"গিরিডিতে গ্যাঁড়াকল"
১.
‘বাহ, খাসা!’ চায়ের কাপটা সশব্দে সামনের ছোট টেবিলের ওপর রেখে অমায়িক স্বরে বললেন বিখ্যাত রহস্য-রোমাঞ্চ ঔপন্যাসিক লালমোহন গাঙ্গুলী ওরফে জটায়ু।
মন্তব্যটা অবশ্যি যার উদ্দেশ্যে করা হল; সেই ফেলুদার হাতে একটা পুরনো বই, এখন যদিও পুরনো বলা চলে না। কিছুক্ষণ আগে অব্দি ছেঁড়া ছিল, সকাল থেকে খেটেখুটে ও-ই মেরামত করেছে।
ফেলুদা বইটা উল্টেপাল্টে দেখছিল। নিজের কাজে ও যে বেশ স্যাটিসফাইড তাতে সন্দেহ নেই। এই বই বাঁধাইয়ের শখটা ওর হালের। হপ্তাখানেক আগে বাবার ঘর থেকে পুরনো বইয়ে বোঝাই একটা ট্রাঙ্ক আবিষ্কার করি আমি। বইগুলোর অবস্থা যে শোচনীয় তা বলাই বাহুল্য, ফেলুদাকে দেখাতেই কী মনে করে ও বলল, ‘রেখে যা।’
আর তারপর থেকে কম করে হলেও কুড়িটার মতো বই ও বাঁধাই করেছে ঘরে বসেই— কিছু আমার, কিছু ওর নিজের। আজ যে বইটার ওপর সূঁচ চলছিল তার নাম জানি না, কারণ এর মলাট নেই। রোববারের সকাল। লালমোহনবাবু যথারীতি এসেছেন ন'টার একটু পরেই। এবং সব দেখেশুনে খুব একটা অবাক যে হলেন তা নয়, কারণ ফেলুদার ঝুলিতে ঠিক কী কী বিদ্যে ধরে, এ ক'বছরে তার নমুনা তিনি কম পাননি।
বইটা সুবিধেমতো জায়গায় শুকোতে দিয়ে বাকি সরঞ্জামগুলো ভেতরে রেখে এল ফেলুদা। লাইটারটা বার করে সোফায় বসে একটা চারমিনার ধরিয়ে একবার ঘড়ি দেখল, তারপর টেবিল থেকে তুলে নিল প্রিয় রুবিকস কিউবটা।
লালমোহনবাবু গোড়া থেকেই উসখুস করছেন। ফেলুদা ব্যস্ত ছিল বলে ঠিক জমিয়ে উঠতে পারছিলেন না, আর এখনও যে ও কেন চুপচাপ কে জানে। শেষমেষ সাহস সঞ্চয় করে বলেই ফেললেন, ‘কী ব্যাপার ফেলুবাবু? অত কী ভাবছেন?’
‘প্রোফেসর শঙ্কুর নাম শুনেছেন?’ পায়ের ওপর থেকে পা নামিয়ে খানিকটা এগিয়ে কাউচে বসা লালমোহনবাবুর ওপর ঝুঁকে কথাটা জিজ্ঞেস করল ফেলুদা।
এই বেমক্কা প্রশ্নে ভদ্রলোক একটু ঘাবড়ে গেলেন। ‘শঙ্কু? আজ্ঞে সে আমার এক পড়শী, শঙ্কাহরণ চাটুজ্যের নামের অ্যাব্রিভিয়েশন ছাড়া তো কস্মিনকালেও শুনিনি। তিনি অবশ্যি প্রোফেসর নন।’ ঝুঁকে এলেন নিজেও, ‘কেন বলুন তো? কোনও নতুন কেসটেস বুঝি?’
চারমিনারে আরাম করে টান দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল ফেলুদা। আমি তাড়াতাড়ি জবাব দিলাম, ‘ঐ বিখ্যাত বাঙালি বৈজ্ঞানিক তো? যাঁর ডায়রি তোমার কাছে আছে?’
দুটো ধোঁয়ার রিং ছেড়ে আধবোজা চোখে ও মাথা ওপর-নীচ করল। লালমোহনবাবু বেশ আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘একটু ঝেড়ে কাশুন মশাই। শঙ্কু! আজকের খবরের কাগজটায়ও তো তেমন কোনও নাম দেখলুম বলে মনে পড়ে না—’
ফেলুদা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে সোফায় টান হয়ে বসল। ‘দেখবেন না। আজকের কেন, বিগত বছরগুলোর সব পুরনো পত্রিকা ঘাঁটলেও কতবার ঠিকঠাক ওঁর নামের উল্লেখ পাওয়া যাবে বলা যায় না। অথচ এমন প্রতিভা সারা ভারতবর্ষে বিরল—’
লালমোহনবাবু বিভ্রান্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন। ফেলুদা সেটা বুঝতে পেরে বলল, ‘শুনুন তবে, সহজ করেই বলছি। প্রোফেসর শঙ্কু, যাঁর পুরো নাম ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু; বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বৈজ্ঞানিক ছিলেন— আপনি যেহেতু এইসব বিশেষণ প্রেফার করেন। যাই হোক, অসামান্য সব আবিষ্কার করে গেছেন ইনি। থাকতেন বিহারের গিরিডিতে। ওখানেই ছিল ওঁর ল্যাবরেটরি, গবেষণাক্ষেত্র।
‘বছরপনেরো আগে উনি হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যান। কেউ বলে ওঁর মৃত্যু হয়েছে, আবার এ-ও গুজব আছে উনি নাকি কোনও এক আবিষ্কারের স্বার্থে গা ঢাকা দিয়ে আছেন। এই প্রোফেসর শঙ্কুরই একুশখানা ডায়রি আমার কাছে রয়েছে। বিচিত্র জিনিস সংগ্রহের তালিকা যে নেহাত ছোট নয় আমার, সে তো জানেনই।
‘কাল রাতে এক ভদ্রমহিলা টেলিফোন করেছিলেন। নাম বললেন তিলোত্তমা শঙ্কু। ইনি নাকি প্রোফেসরের একমাত্র উত্তরাধিকারিণী। কলকাতাতেই থাকেন, একটা স্কুলে চাকরি করেন। আজ একবার আমাদের এখানে আসতে চেয়েছেন। প্রোফেসরের শেষ স্মৃতিগুলো দেখতে চান। আমি হ্যাঁ করে দিয়েছি। আর আধঘণ্টা পরেই এসে পড়বেন আশা করি।’
লালমোহনবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘তিনি যে সত্যিই ওই বিজ্ঞানীর উত্তরাধিকারিণী, তার প্রমাণ আছে কি?’
‘প্রথমত শুধু টেলিফোনের আলাপে কোনও ভদ্রমহিলার কাছে কি সে কথা জানতে চাওয়া যায়? তাছাড়া ডায়রিগুলো দেখাতে তো ক্ষতি নেই। আমার নিজের যখন কোনও অধিকার নেই এর ওপর— ওঁকে জিজ্ঞেস করে খামোখা অপদস্থ কেন হতে যাব বলুন?’
‘তা ঠিক।' আমার দিকে ফিরে চাপা গলায় বললেন লালমোহনবাবু, 'এর আগে তোমার দাদা মহিলা অপরাধী ধরেছেন কয়েকবার। মহিলা ক্লায়েন্ট বোধহয় এই প্রথম না? অবশ্যি যদি ব্যাপারটাকে কেস বলা যায় তবেই—’
আমি কিছু বললাম না। ফেলুদা নির্ঘাত কথাটা শুনতে পেয়েছিল, তাই একটু গলা খাঁকড়ে আবার সোফায় গা এলিয়ে দিল। লালমোহনবাবুও আবহাওয়া আঁচ করতে পেরে চুপ মেরে গেলেন।
ভদ্রমহিলার আসতে এখনও কিছু দেরি, এদিকে চুপচাপ বসে থাকতেও ভাল লাগছে না। ফেলুদাকে না ঘাঁটিয়ে আমি আর লালমোহনবাবু কিছুক্ষণ ওঁর এবারের পয়লা বৈশাখের নতুন উপন্যাসটার প্লট ঝালিয়ে নিলাম। আড়চোখে দেখি ফেলুদা সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ঘনঘন আঙুল মটকাতে ব্যস্ত— কিউবটা আলগোছে কোলের ওপর ফেলে রেখেছে। এমন মামুলি ব্যাপারেও কোনও রহস্যের গন্ধ পেল নাকি ও?
দশটা বাজার মিনিটকয়েকের মধ্যেই কলিংবেলটা বেজে উঠল। ফেলুদা দেখলাম ওর ক্লায়েন্টের সময়ানুবর্তিতায় বেশ খুশি হয়েছে, মুখের গম্ভীর ভাবটা কমে গিয়ে সেখানে বাহবা দেওয়ার মত একটা ভঙ্গী দেখা দিল।
আমি গিয়ে দরজা খুললাম। অনেকবার বলেছে ফেলুদা, লেখার সময় যার সম্পর্কে কথা হচ্ছে তার বর্ণনা আগে দিয়ে নিতে। নামটা জানা ছিল— তিলোত্তমা শঙ্কু। নীল রঙের একটা শাড়ি পরনে, কাঁধে নকশাকরা শান্তিনিকেতনি ঝোলা। চোখে মোটা গোল কালো ফ্রেমের চশমা। চোখদুটো ভীষণ উজ্জ্বল, দেখে একটু ছটফটে ধরনের মনে হয়। রঙ শ্যামলা ধাঁচের। সাড়ে পাঁচফুটের মতো হাইট, বয়স আন্দাজ তিরিশের এপার কী ওপার।
আমি নমস্কার জানিয়ে ওঁকে ভেতরে নিয়ে এলাম।
‘আসুন তিলোত্তমা দেবী!’— ফেলুদা আর লালমোহনবাবু উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। তিলোত্তমাও প্রতিনমস্কার জানালেন। ফেলুদা ওঁকে সামনের সোফা দেখিয়ে দিয়ে নিজের জায়গায় বসে পড়ল। এই ফাঁকে শ্রীনাথকে আমি চায়ের ফরমাশ দিয়ে এলাম।
‘কাল যখন আপনাকে ডায়রিগুলো দেখানোর কথা বললাম, ভাবিনি এত সহজে রাজি হয়ে যাবেন। অচেনা কেউ হুট করে নিজেকে প্রোফেসর শঙ্কুর নাতনী বলে ক্লেম করল, আর আপনিও দিব্যি মেনে নিলেন!’ চশমাটা নাকের ওপর ঠেলে দিয়ে সপ্রতিভ হেসে বললেন তিলোত্তমা।
ফেলুদাও হেসে বলল, ‘এত বছর চর্চার বাইরে যে বৈজ্ঞানিক, শুধু তাঁর ডায়রিগুলো দেখার জন্যে বংশধর হিসেবে কারওর নাম ভাঁড়ানোর দরকার পড়তে পারে বলে মনে হয়নি।’
‘সে আপনার বিচক্ষণতা। তবে আমার দিক থেকে তো একটা দায়িত্ব আছে নিজের পরিচয়টা স্বচ্ছ করবার', ব্যাগ খুলে কী যেন বের করে ফেলুদার হাতে দিলেন তিলোত্তমা।
পাসপোর্ট।
তারপর লালমোহনবাবুর দিকে ফিরে বললেন, ‘আজকাল পাসপোর্টে কীই-বা প্রমাণ হয়। আর হলেও, প্রোফেসর শঙ্কুর সঙ্গে আমার সম্পর্কটা কোনওভাবেই এর থেকে বোঝা যায় না। তবে প্রদোষবাবুর বিষয়ে যা জানি, আমার নাম-ধাম ভেরিফাই করিয়ে নেওয়াটা ওঁর পক্ষে কঠিন কিছু নয়।’
লালমোহনবাবু স্মার্টলি হেসে মাথা নাড়লেন।
‘কিছু যদি মনে না করেন, একটা প্রশ্ন করি?’ পাসপোর্টটা ফেরত দিয়ে ফেলুদা বলল।
‘নির্দ্বিধায়।’
‘আপনি কি লেখেন-টেখেন? এই ধরুন কোনও ম্যাগাজিন—’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ। বহুদিন কাগজে নিয়মিত লিখেছি। এখন অবিশ্যি কয়েকজন বন্ধু মিলে নিজেদের উদ্যোগে ‘পার্থিবী' বলে একটা মেয়েদের পত্রিকা চালাই।’
‘মনে হয়েছিল নামটা আগে কোথাও দেখেছি। আর এখন এই পাসপোর্ট থেকে— একটা জিনিস আগেও বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে; আপনার এই পদবী। আমি আর কোথাও শঙ্কু পদবী শুনিনি। হতে পারে আমার জানার পরিসরই সীমিত।’
‘না না। এক আমরা ছাড়া শঙ্কু বলে সত্যিই আর কারও পদবী নেই।’
‘স্ট্রেঞ্জ। এর পেছনে কোনও ইতিহাস আছে কি? শুনে তো বিশেষ উপাধিগোছের কিছুই মনে হয়। যদিও কোনও উপাধিতেই একচেটিয়া কারওর দখল থাকে বলে জানা নেই।’
‘নিশ্চয়ই আছে। তবে সে বৃত্তান্ত বলতে গেলে অনেক কথা খরচ করতে হয় যে! ভেবেছিলাম আপনার খুব বেশি সময় নেব না।’
‘আপনার তাড়া না থাকলে বলতে পারেন।’ চা এসে গিয়েছিল, সেদিকে ইঙ্গিত করল ফেলুদা।
‘থ্যাঙ্ক ইউ’, চায়ের কাপটা তুলে নিয়ে বলতে শুরু করলেন তিলোত্তমা, ‘ত্রিশঙ্কু দশা বলে বাগধারাটা তো জানেন?’
***
২.
অনিশ্চিতভাবে কোনওকিছুর মাঝামাঝি অবস্থানকে বোঝাতে হলে যে কথাটা ব্যবহার করা হয় তা আমি জানতাম। ফেলুদাও একই উত্তর দিয়ে বলল, ‘সেই ত্রিশঙ্কু রাজাকে সশরীরে স্বর্গে পাঠানোর ঘটনা তো?’
তিলোত্তমা মাথা নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ। প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘিত হয় বলে দেবতারা যাঁকে গ্রহণ করেননি; আর ঋষি বিশ্বামিত্র যেহেতু এর উদ্যোগ নিয়ে যজ্ঞ করেছিলেন, তাই তিনি নিজের ক্ষমতার পরিচয় দিতে মর্ত্যেও ফিরতে দিলেন না। এই দুইয়ের মধ্যে শেষমেষ একটি নক্ষত্রলোকে রাজার জায়গা হল।
‘আমাদের এক পূর্বপুরুষ— ধাপ গুনলে দাঁড়ায়, আমার দাদুর অতিবৃদ্ধ প্রপিতামহের বাবা। নাম ছিল ত্র্যম্বকেশ্বর। শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি ছিলেন, একইসঙ্গে আয়ুর্বেদচর্চায় সিদ্ধহস্ত। তৎকালীন কোনও ধরনের কুসংস্কার মানতেন না। ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ, জাতির বাছবিচার না করে তিনি চিকিৎসা করতেন। এতে যেমন বহু লোক তাঁকে দেবতাজ্ঞান করত, তেমনি সমাজের আরেকটা অংশের কাছে তিনি প্রায় ব্রাত্যই ছিলেন বলা চলে। এই দু'রকম প্যারালাল অভিজ্ঞতায় প্রভাবিত হয়ে ত্র্যম্বকেশ্বর পরবর্তীতে ‘শঙ্কু’ পদবী ধারণ করেন। যার অর্থ কোনওটিকেই গ্রহণ বা বর্জন না করে তার মধ্যস্ততায় বসবাস।’
‘অদ্ভুত।’ ফেলুদা ছোট্ট করে মন্তব্য করল। লালমোহনবাবুকে দেখলাম ঝোলা হাতড়ে একটা নোটবুক বার করে তাতে খসখস করে কী জানি লিখলেন।
খানিকটা চটক ভেঙেই যেন পরের কথাটা পাড়ল ফেলুদা, ‘এনিওয়ে— আপনি ডায়রিগুলো দেখবেন তো?’
‘আপনার যদি খুব অসুবিধে না হয়।’
ফেলুদা চট করে উঠে দাঁড়িয়ে ‘এক্সকিউজ মি’ বলে পাশেই ওর শোবার ঘরে ঢুকে দু'মিনিটের মাথায় একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ নিয়ে বৈঠকখানায় ফিরে এল। তার ভেতর থেকে বেরোল কয়েকটা ছেঁড়া মলাটের ডায়রি। এগুলো আগেও দেখেছি আমি, পড়েওছি কিছু কিছু। এত বছর আগে এরকম আশ্চর্য সব কাণ্ড ঘটিয়ে গেছেন এই প্রোফেসর— বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন।
‘সবমিলিয়ে একুশখানা’, ফেলুদা সোফায় বসে পড়ে বলল। ‘বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড বিচারের ধৃষ্টতা দেখাব না— আমার মনে হয় সাহিত্যের দিক থেকেও এ লেখার আবেদন কোনও অংশে কম নয়। কখনও অকশনে তোলা হলে এর মূল্য কোথায় পৌঁছোতে পারে বলা মুশকিল। কারণ এমন ঝরঝরে প্রাঞ্জল ভাষা আজকালকার কোনও আত্মজীবনীতে তো চোখে পড়ে না।’
‘মানিকবাবুও তাই বলছিলেন।’ একটা ডায়রি তুলে নিয়ে খুব সাবধানে পাতা ওল্টালেন তিলোত্তমা।
‘ডায়রিগুলোর খবরও বোধ করি উনিই দিলেন।’
‘ন্যাচারেলি। গিরিডি থেকে ফেরবার পর কাগজে একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন প্রোফেসর শঙ্কুর ডায়রি আর গবেষণা সম্পর্কে— আর ডায়রির অ্যাডভেঞ্চারগুলো থেকে একটা কাহিনী সন্দেশেও ছাপা হয়। সবটা জেনে বেশ কৌতূহল হয় আমার। মানিকবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করাতে শুনলাম যে ডায়রিগুলো আপনার কাছে আছে।’
এই মানিকবাবু হলেন সত্যজিৎ রায়। বিখ্যাত চিত্রপরিচালক তো বটেই, সেই সঙ্গে ছোটদের পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এর সম্পাদক; ফেলুদাকে নিয়ে আমার লেখা প্রথম গল্পটা যেখানে প্রকাশিত হয়েছিল। একবার খুব অপ্রত্যাশিতভাবে উনি কার কাছ থেকে যেন প্রোফেসরের একটা ডায়রি পান। তারপর খোঁজখবর করে গিরিডির সেই বাড়িতে গিয়ে গবেষণার কাগজপত্র আর সব দেখে-টেখে অন্য ডায়রিগুলো সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। ফেলুদার সঙ্গে আবার মানিকবাবুর খুব খাতির, ওর নানান দিকে ইন্টারেস্ট বলেই সেগুলো উপহার দিয়েছিলেন।
তিলোত্তমা ডায়রি থেকে চোখ না তুলে জবাব দিচ্ছিলেন। সেই ফাঁকে ফেলুদা প্যাকেট থেকে একটা চারমিনার বার করে ভীষণ বিলিতি কায়দায় বলে উঠল, ‘ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড— মে আই?’
‘শিওর।’
আমার চোখ গোল গোল হয়ে গেল। এর আগে কখনও ওকে কারও পারমিশন নিয়ে সিগারেট ধরাতে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না! খেয়াল করলাম, লালমোহনবাবু আমার শার্টের আস্তিনে হালকা টান দিলেন।
‘আপনি বললেন প্রোফেসর শঙ্কু আপনার দাদু। আমি যদ্দূর জানি ভদ্রলোক অকৃতদার ছিলেন। তবে কী—’
‘উনি আমার নিজের দাদু— অর্থাৎ ত্রিকালেশ্বর শঙ্কুর খুড়তুতো ভাই।’
‘আই সি।’ ফেলুদা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে ধোঁয়া ছাড়ল।
হাতের ডায়রিটা বাকিগুলোর সাথে টেবিলের ওপর রেখে তিলোত্তমা চশমাটা খুলে বললেন, ‘প্রদোষবাবু, আমার দুটো বেয়াড়া অনুরোধ আছে। তবে আপনি রাখবেন কি না সে একান্তই—’
‘আগে তো বলুন!’
‘নিশ্চয়ই।’ কয়েকমুহূর্ত থেমে যোগ করলেন তিলোত্তমা, ‘আমি কি এই ডায়রিগুলো নিতে পারি? কোনওরকম দাবী করছি তা ভাববেন না যেন। অবশ্যই ধার হিসেবে। আমি জানি, আপনার কাছে এসবের কদর আমার থেকে কম নয়।’
‘বেশ তো। আমার কোনওরকম আপত্তি নেই।’
তিলোত্তমার চোখ-মুখ নিমেষেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ!’
‘আর পরের অনুরোধটা?’ ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
‘এটা কিন্তু একটু বেশিই বেয়াড়া।’
‘তবু, শুনি।’
‘আপনাকে গোড়ায় বলা হয়নি, আপাতদৃষ্টিতে আমিই এই বংশের একমাত্র জীবিত সদস্য— যেহেতু প্রোফেসরের অস্তিত্ব নিয়ে একটা ধোঁয়াশা আছে। যাই হোক, আমরা থাকতাম বেরিলিতে। আমার জন্মের তিন বছর পর মা মারা যান, তার কিছু পরে দাদু, আর চোদ্দো বছর বয়সে বাবা। তারপর থেকে আমি কলকাতায় আমার মামার বাড়িতে মানুষ।
‘প্রোফেসর শঙ্কুর বিষয়ে আমি ছেলেবেলা থেকেই বাবা আর দাদুর কাছে অনেক শুনেছি। সেভাবে দেখা হয়নি যদিও কখনও, কারণ স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন তিনি। আমার যখন বছরদুয়েক বয়স, তখন নাকি দাদু আমায় একবার দেখতে এসেছিলেন, অ্যালবামে পড়ে থাকা একটা ছবি ছাড়া তার আর কোনও স্মৃতি নেই। বলতে পারেন, তিনি আমার কাছে সুপারহিরো। তবে, জীবনের একের পর এক ক্রাইসিস মোকাবেলা করতে গিয়ে ওঁর সঙ্গে আলাপ হওয়ার সুযোগ আর হল কই! নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি সবে, তখুনি তো দাদু উধাও।
‘এই এত বছর পর মানিকবাবুর আর্টিকেল থেকে দাদুর প্রতি সেই পুরনো ভক্তিটা আবার ফিরে এল। ওঁর খোঁজ অ্যাদ্দিনে তো কেউ পায়নি, সে আশাও আর করি না। কিন্তু এই যে আমি দাদুকে আরও জানতে চাই, এক্সপ্লোর করতে চাই, সেটুকু তো সম্ভব!’
‘নিঃসন্দেহে।’
‘আর সেখানেই তো আটকে যাচ্ছি। এ কাজে আমাকে সাহায্য করবার মতো আসলে কেউ নেই। মামাবাড়ি থেকে এককালে অনেক উপকার নিয়েছি, আশ্রয়ে থেকেছি; আর কোনওভাবে ওদের বিরক্ত করাটা শোভা পায় না।’
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। শুধু পটুদের বাড়ির ওদিক থেকে হারমোনিয়ামে প্যাঁ প্যাঁ আওয়াজ— ওর ছোটবোনের গানের মাস্টারটা এসেছে বুঝি।
ফেলুদা একদৃষ্টে তিলোত্তমার দিকে তাকিয়ে আছে বলেই বোধহয় তিনি একটু নড়েচড়ে বসে আবার খেই তুললেন, ‘আপনি, মানে আপনারা তিনজনই— আমার সঙ্গে গিরিডি যাবেন প্রদোষবাবু?’
***
৩.
‘আপনি ঠিক কী ধরনের সাহায্য এক্সপেক্ট করছেন বলুন তো!’ ফেলুদার গলায় একটা খুব চেনা সুর— তবে সেটা ধারালো নয় মোটেই, বরং আগ্রহের রেশই যেন তাতে স্পষ্ট টের পাওয়া গেল।
‘ব্যস এটুকুই যে— প্রোফেসর শঙ্কুর কর্মক্ষেত্র, পাড়া-প্রতিবেশী থেকে শুরু করে ওঁর ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে যা কিছু; সবটা আমি কাছ থেকে জানতে চাই— আর এখানেই আপনাদেরকে আমার পাশে দরকার।’
‘বুঝতে পেরেছি’, ফেলুদা আঙুল মটকে বলল, ‘দেখুন সত্যি বলতে কী, প্রোফেসরের মতো এরকম একটা কমপ্লেক্স চরিত্রকে স্টাডি করতে পারার সুযোগ যে আমার পেশার দিক থেকেও যে লাভজনকই হবে তাতে সন্দেহ নেই।’
‘এ কারণেই প্রস্তাবটা করার সাহস পেলাম। তা ছাড়াও আপনাদের ট্র্যাভেলিংয়ের শখটা মাথায় ছিল। এবার সিদ্ধান্ত আপনার। যদি ইমিডিয়েট কোনও কেস আপনার হাতে না থাকে—’ তিলোত্তমার গলায় চাপা উত্তেজনা, ‘আর আপনি পেশার কথা বললেন না?’
ফেলুদা সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে ফেলতে যাচ্ছিল, হাত স্ট্যাচু হয়ে গেল ভদ্রমহিলার পরের কথায়। ‘দাদুর অন্তর্ধান রহস্যের কিন্তু এখনও কোনও কিনারা হয়নি। যদি তাঁর সন্ধানের ভারটা আপনাকে দিই? এটা কি একরকম চ্যালেঞ্জ নয়? সম্ভাবনা তো অনেক আছে, কিন্তু তার প্রমাণিত ভিত্তি?’
‘আপনি সত্যিই চাইছেন আমি এই তদন্ত করি?’
‘একশোবার। উনি বেঁচে থাকলে কোথায় আছেন, মৃত্যু হলে তা-ই বা কেমন করে হল— সমস্তকিছুর ওপরে যেন কোথাও একটা পর্দা আছে। সেটা সরে যাওয়া দরকার। আমার বিশ্বাস, আপনি বিফল হবেন না।’ শেষ বাক্যটায় এমন একটা জোর ছিল যে, আমার মনে হল ফেলুদা যেন চাইলেও এই অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারবে না।
ফেলুদার কপালে ভ্রূকুটি। মিলিয়ে গেল অবিশ্যি পরমুহূর্তেই। গম্ভীরভাবে উত্তর এল, ‘বেশ, আমি রাজি।’
‘দ্যাটস সো কাইন্ড অফ ইউ।’ তিলোত্তমা উঠে দাঁড়ালেন, সাথে আমরাও। ‘কবে যাওয়া স্থির হয়, জানাবেন। ডাইরেক্টরিতে আমার নম্বরটা পেয়ে যাবেন। আর ভাল কথা— যাতায়াতের খরচ নিয়ে কোনওরকম চিন্তার প্রয়োজন নেই। আপনার ফি এর ব্যাপারটাও—’
ফেলুদা বাধা দিয়ে বলল, ‘সে আলোচনা পরে হবে।’
তিলোত্তমা হাসলেন। এক ঝলক নজরে পড়ল ওঁর বাঁ গালে একটা গভীর টোল। ‘আসি তবে। নমস্কার।’
‘এক মিনিট— মিস কী বলে, শঙ্কু! আপনার ইয়েগুলো—’ ডায়রির ব্যাগটার দিকে ইঙ্গিত করে লালমোহনবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘এই রে— কথায় কথায় ভুলে গেছি।’
ফেলুদা নিজেই ব্যাগটা তুলে নিয়ে তিলোত্তমাকে দরজা অবধি এগিয়ে দিল। আমরা দুজন পিছন পিছন গেলাম।
‘হাইলি ইমপ্রেসিভ লেডি। কী বলেন ফেলুবাবু?’ ভদ্রমহিলা চলে যাবার পর বৈঠকখানায় ফিরে এসে তক্তপোশের এক কোণে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে জটায়ু বলে উঠলেন। ফেলুদা কোনও মন্তব্য না করে ওর সেই একপেশে হাসিটা হেসে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল।
‘ভাই তপেশ, তোমার কেমন লাগল ভদ্রমহিলাকে?'
খারাপ লাগার প্রশ্নই আসে না। একটু ভেবে বললাম, ‘আশ্চর্য শক্ত মনে হল। দিব্যি সহজ-সাবলীল, আড়ষ্টতা নেই। ভীষণ গুছিয়ে কথা বলেন—’
‘ওই গুণটা না থাকলে ছেলে পড়িয়ে টিকে থাকা মুশকিল।’ পাঞ্জাবি ছেড়ে গায়ে একটা শার্ট চাপিয়ে বেরিয়ে এসে বলল ফেলুদা।
‘কোথায় চললেন মশাই?’ লালমোহনবাবুর এই প্রশ্নের উত্তরে ও জানাল যে কিছু ইনফরমেশন জোগাড় করতে সিধুজ্যাঠার বাড়ি একবার যাওয়া দরকার। আমরাও সঙ্গে যেতে পারি কি না সেটা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করাতে ও বিশেষ খাপ্পা না হয়েই বলল, ‘চল।’
সিধুজ্যাঠার বাড়ি পৌঁছে বাইরের ঘরে ওঁকে না দেখতে পেয়ে একটু অবাকই হলাম। নারায়ণ বলে যে চাকরটি দরজা খুলে দিল; তার কাছ থেকে জানা গেল কাল রাতে নাকি জ্যাঠার খুব শরীর খারাপ হয়েছিল, ডাক্তার এসে দেখে ওষুধ দিয়ে গেছেন। ফেলুদার মুখটা কালো হয়ে গেল। আমি জানি ও কী ভাবছে। প্রয়োজন না পড়লে আজ হয়তো আমাদের এখানে আসাই হত না, ফলে ওঁর অসুস্থতার খবরটাও পেতাম না। আমারই কেমন মন খারাপ লাগল।
শোবার ঘরে গিয়ে দেখি সিধুজ্যাঠা বিছানায় আধবসা হয়ে একটা ভারী কাঁসার গ্লাসে চুমুক দিয়ে কী যেন খাচ্ছেন। সামনে বিছিয়ে রাখা আজকের স্টেটসম্যান। আমরা ঢুকতেই ঘাড় তুলে বললেন, ‘কী ব্যাপার হে?’
‘কেমন আছেন এখন?’ নরম গলায় বলল ফেলুদা।
‘আর বোলো না। ব্লাড প্রেশারটা হঠাৎ বাড়াবাড়ি হয়ে সে এক বিশ্রী কাণ্ড। এখন অনেকটা সুস্থ বোধ করছি।’ নারায়ণকে হাঁক দিয়ে আমাদের জন্য চা পাঠাতে বলে ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন সিধুজ্যাঠা। ‘হুঁ, শুনি এবার। নতুন কোনও কেস?’
ফেলুদা অপরাধীর মতো মুখ করে খুব অল্প কথায় সকালের ঘটনাটা ব্যাখ্যা করল। সাথে এটাও বলতে ভুলল না যে এই অবস্থাতে ওঁকে বিব্রত করতে এসে পড়ায় নিজের ওপর ওর ধিক্কারের শেষ নেই।
‘কী বলছ ফেলু!’ ফেলুদার বাকি কথায় একেবারেই কান না দিয়ে সিধুজ্যাঠা বললেন, ‘প্রোফেসর শঙ্কুর খোঁজ করার গরজ এর আগে যে কেন অন্য কারও হল না সেখানেই আপশোস। এরকম অতিমানবিক মস্তিষ্ক নিয়ে ক'জন জন্মায় আজ! তার ওপর আয়রনিটা কোথায় জানো তো— দেশের নামটা বাইরের লোকে আজও এদের জন্যেই চেনে, শুধু নিজের মাটিতেই মর্যাদা জোটে না। অবশ্য মানুষ হিসেবেও তো প্রচারবিমুখ ছিলেন। সে যাক, তুমি তো গিরিডি থেকেই কাজ শুরু করছ?’
‘সেরকমই ইচ্ছে আছে।’
‘চমৎকার, লেগে পড়ো। আর এই যে মেয়েটির কথা বললে— ওর বাপ-দাদুর বিষয়েও তো পড়েছি এককালে। ত্রিকালেশ্বর বেরিলির খুব নামকরা ডাক্তার ছিলেন। রোগীরা বলত ধন্বন্তরি। আর তাঁর যে ছেলে, সর্বেশ্বর, ভদ্রলোক ছিলেন দুর্দান্ত ব্রিলিয়ান্ট। বেরিলি কলেজে কেমিস্ট্রিতে অধ্যাপনা করতেন।’
স্বীকার করতেই হল, এতসব আমাদের জানা ছিল না।
ফেলুদা একবার ঘড়ির দিকে চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, প্রোফেসর ঠিক কীভাবে নিখোঁজ হলেন তার কি কোনও অথেনটিক সূত্র আছে?’
‘তা সম্ভবত নেই। কিন্তু আমার একটা খটকা লেগেছিল বটে। নিখোঁজ হবার কিছুদিন আগে কাগজে ওঁর একটা লেখা বেরিয়েছিল, বোধহয় কসমসে— হ্যাঁ হ্যাঁ। কী একটা পরিবেশবান্ধব প্রজেক্টের কথা ছিল তাতে। একটা যন্ত্র আবিষ্কারের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে চিঠি চালাচালি হচ্ছিল, ভাঙিয়ে অবিশ্যি কিছু বলা নেই। কিছুদিন পরেই শুনি ভদ্রলোক রাতারাতি উবে গেছেন। আমার তাই মনে হয়েছিল রহস্যটা কোনওভাবে এই আবিষ্কারের সঙ্গে যুক্ত নয় তো?’
‘সেই লেখাটা নিশ্চয়ই আছে আপনার কাছে?’
‘আলবৎ! এখনই দেখাচ্ছি তোমাকে। আমার হাত ধরে একটু তোলো দেখি ফেলু— সে বছরের খাতাটাও বার করি। প্রোফেসরের অন্তর্ধান সম্পর্কে বহু লোকজন মাথা খাটিয়ে হাইপোথিসিস দাঁড় করিয়েছিলেন; তার মধ্যে থেকে যেগুলো নেহাতই উড়িয়ে দেবার মতো নয়, সেগুলো আমার সংগ্রহে আছে। খবরগুলো একবার পড়ে দেখো— তোমার হয়তো কাজে লাগবে। তপেশ আর লালমোহন, আমার বেঁটে আলমারিটার তলার দুটো তাকেই পুরনো সব জার্নাল পাবে। একটু ঘাঁটাঘাঁটি করে বেছে নিও। শঙ্কুর আরও অনেক লেখা আছে ওতে।’
তিনটে জার্নাল আর দুটো বিদেশি ম্যাগাজিন নিয়ে সাড়ে এগারোটা নাগাত আমরা বাড়ির পথ ধরলাম। মাঝখানে ফেলুদা পরপর কয়েকটা বইয়ের দোকানে ঢুঁ মেরে শেষটায় যা খুঁজছিল সেটা পেয়ে গেল।
এ-ও একটা ম্যাগাজিন। পার্থিবী।
যার নাম আমরা আজ সকালেই শুনেছি।
***
৪.
