Tuesday, 9 May 2023

হানিমুনে হন্তারক

 হানিমুনে হন্তারক

—————————————————

পর্ব ১ঃ আমার পরে নাই ভুবনের ভার

—————————————————

“কাল যাবে পাহাড়ে ট্রেক করতে? দুটো দারুণ ট্রেকিং রুট আছে। আমি খোঁজ নিয়েছি।”

“না।”

“না! তবে কি কনডাক্টেড ট্যুরে যাবে? কি সব ৫ পয়েন্ট, ৭ পয়েন্ট ট্যুর আছে বলছিল।”

“না”।

“আচ্ছা মুশকিল তো! কি করবে তাহলে সারাদিন”? 

বলেই বুঝতে পারলাম ভুলটা!

“হানিমুনে লোকে কি করে বলে তোমার ধারণা বলতো”?

“ তা বলে একটা সুন্দর জায়গায় গিয়ে লোকে একটু তো ঘুরেফিরে দেখবে নাকি..” মিনমিন করে বললাম।

“নাঃ, এত ভুল ধারণা তোমার মাথায়।এস, অবিলম্বে ঠিক করা দরকার এগুলো।”


হয়ে গেল।আজ সূর্যাস্ত দেখতে যাবার এখানেই ইতি আমি বেশ বুঝতে পারছি!


এত কান্ড করে এই জায়গাটা সিলেক্ট করলাম আমি। কালিম্পং থেকে একটু দূরে। একটা ছোট্ট গ্রামের মত জায়গায় এই রিসর্ট। মেরে কেটে দশ বারোটা গেস্টরুম আছে। অসাধারণ ভিউ। বিশাল লন গিয়ে মিশেছে খাদের কিনারায়।একটা রেলিং দেওয়া কংক্রিটের প্ল্যাটফর্ম আছে সিঁড়ি দিয়ে লন থেকে চার ধাপ নেমে গেলে…সেখানে দাঁড়ালে মনে হয় শূণ্যে ঝুলছি…নীচে অতলান্ত খাদ। দূরে পাহাড়।


দশ মিনিট হেঁটে গেলে দারুণ সানসেট পয়েন্ট। গোটা জায়গাটা বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত কেবল একটামাত্র কাঠের তৈরী ঝুলন্ত ব্রীজ দিয়ে। গাড়ি যায় সেই ব্রীজ দিয়ে, কিন্তু খুব আস্তে, একটা একটা করে । ব্রীজটার ধার থেকে মোটা মোটা কাছির মত দড়ি দিয়ে দুপাশের পাহাড়ে আটকানো লোহার আংটায় বাঁধা, জাহাজের নোঙরের মত। এমন একটা এক্সটিক, সেক্ল্যুডেড, সিনিক জায়গা খুঁজে বের করলাম। কত ট্রেকিং, হাইকিং, পিকনিকের প্ল্যান বানালাম, তার কিছু যদি হয়!


“কি কান্ড, রাত্তির এগারোটা! শুনছ?”

“শুনলাম। তাতে কি হল?”

“ডাইনিং হল বন্ধ তো দশটায়। খাব কি আমরা? আমার কিন্তু খুব খিদে পেয়েছে। তোমার পায়নি?”

“পেয়েছে। কিন্তু সে তো ডাইনিং হলে গিয়ে মিটবে না…”

“ধ্যাত্তেরি! আমি কিন্তু ক্র্যাঙ্কি হয়ে যাই খিদে পেলে…”

“ওই তো, ঘরে যা আছে-ফ্রুটস, কেক, চকলেট-ওতেই চালিয়ে নাও। যাতে রাতটা জাগতে পার।”

“রাত জাগবে কে?”

“দুজনেই। একজন জাগলে তো হবে না।”

“ওরে বাবারে। মরেই যাব আমি হানিমুনের ঠেলায়। ফিরে গিয়ে আর একটা বিয়ে কোর তুমি”।

“করতেই হবে মনে হচ্ছে । যা সারাক্ষণ পালিয়ে পালিয়ে বেড়াও তুমি!”

“কোথায় আবার পালালাম?”

“সর্বক্ষণই। এই ট্যুরের খোঁজ নিতে যাই লবিতে, নয়তো ঘুরে আসি সানসেট পয়েন্ট থেকে। কিছু না হোক লনে গিয়ে বসি…এই দ্যাখ আবার পালানোর জন্য রেডি…”


“আরে,  শুনলে না একটা শব্দ হল কেমন অদ্ভুত? কি হল বলতো? বাইরে গিয়ে দেখবে না একবার?”

“না। আমি গোয়েন্দাগিরি থেকে ছুটি নিয়েছি। পুলিশ আছে, দরকার হলে ওরা বুঝবে।”

“আমার কিন্তু কেমন সন্দেহ হচ্ছে।”

“এ হচ্ছে আমার সঙ্গে এত বেশী মেশার ফল…”

“হুম! আর মিশব না! কিন্তু তুমিই তো বল বেড়াতে গেলেই নাকি রহস্য এসে পড়ে তোমার ঘাড়ে।”

“এখন আমি কোন কারণেই তদন্তে জড়াব না। দেয়ার শ্যুড বী এ লিমিট ট্যু এভরিথিং। আর তুমিই বা উস্কাচ্ছ কেন আমাকে? ভেবেছ এভাবে ছাড়া পাবে? সেটি হচ্ছে না…”

“উফ্, শোন না, সব পেশায় কি হয় এমন? এক্ষুনি যদি কেউ এসে বলে এই হোটেলে কারো হার্ট আ্যটাক হয়েছে…যেতে হবে তো আমাকে, নাকি..?”

“ডেকেছে কি কেউ আমাকে? নোটিশ ঝোলান আছে তো!”


কথা শেষ করার আগেই দরজায় করাঘাত। 

“ইমপসিবল! এ কি হোটেল বুক করেছ? এ তো দেখি ডোন্ট ডিসটার্ব নোটিশের কোন মূল্যই দেয় না! চল দেখি কি এমন ব্যাপার ঘটে গেল…”


দরজা খুলতেই বাইরে দেখি পুলিশ।

“ওঃ ইজ ইট রিয়েলী ইউ! আই হ্যাভ হার্ড সো মাচ আ্যবাউট ইউ আ্যন্ড ইওর ফেমাস কেসেস..,” ইন্সপেক্টর বলে চলেন।

“হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ অফিসার?”

“ভেরি স্যরি ট্যু ডিসটার্ব ইউ, বাট দেয়ার হ্যাজ বীন এ বিগ বার্গলারি ইন দ্য রুম নেক্সট ট্যু ইউ। তাই আপনাদের কয়েকটা প্রশ্ন করার ছিল…বেশীক্ষণ লাগবে না।”

“ঠিক আছে”

“তো আপনি কি হলিডেতে নাকি কোন কেসে?”

“হানিমুন”।

“ওঃ । আই আ্যম রিয়েলি স্যরি। বাট দেন পসিবলি দ্যাট এক্সপ্লেইনস ইট…”

“এক্সপ্লেইনস হোয়াট?”

“ওরা যে বলল ডাইনিং রুমে সব গেস্টই প্রায় ছিল…আটটা থেকে দশটার মধ্যে, শুধু আপনারা আর তিনজন অতিথি ছাড়া। সেইজন্য আমরা একটু এনকোয়ারি করছিলাম। চুরিটা খুব সম্ভবতঃ তখনি হয়েছে।”

“কি করে জানলেন চুরিটা তখনি…ও ফরগেট ইট। আয়াম নট গেটিং ইনট্যু  দিস।”


“সে তো বটেই। জাস্ট রুটিন প্রশ্ন।  রাত আটটা থেকে দশটার মধ্যে কি আপনারা কেউ বেরিয়েছিলেন?”

“না, আমরা দুপুর দুটো নাগাদ লাঞ্চ থেকে ফিরেছি। তারপর থেকে কোথাও যাইনি।”

“তাহলে ডিনার…?”

“করা হয়নি।”

“কিন্তু…তাহলে…আয়াম স্যরি।কবে এসেছেন এখানে ?”

“গতকাল দুপুরে।” 

“আচ্ছা কিছু শুনেছেন বা দেখেছেন? গত দু ঘন্টায়?”

“আপনি সম্ভবতঃ মীন করছেন এই ঘরের বাইরে…তা হলে না।”


কি যে করে না…এটা বলাটা খুব দরকার ছিল নাকি! 

ইন্সপেক্টরের ঠোঁটে একটা হাল্কা হাসির আভাস দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল মনে হল।

“আমার আর কিছু জিজ্ঞাস্য নেই। গুড নাইট মিঃ মিত্র। গুডনাইট মিসেস মিত্র…”

“…ব্যানার্জি। মিজ ব্যানার্জি ।”


“সত্যি, ডাঃ টা অকাতরে বর্জন করে মিজ হয়ে গেলে কিন্তু মিত্রটা বলা যাবে না তো…”।

“না যাবে না। ডাঃ একটা প্রফেশনাল টাইটেল। সব জায়গায় ব্যবহার করার দরকার নেই। কিন্তু ব্যানার্জিটা আমার নাম, আমার আইডেন্টিটি। ওটা দুম করে বদলালে তো চলবে না।”

“দুম করে কোথায়? রীতিমত নিয়ম মেনে তো…”

“তুমিও তো মেনেছ একই নিয়ম। বদলাও না নিজের নাম। প্রদোষ ব্যানার্জি ….ভালই লাগবে শুনতে।”

“হ্যাঁ। তা মন্দ হবে না। কিন্তু ফেলু ব্যানার্জি কি আর অত ভাল শোনাবে? ফেলু মিত্তির হ্যাজ এ সার্টেন রিং ট্যু ইট। ওটা আর কিছুতে হবে না।”


“আচ্ছা কি চুরি হল বল তো? এত পুলিশ টুলিশ। নিশ্চয়ই দামী কিছু।”

“আমি জানি না, জানতে চাই না।”

“আচ্ছা আমরা তো এখানেই ছিলাম, পাশের ঘরে চুরি হল অথচ কিছু টের পেলাম না তো…”?

“ডোন্ট ইউ থিঙ্ক ,উই ওয়্যার এ লিটল বিজি?”

“হুম। তাতেই তো মিস করে গেলাম। নাহলে চোর বাবাজী ঠিক ধরা পড়ত। হোয়াট এ পিটি!”

“গোয়েন্দাটা কে? তুমি না আমি?”


“যাই বল, এত দূরের একটা হোটেল রিসর্ট। আশপাশে কিচ্ছু নেই। একটা ব্রিজ দিয়ে শুধু বহির্বিশ্বের সঙ্গে কানেক্টেড। গাড়ি ছাড়া যাতায়াত করা যায় না, কয়েকঘর হাতে গোনা গেস্ট…তারমধ্যে বড় চুরি! কেমন একটা হু ডান ইট টাইপ মনে হচ্ছে না? আগাথা ক্রিস্টি! এরপর হবে একের পর এক রহস্যজনক মৃত্যু… মার্ডার ইন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস।”


“মরবিড থটস কি তোমার টার্ন অনের কাজ করে?”

“আচ্ছা, স্যরি। আর বলব না। আসলে খুব অদ্ভুত লাগছে যে এতকিছু ঘটে যাচ্ছে আর তুমি কিচ্ছু ভাবছ না। নট ভেরী ফেলু মিত্তির লাইক, তাই না?”

“না, রবি ঠাকুর লাইক”।

“তার মানে?”

“মানে ‘আমার পরে নাই ভুবনের ভার’।দেশে আরো অনেক গোয়েন্দা পুলিশ আছে। তারা যা পারে করুক। এটা আমার জীবনের সম্ভবতঃ একমাত্র হানিমুন। তাও কেটে যাচ্ছে ক্রাইম কিম্বা হাইপোথেটিক্যাল ক্রাইম আলোচনা করতে করতে। “

“আচ্ছা বাবা, রাগ কোরো না। এই নাও, চকলেট খাও।”

***

হানিমুনে হন্তারক

——————————————————

পর্ব ২ঃ পরনে ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুর

——————————————————

পরদিন সকালে ব্রেকফাস্ট খেতে এসে দেখি এক বয়স্ক দম্পতি আর দুই বান্ধবী -এলা সেন আর সুলগ্না রায়-এসে বসে আছেন। এলা আর সুলগ্নার সঙ্গে কাল দেখা হয়েছিল লবিতে।দুই মধ্যবয়সিনী বান্ধবী, একসাথে ঘুরতে এসেছেন কলকাতা থেকে। ওঁরাও ট্যুরের খোঁজ করছিলেন। বয়স্ক দম্পতিকেও কাল লনে বসে থাকতে দেখেছিলাম। নাম জানি না। সবাই কেমন গম্ভীর আর চুপচাপ। পুলিশের জেরার ফল কি? নাহলে কালই তো সুলগ্না কত কথা বললেন। বেশ একটু অতি কৌতুহলী এবং গায়ে পড়া।কবে বিয়ে হয়েছে, লাভ না আ্যরেঞ্জ ম্যারেজ…সব প্রশ্ন করে ফেলেছেন মোটামুটি পাঁচ মিনিটের ভেতরে। আজ একবার মৃদু হাসিতেই চুপ। যদিও প্রদোষকে একবার আপাদমস্তক মেপে নিয়েছেন—কাল দেখতে পাননি কিনা! 

        

এক্ষুণি আবার ঢুকল আর এক হানিমুন কাপল। এ আর বলে দিতে হয় না। ভদ্রমহিলার লাল সালোয়ার-কামিজ, মেরুনের ওপর সোনালী কাজ করা শাল, হাত ভর্তি চুড়ি, মেহেন্দি আর মাথায় ডগডগে সিঁদুর—সবকিছু তার সাক্ষ্য বহন করছে। এদের কাল দেখিনি। হয়তো কাল বিকেলের দিকে এসেছে…আমরা তো তারপর আর বেরোইনি…


“তা কাকে অপরাধী ঠাউরালে শুনি ?” 

প্রদোষের চোখ হাতের খবরের কাগজে।

“সে আবার কি?”

“না, যে হারে সবাইকে জরিপ করছ, ভাবলাম কালকের ঘটনার সমাধান করে ফেলেছ কিনা।”

“তা তুমি তো কিছু করবে না, ওদিকে তপেশ আর লালমোহনবাবুও সঙ্গে নেই…”

“সে তো বটেই, ওদের না নিয়ে হানিমুনে আসাটা বড়ই ভুল হয়েছে।” 

চোখ এখন খেলার পাতায়।

“সবশুদ্ধ কজন গেস্ট আছে বলতো?”

“ভুল লোককে প্রশ্ন করছ মণি, আমি তোমার সাক্ষী নই।”

“সাক্ষী না, গোয়েন্দা না…কি তবে তুমি?” 

“আমার ধারণা ছিল আ্যডোরিং হাসব্যান্ড…বাট ক্লিয়ারলি দ্যাটস নট এনাফ!”


ব্রেকফাস্ট শেষে লবিতে এসে দেখি ট্যুরের ভ্যান এসে গেছে। কেউ একজন গেস্ট…একটি অল্প বয়সী ছেলে, অলরেডি ভেতরে বসে আছে।এলা, সুলগ্না, বৃদ্ধ দম্পতি আর বাবা-মা-ছেলের এক দল সব একে একে গাড়িতে উঠল। তার পর সবার শেষে উঠল ঐ অন্য হানিমুন কাপল।


আমরা ঘরে ফিরে এলাম।বলতে যাচ্ছিলাম,

“দেখেছ! হানিমুনে এসে লোকে যায় ট্যুরে, তোমার খালি—“

কিন্তু কথাটা শেষ করার আর সময় পেলাম না!


                         ———

ঘন্টা দুয়েক বোধহয় কেটেছে এমন সময় ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে ভেসে এল গাড়ি থামার এবং লোকজনের ছুটোছুটি আর ব্যস্ততার আওয়াজ।


নীচে নেমে দেখি কালকের সেই পুলিশ ইন্সপেক্টর।

“গুড মর্নিং মিসেস মিত্র , আই মীন মিসেস ব্যানার্জি!”


মিজ! মিজ ব্যানার্জি! মনে মনে গুমরোই আমি। মিসেস ব্যানার্জি আমার মা, আমি নই। যাকগে এ আর কত লোককে বোঝাব।


“গুড মর্নিং। কি ব্যাপার, একটা গোলমাল শুনলাম মনে হল…”

“হ্যাঁ , আর বলবেন না! ঐ ট্যুর বাসে গিয়ে একজন অতিথি খাদে গড়িয়ে পড়ে গেলেন। হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে তাঁকে। বাকীরা ফিরে এসেছেন। খুব শকড! তা মিঃ মিত্র..?”

“উনি স্নানে।আমি হৈ চৈ শুনে নেমে এলাম। তো কে পড়ে গেলেন খাদে?”

“সুলগ্না। সুলগ্না রায়”।

“মাই গড! কি করে ?”

“সে তো কেউ ভাল বলতে পারছে না। বাস থামিয়ে একটা ভিউ পয়েন্টে সবাই নেমে ঘুরে টুরে দেখছিল…হঠাৎ একটা আর্তনাদ শুনে ছুটে গিয়ে দেখে এই কান্ড!পায়ে তো সাধারণ চটি ছিল, ভাল জুতো নয়। তারপর বয়সও একটু হয়েছে। স্লিপ টিপ করে যেতে পারেন…”

“কেউ দেখেনি ওঁকে পড়তে?”

“না সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, ছবি টবি তুলছিল…”

“আর ওঁর বান্ধবী? এলা সেন?”

“তাঁর আবার হাঁটুর প্রবলেম। ফলে তিনি বাস থেকে নেমে ওখানেই একটা বেঞ্চে বসেছিলেন। বাকীরা সবাই অনেকগুলো খাড়াই সিঁড়ি ভেঙে ঝর্ণা দেখতে যায়।”

“কি কন্ডিশন সুলগ্নার এখন”?

“জানিনা! বেশ সিভিয়ার চোট। মাল্টিপল ফ্র্যাকচারস। 

দেখা যাক।”


“কি বাজে ব্যাপার! আর কালকের চুরিটা…”?

“সে তো আপনার পাশের ঘরে মিসেস বাজোরিয়ার। নেকলেস। ভীষণ নাকি দামী। ওঁরা খুব আপসেট। কিন্তু আমরা তো তল্লাসী করে এখনো কিছু পাইনি। ভাল কানেকশন তো ওঁর, দেখলেন না, কাল রাতের মধ্যেই তদন্তে আসতে হল! এখন চাপ দিচ্ছেন হোটেলের সব ঘর সার্চ করতে। ওপর মহল থেকে অর্ডার আসলে তাই করতে হবে…তখন হয়তো আপনাদের ঘরও…”

“সে করলে করবেন। কিন্তু এর মধ্যে যদি কেউ হোটেল ছেড়ে চলে যায়?”

“ নাঃ, খোঁজ নিয়েছি।আগামী তিনদিনের মধ্য কেউ ফিরছেন না। একটা কথা বলব, কিছু যদি মনে না করেন..”

“বলুন না…”

“একবার মিঃ মিত্রকে বলে দেখবেন? যদি একটু হেল্প করেন আর কি! মানে পুরোপুরি তদন্ত না, জাস্ট একটু আ্যডভাইস…আসলে এই বাজোরিয়া খুব হাঙ্গামা করবে।”

“আমি বলব, তবে লাভ হবে কিনা জানিনা। ও ছুটির মেজাজে আছে।”


“হল তোমার তদন্ত”? ঘরে ঢুকতেই দেখি প্রদোষ স্নান সেরে চুল আঁচড়াচ্ছে।

“তদন্ত আবার কি! সুলগ্না রায় খাদে পড়ে ইনজিওরড তাই…”

“ ঐ ভদ্রমহিলা যিনি ব্রেকফাস্ট টেবলে আমাকে আপাদমস্তক মাপছিলেন?”

“সে উনি একটু নাকগলানে ধরণের।কালকেই আমায় ধরেছিলেন নতুন বৌ তো শাঁখা সিঁদুর নেই কেন..”

“হুম! পক্ষীরাজই যদি হবে তো ন্যাজ নেই কেন! তাই বোধহয় সন্দেহ করছিলেন আমি তোমার সঙ্গে পরকীয়া করতে এসেছি কিনা…”

“পরকীয়া ভাবার কি আছে! আশ্চর্য তো!”

“আমার কথা হচ্ছে না মণি। হচ্ছে জেনেরিক মাসিমাদের কথা। যাকগে, এই স্পেসিফিক মাসিমা ঠিক আছেন আশাকরি?”

“হাসপাতালে আছেন। তা খোঁজ নিচ্ছ যে? তদন্তে জড়াবে নাকি? ইন্সপেক্টর বলছিলেন কিন্তু…আ্যডভাইসের জন্য।”


“পারহ্যাপস ইউ হ্যাভ ফরগটেন, বাট আই আ্যম স্টিল অন মাই হানিমুন! কিন্তু বার্গলারি অফ সাম স্টিংকিং রিচ পিপল আর মার্ডার এক নয়। পরেরটা কাইন্ড অফ এমারজেন্সী, যদি ঘটে।”

“কি করে জানলে স্টিংকিং রিচ?”

“আমাদের পাশের ঘরে তো বাজোরিয়া গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিসের হিমেশ বাজোরিয়া আ্যন্ড মিসেস বাজোরিয়া আছেন। চেকইন করার সময় রেজিস্টারে দেখলুম যে! তাঁরই কিছু হারিয়েছে তো? মূল্যবান নেকলেস না রোলেক্স ওয়াচ?”

“নেকলেস। তাহলে তুমি পুরো সুইচ অফ করতে পারনি বল! “

“ওগুলো আমার রিফ্লেক্স, স্পাইনাল কর্ডে আছে। চাইলেও বদলাতে পারি না।”


দুপুর বেলা খাবার ঘরে দেখলাম মিঃ আ্যন্ড মিসেস বাজোরিয়াকে। মুখ অন্ধকার করে বসে আছেন ভদ্রমহিলা। স্বামীর চেয়ে অনেক ছোট মনে হল। দ্বিতীয় পক্ষ নাকি কে জানে! কানে হীরের দুল ঝিকমিকিয়ে উঠছে। হাতের আঙুলে ইয়া বড় সলিটেয়ার। গলায় হারেও হীরের লকেট। এত গয়না পরে আবার লোকে বেড়াতে আসে নাকি! 


আরো একজনকে দেখলাম খাবার ঘরে। ইনি সকালে ট্যুর বাসে ছিলেন।অল্প বয়সী একটি ছেলে। এর সম্বন্ধেই বোধহয় বলছিলেন সুলগ্না, যে আর্টিস্ট আছেন একজন। ছবি আঁকেন নাকি। একাই এসেছেন, প্রকৃতির কোলে শিল্পচর্চা করতে। বেশ আর্টিস্ট সুলভ লম্বা আলুথালু চুল, কচি কচি দাড়ি আর ভাসাভাসা চোখ। মধুর একটা হাসি দিলেন আমার দিকে তাকিয়ে।


“তা আর্টিস্ট ভদ্রলোক কি তাঁর নেক্সট মিউজের সন্ধান পেয়ে গেলেন তোমার মধ্যে নাকি!” 

প্রদোষের চোখ মেনু কার্ডে , বসে আছে আর্টিস্টের দিকে পেছন করে…তবুও।

“কি করে পার বলতো? “

“অভ্যেস মণি, বহুদিনের অভ্যেস। ভদ্রলোকের নখের ফাঁকে ফাঁকে রং লেগে আছে অনেক। জিনসের প্যান্টেও

রঙের ছিটে। ঢুকলেন যখন দরজা দিয়ে একটু আগে, তখনই দেখলাম।”

“আর উনি যে আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন সেটা বুঝলে কি করে? তোমার কি পেছনেও দুটো চোখ আছে?”

“না চোখ দুটো সামনেই। সে দুটো দিয়ে দেখলাম হঠাৎ তোমার মুখে আলতো অপ্রস্তুত হাসি আর তারপর চোখ নামিয়ে অকারণে হাতের ঘড়ির ব্যান্ডটা ঘোরাতে লাগলে। কোন আ্যডমায়ারিং পুরুষের দৃষ্টিপাত ঘটেছে বোঝা কি খুব শক্ত?”

“তাতে চট নি?”

“বিন্দুমাত্র না। লোকে কি ভাবছে তাতে কি এল গেল! তুমি কি ভাবছ সেটাই আসল। তাতে তো এখন চিন্তার কারণ ঘটেনি, ঘটেছে কি?”

“ঘটলে নিশ্চয়ই আমি বোঝার আগেই তুমি পারবে বুঝতে। ফেলু মিত্তিরের সঙ্গে তো চালাকি নয়!কাউকে চিমটি কাটার কথা ভাবলেই জেল। যাকগে, ঠিক করেছ কি খাবে?”


খাওয়া শেষ করে বসে কফি খাচ্ছি এমন সময় টেবলে এসে বসলেন আর্টিস্ট।

“নমস্কার। আমার নাম নির্মাল্য অধিকারী।একটু বসতে পারি আপনাদের সঙ্গে?”

“অবশ্যই। আমি প্রদোষ মিত্র”।

“আমি মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি ।”

“—-ও গড। আই আ্যম সো স্যরি..” 

বলার কারণ আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করতে গিয়ে আমার কফির কাপটা উল্টে ফেলেছেন। 

“ভেরী স্যরি…আমি এক্ষুণি আপনাকে আর এক কাপ এনে দিচ্ছি” বলে আমাদের আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উঠে গেলেন। 


“এই নিন। আপনার ব্ল্যাক কফি। সুগার?”

“নো থ্যাঙ্কস। জাস্ট ব্ল্যাক। নো সুগার।”

“ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড…একটা প্রশ্ন ছিল। আর ইউ ট্যুগেদার?”

প্রদোষের মুখে এক চিলতে হাসি। কিছু বলছে না।

“অফ কোর্স উই আর! দিস ইজ মাই হাসব্যান্ড আ্যন্ড উই আর অন আওয়ার হানিমুন”! আমি প্রচন্ড চটেছি!

“ওহ। বাট..আপনাকে দেখে তো …মানে..”

“দেখে মানে? বিয়ে কি চিকেন পক্স নাকি যে গায়ে গুটি বেরোবে?”


“স্যরি, আপনি কিছু মনে করবেন না”, 

এবার প্রদোষকে বলছে। 

“আমি কিছুই মনে করি নি। কি ধরণের ছবি আঁকেন আপনি? আ্যবস্ট্রাক্ট, মর্ডান নাকি পোস্টমর্ডান”?

“অ্যাবস্ট্রাক্ট, মানে স্যুররিয়ালিজম মেইনলি!”

“আচ্ছা! সালভাদর দালি!”

