(1)
নমস্কার। আমি ফেলু বলছি। আপনাদের ফেলুমিত্তির। ছোটদের ফেলুদা।
লেখালেখি আমি পারি না। তবে ডায়েরী লেখার অভ্যাসটা আমাকে সিধুজ্যাঠাই করিয়েছে। আমার কাজের জন্য আরেকটা নীল ডায়েরী আছে বটে, কিন্তু সেটা স্রেফ কাজের জন্য! আর এটা...
এটা আমার কাছের... এটার খবর তোপসেও জানে না। বলিনি ওকে... আমার মনের কথা গুলো লিখে রাখার জন্য, তারিখটা ইচ্ছে করেই দিচ্ছি না, যদিও দেওয়াটা নিয়ম।
আমি জানি... আমি Public Figure। অনেক মানুষ আমাকে ভালবাসে, অনেক শত্রুও আছে, অনেকের সঙ্গে পরিচয়, কিন্তু... আমার নিজের জগতটা আমি কারও সঙ্গে শেয়ার করিনা। সেটা একমাত্র এই ডায়েরী জানবে।
এতদিন পর এই ডায়েরী লেখার প্রয়োজনীয়তাটা কেন হল সেটা বলি। মাদ্রাজ থেকে ফেরার পর কেন জানি না। পুরনো দিন গুলোর কথা মনে হচ্ছিল, তারপর মনে হল... আমি যখন আর থাকব না, তখন এই সব স্মৃতিগুলোও থাকবে না, কত রকম লোকের সঙ্গে আলাপ হয়েছে, কত রকমের চরিত্র, তাদের কথা বলতে ইচ্ছে করে। তোপসে সবটা জানে না... কিন্তু আমার বলতে ইচ্ছে করে। বলতে পারি না। আমার কথা কাউকে বলা হয়ে ওঠেনি। এই ব্যাপারটা সিধুজ্যাঠাকে বলতে। তিনি এই ব্যাপারটা Suggest করলেন।
তাই বলব! সব বলব! একদিন সবাই জানবে...
***
(2)
ছোটবেলার কথা খুবএকটা মনে নেই। বাবা খুব ভালবাসতেন আমাকে চটকাতেন, এটুকু মনে আছে। মা কে জন্মের পরপরই হারিয়েছি, শুধু ছবিতেই দেখেছি। বাবা মারা যাওয়ার পরপরই কাকা বিক্রমপুরের পাট চুকিয়ে কলকাতায় চলে আসেন। তোপসে এখানেই হয়। তারপর এখানেই আমার স্কুল, কলেজ, চাকরি। দেশের বাড়ি একবার গেছিলাম কলেজে পড়ার সময়... কোন স্মৃতি নেই। শুধু আবদুলচাচার বাড়িটা এখনও আছে...
আমাদের আত্মীয়রা বিশেষ খোঁজ খবর রাখেনি... মামারবাড়ির লোক হয়ত আমাকে মনেও রাখেনি। কাকিমার কাছে শুনেছি... আমার মামারবাড়ি ছিল খুব বড়লোক। সে তুলনায় স্কুলশিক্ষক বাবাকে ওরা মেনে নিতে পারেনি,তাই হয়ত...
আমি ছোট থেকে কাকা কাকিমার কাছেই মানুষ। শ্রীনাথদা ছিল আমার খেলার সঙ্গী। তোপসে হওয়ার পর... আমাদের একটা পুচকে খেলার সঙ্গী হয়। আমার তখন কত হবে... ১৩/১৪ বছর হবে। তখনতো আমাদের প্রায় খেলারই বয়স... আজকালকার মত এত পড়ার চাপ ছিল না। স্কুলে মাঝারি মানের ছাত্র ছিলাম। তবে সবসময় মনে হত, আমাকে নিজে কিছু একটা করতে হবেই। কাকা জোর করেন নি কখনো কোন কিছুতেই। কাকিমা অবশ্য মাঝে মাঝে বলতেন তুই যখন বাইরে চলে যাবি... আমি নিজে কিন্তু তখন বাইরে চলে যাওয়ার কথা বলিনি। কিন্তু কাকিমা বলতেন কথাটা... হয়ত আমার ভালোর জন্যই... ওদের স্বপ্ন ছিল ভাল কোন চাকরি করব মোটামাইনের, বিয়ে দেবেন আর তারপর...