লালমোহনবাবু আমাদের সঙ্গেই এলেন, দুপুরে আজ এখানেই ওঁর খাবার কথা। বাড়ি পৌঁছে দেখি বাবা সবে সুবিমল কাকার বাড়ি থেকে আড্ডা সেরে ফিরেছেন। ফেলুদা ম্যাগাজিনগুলো নিয়ে সটান নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়েছে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোদের কোনও নতুন কেস নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘তা এবার কোথায়?’
লালমোহনবাবু গিরিডির কথাটা বলাতে বাবা দারুণ খুশি হয়ে বললেন, ‘অপূর্ব জায়গা। শেষ গেসলাম মেজদার সঙ্গে, ফেলু তখন খুব ছোট্ট। পরেশনাথ পাহাড়ের ওপর জৈনদের মন্দির, হরিহর ধাম, খান্ডুলি পাহাড়, উশ্রী ঝর্না— নাহ, কোনও তুলনাই হয় না। তোরাও সব দেখবি। বিশেষ করে সূর্য মন্দিরটা মিস করিস না ভুলেও।’
ঠিক একঘণ্টা পর ফেলুদা বেরিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে খেতে বসল। বাটিচাপা ভাত ভেঙে ডালটা পাতে ঢেলে বলল, ‘এখন অবধি যতটা পড়লাম তাতে তেমন স্পেসিফিক কিছুই পাওয়া গেল না।’
‘প্রোফেসরের ওই প্রজেক্টটা সম্পর্কে কি?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আমাকে যেটা সবচেয়ে বেশি ভাবাচ্ছে তা হল সেই মার্কিনি ভদ্রলোকটির উধাও হয়ে যাওয়া। এর টাটকা খবরটা আমি দেখেছিলাম প্রোফেসরের নিখোঁজ খবরের সঙ্গেই, কিন্তু তখন স্বাভাবিকভাবেই গা করিনি। কেন যে করিনি! কী করতে গিয়েছিল লোকটা শঙ্কুর সঙ্গে?’
‘ওর বাড়ির লোকজনও কিছু বলতে পারেনি?’ লালমোহনবাবু বললেন।
ফেলুদা মাথা নেড়ে বলল, ‘সে গুড়ে বালি। লোকটার পরিবার বলে কেউ ছিল না। অ্যাসিস্টেন্ট গোছের একটি লোক সব দেখাশোনা করত। তারই একটা সাক্ষাৎকার থেকে পাওয়া যায় যে জ্যাকব উইলসন অনেক বছর আগে একবার নাকি ড্রাগের পাল্লায় পড়েছিল, দীর্ঘদিন রিহ্যাবিটেশন সেন্টারে কাটিয়েছে। সুস্থ হয়ে বহু খাটাখাটুনির পরে নিজের ব্যাবসাটা দাঁড় করায়। লোকটা যে এ দেশে আসছে সে খবরটুকুই শুধু অ্যাসিস্টেন্টটি জানত, এর বেশি কিছু না। তবে তার কয়েকদিন আগে থেকে জ্যাকব কোথায় যেন একটা যাতায়াত করতে শুরু করেছিল। বহু জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট তখন ক্যান্সেল হয়ে যেত। আমার ধারণা, শঙ্কুর প্রজেক্টের সঙ্গে এর কোনও যোগাযোগ থাকতে পারে।’
আমার হঠাৎ একটা কথা মনে হতেই বললাম, ‘লোকটা যেহেতু ব্যবসায়ী ছিল, ব্যবসায়িক কারণেই কি সে প্রোফেসরের নতুন আবিষ্কারটা হাতাবার মতলব করতে পারে না? আগে তো কম হয়নি এরকম। ডায়রিতে যে পড়েছিলাম, সলোমন ব্লুমগার্টেন বলে এক লোক প্রোফেসরকে মোটা টাকা অফার করেছিল, অ্যানাইহিলিন পিস্তল আর কী একটা আবিষ্কার কিনবে বলে!’
ফেলুদা বাঁ হাত দিয়ে আমার পিঠটা দু'বার চাপড়ে দিল। ‘মন্দ ভাবিসনি। কিন্তু সে লোক এই আবিষ্কারের কথা জানবে কেমন করে? শুনলিই তো বেশ কনফিডেনশিয়াল ব্যাপারটা।’
লালমোহনবাবু মুখে ভাত চালান করে দিয়ে বললেন, ‘তা হলে হয়তো পুরনো আবিষ্কার।’
ফেলুদা অন্যমনস্ক, ‘অসম্ভব নয়। তবে তাতে দুইয়ে দুইয়ে চার করতে পারছি না এই যা।'
‘আর—’ গলাটা ঝেড়ে পরিষ্কার করে লালমোহনবাবু বললেন, ‘আমাদের গিরিডি যাওয়াটা কবে হচ্ছে? তিলুদেবীকে কনফার্ম করবেন না?’ অনেকক্ষণ ধরে উনি কথাটা পাড়তে চাইছিলেন, আমি জানি।
‘তিলুদেবী! ভাল নাম ভেবেছেন তো।’
‘ডাকার সুবিধের জন্য একটু কেটে নিলুম, হেঁ হেঁ।'
‘আপনি না জেনেই ভদ্রমহিলাকে ওঁর দাদুর ডাকনাম দিয়ে ফেলেছেন লালমোহনবাবু। প্রোফেসরকে তাঁর বাবা তিলু বলে ডাকতেন। আর ডাকতেন—’
‘নকুড়বাবু!’ আমি বলে উঠলাম।
‘ঠিক তাই। তোর সেই ব্লুমগার্টেনের কথাতে ভদ্রলোকের নামটা মনে পড়ল। অবিশ্বাস্য ক্ষমতা ছিল এই নকুড়বাবুর। ভবিষ্যৎ দেখতে জানতেন। প্রোফেসরকে বহুবার বিপদের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন। কিন্তু সেই ক্ষমতার কী হল? প্রোফেসর নিখোঁজ হলেন কী করে তা কি তিনি জানতে পারেননি?’
‘শুনুন মশাই, ভাল অ্যাডভাইস দিচ্ছি— গিরিডি গিয়ে পড়লেই দেখবেন এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে গেছেন। অতএব বেশি না ভেবে—’
‘তিলুদেবীকে ফোনটা করি।’ আঙুল চেটে টেবিল থেকে উঠে পড়ল ফেলুদা।
তিনজনে তিনটে পান মুখে পুরে বৈঠকখানায় এসে বসলাম। ডিরেক্টরি দেখে তিলোত্তমার নম্বরটা খুঁজে ডায়াল করে লাইন পেতে একটু সময় লাগল। সাড়ে চার মিনিটের কথাবার্তায় যা বুঝলাম তার সারমর্ম এই যে, রেলের রিজার্ভেশন হয়ে গেলেই অনতিবিলম্বে আমরা রওনা হচ্ছি; এবং পুষ্পক ট্র্যাভেলসের সুদর্শন চক্রবর্তীর দৌলতে ওখানে থাকার বন্দোবস্ত করা নিয়ে কোনও অসুবিধে হবে না। তিলোত্তমা কাল দুপুরে স্কুল থেকে ফেরার পথে রজনী সেন হয়ে আমাদের যাওয়ার খরচটা দিয়ে যাবেন। সেটা নেবার ব্যাপারে অবিশ্যি ফেলুদা যথারীতি একটু গাঁইগুঁই করছিল, শেষতক যে রাজি হয়েছে তা টেলিফোন নামিয়ে রাখার পর ওর ‘আশ্চর্য ব্যক্তিত্ব। কোনওভাবে না বলা যায় না’ থেকে বোঝা গেল। আমি যে এমন সন্দেহ আগেই করেছিলাম সে কথা আর বললাম না।
লালমোহনবাবু প্রস্তাব করলেন, ‘হরিপদকে তাহলে আমি বলে দিচ্ছি একদিন পর গাড়ি নিয়ে গিরিডি চলে আসার কথা। কম ঘোরাঘুরি হবে বলে তো মনে হচ্ছে না— আমার অ্যাম্বাসেডর ছাড়া সেহেতু গতি নেই। আর এতে ফেরবার সময় তিলুদেবীর ফিরতি খরচের অনুরোধটা স্বচ্ছন্দে অ্যাভয়েড করা যাবে। কী বলেন ফেলুবাবু?’
‘যথা আজ্ঞা।’
মঙ্গলবার সকালে আমাদের তুফান এক্সপ্রেস হাওড়া স্টেশন ছাড়ল ন'টা বেজে সাঁইত্রিশ মিনিটে। ফোর বার্থ কম্পার্টমেন্টের একটা কামরায় আমরা চারজন। তিলোত্তমা জানালার ধারের জায়গাটা আগেভাগে বাগিয়ে নিয়েছেন, আমি ওঁর পাশে, ঠিক উল্টোদিকে ফেলুদা আর সঙ্গে লালমোহনবাবু। মালপত্র খুব বেশি নেই আমাদের সাথে। সপ্তাহখানেকের মতো জামাকাপড় নিলেই যথেষ্ট, ফেলুদা বলেছিল। শুধু লালমোহনবাবুর কাঁধের ঝোলাটা ভারী ভারী দেখানোয় ফেলুদা তার কারণ জিজ্ঞেস করাতে ভদ্রলোক কান অবধি হেসে বললেন যে ওতে নাকি ওঁর লেটেস্ট বই ‘ধূমলগড়ে ধুন্ধুমার’-এর ডজনখানেক কপি আছে। গিরিডিতে বাঙালির সংখ্যা তো প্রচুর, তাই ওখানে যদি কোনও ভক্ত অনুরাগী বেরিয়ে যায়— তাদের জন্যেই নেওয়া।
ব্যান্ডেলের পর কিছুটা এগোতেই দেখি পশ্চিমে চাবড়া-চাবড়া কালো মেঘ থমকে জমা হয়েছে, যার ফলে আমাদের কামরার ভেতরটা অন্ধকার হয়ে এসেছে। কার্ল সেগানের একটা বই ফেলুদা অনেকক্ষণ ধরে পড়ছিল, এবার হঠাৎ বাইরের দিকে নজর পড়ায় সেটা বন্ধ করতেই ওর হাতের তলায় চাপা পড়ে থাকা নামটা বাইরে এল। দ্য ড্র্যাগনস অফ ইডেন।
‘এমন ওয়েদারে চা না হলে চলে না মশাই।’ আড়মোড়া ভেঙে বললেন জটায়ু। ইতিমধ্যে স্টেশনেই এক রাউন্ড চা হয়ে গেছে আমাদের। ফেলুদা সেটা মনে করিয়ে দিতে তিলোত্তমা বললেন, ‘তাতে কী হয়েছে? সত্যিই তো ঠান্ডা লাগছে বেশ। আমি কিন্তু চা সঙ্গে করে এনেছি। আপনারা খেতে পারেন।’
আমার চায়ে আপত্তি কখনওই নেই, ফেলুদারও না। তিলোত্তমা তাই ওঁর আনা সবুজ ব্যাগটা খুলে প্লাস্টিকে মোড়া একটা ফ্লাস্ক আর চারটে কাগজের কাপ বের করে চা ঢেলে আমাদের এগিয়ে দিলেন। আমি আর লালমোহনবাবু যে যার কাপ নিয়ে বাইরে প্যাসেজে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে থেকে থেকে। পাশের কুপেতে এক পরিবার নজরে পড়ল— দুটো ছেলে আর তাদের বাবা-মা। বাঙালি বলে চিনতে পারলাম বড় ছেলেটার হাতে একটা বই দেখে, নাম হল ‘হন্ডুরাসে হাহাকার’। আমি যখন নামটা দেখেছি, তখন স্বয়ং লেখকের চোখ সেটা এড়ায় কী করে? ফিসফিস করে ‘একটু আসছি ভাই’ বলে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে সবটুকু চা শেষ করে কাপটা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে তাদের সাথে আলাপ জমাতে চলে গেলেন লালমোহনবাবু। সেদিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিচ্ছি, ঠিক সে সময়ে একটা বিশ্রী ব্যাপার ঘটল।
পিঠে কীসের যেন খুব জোরে ধাক্কা খেয়ে আমার হাতের কাপসুদ্ধ সবটুকু চা ছলকে নীচে পড়ে গেল। বিরক্ত হয়ে পিছন ফিরে দেখি তেল চকচকে টাকওয়ালা এক স্থূলকায় ভদ্রলোক আমার ঘাড়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন। মানুষটি অস্বাভাবিক বেঁটে, চোখে ঘোলাটে চশমা, সেটা তার জায়গা হতে ইঞ্চিখানেক নীচে আড়াআড়িভাবে ঝুলছে— বোধহয় সংঘর্ষের ফল।
‘এহহে, সরি! এক্সট্রিমলি সরি। কিছু মনে করেননি তো? আসলে তাড়াহুড়োয় আরকি—’
‘না না, ঠিক আছে।’
‘ইয়ে— থ্যা-থ্যাঙ্কস।' আগন্তুক আর কথা না বাড়িয়ে চশমা ঠিক করতে করতে প্রায় দৌড়ে প্যাসেজের শেষ মাথায় চলে গেলেন। আশ্চর্য লোক তো!
শার্টে কিছুটা চায়ের দাগ লেগে গেছে বলে বেজার মুখে আমি কামরায় ফিরে এলাম। ফেলুদা আর তিলোত্তমা দুজনেই বইয়ে মগ্ন। তিলোত্তমা পড়ছেন প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের একটা ছোটগল্পের সংকলন। আমাকে দেখে বইটা বন্ধ তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে তপেশ?’
‘কী আর বলি—’
‘ওটা কী?' আমায় কথা শেষ না করতে দিয়ে ফেলুদা উঠে এসে প্যাসেজের যেখানে আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম একটু আগে, সেই মেঝেতে পড়ে থাকা সাদামতো কী একটা কুড়িয়ে নিল।
একটা ভিজিটিং কার্ড।
সম্ভবত আমার সঙ্গে ধাক্কা লেগে ওই টেকো লোকটার পকেট থেকে পড়ে গেছে।
লালমোহনবাবু তখনই কামরায় এসে ‘সে কী অভিজ্ঞতা মশাই, আপনাদের থেকেই চলন্ত ট্রেনে—’ পর্যন্ত বলে সকলের মুখের অবস্থা দেখে বাকি কথাটা আর শেষ করলেন না।
‘রমেশ মজুমদার’ নামটা জোরে জোরে পড়ল ফেলুদা, ‘ইনি ব্যবসাদার লোক। এক্সপোর্ট ইমপোর্টের কারবার। বালিগঞ্জে এঁদের আপিস, এখানে ঠিকানা দেওয়া আছে।’— তারপর নিজের মানিব্যাগ বার করে কার্ডটা তাতে ঢুকিয়ে রেখে দিল।
পানাগড়ে যখন আমরা লাঞ্চ খাচ্ছি, বাইরে তখন তেড়ে বৃষ্টি হচ্ছে। রেললাইনের দু'পাশের গাছপালাগুলো সব নুয়ে নুয়ে পড়ছে। দুপুর গড়িয়েও সে বৃষ্টি ধরে আসার নামগন্ধ পাওয়া গেল না। সময় কাটানোর জন্য তাই একটা গল্পের বই বার করে পড়তে শুরু করলাম। ভাতঘুমের অভ্যেস আমার একেবারেই নেই, তবুও ট্রেনের দুলুনি আর শীত-শীত আবহাওয়ায় চোখটা প্রায় লেগে আসছিল। হঠাৎ ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে উঠল একটা কারণে।
তিলোত্তমা গুনগুন করছেন।
জানালায় মাথা ঠেকিয়ে প্রায় শোনা যায় না এমন গলায় যে সুরটা ভাঁজছেন, সেটা হল—
‘এ ভরা বাদর, মাহ ভাদর, শূন্য মন্দির মোর’।
***
৫.
মধুপুর স্টেশন থেকে সেখানকার প্যাসেঞ্জার ট্রেন ধরে গিরিডি পৌঁছতে বাজল পৌনে সাতটা। একটা প্রাইভেট কটেজে বুকিং ছিল আমাদের, স্টেশন থেকে মিনিট দশেকের হাঁটা পথ। কিন্তু বাইরে টাঙ্গার সারি দেখে তিলোত্তমা বললেন ওতে চড়ে যাওয়া যেতে পারে কি না— অগত্যা ফেলুদা সেদিকে এগিয়ে গেল। মালপত্র সব এক জায়গায় জড়ো করে লালমোহনবাবুর জিম্মায় রেখে আমিও ওর সঙ্গে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছি, এমন সময় রাস্তার ওপারে চোখ পড়তেই দেখতে পেলাম ল্যাম্পপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে সকালের সেই ট্রেনের লোকটা।
আলো পড়ে টাকটা চকচক করছে।
হাতে সিগারেট।
এবার সেটা ছুঁড়ে ফেলে একটা রিকশা ডেকে উঠে পড়ল।
আমারও ডাক পড়ল তক্ষুনি। ‘চলে আয়, তোপসে।’
কটেজ কম্পাউন্ডের বাইরে টাঙ্গা দাঁড় করিয়ে ভাড়া মেটানোর সময় ফেলুদা চোখের কোনা থেকে পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া রিকশাটাকে একনজর দেখে নিল। না চাইতেও ওর দেখাদেখি আমার দৃষ্টি ঘুরে গেল।
রিকশায় আর কেউ না, সেই টাকমাথা।
সুদর্শনবাবু জানিয়েছিলেন আমাদের কটেজটা সদ্য তৈরি, এর ঝকঝকে চেহারা দেখে সেটা বুঝতে বাকি থাকল না। বাংলো ধাঁচের দোতলা বাড়ি। ওপরে মালিক থাকেন সপরিবারে, আর নীচের সবসুদ্ধু ছ-সাতখানা ঘরই ভাড়া দেওয়া। সামনের লম্বা বারান্দা পেরিয়ে কাউন্টারের লাগোয়া হলঘর গোছের একটা জায়গা। রান্নাঘর আর ডাইনিং রুম পিছনের দিকে।
স্নানটান সেরে প্রথমে গরম কফি আর পকোড়ার অর্ডার দিয়ে আমরা হলঘরটায় এসে বসলাম। পাশে বেতের চেয়ারে বসা দুজন স্যুট পরা কেতাদুরস্ত ভদ্রলোক নিজেদের মধ্যে হিন্দিতে বাতচিৎ করছিলেন, একটু পর আরেকজন এসে যোগ দিতেই উঠে দাঁড়ালেন। ইনি ভীষণ রোগা, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, মাথায় কাজ করা মাড়ওয়ারি টুপি, নাকের নীচে সরু গোঁফ। গায়ে ভুরভুরে আতরের গন্ধ।
বেয়ারা ট্রেতে কফি আর পকোড়ার প্লেট রেখে গিয়েছিল, আমরা সেগুলোর সৎকারের তোড়জোড় করছি— বাকি দুজনকে ছেড়ে কী মনে করে তৃতীয় ব্যক্তিটি আমাদের দিকে এগিয়ে এসে হিন্দিতে বললেন, ‘নমস্কার। আপনারা কি আজই এলেন?’
ফেলুদা নমস্কার বিনিময় করে হ্যাঁ বলল।
‘বাঙালি?’
আবারও হ্যাঁ।
‘আমার নাম উমাপ্রসাদ খান্ডেওয়াল।’
ফেলুদা নিজের নাম বলল।
‘প্রদোষ মিটার? আপনি ডিটেকটিভ না?’
‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি জানলেন কী করে?’ ফেলুদা অপ্রস্তুত।
‘কলকাতায় আমার ব্যাবসার সূত্রে আসা-যাওয়া আছে। নরেশ পাকড়াশী বলে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে ডিলিংস করেছি অনেক, আপনার নাম তাঁর কাছ শুনেছি। গ্ল্যাড টু হ্যাভ ইউ ইন মাই কটেজ মিঃ মিটার।’
এবার বুঝলাম, ভদ্রলোক আমাদের কটেজ মালিক।
ফেলুদা একেক করে আমাদের আলাপ করিয়ে দিতে লাগল। শুধু তিলোত্তমার বেলায় উমাপ্রসাদ বলে উঠলেন, ‘আপনার মিসেস, রাইট?’
‘না। আমি ওঁর বন্ধু।’ উত্তরটা তিলোত্তমা নিজেই দিলেন।
‘পার্ডন মি প্লিজ। ছিঃ ছিঃ, আপনাদের কফি তো শরবত হয়ে গেল। বসুন আরাম করে।’
বসলাম। কথাবার্তায় মনে হল উমাপ্রসাদজি আমুদে লোক। তিনপুরুষ ধরে গিরিডিতে আছেন। কটেজ তৈরি হবার পর স্ত্রী আর বিধবা মাকে নিয়ে এখানে থাকতে শুরু করেন। দুই ছেলে কাজের সূত্রে অনেকদিন যাবত বাইরে, লোকজনের জমজমাট ভিড়ভাট্টায় তাই একাকীত্বটা আর তেমন অনুভব হয় না।
‘এখানে কোনও ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপারে...’
‘আজ্ঞে না। স্রেফ বেড়াতে।’
‘আমি ভাবলাম গিরিডিতে আপনার কাজের একটা সিগনেচার রেখে যাবেন। দ্যাট উড বি আ ম্যাটার অফ প্রাইড ফর আস আফটার অল।’
‘এখানে ক্রাইমের সেরকম বাড়াবাড়ি আছে বলে তো শুনিনি। সুতরাং আমার কাজের সুযোগ না হওয়াটাই একপ্রকার ভাল।’
‘ঠিক ঠিক।’ আরও দুয়েক কথার পর ভদ্রলোক উঠে পড়লেন, ‘এক্সকিউজ মি— আমার ওষুধ খাবার সময় হয়ে গেল।’ তারপর আমাদের সবার সঙ্গে একবার করে হ্যান্ডশেক করে বললেন, ‘পরিচিত হয়ে খুব খুশি হলাম। কোনওরকম দরকার পড়লে ডোন্ট হেজিটেট টু কল মি। চলি।’
আমরাও নিজেদের ঘরের দিকে এগোলাম। ডিনারের এখনও কিছু দেরী আছে, খানিক গড়িয়ে নেওয়া যাবে। লালমোহনবাবু তার আগে কাউন্টার থেকে কলকাতায় হরিপদবাবুর প্রতিবেশী নগেন বোসকে টেলিফোন করে হরিপদবাবুকে চেয়ে কটেজের ঠিকানাটা দিয়ে দিলেন।
দেহাতি বাবুর্চির রাঁধা পাঁঠার ঝাল-ঝাল কারি আর রুটি দিয়ে জম্পেশ নৈশভোজের পর লালমোহনবাবুকে প্রায় বগলদাবা করে আমরা আমাদের ঘরে এলাম। খাওয়াটা বেশি হয়ে গেছে সেই বাহানায় ভদ্রলোক আজ আগেভাগে শুতে যাওয়ার পাঁয়তারা কষছিলেন, কিন্তু ফেলুদার চনমনে মেজাজ দেখে আর না করেননি। এর আগে বারান্দায় বসে বায়ুসেবন হল সবার। তিলোত্তমা নানান গল্প করলেন— স্কুলের বাচ্চাদের গল্প, বেরিলির গল্প। কথায় কথায় জানা গেল ওঁর ডাকনাম সত্যিই তিলু (আমিও তাই দিব্যি তিলুদি বলে ডাকতে শুরু করে দিয়েছি)। ওখান থেকেই গুড নাইট জানিয়ে চলে গেছেন কিছুক্ষণ হল।
ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে খাটে কাত হয়ে ঠ্যাং নাচানো লালমোহনবাবুকে বলল, ‘কী হল মশাই, কেদরে পড়লেন যে। আপনার কি হজমির বড়ি চাই নাকি?’
‘সেইটে আনতেই তো ঘরে যাচ্ছিলুম মশাই। আমার ঠাকুরদার আমলের এক ধরনের মশলা, বুঝলেন তো, সঙ্গে রাখি। বাবা-জ্যাঠারা খেতেন। মোক্ষম কাজ দেয়।’
আমি বললাম, ‘কিন্তু আমার তো একটা ব্যাপার মোটেই হজম হচ্ছে না ফেলুদা।’
‘কী?’
‘ট্রেনের টাকমাথা লোকটা কি আমাদের ফলো করছিল?’
ফেলুদা একমুহূর্ত চুপ। তারপর বলল, ‘বলা মুশকিল। না-ও করতে পারে। ও যে পাশের কোনও হোটেল বা ধরমশালায় যাচ্ছিল না আমাদের কটেজের সামনে থেকে তাই বা বুঝলি কী করে?’
আগে রওনা দিয়েও দুটো টাঙ্গা পাশাপাশি চলার সময় ওই রিকশাটা আমাদের পিছনে যে একটা নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে এগোচ্ছিল, ফেলুদা সেটা দেখেছে আমি জানি। তাই যতই উড়িয়ে দিক না কেন, ওর মনেও যে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছে তাতে সন্দেহ নেই। লালমোহনবাবু বললেন, ‘আর ধরুন যদি করেই থাকে? এটা তো কোনও মামুলি তদন্ত নয়। প্রতিবারের মতো আপনি অপরাধীদের ধরতে চাইছেন বলে তারা সতর্ক থাকতে আমাদের ওপর নজর রাখবে— তেমন কিছু নিশ্চয়ই না। তা হলে?’
‘সেটা বোঝার মতো কারণ এখনও পর্যন্ত ঘটেছে কি? ঘটেনি। সুতরাং ওর মোটিভ জানতে হলে অপেক্ষা ছাড়া আপাতত পথ নেই।’
‘সেই মোটিভটা কি প্রোফেসর শঙ্কু সম্পর্কিত?’
ফেলুদা উত্তর দিল না। তার বদলে বলল, ‘আমাকে সবচেয়ে বেশি কী ভাবাচ্ছে জানেন?’ চারমিনারের টুকরোটা জানালা দিয়ে বাইরে ফেলে ও খাটে এসে বসল। ‘মানিকবাবু কী বলেছিলেন তোর মনে আছে তোপসে? প্রোফেসরের বাড়ির দেখাশোনা কে করেন?’
‘হ্যাঁ, অবিনাশবাবু।’
‘অবিনাশবাবুটি আবার কে ভাই?’ লালমোহনবাবু জিজ্ঞেস করলেন।
আমি বললাম, ‘প্রোফেসর শঙ্কুর প্রতিবেশী।’
‘একজন বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক, তা সে যত প্রচারবিমুখই হোন না কেন, তাঁর বাড়ির ওপরে প্রতিবেশীর এরকম অধিকার? আর এইসব বাড়ি সাধারণত হেরিটেজ প্রোপার্টির আওতায় পড়ে। সোজা কথায় বলতে গেলে সরকারের সম্পত্তি। পনেরো বছর যাবত নিখোঁজ কোনও পাবলিক ফিগারের বাড়ির মালিকানা ভোগ করছেন এক প্রতিবেশী, অঙ্কটা কি মিলছে?’
আমি কেমন ধন্ধে পড়ে গেলাম। ‘কিন্তু তা হলে যদি ধরো অবিনাশবাবুকে প্রোফেসর বাড়িটা দান করে গেছেন?’
‘যদি তাই হয়— কেন? আর কখন? নিখোঁজ হওয়ার আগেই কি? প্রোফেসর কি ইচ্ছে করেই গা ঢাকা দিয়ে আছেন? খুব শিগগির ফেরার সম্ভাবনা নেই জেনেই কি অবিনাশবাবুকে বাড়ির ভার দিয়ে যেতে হল?’
‘মানিকবাবু কিছু জানতে পারেননি এ ব্যাপারে?’
‘না। তাই কাল অবিনাশবাবুর সঙ্গে দেখা করে ভিতরের কথা আমাদেরকেই বার করতে হবে। প্রোফেসরের প্রজেক্টের কাজে এর নিশ্চয়ই একটা জোরালো ভূমিকা আছে।— তোরা জাগিস না আর, শুয়ে পড়। লালমোহনবাবু, হজমি খাবেন বলছিলেন না?’
‘আপনার চিন্তার সঙ্গে সমানতালে দৌড়তে গেলে যে পরিমাণ মানসিক পরিশ্রম হয় ফেলুবাবু, তাতে আর ও বস্তুটির দরকার পড়ে না। যা ইনপুট করেছিলুম, সব বার্ন হয়ে গেছে।' আরও কী সব বিড়বিড় করতে করতে উঠে গেলেন ভদ্রলোক।
(ক্রমশ)
***
৬.
আমাদের কটেজ থেকে উশ্রী প্রায় বারো কিলোমিটার রাস্তা। প্রোফেসর শঙ্কুর বাড়িটা তার কিছু আগেই পড়ে। গাড়ির ব্যবস্থা করতে কাউন্টারে বলে দেওয়া ছিল, কিন্তু ভোর হতেই এমন তুমুল বৃষ্টি নামল যে বেরোনোটা ভেস্তে যায় কি না তাই ভাবছিলাম। শেষমেষ বৃষ্টি থেমেছে সোয়া দশটা নাগাত, আর আমাদের জিপ এল সাড়ে দশটায়।
জিপের ড্রাইভারটি স্থানীয় বাঙালি। অল্পবয়সী লোকটির নাম রতন সাহা। বকবক করে বেশ, এ অভ্যেসটা টুরিস্টদের গাইড হিসেবে কাজ করার দরুন কি না কে বলবে। সর্বক্ষণ মুখে হাসি লেগে রয়েছে। ফেলুদাকে চেহারায় চিনতে পারল কি না ঠিক বোঝা গেল না, তবে দাঁত বার করে যে হাসিটা দিল তার দাম লাখ টাকা।
এদিকটা ঠিক যাকে বলে সমতল নয়। চড়াই-উতরাই ভাঙতে হচ্ছে ক্রমাগত। এবড়ো-খেবড়ো কাঁচা রাস্তা; তাতে জল জমে একেকটা ডোবার সৃষ্টি হয়েছে, দু'পাশে সবুজ শাল-মহুয়ার জঙ্গল— মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের জিপ। ঘরবাড়ি লোকালয় বাজার স্কুল খেলার মাঠ দোকানপাট সবকিছুর মাঝে চোখে পড়ছে ছোট-বড় লালচে মাটির পাহাড়। ফেলুদা বলল গিরিডি কথাটা নাকি এসেছে ‘গিরি' মানে পাহাড় থেকে। গিরিডির অর্থ তাই দাঁড়ায় পাহাড়ঘেরা জনপদ।
লালমোহনবাবু এদিক-সেদিক দেখতে দেখতে হুঁ হুঁ করে একটা অচেনা গান ভাঁজছিলেন। চেনা অবিশ্যি হলেও হতে পারে, সুরের অ্যানাটমি আমূল পাল্টে গেছে বলে ধরতে পারছি না। এবার সেটা থামিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন, ‘বাতাসে সঞ্জীবনীর ছোঁয়া কী জিনিস, ভাল করে বুঝে নাও তপেশ। সাধে কী অত বড় বড় মানুষ সব এখানে হাওয়া বদল করতে আসতেন?’
সত্যিই চমৎকার হাওয়া দিচ্ছে, মন ভাল হয়ে যায়। গিরিডির আবহাওয়া এমনিতে এই সময়টায় শুষ্কই থাকে, এখন ক'দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় গরমের আঁচও নেই। আমরা এসেছি মার্চের শুরুতে, আর ভালভাবে গরম পড়তে আরম্ভ করবে এপ্রিলে। এখানে শুনেছি গরমের পারদ দারুণ চড়াও হয়, আর তখন বাতাস বেশ আর্দ্র থাকে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুম শুরুর ঠিক আগে আর্দ্রতা বেড়ে যায় খুব।
ফেলুদা বলল, ‘আপনি দেখছি পুরোদস্তুর ড্যানচিবাবুদের মুডে চলে গেছেন।’
‘ও তো আমার এক বাতিক মশাই। সেবার কাশীতে বললুম না— আচ্ছা, এরা ড্যানচি কেন বলে বলুন তো?’
তিলুদি মাথাটা জিপের বাইরে বার করে দূরে এক টিলার গায়ে একটা প্রকাণ্ড গাছের দিকে দেখছিলেন, লালমোহনবাবুর কথা কানে যেতে এবার বললেন, ‘মানুষ যখন পশ্চিমের এদিকে চেঞ্জে আসত, তখন বাজারে গিয়ে সব জিনিসপত্রের সস্তা দর শুনে বলত ‘ড্যাম চিপ’। স্থানীয় লোকেরা তা থেকে চেঞ্জারদের নামই দিয়ে দিল ড্যানচিবাবু।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম’, লালমোহনবাবু কুর্নিশের ভঙ্গিতে বললেন।
আমাদের পৌঁছতে আধঘণ্টার বেশি লাগেনি। জিপে বসে বেশ খানিকটা দূর থেকেই প্রোফেসর শঙ্কুর ধূসর হয়ে যাওয়া এককালের সাদা রঙের দোতলা বাড়িটা চোখে পড়ে, কেন না আসার পথে অন্য যত বাড়ি দেখলাম সে সবই বেঁটে বেঁটে। মূল ফটক ভিতর থেকে বন্ধ। চারিদিকে পাঁচিল তোলা, তার উপর থেকে মাথা উঁচিয়ে আছে গাছগাছালিদের ব্যারিকেড। বাড়িটার যে যথাসাধ্য যত্ন নেওয়া হয় তার চিহ্ন স্পষ্ট হলেও দেয়ালের একেক জায়গায় পলেস্তারা খসে গিয়ে ইঁটে ফাটল ধরে গজিয়ে উঠেছে ছোট-ছোট উদ্ভিদ। পরে কাছে গিয়ে দেখেছি সেগুলো বেশিরভাগই অশ্বত্থের চারা, সঙ্গে নাম না জানা হলদে আর বেগুনি রঙের ফুলও রয়েছে।
আমরা আর এখানে না থেমে রতনের কথামতো অবিনাশবাবুর বাড়ির দিকে চললাম। আমাদের জিপ সামনে গিয়ে বাঁয়ে ঘুরে গেল। প্রোফেসরের বাড়িটা নিরিবিলি জায়গায় হলেও ইতস্তত কিছু বাড়িঘর আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, একটা ছোট ক্ষেতের মতন পেরিয়ে সেরকমই একটা দোতলা বাড়ির সামনে এসে জিপটা থামল।
অবিনাশবাবুর বাড়ি।
বয়সের বেশ চিহ্ন পড়ে গেছে এর গায়ে। নিঝুম, শান্ত জায়গা। আওয়াজ বলতে এক পাখির কিচিরমিচির, আর ভিতর থেকে ভেসে আসা খুব অস্পষ্ট গানের সুর; রেডিয়ো চলছে বোধহয়। একটা বেড়াল ছাতের পাঁচিল বেয়ে কার্নিশে লাফিয়ে পড়ল।
আমরা জিপ থেকে নামলাম।
বাইরের খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে তকতকে পরিষ্কার চওড়া উঠোন— কিছুক্ষণ আগে ঝাঁট দেওয়া হয়েছে মনে হয়। বাড়ির দু'দিকের ঝোপঝাড় এমনই ঘন যে দিনের বেলাতেও এখানে অন্ধকার, রাতে কীরকম দাঁড়ায় জানে কার সাধ্যি। জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই। শুধু খাটো করে ধুতি জড়ানো একটা লোক বারান্দায় বসে বিড়ি বাঁধছিল, আমাদের দেখে কাজ থামিয়ে ভুরু কুঁচকে চাইতে ফেলুদা সামনে এগিয়ে গেল। ‘অবিনাশবাবু বাড়িতে আছেন?’
