টেরাকোটা টালমাটাল
প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় - source
১
‘কিপলিং সাহেবের লেখা পড়ে মনে হচ্ছে গিরিডি ভ্রমণ আপনার বৃথা যাবে না, লালমোহনবাবু।’
জটায়ুর মাথাটা মাঝে মাঝেই ওঁর বুকের কাছে নেমে আসছিল, সম্ভবত গত আধঘণ্টা ধরে সমানে শালবন ছাড়া আর কিছু না দেখতে পাওয়ার কারণে। ফেলুদা মনে হল ভদ্রলোককে জাগিয়ে রাখার জন্যই কথাটা বলেছে। হরিপদবাবু যদিও ওস্তাদ ড্রাইভার, কিন্তু লম্বা ড্রাইভে পাশের সিটে বসে কেউ ঘুমিয়ে পড়লে ঘুমটা ছোঁয়াচে হয়ে যেতে পারে।
‘কী নাম বললেন মশাই? এদিককার জায়গাগুলোর নাম মনে রাখতে বেশ মেহনত করতে হচ্ছে।’ লালমোহনবাবুর চোখ খুলেছে বটে, কিন্তু বোঝাই গেল ফেলুদার কথাটা ঠিক শুনতে পাননি। গাড়িতে এলেও ভদ্রলোক সঙ্গে করে রেলের একটা ট্র্যাভেল গাইড নিয়ে এসেছেন আর থেকে থেকেই কাছেপিঠের স্টেশনগুলোর নামে চোখ বোলাচ্ছেন। মিহিজাম, জামতাড়া অবধি ভদ্রলোকের সমস্যা হয়নি। কিন্তু তারপর ভাণ্ডারিডি, মদন কাট্টা এইসব নাম যেভাবে বিড়বিড় করছিলেন, তাতে মনে হয় মেহনত করাটা নেহাত কথার কথা নয়।
ফেলুদা বাক্যব্যয় না করে বইটাই ধরিয়ে দিল লালমোহনবাবুর হাতে। গিরিডি আসা ঠিক হওয়ার পর থেকেই কিপলিং-এর ‘লেটারস ফ্রম দ্য ইস্ট’ বইটা কাছছাড়া করছে না ফেলুদা, যদিও বইটা ওর নয়, সিধুজ্যাঠার।
বইয়ে মিনিটখানেক চোখ বুলিয়ে লালমোহনবাবু যেভাবে সটান হয়ে বসলেন, বোঝা গেল ওঁর ঝিমুনিটা গেছে, ‘কী কাণ্ড! সাহেব পুরো অঞ্চলটাকেই যে ভূতুড়ে বলছেন।’
‘সেই কথাই বলছি। পিঠাপুরমের পিশাচ-এর পর আর কোনও ভূতের গপ্পো তো লেখেননি। প্রখর রুদ্রকে এ বছরটা রেহাই দিয়ে আর-একটা জমজমাটি ভৌতিক উপন্যাস লিখে ফেলুন। কিপলিং সাহেব যদিও ১৮৯৯ সালে এ বই লিখেছেন, তবে এক-দুটো পোড়ো বাড়ি কি আর খুঁজলে পাওয়া যাবে না? ‘
লালমোহনবাবু অবশ্য জানালেন প্রখর রুদ্র সিরিজের নতুন বই ‘নাইরোবির নরখাদক’ পয়লা বৈশাখ ডিউ। এবং সে বইয়ে্র পাণ্ডুলিপি পড়ে জটায়ুর পরিচালক বন্ধু পুলক ঘোষাল জানিয়েছেন আফ্রিকার জঙ্গলের ব্যাপারটা না থাকলে এ বই বম্বে এখনই লুফে নিত।
ফেলুদা চারমিনারের একটা ফাঁকা প্যাকেটে সিগারেটের ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘পরের এডিশনে তাহলে জঙ্গলটাকে বাদ দিন। পুলকবাবুরও সুবিধা হবে, আপনার নরখাদকেরও। মানুষ যদি খেতেই হয় তাহলে নাইরোবির মতন জনবহুল শহরে ঘাঁটি গেড়ে থাকলেই সুবিধে।’
লালমোহনবাবু মাথা চুলকে বললেন, ‘আসলে একটা গোড়ায় গলদ হয়েছে, রেফারেন্সিং-এ। যে বই পড়ে লিখতে বসেছিলাম সেটা মনে হয় ওই কিপলিং সাহেবের সময়কারই বই। নাইরোবি যে অ্যাদ্দিনে এত জমজমাট শহর হয়ে গেছে সেটা ঠিক জানতুম না।’
আমাদের গাড়ি গিরিডি শহরে ঢুকছে, এক ঝলক দেখে মনে হল কিপলিং-এর বই পড়ে গিরিডি নিয়ে লিখতে বসলে একই ভুল হবে। আমি যে কয়েক পাতা পড়েছিলাম তাতে দেখেছি গিরিডির বন্য সৌন্দর্য নিয়ে কিপলিং বেশ মোহিত ছিলেন। কিন্তু যে গিরিডি এখন দেখছি সেটা বেশ ঘিঞ্জি। আমাদের মধ্যে একমাত্র হরিপদবাবু এর আগে গিরিডিতে এসেছেন, উনি বললেন উশ্রী নদীর অন্য দিকে এখনও বেশ কিছুটা জঙ্গল রয়েছে। আর যে তল্লাটে এককালে বাঙালিরা বসতবাড়ি বানাতেন সেই বারগণ্ডার দিকটা আর-একটু খোলামেলা।
বারগণ্ডা নামটা চেনা চেনা ঠেকল। ফেলুদাকে বললাম, ‘তোমার বন্ধুর বাড়ি ওখানেই, না?’
‘হুঁ, বারগণ্ডায় ভরদ্বাজদের তিন পুরুষের বাড়ি। ভরদ্বাজের ঠাকুর্দা ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের বিখ্যাত ব্যারিস্টার, পশ্চিমে হাওয়া বদলাতে এত ঘন ঘন আসতেন যে এখানে একটা বাড়িই বানিয়ে ফেলেছিলেন।’
এখানে বলে রাখা ভালো ভরদ্বাজ মৈত্র ফেলুদার কলেজের বন্ধু, এবং প্রায় বছরখানেক ধরে বলে বলে ফেলুদাকে গিরিডি আসার ব্যাপারে রাজি করাতে পেরেছে। যদিও বেশ কয়েকটা কেসের গতি করার পর ফেলুদা যখন সময় বার করে উঠতে পারল ঠিক তখনই কাজের সূত্রে ভরদ্বাজ দেশের বাইরে। বন্ধু যেতে পারবে না শুনে ফেলুদা শুরুতে কিছুটা দোনামনা করছিল বটে, কিন্তু ফেব্রুয়ারি শেষ হলেই পঁয়ত্রিশ ডিগ্রির বেশি গরম পড়তে পারে শুনে ওর নিমরাজি ভাবটা কেটে গেল।
বারগণ্ডার দিকে যেতে যেতে খেয়াল করলাম দোতলা-তিনতলা বাড়ি বেশি না থাকলেও এদিককার অধিকাংশ বাড়িই অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি। ফলে প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই বাগান আছে। বাংলো ধাঁচের বাড়িগুলোর পাঁচিল বেশ নিচু বলে রাস্তা থেকে গাছগুলো তো বটেই, বাড়িগুলোও দিব্যি দেখা যায়। একটা অর্ধেক গোলাকৃতি বাড়ির বাগানে দেখলাম সারি সারি ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো। সন্ধ্যার মুখে হাতে গোনা যে কয়েকটা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে তার মধ্যে এই বাড়িটাও আছে, এক ঝলক দেখে মনে হল দোতলায় ঘরের দেওয়ালের অনেকটা জুড়ে আলোআঁধারির চমৎকার সব নকশা তৈরি হয়েছে।
‘জমিদার যদি নাও হন, বাড়ির মালিক এককালে বেশ অর্থবান ছিলেন বলেই মনে হচ্ছে’, ফেলুদাও দেখলাম বাড়িটা খেয়াল করেছে।
‘কী করে বুঝলে? বাড়ির সাইজ দেখে?’
‘শুধু সাইজ নয়। আলোর যা খেল দেখলাম, খান দু-এক ঝাড়লন্ঠন না থাকলে হয় না। আর খান দু-এক ঝাড় মানে সম্ভবত জলসাঘর জাতীয় কিছু ছিল, হয়তো এখনও আছে।’
ভরদ্বাজ মৈত্রদের বাড়ি দেখেও অবশ্য চোখ টেরিয়ে গেল। মেন গেট থেকে বেশ কিছুটা নুড়িছড়ানো পথ ধরে এগিয়ে এসে আমাদের গাড়ি পোর্টিকোর নিচে থামল। গাড়ি থেকে নামতে নামতে দেখি বাড়ির ভেতর থেকে এক বয়স্ক ভদ্রলোক বেরিয়ে আসছেন, হাতে বেশ নকশাদার এক ছড়ি। চেহারায় একটা সাবেকি বনেদিয়ানা আছে। লালমোহনবাবু এক ঝলক দেখে বললেন ভদ্রলোককে টালিগঞ্জের কোনও অভিনেতার মতন দেখতে। কার মতন সেটা অবশ্য মনে করতে পারলেন না।
‘সাহেবি কায়দায় মিস্টার মিটার নাকি বাঙালি কেতায় প্রদোষবাবু, কোনটা বলি বলুন তো?’ ভদ্রলোক অবশ্য সাহেবি কায়দায় হ্যান্ডশেক করার জন্যই হাত বাড়িয়েছেন। ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে বলল, ‘আপনি নিশ্চয় সুধাংশুবাবু? ভরদ্বাজ যখন আপনার ভাইপো, আপনি আমাকে নির্দ্বিধায় প্রদোষ বলেও ডাকতে পারেন।’
সুধাংশুবাবুর ঠোঁটের কোণে হাসি, ‘ভরদ্বাজের কল্যাণে আমিও আপনাদের সবাইকে না দেখেই চিনে গেছি। আর হ্যাঁ, মাস্টার তপেশের লেখা পড়া হয়নি বটে, তবে শ্রীযুক্ত লালমোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের আমি কিন্তু বড়ো ভক্ত। আমার আবার পাল্প ফিকশন নিয়ে ইন্টারেস্ট সেই কলেজলাইফ থেকে।’
জটায়ুর সামান্য অপ্রস্তুত হাসি দেখে মনে হল আমার মতন উনিও পাল্প ফিকশন কথাটা বোধহয় বোঝেননি। ফেলুদার থেকে পরে জেনে নিতে হবে।
সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতে উঠতে সুধাংশুবাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনারা হপ্তা দু-এক মতন আছেন তো? গাড়ি যখন নিয়েই এসেছেন তখন মধুপুর-দেওঘর-পচম্বা সবই ঘুরে নিতে পারবেন। আমি হিতেনকে বলে দেব, ওই নয় আপনাদের লোক্যাল গাইড হয়ে যাবে।’
‘দিন সাতেক তো আছিই, তারপর দেখা যাক।’
সুধাংশুবাবু আকাশ থেকে পড়লেন, ‘বলেন কী মশাই? সাত দিন পর আপনাকে যেতে দিচ্ছে কে? আর যেতে দিলে ভরদ্বাজ যে তার খুড়োর সঙ্গে নাহক রাগারাগি করবে, সেটাও ভাবুন। তা ছাড়া এতদিন পর কলকাতা থেকে অতিথি পেলাম, গল্প শুনতে হবে না?’
ভদ্রলোকের আন্তরিকতা বেশ লাগল। ফেলুদাও হাসিমুখে বলল, ‘গিরিডির গল্প শোনার জন্য আমরাও অবশ্য মুখিয়ে রয়েছি। যাঁর কথা বললেন, সেই হিতেনবাবু কি আপনার সেক্রেটারি?’
‘সেক্রেটারিও বলতে পারেন, কেয়ারটেকারও বলতে পারেন। তবে বাড়ির কেয়ারের কথা বলছি না কিন্তু, এই বুড়োর কেয়ারের কথা বলছি। হিতেনের জন্ম বারগণ্ডাতেই, বয়সে ভরদ্বাজের কাছাকাছি হবে। ছোটো থেকেই চিনতাম, বুঝলেন? কলকাতায় আমার জ্যাঠতুতো দাদা অর্থাৎ ভরদ্বাজের বাবাও মারা গেলেন, আমিও রিটায়ার করে গিরিডি চলে এলাম। এত বড়ো বাড়ি সামলানোরও তো লোক দরকার, ভাগ্যক্রমে ওকে পেয়ে গেছি। শিক্ষিত ছেলে কিন্তু। আমাকে প্রতিদিন স্টেটসম্যান পড়ে শোনানোর দায়িত্ব হিতেনের। কাল সকালেই তো আসবে, আলাপ হয়ে যাবে আপনাদের সঙ্গে।’
ডিনারে গাদাখানেক পদের ব্যবস্থা করেছিলেন সুধাংশুবাবু। প্রত্যেকটা পদই সুস্বাদু। রাঁধুনির এলেম তো আছেই, কিন্তু এখানকার শাকসবজিই হোক কি মুরগি, কোয়ালিটি যে কলকাতার তুলনায় বেশ ভালো সে কথাও মানতে হবে। খাওয়াদাওয়ার পর সেই কথাই হচ্ছিল। সুধাংশুবাবু হাসতে হাসতে বললেন, ‘মশাই, ওই কারণেই তো একশো বছরের বেশি সময় ধরে ড্যাঞ্চিবাবুরা এখানে এসে আস্তানা গাড়তেন। ড্যাঞ্চিবাবু কারা, জানো তো মাস্টার তপেশ?’
ফেলুদার কল্যাণে এই শব্দটা আমার জানা ছিল অবিশ্যি। গিরিডি আসার ঠিক আগে আগেই জেনেছি। কলকাতা থেকে বাবুরা পশ্চিমে হাওয়াবদল করতে আসতেন, আর বাজারে গিয়ে বলতেন ‘ড্যাম চিপ’। সেই ড্যাম চিপ থেকে হয়ে গেল ড্যাঞ্চি।
‘এই বারগণ্ডায় যত বাড়ি দেখছেন তার বোধহয় ষাট শতাংশ এই ড্যাঞ্চিবাবুদের বানানো। তখনকার দিনের পয়সাওলা লোকজন সব, বুঝলেন না? উকিল-হাকিম-ডাক্তার-ব্যবসায়ী, কাকে পাবেন না? আমার বাবার কথা তো ভরদ্বাজের থেকে নিশ্চয় শুনেছেন। একটু এগিয়ে উশ্রী নদীর কাছেই ডাক্তার নীলরতন সরকারের বাড়ি দেখতে পাবেন। আসার পথে রায়দের বাড়ি আপনাদের চোখে পড়েছে কি না জানি না, তবে জিতেন্দ্রনাথ রায়ের টাকা এককালে লন্ডনের রয়্যাল স্টক এক্সচেঞ্জে খাটত বলে শোনা যায়। ওঁর ছেলে রণবীর রায় আমার বিশেষ পরিচিত, কাল নিয়ে যাব আপনাদের। এখনও দু-একটা শেভ্রোলে-ব্যুইক রয়ে গেছে।’
ফেলুদা চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিল। এবার কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, ‘ইউক্যালিপটাসওলা বাড়িটার কথা বলছেন কি?’
সুধাংশুবাবুর চোখে একটা ঝিলিক দেখতে পেলাম, ‘এই না হলে গোয়েন্দার চোখ! হ্যাঁ হ্যাঁ, ওই বাড়িই। কয়েকদিন যাবৎ আবার শুনছি এক সাহেব এসে রয়েছেন। কাল নয় তাঁর সঙ্গেও আলাপ করে আসা যাবে।’
২
ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে দেখি ব্যাকব্রাশ করা, মোটা ফ্রেমের চশমা পরা এক ভদ্রলোক অপেক্ষা করছেন। আমাদের দেখে নমস্কার করে বললেন, ‘আমি হিতেন সান্যাল। আপনারা এসেছেন শুনে আর তর সইল না, একটু আগেই চলে এলাম। তা ছাড়া সুধাংশুবাবু বললেন আপনাদের উশ্রীর দিকটা ঘুরিয়ে দিতে, রোদটা চড়া হওয়ার আগে পৌঁছে গেলেই ভালো।’
ফেলুদা নমস্কার ফিরিয়ে ওঁর হাতে ধরা ম্যাগাজিনটা দেখে বলল, ‘দেশ মনে হচ্ছে? দেখতে পারি?’
‘সার্টেনলি, এটা অবশ্য সুধাংশুবাবুর কপি। গতকালই এসে পৌঁছেছে।’
ফেলুদা ম্যাগাজিনটা দেখতে দেখতে বলল, ‘পদবি সান্যাল বললেন?’
‘আজ্ঞে?’ ভদ্রলোক ফেলুদার প্রশ্নে একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন।
‘দেশে দেখছি বাংলার টেরাকোটা মন্দির নিয়ে একটা লেখা বেরিয়েছে। লেখকের নাম হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল। আপনিই নাকি?’
ভদ্রলোককে বেশ হতভম্ব দেখাল, ‘কই, না তো! আমি আসলে ম্যাগাজিনটা খোলার সময়ও পাইনি। একই নাম দেখাচ্ছে?’
‘তাই তো দেখছি। এরকম নেমসেক চট করে দেখা যায় না অবিশ্যি!’
হিতেনবাবু ঘাড় নাড়লেন, ‘তা যা বলেছেন। শুধু নাম নয়, একেবারে পদবি অবধি মিলে যাচ্ছে। আমি যদিও মন্দিরের ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানি না। উশ্রীর ওপারে জঙ্গলের মধ্যে শুনেছি একটা ভাঙা মন্দির আছে। আপনারা ইন্টারেস্টেড হলে নিয়ে যেতে পারি আজকেই।’
লালমোহনবাবু উত্তেজনার চোটে আমার কনুইটা খামচে ধরলেন, ‘বলেন কী! জঙ্গলের মধ্যে ভাঙা মন্দির! এরকম থ্রিলিং ব্যাপার মিস করা যায় নাকি! বাঘ-টাঘ না থাকলেই হল।’
হিতেনবাবু হেসে ফেললেন, ‘না, গিরিডির জঙ্গলে বাঘ আছে বলে তো কোনোদিন শুনিনি। জঙ্গল পেরিয়ে ওদিকে সাঁওতালদের ছোটো ছোটো কিছু গ্রাম আছে, সেখানে ছোটোবেলায় শুনতাম বুনো শুয়োর বেরোত। সেও আজকাল আর দেখা যায় বলে মনে হয় না।’
বুনো শুয়োরের খবরটা জটায়ুকে মনে হয় খুব একটা স্বস্তি দিল না। তবে তাৎক্ষণিক হকচকানিটা দিব্যি কাটিয়ে উঠে ভদ্রলোক খুব স্মার্টলি ‘তবে আর দেরি কেন মশাই, শীঘ্রস্য শুভম’ বলে হাঁটা লাগালেন।
সুধাংশুবাবুদের বাড়ি থেকে উশ্রী নদী গাড়িতে বোধহয় মিনিট পাঁচেকও লাগে না। নদীর থেকেও অবশ্য আমার বেশি ভালো লাগল উশ্রী জলপ্রপাত। শুনে ফেলুদা বলল, ‘সেটা স্বাভাবিক। একটা ঝরনাকে তুই প্রায় পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারবি, নদীর ক্ষেত্রে সবসময় সেটা হয় না।’
লালমোহনবাবু পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করবেন বলেই কি না কে জানে, দেখি নদীর মধ্যে থেকে উঠে থাকা কালো পাথরগুলোর ওপর পা রেখে রেখে ঝরনার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। উশ্রী জলপ্রপাতের কাছে এই মুহূর্তে আমরা ছাড়া আর একজনকেই দেখা যাচ্ছে। তিনিও সম্ভবত ট্যুরিস্ট, কারণ বেশ অনেকক্ষণ ধরেই জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা বার করে একের পর এক ছবি তুলে চলেছেন। লালমোহনবাবু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে সেই ভদ্রলোককে প্রায় ধাক্কা মারতে যাচ্ছিলেন। শেষ সময়ে সামলে নিয়ে মনে হল জিভ কেটে সরি বললেন।
হিতেনবাবু সবে বলেছেন ‘এই একশিলা পাথরগুলো বেশ পিছল হয় কিন্তু’, বলতে বলতেই দেখি লালমোহনবাবু বেসামাল হয়ে পেছনে পড়ে যাচ্ছেন। শেষ মুহূর্তের একটা প্রাণান্তকর চেষ্টায় কিছু আঁকড়ে ধরার জন্যই যেন ওঁর ডান হাতটা সটান ওপরে উঠে গেল।
বেশ বড়োসড়ো একটা দুর্ঘটনা ঘটতে যাচ্ছিল। কিন্তু সেটা ঘটল না কারণ জলে দাঁড়িয়ে থাকা ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক অসম্ভব দ্রুততায় খান দু-এক পাথর একবারে টপকে গিয়ে জটায়ুকে পিছন থেকে ধরে ফেললেন। জটায়ুকে পড়ে যাচ্ছেন দেখা মাত্র ফেলুদা দৌড়োতে শুরু করেছিল, কিন্তু আমরা বেশ কিছুটা পেছনে থাকায় মনে হয় না ও ঠিক সময়ে পৌঁছে উঠতে পারত।
আমি আর হিতেনবাবু যতক্ষণে গিয়ে পৌঁছলাম, ততক্ষণে ফেলুদা আর ট্যুরিস্ট ভদ্রলোক প্রায় মুহ্যমান জটায়ুকে দুদিক থেকে ধরে এনে জলের ধারে একটা পাথরের ওপর বসিয়েছে। এতক্ষণে ভদ্রলোককে ভালো করে দেখার সুযোগ পাওয়া গেল, এবং প্রথমেই যেটা যেটা চোখে পড়ল সেটা হল ভদ্রলোকের চোখের মণির উজ্জ্বল নীল রং। ছিপছিপে চেহারা, চুল কালো, গায়ের রঙেও একটা তামাটে ভাব আছে। কিন্তু ওই চোখ জানিয়ে দেয় ভদ্রলোক এ দেশের নন।
জটায়ু ঠিক আছেন কি না জেনে নিয়ে ফেলুদা ভদ্রলোককে ইংরেজিতে ধন্যবাদ দিতে যাচ্ছিল, আর ঠিক সেই সময়ে ভদ্রলোক স্পষ্ট বাংলায় বলে উঠলেন, ‘চুন-হলুদ লাগবে কি?’