না!!! ওদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি আমি...
***
(3)
স্কুলে আমার কিছু বন্ধু ছিল। তাদের সঙ্গে খুব মজার স্মৃতি আছে। একবার মনে আছে... স্কুলে সেদিন পিরিয়ডে স্যার আসেন নি। আমরা আড্ডা দিচ্ছি, খেলছি, আমার আবার পড়াশোনার থেকে অন্যান্য বিষয়ে ঝোঁক ছিল বেশি। সেদিন আমার এক পাড়ার দাদার থেকে শেখা তাসের ম্যাজিক দেখাচ্ছিলাম আমার বন্ধুদের। হঠাৎ দেখি বাংলা স্যার পিছনে দাঁড়িয়ে! তাসের প্যাকেট তো কেড়ে নিলেনই... পুরো "দেবতার গ্রাস" মুখস্থ বলে তবে মুক্তি।
কলেজে উঠে আলাপ হল সুহৃদের সঙ্গে। ওর সঙ্গে বিশেষ আলাপ কারণ ও আমার ঠিক পাশের বেঞ্চেই বসত। আর ওর দাদা পড়েছিল প্রেসিডেন্সিতে। তাই ইকনমিক্সের নোটসগুলো ভাল পেতাম। ওর দাদা আমাকে খুব ভালবাসতেন। ওর দাদার কাছে অনেক বই ছিল, বিভিন্ন বিষয়ে, প্রায়ই পড়তে যেতাম।
এখানে চুপি চুপি বলে রাখি, আমি তো কলেজে ক্রিকেট খেলতাম। যোগব্যায়ামের অভ্যাসটা ছিলোই স্কুল থেকে, তাই আমার চেহারাটা নেহাত মন্দ ছিল না। একটি মেয়ে আমার প্রেমে পড়েছিল। বেশ কয়েকবার আমাকে কফিহাউসে যাওয়ার আমন্ত্রণ করেছিল। সত্যি বলতে কি... আজ আমার ভক্তরা আমাকে হিরো ভাবলেও, আমি ছিলাম খুব লাজুক, তাই যাইনি। আর তাছাড়া... আমার তখন কিছু করার, নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা, কিছু টিউশনি করতাম হাত খরচা চালাবার জন্য, তাই... প্রেম বিয়ে, এসব নিয়ে ভাবার আর সময় হয়নি।
কলেজ পাশ করার পর, বেশ কিছু বছর বেকার ছিলাম। বাড়িতে থাকতে লজ্জা করত... চলে আসতাম সিধুজ্যাঠার বাড়ি। বই পড়তাম। সুহৃদের দাদার কাছে চাকরির পরীক্ষার বই পেয়েছিলাম। সেসব চর্চা করতাম। সঙ্গে চলত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পড়া। যে গুলো আমাকে পরে অনেক কাজে দেয়। আর পায়ে হেঁটে ঘুরতাম কলকাতার রাস্তার অলিগলি...
গোয়েন্দা গিরি করব সেটা তখনো ভাবিনি... সেটা হল আরো অনেক পরে...
***
(4)
বয়েস বেড়ে যাচ্ছিল, খরচা বাড়ছে, নিজের হাতখরচা চালাবার টাকাটার জন্য টিউশনি করতাম। তিন চারটে স্কুলের ছেলে মেয়ে ছিল... পড়াতাম। তারা আমার কাছে পড়ে মজাই পেত... কারণ আমি পড়াতে পড়াতে নানান গল্প তাদের শোনাতাম... আমার চিরকালই পড়াশোনা জিনিসটা সহজ করে করাতে ভাল লাগে।
কিন্তু শুধু টিউশনি করে তো চলবে না... চাকরির পরীক্ষা গুলো দিতাম। কিছু ইন্টারভিউ অবধি গড়ালেও, শেষমেশ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার আর আসত না।
এই ভাবে প্রায় ৪/৫ বছর কাটল। বেকার জীবনের চাপ তো ছিলই, কিন্তু... এই সময়ে প্রচুর বই পড়েছি আর সিনেমা দেখেছি। যেটা ভবিষ্যতে আমাকে গোয়েন্দাগিরিতে অনেক কাজে দিয়েছে।
প্রায় তখন ২৭ বছর বয়েস, '৬৪/'৬৫ সাল হবে... একটা ব্যাঙ্কের চাকরি পেলাম। মনটা শান্ত হল। কি ভাগ্যি প্রথম পোস্টিং হল এই কলকাতাতেই। কাকা খুব খুশী হয়েছিলেন। তবে ওনার ইচ্ছে ছিল , আমি যেন বাবার মত স্কুলশিক্ষক বা কলেজের প্রফেসর হই।
চাকরির ইন্টারভিউটা দেওয়ার পরপরই আমরা দার্জিলিং গিয়েছিলাম সকলে মিলে... সেখানেই রাজেনবাবুর সঙ্গে সেই রহস্যময় ঘটনাটা ঘটে। তোপসে সঙ্গে ছিল আমার সবসময়। তার পর থেকেই ওর মাথায় সব সময় রহস্যভেদের ভূত ঘুরত। যাই দেখত তাতেই রহস্য খুঁজে পেত। স্কুলে গিয়ে গল্প করত এই ব্যাপারে। পাগল ছেলে একটা!