‘এজ্ঞে। কী দরকার?'
ফেলুদা মানিব্যাগ থেকে নিজের একটা কার্ড বার করে লোকটার হাতে দিয়ে বলল, 'এটা গিয়ে ওঁকে দাও। বলো যে আমরা কলকাতা থেকে এসেছি, একটু দেখা করতে চাই।’
লোকটা ফেলুদাকে একবার আপাদমস্তক দেখে চলে গেল। ফিরে এল দু'মিনিটে। ‘আসেন। বাবু ডাকতেছেন।’
চারজনে ভিতরে ঢুকলাম।
পুরনো আমলের চকমেলানো মেঝে। দেয়ালের রং মলিন হয়ে এসেছে। মাঝারি সাইজের বৈঠকখানার পরে একটা প্যাসেজ, সেটা ধরে এগিয়ে গেলে সার বেঁধে পরপর তিনটে বন্ধ ঘর। ডান দিকে দোতলায় যাবার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে একটা লম্বা বারান্দা। তার পাশাপাশি দুটো ঘর ছাড়িয়ে একেবারে শেষ মাথার দরজায় এসে থামলাম আমরা। লোকটা সে ঘরের পর্দা সরিয়ে উঁকি মেরে বলল, ‘বাবু, এই যে এনারা।'
জানালার দিকে পিঠ করে আরাম কেদারায় এক সৌম্যকান্তি বৃদ্ধ বসে আছেন। বুঝলাম ইনিই অবিনাশবাবু। সুন্দর স্বাস্থ্য ভদ্রলোকের, টকটকে রং; মাথার চুল সব সাদা হয়ে এসেছে, দুয়েকটা কালো থাকলেও দূর থেকে চোখে পড়ার মতো নয়। ভুরুও তেমনই। ঠোঁটের ওপর মোটা একখানা গোঁফ, তবে দাড়ি পরিষ্কার করে কামানো। পরনে মানানসই সাদা পাঞ্জাবি আর পায়জামা। গায়ে একটা চাদর জড়ানো— যদিও এটা শীতকাল নয়। দেখে মনে হয় সিধুজ্যাঠার মতোই বয়স, বা কয়েক বছর বেশি হতে পারে।
আমাদের দেখে হাত বাড়িয়ে পাশের ছোট টেবিলের ওপর রাখা রেডিয়োটা চাপড় মেরে বন্ধ করে চশমার পুরু কাচের ফাঁক দিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন অবিনাশবাবু।
ফেলুদা নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘আমিই কার্ড পাঠিয়েছিলাম। আমার নাম প্রদোষ মিত্র।'
ভদ্রলোকের দৃষ্টি বলতে হবে খুবই ক্ষীণ, কারণ চশমা থাকার সত্ত্বেও চোখ কুঁচকে বেশ কসরত করে ওঁকে ফেলুদার মুখটা ঠিকঠাক করে দেখতে হল। ‘আর এঁরা সব—’
‘আমার বন্ধু লালমোহন গাঙ্গুলী, এটি আমার খুড়তুতো ভাই তপেশ, আর ইনি তিলোত্তমা শঙ্কু।’
অবিনাশবাবু পিছনের সেই লোকটা, যার নাম বলরাম— তাকে ইশারায় চেয়ার আনতে বলে দিচ্ছিলেন, তিলুদির নামটা শুনে তৎক্ষণাৎ চোখ কপালে উঠে গেল।
‘শঙ্কু?’
‘আমি আপনার প্রতিবেশী প্রোফেসর শঙ্কুর খুড়তুতো ভাইয়ের নাতনী’, তিলুদি এগিয়ে গিয়ে ঢিপ করে একটা প্রণাম করলেন।
‘কল্যাণ হোক দিদিভাই— বোসো তোমরা। তা, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না; প্রদোষ মহাশয়ের নামটাম তো বেশ শুনিচি, কিন্তু আমার কাছে—’
ফেলুদা বলল, ‘আমি প্রোফেসর শঙ্কুর অন্তর্ধান রহস্যের তদন্ত করছি।’
‘কী বলচেন!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এবং এই দায়িত্বটা আমাকে তিলোত্তমা দিয়েছেন।’ ভদ্রলোককে শুরু থেকে সব খুলে বলতে হল, ‘কাজেই বুঝতে পারছেন, এ বিষয়ে প্রথমেই আপনার কাছ থেকে কিছু তথ্য সংগ্রহ ছাড়া আমার পক্ষে অগ্রসর হওয়া কোনও উপায় নেই।’
(ক্রমশ)
***
৭.
‘বেশ। তা বলুন কী জানতে চান, আমার তরফ থেকে যথাসাধ্য সহযোগিতা আপনি পাবেন। তার আগে সামান্য জলযোগ হয়ে যাক— আসুন।’ চায়ের সাথে শিঙাড়া রেখে গিয়েছিল বলরাম, সেদিকে দেখিয়ে অবিনাশবাবু বললেন, ‘আপনারা যে এই উদ্যোগ নিয়েছেন, তাতে আজ আমি অন্তর থেকে খুশি হয়েছি। আসলে সময় তো কম হল না— অ্যাদ্দিন দেখিওনি সেভাবে কাউকে শঙ্কুমশাইয়ের খোঁজ করতে। প্রথম প্রথম কত লেখালিখি হল কাগজে; বিদেশ থেকে হপ্তায় হপ্তায় লোকজন আসত, সে এক তোলপাড় কাণ্ড। দিন যত গেল, তত এদের উৎসাহে ভাটা পড়ল, নতুন অনেক খবরের খোরাক তৈরি হল। এক বিজ্ঞানীমহলের বাইরে যে এদেশের আর কেউ পরের দিকটায় ওঁর কাজকে মনে রাখেনি সে কথা আমি হলফ করে বলতে পারি। নামটা এখনও লোকে জানে, তাও ভাগ্যি। জগৎজোড়া খ্যাতির সত্ত্বেও যথার্থ কদর আর হল কই বলুন?’
ফেলুদা প্লেট থেকে একটা শিঙাড়া তুলে নিয়ে কৌতুকের সুরে বলল, ‘গোড়ায় তো আপনিও ওঁর বিশেষ কদর করতেন না যা শুনেছি।’
গা দুলিয়ে হেসে উঠলেন অবিনাশবাবু, ‘তা অস্বীকার করব না। কিন্তু পরে তো বুঝেছিলুম আমার প্রতিবেশীটি কী জিনিস! ওঁর সঙ্গে লেজুড় হয়ে থেকে কত কী যে দেখলুম নিজের চোখে— এখনও ভাবলে স্বপ্নের মতো মনে হয়।’
মূল প্রসঙ্গে চলে গেল ফেলুদা। ‘কিছু জিজ্ঞাসাবাদে আশা করি আপনার আপত্তি নেই।’
‘একেবারেই না।’ অবিনাশবাবু সোজা হয়ে বসলেন।
‘আপনি যেহেতু প্রোফেসরের বাড়িটার রক্ষণাবেক্ষণ করেন, তাই ধরে নেওয়া যায় এর আইনি অধিকার আপনার আছে।’
‘তা আছে।’
‘এই প্রক্রিয়াটি কবে আর কী কারণে সম্পন্ন হল?’
‘এর উত্তর দেবার জন্য আমার মনে হয় পুরো ব্যাপারটা প্রথম থেকে আপনার শোনা উচিত। এতে বরং সুবিধেই হবে। অনেক বছর আগের কথা কি না, আগে হলে স্মৃতির ওপর নির্ভর করে সব বলবার সাহস করতুম না। এখন এই যে করছি— এও কিন্তু শঙ্কুমশাইয়েরই দৌলতে।’
‘কীরকম?’
‘বছর পাঁচেক আগে আমি একবার বড়ধরনের অসুখে পড়ি। বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতা মিলে আমাকে পুরোপুরি কাবু করে ফেলেছিল। শয্যা নিয়েছিলুম এক কথায়, সেরে উঠবার আশা ছিল না। স্মৃতিও ক্রমশ দুর্বল হয়ে আসে। নিজের নাম ভুলে যেতুম, নিজের লোক বলতে তো নেই, চাকরবাকরই যা আছে— কাউকে চিনতুম না। বলরামকে তো দেখলেন, বেচারা তখন একা হাতে সব সামলায়।
‘আপনি শঙ্কুমশাইয়ের আবিষ্কার করা এক রোগনাশক বড়ির কথা জানেন কি? মিরাকিউরল। স্মৃতি পুনরুদ্ধারের জন্য আর কী যেন এক বড়ি— নাম খেয়াল নেই, যা হোক। এগুলো তিনি আমাকে দিয়েছিলেন। বলরাম জানত ব্যাপারটা, প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর আমার এখানে কাজ করার সুবাদে শঙ্কুমশাইয়ের কোনও কেরামতি ওর অজানা ছিল না। ওষুধগুলো বুদ্ধি করে আমায় ও-ই খাওয়ায়, এবং আমি রোগমুক্ত হই।’
ঘরজুড়ে শুধু পাখার ঘটাং ঘটাং শব্দ। আমরা সবাই চুপ। লালমোহনবাবু একবার যেন বলে উঠলেন, ‘ইনক্রেডিবল’। বাইরে কোথাও একটা বেড়াল খ্যাঁচম্যাচ করে উঠল।
‘বেপাত্তা হওয়ার কয়েকমাস আগে— যতদূর মন পড়ে শীতের সময়টাই হবে; শঙ্কুবাবু একটা রকেট বানিয়ে মঙ্গলে গেসলেন। সঙ্গে ছিল ওঁর চাকর প্রহ্লাদ আর বেড়াল নিউটন। ফেরার পর কী এক যন্ত্রের কাজ শুরু করলেন। শুনেছিলুম সেটি ঠিকঠিক আবিষ্কার হলে এতে করে পৃথিবীর মানুষকে নিয়ে কোন সুদূর মুলুকের ভিনগ্রহে পাড়ি দেওয়া যাবে। আমি ওই সময়টায় বড় কুসংস্কারে বিশ্বাসী ছিলুম, কান দিতুম না ওঁর কথায়। তখনও মাথা ঘামাইনি।
‘ক'দিন পর দেখি ভদ্রলোক আমার বাড়িতে দৌড়তে দৌড়তে এসে হাজির। বললেন, এবার নাকি আরও জোরদার পরীক্ষা। সেই গ্রহে গিয়ে মানুষ আর অন্য সব প্রাণী টিকে থাকতে পারে কি না, সেটা তিনি নিজে গিয়ে যাচাই করে দেখবেন। যদি এতে সফল হন, তবে সারা দুনিয়ার মানুষ গ্রহটিকে জানবে দ্বিতীয় পৃথিবী বলে। যন্ত্রের কাজও প্রায় শেষের দিকে।
‘কিন্তু সমস্তটাই হচ্ছে খুব গোপনে। তাবড়-তাবড় বৈজ্ঞানিকেরা জানতে পারলে কাজ পণ্ড করার চেষ্টা করবেন। রেষারেষি যে তেনাদের মাঝে চিরকালই আছে সেটা আমাকে বুঝিয়েছিলেন শঙ্কুমশাই; সুতরাং আগে পরীক্ষা হোক। আমাকে টিপে দিলেন ভাল করে। আজ বুঝতে পারি— আমি, যার কি না ছিল ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে কথা পাঁচকান করে বেড়ানোর অভ্যাস, তাকেই বলতে গেলেন কেন এসব?
‘আসলে আমার সাহায্য না পেলে উনি এক্সপেরিমেন্টের জন্য গা ঢাকা দিতে পারতেন না। আমি জানতুম যে ভদ্রলোক একটু ক্ষ্যাপা গোছের, কিন্তু এই ভিনগ্রহে বসে যন্তর-মন্তর চালানোটা আমার ঠিক ভাল ঠেকল না। তা তিনি তো কোনওদিন আমার কথায় আমল দেননি— সেদিনও দিলেন না।
‘আবারও কিছুদিন হাওয়া। বিদেশ গেলেন কয়েকবার; এরপর যেদিন এলেন, হাতে কিছু কাগজপত্র। বললেন আমার থেকে একটা উপকার চান। কী? ওঁর বাড়ির সমস্ত দায়দায়িত্ব আমায় নিতে হবে। আমি তো যাকে বলে আকাশ থেকে পড়লুম। এ কেমন আবদার! দুজনের মনেই দুজনের জন্য অশেষ স্নেহ ছিল ঠিক— তবু ওঁর সঙ্গে আমার হরহামেশাই খুটখাট লেগে থাকত। তাই এরকম প্রস্তাবে একটু ভড়কে যাওয়া স্বাভাবিক নয় কি?
‘ওদিকে মানুষটি ভয়ানক নাছোড়বান্দা। ওঁর অবর্তমানে বাড়িটা চিড়িয়াখানা বনে যাক তা তিনি চান না, আবার প্রজেক্ট সফল করতে কতদিন লাগতে পারে, সেও নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। এমন যদি হয়, কাজ শেষ করতে লম্বা সময় লেগে গেল; বাড়ি যেমন আছে সেভাবে ফেলে গেলে হয়তো একদিন তাঁকে মৃত ধরে নিয়ে বাড়িখানাকে সরকারি সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করে দেওয়া হবে— যেটা তিনি চাইছিলেন না।
‘গ্রহটার কী একটা বিটকেলে নাম ছিল— সেখানে বসতি গড়া সম্ভব হলেই তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন, তারপর আবার গবেষণায় মন দেবেন। ততদিন যাতে ওঁর বাড়িতে কেউ হাত না দেন, তাই-ই আমায় লিখেপড়ে বুঝিয়ে দেওয়ার এই ব্যবস্থা।’ একটানা এতগুলো কথা বলে অবিনাশবাবু থামলেন।
ফেলুদাকে এত ধৈর্য নিয়ে চুপচাপ কারওর কথা শুনতে আমি কমই দেখেছি। টেবিলের ওপর রাখা গেলাসটার ঢাকনা তুলে ভদ্রলোক ঢকঢক করে অনেকখানি জল খেয়ে গলা ভিজিয়ে নিলেন।
ফেলুদা প্রশ্ন করল, ‘এত আয়োজন করে যে প্রজেক্টের সূচনা হল, তাতে যোগ দিতে প্রোফেসর কবে গেলেন গ্রহটিতে?’
বিষণ্ণভাবে বললেন অবিনাশবাবু, ‘এইখেনে আজও তিমিরেই রয়ে গেছি আমি।’
‘মানে?’
‘পৃথিবীর বাইরে যেতে হলে তো রকেট লাগে মশাই?’
‘লাগে।'
‘তবে শুনুন। তারিখটা পরিষ্কার মনে আছে— তেইশে আষাঢ়; তার আগের রাত্তিরে আমার এক ভাগ্নীর মেয়ে হল, সকালে দেখতে গেলুম। বিকেলের পর ভাবলুম শঙ্কুবাবুকে নিয়ে উশ্রীর দিকে হাঁটতে যাই। বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, গিয়ে দেখি বাইরের দরজা হাট করে খোলা, ভিতরে কারও টিকিটি নেই। নাম ধরে ডাকলুম বারকয়েক। প্রহ্লাদ, বেড়ালটা, কেউ নেই। ঘরে বাতি জ্বলছে, পাখা চলছে, কাজের সরঞ্জাম যেমন যেখানে পড়ে ছিল তেমনই আছে। মায় ছাতের ঘরে টিনের রকেটখানা পর্যন্ত!’
‘সে কী!’
এ ঘটনাকে বিস্ফোরণ বললে বাড়াবাড়ি হবে না।
কেসটা যে এতে ফেলুদার মাথায় একটা নতুন চেহারা নেবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘তা হলেই বলুন মিত্তিরবাবু— তিনি সেখানে গেছেন কি যাননি, বুঝি কী করে?’
তিলুদি এতক্ষণে মুখ খুললেন। ‘আচ্ছা দাদু, আরেকটা যে যন্ত্র দাদু তৈরি করছিলেন, সেটা আপনি দেখেছিলেন?’
‘একবার দেখেছিলুম। সে এক বিশাল ঢাকনাওয়ালা চৌকোনা জিনিস। তবে হ্যাঁ, ভাল কথা, সেদিন ওঁকে ডাকতে গিয়ে আমি কিন্তু ওই যন্ত্রটা দেখতে পাইনি; স্বভাবতই তন্নতন্ন করে সবকটা ঘর খুঁজেছিলুম।’
‘এই যন্ত্রে করে কি কোনওভাবে অন্য গ্রহে যাওয়া যেতে পারে?’
ফেলুদা বলল, ‘যন্ত্রটার গঠনপ্রকৃতি আর কাজ কী তা জানতে পারলে বলা যেত। তবে আপনার যুক্তিটা ফেলে দেবার মতো নয় তিলোত্তমা।’
‘এই রকেটের ব্যাপারটা পরে আপনি কাগজের লোকজনদের জানাননি?’ ফাঁক পেয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘না ভাই। শঙ্কুমশাইয়ের নিষেধ ছিল। শুধু বলেছিলেন ওঁর চলে যাওয়ার পর হৈচৈ পড়ে গেলে যেন তিনি নিরিবিলিতে কোথাও বিজ্ঞানসাধনায় ব্যস্ত, এটুকুই বলা হয়। কে বলতে পারে; তিনি হয়তো সত্যি সেখানেই গেছেন, এর তো কোনও সুরাহা হয়নি— তাই আমি আর আগ বাড়িয়ে মাতুব্বরি ফলাই কেন।’
ফেলুদা হঠাৎ কী যেন মনে পড়াতে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘নকুড় চন্দ্র বিশ্বাস বলে প্রোফেসরের এক চেনা ভদ্রলোক ছিলেন না? যিনি ভবিষ্যৎ দেখতে পারতেন, বিপদ আপদ দেখলে সাবধানও করে দিতেন—’
‘হ্যাঁ। আমিও চিনতুম। মাকড়দায় থাকতেন।’
‘থাকতেন বলতে? এখন থাকেন না?’
‘তিনি তো অনেক বচ্ছর যাবত জলপাইগুড়ির এক চা বাগানে চাকরি করছেন। আমার ভাইপো শিবু ওখানেই থাকে— ওর কাছে জেনেছি।’
‘ভদ্রলোকের সঙ্গে একবার আলাপ করতে পারলে মন্দ হত না। তা প্রোফেসর শঙ্কু যখন এই প্রজেক্টের কাজে ব্যস্ত, সেই নিয়ে উনি কোনও ভবিষ্যদ্বাণী করেননি?’
‘না। কীভাবে করতেন? তার অনেক আগেই যে ক্ষমতাটা ওঁর নষ্ট হয়ে গেল।’
‘বলেন কী!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
‘ব্যাপারটা ঘটল কেমন করে?’
‘অত ভাল করে তো আর জানি না, তবে অধ্যাপকমশাই নিজেই বলেছিলেন আমায় যে নকুড়বাবুর ক্ষমতাটা লোপ পেয়ে যাচ্ছে। ওষুধপত্তরও দেওয়া হয় বিস্তর, লাভ হয়নি। ঠিক যেমনি করে সে ক্ষমতা এসেছিল, তেমনি হুট করেই চলে গেল।’
‘হুঁ।— শঙ্কুবাবুর সঙ্গে সেই সময়ে দেখা করতে কোনও সাহেব এসেছিলেন কি গিরিডিতে?’
‘সাহেব... দুজন প্রায়ই আসতেন, ওঁর বন্ধু, ক্রোল আর সন্ডার্স। কিন্তু নতুন কাউকেও যেন দেখেছিলুম বলে মনে পড়ে। হ্যাঁ হ্যাঁ, শেষের কদিন নিয়মিত আসতেন ভদ্রলোক।’
‘জ্যাকব উইলসন নাম ছিল?’
‘তা হবে, সঠিক বলতে পারি না। স্মৃতিতে আবার মরচে ধরতে আরম্ভ করেছে। একাকিত্বের চেয়ে বড় রোগ আর নেই। সমস্ত গ্রাস করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। এতে মিরাকিউরলেও কাজ দেয় না।’
***
৮.
প্রোফেসর শঙ্কুর বাড়িটা যে কতখানি বড় তা ভিতরে না গেলে বোঝা যায় না। পিছনে বাগান, সামনে অনেকখানি খোলা জায়গা, তার দু'পাশে প্রচুর গাছপালা। দোতলার অংশটা গোল। ছাতের পাঁচিলটা এমনভাবে তৈরি যে দেখে পুরনো কোনও কাসলের মতো মনে হয়।
অবিনাশবাবুর অনুরোধে আমরা দুপুরে ওঁর বাড়িতে খেলাম। তার আগে ভদ্রলোক বললেন কটেজের পাট চুকিয়ে এখানে এসে থাকবার কথা। কোনওরকম ওজর-আপত্তি শুনলেন না। তিলুদিকে বললেন, ‘দিদিভাই, আমার তো সংসার নেই, নিজের লোকজন নিয়ে হৈ-হল্লায় মেতে থাকার সুখ তাই কপালে জোটেনি কখনও। তোমরা এসে পড়াতে আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে—’
এমন আন্তরিক আহ্বান অগ্রাহ্য করা গেল না। তাই জিপটাকে আর আটকে না রেখে আমরা তখনই বেরিয়ে পড়লাম। কটেজের বিল মিটিয়ে মালপত্রসমেত লাঞ্চের মধ্যে ফিরে আসা হল। কাউন্টারে অবিনাশবাবুর বাড়ির ডিরেকশন দিয়ে হরিপদবাবুর জন্য একটা স্লিপ রেখে এসেছে ফেলুদা। খাওয়াদাওয়ার পর ঠিক হল চারজনে এবার ঢুঁ মারব প্রোফেসরের বাড়িতে।
চন্দন নামে এক লোক এ বাড়ির দেখভাল করে। গাট্টাগোট্টা মুগুর ভাঁজা শরীর; লম্বায় ফেলুদারই সমান, চওড়ায় ওর দেড়গুণ। মালী, দারোয়ান এবং কেয়ারটেকার— এই তিনটে ভূমিকা ওকে পালন করতে হয়। শেষ দুটো কাজের জন্য চেহারা অনুযায়ী লোকটার ওপর ভরসা না হবার কোনও কারণ নেই। হীরালাল বলে আরেকজন ওর সঙ্গে রাতে পাহারা দেয়।
সদর দরজার দু'দিকে সিমেন্টে বাঁধানো রোয়াকের মাঝখান থেকে ছ'ধাপ সিঁড়ি উঠে গেছে। সেটা পেরোলে একটা ছোট স্পেসের ডাইনে বাঁয়ে দুটো ঘর। পিছনে বৈঠকখানায় মুখোমুখি সোফা, দেয়ালে একটা বিরাট ঘড়ি, আর বিদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্য থেকে শুরু করে আইনস্টাইনের হাসি-হাসি মুখের পেইন্টিং— কিছুই বাদ নেই। শো-কেসে বিচিত্র সব শো-পিস আর অগুনতি ট্রোফি-ক্রেস্ট-মেডেল— প্রোফেসরের অর্জনের কিঞ্চিৎ নমুনা। বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে একটা প্যাসেজের বাঁ দিকে দোতলায় যাবার সিঁড়ি। ডানে দুটো ঘরের একটা তালাবদ্ধ, ফেলুদা বলল ওটা ল্যাবরেটরি। ঠিক উল্টোপাশেই সিঁড়ির নীচে একসঙ্গে খাবার ঘর, রান্নাঘর। প্যাসেজের শেষ মাথায় প্রহ্লাদের ঘর আর বাথরুম।
দোতলায় প্রোফেসরের শোবার ঘরটা আলো-হাওয়ায় ভরপুর। একপাশে খাট, মাথার ধারে জানালা। অন্যপাশে রিডিং টেবিল, চেয়ার, আর উল্টোদিকে একটা গোদরেজের আলমারি। এই দুইয়ের মাঝখান দিয়ে ব্যালকনিতে যাওয়া যায়। টেবিলের উপর কলমদানি, রাইটিং প্যাড, বইপত্র আর কিছু টুকিটাকি জিনিসের সঙ্গে একতাড়া কাগজ পড়ে ছিল— ভারী গিজগিজে হাতে লেখা নোটস, ফেলুদা সেগুলো নিয়ে নিল। পাশেই স্টাডিরুমের চার দেয়াল জুড়ে চারটে প্রকাণ্ড বুকশেলফ, প্রাচীন আর দুষ্প্রাপ্য সব বইয়ে ঠাসা। মাঝখানে বড় টেবিল, তার উপরেও খাতাপত্র ডাঁই করে রাখা। দক্ষিণে খোলা ছাতের লাগোয়া চিলেকোঠা। প্রোফেসরের রকেটটা একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে এ ঘরে দাঁড় করিয়ে রাখা আছে, সেটা প্রায় সিলিং ছুঁইছুঁই।
আমরা ছাতে এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকে সবুজে ছাওয়া দিগন্তের একটা চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়। ফেলুদা একটা চারমিনার ধরিয়ে বলল, ‘এখনও পর্যন্ত এগোনোর মতো কোনও খুঁটি পাওয়া গেল না।’
আমারও তাই মনে হচ্ছিল। একেই এরকম রহস্যজনক কেস, তার উপর ইনফরমেশন যা পাওয়া গেছে, পর্যাপ্ত নয় নিশ্চয়ই। ফেলুদা আর কী করতে পারে? ওর বুদ্ধি খাটাবার সুযোগ কোথায়?
ফেলুদা নিজেই বলে চলেছে, আমরা সকলে শ্রোতা।
‘আমার ধারণা, ক্রোল আর সন্ডার্স বলে এই দুই বিজ্ঞানীর সঙ্গে যদি যোগাযোগ করা যায় তা হলে কিছু কাজের খবর পাওয়া গেলেও যেতে পারে। ওঁরা প্রোফেসরের বহু অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গী, ওঁর কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তাঁদের ওয়াকিবহাল থাকাটাই স্বাভাবিক। তা ছাড়া প্রোফেসরের কাগজপত্র, ব্যক্তিগত নোট-টোট সব ঘাঁটাঘাঁটি করলে হয়তো আরও তথ্য মিলবে। তিলোত্তমা, আপনার অনুমতি আছে তো?’
‘বলার অপেক্ষা রাখে না।’ তিলুদি বললেন।
‘নকুড়বাবুকেও ফোন করা দরকার। অতিলৌকিক ক্ষমতা হারিয়ে যাবার মানে তো এই দাঁড়ায় না যে প্রোফেসরের সঙ্গে উনি পরে আর সংস্রব রাখেননি! দেখাই যাক না, কী জানতে পারি। তবে আপাতত যা জোগাড় হয়েছে সেগুলো মাথায় পরপর সাজিয়ে নিতে হবে— সব কেমন জট পাকিয়ে আছে।’
লালমোহনবাবু বললেন, ‘আপনার তো প্রকৃতির সান্নিধ্যে গেলে মাথা খোলে। চলুন যাওয়া যাক।’
‘কোথায় মশাই?’
‘কেন, উশ্রী!’
অবিনাশবাবুর বাড়ির উত্তরের কাঁচা রাস্তাটা ধরে শর্টকাটে এগিয়ে, পাখির ডাক আর দূর থেকে ভেসে আসা উশ্রী নদীর ঝিরঝির শুনতে শুনতে মিনিট আষ্টেক মতন এগোলে, একটা মোড়ের পর শালগাছ আর সকালে দেখা লালমাটির পাহাড়সুদ্ধ ঘন জঙ্গল ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সামনে যে দৃশ্যটা চলে আসে তাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগের একটা টুকরো বললে ভুল হয় না।
বিস্তৃত পাথুরে ভূমিরূপ জুড়ে যতদূর চোখ যায় শুধু বিশাল বিশাল পাথরের স্ল্যাব, নানান আকারের, গায়ে শিরা-উপশিরার মতো কারুকার্য— আর কী মসৃণ পালিশ করা চেহারা তাদের! কিছু পাথর তো দেখে মনে হয় শিল্পীর ছেনি-হাতুড়িতে গড়া। রামায়ণ-মহাভারতে বিভিন্ন দুর্গম প্রাসাদের যেমন বর্ণনা পাওয়া যায়, এই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরগুলোর সাথে তার আশ্চর্য মিল। কেল্লার প্রাচীরের মতো মস্ত পাহাড়ের ওপর সবুজ গাছগাছালি মুকুট হয়ে বসে আছে, সেখান থেকে অবাধ গতিতে দুদ্দাড় করে নেমে আসছে উশ্রী ঝরনা।
বরাকরের ভাবশিষ্য এই উশ্রী একটি গিরিখাতের ভিতর দিয়ে এসে চল্লিশ ফুট উচ্চতার পাহাড়ি ঢাল বেয়ে তিনটে ধারায় ঝাঁপিয়ে পড়ে নদী হয়ে বয়ে চলেছে। সামনের ধারাটাতে সবচাইতে বেশি জল, পাশেরটা তার তুলনায় সরু। তিন নম্বর ধারাটা ভাল করে না দেখলে চোখে পড়ে না— সেটা বাকিদুটোর থেকে অনেকখানি দূরে, আর আকারেও ক্ষীণ। এটা উচ্ছলতার সময় নয় বলে অবিশ্যি জলের তোড় শান্ত, কারণ উশ্রীর গতি বাঁধভাঙা হয় বর্ষা মরশুমে। জলটা তখন হলুদ হয়ে যায়, আর সামনের দুটো ধারা মিলে গিয়ে একটা চওড়া ধারায় পরিণত হয়।
লালমোহনবাবু এসেই ঘোষণা করলেন যে এই ‘মনোরম’ ‘শোভাময়’ ‘সুললিত’ পরিবেশে ওঁর মন নাকি পিছিয়ে কয়েকশো বছর আগে চলে গেছে। আসার পথেও ভদ্রলোকের হটশট ক্যামেরাতে ছবি তোলার কথা হচ্ছিল, সেটা মনে করিয়ে দিতে তিনি ভাবালু চেহারায় বললেন, ‘ক্যামেরা কী বস্তু তপেশ? কিছুই না। আমি সূক্ষ্মদেহে এখন যেখানে আছি, তার সামনে এসব নস্যি। আমার তৃতীয় নয়ন খুলে গেছে ভায়া, দেখতে পাচ্ছি, ব্রহ্মমুহূর্তে কোনও রাজা-মহারাজা এইখানটায় কোমরজলে দাঁড়িয়ে পুবমুখী হয়ে গায়ত্রী জপ করছেন— ’
ফেলুদা বলল, ‘এ ধরনের কাব্যি একমাত্র আপনার মতো সাহিত্যিকদের দ্বারাই সম্ভব।’
‘কাব্যির আর কী দেখলেন। আমার বাংলার শিক্ষক; এথেনিয়াম ইনস্টিটিউশনের সেই বৈকুণ্ঠ মল্লিক— উশ্রীর রূপের বর্ণনা দিয়ে যে কবিতা লিখে গেছেন, সেইটে আবৃত্তি না করলে তো এখানে আসাটাই সার্থক হয় না। তিলুদেবী, ভাল করে শুনুন। আপনি বুঝবেন—
বরিষায় প্রমত্তা সে যে পূর্ণযৌবনা
সতত পাষাণক্রোড়ে অধঃধাবমানা,
ছন্দ তুলি দিবারাত্র স্রোতের সহিত
বহি চলে, রত্নাকরে হইতে মিলিত,
প্রণমিছে অনুক্ষণ
শ্রান্ত পর্যটকগণ—
হেরি এ অনিন্দ্য শ্রী
শৈলজা উশ্রী!’
আমরা আমাদের গাড়িতে করেই উশ্রী এসেছি। হরিপদবাবু খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন, দুপুর নাগাত চলে এলেন। বললেন চিরকুন্ডার কাছাকাছি একবার টায়ার পাংচার হয়েছিল, এ ছাড়া আর কোনও ঝামেলা হয়নি।
ফেলুদা বলল ওকে ফিরতে হবে, কিছু কাজ আছে, এক জায়গায় যেতে হতে পারে। ‘তোরা বরং আমাকে অবিনাশবাবুর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে খান্ডুলি পাহাড়টা ঘুরে আয়।’
অতএব তাই করা হল। আমিও ওর সঙ্গে যেতে চাইছিলাম, কিন্তু কাজের সময় কোনওভাবে ব্যাঘাত ঘটালে নির্ঘাত দাবড়ানি খেতে হবে ভেবে আর সাহস হল না। সিগনিফিক্যান্ট কিছু বেরোলে অবিশ্যি ও নিজেই জানাবে।
উশ্রী থেকে খান্ডুলি পাহাড় একেবারে উল্টোদিকে— একুশ কিলোমিটার মতো দূর। পাহাড়টার সারা গায়ে সবুজের গালিচা বিছিয়ে রয়েছে। পাহাড়ের চুড়ো সাধারণত সূঁচালো হয়— এটা ঠিক সে রকম নয়, অনেকটা আগ্নেয়গিরির মতো আধখাওয়া আকারের। কাছেই খান্ডুলি লেকের উপর বাঁধ। শীতকালে এখানে হাজার রকমের পরিযায়ী পাখিদের মেলা বসে যায়। নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে তারা জমায়েত হতে শুরু করে, আর ফিরে যায় এই মার্চেরই শুরুতে। উশ্রীর মতো এখানেও রঙিন জামাকাপড় পরা ক্যামেরা হাতে টুরিস্টের দল আর বুড়ো থেকে বাচ্চাসহ পরিবারও চোখে পড়ে যারা পিকনিক করতে এসেছে। এদের অনেকেই পাহাড়ে চড়ছে, আবার কেউ নামছে। দিনের আলো এখনও ফুরোয়নি দেখে আমরাও পাথরের খাঁজে খাঁজে পা ফেলে উপরে উঠতে লাগলাম। কিছুদূর যেতেই জামাকাপড়ে শ'য়ে শ'য়ে চোরকাঁটা বিঁধতে শুরু করল, লালমোহনবাবুর মতে যেটা ‘নিদারুণ অস্বস্তিকর’। তিলুদি বিরক্ত হয়ে শেষটায় নেমে গেলেন।
পথে একটা চায়ের দোকানে থেমে চা-বিস্কুট খেয়ে এক পশলা বৃষ্টি মাথায় করে ফিরতে ফিরতে হয়ে গেল সাড়ে সাতটা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দেখি ফেলুদাও এসে হাজির। জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার কাজ হল?’
‘দরকারের চেয়েও বেশি।’
***
৯.
ডিনারের পর ফেলুদা বলল, ‘প্রোফেসরের বাগানে চল। তোদের একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার দেখাই।’
সারা সন্ধ্যেটা ফেলুদা আমাদের ঘরে বসে প্রোফেসরের টেবিল থেকে পাওয়া সেই নোটসগুলো পড়েছে। আমি একবার উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছিলাম, যদিও কিছু বুঝতে পারিনি। লালমোহনবাবু আর এদিকটায় আসেননি, বৈঠকখানায় বসে তিলুদিকে ওঁর পরের গল্পের প্লট শোনালেন। ‘বুঝলে ভাই, পুজোর লেখাটায় ভাবছি প্রখর রুদ্রকে গিরিডিতে এনেই ফেলব। নাম হবে ‘গিরিডিতে গ্যাঁড়াকল’, কী বলো? তিলুদেবীর অ্যাপ্রুভাল যেহেতু পাওয়া গেছে তাই তোমার দাদাকে আর ডিস্টার্ব করলুম না।’
খাবার সময়েও ফেলুদার মুখে কুলুপ। শুধু একবার অবিনাশবাবুকে জিজ্ঞেস করল, ‘কাল একবার প্রোফেসরের ল্যাবরেটরিটা খুলে দেখা যায় কি?’