“হ্যাঁ , মানে উনি তো নমস্য ব্যাক্তি। তবে আমারও ঐ জাক্সটাপোজিশন অব রিয়ালিটি আ্যন্ড ড্রিমস…মেটাফিজিক্যালের ওপর একটা পক্ষপাতিত্ব আছে আর কি…!”

“তার মানে দ্য আর্ট ইক্যুইভ্যালেন্ট অব মার্কেজ”?

“বলতে পারেন! অর দ্যাট অফ কুন্দেরা।”


নির্মাল্য সমঝদার পেয়ে খুশী মনে হচ্ছে! তা যতই দালি, কুন্দেরা আর মার্কেজ কপচাক না কেন, ভেতরে ভেতরে যে কত প্রাচীনপন্থী চিন্তা ভাবনা! কফিটা এখনো চুমুক দেবার মত ঠান্ডা হয়নি। দূর হোকগে ছাই, বসে বসে আর ক্ষ্যান্তবুড়ির দিদিশাশুড়ির থেকে মর্ডান আর্টের ব্যাখ্যা শুনতে পারি না।

“আমি ঘরে যাচ্ছি প্রদোষ, তোমাদের কথা হয়ে গেলে তুমি এস”।

“কফিটা?” নির্মাল্য জিজ্ঞাসা করে।

“ইটস ফাইন। আই আ্যম ডান ফর নাও।” 

আমি ঘরের দিকে হাঁটা লাগাই।


“কি ব্যাপার? দুম করে উঠে চলে এলে যে?” প্রদোষ ফিরেছে।

“জান না কেন? কি রিগ্রেসিভ মিসোজাইনিস্ট ঐ নির্মাল্যটা..”

“এটা একটু আনফেয়ার। ও জানবে কি করে?

কিন্তু একটা খবর পাওয়া গেল।কাল নির্মাল্যও ডাইনিং রুমে যায়নি ডিনার খেতে।”

“তাহলে ঐ চোর!”

“আরে সে তো আমিও যাইনি। তা বলে কি আমি চোর?”

“তুমি যা করছিলে তখন ও-ও কি তাই করছিল?”

“আনলাইকলি!”

“তবে? বাজে যুক্তি যত!  আর তুমি কি পুরো তদন্তে নেমে পড়লে?”

“না তো! আমি জাস্ট তোমাকে খবরটা দিলাম। যদি রাগটা একটু পড়ে এই ভেবে!”

“চারিদিক হাঁদা লোকে ভরে গেছে।এসে থেকে অন্ততঃ পাঁচজনকে নামের ব্যাখ্যা দিতে হল। আমার নাম যদি সকালে তকাই, বিকেলে বিস্কুট আর সন্ধেবেলা রামতাড়ু হয় তো কার কি বল তো!”


“হুম। পরনে ঢাকাই শাড়ি কপালে সিঁদুর হলেই এত গোল হত না, বুঝেছ।”

“এটা কি আসলে তোমার ফ্যান্টাসি নাকি?”

“এটা সব বাঙালী পুরুষের ফ্যান্টাসি মণি…সেই রবি ঠাকুরের আমল থেকে।”

***

হানিমুনে হন্তারক

——————————————

পর্ব ৩ঃ চিত্রকর

——————————————

বিকেলে প্রদোষ নিজেই বলল, “চল একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।”

“যাক। ফাইনালি বোর হয়েছ তাহলে।”

“বোর আমি হইনি একটুও মণি। প্রমাণ চাও কি?”

“থাক থাক! আর প্রমাণ চাই না। চল বেরোই।”


দেখলাম লনে নির্মাল্য আঁকার সরঞ্জাম নিয়ে বসেছে।

আমাদের দেখে হাত নাড়ল। পাশে দাঁড়িয়ে ছবি দেখছে অন্য হানিমুন কাপল। নাম জেনেছি এখন। সৌভিক আর বর্ণালী। সৌভিকও খুব হাত পা নেড়ে কি বোঝাচ্ছে আর নির্মাল্য খুব মাথা নেড়ে সায় দিচ্ছে। সৌভিকও কি আর্টিস্ট নাকি! তাই হবে। ও-ও কি আ্যবস্ট্র্যাক্ট আঁকে? হবে হয়তো! মানুষকে দেখে কি আর বোঝা যায়? চাকুম চাকুম শব্দ করে ভাত খায় বটে, তবে বালিশের নীচে কাফকা রাখা আছে কিনা কে বলতে পারে!


বর্ণালী দেখলাম গদগদ হয়ে বরের দিকে তাকিয়ে আছে। ওর ফর্সা,গোলগাল, ভালমানুষ মুখে আর বুদ্ধির জৌলুসহীন দুচোখে অগাধ গর্ব।বৌকে ইমপ্রেস করাই যদি সৌভিকের উদ্দেশ্য হয় তো তাতে ও সফল।


প্রদোষকে ব্যাপারটা বলব বলে পাশে তাকিয়ে দেখি তাকিয়ে আছে খাদের দিকে, কপালে বিষম ভ্রূকুটি।

এ তো আমার চেনা জিনিস। গত ক’দিন দেখিনি বটে…

“কি ভাবছ? চুরির কথা”?

“চুরি ইজ নট মাই কনসার্ন। বাজোরিয়া তাঁর মিসট্রেসকে হীরের গয়না দিলেন কিনা বা সেটা চুরি হল কিনা…তাতে আমার কিছু যায় আসে না।”

“মিসট্রেস! মিঃ আ্যন্ড মিসেস বাজোরিয়া লেখা ছিল বললে যে খাতায়?”

“আর সেই একই খাতায় তো আমাদের মিঃ আ্যন্ড মিসেস লেখা ছিল না।কি প্রমাণ হয় তাতে?”

“মিসট্রেস তারই বা প্রমাণ কোথায় তোমার? শুধু ভদ্রমহিলার বয়স কম বলেই কি…”

“সে তো আছেই। তা ছাড়াও অনেক টেল টেল সাইন আছে।”

“যেমন?”


“যেমন চুরি হল ভদ্রমহিলার গয়না অথচ পুলিশের সংগে সব কথা বলছেন ভদ্রলোক। ধর তোমার যদি কোন নেকলেস হারায়…”

“একটু শক্ত ,গিভেন যে আমার নেকলেসই নেই কোন…”

“ও হ্যাঁ , তাও তো বটে। যা গন্ডগোল করলে বিয়ের সময়, গয়নার ওপর এম্বার্গো বসিয়ে…কাকীমা কিন্তু খেপচ্যুরিয়াস…”

“ড্যু ইউ ইভন হ্যাভ এ পয়েন্ট?”

“ওকে! ধর যদি তোমার মায়ের একটা দামী গয়না হারায়, তোমার বাবা কি করবেন?”

“ওরে বাবা…বাবা তো ছাতের সমান লাফ দেবে…”

“হ্যাঁ, তাতে তো ওঁর বিশেষ ব্যুৎপত্তি…”

“ভাল হবে না প্রদোষ। ভুলে যেও না যে উনি আমার বাবা আর এখন তোমার শ্বশুর…” 

“শ্বশুর কিসের সঙ্গে ভাল রাইম করে বল তো…ও কি চললে কোথায়?”

“যারা আমার বাবাকে অসুর বলে তাদের সঙ্গে আমি মিশি না…”


“তা এত পিতৃভক্তি ছিল কোথায়, যখন ইরাকের হয়ে শহীদ হতে ছুটেছিলে? আর তা ছাড়াও ওয়ার্ডটা আমি ব্যবহার করিনি কিন্তু …কটমট করে না তাকিয়ে বলনা, কি করবেন আমার পূজনীয় শ্বশুরমশাই গয়না হারালে?”

“বাড়ি মাথায় করবে…আর মাকে যাচ্ছেতাই করবে, এক ওটা পরে বেরোনোর জন্য, দুই কেয়ারলেস হবার জন্য …ওঃ নাও আই সী ইওর পয়েন্ট!”

“এক্সাক্টলি! হারানোর জন্য বাজোরিয়াকে ঐ মহিলাকে দোষারোপ করতে দেখলাম না…বরং সান্ত্বনা দিতেই ব্যস্ত… ডোন্ট ওরি বেবী, দিল ছোটা মত কর জানু…সেদিন ডাইনিং রুমে বসে বলে যাচ্ছিলেন সমানে।”


“বেশ, বাজোরিয়া তাঁর মিসট্রেসকে নিয়ে এসেছেন। যার গয়না চুরি যদি তোমার কনসার্ন নয়। তো কনসার্নটা কি?”

“সুলগ্না রায়।”

“তার মানে? তুমি কি ভাবছ ওটা আ্যকসিডেন্ট নয়?”

“ওরকম ট্যুরিস্ট পয়েন্টে বেড়াতে গিয়ে ক’টা লোক পড়ে যায় এভাবে? উনি এমন কিছু বৃদ্ধা না, এখন বর্ষাকালও না যে চারদিক পেছল…”

“কিন্তু এখানে ওকে কে মারতে যাবে? ট্যুর বাসে তো ঐ ক’জন লোক ছিল…দাঁড়াও, দাঁড়াও! তুমি কি বলছ তাদের কেউ? কিন্তু তারা কেউ কি আগে ওকে চিনত নাকি? হঠাৎ করে একদিন বেড়াতে গিয়ে ঠেলে ফেলে দেবে?”

“চিনত না যে সেটা শিওর হচ্ছ কি করে?।”

“ওর বান্ধবী, ঐ এলা সেন কিছু জানবে না?”

“জানতে পারে… দেখা যাক। উনি তো মনে হয় এখনো কালিম্পং হাসপাতালে।ফিরে এলে হয়তো জানা যাবে। চল ফেরা যাক”। 

হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা চলে এসেছি আমরা।


ফেরার পথে দেখলাম আর্টিস্ট বদল হয়ে গেছে। নির্মাল্য এখন দর্শক। ক্যানভাসে তুলি বোলাচ্ছে সৌভিক। আড়চোখে চেয়ে দেখি বাপরে, এ তো দেখি কিউবিজম ধরেছে, পিকাসোর চ্যালা! ‘দ্য উইপিং উওম্যান’ আঁকা হচ্ছে মনে হয়—লাল রঙের ব্রাশ স্ট্রোক পড়ছে ছবির টুপিতে। বর্ণালী প্রেমে আর গর্বে ঝুঁটিওয়ালা লোটন পায়রার মত গাল ফুলিয়ে ইতি উতি চাইছে।


“তোমার নো ইনভেস্টিগেশন রেসোলিউশন তাহলে এখানেই শেষ”? ঘরে ঢুকে বলি আমি।

“জানি না…সামহাউ মনে হচ্ছে থিংস আর আ্যবাউট ট্যু টার্ন ন্যাস্টি…এ লট মোর ন্যাস্টি।”

ওর কপালের ভ্রূকুটি এখন বড্ড গভীর।

যতক্ষণ ও ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধ্বংস করল ততক্ষণে আমি মিস্ট্রিজ অব আগাথা ক্রিস্টি থেকে ডেথ অন দ্য নাইলটা আর একবার পড়তে শুরু করে দিলাম।


“চল গিয়ে খেয়ে নিই। রোজ রোজ ডিনার মিস করা কিছু কাজের কথা নয়।” খানিক পরে এসে বলল প্রদোষ।


কিন্তু নির্বিঘ্নে ডিনার কপালে থাকলে তো! 

সবে খাবারটা টেবিলে এসেছে, হঠাৎ দেখি বর্ণালী কেমন উদভ্রান্তের মত আমাদের টেবিলে এসে সোজা প্রদোষকে বলল,

“আপনি ডাক্তার না? ওরা রিশেপশনে বলল…একটিবার আসুন না! ও কেমন জানি করছে…”

“আমি না, ডাক্তার উনি”, আমাকে দেখিয়ে বলল প্রদোষ। 

“কার শরীর খারাপ? আপনার হাসব্যান্ডের?”

আমরা দুজনেই ততক্ষণে দৌড়েছি বর্ণালীদের ঘরের দিকে।

ঘরে ঢুকেই দেখি সৌভিক খাটের ওপর চিৎ হয়ে পড়ে আছে। দেখে আমার একটুও ভাল লাগল না। মুখে গ্যাঁজলা উঠছে, চোখের তারা স্থির। মাসল স্প্যাসম হচ্ছে সিভিয়ারলি। 

আমি প্রদোষের দিকে তাকাতেই ও বলে উঠল,

“তোমার ব্যাগটা তো? এনে দিচ্ছি এখনি…”বলে ছুটে বেরিয়ে গেল।


আমার কাছে এরকম সিচ্যুয়েশন হ্যান্ডল করার মত প্রায় কিছুই ছিল না। তবু যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম…ফেনোবারবাইট্যাল ইঞ্জেকশন দিলাম…শেষে সি পি আর অব্দি দিলাম…কিন্তু কিচ্ছু হল না। সৌভিকের ডেথ সার্টিফিকেটটা একঘন্টা পরে আমাকেই লিখতে হল। অদ্ভুত লাগছিল।দুঘন্টা আগেও লোকটা হাসছিল, ঘুরছিল, ছবি আঁকছিল…আঙুলে এখনো লাল রং লেগে আছে পেইন্টের…আর এখন দেহটা আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে আসছে। একটু পরে রিগর মর্টিস সেট ইন করে যাবে।


বর্ণালীর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। এখনো ভীষণ শকড তাই খুব বেশী কান্নাকাটি করেনি। কেমন থম মেরে বসে আছে। মাথায় এখনো ডগডগে সিঁদুর, হাতভর্তি লাল চূড়া, শাঁখা-পলা, মেহেন্দির রং….আমি নিজে এসব সিম্বলিজমের ঘোর বিরোধী, মনে হয় প্যাট্রিয়ার্কাল হেজিমনি। কিন্তু আজ সৌভিকের নিথর দেহটার দশ ফুটের মধ্যে বর্ণালীকে এইভাবে দেখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতায় মনটা ভরে যাচ্ছিল। 


অন্য সব অতিথিরা এসে দেখে গেছে, এমনকি মিঃ আ্যন্ড মিসেস (নাকি মিসট্রেস ) বাজোরিয়াও। মিঃ বাজোরিয়া ওঁর দামী বড় গাড়িটা ড্রাইভার শুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছেন।ওতে করে সৌভিকের দেহ আর বর্ণালীকে নিয়ে যেতে হবে প্রথমে কালিম্পং হাসপাতালে। হয়তো পুলিশকেও বলতে হবে। মৃত্যুর কারণ খুব পরিস্কার নয়, পোস্টমর্টেম করলে ভাল হয়। তাছাড়া ওর বাড়ির লোককে ইনফর্ম করা, বর্ণালীকে ফেরৎ পাঠানোর ব্যবস্থা করা…অনেক কাজ। বর্ণালী এমনিও খুব চৌখস মেয়ে নয়, তার ওপরে এখন তো একেবারে দিশেহারা দশা। সঙ্গে কাউকে যেতে হবে। প্রদোষ যাবে বলেই দিয়েছে। ও পুলিশ স্টেশনেও যাবে, ইন্সপেক্টর সহায়ের সঙ্গে কথা বলবে। নির্মাল্যকেও সঙ্গে যেতে বলেছিল। কিন্তু ও বলল, “দোহাই মিঃ মিত্তির…আমি আর্টিস্ট মানুষ…এইসব ডেডবডি, পুলিশ…আমি পারব না, আমায় ছেড়ে দিন।” রিসর্টের এক কর্মচারী সঙ্গে যাবে ঠিক হয়েছে।


বর্ণালীকে ঐ বয়স্ক দম্পতি সঙ্গে করে নীচে নিয়ে গেছেন। প্রদোষ, রিসর্টের ম্যানেজার, নির্মাল্য আর বাবা-মা-ছেলের বাবা মিলে বডি গাড়িতে তোলার ব্যবস্থা করছে দেখে আমি ঘরে চলে এলাম।


আজও কিছু খাওয়া হল না রাতে আমাদের। কিন্তু  কালকের সঙ্গে আজকের না খাওয়ার কত তফাৎ! ভাবতে ভাবতেই প্রদোষ ঘরে ফিরেছে।


“ওয়েল, আওয়ার হানিমুন ইজ নাও অফিসিয়ালি রুইনড”।

“সীমস সো।” আমি সায় দিই।

“শোন, আমি তো যাচ্ছি। কাল দুপুরের আগে মনে হয় না ফিরতে পারব। তুমি কিন্তু সাবধানে থাকবে..আ্যন্ড আই মীন ইট!”

“কি বলতে চাইছ?” আমি ভুরু কুঁচকে তাকাই।

“বলছি প্রথমে সুলগ্না, তারপর সৌভিক…”

“এই দুটো কি কানেক্টেড?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“মে বী, মে বী নট। আমি এখনো জানি না। তার সংগে ঐ চুরি…”

“তুমি তো বললে চুরিটায় তুমি ইনটারেস্টড নও…”


“ইনটারেস্টড তো আমি কোনটাতেই ছিলাম না মণি!এসেছিলাম তো তোমার সঙ্গে একান্তে সময় কাটাব বলে। জীবনে কখনো যা করিনি তাই করেছিলাম…ক্ল্যু চোখের সামনে এসে পড়লেও মুখ ঘুরিয়েছিলাম পাছে জড়িয়ে যাই। তা সেই জড়াতেই হল। আর হলই যখন তখন ফেলু মিত্তির তো এর শেষ না দেখে ছাড়বে না!”


“তুমি কিন্তু ফোন কোর।” মনে করিয়ে দিই আমি।

“সে তো করবই। আর তুমি চোখ কান খোলা রেখ।

বুদ্ধিমতী মেয়ে তুমি, কিন্তু আ্যট টাইমস ইম্পালসিভ। সেটাই একটু বুঝে চল। লিসন ট্যু ইওর হার্ট আ্যন্ড লিসন ট্যু ইওর হেড…”

“আ্যন্ড ট্যু ইওর হাসব্যান্ড” গম্ভীরভাবে যোগ করি আমি।

“সে তো কত করবে আমার জানা আছে!”


ও দু-একটা জিনিস গুছিয়ে নিয়ে রেডি হয়ে নিল বেরোনোর জন্য। রিভলবারটাও সঙ্গে নিল।


“জান, ডাক্তার আর গোয়েন্দার বিয়ে করা উচিত নয়! পেশার দাবী এসে পড়ে সব সময়”।

আমি বলে উঠি অবশেষে।

“খারাপ লাগছে, না মণি? শুধু আজকের রাতটা তো! একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দাও, কেমন? আসি আমি।”

***

হানিমুনে হন্তারক

————————————————

পর্ব ৪ঃ স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান

————————————————

প্রদোষ চলে যাবার পরে প্রথমে ঘরটা একটু গুছিয়ে ফেললাম। তারপর ভাল করে চুল টুল আঁচড়ে, বেঁধে, মুখে ক্রীম টীম লাগালাম। মানে যেসব কাজ একজন রেসপেক্টেবল মহিলার রোজ করা উচিত কিন্তু আমি জীবনে করি না—সেগুলো সব করে ফেললাম।


মা দেখলে বলতো ‘মিনি রে, বিয়ের পর তুই কত বদলে গেছিস’!লোকেদের এই এক অদ্ভুত কনসেপ্ট, বিয়ের পর নাকি ধাঁই করে সব কিছু বদলে যায়, বিশেষ করে মেয়েদের। কেন, কিভাবে তার কোন উত্তর নেই কিন্তু। নাম-গোত্র -ঠিকানা সব বদলে দাও…আচ্ছা প্রদোষের গোত্র কি? আমারই বা গোত্র কি ছাই? কাশ্যপ মনে হয়…নাকি ওটা মামাদের…!! ধুর কি নিয়ে পড়লাম আমি এখন! খালি পেট আর গরম মাথায় এই হয়!


প্রথমে ভেবেছিলাম বেশ ক’দিন পরে অবশেষে টানা ঘুমিয়ে বাঁচব। কিন্তু তা হল না।বিছানাটা একার পক্ষে বড্ড বড় লাগছে। বালিশগুলো হোপলেস;এই ক’দিনেই ওর হাতে মাথা রেখে ঘুমোনটা অভ্যেস হয়ে গেছে। পারহ্যাপস আই আ্যম  মিসিং হিম! তারপরেই মনে পড়ে গেল ও তো শুধু এক রাতের জন্য গেছে…আর বেচারা বর্ণালীর পাশে সৌভিকের নিথর দেহ আর কখনো জাগবে না। আমি কি সেলফিস! 


এইসব বিভিন্ন কনফ্লিকটিং ইমোশনে ঘুমটা আরো চটকে গেল। ঘড়িতে দেখলাম এগারোটা পাঁচ। 

তারপর চিত হয়ে শুলাম, উপুর হয়ে শুলাম। খাটের ডান দিকে শুলাম, বাঁদিকে শুলাম, আড়াআড়ি শুলাম, কোনাকুনি শুলাম…একটা বালিশ নিলাম, দুটো বালিশ নিলাম, কম্বল ঢাকা নিলাম, কম্বল ফেললাম…কিন্তু ঘুম কিছুতেই এল না। ঘড়িতে সবে এগারোটা আটাশ।

তখন দুত্তেরি বলে উঠে পড়ে ভাবলাম একটু বাইরে হেঁটে আসি।


বাইরে বেরিয়ে দেখি বয়স্ক দম্পতি আর বাবা-মা-ছেলের বাবা লনে বসে গল্প করছেন নীচু স্বরে।আমাকে দেখে হাত নাড়লেন। মুখ গম্ভীর। আমি পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়ালাম ওদের কাছে। একটা ফাঁকা চেয়ারে বসতে ঈশারা করলেন ঐ ‘বাবা’।


“নমস্কার । আমার নাম সায়ক। সায়ক বসু।আপনি তো বোধহয় ডাক্তার, তাই না?”

“হ্যাঁ । আমি মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি ।”

“আর আমি পি মজুমদার আর ইনি মিসেস মজুমদার।” বয়স্ক ভদ্রলোক পরিচয় দেন।

“ঘুম আসছে না বুঝি আপনাদের কারোরই”? আমি হেসে জিজ্ঞেস করি।

“নাঃ যা সব ঘটে গেল, প্রথমে তো ঐ চুরি।”

“হ্যাঁ !সবাই যখন ডিনার খেতে গেছিল, তখনি নাকি…”

“আমরা সেদিন ডিনার খেতে যাইনি অবশ্য।আমার মিসেসের আসলে খুব অম্বল হয়েছিল, আমারও পেটটা ভার ভার লাগছিল।আসলে লাঞ্চে সেদিন অবেলায় বেশী খাওয়া হয়ে গেছিল।”বললেন পি মজুমদার।


আচ্ছা, তাহলে এরা দুজনও ঐদিন ডাইনিং হলে ছিলেন না!


“তার মধ্যে আবার সুলগ্না দেবীর এই খবর। পৃথা, মানে আমার বৌ তো আর থাকতেই চাইছে না এখানে। বলছে চল, কাল দুপুরের মধ্যে চলে যাই। বেড়ানোর মুডটাই নষ্ট। দেখি রিসর্টের এরা রিফান্ড দেয় কিনা!”সায়ক বসু বলে ওঠেন।

“সুলগ্না দেবীর আবার নতুন কি খবর?” আমি জানতে চাই।

“ওমা তুমি জান না? মারা গেছেন তো উনি আজ সন্ধেবেলা। হাসপাতালে। ইন্সপেক্টর সহায় ফোন করেছিলেন এখানকার ম্যানেজারকে। তা উনি আবার বললেন তোমার মেসোমশাইকে।” 

হড়বড় করে বলে দিলেন মিসেস মজুমদার । কোন ফাঁকে যে পি মজুমদার আমার মেসোমশাই হয়ে গেলেন তাও বুঝলাম না।


“ওঃ তাহলে সৌভিকবাবু যে সময় মারা যান প্রায় সেই একই সময় সুলগ্নাও…” আমি বলে উঠি।

“এত খারাপ লাগছে ঐ বর্ণালীর জন্য, জান…! ভারী লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে…” বলে আমাকে আর একবার অপাঙ্গে দেখে নেন মিসেস মজুমদার।

“এই বিকেলেই তো ওরা আমাদের ঘরে এল, আমরা এক সঙ্গে চা খেলাম, তারপর ওরা ছবি আঁকা দেখতে গেল। যাই বল বাপু, ঐ আর্টিস্টকে কিন্তু আমার কেমন জানি লাগে…কেমন একালসেঁড়ে ধরণের। তবে তোমার সঙ্গে তো খুব কথা বলে দেখি।” এটা মিসেস মজুমদারের অভিযোগ কিনা ঠিক বুঝলাম না!

“আর কেউ ছিল, চা খাবার সময়?” আমি জানতে চাই।

“না তো! আর কে থাকবে? শুধু ওরা দুজন, আমি আর তোমার মেসোমশাই।” 


“সৌভিকের কি হয়েছিল মিসেস ব্যানার্জি ?” 

আমার আর সায়ককে শুধরানোর এনার্জি নেই।

“জানি না। মাসল স্প্যাজম, হাই টেম্পারেচর..শেষে ব্রীদিং প্রবলেম। ক্যুড বী মেনি থিংগস। অথচ বর্ণালী যতদূর জানে ওর কোন বড়সড় মেডিক্যাল কন্ডিশন ছিল না…”

“আরে ওদের তো দুদিন বিয়ে হয়েছে…কি করে জানবে সব! “ বলে ওঠেন মিসেস মজুমদার ।

“তোমাদেরও তো..” জানতাম এই প্রশ্নটাই আসছে এবার।


“হ্যাঁ। ১২ দিন হল বিয়ে হয়েছে।”

“সে কি গো! বিয়ের জল তো শুকোয়নি এখনো। হাত কান গলা সব খালি…” 

মিসেস মজুমদার অটোমেটিক মাসিমা মেশিনগান চালিয়ে দিয়েছেন।

“আঃ থামো না তুমি। আজকালকার মেয়েরা কি সব তোমার মত নাকি? তার ওপর ডাক্তার … “

আমার সদ্য লব্ধ মেসোমশাই উদ্ধার করেন আমাকে।

“তা মিঃ ব্যানার্জি কখন ফিরবেন কাল কিছু বলেছেন?”


