুটকো ছাটকা সর্দি কাশি জ্বর
কি এ শর্মা কে অত সহজে কাত করতে পারে!! প্রখর রুদ্র যদি ছ'ছটা গুলি খেয়ে তার পরক্ষণেই উঠে দাড়িয়ে ফাইট করতে পারে, তবে তার স্রষ্টা হয়ে আমারও যে একটা স্পেশাল ক্ষমতা থাকবে না সেটা কি হয়??'
এরপর লালমোহনবাবু ওর চাকরটিকে ডেকে তিনকাপ চা আর সিঙাড়া দিতে বললেন। তারপর নিজের নতুন কেনা স্মার্টফোনটা দেখিয়ে জানতে চাইলেন কেমন হয়েছে। ফেলুদা দেখে জিজ্ঞাসা করল 'এই যন্ত্রটি আবার কবে কিনলেন? আপনি তো ল্যাপটপেই আপনার প্রয়োজনীয় কাজ সারতেন। তা হঠাৎ এটির প্রয়োজন পড়ল কেন??'
লালমোহনবাবু একটু কুন্ঠাভাব দেখিয়ে বললেন ' আসলে ইদানীং ছবি তোলার শখটা খুব বেড়েছে আর কি । সবসময় তো আর ক্যামেরা নিয়ে বেরোনো সম্ভব হয় না। তাছাড়া বাড়ির বাইরে সোশাল সাইটগুলি ব্যবহার করতে গেলে স্মার্টফোন টা থাকা যে আবশ্যক'।
ফেলুদা সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে টেবিলের উপর শ্রীনাথের রেখে যাওয়া চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিয়ে বলল 'তা ঠিক, কিন্তু আপনি এতদিন আপনার শরীর খারাপের খবরটা জানান নি কেন? এমনকি আমার ফোনগুলি পর্যন্ত ঠিকঠাক রিসিভ করতেন না! আপনার চাকরটির সাথে দেখা হওয়ায় ওই কথাটি বলল, আর আপনি ইদানীং বাড়ি থেকেও বের হচ্ছে না সেটাও জানাল।
লালমোহনবাবু বললেন 'ওসব কিছু না। আসলে ক'দিন নতুন লেখাটা নিয়ে একটু বিজি ছিলাম আরকি! হেঁ হেঁ হেঁ'।
ফেলুদা কোন উত্তর না দিয়ে একদৃষ্টে লালমোহনবাবুর দিকে চেয়ে রইলেন। তারপর হঠাৎ একলাফ দিয়ে উঠে ভদ্রলোকের ফুলহাতা পাঞ্জাবিটার বাঁহাতা টা এক ঝটকায় টেনে ছিঁড়ে ফেলল। অতর্কিত আক্রমণে লালমোহনবাবুও কোন বাধা না দেওয়ার সুযোগ না পেয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন।
কিন্তু তার ফলে যেটা আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠল তাতে আমার চক্ষু ছানাবড়া হয়ে গেল। ফেলুদা গম্ভীর কন্ঠে বলল 'নিজেকে ঘরে গুটিয়ে রাখা, কারও সাথে যোগাযোগ না রাখা, জ্বরের ভান করে বাড়িতে লুকিয়ে থাকা, এই গরমে বাড়ির মধ্যে ফুলহাতা পাঞ্জাবি পড়ে থাকা, এগুলি কোন স্বাভাবিক চালচলনের লক্ষ্মণ নয় লালমোহনবাবু। গতকাল আপনার চাকরটির সাথে রাস্তায় না দেখা হলে আমি ভাবতেই পারতাম না যে স্বনামধন্য রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ প্রখর রুদ্রের সৃষ্টিকর্তা জটায়ুর মাথার ব্যামো দেখা দিয়েছে'।
লালমোহনবাবু কোন কথার উত্তর না দিয়ে চুপচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। তখনও ভদ্রলোকের ছেঁড়া পাঞ্জাবির হাতাটা থেকে একটা হাতে আঁকা "নীল তিমি" উঁকি মারছে......
...শান্তপ্রিয়
No comments:
Post a Comment