‘অবিশ্যি। আসল কথা হল, আমার ওসব অ্যাসিড-ফ্যাসিডের নামে কলজে শুকিয়ে আসে— তাই তালাচাবিটি লাগিয়ে নিশ্চিন্তি। যে বার আপনাদের রায়মশাই এলেন; অত মানী মানুষ, তাঁর অনুরোধে খুলেছিলুম বটে— কিন্তু ওই প্রথম আর ওই-ই শেষ। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ, সরঞ্জামগুলো বুঝেসুঝে সামলাতে পারবেন। আমার কোনও অসুবিধে নেই।’
প্রোফেসরের বাড়ির বাঁয়ের গলি ধরে বাগানে ঢুকতেই আমাদের সবার চোখ-নাক-কান-মন সব একসাথে ধাঁধিয়ে গেল। এ কোন জগতে এসে পড়লাম রে বাবা! নাম না জানা কত রকম ফুলের গাছে এই ঘুরঘুট্টিতেও বাগানটা পুরো আলো হয়ে আছে, একটানা বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ঘোর লেগে যায়। একটা গন্ধরাজ গাছ দেখলাম, দেড় মানুষ উঁচু— তাতে দুলছে বেগুনি রঙের অজস্র উইস্টেরিয়া ফুল! এমনই মিষ্টি আর তীব্র ঘ্রাণ তার, যে নাক প্রায় অবশ হয়ে আসার উপক্রম হল। তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে আমরা ফলের বাগানে সরে এলাম। আম কাঁঠাল পেয়ারা নারকেল কতবেল লেবু জামরুল ইত্যাদি গাছের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা অদ্ভুত ধরনের গাছ চোখে পড়ল। ফেলুদার ধারণা এটার নাম ‘ম্যাঙ্গোরেঞ্জ'—আম আর কমলার ক্রস ঘটিয়ে তৈরি, যার কথা প্রোফেসরের ডায়রিতে লেখা আছে। গাছে এখন কোনও ফল নেই। যতীন সঙ্গে ছিল, বলল ও যখন প্রথম দিকে এসেছিল, তখন নাকি এ গাছটায় বারোমাস ফল ধরত। পরে হঠাৎ করে নাই হতে শুরু করে।
টর্চের আলো এদিক-ওদিক ফেলে গাছগুলো দেখতে দেখতে আমরা বাগানের পশ্চিম দিকে চলে এলাম।
দূর থেকে অনেকক্ষণ ধরেই জ্বলজ্বলে কী একটা যেন চোখে পড়ছিল। লালমোহনবাবু সেটা দেখে ফ্যাসফ্যাসে গলায় কিছু বলবার চেষ্টা করলেন, তার মধ্যে কয়েকবার শুধু ‘মা তারা’টা অস্পষ্টভাবে শোনা গেল। ফেলুদা মোটেই পাত্তা না দিয়ে সামনে এগিয়ে চলল।
কুড়ি-পঁচিশ পা হাঁটার পর প্রথমবার ব্যাপারটা ভাল করে দেখতে পেলাম।
একটা গাছ।
গোলঞ্চ গাছ।
জ্বলজ্বলে জিনিসটা হচ্ছে এর ফুল।
গোলঞ্চ ফুল নয় মোটেই, সম্পূর্ণ আলাদা কোনও ফুল।
এর পাঁচটা পাপড়ি। ঝোলা ঝোলা। হাতের আঙুলের মতো দেখতে।
এই ফুলটাই ফরফরাসের মতো জ্বলছে আর হাওয়ায় দুলছে।
‘ও মশ-হাই!’
লালমোহনবাবু ঘাবড়েছেন।
‘কী হল?’ ফেলুদা ওঁর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এইটে দেখাতেই তো আনলাম আপনাদের। এ এক বিশেষ রকমের ফুল। কোনও ভয় নেই। আপনি হাত দিয়েই দেখুন না—’
ভদ্রলোক একটু ইতস্তত করে খুব সাবধানে একটা ফুল ছুঁয়ে পরমুহূর্তে দু'পা পিছিয়ে এসে চোখ কপালে তুলে বললেন, ‘এ নির্ঘাত ভূতুড়ে ফুল মশাই, কেমন মটকা মেরে পড়ে আছে,' তারপর হাতদুটো সামনে এনে ঘাড় হেলিয়ে এমন এক ভঙ্গি করে দেখালেন যে ফেলুদাকে বাধ্য হয়েই বলতে হল ফুলটা দেখতে এর চেয়ে ঢের নিরীহ।
তিলুদি বললেন, ‘এই গাছটার কাছে একবার একটা উল্কাপিণ্ড এসে থেমেছিল, জানেন লালমোহনবাবু? সেই থেকে ফুলগুলো এমন হয়ে গেছে। এতে ভূতুড়ে কোনও কারবার নেই।’
‘তাই বলুন!’
আকাশ এখন পরিষ্কার, মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। সামনেই অমাবস্যা, কৃষ্ণপক্ষের চাঁদের দাপটও কম— তাই অসংখ্য ঝিকমিকে তারা ফুটেছে। মরা জ্যোৎস্না ছড়িয়ে আছে গোলঞ্চ গাছটার মাথায়। অদ্ভুত দেখাচ্ছে ফুলসমেত গাছটাকে। ঠান্ডা বাতাসের দমকে আমার গা শিরশির করতে লাগল।
‘এই গাছের ছায়ায় আমি রোজ বসি,’ যতীন বলে উঠল। ‘ম্যালা দিনের অভ্যেস আমার। একবার তো একটা চোরই ধরে ফেলতুম এইখেনে বসে। ব্যাটাচ্ছেলে একটুর জন্যি বেঁচে গেল।’
‘চোর বলতে? সত্যি চোর?’ লালমোহনবাবু অবিশ্বাসের সুরে প্রশ্ন করলেন।
‘মিথ্যে কী করে বলি দাদাবাবু? সে লোক যে চাদরমুড়ি দিয়ে এলে!’
‘বটে?’ ফেলুদা বলল, ‘ঠিক কী হয়েছিল বলো তো?’
‘আজ্ঞে, এক রাতে এই গাছের নীচে বসে ঝিমোচ্ছি। হঠাৎ শুনি পাঁচিলের ওপাশে খুচখাচ, আর ঝুপ করে একটা শব্দ। আমি শিগগির গাছের আড়ালে লুকোই। লোকটা আমায় খেয়াল না করে পা টিপেটিপে যেই বাড়ির দিকে এগোলে, অমনি আমি জাপ্টে ধরলুম। ধস্তাধস্তি হয়। লোকটা আমার মাথায় বাড়ি মেরে ধাক্কা দিয়ে পাঁচিল টপকে পালায়। পরে বাবুর আরেক চাকর, বাঞ্ছারাম, রাতের খাবার নিয়ে এসে দেখে আমি মাটিতে পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছি।’
‘এ কবেকার ঘটনা?’
‘অনেক আগের। তখন সবে কাজে ঢুকেছি।’
‘কদ্দিন আছ এখানে?’
‘বিজ্ঞেনীবাবু চলে যাওয়ার পর থেকেই।’
‘আর সদানন্দ আছে কবে থেকে?’
‘চোর আসবার পরই বাবু ওকে নিলেন।’
‘ওই একবারই এসেছিল চোর?’
‘আজ্ঞে না, আরও দু'চারবার বুঝি— ভিতরে তো ঢুকতে পারেনি তারা, তাই চোর কি না ঠাওর হয়নি। পাড়ার ছেলেপুলেরাও তো গাছের ফল পাড়তে মাঝেসাঝে আসত। আর পাঁচিলের দিক থেকে কোনও আওয়াজ পেলেই সদানন্দ লাঠি বাগিয়ে তেড়ে যেত। তাই চোর যদি আসেও, তাদের পড়িমরি করে ছুট না লাগিয়ে উপায় ছিল না।’
‘তার কাছাকাছি সময়ে এদিককার আর কোনও বাড়িতে চুরি-টুরি হয়েছিল বলে মনে পড়ে?’
‘আজ্ঞে না দাদাবাবু। হলে আমার মনে থাকত।'
‘হুঁ।— তোমাদের পাহারার ব্যবস্থা কী রকম হয়?’
‘দিনে আমি বেশিরভাগই বাগানে কাজ করি, সদরে তালা থাকে। রাত্তিরে সদানন্দ এলে ও বাগানটা দেখে, আমি সামনে বসি। পরে পালা করে একজন ঘুমোলে অন্যজন পাহারা দিই।’
‘বেশ।’
আমরা ফিরতি পথ ধরলাম। ঘড়িতে বলছে পৌনে দশ।
লালমোহনবাবু হাতদুটো বুকের উপর জড়ো করে হাঁটতে হাঁটতে বললেন, ‘কী মনে হচ্ছে?'
‘কী মনে হবে?’ ফেলুদা বলল।
‘এই যে চোর আসাটায় কেমন একটা সাসপিশাস গন্ধ পাচ্ছি।’
‘তা হলে আপনার নাকের তারিফ করতে হয়।’
তিলুদি বললেন, ‘লালমোহনবাবু তো ভুল কিছু বলেননি প্রদোষ। আপনার সন্দেহ হচ্ছে না যে চোর কেন এসেছিল?’
‘চোরের কেন আসার দরকার পড়তে পারে— সেই সম্ভাবনাগুলো আগে ধাপে ধাপে ঝালিয়ে দেখা যাক। এক, স্রেফ টাকাকড়ি হাতানোর উদ্দেশ্যে।’
‘স্রেফ টাকাকড়ির ব্যাপারই যদি হত তবে তো এ পাড়ায় ধনী লোকের অভাব নেই, আর মনে হয় না তখনও ছিল। আমি বাবার কাছে রামলোচন বাঁড়ুজ্যে বলে ছোড়দাদুর এক প্রতিবেশীর কথা শুনেছি, যিনি বিরাট পয়সাওয়ালা লোক ছিলেন।’
‘ছিঁচকে চোরের প্রয়োজনের পক্ষে সাধারণ মানু্ষের বাড়িতে হানা দেওয়াটাই সুবিধেজনক হয় তিলোত্তমা, এবং নিরাপদও।’
‘কিন্তু প্রোফেসর যে এ বাড়িতে এত বছর যাবত থাকেন না, তিনি কেন— কেউই থাকে না— সে কথা জানে না এমন কেউ গিরিডি শহরে থাকা কী করে সম্ভব ফেলুদা, ছিঁচকে চোর হলেও? বিশেষ করে যে সময়ে প্রোফেসরের উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে এত হৈচৈ চলছে।’ আমি বললাম।
‘ভেরি গুড তোপসে,’ ফেলুদা আমার পিঠ চাপড়ে দিল, ‘উত্তর হচ্ছে, সম্ভব না। তাই ধরে নেওয়া যায় যে সে চোর কোনও সহজ মতলবে আসেনি, অর্থাৎ তাকে ছিঁচকে বলা চলে না।’
‘এক ও বাড়ির বৈঠকখানাতেই কিন্তু দাঁও মারার জন্য যথেষ্ট মূল্যবান জিনিসপত্র রয়েছে। বাড়ির মালিকের অনুপস্থিতিতে সে সবের উপর কারওর নজর পড়তে পারে বইকী,’ বললেন তিলুদি।
‘পয়েন্ট। আর তার চেয়েও মূল্যবান হল—’
লালমোহনবাবু হাতের চেটোয় কিল মেরে ফেলুদার মুখের কথা কেড়ে নিলেন, ‘প্রোফেসর শঙ্কুর ইনভেনশনস!’
***
"গিরিডিতে গ্যাঁড়াকল"
১০.
'এগজ্যাক্টলি। এমন এমন ইনভেনশনস, যা সমস্ত বিজ্ঞানবোদ্ধা তো বটেই, কোনও সাধারণ লোকের হাতে পড়লে সে-ও টেরিয়ে যাবে। আর তা থেকে একটা কাঁচা অংক যে তার হাতে আসবে, সে নিশ্চয়ই আপনাকে বুঝিয়ে দিতে হবে না।’
‘নো ফেলুবাবু। তাও ভরসার কথা এই যে, সে লোক আর পরে চুরির চেষ্টা করেনি।’
‘কিংবা চেষ্টা করতে পারেনি,’ ফেলুদা বলল, ‘তার জন্য দায়ী যতীন আর সদানন্দের তৎপরতা।’
‘ভাল কথা—’ তিলুদি বললেন, ‘নকুড়বাবুর সঙ্গে কথা হয়েছিল আপনার?’
‘হয়েছে।’
‘কী বললেন তিনি?’
‘প্রজেক্টটার বিষয়ে অবিনাশবাবুর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারলেন না। নতুন জিনিস যেটা জানা গেছে তা হল, প্রোফেসরকে ওই পৃথিবীসদৃশ গ্রহটার হদিস দিয়েছিল টাফা গ্রহের বাসিন্দারা। টাফা জানেন তো?’
‘জানি।'
আমিও জানতাম, কিন্তু লালমোহনবাবু জানতেন না। ওঁকে বুঝিয়ে দিতে হল।
‘লেখাটা পড়ে মনে হয়েছিল টাফায় প্রোফেসর এক রকম বন্দীই আছেন। সেখান থেকে পৃথিবীতে ফিরলেন কেমন করে, জানতে ইচ্ছে হয়।’ ফেলুদা বলল।
একটা ঘুমন্ত কুকুরকে সতর্কভাবে পাশ কাটিয়ে লালমোহনবাবু বললেন, ‘প্রোফেসরের সাক্ষাত আমাদের কপালে আছে কি না জানি না মশাই— অন্তত এই নকুড়বাবুটিকে কাল্টিভেট করা গেলেও হত। অমন তাজ্জব ক্ষমতার কথা বাপের জন্মে শুনিনি।'
‘কাল পরশুর মধ্যে সে সুযোগ পেলেও পেতে পারেন।’
‘কীভাবে?’ লালমোহনবাবুর চোখ যে চকচক করে উঠেছে সেটা না দেখেই বলে দেওয়া যায়।
‘ভদ্রলোক গিরিডি আসছেন। সব শুনে নিজে থেকেই বললেন যদি তদন্তে কোনও সাহায্য করতে পারেন।’
‘ওরেব্বাস, এ তো উপরি পাওনা হল।’
একটা খচখচানি আমার মাথা থেকে দূর হচ্ছিল না, তাই জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি বিকেলে যে কাজের কথা বলছিলে সেটা কী?’
‘দুটো টেলিগ্রাম করার ছিল।’
‘কাদেরকে করলে?’
‘এটা তোর আন্দাজ করতে পারা উচিত।’
‘সন্ডার্স আর ক্রোল কি?’
‘ইয়েস।’
লালমোহনবাবু বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়েছেন। সঙ্গে ফেলুদাও।
‘প্রদোষ,’ তিলুদি পিছন থেকে ডাকলেন, ‘এ কী— আপনার হাতে কী হয়েছে?’
ওঁর কথা শুনে আমি থমকে পড়লাম। দেখি কনুই অবধি গোটানো ফেলুদার পাঞ্জাবির হাতার নীচটায় একটা স্টিকিং প্লাস্টার লাগানো।
ফেলুদা বলল, ‘ও কিছু না। একটা দোকান থেকে চারমিনার কিনছিলাম, তারই টিনের বেড়ায় ঘষা লেগেছে।’
উত্তরটা কেন জানি না আমার বিশ্বাস হল না।
পরদিন সকালে উঠে দেখি বাইরে গত দু'দিনের বাদলার কোনও চিহ্নই নেই, সূর্যের তাপ বেশ গনগনে। চা খাওয়ার পর অবিনাশবাবু আমাদের ওঁর ঘরে ডেকে নিয়ে দেরাজ থেকে একটা চাবির গোছা বার করে ফেলুদার হাতে দিলেন। ‘এতে শঙ্কুমশাইয়ের ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে শোবার ঘরের আলমারির চাবিও রয়েছে— দেখুন কোনটা কাজে লেগে যায়।’ কোন চাবিটা কীসের সেটা জেনে নিয়ে আমরা প্রোফেসরের বাড়ির দিকে এগোলাম।
ফটকে কড়া নাড়তে যতীন দরজা খুলে দিল।
বৈঠকখানা-প্যাসেজ-বারান্দা পেরিয়ে আমরা ল্যাবরেটরির বন্ধ দরজার সামনে এসে দাঁড়ালাম। ফেলুদা গোছা থেকে নির্দিষ্ট চাবিটা বেছে নিয়ে তালার ফুটোয় ঢুকিয়ে ডাইনে একটা মোচড় দিতেই ঘটাং শব্দ করে আংটাটা খুলে এল। তালাটা পাশের মেঝেতে রেখে ও দরজায় মারল এক ঠেলা।
ক্যাঁ—চ আওয়াজ তুলে দরজার পাল্লাদুটো দু'পাশে সরে যেতেই একটা বিচ্ছিরি বোটকা গন্ধ এসে এমনভাবে আক্রমণ করল যে আমাদের নাকে হাতচাপা দিতে হল।
ভিতরে জমাট অন্ধকার। জানালা যে বন্ধ তা তো জানিই, আর এখন দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের চারটা শরীরের ফাঁক গলে যে বাইরে থেকে আলোর ছিটেফোঁটা ঢুকবে তারও উপায় নেই।
ফেলুদা চৌকাঠ পেরোল। ওর দেখাদেখি আমরাও।
এইবার চোখ কিছুটা অন্ধকারে সয়ে এসেছে। আবছা আবছা দেখতে পাচ্ছি চারপাশটা।
আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছি তার সামনে সাদা চাদরে ঢাকা বিরাট চওড়া একটা টেবিল। ঠিক তার উপরে কড়িকাঠ থেকে নেমে এসেছে লম্বা ডান্ডাওয়ালা বাল্ব, তাতে জড়িয়ে আছে মাকড়সার জাল। টেবিলের ওপাশে একটা ভাঙা চেয়ার।
দরজার ডানপাশে একটা স্টিলের আলমারি। দু'দিকের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে উঁচু উঁচু সব শেলফ। এদেরকেও ঢেকে রাখা হয়েছিল, কিন্তু খসে পড়া চাদরের আড়াল থেকে কয়েকটা বোতল উঁকিঝুঁকি মারছে। কোনায় একটা সিন্দুক।
মেঝেতে পড়ে থাকা টুকরো টুকরো আবর্জনা আর পোকামাকড় বাঁচিয়ে হেঁটে গিয়ে ফেলুদা জানালা দুটো খুলে দিল। মুহূর্তেই ঘরের ভিতরটা রোদে ধুয়ে গিয়ে সমস্ত কিছু স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠল। জানালা দিয়ে বাইরে বাগানের একটা অংশ দেখা যাচ্ছে। ওই তো কাল রাতে দেখা সেই গোলঞ্চ গাছ। অদ্ভুতভাবে ফুলের রংটা এখন কালো!
ফেলুদা বলল, ‘তোপসে, হাত লাগা। চাদরগুলো তুলে ফেলি।’
তিলুদি আর লালমোহনবাবুও এগিয়ে এলেন। চারজনে মিলে টেবিলের চারদিকে দাঁড়িয়ে চাদরটা আস্তে করে উঁচিয়ে ধরলাম।
‘খেয়াল রাখিস, নীচে সব কাচের যন্ত্রপাতি রয়েছে। সামান্য আঘাতেই ভেঙেটেঙে যেতে পারে।’
চাদরের গায়ে ধুলোর একটা ছাইরঙা পাতলা আবরণ তৈরি হয়েছে। সে ধুলোর তেজকে অস্বীকার করার উপায় নেই, উড়ে এসে যদি একবার নাকেমুখে ঢুকে যায় তবে প্রোফেসরের স্নাফগানের মতোই হাঁচিয়ে মারবে। তাই খুব সাবধানে চাদরটা তুলে নিয়ে দরজার বাইরে চালান করে দিলাম।
একইভাবে শেলফের চাদরগুলোও সরিয়ে ফেলার পর ল্যাবের যে চেহারা দাঁড়াল তা মোটামুটি এই রকম—
ঘুনে খাওয়া টেবিলের উপরটা ডাঁই হয়ে আছে গবেষণার নানান যন্ত্রপাতি দিয়ে। তার মধ্যে কিছু কিছু আমি চিনি, কলেজের ল্যাবরেটরিতে দেখেছি— বিকার, ব্যুরেট, টিউব, কয়েক সাইজের ফ্ল্যাস্ক, ফ্লানেল, টেস্টটিউব, বার্নার, বড় বড় কাচের জার, ম্যাগনিফাইং গ্লাস। নাম না জানা সব তিনকোনা চৌকোনা গোলাকার মরচেধরা ধাতব যন্ত্র, এদের পিছন থেকে বেরিয়ে এসেছে অসংখ্য তার। কয়েকটা খাতা (যার সব পাতা ঝুরঝুরে হয়ে এসেছে, কিছু পোকায় কাটা— পরে হাতে নিয়ে দেখেছিলাম ভীষণ হিজিবিজি নোট), ওষুধের শিশির মতো দেখতে গোটাছয়েক শিশি, টেবিলের নীচে কিছু মোটা পাইপ (লালমোহনবাবু প্রথমে এগুলোকে সাপ ভেবেছিলেন)।
ফেলুদা এবার ঘুরে ঘুরে চারিদিকটা দেখতে লাগল।
শেলফগুলোর সবকটা তাক কেমিক্যাল দিয়ে ভর্তি। কিছু বোতলের রঙ বাদামি বলে ভিতরের পদার্থটি কেমন বোঝা যাচ্ছে না। সবগুলোর গায়েই লেবেল লাগানো থাকলেও নাম পড়া যায় কেবল হাতেগোনা কয়েকটার। কার্বোডায়ালিক অ্যাসিড, বাইকর্নিক অ্যাসিড, টির্যানিয়াম ফসফেট, প্যারানইয়াম পোটেনটেট, একুইয়স্ ভেলোসিলিকা— সব খটমটে নাম।
লালমোহনবাবু ফেলুদার পিছনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নাহ মশাই। এক্ষেত্রে আমি অবিনাশবাবুর সঙ্গে বেশ একমত। অ্যাসিড ইজ যাকে বলে— এক্সট্রিমলি ডেঞ্জারাস।’
শেলফ ছেড়ে এবার ফেলুদা দেয়ালের দিকে এগিয়েছে। হুকে ঝোলানো একটা চার্টের ওপরে তর্জনী বুলিয়ে উঠে আসা ধুলোটা বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে ফেলে ও বলল, ‘চিন্তা নেই, মনে তো হয় বেশিরভাগ কেমিক্যালেরই গুণাগুণ নষ্ট হয়ে গেছে। তবুও কিছু ছোঁবেন-টোবেন না যেন।’
‘ক্ষেপেছেন!’
তিলুদি কোণের সিন্দুকটার সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘এর চাবি তো অবিনাশদাদু দিলেন না।’
‘ওটা লকড?’
‘হ্যাঁ। লকটা বেশ অন্য ধরনের। আগে এমনটা কখনও দেখিনি।’
‘তা হলে বোধ হয় ওঁর কাছে এর চাবি নেই।’
‘আমার কী মনে হয় জানেন, রত্নটা এরই মধ্যে আছে।’
‘ল্যাবরেটরিতে রত্ন?’ লালমোহনবাবু চোখ সরু করে বললেন।
‘নইলে এখানে এরকম জটিল কায়দার লকের কী দরকার?’
***
১১.
‘সেটা তো প্রোফেসরই ভাল বলতে পারবেন, অথবা সিন্দুকের চাবিটা খুঁজে পেলেও জানা যাবে,’ ফেলুদা বলল, ‘আপাতত আসুন— এই আলমারিটা খুলে দেখি ভিতরে কী আছে।’
ফেলুদা আলমারিতে চাবি দিয়ে হাতল ধরে ঘোরাতেই ডালাটা মট্ করে খুলে গেল। ভিতরে কিছু আরশোলার সংসার গড়ে উঠেছিল, আলমারি খোলায় তারা ভীষণ বিরক্ত হয়ে তাকের গা বেয়ে মার্চ করে নীচে নামতে শুরু করল। আলমারির নীচের অর্ধেকটা জুড়ে মোট ছ’টা দেরাজ— রাজ্যের কাগজপত্র আর চামড়ায় বাঁধানো মোটা মোটা খাতা দিয়ে ঠাসা। পোকায় কাটতে কোনওটা বাকি রাখেনি। কিছু পাতার এমনই বেহাল দশা যে ধরতে গেলেই ভেঙে যায়। দেরাজগুলোর উপরের অংশে একটা বড় চৌকো খোপ। ফেলুদা তার ভিতরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী জানি দেখছে। আমি ওর কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিলাম, আর মাথাটা বাঁই করে ঘুরে উঠল। এক সাথে এত সব অচেনা যন্ত্র আমি আগে কোনওদিন দেখিনি!
ফেলুদা আমায় ওর কাঁধের উপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দাঁড়া, আমিই দেখাচ্ছি।… তিলোত্তমা, আপনি একটা রত্ন খুঁজছিলেন না? এখানে একশোরও বেশি যুগান্তকারী রত্ন আছে। আসুন লালমোহনবাবু— এতে অ্যাসিডের কারবার নেই।’
আমরা সকলে গোল হয়ে আলমারির সামনে দাঁড়ালাম। ফেলুদা খোপটা থেকে একটা একটা করে যন্ত্র (হয়তো অস্ত্র, কিংবা গ্যাজেট) বার করে আমাদের দেখিয়ে ডিমনস্ট্রেশন দিয়ে আবার জায়গায় রেখে দিচ্ছে। উদ্ভট সব নাম তাদের— লিঙ্গুয়াগ্রাফ, ক্যামেরাপিড, অমনিস্কোপ, রিমেমব্রেন, অরনিথন, মাইক্রোসোনোগ্রাফ, নিও-স্পেকট্রোস্কোপ। শেষ যন্ত্রটার কার্যকারিতা শুনে লালমোহনবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল।
এরপর বের হল দুটো কিম্ভূতকিমাকার বন্দুক। ফেলুদা বলল, ‘এর মধ্যে একটা নিশ্চয়ই স্নাফগান, আরেকটা অ্যানাইহিলিন। কিন্তু কোনটা যে কী—’
লালমোহনবাবু বললেন, ‘চালিয়ে দেখে নিন।’
‘কার উপর?’
‘অ্যাঁ?’
‘এই অস্ত্র যার দিকে তাক করে মারা হবে; হয় সে চিরকালের জন্য ভ্যানিশ হয়ে যাবে, আর নয় তেত্রিশ ঘন্টা ধরে হাঁচতে থাকবে। এবার গিনিপিগটা কি আপনি হতে চাইছেন?’
লালমোহনবাবু উত্তর দেবার জন্য মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু সে মুখ খোলাই রয়ে গেল, কিছু বলা আর হল না।
কারণ ঠিক তক্ষুনি একটা চিল চিৎকারে আমাদের সকলের কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।
আর সেটা আসছে তিলুদির গলা থেকে।
কারণ আর কিছুই না, একটা আরশোলা বলা নেই কওয়া নেই উড়তে শুরু করেছে।
চিৎকার শুনে লালমোহনবাবু ছিটকে দরজার কাছে চলে গেলেন। আমিও প্রথমে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই, পরে এমন মামুলি ব্যাপার দেখে হাসি পেয়ে গেল। তিলুদিকে টেনে পিছনে সরিয়ে আনতে যাব, এমন সময়ে দু’বার বন্দুকের ঘোড়া টেপার শব্দ শুনলাম।
তাকিয়ে দেখি ফেলুদার দু’হাতে দুটো বন্দুক একই দিকে তাক করা— তিলুদির মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে।
আরশোলা ভ্যানিশ।
‘এইটে হচ্ছে অ্যানাইহিলিন,’ বাঁ হাতে ধরা বন্দুকটা দেখিয়ে বলল ফেলুদা, ‘প্রথমে অন্যটা চালিয়েছিলাম, তাতে কাজ হল না। আরশোলায় তো আর হাঁচতে জানে না! তারপর এটা টিপতেই ওটা গায়েব হয়ে গেল।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ,’ তিলুদি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন— ‘যমদূতের মতো উড়ন্ত আরশোলা আমি বরদাস্ত করতে পারি না। প্যালপিটিশন হয় রীতিমতো।’
‘সে তো বুঝলাম,’ ফেলুদা অ্যানাইহিলিনটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘কিন্তু হাতের টিপটাকে যে শেষমেষ আরশোলা হননে কাজে লাগাতে হবে— এমনটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি।’
লালমোহনবাবু এতক্ষণে আমাদের জটলা ঠেলে ভিতরে এসে ঢুকলেন। ‘ও মশাই, আয়নাহিলিন না কী ওটা একবার দিন তো। বেশ থ্রিলিং ব্যাপার মনে হল।’
ফেলুদা স্নাফগানটা আলমারিতে তুলে রেখে অ্যানাইহিলিনটা লালমোহনবাবুর হাতে দিল।
‘ভালই ওজনদার।’
আমিও ধরে দেখলাম, সত্যিই ভারী।
‘এটা আমার কাছে কিছুক্ষণ থাকলে আপনি মাইন্ড করবেন কি?’
‘তা করব না,’ ফেলুদা বলল, ‘তবে সাবধান। ভুলেভালে ঘোড়াটা টিপে দিলে দেখা যাবে পিস্তল আছে, আপনি নেই।’
‘নো টেনশন স্যার। ওয়েপন হ্যান্ডল করার অভিজ্ঞতা আপনার চেয়ে আমার খানিকটা বেশিই। ভুলে যাবেন না, ও দিকটায় আমার ঝোঁক প্রবল।’ অ্যানাইহিলিনটা রুমালে পেঁচিয়ে পকেটে পুরলেন লালমোহনবাবু।
‘আমি একটু প্রোফেসরের স্টাডিতে বসছি। দেখি অত সব খাতাবইয়ের মধ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে কোনও সূত্র পাওয়া যায় কি না। তোরা চাইলে এ বেলা কোথাও বেড়িয়ে আসতে পারিস।’ দোতলায় এসে বলল ফেলুদা।
লালমোহনবাবুর ইচ্ছে আজ ওঁর এক গিরিডি নিবাসী বন্ধু আশুতোষ সান্যালের সঙ্গে দেখা করেন। ভদ্রলোক এখানকার বেঙ্গলি ক্লাবের সেক্রেটারি। তিলুদি উপরে এসেই কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়েছেন, তাই এখন আর আমাদের সঙ্গে যাবেন না। প্রোফেসরের বেডরুমের আলমারি আর খাটের তলা থেকে তিনি বাক্সপ্যাটরা আর ট্রাঙ্ক বার করে খুলে ভিতরের জিনিসপত্র বার করতে শুরু করে দিয়েছেন। একটু আগে একটা ফটো অ্যালবাম খুঁজে পেয়ে তিলুদি একেবারে ছেলেমানুষের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, এসে আমাদের দেখিয়ে গেছেন ওতে প্রোফেসরের কোলে ওঁর নিজের একটা ছবি আছে।
ফেলুদা বলল বেরোবার আগে যতীনকে ল্যাবরেটরিটা ঝাড়পোঁছ করতে বলে দিয়ে যেতে। ‘ভাল করে বুঝিয়ে বলিস যেন কোনও যন্ত্রপাতি ভেঙে না ফেলে, আর অ্যাসিডের বোতলগুলো না ছোঁয়।’
নীচে নামতে শুরু করে শুনি তিলুদির গলা, ‘প্রদোষ! একবার এদিকে দেখে যান—’
কী হল আবার?
আমরা তিনজনে ও ঘরে গিয়ে ঢুকলাম।
‘এটা কী বলুন তো?’ ছোট্ট চারকোনা একটা জিনিস আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন তিলুদি।
ধুলোর পরত সরিয়ে বুঝলাম, জিনিসটা একধরনের রিমোট। এর দুটো বোতাম। একটা সবুজ আরেকটা লাল। বোতামদুটোর গায়ে একটা করে তীর চিহ্ন আঁকা রয়েছে।
‘এটা কী যন্ত্র ফেলুদা?’
ফেলুদা উত্তর না দিয়ে তিলুদিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় পেলেন এটা?’
‘আলমারির উপরটায়। ওই সুটকেসগুলো নামাতে গিয়ে দেখি জিনিসটা তার এক কোণে পড়ে আছে।’
‘দিন আমাকে।’ ফেলুদা রিমোটটা নিয়ে স্টাডিরুমে গিয়ে ঢুকল।
আশুতোষবাবুর ক্লাস নাইন পড়ুয়া মেয়েটি দেখা গেল জটায়ু এবং ফেলুদা দুজনেরই অন্ধ ভক্ত। ফেলুদাকে আমাদের সঙ্গে না দেখতে না পেয়ে সে মুখভার করে ফেলল। লালমোহনবাবুকে তখন ওর বইগুলোতে সই করে দিতে হল। আশুতোষবাবুর স্ত্রী আমাদের দুপুরে খেয়ে যাবার অনুরোধ করেছিলেন, আমরা কথা দিয়েছি আরেক দিন আসব। ফেরবার সময় আশুতোষবাবু বললেন বেঙ্গলি ক্লাবের সকল সদস্য ফেলুদাকে একদিন তাদের মাঝে পেলে বিশেষ গর্বিত হবেন।
ফিরে এসে বারান্দার মুখে যতীনের সঙ্গে দেখা। আমরা দোতলায় যাচ্ছি, ও কেবল ঝাঁটা ন্যাকড়া আর বালতি নিয়ে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়েছে। ঠিক সেই সময়টাতে একসাথে পরপর রুদ্ধশ্বাস গতিতে যে সব ঘটনা ঘটল, সেগুলো আমার স্মৃতিতে এতটাই দাগ কেটে গেছে যে, কোনওদিন ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। কারণ শুধু আমার নয়, আমি মনে করি থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের জীবনেই দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটির সূচনা তখন হয়েছিল।
সিঁড়ির ন ধাপ পেরিয়ে যেই জায়গায় বাঁকটা উপরের দিকে ঘুরেছে, সেখানটায় পা রাখতেই তিলুদির চিৎকার শুনতে পেলাম— আগের বারের মতোই। আমরা মজা দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম।
‘কী ব্যাপার, আবার আরশোলা উড়ছে বুঝি? এখন কিন্তু আমার কাছে অ্যানাইহিলিন নেই—’ বলতে বলতে ফেলুদা একটা বই হাতে স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে এল। শোবার ঘরের দরজা অবধি গেছে কি যায়নি, ঠিক তক্ষুনি তিলুদি ভিতর থেকে ছুটে এলেন— ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেছে মুখ, তাতে অবর্ণনীয় আতঙ্কের ছাপ; বাইরে এসেই ফেলুদার সঙ্গে দড়াম করে এক কলিশন! আর তাতে যেভাবে তিনি কাটা গাছের মতো নীচে পড়ে যাচ্ছিলেন, বুঝলাম সংজ্ঞা হারিয়েছেন। ফেলুদা শেষ মুহূর্তে এক হাতে তিলুদিকে ধরে ফেললেও টাল হারিয়ে ওঁকে নিয়েই দোতলার সরু প্যাসেজের রেলিংটাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এবার ওদেরকে বিপজ্জনকভাবে রেলিঙে উবু হয়ে থাকতে দেখে এক লাফে সিঁড়ির তিনটে ধাপ পার হয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। কিন্তু ফেলুদাই বাধা দিয়ে চাপা গলায় বলে উঠল, ‘তোপসে, ল্যাবরেটরি! দৌড়ো!’