সাহেবের মুখে চুন-হলুদ শুনেই বোধহয় লালমোহনবাবুর ঘোরটা কেটে গেল। ওঁর মতন চক্ষু ছানাবড়া অবস্থা না হলেও ফেলুদাও একটু অবাক হয়েছে বলে মনে হয়, তবে সেটা প্রকাশ না করে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনিই কি রায়দের বাড়িতে উঠেছেন?’
ভদ্রলোক সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন, আর এর পরের কথোপকথনের পুরোটাই হল ইংরেজিতে। আমি যদিও বাংলাতেই লিখছি।
সাহেবের নাম ডেভিড ম্যাককালাম। ফেলুদা ঠিকই ধরেছে, এঁর কথাই সুধাংশুবাবু শুনেছিলেন। ইনি অধ্যাপক, ইংল্যান্ডের মানুষ হলেও শান্তিনিকেতনে আর্ট-হিস্ট্রি পড়ান। বললেন ছুটিছাটা পেলেই পশ্চিমের দিকে ঘুরতে চলে আসেন। পুরোনো মন্দিরের ইতিহাস খুঁজে বেড়ানো ওঁর একটা হবি বিশেষ। রায়বাড়ির কর্তা রণবীর রায় ওঁর পুরোনো বন্ধু, এ যাত্রা তাঁর কাছেই উঠেছেন।
ডেভিড ইতিহাসের অধ্যাপক শোনা ইস্তক লালমোহনবাবু উশখুশ করছিলেন। মন্দিরের কথা শুনে আর থাকতে না পেরে ডেভিডকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘গিরিডির জঙ্গলেও মন্দির আছে জানেন তো?’
‘শিবমন্দিরের কথা বলছেন কি? টেরাকোটার? না, ওটা এখনও দেখা হয়নি।’
লালমোহনবাবুর মুখ দেখে খেয়াল হল মন্দির যে শিবের সেটা হিতেনবাবু আমাদের বলেননি। হিতেনবাবু মাথা নাড়লেন, ‘হ্যাঁ, ডেভিড ঠিকই বলেছেন। জোড়বাংলা শিবমন্দিরই বটে।’
ফেলুদা হিতেনবাবুর সঙ্গে ডেভিডের আলাপ করিয়ে দিতে ডেভিড বিস্মিত স্বরে বললেন, ‘আপনিই হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল, যিনি বাংলার টেরাকোটা মন্দির নিয়ে এবারের দেশে লিখেছেন?’
‘ওহ হো, আপনিও পড়েছেন বুঝি? না না, ইনি অন্য কেউ। মন্দির নিয়ে আমার কোনও ইন্টারেস্টই নেই। আমি গিরিডিতেই জন্মেছি বলে শুধু এই মন্দিরটার কথা জানি।’
‘আই সি!’ ডেভিডকে যেন একটু অন্যমনস্ক শোনাল। তারপর অবশ্য হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে। সন্ধ্যাবেলা তাহলে দেখা হচ্ছে আবার, আপনারা রায়বাড়িতে আসছেন বললেন তো। টেক কেয়ার মিস্টার গাঙ্গুলি!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ডেভিডবাবু, সো কাইন্ড অফ ইউ!’ জটায়ুর একগাল হাসি দেখে বেশ বোঝা গেল এরকম সহৃদয় সাহেব দেখে তিনি বেশ ইমপ্রেসড।
৩
লালমোহনবাবু সামান্য খোঁড়াচ্ছিলেন বলে আমরা জঙ্গলের মধ্যে না ঢুকে উশ্রী নদীর তীরে গিয়ে বসলাম। উশ্রীর বালির চর একেবারে ধবধবে সাদা। আমরা যেখানটা বসেছি সেখান থেকে আবার একটা তারের পুল দেখা যাচ্ছে।
‘বর্ষার সময় কিন্তু এই উশ্রীকে চিনতে পারবেন না। বন্যার তোড়ে কতবার যে এই পুল ভেঙেছে তার ইয়ত্তা নেই।’ জানালেন হিতেনবাবু।
‘বাব্বা! বন্যা কি ফি-বছর হয় নাকি? এত মনোরম পরিবেশ, দেখে মনে হয় বিপদের কোনও সম্ভাবনাই নেই।’
লালমোহনবাবুর কথা শুনে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন হিতেন সান্যাল।
‘দুনিয়ার কোন জায়গায় বিপদ আসে না বলুন তো! ইন ফ্যাক্ট, একটি বিশেষ বিপদের কথা প্রদোষবাবুকে না বললেই নয়।’
ফেলুদা সোজা হিতেন সান্যালের দিকে তাকিয়ে আছে, ‘বিপদটা কার? আপনার?’
‘আজ্ঞে না, আমার নয়। তবে যার বিপদ আপনারা তাঁকে চেনেন।’ ভদ্রলোক হাত কচলাচ্ছেন, আসল কথাটা যেন বলি বলি করেও বলে উঠতে পারছেন না।
ফেলুদার ভুরু কুঁচকে উঠেছে, ‘সুধাংশুবাবুর কথা বলছেন কি?’
ভদ্রলোক একটু ফ্যাকাশে হাসলেন, ‘ঠিক ধরেছেন। সুধাংশুবাবুর কথাই বলছিলাম। জানি উনি আপনাদের নিজে থেকে কিছু বলেননি, কিন্তু আমার অন্নদাতা তো, একটা গ্র্যাটিচিউড ফ্যাক্টর কাজ করে বুঝতেই পারছেন। তাই জন্যই ভাবছিলাম আপনাকে জানাই।’
‘আপনি নিশ্চিন্তে বলুন হিতেনবাবু। সুধাংশুবাবু ভরদ্বাজের কাকা, তা ছাড়া আমাদের হোস্ট-ও বটে। তাঁর কোনও বিপদ ঘটে থাকলে সাহায্য তো করতেই হবে।’
‘বিপদ ঘটে গেছে কি ঘটতে চলেছে সেটাই অবশ্য বুঝতে পারছি না। আজ থেকে মাসখানেক আগে আমি ওঁর অফিসে ঢুকেছিলাম একটা ফাইল আনতে। ওঁর টেবিলের ড্রয়ার থেকে ফাইল বার করতে গিয়ে আমার হাতে একটা কাগজ উঠে আসে। কাগজটায় একটা চিঠি লেখা হয়েছে আর সেই চিঠিতে…’, হিতেন সান্যালের গলাটা একটু শুকনো লাগছে কি? ‘সেই চিঠিতে স্পষ্টতই ওঁকে ব্ল্যাকমেল করা হয়েছে!’
‘সর্বনাশের মাথায় বাড়ি, গিরিডিতেও ব্ল্যাকমেল! কে লিখেছে সেই চিঠি?’ লালমোহনবাবু্র গলাতে উত্তেজনার ছোঁয়া, সেটা অবশ্য নতুন রহস্যের আবির্ভাবে না এই মনোরম পরিবেশে বিপদের কথা শুনে সেটা ধরতে পারলাম না।
‘কী করে বলি বলুন তো কে লিখেছে সে চিঠি। আমার জ্ঞানত সুধাংশুবাবুর কোনও শত্রু নেই বলেই জানি।’
‘চিঠির বয়ানে কী ছিল?’ জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
‘চিঠি বলা বোধহয় উচিত হবে না, একটা লাইন মাত্র লেখা ছিল– যে ভুল করেছ তার সাজা পাওয়ার জন্য তৈরি হও।’
ফেলুদা একমনে ওর পায়ের বুড়ো আঙুলটা দিয়ে বালি খুঁড়ছে, ‘সুধাংশুবাবু বোধহয় জানেন না যে আপনি চিঠিটা দেখেছেন?’
‘না। আর সেইজন্যই ইয়ে, মানে বুঝতে পারছিলাম না আপনাকে বলাটা উচিত হবে কি না। কিন্তু পরে ভাবলাম ওঁর সত্যি কোনও বিপদ হয়ে গেলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না।’
অনেকটা দূরে রেলপুলের ওপর দিয়ে ট্রেন গেল বোধহয়, একটা গুমগুম শব্দ শুনতে পেলাম। ফেলুদা সামান্য অন্যমনস্ক ভাবে সেদিকে তাকিয়ে ছিল, তারপর সংবিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘আপনি বলে ভালোই করেছেন হিতেনবাবু। হ্যাঁ, ব্যাপারটা একটু ট্রিকি, বিশেষত সুধাংশুবাবু নিজে যখন এ ব্যাপারে কোনও কথা আমাকে বলেননি। দেখি এ রহস্য কিছু উদ্ধার হয় কি না।’
লালমোহনবাবু কিছু একটা বলার জন্য মুখ খুলছিলেন, ফেলুদা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার বন্ধুটির যা অবস্থা দেখছি, মনে হয় না আজ আর বিশেষ কিছু করা যাবে। আপনি বরং বারগণ্ডায় ফিরে যান হিতেনবাবু। আমরা আরও কিছুক্ষণ উশ্রীর ধারে বসে মকৎপুরের বাজারটা ঘুরে বাড়ি ফিরব।’
হিতেনবাবু একটু কিন্তু কিন্তু করছিলেন, তবে ফেলুদার অনীহা দেখে আর জোর করলেন না। যাওয়ার সময় বলে গেলেন আগামী কাল উশ্রীর অন্য দিকটা ঘুরিয়ে দেখাবেন। আর ওঁর বাড়ির ফোন নম্বরটাও দিয়ে গেলেন।
‘আমি কিন্তু মশাই একেবারে ফিট। পায়ে আর কোনও ব্যথা নেই।’ এতক্ষণে মুখ খুলতে পেরেছেন লালমোহনবাবু।
‘জানি, এবার উঠে পড়ুন।’ ফেলুদা নিজেও উঠে দাঁড়িয়েছে।
‘উঠে পড়ব?’ জটায়ু হকচকিয়ে গেছেন, ‘এই যে বললেন উশ্রীর ধারে আরও বসব কিছুক্ষণ?’
‘উশ্রীর ধারে বসে বালি খোঁড়ার থেকে একবার জঙ্গলে ঢুকলে ভালো হয় না? নীল আকাশের নিচে এই কটকটে আলোয় আর কতই বা রহস্য-রোমাঞ্চের উপাদান পাবেন?’
লালমোহনবাবুর চোখ জ্বলজ্বল করছে, ‘সাসপিশাস কিছু খুঁজে পেলেন নাকি ফেলুবাবু?’
‘সাসপিশাস কি না জানি না, তবে একটা জিনিস মিলছে না। আর সেটা মেলানোর জন্য একবার মন্দিরটা দেখে আসা দরকার।’
তারের পুলে ওঠার পরেই অবশ্য লালমোহনবাবুর উৎসাহে একটু ভাটা পড়ল, ‘এ তো বিস্তর নড়বড় করছে। ভাই তপেশ, তুমি একটু পাশে পাশে থাকো দিকিন। নিতান্তই যদি ভেঙে পড়ে তাহলে অন্তত হাতটা ধরার সুযোগ পাব।’
ফেলুদা সামান্য এগিয়ে গেছিল, কিন্তু লালমোহনবাবুর কথাটা ওর কানে গেছে। মাথা ঘুরিয়ে বলল, ‘বন্যা না এলে চিন্তা নেই আপনার। নড়বড় করছে না, নড়ছে। আর নড়ছে মানে পুলটা ফ্লেক্সিবল আছে, সেটা না থাকলেই বরং বিপদ।’
‘বোঝো! বিজ্ঞান কী জিনিস মশাই!’ মুখে বললেও জটায়ু বিজ্ঞানের ওপর খুব যে ভরসা রাখতে পারলেন তা নয়। পুলের বাকি পথটা চোখ বুজে পার হচ্ছেন দেখে আমাকে বাধ্য হয়েই ওঁর একটা হাত ধরে থাকতে হল। পুলের ওপর হোঁচট খেয়ে পড়লে কেলেঙ্কারির একশেষ হত।
পুল পার হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গল শুরু হয়েছে। অবশ্য এ জঙ্গল ডুয়ার্সের জঙ্গল নয়। নিকষ অন্ধকার ব্যাপারটা এখানে নেই। তা ছাড়া জঙ্গলের মধ্যেই চড়াই-উতরাই হয়েছে। গাছগুলোও বেশ কিছু চিনতে পারলাম। শাল বা পলাশ না চেনার তো কোনও কারণ নেই। ঝুপসি হয়ে ওঠা আর-একরকম গাছে থোকা থোকা ফল কলার কাঁদির মতন ঝুলছে। ফেলুদা বলল এটা মহুয়া গাছ।
জটায়ু এতক্ষণ চুপ করে জঙ্গলের সৌন্দর্য উপভোগ করছিলেন। মহুয়া শুনে বললেন, ‘এই গাছের ফল খেতেই ভাল্লুকরা আসে না? ফল কি মশাই মাটি থেকে কুড়িয়ে খায় না গাছখানা ঝাঁকিয়ে?’
‘ফল পড়ে না থাকলে ঝাঁকিয়েই খায় নিশ্চয়’, ফেলুদা একবার আড়চোখে লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঝাঁকিয়েও না পেলে শুনেছি গাছেই উঠে পড়ে।’
‘প্রাণ বাঁচানোর তো কোনও পথই খোলা নেই দেখছি’, লালমোহনবাবু খানিকটা জোর করে হাসতে গিয়ে সামনে কিছু একটা দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ফলে ওঁর ‘হেঁহ্’টা কীরকম ‘এঁহ’-এর মতন শোনাল। আমরা একটা সুঁড়িপথ ধরে এগোচ্ছিলাম, সেটা এবার শেষ হয়েছে। আর সামনেই দেখা যাচ্ছে একটা মন্দিরের ভগ্নাবশেষ।
আর-একটু এগোতে বোঝা গেল মন্দিরের যেটুকু দাঁড়িয়ে আছে তারও বেশ জরাজীর্ণ অবস্থা। মন্দিরের বাইরের দেওয়াল প্রায় ধ্বসে পড়েছে, মূল দরজার চারপাশে অগুনতি আগাছা। মন্দিরের ভেতরে ঢুকে বোঝা গেল ভেতরেও অজস্র শেকড় গজিয়ে আছে, অন্ধকারের মধ্যে যেটুকু দেখা যায় তাতে মনে হচ্ছে ভেতরের দেওয়ালগুলোর রং নিকষ কালো। এতটাই কালো ভেতরের দিকে যে ঠিক কতটা যাওয়া যায় সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।
এত অন্ধকারের মধ্যে লালমোহনবাবু একটু ঘাবড়ে গেছিলেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার দাদা আবার কোথায় গেলেন তপেশ? উনি থাকলে, বুঝলে কিনা, একটু ভরসা পাই।’
সত্যি তো, ফেলুদা গেল কোথায়! আমাদের সঙ্গে তো ঢোকেনি। বাইরে এসে বার দু-এক ডাকডাকি করার পর দেখি মন্দিরের পেছনে একটা ঢিবি বেয়ে নেমে এল। জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ঢিবির ওদিকটায় কী আছে, দেখি ফেলুদা উলটে আমাকেই প্রশ্ন করছে, ‘অঙ্কগুলো ধরতে পারলি?’
এখানেও অঙ্ক!
‘ফলকগুলো দেখিসনি বোকচন্দর? সব প্যাটার্নে বসানো, খাপে খাপ। একেবারে ওপর থেকে দেখতে শুরু কর।’
তাই তো! যেরকম লম্বাটে ইট আমরা দেখে থাকি সেরকম কিছু আছে বটে, কিন্তু চৌকো, তেকোনা ইট-ও রয়েছে। এমনকি গোলচে ইটও চোখে পড়ল। মন্দিরের দেওয়ালে নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য শিল্পীরা যেন কঠিন সব অঙ্ক কষে এক সাইজের সঙ্গে আর-এক সাইজ, এক আকারের সঙ্গে আর-এক আকার জুড়েছেন।
ইটের কথা বলতে ফেলুদা ছোট্ট করে একটা গাঁট্টা মেরে বলল, ‘টেরাকোটা আর ইট কিন্তু এক নয়। টেরাকোটার ইট বলে বটে কিন্তু মেটেরিয়ালটা আলাদা।’
লালমোহনবাবু এর মধ্যে আমাদের খুঁজতে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ফেলুদার কথা শুনে বললেন, ‘টেরা কি আমাদের ট্যারা-র অপভ্রংশ ফেলুবাবু?’
‘এই টেরা লাটিন শব্দ লালমোহনবাবু। টেরা মানে মাটি আর কোটা, সেটাও একটা লাটিন শব্দের অপভ্রংশ বটে, মানে পোড়া। অর্থাৎ?’
‘পোড়ামাটি! পোড়ামাটির মন্দির তো ছোটো থেকে শুনছি মশাই, তাকেই যে টেরাকোটা বলে তা কি আর জানতুম!’ লালমোহনবাবুর মুখ উদ্ভাসিত, ‘কিপলিং সাহেবের বইয়ে পড়লেন বুঝি?’
ফেলুদার মুখটা সামান্য গম্ভীর, ‘কিপলিং সাহেব টেরাকোটা নিয়ে কিছু বলেননি, তবে মনে হচ্ছে রহস্য সন্ধানে ভদ্রলোক কাজে আসবেন।’
লালমোহনবাবুর মুখ হাঁ হয়ে গেল, ‘বলেন কী! সুধাংশুবাবুর ব্ল্যাকমেল রহস্যের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে কিপলিং সাহেবের বইয়ের পাতায়?’