সেটা আবার কে? এক মিনিটের জন্য ধাঁধিয়ে যাই। তারপরেই বুঝলাম প্রদোষের কথা বলছে। এটাও আর শুধরে দেবার এনার্জি নেই। 


“বলেছে তো কাল দুপুরে…দেখি! আমি একটু উঠি, ঐদিকটা থেকে ঘুরে আসি…” একটা অনির্দিষ্ট দিক দেখিয়ে বলি আমি।

“সাবধানে যেও বাপু। খাদের ধারে ঐ পেলাটফর্মে যেও না….যা সব হচ্ছে চারধারে…” 

মিসেস মজুমদার বলে ওঠেন।


কিছুটা এগিয়ে দেখি বাস্কেটবল কোর্টের চড়া আলোয় ইজেল নিয়ে বসে আছে নির্মাল্য। আমাকে দেখে হেসে হাত নাড়ল।


এগিয়ে গেলাম খাদের কিনারার ‘পেলাটফর্মে’।এখানে আলো কম, কিন্তু অপার্থিব সুন্দর লাগছে। এতক্ষণে মাথাটা একটু ঠান্ডা হচ্ছে। 


পেছনে পায়ের মৃদু শব্দ। কে আসছে, নির্মাল্য নাকি?

ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি মিসেস বাজোরিয়া। কাছ থেকে দেখে মনে হল চেহারায় আলগা চটক আছে, পোশাক-আশাকও দামী, কানে হীরের দুল এই অন্ধকারেও ঝকমক করছে…কিন্তু কেমন একটা আনক্যুথ চেহারা।কাজল আর আইলাইনারের প্রলেপে ঢাকা চোখগুলো কেমন মাছের চোখের মত, প্রাণহীন, দীপ্তিহীন, বুদ্ধিহীন। তবু ভদ্রতার খাতিরে আলতো হাসলাম ওঁর দিকে তাকিয়ে। 


“আপ ক্যায়া সচ মে মিঃ মিত্রা কি বিবি হ্যায় ইয়া উনকি গার্লফ্রেন্ড?”

আরে! এ তো উল্টা চোর কোতোয়াল কো ডাঁটে!

“এক্সকিউজ মী”!

“নেহি, আ্যয়সে তো আপকে পাস কঁহি কোঈ সুহাগনবালি কুছ চীজ নেহি হ্যায়, উপরসে সারনেমস ভী আলগ..”

(ওহ গড, নট এগেন। আই কান্ট ড্যু দিস এনি মোর, নট ফর দ্য আম্পটিনথ টাইম। আমি কি এবার ম্যারেজ সার্টিফিকেটটা মাদুলি করে গলায় ঝুলিয়ে বেড়াব…)


“আ্যয়সে তো হামারা ভী ওহি কিসসা হ্যায়, ম্যায় কাঁহা আসলি মিসেস বাজোরিয়া হুঁ। সো তো উয়ো চুড়েল হ্যায়, বৈঠি হ্যায় জো আলিপুর কি বাংলে মে।” চড়া লিপস্টিক লাগানো ঠোঁটের ফাঁকে এখন হাসির রেখা।


(আচ্ছা! তো ইনি ভেবেছেন উই আর দ্য বার্ডস অব সেম ফেদার। তাই ভাব করতে এসেছেন!  দেখা যাক কোন তথ্য পাওয়া যায় কিনা…চুপচাপ থাকি এখন।)


“উস চুড়েল নে তো জাসুস ভেজনে কি প্ল্যান ভী বানায়া থা। হামনে তো পেহলে শোচা থা কি ইসি লিয়ে আপ দোনো হামারে বগল বালে কামরা লিয়ে, হানিমুনকে বাহানে। মিঃ বাজোরিয়া তো ইয়ে জাগা ছোড়কে জানে কি ভি শোচ রহে থে…”

“ফির? আপ ক্যায়সে কনভিন্স হুয়ে কি হাম আপকে পিছে নেহি আয়ে হ্যায়?”


“আরে আপ দোনো কামরে মে সে নিকলে কাঁহা? 

না ডাইনিং রুমমে, না বাহার লন মে, না কিসি ট্রিপ পে…আগর হামারে পিছে আয়ে হোতে তো হামকো ফলো নেহি করতে হর জাগা? বাকী সারেঁ গেস্ট কহতে ভী থে কি আপকি কামরে কে বাহার রাতদিন ডোন্ট ডিস্টার্ব বোর্ড লাগা রহতা হ্যায়…উয়ো হানিমুন কাপল সৌভিক ঔর বর্ণালী সে ভী জ্যাদা…বেচারে…” শেষেরটা নিশ্চয় সৌভিকদের জন্য বলা!


(ওয়াও! দ্যাটস এ লট অফ ইনফো ট্যু প্রসেস। আমাদের কেন্দ্র করে যে গসিপ মিল চলছিল কে জানত।)


“আপকো উয়ো নেকলেস মিলি ক্যায়া”?

(কথাটা ঘোরানো দরকার)।

“আরে কাঁহা। বহত কিমতি হ্যায়। ইসি লিয়ে উনকি বিবি জাসুস ভেঁজনেবালে থে…তাকি উসে প্রুফ মিলে অউর উয়ো ইয়ে হরপ লে পায়ে। চুড়েল কাহিকি!”


“কাঁহা সে গায়েব হুয়া উয়ো? আপকি কামরে সে?”

“আউর নেহি তো ক্যায়া? উসদিন তো হাম ডাইনিং রুম মে খানা খানে গেয়ে…উসকে পহলে ম্যায় উয়ো নেকলেস পহনি থী, জাস্ট দেখনে কে লিয়ে। তব তো ঠিক থা।যাকে খানা খায়ে, অউর লৌটকে আয়ে তো গায়েব থী উয়ো। “

“বীচ মে আপ দোনো মে সে কোঈ কামরেমে নেহি লৌটে?”

“ম্যায় তো পুরি টাইম উধারই থী। মিঃ বাজোরিয়া গেয়ে থে পাঁচ মিনিট কে লিয়ে, মগর রুমমে নেহি, বাহার কারকে পাস। ড্রাইভার সে বাত করনে কি লিয়ে নেক্সট দিন কে প্রোগ্রাম কে বাঁরে মে…”


“খ্যার ছোড়িয়ে উয়ো সব। বাতাইয়ে আপ অর মিঃ মিত্রা কে রিলেশন কিতনে দিনকি হ্যায়?”

মাসকারার আড়ালে ঢাকা কুতকুতে চোখ দুটো গসিপের সম্ভাবনায় অল্প জ্বলে ওঠে।

“এহি কুছ দো সাল কি…”

“আচ্ছা! মুঝে তো লাগা কি এক আধ মহিনা হোগা! ইতনা চিপককে যো রহতে হ্যায়! বিবি হ্যায় উনকি?”


রসালো খবরের লোভে আরো এগিয়ে আসেন উনি। দামী কোকো শ্যানেল পারফিউমের উগ্র গন্ধ সত্ত্বেও আমার বিবমিষা অদম্য হয়ে উঠছে।


“জি হাঁ। আভি আভি তো শাদি হুয়ি হ্যায় উনকি!”

“ক্যায়া বাত কর রহে হ্যায়! বিবিকো পাতা হ্যায় আপকে বাঁরে মে?” মহিলার চোখ ছানাবড়া।


(এনাফ অফ দিস ! আর নেওয়া যাচ্ছে না। নো আ্যমাউন্ট অব ইনফো ইজ ওর্থ দিজ ভার্বাল আ্যবিউজ ফ্রম দিস ইগনোরেন্ট ইমবেসাইল)।তাই বললাম,


“কেয়া মালুম! শায়দ নেহি পতা! ক্যায়া হাম কভি আপনে আপকো পুরা জান পাতেঁ হ্যায়? কমপ্লিট সেল্ফ আ্যওযারনেস তো বড়ে বড়োঁ কো নসিব নেহি হোতি…চলো, তো ফির হাম চলতে হ্যায়। খুশী হুই আপসে মিলকে বহোৎ।”


বলে ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মিসট্রেস বাজোরিয়াকে ফেলে ঘরের দিকে ফিরলাম। সায়ক বসু আর মজুমদাররা ফিরে গেছেন ভেতরে।বাস্কেটবল কোর্টের কাছে এসে দেখি নির্মাল্য এখনো ছবি আঁকছে।


“হাওয়া খাওয়া হয়ে গেল নাকি আপনার? আমি আপনাকে জয়েন করব ভাবছিলুম যে….।”নির্মাল্য হাঁক দিয়েছে। 

“হ্যাঁ । ঐ তো মিসেস বাজোরিয়ার সঙ্গে গপ্প হচ্ছিল এতক্ষণ।” অর্ধসত্য বললাম আমি।

“আর বেশীক্ষণ সইতে পারলেন না, তাই তো?” নির্মাল্যর ঠোঁটে হাসি। এটুকু বুদ্ধি আছে ওর ঘটে। শিল্পী মানুষ যতই হোক! মনটা একটু নরম হয় আমার।

“তা ঐ আলাপচারিতার আ্যন্টিডোট হিসেবে একটু আঁকাজোকা ট্রাই করবেন নাকি ডাঃ ব্যানার্জি ? আমার কাছে ব্ল্যাঙ্ক ক্যানভাস আছে।”

“ধন্যবাদ। কিন্তু মানুষের ইন্টারনাল অর্গানস ছাড়া আর কিছু আঁকতে আমি অপারগ।”

“চাইলে বসে দেখতেও পারেন। খারাপ আঁকি না কিন্তু আমি!”

“আপনি বেশ ভালই আঁকেন। মানে আমি যেটুকু বুঝি আর কি! কিন্তু এখন থাক নির্মাল্য বাবু। ঘরে গিয়ে একটু ভাল করে চান করব আমি।”

“এই রাত দুপুরে? ঠান্ডা লেগে যাবে তো!”

“না মশাই। আমি সুইডেনে থাকতে রোজ করতাম। ওয়ার্ম রিল্যাক্সিং বাথ বিফোর বেড…ওয়ার্কস রিয়েলি ওয়েল ফর মি। চলি, কাল দেখা হবে।”


ফিরতে ফিরতে হঠাৎ মাথায় এল, আচ্ছা,ঐ বাজোরিয়া মহিলা যে বারবার বলছিলেন ওঁদের পেছনে জাসুস আছে সেটা কি একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা নাকি এর পেছনে সত্যি আছে কিছু? আর সত্যি হলে সেই অন্য গোয়েন্দাই বা কে? 


নাঃ, মাথা যেটুকু ঠান্ডা হয়েছিল আবার গরম হয়ে গেল। তাই বাথটবে জল ভরে ভাল করে চান করে নিলাম। বেটার লাগছে অনেক। তবে আমার এই চুলের বোঝা শুকোবে না চট করে। আর ভেজা মাথায় শুলে আবার কাল সর্দি হবার চান্স প্রচুর।তাই মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে আবার আগাথা ক্রিস্টি নিয়ে বসে পড়লাম।ব্যাড আইডিয়া। কারণ রাত তিনটে নাগাদ যখন ঘুমোতে গেলাম তখন বিকট সব স্বপ্ন দেখলাম।


দেখলাম আমি মাউসট্র্যাপের মলি হয়ে এই রিসর্টটা চালাচ্ছি। সুলগ্না খুন হয়ে গেলেন মিসেস বয়েলের মত।

কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না খুনী কে। বর্ণালী ছুটে ছুটে রান্নার কাজ করছে…ওর মাথায় সিঁদুর না, লাল অয়েল পেইন্ট। আমি জিজ্ঞেস করায় লাজুক হেসে বলল সৌভিক নিজের হাতে ওটা ওকে পরিয়ে দিয়েছে। মেজর মেটক্যাফের জায়গায় আমার বাবা…ছাতের সমান লাফিয়ে মিসেস বাজোরিয়াকে জিজ্ঞেস করছে গয়না কি করে হারাল।আমি প্রদোষকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও, খুনী কে তাও মনে পড়ছে না কিছুতেই। হঠাৎ নির্মাল্য এসে কফির কাপ নিয়ে ফিস ফিস করে বলল মাউসট্র্যাপে তো গোয়েন্দাই খুনী…!!!


ধরমরিয়ে চোখ খুলে উঠে বসে দেখি বাইরে রোদ। আটটা বাজে। ঘাড়ে ব্যথা, বালিশগুলো খুব বাজে—ওর হাতটাই ভাল—চুলগুলো এখনো শুকোয়নি ভাল আর মারকাটারি খিদে পেয়েছে। যাই দেখি ব্রেকফাস্ট কি জোটে।

***

হানিমুনে হন্তারক

——————————————————

পর্ব ৫ঃরক্তাক্ত বিচ্ছিন্নতা

—————————————————

নীচে গিয়ে দেখলাম সব গেস্টরা ব্রেকফাস্ট রুমে।কিন্তু বেশ গন্ডগোল হচ্ছে। কি ব্যাপার?


কাছে যেতেই শুনলাম মিসেস মজুমদার ভয়ঙ্কর হিন্দিতে চেঁচাচ্ছেন

“আরে খালি দুধ কর্নফ্লেক্স হাম কিঁউ খায়েগা? পয়সা দিয়া হ্যায় এত এত। মামলেট চাহিয়ে মুঝে—ঐ মাশরুম দিয়ে। ঔর জ্যাম পাঁউরুটি। ঔর তারপরে লুচি, ছোলার ডাল চাহিয়ে।”


বাপরে, কি খেতে পারে! তারপর বলবে অম্বল, বুকজ্বালা !


“আপনি বাংলা বলতে পারেন আমার সঙ্গে মিসেস মজুমদার”, নেপালী ম্যানেজার মিঃ ছেত্রী পরিস্কার বাংলায় বলেন।

“ব্রেড আর জ্যাম তো পেয়ে যাবেন। তবে ওমলেট আর অন্য কোন গরম জিনিস যেমন পুরী, ছোলে এসবগুলো আজ দিতে পারব না, ভেরি স্যরি।”


“কেন বলুন তো”? বিরক্ত গলায় শুধোন সায়ক বসু।

“আসলে আমাদের একজন শেফ কম আছে। ফলে একজনের ঘাড়ে পুরো কিচেন। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় দুটো ছুরি গায়েব। এখন গরম ব্রেকফাস্ট দিতে হলে আর লাঞ্চ দিতে পারব না আপনাদের। এমনিতেই আমাদের আরো একজন স্টাফ শর্ট…কাল ডেডবডির সঙ্গে গেল তো একজন…”


হঠাৎ সবাই চুপ হয়ে গেল। কাল ব্রেকফাস্ট রুমে সৌভিক আর বর্ণালী ছিল। আজ তাদের একজন মর্গে আর অন্যজন বোধহয় পুলিশ স্টেশনে বসে অন্তহীন প্রতীক্ষা করছে পরিবারের লোকদের আসার। এর মধ্যে আমাদের গরম ব্রেকফাস্ট নিয়ে হট্টগোল করাটা হঠাৎ বিসদৃশ লেগেছে সবার কাছেই। মিসেস মজুমদার দেখলাম বাটি হাতে কর্নফ্লেকসের দিকে এগিয়ে গেলেন। বাকিরাও ফাঁকা জায়গা দেখে সরে গেলেন।


“আচ্ছা রান্নাঘরের ছুরি হারানোর কথা কি বলছিলেন?” আমি ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম।

“হ্যাঁ, ডাঃ ব্যানার্জি খুব অদ্ভুত, না? আজ সকাল থেকেই সবচেয়ে বড় ছুরি দুটো নিখোঁজ । ও দুটো আবার কার দরকার পড়ল কে জানে। এদিকে আমাদের ছোট শেফ, সেও সকাল থেকে বেপাত্তা। হেড শেফ সাউ হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কে জানে ছোট শেফই ছুরি দুটো নিয়ে কোথাও গেল কিনা। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না…”


“তা এই ছোট শেফ থাকে কোথায়? খোঁজ নেননি সেখানে?”

“থাকে তো এখানেই, স্টাফ কোয়ার্টারে। শেফ অনিল আর মালী নিখিল দুই ভাই এখানে কাজ করে, একই কোয়ার্টারে থাকে। ওদের কোয়ার্টার তো বন্ধ, বাইরে থেকে তালা দেওয়া সেই সকাল থেকে। নর্মালি ওরা ঘর বন্ধ করে কাজে চলে আসে, অথচ আজ আসেনি।”

“আর ওর ভাই? মানে মালী”?

“কে নিখিল? তাকেও দেখিনি সকাল থেকে। কিন্তু সে তো মাঝে মাঝে এদিক সেদিক যায়। একটু দূরে আমাদের রিসর্টেরই গ্রীন হাউস আর নার্সারি আছে, সেখানে কাজ করে, ফ্লাওয়ার বেড টেড বানায়, গাছে জল দেয়…গেছে হয়তো তেমনি কোথাও। কিন্তু অনিল তো সোজা কিচেনে এসে ব্রেকফাস্ট বানায়…”

“দেখুন এসে যাবে নিশ্চয়ই।” অবশেষে বলি আমি।


ব্রেকফাস্ট করে রিশেপশনের পাশ দিয়ে ঘরে যাবার পথে শুনলাম ফোন বাজছে। সিঁড়িতে ওঠার আগেই রিশেপশনিস্ট মেয়েটি ডাক দিল, “ডাঃ ব্যানার্জি, দিস ইজ ফর ইউ”।


নিশ্চয়ই প্রদোষ। কখন ফিরবে বলতে ফোন করেছে মনে হয়।

“কখন ফিরবে তুমি প্রদোষ? ভাল্লাগছে না একা একা…”

“কি বলছিস মিনি? প্রদোষ তোর সঙ্গে নেই? তোরা তো হানিমুনে?”

 সর্বনাশ! বাবা!

“কি হল? চুপ করে আছিস কেন? প্রদোষ কোথায় গেছে তোকে ফেলে?”

“আঃ, বাবা! ফেলে যাবে কেন? কালকে, মানে, এখানে একজন গেস্ট হঠাৎ মারা গেলেন তো তাই ও…”

“ তার মানে? মার্ডার? আর প্রদোষ তদন্ত করতে বেরিয়ে গেছে? তোকে রেখে? এবার মার্ডারার যদি তোর ওপর শোধ নেয়, তাহলে? এই জন্য ।এই জন্য আমি বারণ করেছিলাম মিনি…শুনলি না আমার কথা …”


“তুমি আমাকে কথা বলতে দেবে বাবা? প্রথমতঃ কোন মার্ডার হয়নি (মনে হয়)। দ্বিতীয়তঃ প্রদোষ কোন তদন্ত টদন্ত কিচ্ছু করছে না। গেছে ওই মৃত লোকটির বৌকে কালিম্পং পৌঁছতে আ্যজ এ গুড সামারিটান।”

“চমৎকার! নিজের বৌকে হানিমুনের মাঝে একা হোটেলে রেখে অন্যের বৌকে নিয়ে কালিম্পং! আ্যন্ড ইউ সী নো প্রবলেম উইথ দ্যাট?”


“বাবা, ইফ ইউ স্টিল হ্যাভ প্রবলেম উইথ প্রদোষ আর সেইজন্য সব যুক্তি ট্যুইস্ট করে করে ওর বিরুদ্ধে সাজাও, দেন ইটস ইওর প্রবলেম। নট মাইন। তুমি তোমার ধারণা নিয়ে বসে থাক, আমার মাথা খেও না। একেই দু দুটো লোক আ্যকসিড্ন্টালি মারা গেল দুদিনের ভেতর…”

“দুটো লোক মানে? আবার কে মারা গেল মিনি? সেও কি গেস্ট”?


নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে! রাতে ভাল ঘুম হয়নি। মাথা কাজ করছে না।


“আর এক মহিলা , হ্যাঁ , গেস্ট। সাইট সিয়িং এ গিয়ে স্লিপ করে…! কিন্তু তুমি চিন্তা কোরো না, আমরা ভাল আছি।”

“প্রদোষ কখন আসবে?”

“এই তো, দুপুরের মধ্যেই মনে হয়। লাঞ্চ তো দেরী হবে আজ, তার আগেই হয়তো…”

“কেন? লাঞ্চ দেরী হবে কেন?”

“ঐ তো, ওদের একজন শেফকে পাওয়া যাচ্ছে না সকাল থেকে তাই দে আর রানিং লেট…”

“কি? দুটো লোক মারা গেছে, একজন নিখোঁজ ? এটা কি হোটেল? আগাথা ক্রিস্টির মাউসট্র্যাপ? আবার প্রদোষও নেই। এদিকে বলছিস চিন্তা না করতে…আমি কালই যাব, তুই দেখ।”


“না বাবা, তুমি কোন কারণেই আমার হানিমুনে আসবে না। ছোটবেলা থেকে সব জায়াগায় খালি পেছন পেছন গিয়ে গিয়ে…ট্রেকিং করতে গেলাম তো তোমার নাকি কাজ পড়ে গেল কার্সিয়াং, এক্সকারশানে গেলাম রাজস্থান, তুমি কাজ নিয়ে হাজির জয়পুরে!  সব বন্ধুরা হাসত। কেদারে গিয়ে আমি পরিত্রাণ পেয়েছিলাম। কোন বাবা মা ছেলে মেয়ের হানিমুনে যায় বলতো?”


“হানিমুন হানিমুন তো খুব করছিস, এদিকে প্রদোষের তো পাত্তা নেই। কখন আসবে তাও জানিস না। তার মধ্যে সিরিয়াল কিলার এসে মেরে যাক তোকে। কারো কিছু আসবে যাবে না, বুঝলি তো? আমার আর তোর মার ছাড়া।”

“উফ! এর মধ্যে আবার সিরিয়াল কিলার কোত্থেকে পেলে বাবা? তুমিও কি গোয়েন্দা হয়ে গেলে?”

“না আমার কোন দরকার নেই গোয়েন্দা হয়ে। উচিত ছিল তোর বিয়েও গোয়েন্দার সঙ্গে না দেওয়া।”

“তুমি তো দাওনি বিয়ে বাবা, বরং ব্যাগড়া দিয়েছিলে সবরকম ভাবে। এটা তো আমার চয়েস। ভাল মন্দ আমাকেই বুঝতে দাও! আমি ছাড়ছি এখন। তোমরা ভাল আছ?”


বাপরে বাপ! কি ঝামেলা করতে পারে আমার বাবা।

কিছু বিশ্বাস নেই, এসেও পড়তে পারে কাল পরশুর মধ্যে। এসে পড়লে প্রদোষের মুখের চেহারাটা কেমন হবে কল্পনা করেই হাসি পেয়ে গেল। শ্বশুর জামাই এর মধ্যে একটা যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে বটে কিন্তু চোরা টেনসন যাবার নয় এত সহজে। আমি মাঝখান থেকে কট ইন দ্য মিডল।

         শাশুড়ি বৌমার মধ্যে পিষ্ট ছেলেদের নিয়ে তো প্রচুর গল্প, আমাদের কথা কেউ লেখে না…এভরিথিং…দ্য হোল ড্যাম লিটেরারী সীন ইজ সো আটারলি ডমিনেটেড বাই মেল…সব কিছুই তাদের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। সব গপ্প নতুন করে লিখতে হবে আমাদের। স্টার্টিং ফ্রম দ্য ফেয়ারিটেইলস। যেখানে রাজকন্যা ড্রাগন মেরে টাওয়ারে বন্দী রাজপুত্রকে উদ্ধার করবে।

ডাক্তারীটা ছেড়ে এবার লেখক হয়ে যাব ভাবছি!


ভাবতে ভাবতেই লন ছেড়ে ওপাশের ঢালু জমি ধরে হাঁটতে লেগেছি। সুন্দর আবহাওয়া আজ—সোনা রোদ , নীল আকাশ, না শীত না গরম। পাইনবন ঘন সবুজ।রডোডেনড্রনের ঝোপ রঙিন ফুলে আলো হয়ে আছে।দূর থেকে হাওয়ায় ভেসে আসছে হাল্কা ল্যাভেন্ডারের গন্ধ।সেই একটা গান আছে না, “মিষ্টি দেখ মিষ্টি কি মিষ্টি এ সকাল”…প্রায় সেরকম ব্যাপার। প্রদোষ যদি থাকত, দুজনে মিলে পাইনবনে হাঁটতে যেতাম ঠিক।


দূরে একটা কাঁচের ঘর দেখছি। এটাই বোধহয় গ্রীন হাউস, যেটার কথা ম্যানেজার বলছিলেন। দেখা যাক গিয়ে, অর্কিড টর্কিড পাওয়া যায় কিনা। বিভিন্ন রকম অর্কিড সংগ্রহ আমার নেশা। সুবিধে ছিল দার্জিলিং-এ ।কলকাতায় বাঁচানোই শক্ত ওদের।ওরা এই হিমালয়েই ভাল থাকে…আমারই মত! আমিও ঘুরে ঘুরে এই পাহাড়েই আসি।প্রদোষ আমার জীবনে না এলে পাহাড়েই থেকে যেতাম ঠিক। এই অর্কিডগুলোই একটুকরো পাহাড় হিসেবে থাকবে আমার কাছে।নিখিলকে জিজ্ঞেস করতে হবে হোয়াইট অর্কিডটা কলকাতায় কি করে বাঁচানো যায়। ওটা রাখব বেডসাইড টেবলে, সেই দার্জিলিঙের মত….


গ্রীন হাউস তো খোলাই দেখছি! মালী নিখিল কি ভেতরে? গিয়ে দেখি…বাঃ, বেশ বড় গ্রীনহাউস।জল দেওয়া হয়েছে গাছগুলোয় সকালে বোধহয়। এই ভিজে সোঁদা সোঁদা মাটির আর গাছের গন্ধটা বেশ লাগে। কত প্রজাপতি…ওমা, ঐ নীল ফুটিফুটি দেওয়াটা কি সুন্দর…ছাতের কাছের উইস্টিরিয়া লতায় বসল…তারপর টেবলের হাইড্রোজেনার ওপর…এখন মেঝের কাছে রাখা ভায়োলেটের টবে….কিন্তু মেঝেটা ওখানে এত লাল…কি, কি ওটা…ও মাই গড…ব্লাড, পুল অফ ব্লাড…তারমধ্যে চিৎ হয়ে পড়ে আছে একটা লোক…গলায়, বুকে সর্বত্র ধারালো অস্ত্রের কোপের চিহ্ন।


আমি যদিও ডাক্তার, রক্ত এবং ডেডবডি দুয়ের সঙ্গেই বেশ পরিচিত, তাও কয়েক মিনিট লাগল ধাতস্থ হতে।

তারপর প্রথমেই গেলাম পালস চেক করতে। দরকার ছিল না, তবুও। অন্ততঃ দুঘন্টা আগে মারা গেছে।লোকটির গায়ে রিসর্টের টি শার্ট। খুব সম্ভব এই মালী নিখিল। আততায়ী ধারাল কিছু দিয়ে বুকে পিঠে, গলায় বেশ কয়েকবার আঘাত করেছে। কিচেনের হারানো ছুরির কথাটা মনে হচ্ছিল…তবে আঘাতগুলো ঠিক ছুরির বলে মনে হচ্ছিল না। আরো শক্তিশালী কিছু…করাত বা কুড়ুল! এরকম নৃসংশ ভাবে এই মালীকে কে মারল, কেন মারল?