***
১১.
‘সেটা তো প্রোফেসরই ভাল বলতে পারবেন, অথবা সিন্দুকের চাবিটা খুঁজে পেলেও জানা যাবে,’ ফেলুদা বলল, ‘আপাতত আসুন— এই আলমারিটা খুলে দেখি ভিতরে কী আছে।’
ফেলুদা আলমারিতে চাবি দিয়ে হাতল ধরে ঘোরাতেই ডালাটা মট্ করে খুলে গেল। ভিতরে কিছু আরশোলার সংসার গড়ে উঠেছিল, আলমারি খোলায় তারা ভীষণ বিরক্ত হয়ে তাকের গা বেয়ে মার্চ করে নীচে নামতে শুরু করল। আলমারির নীচের অর্ধেকটা জুড়ে মোট ছ’টা দেরাজ— রাজ্যের কাগজপত্র আর চামড়ায় বাঁধানো মোটা মোটা খাতা দিয়ে ঠাসা। পোকায় কাটতে কোনওটা বাকি রাখেনি। কিছু পাতার এমনই বেহাল দশা যে ধরতে গেলেই ভেঙে যায়। দেরাজগুলোর উপরের অংশে একটা বড় চৌকো খোপ। ফেলুদা তার ভিতরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কী জানি দেখছে। আমি ওর কাঁধের ওপর দিয়ে উঁকি দিলাম, আর মাথাটা বাঁই করে ঘুরে উঠল। এক সাথে এত সব অচেনা যন্ত্র আমি আগে কোনওদিন দেখিনি!
ফেলুদা আমায় ওর কাঁধের উপর থেকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘দাঁড়া, আমিই দেখাচ্ছি।… তিলোত্তমা, আপনি একটা রত্ন খুঁজছিলেন না? এখানে একশোরও বেশি যুগান্তকারী রত্ন আছে। আসুন লালমোহনবাবু— এতে অ্যাসিডের কারবার নেই।’
আমরা সকলে গোল হয়ে আলমারির সামনে দাঁড়ালাম। ফেলুদা খোপটা থেকে একটা একটা করে যন্ত্র (হয়তো অস্ত্র, কিংবা গ্যাজেট) বার করে আমাদের দেখিয়ে ডিমনস্ট্রেশন দিয়ে আবার জায়গায় রেখে দিচ্ছে। উদ্ভট সব নাম তাদের— লিঙ্গুয়াগ্রাফ, ক্যামেরাপিড, অমনিস্কোপ, রিমেমব্রেন, অরনিথন, মাইক্রোসোনোগ্রাফ, নিও-স্পেকট্রোস্কোপ। শেষ যন্ত্রটার কার্যকারিতা শুনে লালমোহনবাবুর মুখ শুকিয়ে গেল।
এরপর বের হল দুটো কিম্ভূতকিমাকার বন্দুক। ফেলুদা বলল, ‘এর মধ্যে একটা নিশ্চয়ই স্নাফগান, আরেকটা অ্যানাইহিলিন। কিন্তু কোনটা যে কী—’
লালমোহনবাবু বললেন, ‘চালিয়ে দেখে নিন।’
‘কার উপর?’
‘অ্যাঁ?’
‘এই অস্ত্র যার দিকে তাক করে মারা হবে; হয় সে চিরকালের জন্য ভ্যানিশ হয়ে যাবে, আর নয় তেত্রিশ ঘন্টা ধরে হাঁচতে থাকবে। এবার গিনিপিগটা কি আপনি হতে চাইছেন?’
লালমোহনবাবু উত্তর দেবার জন্য মুখ খুলেছিলেন। কিন্তু সে মুখ খোলাই রয়ে গেল, কিছু বলা আর হল না।
কারণ ঠিক তক্ষুনি একটা চিল চিৎকারে আমাদের সকলের কানে তালা লেগে যাবার জোগাড়।
আর সেটা আসছে তিলুদির গলা থেকে।
কারণ আর কিছুই না, একটা আরশোলা বলা নেই কওয়া নেই উড়তে শুরু করেছে।
চিৎকার শুনে লালমোহনবাবু ছিটকে দরজার কাছে চলে গেলেন। আমিও প্রথমে থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম ঠিকই, পরে এমন মামুলি ব্যাপার দেখে হাসি পেয়ে গেল। তিলুদিকে টেনে পিছনে সরিয়ে আনতে যাব, এমন সময়ে দু’বার বন্দুকের ঘোড়া টেপার শব্দ শুনলাম।
তাকিয়ে দেখি ফেলুদার দু’হাতে দুটো বন্দুক একই দিকে তাক করা— তিলুদির মাথা থেকে কয়েক ইঞ্চি উপরে।
আরশোলা ভ্যানিশ।
‘এইটে হচ্ছে অ্যানাইহিলিন,’ বাঁ হাতে ধরা বন্দুকটা দেখিয়ে বলল ফেলুদা, ‘প্রথমে অন্যটা চালিয়েছিলাম, তাতে কাজ হল না। আরশোলায় তো আর হাঁচতে জানে না! তারপর এটা টিপতেই ওটা গায়েব হয়ে গেল।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ,’ তিলুদি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন যেন— ‘যমদূতের মতো উড়ন্ত আরশোলা আমি বরদাস্ত করতে পারি না। প্যালপিটিশন হয় রীতিমতো।’
‘সে তো বুঝলাম,’ ফেলুদা অ্যানাইহিলিনটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে দেখতে বলল, ‘কিন্তু হাতের টিপটাকে যে শেষমেষ আরশোলা হননে কাজে লাগাতে হবে— এমনটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি।’
লালমোহনবাবু এতক্ষণে আমাদের জটলা ঠেলে ভিতরে এসে ঢুকলেন। ‘ও মশাই, আয়নাহিলিন না কী ওটা একবার দিন তো। বেশ থ্রিলিং ব্যাপার মনে হল।’
ফেলুদা স্নাফগানটা আলমারিতে তুলে রেখে অ্যানাইহিলিনটা লালমোহনবাবুর হাতে দিল।
‘ভালই ওজনদার।’
আমিও ধরে দেখলাম, সত্যিই ভারী।
‘এটা আমার কাছে কিছুক্ষণ থাকলে আপনি মাইন্ড করবেন কি?’
‘তা করব না,’ ফেলুদা বলল, ‘তবে সাবধান। ভুলেভালে ঘোড়াটা টিপে দিলে দেখা যাবে পিস্তল আছে, আপনি নেই।’
‘নো টেনশন স্যার। ওয়েপন হ্যান্ডল করার অভিজ্ঞতা আপনার চেয়ে আমার খানিকটা বেশিই। ভুলে যাবেন না, ও দিকটায় আমার ঝোঁক প্রবল।’ অ্যানাইহিলিনটা রুমালে পেঁচিয়ে পকেটে পুরলেন লালমোহনবাবু।
‘আমি একটু প্রোফেসরের স্টাডিতে বসছি। দেখি অত সব খাতাবইয়ের মধ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে কোনও সূত্র পাওয়া যায় কি না। তোরা চাইলে এ বেলা কোথাও বেড়িয়ে আসতে পারিস।’ দোতলায় এসে বলল ফেলুদা।
লালমোহনবাবুর ইচ্ছে আজ ওঁর এক গিরিডি নিবাসী বন্ধু আশুতোষ সান্যালের সঙ্গে দেখা করেন। ভদ্রলোক এখানকার বেঙ্গলি ক্লাবের সেক্রেটারি। তিলুদি উপরে এসেই কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়েছেন, তাই এখন আর আমাদের সঙ্গে যাবেন না। প্রোফেসরের বেডরুমের আলমারি আর খাটের তলা থেকে তিনি বাক্সপ্যাটরা আর ট্রাঙ্ক বার করে খুলে ভিতরের জিনিসপত্র বার করতে শুরু করে দিয়েছেন। একটু আগে একটা ফটো অ্যালবাম খুঁজে পেয়ে তিলুদি একেবারে ছেলেমানুষের মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, এসে আমাদের দেখিয়ে গেছেন ওতে প্রোফেসরের কোলে ওঁর নিজের একটা ছবি আছে।
ফেলুদা বলল বেরোবার আগে যতীনকে ল্যাবরেটরিটা ঝাড়পোঁছ করতে বলে দিয়ে যেতে। ‘ভাল করে বুঝিয়ে বলিস যেন কোনও যন্ত্রপাতি ভেঙে না ফেলে, আর অ্যাসিডের বোতলগুলো না ছোঁয়।’
নীচে নামতে শুরু করে শুনি তিলুদির গলা, ‘প্রদোষ! একবার এদিকে দেখে যান—’
কী হল আবার?
আমরা তিনজনে ও ঘরে গিয়ে ঢুকলাম।
‘এটা কী বলুন তো?’ ছোট্ট চারকোনা একটা জিনিস আমাদের দিকে এগিয়ে দিলেন তিলুদি।
ধুলোর পরত সরিয়ে বুঝলাম, জিনিসটা একধরনের রিমোট। এর দুটো বোতাম। একটা সবুজ আরেকটা লাল। বোতামদুটোর গায়ে একটা করে তীর চিহ্ন আঁকা রয়েছে।
‘এটা কী যন্ত্র ফেলুদা?’
ফেলুদা উত্তর না দিয়ে তিলুদিকে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় পেলেন এটা?’
‘আলমারির উপরটায়। ওই সুটকেসগুলো নামাতে গিয়ে দেখি জিনিসটা তার এক কোণে পড়ে আছে।’
‘দিন আমাকে।’ ফেলুদা রিমোটটা নিয়ে স্টাডিরুমে গিয়ে ঢুকল।
আশুতোষবাবুর ক্লাস নাইন পড়ুয়া মেয়েটি দেখা গেল জটায়ু এবং ফেলুদা দুজনেরই অন্ধ ভক্ত। ফেলুদাকে আমাদের সঙ্গে না দেখতে না পেয়ে সে মুখভার করে ফেলল। লালমোহনবাবুকে তখন ওর বইগুলোতে সই করে দিতে হল। আশুতোষবাবুর স্ত্রী আমাদের দুপুরে খেয়ে যাবার অনুরোধ করেছিলেন, আমরা কথা দিয়েছি আরেক দিন আসব। ফেরবার সময় আশুতোষবাবু বললেন বেঙ্গলি ক্লাবের সকল সদস্য ফেলুদাকে একদিন তাদের মাঝে পেলে বিশেষ গর্বিত হবেন।
ফিরে এসে বারান্দার মুখে যতীনের সঙ্গে দেখা। আমরা দোতলায় যাচ্ছি, ও কেবল ঝাঁটা ন্যাকড়া আর বালতি নিয়ে ল্যাবরেটরি থেকে বেরিয়েছে। ঠিক সেই সময়টাতে একসাথে পরপর রুদ্ধশ্বাস গতিতে যে সব ঘটনা ঘটল, সেগুলো আমার স্মৃতিতে এতটাই দাগ কেটে গেছে যে, কোনওদিন ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। কারণ শুধু আমার নয়, আমি মনে করি থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের জীবনেই দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ঘটনাটির সূচনা তখন হয়েছিল।
সিঁড়ির ন ধাপ পেরিয়ে যেই জায়গায় বাঁকটা উপরের দিকে ঘুরেছে, সেখানটায় পা রাখতেই তিলুদির চিৎকার শুনতে পেলাম— আগের বারের মতোই। আমরা মজা দেখবার জন্য দাঁড়িয়ে পড়লাম।
‘কী ব্যাপার, আবার আরশোলা উড়ছে বুঝি? এখন কিন্তু আমার কাছে অ্যানাইহিলিন নেই—’ বলতে বলতে ফেলুদা একটা বই হাতে স্টাডিরুম থেকে বেরিয়ে এল। শোবার ঘরের দরজা অবধি গেছে কি যায়নি, ঠিক তক্ষুনি তিলুদি ভিতর থেকে ছুটে এলেন— ছাইয়ের মতো সাদা হয়ে গেছে মুখ, তাতে অবর্ণনীয় আতঙ্কের ছাপ; বাইরে এসেই ফেলুদার সঙ্গে দড়াম করে এক কলিশন! আর তাতে যেভাবে তিনি কাটা গাছের মতো নীচে পড়ে যাচ্ছিলেন, বুঝলাম সংজ্ঞা হারিয়েছেন। ফেলুদা শেষ মুহূর্তে এক হাতে তিলুদিকে ধরে ফেললেও টাল হারিয়ে ওঁকে নিয়েই দোতলার সরু প্যাসেজের রেলিংটাতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। এবার ওদেরকে বিপজ্জনকভাবে রেলিঙে উবু হয়ে থাকতে দেখে এক লাফে সিঁড়ির তিনটে ধাপ পার হয়ে উপরে উঠতে শুরু করলাম। কিন্তু ফেলুদাই বাধা দিয়ে চাপা গলায় বলে উঠল, ‘তোপসে, ল্যাবরেটরি! দৌড়ো!’
***
১২.
ল্যাবরেটরিতে কী হয়েছে, কেন সেখানে যেতে হবে— এত কিছু বুঝে ওঠার দরকার হল না, কারণ এক মুহূর্ত দেরী না করে ফেলুদার আজ্ঞা পালন করার প্রবণতা আমার রক্তে মিশে গেছে। আমি তৎক্ষণাৎ নীচে ছুটতে শুরু করলাম। এতক্ষণ স্ট্যাচু হয়ে থাকার পরেও লালমোহনবাবু আমার আগেই লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে গেলেন। মাঝে একঝলক উপরে চেয়ে দেখলাম তিলুদিকে কোলপাঁজা করে তুলে নিয়েছে ফেলুদা।
দরজা খোলাই ছিল। তবুও লালমোহনবাবু অ্যাকশনের মুড নিয়ে ল্যাবে ঢুকে দরজার দুই পাল্লায় এমন জোরে ধাক্কা মারলেন যে, আমার মনে হল যেন ও দুটোকে ব্যথায় কঁকিয়ে উঠতে শুনলাম।
আওয়াজটা এসেছে ডানদিক থেকে।
দরজা না, মানুষেরই।
আমরা সেদিকে এগিয়ে গেলাম।
একটা ষণ্ডামার্কা লোক হাঁটু গেড়ে বসে আছে আলমারির সামনে। চাদরমুড়ি দেওয়া।
নাক চেপে ধরে আছে, মুখ যন্ত্রণায় বিকৃত। লালমোহনবাবু জব্বর দিয়েছেন।
মুহূর্তেই একটা তুলকালাম কাণ্ড।
কোণঠাসা হয়ে পড়েছে বুঝতে পেরে লোকটা পকেট থেকে একটা ছোরা বার করে আমার দিকে তেড়ে এল। যোগ ব্যায়ামের সুফলে আজকাল শরীরটা বেশ ফ্লেক্সিবল হওয়ার ফলে আমি তক্ষুনি নিচু হয়ে আক্রমণ বাঁচিয়ে তার ছোরা সমেত হাতটা আলমারিতে চেপে ধরলাম। সে-ও উল্টে আমাকে সরাবার জন্যে কনুই দিয়ে চাপ দিচ্ছিল, এই ফাঁকে লালমোহনবাবু এক প্রচণ্ড ঝটকা মেরে লোকটার হাত থেকে ছোরাটা নিয়ে নিলেন। কায়দা করতে না পেরে লোকটা আমার কোমরের কাছটায় লাথি হাঁকাল, একটুর জন্য বেঁচে গেলাম।
এরই মধ্যে যতীন ঢুকেছে ল্যাবে। সেই মুহূর্তে ওর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে অবাক না হয়ে পারলাম না। আমাকে সরিয়ে লোকটার পেটে ও এক ঘুষি মারতেই লোকটা যতীনের গলা চেপে ধরল। আমি যতীনের গলা থেকে ওর জেঁকে বসা আঙুলগুলো আলগা করবার চেষ্টা করতে লাগলাম— লালমোহনবাবু পকেট থেকে অ্যানাইহিলিন বার করে লোকটার মাথায় মারলেন মোক্ষম এক বাড়ি।
সে ধরাশায়ী হয়ে গেল।
বেহুঁশ নয়। নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে, আর হাত পা নাড়ার চেষ্টা করছে। যতীন কোনও ঝুঁকি নিল না, নিজের কাঁধের গামছা দিয়ে লোকটাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলল।
ফেলুদা ততক্ষণে নীচে নেমেছে। ল্যাবের ভিতরের চিত্রটা দেখে ওর চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
‘তিলুদির জ্ঞান ফিরেছে?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।
‘এখনও ফেরেনি।’
‘এবার?’
‘যতীন, একটা জলের বোতল নিয়ে লালমোহনবাবুর সঙ্গে উপরে যাও। একে আমি দেখছি।’
ভাল রকমের ঘায়েলই হয়েছে লোকটা।
অ্যানাইহিলিনের কাজ কী, আর সত্যি কথা না বললে ওটা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে— সে সব বুঝিয়ে দেওয়ার পর এমনিতেও বেশি চাপাচাপি করার দরকার হল না।
লোকটা একজনের থেকে মোটা অংকের টাকা নিয়ে এখানে এসেছে। নির্দেশ ছিল ল্যাবরেটরির আলমারি থেকে কোনও একটা যন্ত্র বার করে আনতে হবে। সেই একজনটা কে তা জিজ্ঞেস করাতে নাম বলল সুব্রত ভৌমিক। কোথাকার লোক সে জানে না, তবে এর আগেও তার কথামতো সে ছোটখাটো অনেক গোলমেলে কাজ করেছে।
‘যন্ত্রটা চুরি করে কোথায় তার হাতে তুলে দেওয়ার চুক্তি হয়েছিল?’
‘মনোরমা হোটেলে।’
‘একটা ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল, আমার আন্দাজে ভুল হয়নি’, ফেলুদা যে এখনও কী করে এমন নিস্পৃহ গলায় কথা বলছে জানি না। আর এই সুব্রত ভৌমিকই বা কে? তাকে কি ফেলুদা চেনে?
‘তুই এখানে থাক, আমি থানায় খবরটা দিয়ে দিই।’
বেরোবার সময় ফেলুদা বলরামের মুখোমুখি গিয়ে পড়ল।
‘কী হয়েছে?’
‘দাদাবাবু, আপনার টেলিফোন—’
‘এরই মধ্যে? চলো।’
আমি জানি গিরিডি এসে ফেলুদা মোটেই চুপচাপ বসে নেই। প্রথম দিন থেকেই যা সব কাণ্ডকারখানা ঘটে চলেছে, তাতে ওর মস্তিষ্ক একবিন্দুও বিশ্রাম পাচ্ছে না। কিন্তু ও যে কেন আমাদের তিমিরে রেখে সমানে হেঁয়ালি করে চলেছে কে জানে। ফলে আমি আর লালমোহনবাবু ওর ভাবনার সঙ্গে তাল মেলাবার কথা কল্পনাও করতে পারছি না।
‘তোপসে—’ হন্তদন্ত হয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকল ফেলুদা, ‘চলে আয়, বেরোতে হবে। বলরাম, তোমাকে একটি দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি, যতীন যতক্ষণে না নীচে আসছে, তুমি এখানে পাহারায় থাকো। লালমোহনবাবুকে বলে দিও আমরা ফিরে এসে ওঁর সব প্রশ্নের উত্তর দেব।’ এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে ও যেভাবে এসেছিল— ঠিক সেভাবেই বেরিয়ে চলে গেল হরিপদবাবুকে ডাকতে।
এর পরের কয়েকটা মিনিটে ফেলুদা প্রায় ঝড় বইয়ে দিল আমাদের উপর।
গাড়ি বার করা হল। চোরটিকে আমার সঙ্গে পিছনের সিটে তুলে দিল ফেলুদা, আর নিজে বসল সামনে। হরিপদবাবুকে বলা হল ধানবাদ-আসানসোল হয়ে ছুটতে, অ্যাকসিডেন্ট বাঁচিয়ে স্পিডের কাঁটা যতখানি উপরে তোলা যায়। ভদ্রলোক অনেক বছর ধরেই ফেলুদার কার্যকলাপের সাথে পরিচিত। আমাদের অ্যাডভেঞ্চারগুলোতে ওঁর অনস্বীকার্য ভূমিকার কথা না বললেই নয়। তাই দ্বিতীয় কোনও প্রশ্ন না করে অ্যাক্সিলারেটরে পা চেপে ধরলেন তিনি।
হরিপদবাবু যে কত দক্ষ ড্রাইভার সেটা আজ আরেকবার প্রমাণ হয়ে গেল। সামনে থেকে দৈত্যের মতো বিরাট সব ট্রাক আমাদের গাড়ির প্রায় কান ঘেঁষে বেরিয়ে যাচ্ছে, তারই মধ্যে উনি একটানা হর্ন বাজিয়ে গাড়িটাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে চলেছেন। ফেলুদার মুখ ভাবলেশহীন। আমার মনের যা অবস্থা, সাসপেন্সে প্রায় দম বন্ধ হয়ে আসছে। সারা পথ আমার পেটের ভিতর কৌতূহলে ভুটভাট করতে লাগল, কিন্তু টুঁ শব্দটি করলাম না।
পোস্ট আপিসের কাছাকাছি এসে একটা পুলিশের জিপ নজরে পড়ল। সেটা বাঁয়ের রাস্তা থেকে বেরিয়ে আমাদের আগে আগে চলছে।
তারও সামনে একটা সাদা অ্যাম্বাসেডর। স্পিড বাড়িয়ে ছুটছে।
তিনটে গাড়ি এখন প্রায় একই সমান্তরালে।
জিপটা আচমকা কেমন ক্ষেপে গিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করে ডানদিকের রাস্তায় উঠে কয়েকটা পাথর চুরমার করে ঘাসের চাবড়া মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে সামনের গাড়িটাকে ওভারটেক করে তার পথ আটকে টেরচাভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমাদের গাড়িটা থামল তার পিছনেই।
জিপ থেকে কয়েকজন পুলিশ নামল। তার মধ্যে থেকে একজন হাসিখুশি গোঁফওয়ালা পুলিশ এগিয়ে এসে ফেলুদার সঙ্গে হাত মেলালেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ ইন্সপেক্টর রেড্ডি।’
‘ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম মিস্টার মিত্তর!’
‘মনোরমা হোটেল থেকে কোনও আপডেট?’
‘সে লোককে ধরা হয়েছে। আমাদের টিম তাকে নিয়ে এই এসে পৌঁছুল বলে।’ হিন্দিতে বললেন ইন্সপেক্টর।
‘ভেরি গুড', ফেলুদা রেড্ডিকে ছেড়ে সাদা অ্যাম্বাসেডরের দিকে এগোল।— ‘আসুন!’
‘এটা কী হল মিঃ মিটার?’
চোখেমুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে গাড়ি থেকে নামলেন আমাদের গেস্ট হাউস মালিক, শ্রীউমাপ্রসাদ চৌহান।
আমার মুখ আপনা থেকেই আলীবাবার গুহার মতো ফাঁক হয়ে গেল।
‘আমি অত্যন্ত দুঃখিত মিঃ চৌহান,’ ফেলুদা বলল, ‘একটা জরুরি প্রয়োজনে আপনাকে আপনাকে আটকাতে বাধ্য হলাম।’
‘সেটা আপনি গেস্ট হাউসেই কেন মিটিয়ে নিলেন না? কলকাতায় আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট—’
‘স্টিভেন হুপারের সঙ্গে?’
কথাটা শুনে ভদ্রলোকের চেহারা থেকে বিরক্তি উবে গিয়ে এবার একটা বরফ শীতল দৃষ্টি দেখা দিল।
‘মানে?’
ফেলুদার কণ্ঠ তার চেয়েও শীতল। ‘মানে এই যে, আপনি তো স্টিভেন হুপার সাহেবটির সঙ্গে দেখা করতেই তড়িঘড়ি করে কলকাতায় ছুটছেন।’
‘কী বলছেন আপনি? সাহেব কালই আমার গেস্ট হাউস থেকে চলে গেছেন। তার সঙ্গে আমার কী কাজ থাকতে পারে?’
‘যে কাজটার জন্য সাহেব আরও দু'দিন গিরিডিতে থাকতে রাজি হয়েছিলেন।’
‘কী আবোলতাবোল বকছেন আপনি?’
‘আমি এখনও কিছুই বকিনি, তবে বকব। পুলিশের অন্য টিমটা এসে পৌঁছানো পর্যন্ত সেই সময়টুকু দয়া করে আমায় দেবেন।’
‘দেখুন মিঃ মিটার,’ উমাপ্রসাদ অধৈর্য গলায় বলে উঠলেন, ‘এই অ্যাপয়েন্টমেন্টটার উপরে আমার ব্যাবসার একটা বড় ডিল নির্ভর করছে। হাতে বেশি সময় নেই। বিকেলের মধ্যে কলকাতায় পৌঁছতে না পারলে—’
‘স্টিভেন সাহেব আপনার অপেক্ষা না করে ফ্লাইটে চড়ে বসবেন, এই তো?’ ফেলুদা ওর একপেশে হাসিটা হেসে বলল, ‘আর তা হলে প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কার বিক্রি করে আপনি যে অ্যামাউন্টটা আশা করছিলেন, সেটা হাতছাড়া হয়ে যাবে।’
উমাপ্রসাদ গর্জে উঠলেন, ‘রাবিশ! হোয়াট প্রোফেসর শঙ্কু?’
ফেলুদা সে আস্ফালন অগ্রাহ্য করে পিছনে তাকাল। পুলিশের আরেকটা জিপ এসে থেমেছে।
জিপ থেকে পুলিশদের হাতে বন্দী হয়ে যিনি নামলেন তিনি আর কেউ নন।
ট্রেনের টাকমাথা।
***
১৩.
আমার মাথার ভিতর সব গুবলেট হয়ে যাচ্ছে।
ইনিই কি সুব্রত ভৌমিক?
দুজন কনস্টেবল লোকটাকে ধরে ফেলুদার সামনে আনল। এবার ফেলুদা ইন্সপেক্টর রেড্ডিকে ইশারা করতে আর একজন গিয়ে আমাদের গাড়ির দরজা খুলে চোরটিকে ঘাড় ধরে টেনে বাইরে বার করল।
উমাপ্রসাদ বেপরোয়া হয়ে বললেন, ‘কারা এরা?’
‘আপনি চেনেন না এদের? এরাই তো আপনাকে প্রোফেসরের আবিষ্কার হাতানোয় সাহায্য করছিল। সুব্রতবাবু—’ ফেলুদা টাকমাথাকে বলল, ‘আপনি যাকে অ্যাপয়েন্ট করেছিলেন তার স্বীকারোক্তি কিন্তু পাওয়া গেছে, এবার আপনার পালা। এ কাজে আপনাকে কে নিয়োগ করেছিল সেটা আপনি নিজের মুখে বলবেন, না আমিই বলব?’
সুব্রত ভৌমিক পাথরের মতো দাঁড়িয়ে।
‘আপনাকে নিয়োগ করেছিলেন উমাপ্রসাদ চৌহান।’
‘আপনার এ অভিযোগের কী প্রমাণ আছে মিঃ মিটার?’
‘প্রমাণ সুব্রতবাবু নিজেই। তবে তিনি যদি ভেবে থাকেন যে মুখ খুলবেন না, আমাকে নিজের মতো প্রমাণ দেবার চেষ্টা করতে হবে।
‘গত পরশু, অর্থাৎ সতেরোই মার্চ এঁর সঙ্গে একই ট্রেনে আমরা কলকাতা থেকে গিরিডি এসেছি। ট্রেনের প্যাসেজে আমার ভাইটির সঙ্গে সুব্রতবাবুর একটা সংঘর্ষ হয়, যার ফলে অসাবধানবশত ভদ্রলোকের পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড নীচে পড়ে যায়। কার্ডের নামটা ছিল রমেশ মজুমদার বলে একজনের। কিন্তু ট্রেনের রিজার্ভেশন চার্টে আমি সে নামের কাউকে পাইনি, তার বদলে পেয়েছিলাম সুব্রত ভৌমিকের নাম। যেটা আজ এই চোরটির বয়ান মিলিয়ে বুঝতে পেরেছি— সুব্রত ভৌমিক আসলে আমাদের সেই সহযাত্রী, যার পকেট থেকে কার্ড পড়ে গিয়েছিল, এবং পরবর্তীতে যিনি স্টেশন থেকে গেস্ট হাউস পর্যন্ত আমাদের ফলো করছিলেন।’
সুব্রতবাবু যেন বাধা দিতে গিয়েও পারলেন না।
‘রমেশ মজুমদারের প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই ফলো করার ঘটনা থেকে আমার মনে স্বাভাবিকভাবেই একটা প্রশ্ন জাগে। তাই কাল বিকেলে আমি বালিগঞ্জে আমার এক বন্ধুর আপিসে ফোন করে সেই কার্ডের ঠিকানাটা দিয়ে কিছু খোঁজখবর করতে বলি। সে জানায়, সেই কোম্পানিটির কর্ণধার উমাপ্রসাদ চৌহান বলে এক ব্যাবসায়ী, এবং রমেশ মজুমদার ব্যক্তিটি সেখানকার ম্যানেজার।
‘এতটা সমাপতন কি সম্ভব?’
‘এ থেকে আপনি বুঝে গেলেন যে প্রোফেসর শঙ্কুর কী সব নাকি আমি চুরি করিয়েছি?’ উমাপ্রসাদ বিদ্রুপের হাসি হেসে বললেন।
‘আমাকে বলতে দিন উমাপ্রসাদজি,’ ফেলুদার স্বর চাবুকের মতো আছড়ে পড়ল, ‘চুরি আপনি করাননি, বলা ভাল করাতে পারেননি। অ্যাদ্দূর অবধি সবটা আমি সমাপতন হিসেবেই মেনে নিতাম, যদি না এরপর থানায় গিয়ে আপনার কার্যক্রম সম্পর্কে আমার একটা সম্যক ধারণা তৈরি হত। ইন্সপেক্টর রেড্ডির সঙ্গে আমার পরিচয় কানপুরের একটা কেস থেকে। তাঁর কাছ থেকে জানতে পারি উমাপ্রসাদ একটি বড় চোরাচালান র্যাকেটের সাথে যুক্ত। কোনও শক্ত প্রমাণ অবিশ্যি নেই, যা আছে সেগুলো কোর্টে টেকবার মতো নয় বলে আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের খাতায় নাম তার ওঠেনি। গত কয়েক বছরে তার সম্পত্তির পরিমাণ বেড়েছে বহুগুণ, ব্যাবসা রমরমা হয়েছে, গেস্ট হাউস তৈরি হয়েছে। এবং এই প্রতিবারই যে উমাপ্রসাদ প্রশাসনের চোখে ধুলো দিতে সফল হয়েছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
‘আমার সন্দেহটা পাকা হয় এর পরের ঘটনায়। থানা থেকে ফেরার পথে একটি নির্জন গলিতে আমার উপর আক্রমণ হয়। বলাই বাহুল্য, আমি এর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। একটা লোক অন্ধকারের মধ্যে থেকে এসে প্রচণ্ড জোরে আমার কাঁধে আঘাত করে আমায় রাস্তায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দৌড়ে পালাচ্ছিল। আমি তাকে ধরে ফেলি। হাতাহাতিও হয় বেশ। তবে ব্যথার কারণে জুত করতে পারিনি, সে সুযোগে লোকটা পালায়।’
তার মানে এই জন্যেই কাল ফেলুদার হাতটা কেটেছিল!
‘এখানে প্রশ্ন আসে, আমাকে সরানোর দরকার হয়ে পড়ল কার? কোনও তদন্ত চলাকালীন এমন দু-চারটে ঘা খাওয়ার অভ্যেস আমার আছে। কিন্তু যেখানে আমার আগমন একান্তই ব্যক্তিগত কারণে, সেখানে এই হামলা ভাবায় বইকী। এর অর্থ কি এই যে— শীঘ্রই এখানে কোনও দুষ্কর্ম সাধিত হতে চলেছে, আমার উপস্থিতি যাতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে?