ফেলুদা আরও অবাক হয়ে তাকাল, ‘ব্ল্যাকমেল? আরে না মশাই, সে চিঠির কথা ভুলেই গেছিলাম।’ বলেই কীরকম অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল।
আমি জানি ওর মনের মধ্যে গভীর কিছু চিন্তাভাবনা চলছে। তাই ইচ্ছে থাকলেও আর জিজ্ঞাসা করা গেল না ঢিবির ওদিকে কী দেখতে গেছিল। লালমোহনবাবু আমার কানে ফিসফিস করে বললেন, ‘এবারে কি ডবল রহস্যে জড়িয়ে পড়ছি তপেশ?’
আমিও বুঝতে পারছি না ফেলুদা ঠিক কী ভাবছে। আপাতত ও একটা ডায়রি বার করে কীসব নোট নিতে শুরু করেছে। কী যে লিখছে সেটা আর সাহস করে দেখে উঠতে পারলাম না।
৪
সুধাংশুবাবু ঠিকই বলেছিলেন, রায়বাড়ির গ্যারাজে শেভ্রোলে আর ব্যুইক দুই-ই দেখা গেল। সেই দুই গাড়ির মালিক এখন আমাদের সামনেই বসে। যে পাইপ কামড়ে ভদ্রলোক আমাদের সঙ্গে গল্প করছেন শুনলাম সেটা হাতির দাঁতের তৈরি। ডেভিড ম্যাককালামের বন্ধু যখন, রণবীর রায়ের বয়স মাঝ-চল্লিশের বেশি হওয়া উচিত নয়, তবে দেখলে মনে হয় ভদ্রলোক পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছেন। চুলে ভালোই পাক ধরেছে। হাত আর গলার কাছের চামড়াটাও বয়সের তুলনায় সামান্য কোঁচকানো লাগল, তবে ভদ্রলোক এত বেশি ফর্সা যে কুঁচকে যাওয়া চামড়া আরও বেশি করে চোখে পড়ে।
ফেলুদা বলল, ‘আপনার শেভ্রোলেটা তো বোধহয় ফিটন, তাই না?’
ফেলুদার প্রশ্ন শুনে রণবীর রায় খুবই ইমপ্রেসড হলেন, ‘বাহ! আপনার মতন ইয়ংম্যানের যে এসব আদ্যিকালের গাড়ি নিয়ে ইন্টারেস্ট থাকবে তা তো ভাবিনি। এই ফিটনের দেখভাল করতেই বছরে বেশ কয়েক হাজার টাকা যায় প্রদোষবাবু। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি, তবে বাপ-ঠাকুদ্দা এই গাড়ি চড়েছেন, প্রাণে ধরে আর বিক্রি কী করে করি বলুন! দুটো গাড়িই ঠাকুদ্দা তিরিশ সালে এক আমেরিকানের থেকে কিনেছিলেন।’
‘আপনাদের ব্যবসাটা কীসের?’
‘তামা। বরগণ্ডায় যত কপার মাইনস আছে তার মধ্যে সবথেকে বড়ো মাইন আমাদের। এককালে আমাদের কোম্পানি ব্রিটেনে এত তামা পাঠাত যে ইংল্যান্ডে তামা গলানোর একটা কারখানা অবধি খুলেছিলেন আমার বাবা। আমিও তখন অক্সফোর্ডে পড়তে যাই, আর সেই সুবাদেই ডেভিডের সঙ্গে আলাপ।’
ডেভিড মাথা নাড়লেন, ‘কারি খাওয়ায় আমার হাতেখড়ি রণবীরের হাত ধরেই। দেশে থাকার সময় ওকে হাত পুড়িয়ে রাঁধতে হয়নি বটে, কিন্তু অক্সফোর্ডে আর সে সুযোগ কোথায়?’
‘বিলেত ছাড়ার পরেও তাহলে যোগাযোগ ছিল আপনাদের মধ্যে?’
ডেভিড একবার রণবীরের দিকে তাকালেন, ‘অক্সফোর্ডের পর আমার বন্ধু একেবারে বেপাত্তা। সত্যি বলতে কি যোগাযোগ ছিলই না। যা হয় আর কী, প্রথম দিকে কিছু চিঠিচাপাটির আদানপ্রদান হত। পরে সেসবও বন্ধ হয়ে যায়। শেষ চিঠি আমরা লিখেছি বোধহয় বছর কুড়ি আগে, নয় কি?’
‘হ্যাঁ, বিশ বছর তো হবেই। সেই শেষ, তারপর এই মাসখানেক আগে ওর চিঠি পেয়ে আমি একেবারে অবাক! কী বিশেষ কাজে ও গিরিডি আসবে, আমি থাকব কি না জানতে চেয়েছে। আমিও পত্রপাঠ উত্তর দিয়ে দিলাম, থাকব তো বটেই এবং তুমিও এসে আমার কাছেই উঠবে।’
ডেভিড হেসে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, এমন সময়ে বৈঠকখানার জানলার বিশাল পাল্লা দুটো সশব্দে আছড়ে পড়ল। বাইরে যা শোঁ শোঁ আওয়াজ হচ্ছে, বোঝাই যায় ভালোমতন ঝড় উঠেছে।
সুধাংশুবাবু বললেন, ‘ফাল্গুন মাসে এই ঝড় প্রায়ই হয় গিরিডিতে। রণবীর, তোমাদের ছাদে যাওয়া যাবে? মিত্তিরমশাইদের একটা সারপ্রাইজ দেওয়া যাক।’
‘সে কথা আর বলতে! এই ঘোরানো সিঁড়িটা দিয়ে আসুন আপনারা।’
আমরা এতক্ষণ বসেছিলাম একতলায়। দোতলার ওপর ছাদ। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে খেয়াল করলাম দোতলার সেই বিশাল ঘরে সত্যিই দুখানা ঝাড়বাতি, এবং এরকম রাজকীয় ঝাড়বাতি আমি এর আগে দেখিনি। ফেলুদাকে ঘুরে বলতে গিয়ে দেখি কয়েক ধাপ নিচে ডেভিডের সঙ্গে খুব মনোযোগ দিয়ে কী যেন আলোচনা করছে। কান পেতে বিশেষ সুবিধে হল না, শুধু ‘জোড়বাংলা’ শব্দটা শুনলাম। মনে হয় জঙ্গলের সেই মন্দিরটা নিয়েই আলোচনা চলছে।
ঝড় উঠেছে বলেই মনে হল সন্ধ্যাটা যেন আজকে আর-একটু তাড়াতাড়ি নেমে এসেছে। ছাদে উঠতেই লালমোহনবাবুর গলা পেলাম, ‘এদিকটায় এসো তপেশ। অপার্থিব ভাই, অপার্থিব দৃশ্য।’
লালমোহনবাবুর কথাটা নেহাত আবেগ বলে উড়িয়ে দেওয়া গেল না। সত্যিই অপরূপ দৃশ্য। দূরে উশ্রীর জলে চাঁদের আলো পড়ে রুপোর পাতের মতন দেখতে লাগছে, আর প্রবল হাওয়ায় উশ্রীর উলটো দিকে শালবনের মাথাগুলো সজোরে দুলছে।
সুধাংশুবাবুর সারপ্রাইজের জন্য অবশ্য আর-একটু অপেক্ষা করতে হল। হাওয়াটা কমে যাওয়ার পর পরেই অবাক হয়ে দেখলাম বারগণ্ডা জুড়ে জায়গায় জায়গায় জ্বলে উঠছে ছোটো ছোটো আগুন।
সুধাংশুবাবু মুচকি হাসলেন, ‘বনে ফায়ার বেশ বিপদজনক হয়ে যেতে পারে, তাই এই আমাদের বনফায়ার। ফাগুন মাসের এই ঝড় শুরু হলেই বারগণ্ডার ছেলেমেয়েরা বেরিয়ে পড়ে শুকনো শালপাতা জড়ো করে আগুন জ্বালাবে বলে। গেঁয়ো মজা বলতে পারেন, কিন্তু শহুরে মানুষরাও কম উপভোগ করেন না!’
সে অবশ্য লালমোহনবাবুকে দেখেই বেশ বোঝা যাচ্ছে। লালমোহনবাবু তন্ময় হয়ে সুধাংশুবাবুর কথা শুনছিলেন। ভদ্রলোক কী একটা কাজে ছাদের অন্য দিকে যেতে আমার দিকে ঘুরে বললেন, ‘মনে হয় না তপেশ, রবীন্দ্রনাথের মতন বলি– আহা কী দেখিলাম, জন্ম-জন্মান্তরেও ভুলিব না?’ এই রে, ভদ্রলোক এবার সত্যিই বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছেন! ওঁকে বলাটা কি উচিত হবে যে কথাটা রবীন্দ্রনাথ নয়, বঙ্কিমচন্দ্র বলেছেন?
‘অবশ্য গড়পারের বৈকুণ্ঠ মল্লিকই বা কম যান কীসে? শুধু শালগাছ নিয়ে কবির ইমেজারিটা একবার দ্যাখো—
তরুবর তুমি মহাপ্রাংশু, তুলে যাও হিল্লোল,
রাঢ়বঙ্গের বিটপীশ্রেষ্ঠ, দাও দোদুল দোলায় দোল
ক্ষুৎপীড়িতের করেছ সেবা,
পাতা নাকি থালা বুঝিবে কে বা!
হরিৎহৃদয়, চর্ম তোমার হইবে না কভু লোল।’
ভদ্রতা করে বলতেই হল বৈকুণ্ঠবাবুর দেখার চোখ আছে, যদিও শালকে মহাপ্রাংশু বলা যায় কি! শেষ লাইনের গুরুচণ্ডালী দোষটা নিয়ে বলাতে জটায়ু ‘পোয়েটিক লাইসেন্স’ বলে হেসে উড়িয়ে দিলেন।
‘একবার ভাবো তো তপেশ, গাছের ছাল দেখে যার লোলচর্ম বৃদ্ধের কথা মনে পড়ে তিনি কত বড়ো কবি! আমার তো মনে হয় ইউক্যালিপটাস গাছ দেখেই বৈকুণ্ঠবাবুর এই ইমেজারিটা মাথায় এসেছিল।’
আমার যদিও সন্দেহ হচ্ছিল কচি ইউক্যালিপটাস গাছের চামড়ার রংই সাদা হয়। ফেলুদাকে বলতে গিয়ে খেয়াল হল সেই যে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে ডেভিডের সঙ্গে কথা বলছিল তারপর আর ফেলুদাকে দেখিইনি।
বারগণ্ডা জুড়ে আগুনগুলো নিভে এসেছে। সুধাংশুবাবু বা রণবীর রায়কেও দেখতে পাচ্ছি না। লালমোহনবাবু যতক্ষণ আবৃত্তি করছিলেন তখনই বোধহয় সবাই নেমে গেছেন। লালমোহনবাবু কথা বলতে বলতে ছাদের অন্য প্রান্তে চলে গেছিলেন। ডাকতে গেলে বললেন, ‘দেখেছ কাণ্ড! এই দিক দিয়ে আর-একটা সিঁড়ি সোজা একতলায় নেমে গেছে।’
সুধাংশুবাবুদের বাড়ি্র পেছনেও এরকম সিঁড়ি দেখেছি, বাড়ির জমাদারদের জন্য বানানো। আমি ভেতরের সিঁড়ি দিয়েই নামব ভাবছিলাম, ফেলুদাকে ধরতে হবে। কিন্তু লালমোহনবাবুর নিচের বাগানে গিয়ে ঘোরার ইচ্ছে জেগেছে, খানিকটা বাধ্য হয়েই পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নামলাম।
‘ওরে বাবা, কত ফুলগাছ দেখেছ তপেশ! চাঁপাফুলের গন্ধ পাচ্ছ?’ লালমোহনবাবুর কথায় খেয়াল হল হাওয়ায় সত্যিই মিষ্টি, কাঁঠালমার্কা গন্ধ ভেসে আসছে। এই ফুলকেই কি কাঁঠালিচাপা বলে?
গাছটা খুঁজে বার করার জন্য এগোতেই একটা হিসহিসে শব্দ ভেসে এল। কারা কথা বলছে। ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর আড়ালে মুহূর্তের জন্য যেন দুটো সিল্যুয়েট নজরে এল।
লালমোহনবাবুও শুনেছেন। ফিসফিস করে বললেন, ‘কাছে গিয়ে একবার দেখবে নাকি?’
ভাগ্য ভালো এদিকটায় শুকনো পাতা বিশেষ পড়েনি, না হলে হাঁটাই মুশকিল হয়ে যেত। পা টিপে টিপে আর-একটু দূর যেতেই একটা গলার স্বর শোনা গেল। সে গলা গজরাচ্ছে।
‘সমস্ত ভালোমানুষি এবার ঘুচে যাবে। আমাকে ব্ল্যাকমেল করে পার পাওয়া যাবে না!’
অন্য গলাটা অস্পষ্ট, কী বলছে শোনা যাচ্ছে না।
প্রথম গলার স্বর আরও চড়ছে, ‘কী মতলবে এতদিন পরে আসা হয়েছে তা কি জানি না?’
দ্বিতীয় গলাটা যেন প্রথমজনকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। প্রথম গলার আওয়াজটা এবার কমে এল।
আমার কবজিতে চাপ পড়তে দেখি লালমোহনবাবুর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। ইশারায় জানতে চাইলেন এবার ফিরে যাওয়া উচিত হবে কি না।
আমার পুরো কথোপকথনটা শোনার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু লালমোহনবাবুর চোখমুখের অবস্থা দেখে ফিরে যাওয়াই মনস্থির করলাম। তা ছাড়া এরা যেই হোক না কেন, মুখোমুখি পড়ে গেলে একটা কেলেঙ্কারি হবে।
ফেলুদা একতলাতেই অপেক্ষা করছিল। লালমোহনবাবু হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকে প্রশ্ন করলেন, ‘সাহেবটি কোথায়?’
ফেলুদা সামান্য অবাক, ‘কেন বলুন তো? বাইরে বেরোল বলেই তো মনে হল।’
লালমোহনবাবু চোখ বড়ো বড়ো করে বললেন, ‘ব্ল্যাকমেল রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে ফেলুবাবু!’
শুনে ফেলুদার কয়েক সেকেন্ড বাক্যস্ফূর্তি হল না। জটায়ু আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রণবীরবাবু তখনই ঘরে এসে ঢুকলেন, সঙ্গে শরবত-এর ট্রে হাতে তাঁর কাজের লোক। ফেলুদা ইশারায় লালমোহনবাবুকে বলল রাতে কথা হবে।
‘বাকিরা কোথায় সব?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন রণবীর রায়, ‘এবার খাবারদাবারের ব্যবস্থাটাও তো করে ফেলতে হবে।’
সুধাংশুবাবু কিছুক্ষণ পরেই ফিরে এলেন, কিন্তু ডেভিডের দেখা নেই। সুধাংশুবাবুর মুখটা যদিও বেশ থমথম করছে। ফেলুদা জিজ্ঞেস করায় বললেন, ‘শরীরটা ভালো ঠেকছে না, আপনারা বরং রণবীরের এখানেই ডিনারটা সেরে নিন। আমি বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম নিই। আপনাদের ফেরার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দেব কি? হরিপদবাবু তো বাড়িতেই আছেন।’
রায়বাড়ি থেকে সুধাংশুবাবুদের বাড়ি দিব্যি হেঁটে ফেরা যায়। ফেলুদা ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করতে উনি উঠে পড়লেন। ডেভিড কোথায় গেছেন কে জানে, আমরাও গুটিগুটি ডাইনিং রুমের দিকে এগোলাম।
৫
রায়বাড়ি থেকে একটু এগিয়েই বড়ো বাগানবাড়ি পড়ে যার নাম ‘শশীকান্ত কুটির’, আর বাগানবাড়ির পাশ দিয়ে যে গলি ঢুকে গেছে সেটা ধরলে সুধাংশুবাবুদের বাড়ি শর্টকাটে পৌঁছে যাওয়া যায়। আমরা সেই রাস্তাটাই ধরেছি। ফেলুদা আয়েশ করে একটা চারমিনার ধরিয়ে লালমোহনবাবুর দিকে তাকাল, ‘ব্ল্যাকমেলের কথা কী বলছিলেন?’
লালমোহনবাবু সন্ধ্যাবেলার ঘটনাটা ফেলুদাকে বললেন। ফেলুদা একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে বলল, ‘তা আপনার থিয়োরিটা কী?’
‘ব্যাপারটা বেশ ঘোরালো মশাই। ডেভিড ম্যাককালাম যে সুধাংশুবাবুকে ব্ল্যাকমেল করছেন সেটা তো বেশ বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু কেন সেটাই প্রশ্ন!’
‘ডেভিড! সুধাংশুবাবুকে? এত শিওর হচ্ছেন কী করে?’
আলো-অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছি লালমোহনবাবুর মুখটা উত্তেজনায় চকচক করছে, ‘আপনি কি জানেন সুধাংশুবাবু আর ডেভিড একে অপরকে আগে থেকেই চেনেন?’
আমার মুখ হাঁ হয়ে গেছে। ফেলুদাও অবাক হয়ে লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে।
‘মনে আছে প্রথম দিন সুধাংশুবাবুকে দেখে আপনাদের বলেছিলাম টালিগঞ্জের কোনও অভিনেতার মতন ওনাকে দেখতে। তারপর গত দুদিন ধরে যতবার দেখছি, ভারী চেনা চেনা ঠেকছে অথচ ঠাহর করতে পারছিলাম না। আজকে রায়বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়েও মনে করবার চেষ্টা করছিলাম। তখন মনে এল না, কিন্তু বাগানে ওই ঝামেলার মধ্যে স্পষ্ট মনে পড়ে গেল! বছর তিনেক আগে সিমলে নাট্য উৎসবে শান্তিনিকেতন থেকে একটা দল এসেছিল, সব ওখানকারই ছাত্রছাত্রী আর অধ্যাপক। গড়পারে আমার প্রতিবেশী মৃগাঙ্ক ভড় আবার সেই উৎসব কমিটির সেক্রেটারি, আমাকে ভার দিয়েছিলেন ব্যাকস্টেজে গিয়ে প্রতিটি দলের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আসতে।’
ফেলুদার ভুরু কুঁচকে উঠেছে, ‘আপনি বলছেন সেখানেই সুধাংশুবাবুকে দেখেছেন আপনি?’
‘তবে আর বলছি কী মশাই! শুধু দেখিনি, রীতিমতন হ্যান্ডশেকও করেছি। আসলে ওঁর হাইটটা তো অ্যাভারেজ বাঙালির থেকে বেশি, তা ছাড়া বনেদি ব্যাপারটাও আছে। চেহারাটা মনে রয়ে গেছিল।’
‘স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ! আপনার কথা সত্যি হলে ডেভিডের সুধাংশুবাবুকে আগে থেকে না চেনার সত্যিই কোনও কারণ নেই। কিন্তু সে কথা দুজনেই লুকিয়ে গেলেন কেন?’
‘ওখানেই তো রহস্য মশাই। আমার ধারণা ডেভিড সুধাংশুবাবুর কোনও গোপন কথা জানেন। আর সেটা নিয়েই ওনাকে ব্ল্যাকমেল করতে গিরিডিতে এসেছেন।’
বারগণ্ডার এদিকটায় আলো একটু কম। আমাদের ডানদিকে একটা মন্দির চোখে পড়ল, সেটার ফলকে দেখি লেখা আছে ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ মন্দির’। বৈষ্ণবসমাজ তো বুঝলাম, কিন্তু গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ মানে কী? ফেলুদাকে অবশ্য জিজ্ঞাসা করা গেল না, কারণ লালমোহনবাবু খানিকটা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, ‘ফেলুবাবুর কি আমার থিয়োরিটা মনে ধরল না?’
‘না না, মনে না ধরার কোনও কারণ নেই। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ইনফরমেশন দিলেন আপনি। তবে ডেভিডের ব্ল্যাকমেল করার পয়েন্টটায় একটু গণ্ডগোল লাগছে।’
‘কেন বলুন তো? ওরকম ভালোমানুষ চেহারা দেখে?’