ভাবতে ভাবতেই তাড়াতাড়ি পা চালালাম রিশেপশনের দিকে, কিন্তু লবিতে পৌঁছে দেখি বেশ হৈ চৈ, প্রায় সব অতিথিরাই রয়েছেন। আমাকে দেখেই কে বলে উঠলেন “ঐ তো এসে গেছেন উনি। ডাঃ ব্যানার্জি।”

“কি ব্যাপার?”

“একটু আমার সঙ্গে আসতে পারবেন? একটা ডেডবডি…মানে মনে হচ্ছে ডেড আরকি…!”

বলে উঠলেন ম্যানেজার ছেত্রী।

“হ্যাঁ, দেখে এলাম তো, কিন্তু আপনারা কি করে জানলেন…ওখানে তো আর কেউ ছিল না…?”

“আপনি দেখেছেন? কিন্তু মিঃ আ্যন্ড মিসেস বাজোরিয়া তো ওটা প্রথম দেখেন…তারপর মিসেস বাজোরিয়া ফেইন্ট হয়ে যান। ঐ তো ঐ সোফায় শুইয়ে রেখেছি আমরা সবাই…ওঁকেও একটু দেখে দিন।”

তাকিয়ে দেখি দূরের বড় সোফায় মিসেস বাজেরিয়া চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। মিসেস মজুমদার পাশে বসে হাওয়া করছেন। কাছের চেয়ারে চিন্তিত মুখে বসে মিঃ বাজোরিয়া।


“আপনারা গ্রীনহাউসের দিকে কখন গেলেন? দেখলাম না তো ওদিকে আপনাদের?” আমি শুধোলাম বাজোরিয়াকে।

“গ্রীন হাউস? না ডাঃ ব্যানার্জি! আমরা তো ব্রীজের কাছে গেছিলাম। আমাদের ড্রাইভার বলল যে ব্রীজের দড়ি সব কাটা, ও তাই গাড়ি নিয়ে কালিম্পং যেতে পারেনি ম্যাডামের জন্য শপিং করতে। সেই শুনে তো আমরা গেলাম। ব্রীজের দড়িগুলো সত্যিই কাটা। তখন একটু পাশ দিয়ে নেমে দেখতে যেতেই তো ঐ ডেডবডি…ঐ ছোট শেফের”! 


“ছোট শেফের ডেডবডি? ব্রীজের নীচে? মালীর বডি না? গ্রীন হাউসে?”

“কি বলছেন ডাঃ ব্যানার্জি? মালী, মানে নিখিলও মৃত? গ্রীনহাউসে?” 

ম্যানেজার ছেত্রীর মুখ দেখে মায়া হয়।


“হ্যাঁ। কোন করাত বা কুড়ুল দিয়ে মারা হয়েছে। অন্তত দুঘন্টা আগে। সেই খবর দিতেই তো আসছিলাম আমি…”

“এদিকে ছোট শেফ, অনিল মরে পড়ে আছে ব্রীজের তলায়। বুকে বেঁধানো কিচেনের বড় ছুরি… আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না…” 

ম্যানেজারের ঝকঝকে চেহারা কেমন কালচে লাগছে।

“আবার ব্রীজের দড়ি তো সব কাটা বললেন তাই না?”

“হ্যাঁ”, বাজোরিয়া মাথা নাড়েন।

“তার মানে আমরা পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এবং কেউ বা কারা একের পর এক হামলা করছে। দিস ইজ সিরিয়াস । চলুন মিঃ ছেত্রী, কালিম্পং পুলিশ স্টেশনে ফোন করতে হবে।”


মিঃ ছেত্রীর পেছন পেছন আমি, মিঃ মজুমদার আর সায়ক বসু গেলাম। কিন্তু রিসিভারটা ক্রেডল থেকে তুলেই মিঃ ছেত্রীর মুখটা কেমন হয়ে গেল।

ফ্যাকাশে মুখে ফ্যাঁসফেঁসে গলায় উনি বললেন 

“দ্য ফোন ইজ অলসো ডেড।”।


“কি হয়েছে এখানে? সবাই এত গম্ভীর কেন?” নির্মাল্য উঠে এসেছে মিসেস বাজোরিয়ার কাছ থেকে।

“ফোন ডেড।” আমি বললাম

“ ওয়াও! দুজন স্টাফকে ব্রুটালি খুন করা হয়েছে। ব্রীজ ড্যামেজড, ফলে আমরা টোট্যালি ডিসকানেক্টেড এবং ফোনও কাজ করছে না।এত কিছু হয়ে গেল সকাল থেকে এই তিন চার ঘন্টায়?” নির্মাল্য বলে উঠল।

“ফোনটা তো একটু আগেও কাজ করছিল। আমার বাবা ফোন করেছিলেন কলকাতা থেকে।” আমি বললাম।

“ডাঃ ব্যানার্জি, আপনি হঠাৎ গ্রীনহাউসে গেছিলেন কেন?” নির্মাল্য জিজ্ঞেস করে।

“অর্কিড দেখতে নির্মাল্যবাবু। অর্কিড আমার শখ।”

“আই সী! কিন্তু এ তো দেখছি মাউসট্র্যাপ! হোটেলে সবাই বন্দী , পালানোর পথ নেই আর অজ্ঞাত খুনী ঘুরে বেড়াচ্ছে…এদিকে গোয়েন্দাটি, আপনার স্বামী, সেও এখানে নেই।”


“মিঃ অধিকারী, দিস ইজ নট ফানি। ফলে আপনি আপনার এইসব বিদঘুটে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকুন। সবাই এমনিতেই যথেষ্ট ভীত!”

“আর মিঃ ছেত্রী, আমি আগে মিসেস বাজোরিয়াকে দেখব। তারপর আপনারা কয়েকজন চলুন অনিলের বডির কাছে আমাকে নিয়ে। আমাদের যেভাবে হোক বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আমি আশা করছি প্রদোষ ফিরবে একটু পরে এবং ব্রীজের এই অবস্থা দেখলে পুলিশকে জানাবে। এর মধ্যে আমার মনে হয় বাকী অতিথিদেরও সাবধানে থাকাই ভাল।” 


আমি এগিয়ে যাই মিসেস বাজোরিয়ার দিকে। আশা করি এই হোটেলের সব লোকের ডেথ সার্টিফিকেট একে একে আমাকেই লিখতে হবে না!


(বিঃদ্রঃ এই গল্পের সময়কাল প্রাক মোবাইল, যখন ল্যান্ডলাইন ছিল একমাত্র ভরসা)

***

হানিমুনে হন্তারক

————————————————

পর্ব ৬ঃ অতীতের প্রেতাত্মা

————————————————-

প্রদোষ মিত্রের কথা

***************

দিস ইজ স্যুররিয়েল। হানিমুন করতে এসে এখন মণিকে ফেলে একটা ডেডবডি আর তার শোকাতুরা পত্নীকে নিয়ে দৌড়তে হচ্ছে পুলিশ স্টেশন, হাসপাতাল! আমার সঙ্গেই খালি হয় এসব! আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম এবার কিছুর মধ্যে জড়াব না, তবুও। 


সাতটা! শুধু সাতটা দিন চেয়েছিলাম নিজেদের মত কাটাব বলে। গোয়েন্দগিরির থেকে, অপরাধী ধাওয়া থেকে ছুটি নিয়ে। ওয়াজ ইট ট্যু মাচ টু আস্ক ফর? যবে থেকে শুরু করেছি এই কাজ সেই তো করে চলেছি সমানে। জেলের কয়েদীরাও বিয়ে করতে গেলে প্যারোল পায় কিন্তু ফেলু মিত্তিরের কপালে ব্রেক নেই।


এক্ষেত্রে কিছু করার ছিল না। বাজোরিয়ারা আসত না। গাড়িটা দিয়েছে সেই ঢের। সায়ক বসু তো ফ্যামিলি রেখে আসতে চাইল না, বৃদ্ধ দম্পতি এসবের পক্ষে বড্ড বয়স্ক, সুলগ্নারা নেই, ম্যানেজার ছেত্রী রিসর্ট ছেড়ে আসতে পারবেন না। একজন কর্মচারী পাঠিয়েছেন তাই অনেক। নির্মাল্যটাকে আসতে বললাম সেও আবার আর এক ন্যাকা।আমি গোয়েন্দা—পুলিশ, পোস্টমর্টেম এসবে অভ্যেস আছে সুতরাং আমার ঘাড়েই চাপল।


কিন্তু পোস্টমর্টেমটা কি করাতেই হবে? তাহলে আবার আরো এক সেট ঝামেলা। কিন্তু কেন এমন হল সেটাও তো ভাল বোঝা যাচ্ছে না। দেখা যাক বর্ণালী কি বলে…এখন জিজ্ঞেস করা যাবে না, কালিম্পং পৌঁছে না হয়..!!


সমানে কেঁদে যাচ্ছে বর্ণালী সামনের সীটে বসে। দারুণ কিছু দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু এসব ইমোশনাল সিচ্যুয়েশন আমি ভাল হ্যান্ডেল করতে পারি না। মণি থাকলে ভাল হত। কিন্তু ওকে শুধু শুধু ভুগিয়ে লাভ ছিল না। একেই ও সৌভিককে বাঁচানোর অত চেষ্টা করল, ইট ওয়াজ র্যাদার এক্সসটিং। আমাদের দুজনের প্রফেশন আর আমার লাক মিলে এমন দাঁড়িয়েছে যে একটু ব্রেক পাওয়াই দুষ্কর।ইটস গোয়িং ট্যু বী এ লং নাইট! 

                        ————————

সকাল হয়ে গেল পুলিশ স্টেশন থেকে বেরোতে বেরোতে। কাল রাতে এসে যখন পৌঁছলাম তখন সহায়জী ছিলেন না। অপেক্ষা করতে হল। তারপর অবশ্য উনি সাহায্য করলেন অনেক। কলকাতায় সৌভিকদের বাড়িতে খবর দিলেন,এমনকি বর্ণালীকে নিজের কোয়ার্টারে রাতটা কাটানোর ব্যবস্থা করে দিলেন ওঁর স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে। 

আমার অবশ্য জেগেই কাটল রাতটা। আগের দুদিনও যে বিশেষ ঘুম হয়েছে তা তো নয়, যদিও সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে! তবে আমার অভ্যেস আছে এভাবে কেসে জড়িয়ে দিনের পর দিন যৎসামান্য ঘুমিয়ে চালানো। তোপসে জানে সে কথা।


বাজোরিয়াদের গাড়িটা ছেড়ে দিয়েছিলাম রাতেই। এবার পুলিশের গাড়িতেই বডি নিয়ে মর্গে যেতে হবে। প্রায় আট ঘন্টা হয়ে গেছে, এবার মর্গে না ঢোকালে ডিকম্পোজ করতে লাগবে। তাও পাহাড়ী, ঠান্ডা জায়গা বলে চলছে একরকম। বর্ণালীকে যেতে হবে হাসপাতালে ফর্মালিটিস সব পূরণ করতে। পোস্টমর্টেমের ব্যাপারে যে ওর দারুণ কিছু সায় আছে তা মনে হল না। কিন্তু আমি এখনও শিওর না…কজ অফ ডেথটা কি? এভাবে একজন ইয়াং লোক উইদাউট এনি প্রি এক্সিসটিং মেডিক্যাল কন্ডিশন…


কাল যেটুকু বুঝলাম, প্রাথমিক শকটা কাটিয়ে উঠে বর্ণালীর মূল চিন্তা এখন দাঁড়িয়েছে যে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ওকে অপয়া ডিক্লেয়ার করে তাড়িয়ে দেবে কিনা।বলার চেষ্টা করলাম যে ওই সৌভিকের মেইন সাকসেসর, কিন্তু ওর মগজে কতটা ঢুকল সেটা বুঝলাম না। ওর একটা ভাল লইয়ার লাগবে।আর কিছু শুভাকাঙ্খী।শী থিঙ্কস দ্যাট শী ইজ কমপ্লিটলি আ্যট দ্য মার্সি অফ এ র্যন্ডাম বাঞ্চ অফ পিপল…হার ইন লজ, যাদের ও হার্ডলি চেনে। সত্যি, কি যে অবস্থা আজও এদেশের এত সংখ্যক মেয়েদের! না আছে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, না আছে বেসিক নলেজ অফ দেয়ার ওন রাইটস। এক্সপ্লয়টেড হবার জন্যই বসে আছে।সাধে কি আর মণি চেঁচায়…!


সৌভিকের বডি নিয়ে আমরা হাসপাতালে পৌঁছেছি।

ওকে ঢেকে রাখা রিসর্টের সাদা চাদরটা সরানো হয়েছে মর্গে ঢোকাতে যাবার আগে। কিন্তু ওর ডান হাতের মধ্যমায় ওটা কি?


“বর্ণালী, সৌভিক বাবুর আঙুলে কি কেটে গেছিল নাকি?”

“হ্যাঁ, মানে কাল ছবি আঁকতে গিয়ে…ঐ ইজেলের ফ্রেমে একটা পেরেক উঠে ছিল। তাতে খোঁচা লেগে…বেশী না, একটু রক্ত পড়েছিল শুধু।”

“পেরেকের খোঁচা…আর সিম্পটমস যা বলছেন…টিটেনাস হয়েছিল নাকি বলুন তো মিঃ মিত্র”? সহায়জী প্রশ্ন করেন।

“ওর কিন্তু  আ্যন্টিটিটেনাস নেওয়া ছিল, তিন মাস আগে। খোঁচা লাগার পরেই ও বলেছিল”। বর্ণালী বলে ওঠে।

“স্ট্রেঞ্জ! তাহলে…” সহায় আবার চিন্তাণ্বিত।

“বর্ণালী, কাটা জায়গার ওপরে ঐ লাল রংটা কিসের”?

“ওটা তো ঐ ছবি আঁকার রং…নির্মাল্যবাবুর রং”।


“আপনি কি কন্টামিনেশনের কথা ভাবছেন মিঃ মিত্র? থ্রু দ্য অয়েল পেইন্ট? ” সহায় প্রশ্ন করেন।

“হুম! কন্টামিনেশন অর আ্যডাল্ট্রেশন? সে তো এখনো জানি না…কিন্তু পোস্ট মর্টেম করতেই হবে। স্ট্রিকনিন পয়জনিং কিনা দেখা দরকার…”

“স্ট্রিকনিন পয়জনিং? বাট হোয়াই? মোটিভটা কি? বর্ণালীজী, ঐ আর্টিস্ট, নির্মাল্যকে কি আপনার স্বামী চিনতেন আগে থেকে?”

“কই তেমন তো কিছু বলে নি…”!


আই আ্যম হ্যাভিং এ ভেরী ব্যাড ফিলিং…এ দেজা ভ্যু…কাঠমান্ডু…ডাঃ দিবাকর…আই রিয়েলি ডু হোপ দ্যাট আই আ্যম রং।


“মিঃ সহায়, আপনার এখানকার কাজ শেষ হলে চলুন তো একবার পুলিশ স্টেশন, যদি আপনি কলকাতা আর কাঠমান্ডু পুলিশের থেকে ঐ আমার পুরোন কেসটা…আ্যবাউট ডাঃ দিবাকর, কিছু ইনফরমেশন পান।”

“হোয়াই মিঃ মিত্র? এটাও স্ট্রিকনিন পয়জন হতে পারে বলে বলছেন? ডাঃ দিবাকর কিন্তু জেলে। আর উনিই তো জগতে একমাত্র ক্রিমিনাল না যে স্ট্রিকনিন পয়জন করতে পারেন।”

“আমি জানি মিঃ সহায়। বাট দেয়ার আর সাম আনক্যানি সিমিলারিটিস। একটু কেস ফাইলগুলো পেলে ভাল হত। বিশেষ করে আমি দিবাকরকে পুলিশে হ্যান্ডওভার করার পর থেকে ওর বিচার এবং জেল হওয়া অব্দি ঘটনাগুলো…”

“ওকে মিঃ মিত্রা। আমি কল করব। ওরা ইনফরমেশনগুলো ফোনে বলে দেবে বা ফ্যাক্স করে দেবে।”


পুলিশ স্টেশনে বসে আছি ইনফরমেশনের জন্য, এমন সময় হাজির হলেন এলা সেন।সুলগ্না যে কাল রাতে মারা গেছেন সেকথা সহায়জী বলেছেন আমাকে।


“আমি ফিরে যাচ্ছি কলকাতা, মিঃ সহায়। আপনি যে বলেছিলেন জানিয়ে যেতে, তাই…”

“ওকে মিস সেন। ইউ ক্যান গো। আপনার ডিটেইলস তো আছে আমার কাছে, দরকার হলে যোগাযোগ করব। আই আ্যম স্যরি ফর ইওর লস…”। সহায়জী বলেন।


এলা সেন হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, 

“মিঃ মিত্র, ভালই হল আপনাকে এখানে পেয়ে। ক’টা কথা বলার ছিল আপনাকে…”

“হ্যাঁ, বলুন”?

“আগে আমাদের পরিচয়টা দিই আপনাকে। আমরা…মানে আমি আর সুলগ্না…আমরাও কিন্তু ডিটেক্টিভ”।

“তাই নাকি! আচ্ছা! তো এখানে কি কোন কেসে এসেছিলেন?”

“হ্যাঁ। কিন্তু আমরা তো আপনার মত অত বিখ্যাত নই। ঐ ধরণের রোমাঞ্চকর কেসও করি না। আমরা এই মূলতঃ আ্যডাল্ট্রি, ইনফিডেলিটির কেসে প্রমাণ জোগাড় করে এনে দিই চীটেড স্বামী বা স্ত্রীকে।”

“আপনাদের কি আসল মিসেস বাজোরিয়া এমপ্লয় করেছিলেন?” আমি জিজ্ঞেস করি।

“আপনিও বুঝেছেন তাহলে ঐ সাজানো মিসেস বাজোরিয়া…”

“হ্যাঁ, ওটা কাইন্ড অফ অবভিয়াস।”

“তা ঠিক। তবে যে হারটা হারিয়েছে বলে ওঁরা দাবী করছেন সেটা আসলে আমার ক্লায়েন্টের। আসল মিসেস বাজোরিয়ার। উনি চাইছিলেন ওদের কিছু ছবি, প্রেফারেবলি ঐ হারটা সমেত…তাহলে উনি মিঃ বাজোরিয়াকে চেপে ধরতে পারতেন আর কি…”

“আই সী। কিন্তু আমাকে আপনি কি বলতে চাইছিলেন?”


“আমি জানিনা, এটা আদৌ গুরুত্বপূর্ণ কিনা, কিন্তু সেদিন ট্যুরে আমরা সবাই যখন চা খেতে নেমেছিলাম, তখন আমি শুনি সুলগ্না খুব রাগত গলায় নির্মাল্যকে বলছে, ‘তুমি যা ভাবছ তা করা অত সোজা হবে না।’ আমি ওকে তারপর জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার। তো ও বলল হোটেলে ফিরে বলবে। আর বলল আপনাকেও নাকি কি একটা ব্যাপারে সাবধান করে দেবে।কিন্তু তার আগেই তো আ্যক্সিডেন্ট হল।”

“ইন্টারেস্টিং! আমাকে কেন? উনি চিনতেন কি আমাকে?”

“মিঃ মিত্র, আপনাকে সুলগ্না একরকম পুজো করত! আপনার সব কেসের ডিটেইলস ওর নখদর্পণে ছিল। বলত এই হল আসল ডিটেক্টিভ, আমাদের তো কেবল খোঁচড়গিরি সার! আইডল ছিলেন আপনি ওর! এই পার্টিকুলার ব্যাপারে কেন কথা বলতে চাইছিল সেটা অবশ্য আমি জানি না।”

“অনেক ধন্যবাদ এলা দেবী। নির্মাল্য আমাদের সন্দেহের তালিকাতেও ঢুকেছে। ফলে এই ইনফর্মেশনটা গুরুত্বপূর্ণ ।”

“আচ্ছা। আসি তাহলে মিঃ মিত্র”।


এলা সেন চলে যাবার ঘন্টা খানেক পরেই এলেন মিঃ সহায়। হাতে কিছু ফ্যাক্সের কাগজ। মুখ গম্ভীর।


“মিঃ মিত্র,দিবাকরের এক ভাই ছিল সুহাস, যার বয়স এখন নির্মাল্যর কাছাকাছি।”

“আই সী”!

“কেস ফাইল আরো বলছে ছেলে জেলে যাবার পরে দিবাকরের মা সিভিয়ার ডিপ্রেশন চলে যান এবং শেষে মাস দুয়েক পরে আত্মহত্যা করেন। তখনও দিবাকরের কেস চলছিল। ও প্যারোলে গিয়ে মায়ের শেষকৃত্য করে। তারপর ওর বৌ ডিভোর্স নেয়। আর সুহাসের একটা নার্ভাস ব্রেকডাউন মত হয়। মেন্টাল আ্যসাইলামে ছিল তারপর বেশ কিছুদিন। ও বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টে পড়ত। সেখানেও জানাজানি হবার পর বেশ বুলিয়িং ফেস করে স্কুল ছেড়ে দেয়।”


“বালিগঞ্জ গভর্নমেন্টে সৌভিকও পড়ত”। বলে ওঠে বর্ণালী। শুনছিল পাশে বসে আমাদের কথা এতক্ষণ।

সৌভিকের বয়স তো সুহাসের কাছাকাছি!


“বর্ণালী, আপনাদের কি আ্যরেঞ্জড ম্যারেজ?”

“হ্যাঁ মিঃ মিত্র”।

“সৌভিকবাবু কেমন মানুষ ছিলেন, মানে যতটুকু দেখেছেন ওঁকে আর কি…”!

“খুব ভাল প্রদোষবাবু! ওরকম বর পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার..সইল না আমার কপালে”, বর্ণালী ওড়নায় চোখ মোছে।

“বন্ধু বান্ধব, পাড়ার লোক—এদের সঙ্গে ওঁর কেমন সম্পর্ক ছিল?”

“পাড়ার ক্লাবের লীডার ছিল ও।সবাই কত মানত! খুব কড়া ছিল কিন্তু। একবার বেপাড়ার একটি ছেলে পাড়ার মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতে এসছিল বলে সৌভিক তাকে মোড়ের মাথায় দাঁড় করিয়ে ২৫ টা উঠবোস করায় কান ধরে! কি দাপট! আমাকে ফুলশয্যার রাতেই বলে দিয়েছিল, বৌ যদি বৌ এর মত থাক আদর-যত্ন, জিনিসপত্র সবই পাবে। তবে বেচাল যদি চেলেছ…। আমি তো ভয়ই পেয়েছিলাম একটু। অষ্টমঙ্গলায় বাপের বাড়ি গিয়ে মা কে বললাম, তো মা বলল পুরুষ মানুষ একটু দাপুটে না হলে চলে? লোকে মানবে কেন! আমি যেন বুঝে শুনে চলি। তাই তো চলছিলাম…হঠাৎ করে…” বর্ণালীর কান্নার বেগ বেড়ে গেল।


আমার যা জানার ছিল জানা হয়ে গেছে। সৌভিক ওয়াজ এ বুলি। যেসব ছেলেরা বুলি করে সুহাসকে স্কুল ছাড়া করেছিল তার মধ্যে সম্ভবতঃ সৌভিক ছিল। আর তারই প্রতিশোধ নিয়েছে এতদিন পরে সুহাস ওরফে নির্মাল্য।


“মিঃ সহায়, ওদের পরিবারে আর কেউ ছিল? মানে সুহাসের বাবা বা অন্য কোন ভাই বোন?”

“নাঃ। জাস্ট বিধবা মা, ওরা দুই ভাই আর দিবাকরের স্ত্রী—ঘটনার বছর খানেক আগে বিয়ে করেছিল। হি ওয়াজ ড্যুয়িং র্যাদার ওয়েল—বাড়ি, গাড়ি খুব অল্প সময়ের মধ্যে। এখন অবশ্য আমরা জানি সেগুলো সব সৎপথে নয়। জাল ওষুধের কারবারে জড়িয়েছিলেন উনি। কিন্তু তার আগে অব্দি বেশ সফল ডাক্তার হিসেবে সমাজে প্রতিপত্তি বাড়ছিল।”


“এবং এই সব কিছু তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে আমার ইনভেস্টিগেশনের ফলে—মিঃ সহায়, আমাকে রিসর্টে ফিরতে হবে। আপনি যদি একটা  গাড়ির ব্যবস্থা করে দেন এক্ষুনি…”

“মিঃ মিত্রা, আপনি কি ভাবছেন….”

“ইয়েস! এই সুহাস ওরফে নির্মাল্য হয়তো আমাকে দায়ী করছে ওর পরিবারের এই মিসফরচুনের জন্য।পারহ্যাপস হি ইজ সিকিং রিভেঞ্জ। সেটাই হয়তো কোনভাবে সুলগ্না আঁচ করে আমাকে সাবধান করতে চেয়েছিলেন আর সেই জন্যই ওঁকে ধাক্কা মেরে খাদে ফেলা হয়। ঐ রিভেঞ্জের জন্যই ও সম্ভবতঃ সৌভিককেও পয়জন করেছে।”

“কিন্তু আপনি তো এখন এখানে, সেফ।” সহায় বলে ওঠেন।

“কিন্তু মণি, মাই ওয়াইফ, ওখানে।সুহাস ওর মার মৃত্যুর বদলা হিসেবে মণিকেই তো টার্গেট করবে, তাই না?”

“দাঁড়ান মিঃ মিত্র, একটা কল করি ঐ রিসর্টে…ও ড্যাম ইট!”

“কি হল”?

“ফোন লাগছে না।মনে হচ্ছে ডিসকানেক্টেড।”

“লেটস গো মিঃ সহায়।আর সময় নষ্ট করা যাবে না।”


কিন্তু গাড়ি নিয়ে ব্রীজের কাছে এসে দেখি ব্রীজের অন্যদিকটা ভেঙে ঝুলছে। ব্যাপারটা ক্রমশঃ ঘোরাল হয়ে উঠছে। মণির জন্য আমি ভীষণ চিন্তিত। ও শুধু ওখানে আটকে পড়া একজন গেস্ট না। ও-ই সিক্, মেন্টাল কিলারের আসল টার্গেট!