ওই আমাকে উৎসাহ দেয় গোয়েন্দাগিরি করার ব্যাপারে। তখনো এটা যে একটা পেশা হতে পারে, ভাবিনি। কিন্তু কাজটা ভালই লাগত। চেষ্টা করতাম কি ভাবে Detection করা যায়, পর্যবেক্ষণ করতে Practice করতাম। চাকরিটা পাওয়ার পর থেকে রাত জেগে এই বিষয়ে বিভিন্ন বই পড়তাম। সিধুজ্যাঠাও উৎসাহ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন গোয়েন্দাগিরির ইতিহাসটা ভাল করে পড়ে নিও।
সেই সুরু হল। একটা নেশার মত...
***
(5)
চাকরিটা আমি তখনো ছাড়িনি। গোয়েন্দাগিরিতো তখনো শখের ছিল। একটা বাঁধা আয়ের রাস্তা রাখাটা দরকার ছিল। যখন দেখলাম এই কাজ থেকেও ভালই আয় করতে পারছি, তখন ছাড়লাম। কারণ বার বার ছুটি নিয়ে কাজ করা যায় না। আর এই কাজে একটা যে স্বাধীনতা আর সত্যি খুঁজে বার করার আনন্দ সেটা কোন চাকরি দিতে পারে না। তাই সরকারি চাকরিও ছেড়ে দিলাম।
কাকিমা খুশী হননি। তোপসে যে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে সেটাও কাকিমার মনঃপূত হয়নি। কিন্তু কাকা খুশী ছিলেন। আমি যখন সকলের অসুবিধের কথা ভেবে ফ্ল্যাটে উঠে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম, কাকা রেগে গেছিলেন।
গোয়েন্দাগিরির কথা তো তোপসে লিখছেই। সে সবের কথা থাক। বরং অন্য কথা বলি।
কাজের সূত্রে অনেক রকম মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। কারো সঙ্গে আজো যোগাযোগ আছে। মুকুল এখন আর্ট কলেজে পড়ে। ওর রাজস্থানের সেই সব স্মৃতি আজো মনে পড়ে। মাঝে মাঝে ফোন করে খবর নেয়। রুকুও এখন বড় হয়ে গেছে। শেষ শুনেছিলাম উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে গতবছর। ওদের কলকাতার বাড়িতে একবার গিয়েছিলাম। আরেকজনের কথা না বললেই নয়। সে হল মহেশ চৌধুরীর নাতনি, বিবি। এখনো সেই কথার খেলার নেশা ওর আছে। আমাকে মাঝে মাঝে ফোন করে এটা সেটা নিয়ে বলে। আমার বাড়িতেও আসে। বই পড়তে খুব ভালবাসে। আমার বই গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করে। মহিম বাবু একবার ফোন করেছিলেন। দুর্গাগতি সেনের শরীর বিশেষ ভাল নেই। আমাকে আর সিধুজ্যাঠাকে ডাকছেন। একবার পুরী যাওয়া দরকার।
সবই ঠিক আছে... তবু মনের মধ্যে আজকাল একটা অস্বস্তি হয়...