ফেলুদা একবার গলা খাঁকরিয়ে বলল, ‘উঁহু। চেহারা দিয়ে যে মনুষ্যচরিত্র বোঝা যায় না সেটুকু আমি জানি।’
লালমোহনবাবু বিস্তর লজ্জা পেয়ে, জিভ কেটে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন।
ফেলুদা হাত তুলে বলল, ‘আমি জানি আপনি ওরকম কিছু ভেবে বলেননি। তাই ব্যতিব্যস্ত হবেন না। আপনার মনে আছে বোধহয়, হিতেন সান্যাল আমাদের বলেছিলেন সুধাংশুবাবুর ড্রয়ার থেকে উনি ব্ল্যাকমেলের কাগজটা পেয়েছিলেন মাসখানেক আগে। যে পাঠিয়েছিল সে হয়তো আরও কিছুদিন আগেই পাঠিয়ে থাকতে পারে। অথচ ডেভিড গিরিডিতে এসেছে দিন পাঁচেক।’
লো-ভোল্টেজ গলার স্বরে জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাই পোস্ট পাঠায়নি বলছেন?’
আমরা হাটতে হাঁটতে সুধাংশুবাবুদের বাড়ির প্রায় কাছেই চলে এসেছি। ফেলুদা মাথা নেড়ে বলল, ‘সে কথা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ডাকেও এসে থাকতে পারে।’
‘তাহলে?’
ফেলুদা দাঁড়িয়ে পড়েছে, ‘যদি সে চিঠি ডাকে এসেও থাকে, তাহলেও আজকে সন্ধ্যার সময় তো ডেভিডের রায়বাড়ির বাগানে থাকার কথা নয়।’
লালমোহনবাবু এবার যারপরনাই অবাক হয়েছেন, ‘আপনি এত শিওর হচ্ছেন কী করে ফেলুবাবু?’
‘কারণ লালমোহনবাবু, আপনারা যখন ছাদে ছিলেন ডেভিড তখনই বেরিয়ে গেছে মোহনপুরের দিকে। বারগণ্ডা থেকে মোহনপুর হেঁটে যেতে মিনিট চল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ তো লাগবেই।’
‘মোহনপুরে কী আছে ফেলুদা? তোমাকে বলেই গেছে?’
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ, বলেই গেছে। কিন্তু কেন গেছে সে কথা ক্রমশ প্রকাশ্য।’
জটায়ু নিজের থিয়োরি খাটল না দেখে একটু মুষড়ে পড়েছিলেন। ফেলুদা সেটা বুঝতে পেরে বলল, ‘আপনার তো তাও একটা থিয়োরি ছিল। ফেলু মিত্তিরের এখন এমন অবস্থা যে থিয়োরিটুকুও নেই, রহস্যের গোলকধাঁধায় ঠোক্কর খেয়ে বেড়াচ্ছি।’
সুধাংশুবাবুর বাড়িতে ঢুকে কিছুটা এগিয়ে খেয়াল হল গেটটা বন্ধ করা হয়নি। ফিরে এসে গেটটা আটকাতে গিয়ে উলটোদিকের রাস্তায় বিশাল পাকুড় গাছে চোখ চলে গেল। এ গাছ রোজই দেখছি, কিন্তু গাছের নিচে প্রায় অন্ধকারে মিশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে তাকে আগে দেখিনি। ভালো করে দেখতে যাওয়ার আগেই লোকটা আরও অন্ধকারের দিকে সরে গেল।
সুধাংশুবাবু শুয়ে পড়েছিলেন। দোতলায় আমাদের ঘরে গিয়ে দেখি ফেলুদা বাংলার মন্দিরের স্থাপত্যকলা বিষয়ে একটা বই উলটেপালটে দেখছে। দেখে মনে হল সুধাংশুবাবুদের লাইব্রেরি থেকেই নিয়েছে বইটা। পাকুড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার কথা বললাম ফেলুদাকে, শুনল বটে কিন্তু বিশেষ উচ্চবাচ্য করল না।
আমি কলকাতা থেকে টিনটিনের ‘প্রিজনারস অফ দ্য সান’ বইটা নিয়ে এসেছিলাম। রাজদরবারে যখন টিনটিনদের বিচার চলছে তখনই ঘুমটা এসে গেল।
ঘুম ভাঙল ফেলুদার ডাকে, ‘তোপসে ওঠ, সাতটা বাজে। বেরোতে হবে এবার।’ এত সকালে বেরোতে হবে শুনে একটু অবাক হচ্ছিলাম। ফেলুদা দেখলাম অলরেডি পাজামা-পাঞ্জাবি পরে তৈরি। আমাকে বলল, ‘লালমোহনবাবুকে ডেকে তোল। ওনাকে না নিয়ে বেরোলে জেনুইনলি দুঃখ পাবেন।’
‘কিন্তু এত সকালে যাব কোথায়?’
‘উশ্রী নদীর ধারে। আর হ্যাঁ, সূর্যের আলো উঠেছে পাক্কা ছটার সময়। একঘণ্টা পরেও এত সকাল বললে একটা গাঁট্টা খাওয়ার কথা। কিন্তু গিরিডির এই চমৎকার সকালে ভায়োলেন্ট হতে মন চাইছে না।’
লালমোহনবাবু এত সকালে বেরোতে হবে শুনেও যাকে বলে এক পায়ে খাড়া। কালকের দুঃখটাও বেমালুম চলে গেছে দেখলাম, আমাকে বললেন, ‘তুমি মিলিয়ে নিয়ো তপেশ, ফেলুবাবু নির্ঘাত কোনও রহস্যের গন্ধ পেয়েছেন।’
রহস্যের গন্ধ পেলে ফেলুদা যেমন চিন্তামগ্ন হয়ে পড়ে সেরকম অবশ্য কিছু দেখলাম না। বরং কী একটা গানের কলি গুনগুন করতে করতে হাঁটছে এখন। জিজ্ঞেস করাতে দু-কলি গেয়েও শুনিয়ে দিল– ‘ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে ততই বাঁধন টুটবে, মোদের ততই বাঁধন টুটবে/ ওদের যতই আঁখি রক্ত হবে মোদের আঁখি ফুটবে, ততই মোদের আঁখি ফুটবে।’
রবীন্দ্রনাথ গানটা লিখেছিলেন বঙ্গভঙ্গের সময়ে, আর সে গান নাকি লেখা হয়েছিল গিরিডিতেই।
রাতে বোধহয় কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। বারগণ্ডার কয়েক জায়গায় জল জমেছে দেখলাম, এদিকে উশ্রীর পাড়টাও ভেজা ভেজা। আমরা তাই না বসে নদীর ধার ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। সময় কাটানোর জন্য ফেলুদা বলল অ্যাক্রস্টিক খেলা যাক।
‘সেটা আবার কী খেলা মশাই? এই প্রথম নাম শুনলাম।’
লালমোহনবাবুর মতন আমিও অ্যাক্রস্টিকের নাম এর আগে শুনিনি। ফেলুদা সরাসরি উত্তর না দিয়ে বলল, ‘জমবে কেমন মজা/ টাটকা হবে ভাজা/ উচ্ছে তাজা তাজা।’
‘এ আবার কী হেঁয়ালি মশাই! তাও আবার উচ্ছে নিয়ে! তুমি কিছু বুঝলে তপেশ?’
আমি বুঝেছি। বার দু-এক লাইন তিনটে আওড়াতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেল।
‘প্রত্যেক লাইনের প্রথম শব্দের প্রথম অক্ষরগুলো জুড়ে দেখুন।’
মিনিটখানেক বিড়বিড় করার পর জটায়ুর মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল, ‘কী কাণ্ড! এলেম আছে মশাই আপনার, তবে এ বড়ো শক্ত খেলা।’
‘শক্ত কোথায়? আর-একটা দেখুন– তমলুক গেলে ভাই/ পেট পুরে খাওয়া চাই/ শরবৎ-এ-জলপাই। মিলল?’
‘মিলল তো বটেই। উত্তর দিতে সমস্যা নেই, প্রশ্ন বানাতেই যত ঝঞ্ঝাট যে।’
আরও কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটির পর ফেলুদা ঘড়ি দেখতে শুরু করল। ঘড়ির ছোটো কাঁটা যখন প্রায় নয়ের ঘরে, ফেলুদা দেখলাম আঙুল মটকাতে শুরু করেছে। ও কি কারও জন্য অপেক্ষা করছে? আরও দশ-বারো মিনিট অপেক্ষা করার পর ফেলুদা বলল, ‘তোপসে-লালমোহনবাবু, আমাদের আবার ওই পুল পেরোতে হবে।’
পুল পেরিয়ে উশ্রীর ওদিকে জঙ্গলে?
ফেলুদা যেন আমার মনের কথা বুঝতে পারল, ‘হুঁ, মন্দিরে একবার যাওয়া দরকার।’
হিতেনবাবুর আজ আমাদের মন্দিরে নিয়ে যাওয়ার কথা। ওঁর জন্যই কি উশ্রীর ধারে অপেক্ষা করছিলাম আমরা?
লালমোহনবাবু রহস্যের খোঁজে বেরিয়ে এতক্ষণ বেশ চনমনে ছিলেন। পুল পেরিয়ে আবার জঙ্গলে ঢুকতে হবে শুনে মুখটা দেখলাম একটু শুকিয়ে গেল।
৬
মন্দিরের সামনে যে চমকটা অপেক্ষা করছিল তার জন্য আমরা কেউই প্রস্তুত ছিলাম না। এমনকি ফেলুদাও নয়। মন্দিরের সামনের ঘাসজমিতে অস্থিরভাবে পায়চারি করছিলেন হিতেন সান্যাল। আমাদের দেখে ভদ্রলোক হাঁ হয়ে গেলেন।
‘কী ব্যাপার মিস্টার মিটার! আপনারা এখানে? আপনারা এ মন্দির চেনেন?’
ফেলুদা হিতেনবাবুর প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে উলটে ওঁকেই জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনি মিস্টার ম্যাককালামকে এদিকে আসতে দেখেছেন?’
হিতেনবাবু সন্দিগ্ধ স্বরে বললেন, ‘কী ব্যাপার বলুন তো? আপনাদেরও উনি ডেকেছেন নাকি? কাল বেশ রাতের দিকে আমার বাড়িতে উনি ফোন করেছিলেন। বললেন আজ সকাল আটটার সময় মন্দিরের সামনে দাঁড়াতে, ভীষণ জরুরি দরকার। বুঝতেই পারছেন আমি কতটা অবাক হয়েছি, গতকালই মাত্র আলাপ হয়েছে। ফোন নম্বর-ও যে কোথা থেকে পেয়েছেন বললেন না।’
আমি জানি ডেভিড কোথা থেকে হিতেনবাবুর ফোন নম্বর পেয়েছেন। ফেলুদাই দিয়েছে। কিন্তু কেন?
‘হ্যাঁ, ওঁর সঙ্গে আমারও দেখা হওয়ার কথা ছিল উশ্রীর ধারে। কিন্তু একঘণ্টারও বেশি লেট, অথচ ওঁর দেখা নেই। ‘
‘কী জানি মশাই। কী কারণে আপনাকে ডেকেছেন কিছু জানেন?’
ফেলুদার দিক থেকে কোনও উত্তর না আসাতে ঘুরে দেখি ফেলুদা ভীষণভাবে ভুরু কুঁচকে মাটির দিকে তাকিয়ে আছে। এবার মুখ তুলে হিতেনবাবুকে বলল, ‘আপনি কটা থেকে এখানে অপেক্ষা করছেন?’
হিতেনবাবু একটু হকচকিয়ে গিয়ে বললেন, ‘আমি তো আটটা বাজার আগেই চলে এসেছি, ধরে নিন আটটা বাজতে দশ হবে।’
‘ডেভিডকে ছাড়া আর কাউকে আসতে বা যেতে দেখেছেন এদিক দিয়ে?’
‘কই না তো!’
হিতেনবাবুর উত্তর ভালো করে না শুনেই ফেলুদা তিরবেগে দৌড়োতে শুরু করেছে মন্দিরের দিকে। হিতেনবাবু ফ্যালফ্যাল করে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে।
আমি দেখতে পেয়েছি কী হয়েছে। ভিজে মাটিতে ফুটে উঠেছে একজোড়া পায়ের ছাপ, আর সে ছাপ আমাদের কারও নয়। কারণ এই দূর থেকেই দেখতে পাচ্ছি সে ছাপ পৌঁছেছে মন্দিরের দরজার সামনে অবধি।
ফেলুদার পেছনে পেছনে লালমোহনবাবুও দৌড়েছেন, তার পেছনে আমি।
ফেলুদা মন্দিরের দরজা খুলে ঢুকেই স্ট্যাচুর মতন দাঁড়িয়ে পড়েছে। ফেলুদার সামনেই ভেতরের দেওয়ালের দিকে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন ডেভিড ম্যাককালাম।
‘খ-খুন!’ শিউরে ওঠা গলায় বললেন লালমোহনবাবু। খুন যে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই, কারণ মন্দিরের ভেতর আলো ভালো করে না ঢুকলেও বেশ দেখতে পাচ্ছি ডেভিডের ব্রহ্মতালু থেকে রক্তের ধারা বেরিয়ে এসে মন্দিরের মাটি ভিজিয়ে তুলেছে।
‘কী সর্বনাশ!’ হিতেনবাবুর এতক্ষণে এসে ঢুকেছেন। এবং সব রক্ত সরে গিয়ে তাঁর মুখটা রীতিমতন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
লালমোহনবাবু সংবিৎ ফিরে পেয়ে বললেন, ‘হিতেনবাবু আসার আগেই কি ইনি খুন হয়েছেন?’
ফেলুদা একদৃষ্টিতে মন্দিরের ভেতরের দিকে তাকিয়ে, ‘খুব সম্ভবত তাই লালমোহনবাবু, এবং খুনি মন্দির থেকে বেরোয়নি।’
‘বলেন কী! খুনি এখনও মন্দিরের মধ্যেই লুকিয়ে?’ লালমোহনবাবুর গলা কাঁপছে।
ফেলুদা এবার হিতেনবাবুর দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ‘মন্দিরের অন্য দরজাটা কোনদিকে হিতেনবাবু?’
হিতেনবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন, ‘অন্য দরজা! কী বলছেন মিস্টার মিটার! আমি তো কিছুই বুঝছি না।’
ফেলুদার গলার স্বর ক্রমেই ধারালো হয়ে উঠছে, ‘অভিনয় রাখুন মিস্টার সান্যাল। যিনি এই পোড়ো, ধ্বসে যাওয়া মন্দিরকে জোড়বাংলা মন্দির বলে জানেন, তিনি নিশ্চয় এটাও জানেন যে জোড়বাংলা আসলে একটা মন্দির নয়, দুখানা লাগোয়া মন্দির। এবং সেই দুই মন্দিরের মধ্যে যাতায়াত করার জন্য আলাদা দরজাও থাকে। মনে রাখবেন এখন যা পরিস্থিতি তাতে পুলিশের সন্দেহ সবার আগে আপনার ওপরে গিয়েই পড়বে।’
জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল, হিতেন সান্যাল আর্তনাদ করে উঠলেন, ‘আমি নিরপরাধ প্রদোষবাবু। এ খুন আমি করিনি।’
‘আপনি নিরপরাধ কি না সে বিচার পরে হবে। আগে বলুন দুই মন্দিরের ভেতরের দরজাটা কোথায়? ওই কালো দেওয়াল ঘেঁষে বোধহয় আরও অনেকটা দূরেই যাওয়া যায়, নয় কি?’
বাধ্য ছেলের মতন ঘাড় নাড়লেন হিতেন সান্যাল, ‘হ্যাঁ যায়। পাশের মন্দিরটা পুরোপুরি ধ্বসে গিয়ে একটা সুড়ঙ্গ তৈরি হয়ে গেছে। এই মন্দিরের দেওয়াল ধরে এগিয়ে গেলে আপনি সেই সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকতে পারবেন।’
‘আর সেই সুড়ঙ্গ গিয়ে শেষ হয়েছে পেছনের ঢিবিতে?’
সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন হিতেন সান্যাল।
‘নিজের অবস্থাটা কী বুঝতে পারছেন মিস্টার সান্যাল? যে লুকোনো পথ আপনি হাতের তালুর মতন চেনেন, সেই একই পথ ধরে খুনি এসেছে।’
হিতেনবাবু এবার একেবারে হাউমাউ করে উঠলেন, ‘আমি আবারও বলছি এ খুন আমি করিনি প্রদোষবাবু। আপনি বিশ্বাস করুন।’
‘আমি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করতে পারি হিতেনবাবু, কিন্তু তার জন্য এই মুহূর্ত থেকে আপনাকে শুধুমাত্র সত্যি কথা বলতে হবে। মনে রাখবেন গিরিডির পুলিশ ছাড়াও আপনার ওপর আরও অনেকের নজর আছে।’
হিতেন সান্যাল হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে, ‘আপনি কী বলছেন প্রদোষবাবু, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘বুঝতে পারবেন মিস্টার সান্যাল। আপাতত শুধু এটুকু জেনে রাখুন ডেভিড ম্যাককালাম কিন্তু গিরিডি এসেছিলেন আপনাকেই খুঁজতে।’
হিতেন সান্যালে এবার দুহাতে মুখ ঢেকে কাঁপতে কাঁপতে বসে পড়লেন।
৭
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষ হতে হতেই দুপুর গড়িয়ে গেল। খুনটা উশ্রীর ওপারে হওয়ায় কোন থানা ইনভেস্টিগেশন চালাবে সেই নিয়েও কিছুটা টালবাহানা চলছিল। আমাদের জবানবন্দি অবশ্য বারগণ্ডা থানার দারোগা চুনিলাল তিওয়ারি নিলেন। তিওয়ারি পদবি হলেও ভদ্রলোক ঝরঝরে বাংলা বলেন, এবং ফেলুদার কীর্তিকলাপের সঙ্গেও সবিশেষ পরিচিত। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, ‘বুঝতেই পারছেন, একজন সাহেব খুন হয়েছেন। আমাদের এখন অনেক ঝক্কি পোহাতে হবে। কিছু জানতে পারলে অবশ্যই খবর দেবেন মিস্টার মিটার। এ কেস তাড়াতাড়ি সলভ না হলে চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে।’
সুধাংশুবাবু খবরটা শোনা ইস্তক পাথরের মতন বসেছিলেন। পুলিশ যাওয়ার পর বললেন, ‘এই তো সদ্য আলাপ হল ভদ্রলোকের সঙ্গে। তিনিই খুন হয়ে গেলেন, এ কি ভাবা যায়! অবিশ্বাস্য ব্যাপার। আপনি কিছু বুঝতে পারছেন প্রদোষবাবু?’
‘নাহ! আমারও আপনার মতনই অবস্থা। এখানকার মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে কিছু আলোচনা করছিলাম গতকাল। আজ কথা ছিল উনি নিজেই ঘুরিয়ে দেখাবেন মন্দিরটা। কী থেকে কী হয়ে গেল!’
সুধাংশুবাবুকে আজকের ঘটনাটা যে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়ে গেছে সেটা বেশ বোঝা যাচ্ছে। ফেলুদার কথা শেষ হতে না হতেই উঠে দাঁড়ালেন, ‘আমাকে মাফ করবেন আপনারা। কাল থেকেই শরীরটা জুতের যাচ্ছে না। তার মধ্যে এই খুনখারাপি! বারগণ্ডাতে এর আগে কোনও খুন হয়েছে কি না মনেই করতে পারছি না। আমি একটু বিশ্রাম নিতে যাই। আপনাদের ওপর দিয়েও সারাদিন যা ধকল গেছে, আপনারাও আপাতত রেস্ট নিন। ‘
সুধাংশুবাবু বেরিয়ে যেতেই লালমোহনবাবু চুপিচুপি বললেন, ‘হিতেন সান্যালের কী হল মশাই?’