আমাকে রিসর্টে পৌঁছতেই হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব…যে করেই হোক।

***

হানিমুনে হন্তারক

—————————————————-

পর্ব ৭ঃফ্রয়েডিয়ান নাইটমেয়ার

——————————————————


সারাদিন প্রায় ঘরে কাটিয়ে এই শেষ বিকেলে বেরিয়েছিলাম একটু লনে। আর কেউ নেই। সবাই ভয়ও পেয়েছে, মনও খারাপ। কিন্তু আমি ব্যালকনি থেকে দেখলাম ঐ প্লাটফর্মে অনেকগুলো অর্কিডের টব দিয়ে সাজানো। আগে ছিল না তো! ভাবলাম একটু দেখে আসি কি কি অর্কিড আছে। আর মালী বা যে ওগুলো ওখানে রেখেছে, তার সাথেও একটু কথা বলে নিই। কতক্ষণই বা লাগবে !আমি একটু এই ওখানে দাঁড়িয়ে সন্ধে হলেই ঘরে চলে যাব। প্রদোষেরও পাত্তা নেই। কোত্থেকে কি সব হয়ে গেল, হানিমুন করতে এসে… বাবা যদি জানত আরো দুটো খুন হয়েছে…চেঁচামেচি করে বটে, কিন্তু দোষও নেই, এমন এমন সব ঘটনা ঘটে! 


নিখিল আর অনিলের রক্তাক্ত দেহ দুটোর কথা মনে পড়ে গেল। বেচারারা…দুই ভাই…হয়তো কোন নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের আর্নিং মেম্বার…বাড়িতে হয়তো স্ত্রী আছে, ছেলে মেয়ে। বৃদ্ধ বাবা মা যদি থাকে তবে তো তাদের ডবল শোক। এই রিসর্টে চাকরী করতে এসে কি ভয়ঙ্কর পরিণতি।


বাবাই কি ঠিক? সিরিয়াল কিলারের কাজ? নাহলে এরকম একের পর এক আপাত সম্পর্কহীন নিষ্ঠুর হত্যা…? মানে কি এর? সুলগ্না, সৌভিক, নিখিল, অনিল… কি যোগ এদের মধ্যে? একমাত্র এই রিসর্টে কিছুদিন একসঙ্গে থাকা ছাড়া ? আর সৌভিক…ওটা কি জাস্ট আ্যকসিড্ন্ট না ওটাও খুন? পোস্টমর্টেম করলে বোঝা যাবে…


ভাবতে ভাবতে শুনি পেছনে কে এসে দাঁড়িয়েছে।


“ও আপনি! আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম।”

“কেন? ভয় কিসের? সিরিয়াল কিলারের?”

নির্মাল্য মৃদু হেসে প্রশ্ন করে।


“হ্যাঁ । যা সব ঘটছে। মন হচ্ছে আগাথা ক্রিস্টির মার্ডার মিস্ট্রির মধ্যে বসে আছি… এক এক করে লোক খুন হয়ে যাচ্ছে। পালাবার রাস্তাও বন্ধ।”

“তাহলে ঘরে না বসে এখানে যে?”

“আর কাঁহাতক ঘরে থাকা যায় বলুন তো? হাঁপিয়ে উঠেছি। আর এই অর্কিডগুলোও দেখতে এলাম…”

“ও হ্যাঁ , আপনি তো আবার অর্কিডপ্রেমী! তা আপনার হাসব্যান্ড তো ডিটেক্টিভ, উনি কিছু বুঝতে পারছেন না কি ঘটছে?”

“আপনি সকালেও বললেন বটে…কিন্তু আপনি জানলেন কি করে যে ও ডিটেক্টিভ? মুখ চেনেন নাকি?”

“না। অন্য সূত্রে চিনি। আপনি ওঁর কাঠমান্ডুর কেসটা জানেন তো?”

“হ্যাঁ শুনেছি। আমার সঙ্গে আলাপের আগে অবশ্য। কিন্তু তার সঙ্গে আপনার যোগটা ঠিক…”

“ওখানে যাঁর জেল হয়…ডাঃ দিবাকর…আমার বড় দাদা ”

“ওঃ। তা-তাহলে …মানে…”


“আমি স্কুলে পড়তাম জানেন। মা আর দাদা বৌদির সঙ্গে থাকতাম। খুব ক্লোজ। অনেকটা আপনাদের আর তপেশের মত। খুব প্রাউড ছিলাম ডাক্তার দাদাকে নিয়ে। আপনি তো নিজে ডাক্তার, জানেন তো, সমাজে প্রেস্টিজ… দাদা খুব ভাল করছিল..গাড়ি, বাড়ি ..অল্প সময়ের মধ্যেই…!!

          তারপর একদিন মিঃ মিত্র এসে তাঁর ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়ে এক ঝটকায় সব তছনছ করে দিলেন। দাদার হল জেল। বৌদি বাপের বাড়ি গিয়ে ডিভোর্স ফাইল করল। মা ডিপ্রেসনে ভুগে দুমাসের মধ্যে….”


“আই আ্যম সো স্যরি! বাট দোষটা তো প্রদোষের ছিল না। আপনার দাদা তো জাল ওষুধ আর স্ট্রীকনিন পয়জনিং”….আমার গলাটা শুকনো লাগছে।


“দোষটা কি আমার ছিল?  আমার মায়ের? 

স্কুলে যেতে পারতাম না টিটকিরির ভয়ে! খুনী ডাক্তারের মা, খুনীর ভাই…সবাই বলত আমাদের। এখন যদি আমি আপনাকে এই এখান থেকে আলতো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিই…আপনারও তো কোন দোষ নেই…কিন্তু কি দারুন পোয়েটিক জাস্টিস হবে, তাই না! প্রদোষবাবু যখন দেখবেন তাঁর নববিবাহিতা স্ত্রীর দোমড়নো মোচরানো দেহ… ২০০০ ফুট খাদের নীচে…তখন উনি বুঝবেন তো কেমন লাগে, স্কুল থেকে ফিরে নিজের মাকে সিলিং থেকে ঝুলতে দেখলে?”


(তাহলে নির্মাল্যই…!!

কিন্তু এ পাগল। পুরোপুরি পাগল।

আই নিড ট্যু বাই টাইম। আ্যজ মাচ আ্যজ পসিবল। ওকে কথায় ব্যস্ত রাখতে হবে । হয়তো তাহলে প্রদোষ বা অন্য কেউ এসে পড়বে।

কিন্তু প্রদোষ কি করে আসবে? ব্রীজ তো ভাঙা।ও কি সুপারম্যান যে উড়ে আসবে…?)


“আমি তো কালকেই কাজটা সারতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ঐ মিসেস বাজোরিয়া এসে আপনার সঙ্গে বকর বকর করে প্ল্যানটা ভেস্তে দিলেন। আপনি এত ইন্টেলেকচ্যুয়াল, ঐ অশিক্ষিত মেয়েটার সঙ্গে অত কথা কিসের আপনার?”


(কি কান্ড! ঐ আনক্যুথ মিসট্রেস বাজোরিয়ার গসিপ তাহলে কাল আমায় প্রাণে বাঁচিয়েছে!)


“এই অর্কিডগুলো এখানে সাজিয়ে রাখাও কি আপনার কাজ?”

“ন্যাচেরালি! বললেন যে তখন আপনার নেশা অর্কিড। 

দিব্যি কাজে দিল…পতঙ্গের মত ছুটে এলেন আগুনের পানে! এত ইম্পালসিভ কেন আপনি?”

(প্রদোষও তাই বলেছিল। কিন্তু এখন এই ম্যানিয়াকের থেকে ছাড়া পাই কি করে…)


“সুলগ্নাকেও কি আপনিই ফেলেছিলেন? কিন্তু কেন?”

ভাবতে ভাবতেই প্রশ্ন করি আমি।


“হ্যাঁ আমিই। কারণ টিকটিকিতে আমার ঘেন্না।আরে উনিও তো টিকটিকি। আপনার স্বামীর মত। অন্যের নোংরা সিক্রেট খোঁজা কাজ। সত্যি, কেন আপনি বিয়ে করলেন প্রদোষবাবুকে বলুন তো? কোন ডাক্তার পেলেন না বিয়ে করার জন্য? কিম্বা আর্টিস্টকে? আমার মত? হা হা হা হা…”


(বাবাগো! এ আমাকে মারতে চায় না ফ্লার্ট করতে চায়..? লোকটার ব্রেনের মধ্যে সব ইমোশনস জট পাকিয়ে গেছে মনে হয়…ব্রেন অফ এ সিরিয়াল কিলার। চারটে খুন করেছে। আমি পাঁচ নম্বর হব না…কিছুতেই না…কথা বলে যাই…এটাই একমাত্র উপায় এখন…)


“সুলগ্নাকে কে লাগিয়েছিল? “

“আরে নিশ্চয়ই ঐ বাজোরিয়ার আসল স্ত্রী। ঐ ছুকরিটাকে স্ত্রী সাজিয়ে তো নিয়ে এসেছে। আসল স্ত্রী সন্দেহ করেছিলেন নিশ্চয়ই।”

“চুরিও কি আপনি…”

“না চুরি টুরির মধ্যে আমি নেই…। বরং চুরির জন্য পুলিশ টুলিশ এসে আমার প্ল্যান ভেস্তে দিচ্ছিল…

                 আসলে কি হল জানেন, সুলগ্না সেদিন ব্রেকফাস্ট হলে প্রদোষবাবুকে দেখে চিনে ফেলেন। তারপর সেদিন ট্যুরে ওর সামনে বাই চান্স আমার ওয়ালেটটা পড়ে যায় আর সেটা থেকে আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সটা বেরিয়ে পড়ে যাতে আমার আসল নামটা ছিল…সুহাস দিবাকর।

                 সুলগ্না তো মিঃ মিত্রকে একরকম পুজো করতেন, ওঁর সব কেসের খবর নখদর্পণে ছিল। সেই থেকে দুয়ে দুয়ে চার করে ভাবলেন আপনার স্বামীকে উনি আমার ব্যাপারে সাবধান করে দেবেন। তবে সেটা আমাকে বলে এবং শাসিয়ে কাঁচা কাজ করেছিলেন। ঐ জন্যই তো উনি অত বড় গোয়েন্দা হতে পারেননি। কিম্বা , ভাবেননি হয়তো আমি ঠিক কতদূর যেতে পারি…”

(ঈশ। বেচারা সুলগ্না তাহলে গোয়েন্দা ছিলেন? আমাদের সাবধান করতে চেয়েছিলেন? অথচ আমরা ভেবেছি নোজি মাসিমা…)


“আর সৌভিককে তাহলে কেন মারলেন?”

(কথা চালিয়ে যাই যতক্ষন পারি।)


“কেন মারব না? আমাদের স্কুলে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ত ও। আমার দাদার জেলে যাবার খবর ওই রাস্ট্র করে। প্রত্যেকদিন স্কুলে যারা আমার জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছিল ও ছিল তাদের পান্ডা। অথচ তার আগে আমাকে চিনতও না ভাল করে। ভাল ছবি আঁকতাম। আমার জন্য ও কখনো স্কুলে আঁকার প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়নি। শোধ তুলল তার।”


“কিন্তু মারলেন কি করে? ওকে তো পাহাড় থেকে ঠেলে দেননি?”


“নাঃ। ও তো আমাকে চিনতে পারেনি।অনেকদিন হয়ে গেছে, তারপর এই দাড়িগোঁফ…নামটাও আলাদা।ব্যাটাকে ছবি আঁকতে বলেছিলাম। জানতাম বার খেয়ে আঁকতে যাবে।বিশেষ করে নতুন বৌ এর সামনে…রঙের টিউবে মেশানো ছিল বিষ।স্ট্রিকনিন! আঙুলের কাটা দিয়ে রক্তে মিশে দু ঘন্টাতেই..। ইজেলের ফ্রেমে একটা পেরেক উঠিয়ে রেখেছিলাম তো, আঙুলটা যাতে কাটে! আঙুল কাটার পর প্রায় ময়দান ছেড়ে পালাচ্ছিল। হাতছাড়া হয় দেখে আবার নতুন বৌ এর অজুহাত দিতে হল। সত্যি এই নতুন বৌ যে কি জিনিস ! প্রদোষবাবুকেই দেখুন। পণ করে বসে রইলেন তদন্তে জড়াবেন না। না হলে হয়তো এদ্দিনে …”


“আপনি ভুল করছেন। ও প্রথম খুনের পর থেকেই এতে জড়িয়েছে। চুরির ব্যাপারটায় শুধু জড়াতে চায়নি।”

“তাই নাকি! আরো ভাল তাহলে। প্রদোষ মিত্রের চোখে বেশ ধুলো দেওয়া গেল। দাদা পারেনি, কিন্তু আমি পারলাম…”

(কি মুশকিল…এগিয়ে আসছে তো! আমার পেছনে কোমর হাইটে রেলিং। একটা ঠেলা মারলেই ২০০০ ফুট খাদ।কি ভাবে যে ঠেকাই। আর কতক্ষণ এভাবে..)


“আপনি ভাবছেন বটে সবাইকে ধোঁকা দেবেন। কিন্তু পারবেন না। দেখবেন,ও ঠিক খুঁজে বের করবে আপনাকে। নিজের জীবনটা কেন বরবাদ করছেন এভাবে?” বলে উঠি আমি।


“জীবন আর নতুন করে কি বরবাদ হবে ডাঃ ব্যানার্জি ?  সে তো সেদিন স্কুল থেকে ফিরে ঝুলন্ত মাকে দেখেই হয়ে গেছিল। আর চারটে খুনের শাস্তিও যা, পাঁচটারও তাই।” 

(দৃষ্টিটা একদম পাগলের। পিউপিলগুলো অস্বাভাবিক বড়, হাসিটা উদভ্রান্তের মত…)


“আর বলছিলেন না ধরতে পারবে আমাকে আপনার ‘ও’! আদপেই নয়। আমি তো ওঁর কার্যকলাপ অনেকদিন থেকে ফলো করছি…অবসেসিভলি! উনি আর সে জিনিস নেই। এবং তার জন্য দায়ী সম্ভবতঃ আপনি।”

“তার মানে?” (আমাকে কথা চালিয়ে যেতে হবে।)

“মানে উনি প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে একদম সংসারী হয়ে গেছেন। শার্পনেসটাই আর নেই॥”


(এ কি! এ প্রদোষের শত্রু না ফ্যান ! 

ওর অনেক ফ্যানরাই এরকম বলে। আমরা অনেক হাসাহাসি করেছি এই নিয়ে।)


“সে কথা বলছেন কেন?” 

আমি আবার জিজ্ঞেস করি।

(এ পাগল যতক্ষণ বকবে আমি ততক্ষণ বেঁচে থাকব।)


“আমি লনে বসে ছবি আঁকার নাম করে নজর রাখছিলাম তো আপনাদের ঘরে। সেই প্রথমদিন থেকে।”

(সর্বনাশ! বলে কি! এই পরিস্থিতিতেও আমার কানের ডগা লাল হয়ে উঠছে বুঝতে পারছি।)


“পর্দা টানা ছিল ঠিকই”। 

(বাব্বা, বাঁচোয়া…কিন্তু কি হাস্যকর, আমি হয়তো এক মিনিট পরে আর বেঁচেই থাকব না। সেক্ষেত্রে আর এই বাঁচোয়া কথাটার মানে কি! আর ও কি দেখেছে তাতেই বা কি এল গেল।)


“কিন্তু দেখলাম তো ঘরেই বন্ধ সারাদিন। ডিনার অব্দি খেতে গেলেন না। ফলে জলের গ্লাসে স্ট্রীকনিন মেশানোর চমৎকার প্ল্যানটা আমার মাঠে মারা গেল।”

“আপনার দাদা স্ট্রীকনিন পয়সন করেছিলেন না?”


“হ্যাঁ । সেইজন্যই তো বলছি পোয়েটিক জাস্টিস হত। শুধু আপনার গ্লাসে মেশাতাম। উনি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতেন…. আপনার ঠান্ডা, রিগর মর্টিস সেট ইন করতে থাকা শরীর…আর ভাবতেন এটাই কয়েক ঘন্টা আগেকার সেই কোমল,উষ্ণ, মায়াবী দেহটা কিনা, যাতে ডুবে উনি জগৎ ভুলেছিলেন।আমার মাকেও যখন ওরা নামাল…আমার নরম মা, গরম মা…একই রকম তো…ঠান্ডা, শক্ত…হা হা হা হা!!”


(উন্মাদ! বদ্ধ উন্মাদ!! 

একটা আস্ত ফ্রয়েডিয়ান নাইটমেয়ার…আকাশে অন্ধকার নেমে আসছে…আমার জীবনেও কি?)


“পরদিন কফির কাপেও কি স্ট্রীকনিন দিয়েছিলেন? প্রথমে আমার কাপটা হাতের ধাক্কায় ফেলার পরে?” 

হঠাৎ মনে পড়ে আমার।

“বাঃ। বেশ বুদ্ধি আছে তো আপনার! সেই জন্যই বোধহয় ফেলু মিত্তির আপনার কাছে ধরা পড়েছেন।”


(মারতে আসা সিরিয়াল কিলারের থেকে বুদ্ধির প্রশংসা! দিস ইজ স্যুররিয়েল। প্রদোষ যদি শুনত…কিন্তু হবে কি সেই সুযোগ আর কখনো…)


“হ্যাঁ। ভেবেছিলাম হাল্কা ফ্লার্টিং এর চার্মে আর্টের কথা শুনতে শুনতে আপনি কফিটা বসে বসে খাবেন। বরং আপনার স্বামী বিরক্ত হয়ে পালাতে পারেন। হল উল্টো। আপনিই পালালেন। একটু পিকিউলিয়ার কাপল আপনারা।”

(ভাগ্যিস! ভাবলাম আমি। আকাশে তাকিয়ে দেখি সন্ধাতারা উঠেছে। তারপাশে আরো দুই জ্যোতিষ্ক…আর কিছুক্ষণ। আরো কিছুক্ষণ আমাকে টানতেই হবে। যে করে হোক….)


“যাক, অনেক সময় দিয়েছি আপনাকে, আর না..”, আমার মনের ভাব বুঝেই যেন এগিয়ে এল আর এক পা।

“ব্রীজটা ড্যামেজ করাও কি আপনার  কাজ”, মরিয়া হয়ে প্রশ্ন করি।

(হে ভগবান, কাজ করে যেন এটা। শুনেছি সিরিয়াল কিলাররা নিজেদের কাজের ঢাক পেটাতে ভালবাসে। প্লীজ, লেট দ্যাট বী ট্রু…প্লীজ, প্লীজ, প্লীজ…”)


“হ্যাঁ। আমিই।”

 (থমকে গেছে। মুখে হাসি। নিজের অন্যতম আ্যচিভমেন্টের কথা শোনাবে আমাকে…)

“দেখলাম তো, আপনার স্বামী বেরিয়ে গেলেন, আমার কাজের সুবিধা করে দিয়ে। সৌভিককে মেরে ডবল লাভ হল…”

(ওর চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে, আকাশের তারাগুলোর মত…শুধু একটা তারা ছাড়া…তারা, নাকি ফানুস ওটা? )

“ড্র ব্রিজের মোটা কাছিগুলো কাটার জন্য তো রান্নাঘরের বড় ছুরি দুটো চুরি করলাম। কিন্তু কি জানেন, বড্ড সময় লাগে ওতে…ঘষে ঘষে কাটা তো। 

সেই করতে গিয়ে তো অনিল, ঐ ছোট শেফ দেখে ফেলল আমায়। এসেছিল ব্রীজের ধারে মাশরুম তুলতে, আমি তখন ছুরি ঘষে ঘষে কাছি কাটতে গলদ ঘর্ম! মারতেই হল ওকে। ঐ ছুরিই বুকে বসিয়ে! তারপর গ্রীনহাউস থেকে কুড়ুলটা নিতে গেলাম।ব্যাটা মালী কিন্তু দেখে ফেলল আমাকে। তখন না মেরে ওকে আর উপায় ছিল কিছু, আপনিই বলুন না…”


(কি সাংঘাতিক! দুটো সম্পূর্ণ নির্দোষ মানুষকে অকারণে নৃসংশ ভাবে মেরেও এতটুকু অনুতাপ নেই! আকাশের বড় ফানুসটা এখন আরো কাছে। নির্মাল্যর পেছনে, তাই ও দেখতে পাচ্ছে না। আমি চেষ্টা করছি ওদিকে না তাকাতে, তাহলে নির্মাল্যর সন্দেহ হবে…)


“কি ভাবছেন? ঐ লোকগুলো আমার প্ল্যানের কোল্যাটেরাল ড্যামেজ? হয়তো! যেমন আমি আর আমার মা ছিলাম আপনার স্বামীর সফল ইনভেস্টিগেশনের ক্ষেত্রে! কাগজে কাগজে ওঁকে নিয়ে যখন হৈ চৈ, পাতাজোড়া ইন্টারভিউ বেরোচ্ছে চারমিনার হাতে, মুখে একপেশে হাসি, পাজামা-পাঞ্জাবী আর শালে আদ্যন্ত বাঙালী শার্লক হোমস—তখন আমি আর মা লজ্জায়, ভয়ে ইঁদুরের মত গর্তে লুকিয়ে আছি, ফর নো ফল্ট অফ আওয়ার ওন! টক আ্যবাউট কোল্যাটেরাল ড্যামেজ!”


“নির্মাল্যবাবু, আপনাদের দুরবস্থার জন্য কি ও দায়ী না দায়ী আপনার দাদার সীমাহীন লোভ?” 

(আমি মরিয়া চেষ্টা চালিয়ে যাই)।


“দায়ী প্রদোষ মিত্র, আর কেউ না। আর তার শাস্তি উনি আজ পাবেন…”


নির্মাল্য এখন আমার দুহাতের মধ্যে। দুটো হাত সামনে প্রসারিত আমাকে ধাক্কা দেবার জন্য। ফানুসটা মাটির কাছে এখন। আমার আর পেছনোর জায়গা নেই…

মাথাটা নীচু করলাম নির্মাল্যকে এড়ানোর জন্য আর সেই মুহূর্তেই একটা বিরাট আওয়াজে নির্মাল্য চমকে তাকাল পেছনে।


এই সুযোগটুকু কাজে লাগিয়ে, ওকে প্রাণপনে ধাক্কা দিয়ে চলে গেলাম সিঁড়িতে। আর তিন ধাপ উঠলেই লন… কিন্তু শেষ রক্ষা আর হয় না বোধহয়। ও আমার বাঁ পা টা চেপে ধরেছে…আবার টেনে নিয়ে যাচ্ছে খাদের দিকে। আমি চেষ্টা করছি উল্টোদিকে যেতে…কিন্তু ওর গায়ের জোর আমার চেয়ে বেশী।কপালটা সিঁড়িতে ঠুঁকে গেল…দু হাতের তালুতেই নুনছাল উঠে গেছে ঘষটে…চিনচিনে ব্যথা। ওপর পাটির দুটো দাঁত নীচের ঠোঁটে কেটে বসে গেছে…মুখে রক্তের ধাতব স্বাদ…সিঁড়ি, লন, জীবন…সব আবার দূরে সরে যাচ্ছে। প্রদোষ কোথায় তুমি…

***

হানিমুনে হন্তারক

————————————————

পর্ব ৮ঃ আহত ব্যাঘ্র

___________________________


আবার একটা আওয়াজ। এবার একটা কাৎরানীর আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে আমার পা টা ছাড়া পেল। আমি প্রাণপণ শক্তিতে উঠেই এক দৌড়ে লনে।দেখলাম ফানুস না, ওটা বেলুন আর ওটা ল্যান্ড করেছে। তিন চারটে ছায়ামূর্তি ছুটে আসছে।

সবার আগে হাতে রিভলবার ঐ সিল্যুয়টকে আমি চিনি…খুব, খুব কাছ থেকে চিনি।


“মণি তুমি ঠিক আছ”? প্রদোষ এক হাতে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে…নাহলে পড়ে যেতাম…হাঁটু দুটোয় জোর নেই একটুও।অন্য হাতে ধরা ওর কোল্ট .৩২।


“মণিদি!!!”

“মণিকঙ্কণা !!!” 

লালমোহনবাবু আর তপেশ!


(ওরা এখানে কি করে…আমরা তো হানিমুনে…এই জায়গাটা কি…কলকাতা না কেদার…পাহাড় আছে যে… সবাই কি সব বলছে…শুনতে পাচ্ছি না…কানে হাজার ঝিঁ ঝিঁর ডাক… কেমন ঘুম ঘুম পাচ্ছে…বললাম সারারাত জাগিয়ে রেখ না…তাও…জানলার বাইরে সিরিয়াল কিলার নজর রাখছে…কিলার না আর্টিস্ট…সৌভিকও তো আর্টিস্ট …মরে গেল দুম করে…বিষ ছিল লাল রঙে…লাল সিঁদুর বর্ণালীর মাথায়…বোকা মেয়ে…আমি তো পরি না…আমার বরকে মারবে না…সবাই কোল্যাটেরাল ড্যামেজ…শুধু আমাকে মারবে …আমার বডিতে রিগর মর্টিস হবে…আর কেউ দস্যিপনা করতে পারবে না…পর্দাটা টেনে দিতে হবে…ভারী পর্দা…যেন কিছু দেখা না যায়…যেমন পর্দা এখন আমার চোখে নেমে আসছে…)

                       ———————

“লালমোহনবাবু, আপনি আর তোপসে একটু থাকুন এঘরে মণির সঙ্গে।”

“আপনি কোথায় যাবেন আবার”?

“নির্মাল্য তো খাদের পাশ দিয়ে পালিয়েছে। ইন্সপেক্টর সহায় বেরিয়ে গেছেন খুঁজতে। কনস্টেবল দুজন এই হোটেলে পাহারা দিচ্ছে। আমাকে সহায়কে জয়েন করতে হবে।”

“পুলিশকেই করতে দিন না তাড়া করার কাজটা। আপনি বরং ম্যাডামের সঙ্গে থাকুন।” 

“লালমোহনবাবু, বিশ্বাস করুন, সেটা করতে পারলে এখন আমার চেয়ে বেশী খুশী কেউ হত না।”


“কিন্তু নির্মাল্যর আসল টার্গেট আমি… র্যাদার মণি। বাকী সব খুনগুলো ওর কোল্যাটেরাল ড্যামেজ।মণিকে মেরে ও আমার ওপর শোধ তুলতে চায়। এভাবে ছেড়ে রাখা যাবে না ওকে। ট্যু বিগ এ রিস্ক ফর হার। আজ না হলে কাল। এখানে না হলে কলকাতায়। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। একটু পরে কৈরালা বেলুন নিয়ে ফিরবে কালিম্পং। আপনারা যাবেন ওর সাথে মণিকে নিয়ে ।আর তারপর শিলিগুড়ি। কাল ভোরে বাগডোগরা থেকে ফ্লাইটে কলকাতা। আমার জন্য ওয়েট করবেন না।”


“কিন্তু মণিকঙ্কণার তো জ্ঞান ফেরেনি এখনো…”

“ফিরে আসবে শীগ্গীর বলেই আমার বিশ্বাস। শক থেকে হয়েছে। এমনি কোন বড় ইনজুরি তো নেই। শী ইজ এ ব্রেভ গার্ল…শী উইল বী ফাইন।”


“ফেলুদা, তুমি যে গুলিটা চালালে সেটা কি হল?”