***
(6)
তখন ৭০এর দশক। কলকাতায় একটা অস্থির অবস্থা ! কলেজে পড়তে পড়তে অনেকেই এই সমসাময়িক আন্দোলন, রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। আমি জড়াই নি... ওরা অনেকবার ডেকেছিল। পল্টু, মাইতিদা, অনিমেষ অনেকবার বলেছিল যে, ফেলু একবার দেশের জন্য কাজ কর। আমাদের লড়তে হবে।
না। আমার মন সায় দেয় নি। রাজনীতি থেকে আমি বরাবরই দূরে থেকেছি। কেবল নিজের জীবন গোছানোর জন্য না। আমার মনে হত, যুদ্ধ করে, বোমা ছুঁড়ে কিছু করা যায় না। তবে খারাপ লাগত দেশের অবস্থার জন্য। কিছু লোক টাকার ক্ষমতার জোরে যা খুশী তাই করবে, আর যারা পরিশ্রম করবে তারা অবিচার পাবে। এটা মেনে নেওয়া যায় না। আবার, আমার সেই সব গরীবদের প্রতি কোন সহানুভূতি নেই যারা পরিশ্রম না করে স্রেফ আমরা কেন গরীব থাকব বলে, একটা মিথ্যা লড়াই করে।
তোপসে বড় হচ্ছে। ওকেও এই সবের থেকে দূরে রাখতে চেয়েছি। তাই ওকে ভাল ভাল বই - সিনেমা দেখতে বলতাম। এতে মনটা পরিষ্কার হয়। মজার কথা, আমি বিদেশী বই পড়তাম বলেও আমাকে আমার বন্ধুদের থেকে কথা শুনতে হয়েছে। হা হা !!!
চাকরি করার সময় আমার এক কলিগের সঙ্গে আমার এই সব নিয়ে কথা হত। তার দৃষ্টিভঙ্গী আমার ভাল লেগেছিল। সে বলত, নিজে ঠিক থাকলে, দেশ, রাজ্য, সরকার... সব কিছু ঠিক থাকবে। এই নিজে ঠিক থাকাটা... কেন যে কেউ থাকতে চায় না। অন্যায় - অপরাধ থাকবেই। যে অন্যায় করছে তারও কোন না কোন কারণ আছে। অন্যায়কারী কে বোঝাতে হবে তার কাজটা ভুল। তার দিক থেকে যে কারণটা সে ঠিক ভাবছে সেটা অন্যের ক্ষতি করছে। কেউ জন্মেই অপরাধী হয় না। তাই আমি মগনলাল কে বার বার শুধরে যাওয়ার কথা বলতাম।তোপসে অবশ্য সে কথা জানে না। শেষবার মগনলালের সঙ্গে দেখা হয় ওর কলকাতার বাড়িতে। ডেকেছিল আমাকে। একা। অনুতপ্ত। জাল ওষুধে সুরজলালের একটা শারীরিক সমস্যা হয়। তাইতেই মগনলাল তার ভুল স্বীকার করে।
***
(7)
বেড়াতে যেতে ছোট থেকেই ভালবাসতাম। মনে আছে কাকার সঙ্গে ছোটবেলায় একবার সুন্দরবন গিয়েছিলাম। কাকারই কি একটা কাজ ছিল। সেই সুত্রেই কয়েকদিন ছুটিও ম্যানেজ করে আমাদের সবাইকে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেবার তখন আমি খুবই ছোট। তোপসে তখনতো হয়ই নি। গিয়ে আমি বাঘের পিঠে চড়ব বলে নাকি খুব বায়না আর কান্না জুড়েছিলাম। :)
কলেজে পড়ার সময় বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এদিক ওদিক ঘুরতে গেছি। বেনারস... লখনউতে তো ক্রিকেট খেলতেও গেছি। তখনও ঘুরেছি। তারপরতো বিভিন্ন কেসে নানান জায়গা ঘোরা হল। তোপসে সব জায়গায় যেতে পারেনি স্কুলের পরীক্ষার জন্য। আর সত্যি বলতে কি, লালমোহন বাবু আসার পর থেকে বেড়ানোর আনন্দটা অনেকটা বেড়ে গেছে। ওনার সঙ্গে বেড়িয়ে যে আনন্দ, সেটা লিখে বা বলে বোঝানো সম্ভব না।
বেড়াতে যাওয়ার আগে কোন জায়গা সম্মন্ধে পড়ে নেওয়ার অভ্যাসটা বলেছিলেন আমার কলেজের এক প্রফেসর। ওনাকে আমরা মাস্টারমশাই বলে ডাকতাম। প্রফেসর শশাঙ্ক। উনি ছিলেন অঙ্কের অধ্যাপক। কাজের সূত্রে বিভিন্ন জায়গায় গেছেন। সেমিনার / গেস্ট লেকচারার হয়ে ... উনিই বলতেন "বুঝলে, বইতে পড়া জায়গাগুলোতে গিয়ে পড়লে যখন সেগুলো কল্পনার সঙ্গে বাস্তব মিলে যায় তখন অনেকটা অঙ্ক মেলানোর মত আনন্দ পাই !!"