‘যা যা ঘটেছে তাই যদি বলে থাকেন পুলিশকে, তাহলে এখনই কিছু হওয়ার নেই লালমোহনবাবু। তবে এ জট অনেক গভীর, পুলিশ এখনই তার নাগাল পাবে বলে মনে হয় না।’
‘পুলিশ না পেলেই বা কী, আপনি পেলেই হল।’
ফেলুদা ঘড়ি দেখল, ‘কিন্তু তার জন্য হিতেন সান্যালের সঙ্গে আর-একবার বসা দরকার।’
হিতেনবাবু সুধাংশুবাবুর অফিসে বসে কাজ করছিলেন। ফেলুদাকে দেখে উঠে দাঁড়ালেন, ‘আ-আপনারা?’ ওঁর হকচকানি ভাবটা এখনও যায়নি।
‘সকালের কথা যে শেষ হয়নি হিতেনবাবু।’
হিতেন সান্যাল তড়িঘড়ি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন, সুধাংশুবাবু ধারেকাছে আছেন কি না বোঝার চেষ্টা করছেন বোধহয়, ‘এ-এখানেই কথা বলতে চান?’
‘আপনি চাইলে আমাদের ঘরেও আসতে পারেন।’
হিতেন সান্যালকে দেখে মনে হল ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলেন।
অবশ্য ঘরে এসেও একটু ইতস্তত করছিলেন, সেটা লক্ষ করে ফেলুদা বলল, ‘আমার ভাই আর লালমোহনবাবু প্রায় প্রতিটি কেসেই আমার সঙ্গে থাকেন। আপনি নিশ্চিন্তে শুরু করতে পারেন।’
ভদ্রলোক কতটা নিশ্চিন্ত হলেন বোঝা গেল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনি সকালে বলছিলেন মিস্টার ম্যাককালাম আমাকে খুঁজতে গিরিডিতে এসেছিলেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমি ওনাকে এর আগে কোনোদিন দেখিওনি, ওঁর ব্যাপারে কিছু জানতামও না। আমাকে খুঁজতে আসার হেতুটা কী?’
ফেলুদার দু-আঙুলের ফাঁকে চারমিনার জ্বলছে। ফেলুদা সামনের অ্যাশট্রেতে ছাই ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, ‘সে কথায় আসছি। কিন্তু সকালে আমার কথায় আপনার প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছিল মিস্টার ম্যাককালাম না এলেও অন্য কেউ আপনাকে খুঁজতে আসতে পারে এরকম একটা দুশ্চিন্তা আপনার ছিল। ঠিক ভাবছি?’
‘আমার মতন সাধারণ মানুষকে খুঁজতে কে আসবে মিস্টার মিটার?’ হিতেন সান্যালের গলাটা কি একটু কেঁপে গেল?
ফেলুদা একদৃষ্টিতে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে, ‘যদি বলি অন্য আর-এক হিতেন সান্যাল?’
ভদ্রলোকের দৃষ্টি মেঝের দিকে, রগ ধরে বসে রয়েছেন।
‘কী মিস্টার সান্যাল, ভুল বলছি?’
ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়লেন দুদিকে।
‘আপনার বোধহয় জানা নেই যে ডেভিড ম্যাককালাম এবং অন্য হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল বাংলার মন্দির নিয়ে বহুদিন ধরেই একসঙ্গে গবেষণা করে চলেছেন। ইন ফ্যাক্ট, হিতেন্দ্রনাথের যে সমস্ত লেখা পড়ে আপনি নিজের পরিচয় ভাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তার কয়েকটায় খুঁজলে দেখতে পাবেন হিতেন্দ্রনাথ ডেভিডের প্রতি সহ-গবেষক হিসাবে কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন।’
‘কিন্তু পরিচয় তো আমি…’
ফেলুদা ভদ্রলোকের কথা মাঝপথেই থামিয়ে দিল, ‘না, কাকতালীয়ভাবে আপনার নামটিও হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল। তাই আক্ষরিক অর্থেই হয়তো পরিচয় ভাঁড়াননি। কিন্তু প্রকৃত মন্দিরবিশারদ তো আপনি নন মিস্টার সান্যাল। যিনি প্রকৃত মন্দিরবিশারদ, সেই হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল তো কলকাতায় বসে।’
হিতেন সান্যাল মলিন হাসি হাসলেন, ‘বিশারদ হওয়ার জন্য কি কলকাতায় থাকাটা আবশ্যক মিস্টার মিটার? আমিও মন্দির নিয়ে নেহাত কম জানি না। তবে হ্যাঁ, কলকাতাবাসী না হওয়াটা যদি দোষ হয় তাহলে সে দোষে আমি দোষী।’
ফেলুদা ওর পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কাগজ বার করে এনেছে, ‘পড়ে দেখুন।’
‘কী এটা?’ জিজ্ঞাসু দৃষ্টি হিতেন সান্যালের চোখে।
‘আপনার লেখার তালিকা। যার অধিকাংশই বেরিয়েছে গিরিডি-দেওঘর-মধুপুরের বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্রপত্রিকায়, হিন্দি এবং ইংরেজিতে। আর এই প্রতিটি লেখাই যেখান থেকে টোকা, তার তালিকাটাও পাশেই দেওয়া আছে মিস্টার সান্যাল। আর সেগুলি সবই বেরিয়েছে বিভিন্ন অ্যাকাডেমিক জার্নালে, সাধারণ মানুষ ছুঁয়ে দেখা দূর অস্ত, যার নামই জানেন না। কলকাতায় না থাকাটা দোষ নয় মিস্টার সান্যাল, সে আমিও জানি আর আপনিও জানেন। কিন্তু প্লেজিয়ারিজম অর্থাৎ অন্যের লেখাকে নিজের বলে চালানো যে একটা বিশাল বড়ো অপরাধ, সে কথাটাও আমরা দুজনেই জানি।’
হিতেন সান্যালের মুখ লাল হয়ে উঠেছে, কাগজটা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিলেন। ফেলুদা কাগজটা মুড়ে ফের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, ‘আপনাকে জানিয়ে রাখি মিস্টার সান্যাল, এই লিস্টি কিন্তু আমি করিনি। গতকাল সন্ধ্যাবেলায় এ কাগজ আমাকে দিয়েছিলেন স্বয়ং ডেভিড ম্যাককালাম। খানিক কাজের সূত্রে, আর খানিক ঘোরার বাসনায় ডেভিড পশ্চিমে প্রায়ই চলে আসতেন। কোনওভাবে বছর দেড়েক আগে আপনার একটা লেখা ওঁর চোখে পড়ে যায়। আর ডেভিডের চোখে না পড়লে আসল হিতেন্দ্রনাথ সান্যাল কোনোদিন জানতেও পারতেন না আপনার কীর্তিকলাপ। গত এক বছর ধরে ডেভিড এবং হিতেন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত লেখালেখির হদিশ রাখছিলেন। সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ জড়ো করে ডেভিড এবার এসেছিলেন আপনাকে সতর্ক করে দিতে। মনে আছে, প্রথম দিন উনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন দেশের লেখাটা আপনার কি না? সেটাও একটা পরীক্ষা ছিল আপনার জন্য। সেবার উতরে গেলেও জোড়বাংলা শব্দটা আপনাকে ডুবিয়ে দিয়ে গেল।’
‘আমাকে মাফ করুন মিস্টার মিটার’, হিতেন সান্যাল প্রায় টলতে টলতে উঠে দাঁড়িয়েছেন।
ফেলুদার হাত দুটো বুকের ওপর জড়ো করা, কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে। আজ আপনি আসুন মিস্টার সান্যাল। কিন্তু আমাদের কথা এখনও শেষ হয়নি।’
হিতেন সান্যাল ঘর থেকে বেরোতে যাবেন, ফেলুদা হঠাৎ বলে উঠল, ‘আজকের মতন একটা শেষ প্রশ্ন মিস্টার সান্যাল। শ্রীরামপুরের রাজাদের সঙ্গে গিরিডির কোনও সম্পর্ক আছে?’
ভদ্রলোক ঘুরে দাঁড়ালেন, মনে হচ্ছে বেশ অবাক হয়েছেন, ‘অবশ্যই। এখনকার গিরিডির অনেকটা জমিই ছিল শ্রীরামপুরের রাজাদের।’
‘আর মন্দিরটা?’
‘হ্যাঁ। ওনাদেরই বানানো। না হলে এই চত্বরে ওরকম টেরাকোটার কাজ আসবে কী করে!’
‘ধন্যবাদ, মিস্টার সান্যাল।’
৮
‘বলেন কী ফেলুবাবু, শ্রীরামপুরেও রাজা আছেন?’ জটায়ুর হাঁ-মুখটা দেখার মতন হয়েছে।
‘আছেন নয় মশাই, ছিলেন। শুধু শ্রীরামপুর কেন, শেওড়াফুলি, বাঁশবেড়িয়া সর্বত্রই রাজারা ছিলেন।’
জটায়ু প্রায় খাবি খাচ্ছিলেন, ‘কী খবর দিলেন প্রদোষবাবু! আচ্ছা, বদ্যিবাটিতেও কি রাজবাড়ি আছে?’
এবার ফেলুদা হেসে ফেলল, ‘বদ্যিবাটির খবর আমার কাছে নেই। আসলে নামে রাজা হলেও এঁরা প্রায় সবাই ছিলেন বড়ো ভূস্বামী। তাই শ্রীরামপুরের রাজা আর শশাঙ্কর মধ্যে কিছু তফাত তো আছেই। তবে বলে রাখি, শ্রীরামপুরের রাজার কথা আমিও জেনেছি সদ্য। সৌজন্যে সেই কিপলিং সাহেব!’
‘কী কাণ্ড! বাংলার মন্দির নিয়ে তো দেখছি বাঙালিদের থেকে সাহেবরা বেশি খবর রেখেছেন।’
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘কথাটা হয়তো খুব ভুল বলেননি আপনি। বিশেষত ডেভিডকে দেখার পর এ কথা বলাই যায়। তবে কিপলিং-এর লেখায় এ মন্দিরের উল্লেখ নেই, শুধু বলা আছে গিরিডিতে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে কোম্পানি গড়ে উঠেছিল শ্রীরামপুরের রাজার এস্টেট ভাড়া করে। গিরিডিতে টেরাকোটার মন্দির দেখে আমার আগেই সন্দেহ হয়েছিল, হিতেন সান্যালকে জিজ্ঞেস করলাম দুয়ে দুয়ে চার করতে। ভদ্রলোক সম্ভবত পুরো মিথ্যা কথা বলেননি, লিখতে লিখতে কিছু গবেষণা এই হিতেন সান্যালও করেছেন।’
আমার মনে একটা প্রশ্ন খচখচ করছিল অনেকক্ষণ ধরে। এবার করেই ফেললাম, ‘কিন্তু ফেলুদা, যেসব জার্নালের কথা বললে সেসব জার্নাল গিরিডিতে বসে হিতেনবাবু পেতেন কী করে?’
‘ভেরি গুড তোপসে’, ফেলুদা একটা পিঠে চাপড় মেরে বলল, ‘এই কথাটা আমাকেও ভাবাচ্ছিল। গিরিডি খুব ছোটো শহরও নয়, কলেজ-লাইব্রেরি সবই আছে। তা হলেও, যেসব জার্নালে কলকাতার হিতেন্দ্রনাথ লেখা বার করতেন সেসব পাওয়া এখানে সহজ হত না। কিন্তু তাও গিরিডির হিতেন সান্যাল কী করে সেইসব লেখা পাচ্ছিলেন? এর উত্তর পেতে আমারও কালঘাম ছুটে যেত, কিন্তু ভাগ্যক্রমে সে উত্তর কাল লালমোহনবাবু দিয়ে দিয়েছেন।’
লালমোহনবাবু সামান্য ঘাবড়ে গেলেন, ‘আমি? কোন উত্তর দিলাম মশাই? কিছুই তো বুঝতে পারছি না।’
আমার ধাঁ করে গতরাতের আলোচনাটা মনে পড়ে গেল, ‘সুধাংশুবাবু?’
‘এক্সেলেন্ট তোপসে! তুই আর নেহাত স্যাটেলাইট নোস দেখছি, টিমটিম করে হলেও এ জ্যোতিষ্কেরও তেজ বাড়ছে। হ্যাঁ, সুধাংশুবাবুর লাইব্রেরিতেই এইসব জার্নালের সন্ধান পেয়েছিলেন হিতেন সান্যাল। কিন্তু একটা প্রশ্ন এখনও ভাবাচ্ছে রে…’
আমরা দুজনেই ফেলুদার দিকে তাকিয়ে।
‘সুধাংশুবাবু শান্তিনিকেতনের চাকরি ছেড়ে গিরিডিতে কেন ফিরে এসেছেন? এবং সত্যি কথাটা গোপনই বা করছেন কেন?’
‘চিঠির কথাটাও ভুলে যাবেন না ফেলুবাবু’, বলে উঠলেন জটায়ু।
ফেলুদা লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে উনি বললেন, ‘ব্ল্যাকমেল রহস্যের তো এখনও সমাধান হয়নি মশাই। ডেভিড যদি ব্ল্যাকমেল নাই করে থাকে, অন্য কেউ তো করেছে।’
‘না লালমোহনবাবু, মনে আছে। রহস্য তো এক নয়, একাধিক। জট ছাড়ানো তো পরের কথা, কোথায় কোথায় যে জট বেঁধে আছে সেটাও পরিষ্কার হচ্ছে না।’
‘ছাড়বে মশাই, ছাড়বে। এই যে একটা জোড়বাংলা শব্দ থেকে প্রথম রহস্যের সমাধান করে ফেললেন, এটাই বা কজন করতে পারে বলুন?’
ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করছিল। লালমোহনবাবুর কথা শুনে বলল, ‘সেটার কৃতিত্ব অবশ্য অনেকটাই ডেভিডের। হিতেন সান্যালের মুখে জোড়বাংলা শব্দটা শুনে আমার একটা প্রাথমিক খটকা লেগেছিল, কারণ এটুকু জানতাম যে টেরাকোটা মন্দিরগুলোর মধ্যে আটচালা যতটা জনপ্রিয়, জোড়বাংলা অতটাও নয়। তাই শুনে মনে হয়েছিল যে বেশ খানিকটা চর্চা বা পড়াশোনা না থাকলে এটা সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। কিন্তু জোড়বাংলা মন্দিরের গঠনশৈলী যে ঠিক কীরকম, সেটা ডেভিড না বোঝালে ওই সুড়ঙ্গের অস্তিত্ব আন্দাজ করা সম্ভব হত না।’
‘ডেভিডের কথায় মনে পড়ল ফেলুবাবু, অত সকালে উনি মন্দিরে কেন গেছিলেন?’
‘সেটা জানবার জন্যই তো সাতসকালে উশ্রী যাওয়া। ডেভিড বলেছিলেন উনি আমাকে মন্দিরের ব্যাপারে কিছু জানাতে চান, কী সেটা খুলে বলেননি। খালি বলেছিলেন আর্জেন্ট। তারপরেই তো ফিল্ম কিনতে…’
ফেলুদা থেমে গেছে, ‘আরে তাই তো! ফিল্ম যখন, ক্যামেরাটাও নিশ্চয় ছিল।’
ডেভিড ম্যাককালাম তাহলে ক্যামেরার ফিল্ম কিনতে মোহনপুর গেছিলেন!
ফেলুদা বলল, ‘আমি একবার চট করে থানায় ঘুরে আসি। খোলা থাকা উচিত, আর যদি বন্ধ নেহাত হয়ে যায় চুনিলালকে ফোন করব। পুলিশ কোনও ক্যামেরা পেয়েছে কি না জানতে হবে।’
ফেলুদা বেরোতে যাচ্ছে, আমাদের ঘরে সুধাংশুবাবু ঢুকলেন।
‘বেরোচ্ছেন নাকি প্রদোষবাবু? কাল সন্ধ্যা থেকে যা ঝঞ্ঝাট গেল, আমি এসেছিলাম আপনাদের সঙ্গে একটু সময় কাটাতে। মনটা বড়ো বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।’
‘আপনি বসুন। তপেশ আর লালমোহনবাবু রইলেন, আমার ফিরতে একটু দেরি হবে যদিও।'
'কিন্তু এত তড়িঘড়ি চললেন কোথায়?’
ফেলুদা দেখলাম সত্যি কথাটাই বলল, ‘ডেভিড ম্যাককালাম যখন মারা যান তখন সম্ভবত একটা ক্যামেরা ছিল ওঁর সঙ্গে। খোঁজ করা দরকার ক্যামেরাটা পুলিশের হস্তগত হয়েছে কি না।’
সুধাংশুবাবু অস্ফুটে কিছু একটা বললেন। মনে হল বললেন, ‘দুয়ো।’
ফেলুদা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বললেন?’
সুধাংশুবাবু তাড়াতাড়ি সামলে নিলেন নিজেকে, ‘না, এদের এই গা-ছাড়া ব্যাপারগুলো একদম পোষায় না, বুঝলেন! আপনার সঙ্গে এত কথা হল, আর ক্যামেরার মতন এত গুরুত্বপূর্ণ একটা এভিডেন্স নিয়ে কিছু বললই না। আচ্ছা, আপনি ঠিক জানেন উনি ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলেন?’
‘না, একটা স্পেকুলেশন মাত্র।’
ফেলুদা বেরিয়ে গেল। সুধাংশুবাবুকে যেন একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে।
লালমোহনবাবু সামান্য উশখুশ করেছিলেন। এবারে বলে বসলেন, ‘আপনি কি এককালে নাটক-টাটক করতেন?’
এবার সুধাংশুবাবুর অবাক হওয়ার পালা, ‘নাটক? কই না তো, কেন বলুন তো?’
লালমোহনবাবু একবার আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আসলে গত পরশু থেকে মনে হচ্ছে আপনাকে আগে যেন কোথাও দেখেছি। আমার আবার নাটক-টাটক দেখার ইয়ে, একটু শখ আছে কিনা। কেন জানি মনে হচ্ছিল স্টেজেই দেখেছি আপনাকে।’
‘না মশাই। ওই স্কুল-কলেজে থাকতে যা হয় আর কি, কখনও-সখনও স্টেজে উঠেছি। কিন্তু তার বাইরে নৈব নৈব চ।’
‘ওহ, আমারই ভুল। আসলে আপনার চেহারাটা হেঁ হেঁ, মানে বেশ দাগ কেটে যায় তো।’
সুধাংশুবাবুর মুখে এবারে একটু হাসি ফুটল, ‘তা চেহারার কথা যদি বলেন, এটা বংশগত। আমার বাবা আর দুই জ্যাঠাকে অবশ্য শুধু দেখতেই ভালো ছিল না, টুগেদার দে ওয়র অ্যান ইনডমিটেবল ফোর্স। লোকে ওনাদের বেশ সমঝে চলত।’
‘কী বলছেন মশাই, ব্যক্তিত্ব কি আপনারই কম নাকি? কাল ব্ল্যাকমেলের কথা যে মুহূর্তে শুনেছি তখন থেকেই…’
সর্বনাশ করেছে!
লালমোহনবাবু জিভ কেটে চুপ করে গেলেও যা ঘটার ছিল তাই ঘটল। সুধাংশুবাবুর মুখ অন্ধকার হয়ে এসেছে, ‘ব্ল্যাকমেলের কথা কী বলছিলেন?’
লালমোহনবাবুর ধরণী দ্বিধা হও অবস্থা! মেঝের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মাফ করবেন। আমি আসলে ভুল করে…’
সুধাংশুবাবুর মুখের অন্ধকার ভাবটা ধীরে ধীরে কেটে যাচ্ছিল। লালমোহনবাবুকে থামিয়ে বললেন, ‘আপনার লজ্জিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। কাল রায়বাড়ির বাগানে পাতার ওপর পায়ের আওয়াজ পেয়েছিলাম বটে। কিন্তু আপনারাই যে সেখানে ছিলেন সে কথা বুঝতে পারিনি। আসলে একটা সামান্য কথায় রণবীর যে অত উত্তেজিত হয়ে যাবে তাও বুঝতে পারিনি।’
লালমোহনবাবু আর আমার চোখাচোখি হল। আমি ইশারায় ভদ্রলোককে বললাম আর কোনও কথা না বলতে। সুধাংশুবাবু যে ভুল করে গতকালের ঘটনার কথা ভেবে নিয়েছেন, সেটা এক হিসাবে শাপে বর হতে পারে।
‘আসলে জানেন তো ওর ফ্যামিলি হিস্ট্রির অনেকটাই আমার জানা, যে কারণে রণবীরের আমাকে নিয়ে একটা ইনসিকিউরিটি চিরকালই ছিল।’
‘ইনসিকিউরিটি?’ লালমোহনবাবুর জড়তা কেটে গেছে।
‘সে তো বটেই। অক্সফোর্ডে গিয়ে বেলেল্লাপনা করার জন্য যে পড়াশোনাটাই শেষ হল না, সে কথা কি লোকসমাজে বলা যায়? বা ধরুন, পারিবারিক ব্যবসা যে ওর হাতে পড়ে ক্রমেই লাটে উঠে গেল, সেটাই বা জানে কজন?’