‘দুয়ে দুয়ে চার করলে সন্দেহের তীরটা উমাপ্রসাদের দিকেই যায়। তাই আমি ইন্সপেক্টর রেড্ডিকে ওই গেস্ট হাউসের উপর নজর রাখতে অনুরোধ করি— যদিও এতে কতটুকু লাভ হবে জানা ছিল না। কথামতো সাদা পোশাকের পুলিশ মোতায়েন করা হয় সেখানে।
‘উমাপ্রসাদের উদ্দেশ্য কী সেটা ভাবতে ভাবতেই আমার মনে হয় স্টিভেন হুপারের কথা। গেস্ট হাউসের আরেক ভদ্রলোক সেদিন কথায় কথায় বলেন যে সাহেব নাকি গিরিডিতে থাকার মেয়াদ দুদিন বাড়িয়েছেন। সাহেবটির সঙ্গে সেদিন আমার কথা হয়। তিনি বিলেতের একজন ধনাঢ্য ব্যাবসায়ী; কালেক্টর এবং ইমপ্রেসারিও হিসেবেও সুনাম আছে, ভারতীয় একটি ব্যাবসায়ী দলের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গত পনেরোই আসেন কলকাতায়। বৈঠকটির তারিখ ছিল বিশে মার্চ। হাতে সময় থাকায় গিরিডিতে তার একটা ভাল কাজের সুযোগ হতে পারে জেনে তিনি চলে আসেন এখানে। আজ সকালে খবরের কাগজ থেকে জানতে পারি, ব্যাবসায়ী দলের বৈঠকটি বসছে একদিন পিছিয়ে, মানে আজ। সে কারণেই সাহেবের আরও দুদিন গিরিডিতে থাকবার কথা হলেও তিনি কালই কলকাতা ফিরে গেছেন।
‘গিরিডিতে আমার আসার কারণ ছিল প্রোফেসর শঙ্কু সম্পর্কে কিছু রিসার্চ করা। সেখানে যখন আমার পিছনে লোক লাগানো হল, ধারণা হয়, এর মোটিভ কোনওভাবে প্রোফেসর শঙ্কুরই সঙ্গে জড়িত নয় তো? প্রোফেসর শঙ্কুর কথা উঠলেই অবিচ্ছেদ্যভাবে চলে আসবে তার আবিষ্কারের কথা। একজন ব্যাবসায়ী যখন এই সব কিছুর কেন্দ্রে, তখন এই ধারণাটাকে মোটেই অমূলক বলা যায় না। কারণ প্রোফেসর শঙ্কুর আবিষ্কারের বৈজ্ঞানিক মূল্য বাদ দিলেও তার ব্যবসায়িক মূল্য যে আজকের বাজারে কোন মাত্রায় পৌঁছতে পারে, তা চিন্তার বাইরে।
‘এবার সেই আবিষ্কার উমাপ্রসাদজির হাতে এলেও তা এ দেশের চোরাবাজারে বিক্রি করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। তাই সে মাল বিদেশে পাচার করা গেলে তিনি যে শুধু ভাল দামই পাচ্ছেন তা নয়, বরং সব দিক বিবেচনায় এটি নিরাপদ। হাতের কাছে খদ্দেরও রয়েছে, ধনকুবের সাহেব স্টিভেন হুপার।’
টানটান উত্তেজনায় নিশ্বাস চেপে রেখে আছি সকলে। রাস্তা দিয়ে হুশহাশ করে গাড়ির আসা-যাওয়া আর পাখির কিচিরমিচিরটা বাদ দিলে চারিদিকে পিনপতন নীরবতাই থাকত।
ফেলুদা উমাপ্রসাদের সামনে দাঁড়াল। ওর চোখে পলক পড়ছে না। ‘সাহেবের সঙ্গে আপনার যোগাযোগ কী করে হল, তা পুলিশই ভাল বের করতে পারবে। আমি বলছি তার পরের কথা। সাহেবকে আপনি প্রোফেসরের আবিষ্কারটি বিক্রির কথা ভাবেন। কিন্তু চুরিটা কিছুতেই করানো যাচ্ছিল না। প্রোফেসর শঙ্কুর নামটা লোকে আজ প্রায় ভুলতে বসলেও তাঁর বাড়িতে বেয়াড়া উপায়ে চুরির চেষ্টা করলে যে মারাত্মক শোরগোলের সৃষ্টি হবে তাও আপনি জানেন। এদিকে রগচটা সাহেব ক্রমাগত তাগাদা দিয়ে যাচ্ছিলেন। আপনি তার কাছ থেকে দুদিন সময় চেয়ে নেন। তিনিও জিনিসটা নিয়েই দেশে ফিরবেন ভেবে দুদিন থেকে যেতে রাজি হন। কিন্তু মিটিংয়ের তারিখ এগিয়ে আসায় সাহেবকে কালই কলকাতায় রওনা হতে হয়।
‘আপনি ঠিক করেন, যেনতেনপ্রকারেণ আজকের মধ্যেই মাল আপনার হাতে আসা চাই। এতটা ডেস্পারেট হয়েই আপনি কাঁচা চালটা চাললেন উমাপ্রসাদজি। আপনার পরিকল্পনা ছিল এই রকম, আপনি সকাল সকাল বেরিয়ে পড়বেন, চোর সে আবিষ্কার চুরি করে এনে দেবে আপনার রাইট হ্যান্ড ম্যান সুব্রত ভৌমিককে, তিনি চোরাই মাল নিয়ে পথে কোনও একটা নির্দিষ্ট জায়গায় আপনার হাতে সেটা তুলে দেবেন। পুলিশ আপনাকে গেস্ট হাউস থেকে বেরোতে দেখেই আমায় ইনফর্ম করে। তার আগে সুব্রতবাবু যাকে চুরি করতে অ্যাপয়েন্ট করেছেন, সেই লোকটির স্বীকারোক্তি আমাদের হাতে আসে। এবার আপনি বলুন, সুব্রতবাবু।’
সুব্রত ভৌমিকের মাথা হেঁট। সেই অবস্থাতেই তিনি মিনমিন করে বললেন, ‘আমার কিছু বলার নেই।’
‘তার মানে আপনি স্বীকার করছেন আমি যা বলেছি তা সব সত্যি?’
‘হ্যাঁ। আমি যা করেছি সব উমাপ্রসাদজির মদদেই।’
‘মিথ্যে! সব মিথ্যে! এরা মিথ্যে কথা বলছে! আর শুনে রাখুন, আমি কলকাতায় যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু তার সঙ্গে স্টিভেন হুপারের কোনও সম্পর্ক নেই। মনগড়া কথা বলা বন্ধ করুন!’ উমাপ্রসাদ খেঁকিয়ে উঠলেন।
‘মেনে নিলাম এরা মিথ্যে বলছে। কিন্তু গ্র্যান্ড হোটেলের সেই রিসেপশনিস্ট, যে পুলিশকে জানিয়েছে আজ সন্ধ্যে সাতটায় আপনার স্টিভেন হুপারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, তাকে কী বলবেন?’
উমাপ্রসাদকে হঠাৎ কেমন অবসন্ন দেখাতে লাগল। ফেলুদার বাক্যবাণে তিনি ভাল রকম ঘায়েলই হয়েছেন, পালটা যুক্তি দেবার মতো অবস্থা তাঁর আর নেই।
পুলিশ তার কাজ করতে এগিয়ে এল, আমরা আমাদের গাড়িতে গিয়ে বসলাম। তিনজনকে হাতকড়া পরিয়ে যখন জিপে তোলা হচ্ছে, উমাপ্রসাদ হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে হো হো করে হেসে উঠে বললেন, ‘আমার কাজটার মতো আপনার টিকটিকিগিরিও অসম্পূর্ণই থেকে গেল। গুড বাই মিঃ মিটার।’
পুরো রাস্তায় ফেলুদার ভুরু সাংঘাতিক কুঁচকে রইল। একটা অসোয়াস্তি আমার ভিতর থেকে পাক খেয়ে খেয়ে উঠছিল। সকাল থেকে সমস্ত কিছু এত দ্রুত ঘটে গেল যে চিন্তাভাবনা সব এলোমেলো হয়ে গেছে। কী বলে গেল উমাপ্রসাদ লোকটা? অসম্পূর্ণ… অসম্পূর্ণ…
বিদ্যুতের মতো আমার মাথায় খেলে গেল অসোয়াস্তির কারণটা।
ফেলুদা তখনও গম্ভীর। আমি আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলাম না। ‘ফেলুদা, উমাপ্রসাদের প্ল্যান অনুযায়ী সুব্রত ভৌমিক ট্রেন থেকে আমাদের ফলো করতে শুরু করে। কিন্তু আমরা যে গিরিডি আসছি সেটা ও জানল কীভাবে? তার মানে কি—’
‘তার মানে আমাদের পিছনে ফেউ কলকাতা থেকেই লেগেছিল।’
‘কিন্তু কেন? একে তো উমাপ্রসাদের সঙ্গে তো আমাদের কখনও পরিচয়ই ছিল না, তার উপর যেখানে ও চাইলেই নির্ঝঞ্ঝাটে চুরি করতে পারে, সেখানে আমাদের পিছনে লাগার অর্থ আর কারণ কোনওটাই তো আমি খুঁজে পাচ্ছি না।’
‘চুপ।’ ফেলুদা সিটে মাথা ঠেকিয়ে একটা চারমিনার ধরাল।
আমার মাথার মধ্যে হাজার হাজার হুল ফুটছে। এ রহস্য কি এত সহজে মিটে গেল? ফেলুদাকে হটাবার চেষ্টাই যদি হবে তা হলে কলকাতা থেকে ফলো করে গিরিডি কেন আসা? প্রোফেসরের বাড়িতে প্রথমবার কে চোর পাঠিয়েছিল? তিলুদি কী দেখে ভয় পেলেন?
এত সব প্রশ্নের উত্তর এখন কে দেবে?
***
১৪.
আমাদের বিভিন্ন তাক লাগানো পিলে চমকানো অ্যাডভেঞ্চারের শেষে লালমোহনবাবুকে ‘ট্রুথ ইজ স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন’ কথাটা প্রায়ই ব্যবহার করতে দেখেছি। গিরিডির কেসের পর থেকে মনে হয় কেউ যেন আক্ষরিক অর্থেই চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের এই প্রবাদের সত্যতা বুঝিয়ে দিয়েছিল। কতদূর গুছিয়ে লিখতে পারব জানি না, কারণ সেদিনকার ঘটনাগুলো একে একে মনে পড়তেই আমার বুকের ভিতর পুরনো ধুকপুকুনিটা ফিরে আসছে।
এগারোটা নাগাত যখন আমরা প্রোফেসরের বাড়িতে ফিরলাম আকাশ তখন মেঘে ছেয়ে গেছে, টিপটিপ করে বৃষ্টিও পড়তে শুরু করেছে। যতীন সদরের সিঁড়িতে বসে ছিল। আমরা ঢুকতেই সে বলল, ‘তাড়াতাড়ি উপরে যান দাদাবাবু, সবাই খুব ঘাবড়ে আছে।’
‘কী হয়েছে?’
‘সে আমি বলতে পারবনি। আপনারা দেরি না করে গিয়ে দেখুন!’
দুজনে দিলাম ছুট। তিলুদি ভাল আছেন তো?
দোতলায় উঠে একেবারে হকচকিয়ে যেতে হল। অবিনাশবাবু থেকে শুরু করে বলরাম— সবাই রয়েছে প্রোফেসরের শোবার ঘরে। আর প্রত্যেকের চেহারায় একই রকমের ছায়া, যাকে ভয় বলব না কৌতূহল, ঠাহর করতে পারলাম না। লালমোহনবাবু একটা চেয়ারে বসে হাঁটু নাচিয়ে চলেছেন, খুব নার্ভাস হয়ে গেলে সাধারণত তিনি যা করেন। তিলুদি খাটে বসে খাটেরই উপর একটা অংশে মুখ ঘুরিয়ে কী জানি দেখছিলেন, আমাদের পায়ের শব্দ পেয়ে মুখ তুলে চাইলেন। এরকম নিষ্প্রভ দৃষ্টি ওঁর চোখে আমি এ ক'দিনে একবারও দেখিনি।
‘তিলোত্তমা, আপনি ঠিক আছেন?’ ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
‘এদিকে আসুন,’ অদ্ভুত শান্ত গলা।
আমরা এগিয়ে গেলাম।
‘দেখুন।’ খাটের সেই অংশটায় ইঙ্গিত করলেন তিলুদি।
কী দেখতে হবে সেটা বুঝে উঠতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। আর যখন বুঝতে পারলাম— অমনি আমার হাত পা জমে গেল।
তিনটে ছোট্ট ছোট্ট পুতুল শুইয়ে রাখা আছে সেখানে। দুটো ছ ইঞ্চি সাইজের, আরেকটা তিন ইঞ্চির বেশি হতেই পারে না।
এত নিখুঁত করে গড়া হয়েছে এদের যে পুতুল না বলে মানুষই বলা ভাল।
দুটো মানুষ। একটা বেড়াল।
এদের চোখ বন্ধ। যেন ঘুমোচ্ছে।
এর মধ্যে একজনকে আমি চিনি।
প্রোফেসর শঙ্কু। ছবিতে যেমন দেখেছি— সেই এক মুখ, রোগা প্যাকাটি চেহারা, লম্বা দাড়ি, চোখে রাউন্ড ফ্রেমের সোনার চশমা, মাথায় টাক, কানের দু'পাশে অল্প চুল।
ধুতি আর ফতুয়া পরা পরের পুতুলটাকে না চিনলেও বলতে পারি, এটি আর কেউ না, প্রোফেসর শঙ্কুর বিশ্বস্ত ভৃত্য প্রহ্লাদ।
বেড়ালটা সন্দেহাতীতভাবে নিউটন।
‘মাই গড!’ ফেলুদা সচরাচর তেমন অবাক না হলেও এই মুহূর্তে আর নিজেকে সামলাতে পারল না, ‘এ যে অবিকল প্রোফেসরের বর্ণনায় লিন্ডকুইস্টের তৈরি পুতুলের মতো!’
‘পুতুল নয় প্রদোষ,’ তিলুদি বললেন, ‘কাছে এসে দেখুন।’
ফেলুদা মন্ত্রমুগ্ধের মতো সটান মেঝেতে বসে পড়ে পুতুলগুলোকে কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করল। আমার মনের অবস্থা কহতব্য নয়। আড়চোখে লালমোহনবাবুকে দেখলাম, তিনি হাঁটু নাচানি থামিয়ে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে আছেন।
প্রায় এক মিনিট পর ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘বুক ওঠানামা করছে তিনজনেরই।’
একটা মরা মানুষকে জ্যান্ত হয়ে উঠে বসতে দেখলেও আমার এভাবে গায়ে কাঁটা দিত না।
এগুলো তা হলে পুতুল নয়। সত্যিকারের মানুষ!
আমার মনে হল আমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছি।
‘কোথায় ডিসকভার করলেন ব্যাপারটা?’ ফেলুদার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে।
তিলুদি খাটের নীচ থেকে একটা ধাতব ভারী বাক্স বার করে ফেলুদাকে দিলেন। বাক্সটা লম্বায় এক হাত, সাধারণ সুটকেসের সঙ্গে এমনিতে কোনও তফাত চোখে পড়ে না, মসৃণ চকচকে গা। ডালাটা খোলার পর দেখি ভিতরটা গিজগিজ করছে খুদে খুদে তার, নল আর যন্ত্রপাতিতে, যেগুলো গিয়ে জুড়েছে অর্ধবৃত্তাকার নীল রঙের কাচ দিয়ে ঢাকা তিনটে লম্বা খোপে।
‘আপনি তখন স্টাডিতে। আমি দাদুর সুটকেসগুলো খুলে এক এক করে দেখছিলাম। আলমারির উপর থেকে সবার শেষে এই বাক্সটা বেরোয়। বাকি সব বাক্সের তুলনায় এটা একটু অন্য রকম। খুলে দেখি এর ভিতরে অসংখ্য কলকব্জা। এই খোপ তিনটের মধ্যে ছিল এই তিনজন। পুতুল ভেবে এদের হাতে তুলে নিতেই আমার বুকটা কেঁপে উঠল। বরফের মতো ঠান্ডা গা— এ কোন ধরনের পদার্থ দিয়ে তৈরি পুতুল? তারপর পুতুলগুলোকে হাতের তালুতে শুইয়ে চোখের খুব কাছে এনে আমি লক্ষ করি, এদের নিশ্বাস-প্রশ্বাস চলছে! সেই মুহূর্তে আমার বোধশক্তি সব লোপ পেয়ে যাচ্ছিল। ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠি। কোনওমতে আবার বাক্সে ভরে বাইরে গিয়ে আপনাকে খবরটা দেব—’
‘বুঝতে পেরেছি।’
ফেলুদা অস্থিরভাবে পায়চারি করতে লাগল। বাকিদের কী দশা জানি না, আমার মনে হচ্ছে আমার হৃৎপিণ্ডটা বুঝি বুক ছেড়ে গলার কাছে উঠে এসেছে। মিনিট পাঁচেক এভাবে ঘরময় ঘুরে বেড়ানোর পর খাটের কাছে থেমে পুতুলগুলোর (নাকি মানুষ?) দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ ওর চোখদুটো জ্বলে উঠল। নিচু গলায় বলতে শুনলাম, ‘আমি নিশ্চিত, এটাই একমাত্র রাস্তা।’
আমরা সব নির্বাক দর্শক।
কেউ কিছু বুঝে উঠতে পারার আগেই ফেলুদা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখলাম ও গিয়ে প্রোফেসরের স্টাডিতে গিয়ে ঢুকল। দশ সেকেন্ডের মাথায় আবার এ ঘরে চলে এল, হাতে সকালের সেই রিমোট।
ওর পরের কাজকারবার আরও রহস্যজনক। তিলুদিকে খাট থেকে উঠে দাঁড়াতে বলে তিনটে পুতুলকে ফেলুদা এমনভাবে সরিয়ে রাখল, যেন প্রত্যেকের মাঝখানে কিছুটা জায়গা ফাঁকা থাকে। তারপর প্রোফেসরের পুতুলের কাছে রিমোট নিয়ে গিয়ে সবুজ বোতামটা টিপল।
ওটা কী?
একটা সূক্ষ্ম কম্পন দেখা দিল পুতুলের দেহে।
কম্পনের সঙ্গে সঙ্গে এবার সেটা আকারে বাড়তে লাগল।
বেড়েই চলেছে।
দেহটা বাড়তে বাড়তে স্বাভাবিক মানুষের আকারে পৌঁছতেই কম্পন থেমে গেল।
আমরা বিস্ফারিত চোখে দেখলাম, খাটে ঘুমিয়ে আছেন স্বয়ং প্রোফেসর শঙ্কু।
‘ছোড়দাদু!’
‘শঙ্কুমশাই!’
তিলুদি আর অবিনাশবাবু এক সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠলেন।
‘আস্তে—’ ফেলুদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বোঝাল, ‘ইনি ঘুমোচ্ছেন। আচমকা ঘুম ভেঙে গেলে ওঁর শরীর কীভাবে রেসপন্স করবে তা আমরা জানি না।’
আমার গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না, চোখের সামনে সব কিছু ঘোলাটে দেখছি। লালমোহনবাবু চেয়ার থেকে উঠে আবার ধপ করে বসে পড়লেন। ফেলুদা প্রোফেসরের নাড়ি ধরে বলল, ‘সামান্য ধীরে চলছে।’
এর পর প্রহ্লাদ আর নিউটনকেও একইভাবে পুতুল থেকে স্বাভাবিক আকারে ফিরিয়ে আনা হল। তিলুদি প্রোফেসরের মাথার পাশে বসে তাঁর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।
‘নিবারণ ডাক্তারকে একটা খবর দেব?' অবিনাশবাবু কাঁপা স্বরে প্রশ্ন করলেন।
ফেলুদা বলল, ‘সেই ভাল। এক্ষুনি কাউকে পাঠিয়ে দিন। তবে ঘটনাটা আপাতত যেন বাইরের কারও কানে না যায়।’
বলরাম ডাক্তার ডাকতে চলে গেল।
আমার ধাতস্থ হতে বেশ সময় লাগল। খানিকটা জোর করেই নিজেকে স্টেডি করার চেষ্টা করে ফেলুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এ সমস্ত তুমি কীভাবে করলে?’
‘আমি আসলে কিছুই করিনি রে তোপসে। ভাগ্যিস কাল রাতের সেই খাতাটা পড়ে রিমোটের কাজটা জানতে পেরেছিলাম!’
‘কোনও জিনিসকে আকারে বড় বা ছোট করে দেওয়া?’
‘হ্যাঁ। এটাই প্রোফেসরের তৈরি সর্বশেষ গ্যাজেট। এর নামকরণ করা হয়েছিল শ্যাঙ্কমোট। এই যে বোতামদুটো দেখছিস— এ দুটো কোনও ব্যক্তি বা বস্তুর দিকে তাক করে টিপলে যন্ত্রটার ভিতর থেকে দু ধরনের রশ্মি বেরিয়ে এসে তাদের মলিকিউলার স্পেস বাড়িয়ে অথবা কমিয়ে দেয়। সবুজটার কাজ আকার বাড়িয়ে দেওয়া, আর লালটা তার উল্টো। যে জিনিসটার আকার তুই পরিবর্তন করতে চাইছিস, বোতামের উপরের এই তীর চিহ্নটা সেই দিকে ঘুরিয়ে নিতে হবে। নোটসের ফাঁকে ফাঁকে প্রোফেসর যা লিখেছিলেন তা থেকে বোঝা গেল, যে নতুন যন্ত্র আবিষ্কারের কথা অবিনাশবাবু আমাদের বলেছিলেন— এর নাম আদপে ক্রায়োজেনোসেল।’
‘সেটি কী জিনিস?’ লালমোহনবাবু বলে উঠলেন।
‘মনে করুন, আপনি এই মহাবিশ্বের কোনও এক গ্রহে পাড়ি দিচ্ছেন। পৃথিবী থেকে সেখানে পৌঁছতে অনির্দিষ্টকাল লেগে যাবে। এই দীর্ঘযাত্রায় যে আপনি গ্রহ উপগ্রহের মধ্যে দিয়ে মহাশূন্যে ভেসে চলেছেন, থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী এ সময়ে বয়স ধীরগতিতে বৃদ্ধি পেলেও একেবারে স্থির থাকে না। তাই আপনি বুড়ো হয়ে যেতে পারেন, রসদ ফুরিয়ে আসতে পারে, কিংবা সে গ্রহে পৌঁছবার আগে কোনও শারীরিক জটিলতায় মৃত্যুও ঘটতে পারে। এরই সলিউশন হল ক্রায়োজেনোসেল। যার ক্রায়োস্লিপ চেম্বার, সোজা বাংলায় ধরুন শীতলঘর— রাসায়নিক এবং বৈদ্যুতিক প্রক্রিয়ায় আপনাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে দেহের তাপমাত্রা এমন এক পর্যায়ে নামিয়ে আনবে যাতে সেখানে কোনও বিকার না ঘটে। গন্তব্যে পৌঁছে অবশেষে আপনাকে জাগিয়ে তোলা হবে।’
‘ওই বাক্সটা কি এই যন্ত্রেরই মিনি সংস্করণ নাকি মশাই?’
ফেলুদা গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তাই হয়তো হবে। নোটসেই পেলাম— ক্রায়োজেনোসেল আবিষ্কারের পর প্রোফেসর দেখলেন তাঁর রকেট যে পরিমাণ ভার বইতে পারে, এর ওজন তার চেয়ে অনেক বেশি। এই বিপত্তি থেকে উদ্ধার পেতে পরবর্তীতে তৈরি হল শ্যাঙ্কমোট। তাই আমার মনে হল যদি প্রোফেসরদের আগের আকারে ফিরিয়ে আনতে হয়, এই রিমোটই সেই কাজটা করতে পারবে।… অবিনাশবাবু, আপনি তো দেখেছিলেন সেই যন্ত্র। এই বাক্সটা ভাল করে দেখুন তো চিনতে পারেন কি না?’
অবিনাশবাবু সময় নিয়ে বাক্সটা উল্টেপাল্টে পরখ করে বললেন, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, এইটেই। মনে পড়ে— শঙ্কুমশাইকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, যন্ত্র বানাবেন বানান, তাতে সাহেবদের কফিন ঢোকানোর দরকার কী ছিল?’
যাকে এতক্ষণ আমরা খোপ ভাবছিলাম, বুঝলাম সেই ক্রায়োস্লিপ চেম্বারের কথা বলছেন তিনি।
‘দাদু নড়াচড়া করছেন—’ তিলুদির ফিসফিসিয়ে বললেন। আমরা খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফেলুদা প্রোফেসরের গায়ে হাত দিয়ে বলল, ‘তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে আসছে।’
‘পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে গেলে কি দাদু জেগে উঠবেন?’
‘উঠবেন।’
ফেলুদার বিশ্বাসকে সত্যি প্রমাণ করে প্রোফেসর ত্রিলোকেশ্বর শঙ্কু মিনিট কয়েক পর চোখ মেললেন।
***
১৫.
প্রোফেসরের ঘুম ভাঙবার পর ঘরের মধ্যে এতজন অচেনা মানুষ আর তিলুদিকে দেখে ওঁর যা প্রতিক্রিয়া হল এবং ফেলুদা যেভাবে তাঁকে শান্ত করে ধৈর্য ধরে সব ব্যাখ্যা করল, তা দিয়েই আলাদা একটা গোটা উপন্যাস হয়ে যায়। শুধু বলে রাখি, সব কিছু শোনার পর প্রোফেসর সে রকম বিচলিত হলেন না। ছেলেবেলায় রিপভ্যান উইংকলের গল্প পড়েছিলাম— প্রোফেসর যদি আশ্চর্য সংযমী এবং স্থিতধী না হতেন, ওঁর পরিণতি সেই গল্পের মতোই হতে পারত।
প্রহ্লাদও জেগে উঠল একটু পর, আর সবশেষে নিউটন। উঠেই সে গিয়ে সুট করে ঢুকে গেল প্রোফেসরের কোলে, আর ফ্যাঁসফ্যাঁস আওয়াজ করতে লাগল। খেয়াল করলাম বেড়ালটা একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। প্রহ্লাদ শুরুতে কিছু বুঝতেই পারেনি, ঘুম ভেঙে নিজেকে মনিবের খাটে শুয়ে থাকতে দেখে সে লজ্জায় জিভ-টিভ কেটে একাকার। প্রোফেসর সব বুঝিয়ে বলার পরেও তাকে বিশেষ উদ্বিগ্ন হতে দেখা গেল না, শুধু এতগুলো বছর সে কেবল ঘুমিয়ে কাটিয়েছে চিন্তা করে ‘বাড়িটার কী হাল হয়েছে দেখে আসি গে’ বলে সুড়সুড় করে খাট থেকে নেমে হাঁটা দিল। তিলুদি কোনওমতে তাকে নিরস্ত করলেন।
নিবারণ চক্রবর্তী বেশ কমবয়সী ডাক্তার, দু বছর হল নাকি গিরিডিতে ডিসপেনসারি খুলেছেন। তার সত্ত্বেও তিনি প্রোফেসরকে দেখেই চিনতে পারলেন। ডাক্তারের কাছে কিছু লুকোনো চলে না, তাই ফেলুদা এক বাক্যে ওঁদের এত বছর ঘুমিয়ে থাকার কথাটা বলে দিল। শুনে নিবারণবাবু ফ্যাকাসে মেরে গেলেন। চেকআপের ফাঁকে ফাঁকে প্রোফেসরের দিকে ভয় পাওয়া নজরে তাকাচ্ছিলেন ভদ্রলোক। দেখা শেষ করে বললেন, ‘ব্লাড প্রেশারটা দুজনেরই লো। ইন্টারনাল কোনও ড্যামেজ হয়েছে কি না সেটা এভাবে দেখে বলা যাবে না, তার জন্য কিছু টেস্ট করাতে হবে। আসলে কী দেখুন— আমি আমার ডাক্তারি জীবনে এরকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হইনি কখনও। তাই এ অবস্থায় কোন ধরনের ওষুধ প্রেসক্রাইব করা উচিত সেটাই এখন ভাবনা। এঁদেরকে আপাতত গরম দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা গেলে ভাল হয়। দুপুরবেলা হালকা সুপ দেবেন, শরীর নিতে পারলে রাতে ভাত।’ যাওয়ার আগে জ্বর আর বমি বমি ভাবের জন্য দুটো আজেবাজে ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন।
‘এ ঘটনা চাপা থাকবে না’, ফেলুদা চিন্তিত মুখে বলল। ‘ইনস্পেক্টর রেড্ডিকে পুলিশ পাঠাবার বন্দোবস্ত করতে বলে দিতে হয়।’
সেই কোন সকালে লুচি তরকারি খেয়ে বেরিয়েছিলাম, দৌড়োদৌড়ি আর মানসিক উত্তেজনায় সে সব কখন হজম হয়ে গেছে টেরই পাইনি। এতক্ষণে বুঝলাম পেটটা খিদেয় চোঁ চোঁ করছে। লাঞ্চের আয়োজন প্রোফেসরের বাড়িতেই হল। ওঁকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না, কারণ নীচে একজন দুজন করে লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। তিলুদি যত্ন করে সুপ রান্না করলেন। আমি ওঁকে যত দেখছি ততই অবাক হয়ে যাচ্ছি। এত বড় ঘটনাটায় বিন্দুমাত্র টসকাননি, শক্তভাবে সামলেছেন নিজেকে। যেন পনেরো বছর টানা যন্ত্রের মধ্যে ঘুমিয়ে থেকে আবার জেগে ওঠাটা কোনও ব্যাপারই নয়, আকছার হচ্ছে। ‘অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর শুনেছ তো ভায়া? এ হচ্ছে সেই রকম। এখানে যদিও শোকে না বলে শকে বলাই ভাল’, বললেন লালমোহনবাবু।
খাওয়াদাওয়া সেরে উঠতে না উঠতেই দেখি লোকজনের গোলমাল আর চেঁচামেচিতে কান পাতা দায়। পুলিশ এসেছে আগেই, কিন্তু তাদের উপর কতখানি ভরসা রাখা উচিত বুঝতে পারছি না, কেন না পুরো গিরিডি শহরটাই ভেঙে পড়েছে এ বাড়ির দরজায়। দোতলার জানলা দিয়ে দেখলাম কম্পাউন্ডের বাইরে খালি ছাতা আর ছাতা; বৃষ্টি পড়েই চলেছে, তাও কারও উৎসাহে খামতি নেই। সারা বিহার থেকে দলবল নিয়ে পিলপিলিয়ে মানুষ আসছে, যাদের মধ্যে স্থানীয় খবরের কাগজের রিপোর্টারও আছে কয়েকজন। কলকাতা থেকেও নিশ্চয়ই সন্ধ্যে নাগাত টিভির সাংবাদিকেরা চলে আসবে। প্রোফেসর শঙ্কু জীবিত আছেন এবং ফিরে এসেছেন— এই খবরটা দাবানলের চেয়েও দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রোফেসরের কিন্তু সেদিকে কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি নিজের মতো ল্যাবরেটরিতে ঘোরাফেরা করছেন, তেমন কথাবার্তাও বলছেন না। এ-ও হতে পারে যে প্রোফেসর স্বল্পভাষী। কিন্তু আমার কেন জানি না ওঁকে খুব অন্যমনস্ক লাগছিল। বিকেলে বলরাম কফি নিয়ে এলে ফেলুদা ওঁকে বৈঠকখানায় ডেকে আনল। কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে প্রোফেসর কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে কী যেন ভাবতে লাগলেন।
তিলুদি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হয়েছে দাদু?’
প্রোফেসর অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, ‘কফির কাপেই মিশিয়েছিল।’
‘কী মেশানোর কথা বলছ?’
‘সম্নোলিন।’
আমি জানতাম সম্নোলিন হল প্রোফেসরের তৈরি এক বিশেষ রকমের ঘুমের ওষুধ, যার কোনও স্বাদ-গন্ধ নেই।
‘কে মিশিয়েছিল?’ এবার ফেলুদা প্রশ্ন করল।
‘উইলসনই করেছিল কাজটা, কোনও সন্দেহ নেই।’
উইলসন আবার কে? উইলসন… ধাঁ করে আমার মনে পড়ে গেল জ্যাকব উইলসনের নাম।
‘জ্যাকব উইলসন?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ— জ্যাকব। আমরা উইলসন বলে ডাকতাম।’
‘স্যার,’ ফেলুদা সোফা ছেড়ে উঠে প্রোফেসরের হাতদুটো ধরে বলল, ‘আমার পরিচয় তো আপনাকে আগেই দিয়েছি। আমি গিরিডিতে এসেছিলাম আপনার বিষয়ে তদন্ত করতে। খোঁজখবর করে যেটুকু তথ্য পেয়েছি তাতে এই উইলসনের নামও উঠে এসেছে। কিন্তু হিসেবে কোথাও যেন অনেকটা ফাঁক রয়ে গেছে। বুঝতেই তো পারছেন, আপনাকে এ অবস্থায় খুঁজে পাওয়াটা যে কোনও মানুষের পক্ষেই হজম করা শক্ত। আপনার শরীরের কথা ভেবে সকালে আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রবৃত্তি হয়নি। এখন যখন আপনি নিজেই বলছেন, আমি অনুরোধ করব যদি এসব কী করে হল সেটা প্রথম থেকে আমাদের খুলে বলেন। কারণ আর কিছুই নয়; আমি গোয়েন্দা বলেও নয়, বাকি সকলেরই মনের মধ্যে যা যা প্রশ্ন জমা হয়েছে— সে সবের উত্তর যদি পাওয়া যায়।’
প্রোফেসর হেসে বললেন, ‘ইয়াংম্যান, আপনাদের কৌতূহল যে খুবই সঙ্গত, তা আমি বুঝি। আমি এ সব প্রশ্নের উত্তরও নিশ্চয়ই দেব, কিন্তু তার আগে আমার একটি প্রশ্ন আছে।’
‘বলুন।’
‘উইলসন এখন কোথায় আছে সে বিষয়ে কি কিছু জানতে পেরেছেন?’
‘আপনি নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার পর তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না শুনেছি। নিজের দেশেও ফেরেননি।’
‘ফেরেনি?’ প্রোফেসর আপনমনে বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘তা হলে কী করল সে?… কেন করল?’ তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘যাক গে। আমি যে মঙ্গলের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলাম সে ঘটনা তো আপনারা অজ্ঞাত নন।’
‘আজ্ঞে না।’
‘মঙ্গল থেকে এক ভীষণ বিপত্তি কাটিয়ে আমি পৌঁছই টাফা গ্রহে। টাফার বাসিন্দারা আমাকে রাজার হালেই রেখেছিল। আমাকে তারা পৃথিবীতে ফিরতে দিতে চায়নি, আমিও থেকে যেতে আপত্তি করিনি। আমার রোবট বিধুশেখর জানিয়েছিল সে গ্রহের সভ্যতা নাকি পৃথিবীর চেয়ে কয়েক কোটি বছর পুরনো, এবং তার বাসিন্দারা জ্ঞান-বিজ্ঞানে মানুষের চেয়েও উন্নত— এর কোনও প্রমাণ আমি পাইনি। উল্টে দেখি তারা সভ্যতায় আমাদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। অবিশ্যি তাদের মধ্যে বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী এরকম কিছু ব্যক্তিও ছিল। তেমনই একজন একবার একটা আশ্চর্য খবর দেয় আমাকে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির একেবারে শেষ প্রান্তে একটি গ্রহ আছে, যাকে নাকি অনায়াসে দ্বিতীয় পৃথিবীর খেতাব দেওয়া যায়। এর নাম কেপলার-639B। একজন বৈজ্ঞানিক হওয়ার সুবাদে স্বাভাবিকভাবেই সে গ্রহে যাবার বাসনা আমার হয়; কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন উপযুক্ত গবেষণা, যা আমার গিরিডির ল্যাবরেটরি ছাড়া সম্ভব নয়। তার উপর কেপলারের দূরত্ব টাফা থেকে অনেক বেশি— আমার রকেটের স্বল্প জ্বালানি আর রসদ নিয়ে সেখানে পৌঁছনোর কথা ভাবা কঠিন। ক্রায়োজেনিক পদ্ধতির যন্ত্র আবিষ্কারের আইডিয়াটা তখনই মাথায় আসে। সব দিক বিবেচনা করে আমি পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা ভাবি। টাফার বাসিন্দারা তাতে রাজি হয় দুটি শর্তের বদলে। এক বিধুশেখর, আর দুই আমার ডায়রি। এই দুটো জিনিস তাদের কাছে রেখে এলে তারা আমাকে পৃথিবীতে ফিরতে দেবে। তাদের সঙ্গে আমি সামনেও যোগাযোগ রাখব বলে ঠিক করি, কেন না কেপলারের বিষয়ে টাফার সদস্যরাই আমাকে গাইড করতে পারত।’
‘আপনি সেই শর্ত মেনে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে এলেন?’
‘হ্যাঁ। তারা বলেছিল বিধুশেখরকে নিজেদের বিজ্ঞানের উন্নতির কাজে লাগাবে, আর ডায়রিটা রাখবে আমার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। আসলে আমার উপর তাদের এক রকম টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল।’
‘সেই ডায়রি সুন্দরবনের মাথারিয়া অঞ্চলে উল্কাপাতের ফলে কীভাবে পাওয়া গেল?’
‘এর একটাই অর্থ হতে পারে। টাফা গ্রহে হয়তো কোনও বড়সড় বিপদের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। তাই ডায়রিটাকে বাঁচাতে তারা সেটিকে উল্কাপিণ্ডের সাহায্যে পৃথিবীতে পাঠিয়ে দেয়।’
‘ডায়রির কাগজে আর লেখার রঙে পরিবর্তন কি এদেরই কীর্তি বলে ধরে নেওয়া যায়?’