এমনতো অনেকবার হয়েছে যে বেড়াতে গিয়ে কেস পেয়েছি। কিন্তু কয়েকবার বিরক্তও হয়েছি। হয়ত কেউ চিনে ফেলেছে... সঙ্গে সঙ্গে হোটেলে এসে পীড়াপিড়ি - কার বাড়ি চুরি হয়েছে, কার দামি গয়না হারিয়ে গেছে, এমনকি কার পকেটমারি হয়েছে সেটা অবধি। আমি এই সব ক্ষেত্রে মাঝে মাঝে কঠোর ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছি। পরে মনে হত, ওরা সাধারণ মানুষ। হয়ত খুবই অসহায় হয়ে এসেছে। সব সময় সব জায়গায় পুলিশরা সব কেস সল্ভ করতে পারেন না। বা সব কিছু করা ওনাদেরও সম্ভব নয়। অনেকসময় ওনাদের হাত পা ও বাঁধা থাকে। এই সব সাধারণ মানুষ দের সাহায্য করা আমার উচিত। তেমন কেসও আমি অনেক সময় নিয়েছি। যদিও তোপসে সে সব লেখেনি। আমিই বারণ করেছি। ওর পাঠকদের ভাল লাগত না।
***
(8)
সবকথা গল্পে বা উপন্যাসে বলা যায় না। ডায়েরীতে সব কিছু বলা যায় বা বলতে হয়।
আজকাল তোপসের জন্য বড্ড চিন্তা হয়। স্কুল কলেজের পড়াশুনো না হয় সামলে আমার সঙ্গে থাকে। কিন্তু ওরও তো নিজের জীবন আছে। যত বয়েস বাড়ছে। আমি কেমন যেন ওর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি। কেসের ব্যাপারে আজকাল আমি নিজে অনেক সময় কাজে যাই না। ওকে আর লালমোহন বাবুকে পাঠিয়ে দি। তখন কিছু মনে থাকে না। ওরা আমাকে ভালবাসে তাই কিছু বলে না হয়ত খুশি মনেই কাজটা করে এসে আমাকে রিপোর্ট করে। কিন্তু ওর নিজের পড়াশোনার কোন ক্ষতি হচ্ছে না তো? বা ওকে ওর নিজের কেরিয়ার করতে বাধা দিচ্ছি না তো? কাকিমার হয়ত ওকে নিয়ে অন্য কোন স্বপ্ন আছে... আমি আবার তেমন কোন স্বপ্ন ভেঙ্গে দিচ্ছি না তো?
সেদিন লালমোহন বাবু একটা অদ্ভুত কথা বললেন, "জানেন মশাই ! সেদিন হঠাৎ একটা দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গে গেল। মগনলাল আমাকে আবার সেই অর্জুনের ছুরির সামনে দাঁড় করিয়েছে। আর একটা ক্রুর হাসি হেসে বলছে। এবার আর আপনার রেহাই নেই মোহনলালবাবু !!!"
আমার সঙ্গে ঘোরার জন্য লালমোহন বাবুকে অনেক বিপদের সামনে পড়তে হয়েছে। লালমোহন বাবুর বয়েস হচ্ছে। এই সব বিপদের একটা অবচেতন ছায়া ওনার মনে বাসা বাঁধছে না তো? যেটা উনি নিজেও বুঝতে পারছেন না। মনে হয়ত উনি এখন যুবক। কিন্তু বয়েসতো থেমে থাকছে না।
আচ্ছা... আমি নিজের খ্যাতি বা কাজের আনন্দে কারও ক্ষতি করছি না তো? আজকাল অপরাধীরা বড্ড বেপরোয়া !