লালমোহনবাবুর মুখচোখ দেখে সুধাংশুবাবু বললেন, ‘আপনি হয়তো ভাবছেন এসব খবর আমার কাছেই বা এল কী করে! এসে যায় লালমোহনবাবু, ছোটো শহর। কতরকমের যে কথা উড়তে থাকে। আমি শুনি সবই, চট করে মুখ খুলি না। রণবীর রগচটা মানুষ, কবে একটা তর্কাতর্কির সময় মুখ ফসকে কিছু কথা বলে ফেলেছিলাম, সে রাগ আজও ওর যায়নি। আমি অবশ্য মাইন্ড করি না।’
সুধাংশুবাবু আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলে বিদায় নিলেন। ফেলুদার ফিরতে ফিরতে ভালোই রাত হল। জটায়ুর চোখমুখ উত্তেজনায় ফেটে পড়ছে দেখে বলল, ‘দাঁড়ান। একটু ফ্রেশ হয়ে আসতে দিন অন্তত।’
ফেলুদা চান করে এসে আরামকেদারায় বসা মাত্র লালমোহনবাবু আপডেট দিতে বসলেন। সব শুনে-টুনে ফেলুদা বেশ নির্বিকার চিত্তে একটা সিগারেট বার করে চারমিনারের প্যাকেটটার ওপর ঠুকতে লাগল।
জটায়ু অধৈর্য হয়ে পড়লেন, ‘কী মশাই? কিছু তো বলুন?’
‘গিরিডি যে রহস্যের খাসমহল, আপাতত এটুকুই যা বলার। কিপলিং-এর ভূতেদের দেখা না পেলেও কম রহস্যজনক ব্যাপার ঘটছে না!’
‘কিন্তু সুধাংশুবাবু…’
ফেলুদা বসা অবস্থাতেই সামনের দিকে ঝুঁকে এল, ‘সুধাংশবাবু কোনটা সত্যি বলছেন আর কোনটা মিথ্যা, সেটা চট করে ধরা যাবে না লালমোহনবাবু। তবে কিছু তথ্য, সে দরকারি হোক বা অদরকারি, আমাদের এখনও বলেননি।’
‘তুমি কি সেই খোঁজেই এত রাত অবধি ঘুরছিলে?’
ফেলুদা আবার আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিল, ‘তা বলতে পারিস। তবে এত দেরি হওয়ার একটা কারণ হল আমাকে মোহনপুর যেতে হয়েছিল।’
‘মোহনপুর? গতকাল যেখানে ডেভিড গেছিলেন?’
‘ঠিক ধরেছিস। কাল আমাকে যখন ডেভিড বলল ও ক্যামেরার ফিল্ম কিনতে মোহনপুর যাচ্ছে, আমি সামান্য অবাকই হয়েছিলাম। এই তো কাছেই মকৎপুর বাজার। সেটা বাদ দিয়েও আরও খান দু-এক বাজার আছে গিরিডি শহরের মধ্যে। তাহলে উজিয়ে মোহনপুর কেন, যেখানে যেতে আসতে সময় লেগে যাবে দেড় ঘণ্টার বেশি? আজ থানায় চুনিলাল তেওয়ারির কাছে ক্যামেরা দেখামাত্র বুঝতে পারলাম কেন।’
‘কেন ফেলুদা?’
‘কারণ ডেভিডের ক্যামেরাটি ভিন্টেজ, মোহনপুরের দোকানটার মতন স্পেশ্যালিস্ট না হলে এ ক্যামেরার ফিল্ম সাধারণ দোকানে পাওয়া যাবে না।’
‘কতটা ভিন্টেজ মশাই?’ শুধোলেন জটায়ু।
‘দোকানদার তো বলল এ ক্যামেরা চলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। পঞ্চাশের দশক থেকেই এর ব্যবহার কমে এসেছে, এখন তো বোধহয় পাওয়াই যায় না।’
আমার জানতে ইচ্ছে করছিল ক্যামেরার দোকান ছাড়া আর কোথায় গেছিল ফেলুদা। ওকে বলাতে একটা হাই তুলে বলল, ‘বৈষ্ণবসমাজ মন্দিরে। কিন্তু সেখানে উত্তর না এসে বরং প্রশ্ন বেড়ে গেল। কাল অগতির গতি সিধুজ্যাঠাকে ফোন না করে আর উপায় নেই। এবার আর না বকিয়ে ঘুমোতে যা।’
আর্কিটেকচার নিয়ে মাথা না ঘামালে মন্দিরে যে ফেলুদা ঢুঁ মারে না সে কথা বিলক্ষণ জানি। কিন্তু এই সন্ধ্যাবেলা, তাও আবার বৈষ্ণবসমাজ মন্দিরে? মাথামুন্ডু কিছুই বুঝছি না।
আমি শুতে যাওয়ার তোড়জোড় করছি, ফেলুদা আর-একটা হাই তুলে বলল, ‘ভালো কথা, তোর চেনা একজন লোককে দেখলাম।’
‘আমার চেনা! গিরিডিতে?’
‘হুঁ, কালকের সেই মক্কেল আজও পাকুড় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল।’
শুনে হার্টবিট বেড়ে গেল। কিন্তু ফেলুদা ওর নোটবুক টেনে নিয়েছে। অর্থাৎ, এখন আর ওকে বিরক্ত করা যাবে না।
৯
সকালে উঠে ফেলুদাকে দেখতে পেলাম না। সিধুজ্যাঠাকে ফোন করতে গেল, নাকি থানায়? বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও ওর টিকির দেখা পাওয়া গেল না। লালমোহনবাবুকে সঙ্গে নিয়ে ব্রেকফাস্ট টেবলে পৌঁছে দেখি সুধাংশুবাবু বসে আছেন। আমাদের দেখে একটা শুকনো হাসি হেসে গুড মর্নিং জানালেন।
‘তপেশ, তোমার দাদা কখন ফিরবেন?’
সুধাংশুবাবুকে বাধ্য হয়ে বলতে হল ফেলুদা কোথায় গেছে আমি জানি না। ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একবার গলা খাঁকরে বললেন, ‘আসলে ওনাকে একটা কথা বলার ছিল। একটু জরুরি বলতে পারেন।’
লালমোহনবাবু একবার আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনার নিতান্ত অসুবিধা না থাকলে আমাদের বলতে পারেন।’
‘না, অসুবিধা আর কী। আসলে জানেন, এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটে গেল, এমনিতেও গত কয়েকদিন মনমেজাজটা ভালো যাচ্ছে না…’
ভদ্রলোক কি ওঁর সঙ্গে রণবীর রায়ের কথা কাটাকাটির দিকে ইঙ্গিত করছেন?
‘তাই ভাবছিলাম আজ সন্ধ্যার ট্রেনে কলকাতা যাব, কয়েকটা দিনের জন্য চেঞ্জ অফ প্লেস দরকার। কিন্তু আপনারা আমার অতিথি হয়ে এসেছেন, তাই বুঝে উঠতে পারছি না কী করা উচিত।’
লালমোহনবাবু সামান্য হালকা মেজাজে বললেন, ‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন সুধাংশুবাবু, এরকম পরিস্থিতিতে আমাদেরও আর ঘোরার ইচ্ছা সেরকম নেই। কী বলো তপেশ?’
ভদ্রলোক কথাটা ঠিকই বলেছেন, কিন্তু ফেলুদার সঙ্গে একবার কথা বলে নিতে পারলে ভালো হত।
সুধাংশুবাবু অবশ্য মনে হল খানিক হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন, ‘আপনি বাঁচালেন। কথাটা পাড়তেও বড় অস্বস্তি হচ্ছিল। তবে আপনারা চাইলে স্বচ্ছন্দে পুরো ছুটি কাটিয়ে যেতে পারেন। কাজের লোকেরাও সবাই রইল, হিতেনও থাকবে, কোনোই অসুবিধা হবে না আপনাদের।’
লালমোহনবাবুও কথাটা ঘোরাতে চাইছিলেন। এবার ফুরসত পেয়ে বললেন, ‘আপনাকে কিন্তু দেখলে চট করে মৈত্রবাড়ির লোক বলে মনে হয় না।’
সুধাংশুবাবু একটূ ঘাবড়ে গেছেন, ‘তাই নাকি! কেন বলুন তো?’
লালমোহনবাবু এবার বৈঠকখানার দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সেই প্রথম দিন থেকে দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখছি তো। আপনাকে কিন্তু মশাই আপনার পূর্বপুরুষদের মতন একেবারেই দেখতে নয়। আমি অবশ্য ভরদ্বাজবাবুকে দেখিনি…’
‘আরে না মশাই’, সুধাংশুবাবু হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘এঁরা কেউই আমার পূর্বপুরুষ নন।’
এবার জটায়ুর ঘাবড়ানোর পালা, ‘বলেন কী! এনারা কে তাহলে?’
‘এঁরা সবাই গিরিডির কৃতী আবাসিক লালমোহনবাবু। ওপরের বাঁদিকে দেখুন, উনি হলেন সুধীররঞ্জন খাস্তগীর, দুন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন একসময়। তার পাশে তো বোধহয় প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে চিনতে পারছেন। প্রশান্তচন্দ্রের পাশে ওনারই শ্বশুর, আরেক বিখ্যাত অধ্যাপক হেরম্বচন্দ্র মৈত্র। আর মৈত্রমশাই-এর নিচে হলেন হেমেন বোস।’
“কার কথা বলছেন? সেই ‘কেশে মাখো কুন্তলীন, অঙ্গবাসে দেলখোস’?” ফেলুদা ফিরে এসেছে!
‘আরে আসুন আসুন প্রদোষবাবু’, সুধাংশুবাবু উঠে দাঁড়িয়েছেন, ‘হ্যাঁ, সেই হেমেন বোসের কথাই হচ্ছে। ওনার বিশাল বাংলো এই কাছেই, পি-ডব্লিউ-ডির মাঠ পেরোলেই দেখতে পাবেন।’
সুধাংশুবাবু সন্ধ্যার ট্রেনে কলকাতা যাবেন শুনে ফেলুদা অবাক, ‘সে কী! এদিকে আমি যে একবার রায়বাড়িতে যাব ভাবছিলাম সন্ধ্যাবেলায়।’
রায়বাড়িতে যেতে হবে শুনে সুধাংশুবাবু একটু চমকেই গেলেন, ‘রায়বাড়ি? কোনও বিশেষ দরকার ছিল কি?’
ফেলুদা শান্তস্বরে বলল, ‘তদন্তের কাজেই রণবীরবাবুকে কিছু প্রশ্ন করার ছিল।’
‘তদন্ত!’ সুধাংশুবাবু হাঁ হয়ে গেছেন।
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ, কোনও মক্কেল অবশ্য এ তদন্তের ভার আমাকে দেয়নি। কিন্তু ডেভিডের মৃত্যু আমাকে এতটাই ভাবিয়ে তুলেছে যে কয়েকটা জিনিস জানার আশু দরকার।’
সুধাংশুবাবুর গলা গম্ভীর, ‘ডেভিডের মৃত্যুরহস্যের সমাধান হলে আমিও যারপরনাই খুশি হব প্রদোষবাবু। গিরিডিতে এরকম খুনখারাপি আগে ঘটেছে বলে তো খেয়ালও পড়ে না। তবে আপনি হয়তো আপনার বন্ধুর মুখে শুনে থাকবেন যে রণবীরের সঙ্গে কয়েকদিন আগে আমার বেশ একটু কথা কাটাকাটি হয়। এরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে আমার হয়তো রায়বাড়িতে না যাওয়াই সমীচীন। তা ছাড়া কলকাতায় যাব বলে মনস্থির যখন করেই ফেলেছি, তখন আর প্ল্যান বদলানোর মানে হয় না।’
ফেলুদা একটা আরামকেদারায় বসে পড়ে মাথা নাড়ল, ‘আপনাকে অবশ্যই আমি জোর করব না। তবে সুধাংশুবাবু, আপনার কাছেও কয়েকটা প্রশ্ন ছিল যে!’
সুধাংশুবাবু অবাক হয়ে ফেলুদার দিকে তাকিয়ে রয়েছেন।
‘ওহ! আমিও তাহলে আপনার সন্দেহভাজনের তালিকায় আছি?’ সুধাংশুবাবুর গলায় একটা অস্থিরতা টের পাচ্ছি।
ফেলুদার বিশেষ কোনও তাপউত্তাপ না দেখিয়ে একটা চারমিনার ধরিয়েছে, ‘বসুন সুধাংশুবাবু। সন্দেহ নয়, শুধু কয়েকটা জট ছাড়াতে চাই। তাই আপনার সাহায্য দরকার।’
‘সাহায্য?’ ফ্যাকাশে হাসলেন সুধাংশুবাবু, ‘বেশ! বলুন কী জানার আছে আপনার?’
ফেলুদা একদৃষ্টিতে লক্ষ করছে সুধাংশুবাবু্কে, ‘আপনার লাইব্রেরি আমি বেশ ভালো করে দেখেছি সুধাংশুবাবু। আর্ট-হিস্ট্রি নিয়ে আপনার কালেকশন ঈর্ষণীয়। আর্ট-হিস্ট্রি নিয়ে আপনার এই উৎসাহের কোনও কারণ আছে কি?’
‘থ্যা-থ্যাঙ্কস’, ভদ্রলোক কপালের ঘাম মুছছেন, ‘আর্ট-হিস্ট্রি আমার নেশা বলতে পারেন।’
‘নেশা, নাকি পেশা?’ ফেলুদার গলার স্বর ধারালো হয়ে উঠেছে।
সুধাংশুবাবু চুপ।
‘আপনি যদি না বলেন তাহলে আমিই বলি। শান্তিনিকেতনে আপনি ডেভিড ম্যাককালামের সহকর্মী ছিলেন, তাই নয় কি? আমার বন্ধু শ্রী লালমোহন গাঙ্গুলি কাকতালীয়ভাবে আপনাকে আগেই চিনেছিলেন। গতকাল চুনিলালবাবু শান্তিনিকেতন থানায় খোঁজ নিয়ে আমার বন্ধুর ধারণাটি কনফার্ম করেছেন। কিন্তু শান্তিনিকেতনের সে চাকরি আপনার থাকেনি। কেন সুধাংশুবাবু?’
সুধাংশুবাবু একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেললেন, ‘সবই কপালের ফের প্রদোষবাবু। আবার ইন্ট্রিগ্রিটি রাখার খেসারতও বলতে পারেন। শান্তিনিকেতনে ডেভিডের শত্রু কম ছিল না! একজন সাহেব কী করে বাংলার শিল্পইতিহাস পড়াতে পারেন সে নিয়ে বহু প্রশ্ন উঠছিল। একমাত্র আমি ওর পাশে দাঁড়িয়েছিলাম সেসময়। তারই খেসারত দিতে হয়েছে আমাকে। কলকাতায় ডেভিডের বহু গুণমুগ্ধ ছিলেন, তাঁদের জন্য ডেভিডের চাকরি যায়নি। মাঝখান থেকে কাজে গাফিলতির অভিযোগ দেখিয়ে আমাকে বরখাস্ত করা হয়।’
ফেলুদার ভাব দেখে বুঝলাম ও সুধাংশুবাবুর কথাটা অস্বীকার করছে না। কিন্তু ওর প্রশ্ন এখনও শেষ হয়নি, ‘ডেভিড ম্যাককালামকে নিয়ে আমি যতটা জেনেছি তাতে তাঁকে অকৃতজ্ঞ বলে মনে হওয়ার কোনও কারণ নেই। অথচ সেই ডেভিড এখানে এসে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আপনিও এমন ভান করছিলেন যেন ডেভিডকে আপনি চেনেন না। ব্যাপারটা রহস্যজনক নয় কি?’
সুধাংশুবাবুর মুখে মৃদু একটা হাসি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল, ‘যোগাযোগ করেনি এ কথা কে আপনাকে বলল প্রদোষবাবু? এখানে এসে যোগাযোগ করেনি ঠিকই, কিন্তু যোগাযোগ করেই এসেছিল যে।’
ফেলুদার ভুরু কুঁচকে উঠেছে।
‘তার মানে হিতেন সান্যালের জালিয়াতির ব্যাপারে আপনি জানতেন?’
সুধাংশুবাবুকে কিছুটা বিমর্ষ দেখাল, ‘অবশ্যই! ডেভিডই খবর দিয়েছিল, এবং সে-ই বারণ করেছিল এ ব্যাপারে কোনও কথা আগে থেকে না বলতে। যে কারণে আমরা দুজনে মিলে ঠিক করি আমাদের পূর্বপরিচিতির ব্যাপারটা গোপন রাখতে হবে। হিতেন যে এরকম কিছু করতে পারে এ আমার ধারণার অতীত ছিল প্রদোষবাবু।’
ফেলুদা কথা বন্ধ করে কিছু একটা ভাবছে।
‘আমি কি উঠতে পারি? যাওয়ার আগে কিছু কাজকর্ম শেষ করার দরকার ছিল। আর হ্যাঁ, আমি কিন্তু মাস্টার তপেশ আর লালমোহনবাবুকে বলে রেখেছি– গিরিডির ছুটিটা আপনাদের মাঠে মারা যাওয়ার কোনও কারণ নেই। আপনারা যতদিন ইচ্ছে এখানে থেকে যান।’
ফেলুদা হাসল, ‘ডেভিডের খুনিকে না ধরতে পারা অবধি আর ছুটি নেই সুধাংশুবাবু।’
সুধাংশুবাবু উঠতে যাচ্ছিলেন, ফেলুদা বলল, ‘একটা শেষ প্রশ্ন। আপনাকে কি সম্প্রতি কেউ ব্ল্যাকমেল করছিল?’
সুধাংশুবাবু উঠতে গিয়েও বসে পড়লেন। মুখে সামান্য অসহিষ্ণুতার ছাপ, ‘সেই কথাই তো হচ্ছিল মিত্তিরমশাই। রণবীর রায়…’
ফেলুদা হাত তুলে বাধা দিল, ‘রণবীরবাবুর প্রসঙ্গ টানছি না। আপনি কি কোনও হুমকি দেওয়া চিঠি পেয়েছিলেন?’
সুধাংশুবাবু অবাক, ‘আপনাকে সে কথা কে বলল! হ্যাঁ, ট্যারাব্যাঁকা হাতের লেখায় একটা চিঠি এসেছিল বটে। তার মাথামুন্ডু আমি বুঝিনি। পড়া মাত্রই ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। আপনি জানেন কে সে চিঠি পাঠিয়েছিল?’
ফেলুদা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল দুদিকে।
এই সময় সুধাংশুবাবুর কাজের লোক ঘরে ঢুকল, হাতে একটা মস্ত বড় খাম, ‘বাবু, ইন্সপিক্টর সাহিব নে ভেজা হ্যায়।’
ফেলুদা খামটা নিয়ে উঠে পড়ল, ‘তোপসে-লালমোহনবাবু, একটা পাজল সলভ করতে হবে। ঘরে চল।’
সুধাংশুবাবুও উঠে দাঁড়ালেন, ‘আমিও এবারে আসি প্রদোষবাবু। আপনারা যদি ফিরেই যান তাহলে সম্ভবত কলকাতাতেই দেখা হবে আবার।’
১০
আমাদের বিছানায় এখন ছবির ছড়াছড়ি। ডেভিড ম্যাককালামের ক্যামেরার ফিল্ম নেগেটিভগুলো ছেপে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চুনিলাল তেওয়ারি ফেলুদার জন্য পাঠিয়ে দিয়েছেন।
‘কী ঢাউস সব ছবি মশাই। ভাবা যায়, ওইটুকু ছোটো ক্যামেরা থেকে এত বড় বড় প্রিন্ট বেরোচ্ছে!’