‘যেতেই পারে। ডায়রিটাকে সুরক্ষিত রাখবার জন্য তারা নিজেদের কোনও বিশেষ প্রযুক্তির প্রয়োগ করেছিল।’
‘হুঁ,’ ফেলুদা একাই কথা বলছে, আমরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনছি। ‘পৃথিবীতে ফিরে আসার পর কী হল?’
‘ফিরেই আমি কেপলার অভিযানের ব্যাপারে আমার দুই বৈজ্ঞানিক বন্ধু জেরেমি সন্ডার্স এবং উইলহেম ক্রোলের সঙ্গে আলোচনা করতে লন্ডন চলে যাই। সেখানেই সন্ডার্সের মাধ্যমে আমার পরিচয় হয় জ্যাকব উইলসনের সঙ্গে। সম্ভাবনাময় তরুণ ব্যবসায়ী; অল্পবয়সে কুসঙ্গে পড়েছিল— হার্ড ড্রাগস। পরে এক ভারতীয় স্পিরিচুয়ালিস্টের সংস্পর্শে এসে সে ওসব পুরোপুরিভাবে ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। সেই থেকে উইলসনের মনে ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতি অগাধ সম্ভ্রম জন্মায়। আমার বিষয়ে সে সন্ডার্সের কাছ থেকে জানতে পেরে আলাপ করার ইচ্ছে প্রকাশ করে। ছেলেটিকে আমার ভাল লেগে যায়। শিল্প, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে সমসাময়িক রাজনীতিতেও তার সমান আগ্রহ। আমি যে ক'দিন লন্ডন ছিলাম, সে ক'দিন প্রায় রোজই উইলসন আমাদের আড্ডায় যোগ দিতে আসত। রসিক আর সদালাপী হওয়ায় ক্রোলেরও তাকে খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।
‘এমনই একদিন আড্ডাতে ক্রোলের মদ্যপানের মাত্রা একটু বেশি হয়ে যাওয়ায় সে বলে ফেলে— ‘উইলকেও তোমার সঙ্গে কেপলারে নিয়ে যাও শঙ্কু, সময় কাটানোর জন্য এত ভাল সঙ্গী আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাবে না।’ স্বভাবতই এতে উইলসন কেপলার সম্পর্কে জানতে চায়। তখনকার মতো আমি আর সন্ডার্স মিলে কোনওভাবে ম্যানেজ করে নিই ব্যাপারটা। কিন্তু উইলসন বুদ্ধিমান ছেলে, সে বুঝতে পেরে যায় এখানে কোনও গোপন প্রজেক্ট নিয়ে কথা হচ্ছে। সে জানায় যদি আমি কখনও তাকে নিজের অভিযানে শামিল হওয়ার যোগ্য মনে করি, তা হলে যেন দ্বিধা না করে তার সঙ্গে যোগাযোগ করি। আমি এ প্রসঙ্গে আর কথা বাড়াইনি। এরপর দেশে ফেরবার আগে তাকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানিয়ে আসি।
‘উইলসন যে সত্যি সত্যিই আমার আমন্ত্রণ রক্ষা করতে একেবারে গিরিডি চলে আসবে তা আমি ভাবিনি। তখন আমার ক্রায়োজেনোসেলের কাজ প্রায় শেষের দিকে, আর উপায় না থাকায় সেই ব্যস্ততার মাঝেই আমায় ওকে সময় দিতে হল। একদিন কী মনে হতে উইলসনকে আমার যন্ত্রটা দেখালাম। আপনার বুদ্ধি নিয়ে কারবার মিস্টার মিত্র, তাই বুঝবেন; অনেক সময় নিজেদের বুদ্ধির বড়াই করার লোভ অনেক কষ্টেও আমরা সামলাতে পারি না।
‘ক্রায়োজেনোসেল দেখে উইলসনের তাক লেগে গেল। সে জিজ্ঞেস করল আমি এর পেটেন্ট বিক্রি করতে রাজি আছি কি না। আমি বরাবরের মতোই না বললাম, আর এ যন্ত্র যে কোনও ফ্যাক্টরিতে তৈরি করা যাবে না সেটাও বোঝালাম। পরদিন সে গিরিডির স্থানীয় এক দালালকে ধরে নিয়ে এল আমাকে কনভিন্স করাতে।’
‘দালাল?’
‘হ্যাঁ। মহা ঘাঘু লোক। সম্ভবত উমাপ্রসাদ নাম ছিল— হ্যাঁ, উমাপ্রসাদ চৌহান।’
আমরা কয়েক মুহূর্তের জন্য থ মেরে গেলাম। আবারও উমাপ্রসাদ! একেও কি সমাপতনই বলব না অন্য কিছু?
‘তারপর?’
‘লোকটাকে একটু কড়া ধমক দিয়েই বিদায় করি। এসব ক্ষেত্রে আমার সেন্টিমেন্ট বড় সাংঘাতিক। উইলসনের বৈষয়িক মনোভাবে অসন্তুষ্ট হয়ে আমি ওকে সাফ জানিয়ে দিই যে, আমার কেপলার যাত্রার সময় আসন্ন, তাই ওর এবার আমেরিকাতে ফিরে যাওয়া উচিত। নিজের ভুল বুঝতে পেরে উইলসন ক্ষমা চেয়ে অনুরোধ করে, আমি যেন এই অভিযানে ওকে সঙ্গী করে নিই। আমার এক্সপেরিমেন্টে ওর দ্বারা যদি সামান্যতম সহযোগিতাও হয় তবে নাকি ও বর্তে যাবে।’
‘আপনি রাজি হয়ে গেলেন?’
‘হ্যাঁ। উইলসনও রয়ে গেল। আমার ক্রায়োজেনোসেল তৈরি হয়ে গিয়েছিল, শ্যাঙ্কমোটও তৈরি হল। এর মধ্যে একদিন উইলসন জানাল ওর নাকি পর পর কয়েক রাত ঘুমোতে অসুবিধে হচ্ছে। আমি ওকে একটা সম্নোলিন বড়ি দিই। পরদিন সে এসে বলে ওষুধে দিব্যি কাজ দিয়েছে, কিন্তু ওষুধ না খেলেই নাকি আর ঘুম হচ্ছে না। এভাবে সে আরও দু'দিন দুটো করে বড়ি নেয়।
‘এক বিকেলে স্টাডিতে বসে কাজ করছি, প্রহ্লাদ কফি এনে দিয়েছে। উইলসন আমার সঙ্গেই স্টাডিতে ছিল। এক ফাঁকে আমার ল্যাবরেটরিতে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ল। ঠিক করেছিলাম শ্যাঙ্কমোট আর ক্রায়োজেনোসেল ছাড়াও বাকি সাম্প্রতিক আবিষ্কারগুলোর নোটস বানিয়ে রাখব। কফিটা খেয়ে ল্যাবরেটরিতেই বসব বলে ভাবি। কিন্তু… কিন্তু কফি খাওয়ার পর… আমার আর কিছু মনে নেই। স্টাডিতেই যে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম জানি না। সেই ঘুম ভাঙল আজ সকালে।’
বাইরের গোলমাল আর আমাদের কান অবধি পৌঁছচ্ছে না। শুধু দেয়াল ঘড়ির টিক টিক, আর বুকের মধ্যে ঢিপ ঢিপ।
‘ঘুমিয়ে পড়ার আগ মুহূর্তে ঠিক কী হয়েছিল আমার সঙ্গে সেটা আবছা আবছা মনে পড়ছিল, এখন এই কফি খেতে গিয়ে সবটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল।’
তিলুদি বললেন, ‘তার মানে উইলসন তোমাকে ঘুম পাড়িয়ে রেখে তোমার সব আবিষ্কার কব্জা করতে চাইছিল!’
‘এ ছাড়া আর কী হতে পারে দিদিভাই,’ বললেন প্রোফেসর।
আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কিন্তু প্রহ্লাদ আর নিউটনের কী হয়েছিল?’
‘প্রহ্লাদকেই বরং জিজ্ঞেস করে দেখা যাক।’ লালমোহনবাবু বললেন।
‘সে কথা কি ওর মনে আছে?’ ফেলুদার ভুরু কুঁচকে গেছে, ‘যদি থাকতই তা হলে তো ও ঘুম ভেঙে প্রথমে সেটাই বলত, তাই নয় কি?’
‘একেবারেই তাই।’ প্রোফেসর বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমি হয়তো কিছুটা হেল্প করতে পারি। আমার রিমেমব্রেন যন্ত্রের মাধ্যমে প্রহ্লাদের সেই লুপ্ত স্মৃতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।’
‘এক্সেলেন্ট!’ ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘চলুন তা হলে ল্যাবরেটরিতে যাওয়া যাক। শুধু একটা প্রশ্ন— এতে প্রহ্লাদের দুর্বল শরীরে স্ট্রেন হওয়ার চান্স কতটুকু?’
‘চিন্তা করবেন না, এতে ওর কোনও স্ট্রেন হবে না।’
আমরা সকলে ল্যাবরেটরিতে গেলাম। প্রহ্লাদকে চেয়ারে বসিয়ে প্রোফেসর আলমারি খুলে হেলমেটের মতো দেখতে রিমেমব্রেন যন্ত্রটা বার করে ওর মাথায় পরিয়ে দিয়ে বোতাম টিপে দিলেন। মুহূর্তের জন্য প্রহ্লাদের শরীরটা একটা ঝাঁকুনি দিয়ে স্থির হয়ে গেল, আর চোখদুটো হয়ে গেল রোবটের মতো প্রাণহীন। এবার প্রোফেসর তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘প্রহ্লাদ, ঠিক পনেরো বছর পিছিয়ে যাও। তারিখ আট জুলাই, সময় বিকেল চারটে। আমি আমার পড়ার ঘরে ঘুমিয়ে পড়েছি। এর পর তোমার সঙ্গে কী ঘটেছিল?’
উত্তর এল থেমে থেমে। ‘আপনি তো পড়ার ঘরে ছিলেন না বাবু। আমি আপনার শোবার ঘরে গিয়ে দেখি সেখেনে জ্যাকব সাহেব আপনাকে বোতাম টিপে পুতুল করে ফেলতেছেন। আমি কিচ্ছুটি না ভেবে সোজা তেনার উপর হামলে পড়ি। সাহেব ঘুরেই আমার থুতনিতে একটা বিরাশি সিক্কার ঘুষি কষালেন, তারপর আমার আর কিছু মনে নাই।’
আমাদের যা জানবার তা জানা হয়ে গেছে, তাই প্রোফেসর যন্ত্রটা প্রহ্লাদের মাথা থেকে খুলে নিলেন। প্রহ্লাদ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে হাঁফ ছেড়ে শেষের কথাটাই বলল, ‘তারপর আমার আর কিছু মনে নাই বাবু।’
আমরা বৈঠকখানায় ফিরে এলাম। দিনের আলো ফিকে হয়ে আকাশে নীলচে বেগুনি রং ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের ভিতরটা অন্ধকার। তিলুদি সুইচ টিপলেন, অথচ বাতি জ্বলল না। ‘লোডশেডিং’, বললেন অবিনাশবাবু, ‘বলরামকে মোমবাতি দিতে বলি।’
ফেলুদা সোফায় বসে বলল, ‘নিউটনের স্টেটমেন্ট না পেলেও বোঝাই যাচ্ছে যে ও আপনাকে আর প্রহ্লাদকে ওই দশায় দেখতে পেয়ে উইলসনকে আক্রমণ করে। তাতে উইলসন হয়তো ওকে দেয়ালে অথবা মেঝেতে ছুঁড়ে মেরে অজ্ঞান করে ফেলে, নিউটনের পায়ের চোটটাই যার প্রমাণ; তারপর তিনজনকে ক্রায়োজেনোসেলে ঢুকিয়ে আলমারির উপর রেখে দেয়। প্রথমে উইলসনের নজর সেই যন্ত্রটার উপর থাকলেও এতে আখেরে দুটো সুবিধে হয়— অন্যান্য আবিষ্কারের ফরমুলা হাত করতে খুনোখুনির দরকার পড়ে না, আর আপনার গোপন গবেষণার খবরটা কাজে লাগিয়ে মিসিং কেসটাকেও চাপা দেওয়া যায়।’
‘সবই তো বুঝলাম মিস্টার মিত্র, কিন্তু উইলসন কোথায়?’
ফেলুদা কী উত্তর দিত জানি না, আপাতত যতীন এসে পড়ায় ওকে কথা বন্ধ করতে হল।
‘এক বাবু আপনার সঙ্গে দেখা করতে খুব জোরাজুরি করছেন। আপনাকে নাকি বলা ছিল যে তিনি আসবেন—’
‘আমাকে বলা ছিল… কী নাম বাবুর?’
‘নাম বললেন নকুড় বিশ্বাস।’
***
১৬.
নকুড়বাবুর মধ্যে কী এমন বিশেষত্ব আছে জিজ্ঞেস করলে বলতে পারব না, ছা-পোষা নিরীহ চেহারা, কিন্তু ভিড়ের মাঝে সবার আগে ওঁর দিকে নজর পড়তে বাধ্য। এসেই যেভাবে তিনি প্রোফেসরকে দেখে আপ্লুত হয়ে পড়লেন, তাতে বুঝলাম তাঁর প্রতি ভদ্রলোকের শ্রদ্ধা কতটা গভীর। ঘর ঠান্ডা হওয়ার পর পরিচয় পর্ব শেষে নকুড়বাবু বললেন, ‘আমায় মাপ করবেন তিলুবাবু। আজ যদি আমার ভবিষ্যৎ দেখার সেই বিশেষ ক্ষমতাটি থাকত, আপনার এহেন দুর্দশা আমি কিছুতেই হতে দিতুম না।’
প্রোফেসর বললেন, ‘তুমি অযথাই এসব ভেবে সময় নষ্ট করছ। এতে তো তোমার কোনও দায় নেই। বরং তোমার ক্ষমতাটা আমি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারিনি, সে দায় আমার আছে।’
‘না তিলুবাবু! এভাবে বলবেন না। ঈশ্বরের খেয়ালে সে ক্ষমতা এসেছিল, তাঁর খেয়ালেই আবার চলে গেল। কিন্তু
মন থেকে আমি কোনওদিন আপনার অন্তর্ধানের দায় এড়াতে পারিনি। কেবলই মনে হত আপনি স্বাভাবিকভাবে সেই গ্রহে যাননি, কিছু গণ্ডগোল নিশ্চয়ই আছে এর পিছনে। কাল যখন প্রদোষবাবু টেলিফোন করে জানালেন তদন্তের কথা, তৎক্ষণাৎ ঠিক করলুম এখানে আসব। আপনার অশেষ উপকার রয়েছে আমার জীবনে। তার সিকিভাগও যদি শোধ করতে পারি, সেই ভেবে—’
‘এসে ভালই করেছ। আমার সন্ধান করার সুযোগে এই বুদ্ধিদীপ্ত মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হয়ে যেত, সেটাই বা কম কীসে?’ ফেলুদাকে দেখিয়ে বললেন প্রোফেসর।
নকুড়বাবু বললেন, ‘আজ্ঞে, হক কথা।’
ফেলুদা বলল, ‘আমি একটা জিনিস জানতে চাইছিলাম।’
‘বলুন মিস্টার মিত্র।’
‘আপনি তো নকুড়বাবুকে আপনার অব্যর্থ সেরিব্রিলান্ট ওষুধ দিয়েছিলেন, ডায়রিতে যা পেয়েছি। তার সত্ত্বেও ওঁর ক্ষমতাটা টিকল না কেন?’
‘দেখুন, সেটা ঠিক আমার ওষুধের দোষ নয়। নকুড়বাবু বল লাইটনিং-এর দৌলতে অকস্মাৎ কিছু অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জন করেন। এই যেমন ধরুন টেলিপ্যাথি, অতীত কিংবা ভবিষ্যৎ দেখা, থটরিডিং ইতাদি। এগুলো একেক সময়ে ওঁর চোখের সামনে ভেসে উঠত। এদের উপর নকুড়বাবুর নিজের মস্তিষ্কের কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না। আর সেরিব্রিলান্টের কাজ যেহেতু মস্তিষ্কের নিউরনকে উজ্জীবিত রাখা, সেখানে এই ক্ষমতাগুলোর উপর ওষুধটার কোনও প্রভাবই পড়বে না। তবে ওঁর আরেকটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল। বাস্তব অথবা মনগড়া কোনও ঘটনা তিনি নিজের চোখে দেখতে পেতেন, এবং মস্তিষ্কের জোরে অন্যকে সেটা দেখাতেও পারতেন। সেরিব্রিলান্ট এই ক্ষমতাটাকে বাঁচাতে পেরেছিল। অবশ্য সে ক্ষমতা এখনও আছে কি না বলতে পারব না।’
‘আছে তিলুবাবু। ওষুধের পাশাপাশি আপনি যা যা শিখিয়েছিলেন, যোগাসন, মনঃসংযোগের ধ্যান, এর কোনও অভ্যেসই ছাড়িনি। তাই ক্ষমতাটা দিন দিন প্রখর হয়ে উঠেছে। এখন আর শুধু ছবি দেখে নয়, বর্ণনা শুনেই আমি যে কোনও দৃশ্য দেখিয়ে দিতে পারি।’
‘বলো কী!’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ’, নকুড়বাবু হাতদুটো জোড় করে বললেন।
‘তার একটা আমাদের নমুনা দেখাতে পারো?’
‘পারি বইকী। কী দেখবেন বলুন।’
‘এক মিনিট!’ লালমোহনবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘এক মিনিট নকুড়বাবু। ইয়ে, আমি তো একটু আধটু লিখি-টিখি আরকী, তাই ভাবছিলাম আপনার এই কাল্পনিক দৃশ্য প্রদর্শনের ক্ষমতার কথা যদি আমার লেখায় ব্যবহার করি—আপনি অনুমতি দেবেন?’
‘সানন্দে অনুমতি দেব মশাই।’ নকুড়বাবু বিনয়ী হাসি হেসে বললেন।
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। তা হলে আপনি যতক্ষণ আমাদের ছবি দেখাবেন, আমি ততক্ষণ একটু নোট করে নিই।’ লালমোহনবাবু পকেট হাতড়ে কী একটা খুঁজতে লাগলেন। শেষে না পেয়ে আমার কানে কানে বললেন, ‘আমার কলমটা দেখেছ তপেশ?’
আমি বললাম, ‘না তো। কোথায় রেখেছিলেন?’
‘পকেট থেকে তো সারাদিনে বেরই করিনি।’
‘সকালে সেই চোরের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় ল্যাবরেটরিতে পড়ে যায়নি তো?’
‘এটা তো মাথায় আসেনি ভাই। হতেও পারে। ছোট টর্চ-ফর্চ আছে নাকি? আমারটা সুটকেসে, সেটাও রয়ে গেছে অবিনাশবাবুর বাড়িতে।’
‘যতীনের কাছে আছে একটা, ওটা চেয়ে নিন।’
‘তাই করি বরং।’
যতীনের কাছ থেকে টর্চ এনে লালমোহনবাবু কাঁচুমাচু হয়ে ‘সরি ফর ইন্টারাপ্টিং’ বলে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেন। আমি মোমবাতির শিখার নাচানাচি দেখছি, তিলুদি বাঁ হাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে দু চোখের মধ্যিখানটা টিপে ধরে আছেন, বোধহয় মাথা ধরেছে। নিউটন প্রোফেসরের পায়ের কাছে একটা উলের বলের মতো গুটলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। চুকচুক করে ডাকতেই বেড়ালটা আমার কাছে চলে এল। নিচু হয়ে ওকে তুলতে গিয়ে একটা অস্ফুট ‘খং’ আওয়াজ শুনে ওপাশের দরজায় তাকিয়ে দেখি লালমোহনবাবু দাঁড়িয়ে।
‘কিছু বলছেন লালমোহনবাবু?’ ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
‘কং—’ চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে ওঁর, ‘মানে ক-কঙ্কাল।’
ল্যাবরেটরির মেঝেতে কলমটা না পেয়ে লালমোহনবাবু সিন্দুক আর আলমারির তলায় টর্চের আলো ফেলে খুঁজতে থাকেন, যদি গড়িয়ে-টড়িয়ে গিয়ে থাকে। আলমারির তলার সরু জায়গাটায় কলমটা দেখা গেছে, তার সঙ্গে নাকি দেখা গেছে একটা খুদে নরকঙ্কাল।
সকাল থেকে একের পর এক যা ভেলকি দেখে চলেছি তাতে আমার অবাক হওয়ার স্টক প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে, লালমোহনবাবুর কথা শুনে তাই আমার কেন জানি কোনও প্রতিক্রিয়াই হল না। কঙ্কালটা যদি এখন উঠে ভূতের কেত্তনও আরম্ভ করে দেয়, আমি মোটেই অবাক হব না। তবে এখানে বুঝলাম প্রোফেসর আর ফেলুদার মধ্যে একটা দারুণ মিল রয়েছে। দুজনের কেউই কোনও জটিল পরিস্থিতির প্যাঁচে পড়ে মাথা গরম করেন না বা দিশেহারা হন না। এমন কিছু ঘটল যা হয়তো আগে থেকে একেবারেই আন্দাজ করা যায়নি, ক্যালকুলেশন ওলটপালট করে দিল; ফেলুদা বলে সেরকম বেকায়দায় পড়েও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলে চিন্তার একটা না একটা নতুন মোড় বেরিয়েই যায়।
তিলুদি বললেন, ‘আপনি ঠিক দেখেছেন তো লালমোহনবাবু?’
ভদ্রলোক নিজেকে সামলে নিয়েছেন এতক্ষণে, ‘একেবারে স্পষ্ট।’
‘কিন্তু আলমারির তলার অতটুকু জায়গায় মানুষের কঙ্কাল কেমন করে যাবে?’
‘আলমারির উপর অতটুকু বাক্সে খোদ মানুষই যদি ঘুমিয়ে থাকতে পারে, কঙ্কালের তলায় শুতে ইচ্ছে করলে কী দোষ বলুন? আজ সকালের এক্সপিরিয়েন্সের পর কঙ্কাল-ফঙ্কাল কিছুই আর আশ্চর্যের নয়।’
তিলুদি আর কথা বাড়ালেন না।
‘জিনিসটাকে আগে দেখি’, ফেলুদা বলল, ‘এমনও তো হতে পারে যে সেটা কোনও একটা ডামি।’
‘কিন্তু ডামি কঙ্কাল আমার ল্যাবরেটরিতে কোনওদিন ছিল না মিস্টার মিত্র। সম্ভাবনা হিসেবে ভাবতে মন্দ লাগছে না যদিও, চলুন দেখা যাক।’
পাওয়ার চলে এসেছে। ঘড়িতে বলছে আটটা।
আমরা ল্যাবরেটরিতে গিয়ে ঢুকলাম।
ফেলুদা মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ে চোখটা লাগিয়ে দিল আলমারির নীচের ফাঁকটাতে, আর এক হাত দিয়ে টর্চ জ্বেলে আলো ফেলল।
‘লালমোহনবাবুর কথাই ঠিক—কঙ্কালই বটে।’
যতীন কোত্থেকে একটা গাছের চিকন কঞ্চি ভেঙে এনেছে, এবার হাত বাড়িয়ে সেটা চেয়ে নিয়ে খুব সাবধানে ফেলুদা কঙ্কালটাকে টেনে বাইরে বার করল।
সেটা ইঞ্চি ছয়েক লম্বা।
এর সারা গায়ে কালসিটে পড়ে সাদা রংটা প্রায় বোঝাই যায় না, তার উপর দেখতে পাচ্ছি ধুলো আর গুঁড়োমতন কিছু লেগে আছে।
আমার গলা শুকিয়ে গেল।
‘এ যে দেখছি ডামিও নয়’, প্রোফেসর ভাল করে পরখ করে বললেন, ‘সত্যিকার মানুষেরই স্কেলিটন।’ তারপর টেবিলের উপর সেটাকে শুইয়ে রাখলেন। তিলুদির বুঝি মাথা ঘুরে গিয়েছিল, তিনি ভয়ার্ত স্বরে একটা চাপা শব্দ করে কোনওমতে আলমারিটা ধরে দাঁড়ালেন।
ফেলুদা উঠে দাঁড়িয়ে জামাকাপড় ঝেড়ে যতীনকে ডাকল। ‘তুমি এই বাড়ির ঘরগুলোর দেখাশোনা করতে না?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ দাদাবাবু। কিন্তু এই মড়া এখানে কোথা থেকে এল আমি জানিনে, বিশ্বাস করুন—’
‘এই ঘরটা তুমি নিজে কোনওদিন খোলোনি তো?’
‘মা কালীর নাম করে বলছি, কক্ষনও খুলিনি দাদাবাবু। বাবু নিষেধ করেছিলেন; ওতে কত সর্বনেশে জিনিস থাকে, আমি মুখ্যুসুখ্যু মানুষ—কেনই বা খুলব, শেষে কী না কী ছুঁয়ে দিয়ে বেঘোরে প্রাণটা যায়—’
‘এত বছরে এ বাড়িতে কখনও কোনও গোলমেলে ব্যাপার হতে দেখেছ?’
‘চোর এসেছিল একবার, আপনাকে তো কালই বললুম। এর বাইরে আর কিচ্ছু হয়নি।’ যতীন জোর গলায় বলল।
‘আর সদানন্দ? ও ঢুকত না বাড়ির ভিতর?’
‘না দাদাবাবু।’
‘হুঁ।’ ফেলুদা এবার প্রোফেসরের দিকে ঘুরল, ‘আপনার কোনও এক্সপেরিমেন্টের জন্য কি কখনও আসল নরকঙ্কাল ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েছিল?'
‘নেভার। অন্তত আমার ল্যাবরেটরিতে তো কখনওই নয়—তাও আবার এই আকারের।’
তিলুদি বললেন, ‘পুলিশকে তো জানাতে হবে দাদু।’
‘অবশ্যই। কিন্তু এই কঙ্কাল এখানে এল কী করে সেটাই তো আসল প্রশ্ন।’
‘আমার একটা খুব অদ্ভুত জিনিস মনে হচ্ছে।’ ফেলুদার কণ্ঠ শুনে চমকে যেতে হল। কথাগুলো যেন দূর থেকে ভেসে আসছে; ভাসাভাসা চোখে ও শুধু তাকিয়ে আছে কঙ্কালটার দিকে, কিন্তু যেন দেখছে না কিছু।
‘কী?’
‘শুনে আপনারা আমাকে পাগল ঠাওরাবেন—সেই ঝুঁকিটা নিচ্ছি। কিন্তু আমার ধারণা এই কঙ্কালটা জ্যাকব উইলসনের হতে পারে।’
ঘরে যেন একটা বাজ পড়ল।
প্রত্যেকের চোখ একযোগে সাঁই করে ঘুরে গেল ফেলুদার দিকে।
এটা কী বলছে ও?
প্রোফেসরই শুধু নির্বিকার সুরে প্রশ্ন করলেন, ‘এ রকম মনে হওয়ার কারণ?’
‘কারণটাই ভেবে বার করতে হবে স্যার,’ ফেলুদা অন্যমনস্ক গলায় বলল, ‘ক্লুগুলো যেন জিগ'স পাজলের মতো এলোমেলো হয়ে আমার সামনেই আছে। এর একেকটা টুকরো ঠিকঠাক জুড়ে দিতে পারলেই আসল ছবিটা ফুটে উঠবে।’
বাইরে পাহারায় থাকা একজন কনস্টেবলকে ডেকে ফেলুদা কঙ্কালটার বিষয়ে জানাল। লোকটার চোখ ছানাবড়া, ভয়ও পেয়েছে ভালই। সে বলল এ ব্যাপারে ইনস্পেক্টরই সিদ্ধান্ত নেবেন; তাকে খবর দেওয়া হচ্ছে, তিনি এসে যা করবার করবেন। কঙ্কালের ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়াতে একটা লাভ হল, বাইরের অতি উৎসুক জনতার ভিড় আস্তে আস্তে পাতলা হতে শুরু করল।
ইনস্পেক্টর রেড্ডি আধঘণ্টায় এসে পৌঁছলেন। বললেন, ‘আমি আমার লাইফের কোনও কেসে কখনও এমন ধাক্কা খাইনি। প্রোফেসরকে ফিরে পাওয়া গেল—দ্যাটস দ্য বেস্ট থিং এবাউট টুডে, বাট নাউ হোয়াট ইজ দিস ডিজাস্টার?’
‘কঙ্কালের অবস্থা দেখে ডিজাস্টারটা রিসেন্টলি ঘটেছে বলে মনে হয় কি?’ ফেলুদা বলল।
‘তা হয় না। যাই হোক, মৃত্যুর সঠিক সময় আর কারণটা ফরেনসিক টেস্টের রিপোর্ট এলে তবেই জানা যাবে। কিন্তু এই আকারের স্পেসিমেন—’ ইনস্পেক্টর হঠাৎ মুষড়ে পড়লেন, ‘নিজের চোখে দেখার পরেও বিশ্বাস করতে মন চায় না। কী বিস্তর ঝক্কি পোহাতে হবে এই নিয়ে আমি তো কল্পনাই করতে পারছি না মিস্টার মিত্তর।’
‘একটা উপায়ে স্পেসিমেনকে সাধারণ আকারে নিয়ে আসা যায়। প্রোফেসরকে যদি অনুমতি দেওয়া হয় তা হলে তিনি নিজের একটি যন্ত্র দিয়ে কাজটা করতে পারেন।’
‘ওঁর আজব সব ইনভেনশনের ব্যাপারে আমি পড়েছি। তার একটা ডিমনস্ট্রেশন পেলে যদি আমার কাজের সুবিধে হয় তা হলে তো সোনায় সোহাগা।’
ইনস্পেক্টরকে ল্যাবরেটরিতে নিয়ে নিয়ে প্রোফেসর তার শ্যাঙ্কমোটের সাহায্যে কঙ্কালটাকে স্বাভাবিক সাইজে ফিরিয়ে আনলেন। সেটাকে পুলিশের লোকেরা নিয়ে যাবার পর আমাদের সকলেরই এক প্রস্থ জেরা হয়ে গেল। শুরু হয়েছিল লালমোহনবাবুকে দিয়ে, ভদ্রলোক বেশ ভালভাবেই উৎরে গেলেন। পরে বললেন, ‘কঙ্কাল আবিষ্কার করেও যখন নার্ভের উপর থেকে দখল হারাইনি, পুলিশের সেখানে কী সাধ্যি যে আমাকে টলায়?’
রাতে খাওয়ার সময় দেখি ফেলুদা গুম মেরে গেছে, আশেপাশে কী হচ্ছে তার সম্বন্ধে সম্পূর্ণ উদাসীন। এই হাবভাবের মানে আমি খুব ভাল করে জানি। ওর মাথায় নিশ্চয়ই ঘুরছে কঙ্কাল রহস্য। কিন্তু যতবারই মনে পড়ছে ও কঙ্কালটাকে জ্যাকব উইলসনের বলে সন্দেহ করছে, আমার চিন্তাভাবনা পুরো গুবলেট হয়ে যাচ্ছে।
‘আমি একটু ছাদে যাচ্ছি, কিছু সময় একা থাকতে চাই। খুব প্রয়োজন না হলে ডাকিস না’ বলে ফেলুদা উপরে চলে গেল।
***
১৭.
আমরা ক'জন বৈঠকখানায় বসে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। কী যে হচ্ছে, আর কেনই বা হচ্ছে— আমাদের কারওরই মাথায় ঢুকছে না। লালমোহনবাবুর ইচ্ছে ছিল নকুড়বাবুর কাছ থেকে ওঁর কিছু রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প শোনেন, ভদ্রলোকের চুপসানো চেহারা দেখে এখন মনে হচ্ছে সে ইচ্ছে আর বেঁচে নেই। নকুড়বাবু যেচে ওঁর লেখার প্রশংসা করাতে দেখলাম লালমোহনবাবুর মুখে হাসি ফুটল। আজ রাতে তিলুদি দাদুর কাছেই থাকবেন বলে ঠিক করেছেন, তাই আমরাও রয়ে গেছি এ বাড়িতে। অবিনাশবাবু বসে বসে ঢুলছেন। ফেলুদা কীভাবে রহস্যের সমাধান করে সেটা জেনে তারপর তিনি বাড়ি ফিরবেন।
কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতার পর শুনি সিঁড়িতে পায়ের শব্দ। ফেলুদা নীচে নামছে। টানটান উত্তেজনায় নিশ্বাস চেপে রেখে আছি সকলে।
বসবার ঘরে এসে ও আর কোথাও বসল না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একবার আমাদের দিকে দেখে নিল। তারপর গলা খাঁকরে কথা শুরু করল—
‘প্রথমেই জানিয়ে রাখি; আমি এখন যা বলতে চলেছি তা মোটেই কোনও প্রমাণিত সত্য নয়, আর সেরকম দাবিও আমি করব না। কিন্তু প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যেখানে দুরূহ, সেখানে অনুমানকেই হাতিয়ার করে নিতে হয়। কর্মজীবনের বহু তদন্তে আমায় এই হাতিয়ার ব্যবহার করতে হয়েছে। তবে কোনও ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ অনুমানের উপর ভিত্তি করে রহস্যের জট আমি ছাড়াইনি। এখানেই এই কেসটির অভিনবত্ব। আমার হাতে ছিল শুধু কিছু সুতো, যা দিয়ে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেল থেকে জাল বোনার চেষ্টা করে ঘটনাগুলোর সাপেক্ষে যে ব্যাখ্যাটা সবচেয়ে যথাযথ বলে মনে হয়েছে, সেটাই আমি বলছি।
‘প্রোফেসরকে তাঁরই তৈরি রিমোট দিয়ে ছোট বানিয়ে ক্রায়োজেনোসেলে ঘুম পাড়িয়ে রাখে জ্যাকব উইলসন, এটুকু প্রহ্লাদের বক্তব্য থেকে আমরা সুনিশ্চিতভাবে জানি। যেহেতু উইলসনের আগে থেকেই লোভ ছিল প্রোফেসরের আবিষ্কারের প্রতি, তাই ধরে নেওয়া যেতে পারে এই কাজটি সে করে আবিষ্কার হস্তগত করার আশাতেই। এর পরের দৃশ্য ভাবতে গেলে মনে হয়, উইলসন নিশ্চয়ই প্রোফেসরের নোটস আর গ্যাজেটস নিয়ে পালাবে। এখানে একটু সময়টা খেয়াল করা দরকার। আট জুলাই, অবিনাশবাবুর কথা অনুযায়ী তেইশে আষাঢ় বিকেলে তিনি প্রোফেসরকে ডাকতে ওঁর বাড়িতে আসেন। প্রহ্লাদ এবং প্রোফেসর দুজনেই আজ সেই দিন কী ঘটেছিল তা বোঝাবার সময় এই বিকেল কথাটিই উল্লেখ করেছেন। বিকেল চারটেয় প্রোফেসর কফিটা খান, তারপরই অচেতন হয়ে পড়েন। এর পর পর্যায়ক্রমে প্রহ্লাদ আর নিউটনেরও একই দশা হয়। এই কাজগুলো করতে উইলসনের ঠিক কত সময় লেগেছিল বলা যায় না, ধরে নিচ্ছি সর্বোচ্চ আধঘণ্টা। সুতরাং প্রোফেসরের কাগজপত্র সরানোর কাজটা সে আধঘণ্টা পর করবে।
‘অবিনাশবাবু যখন এ বাড়িতে এলেন, ততক্ষণে প্রোফেসর বাক্সবন্দি হয়ে চলে গেছেন আলমারির উপর। বাড়ি ফাঁকা, কোথাও কেউ নেই, অথচ ঘরদোর সব খোলা পড়ে আছে। সময়ের খুব হেরফের না হলে উইলসনের তখনও এখানেই থাকার কথা। কিন্তু সে নেই। এবার যদি ধরেও নিই লোকটা ফরমুলা চুরি করে তল্পিতল্পা গুটিয়ে পালিয়েছে, তা হলে সে ঘরবাড়ি আসবাব যন্ত্রপাতি সব যেমন ছিল তেমনই ফেলে যাবে কেন? প্রোফেসর কেপলার অভিযানে চলে গেছেন, সেটা বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য এই ডিটেলগুলোর দিকে সে নজর দেবে না? এত মাথা খাটিয়ে প্রোফেসরের বিশ্বাস অর্জন করে ধাপে ধাপে যে বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে উইলসন এগিয়েছে, তার সঙ্গে এই স্টেপটা বিসদৃশ নয় কি?’