সিধুজ্যাঠা একলা থাকেন। লালমোহনবাবুও গড়পাড়ের সুনসান পাড়ায় প্রায় একলাই থাকেন। চিন্তা হয় মাঝে মাঝে...
***
(9)
সিধুজ্যাঠার কাছেই শুনলাম, আমাকে নিয়ে নাকি আজকাল অনেকেই চর্চা করছে। তোপসেও সেদিন বলল ওর কলেজের এক বন্ধু নাকি আমাকে নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখছে। আমার সঙ্গে একদিন দেখা করতে আসবে। বেশ লাগে। সেলেব্রিটি সেলেব্রিটি ফিলিং হয়। মনে একটা গর্বভাব আসেই। যদিও সেটা যেন অহংকারে না পরিণত হয়, সেটা দেখতে হবে। তোপসেকেও বলি। কক্ষনো নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাববি না। “ফেলুমিত্তিরের বুদ্ধি” নিয়ে আমার একটা অহং ভাব এসেছিল এক সময়। আর সেটাকে বাড়তে দিই নি।
আচ্ছা আপনারা বলুনতো আমি কি এমন করেছি যে, আমার অহংকার হবে? আমাকে নিয়ে চর্চা হবে? সমাজের বুকে কিছু অপরাধীদের ধরে তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিমাত্র। তারজন্য আমার বুদ্ধি – সাহস – মগজাস্ত্রের ব্যবহার করেছি। এতো সবাই করে। সবারই তাদের নিজেদের মত করে বুদ্ধি – সাহস – মগজাস্ত্র আছে। যে লোকটা ১০টা-৫টা চাকরি করে একটা ৫/৬ জনের সংসার চালায় তার বুদ্ধি লাগেনা? তার সাহস নেই? অফিস – বাজার – সংসারের কাজে মগজাস্ত্র লাগে না? আমি যেমন মগনলাল বা মন্দার বোস কিংবা ধরুন, মহাদেব চৌধুরীর মত লোকেদের অপরাধ ধরবার মগজাস্ত্র ব্যবহার করি, কিন্তু কই, বাজার থেকে কত কিলো চাল কিনলে এই মাসের ভাতের জোগান হবে সেই হিসেবটা পারি না। তাহলে? সেটা যে পারে তারও তো বুদ্ধি আছে। তাকেও তো মগজাস্ত্র খাটাতে হয়।
যাকগে, বয়েস বাড়ছে... অনেক বাজে কথা বলে ফেলি। লোকে ভালবাসে, সেই ভালবাসাটা নিতে হয়। নইলে যে...
রাতে যখন আজকাল ঘরে বসে বই পড়ি, তোপসে ওঘরে বসে কম্পিউটারে কাজ করে, পাড়াটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়। নিজেকে মাঝে মাঝে একলা মনে হয়। কেন?
***
(10)
সেদিন একটা ভালো ঘটনা ঘটল। সকালে যোগব্যায়াম সেরে সবে ড্রয়িংরুমে এসে বসেছি। তোপসে ছিলো না। প্রফেসরের বাড়ি নোটস নিতে গিয়েছিল। বেল বাজল। শ্রীনাথদাও দেশে গিয়েছিল। আমি উঠে দরজা খুললাম। মহিম সেন। বয়েস বেড়েছে। চুলে পাক। মুখটা দুর্গাগতি সেনের আদল আসছে। দাড়িটা শুধু নেই। সঙ্গে ওনার পুত্র। অভীক সেন। তখন তো আটবছর বয়েস ছিল। এখন সে উচ্চমাধ্যমিক দেবে। আর্টস নিয়ে পড়াশুনো করছে। এখন ওনারা সপরিবারে পুরীতেই থাকেন।
একটি বিশেষ দরকারে এসেছে। ওরা দুর্গাগতি সেনের পুঁথিগুলো সব ডিজিটালাইজড করতে চায়। “দেখুন কাকু। আপনি তো তখনই দেখেছিলেন যে দাদুর পুঁথিগুলো যথেষ্ট অবস্থা খারাপ। সেটা স্বাভাবিক। এইগুলো সম্পূর্ণ নষ্ট হওয়ার আগে একটা ডিজিটাল ফরম্যাটে সেভ করাটা জরুরি। আর তার জন্যই আপনার কাছে আসা। দাদু সিদ্ধেশ্বর বোসের কাছে যাওয়ার জন্য বললেন। তাই আপনার কাছে আগে এলাম।”