“সম্ভবতঃ নির্মাল্য আংশিক আহত তাতে। রক্তের দাগ দেখেছি ওখানে। মণিকে ছেড়েও দিয়েছে ও সেই কারণেই।কিন্তু এতটাও আহত নয় যে পালাতে পারবে না। ঐ আধো অন্ধকারে, মণিকে বাঁচিয়ে, বেলুন থেকে এর চেয়ে বেটার এইম করতে পারিনি।”

“তুমি তো তাও আহত করেছ ফেলুদা…ইন্সপেক্টর সহায় এর শটটা তো লাগেই নি।”

“কিন্তু ও পালাবে কোথায়? ব্রীজ তো ভাঙা ফেলুবাবু?”

“এখানে আশে পাশে জঙ্গল, রিসর্টের অন্যপাশে পাহাড়, খাদ ধরেও কিছুটা নামা যায় বহু জায়গায়। একজন লোকের লুকোনোর পক্ষে অনেক জায়গা। দেখি…আমি এবার বেরোব।”


“সাবধানে যেও ফেলুদা। ও কিন্তু এখন মরিয়া।”

“আমিও। ভাবিস না তোপসে।”


তোপসের কথা

***************************

ফেলুদা তো বেরিয়ে গেল। আমি আর লালমোহনবাবু বসে আছি ওদের হোটেলের ঘরে। কি যে সব ঘটে গেল গত একদিনে ! আসলে সকালে মণিদির বাবা ফোন করে যখন আমাদের বললেন যে এরকম রিসর্টে খুন হচ্ছে, লোকে নিখোঁজ হচ্ছে, এদিকে ফেলুদার পাত্তা নেই, তখন আমরা সবাই খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। তারপর এই হোটেলে ফোন করতে গেলাম, অথচ ফোন লাগল না।আমরা, মণিদির বাবা মা, লালমোহনবাবু, সবাই চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোথায় কি! এখন তো দেখছি কেন। ব্যাটা লাইন-ই কেটে দিয়েছিল।


ওদিকে মণিদির বাবা তো আসবেন বলে বদ্ধপরিকর। তখন মা ওঁকে বকুনি দিয়ে থামালেন আর বাবা একটা রফা সাব্যস্ত করলেন যে আমি আর লালমোহন বাবু আসব।


“না না। এ অসম্ভব। ফেলুবাবুর হানিমুনে আমি গিয়ে হাজির হতে পারব না তপেশ। সব কিছুর একটা লিমিট আছে। ব্যাচেলর হতে পারি তাই বলে হাঁদারাম তো আর নই।” 

প্রস্তাবটা শুনে প্রথমে বলেছিলেন জটায়ু ।


“আরে, আমিই কি আর যেতে চাই নাকি, লালমোহনবাবু! এমনিতেই ঐ পুকাইটা বলছিল আমি নাকি সারক্ষণ ওদের সঙ্গে থার্ড হুইলিং করি…খুব ডেঁপো মেয়ে! যাদবপুর তো, হবেই!”

“তবে? আমাদের কারোরই যাবার কোন দরকার নেই।”

“কিন্তু ব্যাপারটা একটু গোলমেলে ঠেকছে ঠিকই। ফোন কাজ করছে না, দুটো রহস্যমৃত্যু,ফেলুদা নেই… সবথেকে বড় কথা আমরা না গেলে মেসোমশাই, মানে মণিদির বাবা যাবেন। তাতে কি লাভ হবে ওদের?”

“উফ, ঐ ভদ্রলোক না…ব্যাগড়া দিতে মুখিয়ে আছেন সর্বক্ষণ। কি করে যে ঐ মেয়ের ঐ বাপ হয় বুঝি না।”

“তাহলে টিকিট বুক করে ফেলি, কি বলেন? এক্ষুণি বেরোতে হবে কিন্তু। তাহলে বিকেলের মধ্যে কালিম্পং।”


সেইমত কালিম্পং পৌঁছে ওখানকার পুলিশ স্টেশনে খোঁজ নিতেই দেখলাম ফেলুদা ওখানে। ইন্সপেক্টর সহায় বললেন ওঁরাও খবর পেয়েছেন ব্রীজ এবং টেলিফোন লাইন ডিসকানেক্ট করার কথা। তারপর থেকে ওঁরা পি ডাব্লু ডির সঙ্গে যোগাযোগ করে চলেছেন। সারানোর কাজ শুরু হবে দ্রুত।


কিন্তু ফেলুদা আরো আগে পৌঁছতে চায়। কারণ ওর ধারণা সৌভিকের মৃত্যু আ্যক্সিডেন্ট নয় খুন। বর্ণালী ওকে বলেছিল ওর হাতে ইজেলের পেরেকের খোঁচায় কেটে গেছিল। ঠিক সেইখানেই লেগে আছে লাল অয়েল পেন্ট। তাই ও পোস্টমর্টেমে স্ট্রিকনিন পয়জনিং হয়েছে কিনা নজর রাখতে বলেছে।আর ওর ধারণা এই সব কিছুর পেছনে আছে নির্মাল্য, ওরফে সুহাস দিবাকর।


“কিন্তু ফেলুদা, পেরেকের খোঁচায় টিটেনাসও তো হতে পারে।”

“পারে, কিন্তু বর্ণালী বলছিল সৌভিকের আ্যন্টি টিটেনাস নেওয়া ছিল তিন মাস আগে। তা ছাড়াও এত তাড়াতাড়ি একটা ইজেলের পেরেকের খোঁচায় কেটে এত সিভিয়ার রিআ্যকশন হতে পারে না। মোস্ট লাইকলি স্ট্রিকনিন পয়জন, যেটা রঙের টিউব থেকে ডাইরেক্ট ব্লাড স্ট্রীমে গেছে।”


“কিন্তু নির্মাল্য বা সুহাস…ও কি সৌভিকের শত্রু”?

“আ্যকর্ডিং ট্যু নির্মাল্য সৌভিক ওর শত্রু।ওরা এক স্কুলে পড়ত। সৌভিক সিনিয়ার একবছরের। হয়তো যারা ওকে বুলি করে স্কুল ছাড়া করে তাদের দলে সৌভিক ছিল!”

“কিন্তু সেই জন্য কেউ খুন করে?”

“সাধারণতঃ না। কিন্তু এরকম স্কিৎজোফ্রেনিক সিরিয়াল কিলারের কথা আলাদা।”

“কি সাংঘাতিক!”

“আর ভেবে দেখ তোপসে , শুধু সৌভিক না, আমিও কিন্তু ওর শত্রু। কেস ফাইল বলছে ছেলে জেলে যাবার পরে দিবাকরের মা আত্মহত্যা করেন, সম্ভবত লোকলজ্জায়। ওর বৌ ডিভোর্স নেয়। তখনকার ১৭/১৮ বছরের সুহাস যদি ওর পরিবারের এই মিসফরচুনের জন্য আমাকে দায়ী করে?”

“কিন্তু আপনি তো এখন এখানে মশাই।” জটায়ু বলে ওঠেন।

“কিন্তু মণি ওখানে। ট্র্যাপড। কিছু জানেও না এ ব্যাপারে। আমাকে একবারে মেরে না ফেলে যদি দগ্ধে দগ্ধে মারতে চায় তো মণিকেই তো ও টার্গেট করবে, তাই না? আমাদের হানিমুনে…একদম পারফেক্ট রিভেঞ্জ।”


আমার গলা শুকনো লাগছে। এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার !


“সবই তো বুঝলাম মশাই, কিন্তু ব্রীজ তো কাল সকালের আগে সারানো হবে না। এদিকে মণিকঙ্কণাকে যে ফোনে সাবধান করে দেবেন তাও তো হবে না।” জটায়ু বললেন।

“না অতক্ষণ ওয়েট করা যাবে না। নির্মাল্যই যদি খুনি হয় ও-ও জানবে ব্রীজ সারানোর ব্যবস্থা চলছে। ও তাই আজকের মধ্যেই আঘাত হানতে চাইবে। হয়তো রাতেই…”

“কিন্তু যাবেন কি করে? উড়ে তো যেতে পারবেন না?”

“উড়েই যেতে হবে  লালমোহনবাবু! এখানকার প্যারা গ্লাইডিং ক্লাবের একটা বড় বেলুন আছে। চালক ছাড়া ৬ জন ধরে। ওদের এক সদস্য মিঃ কৈরালা সহায়জীর চেনা। উনি রাজী হয়েছেন আমাদের নিয়ে যেতে।আমি, সহায় আর দুজন কনস্টেবল তো যাবই। আপনারা দুজনও চলুন।”


“বলেন কি ফেলুবাবু বেলুন! এ তো দারুণ আ্যডভেঞ্চার মশাই।”

“হ্যাঁ। কিন্তু মনে রাখবেন এই আ্যডভেঞ্চারে ফেল করা যাবে না।এটা লাইফ আ্যন্ড ডেথ সিচ্যুয়েশন ফর মণি…আ্যন্ড সো বাই এক্সটেনশন আমার।”


বেলুনের দিকে যেতে যেতেই ফেলুদা ছোট করে বুঝিয়ে দিয়েছিল ব্যাপারটা। লিক্যুইড প্রোপেন জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করে প্রচুর গরম হাওয়া তৈরী হয় যেটা নাইলনের বেলুনকে ফোলায়। তার সংঙ্গে আটকানো ঝুড়ির মত জিনিসে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়াতে পারে। তারপর আর্কিমিডিসের সূত্র অনুযায়ী সবসুদ্ধ ঐ গরম হাওয়ার বেলুন আকাশে ওড়ে। মুস্কিল হল বেলুনে কোন স্টিয়ারিং হুইল থাকে না, ফলে কোন নির্দিষ্ট দিকে যাবার একমাত্র উপায় গরম হাওয়া বাড়িয়ে বা কমিয়ে বেলুনকে ওপর নীচ করা এবং সেখানকার বাতাসের দিক অনুযায়ী বেলুনটাকে পরিচালনা করা। সবচেয়ে শক্ত কোন একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ল্যান্ড করা।

“ইট ইজ এ প্রিসাইস সায়েন্স আ্যন্ড আ্যন এক্স্যাক্ট আর্ট।” ফেলুদা বলল। 


প্যারাগ্লাইডিং ক্লাবের কৈরালার নাকি সেই দক্ষতা আছে। উনি ট্যুরিস্টদের নিয়ে প্রায়ই বেলুনে ঘুরিয়ে আনেন।


বেলুন থেকেই দেখতে পাচ্ছিলাম মণিদিকে কেমন কোনঠাসা করেছে নির্মাল্য। মুশকিল হল বেলুন দ্রুতগামী যান নয়। হাওয়ার ওপর নির্ভরশীল অনেকটাই। ঠিকমত ল্যান্ড করানোও শক্ত। মণিদি যে ওকে কথায় ব্যস্ত রেখে সময় কিনছে বোঝা যাচ্ছিল। শেষে নির্মাল্য যখন আ্যটাক করতে গেল ইন্সপেক্টর সহায় গুলি চালালেন, যদিও রেঞ্জে ছিল না। তাতে অন্ততঃ প্রথম আ্যটেম্পটটা আটকানো গেছিল নির্মাল্য চমকে পেছনে তাকানোয়। তারপর তো ফাইনালি ফেলুদার রিভলভারের গুলি ওর হাতে লাগে। পুরো লেগেছে না ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে এখনো জানি না।


তবে মণিদির মেন্টাল স্ট্রেংথ দারুণ। কতক্ষণ যে ঐ সাইকোটাকে ঠেকিয়ে রেখেছিল ঐ খাদের ওপর ঝুলন্ত প্ল্যাটফর্মে! ফাইনালি আমরা আসার পর আর নির্মাল্য পালানোর পর আ্যড্রেনালিন সার্জটা কমতেই লুটিয়ে পড়ল। দু-একটা ছোটখাট চোটও আছে।


ফেলুদা তো বেরিয়ে গেল ইন্সপেক্টর সহায়কে নিয়ে। আশা করি ওরা তাড়াতাড়ি নির্মাল্যকে কব্জা করতে পারবে। 


হয়তো এই ঘরে আমরা সেফ, কে জানে! তবে আমার কেবলই মনে হচ্ছিল জিম করবেটের দ্য ম্যানইটার অব রুদ্রপ্রয়াগের কথা। জখম হওয়া বাঘ কিন্তু আরো ভয়াবহ। কে শিকার আর কে শিকারী গুলিয়ে যায় প্রায়ই।দিনের পর দিন পিছু ধাওয়া করে কি অধ্যাবসায়ের সঙ্গে করবেট সাহেব ওটাকে মেরেছিলেন। 


ফেলুদাও করবেটের মত সফল হবে কি?

***

হানিমুনে হন্তারক

———————————————————

পর্ব ৯ঃসাইকো

—————————————————-

পারলাম না। এত কাছে এসেও পারলাম না। এতদিন ধরে এত প্ল্যানিং, ফেলু মিত্তিরকে এতদিন ধরে ফলো করা—ও কোথায় যায়, কি করে, কাদের সঙ্গে মেশে—ওর প্রেম, বিয়ে—সব আমার নখদর্পণে ছিল। তাও তীরে এসে তরী ডুবল।


প্রথমে তো ভেবেছিলাম তোপসেকে টার্গেট করব। ফেলু মিত্তিরের বাপ মা তো নেই। কাকা কাকীমা নিজেদের ছেলের মত মানুষ করেছেন ঠিকই, তাও…।যদি ওর মা থাকত তাহলে নিশ্চয়ই মাকেই টার্গেট করতাম। আমার মার পরিণতির জন্য তো ওই দায়ী। কিন্তু তা তো হবার নয়, মরা মাকে তো জ্যান্ত করে খুন করা যায় না! তাই ভাবলাম তোপসে …ছোট ভাই, সব সময় সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে। আর তা ছাড়া আমার দাদাকে এক্সপোজ করার ব্যাপারেও তো তোপসেই সাহায্য করেছিল, ঐ টেকো,ভাঁড় লেখকটার সঙ্গে। 


কিন্তু তারপর কাগজে-টাগজে বেরলো ওর প্রেমে পড়ার খবর। ঐ সুইডেনে এক মার্ডার আ্যটেম্পটের ব্যাপারে আ্যন্টনি হোয়াইটকে ধরল। লোকে তো বলে আ্যন্টনি নাকি সাউথ আফ্রিকান সরকারের চর। গুজব ও উলফ পালমের খুনেও জড়িত। সেগুলো অবশ্য প্রমাণিত নয়। কিন্তু ওর ফ্যানেরা তো পাগল হয়ে গেল কৃতিত্বে। তারপরই বেরোল সুইডেনে নাকি ওর গার্লফ্রেন্ডও ছিল। অনেকে ভেবেছিল অবশেষে সুইডিশ মেয়েকে বোধহয় মনে ধরেছে। তারপর আবার দেখা গেল সুইডিশ নয়, আদ্যন্ত বাঙালী মেয়ে—মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি!


প্রথমে ভেবেছিলাম গুজব, ঐ হিরোইন রূপার মত। কিন্তু দেখলাম, না। ক্রমশঃ গার্লফ্রেন্ডের নাম ধাম সব কাগজে বেরিয়ে গেল, তারপর আবার বাড়ির লোকদের আপত্তিতে ছবি টবি দেওয়া বন্ধ হল, কিন্তু ফ্যান ক্লাব তো আর ওভাবে বন্ধ হয় না! আমি দুটো ফ্যান ক্লাবের মেম্বার। কি উত্তপ্ত বিতন্ডা! অনেকেই তো বলতে লাগল ফেলু মিত্তির এবার গেঁজে গেল বলে। অচিরেই ঝোলা হাতে বাজারে গিয়ে আলু-পটল আর ফিডিং বটল কিনবে। বাঙালী তাদের হিরোকে ব্যাচেলর দেখতেই ভালবাসে তো…নেতাজীর স্ত্রী কন্যাকেই মানতে পারে না তা আর ফেলু মিত্তির! আবার কিছু লোক ব্যোমকেশের উদাহরণ দিল। মোটের ওপর বোঝা গেল ভাল, খারাপ যাই হোক ব্যাপারটা সত্যি। ফেলু মিত্তির প্রেমে পড়েছেন এবং অচিরেই হয়তো বিয়ের পিঁড়িতেও বসবেন।


আমি তখনই আমার টার্গেট বদলে ফেললাম। তোপসে নয়, মণিকঙ্কণা। সুইডেন থেকে ও ফেরার পর থেকেই প্ল্যান করছিলাম। কিন্তু শুধু মারলে তো হবে না…এমন ভাবে মারতে হবে যাতে ফেলু মিত্তির সারা জীবন দুচোখের পাতা এক করতে না পারে। চোখ বুজলেই যেন সামনে আসে একটা ছিন্ন ভিন্ন দেহ…যেমন আমার আসে…আমার মায়ের নীল হয়ে যাওয়া, জিভ বেরোন, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসা, ঘাড় ভাঙা…ঠান্ডা শক্ত দেহ! 


মেন্টাল হসপিটালের লোহার খাটে শুয়ে ধপধপে সাদা দেওয়াল আর সিলিং-এ তাই তো দেখতাম রাতদিন। ওরা বলত হ্যালুসিনেশন। বাজে কথা। মা তো আসত আমার কাছে, ঐ চেহারায়—-এসে কাঁদত আর বলত ‘বড় কষ্ট বাবা সুহাস! তুই কি এর কোন বিহিত করবি না?’ ওরা বলতে আই আ্যম হিয়ারিং ভয়েসেস ইন মাই হেড। স্কিৎজোফ্রেনিয়ায় হয় নাকি এরকম। ছাই জানে ওরা। মা তো সত্যিই আসত। কষ্ট হলে বিহিত চাইতে আর কোথায় যাবে, আমার কাছে ছাড়া?


মাকে নামানোর পর দেখে ডাক্তার কি বলেছিল আমার এখনো মনে আছে… এক্সেসিভ প্রেসার অন নেক, রাপচার্ড উইন্ড পাইপ! ওরা বলল সুইসাইড। কিন্তু আমি জানি ওটা মার্ডার। আর মার্ডারার সবার হিরো ফেলু মিত্তির। ও যদি দাদাকে না ধরত তাহলে দাদা,বৌদি, মা, আমরা সবাই…হয়তো এতদিনে ওদের ছেলে মেয়েও হত…একটা নিটোল সুখী পরিবার। 


এখন ভাবছে নিজে ঐ সব গুষ্টিসুখ ভোগ করবে। সুন্দরী, বিদূষী স্ত্রী-অনুগত ভাই-সুহৃদ বন্ধু-অচিরেই সন্তান…নাম যশ…সব, সব কিছু কেবল ওই পাবে। 


আর আমি? কি করেছিলাম আমি? স্কুল ছেড়ে দিলাম। মেন্টাল আ্যসাইলামে রাখল কিছুদিন। আমার নাকি ডিপ্রেশন, অবশেসন উইথ মাই মাদার্স ডেথ। আমি নাকি প্যারালাল রিয়ালিটিতে বাস করি, স্কিৎজোফ্রেনিয়া আছে আমার! আমার আঁকা ছবিগুলো শুদ্ধ ওরা আ্যনালাইজ করতে বসত।জাক্সটাপোসিশন অফ ড্রিম আ্যন্ড রিয়ালিটি…। সেটা মার্কেজ লিখলে হয় ‘ওয়ান হানড্রেড ইয়ার্স অফ সলিচ্যুড’, নোবেলজয়ী সাহিত্য । দালি আঁকলে , পিকাসো আঁকলে হয় কালজয়ী শিল্প। আর আমি করলেই ডার্ক, কম্পলিকেটেড মনের প্রতিফলন নাকি ওগুলো। কিছু জানে না ওরা। মাকে ভালবাসা অন্যায়? তার জন্য এত ফ্রয়েডিয়ান ব্যাখ্যা কিসের! 


দাদার চেয়ে অনেক ছোট, মায়ের কোল পোঁচা ছেলে আমি। রোজ সন্ধেবেলা মায়ের কোলে মাথা রাখে শুতাম…মা চুলে বিলি কেটে দিত। কি সুন্দর নরম, গরম শান্তির জায়গা মায়ের কোল।বৌদি খ্যাপাত, বলতো ‘বৌ এলে তখন কি করবে ঠাকুরপো’?


বৌ! দেখলাম তো দ্য ফেমাস ফেলু মিত্তিরের দশা নতুন বৌ পেয়ে! মণিকঙ্কণা যে এই রিসর্টটা বুক করেছে, সেটা তো ওকে ফলো করে ওর ট্র্যাভেল এজেন্টের থেকেই জানতে পারলাম। তারপর ওদের একদিন আগেই এখানে। ভেবেছিলাম হয়তো দু একদিন আগেই সুযোগ পাব। ঠেলে ফেলা বা স্ট্রিকনিন দেওয়া…


কিন্তু বেরোলই না ঘর থেকে। খেতে অব্দি গেল না অর্ধেক সময়…হয় রুম ডেলিভারী নয় তো একেবারেই বাদ।ভাবলাম কনডাক্টেড ট্যুরে যাবে…মণিকঙ্কণা খোঁজ নিচ্ছিল লবিতে। সেই জন্য আমিও ট্যুর বুক করলাম। ওমা কোথায় কি! পরদিন সবাই ট্যুরে গেল, এমনকি সৌভিকরাও, অথচ ওরা বসে রইল ঘরে।মাঝখান থেকে সুলগ্নার কাছে আমার আসল পরিচয় প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় ওকেও মারতে হল। তাতে অবশ্য আমার কিছু দুঃখ নেই, জগতে টিকটিকি যত কম থাকে ততই ভাল। 


কি যে বিরক্তিকর ওদের এই ঘরে আটকে থেকে আমার প্ল্যানগুলো বানচাল করাটা! দুটো মানুষ কি করে যে পরস্পরের মধ্যে এমন বুঁদ হতে পারে আমি তো বুঝতে অক্ষম। আমি বুঝি একটা কাজের নেশা…একটা গোল, একটা টার্গেট।যেমন আমার—ফেলু মিত্তিরকে চুরমার করার টার্গেট।ওরা বলে অবশেসন। তো তাই! সবার কাজই অবশেসন, ফেলু মিত্তিরও তো অবশেসড ছিল অপরাধী ধরার ব্যাপারে। আর এখন কি অধঃপতন! ভাবা যায় না। তবে ভালোও লাগছিল এটা ভেবে যে আঘাতটাও চরম হবে যখন ওর ঐ প্রাণেশ্বরীর থ্যাঁৎলানো দেহটা দেখবে! 


এই মায়ের শরীরে আদা বাটা, সিন্থল সাবান আর চন্দন ধুপের গন্ধ মেশানো ওম…এই মা শক্ত কাঠ, ঠান্ডা নীল। এই নতুন বৌ এর নরম, গরম, নেশা ধরানো শরীর…এই বৌ একটা রক্তাক্ত মাংসপিন্ড!! হি হি !

টিট ফর ট্যাট। বুঝুক আমার মত সারা জীবন ধরে… শয়নে, স্বপনে, জাগরণে শুধু ঐ দুমড়ানো মুচড়ানো দেহ চোখে ভাসবে। শুধু একটু ধৈর্য্য…তাহলেই সে সুযোগ আসবে। 


এল অবশেষে সুযোগ। সৌভিকটাকে মারার পরেই। জানতাম না ওটাও এখানে আসবে। মারার প্ল্যানও ছিল না। কিন্তু এলই যখন…। কি আশ্চর্য, সেও হানিমুন করতে। বদলায়নি দেখলাম বিশেষ। সেই হামবড়া সবজান্তা ভাব, সেই ধারণা নিজের মাঝারি মানের আঁকাগুলো কালজয়ী শিল্প আর সেই বুলিয়িং টেন্ডেন্সী। দেখলাম তো নিজের বোকাসোকা বৌটার ওপরে কি ছড়ি ঘোরানো। নরম মাটি পেলেই আঁচড়াবে। বুঝবে পরে ঐ বর্ণালী আমি ওকে কেমন বাঁচালাম জীবনভোর ঐ বুলির ঘর করা থেকে। আর আমার ডবল লাভ তো হল যখন ফেলু মিত্তির রওনা হলেন ডেডবডির সঙ্গে।


এত কান্ড করলাম। আরো দুটো লোককে মারতে হল, ব্রীজ খারাপ করলাম। আর একটা মিনিট পেলেই হয়ে যেত…অথচ সেই…লিটারেলি নেমে এল আকাশ থেকে…প্রদোষ মিত্র, আমার নেমেসিস!


গুলিটা আমার কাঁধ ছুঁয়ে গেছে। রক্ত পড়া বন্ধ হয়েছে, কিন্তু বাঁ হাতে খুব ব্যথা। আমি এখন এসেছি পাহাড়ের ঢালে এই ভাঙা ঘরটায়। এটাতে আগে ওদের বাগানের সরঞ্জাম থাকত। এখন সব নতুন গ্রীন হাউসের কাছে সরে গেছে। কিন্তু এখানে আসার পরের দিনই এই পরিত্যক্ত ঘরটা দেখেই ভেবেছিলাম এটা আমার কাজে লাগবে। চুরি করা ছুরি, কুড়ুল, কিছু এক্সট্রা জামা কাপড় সব এখানেই রেখে দিয়েছিলাম। সবচেয়ে ভাল ব্যাপার এখান থেকে ওদের ঘরটা পরিস্কার দেখা যায়। এতদূর থেকে ডিটেইলগুলো বোঝা যায় না, তবে ঘরের আলো দেখা যায়।


আমার হাতে বেশী সময় নেই। ইন্সপেক্টর সহায় তো খুঁজছেন আমাকে। নিশ্চয়ই দুই দরজায় পাহারা মোতায়ন।মিঃ মিত্র নিশ্চয়ই বেরোবেন খুঁজতে এক্ষুণি…রক্তের ট্রেইল ধরে ধরে…অন্ধকারে সহজ নয় কাজটা…কিন্তু খুব বেশীক্ষণের আগেই ওরা এই ডেরায় চলে আসবে। যা ধূর্ত ঐ প্রদোষ মিত্র, এখানে আসতে ওর বেশী সময় লাগবে না।এতক্ষণ এসেই যেত যদি না ওর ঐ প্রেয়সীকে নিয়ে ব্যস্ত থাকত। তবে আর অপেক্ষা করা ঠিক হবে না।রক্তটা বন্ধ হয়েছে, জামাটা বদলে এখান থেকে অন্য কোথাও যেতে হবে….তারপর অসমাপ্ত কাজটা শেষ করতে হবে!