‘প্রোবাবিলিটির একটা অংশ বলছে উইলসন তখনও বাড়ি থেকে বেরোয়নি। তা হলে কি সে কোথাও লুকিয়ে ছিল? অবিনাশবাবু সারা বাড়িজুড়ে প্রোফেসরকে খুঁজছিলেন। যদি উইলসন লুকিয়েই থাকত, তবে ওঁর চোখে ধরা না পড়ার কোনও কারণ নেই। এ বাড়িতে গা ঢাকা দেওয়ার মতো কোনও জায়গা নেই সেটা আমি দেখেছি। তার মানে হয়তো উইলসন বাড়িতেই ছিল, কিন্তু এমন অবস্থায় যে, তাকে অবিনাশবাবু দেখতেই পাননি।’
ফেলুদা দম নেবার জন্য থামল। আমাদের কিছু বলার আছে কি না শোনার জন্য একটু অপেক্ষা করে বলল,
‘ঠিক যে অবস্থায় আজ সকালে প্রোফেসরকে আমরা পেয়েছি।’
ঘরে সবাই যেন পলক ফেলতে ভুলে গেছে। প্রোফেসর প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ফেলুদার দিকে।
‘উইলসনের এ হাল হল কী করে সেটাও একটা প্রশ্ন। সে কি অবিনাশবাবুর থেকে লুকোনোর জন্য নিজেই রিমোট টিপে ছোট হয়ে গিয়েছিল? তারপর অবিনাশবাবু বেরিয়ে যেতেই নিজের আসল চেহারায় ফিরে এসে কাগজপত্র অথবা যন্ত্র নিয়ে পালাল? এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা কম— কারণ যত দ্রুতই সে পালাবার চেষ্টা করুক না কেন, কারও না কারও চোখে পড়তে তো বাধ্য। ভুলে গেলে চলবে না, বলরাম তালা কিনে ফেরা পর্যন্ত সেখানে অবিনাশবাবু নিজেই পাহারায় ছিলেন। উইলসন বের হওয়ার চেষ্টা করলে ওঁর কাছে ধরা পড়েই যেত।
‘উইলসনের মোটিভটা আরেকবার ঝালিয়ে দেখা যাক। সে আবিষ্কার হাত করতে চাইছিল, না ফরমুলা? একটা কারণে সন্দেহ হয় ফরমুলা। অবিনাশবাবু বলেছিলেন তিনি প্রোফেসরের শোবার ঘরে গিয়ে দেখতে পান মেঝেতে খাতাপত্র ছড়ানো। আমার বিশ্বাস ওগুলো ছিল ফরমুলার খাতা, যা উইলসন নিতে চেয়েছিল। স্যার,’ ফেলুদা প্রোফেসরকে বলল, ‘আপনি কি আপনার ফরমুলার পেপারস বেডরুমে রাখতেন?’
‘হ্যাঁ। আমার আলমারি আর রাইটিং ডেস্কের দেরাজে থাকত। উইলসন সেগুলো দেখেওছিল। সব সময় অবিশ্যি লক করেই রাখতাম, কিন্তু সেদিন নোটস লেখার জন্য বার করতে হয়।’
‘এ সব ফরমুলার খাতার সংখ্যা মোটামুটি কত হতে পারে?’
‘কখনও হিসেব করিনি। পঞ্চাশের উপরে তো হবেই।’
‘বেশ। এখানে বিবেচ্য, এতগুলো খাতা উইলসনের পক্ষে কাস্টমসের চেকিং এড়িয়ে দেশে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ-ও হতে পারে সে হয়তো কয়েকটাই নিতে চেয়েছিল। কিন্তু কীভাবে নেবে? লোকজনের মনে কোনও রকম সন্দেহের উদ্রেক না ঘটিয়ে খাতাগুলো নিয়ে পালানোর একটা ভাল উপায় সামনেই রয়েছে, শ্যাঙ্কমোট। এটা দিয়ে খাতাগুলোকে ছোট করে খুব সহজেই নিয়ে যাওয়া যায়, পরে সুযোগ মতো বড়ও করে নেওয়া যাবে। উইলসন সেটাই করেছিল। থুড়ি— করতে চেয়েছিল।
‘শ্যাঙ্কমোটের লাল বোতাম টিপে কোনও জিনিসকে ছোট করা যায়। কিন্তু তার জন্য আগে এর উপরের তীর চিহ্নটিকে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ঘুরিয়ে নিতে হয়’, ফেলুদা এবার পকেট থেকে রিমোটটা বার করল— ‘এই দেখুন। লাল বোতামটা আমার দিকে, সবুজটা আপনাদের দিকে রাখছি। সবুজের তীরটা আপনাদের দিকেই ঘোরানো রয়েছে। আর লালটা?’
আমরা দেখলাম, লাল বোতামের তীরটা ফেলুদার দিকে ঘুরে আছে।
‘তীরটা এদিকে আমি ঘোরাইনি,’ ফেলুদা বলে চলল, ‘এটা এত বছর ধরে ঘুরেই ছিল। এখন বোতামটা টিপে দিলে কী হবে তা আপনারা জানেন। আমি ছোট হয়ে যাব। ঠিক এই ভুলটাই করেছিল উইলসন।’
আমি কানের কাছটা ভোঁ ভোঁ করতে শুরু করেছে।
‘তাড়াহুড়োয় তীরটা ঘোরাতে ভুলে গিয়েছিল সে। এক হাতে খাতা নিয়ে অন্য হাত দিয়ে রিমোটটা টিপে দিতেই বুমেরাং। রশ্মির সংস্পর্শে আসায় তার শরীরের অ্যাটমিক স্পেস কমতে শুরু করল। এই পর্যায়ে শরীরে সৃষ্টি হওয়া কম্পনের কারণে রিমোটটা হাত থেকে ছিটকে গিয়ে পড়ল আলমারির উপর। খাতাগুলো ছড়িয়ে পড়ল নীচে।
‘সেই খুদে শরীর নিয়ে অসহায় উইলসন সারা বাড়ি ঘুরে বেড়াতে লাগল। অবিনাশবাবু এসে তাই আর তাকে দেখতে পেলেন না। তারপর বাড়ির সবগুলো ঘরে তালা মেরে তিনি যখন চলে গেলেন, উইলসন ততক্ষণে আটকা পড়ে গেছে ল্যাবরেটরিতে। পরে বহুবার বাড়ির বাকি ঘরগুলো খোলা হয়েছে, শুধু ল্যাবরেটরি বাদে। উইলসন সেখানেই মারা যায়। ইঁদুর বা অন্যান্য পোকামাকড়ে বডিটা টেনে নিয়ে যায় আলমারির নীচে। তারই দেহাবশেষ আজ লালমোহনবাবু আবিষ্কার করেন।’
***
১৮.
কাল সারারাত আমার ভাল ঘুম হয়নি। যতবারই চোখের পাতা বুজে এসেছে, ততবার শুধু মনে ভেসে উঠেছে একটা খুদে মানুষের চেহারা, আর ঘুমটা চটে গেছে। ঘুম না হওয়ার যদিও আরও একটা কারণ আছে।
রাতের ঘটনার পর প্রোফেসর ফেলুদাকে বলেছিলেন, ‘মিস্টার মিত্র, আপনার জবাব নেই। যেভাবে আপনি রহস্যভেদ করলেন—এক কথায় স্প্লেনডিড।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আমি কেবল যুক্তি খাটিয়ে সেদিনকার ঘটনার একটা সম্ভাব্য ছবি তৈরি করার চেষ্টা করেছি। রহস্য তখনই ভেদ হত, যদি আসলেই উইলসনের সঙ্গে কী ঘটেছিল সেটা নিশ্চিত হওয়া যেত। কিন্তু সে সুযোগ তো আর নেই।’
‘আছে।’
‘আছে?’
‘অন্তত আমার কাছে।’
‘কীভাবে সম্ভব সেটা?’
‘আমার যন্ত্র নিও-স্পেকট্রোস্কোপ দিয়ে। আপনার অনুমান সঠিক কি না তা যাচাই করার জন্য এর চেয়ে ভাল রাস্তা আর হয় না। পুলিশি পরীক্ষায় কঙ্কালের পরিচয় জানা গেলেও এর পিছনের রহস্য কিন্তু অধরাই থেকে যাবে। তাই যদি উইলসনকে এ যন্ত্রে আমরা ডাকি, কঙ্কালটা ওর হলে ও নিজেই নিজের মৃত্যু রহস্য শোনাতে পারবে। প্রশ্ন হল আপনি কি আসতে চাইবেন? ভূতপ্রেতাদিতে বিশ্বাস আছে আপনার?’
‘অবিশ্বাস যে আছে তাও বলব না—কারণ প্রমাণ ছাড়া কোনও বিষয়ে অবজ্ঞা প্রকাশ করা বোকামি। এ সব ক্ষেত্রে আমার মনটা যথেষ্ট খোলা। এর আগেও আমি প্ল্যানচেটে বসেছি কয়েক বার। ধাপ্পাবাজি যেমন অনেক দেখেছি, তেমন ভাল মিডিয়ামের মধ্যস্ততায় সফল প্ল্যানচেটের অভিজ্ঞতাও হয়েছে। নিও-স্পেকট্রোস্কোপের পদ্ধতিটা আলাদা হলেও উদ্দেশ্য তো মূলত একই—আত্মার সঙ্গে যোগস্থাপন করা। এতে আমার না আসতে চাওয়ার কোনও মানে নেই। আপনি ব্যবস্থা করুন।’
‘নিশ্চয়ই। কিন্তু আজ রাতে তো আর হচ্ছে না, কিছু উপাদান সংগ্রহ করতে হবে তার জন্য। কাল সকালে বরং আমরা ল্যাবরেটরিতে বসব।’
শেষ কবে এত অধীর আগ্রহে সকাল হওয়ার অপেক্ষা করেছি মনে পড়ে না।
সকালে মুখ-টুখ ধুয়েই গুটিগুটি সকলে হাজির হয়েছি ল্যাবরেটরিতে। লালমোহনবাবু একটু সিঁটিয়ে আছেন। তাই ওঁকে সাহস দেওয়ার জন্য বললাম, ‘দিনের বেলায় ভূত নামালে ভয়ের কিছু নেই’—কিন্তু যুক্তিটা উনি পুরোপুরি মানতে পারলেন না। ফেলুদা যোগব্যায়াম করতে উঠে দেখেছে প্রোফেসর খুব ভোর থেকে কাজ শুরু করেছেন। প্রহ্লাদকে এখনই বাইরে বেরোতে দেওয়া যায় না, তাই যতীনই প্রোফেসরের কথামতো মালমশলাগুলো এনে দিয়েছে। তার মধ্যে নাকি চিতার ধোঁয়ায় পরিপুষ্ট কী সব গাছের শিকড়ও আছে।
‘আসুন। আমার সলিউশন তৈরি’, বললেন প্রোফেসর, ‘এবার শুরু করা যাক।’
হেলমেটের মতো যন্ত্রটার দুপাশ থেকে দুটো তার বেরিয়ে টেবিলে রাখা কাচের পাত্রে রাখা ঘন সবুজ তরলটির ভিতরে দুটো তামার পাতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। দেখে আমার কলেজের ল্যাবরেটরিতে দেখা অ্যাসিড ব্যাটারির কথা মনে পড়ে গেল।
কাচের পাত্রটার নীচে বার্নার জ্বালিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে প্রোফেসর ধ্যানে বসলেন।
সলিউশনটা গরম হতে লাগল।
মিনিট খানেক পর দেখি পাত্রের উপরে খুব সূক্ষ্ম একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী।
এবার সেটা সবুজ রঙের হয়ে গেল।
কুণ্ডলীটা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। না না, হয়নি—থেমে গেল।
একটা ছোট জায়গায় কুণ্ডলীটা জমাট বেঁধে ছোটাছুটি করছে।
প্রোফেসরের ভুরু কুঁচকে গেছে। তিনি বললেন, ‘আশ্চর্য—এ রকম তো হবার কথা নয়।’
ওই তো—কুণ্ডলীটা একটা মানুষের অবয়ব নিচ্ছে।
ঠিক মানুষের না। নরকঙ্কালের।
ক্রমে সেটা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
আমার ডান পাশে একটা ভাইব্রেশন টের পাচ্ছি। ঠকঠক করে লালমোহনবাবুর হাত কাঁপছে। তিনি চোখ বন্ধ করে আমার শার্টের এক কোনা খামচে ধরেছেন।
আমি আবার ধোঁয়ার কুণ্ডলীর দিকে তাকালাম।
এ তো কালকের সেই ছ ইঞ্চির কঙ্কাল!
জ্যাকব উইলসন।
না, তার ভূত।
প্রোফেসরের সাথে তার পরবর্তী কথোপকথন আর লেখার দরকার নেই, কারণ ফেলুদার অনুমান নির্ভুল। মৃত্যুর সময় তার আকার ছোট ছিল বলে যন্ত্রেও সে একই আকার নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে।
কাজ শেষ হওয়ার পর কঙ্কালটা ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে মিলিয়ে গেল।
‘গেছে?’ লালমোহনবাবু এক চোখ খুলে ভয়ে ভয়ে চারিদিক দেখে নিলেন।
‘গেছে।’
‘বাঁচা গেল।’ তারপর কিছুই হয়নি এমন এক ভাব করে এগিয়ে এসে লালমোহনবাবু প্রোফেসরকে বললেন, ‘ভেরি ব্রিলিয়ান্ট ইনভেনশন স্যার’, আর হঠাৎ গোঙানির মতো শব্দ হল ওঁর মুখ থেকে।
‘ও কী!’
কাঁপা হাতে ভদ্রলোক নির্দেশ করলেন একটা শিশিবোতলের শেলফের উপরে, ‘তপেশ—যায়নি!’
ওঁকে অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়ে যা দেখলাম—আমার হার্টটা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
শেলফের একটা তাকে হেঁটে বেড়াচ্ছে একজন খুদে সোনালি চুলওয়ালা শ্বেতাঙ্গ লোক।
আন্দাজে মনে হয় ছ ইঞ্চি।
এ কি জ্যাকব উইলসন?
প্রোফেসরের যন্ত্রের মাধ্যমে কঙ্কাল থেকে জড়দেহ ধারণ করল?
দিনের বেলাতেও আমার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা কালস্রোত নেমে গেল।
ভাবতে ভাবতে দেখি একটা বোতলের পাশ দিয়ে হেঁটে এসে সে লোক শূন্যে লাফ দিয়েছে।
‘উইল!’ প্রোফেসর চিৎকার করে উঠলেন।
লাফ দিয়ে মেঝে অবধি পৌঁছনোর আগেই শরীরটা অদৃশ্য হয়ে গেল।
‘কেমন দেখলেন আপনারা?’ নকুড়বাবুর কণ্ঠে হুঁশ ফিরল আমার।
‘কাল রাতের অত ঝামেলার পরে আর কিছু দেখাতে পারিনি। এখন সেই সাহেবের কঙ্কাল দেখে, আর তিলুবাবুর মুখে তার বর্ণনা শুনে ভাবলুম আপনাদের একটি বার তার দর্শন করিয়ে চমকে দিই। যদি কিছু বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়ে থাকে, আমায় মাপ করবেন।’
প্রোফেসর বললেন, ‘আমি এতদিন তোমার ক্ষমতার সঙ্গে পরিচিত, তাও অবাক না হয়ে পারলাম না। এ তো অবিশ্বাস্য! কিন্তু একটা কথা বলো, উইলসনের চেহারাটা অবিকল ওর মতোই হল কী করে?’
‘আজ্ঞে তা তো বলতে পারব না তিলুবাবু। আমি মনকে একাগ্র করে একটা ছবি ভেবে নিয়ে তার রূপদান করার চেষ্টা করি মাত্র—কিন্তু সে যে কী করে আসল ছবি হয়ে ওঠে, তা আমার জানা নেই।’
প্রোফেসর চেয়ার থেকে উঠে সোজা এসে ফেলুদা আর নকুড়বাবুকে জড়িয়ে ধরলেন। ফেলুদার ঠোঁটের কোণ থেকে নকুড়বাবুর প্রতি বিস্ময়ের হাসি এখনও সরেনি, সঙ্গে নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিকে শানিয়ে নেবার পর ওর চেহারায় ফুটে ওঠা তৃপ্তির চিহ্নটাও আছে।
‘আপনাদের মতো দুজন জিনিয়াসের সান্নিধ্য পেয়ে আমি গর্ববোধ করছি।’ —প্রোফেসর বললেন।
‘আর আপনাকে নিয়ে সারা পৃথিবী গর্ববোধ করে, স্যার।’ ফেলুদার গলাতেও একই আন্তরিক সুর।
লালমোহনবাবু হাততালি দিয়ে উঠলেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে যোগ দিলাম। পুরো একদিন পর আজ তিলুদিকে হাসতে দেখছি।
প্রোফেসর এবার নিও-স্পেকট্রোস্কোপটা দেরাজে তুলে রাখলেন। আলমারি লক করে এর চাবিটা তিলুদির হাতে দিয়ে বললেন, ‘এটা আপাতত তোর কাছেই রাখ,’ তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে আরেকটা চাবি বার করে বললেন, ‘আর এটাও। কাল জেগে ওঠার পর খেয়াল হল এ চাবিটা এত বছর ধরে পকেটে নিয়েই ঘুমিয়েছি। এটা ওই সিন্দুকের চাবি—এর লকটা আমারই তৈরি।’
‘সিন্দুকে কী আছে?’ তিলুদি প্রশ্ন করলেন।
প্রোফেসর চোখ নাচিয়ে বললেন, ‘গুপ্তধন।’
‘সত্যি?’
‘হ্যাঁ রে, আমার জন্য গুপ্তধনই বটে। এখানে আমার কিছু বিশেষ আবিষ্কারের ফরমুলা সংরক্ষণ করে রেখেছি। আর আছে আমার ব্রহ্মাস্ত্র, ভয়ংকর ইলেকট্রিক পিস্তল; যার ৪০০ ভোল্টের একটি বৈদ্যুতিক শক যে কোনও প্রাণীকে ধরাশায়ী করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।’
‘তাই বলো—আমি ভাবলাম বুঝি সেই রত্নটা।’
‘কোন রত্নের কথা বলছিস দিদিভাই?’
‘তোমাকে বলা হয়নি। আমাদের বেরিলির বাড়িতে পুরনো চিঠিপত্রের মধ্যে ঈশ্বর বটুকেশ্বর শঙ্কুর লেখা একটা কাগজ খুঁজে পাই আমি। তিনি লিখেছিলেন তোমার ভাগ্যে নাকি কী একটা রত্নপ্রাপ্তি ঘটেছে, ভারতবর্ষে এমন রত্ন আর দ্বিতীয়টি নেই। সেটা কী রত্ন গো?’
‘রত্ন—আর আমার কাছে?’
‘হ্যাঁ তো!’
‘দাদুর লেখা—ওহ হো!’ প্রোফেসর হেসে উঠলেন, ‘তাই বল! দাদু যে কী হেঁয়ালি পছন্দ করতেন তা জানিস? ওই লেখাটাও কতকটা একই রকম। কী হয়েছিল বলি শোন। আমার তখন তিন কি চার বছর বয়স। অক্ষর পরিচয়ও ঠিক করে হয়নি, কিন্তু বড় বড় অঙ্ক কষে ফেলতাম চোখের নিমেষে। দেখে সকলে অবাক। একদিন দাদুর একটা পুরনো সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে বসে গড়গড় করে পড়তে শুরু করি। এই ঘটনাটা দাদু নিজের দিনলিপিতে লিখে ফেলেন। আমি তখন তাঁর কোলে বসে। বললেন, ‘তিলু রে—তুই মাথায় রত্ন নিয়ে জন্মেছিস।’ বুঝলি তো, কীসের কথা বলেছেন দাদু লেখাটায়?’
‘আপনার মস্তিষ্ক’, ফেলুদা বলল, ‘কাগজের লেখাটা মনে করে দেখুন তিলোত্তমা, সব এখন জলের মতো পরিষ্কার। প্রোফেসর যে এমন অসীম বুদ্ধির অধিকারী হবেন সেটা কুষ্ঠিতে আগেই ধরা পড়েছিল। দেখা গেল সেই মস্তিষ্ক ক্রমেই তুখোড় হয়ে উঠছে, প্রতিনিয়ত নিজেকেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর বুদ্ধির ধার।’
‘আর প্রোফেসরের মতো প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ভারতবর্ষে সত্যিই অনন্য’, লালমোহনবাবু বলে উঠলেন।
‘বুঝেছি’, তিলুদি বললেন, ‘আসলে ভুলটা আমাদেরই। রত্ন চিনতে আমরাই ভুল করে থাকি। মন ও মেধার ঊর্ধ্বে সত্যিই কোনও রত্ন হয় না, অন্তত কোনও পার্থিব রত্ন তো নয়ই।’
‘একদমই তাই। এই রত্ন—’ ফেলুদার মুখের কথা আটকে গেল, কপালে আবার সেই বিখ্যাত ত্রিশূলের মতো ভ্রূকুটি; হঠাৎ আমার দুই কাঁধ ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে ও চিৎকার করে উঠল, ‘অসম্পূর্ণ নয় তোপসে! অসম্পূর্ণ নয়! এবার সম্পূর্ণ!’ আমি ভ্যাবাচ্যাকা—ফেলুদা উত্তেজিত গলায় বলল, ‘উমাপ্রসাদের সম্পূর্ণ কারসাজিই মনে হচ্ছে আমি ধরে ফেলতে পেরেছি রে।’
‘কী ধরে ফেললে?’
‘উইলসনের প্রস্তাবে উমাপ্রসাদ প্রোফেসরকে রাজি করাতে পারলে তার যে অর্থপ্রাপ্তির সম্ভাবনা তার ছিল—সেটা হাতছাড়া হওয়াতে লোকটার মনে ক্ষোভ জমে। সে ক্ষোভ দ্বিগুণ হয় প্রোফেসরের কাছ থেকে অপমানিত হয়ে। তার মনে প্রতিশোধের স্পৃহা জাগে। হতে পারে প্রতিশোধ নিতে সে-ই প্রোফেসরের বাড়িতে চোর পাঠায়। কী চুরি করতে এসেছিল চোর তা আশা করি আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই! চুরিটা সে যাত্রায় ব্যর্থ হয়।
‘সময়ের সাথে সাথে লোকজনের মন থেকে প্রোফেসর শঙ্কু মুছে যেতে থাকেন। উমাপ্রসাদও ব্যাপারটা প্রায় ভুলে যায়। তারপর এই এতগুলো বছর বাদে মানিকবাবুর আর্টিকেলের সূত্রে বাকিদের মতো ওরও খেয়াল হয় প্রোফেসরের কথা। চাপা ক্ষোভটা আবার জেগে ওঠে। আগের চুরিতে যদি ওর হাত না-ও থেকে থাকে—এই চুরিটা যে ও-ই করাতে চেয়েছিল, তা আমরা কাল জেনেছি। এখন সে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, পনেরো বছর আগেকার সেই ছুটকো এজেন্ট নয়। ক্রিমিনাল অ্যাক্টিভিটিজের সঙ্গে যুক্ত, হাতে অঢেল ক্ষমতা। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে উমাপ্রসাদ প্রোফেসরের মূল্যবান আবিষ্কারগুলো পাওয়ার আশা করে।’
‘কীভাবে?’
‘স্পাই লাগিয়ে। আমরা আসলে ভুল ভেবেছিলাম রে। স্পাই সে আমাদের পিছনে লাগায়নি, লাগিয়েছিল মানিকবাবুর পিছনে।’
‘কিন্তু—’
ফেলুদা আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘আগে শেষ করতে দে—কেন আমি বলছি মানিকবাবুর পিছনে স্পাই লাগানো হয়েছিল, একটু বুদ্ধি খেলিয়ে ভেবে দ্যাখ। প্রোফেসরকে আবার লাইমলাইটে মানিকবাবুই তো এনেছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাই যদি হয়, প্রোফেসরের সম্পর্কে খোঁজখবর করতে উমাপ্রসাদ ওঁর পিছনেই লোক লাগাবে। আমার সঙ্গে প্রোফেসর শঙ্কুর কোনও সম্পর্ক নেই। তাই এই জায়গা থেকে উমাপ্রসাদের আমাকে চেনার কথা নয়, যদিও আমি যে গোয়েন্দা সেটা সে জানত। অতএব স্পাই আমার পিছনে প্রথমে লাগেনি।’
‘পরে লেগেছিল?’
‘ঠিক আমার পিছনে নয়, তিলোত্তমার পিছনে।’
‘অ্যাঁ?’ আমার আবার মাথাটা গোলমাল হয়ে যাচ্ছে, ‘কিন্তু কেন? উমাপ্রসাদ তো গিরিডিরই লোক, ও তো চাইলেই যে কোনও সময়ে চুরি করতে পারত। তা হলে মানিকবাবু আর তিলুদির পিছনে স্পাই লাগানোর কারণ?’
‘কারণ একমাত্র মানিকবাবুই জানতেন প্রোফেসরের বাড়ির ভিতরের বর্তমান পরিস্থিতি। তিনি এখানে এসেছেন, কাগজপত্র যন্ত্রপাতি নিজে দেখেছেন, ডায়রি নিয়ে গেছেন, অবিনাশবাবুর সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। উমাপ্রসাদ এবার আর ছিঁচকে চোর পাঠিয়ে চুরি করাতে চায়নি—বরং বেশ মেথডিক্যালিই এগোচ্ছিল। মানিকবাবুর কাছ থেকে কোনও গোপন তথ্য বার করা যায় কি না সেই উদ্দেশ্যে সে স্পাই লাগিয়েছিল। এভাবে একটা সময়ে গিয়ে স্পাই তিলোত্তমার সন্ধান পায়। তিলোত্তমা, আপনি মানিকবাবুকে এই রত্নটির কথা জানিয়েছিলেন?’
তিলুদি হতবাক হয়ে ফেলুদার কথা শুনছিলেন, বললেন, ‘হ্যাঁ। তিনি বলেন এ ধরনের গুপ্তধন কিছু যদি থেকেও থাকে তা আপনি খুঁজে বার করতে পারবেন। তারপরই আমি আপনার সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিই।’
‘স্পাই জানায় প্রোফেসর শঙ্কুর নাতনী একটি রত্নের কথা বলেছেন। এই রত্নের উপর উমাপ্রসাদের লোভ হয়। এতে এক ভাবে যেমন নিজের প্রতিশোধ চরিতার্থ হয়, তেমনি চোরাকারবারি হিসেবে এমনিতেও এটা মস্ত দাঁও মারার সুযোগ। কিন্তু আমার মনে হয় উমাপ্রসাদের কাছে পুরো খবরটা ছিল না। আপনি যে এই রত্ন সম্পর্কে কিছু জানেন না, এটা সে জানত না। তাই আমরা কবে গিরিডি আসছি জেনে নিয়ে সে একই ট্রেনে তার রাইট হ্যান্ড ম্যানকে পাঠায়, আমাদের ফলো করে রত্নটার ব্যাপারে ইনফরমেশন জোগাড় করতে। এদিকে আপনি একা নন, আপনার সঙ্গে আমি আছি; আর গোয়েন্দার উপস্থিতিতে চুরি করানোটা উমাপ্রসাদের পক্ষে শক্ত। তাই আমাকে কাটানোর চেষ্টা।’
তিলুদি বললেন, ‘সে যে রত্নই চেয়েছিল, আবিষ্কার নয়, সেটা কী করে নিশ্চিত হচ্ছেন আপনি?’
‘আবিষ্কার চাইলে আমাদের ফলো করানোর কোনও প্রশ্নই থাকত না, এত ঝামেলা না করে সে গিরিডিতে বসেই চুরির প্ল্যান ফাঁদতে পারত।’
আমি বললাম, ‘তা ঠিক। কিন্তু স্টিভেন হুপার তো ব্যবসায়ী ছিল ফেলুদা, ও কেন বিদেশ বিভূঁইয়ের চোরাই মাল নিতে চাইবে?’
‘শুধু ব্যবসায়ী নয়—কালেক্টরও। আর কালেক্টরদের গোঁ সম্বন্ধে সিধুজ্যাঠা একবার কী বলেছিলেন ভুলে গেছিস? কালেকশনের জন্য হিরে জহরতের খোঁজে এরা করতে পারে না এমব কিছু নেই। এ রকম লোককে মুলোর টোপ দেখিয়ে উমাপ্রসাদ কাজ হাসিল করতে চাইবে, তাতে আর আশ্চর্য কী।’
‘আপনার মাথাটিও কোনও রত্নের চেয়ে কম না’, জটায়ু মন্তব্য করলেন।
‘বলছেন?’
‘যেমন সাসপেন্স ফিলিম দেখালেন, তারপরেও বলব না?’
‘ফিলিম কিন্তু শেষ হয়নি।’
‘হয়নি? মশাই, আমার হার্টের কন্ডিশন ভাল ঠেকছে না। লো ব্লাড প্রেশার—মনে আছে তো?’
‘চিন্তা করবেন না। একটা মিরাকিউরল বড়ি, ব্যস। হার্ট ব্লাড কিডনি—কিছুরই ঝামেলা থাকবে না।’
‘দুর মশাই! ইয়ার্কি না করে বলুন দেখি, আপনার ফিলিমের শেষটায় কী আছে?’
‘এখনও তো প্রমাণ পাওয়া বাকি। সেটা পেলেই কেল্লা ফতে।’
‘বোঝো। এই প্রমাণের চক্করে আবার কার ভূত ডাকবেন?’
‘ভূত বলে ভূত? একেবারে জ্যান্ত ভূতের বয়ান নেবার সময় এসে গেছে। মিডিয়াম হলেন ইনস্পেকটর রেড্ডি।’
আমরা আরও তিন দিন ছিলাম গিরিডিতে। অবশেষে প্রোফেসর সর্বসমক্ষে এসে টিভি আর খবরের কাগজের রিপোর্টারদের সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সঙ্গে অবিশ্যি ফেলুদাকেও সাক্ষাৎকার দিতে হয়েছে। দুজনের একসঙ্গে তোলা ছবিও ছাপা হয়েছে বিভিন্ন কাগজে। দুটো খবর এখানে দিয়ে দেওয়া দরকার—উমাপ্রসাদের স্বীকারোক্তি আদায় হয়েছে, আর প্রোফেসরের বাড়ির একটা ঘর থেকে উইলসনের একটা সুটকেস পাওয়া গেছে। তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র থেকে পাওয়া নমুনার সঙ্গে কঙ্কালটির ডিএনএ ম্যাচ হয়েছে। প্রোফেসর এই কেসের পারিশ্রমিক তিলুদিকে দিতে দেননি। নিজেই ফেলুদাকে একটি মহামূল্য বস্তু উপহার দিয়েছেন—সেটা হল গ্রীক দেবী অ্যাথেনার একটি অ্যান্টিক মূর্তি। গাঢ় সবুজাভ গা, তার উপরে অনেক রকম ঝলমলে পাথর বসানো—যার মধ্যে পান্না আর পোখরাজটা চিনতে পেরেছি শুধু। এত নিখুঁত কারুকাজ যে দেখলে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ‘অ্যাথেনা বুদ্ধি আর জ্ঞানের দেবী, জানেন তো? আপনার উপর এঁর কৃপা সর্বদা বর্ষিত হোক—এই কামনাই করি।’ প্রোফেসর বললেন।
ক্রোল আর সন্ডার্সের চিঠিও এসে গেছে, তবে সেটা ফেলুদার চিঠির উত্তরে নয়, প্রোফেসরকেই লেখা। ওঁর প্রত্যাবর্তনের খবরটা দেশ বিদেশের পত্র-পত্রিকায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফেলুদার চিঠির উত্তর আর দিতে হয়নি, তার আগেই দুই বন্ধু জানতে পেরে যান প্রোফেসরের কথা। খুব তাড়াতাড়িই তাঁরা ভারতে আসছেন বলে চিঠিতে লিখেছেন। অবিনাশবাবু আর লালমোহনবাবুর মধ্যে দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ফেলুদার মতে দুজনের চিন্তাভাবনা নাকি সমান্তরালে চলে। নকুড়বাবু এখনকার মতো জলপাইগুড়ি ফিরে গেছেন, এর পরের বার বেশি দিনের ছুটি নিয়ে আবার আসবেন।
তিলুদি আর আমাদের সঙ্গে এলেন না, আরও কিছু দিন দাদুর কাছে কাটিয়ে তারপর কলকাতায় ফিরবেন। ভারী আনন্দে আছেন তিনি। প্রহ্লাদ বাগানের একটা জাম গাছে দোলনা খাটিয়ে দিয়েছে, নিউটনকে কোলে নিয়ে দু'বেলা সেটাতে চড়ে দোল খাচ্ছেন। এখন ওঁকে মনে হচ্ছে কোনও পাহাড়ে ঝরনা—যার মুখে এতদিন একটা পাথর চাপা দেওয়া ছিল, পাথরটা কেউ সরিয়ে নিয়েছে। লালমোহনবাবু তো বলেই দিয়েছেন, ‘তিলুদেবীর নামের আগে একটা কল্লোলিনী না বসালে চলে না।’
কিন্তু ফেলুদার মাথায় যে কী চলছে সেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না। আমাদের ফেরবার আগের দিন রাতে দেখি ও ওর সেই নীল খাতা বার করে তাতে কী সব লিখছে। কেস মিটে গেছে, অপরাধী ধরা পড়েছে, এর পরেও এত কীসের হিসেব-নিকেশ কে জানে। কৌতূহল চাপতে না পেরে আমি আর লালমোহনবাবু মিলে ওর খাতাটা খুলে পড়ে ফেলেছি, যদিও মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারিনি। একটা গোটা পাতা জুড়ে এলোমেলোভাবে লেখা রয়েছে শুধু একটাই মাত্র লাইন, “বিদ্যাপতি কহে কৈছে গোঙায়বি হরি বিনে দিন রাতিয়া”।
‘মিস্টিরিয়োসো!’ —বলে উঠলেন লালমোহনবাবু।
(সমাপ্ত)

No comments:
Post a Comment