ওদের সিধুজ্যাঠার কাছে নিয়ে গেলাম। উনিও খুব খুশি হলেন। এমনকি ওনার সংগ্রহগুলোও দেবেন বলে কথা দিলেন। ব্যাপারটা খুব ভালো করছে ওরা। আজকালকার প্রজন্ম একদমই উচ্ছন্নে যাওয়া প্রজন্ম নয়, এটা আমাদের বিশ্বাস।
সারাদিন প্রায় আড্ডা হল। সিধুজ্যাঠার বাড়ি খাওয়া দাওয়া হল। তোপসেও এল পড়া সেরে। লালমোহনবাবুকেও ডেকে নিলাম। পুরনো পুঁথি নিয়ে কথা হল। বেশ কাটল দিনটা। ওদের সেদিন রাতেই পুরী ফিরে যাওয়ার ট্রেন। লালমোহনবাবুর গাড়িতেই ওনাদের হাওড়াতে সি-অফ করে এলাম। লালমোহনবাবু আজকের আড্ডার ফলে পুরনো পুঁথি নিয়ে একটা উপন্যাসের প্লট ভাবছেন। সেটার পটভূমি দেবেন ভাবছেন এই কলকাতাতেই। কলকাতা নিয়ে ওনার বিশেষ লেখা নাকি হয় নি। তোপসে বলে, “কি নাম দেবেন ভাবছেন? কলিকাতায় কলিকাল?”। ওনার গাড়িতে ফিরতে ফিরতে আড্ডা হাসিঠাট্টা করতে করতে তিনজনেরই মনে হল, সত্যি অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি তিনজনে। কোথাও একটা গেলে হয়...
***
(11)
শরীরটা কদিন ভাল যাচ্ছে না। হ্যাঁরে বাবা! তোপসে আর তার পাঠকের কাছে আমি তো সুপারহিরো। তাই আমার নাকি শরীর খারাপ করে না। যোগাভ্যাস থাকলেও, আমার তো মানুষের শরীর। তবে সিরিয়াস কিছু নয়। কদিন বাদলা হয়ে একটু ঠান্ডা গরমে শরীরটা খারাপ করেছিল। এখন বাড়িতে বসে বসে একটু কুঁড়েও হয়ে গেছি। এখন মনে হচ্ছে ব্যাঙ্কের চাকরিটা না ছাড়লেও হত। গোয়েন্দাগিরি করে সারাজীবন চলে না। বাস্তবে সত্যিই চলে না। মাসে মাসে আয়ের একটা পথ থাকা প্রয়োজন। বই অনুবাদের কাজ করি। নিজে লেখার ক্ষমতাতো নেই। প্রবন্ধ লিখতে হয় চাপে পড়ে। সেদিন একটা গোয়েন্দা পত্রিকায়, গোয়েন্দাগিরি নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখলাম। কিছু উৎসাহী ছেলেমেয়েরা পত্রিকাটা বার করছে। কলকাতার নয়, হুগলী থেকে। কিন্তু এই লিটল পত্রিকাগুলো চালানো বেশ চাপ। কলেজলাইফে থাকতে সুহৃদ, গৌতম, অনিমেষ আমরা একটা বার করতাম। বিদেশী অনুকরণ করেছিলাম। চলেনি বেশীদিন।
আচ্ছা আপনাদের কি মনে হয়? সারাজীবন এত পড়াশুনো, এত ক্রাইমের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া, এত মানুষের সঙ্গে মেলামেশা, এত ঘটনা একটা মানুষের জীবনের লাভক্ষতির হিসেবে কি প্রভাব ফেলে? একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের জীবন এটা? আজকাল Freelancer হয়েছে সব ক্ষেত্রেই। ভবিষ্যতে আরো হবে। কি জানি এভাবে জীবনধারণ সম্ভব কিনা!