জামাটা চেঞ্জ করে নিয়েছি। হাতটায় একটা যেমন-তেমন ব্যান্ডেজ যেটা এই জামার তলায় ঢাকা। অসহ্য যন্ত্রনা, কিন্তু আমাকে যেতেই হবে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠতে উঠতেই দেখলাম হাতে টর্চ নিয়ে এক ছায়ামূর্তি প্ল্যাটফর্মের পাশের জায়গাগুলো দেখছে। মনে হয় পুলিশ। আমার কাঁধের ব্যাগে বড় ছুরি, টর্চ আরো দু একটা জিনিস। রিসর্টের মধ্যে ঢুকতে হবে আমাকে। মণিকঙ্কণা ওখানেই আছে। শেষ চেষ্টা করে দেখি একবার…


 অন্ধকার জায়গা দিয়ে, ঝোপঝাড়ের পিছন দিয়ে এসে পড়লাম রিসর্টের পিছনের দরজায়। পাহাড়ের ঢালে তৈরী এই হোটেলের এন্ট্রান্সটা মাঝের ফ্লোরে। ওপরের তলায় আছে সব গেস্টরুম গুলো। এই তলায় লবি, রিশেপশন, ডাইনিং হল। নীচের তলায় স্টাফ কোয়ার্টার, সুইচ রুম ইত্যাদি। এই পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকলে লবি বা মেইন সিঁড়ি বা করিডোরে যাওয়া যাবে না সহজে, কিন্তু পিছনের সিঁড়ি দিয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে যাওয়া যাবে। দেখা যাক, সুবিধে হয় কিনা। কিন্তু সবার আগে দরজায় দাঁড়ানো কনস্টেবলকে সরাতে হবে। ও তো আমাকে দেখেনি, চেনে না…সেটা যদি কাজে লাগানো যায়…


“কনস্টেবলজি, ম্যয় নিখিল হুঁ, ইঁহাকে মালী। আভি আভি দেখা উধার উস ঝাড়ি কি তরফ কোঈ যা রহা থা…থোড়া লড়খড়াকে…আপ জারা দেখেঙ্গে?”

“কাঁহা? দিখাও তো সহি…”

“উয়ো উস ঝাড়িকে পিছে, থোড়া ঔর আগে বাঢিয়ে, দিখ যায়েগা আপকো…”

ও এগিয়ে গেল ঝোপটার দিকে…আমি ছুরিটা বের করে, পেছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েই গলার এপাশ থেকে ওপাশ চালিয়ে দিলাম। 


জগুলারটা গেছে। কাটা কলাগাছের মত পড়ে গেল লোকটা, চিৎকারও করতে পারল না। সী, সো সিম্পল! 

একটু পরেই ঠিক এইভাবেই… মণিকঙ্কণা, ফেলু মিত্তিরের হৃদয়েশ্বরী…হি হি হি!


ভেতরে ঢুকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলাম চটপট, ছুরি ব্যাগে ভরে। নীচের করিডোরে মিটমিটে আলো। স্টাফরা সব হয় ঘরে নয় ওপরে কিচেন বা রিশেপশনে। করিডোরের একদিকে সারি দিয়ে স্টাফদের ঘর। অন্যদিকে লন্ড্রি , পাম্পরুম, ইলেকট্রিক সুইচ রুম এই সব…


প্রথমে গেলাম লন্ড্রি রুমে। আগেই দেখেছি এখানে দেওয়ালে ঝোলানো থাকে জমাদারের চাবির গোছা। ওটা আমার লাগবে।এবার আমি ঢুকে গেলাম ইলেকট্রিক রুমে। মেইন সুইচটা নামিয়ে দিলাম। ওরা ভাববে লোডশেডিং। হয় এখানে মাঝে মাঝে। মোমবাতি টাতি জ্বালিয়ে এখানে দেখতে আসতে আসতে আরো অন্ততঃ পাঁচ দশ মিনিট তো বটেই…যদি আদৌ সন্দেহ করে এখানে আসে।


তার অনেক আগেই আমি পৌঁছে যাব। মেইন সিঁড়ি দিয়ে তো না, অন্য রাস্তা আছে…আমি জানি মণিকঙ্কণা এখন কোথায়, আলো জ্বলতে দেখেছি যে একটু আগে, বাথরুমের জানলায়…বেশ অনেকক্ষন ধরে…যতক্ষন লাগে চান করতে— বাথটবে ডুবে, আরাম করে… 


সিরিয়াল কিলারের হাত থেকে বেঁচে ফিরেছে, হিরো প্রিয়তম আসমান থেকে নেমে এসে খাদের কিনারা থেকে বুকে জড়িয়ে তুলে নিয়ে গেছে…এখনি তো আরাম করে উষ্ণ ফেনিল জলে অবগাহনের সময়। ডুব দাও মণিকঙ্কণা, ডুব দাও…ডুবে থাক তুমি আদরে, সোহাগে, কীর্তিমান দয়িতের গর্বে…আর শুধু কিছুক্ষণ ডুবে থাক সুগন্ধী বাথ ফোম আর বাথসল্ট মেশানো দুধ সাদা ফেনায়।যতক্ষণ না আমি পৌঁছই।

এবার আমি গেলেই আস্তে আস্তে তাতে মিশবে লাল। আলতা লাল…রক্ত লাল!


তারপর ফেলুবাবু মুগ্ধ হয়ে যাবেন দুধে আলতায় ডোবা তাঁর প্রেয়সীকে দেখে…হি হি হি! 

তখন উনিও ডুববেন…হতাশায়, রাগে, দুঃখে!

জাস্টিস আ্যট লাস্ট…পোয়েটিক জাস্টিস!


রিভেঞ্জ ইজ দ্য ডিশ বেস্ট সার্ভড কোল্ড মিঃ প্রদোষ মিত্র!

***

হানিমুনে হন্তারক 

————————————————

পর্ব ১০ঃদুধে আলতা

—————————————————-

তোপসের কথা

**************

মণিদির হুঁশ ফিরেছে একটু আগে। জল খেয়েছে কিছুটা, তারপর চা খাচ্ছে এখন খাটে বসে। লালমোহনবাবু বলেছিলেন গরম দুধ খেতে, এক কথায় নাকচ করে দিয়েছে।


“তোমরা কি করে এসে হাজির হলে বলতো?” মণিদি প্রশ্ন করে।

“ আরে তোমার বাবা, মানে মেসোমশাই তো বললেন কিসব খুন টুন হচ্ছে, উনি নিজেই আসতে চাইছিলেন…ফেলুদাও তো ছিল না। বিশ্বাস কর, আমাদের একটুও আসার ইচ্ছে ছিল না, তোমাদের হানিমুন…”

“চুপ কর তো তপেশ! হানিমুন! যা হানিমুন হচ্ছিল দেখতেই তো পাচ্ছি! পাঁচটা না সাতটা খুন, উনি ঝুলছেন খাদের কিনারায়, ফেলুবাবু বেলুনে চড়ে ধাওয়া করেছেন সিরিয়াল কিলারকে…খুব হানিমুন হল যা হোক! ওঁর বাবা তো ঠিকই বলেছিলেন। আসাই দরকার এরকম ক্ষেত্রে।”


“আপনি আবার আমার বাবার দলে কবে থেকে গেলেন লালমোহনবাবু”, মণিদির মুখে হাসি, যদিও ঠোঁটটা ফুলে আছে।

“দলাদলির তো কিছু নেই মণিকঙ্কণা, আগে আপনার বাবা অন্যায় জেদ করছিলেন বলে বলেছিলাম।এক্ষেত্রে উনি ঠিক। তাই সমর্থন। তাছাড়া ফেলুবাবুও তো বললেন আমরা আসায় ভালই হয়েছে।”

“আমিও খুশী হয়েছি লালমোহনবাবু! আপনি ঠিকই বলেছেন, ওসব হানিমুন টুন চটকে গেছে আগেই, প্রথম খুনটা হতেই। প্রদোষের কপাল তো জানেনই, বেরোলেই রহস্য। এবারও তার ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু ও গেল কোথায়?”

“ সুহাস ওরফে নির্মাল্যকে ধরতে।”

“সে কি, ও ধরা পড়েনি?” 

ওর ঐ পাগলের চাউনি আর হাসি মনে পড়ে গেল…এখনো কি শান্তি নেই!

“কিছু ভেব না মণিদি। ও আহত। হাতে গুলি লেগেছে। ফেলুদা আর ইন্সপেক্টর সহায় গেছে। ও ধরা পড়বে।”


মণিকঙ্কণার কথা

*******************

আমি অবশ্য অতটা নিশ্চিন্ত হতে পারছিলাম না। নির্মাল্য যে ধরা পড়েনি এখনো তা আমি জানতাম না। ও যে কি ভয়ঙ্কর তা আমি ছাড়া কেউ জানে না। অন্য অপরাধীদের তাও কিছু বেসিক ইন্সটিংকট কাজ করে, অন্ততঃ নিজেকে বাঁচানোর ইচ্ছেটা। অন্য যে কোন অপরাধী এতক্ষণে অন্য কোথাও পালাতে চেষ্টা করত। বাট নট সুহাস ওরফে নির্মাল্য। ওর দয়া, মায়া, বুদ্ধি বিবেচনা এমনকি নিজের প্রাণের মায়াও নেই। আছে শুধু অদ্ভুত অবশেসন উইথ রিভেঞ্জ। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে ও আবার এখানে ঢুকে না পড়ে। দুই দরজায় দুজন পুলিশ মোতায়েন আছে অবশ্য।


এইসব টানা হ্যাঁচড়ায় সারা শরীরটা কেমন করছে। হাতের তালুগুলো জ্বলছে, পাঁজরের কাছে ব্যথা। কপালটা তো ফুলে আছে, ঠোঁটটাও। যাই একটু ভাল করে চান করে আসি। মাথাটাও ঠান্ডা হবে। আর ঐ ধস্তাধ্বস্তিতে সারা গায়ে যে ধুলো বালি লেগে গেছে, সেটাও যাবে। তপেশ আর জটায়ু তো রইলই ঘরে।


এই হোটেলের বাথটাবটা কিন্তু বেশ ভাল। আর এটা তো স্পেশাল হানিমুন স্যুট। এই টাবটা তাই ডাবল সাইজ।রিসর্টের দেওয়া বাথ ফোম আর বাথ সল্টগুলোও দারুণ।ল্যাভেন্ডার আর ইলাং-ইলাং এসেন্সিয়াল অয়েলও আছে…ভেরী ইনভিগোরেটিং।উষ্ণ ফেনিল জলে গলা ডুবিয়ে বসতেই অনেকটা আরাম পেলাম। 


আস্তে আস্তে শরীরটা ভাল লাগছে। নার্ভগুলো ক্রমে শান্ত হচ্ছে । দ্য ওয়ার্ম বাথ অলওয়েজ ওয়ার্কস ফর মি।


যাঃ, লোডশেডিং হয়ে গেল নাকি? হোকগে, অসুবিধে নেই। এখানে তাকে সেন্টেড ক্যান্ডেল আর দেশলাই আছে…পুরো স্পা এফেক্ট তৈরী করার জন্য।জ্বেলে নিচ্ছি এখনি।


“মণিদি, তুমি ঠিক আছ? আলো লাগবে তোমার?” তপেশের গলা।

“আমি ঠিক আছি। এখানে ক্যান্ডেল আছে, জ্বেলে নিয়েছি। এক্ষুনি কারেন্ট চলে আসবে, দেখ।” আমি আশ্বাস দিলাম।


প্রদোষ মিত্রের কথা

*********************

সুহাস ওরফে নির্মাল্যকে ছেড়ে রাখলে চলবে না। ওকে এখন না ধরলে ও হয়ত রাত্তিরটা লুকিয়ে থাকবে। তারপর ব্রীজ সারানো হলে এখান থেকে পালাবে। পুলিশ নিশ্চয়ই কালকের মধ্যে হাল ছেড়ে দেবে…আ্যনাদার আনসলভড মার্ডার। তারপর ও আবার গুটিগুটি কলকাতায় গিয়ে হাজির হবে আর মণির ওপর হামলার নতুন সুযোগ খুঁজবে। আজকেই ওকে ধরতে হবে। দেখি, মিঃ সহায় তো টর্চ হাতে ওখানে ঘুরছেন।


“কি মিঃ সহায়, কিছু হদিশ করতে পারলেন?”

“না মিঃ মিত্র, যা অন্ধকার আর জায়গাটাও গাছপালা, ঝোপঝাড়ে ভর্তি। ঐ ডান পাশটা দিয়ে নেমে গেছে সে তো বোঝাই যাচ্ছে।তার চেয়ে বেশী আর কিছু এই মূহু্র্তে  তো…”

“রিসর্টে পাহারা বসিয়েছেন তো?”

“হ্যাঁ । দুজন কনস্টেবল দুদিকে আছে। তাহলে এই ডানদিকের ট্রেইলটা ফলো করি?”

“হুম। তাই করি। দেখা যাক, হোয়্যার ডাজ ইট লীড আস ট্যু।”


“এই ভাঙা ঘরটা দেখেছেন?”

“ঢুকতে চান? মনে হয় না কিন্তু কেউ আছে!”

“চলুন তাও। বড় টর্চটা নিয়ে..”

“কেউ তো নেই বলে মনে হচ্ছে…”

“হুম! হয়তো আগে এসেছিল”?

“কি করে বলছেন মিঃ মিত্র”?

“ঐ টেবলটা দেখুন, ধুলোর প্রলেপের মধ্যে কয়েকটা জায়গা চকচক করছে। কিছু রেখেছিল কেউ…ব্যাগ ট্যাগ..”

“ঠিক, আর এই চেয়ারটাও তো অন্যগুলোর চেয়ে পরিস্কার…বসেছিল কেউ…”

“দেখুন চেয়ারের বাঁ হাতলে রক্তের ছোপ…”

“কোথায় গেল বলুন তো এখান থেকে মিঃ মিত্র?”

“তার আগে দেখুন তো এখানে বসলে জানলা দিয়ে কি দেখা যাচ্ছে?”

“রিসর্টের গেস্টরুমস। ঐ দোতলার ঘরটা ওটাই আপনাদের, তাই না?”

“হ্যাঁ। জানলা, ফ্রেঞ্চ উইনডো, বাথরুমের স্কাইলাইট সব দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট…”

“হুম আলো জ্বলছে তো ভেতরে… যাঃ কি হল! লোডশেডিং?”


কিন্তু লোডশেডিং কি? নাকি…! ওহ গড, হি হ্যাজ ফুলড আস। আমরা এখানে ওকে খুঁজছি আর ও ততক্ষণে আবার রিসর্টে…মণি…


“রান! মিঃ সহায়, রান…উই হ্যাভ ট্যু বী দেয়ার! হি ইজ ইনসাইড দ্য রিসর্ট!!”

“হ্যাঁ …বাট হাউ…মানে এখানে হয় কিন্তু পাওয়ার কাট মাঝে মাঝে…” ছুটতে ছুটতেই বলেন সহায়।

“দিস ইজ নো অর্ডিনারি পাওয়ার কাট। মাই ওয়াইফ ইজ ইন ডেঞ্জার, গ্রেভ ডেঞ্জার…”

“ডোন্ট ওয়ারি মিঃ মিত্রা। দুজন গার্ড আছে দুই দরজায়। উইথ আর্মস…”


আমরা এসে গেছি সামনের দরজার কাছে।

“দোরজি, কোই আয়াথা কেয়া অন্দর?”

“কোই নেহি সাব…” কনস্টেবল দোরজি জবাব দেয়।

এখন আমরা রিসেপশনে, সিঁড়ির কাছে…

“মিঃ ছেত্রী, কেউ গেছে ওপরে গত দশ মিনিটে?”

“না মিঃ মিত্র। আমি তো এখানেই আছি, পাওয়ার কাটের আগে থেকেই…”

“আপনাদের ইলেকট্রিকাল সুইচ বক্স কোথায়?”

“নীচে স্টাফ কোয়াটার্সের কাছে…”

“চলুন, দেখাবেন আমাদের…”


ছেত্রী আমাদের সঙ্গে করে পেছনের দরজার কাছে নিয়ে আসেন । ওখান থেকেই সিঁড়ি নেমে গেছে নীচের তলায় স্টাফ কোয়ার্টারে।


“আরে এ কি, এই দরজায় তো পাঠকের পাহারায় থাকার কথা… কোথায় গেল?” সহায় বলে ওঠেন।

“চলুন বেরিয়ে দেখি…”

“ও মাই গড…পাঠক…হোয়াট হ্যাপেনড”… 


সহায় ছুটে গেলেন পড়ে থাকা দেহের দিকে। আমার এখন ওদিকে গেলে হবে না। আমাকে নির্মাল্যকে ঠেকাতে হবে…বিফোর ইট ইজ ট্যু লেইট।


“মিঃ ছেত্রী, ওপরে যাবার আর কোন সিঁড়ি আছে?”

“না সেরকম তো…শুধু পেছনে ঐ পাশে জমাদার ওঠার লোহার সিঁড়ি আছে সব বাথরুমের সঙ্গে। সেটা দিয়ে কিন্তু শুধু বাথরুমে যাওয়া যায়, আর কোথাও না…”

“আপনি শীগ্গীর নীচে সুইচ রুমে যান মিঃ ছেত্রী । আমি শিওর মেন সুইচ অফ। ওটা অন করুন। তিন নম্বর সিঁড়িটা আমাদের বাথরুমের, না?”  


নির্মাল্যর কথা

*************

জমাদারের সিঁড়ি দিয়ে উঠে যাব। বাথরুমেই তো আছে মণিকঙ্কণা…বাথটবে, ওয়ার্ম রিল্যাক্সিং বাথ নিচ্ছে নিশ্চয়ই…হোয়াট ইজ মোর রিল্যাক্সিং দ্যান ডেথ?

কোন চিন্তা নেই, ভাবনা নেই…শুধু তার আগের কয়েকটা মূহুর্ত একটু… ইফ আই ক্যান গো ফর দ্য জগুলার ইট উইল বী ক্যুইক…সী মণিকঙ্কণা আই আ্যম এ মার্সিফুল ম্যান…তোমার প্রদোষ মিত্রের চেয়ে অনেক দয়ালু। তবু তুমি, তোমার মত সব মেয়েরা ছুটবে খালি মিত্তির মশাইএর পেছনে…আমাদের ভরে রাখবে পাগলা গারদে..


সাবধানে উঠলাম লোহার সিঁড়ি বেয়ে…পা টিপে টিপে।অসাবধান হলে শব্দ হতে পারে।চাবির গোছাটায় আছে সব বাথরুমের দরজার চাবি…নম্বর দেওয়া। এমনিতে জমাদার এলে আগে ওরা গেস্টদের রিসেপশন থেকে জানিয়ে দেয়…কিন্তু এখন তো…

সাবধানে, খুব সাবধানে চাবি ঘোরালাম দরজায়।


ভেতরে সুগন্ধী মোমবাতির মৃদু আলো।ঐ তো মণিকঙ্কণা…গলা অব্দি দুধসাদা ফেনায় ডোবা…এদিকে পেছন করা… চুলগুলো ওপরে চুড়ো করে বাঁধা, চোখ দুটো বোজা…রিল্যাক্সিং…ঘাড়ের কাছে লেপটে আছে দুটো ভেজা চুলের গুছি। শী ইজ বিউটিফুল…মাই মাদার ওয়াজ বিউটিফুল ট্যু…


মণিকঙ্কণার কথা

****************

নাঃ, বাথটা নিয়ে সত্যিই বেশ ভাল লাগছে এখন।

সো রিল্যাক্সিং….হঠাৎ কি যেন মনে হল…চোখটা খুললাম…কিছু তো নেই…বাথটাবের ধারে সুগন্ধী মোমবাতির শিখাটা কাঁপছে, টেলিফোন শাওয়ার হেডটার ঠিক পাশেই…


নির্মাল্যর কথা

***************

…আর কয়েকটা সেকেন্ড…পায়ে পায়ে এগিয়ে যাই ছুরিটা নিয়ে…ঝাঁপাতে যাব, ঠিক তখনই…মণিকঙ্কণা, শয়তানী…ঘুরে গিয়ে একরাশ ফেনিল, ইলাং-ইলাং অয়েল মেশানো সাবান জল আঁজলা করে মার্বেলের মেঝেতে ফেলে দিল… সাংঘাতিক পেছল এই তেল-সাবানের জল…হড়কে গেলাম ভীষণভাবে…পড়তে পড়তে ডানহাতে বাথটাবের কোনাটা ধরে ব্যালেন্স রাখলাম কোনরকমে…হাত থেকে ছুরিটা পড়ে গেল টাবে…মণিকঙ্কণা অন্যদিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে ভাবছে…অত সোজা নয়…লাগবে না আমার ছুরি…ডুবিয়ে মারব ওকে এই বাথটাবের জলে… অনেক জল আছে এই ডবল বাথটবে…


হঠাৎ আলোটাও জ্বলে উঠল। ওরা টের পেয়েছে তাহলে! ভেতরের ঘর থেকে দুমদুম করে ধাক্কা দিচ্ছে ঐ তোপসে আর জটায়ু …


“দরজা খোল মণিদি, দরজা খুলুন মণিকঙ্কণা”…


আর খুলেছে!!! ধরেছি ওর চুলের মুঠি…এই মরালগ্রীবা মুচড়ে ভেঙে আমি ডুবিয়ে দেব…এক্সেসিভ প্রেসার অন নেক…লাইক মাই মাদার…


আঃ… তীব্র যন্ত্রণা আমার ডান হাতে, এবার ডান পায়ে…আলগা হয়ে গেল চুলের মুঠি…চোখে অন্ধকার নেমে আসছে..আমি হুমড়ি খেয়ে পড়ছি টাবের দুধ সাদা ফেনিল জলে…লাল রক্ত মিশছে জলে আমার গুলি লাগা হাত আর পা থেকে…


মণিকঙ্কণা টাব থেকে বেরিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ওপাশে…আমার আর্টিস্ট চোখ দেখছে…কোমর ছাপানো খোলা চুল আর ভেজা শরীরে বত্তিচেল্লীর ভেনাস…দুচোখে বাঙালী মেয়ের লজ্জা নিয়ে আড়াল খুঁজছে আমার নেমেসিসের দেহের পিছনে…আমি পারলাম না মা…আমার দু চোখে ঘুম নামছে…ডুবছি আমি দুধে আলতায়…

***

হানিমুনে হন্তারক

———————————————-

পর্ব ১১ঃপ্রস্থান

——————————————

মণিকঙ্কণার কথা

***************

“আই থট আই লস্ট ইউ মণি!” আমার কানে প্রদোষের ফিসফিসানি।এদিকে আমার ভেজা গা আর চুল থেকে যে নিজের শার্টটা ভিজে একসা তার হুঁশ নেই ওর।

“আগে ঐ বাথরোবটা দাও আমাকে…আর টাওয়েলটা”! বলে উঠলাম আমি।

“ওঃ! এই নাও…তুমি গিয়ে দরজাটা খোল এবার…”


আমি যতক্ষণে গিয়ে দরজা খুলে তপেশ আর লালমোহনবাবুকে ঢুকতে দিলাম ও রিভলবার তাক করে দাঁড়িয়ে থাকল। যদিও নির্মাল্য সেন্সলেস বলেই মনে হচ্ছে।


“কি মশাই? কি কান্ড এসব?”

“হ্যাঁ লালমোহনবাবু। নির্মাল্য এই জমাদারের দরজা দিয়ে এসে মণির ওপর আবার হামলা চালিয়েছিল। এবার ছুরি হাতে…”

“ছুরিটা ফস্কে গেছিল। মোমবাতির আলোতে আমি চকচকে মেটালের টেলিফোন শাওয়ারে প্রতিফলন দেখি নির্মাল্য ছুরি হাতে পা টিপে টিপে আসছে…ঝাঁপাতে যেতেই আমি সরে গিয়ে অনেকটা সাবানজল ছিটিয়ে দিই আর ও হড়কে গিয়ে ছুরিটা জলে পড়ে যায়।” বলে উঠি আমি।

“সাংঘাতিক নার্ভ আপনার মণিকঙ্কণা, সন্ধেবেলা অত কিছু হল, তারপর..”

“তারপরও তো ছুরি ছাড়াই আমাকে ডুবিয়ে মারতে চাইছিল, তখন ও এসে হাতে পায়ে গুলি করল।”


“কি ভয়ঙ্কর! তাহলে, এখন ফেলুবাবু?”

“ইন্সপেক্টর সহায় এসে ওর ব্যবস্থা করবেন। আপনারা মণিকে নিয়ে বেরিয়ে যাবেন।কৈরালার সঙ্গে ঐ বেলুনেই। কালিম্পং থেকে শিলিগুড়ি হয়ে সোজা কলকাতা। যত তাড়তাড়ি হয়।পুলিশের থেকে বলা আছে। এমার্জেন্সী এয়ার টিকিট দিয়ে দেবে আপনাদের।”

“আর আপনি?”

“কালকের মধ্যে ব্রীজ ঠিক হয়ে যাবে। আরো ফোর্স আসবে।এই নির্মাল্যকে নিয়ে তখন যাওয়া যাবে। সহায় একা একজন কনস্টেবল নিয়ে নাহলে পেরে উঠবেন না। তাছাড়া আমার স্টেটমেন্ট, আমার রিভলবার, যেটা থেকে ওকে গুলি করা হয়েছে, এইসবও লাগবে। এই ফর্মালিটিসগুলো পূর্ণ না করে আমার ফেরা হবে না।”

প্রদোষ বুঝিয়ে বলল।

“দুজন কনস্টেবল ছিল না?”

“একজন খুন হয়েছেন। এঁর হাতেই।”

“বোঝ! তা আমরাও থাকি না, কাল অব্দি?”