ফেলুদা ছবিগুলো সাজাচ্ছিল, লালমোহনবাবুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডেভিডের ক্যামেরার বিশেষত্বই যে সেটা। কোডাক-ডুয়ো ক্যামেরা বানানোই হয়েছিল বড় প্রিন্ট বার করার জন্য, এতটাই বড় যে খুঁটিয়ে দেখার জন্য ম্যাগনিফাইং গ্লাস না হলেও চলবে। বুঝতেই পারছেন ডেভিডের মতন আর্ট-হিস্টোরিয়ানদের জন্য কী কাজের একটা জিনিস।’
ক্যামেরার নামটা শোনামাত্র ধাঁ করে একটা কথা মাথায় এল। বলব কি বলব না করতে করতে ফেলুদাকে বলেই ফেললাম।
‘সুধাংশুবাবু মনে হয় ডেভিডের এই ক্যামেরাটাকে চিনতেন।’
ফেলুদা ছবিগুলোর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল। আমার কথা শুনে একবার আড়চোখে তাকিয়ে বলল, ‘সেটা হতেই পারে, দুজনে এতদিন ধরে একে অপরকে চিনত। কিন্তু তুই বুঝলি কী করে?’
“তোমার মনে আছে, গতরাতে তুমি যখন ক্যামেরার কথাটা তুলেছিলে উনি চমকে গিয়ে কিছু একটা বলেছিলেন। আমি শুনেছিলাম ‘দুয়ো’, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে…”
ফেলুদা এবার সটান আমার দিকে তাকিয়েছে ‘সাব্বাশ তোপসে! এটা মোক্ষম ধরেছিস। হ্যাঁ, উনি নির্ঘাত এই ক্যামেরাটার কথাই বলছিলেন– ডুয়ো।’
আমার মনের মধ্যে তাও একটু খচখচ করছিল। ভদ্রলোক কি কিছুটা চমকেও উঠেছিলেন ক্যামেরার কথা শুনে? কে জানে!
‘কিন্তু পাজলটা কী ফেলুবাবু?’
‘আপনার মনে আছে লালমোহনবাবু, মন্দির দেখতে গিয়ে আপনাদের টেরাকোটার কাজগুলো দেখাচ্ছিলাম।’
‘হ্যাঁ মশাই! মনে আবার থাকবে না? সেই পোড়ামাটি?’
‘ঠিক। তাহলে এটাও নিশ্চয় মনে আছে যে পোড়ামাটির টাইলসগুলো সব জ্যামিতিক প্যাটার্নে বসানো। আমাদের কাজ হচ্ছে সেই নকশাগুলো এইসব ছবি থেকে খুঁজে বার করা। আমার ধারণা ডেভিড ম্যাককালাম নিজেও সেই কাজটা করতে চেয়েছিলেন এত ছবি তুলে রেখে।’
‘কিন্তু কেন বলুন তো?’ লালমোহনবাবু এবার কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়েছেন। সেটা ছবির সংখ্যা দেখে না রহস্যের উত্তর মিলছে না বলে, সেটা অবশ্য ঠিক বোঝা গেল না।
‘সাজাতে শুরু করুন। ঠিক বুঝতে পারবেন।’
একশোর কাছাকাছি প্রায় ছবি, ঠিকমতন সাজিয়ে উঠতেই বেশ কয়েক ঘণ্টা চলে গেল। অবশ্য ফেলুদা না থাকলে আমরা হয়তো নকশাগুলো বুঝেই উঠতে পারতাম না।
‘কী বুঝছিস তোপসে?’ ফেলুদার স্বর গম্ভীর।
ও ঠিকই বলেছিল, ছবিগুলো সাজানোর পরপরই রহস্যটা ঠিক চোখের সামনে ভেসে উঠল।
জ্যামিতিক নকশাগুলো মোটের ওপর টিকে থাকলেও একাধিক জায়গা স্রেফ ফাঁকা। কেউ সেই ইটগুলো তুলে নিয়েছে।
লালমোহনবাবুও দেখতে পেয়েছেন, ‘কিন্তু ফেলুবাবু, মন্দিরের বাইরে তো কিছু নজর পড়ল না সেদিন।’
‘কারণ অধিকাংশ ছবিগুলো মন্দিরের ভেতরের’, ফেলুদা ঝুঁকে পড়ে ছবিগুলো দেখছে, ‘ছবিগুলোয় আলোর ব্যবহারটা দেখুন। স্পষ্টতই ক্যামেরার ফ্ল্যাশ ছাড়া এ ছবি ওঠে না।’
‘কিন্তু এই ইটগুলোয় কী ছিল ফেলুদা?’
ফেলুদা পায়চারি করতে শুরু করেছে, ‘আমার ধারণা যে ইটগুলো তোলা হয়েছে তার প্রত্যেকটিতেই খোদাই করা আছে হয় পৌরাণিক বা ঐতিহাসিক কোনও কাহিনিচিত্র। শিবের মন্দির যখন, শিবের ছবি খোদাই থাকাও অসম্ভব নয়। জ্যামিতিক নকশা তুলতে গেলে অনেক কটা ইট তুলতে হত, ফলে ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। কিন্তু মন্দিরের ভেতরের দেওয়াল থেকে খুবলে খুবলে নির্দিষ্ট কয়েকটি ইট তুললে কে আর দেখতে যাবে? ওই যে কিপলিং লিখেছিলেন না, গোটা অঞ্চল জুড়েই ভূতের গল্প শোনা যায়, আমার ধারণা ওই ভৌতিক পরিবেশের পূর্ণ ফায়দা তুলেছে এই অপরাধী।’
আমার আর লালমোহনবাবুর মাথায় যে একই প্রশ্ন ঘুরছে সেটা ফেলুদা আন্দাজ করতে পারছিল।
‘এবার প্রশ্ন থাকে একটাই। কে এই দুষ্কৃতী? কোনও সন্দেহ নেই যে ডেভিডের খুনটিও সম্ভবত সেই লোকটিই ঘটিয়েছে।’
বলতে বলতেই দেখলাম ফেলুদা ঝটিতি ছবিগুলো খামের মধ্যে ঢোকাতে শুরু করেছে, ‘চ তোপসে, চলুন লালমোহনবাবু। অপরাধীর সুলুকসন্ধান এখন একজন লোকই দিতে পারে।’
বারগণ্ডার এই দিকটার অবস্থা বেশ পড়তির দিকে। খান দুই বড় বাড়ির বিশাল থামগুলো দেখলাম ভেঙে পড়েছে; যত্রতত্র আবর্জনা, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা চায়ের দোকান সবই চোখে পড়ল। গলিগুলোও বেশ সরু, এবং সেসব গলিতে লোকের বাস কম নেই।
লালমোহনবাবু বলেই ফেললেন, ‘মশাই, সেই ছড়াটা মনে পড়ে গেল- ‘অলিগলি চলি রাম, ফুটপাথে ধুমধাম।’
ফেলুদা একটা তিনরাস্তা থুড়ি তিনগলির মুখে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছিল, তারপর বাঁদিকে কিছু একটা চোখে পড়তেই ওর চোখ নেচে উঠল, ‘ঠিক! আর কালি দিয়ে না হলেও যে বাড়িটা মোটের ওপর সদ্য চুনকাম হয়েছে ওখানেই আমরা যাব।’
সাদা একতলা বাড়ি, টিনের চালা। সে বাড়ির একটু আগেই একটা চায়ের দোকান। আমরা দোকানটা পেরোতে যাব, শুনতে পেলাম, ‘মিস্টার মিটার?’
রোদচশমা পরা যে ভদ্রলোক ডেকেছেন তিনি নিজেই এগিয়ে এলেন। এসে হিন্দিতে যা বললেন তার অর্থ হল, পাখি বাড়িতেই আছে, উড়ে যায়নি। ইনি যে চুনিলালের লোক, তা বুঝতে ভুল হওয়ার কথা নয়।
আমি ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম কার বাড়িতে ঢুকতে চলেছি। কিন্তু কড়া খটখটানির আধ মিনিটের মধ্যে যিনি দরজা খুললেন তিনি সম্ভবত আমাদের এক্সপেক্ট করেননি। হিতেন সান্যাল প্রায় ভূত দেখার মতন চমকে উঠলেন, ‘আপনারা!’
‘আসতেই হল হিতেনবাবু। আপনার মিথ্যে কথা যে শেষ হচ্ছে না।’
হিতেন সান্যাল দু-পা পিছিয়ে গেছেন, ‘আজ্ঞে, সেদিনের পর আর কোনও কথাই তো হয়নি।’
ফেলুদা ঢুকে দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছে, ‘যে চিঠি সুধাংশুবাবু পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছিঁড়ে ফেলেছেন, তা আপনার হাতে আসে কী করে হিতেনবাবু?’
হিতেন সান্যাল ধপ করে তক্তপোশের বসে পড়লেন, মুখটা প্রায় রক্তশূন্য।
‘চিঠির কথা আপনাকে কে বলেছিল হিতেনবাবু?’
হিতেন সান্যাল মাথা নাড়লেন, ‘কেউ বলেনি প্রদোষবাবু! ও চিঠি আমারই লেখা।’
ফেলুদা যেন ভূত দেখেছে, ‘আপনার লেখা? আপনিই ব্ল্যাকমেল করছিলেন সুধাংশুবাবুকে!’
‘ব্ল্যাকমেল নয় প্রদোষবাবু! শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম। যাতে জাতীয় সম্পত্তি বাঁচাতে পারি।’
ফেলুদাও এবার হিতেন সান্যালের পাশে বসে পড়েছে, ‘আর সেই কারণেই আপনি আমাকেও ওই চিঠির কথা বলেছিলেন!’
‘হ্যাঁ, আমার চিঠিতে তো কোনও কাজের কাজ হয়নি। তাই ভাবলাম যদি আপনাকে চিঠির কথাটা বললে কিছু কাজ হয়!’
‘হোয়াট আ ফুল আই অ্যাম! হিতেনবাবু, পরের বার দেশের সম্পত্তি বাঁচাতে চাইলে গোয়েন্দার সঙ্গে অন্তত হেঁয়ালি করবেন না, কেমন?’
হিতেনবাবু মাথা নামিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে, ‘আমি দুঃখিত প্রদোষবাবু। আপনি সুধাংশুবাবুর অতিথি, প্রথম দিনেই কি এসব কথা বলা যায়! যদিও আপনি ওই চিঠির ব্যাপারে আর উচ্চবাচ্য করলেন না দেখে আমাকে অন্য একজনকে সব কথা চিঠি লিখেই বলতে হয়েছে।’
ফেলুদার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে ও প্রচণ্ড উত্তেজিত হয়ে পড়েছে, ‘কার কথা বলছেন আপনি?’
‘যার পূর্বপুরুষের জমিতে টেরাকোটার মন্দির গড়ে উঠেছে।’
‘অর্থাৎ রণবীর রায়!’ ফেলুদা রগ ধরে আছে। শিরাগুলো দপদপ করছে।
এবার হিতেন সান্যালের অবাক হওয়ার পালা, ‘আপনি জানেন?’
‘হ্যাঁ হিতেনবাবু। আমাকেও রিসার্চ করতে হয়েছে বইকি! রণবীর রায়ের পূর্বপুরুষরাই যে শ্রীরামপুরের রাজা ছিলেন সে কথা আমি জানি। রায়বাড়ির বৈঠকখানার ওই বিশাল বিশাল ঝাড়বাতি যে কোনও রাজবাড়ি থেকেই এসেছে সে কথা আমার প্রথম দিনেই মনে হয়েছিল।’
‘রণবীরবাবু তাহলে জানেন টেরাকোটার ইটগুলো তুলে নেওয়া হয়েছে?’ এবার প্রশ্নটা এল লালমোহনবাবুর দিক থেকে। তাকিয়ে দেখি উত্তেজনার চোটে ভদ্রলোকের চোখের পলক অবধি পড়ছে না।
হিতেন সান্যাল ভীষণ অবাক হয়ে তাকালেন, ‘টেরাকোটার ইট? কই সে ব্যাপারে তো কিছু জানি না।’
‘আপনি তাহলে কোন চুরির কথা বলছেন হিতেনবাবু?’ ফেলুদার গলায় প্রবল উত্তেজনা।
‘আমি বলছি টেরাকোটার বিষ্ণুমূর্তির কথা!’
‘যে বিষ্ণুমূর্তি এসেছে জোড়বাংলার ধ্বসে যাওয়া দ্বিতীয় মন্দির থেকে!’ ফেলুদা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আজ সকালে এই মন্দিরের কথাই সিধুজ্যাঠা জানিয়েছিলেন আমাকে। গিরিডির জোড়বাংলা মন্দিরের এক অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য, প্রথম মন্দিরে শিবলিঙ্গ থাকলেও ভেঙে পড়া দ্বিতীয় মন্দিরে করা হত বিষ্ণুর উপাসনা। আর সেই কারণেই সে মন্দিরের দেওয়াল জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছিল অনন্যসুন্দর বিষ্ণুমূর্তি, সেও টেরাকোটায় তৈরি। বছর একশো-দেড়শো আগে অবধি এই মন্দিরকে তাই হরিহরের মন্দির বলে ডাকত লোকে।’
ফেলুদা এবার হিতেন সান্যালের দিকে ঘুরে বসল, ‘আর কলকাতায় বসে সিদ্ধেশ্বর বোস যা থেকে বিষ্ণুমন্দিরের কথা জেনেছেন, গিরিডিতে বসে আপনিও বোধহয় সেই লেখাতেই বিষ্ণুমূর্তির কথা জেনেছেন। আসল হিতেন্দ্রনাথ সান্যালের লেখা প্রবন্ধ, তাই না?’
হিতেন সান্যাল চুপ করে আছেন।
‘আপনিও লোভে পড়ে সেই মূর্তির সন্ধানেই গেছিলেন, নয় কি? গিয়ে দেখলেন মূর্তি ভ্যানিশ!’
হিতেন সান্যাল নড়ে উঠেছেন, ‘ভ্যানিশ নয় প্রদোষবাবু, সে মূর্তি যে আমি দেখেছি। ভোররাতের অন্ধকারেও সেই প্রায় বুজে যাওয়া সুড়ঙ্গের মধ্যে চোরকে চিনে নিতে ভুল হয়নি আমার।’
ফেলুদা তড়িৎগতিতে উঠে দাঁড়িয়েছে, ‘কিন্তু, সে মানুষ তো শুধু চোর নয়, সে খুনিও বটে! কেশে মাখো কুন্তলীন, অঙ্গবাসে দেলখোস…। আপনার ফোনটা কোথায় হিতেনবাবু?’
লালমোহনবাবু হতভম্ব, আমাকে ফিসফিস করে বললেন, ‘তোমার দাদা কি পাগল হয়ে গেলেন তপেশ? হেমেন বোস আবার কোথা থেকে এলেন?’
সে প্রশ্নের উত্তর আমিও জানি না।
ফেলুদার ফোন করা হয়ে গেছে। ভেতরের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘ক্যুইক তোপসে, মৈত্রবাড়ি পৌঁছতে হবে যত শীঘ্র সম্ভব।’
১১
হিতেন সান্যালের বাড়ি থেকে মৈত্রবাড়ি বেশি দূর নয়, হেঁটে হয়তো মিনিট পনেরোর রাস্তা। দৌড়োলে হয়তো সাত-আট মিনিট লাগত। কিন্তু গলি থেকে বড়রাস্তায় পড়তেই একটা রিকশা পাওয়া গেল, আর সেটা না পেলে জটায়ুকে অ্যাডভেঞ্চারের শেষ ভাগে দেখা যেত না।
রিকশা থেকে পড়ি কি মরি করে নামতে না নামতেই দেখি গেটের সামনেই লালমোহনবাবুর গাড়ি। হরিপদবাবু গাড়ির জানলা দিয়ে মুখ বার করে ডাকছেন, ‘শিগগির আসুন স্যার, একটু আগেই গাড়ি বেরিয়ে গেছে।’
কোন গাড়ির কথা বলছেন হরিপদবাবু? সুধাংশুবাবুর গাড়ি তো কাজ করছে না, চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছি পোর্টিকোর নিচে সে গাড়ি দাঁড়িয়ে। আর হরিপদবাবুই বা কী করছেন এখানে?
‘এবারের গল্পটা যখন লিখবি, হরিপদবাবুকে একটা গ্র্যান্ড থ্যাংক ইউ দিতে ভুলিস না’, গাড়িতে উঠতে উঠে বলল ফেলুদা।
আমি ভ্যাবাচাকা খেয়ে তাকিয়ে আছি দেখে ফেলুদা হেসে ফেলল, ‘এই কদিন যে টানা গেটের বাইরে থেকে নজর রাখছিলেন সেটার কোনও দাম নেই? আমি যদিও হরিপদবাবুকে খেয়াল রাখতে বলেছিলাম হিতেন সান্যালের ওপর, কখন ঢুকছেন, কখন বেরোচ্ছেন সেগুলো জানা দরকার ছিল। ওই প্রথম দিনের জোড়বাংলা রেফারেন্সের পর থেকেই ওঁর প্রতি একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। আর রায়বাড়িতে কথা কাটাকাটির পর সুধাংশুবাবুর প্রতিও একটা সন্দেহ তৈরি হয়েছিল বটে।’
হরিপদবাবু উশ্রীর দিকে যাচ্ছেন দেখে ফেলুদা অবাক, ‘গাড়ি ধরমপুর-জামতাড়া হাইওয়ের দিকে যায়নি?’
‘না স্যার, সামনে টায়ারের দাগ দেখুন। মনে হয় পচম্বার দিকে যাচ্ছে।’
একে নতুন গাড়ি, তার ওপর হরিপদবাবু এত জোরে চালাচ্ছিলেন যে মিনিট সাতেকের মধ্যেই সেই গাড়িকে সামনে দেখা গেল।
‘ও মশাই!’ এত স্পিডে গাড়ি চলছিল যে লালমোহনবাবু বিশেষ কথাবার্তা বলছিলেন না, কিন্তু সামনের গাড়িটাকে দেখে উনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না।
আমি জানি ভদ্রলোক কেন অবাক হয়েছেন। সামনে দেখা যাচ্ছে রণবীর রায়ের সেই ফিটন গাড়ি!
হরিপদবাবু প্রায় ধরে ফেলতে চলেছেন দেখে গাড়িটা এবার মেন রোড ছেড়ে উশ্রীর বালির ওপর নেমে পড়েছে।
ফেলুদা দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ‘গাড়ির ব্রিজে উঠতে পারবে না বুঝতে পেরে এবার তারের পুল দিয়ে জঙ্গলে ঢুকে যাওয়ার মতলব।’
ফেলুদা ঠিকই বলেছে। আর-একটু এগোতেই দেখা গেল ফিটন গাড়িটা উশ্রীর ধারে দাঁড় করিয়ে গাড়ির চালক প্রাণপণে তারের পুলের দিকে দৌড়ে চলেছে। হাতে একটা মস্ত স্যুটকেস।
আমরা গাড়ি থেকে বেরিয়ে দৌড়োতে শুরু করতে করতে সে মানুষটা পুলের ওপরে উঠে পড়েছে। ফেলুদার কথায় হরিপদবাবু গাড়ি ঘুরিয়ে সোজা রওনা দিলেন থানার দিকে।
লালমোহনবাবু হাঁফ ধরে যাওয়া গলায় বললেন, ‘তোমার দাদা যন্তরটা সঙ্গে করে এনেছেন নাকি তপেশ? না হলে একে থামাব কী করে? উশ্রীর ওদিকে গেলেই তো ঘন জঙ্গল।’ আমার মনেও সেই একই প্রশ্ন। আমি যতদূর জানি ছুটি কাটাতে আসছে বলে ফেলুদা এবারে ওর পিস্তলটা সঙ্গে আনেনি। তাহলে কি পাথর ছুড়বে নাকি দৌড়েই ধরতে চায়?