বড্ড আজে বাজে কথা লিখছি নাহ? ডায়েরীতে এসব লেখে না। সিধুজ্যাঠা বলবে, “একিহে ফেলু! তোমার শেষে এই অবস্থা!” যে মানুষটা ৩০ বছর ধরে সারাভারত ঘুরেছে। দাপটের সঙ্গে ক্রাইম আর ক্রিমিনাল নিয়ে পেশাগত ভাবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে, সে একটা অকর্মণ্য পুরুষ হয়ে ঘরে বসে।
আপনাদের জানতে ইচ্ছে করে না? কেন এমন হল?
আমি কি হতাশ হয়ে পড়ছি?
***
(12)
আপনাদের শীলা বিশ্বাসকে মনে আছে? মেরি শীলা বিশ্বাস... লখনউয়ের... সেই লালমোহনবাবুকে নিয়ে যেবার গেলাম... শকুন্তলাদেবীর কণ্ঠহার নিয়ে একটা ঘটনা হয়েছিল। সেই মেরি শীলা বিশ্বাস। এখন সে রীতিমত নামকরা ইন্টিরিয়র ডেকরটর। নিজের কোম্পানিও করেছে। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সে কাজ করে বেড়ায়। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিল্যান্স জার্নালিজমটাও চালিয়ে যাচ্ছে। বিয়ে করেনি। A perfect independent working lady. এমন মেয়েদের দেখলে সত্যি গর্ব হয়। বাঙালি মেয়েরা যে কি না করতে পারে সেটা এদের দেখলে বোঝা যায়।
ও গত সপ্তাহে এসেছিল। Indian Private Detective দের নিয়ে একটা আর্টিকল লিখছে বিদেশী এক পত্রিকার জন্য। আবার ইন্টারনেটেও নাকি ভিডিও দেখাবে... ইউটিউবে। আপাতত নাম প্রকাশ বারণ বলে লিখলাম না। প্রথম দশজনের মধ্যে নাকি আমাকেও সিলেক্ট করেছে। একদিন এসে পারমিশন নিল আর আড্ডা দিয়ে গেল। পরের দিন ফুলটিম নিয়ে এসে সে এক এলাহি সাক্ষাৎকার। ক্যামেরাম্যান, ভিডিও আরো কত লোক। শুটিং জিনিসটা সাধারণত আমি এড়িয়ে চলি। কিন্তু এক্ষেত্রেতো আমি নিজেই ক্যামেরার সামনে। একটু অপ্রস্তুত লাগছিল। সিধুজ্যাঠাকে অনেকবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও এলেন না। বড্ড প্রচারবিমুখ।
শীলা বিশ্বাস পুরনো অনেক কথা বলল। স্মৃতিগুলো আবার মনের সামনে চলে এল। জয়ন্তবাবু বৃদ্ধ হয়েছেন। ব্যবসা এখন প্রসেনজিৎ সামলাচ্ছে। ও নাকি এখন অনেক ভদ্র ও শিক্ষিত হয়েছে। সেই ঘটনার পর প্রসেনজিৎ নাকি বিভিন্ন মানসিক সমস্যার মধ্যে পড়ে কোন এক কারণে। তারপর কাউন্সেলিং করে সুস্থ হয় ও MBA করে।
সত্যি বিচিত্র মানুষের জীবন! ভাবতে পারেন! ইন্সপেক্টর তেওয়ারী... যিনি মছলিবাবার মত ভন্ড সাধু আর মগনলালকে জেলবন্দী করেছিলেন তিনি অবসর নেওয়ার পর এক ধর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত হন আর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। কারো ধর্মবিশ্বাসে আমি আঘাত করতে চাইনা তাই কিছু বলিনি। মনের শান্তির জন্য অনেক কিছু করা যায়। মানুষের জন্য কাজ করা প্রয়োজন। যোগাভ্যাস আর মেডিটেশন করলেই অনেক শান্ত মন একাগ্র মন পাওয়া যায়। যাইহোক এসব তর্কের বিষয়... থাক এসব কথা।
আগামী সপ্তাহে লালবাজার থেকে এক অফিসারের আসার কথা। সুপ্রতিম না কি যেন নাম। আজকাল ল্যান্ডফোনের এত অপরিষ্কার শব্দ আসে যে ভাল করে কথা বলা যায় না। তোপসে একটা স্মার্টফোন নেওয়ার কথা বলছে... আমার একটুও ইচ্ছে নেই। দিব্বি তো এতকাজ করলাম স্মার্ট ফোন ছাড়াই...
***

No comments:
Post a Comment