“কি দরকার লালমোহনবাবু? আমাদের হানিমুনের তো বারোটা আগেই বেজেছে। আপনারাও যে বেড়ানোর মুডে আছেন তা নয়। এই রিসর্টের যা অবস্থা এখন বাকী গেস্টরাও পালাতে পারলে বাঁচেন এবং ম্যানেজার ছেত্রীও সব বন্ধ করে দুদিন হাঁপ ছাড়তে চান।” 


ক্লান্ত গলায় বলল প্রদোষ। বেচারা সেই কাল থেকে বোধহয় দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি। খাওয়া দাওয়াও কি করেছে মা গঙ্গাই জানেন।ডেডবডি নিয়ে যাওয়া, পুলিশ, হাসপাতাল, অপরাধী ধাওয়া এই করে চলেছে সমানে। আগামী কাল অব্দি এই চলবে।অথচ এটা ওর ছুটি! তার সঙ্গে উপরি পাওনা এই স্ট্রেস। অন্য কেসে তো ও শুধু গোয়েন্দা। এটাতে তো ভিক্টিমও আমার বকলমে ও নিজে! একটা রাফ টাফ ইমেজ বানিয়ে রেখে দিয়েছে তো, সবাই সারক্ষণ ভাবে হি ইজ অলওয়েজ অন হিজ টোজ। ফেলু মিত্তিরের ক্লান্তিও নেই বিশ্রামও নেই। কিন্তু ঐ তীক্ষ্ণ দৃষ্টির পেছনে ঘনিয়ে আসা শ্রান্তির ছায়াটা তো আমার চোখ এড়ায়নি। ভীষণ ইচ্ছে করছে সব ফেলে ওকে টেনে নিয়ে কোথাও চলে যাই যেখানে ও একটু শান্তিতে দু দন্ড বসতে পারবে।


কিন্তু তার তো কোন উপায় নেই, তাই বললাম,

“হ্যাঁ লালমোহনবাবু। আমরা থাকলে ওর অসুবিধাই হবে। নির্মাল্যর জ্ঞান ফিরলেই আবার…আমাদের তিনজনের মধ্যে একজনকে ঘায়েল করার চেষ্টা ও আবার করতে পারে। যাই হোক, যাবার আগে আমি ওকে দেখব একবার… ফার্ষ্ট এইড আর ব্যান্ডেজ একটা…”


“আপনি কি পাগল হলেন মণিকঙ্কণা …ও একটা সিরিয়াল কিলার, তাও কি ভুলে গেলেন? পাঁচটা খুন করেছে ও। আপনি ছনম্বর হতে যাচ্ছিলেন…”

“আমি কিছুই ভুলিনি লালমোহনবাবু…কিন্তু আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে আমি কিলার নই, ডাক্তার। প্রাণ বাঁচানোই আমার কাজ। না হলে ওর দাদা ডাঃ দিবাকর আর আমার মধ্যে কোন তফাত থাকে না।”


“মণি, তুমি ওর ধারে কাছে যাবে না এখন। তোমার হিপোক্র্যাটিক ওথের কথা আমি জানি, কিন্তু আমিও কিছু ওথ নিয়েছি…ট্যু বী উইথ ইউ ইন সিকনেস আ্যন্ড ইন হেল্থ। আর এটা ক্লিয়ারলি একটা হেল্থ আ্যন্ড সেফটি ইস্যু। অপেক্ষা কর, সহায় এসে ওর হাতে অন্তত হাতকড়া পড়ান, তারপর চাইলে ফার্স্ট এইড দিও। লোক মারা আমারও পেশা নয়। তাই বাথটাবের জলটা বের করে দিয়েছি যাতে ও ডুবে না মরে। যদিও এই মানবিকতা ও ডিজার্ভ করে কিনা আমি জানি না।ও কোনরকম মনুষ্যত্ব দেখায়নি সম্পূর্ণ নিরাপরাধ নিখিল, অনিল আর কনস্টেবল পাঠককে নৃসংশ ভাবে খুন করার সময়।”


একটু পরেই এলেন ইন্সপেক্টর সহায়। সঙ্গে ছেত্রী আর কনস্টেবল দোরজি। অন্য গেস্টরাও উঁকি ঝুঁকি মারছেন গুলির আওয়াজ শুনে। 


সব শুনে আগেই গিয়ে নির্মাল্যর হাতে হাতকড়া পড়ালেন উনি। ও তখনও সেন্সলেস। তবে বেঁচে আছে।

সহায় আর প্রদোষের জোড়া রিভলবারের সামনে বসে আমি নির্মাল্যকে ফার্স্ট এইড দিলাম।রক্ত বন্ধ করার জন্য ব্যান্ডেজ আর কয়েকটা পেইনকিলারও দিয়ে দিলাম জ্ঞান ফিরলে দেবার জন্য। যদিও সহায় বা দোরজি কেউই যে ওর পেইন কমাতে উৎসাহী তা মনে হল না। একটু আগেই ওদের সহকর্মীকে নৃশংসভাবে মেরেছে ও।ওর হাতে আর পায়ে দুটো গুলি এখনো ঢুকে আছে। হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন না করলে চট করে উঠে দাঁড়াতে পারবে না।


আমরা তিনজন বেলুনের দিকে রওনা হতে যাব এমন সময় ও বলল,

“ও হ্যাঁ , সহায়জী, একবার বাজোরিয়াদের ডাকুন তো! নেকলেসের ব্যাপারটা বোধহয় সমাধান হয়ে গেছে।”

“সেটা আবার কি করে হল মিঃ মিত্রা?” সহায় অবাক।


বাজোরিয়ারা আসতে আসতেই আমি তপেশদের দুকথায় বলে দিলাম নেকলেস চুরির ব্যাপারটা।


“আসুন মিঃ বাজোরিয়া। সেই নেকলেস চুরির দিন কি হয়েছিল বলুন তো? আপনারা খেতে যাবার আগে ওটা দেখে গেছিলেন। ফিরে দেখেন আর নেই, তাই না?”

“জি হাঁ।”

“খাবার সময়ের মধ্যে আপনারা কেউ উঠে এসেছিলেন এদিকে?”

“জি নেহি।”


“কিন্তু আপনার মিসেস যে বললেন সেদিন আপনি উঠে পার্কিং এর দিকে গেছিলেন একবার? ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলতে? “আমি বলে উঠি।

“তাই নাকি! তবে তো হয়েই গেল”। ওর মুখে একপেশে হাসি।

“কি হয়ে গেল মিঃ মিত্তর?”


“পার্কিং তো পেছন দিকে। মানে যেদিকে এই জমাদার ওঠার লোহার সিঁড়িগুলো আছে। সেদিন তাহলে আপনি ঐ সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসে, হারটা নিয়ে লুকিয়ে ফেলে আবার ওখান দিয়েই নেমে যান, তাই না? বাথরুমের দরজাটা কি ডাইনিং হলে যাবার আগেই ভেতর থেকে খুলে রেখে গেছিলেন নাকি?”


“আরে ইয়ে ক্যায়সি আ্যকুইজিশন হ্যায়? ম্যয় কিঁউ করুঙ্গা আপনি বিবিকি হার চোরি?”

“এক্স্যাক্টলি! কিঁউকি উয়ো আপকি বিবিকি হার হ্যায়। যেটা আপনি লুকিয়ে আপনার এই মিসট্রেস অর গার্লফ্রেন্ড অর হোয়াটএভার শী ইজ তাকে দেন। সুলগ্না এবং এলা…আপনার আসল স্ত্রীর লাগানো দুই গোয়েন্দা ঐ হারের ছবি তুলে পাঠালে আপনার কপালে দুঃখ ছিল। ডিভোর্স, আ্যলিমনি, বড় বড় ছেলে মেয়েদের কাছে বেইজ্জতি…। তাই আপনি ওটা চুরি করে রেখে দেন যাতে ছবি টবি না ওঠে, তাই না?”


“প্রুফ কি আছে আপনার”?

“কি জানেন, বাথরুমের পেছনের ঐ সরু বারান্দা থেকে লোহার সিঁড়িটা বেশ একটু নীচে। ওঠার সময় কোন প্রবলেম নেই, কিন্তু নামার সময় প্রথম সিঁড়িটাতে পা দিলেই বেশ একটা ঝংঝং টাইপ আওয়াজ হয়। আপনার মত ভারী, আনফিট শরীরে নামতে গেলে তো আরোই। আজ ওটা ভাল করে দেখলাম তো, আর মনে পড়ে গেল ঐ চুরির দিনের ঘটনা। আমরা তো তখন ঘরেই ছিলাম, আওয়াজটাও পেয়েছিলাম…”


“ফিরভি আপকি পাস কোঈ প্রুফ নেহি হ্যায়।” বাজোরিয়ার গলা মরিয়া।

“প্রুফ চাইলে সহায়জী যোগাড় করতে পারেন। সার্চ করবেন কি আপনাদের ঘর? ইনক্লুডিং বাথরুমের পেছনে করিডোরে রাখা টবের মাটিটাও?”

মিঃ বাজোরিয়া দুহাতে মুখ ঢেকে বসে থাকেন কিছুক্ষণ। তারপর বলে ওঠেন 

“সব কুছ ইস জিদ্দি ঔর লালচি লড়কীকি বজাসে। কিমতি গহনে চাহিয়ে, হলিডে করনি হ্যায়,ইয়ে, উয়ো। সব কুছ আসলি বিবি কি বরাবর।যব কি হ্যায় এক দো কৌড়ি কে কলগার্ল—“

“আরে ইতনা কামিনা আদমী তো হামনে কঁহি নেহি দেখি”, বলে ওঠেন ‘মিসেস’ বাজেরিয়া।

“বিবি কো ধোঁকা, গার্লফ্রেন্ড কো ধোঁকা…দুনিয়া ভর মে সভি কো ধোঁকা। প্রমিস তো কিতনে কিয়ে থে আব কহতে হ্যায় কলগার্ল।“


মেয়েটার গাল বেয়ে নামছে মাসকারা আর কনসিলার ধোওয়া জল। কিন্তু আজ আমার ওকে বিরক্তিকর লাগছে না। মায়া হচ্ছে। আ্যনাদার ভিক্টিম অব প্যাট্রিয়ার্কি ব্লেন্ডেড উইথ রুথলেস ক্যাপিটালিজম!


তোপসের কথা

******************

কৈরালাজি এসে বলেছেন বেলুন রেডি।আমরা ওদিকে যাচ্ছি, ফেলুদাও সঙ্গে আছে আমাদের সী অফ করবে বলে। লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করলেন,

“বুঝলেন কি করে নেকলেসটা কোথায় আছে?”

“শিওর ছিলাম না। তবে আমাদের বাথরুমের দরজাটা বন্ধ করতে গিয়ে দেখলাম পেছনের ফালি বারান্দাটায় ওদের আর আমাদের ঘরের মাঝখানে যে বড় টবের গাছটা আছে তার মাটি সদ্য খোঁড়া। অন্য সব টবের মাটি গুলো কিন্তু বহুদিন হাত পড়েনি মনে হল। মনে হল টবের মাটিতে চুরি করা গয়না পোঁতা তো একটা স্ট্যান্ডার্ড টেকনিক। তাই চান্স নিলাম। না হলেও ঘরেই কোথাও থাকত, ভদ্রমহিলার নাগালের বাইরে।”


“কিন্তু আরো দুটো জিনিস বুঝলুম না” ভীষণ ভুরু কুঁচকে বললেন জটায়ু।

“বলে ফেলুন! দেখা যাক আপনার মনের অন্ধকার দূর করা যায় কিনা।”ফেলুদা বলল।

“এক, আপনারা সেদিন ডাইনিং হলে খেতে গেলেন না কেন? সন্দেহ করেছিলেন কি বিষ দিতে পারে?

আর দুই। ঐ সিঁড়িতে শব্দ পেলেন তো দেখতে গেলেন না যে বড়? হাইলি সাসপিশাস !”


“নিন উঠে পড়ুন।” জটায়ুর মনের অন্ধকার দূর করার কোন চেষ্টা না করে বেলুনের কাছে এসে বলল ফেলুদা।


কৈরালা বেলুনের জ্বালানীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছেন। সেই আগুনের আলোয় মণিদির মুখ টকটকে লাল।


               ————————-

প্রদোষ মিত্রের কথা

*****************

হানিমুনটা রজনী সেন রোডে করাই ভাল ছিল। কারণ

ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানবে।দুটো দিন স্বর্গে কেটেছিল আর তার পর থেকেই ধান ভানা শুরু। বেড়াতে বেরোলেই রহস্যের রেকর্ড অক্ষত! 


ব্রীজ সারানো হবার পর নির্মাল্যকে কালিম্পং-এ পুলিশি হেফাজতে দিয়ে পাহাড় থেকে নামতে নামতে প্রায় রাত ন’টা হয়ে গেল। যদিও সুহাস ওরফে নির্মাল্য জেলে যাবে না আ্যসাইলামে তা আমি জানি না। এখন শালবনের মধ্যে দিয়ে চলেছি বাগডোগরার দিকে। আর আধঘন্টায় পৌঁছে যাব মনে হয়। কিন্তু এত রাতে আর ফেরার ফ্লাইট নেই। রাতটা একটা এয়ারপোর্ট হোটেলে কাটিয়ে কাল সকালে কলকাতা।


প্রদোষ হওয়া আর হল না, ফেলুদা হয়ে থাকাই আমার ভবিতব্য । রিভলবার উঁচিয়ে অপরাধী ধাওয়া, রহস্য উদঘাটন…এই করে যেতে হবে জীবনের শেষ দিন অব্দি।আমাকে দু দন্ড শান্তি দিয়েছিল—না নাটোরের বনলতা সেন না—কেদারের মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি। কিন্তু সেও কপালে সইল না! আবার হয়েছে শুরু হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথ হাঁটা।


নাও আই নিড সাম রেস্ট। ভাল হয়েছে ওদের পাঠিয়ে দিয়েছি আজ সকালের ফ্লাইটে। যে গাড়ি ওদের পৌঁছে দিয়েছিল বলেছিলাম তাকেই যেন আবার আমাকে নিতে পাঠিয়ে দেয়।এখন কোনরকমে গিয়ে এয়ারপোর্ট হোটেলে উঠে ঘুম। টানা চার রাত বিশেষ ঘুম হয়নি, ফেলু মিত্তিরের পক্ষেও আর এভাবে চালান সম্ভব নয়।এক্সসটেড লাগছে।


কিন্তু গাড়িটা হঠাৎ থেমে গেল কেন?


“কি হল, ড্রাইভার জি?”

“সাব কোঈ প্রবলেম হ্যায় এঞ্জিন মে। আপকো সায়দ রুকনা পড়েগা ইঁহা আজ রাত”।

“তার মানে? কোথায়?”

“ফরেস্ট বাংলো হ্যায় না সামনে। চলিয়ে ম্যয় ছোড় দেতা হুঁ। জাগা মিল যায়্গী।”


অগত্যা! হানিমুন স্যুট তো টিকল না ভাগ্যে, এখন কোথাও যে কোন একটা ঘর আর একটা বিছানা- ক্যাম্পবেড, খাটিয়া বা তক্তাপোশ যা হোক একটা হলেই আমার চলে যাবে।


বাংলোটা বেশ ছোট, নিরিবিলি… খান চারেক ঘর হয়তো সব শুদ্ধ। চারিদিকে শালগাছের বন। লোকজনও বিশেষ আছে বলে তো মনে হল না। রিসেপশনে বসে ঢুলছিল একটা লোক, খাতায় নাম ধাম লিখে চাইতেই একটা ঘরের চাবি দিয়ে দিল।


ঘরটা তো বড়ই মনে হচ্ছে কিন্তু আলোর সুইচটা কি কাজ করে না নাকি! যাকগে, ও ছাড়াই চলে যাবে।জানলা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে। ওতেই হবে।রিয়েলি নিড ট্যু স্লিপ নাও…. 


কিন্তু এই হাল্কা মিষ্টি গন্ধটা কিসের?

কেউ কি আছে ঘরে! 

হঠাৎ গাড়ি খারাপ..জঙ্গলের মধ্যে এত ভাল বাংলো…অথচ আলো জ্বলে না ঘরে …ইটস এ ট্র্যাপ! 

রহস্য কি এখনো পিছু ছাড়ে নি? নির্মাল্য তো হাসপাতালে, পুলিশ পাহারায়।

বেরিয়ে পড়ল আবার? নাকি এ অন্য কেউ?

এবার কি সোজাসুজি আমাকে টার্গেট?

আমার স্নায়ু সজাগ, হাত কোল্ট .৩২ তে…

***

হানিমুনে হন্তারক

———————————————-

পর্ব ১২ঃসুখদা স্বয়মাগতা

————————————————

…অন্ধকারে খসখস শব্দ… হাল্কা রিনঠিন…

…কি হচ্ছে কি ব্যাপারটা? 

বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ একজোড়া সুকোমল বাহুর সুকঠিন বাঁধনে আটকে গেলাম।


“মণি! তুমি এখানে? এই বেশে…? কি ব্যাপারটা কি?”

“কেন, তোমার সেই রাবীন্দ্রিক ফ্যান্টাসি! ঢাকাই শাড়ি আর কপালে সিঁদুর! এভাবে লুকিয়ে থাকার এই প্লটটাও তো চুরি করা ‘সমাপ্তি’ থেকে।”

“তাই তো দেখছি! আবার চুলে কি ওটা জুঁই ফুলের মালা নাকি? তাই গন্ধটা অচেনা লাগছিল…তোমার ডিওর পয়সন তো নয়!”

“হুম। রবীন্দ্রনাথ এটার কথা এক্সপ্লিসিটলি বলেননি, তবে বেমানান হয়নি এই সাজের সঙ্গে, কি বল?”

“ একটুও না! ড্রাইভারকে হাত করেছিলে সে তো বুঝতেই পারছি, আর বুকিং? “

“হানিমুন বুকিং করতে গিয়ে এই অঞ্চলের সব অফবীট বাংলো মুখস্ত হয়ে গেছিল। বাগডোগরা অব্দি না গিয়ে এখানেই নেমে পড়লাম।”


“তোপসে আর লালমোহনবাবু? পাশের ঘরে নাকি?”

“নাঃ। আমাকে নামিয়ে দিয়ে কলকাতা রওনা হয়ে গেছে। আইডিয়াটা কিন্তু ওদের! লালমোহনবাবুই প্রথমে বললেন ‘আপনাদের হানিমুনটা এভাবে বরবাদ হওয়াটা আমি কিছুতেই মানতে পারছি না মণিকঙ্কণা। কোনভাবে কি এটাকে স্যালভেজ করা যায় না’?”


“তাহলে ওঁর মনের অন্ধকার দূর হয়েছে?”

“হুম ভদ্রলোক যতটা ভান করেন ততটা বোকা কিন্তু নন।”

“আমারও তাই ধারণা। তা এই পুরো বাংলোতে আর কোনো গেস্ট নেই?”

“না। শুধু আমরা। আগামী সাত দিন।”

“পয়সার শ্রাদ্ধ ।”

“তা একটু লাগল, তবে আমরা তো বিয়েতে ঘটা করিনি প্রায় কিছুই। কাজেই…”

“তাহলে এবার আসল মধুচন্দ্রিমা তো?”

“চাঁদ তো আকাশেই আছে। আর মধু…”

“ভেব না, মধুর খোঁজ আমি জানি।তবে একটাই সমস্যা..”

“কি সমস্যা আবার?”

“ঘুমটা মনে হচ্ছে আজও কপালে নেই!”

“শোন, বেশী জ্বালাতন করবে না কিন্তু”!

“সে রকম কোন গ্যারান্টি দিতে পারছি না, স্যরি! এরকম একটা আয়েজন করে তারপর এইসব শর্ত আরোপ করাটা ক্রুয়েলটির পর্যায়ে পড়ে, সেটা জান?”

“ওমা, এই আয়োজন করাটাও আমার দোষ?”

“দোষ হবে কেন? কবিতা এবং বনিতা স্বয়মাগতা হলেই তো ভাল। এ তো আমার ভাগ্যে বড় একটা ঘটে না! কেবল ক্রিমিনালরাই স্বয়মাগত হয়ে চলে আসে ব্যাগড়া দিতে। এখন আবার তেমন হবে না তো?”


“কেউ জানে না তো আমরা এখানে, আমাদের ফোর মাস্কেটিয়ার্স ছাড়া।বাড়ির লোকরাও জানেনা!”

“তা তোমার বাবা আবার ছাতের সমান…না, আই মীন উনি আবার উদ্বিগ্ন হবেন কিনা!”

“সে জটায়ু আর তপেশ সামলে দেবে।ওরাই বলল তোমার নামে বুকিং না করতে।”

“সে কি? জটায়ুর নামে হানিমুন বুকিং করলে নাকি শেষে? তাহলে কিন্তু গন্ডগোল হবেই …”

“ধ্যুৎ। জটায়ুকে সবাই তোমার সঙ্গে আ্যসোসিয়েট করে। লাভ নেই কিছু। আমি বুকিং করলাম মিঃ আ্যন্ড মিসেস ব্যানার্জির নামে।”

“বোঝ! ফেমিনিস্ট মহলে তো তোমার নামে জয়জয়কার পরে যাবে!”

“ভালই তো! স্বনামের ঝকমারী তো কম নয় তোমার”।

“ঝকমারী আর আমার কি… তুমিই তো দাঁড়িয়েছিলে খাদের ধারে। কোয়াইট লিটরেলী! 

                    আমি এত ভয় জীবনে কখনো পাইনি, মণি! খালি মনে হচ্ছিল তোমার বাবাই ঠিক। উচিত হয়নি আমার তোমাকে বিয়ে করে এরকম বিপদে ফেলা।”


“বাব্বা! তোমাদের দুজনেরই হল কি? তুমি বলছ বাবা ঠিক। এদিকে বাবা সকালে ফোনে তোমার কীর্তিকলাপ শুনে বলল বাবাই নাকি ভুল করেছিল, তোমার মত কেয়ার আর আমার কেউ নেবে না…সন্ধি হয়ে গেল নাকি তোমাদের?”

“হতেও তো পারে! একটা কমন ইন্টারেস্ট আছে যখন”!

“হলেই ভাল! তাহলে এবার থেকে বেড়াতে গেলে তুমি অরিন্দম ব্যানার্জি ।”

“তথাস্তু ! অরিন্দম বলে কেউ তোমার কিশোরী বেলার প্রথম ক্রাশ ছিল কিনা সে প্রশ্ন আর করব না…”

“করলে মার খাবে, জান তো! এত কান্ড করে এই প্ল্যানটা করলাম , আর …”


“মন্দ প্ল্যান নয়। তা এইসব শাড়ি, টিপ কোত্থেকে জোগাড় হল? সঙ্গে এনেছিলে তো খালি কতগুলো হাইকিং গিয়ার!”

“তা ভেবেছিলাম তো আমরা ট্রেকিং করব চুটিয়ে। মাঝখান থেকে যে রাবীন্দ্রিক নায়িকা সাজতে হবে তা তো জানতুম না। জোগাড় করলাম পাশের গঞ্জের বাজারে… একদম হাটুরে জিনিস কিন্তু, কোনো ডিজাইনার খরিদারি নয়!”

“অথেন্টিক!কিন্তু তুমি তো অস্ত্র শস্ত্র সব নিয়ে নেমে পড়েছ মনে হচ্ছে। এদিকে আমার দশা তো দেখছ, দুদিন দাড়ি কামাইনি, এক জামা কাপড়ে অপরাধী ধাওয়া করে বেড়াচ্ছি…”


“সে আর নতুন কথা কি? তোমাকে আমি যখন প্রথম দেখেছিলাম কেদারে, তখনও তো তাই। উস্কো খুস্কো, কাঁধে চোট…তবে বেশ রাফ টাফ দেখাচ্ছিল কিন্তু। তার মধ্যে রাগী রাগী মুখ করে দেওয়ালের টিকটিকি দেখছিলে…”

“কি করব? তোমার কুচো চুলগুলো যে কানের কাছে সুড়সুড়ি দিচ্ছিল, আর গরম নিঃশ্বাস ঘাড়ে এসে পড়ছিল। সেই জন্য তো অত কষ্ট করে গম্ভীর হয়ে বসেছিলাম।”

“ঈশ! কি কষ্ট!”

“শুধু কি তাই? তারপরই আবার পত্রপাঠ পাঠিয়ে দিলে তোমার বিছানায়। এখন তো ডেকে ডেকে পাওয়া যায় না আর তখন একটা অপরিচিত লোককে…”

“আরে সে তো চেক আপ করব বলে…তোমাকে না কিছু চিকিৎসা না করে ভাগিয়ে দিলে বেশ হত।”

“ওসব চিকিৎসা টিকিৎসা কিছু না। তুমি প্রেমে পড়েছিলে আমার তখনি। এটাই ফেলু মিত্তিরের ডিডাকশন।”

“শখ কত! কেদারে আমি মোটেই তোমার প্রেমে পড়িনি।”


“তা হবে! আমি কিন্তু তখনি পড়েছিলাম। আজ আবার নতুন করে পড়ছি বোধহয়!”

“হুম। এত প্রেমে পড়ো না। বুদ্ধি সব ভোঁতা হয়ে যাবে।”

“কে বলল, অন্ধ ভক্তদল?”

“না। সিরিয়াল কিলার।”

“ওই একই কথা! কান দিও না।”

“যাঃ কি যে বল, অন্ধ ভক্তরা যেমনই হোক ভাল তো বাসে তোমাকে, তাদের মত করে। সিরিয়াল কিলার বলার কি হল?”

“হুম। সাংঘাতিক ভালবাসা। পুজোর বেদীতে বসিয়ে মানুষটাকে দমবন্ধ করে মারা।মানিকবাবুর দেবী সিনেমাটা দেখনি তুমি? পুজ্য ব্যক্তিটির স্যাংকটিটি রক্ষার প্রতি তাদের অবশেসন সিরিয়াল কিলারদের চেয়ে কম নয়।”

“চটেছ খুব মনে হচ্ছে?”

“চটারই কথা। আমি যাকে ভালবাসি তাকে ইচ্ছেমত গালমন্দ করবে আবার বলবে তারা আমারই ভক্ত…”


“তা তাদের কথা ভেবেই আজকের রাত্তিরটা পার করবে কি?”

“না, সেটা বোকামো হবে…বাবা, এ তো মনে হচ্ছে ফোর পোস্টার বেড,মানে রীতিমত পালঙ্ক ! ঘরের আলোটা কি সত্যিই জ্বলে না?”

“জ্বলবে না কেন? সার্কিট ব্রেকারটা নামিয়ে রেখেছি যে! তুলে দেব?”

“নাঃ থাক। চাঁদের আলো, ঢাকাই শাড়ি,খোঁপায় জুঁই ফুলের মালা… সব মিলিয়ে দিব্যি উনবিংশ শতকীয় আয়োজনটা হয়েছে । তাকে আর বিজলী বাতি জ্বেলে মাটি করে কাজ নেই।”

“ঠিক।খামতি শুধু আবহসংগীতের।”

“তোমার পছন্দের সেই মুন রিভার?”

“দ্যুৎ, খালি একটা জিনিস শিখে রেখেছে!সে তো ইভনিং গাউনের সঙ্গে।ঢাকাই শাড়ির অন্য গান…”


…..নীল গগনের ললাটখানি চন্দনে আজ মাখা,

বাণীবনের হংসমিথুন মেলেছে আজ পাখা।

পারিজাতের কেশর নিয়ে,

ধরায়, শশী, ছড়াও কী এ।

ইন্দ্রপুরীর কোন রমণী বাসরপ্রদীপ জ্বালো…

***

No comments:

Post a Comment