ফেলুদা অবশ্য দুটোর কোনোটাই করল না, উলটে পুলের সামনে গিয়ে দুদিকের তার দুটো ধরে প্রবল ঝাঁকাতে শুরু করল। অন্য মানুষটা পুলের প্রায় শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছে, কিন্তু প্রবল ঝাঁকুনির ফলে আর এগোতে পারছে না। আমি ফেলুদার কাছে পৌঁছোতে আমাকে বলল, ‘তার দুটো ঝাঁকাতে থাক। যতক্ষণ না ওদিকে পৌঁছোচ্ছি, থামিস না।’
খুব বেশিক্ষণ অবশ্য ঝাঁকাতে হলও না। সেই মানুষটা পুলের ওপরেই বসে পড়েছে।
লালমোহনবাবু আর আমি যতক্ষণে পৌঁছোলাম, ফেলুদা ততক্ষণে স্যুটকেসটা খুলে ফেলেছে। স্যুটকেস থেকে বেরিয়ে এসেছে এক অপূর্ব মূর্তি। না, একটা মূর্তি বললে ভুল বলা হবে। দশখানা মূর্তি একটা চালের মধ্যে খোদাই করা। আমি এই মূর্তিগুলো চিনি– মৎস্য, কূর্ম, বরাহ, নৃসিংহ…
‘আপনি ভুল করছেন প্রদোষবাবু। এই দশাবতার মূর্তি আমার পৈতৃক সম্পত্তি।’ হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন সুধাংশু মৈত্র।
‘ভুল আমি নই সুধাংশুবাবু, করছেন আপনি। আশা করি আমার বন্ধু, আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রও ভবিষ্যতে একই কথা বলবে। দ্বিতীয় মন্দির যদি আপনার পূর্বপুরুষের টাকায় বানানো হয়েও থাকে, তাহলেও এই মূর্তি মন্দির থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার কোনও অধিকার আপনার নেই সুধাংশুবাবু। আর অপরাধ তো আপনার একটা নয় সুধাংশুবাবু, অপরাধ যে অনেকগুলো। খুন…’
উশ্রীর স্রোতের তীব্রতা বাড়ছে, সুধাংশুবাবু সেদিকেই তাকিয়ে ছিলেন। ফেলুদাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এবার ক্লান্ত স্বরে বলে উঠলেন, ‘ডেভিডকে খুন আমি করিনি। আমি জানি না কোথা থেকে এত আজগুবি কথার আমদানি করছেন আপনি।’
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘খুন হয়তো করেননি আপনি। কিন্তু খুনের সময় যে সেখানে ছিলেন আপনি। আপনি খুনির দোসর, খুনির স্যাঙাত।’
সুধাংশুবাবুর চোখ জ্বলছে।
‘আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারলেও নাককে দিতে পারেননি সুধাংশুবাবু। হেমেন বোসের কোম্পানির এসেন্সগুলো কি আপনার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া? এই এসেন্সের গন্ধ যে অন্য কোথাও পাওয়া যায় না মিস্টার মৈত্র। যে গন্ধ এই মুহূর্তে আপনার পোশাক থেকে আসছে, ঠিক সেই একই গন্ধ যে খুনের দিন মন্দিরের ভেতরেও পেয়েছিলাম।’
তাই তো! এ যে সেই মিষ্টি গন্ধ যা আমি আর লালমোহনবাবু রায়বাড়ির বাগানে পেয়েছিলাম।
লালমোহনবাবু পুলে ওঠা ইস্তক সামান্য আড়ষ্ট হয়েছিলেন, বোধহয় পুলটা তখনও একটু একটু দুলছিল বলে। এবার এক দিকের তারটা প্রায় আঁকড়ে ধরে থেকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সবই তো বুঝলাম। কিন্তু খুনটা তাহলে কে করল ফেলুবাবু?’
ফেলুদা সুধাংশু মৈত্রকে দাঁড় করাতে করাতে বলল, ‘চিন্তা নেই লালমোহনবাবু। হিতেন সান্যালের বাড়ি থেকে আমি চুনিলাল তেওয়ারিকে ফোন করেছিলাম। খুনির পালানোর সুযোগ নেই। আর চোরাই মাল তারও তো কম নেই। ‘
ফেলুদা পুল থেকে নেমে এবার ফিটনের দিকে তাকিয়ে আছে।
‘সুধাংশুবাবু, আপনি হয়তো জানেন না যে গাড়ি নিয়ে আমার একটু আধটু চর্চা আছে। রণবীর রায়ের বাড়িতে শেভ্রোলের এই মডেলটা দেখেই আমার একটা সন্দেহ হয়েছিল। আজ আর কোনও সন্দেহই নেই। এ বোধহয় শেভ্রোলের হাতে গোনা সেই কয়েকটা মডেলের একটা, যাতে এক্সটেনশন ট্রাঙ্ক রয়েছে। ঠিক বলছি তো?’
সুধাংশুবাবু নিরুত্তর।
‘ট্রাঙ্ক? গাড়ির কোম্পানি ট্রাঙ্কও দেয় বুঝি?’ জটায়ু ভালোই অবাক হয়েছেন।
‘ট্রাঙ্ক মার্কিনি শব্দ লালমোহনবাবু। ডিকি বোঝেন তো, গাড়ির ডিকি? এই গাড়িতে যে ডিকি দেখতে পাচ্ছেন সেটা ছাড়াও যে একটা গোপন ডিকি আছে।’
‘বলেন কী!’
ফেলুদা হাত বাড়াতে সুধাংশুবাবু বিনা বাক্যব্যয়ে একটা চাবি তুলে দিলেন ওর হাতে। বিশাল ফিটনের ডিকিটাও বিশাল। আর খুব খেয়াল করে না তাকালে বোঝা সম্ভব নয় যে ডিকির মধ্যেই রয়ে গেছে একটা ছোটো ক্যাবিনেট। ফেলুদা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সুধাংশুবাবুর চাবি দিয়ে সেই ক্যাবিনেট খুলে ফেলেছে।
আর সেই ক্যাবিনেটের মধ্যে সার দিয়ে রাখা বস্তুগুলোকে এক ঝলক দেখেই বলে দেওয়া যায় যে ডেভিড ম্যাককালামের ক্যামেরা এদেরকেই খুঁজে পায়নি। একের পর এক টেরাকোটা টাইল। দূর থেকেও বেশ বুঝতে পারছি একদম ওপরের টাইলে শিব আর পার্বতীর বিয়ে দেখানো হয়েছে, শিবের পায়ের নিচে নন্দী-ভৃঙ্গী বসে।
‘জয় বাবা গিরিরাজ’, দুহাত জড়ো করে পেল্লায় একটা প্রণাম ঠুকলেন লালমোহন গাঙ্গুলি, ‘শিবের নামেই গিরিডির নাম নাকি মশাই?’
‘গিরি থেকেই গিরিডি, কিন্তু শ্বশুর আর জামাইয়ের আইডেন্টিটি বদলাবদলি করে দিলে আপনার পুণ্যের ভাগে কিছু কম পড়তে পারে লালমোহনবাবু।’
১২
হিতেন সান্যালের বাড়ি থেকে ফেলুদার ফোন পেয়েই চুনিলালের লোকেরা রায়বাড়ির ওপরে নজর রাখতে শুরু করেছিল। সুধাংশু মৈত্রকে বমাল ধরার পর রণবীর রায়কেও গ্রেপ্তার করতে আর বেশি সময় লাগেনি।
চুনিলাল তেওয়ারির মুখটা দেখে মনে হচ্ছিল উনি কিছুটা আপসেট। ফেলুদা জিজ্ঞাসা করাতে বললেন, ‘গিরিডির এতদিনের বাসিন্দা দুজনেই। এরকম বনেদি বাড়ির লোক সব। তারাও যে এরকম জঘন্য সব অপরাধ করতে পারে, কে বিশ্বাস করতে পারে বলুন।’
ফেলুদা একটা একপেশে হাসি হেসে বলল, ‘গিরিডির অবস্থা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে এঁদেরও অবস্থা পড়েছিল, সন্দেহ নেই। তবে লোভের মোটিভ যে চিরন্তন। আর এই কেসে ক্রস-কানেকশনের একটা বিশেষ ভূমিকা আছে।’
‘ক্রস-কানেকশন?’
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘হিতেন সান্যালের সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত করতে ডেভিড গিরিডি এসেছিলেন। এদিকে মন্দির ঘুরতে গিয়ে ডেভিডের মনে সন্দেহ জেগে উঠল, একাধিক জায়গায় দেখতে পেলেন টেরাকোটার টাইল কেউ বা কারা তুলে নিয়ে গেছে। এখন কাকে উনি এই সন্দেহের কথা বলতে পারেন?’
চুনিলালের ভুরু কুঁচকে উঠেছে, ‘সুধাংশুবাবু?’
‘একজ্যাক্টলি সো, মিস্টার তেওয়ারি! একে সুধাংশু ওঁর প্রাক্তন সহকর্মী, তার ওপর ডেভিড জানতেন রণবীর রায়ের পূর্বপুরুষের জমিতেই গড়ে উঠেছিল এই মন্দির। ডেভিড ভেবেছিলেন রণবীরের থেকে সুধাংশুকে জানানোই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। যেটা ডেভিড কেন, আমরা কেউই জানতাম না, যে, শুধু শ্রীরামপুরের রায়বাড়ি নয়, ঢাকার মৈত্রবাড়ি থেকেও পয়সা এসেছিল এই মন্দির গড়ে তুলতে। মৈত্ররা ছিলেন বৈষ্ণব, যে কারণে জোড়বাংলার দ্বিতীয় মন্দিরে বিষ্ণু-উপাসনা হত।’
আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘গিরিডির ওই বৈষ্ণবসমাজের প্রতিষ্ঠাতা কি এই মৈত্ররাই?’
‘না, এ হল গৌড়ীয় বৈষ্ণবসমাজ। অর্থাৎ গৌড়বাংলা, সম্ভবত নবদ্বীপের বৈষ্ণবরা এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা। আমার মনে ছিল বিষ্ণুপুরের যে বিখ্যাত জোড়বাংলা মন্দির আছে তা বিষ্ণুমন্দির। গিরিডিতে বৈষ্ণবসমাজ আছে দেখে ভাবছিলাম তারা এখানকার জোড়বাংলা মন্দির নিয়ে কিছু জানে কি না। গিয়ে দেখলাম কেউই কিছু জানে না, তবে শুনলাম সুধাংশুবাবু বৈষ্ণবসমাজের অন্যতম সম্মাননীয় সদস্য।’
মনে পড়ল ফেলুদা বলেছিল বৈষ্ণবসমাজে গিয়ে উত্তর পাওয়ার বদলে প্রশ্ন বেড়ে গেছে।
‘কিন্তু একটা কথা বলুন মিস্টার মিটার’, চুনিলালের কপালে চিন্তার ভাঁজ, ‘এই যে দ্বিতীয় মন্দিরটা নষ্ট হয়ে গেল, এ নিয়ে মৈত্ররা কোনও অ্যাকশন নিলেন না কেন?’
‘ডিসট্যান্স মিস্টার তেওয়ারি, দূরত্ব। তখনকার দিনে পূর্ববঙ্গে থেকে গিরিডির মন্দির নিয়ে বেশি খোঁজখবর রাখা সম্ভব ছিল না। তা ছাড়া দেবত্র সম্পত্তি, তাই জন্যও বোধহয় বেশি মাথা ঘামাননি। আর দেশি মন্দিরের শিল্পকলা এভাবে বিদেশে পাচার হয়ে যাবে এ কথাই বা কে ভাবতে পারত সে সময়ে?’
‘মশাই, ক্রস-কানেকশনের কথাটা তো শেষ হল না’, জটায়ু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলেই ফেললেন।
‘হ্যাঁ, ক্রস-কানেকশনের কথায় ফিরি। শিবমন্দিরের চুরির কথা ডেভিড জানালেন সুধাংশুকে। ওদিকে বিষ্ণুমূর্তি হাপিস হয়ে যেতে দেখে শেষ চেষ্টা হিসাবে হিতেন সান্যাল জানালেন রণবীর রায়কে। যেদিন আমরা রায়বাড়ি গেলাম সেদিন বিকালে রণবীর চুরির অভিযোগে চেপে ধরলেন সুধাংশুকে। সুধাংশুও মরিয়া হয়ে জানালেন যে ডেভিড টেরাকোটার টাইলসের চুরির কথা জেনে গেছেন। নিজেদেরকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে দুজনে মিলে ঠিক করলেন ডেভিডকে সরাতে হবে। হিতেন সান্যাল দু-জায়গাতেই বেনামি চিঠি লিখে বেঁচে গেছিলেন। না হলে তাঁর ভাগ্যও যে বিরূপ হত না সে কথা কে-ই বা বলতে পারে!’
‘একজন পরিচিত লোককে এরকমভাবে খুন করতে বাধল না এদের?’ লালমোহনবাবুর গলাটা কেঁপে গেল।
‘ভয়, লালমোহনবাবু। ডেভিড শেষ কিছু বছরে এই টেরাকোটা চোরাচালান নিয়ে এত লেখালেখি করেছেন যে এঁরা জানতেন ডেভিড এই রহস্যের শেষ দেখে ছাড়বেন। আর সেটা ঘটলে দুজনের ভাগ্যেই লেখা ছিল বহু বছরের হাজতবাস। ডেভিডের প্যাশনই ওর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াল।’
ফেলুদা একটু থেমে চুনিলাল তেওয়ারির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মিস্টার তেওয়ারি। আপনি সুধাংশু মৈত্রকে জিজ্ঞাসা করে কনফার্ম করতে পারেন- আমার ধারণা যেদিন উনি রায়বাড়ি থেকে আগে চলে এসেছিলেন সেই রাতেই উনি ডেভিডকে ফোন করে সাতসকালে মন্দিরে আসতে বলেন। রণবীর আগে থেকেই জানতেন এই প্ল্যান। সকালবেলা ডেভিড ঢুকলেন মন্দিরের সামনের দিক থেকে, আর রণবীর ও সুধাংশু এলেন জোড়বাংলার দ্বিতীয় মন্দিরের সুড়ঙ্গ দিয়ে। তারপর সবই পরিকল্পনা মোতাবেক এগোচ্ছিল। যেটা সুধাংশু বা রণবীর জানতেন না, যে, ডেভিড প্রায় ওই একই সময়ে হিতেন সান্যালকেও ওখানেই ডেকেছিলেন। হিতেনের সঙ্গে ডেভিড হয়তো টেরাকোটার টাইলস নিয়েও কথা বলতে চেয়েছিলেন। সেদিন আমাকে চুরির ব্যাপারে বিশদে কিছু না বললেও আমার মনে হয়েছিল উনি হিতেনকে সন্দেহ করছিলেন। হিতেন চুরির ব্যাপারে দোষ স্বীকার না করলে ডেভিড হয়তো আমাকে অনুরোধ করতেন রহস্য উন্মোচন করতে।’
‘হিতেনকে সুধাংশু আর রণবীর দেখতে পেয়েছিলেন?’ জিজ্ঞাসা করলেন চুনিলাল।
ফেলুদা বলল, ‘আমার ধারণা তাই। আর যদি দেখতে নাও পেয়ে থাকেন পায়ের শব্দ তো নিশ্চিতভাবে পেয়েছিলেন। হিতেনের পায়ের শব্দ পেয়েই দুজনে তড়িঘড়ি ওই সুড়ঙ্গ ধরেই ফিরে যান। খেয়ালও করেননি ডেভিডের ক্যামেরা ছিটকে মন্দিরের মেঝেতে পড়ে রয়েছে।’
চুনিলাল একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘রণবীর রায় স্বীকার করেছেন ডেভিডের মাথায় লোহার রড মেরে উনিই খুন করেছেন। আর ফিটনে সমস্ত চোরাই মাল তুলে গিরিডি ছেড়ে পালানোর মতলব-ও ওঁরই।’
ফেলুদা মাথা নাড়ল, ‘দুজনের মধ্যে যে রণবীর বেশি রগচটা মানুষ সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। লোহার রডটি ওই সুড়ঙ্গে বা পেছনের জঙ্গলে পেয়ে যাবেন। কিন্তু চোরাই মালের ব্যাপারটায় আর-একটু জটিলতা রয়েছে।’
‘আরও জটিলতা?’ এবার চুনিলালও হাঁ হয়ে গেছেন।
‘ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন, মিস্টার তেওয়ারি’, ফেলুদা আমাদের দেখিয়ে বলল, ‘রায়বাড়ির বাগানে আমার ভাই আর লালমোহনবাবু শুনেছিলেন একজন আর-একজনকে বলছে ‘আমাকে ব্ল্যাকমেল করে পার পাবে না’, সেটা যদি সত্যি হয় তাহলে কী মানে দাঁড়ায়?’
‘কী বলুন তো?’
আমি বুঝতে পারছি আমার মতনই লালমোহনবাবু আর চুনিলাল তেওয়ারির-ও হার্টবিট মিস হওয়ার দশা।
'মানে এই যে, সুধাংশু এবং রণবীর এই চোরাচালানের কারবার আরও আগে থেকেই চালিয়ে আসছেন। এবারের ঘটনাটা নেহাত কাকতালীয় নয়। আমি অবাক হব না যদি শুনি স্রেফ আরও টাকার লোভে সুধাংশু তাঁর চাকরি ছেড়ে গিরিডি চলে এসেছিলেন। শান্তিনিকেতনে কিছু অশান্তি পাকিয়ে উঠতেই পারে, কিন্তু সুধাংশুর দিক থেকে ইচ্ছাকৃত ইন্ধন ছিল কি না তা বার করার দায়িত্ব এখন আপনার মিস্টার তেওয়ারি’, ফেলুদার মুখে একটা আলগা হাসি লেগে। কিন্তু ইন্সপেক্টর চুনিলাল তেওয়ারির মুখে একফোঁটাও হাসি নেই। বলা বাহুল্য যে তাঁর কাজ আরও বাড়ল।
আমাদের গাড়ি এখন চলেছে মধুপুরের পথে। গিরিডিতে আর থাকতে ইচ্ছে না করলেও ছুটির পর্ব শেষ করে দিতে আমাদের কারোরই মন চাইছিল না।
লালমোহনবাবুর হাতে আবার সেই রেলের বই, ‘নামগুলো শুনুন মশাই একবার– মহেশমণ্ডা, ভাণ্ডারিডি, সুগাপাহাড়ি। শুনলেই মনে হয় একটা অ্যাডভেঞ্চার না হয়ে যায় না। আপনার কিপলিং সাহেব মধুপুর নিয়ে কিছু বলেছেন নাকি?’
‘আরও অ্যাডভেঞ্চার চাই? এ তো সুনির্মলবাবুর মৌমাছিদের মতন অবস্থা আপনার।’
জটায়ুর একটু থতোমতো খেয়ে বললেন, ‘কার কথা বলছেন?’
“সুনির্মল বসু। ওঁর লেখা ছড়া শোনেননি?
‘উড়কি ধানের মুড়কি, ইঁদুর চাটে গুড় কি/টিকটিকিটা বানায় বাড়ি, ফড়িং ভাঙে সুরকি/ মৌমাছিরা মধুর লোভে যাচ্ছে মধুপুর কি?”
ফেলুদার ছড়া শুনে জটায়ু ধড়মড় করে সোজা হয়ে বসলেন, ‘দেখেছেন কাণ্ড। আপনাকে তো আসল কথাটাই বলা হয়নি।’
‘এখনও আসল কথা বাকি?’ ফেলুদা অবাক।
‘হেঁ-হেঁ, আমিও যে একখানা অ্যাক্রস্টিক বানিয়ে ফেলেছি মশাই- ফেল কভু করে না/ লুটেরাদের ডরে না/ বাগে তাকে পায় কে/ বুদ্ধি আর ধরে না।’
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment